Home হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৬

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৬

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৬
সাবা খান

ঢাকার এক অভিজাত এলাকার বুকে দাঁড়িয়ে আছে ‘ফাইন ডাইনিং ও প্রিমিয়াম’ স্বনামধন্য রেস্টুরেন্টটি যেন আলোর নরম আবরণে মোড়া এক স্বপ্নলোক। বাইরে কাঁচের দেয়ালে প্রতিফলিত শহরের ব্যস্ততা, ভেতরে ঢুকলেই তার ঠিক উল্টোটা নজরে আসে, ধীর লয়ের সুর, আর সুবাসিত খাবারের গন্ধে ভরা এক প্রশান্ত পরিবেশ। দেয়াল জুড়ে মিনিমালিস্ট ডেকোর, টেবিলগুলোর উপর রাখা ছোট্ট ক্যান্ডেল লাইটগুলো মৃদু আলো ছড়িয়ে প্রতিটা কোণকে করে তুলেছে আরো মোহনীয় ও শান্ত। চারদিকে কেউ হাসছে, কেউ গল্পে মশগুল, আবার কেউ নিঃশব্দে ডিনার উপভোগ করছে।

এইসব কিছুর মাঝেই, একদম কর্নারের একটা টেবিলে বসে আছে ঈশানী আর রিজভী। টেবিলটা একটু আড়ালে, যেন পৃথিবীর সব ব্যস্ততা থেকে দূরে একটা ছোট্ট নিজস্ব জগৎ। আজ রিজভীর জন্মদিন, আর সেই উপলক্ষেই সে ঈশানীকে এখানে নিয়ে এসেছে। যদিও রিজভী কখনো নিজের জন্মদিন পালন করে না, তবুও আজকে একটা বিশেষ কারণে এসেছে। টেবিলের উপর দুটো গ্লাসে রাখা ঠান্ডা পানীয়, আর তারা অপেক্ষা করছে খাবার আসার।
রিজভী বসে আছে ঈশানীর সামনাসামনি। সামনের মানব মুঠোফোন কানে দিয়ে কারো সাথে গভীর মনোযোগে কথা বলছে। সম্ভবত কোনো পেশেন্টের সাথে কথা বলছে, কারণ তার কথাগুলোয় বারবার ভেসে আসছে আশ্বাস, সাথে কড়া নির্দেশনা।
আর এদিকে ঈশানী, সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রিজভীর দিকে। কোনো শব্দ নেই, কোনো তাড়া নেই, শুধু তার চোখদুটো নিবদ্ধ রিজভীর উপর। যেন রমণী তার প্রতিটা অভিব্যক্তি, প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা নিঃশ্বাস নিজের ভেতরে ধারণ করে নিতে চাইছে। কেন জানি না, আজকাল হুটহাট করে তার মনটা কেমন অদ্ভুত হয়ে যায়। রিজভীকে দেখার একটা অকারণ ইচ্ছা জেগে ওঠে। কোনো কারণ ছাড়াই, হুট করে তার কথা মনে পড়ে তার কথা। মাঝে মাঝে শুধু তার কণ্ঠটা শোনার জন্যও মনটা কেমন অস্থির হয়ে ওঠে।
কিন্তু কেন?

এই প্রশ্ন টার উত্তর তারও অজানা। বহুবার খুঁজার চেষ্টা করেছে কিন্তু মিলেনি। এই বিষয়ে সানা বা এসপিকে ও কিছু বলেনি। বলবে কীভাবে?
এই দুই বাঁদর শুনলে আগে তার মজা উড়াবে তারপর সিরিয়াস হবে। আর।সে নিজেও শিউর না এসব কী হচ্ছে তার সাথে। তার বুকের ভেতরটা কেমন হালকা কাঁপে, যখন রিজভী তার কাছে থাকে। তার উপস্থিতিতে একটা অদ্ভুত নিরাপত্তা কাজ করে, আবার সেই সাথে এক ধরনের অজানা অস্বস্তিও।
সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপারটা হলো, আজকাল রিজভীকে ‘ভাই’ বলে ডাকতে গেলেই তার কেমন একটা থমকে যাওয়া অনুভূতি হয়। শব্দটা যেন তার গলায় আটকে আসে। সে নিজেই বুঝতে পারে না, কেন এমন হচ্ছে।
এই অনুভূতিগুলোর শুরুটা কবে থেকে?
সম্ভবত সেই সময় থেকে, যখন রওনাক চলে যাওয়ার পর, ভেঙে পড়া ঈশানীর পাশে প্রথম এসে দাঁড়িয়েছিল রিজভী। এই এক মাসে প্রতিটা কঠিন মুহূর্তে, প্রতিটা ভাঙা রাতে, প্রতিটা নিঃশব্দ কান্নায় রিজভী ছিল তার পাশে। কখনো তাকে জোর করে হাসিয়েছে, কখনো চুপচাপ পাশে বসে থেকেছে, কখনো না বলেই তার সব কষ্ট বুঝে নিয়েছে। ধীরে ধীরে ঈশানী আবার আগের মতো হতে শিখেছে। কিন্তু সেই সাথে, তার ভেতরে জন্ম নিয়েছে আরেকটা অনুভূতি। যেটার নাম সে না দিতে পারছে আর না কাউকে বোঝাতে পারছে। আর সবচেয়ে বড় কথা স্বীকারও করতে পারছে না।

