Home ফিরে এসো অনুরাগে ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩০

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩০

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩০
নওরিন কবির তিশা

আজ তৃষার প্রস্থানের পর কিঞ্চিৎ নিস্তব্ধতা নেমে এসেছিল প্রাঙ্গনে। পরক্ষণেই পূর্ণোদ্যমে শুরু হলো হলুদিয়া আয়োজন। চারদিকে হলুদ শাড়ির বর্ণিল ছটা আর গাঁদা ফুলের উগ্র সুবাসে উৎসবের আমেজ এখন তুঙ্গে। সবাই আবার মেতে উঠছে হাসি-ঠাট্টায়।
তবে সেই মহিলাটি অর্থাৎ লিমা খানম তখনও বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তিনি আমতা-আমতা করে জাহানারা বেগমের দিকে তাকিয়ে কিঞ্চিৎ অপ্রস্তুত গলায় বললেন,
-‘ জাহানারা, তুমি একবারও বললে না যে এটি তোমার বড় ছেলের ঘরের ঘরণি? আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম ! আর তোমার ছেলে যেভাবে সবার সামনে হুংকার দিয়ে উঠল, বাপ রে!
জাহানারা বেগম এক গাল হেসে মহিলার দিকে তাকিয়ে বললেন,

-‘ আরে বোন, আমি তো বলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু তার আগেই তো..!
ওনাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে মহিলাটি লজ্জিত মুখে শাড়ির আঁচলটা একটু টেনে বললেন,
-‘ তা তো দেখলামই। কিন্তু কত বড় লজ্জা পেতে হলো আমায় বলো তো? আমি তো ভেবেছিলাম তোমার এই মিষ্টি মেয়েটি এখনো কুমারী।
জাহানারা বেগম এবার খানিকটা রসিকতার সুরেই বললেন,
-‘ আরে বোন, লজ্জার কী আছে? আমার ছেলেটা একটু অমনি বড্ড জেদি আর বেশি পজেশিভ, ও তো ওর জিনিসের ওপর কারো ভাগ বসানো সহ্যই করতে পারে না। ও যখন সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন আমারও মাঝে মাঝে সাহস হয় না ওর কথার ওপর কথা বলার।
মহিলাটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে তৃষার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি নিজের মনেই বিড়বিড় করে বললেন,
-‘ তা তো দেখলামই! কী একখান বাঘের মতো চাউনি ছেলের! কিন্তু মানতেই হবে জাহানারা, তোমার ছেলের পছন্দ একদম জহুরির মতো। মেয়েটা যেমন মায়াবী, আর্যর পাশে ওকে ঠিক তেমনই মানিয়েছে। আর সবচেয়ে ভালো লাগলো তোমার ছেলের ওকে আগলে রাখাটা।
পাশ থেকে গুলশানারা বেগম ফিক করে হেসে উঠে ফোড়ন কাটলেন,

-‘ আরে আপা, আর্যর যে যত্নের ধারা তাতে মানুষ তো দূর, আমার মনে হয় আর্যর ওই ধমকের পর এখন কোনো পশুপাখিও তৃষার দিকে চোখ তুলে তাকাতে ভয় পাবে।
উপস্থিত অন্য আত্মীয়রা হাসিতে ফেটে পড়ল। তামান্না এক গাল হেসে বলল,
-‘ ঠিক বলেছ খালামণি! ভাইয়া যেভাবে হুকুম দিয়ে ভাবিকে ওপরে নিয়ে গেল, জিও জিও। বলতেই হবে তৃষা ভাবির কপাল আছে।
পাশ থেকে রাইসা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,,-‘ হ্যাঁরে আপু তৃষা ভাবিমনিরই কপাল, আর আমাদের গুলা হুদাই হুদাই চার আঙ্গুল হইছে।
কিছুক্ষণ বাদে সেখানে ধীরলয় উপস্থিত হল তৃষা।তামান্না আর রাইসার খুনসুটি তখনো থামেনি, এমন সময় হুট তৃষাকে পুনরায় সেখানে পদার্পণ করতে দেখে উপস্থিত সবার মাঝে মৃদু হাসির হিল্লোল বয়ে গেল। তৃষা কিছুটা লজ্জিত ও কুণ্ঠিত চরণে এগিয়ে আসতেই রাইসা রসিকতার সুরে বলে উঠল,

-‘ ও বাবা! ভাবিমণি যে আবার ফিরে এলে? তা ভাইয়ার কাছ থেকে এখানে অনুমতি মিলল তাহলে? নাকি আবার কিছুক্ষণ বাদে রুমে ডাকবে হ্যাঁ?
তৃষা আরক্ত মুখে নতনেত্রে দাঁড়িয়ে রইল। গুলশানারা বেগম ওর গাল টিপে দিয়ে টিপ্পনী কাটলেন,
-‘ ছেলের আমার চোখে হারানো প্রেম, এক মুহূর্ত চোখের আড়াল হওয়ার জো নেই! তা মা, আর্য কি ওপর থেকে দূরবীক্ষণ যন্ত্র নিয়ে নজর রাখছে, না কি সাথে কোনো বডিগার্ড পাঠিয়েছে?
তৃষা আমতা-আমতা করে বলল,
-‘ খালামনি তুমিও। আর সেরকম কিছুই না উনি জাস্ট এমনি…!
ওকে কথা শেষ করতে না দিয়ে তামান্না হেসে কুটিপাটি হয়ে বলল,
-‘ থাক ভাবি, আর সাফাই গাইতে হবে না! ভাইয়ার ওই বাঘের চাউনি মনে পড়লে এখনো আমাদেরই পিলে চমকে উঠছে, আর দরকার নেই বাবা বিয়ের আগে ম’রে বরকে বিপত্নীক করতে চাই না ।
আসর জুড়ে যখন এই মধুর হাস্যকল্লোল আর রসাত্মক বাক্যালাপের জোয়ার বইছে, ঠিক তখনই এক কোণে সোফায় বসে থাকা মায়ার অবয়বে কালবৈশাখীর মেঘ ঘনীভূত হলো। ওর তপ্ত নিশ্বাসে ঈর্ষার লেলিহান শিখা যেন প্রতি মুহূর্তে দাউদাউ করে জ্বলছে। আর্যর ওই গম্ভীর ঘোষণা আর তৃষার প্রতি ওর এই প্রকাশ্য অধিকারবোধ সবই মায়ার হৃদয়ে তপ্ত সীসার মতো বিঁধছে। ও দাঁতে দাঁত চেপে নিজের মায়ের উদ্দেশ্যে কর্কশ স্বরে বিড়বিড় করল,

-‘ ন্যাকামির একটা সীমা থাকা উচিত! সবার সামনে আদিখ্যেতা না করলে কি ওদের পেটের ভাত হজম হয় না? যত সব আদিখ্যেতা, ঢং!
মায়ার কটু স্বরে আসমা বেগম খানিকটা অপ্রস্তুত হলেন। মায়া আর এক মুহূর্তও সেখানে স্থির থাকতে পারল না; শাড়ির আঁচলটা ঝটকায় টেনে নিয়ে ও গটগট করে ভেতরের দিকে প্রস্থান করল। ওর প্রস্থানের ভঙ্গিটা লিমা খানমের নজরে আসতেই তিনি ভ্রু কুঁচকে জাহানারা বেগমের দিকে ফিরে কৌতূহলী স্বরে শুধালেন,
-‘ হ্যাঁ গো জাহানারা, এই চটপটে মেয়েটি কে? বড্ড রাশভারী মেজাজ তো!
জাহানারা বেগম হালকা হেসেই দায়সারা গোছের উত্তর দিতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু পাশ থেকে গুলশানারা বেগম ফোড়ন কেটে বললেন,

