শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৫১
সুরভী আক্তার
আফতাবের সদ্য বন্ধ করা চোখ দুটো বিভৎস চমকিত হলো । বজ্রপাতের ন্যায় ঝলকানি দিয়ে আলাদা হলো নেত্রপল্লব । পুরুষালি শান্ত চিত্ত কাঁপল । শোয়া অবস্থায় ঝটকা মেরে ঘাড় ঘোরালো আফতাব । অবিশ্বাস্য দিপ্তীমান চোখের চাহনি । চক্ষু জোড়া কোটর ফেটে বেরিয়ে আসার দশা । খাটের উপর এক হাতে হাঁটু জড়িয়ে গুটিয়ে বসে আছে ময়না । চোখ জোড়া টই-টুম্বুর । আফতাব তাকাতেই উষ্ণ তরল গাল বেয়ে গড়ালো ময়নার । ঢুকি চিপে নাক টানলো ময়না । দ্রুত গাল বেয়ে নামা পানির ধারা টুকু মুছে ফেললো । আফতাবের শরীর অবশ লাগছে কেমন । ঝিমঝিম করছে শরীর । ও ময়নার পানে দৃষ্টি রেখেই উঠে বসলো ধীরে । মোলায়েম কন্ঠে ময়নার নাম উচ্চারণ করলো….
“ ময়নাহহহ ?
ঢোক গেলে ময়না ।
হাসার চেষ্টা করে উপর নিচে মাথা নাড়ে । অবাধ্য চোখ থেকে ফের পানি গড়াতে নিলে তার আগেই হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছলো ময়না । ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে । তেষ্টা পাচ্ছে ভীষণ । গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে ।
এতক্ষণ আফতাবের অনুপস্থিতিতে বহু কষ্টে নিজেকে সামলেছে । এখন আর পারা যাচ্ছে না ।
বুকের ভেতর অসম্ভব যন্ত্রনা হচ্ছে । অস্থিরতা কাজ করছে ভীষণ । ময়না অন্য হাত দিয়ে অতি সন্তর্পণে নিজের পেট চেপে ধরে বসে আছে ।
আফতাব কিছুক্ষণ অবিশ্বাস্য নয়নে চেয়ে রইলো । মাথা ভোঁ ভোঁ করছে ঝিঁঝিঁ ধরার ন্যায় । আফতাব তড়িতে উঠে দাঁড়ালো । ময়নার পাশে নিসংকোচে উঠে বসলো । ময়না কে টেনে ধরলো নিজের দিকে । উদ্বিগ্ন মনে শান্ত কন্ঠে বললো…
“ ময়না ? কি বলছো তুমি ? তুমি …
শুকনো গলা ভেজানোর জন্য পানির প্রয়োজন । ভীষণ প্রয়োজন এক ফোঁটা পানি । ময়না ভয়ার্ত কন্ঠে বুলি ফুটালো..
“ পানি খামু ।
আফতাব তড়িঘড়ি করে হাত বাড়িয়ে টেবিলের উপরের জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢালে । গ্লাস টা ময়নার দিকে বাড়িয়ে দেয় । হাত কাঁপে ওর নিজের ও । আফতাব গ্লাস টা ছাড়ে নি । ময়না ওর হাতের উপর হাত রেখে গ্লাসটা ধরে দুঢোক পানি খেলো । তৃষ্ণার্ত গলা ভিজে এলো একপর্যায়ে । আর একটু হলেই দম ফুরিয়ে যেতো মনে হয় ।
আফতাব গ্লাস সরিয়ে টেবিলের উপর রাখলো । উদগ্রীব হয়ে একই প্রশ্ন করলো আবার…
“ ময়না , তুমি , তুমি এক্ষুনি কি বললে ? বলো…
“ হুম ! আ..আমি মা হমু না ।
গলা কাঁপে ময়নার । বারবার চোখ ভরে ওঠে । নিজেকে ধাতস্থ করতে বেজায় হিমশিম খাচ্ছে মেয়েটা । অনুতাপ , অপরাধ বোধ , ভয় , জড়তা , আফতাবের স্পর্শ , সবটা মিলিয়ে রিতিমত কম্পন ধরেছে নারী অঙ্গে । চোখের কোটরে ভিড় জমানো নোনা জল যথা সম্ভব ঠেলে ঠুলে আটকানোর চেষ্টা চালাচ্ছে ও ।
আফতাব অস্থির । কাঁপছে ওর মুখশ্রীও । আফতাব ময়নাকে আরো বেশি টেনে নিলো নিজের কাছে । মধ্যকার কিছুটা দূরত্ব রেখে আবার শীতল কন্ঠে বলতে লাগলো ধরা গলায়…
“ ময়না ! তাকাও আমার দিকে । ভয় পাচ্ছো তুমি ? মিথ্যে বলছো আমায় ? তাই না ? ভয় পাওয়ার কিচ্ছু নেই , মিথ্যে বলতে হবে না তোমায় ! আমার কদিনের ব্যবহারে কষ্ট পেয়েছো ? তাই এসব বলছো , না ? আমি আর এমন ব্যবহার করবো না । এড়িয়ে চলবো না তোমায় ! আমি দুঃখিত ময়না । আর ভুল করবো না । তোমাকে ছাড়বো না আমি ! বাচ্চা ! বাচ্চা নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই আমার । আমি তো বলেছি এটা অস্বাভাবিক কিছু নয় । আমি কোনো প্রশ্ন তুলবো না তোমার উপর । তুমি কাঁদছো কেনো ? আমি আর কিচ্ছু বলবো না তোমায় । তোমাকে কক্ষনো ছাড়ার প্রসঙ্গে আসবো না আমি ।
ময়না ফিকড়ে উঠলো এবার । ঠোঁট ভেঙে কেঁদে ফেললো চোখ নামিয়ে । ভড়কালো আফতাব । হকচকিয়ে গেলো সে । ক্রন্দনরত কন্ঠে ময়না আওড়ালো অস্পষ্ট স্বরে….
“ আমি মিছা কথা কাইতাছি না । আমি সত্যিই মা হমু না আর ! আমার পেটে কোনো বাচ্চা নাই । আমি গর্ভবতী নই ।
আফতাব গলা ভেজায় ।
ছাড়ে ময়না কে । রুদ্ধ গলায় শুধোয়..
“ তাহলে , বলে ছিলে কেনো ?
দুদিকে মাথা নাড়ালো ময়না ।
“ জানি না । এখন খালি জানি আমি গর্ভবতী নই । আমার পেটে কারোর বাচ্চা নাই । কেউ নাই আমার গর্ভে ।
আফতাবের সন্দেহ জাগে । চোখ নিচু করে ময়নার পানে সরু চোখে তাকায় । জিজ্ঞেস করে…
“ ঠিক আছো তুমি ?
দেখো , মিথ্যে বলার কিছু নেই । বললাম তো তোমাকে ভয় পেতে হবে না । তোমার সন্তান হোক , আমার কোনো আপত্তি নেই । তুমি আম্মা-আব্বা কে নিয়ে ভাবছো ? এই নিয়ে ভয় পাচ্ছো ? ওরা বলবে না কিছু । ওরা কেউ জানবে না । যখন তোমার সন্তান হবে , তখন সে আমার পরিচয়ে বড় হবে । আমাদের সন্তান হিসেবে বেড়ে উঠবে ও ।
ময়না আহত হয়ে আসলো । চোখ তুললো নির্বিকার করুন ভঙ্গিতে । আফতাবের দূর্বোধ্য মুখ পানে তাকালো । এই লোকটা আজ এসব বলছে , প্রথম দিন ও বলেছিলো । শান্তনা দিয়েছিলো ওকে । কিন্তু কই , মানতে তো পারে নি । মানতে পারলে এই কদিন ময়না কে এভাবে এড়িয়ে চলতে পারতো না । বলা টা খুব সহজ হলেও মেনে নেওয়া টা খুব কঠিন । জিভ নাড়িয়ে মুখ দিয়ে কিছু একটা উচ্চারণ করলেই হলো বুঝি ?
ময়নার হাসি আসলো । মৃদু হাসলো কান্নার মাঝে । বললো…
“ যে নাই , তারে আর কি পরিচয় দিবেন ? আমি তো কইতাছি আমি মা হমু না । যা শুনছিলেন , আন্দাজ করেছিলেন , মিথ্যা আছিলো সব । এখন সত্যি শুনতাছেন । আমি সত্যিই গর্ভবতী নই । কি কইরা বুঝলাম , এইটা নিশ্চয়ই আপনারে আলাদা কইরা বুঝাইতে হইবো না আর ?
বেশ বিজ্ঞের মতো কথা গুলো বললো ময়না । যেনো কত বুঝদার সে । আফতাব শিথিল হয়ে আসলো । তপ্ত শ্বাস ফেললো । আর কিছু জানার নেই ওর । জানার থাকলেও এই মুহূর্তে শুধানোর মতো শক্তি নেই ।
নিশ্চল হয়ে আসলো সে । শক্ত দেহ খানা আচমকা কেমন গুঁড়িয়ে গেলো । যেমনটা ঠিক সেদিন এই খবরটা শোনার পর হয়েছিল । ঠিক তেমনটাই আজ ও এই খবরটা শোনার পর একই অবস্থা হলো । এক মুহুর্তের জন্য দুহাতের তালুতে নিজের মুখখানা আড়াল করলো আফতাব । নাকের ডগায়, কপালে যে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছিল , তা উঠে আসলো হাতের তালুতে ।
হাত সরালো আফতাব । ময়নার পানে তাকাতেই ময়না দৃষ্টি সরালো তৎক্ষণাৎ । আফতাব খানিকক্ষণ কান্নার বেগে তিরতির করে কাঁপতে থাকা ময়নার লালচে মুখ খানার পানে স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল । অতঃপর দৃষ্টি সংযত করলো । বললো নোয়ানো কন্ঠ খানিক স্বাভাবিক করে…
“ ডাক্তারের কাছে যাবে ? কোনো সমস্যা আছে আর ?
ময়না ছলকে তাকায় । তৎক্ষণাৎ বলে ভড়কানো গলায়…
“ ডাক্তারের কাছে ক্যান যামু ? কোনো সমস্যা নাই । আমারে বিশ্বাস হইতাছে না আপনার ? আমার সত্যি….
“ থাক । আমি অবিশ্বাস করছি না তোমায় ।
যদি বাড়তি কোনো সমস্যা থেকে থাকে তাহলে জানতে ভুলো না । আমার কাছে ইতস্তত থেকো না । আমি স্বামী তোমার । তোমার ছোট খাটো সব বিষয়ে জানার অধিকার রাখি আমি ।
ময়না মাথা নোয়ায় । চোখ বুজে তৃপ্ত শ্বাস ফেলে ।
আফতাব আকস্মিক ওর মাথায় হাত রাখলো । চমকে তাকালো ময়না । আফতাব হাত বুলিয়ে বললো শান্ত স্বরে…
“ ঘুমাও এখন ।
কাল থেকে পড়াশোনায় মনোযোগ দেবে আবার । আমি পড়া ধরবো কাল । একটু ও ফাঁকি বাজি চলবে না । পরীক্ষার বেশি দিন নেই ।
ময়না ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল । আফতাব থেমে আবার বললো….
“ শুয়ে পড়ো । আমি আসছি ?
আফতাব কথা টুকু উচ্চারণ করলো কোনো রকমে । হাসার চেষ্টা করে দরজা খুলে দ্রুত বেরিয়ে গেলো ঘর ছেড়ে । এই মুহূর্তে হুড়ো বাতাস প্রয়োজন শরীরের উপর । দম বন্ধ লাগছে আফতাবের । সোজা বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেলো ও ।
ময়না খানিক ক্ষণ তাকিয়েই রইলো ওর যাওয়ার পথের পানে । পড়াশোনার কথা ভুললো না এই লোক ?
চোখ নামিয়ে শুয়ে পড়লো ময়না । নিজের মাঝে হাসলো কান্না গুলো কে ঢাকতে । দুহাত ভাঁজ করে রাখলো নিজের উদরের উপর । এবার আর পারলো না , বুক ফেটে কান্না আসলো । কাঁপল হাত দুটো । টপাটপ পানি গড়িয়ে পড়লো বালিশের উপর । কান্নার শব্দ বেরোতে চাইলে দুহাতে মুখ চেপে ধরলো ময়না । বাচ্চা সুলভ হৃদয়ে ছটফটিয়ে উঠলো । কুকড়ে গেলো মেয়েটা । বিড়বিড় করলো….
“ আমি আসলেই খুব খারাপ । নিজের ভালো চাইলাম । কিন্তু তোরে চাইলাম না । ক্ষমা কইরা দিস আমারে । আমি ভালো না । ভালো না আমি । আমি খুব খারাপ…
সকাল থেকে ফুলির খোঁজ মিলছে না । আতিয়া বেগম ঘুম থেকে উঠে পাশে ফুলি কে দেখতে পান নি । সকালের নাস্তায় নিচে নেমেও ফুলির পাত্তা মেলে নি । ভেবেছিলেন হয়তো বাড়িতে এদিক ওদিক কোথাও আছে । কিন্তু না , নেই ফুলি । শ্যামা ও জানে না কিছু । প্রথমে শান্ত হয়েই ফুলির খোঁজ করলো , কিন্তু ওর দেখা মিললো না । অতঃপর অস্থির হলো সকলে । সকালের নাস্তা টা কারোরই হলো না ঠিকমতো । যদিও লতিফা আর জুনাইদ নির্বিকার । বাকিরা অস্থির । সালেহা ও যথেষ্ট তৎপর । চিন্তায় পড়েছে সকলে । অন্দরে কোত্থাও নেই ।
সংগ্রাম বাইরে দারোয়ানের কাছে খোঁজ করতেই তিনি বললেন কাক ভোরে ফুলি বেরিয়ে গেছে বাড়ি থেকে । দারোয়ান প্রথমে মানা করেছিল ওকে । কিন্তু জোর খাটাতে পারে নি । ফুলি বলে গেছে সে ঘাটের দিকে যাচ্ছে । সংগ্রাম কিছুটা ভড়কালো । শ্যামা কে অন্দর ছেড়ে বেরোতে দেয়নি ও । উদ্বিগ্ন শ্যামা ঘরে থাকতে পারছে না । বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো সে । উপর থেকে সংগ্রাম কে দেখলো প্রধান ফটক পেরিয়ে যেতে ।
ছটফটে হৃদয়ে উদগ্রীব হয়ে পায়চারি করতে লাগলো শ্যামা । সংগ্রাম ঘাটের দিকটা পুরোপুরি খুঁজেছে । এতক্ষণ ধরে ঘাটে থাকার কথা নয় ফুলির । ওর দেখা মিললো না ঘাটেও । অতঃপর ফিরে এসে সোজা জিপ নিয়ে বেরিয়ে গেছে সংগ্রাম । পথে রহিম করিম কে তুলে নিয়েছে । আন্দাজ খাটিয়ে গোরস্থানে গেছে সোজা । জিপ থেকে নেমে এলোমেলো পায়ে ছুটলো ভেতরের দিকে । সারি সারি
অগনিত পিঠ উঁচু টিলা । যার আবডালে শায়িত হয়ে আছে একেকটা মরদেহ । পচে গলে মাটির সাথে মিশে একাকার সেই মাটির দেহ ।
শেষের দিকে নতুন একটা কবর । বাঁশের কাবারি দিয়ে চারদিক ঘেরা হয়েছে এই কদিন হলো ।
সংগ্রাম মাঝের রাস্তা দিয়ে সেদিকে এগোলো । কবরের ডান পাশে ঘাসের উপর কারোর অস্তিত্ব অবলোকন করে হাঁফ ছাড়লো সংগ্রাম । মুখ শক্ত করে দূর থেকে ভরাট কন্ঠে ডাকলো….
“ ফুলি ?
চমকালো ফুলি । এই শুনশান ভৌতিক গোরস্থানে আকস্মিক কোনো পুরুষের তপ্ত স্বরে ভীত নারী আত্মা কেঁপে উঠলো । সূর্য উদিত হয়েছে সেই কবেই । আজ প্রখর তীব্রতা নিয়ে হাজির হয়েছে সূর্যি মামা । ফুলির কালচে শ্যামলা চেহারা চিকচিক করছে রোদের ঝলকানিতে । ও ভেজা চোখে চমকে তাকালো পেছনের দিকে । কিছুটা দূরে সংগ্রাম কে টান টান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে স্বাভাবিক হলো । সংগ্রামের কন্ঠ ঠাহর করতে পারে নি সে । আম্মার কবরের শিয়রের কাছ থেকে উঠে দাঁড়ালো ফুলি । পুরোপুরি দৃষ্টি পাত করলো সংগ্রামের দিকে । রৌদ্রের আলোয় জ্বলছে জমিদারের সৌন্দর্য ।
তবে মুখো ভঙ্গিমা বিভৎস নিরেট । রাগান্বিত সংগ্রাম । ফুলি এগোতেই তপ্ত ধমক দিলো সংগ্রাম…..
“ এখানে কি করছো তুমি ?
উত্তরে ফুলির ইতস্তত স্বর….
“ আম্মার কবরে আইছিলাম !
“ বাড়িতে বলে এসেছো কাউকে ? একা একা কোন সাহসে এসেছো তুমি ?
রুষ্ট স্বর সংগ্রামের ।
ফুলি হাত জড়ো করে সিটিয়ে দাঁড়ালো । এদিক ওদিক চোখ বোলালো সংগ্রাম । বড় তেঁতুল গাছটার নিচে আরাকান দের আড্ডা বসে না আর । যে ভয়ে ছিলো সংগ্রাম , তেমনটা কিছুই হয় নি ।
মারপ্যাঁচ না কষে সোজা সোজি আবার বললো….
“ চলো এখান থেকে !
“ আমি আর ও বাড়িতে যামু না ছোট জমিদার ।
পা বাড়িয়ে থামলো সংগ্রাম । কপাল গুটিয়ে তাকালো ।
“ যাবে না মানে ?
“ আপনাগো বাড়িতে ক্যান যামু আমি ? আপনি চইলা যান । অনেক দিন আছিলাম আপনার আশ্রয়ে । মেলা ঋণী আমি আপনাগো উপর । আমার তো কেউ নাই । আপনি , আপনারা অসময়ে ঠাঁই দিছেন আমারে । অসময় কাঁইটা গেছে । এহন আমারে নিজের মতো থাকতে দেন । আমি আমগো বাড়িতে ফিরমু । সেইটাও একপ্রকার আপনার দেওয়া আশ্রয় । শ্যামা রে কইবেন আমার কথা । আওনের আগে ওর লগে দেহা করতে পারি নাই । পরে একদিন যামু আবার ।
ফুলির স্বাভাবিক কন্ঠ । সংগ্রামের সম্মুখে এর আগে এভাবে চটচটে হয়ে কথা বলে নি কখনো । মাথা নুইয়ে যথেষ্ট বন্দনার সহিত কথা বলেছে । আজ ভিন্ন । সূক্ষ্ম নেত্রে তাকালো সংগ্রাম । ফুলি কে পরখ করলো । তীক্ষ্ণ চোখা সংগ্রাম ভ্রু তীক্ষ্ণ করলো ।
কথা বাড়ালো না । হাঁটা লাগালো । গলা বাড়িয়ে রাশভারী কন্ঠে আদেশ করলো….
“ করিম , ফুলি কে বাড়িতে রেখে এসো ।
ফুলি খানিক অবাকই হলো । এতো সহজে সংগ্রাম ওকে ছাড়বে ভাবে নি ও । মধ্যরাতে বিতাড়িত অপমান সহ্য করতে পারে নি ফুলি । পানি খাওয়ার জন্য উঠেছিল সে । ঘরে পানি ছিলো না । পা টিপে টিপে সবে নিচে নেমেছে । অমনি সম্মুখীন হয়েছে লতিফার ।
বসার ঘরে একটাই আলো জ্বলছিলো । ফুলি হেঁশেলের দিকে এগোতেই আকস্মিক ঝটকা মেরে শক্ত করে ওর হাত চেপে ধরলো কেউ । তৎক্ষণাৎ ভড়কালেও লতিফাকে দেখে শান্ত হয়েছিল একটু । কিন্তু লতিফা ছাড়ে নি ওকে । মুখে যা এসেছে , খড়খড়ে স্বরে তাই বলেই অপমান করেছে ফুলি কে । যা নয় তাই বলেছে । তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে ছোট করেছে । খাবারের খোঁটা দিয়েছে মেয়েটা কে । ফুলি একেই ভঙ্গুর । অনুতাপ , অনুশোচনা , পরের ঘরে থেকে নিজেকে তুচ্ছ ভাবছে সে । অবমাননায় গুটিয়ে গেছে । তার উপর লতিফার এতো গুলো কথা । ও মানতে পারে নি । লতিফা এমন করে হাত মুচড়ে ধরেছিল , যে কব্জির কাছে দাগ বসে গেছে অনেকটা ।
লতিফাও এই মধ্য উঠেছিল কোনো এক কারনে । ফুলি প্রথমে তাকে লক্ষ্য করে নি । তিনি ঘরে উঠে গেলেও ফুলি ঘরে যায় নি আর । তৃষ্ণার্ত গলায় পানি টুকুও গেলে নি ।
ফজরের আজানের ধ্বনি ধ্বনিত হতেই বাড়ি ছেড়ে তীব্র অপমান বোধে বেড়িয়ে এসেছে ও । গুঁড়িয়ে আসা পা দুটোকে টেনে সোজা এসে আছড়ে পড়েছে মায়ের কবরের উপর । কবর খানা আঁকড়ে ডুকরে কেঁদে কেঁদে অভিযোগ করেছে হাজার । দুনিয়াতে যার মা নেই , তার কাছে পুরো দুনিয়া থাকলেও সেই দুনিয়ায় বাঁচার স্বাদ ক্ষুন্ন হয়ে যায় । ফিকে হয়ে যায় জীবন ।
ফুলির তো কেউই নেই । ওর বাঁচার স্বাদ ক্ষুন্ন নয় , তিক্ত হয়ে গেছে একেবারে । বিতৃষ্ণা এসেছে জীবনের প্রতি ।
বর্তমান___
রহিম কে সাথে করে গোরস্থান ত্যাগ করেছে সংগ্রাম । জিপ নিয়ে গেছে সাথে । এদিকে করিম মহা বিরক্ত । এই মেয়েটার ভার পড়লো ওর কাঁধে !
আশেপাশে এতো গুলো কবরের মাঝে নির্ভয়ে ফুলি কে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কর্কশ স্বরে খেকিয়ে উঠলো করিম…
“ ঐ ফুলকপি , এমনে দাঁড়ায় আছো ক্যান । ভয় ডর নাই কলিজায় ? আও আমার লগে । চাঁন্দে পাঠায় আসি তোমারে । জমিদারের ভোগ বিলাস পছন্দ হইলো না , সইলো না চামড়ায় । এহহহ্ , এহন যাইবো ঘর পোড়া একখান বাড়িত । কেডায় আছে ঐ বাড়িতে তোমার ?
ফুলি মুখ কুঁচকালো । উত্তর করার প্রয়োজন বোধ করলো না । মুখ বাঁকালো করিম । আবার বললো..
“ এহনো খাঁড়ায় আছো ? লগে আও জলদি । বাড়িত ফেলায় আসি তোমারে ।
“ লাগবো না আপনারে । আমি পথ দেখছি , একলা যাইতি পারমু আমি ।
“ ও বাবা । মুখের উপর কথা কও ? সাহস তো কম না । তুমি জানো আমি কেডা ?
“ করিম নাম আপনার !
ফুলির তৎক্ষণাৎ ভেঙ্গানো উত্তরে হতভম্ব হলো করিম । চোখ মুখ খিচে ঝাড়ি মারলো…
“ ঐ মাইয়া চুপ । মুখের চোপা দেখাও ? কান্দোনের সাথে সাথে নাক দিয়া পানি বাড়াইতাছে,হেইডা মুছো আগে । হটো জলদি , সময় নাই আমার ।
ফুলি ভিমড়ি খেয়ে তাৎক্ষণিক নাকে হাত দিলো । কপাল গুটিয়ে নিলো পরমুহূর্তে । কোথায় নাক দিয়ে পানি পড়ছে ওর ?
বাড়িতে এসে সোজা উপরে উঠেছে সংগ্রাম । শ্যামা বিচলিত, উৎকন্ঠিত । পা স্থির হচ্ছে না ওর । ধড়ফড় করছে বুক । সংগ্রাম দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকতেই চকিতে তাকালো শ্যামা । হাঁফ ছেড়ে দ্রুত কদমে এগিয়ে আসলো । উদ্বিগ্নতায় শুধালো হাঁসফাঁস করে…
“ ছোট জমিদার সাহেব ? ফুলি , ফুলি কোথায় ?
সংগ্রাম স্বাভাবিক মুখো ভঙ্গিমা । শিথিল চোয়াল । ও বললো সহসা….
“ চিন্তা নেই বেগম , ফুলি বাড়িতে গেছে ।
“ কখন ?
“ এখনই ! তুমি ও চলো ।
“ কোথায় ?
“ ওর কাছে !
“ আমি যাবো ?
“ হুম । এক্ষুনি । একটা গুরুত্বপূর্ণ কার্য সম্পাদন করতে হবে এখন । তুমি আর আমি মিলে করে আসি চলো ।
সংগ্রাম শ্যামা কে বেশি কিছু বলতে দেয় নি । তাড়া দিয়ে ঝটপট ওকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে জমিদার বাড়ি থেকে । শ্যামা বুঝলো না কিছু । সংগ্রাম কে শুধালো ও না আর কিছু । শুধালেও উত্তর করবে না সংগ্রাম । এটা শ্যামার অজানা নয় ।
রহিম কে অন্য কোথাও পাঠিয়েছে সংগ্রাম । ও নিজে জিপ চালিয়ে সোজা মাধবপুরের দিকে রওনা দিলো শ্যামা কে সাথে করে । গাড়ির দ্রুত গতিতে গ্রামে পৌঁছাতে সময় লাগলো না । সূর্যি ধীরে ধীরে মাথার উপর উড্ডয়ন হচ্ছে । প্রখর তাপ বাড়ছে ধরনীতে । পুরোপুরি চোখ মেলে রাখা দায় হয়ে পড়েছে রৌদ্রের চরম তীব্রতায় ।
ধরলার পাশে সেই ছোট্ট কুটিরের বাইরে গাড়ি থামলো । ভেতরে কেউ নেই । সংগ্রাম গাড়ি থেকে নেমে শ্যামা কে নামালো । পূর্বাহ্নে যে যার কাজে মগ্ন । কিছু মহিলা নদীর তীরে কাপড় কাচায় ব্যস্ত । গাড়ির শব্দে তারা নিচ থেকে চোখ তুলে চাইলো । এই গাড়ির শব্দ সাত গ্রামের সব মানুষের চেনা । মহিলারা সংগ্রাম জোয়ার্দার আর তার বেগম কে দেখে চাওয়া চাওয়ি করলো একে অপরের দিকে । ঘটনা বোঝাতে ভ্রু নাচালো একে অপরকে । হঠাৎ আজ তাদের জমিদারের এখানে আসার হেতু আন্দাজ করতে পারলো না কেউই ।
বাড়ির ভেতরে কেউ নেই । নড়বড়ে দরজায় একটা তালা ঝুলছে । সংগ্রাম এদিক ওদিক তাকালো । ফুলি এখনো বাড়িতে আসে নি ! করিম ফুলি কে নিয়ে আসে নি এখনো । খোলা আকাশে রোদের নিচে দাঁড়িয়ে না থেকে শ্যামা কে নিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকলো সংগ্রাম । রান্না ঘরের ছোট্ট ছাউনী টার নিচে দাঁড়ালো । মোলায়েম কন্ঠে ডাকলো….
“ বেগম ?
অন্যদিকে মনযোগ ছিলো শ্যামার । সংগ্রামের ডাকে চমকে উত্তর করলো ও …
“ হুম ।
সংগ্রাম স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে । শ্যামার মুখ পানে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ । চোখ উপর নিচ করে আগা গোড়া পুরোটা পরখ করলো শ্যামা কে । শ্যামার মাঝে বিশাল পরিবর্তন এসেছে । বেশ লক্ষ্য করছে সংগ্রাম । সংগ্রাম শ্যামার হাতে হ্যাঁচকা টানে ওকে টেনে নিলো নিজের কাছে । ঠোঁট চেপে শুধালো….
“ কি ব্যাপার বলো তো বেগম ? এতো সুন্দর হচ্ছো কেনো দিন দিন ?
নিজেকে সামলে কপাল গুটিয়ে ফেললো শ্যামা । সংগ্রামের চাহনি বুঝে বললো নিজের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে….
“ কি সব বলছেন ? আমি যেমন ছিলাম তেমনই আছি । আপনার এসব ছল চাতুরির আশ্রয় বুঝবো না ভেবেছেন ? ছাড়ুন, কেউ দেখে ফেলবে ।
“ দেখুক । আমিও দেখি আমার বেগম কে । তার সৌন্দর্যের রহস্য নিয়ে সন্দেহ হচ্ছে আমার । ব্যাপার কি বেগম ?
একই ফিচেল স্বর । শ্যামা মুখ বাঁকায় । ভেংচি কেটে বলে…
“ আপনি আসলেই বেহায়া হয়ে যাচ্ছেন ছোট জমিদার সাহেব । কতবার বলবো এসব আচার আচরণ,কথা বার্তা মানায় না আপনার সাথে । ভুলে যাবেন না , আপনি এখন সাত গ্রামের জমিদার । সবাই তাদের জমিদার কে এভাবে দেখলে কি ভাববে ?
“ কারোর ভাবনায় আমার কিছু যায় আসে না , এটা আমি তোমাকে কতবার বলবো বলতো ?
“ হয়েছে ছাড়ুন এখন । ওনারা এদিকেই দেখছেন ।
দূরের নদীর ঘাট থেকে উঠে আসা মহিলাদের ইশারা করে চাপা স্বরে বললো শ্যামা । সংগ্রাম পরোয়া করলো না । শ্যামা কে আরো বেশি চেপে ধরলো । মহিলারা নিজে থেকেই লজ্জায় দৃষ্টি সরালেন । দ্রুত চোখ ফিরিয়ে জায়গা ত্যাগ করলেন তারা । সংগ্রাম বললো খানিক অবাক হাওয়ার ভান ধরে….
“ আমি তোমাকে ভালোবাসছি , তুমি লজ্জা পাও , এটা স্বাভাবিক । কিন্তু ওনাদের কি হলো ? ওনারা কেনো লজ্জা পেলেন বলতো ?
“ আপনার লজ্জা নেই দেখে কি কারোরই লজ্জা নেই !
করিম আর ফুলির দেখা মিললো দূরে । সংগ্রাম ওদের দেখে স্বাভাবিক হয়ে শ্যামা কে ছাড়লো । মুখো ভঙ্গিমা দৃঢ় করলো । বাড়ির সামনে ফুলি কে রেখে চলে যেতে নিচ্ছিল করিম । অমনি সংগ্রাম কে দেখে থমকে গেলো । সংগ্রামের পাশে শ্যামা কে দেখে অবাক হলো আরো বেশি ।
পুরো রাস্তা সে ফুলি কে হাঁটিয়ে নিয়ে এসেছে । ফুলি চরম বিরক্ত এতে । ওর বিরক্তি টুকুও মিলিয়ে গেলো করিমের দৃষ্টি অনুসরণ করে শ্যামা কে দেখার পর । কপাল শিথিল করে বাড়ির ভেতরে ঢুকলো ওরা । করিম শুধালো প্রথমেই…
“ জমিদার সাহেব , আপনি এইহানে ?
“ এতোক্ষণ লাগলো কেনো আসতে ?
পাল্টা প্রশ্নে খড়খড়ে স্বরে ফুলি কে কটাক্ষ করে উত্তর করলো করিম….
“ এই খুমনি মাইয়া হাঁটতে পারে না । না খাইয়া, না খাইয়া চেহারা বানাইছে কাকতাড়ুয়ার নাকান । হেতি পা চালাইতে পারে না জোরে । এই লাইগা দেরি হইলো । কিন্তু আপনি এইহানে ?
“ দরকার আছে তাই এসেছি । অপেক্ষা করো , জানতে পারবে ।
ঘরের দরজা খুলে দিয়েছে ফুলি । সে কিচ্ছুটি বলে নি নিজে থেকে । শ্যামা ওর সাথে ঘরে ঢুকলো । শ্যামার বসার জন্য চৌকিটা ঝেড়ে দিলো ফুলি । ফুলির আচরণে হতভম্ব হচ্ছে শ্যামা । ও যথাসম্ভব শ্যামা কে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে । চোখে চোখ রাখছে না । তাকাচ্ছে না শ্যামার দিকে । শ্যামা সহ্য করতে না পেরে শুধালো….
“ ফুলি , কি হইছে তোর ? কথা কইতাছোস না ক্যান আমার লগে ? এমনে এড়ায় যাইতাছোস ক্যান আমারে ? সকালে অমনে কাউরে না বইলা কইয়া চইলা আইলি , জানোস কতটা ভয় পাইছিলাম আমি ?
ফুলি হাসার চেষ্টা করলো শুধু । কথা এড়িয়ে যেতে হাতে পানির জগ তুলে বললো…
“ ব , আমি পানি লইয়া আহি ।
বলেই বেরোলো ঘর থেকে ।
ফুলি কে কলপাড়ের দিকে এগোতে দেখে সংগ্রাম বাঁধা দিয়ে ডাকলো ওকে । করিম কে আদেশ করলো….
“ পানি নিয়ে এসো যাও ।
অবিশ্বাসে শুধালো করিম …
“ আমি ?
“ হুম ।
ফুলির হাত থেকে ঝাড়া মেরে জগটা নিয়ে মুখ বাঁকিয়ে পানি আনতে গেলো করিম । এর মধ্যেই রহিম এসেছে । সাথে আরো কজন । পরিচিত অনেকে ।
সাদা জুব্বা পরিহিত মৌলভী সিকিমের একজন । এই হুটহাট সময়ে এনাকেই জোগাতে পেরেছে রহিম । রহিমের ঠোঁটে চওড়া হাসি । করিম কে দেখে আরো বেশি দাঁত কেলালো ও ।
করিমের হাতে এখনো সেই পানির জগ । সংগ্রাম ভরাট কন্ঠে আকস্মিক বলে উঠলো….
“ করিম , তোমার বিয়ে দেবো ফুলির সাথে ।
ঠাস করে হাত থেকে পিতলের জগটা ফসকে পড়ে গেলো মাটিতে । চোখ বড় বড় করে চাইলো করিম । মুখ ফাঁক হয়েছে আপনা আপনি । মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো ওর । নিজের কান কে অবিশ্বাস করে সংগ্রামের পানে অবিশ্বাস্য নয়নে তাকিয়ে রইল ও ।
ফুলি পাশেই ছিলো । ধক্ করে উঠলো ও ।
রহিম ওর ভাইয়ের অবস্থা দেখে ঠোঁট কামড়ে হাসলো ফিক করে । করিম অবিশ্বাসে বুলি ফুটায়….
“ এ্যাহহহহ , বিয়া ?
“ হুম , এক্ষুনি ! সব কিছু তৈরি , উপস্থিত , এখন শুধু বিয়ে হবে । এই খুমনি কাকতাড়ুয়া টাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে খাইয়ে দাইয়ে চেহারা বাড়িয়ে দিও একটু ।
করিম ছলকে তাকালো ফুলির দিকে ।
“ আমি এরে বিয়া করুম ? এই মাইয়ারে ?
“ হুম ! কোনো আপত্তি আছে ! আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি এটা , আমার সিদ্ধান্তের উপর কথা আছে কোনো ?
“ জমিদার সাহেব , আমি…
“ কি আমি ?
করিমের আপত্তি সূচক শব্দরা গলায় জড়িয়ে যায় । সংগ্রামের মুখের উপর কথা বলা দুঃসাধ্য ওর কাছে । করিম আমতা আমতা করলো । বললো….
“ বিয়া করলে আমার আম্মা আমারে বাড়ি ছাড়া করবো । বাইর কইরা দিবো বাড়ি থাইকা ।
“ ও নিয়া তোরে ভাবতে হইবো না । আমি আম্মারে বুঝাইয়া কমু । আর জমিদার সাহেব তো আছেই । তুই খালি ভাবির নামে কবুল টা পইড়া ফেলা ।
রহিমের টিটকারী স্বর । ও ভীষণ মজা পাচ্ছে করিমের অবস্থা দেখে । এই কালো মেয়েটার সাথে বিয়ে হবে করিমের । ও সবসময় খোটা দিতে পারবে করিম কে ।
করিমের চরম আপত্তি এতে । কিন্তু আপত্তি প্রকাশের সাধ্য নেই । সংগ্রামের বিরুদ্ধ চারন করতে পারবে না ও । সংগ্রামকে অন্ধের ন্যায় মান্য করে সে ।
রাত্রি এগারোটা পেরিয়েছে । বাড়িতে মোটে তিনটে মানুষ । দু’জন ঘুমিয়ে গেছে । একজন জাগ্রত এখনো ।
নিচে বসার ঘরে আলো জ্বলছে । রান্না ঘরেও জ্বলছে । ঠুকঠাক শব্দ হচ্ছে পাতিলের । সুরবালা আর শায়লা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন । ঘুমের ঔষধ খেয়ে ঘুমিয়েছেন শায়লা । ঝড় বয়ে গেলেও টের পাবেন না তিনি ।
সুরবালাও নিশুতি ঘুমে টাল । বেঘোরে ঘুমোচ্ছে সে । একমাত্র জেগে আছে অংকুর । সে রান্নাঘরে । আজ প্রথম বার রান্না ঘরে রান্নার উদ্দেশ্যে পা পড়েছে ওর । দ্বিতীয় প্রহরের শেষ প্রায় । বৈদ্যুতিক চুলার আঁচে রান্না হচ্ছে কিছু । মিষ্টি একটা গন্ধ পুরো রান্না ঘর জুড়ে ।
অংকুর চুলার আঁচে রাখা পাতিলে ঢাকনা চাপিয়ে অধীর আগ্রহে বুকে হাত গুটিয়ে অপেক্ষায় আছে । দৃষ্টি মেঝেতে নিবদ্ধ । কিছু ভাবনায় মগ্ন সে ।
ঝাঁকড়া চুল কপালে এলোমেলো । চোখ ঢেকে গেছে চুলে । অনেকক্ষণ যাবৎ এভাবেই আনমনা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অংকুর । নিজেকে নিয়ে ভাবছে সে । ভাবছে নিজের কার্যকলাপ সম্পর্কে । কি করছে ও এসব ? এতো রাতে এসব করার মানে কি ? ও কি এসব পারে ? রান্নার নির্দেশিকা বইয়ে দুবার চোখ বুলিয়ে এসব রাঁধা যায় নিখুঁত ভাবে ? অংকুর নিজেকে নিয়ে সন্দিহান ।
নিজের অলৌকিক, আকস্মিক পরিবর্তন নিয়ে বিব্রত সে । মন খচখচ করে মাঝে মাঝে নিজেকে দেখলে । সে তো এমন নয় , তাহলে এমন হলো কেনো ? এমন স্বাভাবিকতা অস্বাভাবিক ওর কাছে । আগে অন্তত ও এসবে বিমুখ ছিলো । অনাগ্রহী ছিলো তীব্র রুপে । তাহলে এখন এমন হুটহাট অনুরক্ত হওয়ার অর্থ কি ? এভাবে সদয় হলো কেনো অংকুর ?
সুরবালা কে দেখে ? শুধু দেখেই এতোটা পরিবর্তন ? এতোটা উন্মুখতা ? বালা তো ওকে চায় না , অন্য কাউকে মন কোঠরে পুষে রেখেছে এখনো । তবুও বালার প্রতি কেনো রাগ আসে না অংকুরের ?
অংকুর নিমগ্ন নিজের চিন্তা ধারার ঘোরে । চোখে পলক পড়ছে অনেকটা সময় পরপর । দীর্ঘ একটা শ্বাস টানতেই কপাল কুঁচকে আসলো অংকুরের । নাকের ভিতরে পোড়া গন্ধ হানা দিতেই ছলকে উঠলো । বিবাগি মন দূরে ঠেলে ধক্ করে তাকালো চুলার দিকে । ধোঁয়া উঠছে । পোড়া গন্ধ সেখান থেকেই । অংকুর আঁতকে উঠে তড়িঘড়ি করে পাতিলের ঢাকনা সরাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো । পিতলের গরম ঢাকনা হাত দিয়ে ধরতেই গরমের তীব্রতা সহ্য করতে না পেরে ঝনঝনিয়ে ঢাকনা টা মেঝেতে ফেললো অংকুর । সেদিকে খেয়াল না দিয়ে দ্রুত চুলা ছেড়ে পাতিল নামালো খালি হাতে । গরম লাগলেও পরোয়া করলো না । পাতিলের ভেতরে পায়েস রান্না হচ্ছিলো । দুধের সাদা পায়েস এতক্ষণ জ্বাল পেয়ে পুড়ে গিয়ে লালচে বাদামি বর্ণ ধারণ করেছে ।
সেদিকে তাকিয়ে মুখে বিরক্তি সূচক শব্দ উচ্চারণ করলো অংকুর । বিরক্তিতে কপালে আঁচড়ে পড়া ঝাঁকড়া চুল একহাতে ঠেলে সরালো । কতো সাধ করে একটা পরিকল্পনা করলো সে । সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী না পারা সত্বেও এই পায়েস রাঁধতেও উদ্যত হলো ।
শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৫০
আজ যে সুরবালার জন্মদিন । ২৪ শে চৈত্র । রাত বারোটা বাজতে চললো । একটু বেখেয়ালে হওয়ার জন্য নষ্ট হলো সব । নিজের প্রতি নিজেই প্রচন্ড বিরক্ত হলো অংকুর । ঘাড় ডলে পাতিলটার দিকে তাকালো । কেমন বিদঘুটে দেখাচ্ছে পায়েসের রং । একটুই রান্না করার পরিকল্পনা ছিলো । শুধু সুরবালার জন্য । পাতিলের তলানিতে ঠেকেছে পুড়ে যাওয়া দুধ-চাল ।
মিষ্টি কিছু পুড়ে যাওয়ার গন্ধ ছড়িয়েছে । একই সময়ে আরো একটা উদ্বিগ্ন মিষ্টি চিকন কন্ঠস্বর ভেসে আসলো….
“ একি ? এতো রাতে এখানে কি করছেন আপনি ?
