Home হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২০ (২)

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২০ (২)

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২০ (২)
সাবা খান

আজকের দুপুরটা যেন অস্বাভাবিকভাবে উজ্জ্বল, বাতাসে একটা অদৃশ্য উত্তেজনা, চাপা ফিসফাস, আর কৌতূহলের ঢেউ। ঢাকার উপকণ্ঠে বিশাল এক খোলা মাঠে চারদিকে রঙিন ব্যানার, বিশাল স্টেজ, ডিজিটাল স্ক্রিন আর ফুলের সাজে সজ্জিত এক অভিজাত আয়োজন। কেননা আজ উদযাপিত হচ্ছে,
“জেবি হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন”
এর পনেরো বছর পূর্তির অনুষ্ঠান।
এই ফাউন্ডেশনের নাম শুনলেই মানুষের চোখে ভেসে ওঠে দান, সাহায্য আর মানবতার ছবি। এত বছর ধরে হাজার হাজার মানুষকে সাহায্য করেছে, অসংখ্য অসহায় পরিবারকে দাঁড় করিয়েছে নিজের পায়ে আজ সেই ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ‘সোফিয়া জাওয়ান’ নিজে উপস্থিত থাকবেন সাধারণ মানুষের মাঝে। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে, মাঠজুড়ে মানুষের ঢল নেমেছে।
কেউ এসেছে দূর গ্রাম থেকে, কেউ শহরের ভিড় ঠেলে শুধু একবার চোখের দেখা দেখতে, একবার সামনে থেকে ‘মা’ বলে ডাকার জন্য। চারদিকে থেকে ভেসে আসছে সোফিয়ার গুণকীর্তন,

–“উনিই তো আমাদের বাঁচাইছে”
–“এই মহিলা না থাকলে আজ আমি রাস্তায় থাকতাম”
–“সোফিয়া ম্যাম আসবে নাকি সত্যি?”
স্টেজের সামনে বড় বড় এলইডি স্ক্রিনে ভেসে উঠছে ফাউন্ডেশনের কাজের ভিডিও, অসহায় শিশুদের হাসি, বন্যার সময় সাহায্য, হাসপাতাল, স্কুল সবকিছু যেন নিখুঁত, সবকিছু যেন স্বর্গীয়। কিন্তু এই স্বর্গীয়তার আড়ালেই লুকিয়ে আছে নরক যা কেউই দেখছে না। স্টেজের একপাশে বসে আছে ফাউন্ডেশনের দুই বড় অংশীদার সাবেক জেনারেল ওয়াসিম হায়দার ও চতুর ভারতীয় ব্যবসায়ী আলী মির্জা। তারা দুজনেই নিচের জনতার দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝে একে অপরের দিকে চোখাচোখি করছে। ওয়াসিম নিচু স্বরে বলে,
–“সোফিয়া এবারের অনুষ্ঠান অনেক বড় করে করেছে”
আলী মির্জা ঠোঁট বাঁকিয়ে প্রত্যুত্তর করে,

–“শো যত বড়, আড়ালের খেলা তত গভীর”
তারপর দুজনের ঠোঁটে খেলে যায় কুটিল হাসি।
হঠাৎ করেই মাঠের এক প্রান্তে ভিড় জমাট বেঁধে যায়। সিকিউরিটি টিম দ্রুত সক্রিয় হয়ে ওঠে। ওয়াকিটকিতে ভেসে আসে জিহাদের কণ্ঠস্বর,
–“লেডি অন দ্য ওয়ে… ক্লিয়ার দ্য পাথ”
মুহূর্তেই মানুষের ভিড় দুদিকে সরে যেতে থাকে। কালো স্যুট পরা গার্ডরা একপ্রকার ঢাল তৈরি করে এগিয়ে নিয়ে আসছে। তারপর সেই ঢালের মাঝখান থেকে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে আসে সোফিয়া জাওয়ান। সাদা কালো জামদানী শাড়ি, চোখে ডার্ক গ্লাস, ঠোঁটে হালকা হাসি টেনে তিনি এগিয়ে চলছে সামনে। মাঠজুড়ে জনতা চিৎকার করে বলতে থাকে,

–“সোফিয়া ম্যাম, “মা” “আমাদের গর্ব”
হাজার হাজার মানুষের কণ্ঠে তার নাম উচ্চারিত হতে থাকে। সোফিয়া ধীরে ধীরে হাত তোলে একটা মেকি হাসি ছড়িয়ে দেয় চারদিকে। তার চোখের কোণে কোনো দুঃখ নেই, কোনো উৎকণ্ঠা নেই, যেন তার নাতি অপহৃত সে বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। স্টেজে উঠে এসে তিনি প্রধান চেয়ারে বসেন। ওয়াসিম ও আলী মির্জা উঠে দাঁড়িয়ে তাকে সম্মান জানায়। সোফিয়া হালকা মাথা নেড়ে বসে পড়ে। তার দৃষ্টি একবার পুরো মাঠে বুলায় নজরে আসে মানুষের উচ্ছ্বাস, বিশ্বাস, ভক্তি। সবকিছু সে দেখে তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে এক অদ্ভুত হাসি। তবে তার মনের ভেতরে তখন চলছে অন্য খেলা, সোফিয়া খুব ভালো করে জানে, যারা আরভিকে কিডন্যাপ করেছে তাদের কে আরজে ছাড়বে না। আর সময় মতো সে নিজের দরকারি জিনিস টা ছিনিয়ে নিবে। তার আঙুল ধীরে ধীরে চেয়ারের হাতলে টোকা দেয়। কিয়ৎকাল পরই তাকে ভাষণ দেওয়ার জন্য ডাকা হয়।
ঢাকার খোলা বিশাল মাঠ যেখানে কিছুক্ষণ আগেও উৎসবের রঙে ভাসছিল চারপাশ, এখন সেখানে এক অদ্ভুত ভারী নীরবতা নেমে এসেছে। মঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে আছে সোফিয়া জাওয়ান। তার ঠোঁটে এখনো সেই অভ্যাসগত আত্মবিশ্বাসী মেকি হাসি। মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি হাত তুলতেই জনতা নিস্তব্ধ হয়ে যায়। সোফিয়া বলতে শুরু করে

–“মানবতা… এই শব্দটাই আমার জীবনের মূল মন্ত্র। এই ফাউন্ডেশন, এই পরিবার সবকিছু আমি গড়ে তুলেছি মানুষের জন্য, আপনাদের জন্য”
তার কণ্ঠে এমন মাতৃত্বময়, মায়াভরা বাক্য ভিড়ের মানুষগুলো মুগ্ধ হয়ে শুনছে। কারও চোখে শ্রদ্ধা, কারও মুখে প্রশংসা। তিনি ফের বলেন,

–“আমি বিশ্বাস করি, একজন মানুষ যদি আরেকজন মানুষের পাশে দাঁড়ায় তাহলেই পৃথিবীটা বদলে যাবে…”
হালকা করতালি উঠতে শুরু করে জনতার তরফ থেকে। কিন্তু হঠাৎই তালির শব্দ থেমে যায়। একটা অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে পুরো মাঠ জুড়ে। সোফিয়া কথা বলার মাঝেই থেমে যায়। সে ভ্রু কুঁচকে লক্ষ্য করে সামনের হাজার হাজার মানুষের মুখে হঠাৎ অন্ধকার নেমে এসেছে। তার মধ্যে কেউ ফিসফিস করছে, কেউ স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে তার পেছনের দিকে।
সোফিয়া তাদের দৃষ্টি অনুসরণ করে ধীরে ধীরে পিছনে ঘুরে তাকায়, আর ঠিক সেই মুহূর্তেই তার চোখ বিস্ফোরিত হয়ে যায়। সে চমকে উঠে কেননা পেছনের বিশাল এলইডি স্ক্রিনে তার মুখ নয় চলছে ভিডিও, তার নিজের কিছু গোপন ভিডিও চলছে পরপর। প্রথম ক্লিপে দেখা যাচ্ছে একটা অন্ধকার কক্ষে কয়েকজন মন্ত্রী টেবিলের ওপারে বসে আছে। যারা কয়েক বছর আগে হঠাৎ-ই উধাও হয়ে গিয়েছিল। সোফিয়া তাদের সামনে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা স্বরে আওড়ায়,

–“হয় আপনারা আমার সাথে হাত মিলাবেন না হয় সেই হাত থাকবে না যেই হাত আমার বিরুদ্ধে ওঠবে আর না সেই হাতের মালিক”
তার এমন হুমকির তোফে মুহুর্তে কয়েকজন তার সাথে চুক্তিবদ্ধ হয় আর যারা তার বিরোধিতা করে সেই মন্ত্রীদের গাড়ি হঠাৎ বিস্ফোরণ হচ্ছে, আগু*নে পুড়ে যাচ্ছে তাদের ঘরবাড়ি।
তারপর আরেকটা ক্লিপ চালু হয়, ভিডিও তে দেখা যাচ্ছে ফাউন্ডেশনের ভেতরের একটা গোপন মিটিং চলছে। আর সোফিয়া ঠান্ডা গলায় বলছে,
–“মানুষকে সাহায্য করার মানে… তাদের বিশ্বাসটা কিনে নেওয়া। তারপর সেই বিশ্বাস দিয়েই ওদের শেষ করা”
চারপাশে বসে থাকা লোকজন মাথা নেড়ে সম্মতি দিচ্ছে তার কথায়। তৃতীয় ক্লিপে দেখা যাচ্ছে কিছু ছোট ছোট বাচ্চারা অসহায়ভাবে কাঁদছে। একজন গার্ড তাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে। পেছন থেকে সোফিয়ার বজ্র কণ্ঠ আদেশ ছুঁড়ে,

–“এইগুলো পাঠাও বাইরে। যত দাম পাওয়া যায়, নাও। ডেড বডি হলেও প্রবলেম নেই”
ভিডিও তে থাকা সোফিয়া আর জনতার সামনের সোফিয়ার মধ্যে যেন আকাশ পাতাল পার্থক্য। এখানে সোফিয়ার মুখে মমতায় ভরা আর ভিডিও তে হিংস্রতায় ভরা।
চতুর্থ ক্লিপে দেখা যাচ্ছে নারীদের একটা দল।কেউ কাঁদছে, কেউ হাত জোড় করে বাঁচতে চাইছে, কেউ বা স্বইচ্ছায় হেঁটে চলছে যেন তারা বাস্তবতার কাছে হেরে গেছে। সোফিয়া ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে,
–“এদের নাম দাও ‘রেসকিউ। আর রুটটা পাঠাও ভারতের বর্ডারের দিকে…”
তার কথা সম্পন্ন করার আগে পিছন থেকে ভেসে আসে মেয়েলি কণ্ঠস্বর,
–“মম, ভারতের বর্ডার সাইট এখনো ক্লিয়ার না। নতুন সব অফিসার এসেছে। মিস্টার মির্জা বলেছে দুদিন পর…..”
রিয়ানা বাক্যটুকু শেষ হওয়ার পূর্বেই সোফিয়া শক্ত কণ্ঠে শুধালো,

–“যেটা বলছি সেটা করো”
–“ওকে মম”
ভিডিও চলতেই থাকে প্রতিটা দৃশ্য, প্রতিটা শব্দ যেন সোফিয়ার মুখোশ ছিঁড়ে ফেলে দিচ্ছে হাজার মানুষের সামনে। মাঠে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে,
–“এটা… এটা কি সত্যি?”
–“ওই মহিলা… এইসব করছে?”
–“ধিক্কার”
সোফিয়া এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকে স্থির হয়ে। তার চোখ লাল হয়ে উঠেছে। হঠাৎ জীবনে প্রথমবারের মতো ক্যামেরার সামনে নিজের বাঁধ খুলে চিৎকার করে ওঠে,
–“জিহাদ, আব্বাস এটা বন্ধ করো রাইট নাউওওও….” বন্ধ করো”
জিহাদ আর আব্বাস ছুটে গিয়ে স্ক্রিনের পেছনে কাজ শুরু করে। কিন্তু কোনক্রমেই ভিডিও টা বন্ধ হচ্ছে না। সোফিয়া দন্ত চেপে আদেশ করে,

–“ক্যাবল খুলে ফেলো”
–“সিস্টেম শাটডাউন করো”
জিহাদ এক টানে ক্যাবল খুলে ফেলে তবুও স্ক্রিন চলছে। পাওয়ার কেটে দেওয়া হয় তবুও ভিডিও বন্ধ হয় না। জনতার গুঞ্জন এখন রাগে রূপ নিয়েছে,
–“ভণ্ড, খুনি, মানবতার নামে ব্যবসা, ধিক্কার সোফিয়া জাওয়ান”
হঠাৎ জনতার দিক থেকে একটা ঢিল উড়ে এসে পড়ে মঞ্চের সামনে, তারপর আরেকটা। তারপর একসাথে কয়েকটা যেন আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল কিছু মানুষ। সোফিয়ার গার্ডরা দৌড়ে এসে তাকে ঘিরে দাঁড়ায়। মুহূর্তে জায়গা টা ভরে ওঠে বিশৃঙ্খলতায়। চারদিকে মানুষ চিৎকার করে সোফিয়ার দিকে ধিক্কার জানাচ্ছে। সোফিয়ার শিরায় শিরায় রাগ জমে ওঠেছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে চারপাশে তাকায়। তারপর হঠাৎ মঞ্চের পাশে থাকা ভারী চেয়ারটা তুলে নিয়ে পুরো শক্তি দিয়ে ছুঁড়ে মারে এলইডি স্ক্রিনের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে কাঁচের স্ক্রিন ফেটে চৌচির হয়ে যায় সাথে ভিডিও বন্ধ হয়ে যায় । কিন্তু ততক্ষণে যা শেষ হওয়ার হয়ে গেছে, যা দেখার মানুষ দেখে ফেলেছে। কিছুক্ষণ আগেও যারা বলছিল, আমাদের গর্ব, আমাদের মা। এখন তারাই চিৎকার কর বলছে অভিশাপ, রক্তচোষা, শিশু পাচারকারী, খুনি, মানবতার কলঙ্ক। ওয়াসিম হায়দার আর আলী মির্জার নামও ছড়িয়ে পড়ে ভিড়ের মধ্যে। মাঠ এখন যুদ্ধক্ষেত্রের মতো হয়ে ওঠেছে, চিৎকার, ভাঙচুর, রাগ, ঘৃণায়। আর সেই বিশৃঙ্খলার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ‘সোফিয়া জাওয়ান’। সে চারদিকে তাকিয়ে দেখছে,

মাঠজুড়ে মুহূর্ত আগেও যেখানে করতালির শব্দ ছিল, সেখানে এখন শুধু চিৎকার, গালাগালি আর বিশৃঙ্খলার ঝড়। স্টেজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো আর আগের সেই ভক্ত নয় তাদের চোখে এখন শুধু ঘৃণা আর ধিক্কার। সোফিয়া জাওয়ান, পাশে আলী মির্জা ও ওয়াসিম হায়দার তিনজনকেই তাদের গার্ডরা প্রায় জোর করে ঘিরে ফেলেছে। আব্বাস চিৎকার করে ওঠে,
–“লেডি, প্লিজ মুভ”
এদিকে মানুষের ভিড় যেন হিংস্র জন্তুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছে তাদের ওপর। কেউ সামনে এসে গার্ডের কলার ধরে ঝাঁকাচ্ছে সাথে মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছে,
–“তোদের মতো জানোয়ারদের আমরা এতদিন সম্মান দিছি”
আরেকজন লাঠি তুলে আঘাত করতে গেলে গার্ডরা ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। আব্বাস দাঁত চেপে বলে,
–“ফায়ার….”
পরের মুহূর্তেই সোফিয়ার গার্ড রা কালবিলম্ব না করে গুলি ছুড়ে জনতার দিকে। সাথে সাথে মানুষ ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়, কেউ দৌড়াচ্ছে, কেউ পড়ে যাচ্ছে, কেউ চিৎকার করছে। একটা ভয়ংকর বিশৃঙ্খলা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই সুযোগে সোফিয়া কোনমতে গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ে। তার বুক উঠানামা করছে দ্রুত। এটা সেই নারী না, যাকে সবাই ভয় পায়। এটা এক আতঙ্কিত নারী, যে প্রথমবার নিজের সাম্রাজ্য ভেঙে পড়তে দেখছে। সে কাঁপা কণ্ঠে বলে,

–“ড্রাইভ, ফাস্ট এখান থেকে বের হও”
গাড়ি ছুটে চলে মুহূর্তে তবে যাওয়ার আগে সে একবার কাঁচের বাইরে তাকায়। মানুষ এখনো দাঁড়িয়ে আছে, আঙুল তুলে গালি দিচ্ছে তার দিকে। সোফিয়ার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। তার ঠোঁট কেঁপে ওঠে,
–“নো… নো… এমনটা হতে পারে না”
তার মাথার ভেতর বারবার ঘুরে ফিরে একটাই কথা ঘুরছে “সব শেষ হয়ে যাচ্ছে”। এখন তার মনে হচ্ছে, এখানে যদি আজ আরজে থাকতো তাহলে এগুলো অনেক সহজে সামলে নিত। তার এদেশে পথ চলার শুরুর দিকে অনেক বার এমন হয়েছিল কিন্তু আরজে সব সামলে নিয়েছে।
এই বিশৃঙ্খলার মাঝেই, রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে আছে একটা কালো বিলাসবহুল গাড়ি। গাড়ির কাঁচ ধীরে ধীরে নিচে নামে। ভেতর থেকে প্রথমে সিগারেটের ধোঁয়ার কুণ্ডলী বেরিয়ে আসে। ধোঁয়া কেটে গেলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে মুখটা,
“সারহাদ চৌধুরী”
তার চোখে কোনো উত্তেজনা নেই, কোনো ভয় নেই শুধু ঠান্ডা, হিসেবি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনের বিশৃঙ্খল অবস্থার দিকে। কিছু লোক, যারা একটু আগে সোফিয়ার দিকে ঢিল ছুঁড়ছিল, দৌড়ে এসে দাঁড়ায় তার সামনে। তাদের মধ্যে একজন ফিসফিস করে,

–“স্যার, কাজ হয়ে গেছে”
সারহাদ কিছু না বলে শুধু পাশে রাখা একটা ব্যাগ তুলে তাদের দিকে এগিয়ে দেয়, ব্যাগের ভেতর টাকা ভর্তি। লোকগুলো এক মুহূর্ত দেরি না করে সেটা নিয়ে সরে পড়ে। গাড়ির ভেতরে আবার নিস্তব্ধতা নেমে আসে। সারহাদ সিগারেটে শেষ টান দিয়ে সেটা বাইরে ছুঁড়ে ফেলে। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা ঠান্ডা, নির্মম হাসি ফুটে ওঠে। সে গভীর স্বরে আওড়ায়,
–“এটা শুধু টেইলার ছিল, আসল খেলা তো এখন শুরু হবে”
সে সিটে হেলান দিয়ে বসে, আঙুল দিয়ে হালকা টোকা দিয়ে বলে,
–“আজ সাম্রাজ্য কাঁপছে… কাল সেটা ধসে পড়বে”
গাড়ির কাঁচ ধীরে ধীরে উঠে যায়। বাইরে এখনো মানুষের চিৎকার, আগুন, বিশৃঙ্খলা আর ভেতরে বসে আছে সেই মানুষটা, যে সবকিছু পরিকল্পনা করেছে।

সমুদ্রের বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা দানবীয় ‘ড্যাসেল’ জাহাজটা যেন অন্ধকারের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। চারদিকে শুধু কালো পানি, আকাশে মেঘের ভার মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি পুরো জাহাজটাকে এক সেকেন্ডের জন্য আলোকিত করে আবার গিলে খায় অন্ধকার। সময়টা বিকাল হলেও তা বুঝার উপায় নেই। বিশাল সেই জাহাজের গায়ে ধাতব শব্দ, কোথাও দূরে মেশিনের গর্জন, আর ভিতরে এক অদৃশ্য উত্তেজনা, যেন কিছু ভয়ংকর ঘটতে চলেছে।
জাহাজের ভেতরের করিডোরগুলোর মধ্যে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা। ডেকের পাশে দাঁড়িয়ে আছে একই মুখের মানুষগুলো, প্লাস্টিক সার্জারিতে তৈরি একরকম চেহারা, নিঃস্পৃহ, ঠান্ডা, যান্ত্রিক চোখে তারা পাহারা দিচ্ছে নীরবে।
এই নীরবতার মাঝে সেই কক্ষে ধীরে ধীরে হেঁটে এগিয়ে যাচ্ছে আরজে। তার চোখে আগুন, চোয়াল শক্ত, প্রতিটা নিঃশ্বাস যেন আগ্নেয়গিরির লাভার মতো গরম। তার দৃষ্টি একদম সামনে মেঝেতে পড়ে থাকা দুইটা দেহের দিকে যেখানে র*ক্তে ভেজা, নিস্তেজ, জ্যাক আর রওনাক। আরজে থেমে কয়েক সেকেন্ড শুধু তাকিয়ে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে থমাসের চারপাশ দিয়ে হেঁটে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে ধারালো কণ্ঠে ফের বলে,

–“ওপস..মাই স্টেপ ব্রাদার, তুই ওকে মেরে দিয়েছিস, তাই না? তারপর তার জায়গায় নিজেকে বসিয়েছিস ‘থমাস স্টিফেন’
এক মুহূর্ত সব নিস্তব্ধ তারপর হঠাৎ সেই নিস্তব্ধতা ছিঁড়ে মেঝে থেকে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ায় রওনাক রূপী থমাস স্টিফেন। সঙ্গে সঙ্গে একটা বিকৃত সাইকোটিক হাসি পুরো রুমে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। থমাস নিজের হাতটা মটকা দিয়ে ঠিক করে, যেন এতক্ষণ ধরে ভাঙা ছিল। তারপর ঠোঁটের কোণে থাকা আঘাতের দাগ গুলো আঙুল দিয়ে টেনে খুলে স্টিকার গুলো নিচে ফেলে দেয়। একটার পর একটা মেঝেতে পড়ে।
তার বুকের দিকে তাকিয়ে হালকা চাপড় দেয়। সাথে সাথে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটের ভেতর থেকে আরজে করা গুলিগুলো বের করে ফেলে দেয়। টুং টাং শব্দে বুলেট গুলো মেঝেতে গড়াগড়ি খায়। রওনাক রূপী থমাস খিকখিক করে হাসতে হাসতে মাথা কাত করে তাকায় আরজের দিকে। তার চোখে মুখে ফুটে ওঠে অস্থিরতা ভরা পাগলামো।
সেই দিন হসপিটাল থেকে বের হওয়ার পর রাতটা ছিল অদ্ভুত ভাবে নিস্তব্ধ। ঢাকার ফাঁকা রাস্তা চিরে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল কালো কনভয়ের গাড়িগুলো। মাঝখানের গাড়িটাতে বসে আছে ঈশানী, তার বুকের সাথে শক্ত করে চেপে রাখা ছোট্ট আরভি। শিশুটার মাথা তার কাঁধে এলিয়ে আছে ঘুমে।

ড্রাইভিং সিটে জ্যাক, তার সতর্ক চোখ দুটো বারবার চারদিকে ঘুরছে। আর পাশের সিটে বসে আছে রওনাক চুপচাপ, অস্বাভাবিকভাবে চুপচাপ। সে বসে সুযোগের আশায়। হঠাৎ চারদিকের গাড়িগুলোর গতি কমে আসে। আর তারপর এক মুহূর্তে চারপাশে ঘিরে ধরে কালো গাড়ির সারি। জ্যাকের চোখ সরু হয়ে আসে। সে এক সেকেন্ডও দেরি না করে তার দৃষ্টি ছুটে যায় সবদিকে ডানে, বামে, সামনে, পেছনে। মুহূর্তে সে বুঝে তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। নিচু স্বরে হিসহিসিয়ে বলে,
–“ফাঁদ…”
তারপর রওনাক আর ঈশানীর দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলে,
–“আমি না আসা পর্যন্ত কেউ গাড়ি থেকে বের হবে না”
ঈশানী আরভিকে আরও শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে নিজের ভয়ার্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মাথা নাড়িয়ে বলে,
–“ওকে”

জ্যাক ড্যাশবোর্ড খুলে একসাথে দুইটা বন্দুক বের করে। দরজা খুলে বাইরে নেমে যায়। পরের মুহূর্তেই চারপাশের সব গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে একই চেহারার মানুষগুলো। তারা একসাথে আক্রমণ করে আরজের গার্ডদের উপর। কিন্তু জ্যাকের কারণে কেউই আরভির গাড়ির দিকে এগুতে পারছে না। যন্ত্রমানব দক্ষ হাতে একটানা ট্রি*গার চাপতে থাকে। গুলির শব্দে রাত কেঁপে ওঠে। এক এক করে লোকগুলো মাটিতে পড়ে যেতে থাকে। মিনিটের ভেতর পুরো এলাকা র*ক্তে ভেসে যায়। গাড়ির ভেতর থেকে রওনাক তাকিয়ে আছে চোয়াল শক্ত করে। সে ভেবেছিল, জ্যাক তাদের দমাতে ব্যস্ত থাকবে আর সেই সুযোগে সে আরভিকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়বে। কিন্তু জ্যাক বেরুনোর আগে গাড়ি লক করে গেছে। রাগে তার চোখে এক অদ্ভুত আগুন জ্বলে উঠেছে। সে ধীরে ধীরে ঈশানীর দিকে তাকািয়ে মুখে মৃদু হাসি এনে বলে,

–“আমি বাইরে গিয়ে দেখি… তুমি আরভিকে নিয়ে বসো”
ঈশানী সাথে সাথে মাথা নাড়িয়ে বলে,
–“না, না, জ্যাক বলেছে না বেরুতে”
রওনাক কিছু না বলে চুপচাপ বসে থাকে দাঁতে দাঁত চেপে। কিন্তু তার আঙুলগুলো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে আছে। কয়েক মিনিট পর জ্যাক ফিরে আসে। তার সারা শার্টে রক্তের ছিটে। সে সিটে বসে একটা টিস্যু দিয়ে হাত মুছতে থাকে। আর ঠিক তখনই তার এক সেকেন্ডের অসতর্কতায় পাশে বসা রওনাক একটা ইনজেকশন সরাসরি জ্যাকের ঘাড়ে ঢুকিয়ে দেয়। যন্ত্রমানবের চোখ বিস্ফারিত হয়ে যায়। সে সাথে সাথে ইনজেকশনটা টেনে বের করে রওনাকের দিকে তাকায়। বিপরীতে রওনাকের ঠোঁটে ধীরে ধীরে বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে…
ড্যাসেলের ভিতর এই মুহুর্তে রওনাক রূপী থমাস তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলে,

–“স্টেপ ব্রাদার, তোর ওই স্টেপ ব্রাদারটা ছিল এক নাম্বারের গাধা”
সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে আরজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দন্ত পাটি পিষে আওড়ায়,
–“কতবার বলেছি ঐ রওনাককে, তোর মা তৃণা জাওয়ানকে কে মেরেছে ওই সোফিয়া। নিজের হাতে খু*ন করেছে। আর আরজেও ছিল সেই খেলায় কিন্তু শা*লা বিশ্বাসই করলো না”
হঠাৎ তার চোখে পাগলামির ঝিলিক ফুটে ওঠে। সে মাথা নাড়িয়ে হাসতে হাসতে বলে,
–“শা*লা, মরার আগ পর্যন্ত ভাই ভাই করছিল যে ভাই তার ব্যপারে সবটা জেনেও তাকে বঞ্চিত করেছে”
তারপর হঠাৎ কিছু একটা ভেবে আবারও দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
–“ফা*কিং বাস্টার্ড…কিন্তু আমার তো কাউকে লাগতো, তাই না?”
সে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে হাত দুটো ছড়িয়ে বলে,
–“তাই আমি তাকে মেরে দিলাম… আর তার জায়গায় আমি চলে এলাম, ‘রওনাক হয়ে'”
তারপর হঠাৎ আবার হেসে মাথা কাত করে বলে,

–“বল তো, আমার এক্টিং কেমন লেগেছে?
পুরো তিন বছর… থ্রি ফাকিং ইয়ার্স… তুই আমাকে চিনতেই পারিস নি”
সে একবার নিজের গাল ছুঁয়ে দেখে, যেন নিজেই নিজেকে মুগ্ধ চাহনিতে দেখছে,
–“একই টেবিলে বসেছি, একসাথে প্ল্যান করেছি, তোর পরিবারের সাথে থেকেছি। আর তুই “ব্ল্যাক হান্টার” আমাকে একবারও ধরতে পারিস নি। আই অ্যাম ইমপ্রেসড, আরজে… সত্যি ইমপ্রেসড। কারণ তুই এত কাছে থেকেও কিছু বুঝিস নি। কারণ তুই সবসময় ভাবতি, আমি সেই বোকা রওনাক যাকে তুই আর তোর বাপ মিলে অনাথ আশ্রমে রেখে দিয়েছিস”

ঠিক তখনই চারদিক থেকে ঢুকে পড়ে সেই প্লাস্টিক সার্জারি করা গার্ডগুলো। একজন এগিয়ে এসে আরজের হাত থেকে বন্দুক কেড়ে নেওয়ার জন্য বাকিরা ঘিরে ফেলে তাকে। তাদের বন্দুকগুলো একসাথে তাক করে সোজা তার মাথা আর বুকের দিকে। কিন্তু বিপরীতে পাশের মানব একটুকুও নড়ে না। এখন তার প্রথম কাজ, আরভিকে সেফলি দেখা। এজন্যই সে থমাসকে উসকে দিয়েছে যাতে সে আরভিকে সামনে নিয়ে আসে।
থমাস ধীরে ধীরে মাথা কাত করে তাকায় আরজের দিকে, চোখ সরাসরি আরজের চোখে গেঁথে দিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে আবার বলে,

–“জানিস, তোর একটা ভুলই আমাকে এই জায়গায় এনে দিয়েছে। তুই নিজে তোর সিকিউরিটি গার্ডদের বলেছিলি,
‘দ্যাটস মাই ব্রাদার…অ্যান্ড আই টুক দ্য চান্স”
আমি চাইলে গত তিন বছরে তোকে, তিনশো কোটি বার মে*রে ফেলতে পারতাম। একবার না, বারবার, প্রতিদিন, প্রতিটা মুহূর্তে”
থমাস আঙুল তুলে আরজের বুকে নির্দেশ করে ফিসফিস করে,
–“কিন্তু আমি সেটা চাইনি। আমি চেয়েছিলাম তুই ধুঁকে ধুঁকে মরিস, ভিতর থেকে পচে যাস। যেমনটা তোরা মা ছেলে আমার মায়ের সাথে করেছিস। তোর সব দুর্বলতা আমি নিজের হাতে টেনে বের করেছি। কারণ ব্ল্যাক হান্টারকে গুলি মে*রে মারা যায় না, ওকে ভাঙতে হয় ভিতর থেকে”
আরজে এক পলক তার দিকে তাকিয়ে কিছু না বলে, হঠাৎ ঝড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে সামনে থাকা গার্ডদের ওপর। কয়েক পলকেই চারপাশে ধপ ধপ শব্দ একজন, দুজন, পরপর গার্ড গুলো মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে। কারো মুখ থেঁতলে গেছে, কারো গলা চেপে ধরা, কারো অস্ত্র ছিটকে গেছে দূরে। কিন্তু আরজের হাত থেমে যায় থমাসের ঠান্ডা কণ্ঠে আওড়ানো একটা বাক্যে,

–“ব্ল্যাক হান্টার, জাস্ট রিমেম্বার ইউর সান”
শব্দটা যেন ব্রেক কষে দেয় আরজের ওপর সাথে সাথে আরজে থেমে যায়। তার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত রাগে, কিন্তু হাত থেমে গেছে। ধীরে ধীরে সে ঘুরে তাকায় থমাসের দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে। থমাস ঠোঁট বাঁকিয়ে হালকা একটা ইশারা করে। মুহূর্তে পেছন থেকে চার-পাঁচজন গার্ড এসে হ্যান্ডকাফে আটকে ফেলে আরজের হাত। আরজে দাঁতে দাঁত চেপে সব সহ্য করে নেয়। একটাও শব্দ করে না কেননা এখন প্রশ্নটা তাার ছেলের।
থমাসের ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে পৈশাচিক তৃপ্তির হাসি। ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যায় মেঝেতে পড়ে থাকা জ্যাকের দিকে। জ্যাকের চোখ লাল, শরীর র*ক্তাক্ত, তবুও দৃষ্টি আগুনের মতো। থমাস তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে ঠোঁট বেঁকিয়ে মুখে ‘চ’ বর্গীয় শব্দ উচ্চারণ করে বলে,

–“তুই জানিস, তুই কী? তুই একটা কলগার্লের ছেলে”
শব্দটা ঘরে ছু*রি হয়ে ছড়িয়ে পড়ে বিপরীতে মানবের সারা শরীরে, মুহূর্তে তার শরীর কেঁপে ওঠে। সে চোয়াল শক্ত করে দাঁড়াতে চেষ্টা করে, হাত কাঁপছে, শরীর দুলছে তবুও উঠে দাঁড়াতে যায় কিন্তু পারছে না। আবার পড়ে যায় মেঝেতে। তবুও গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে,
–“শুয়োরের বাচ্চা, আরেকবার আমার মাকে নিয়ে কিছু বললে…..”
তার গলা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে রাগে। থমাস তার রাগী চেহারা দেখে চকচকে দন্ত পাটি বের করে খিকখিক করে হেসে ফেলে। আরও কাছে ঝুঁকে চোখে চোখ রেখে বলে,

–“এই দুই দিনেও তোর তেজ একটুও কমেনি, ইমপ্রেসিভ। কিন্তু তুই সত্যিটা জানিস না, জ্যাক…তোর মাকে রে**প করেছিল… ইকবাল জাওয়ান আর তার বন্ধুরা মিলে”
কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা নেমে আসে কক্ষে। জ্যাকের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে থমাস আবার বুলি ছুড়ে,
–“তোর তো বাপের-ই ঠিক নেই, ইয়ার….”
ব্যাস এই শব্দটাই যথেষ্ট ছিল জ্যাকের বিগড়ে দেওয়া মস্তিষ্ককে আগুন জ্বালাতে। বাক্যটা শেষ হওয়ার আগে জ্যাক ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ওপর। তার দুর্বল হাত দিয়েই থাবা বসায় থমাসের মুখে একটার পর একটা। থমাসের ঠোঁট ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ে। কিন্তু বিপরীতে সে বিকৃত ভাবে হাসছে, খিক খিক করে পাগলের মতো। তার চোখে মুখে উন্মাদনার ঝিলিক। সে হাত তুলে ইশারা করতেই মুহূর্তে গার্ডগুলো এগিয়ে এসে। জ্যাককে ধরে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে থাকে মেঝের ওপর দিয়ে। তার শরীর ঘষটে যাচ্ছে, র*ক্তের দাগ রেখে যাচ্ছে পিছনে। ঘরের ভেতর আবার নেমে আসে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। আরজে অদূরে দাঁড়িয়ে আছে হাত বাঁধা, চোখে আগুন নিয়ে। সে যতক্ষণ না আরভিকে খুঁজে পাচ্ছে ততক্ষণ কাইলিন বা তার গার্ড রা আসতে পারবে না। আর একবার আরভি তার হাতে আসার পর…

সমুদ্রের বুক চিরে এগিয়ে চলা দানবীয় ‘ড্যাসেল’ জাহাজটা যেন আজ হঠাৎ করে থমকে গেছে। চারপাশে কালো পানির উপর চাপা উত্তেজনা। জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে থাকা মার্কানের গার্ড গুলো কড়া পাহারারত অবস্থায়। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চারপাশে তাকাচ্ছে বারবার। কেননা মার্কান খুব ভালো করে আরজে কে চিনে সে কি জিনিস। এত সহজে যে আরজে এখানে ধরা দিবে না এটা সেও বুঝতে পারছে। তাই কল করে বারবার নিজের গার্ড দের সতর্ক থাকতে বলছে।
হঠাৎ দূরের আকাশে গর্জন তুলে ছুটে আসে কয়েকটি হেলিকপ্টার। এগুলো সাধারণ কোনো হেলিকপ্টার নয়, চোখে পড়ার মতো ভারী, বিশাল, সম্পূর্ণ যুদ্ধের জন্য তৈরি চীনের অত্যাধুনিক ‘উ ঝি আক্রমণাত্মক হেলিকপ্টার’ এবং তার সাথে ‘ব্ল্যাক হান্টার সাপোর্ট চপার’ হেলিকপ্টার গুলো আকাশে শিকারি পাখির মতো ঘুরে জাহাজটাকে ঘিরে ফেলেছে।
জাহাজের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা থমাস এত তীব্র শব্দে ভ্রু কুঁচকে চারদিকে তাকায়। কণ্ঠ থেকে বেড়িয়ে আসে বিরক্তি সূচক শব্দ,

–“হোয়াট দা হেল…? এরা আবার কারা?”
সামনে থাকা আরজে যার হাত হ্যান্ডকাফে বাঁধা, সে ধীরে ধীরে মাথা তোলে। তার ঠোঁটের কোণে এক ফোঁটা রক্ত শুকিয়ে আছে। সে চারপাশে তাকিয়ে সব বুঝে যায়। মনে মনে ফিসফিস করে আওড়ায়,
–“কাম অন, ওয়াইফি শো দেম হু ইউ আর?”
থমাস সেখান থেকে তার গার্ডদের আক্রমণ করতে বলে এবার যেই হোক না কেন? কিন্তু তারা আক্রমণ তো দূর সতর্ক হওয়ার সময়টুকুও পায়নি হঠাৎ করেই হেলিকপ্টারগুলোর নিচে বসানো ভারী অস্ত্র একসাথে গর্জে ওঠে, হেভি রোটারি গান, ও ফায়ার অটোমেটিক ক্যাননের দ্বারা একযোগে বুলেট ঝরাতে শুরু করে আগুনের মতো করে। মুহূর্তের মধ্যে জাহাজের উপরের ডেক র*ক্তে ভেসে যায়। মার্কানের গার্ডরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই একে একে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে থাকে। তাদের গুলির শব্দ, চিৎকার, ধোঁয়া সব মিলে পুরো ড্যাসেল কয়েক পলকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। থমাস দাঁত চেপে চিৎকার করে ইয়ারপিসের বিপরীত পাশ থেকে গার্ডদের আদেশ করে,

–“রিটার্ন ফায়ার, কভার দা ডেক”
কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। আকাশ থেকে নামা আগুনের সামনে তারা প্রস্তুতই ছিল না। ধীরে ধীরে ধোঁয়া কেটে যেতে থাকে। একটা হেলিকপ্টার নিচে নেমে আসে। দরজা খুলে সেখান থেকে নামে, সানা। গায়ে জড়ানে কালো কমব্যাট স্যুট, পনিটেইল করে বাঁধা চুলগুলো বাতাসে উড়ছে, চোখে আগুন ঠোঁট শক্ত করে চেপে রাখা। তার হাতে ধরা, অ্যাসল্ট রাইফেল” আজ তার চোখে আজ কোনো দয়া মায়া নেই শুধু আছে ধ্বংস।
পাশের আরেকটা হেলিকপ্টার থেকে লাফিয়ে নামে এসপি। তার চোখ রক্তবর্ণ, হাতে গান। তাদের সাথে সাথে নেমে আসে মিসেস দিলরুবা খানমের ট্রেইনড এজেন্টরা। সবাই কালো গিয়ারে, নিঃশব্দে, নিখুঁতভাবে ছড়িয়ে পড়ে জাহাজজুড়ে। মিসেস দিলরুবা খানম জানতেন আরজে যেভাবেই হোক তার ছেলের কাছে পৌঁছে যাবে এজন্য তিনি আগে থেকে আরজের উপরে নজর রেখেছেন। ডেকের উপর এখন সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খলা। মার্কানের লোকেরা পাল্টা আক্রমণ করার চেষ্টা করলেও সানার দল একে একে নিঃশেষ করে দিচ্ছে তাদের। সানা সামনে এগোতে এগোতে ট্রি*গার চাপছে, প্রতিটা গুলি যেন হিসেব করে ছোড়া।

ড্যাসেল ভেতরে লোহার করিডোর জুড়ে ধোঁয়া ভাসছে, দেয়ালে গুলির দাগ, কোথাও কোথাও রক্তের ছোপ সব মিলিয়ে এক নরকযজ্ঞ। এই নরকের মাঝেই প্রবেশ করে সানা। করিডোরের বাঁক ঘুরতেই সামনে এসে দাঁড়ায় কয়েকজন মার্কানের গার্ড একই মুখ, একই অভিব্যক্তি প্লাস্টিক সার্জারির তৈরি সেই অভিশপ্ত সৈনিকেরা। এক সেকেন্ডও নষ্ট করেনি রমণী ট্রিগার চাপতেই গুলির শব্দে করিডোর কেঁপে ওঠে। সবাই একে একে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। সানার দৃষ্টির কোনো পরিবর্তন নেই আর না একফোঁটা দয়া। পেছন থেকে এসপি এগিয়ে আসে, গম্ভীর গলায় বলে,

–“সামনে ক্লিয়ার, চল”
সাথে থাকা ট্রেইনড এজেন্টরাও ছায়ার মতো ছড়িয়ে পড়ে, পথ পরিষ্কার করতে করতে এগোতে থাকে। কিয়ৎকাল পর তারা পৌঁছে যায় সেই দরজার সামনে যেটার ভিতরে আরজে রা আছে। সানা থেমে হাত তুলে নিজের কব্জির ঘড়ির স্ক্রিনে তাকায় নজরে আসে, লোকেশন ব্লিঙ্ক করছে ঠিক এখানেই। রমণী চোয়াল শক্ত হাত তুলে ইশারা করে,
–“ব্রেক”
এজেন্টরা দরজাটা ভাঙ্গার জন্য সামনে এগোতেই ঠাস করে ভেতর থেকে দরজা নিজেই খুলে যায়। ঘরের ভেতরটা আধো অন্ধকার। মাঝখানে একটা চেয়ার, সেখানে বসে আছে থমাস মাথা নিচু করে, ঠোঁটে অদ্ভুত পৈশাচিক হাসি। থমাস ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকায় সানার দিকে। তারপর নাটকীয় ভঙ্গিতে দুই হাত দুদিকে ছড়িয়ে বলে,

–“ওয়েলকাম, ভাবি সাহেবা ওয়েলকাম। আ’ম ওয়েটিং ফর ইউ”
বিপরীত পাশের রমণী এক মুহূর্ত থমকে যায় রওনাকের মুখ দেখে, কিন্তু ভিতরের মানুষটা সম্পূর্ণ অন্যরকম যার চোখে ঠান্ডা নিষ্ঠুরতা। পরের মুহূর্তেই সানা কিছু না ভেবে এগিয়ে যায় ভারী ভারী কদম ফেলে থমাসের সামনে এসে দাঁড়ায়। রাইফেল তুলে সোজা তার কপালে তাক করে দন্ত খিঁচিয়ে বলে,
–“জাস্ট ফার্স্ট অ্যান্ড লাস্ট টাইম জিজ্ঞেস করছি… আমার ছেলে কোথায়?
নেক্সট টাইম, আমার বন্দুক জিজ্ঞেস করবে”
পাশ থেকে এসপি গর্জে ওঠে,
–“আব্বে ইয়ার, নেক্সট টাইম বন্দুক না, সরাসরি ওপরওয়ালার কাছে গিয়ে বলবে, মেরে দে গুলি”
সানার আঙুল ট্রি*গারে শক্ত হয়ে আসে কিন্তু সে চাপার আগেই থমাস হঠাৎ করেই হেসে ওঠে একটা বিকৃত, কর্কশ, ঘর কাঁপানো হাসি। সানা আর এসপি দুজনেই এক সেকেন্ডের জন্য থেমে যায়। কেননা এই হাসির মানে তারা বুঝতে পারছে না। থমাস ধীরে ধীরে হাসি থামিয়ে তারপর তালি বাজায়। দরজার পাশ থেকে কয়েকজন গার্ড ঢুকে পড়ে। তাদের মাঝে টেনে হিঁচড়ে আনা হচ্ছে একজনকে, আরজে। তার হাত হ্যান্ডকাফে বাঁধা। তার দৃষ্টি দেখেই বুঝা যাচ্ছে ছেলের জন্য নিজেকে কতটা সংবরণ করে রেখেছে।
সানার বুক কেঁপে ওঠে এক মুহূর্তের জন্য। থমাস ধীরে সানার দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে,

–“লিসেন ভাবি সাহেবা, ইউ হ্যাভ ওয়ান অপশন….হয় হাজব্যান্ড, না হয়…”
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই ঘরের চারপাশে একসাথে উপস্থিত হয় আরও গার্ড।সবাই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে পড়ে যেন কাউকে স্বাগত জানাচ্ছে। মুহূর্তে পরিস্থিতি বদলে যায়। সানা, এসপি, আর এজেন্টরা একসাথে তাদের দিকে বন্দুক তাক করে।
ঘরের মাঝখানে একটা সরু ফাঁক তৈরি হয়। আর সেই ফাঁক দিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে আসে এক মানব, মার্কান স্টিফেন। আর তার কোলে ছোট্ট আরভি। সানার শ্বাস এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়। কণ্ঠস্বর থেকে ফিসফিস করে বের হয়,

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২০

–“ভীর…”
থমাস আবার সানার কানের কাছে ফিসফিস করে,
–“না হয়… ছেলে, যেকোনো একজন, ভাবি সাহেবা….”

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২০ (৩)