তার চোখ আবারও রিজভীর দিকে স্থির হয়। রিজভী তখনও ফোনে কথা বলছে, কিন্তু তার মুখের সেই সিরিয়াস এক্সপ্রেশন, মাঝে মাঝে ভ্রু কুঁচকে যাওয়া, আবার কখনো হালকা মাথা নেড়ে কিছু বোঝানো সবকিছুই ঈশানীর কাছে অদ্ভুতভাবে আকর্ষণীয় লাগছে। রমণী বেখেয়ালি ভাবে পলকহীন ভাবে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ রিজভী ফোন কেটে সামনে তাকাতেই সেই মুহূর্তেই তার চোখ পড়ে ঈশানীর চোখে। সাথে সাথে দুজনের চোখাচোখি হয় আর সময় যেন থেমে যায়। চারপাশের শব্দগুলো ম্লান হয়ে আসে, মানুষজন, আলো, সুর সবকিছু যেন দূরে সরে যায়। শুধু দুটো দৃষ্টি গেঁথে যায় একটা আরেকটার মধ্যে আটকে যায়।
ঈশানীর বুকের ভেতরের ধুকপুক শব্দটা যেন আরও জোরে শোনা যাচ্ছে, তার শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী হয়ে ওঠেছে। রিজভীর চোখেও এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময় ঝিলিক দিয়ে যায়, তারপর সেটা ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসে। কতক্ষণ তারা এভাবে তাকিয়ে ছিল তা দুজনেরই অজানা।
হঠাৎ তাদের কানে আসে ওয়েটারের কণ্ঠস্বর,

–“এক্সকিউজ মি, আপনার অর্ডার”
ওয়েটারের কণ্ঠ শ্রবণ ইন্দ্রিয় হতেই বাস্তবতায় ফিরে আসে তারা দুজনেই। সাথে সাথে রমণী যেন চমকে ওঠে। তার চোখ হঠাৎই এদিক সেদিক ছুটে যায়, সারা আদলে লজ্জার লাল রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ে। মনে মনে নিজের উপরেই ক্ষিপ্ত হয়ে যায়,
“কি করছিল সে?”
“এভাবে কেউ তাকিয়ে থাকে?”
নাহ আর এক ন্যানো সেকেন্ডও এখানে থাকা যাবে না। তাই সে তড়িঘড়ি করে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়। তাড়াহুড়ো করে বলে,

–“এক্সকিউজ মি”
বাক্যটা উগড়ে দিয়েই আর কোনো দিকে না তাকিয়ে, প্রায় দৌড়েই সে চলে যায় বাথরুমের দিকে। তার পেছনে পড়ে রইল রিজভী যে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে তার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক টুকরো মৃদু, রহস্যময় হাসি। যেন সে কিছু বুঝেছে, আবার কিছু বুঝেও না বোঝার ভান করছে।
কিয়ৎকাল পর রিজভীর হাতটা অজান্তেই চলে গেল কোটের পকেটে, সেখান থেকে ধীরে ধীরে বের করে একটা ডায়মন্ডের রিং। সেটাকে আঙুলের ফাঁকে ধরে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। মনের ভেতর শুরু হলো নিজের সাথেই যুদ্ধ। বারবার নিজেকে বুঝাচ্ছে,

–“কি করছিস তুই রিজভী? তুই একজন ডাক্তার… অপারেশন থিয়েটারে দাঁড়িয়ে মানুষের বুক চিরে জীবন বাঁচাস, আর আজ একটা মেয়েকে ‘ভালোবাসি’ বলার সাহস পাচ্ছিস না?”
সে হালকা করে নিঃশ্বাস ছেড়ে ফের ভাবে,
-“এটা তো কোন হার্ট সার্জারি না, একটা সোজা কথা, তাহলে কেন এত ভয় লাগছে?”
তার ঠোঁট শুকিয়ে আসছে এটা ভেবে যে, যদি ঈশানী না বলে। তার বিভ্রম কাটিয়ে হঠাৎ ঈশানী এসে সামনে বসে পড়ে। রিজভী চমকে উঠে, তড়িঘড়ি করে রিংটা আবার পকেটে ঢুকিয়ে ফেলে। ঈশানী ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
–“কি হলো? এত চমকালেন কেন?”
রিজভী ঠোঁটে মেকি হাসি টেনে শুধায়,

–“না… কিছু না… এমনি”
ঈশানী ‘ওহ আচ্ছা’ বলে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। এরিমধ্য ওয়েটার খাবার নিয়ে আসে। দুজনেই প্লেটে খাবার নিতে শুরু করে। কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে আসে তাদের দুজনের মধ্যে। সেই নীরবতা কাটিয়ে হঠাৎ ঈশানী বলে,
–“আপনাকে আজ খুব অদ্ভুত লাগছে?”
রিজভী কাঁটাচামচ থামিয়ে তাকায়। তারপর ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করে,
–“কেন?”
–“জানি না, কিন্তু মনে হচ্ছে কিছু বলতে চাইছেন, আবার বলছেন না”
রিজভীর বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। এই রে ঈশানী আবার কিছু বুঝে ফেলে নি তো। সে হেসে এড়িয়ে যায় বিষয়টা,
–“ডাক্তারদের সব কিছু বুঝে ফেলো নাকি?”
ঈশানী হালকা হেসে মাথা নাড়িয়ে মিনমিনিয়ে আওড়ায়,

–“সব না, তবে কিছু কিছু বুঝি”
রিজভী তার কথাটা শুনলো না তবে তারপর আর কোন বাক্যালাপ হয়নি। দুজনের খাওয়া শেষ করে, রিজভী গ্লাস থেকে এক চুমুক পানি খায়। তার হাত সামান্য কাঁপছে। সে অন্য হাতটা আবার পকেটে ঢুকিয়ে রিংটা বের করে আনে। এইবার আর লুকায় না। এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে মনে মনে ভাবে,
“আজ না বললে আর কখনো বলা হবে না, কাম অন রিজভী। এখন তার লাইফে আর কেউ নেই, আর না আমি থার্ড পার্সন আর না আমি তাকে কারো কাছ থেকে কেঁড়ে নিচ্ছি। ধীরে ধীরে সে হাত বাড়িয়ে ঈশানীর সামনে রিংটা রাখে। ঈশানীর চোখ রিংটায় পড়তেই সে থমকে যায়। তার চোখ বড় হয়ে যায় বিস্ময়ে। রিজভী আর এক সেকেন্ডও অপেক্ষা না করে তাড়াহুড়ো করে বলে ফেলে,
–“ঈশা, উইল ইউ ম্যারি মি?”

দিনের প্রায় অর্ধেক পেরিয়ে গেছে। সূর্যের আলো আর আগের মতো তেজি নেই একটু নেতিয়ে পড়েছে। সেই আলো ছায়া ফেলে রেখেছে বিশাল ব্ল্যাক ম্যানশনের গম্ভীর দেয়ালে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন এক নিঃশব্দ সাম্রাজ্য যেখানে সবকিছু স্থির, অথচ ভেতরে ভেতরে কত গল্প, কত অস্থিরতা জমে আছে তার কোন হিসাব নেই।
আর সেই ম্যানশনের এক কোণের কক্ষে, তার সাথে লাগোয়া ব্যালকনিতে থাকা দোলনায় বসে আছে যন্ত্রমানব। তার দৃষ্টি সামনে স্থির। আকাশটা আজ কালো মেঘে ঢেকে আছে যেন যেকোনো মুহূর্তে বৃষ্টি নামবে। জ্যাকের ধূসর চোখজোড়াও তেমনি একটা অজানা কালো ছায়ায় ঢেকে আছে। মনে মনে হাজার টা ভাবনা উঁকি দিচ্ছে। সে তো ভেবেছিল ইবেলিনা কে হসপিটাল থেকে এসেই তার অতীত, পরিচয় সম্পর্কে সবটা বলে দিবে। কিন্তু আজ কতগুলো দিন গড়িয়ে গেল তবু এখনো বলা হয়ে ওঠেনি। কথাটা ভাবতেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। সে চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্ত ফের ভাবে,

“কেন বলছে না সে, ভয়?
না, না, জ্যাক আর ভয়’ এটা একসাথে যায় না। তার ঠোঁটে হালকা তিক্ত হাসি ফুটে ওঠে। ‘তাহলে কী? আমি কি তাকে হারানোর ভয় পাই?
আমার ভেতরের অন্ধকারটা দেখলে সে থাকবে তো?’
তার বুকের ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে ওঠে।হঠাৎই তার ভাবনা ছিড়ে তার কাঁধে নরম একটা হাতের স্পর্শ অনুভূত হয়। জ্যাক মুহূর্তে পিছনে তাকায় নজরে আসে রাজস্থানী রমণী। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। চুলগুলো একটু এলোমেলো , চোখে ক্লান্তি কিন্তু ঠোঁটে সেই পরিচিত হাসি ফুটে আছে। জ্যাকের ভ্রু সাথে সাথে কুঁচকে যায়। সে গম্ভীর স্বরে ধমকে উঠে,

–“তোমাকে আমি বলেছি না ঘুমাতে?”
তুমি এখানে কেন এসেছো?
লিনা, তুমি কি প্ল্যান করে নিয়েছো আমার একটা কথাও শুনবে না?”
সে সোজা হয়ে বসে, চোখে কড়া দৃষ্টি ফেলে শুধায়,
–“সুন্দর করে বলছি চুপচাপ যাও, গিয়ে ঘুমাও”
বিপরীতে কোন শব্দ এলো না বরং ইবেলিনা একটাও কথা না বলে হঠাৎ সে ঝুঁকে পড়ে জ্যাকের গলা জড়িয়ে ধরে। তারপর একেবারে স্বাভাবিকভাবে জ্যাকের কোলে বসে মাথাটা রেখে দেয় তার বুকের উপর। আবেশে দুচোখ বন্ধ করে, পুরোপুরি নিশ্চুপ হয়ে মিশে থাকে। জ্যাক থেমে যায়। তার কথাগুলো যেন মাঝপথেই আটকে যায়। এক সেকেন্ড আগেও যেই রাগটা তীব্র হয়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল এখন সেটা গলে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। সে স্থির হয়ে বসে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর নিজের বুকের উপর তাকায় যেখানে ইবেলিনা নিঃশব্দে শুয়ে আছে তার বুকে, যেন এটাই তার সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। জ্যাকের বুকের ভেতরটা কেমন নরম হয়ে আসে। তার আঙুলগুলো ধীরে ধীরে ইবেলিনার চুলে ছুঁয়ে যায়। মনে মনে বলে,

-“এই মেয়েটা… কীভাবে পারে?
আমি এত কড়া কথা বললাম তবুও একটাও জবাব দিল না। এই জন্যই তোমার সামনে শক্ত হয়ে থাকতে পারি না”
সে খুব ধীরে ডেকে ওঠে,
–“লিনা…”
ইবেলিনা চোখ না খুলেই মৃদু স্বরে জবাব দেয়,
–“হুম…”
–“আমি কি বললাম একটু আগে, মনে আছে?”
ইবেলিনা ঠোঁট বাঁকিয়ে ফিসফিস করে,
–“মনে নেই…”
–“মিথ্যা বলছো”
–“হুম… বলছি…”
জ্যাক একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে,
–“আমি বলেছিলাম ঘুমাতে যেতে”
ইবেলিনা এবার চোখ না খুলেই আরও গা এলিয়ে দিয়ে বলে,
–“আমি তো ঘুমাচ্ছি”
–“এখানে?”
–“হ্যাঁ… এখানে বেশি আরাম”
জ্যাক মাথা নেড়ে নিচু স্বরে বলে,
–“একদম পাগল তুমি”
–“আপনার জন্য”
এই একটা কথায় জ্যাকের বুকটা কেমন কেঁপে ওঠে। সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর ধীরে বলে,

–“তুমি কখনো সিরিয়াস হবে না, তাই না?”
ইবেলিনা এবার একটু চোখ খোলে, তার দিকে তাকায়,
–“হই তো… যখন দরকার হয়”
–“আর এখন?”
–“এখন দরকার নেই”
–“কেন?”
–“কারণ আপনি আছেন”
রমণীর এমন স্বগোতক্তিতে জ্যাকের চোখে অদ্ভুত এক দৃষ্টি খেলে যায়। সে ধীরে বলে,
–“আমি যদি না থাকি?”
ইবেলিনা চোখ খুলে তাকায় এবার। সাথে সাথে প্রতুত্তর ভেসে আসে,
–“তাহলে আমি থাকবো না”
জ্যাক তার বিপরীতে আর কিছুই বলতে পারল না। সে শুধু হাত বাড়িয়ে ইবেলিনাকে আরও কাছে টেনে নেয়। মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দেয়। হঠাৎ জ্যাক কিছু একটা ভেবে নিচু স্বরে ডেকে ওঠে,

–“লিনা…”
বুকের ভেতর মুখ গুঁজে থাকা ইবেলিনা মৃদু সাড়া দেয়,
–“হুম…”
জ্যাক কিছুক্ষণ থেমে থেকে, একদম সোজা সাপ্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়,
–“ভালোবাসো আমায়?”
ইবেলিনা বিন্দুমাত্র দেরি না করে, তার বুকেই মাথা রেখে ফিসফিস করে,
–“হুম”
–“আমি ভালোবাসতে জানি না”
কথাটা শুনতেই বিপরীতে রমণী চমকে ওঠে। তড়িঘড়ি করে তার বুক থেকে মুখ তুলে জ্যাকের চোখে চোখ রাখে। রমণী বোঝার চেষ্টা করছে সামনের মানবের হাবভাব। কিন্তু না, বরাবরের মতোই সে কিছুই বুঝতে পারছে না। কিছু না ভেবে, নিজের উষ্ণ হাতটা জ্যাকের ঠান্ডা গালে রেখে বলে,

–“তবুও… ভালোবাসি”
জ্যাকের চোখে এক সেকেন্ডের জন্য অদ্ভুত এক ঝিলিক খেলে যায়। সে আবার বলে,
–“আমার জন্মদাত্রী একজন পতিতা ছিল”
কথাটা যেন বাতাসে কেটে গিয়ে সরাসরি আঘাত করে ইবেলিনার বুকে। এক মুহূর্তের জন্য সে হকচকিয়ে ওঠে। কিন্তু পরের মুহূর্তেই সে আবার জ্যাকের ধূসর, নিষ্প্রাণ চোখের দিকে তাকিয়ে, আগের চেয়েও দৃঢ় কণ্ঠে স্বগোতক্তি করে,
–“তবুও… ভালোবাসি”
–“আমার অতীত রক্তে মাখা, লিনা। একটা পাপের সমুদ্র, যেখানে আমি একটা চলমান জাহাজের মতো ভাসছি। সেই সমুদ্র থেকে ফিরে আসার কোনো পথ নেই। হ্যাঁ, যে কোনো দিন স্রোতে হারিয়েও যেতে পারি”
ইবেলিনা নিঃশ্বাস আটকে কয়েকবার নিজের ঘন নেত্রপল্লব ঝাপটে তারপর আর কিছু না বলে, হঠাৎ করেই জ্যাককে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে,

–“যতদিন ভাসমান, ততদিন ভালোবেসে যাবো। আপনি ডুবে গেলে আমি আপনার সাথে ডুববো’
জ্যাক কিছুক্ষণ স্থির থাকে। তারপর ধীরে ধীরে তাকে নিজের থেকে আলগা করে সামনে এনে দাঁড় করায়। গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
–“আমি ভেবে নিয়েছি। আজ থেকে তোমার বন্দিত্ব শেষ। তুমি মুক্ত, যাও মুক্তির সাধ নাও”
কথাটা শেষ হতেই ইবেলিনা তার হাত ঝটকা মেরে ছাড়িয়ে পরমুহূর্তেই আবার তাকে জড়িয়ে ধরে, বুকের ভেতর মুখ গুঁজে বলে,

–“কিন্তু বন্দিত্ব যে আমার রক্তে মিশে গেছে।
আপনার থেকে দূরে থাকা সেটাই তো আমার জন্য কারাগার”
–“যেদিন আমি হারিয়ে যাবো যেদিন হয়তো ফিরবো না তখনও?
–“তখনও, যতদিন আপনার স্মৃতি থাকবে, ততদিন আমি বাঁচবো। আর যদি সেটা না থাকে তাহলে বেঁচে থাকার কোনো কারণই থাকবে না”
–“তুমি সত্যিই জানো না তুমি কি বলছো”
ইবেলিনা ফিসফিস করে বলে,
–“জানি, আমি একজন খারাপ মানুষের প্রেমে পড়েছি আর আমি সেটা থেকে বের হতে চাই না”
জ্যাক তার চিবুক তুলে ধরে সামনে এনে বলে,
–“শেষ সুযোগ দিচ্ছি, লিনা। এখনো চাইলে ফিরে যেতে পারো”
ইবেলিনা তার চোখে চোখ রেখে বলে,
–“‘আমি তো অনেক আগেই হারিয়ে গেছি… আপনার ভেতরে”
তারপর ধীরে জ্যাকের বুকের উপর হাত রেখে বলে,
–“এখানেই আমার ঠিকানা”
জ্যাক কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে তারপর ধীরে ধীরে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে গভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,

–“ভেবে চিন্তে বলছো তো, মেয়ে?”
–“আমি ইবেলিনা সিদ্দিকী, ভেবে চিন্তে, সম্পূর্ণ সজ্ঞানে আপনার বন্দিত্ব, আপনার পাপ সব কবুল করছি”
জ্যাকের ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক রহস্যময় হাসি ফুটে ওঠে। সে দুই হাতে তাকে আরও শক্ত করে বুকে টেনে নিয়ে ভারী গলায় জিজ্ঞেস করে,
–“কতটা ভালোবাসো আমায়?”
ইবেলিনা তার বুকের উপর ডান হাত দিয়ে আলতো আঁকিবুঁকি কাটতে কাটতে বলে,
–‘ঠিক ততটা, যতটা ভালোবাসলে আপনার নিঃশ্বাস থেমে গেলে আমারটাও থেমে যাবে।আপনি যদি অন্ধকার হন, আমি সেই অন্ধকারে আলো খুঁজবো না, আমি অন্ধকারকেই নিজের আকাশ বানিয়ে নেবো।
আপনি যদি আগুন হন, আমি পুড়ে ছাই হবো, তবুও দূরে যাবো না। আপনি যদি পাপ হন, আমি সেই পাপের মধ্যেই নিজের স্বর্গ খুঁজে নেবো। আপনি না থাকলে, আমিও থাকবো না, মিস্টার ফরেনার। আমি শুধু একটা শূন্যতা হয়ে যাবো আপনিহীন”

জ্যাক একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। এই প্রথম তার ধূসর চোখে অনুভূতির স্পষ্ট ছাপ। হঠাৎ ইবেলিনা কিছু একটা ভেবে ধীরে ধীরে জ্যাকের বুক থেকে মুখ তুলে আবার তার গলা জড়িয়ে ধরে। নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
–“তাহলে, আপনি জানেন না আপনার পিতৃ পরিচয়?”
জ্যাক কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকে তার দিকে। তারপর ধীরে মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বোঝায়।
ইবেলিনা সাথে সাথে আবার কৌতুহল বসত জিজ্ঞেস করে,
–“তাহলে আপনার বাবা কে?”

মেঘে ঢাকা আকাশটা যেন আজ অস্বাভাবিক ভারী হয়ে আছে। গাঢ় কালো মেঘগুলো একে অপরকে গ্রাস করে নিয়ে আকাশটাকে এমনভাবে ঢেকে রেখেছে, যেন সূর্যের অস্তিত্বই মুছে গেছে। একটু পরপরই আকাশ চিরে বিদ্যুৎ চমকে উঠছে। সেই তীব্র সাদা আলো এক মুহূর্তের জন্য চারপাশ আলোকিত করে আবার সবকিছু গিলে নিচ্ছে অন্ধকার। একটা অদ্ভুত, ভীতিকর শব্দে মেঘ গর্জে ওঠঠছে বারবার। মনে হচ্ছে, এই পরিবেশ নিজেই নিজেকে অন্ধকারের চাদরে মুড়িয়ে নিচ্ছে, কোনো ভয়ংকর ঘটনার অপেক্ষায়।
এই অন্ধকার বিদ্যুৎ ঝলকানি মেঘে ঢাকা ভয়াল আকাশের নিচে মাথা উঁচু করে দানবের মতো দাঁড়িয়ে আছে,
“টাইটান ভল্ট প্রিজন”

কালো পাথর আর স্টিলের মিশেলে তৈরি বিশাল কাঠামোটা দূর থেকে দেখলেই মনে হয় এটা কোনো কারাগার নয়, এটা যেন জীবন্ত কোনো দানব, যে তার বুকের ভেতর আটকে রেখেছে পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর মানুষগুলোকে। চারপাশে কয়েক স্তরের ইলেকট্রিক তার। প্রতিটা তারে উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ। তার বাইরে মোশন সেন্সর, থার্মাল ক্যামেরা, ড্রোন টহল। প্রতিটা কোণায় স্নাইপার টাওয়ার, যেখানে দাঁড়িয়ে থাকা সশস্ত্র গার্ডরা এক মুহূর্তের জন্য দায়িত্বের হেরফের করছে না। প্রধান ফটকে কয়েক স্তরের স্টিলের বিশাল দরজা, যার প্রতিটা লক খুলতে লাগে আলাদা অথরাইজেশন। ভেতরে ঢুকলেই শুরু হয় একের পর এক সিকিউরিটি চেক, আইরিস স্ক্যান, ফিঙ্গারপ্রিন্ট, ভয়েস অথেনটিকেশন। এখান থেকে পালানো অসম্ভব না, কিন্তু প্রায় মৃত্যুর সমান কঠিন। এই প্রিজনেই রাখা হয়েছে বিশ্বের শীর্ষ অপরাধীদের। যাদের নাম শুনলেই শহর কেঁপে ওঠে। আর সেই ভয়ংকর তালিকার মাঝখানে একটা আলাদা, ভিআইপি লেভেলের সেলে বন্দী,

“সোফিয়া জাওয়ান”
তার সেলের চারপাশে সিকিউরিটি আরও দ্বিগুণ। ডাবল লকড স্টিল ডোর, বুলেটপ্রুফ গ্লাস, সারাক্ষণ নজরদারিতে থাকা ক্যামেরা। এখানে তার সাথে দেখা করার অনুমতি আছে শুধু একজনের, সে হলো আরজে। আরজে প্রতিদিনই আসে এখানে মায়ের সাথে দেখা করতে। আজ সেই একই কারাগারের নিঃশব্দ করিডোর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সানা। তার হাত শক্ত করে ধরা ছোট্ট আরভির হাত।
তাকে এখানে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে, মিসেস দিলরুবা খানম। আর তাকে এখানে এনে রেখে সিতারা অনেক আগেই চলে গেছে। দিলরুবা খানমই সিতারাকে পাঠিয়েছে সানাকে নিয়ে আসতে। রমণী ধীরে ধীরে পা ফেলতে ফেলতে পৌঁছে যায় সেই সেলের সামনে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে দুজন সশস্ত্র অফিসার। তাদের হাতে আধুনিক রাইফেল, কাঁধে কমিউনিকেশন ডিভাইস। চোখে সতর্কতা। দরজাটা ঘন স্টিলের তৈরি, তার উপর ডিজিটাল লক, বাইরে থেকে একাধিক সিকিউরিটি লেয়ার। দরজার পাশে ছোট্ট একটা স্ক্যান প্যানেল, যেখানে প্রতিটা প্রবেশ রেকর্ড করা হয়।

একজন অফিসার এগিয়ে এসে। চাবি আর কোড দুটোই ব্যবহার করে দরজাটা আনলক করে। অফিসার মাথা নিচু করে সানার দিকে সম্মান জানিয়ে তারপর কোনো কথা বলে না শুধু সরে দাঁড়ায়। সানা ভেতরে ঢোকার আগে দরজার নবের উপর হাত রেখে চোখ বন্ধ করে ফেলে। একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার বুক থেকে।
সানা ধীরে ধীরে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢোকে। দরজাটা ভারী শব্দে খুলে যেতেই তার দৃষ্টি গিয়ে থামে সামনে বসে থাকা সেই নারীর উপর। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই সে থমকে যায়। এক মুহূর্তের জন্য তার শ্বাস পর্যন্ত আটকে আসে। মনের মধ্যে হাজারটা প্রশ্ন ভির জমায়, এই… এই কি সেই নারী?
যার নাম শুনলে শহর কেঁপে উঠতো?

যার চারপাশে সবসময় শত শত গার্ড, মিডিয়া, ক্ষমতাধর মানুষের ভিড় লেগে থাকতো। যে নারী একসময় অহংকারে মাটিতে পা ফেলতো না, যার চোখের ইশারায় পাখির মতো মানুষ মেরে ফেলা হতো, আজ সে মেঝেতে বসে আছে নিঃশব্দে। তার চুলগুলো এলোমেলো, উস্কোখুসকো, যেন বহুদিন কোনো যত্ন পায়নি। তার সেই একসময়কার নিখুঁতভাবে সাজানো চুল গুলো আজ জট বেঁধে কাঁধে পড়ে আছে। মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে আছে, চোখের নিচে কালচে দাগ, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। চামড়ার সেই উজ্জ্বলতা যা একসময় আলো ছড়াতো, আজ নিভে যাওয়া প্রদীপের মতো নিস্তেজ। তবুও তার চোখ, সেই চোখ দুটো এখনো আগের মতোই গভীর। তবে সেখানে নেই অহংকার, নেই ক্রোধ, আছে এক অদ্ভুত শূন্যতা। যেন সব অনুভূতি কোথাও হারিয়ে গেছে।

সানার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই মোচড় দিয়ে ওঠে। কেন সে নিজেও জানে না। এই নারী তার কিছু না, তার সাথে তেমন কোনো সম্পর্কও গড়ে ওঠেনি কখনো তার। তবুও তার চোখের কোণ ভিজে ওঠে অজান্তেই।
বিচারকের রায় মতে, সোফিয়াকে রাখা হয় সেই ভয়ংকর কক্ষগুলোতেই, যেগুলো সে নিজেই তৈরি করেছিল অন্য মানুষদের জন্য। আরজে মিসেস দিলরুবা খানম কে ব্ল্যাকমেইল করে সবকিছু বদলে দিতে চেয়েছিল। তার মাকে আর সেই নরকযন্ত্রণার মধ্যে না রাখতে পারতো সে। কিন্তু সোফিয়া নিজেই না করে দিয়েছিল। সে বলেছিল সে তার নিজের বানানো নরকেই থাকবে।
প্রথম দিন তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ইলেকট্রিক শক রুমে। উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ, যা কয়েক সেকেন্ডেই একজন মানুষকে ছটফট করতে বাধ্য করে। কিন্তু তার কিছুই প্রভাব ফেলতে পারেনি সোফিয়ার উপর। সোফিয়া একটুও বদলায়নি। এত হাই ভোল্টেজের দরুনে তার শরীর পর্যন্ত কেঁপেছিল। হ্যাঁ, প্রতিটা শকে তার পেশী শক্ত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তার মুখের ভাব একই রকম ছিল। কোনো আর্তনাদ নেই, কোনো চিৎকার নেই, এক ফোঁটা অশ্রুও না। শুধু শূন্যতার ঘিরে ছিল তার বাদামী চোখজোড়া। যেন ব্যথা নামক অনুভূতিটাই তার ভিতর থেকে মুছে গেছে। অফিসাররা তার এমন ব্যবহারে অবাকের চরম শীর্ষে পৌঁছে যায়। তারা এমন মানুষ আগে কখনো দেখেনি। তারপর একে একে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বাকি সব কক্ষে। ডার্ক সেল, আইস চেম্বার, সাউন্ড টর্চার রুম, প্রতিটা জায়গায় একই অবস্থা, না সে কাঁদছে, না হাসছে, না চিৎকার করছে শুধু ফাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকছে। আর মাঝেমধ্যে একটা নাম জপ করছে,

–“ইকবাল,
আমার ইকবালকে আমার কাছে নিয়ে আসো,
ইকবাল”
কিন্তু একটা জায়গায় গিয়ে সব বদলে যায়, আর সেটা হলো আয়নার রুম। যেখানে চারদিক জুড়ে শুধু আয়না। আর মাঝখানে দাঁড় করিয়ে রাখা হয় বন্দীকে। সাথে চারপাশে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে মানুষের আর্তনাদ, চিৎকার, কান্না, মৃত্যুর আগে শেষ আর্তনাদ। সেই শব্দগুলো দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে মাথার ভেতর ঢুকে যায়। এই রুমটাই ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর। আর সেখানেই সোফিয়ার ঠোঁটে ভেসে উঠেছিল, একটা অদ্ভুত, প্রশান্তির হাসি। যেন এই চিৎকারগুলো
তাকে যন্ত্রণা নয় বরং তাকে অদ্ভুত শান্তি দিচ্ছে। অফিসাররা একে অপরের দিকে তাকিয়ে তারা হতভম্ব হয়ে যায়। কেউ কেউ বলছে, হয়তো তার অনুভূতিগুলো মরে গেছে।
আর আজ সেই একই নারী এই ছোট্ট সেলে মেঝেতে বসে আছে নিঃশব্দে। দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে। যেন কিছুই নেই তার চারপাশে। সানা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে স্থির হয়ে। তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক চাপা অনুভূতি জমে ওঠে।
এই নারীকে সে জীবনেও বুঝে উঠতে পারে না।
সানার হাতটা এখনো শক্ত করে ধরে আছে আরভিকে। হঠাৎ সে মুখ তুলে সানার দিকে তাকিয়ে বাচ্চাসুলভ কণ্ঠে শুধালো,

–“মম… এটা কি আমার গ্র্যান্ডমা?”
প্রশ্নটা শুনতেই রমণী বাস্তবে ফিরে আসে। তাৎক্ষণিক তার চোখের কোণে জমে ওঠা জলটা সে তড়িঘড়ি করে লুকিয়ে ফেলে। আরভি গাড়িতে সানাকে বারবার জিজ্ঞেস করাতে সানা শেষ পর্যন্ত তাকে বলেছে, তারা আরভির গ্র্যান্ডমার সাথে দেখা করতে যাচ্ছে। এজন্যই আরভি এখন তাকে এ প্রশ্ন করছে। সানা ঠোঁটে জোর করে একটা হাসি টেনে এনে ছেলের দিকে তাকিয়ে আওড়ায়,
–“হ্যাঁ… যাও, গ্র্যান্ডমাকে গিয়ে হ্যালো বলো”
আরভি মায়ের হাত ছেড়ে দিয়ে ছোট ছোট কদম ফেলে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় সোফিয়ার দিকে। সোফিয়ার এখনো খেয়াল নেই। সে শব্দ শুনেছে কিন্তু ভেবেছে হয়তো কোন অফিসার এসেছে তাই চোখ তুলে তাকায়নি। আরভি গিয়ে দাঁড়ায় সোফিয়ার সামনে। মাথা একটু কাত করে, নিষ্পাপ কণ্ঠে ডাকে,

–“গ্র্যান্ডমা…”
শব্দটা যেন বিদ্যুতের মতো আঘাত হানে সোফিয়ার ভেতরে। এক মুহূর্তে তার চোখ খুলে যায়। তড়িৎ গতিতে মাথা তুলে তাকায় সামনে নজরে আসে আরভি। সঙ্গে সঙ্গে হকচকিয়ে উঠে সে। চোখদুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে ওঠে যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না, এটা সত্যি?
তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, তার রক্ত, তার একমাত্র নাতি। সোফিয়া আরভিকে ছবিতে দেখেছিল তাই তাকে চিনতে তার বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয়নি। সে তাকিয়ে থাকে একদৃষ্টিতে না নড়ছে, না চড়ছে। যেন চোখ সরালেই সবটা মিলিয়ে যাবে। তার বুকের ভেতর হঠাৎ করে কেমন এক চাপা ঝড় বয়ে যায়।
“রনো” নামটা যেন অচেতনেই ভেসে ওঠে তার ভেতর। কেননা আরজের মতো এই চোখ, এই মুখ, এই নিষ্পাপ দৃষ্টি সবকিছুই তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় বহু বছর আগে সেই ছোট্ট আরজের কাছে। না, না আরজে না, এটা তার রনো, যাকে সে নিজের হাতে, নিজের চোখের সামনে ধীরে ধীরে একটা দানবে পরিণত করেছিল।
হঠাৎ এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে তার চোখের কোণ থেকে। অনেক বছর পর প্রথমবারের মতো ইকবাল জাওয়ান ছাড়া অন্য কারো জন্য তার কার্নিশ ভিজে ওঠেছে। সে কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। কথা গুলো কেমন গলা জড়িয়ে আসছে তার। তারপরও বহু কসরতে অবিশ্বাসের সুরে বের হয়,

–“তুমি… আবার বলো, আরেকবার ডাকো আমাকে”
আরভি মিষ্টি করে হেসে ফের ডাকে,
–“গ্র্যান্ডমা”
আরভি তার চোখের জল দেখে সে একটু এগিয়ে এসে নিজের ছোট্ট হাতটা তুলে আলতো করে সোফিয়ার চোখ মুছে দিয়ে জিজ্ঞেস করে,
–“গ্র্যান্ডমা… তোমার কি হয়েছে?
তুমি কাঁদছো কেন?”
সেই ছোট্ট স্পর্শ সোফিয়ার শরীর কেঁপে ওঠে।সে যেন বাস্তবে ফিরে এসেছে। তার মানে, এটা স্বপ্ন না। আরভি সত্যিই এখানে। তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ হাহাকার করে ওঠে। সে তো কতবার বলেছিল আরজেকে, আরভিকে একবার নিয়ে আসতে একবার। কিন্তু সে আনেনি। আজ আজ সে নিজে থেকেই এসেছে। সোফিয়ার হাত কাঁপতে শুরু করে। জীবনে প্রথমবার তার হাত এভাবে কাঁপছে। সে ধীরে ধীরে দুই হাত তুলে কাঁপা কাঁপা আঙুল দিয়ে ধরে আরভির মুখ। গভীরভাবে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। তার কণ্ঠ থেকে ফিসফিস করে বের হয়,

–“আমার রক্ত”
এইবার আর নিজেকে সামলাতে পারে না সোফিয়া। তার চোখ ভিজে ওঠে আবার। আরোভি তার চোখের দিকে তাকিয়ে হালকা বিরক্তির সুরে বলে,
–“গ্র্যান্ডমা, তুমি আবার কাঁদছো?”
সোফিয়া নিজের হাতের উল্টো পিঠে অশ্রু মুছে আওড়ায়,
–“কেননা, আমি… আমি তো ভাবিনি। আমাকে কেউ এই নামে ডাকবে কোনোদিনও। আমি তো শুধু অভিশাপ ছিলাম, কারো জন্য আশীর্বাদ না”
সোফিয়া আরভিকে নিজের আরও কাছে টেনে এনে তার গালে নিজের ঠান্ডা হাতটা ছুঁইয়ে বলে,
–“তুমি জানো, আমি কখনো কাউকে আদর করতে শিখিনি। আমি শুধু কষ্ট দিতে শিখেছি”
অজান্তেই সোফিয়ার চোখের কার্নিশ বেয়ে উষ্ণ অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। আরভি নিজের ছোট্ট হাতে মুছে বলে,
–“গ্র্যান্ডমা, তুমি এত কাঁদছো কেন?”
সে ধীরে ধীরে আরভিকে কাছে টেনে নিয়ে কোলে বসিয়ে বলে,

–“কেউ আমার চোখের জল মুছে দেয়নি, আজ তুমি দিলে। আমি… আমি তো এর যোগ্য না”
আরভি তার এমন কঠিন কথার অর্থ কিছুই বুঝতে পারে না। সে শুধু সোফিয়ার হাত ধরে বলে,
–“আপনি আমার সাথে খেলবেন?”
এই প্রশ্নটা যেন সোফিয়ার বুকের ভেতর যেন ছুরি হয়ে ঢুকে যায়। তার চোখে জল টলমল করছে। জড়িয়ে আসা গলায় শুধালো,
–“আমি…আমি তো কখনো খেলতে শিখিনি”
–“কেন? আপনার মম আপনাকে খেলতে দেয়নি”
বিপরীতে সোফিয়া চুপ করে যায়। তার চোখে হঠাৎ অদ্ভুত এক ছায়া নেমে আসে। সে ফিসফিস করে বলে,
–“ওরা আমার মাকে মেরে ফেলেছে”
আরভি তার ফিসফিসানি শুনতে পায়নি। সে চারপাশে তাকিয়ে কিছুটা নাক সিটকে বলে,

–“গ্র্যান্ডমা, এই জায়গাটা ভালো না। এখানে অন্ধকার, তোমার ভয় লাগে না?”
আরভির এমন প্রশ্নে সোফিয়ার ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ওঠে,
–“ভয়? আমি তো ভয়কেই বন্ধু বানিয়ে ফেলেছি। কিন্তু আজ তোমাকে দেখে আমার আবার ভয় লাগছে”
–“কিসের ভয়?”
–“তোমাকে হারানোর, এই একটুখানি আলোকে হারানোর”
অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা রমণী সামনের দৃশ্য দেখে ঠোঁট কামড়ে নিজের কান্না সংবরণ করছে। হঠাৎ তার ভাবনা ছিড়ে কানে আসে একজন অফিসারের কণ্ঠস্বর,
–“টাইম ওভার, ম্যাম”
সানা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। সে আরভির হাত ধরতে যায় ঠিক তখন সোফিয়া হঠাৎ আরভিকে শক্ত করে ধরে বলে,
–“তুমি আমার কাছে একটু থাকো, আর একটু”
আরভি সানার হাত ছাড়িয়ে ঠোঁট উল্টে বলে,
–‘মম, আমরা গ্র্যান্ড মাকে বাড়ি নিয়ে যাই”
সানা তরফ থেকে কোন জবাব আসার আগেই বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকা অফিসার ফের তাড়া দিতে শুরু করে,
–“ম্যাম, প্লিজ তাড়াতাড়ি আসুন”
সোফিয়া সানার দিকে তাকিয়ে জীবনে প্রথমবারের মতো অনুরোধের সুরে বলে,
–“প্লিজ…আর পাঁচ মিনিট ও আমার সাথে থাক”

সানা থেমে যায়। সে চোখ বন্ধ করতেই তার মনে ভেসে ওঠে সেই দিন আরজে আর সোফিয়ার কথাগুলো। সে সবটাই দূর থেকে শুনেছিল। সে নিজেও তো একজন মা। তাই আরেকটা মায়ের অনুরোধ ফেলতে পারেনি। এজন্য আরভিকে নিয়ে এসেছে। এমনিতেই সোফিয়ার আর তিনদিন পরই ফাঁ*সি। কিন্তু পর মুহূর্তে নিজেকে শক্ত করে চোখ খুলে তাকায় সোফিয়ার দিকে,
–“আপনি যদি এমন না করতেন, তাহলে পাঁচ মিনিট না সারাজীবনই ও আপনার কাছে থাকতো। কেন করেছেন আপনি এগুলো?’
সোফিয়া তার প্রতুত্তর না করে ধীরে ধীরে আরভির হাত ছেড়ে দেয়। সানা আরভিকে নিয়ে দরজার দিকে এগোতে থাকে। ঠিক তখন পেছন থেকে ভেসে আসে সোফিয়ার কণ্ঠ,

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৫

–“একটা দশ বছরের মেয়ে যখন তার সৎ ভাইদের দ্বারা ধর্ষিত হয়, তখন তার কেমন হওয়া উচিত, সানা?”
সানার পা থেমে যায়। সে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়। চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়। সোফিয়া থামে না সে ফের বলে,
–“যখন একটা বাচ্চার সামনে, প্রতিদিন তার মাকে নির্যাতন করা হয়। তখন তার কেমন হওয়া উচিত?
যখন সে নিজের স্বামীকে নিজের ছোট জায়ের সাথে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখে তখন তার কেমন হওয়া উচিত?
যখন তার শরীরকে একটা ল্যাবরেটরির এক্সপেরিমেন্ট বানানো হয় তখন তার কেমন হওয়া উচিত, সানা?”
সানার ঠোঁট থেকে ফিসফিস করে বের হয়,
–“মানে…?”
সোফিয়া ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকায় তার দিকে। তার ঠোঁটের কোণে ভয়ংকর তিক্ত এক হাসি ফুটে ওঠে। সে ধীরে ধীরে বলতে শুরু করে,

হ্রদয়ামিলন দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ২৬ (২)