-‘ ও আমাদের মেজো ভাইয়ের ছোট মেয়ে, মায়া। একটু জেদি স্বভাবের তো, তাই হয়তো ভিড়ভাট্টা সহ্য করতে পারছে না।
লিমা খানম মায়ার চলে যাওয়ার পথের দিকে কিছুক্ষণ অপলক চেয়ে রইলেন। ওনার জহুরির চোখ যেন মায়ার সুশ্রী অবয়ব আর দীর্ঘাঙ্গী গড়নের মাঝে কিছু খুঁজতে ব্যস্ত। তিনি গলার স্বর কিঞ্চিৎ খাদে নামিয়ে বললেন,
-‘ মেয়েটি তো বেশ ডাগরডোগর হয়েছে। তা বিয়েশাদি হয়েছে নাকি?
তৃষার দুষ্টুমি ভরা মস্তিষ্কে এবার এক দুষ্ট বুদ্ধি খেলে গেল ও এক পা এগিয়ে এসে লিমা খানমের খুব কাছে বসে উৎসাহের সাথে বলল,
-‘ না না আন্টি, ও তো এখনো সিঙ্গেল! আপনি মায়াকে কিন্তু সিরিয়াসলি কনসিডার করতে পারেন। দেখুন না, ও যেমন লম্বা তেমনি মায়াবী সুন্দরী। পড়াশোনাতেও বেশ ব্রিলিয়ান্ট। আমাদের মেজো কাকার বড্ড আদরের মেয়ে। আপনার লন্ডনি ব্যারিস্টার ছেলের পাশে মায়াকে কিন্তু একদম পারফেক্ট লাগবে!
লিমা খানম এবার নড়েচড়ে বসলেন। তিনি চশমার ওপর দিয়ে তৃষার চোখের মণির দিকে তাকিয়ে খানিক ভেবেচিন্তে বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়িয়ে বললেন ,

-‘ হুম, বুদ্ধিটা কিন্তু মন্দ দাওনি বউমা। মেয়েটার চোখ-মুখের কাটিং বেশ সুন্দর। তা জাহানারা, কী বলো তুমি? সম্বন্ধটা নিয়ে একটু এগোব নাকি?
জাহানারা বেগমও তৃষার এই চতুর চাল দেখে মনে মনে হাসলেন। তিনি ভালো করেই আর্যর মায়ার মনোভাব জানেন। তৃষাই ওনাকে অবগত করেছে ওনাকে এই ব্যাপারে তাই পরিবেশটা হালকা করতে উনি বললেন,
-‘ সে তো দেখা যাবেই বোন। আগে গায়ে হলুদের রঙটা সবার গায়ে লাগুক, তারপর না হয় সম্বন্ধের রঙ নিয়ে আলোচনা করা যাবে!
তৃষা অগোচরে হাসলো কথোপকথনে; মনে মনে বলল,,
-‘ এবার বুইঝো চান্দু, অন্যের জামাইয়ের দিকে নজর না! আভি আয়েগা মাজা!

গুলশানারা বেগমের সনির্বন্ধ অনুরোধে ওকে পুনরায় অন্দরমহলে যেতে হয়েছিল। প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি নিয়ে যখন ও পুনরায় হলুদিয়া উৎসবের প্রাঙ্গণে পা রাখল, ঠিক তখনই অতর্কিতে পেছন থেকে দুটি নরম হাতের তালু ওর আঁখিপল্লবদ্বয়কে নিবিড়ভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জাপটে ধরল।
তৃষা মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। বিস্ময়-বিহ্বল কণ্ঠে অস্ফুট স্বরে শুধাল,
-‘ কে? কে আপনি?
পিছন থেকে কোনো প্রত্যুত্তর এল না, কেবল একজোড়া চঞ্চল হাতের মৃদু চাপের মাঝে একরাশ চেনা নিস্তব্ধতা খেলা করতে লাগল। তৃষা হাতের সামগ্রীগুলো অতি সন্তর্পণে পাশে সরিয়ে রেখে নিজের দু-হাতে আগন্তুকের হাতদুটোকে স্পর্শ করল। বিদ্যুতীও স্পর্শে হৃদস্পন্দন ওকে জানান দিল এটা ওর প্রাণের সখী,ওর সমস্ত ভন্ডামির সারথি ওর হৃদয়ের দর্পণ মেহেসানা!
আবেগের আতিশয্যে তৃষা দুই হাতে মেহেসানার হাতগুলো সরিয়ে দিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। সামনে প্রিয় সখীকে দেখা মাত্রই ওর চোখেমুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি আর আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল। তৃষা ওকে জাপ্টে ধরে বলল,,
-‘ মেহু, দোস্ত। তুই কখন এলি?
‌তৃষার আবেগতাড়িত বাক্যগুলোকে উপেক্ষা করে মেহেসানা ওর কপালে হালকা চাটি মেরে নাক কুঁচকে বলল,
-‘ আরে বাবা, একটু দম তো নিতে দে।
তৃষা ওকে ছাড়ে বলল,,

-‘ বল।
-‘ কিছুক্ষণ হলো। তোর কাছেই যাচ্ছিলাম পরে দেখি তুই এখানে। আর এমনি তো আমাদের আসার কথা আরো আগে ছিল কিন্তু তোর ওই সার্জন দেবরের চক্করে দেরি হয়েছে। হামিদা আন্টিরা না পেরে বলছিল যে আমরাই চলে আসি তখন ওনার টাইম বের হয়েছে।
-‘ ওহ।
-‘ হু।
মেহেসানা এতক্ষন আলাপচারিতায় ব্যস্ত থাকলেও ও মূলত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তৃষাকে পর্যবেক্ষণ করছিল। হঠাৎ ভ্রু ও নাঁচিয়ে তৃষার আপাদমস্তক পরখ করল,
-‘ কি ব্যাপার মিসেস এহসান? এত সুন্দরী হয়ে গিয়েছো। ডার্লিং তোকে দেখে তো আমার নিজেরও বিয়ে করতে ইচ্ছা করছে রে।
-‘ তো কি করে ফেল।
মেহেসানা মুখ বাঁকিয়ে বলল,-‘ বেডা পামু কই?
ওর প্রত্যুত্তরে তৃষা কিছু বলতে গেল তার আগেই উঠোনের অপর পাশ থেকে ভেসে আসলো শাহানারা বেগমের কন্ঠ,,
-‘ তৃষা মা এদিকে আয় তো। হলুদ লাগাবো এখন অহনাকে।
শাহানারা বেগমের কন্ঠ কর্ণগোচর হতেই তৃষা উনার দিকে তাকিয়ে বললেন,,-‘ খালামণি তুমি যাও আসছি।
-‘ দ্রুত আয় মা।
ওরা আর কালক্ষেপন না করে ওদিকে এগিয়ে গেলো।

প্রাঙ্গণজুড়ে তখন উৎসবের এক উন্মাতাল জোয়ার। শানবাঁধানো উঠোনের মাঝখানে অহনাকে ঘিরে বসেছে রমণীকুল। সুগন্ধি তেলের সাথে মেশানো কাঁচা হলুদের তীব্র ঘ্রাণে চারপাশটা যেন ম ম করছে। মুরুব্বীদের হলুদ মাখানোর পর তৃষা আলতো করে এক চিমটি হলুদ অহনার কপালে আর গালে ছুঁইয়ে দিলো। একে একে ওকে হলুদ মাখিয়ে দিল প্রত্যেকটা নবকুড়ি।
টুইংকেল ছোট্ট ছোট্ট পায়ে এগিয়ে এসে তৃষার সাথে দাঁড়িয়েই হলুদ মাখালো অহনাকে। তারপর তৃষা হাতে সামান্য হলুদ নিয়ে আলতো করে ছুঁয়ে দিলে টুইংকেলের মিষ্টি তুলতুলে চোয়ালে। টুইংকেলও নিজের ছোট্ট ছোট্ট হাত দ্বারা হলুদ আবৃত করল তৃষার মুখশ্রী।
-‘ ইউ্য লুকিং সুইট বানি।
-‘ তোমাকেও ভীষণ কিউট লাগছে সুইটহার্ট। একদম কিউটনেস ওভারলোড।
টুইংকেল মিষ্টি হাসলো। একে একে প্রত্যেককে হলুদ মাখালো প্রত্যেকে তবে বাদ পরল তৃষা। টুইংকেল চলে যেতেই ও এক কোনায় চুপিসারে দাঁড়িয়ে আছে। কিছুতেই হলুদ মাখবে না ও শাড়ি নষ্ট হয়ে যাবার ভয়ে তবে ওর অগোচরেই চলছে এক দীর্ঘ পরিকল্পনা। রাইসা, তামান্না আর মেহেসানা এই ত্রয়ীর চোখে তখন দুষ্টুমির ঝিলিক। ওদের হাতে ধরা বাটি ভর্তি হলুদের কাই। রাইসা ফিসফিস করে বলল,
-‘ তৃষা ভাবিমণিকে আজ আস্ত রাখা যাবে না। হলুদে একদম ভূত বানিয়ে ছাড়ব!
তৃষা বিপদ আঁচ করতে পেরে এক পা পেছাল। কিন্তু ততক্ষণে মেহেসানা ওর এক হাত জাপটে ধরেছে। ও আর্তনাদ করে উঠল,

-‘ মেহু, ছাড়! দেখ আমার শাড়িটা নষ্ট হয়ে যাবে কিন্তু!
-‘ আরে আরে ক্যাপ্টেনের বউ হয়ে শাড়ির মায়া করিস? শালী তোর একটা শাড়ি নষ্ট হলে তোর বর তোকে দশটা কিনে দিবে। চুপ থাক।
মেহেসানার হাসির মাঝেই রাইসা আর তামান্না দুই দিক থেকে এগিয়ে এল। তৃষা আর এক মুহূর্ত দেরি না করে কোনোমতে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ভোঁ-দৌড় দিল। ওর পিছু পিছু হলুদের বাটি হাতে ছুটল তিনমূর্তি। উঠোনের হাসাহাসি আর হুল্লোড় ছাপিয়ে তৃষার শাড়ির খসখস শব্দ আর ওর চঞ্চল পায়ের নূপুরের নিক্কন প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
উঠোনের ভিড় কাটিয়ে ও সোজা অন্দরের দিকে ছুটল। গন্তব্য দোতলার নিরাপদ ঘর। রাইসা পেছন থেকে চিৎকার করে বলল,

-‘ ভাবিমণি, পালিয়ে বাঁচা যাবে না! আজ তোমাকে হলুদ ভুত করেই ছাড়বো।
তৃষা হাপাচ্ছিল। শাড়ির কুঁচি এক হাতে সামলে অন্য হাতে রেলিং ধরে ও যখন সিঁড়ির বাঁকটা দ্রুতবেগে অতিক্রম করতে চাইল, ঠিক তখনই ঘটল বিপত্তি। দুই তলার ল্যান্ডিংয়ে আসতেই কারো এক সুঠাম, শক্ত দেহের সাথে ওর সজোরে ধাক্কা লাগল। তৃষা নিজেকে সামলাতে না পেরে ছিটকে পড়ে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই এক জোড়া বলিষ্ঠ হাত ওর কোমর জড়িয়ে ধরে এক হ্যাঁচকা টানে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল।
তৃষার বন্ধ আঁখিপল্লব ভয়ে কাঁপছিল। হঠাৎ নাসারন্ধ্রে ধাক্কা দিল পরিচিত পারফিউমের কড়া ঘ্রাণ। ও চোখ খুলে তাকাতেই দেখল আর্যর সেই অতলান্ত গম্ভীর চোখের চাউনি। আর্যর শুভ্র পাঞ্জাবিতে তৃষার হাতের হলুদের ছাপ ইতিউতি লেগে গেছে।

-‘ হ্যোয়্যাট ননসেন্স! এভাবে ছোটাছুটি করছেন কেন?
তৃষা ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে আসছিল এই বুঝি আর্য ওকে এক ধমক দিবে। তবে আর্যর কন্ঠে ধমকের চেয়ে উদ্বিগ্নতা প্রবল দেখে খানিক সাহসের সঞ্চয় হলো ওর। আর্যর অগোচরে শুকনো ঢোক গিলে ও বলল,,
-‘ এমনি..
ওকে কথা শেষ না করতে দিয়ে আর্য বলল,-‘ এমনি এমনি কেউ ছোটাছুটি করে? তার উপর শাড়ি পড়েছেন ম্যাম, নিজেকে সামলান। সাথে আমাকেও শান্ত থাকতে দিন। আপনার কন্ডিশনের যে কোনো মুহূর্তে হার্ট-ফল হতে পারে আমার।
শেষ কথাগুলো খানিক নিম্ন স্বরে বলল আর্য যার দরুণ সেগুলো কর্ণগোচর হলো না তৃষার। তাই ও পুনর্বার প্রশ্নাত্নক দৃষ্টি মেলে বলল,,
-‘ মানে?
আর্য ওকে ছেড়ে দিল সন্তর্পণে, অতঃপর নিজের পাঞ্জাবি ঠিক করতে করতে বলল,,

-‘ নাথিং।
তৃষা ওকে ফের প্রশ্ন করতে যাবে তার আগেই আর্য বলল,,
-‘ পাঞ্জাবিটা নষ্ট করে দিয়েছেন। এখন এটা পরিষ্কার কে করবে?
-‘ আমি কি জানি?
তৃষা তৎক্ষণাৎ ওখান থেকে কেটে পড়তে গেলেই আর্য ওর হাত আঁকড়ে নিজের কিছুটা কাছাকাছি টেনে এনে বলল,,
-‘ আপনি কি জানেন মানে? এখন কি আমি এটা পড়ে ওখানে যাব?
-‘ সেটা আপনি জানেন। আর আমায় একটা কথা বলুন তো, হলুদের দিন সাদা পাঞ্জাবি কে পরে?
-‘ আমি পড়ি, কোনো প্রবলেম?
-‘ নাহ কোনো প্রবলেম নেই। আর আপনি যখন পড়েনই তাহলে আমাকে বলছেন কেন? হলুদের দিনে সাদা পাঞ্জাবি পড়লে নোংরা তো হবেই। যান গিয়ে নিজে পরিষ্কার করে নিন।
তৃষা পালানোর জন্য ছটফট করতে করতে আর্যর হাতের বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল। অথচ আর্য ওকে নড়বার একদণ্ড অবকাশ না দিকে ওর কবজিটা সামান্য শক্ত করে ধরে ওর চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে ভরাট বলল,

-‘ যুক্তি ভালোই শিখেছেন ম্যাম। ভুলটা আপনার, অথচ সাফাই গাইছেন আমার পাঞ্জাবির কালার নিয়ে?
তৃষা ঠোঁট উল্টে অবজ্ঞার সুরে বলল,
-‘ আরে বাবা, এখানে আমার দোষটা কোথায়?আমি তো জাস্ট রাইসাদের হাত থেকে বাঁচতে দৌড়াচ্ছিলাম। আপনি কেন মাঝপথে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন? দোষ তো আপনারই!
-‘ পাহাড় নড়ে না তৃষা, সমতলকেই পাহাড়ের কাছে আসতে হয়। এখন আমার এই পাঞ্জাবিতে আপনার হাতের যে ছাপ লেগেছে, এটার সলিউশন কী? আমি কি এই কন্ডিশনে নিচে গিয়ে সবার ইনভেস্টিগেশনের শিকার হব?
তৃষা অপ্রস্তুত হয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে আমতা-আমতা করে বলল,
-‘ উফ, আপনি না বড্ড বেশি খুঁতখুঁতে! জাস্ট একটু হলুদই তো লেগেছে। ধুয়ে ফেললেই হয়। ছাড়ুন এখন আমাকে, ওরা চলে আসবে!
আর্য তৃষার হাতটা এক ঝটকায় ছেড়ে দিয়ে নিজের পাঞ্জাবির দাগটার দিকে তাকাল। ওর চোয়াল শক্ত করে গম্ভীর গলায় বলল,

-‘ ছাড়লাম। তবে মনে রাখবেন, এই ড্যামেজ কন্ট্রোল কিন্তু আপনাকেই করতে হবে। এখন যান, নিজেকে হলুদ ভুত হওয়ার হাত থেকে বাঁচান। আপনার এই ক্ল্যামজিনেস সামলাতে আমার সিস্টেম এমনিতেই ওভারলোডেড।
তৃষা আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। আর্যর ওই তীব্র চাউনি আর গাম্ভীর্যমাখা ধমকের রেশ থাকতেই ও শাড়ির কুঁচি সামলে নিয়ে চিলের মতো দৌড় দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। যাওয়ার সময় ওর নূপুরের দ্রুত লয়ের ঝংকার আর্যর কানে এক অদ্ভুত প্রশান্তি দিয়ে গেল। আর্য স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে নিজের মনেই বিড়বিড়িয়ে বলল,
-‘ ক্রেজি গার্ল, আপনাকে সামলানো আর মাঝ সমুদ্রে জাহাজ চালানো দুটোই সমান চ্যালেঞ্জিং।
হঠাৎই প্রাঙ্গণের সাউন্ড বক্সে বেঁজে উঠল এক সুরেলা লহরী,,

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২৯

🎶 কি আবেশে সে তারে বারে বারে দেখি তবু
যেন মেটেনা তৃষা …
সে যে পথ চলে বুকে ঝড় তোলে…
জেগে ওঠে ঘুমানো আশা….🎶
গানের লাইনগুলো যেন আর্যর সঙ্গে হুবহু মিলে গেল ও অজান্তেই হাত রাখল নিজের বুকের বা পাশে। স্পষ্ট টের পেলো হৃদযন্ত্রের অবাধ্য কম্পন।

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩০ (২)