Home ফিরে এসো অনুরাগে ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২৯

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২৯

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২৯
নওরিন কবির তিশা

তপ্ত রক্তিম আভা ছড়িয়ে নবপ্রভাতের অরুণখানা নীল দিগন্তের ললাটে তিলক আঁকল সবে। মিষ্টির রোদ্দুরের স্পর্শে ধরিত্রীর বুকে ‌স্ফুরণ ঘটল স্নিগ্ধতার। কাঁচা সোনাঝরা রৌদ্ররশ্মি তালুকদার মঞ্জিলের কার্নিশ ছুঁয়ে অন্দরমহলে প্রবেশ করতে শুরু করেছে অনেকক্ষন হলো,আর সেই তপ্ত প্রভাত নিজ সঙ্গে বয়ে এনেছে তীব্র ব্যস্ততার মাত্রা।
আজ শাহরিয়ার আর অহনার গায়ে হলুদ। অন্দরে তাই ব্যস্ততা বড্ড বেশি। মিনিট দশেক হলো শয্যা ত্যাগ করেছে তৃষা। ফ্রেশ হয়ে জানালার কপাটগুলো উন্মুক্ত করতেই একঝাঁক অবাধ্য রোদ্দুর ওর স্নিগ্ধ মুখশ্রীতে এসে আছড়ে পড়ল। বায়ুপবনের মৃদু হিল্লোলে অবাধ্য হয়ে উড়তে লাগলো ওর ললাটে পতিত একগুচ্ছ কেশরাজ।
ওড়নাটা কাঁধে টেনে নিয়ে ও জানালার ধারে এসে দাঁড়াতেই টেবিলের ওপর রাখা ইলেকট্রনিক যন্ত্রটা আচানক টুং করে বেজে উঠল। ফেসবুকের নীল স্ক্রিনে একটা নোটিফিকেশন জ্বলজ্বল করছে। তৃষা কৌতূহলী হয়ে ফোনটা হাতে নিলো। নোটিফিকেশন বারে বড় বড় করে লেখা

— “Sailing King has excepted your request and replied to your message.”
সকাল সকাল এমন বিস্ফোরক কাণ্ডে চক্ষুদ্বয় কোটর থেকে বের হয়ে আসার উপক্রম তৃষার, হৃৎস্পন্দন থমকে যোগাড়।যার লেখার মোহে ও এতদিন আচ্ছন্ন, সে আজ নিজে থেকে প্রত্যুত্তর পাঠিয়েছে? ও অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে কাঁপাকাঁপা আঙুলে ইনবক্সটা খুলল। তবে বৃহৎ কোন চিঠি নেই সেখানে,কেবল কয়েকটা শব্দ মাত্র কিন্তু সেগুলোই ছিল ওর হৃদয়ের গহীনে তীব্র ঢেউ তোলার জন্য যথেষ্ট,
“সাগরের ঢেউ যেমন বেলাভূমিকে ছুঁয়ে যায় অবলীলায়, আপনার ওই দীর্ঘ চিরকুটটাও আজ আমার গুমোট একাকীত্বকে ওভাবেই নাড়িয়ে দিল। ভালো থাকবেন, স্বপ্নবিলাসী ম্যাম।”
তৃষার আঙ্গুলের কম্পন তীব্র থেকে তীব্র হতে শুরু করেছে। বক্ষপঞ্জরের ভেতর তখন সহস্র ডানাওয়ালা কোনো এক বিহঙ্গ উন্মত্ত উল্লাসে ঝাপটা দিচ্ছে। যার শব্দের মোহ তাকে আচ্ছন্ন করে রাখত নিশিদিন, তারই এই গভীরতম সংক্ষিপ্ত প্রত্যুত্তরটুকু ওকে বড্ড উচ্ছ্বাসিত করছে। ওর ইচ্ছে করছে জানালার কপাটগুলো আরও চওড়া করে খুলে দিয়ে আকাশকে জানিয়ে দিতে
’দেখো, আমার স্বপ্নবিলাস আজ পূর্ণতা পেয়েছে!’
উত্তেজনায় ওর কপোলদ্বয় আরক্তিম হয়ে উঠেছে, ঠোঁটের কোণে খেলে যাচ্ছে এক ভূবনভোলানো চপল হাসি।ও যখন নিজের এই আনন্দটুকু উদযাপনে আত্মহারা, ঠিক তখনই কক্ষের নিস্তব্ধতা চিরে কারোর গম্ভীর কন্ঠস্বর ভেসে এলো,

-‘ মেবি পায়ের ওই ব্যান্ডেজটার দয়াতেই আপাতত আপনি মাটিতে আছেন, নইলে আপনার যা রিঅ্যাকশন! মনে হচ্ছে এখনই উইংস গজিয়ে জানলা দিয়ে উড়াল দেবেন। তা সকাল সকাল ঘরে এমন কী মহামূল্যবান সম্পদ আবিষ্কার করলেন যে এভাবে লাফালাফি শুরু করেছেন?
হুট করে আর্যর প্রশ্নে সম্বিৎ ফিরে পেল তৃষা। বিদ্যুৎবেগে ঘুরে তাকাতেই দেখল দরজার কপাটে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আর্য। তৃষা তৎক্ষণাৎ হাতের ফোনটা বুকের সাথে চেপে ধরে ও এক গাল হেসে আর্যর তীক্ষ্ণ চাউনি উপেক্ষা করে চপল কণ্ঠে বলল,
-‘ মহামূল্যবানই মিস্টার , আজ আকাশ থেকে আস্ত একটা নক্ষত্র আমার সামনে খসে পড়েছে! আপনি বুঝবেন না, আপনার ওই রাফ অ্যান্ড টাফ লাইফে এসব ইমোশনাল ডাটাবেজ তো জ্যাম হয়ে পড়ে আছে। শুধু জানুন, আজ আমার জীবনের ওয়ান অফ দ্য বেস্ট মর্নিং!
তৃষার অগোচরে আর্য ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল, তবে পরক্ষণেই নিজেকে সামলে ও পকেটে হাত গুঁজে ধীর পায়ে তৃষার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলল,

-‘ নক্ষত্র কিংবা ধূমকেতু যাই হোক, সেগুলো ধরার আশায় আকাশে উড়াল দেওয়ার চিন্তা করলে, রিমেমবার ইট আপনার গ্রাউন্ড কন্ট্রোল কিন্তু এখনো আমার হাতে।
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার পর্দা সরিয়ে ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকল টুইংকেল। ওর পরনে একটা কাঁচা হলুদ রঙা বার্বি ফ্রক, লালচে চুলগুলো দুপাশে ঝুটি করা তার মাঝে ছোট ছোট গাঁদা ফুল গোঁজা।ও তৃষার দিকে ছুটে এসে ওর হাঁটু জড়িয়ে ধরে মিষ্টি কন্ঠে শুধালো,
-‘ বানি! তোমার পা কি ঠিক হয়ে গেছে? এখন কি আর ব্যাথা করছে? পাপা কি তোমাকে আবার কোনো তেতো মেডিসিন দিয়েছে?
তৃষা কালক্ষেপণ না করে ঝট করে টুইংকেলকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। ওর নরম তুলতুলে গাল দুটোতে একের পর এক শব্দ করে চুমু খেয়ে উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,
-‘ হ্যাঁ সুইটহার্ট! আমার সব ব্যাথা একদম ভ্যানিশ হয়ে গেছে। বানি এখন একদম সুপার ফিট! তুমি রেডি হয়ে গেছ? চলো আমরা এখন নিজে যাব।
টুইংকেল খুশিতে হাততালি দিয়ে আর্যর দিকে তাকিয়ে বলল,

-‘ শুনলে তো পাপা? বানির পা ঠিক হয়ে গেছে, তাই বানিকে আর তোমার ওই বাজে মেডিসিন খেতে হবে না। চলো বানি।
আর্য একপাশে দাঁড়িয়ে ওদের এই নির্মল সখ্যতা দেখছিল। হুট করে কি যেন ভেবে মুচকি হাসলো ও। অতঃপর গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
-‘ নিচে যাওয়ার আগে ড্রেসিংটা চেক করে নিবেন।
তৃষা টুইংকেলকে নিয়ে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় আর্যর দিকে তাকিয়ে খানিক ভেঙিয়ে বলল,
-‘ আপনার শুধু ডিসিপ্লিন আর কমান্ড! আজ আনন্দ করার দিন মিস্টার…! সো কোনো কমান্ড আজ কাজ হবে না।
বলেই ও টুইংকেলকে নিয়ে হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেল। ওরা যেতেই আর্য জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরের রোদ্দুর তখন আরও তপ্ত হয়েছে। ও নিজের ফোনের স্ক্রিনে একবার তৃষাকে পাঠানো মেসেজটার দিকে তাকাল আর মনে মনে বিড়বিড়িয়ে বলল,
-‘ ক্রেজি গার্ল, ইয়োর স্টার ইজ অলরেডি ক্যাপচার্ড ইন দ্য পাম অব ইয়োর হ্যান্ড।

আত্মীয় স্বজন আর পাড়া-প্রতিবেশীর উপস্থিতিতে রীতিমতো জনাকীর্ণ উদ্যানে পরিণত হয়েছে তালুকদার মঞ্জিল। তৃষা খুশিমনে টুইংকেলের সাথে সিঁড়ি বেয়ে নামতেই কানে এল সম্মিলিত হাসির কলতান। ড্রয়িং রুমের এক কোণে শীতল পাটি বিছিয়ে বসেছেন বাড়ির প্রবীণারা। রুপোর থালায় কাঁচা হলুদের গাঢ় হলদেটে আভা আর তার উগ্র ঘ্রাণে চারপাশটা ম ম করছে।
তৃষাকে দেখে জাহানারা বেগম চশমার ওপর দিয়ে একবার তাকিয়ে স্নেহার্দ্র কণ্ঠে ডাকলেন,
-‘ তৃষা, এদিকে আয় মা। টুইংকেলকে নিয়ে এখানে বস।
তৃষা সামান্য খুঁড়িয়ে এগিয়ে গিয়ে তাঁদের পাশে বসতেই গুলশানারা বেগম ওর মাথায় হাত বুলিয়ে শুধালেন,
-‘ এখন শরীরের অবস্থা কেমন রে মা? কাল তো যা কাণ্ড বাঁধিয়েছিলি, আমরা তো ভয়ে রীতিমতো শেষ হয়ে যাচ্ছিলাম।
তৃষা এক চিলতে সলজ্জ হাসি হেসে বলল,

-‘ খালামণি, এখন একদম ঠিক আছি।
গুলশানার বেগম মুচকি হেসে বললেন,
-‘ যাক। আলহামদুলিল্লাহ।
তবে ওদের কথোপকথনের মাঝেই জাহানারা বেগমের জহুরির চোখ তৃষার সাধারণ সালোয়ার কামিজের ওপর গিয়ে স্থির হয়েছে। তিনি ভ্রু কুঁচকে কিঞ্চিৎ শাসনের সুরে বললেন,
-‘ হলুদ বাটা প্রায় শেষ হতে চলল, আর তুই এখনো এই সাদামাটা বেশে আছিস কেন? গায়ে হলুদের দিনে, বাড়ির বড় বউ হয়ে তুই কি এভাবেই সবার সামনে যাবি না কি? শাড়ি পরিস নি কেনো?
তৃষা আমতা আমতা করে বলল,
-‘ আসলে আম্মু… আমি তো শাড়ি ঠিকমতো সামলাতে পারি না। তার ওপর পায়ে এই ব্যান্ডেজ, পড়ে যাওয়ার ভয় আছে তো।

-‘ উহু,কোনো ওজর শুনব না। শাড়ি পরতে পারিস না বলে কি সারা জীবন এভাবেই থাকবি?
তিনি কিছুটা দূরে দণ্ডায়মান তামান্নাকে উদ্দেশ্য করে রীতিমতো হাকডাক শুরু করলেন,
-‘ তামান্না, এই তামান্না! এদিকে আয় তো মা। তৃষাকে ওপরে নিয়ে যা, একদম নিখুঁত করে শাড়ি পরিয়ে দিয়ে তবেই নিচে নামাবি। আমি যেন আধঘণ্টার মধ্যে আমার মেয়েটাকে শাড়ি পরা অবস্থায় দেখি।
তামান্না একছুটে এসে তৃষার হাত ধরল। তৃষা অসহায়ভাবে টুইংকেলের দিকে তাকাল, কিন্তু টুইংকেলও তখন দাদুনদের দলে যুক্ত হয়ে বলল,,
-‘ হ্যাঁ বানি! শাড়ি পরলে তোমায় একদম ফেইরিদের মতো লাগবে। জলদি যাও!
তৃষা অগত্যা তামান্নার সাথে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল।
কিছুক্ষণ বাদে,
ড্রয়িং রুমের কোলাহল স্তিমিত হয়ে এসেছে;বাড়ির আবালবৃদ্ধবনিতা তখন উৎসবের আমেজে প্রাঙ্গণে মত্ত। সকলের জোরাজুরিতে আর্যও উপস্থিত সেখানে। তবে টা অনুপস্থিতিরই নামান্তর। ওর পাশ্ববর্তী একটা সোফায় হেলান দিয়ে ল্যাপটপের নীলচে আলোয় নিমগ্ন ছিল, যান্ত্রিক জগতেরই নিবদ্ধ ছিল ওর ধ্যানজ্ঞান। হঠাৎ নিস্তব্ধতা চিরে টুইংকেলের উচ্ছ্বসিত চিৎকার প্রতিধ্বনিত হলো,

-‘ ও বানি! তোমাকে তো একদম ফেইরিদের মতো লাগছে!
আর্যর আঙুলগুলো কিবোর্ডে থমকে গেল। সে অলস চাউনিতে সিঁড়ির দিকে তাকাতেই বুকের ভেতরটা যেন এক অচেনা স্পন্দনে কেঁপে উঠল। ধীরলয়ে এদিকেই এগিয়ে আসছে তৃষা। কাঁচা হলুদ রঙ্গা শাড়িটা ওর তন্বী দেহে মায়াবী লতার মতো জড়িয়ে আছে। ওর কাজলকালো টানা দু’টি চোখ আজ বড্ড গভীর। যার অতল গহবরে ডুবে যাচ্ছে হয়ত আর্য।
ও ওর যান্ত্রিক মস্তিষ্ক মুহূর্তের জন্য অকেজো হয়ে পড়ল। ল্যাপটপ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ও একদৃষ্টে চেয়ে রইল সেই জীবন্ত উপমাকাব্যটির দিকে। পরক্ষণেই নিজের এমন বেহায়া দৃষ্টির দরুন নিজেই লজ্জিত হলো ও। সংকুচিত নেত্রে ফের ল্যাপটপে মনোনিবেশ করার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালালো।
এদিকে তৃষা নিজের বাধনহারা বিক্ষিপ্ত কেশরাজ সামলাতে তৎপর, টুইংকেল দৌড়ে এসে ওর পা জড়িয়ে বলল,
-‘ ও মাই কিউট বানি! তোমাকে একদম ইয়োলো অ্যাঞ্জেলের মত লাগছে।
তৃষা মুচকি হেসে টুইংকেলের তুলতুলে চোয়ালখানা আলতো টেনে বলল,,

-‘ থ্যাংকু বাটারফ্লাই।
টুইংকেল ওকে আরও কিছু বলতে যাওয়ার আগেই পাশ থেকে ভেসে আসলো জাহানারা বেগমের মুগ্ধ কণ্ঠস্বর,
-‘ মাশাআল্লাহ,মাশাআল্লাহ। আমার মেয়েটা।
উনি হাতে থাকা জিনিসগুলো পাশের রেখে তৃষার দিকে এগিয়ে এসে বললেন,
-‘ মাশাআল্লাহ,কারো নজর না লাগুক।
তৃষা প্রসারিত হেঁসে জাহানারা বেগমের উদ্দেশ্যে বলল,,
-‘ দেখো তোমার কথায় শাড়ি পড়ছি। এইবার শান্তি?
-‘ হুমম।
গুলশানারা বেগম আর শাহানারা বেগমও মুগ্ধ দৃষ্টিতে অবলোকন করছে ওকে। তখনই পাশের সোফায় বসে থাকা এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় জাহানারার দিকে ঝুঁকে বেশ কৌতূহলী স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,

-‘ হ্যাঁ গো জাহানারা, এই যে হলুদ শাড়ি পরা মেয়েটি, এটি কে গো? তোমার কোনো আত্মীয় নাকি?
জাহানারা বেগম এক গাল তৃপ্তির হাসি হেসে তৃষার দিকে তাঁকিয়ে বললেন,
-‘ আরে না না, ও তো আমার মেয়ে! আমার কলিজার টুকরো।
মহিলাটি বিস্মিত দৃষ্টিতে তৃষাকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে বললেন,
-‘ বলো কী! তোমার এত বড় মেয়ে আছে জানতাম না তো। সে যাই হোক মাশাআল্লাহ এমন সুন্দরী মেয়ে। তাহলে আমাদের সম্পর্কটা একটু এগোনো যায়, তাই না জাহানারা?
-‘ মানে?
-‘ মানে আর কি? আমার বেয়াইন হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নাও তাহলে। আমার রিদ তো লন্ডনে ব্যারিস্টারি করছে, তোমার মেয়ের পাশে ওকে কিন্তু মানাবে খাসা!
ল্যাপটপের উজ্জ্বল স্ক্রিনের ওপর আর্যর আঙুলগুলো এক নিমেষেই পাথরের মতো স্থবির হয়ে গেল।ব্যারিস্টার ছেলে আর তৃষার বিয়ে —এই চারটে শব্দ ওর কানে বিষাক্ত তিরের ন্যায় এসে বিঁধছে বারংবার।
মুহূর্তের মধ্যে আর্যর শান্ত পেশীগুলো শক্ত হয়ে এল, চোয়াল কঠোর হলো এক অনিয়ন্ত্রিত ঈর্ষার প্রবল ঝাপটায়। প্রবল আক্রোশে ও সশব্দে ল্যাপটপটা বন্ধ করে দিয়ে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। মহিলাটি তখনও উৎসাহ নিয়ে বলে যাচ্ছেন,

-‘ কী বলো জাহানারা? আমার ছেলের সাথে তোমার এই মেয়েকে কিন্তু একদম রাজজোটক…
-‘ এক্সকিউজ ম্যি!
আর্যর ভরাট কণ্ঠস্বরে ওর দিকে ঘুরে তাকালেন মহিলাটি। সঙ্গে সঙ্গে আর্য নিজের ভেতরকার উত্তপ্ত আগ্নেয়গিরি শান্ত করার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালিয়ে যথাসম্ভব শান্ত কণ্ঠে বললো,
-‘ আপনি কি নিজের ছেলেকে কোনো বিবাহিত মেয়ের সাথে বিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন?
-‘ মানে?
-‘ মানে শ্যি ইজ অলরেডি ম্যারিড। এন্ড মোস্ট ইম্পর্ট্যান্টলি, শ্যি ইজ মাই ওয়াইফ, মিসেস আর্য এহসান।
আর্যর এই বিস্ফোরক ঘোষণায় সমগ্র তালুকদার প্রাঙ্গণে পিনপতন নীরবতা নেমে এল। তৃষা আর্যর দিকে তাকাতেই আর্য আর এক মুহূর্ত দন্ডায়মান রইল না। সেখান থেকে প্রস্থান করতে করতে সামান্য চড়া গলায় তৃষার উদ্দেশ্যে বলল,,

-‘ রুমে আসো তৃষা। আই নিড ইউ্য। কুইক।
আর্য গটগট পায়ে প্রস্থান করল। অন্যদিকে ওর ভুলে যাওয়া শেষ কথাগুলোই সকলের উৎসুক দৃষ্টি একযোগে তৃষার উপর নিবদ্ধ হয়েছে। ও লজ্জায় তৎক্ষণাৎ মাথা নিচু করে মাটির দিকে চেয়ে রইল। লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে আসছে শরীর। ইচ্ছা করছে আর্যকে দু চারটে কথা শুনিয়ে দিতে সবার সামনে এমন কথাবার্তার জন্য, আবার ভালোও লাগছে সকলের সম্মুখে তার দেওয়া স্ত্রী সম্মোধনে। ও যখন মিশ্র অনুভূতির সাগরে আবগাহন করছে ঠিক তখনই ফের ভেসে আসলো আর্যর কণ্ঠস্বর,
-‘ কি হল কথা শুনতে পাওনি? বললাম তো দ্রুত আসো।
আবারও আর্যর তুমি সম্মোধন। তৃষার হৃদয়ের অদ্ভুত অনুভূতিগুলো দোলা দিয়ে যাচ্ছে। তবে পরক্ষণেই আর্যর অধিকারবোধের ওই অতর্কিত ঘোষণায় ও সলজ্জ পায়ে দ্রুত অনুগামিনী হলো।

কিছুক্ষণ বাদ তৃষা ধীর পায়ে কক্ষে প্রবেশ করল শাড়ি পরার দরুন আসতে কিঞ্চিৎ দেরি হয়েছে ওর। ও ঘরে ঢুকে দেখল আর্য ল্যাপটপের স্ক্রিনে গভীর মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে আছে, যেন একটু আগের সেই রণংদেহী মূর্তিটা স্রেফ একটা ভ্রম ছিল। তৃষা সামান্য এগিয়ে এলো। ওর নূপুরের শব্দে আর্যর চোখের পলক একবার স্থির হলো তবে ও মুখ তুলল না। তৃষা তড়িৎ কণ্ঠে প্রশ্ন ছুড়লো,,
-‘ ডাকছিলেন কেন? কোনো ইমার্জেন্সি?
আর্য ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই নির্লিপ্ত কন্ঠে বলল,
-‘ নাথিং।
তৃষা বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে বলল,,
-‘ নাথিং মানে? নিচে অতগুলো মানুষের সামনে ওভাবে সিন ক্রিয়েট করে ডেকে আনলেন, আর এখন বলছেন এমনি? আপনি কি জানেন আপনি আসার পরে ওখানে কি হচ্ছিল?
আর্য এবার ধীরস্থিরে ল্যাপটপটা একপাশে রেখে সোজা হয়ে বসল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তৃষার কাজল কালো চোখের ওপর নিবদ্ধ করে শান্ত স্বরে বলল,

-‘ মানুষের ভাবনায় বা কর্মকাণ্ডে আমার বিন্দুমাত্র কিছু যায় আসে না । তবে আমার লিভিং রুমের সোফায় বসে কেউ আমার পার্সোনাল প্রপার্টি নিয়ে ডিল করবে, সেটা সহ্য করার মতো পেশেন্স আমার নেই।
তৃষা নাক কুঁচকে বলল,,
-‘ পার্সোনাল প্রপার্টি? আপনি কি আমায় বাজারের কোনো কমোডিটি মনে করেন? আর ওই খালামণি তো জানতেন না যে আমি আপনার… মানে আমরা বিবাহিত। আপনি ওনাকে ওভাবে না বললেও পারতেন।

-‘ বলতাম না? উনি তো আপনার জন্য লন্ডনের ব্যারিস্টার ঠিক করে ফেলেছিলেন। তো আপনি কি চাচ্ছিলেন আমি ওনার সাথে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ফিক্স করি?
তৃষা আর কথা বাড়াল না। এই লোকের সাথে তর্কে জেতা মানে অরণ্যে রোদন করা। ও বিরক্তি নিয়ে গটগট করে দরজার দিকে পা বাড়াল,
-‘ ফালতু বকবক! আমি নিচে যাচ্ছি।
তৃষা দরজার হাতলটা ধরতেই পেছন থেকে আর্যর সেই ভরাট, গম্ভীর কণ্ঠস্বর বর্শার মতো ওকে বিঁধল,,
-‘ ওয়ান মিনিট, তৃষা।
তৃষা থেমে গেল, তবে পেছন ফিরল না।
-‘ আবার কী?

আর্য কোনো উত্তর দিল না। ও ধীরলয়ে পা ফেলে তৃষার ঠিক পেছনে এসে দাঁড়াল।ওর শরীরের সেই পরিচিত কড়া পারফিউমের সুভাষ নাসারন্ধ্রে ধাক্কা দিতেই তৃষা পিছু হটতে চাইল, কিন্তু বিপত্তি বাধলো পিছনে থাকা দেওয়ালে।
আর্য অত্যন্ত এগিয়ে এসে তৃষার দিকে না তাকিয়েই ওর একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল। আর্যর এহেন আকস্মিক স্পর্শে থরথরিয়ে কেঁপে উঠল তৃষার ক্ষীন কায়া। পরক্ষণেই ওর অনূভুত হলো আর্য খুব সাবধানে ওর হাতের সাধারণ কাঁচের চুড়িগুলো একটা একটা করে খুলে টেবিলের ওপর রাখছে।
তৃষা বিস্ময়বিস্ফোরিত নেত্রে দেখল, আর্য একজোড়া নিখুঁত কারুকাজ করা স্বর্ণের বালা বের করে ওর ফর্সা কবজিতে সেগুলো পরিয়ে দিচ্ছে। ওর শীতল আঙুলের ছোঁয়া তৃষার স্পন্দিত ধমনীতে এক অচেনা সুরে এরে অবতারণা করছে।বালা পরানো শেষ হলে আর্য তৃষার হাতের ওপর নিজের আঙুলগুলো আলতো করে রাখল। ওর দৃষ্টি তখনো তৃষার হাতের ওপর নিবদ্ধ। তীব্র অধিকার বোঝে ও অটল কণ্ঠে বলল,

-‘ এগুলো যেন হাত থেকে খোলা না হয়।
তৃষা বোকা দৃষ্টি মেলে তাকাতেই আর্য এবার খানিক ধমকের সুরে বলল,
-‘ বুঝেছেন?
তৃষা বোকা দৃষ্টি মেলে মাথা নাড়িয়ে বলল,,-‘ হুম।
মুহূর্ত খানিক অতিবাহিত হতেও তৃষাকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে আর্য ভ্রু কুঁচকে কিঞ্চিৎ আড়ষ্ট গলায় বলল,
-‘ ওভাবে কী দেখছেন?
তৃষা এবার একটু সাহস সঞ্চয় করে সরাসরি আর্যর চোখের দিকে তাকিয়ে হাতটা না ছাড়িয়ে বেশ চপল স্বরে পালটা প্রশ্ন করল,
-‘ আসলে আমি একটা কনফিউশনে আছি মিস্টার। আপনার প্রবলেমটা ঠিক কী বলুন তো? একবার আপনি আপনি বলে বড্ড ফরমাল হয়ে যান, আবার হুট করে তুমি বলে..ইয়ে ..! না মানে আপনার সিস্টেম কি মাঝেমধ্যে হ্যাং করে নাকি?
আর্য মুহূর্তকাল স্তব্ধ হয়ে রইল। অতঃপর কি যেন ভেবে ও তৃষার কবজিটা আলতো করে ছেড়ে দিয়ে এক কদম পিছিয়ে দাঁড়াল। পকেটে হাত গুঁজে জানালার বাইরের রোদ্দুরের দিকে তাকিয়ে খুব ধীর লয়ে বলল,

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২৮

-‘ নাথিং।
তৃষা সন্দিহান দৃষ্টিতে আর্যর দিকে তাকিয়ে বলল,
-‘ সত্যি তো নাকি আন্টির ছেলের কথা শুনে আপনি কি জ্যেলাস হচ্ছিলেন?
আর্য এবার সরাসরি তৃষার চোখের মণির দিকে চাইল। সেই দৃষ্টিতে শতসহস্র অব্যক্ত শব্দের আনাগোনা,অথচ ও পরক্ষণেই নিজেকে সামলিয়ে গাম্ভীর্যে নিজেকে আবৃত করে বলল,,
-‘ জ্যেলাস? জাস্ট প্রোটেক্টিভ। নিজের একান্ত ব্যক্তিগত জিনিসের অন্য কারো নজর পড়া আমি একদমই পছন্দ করি না, দ্যাটস ইট!

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩০