শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৫১ (২)
সুরভী আক্তার
চমকালো অংকুর । ছ্যাত করে পিছু ফিরলো ।
রান্না ঘরের দরজার কাছে কোমরে হাত ঠেসে কপাল কুঁচকে সরু চোখে তাকিয়ে আছে সুরবালা । সদ্য ঘুম ছুটে যাওয়ার রেশ স্পষ্ট চেহারায় । চোখে কাতরতা এখনো ।
অংকুর অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়লো । সুরবালা চোখ তীক্ষ্ণ করলো অধিক । ফের বললো ভরাট কন্ঠে…
“ এতো রাতে কি করছেন এখানে ?
অংকুর ভ্যাবাচ্যাকা খায় । দৃষ্টি ফেরায় । পাতিলের ঢাকনা মেঝেতে পড়ার শব্দে সুরবালার ঘুম ছুটে গেছে তা বুঝতে বাকি নেই ওর । দাঁতে দাঁত চাপলো অংকুর । পাতিল টাকে গা ঢাকা দিয়ে দাঁড়ালো । কি ভাবলো, আর কি হলো ? সব পরিকল্পনা জলে গেলো ওর । ভেবেছিল একটু কিছু করে সুরবালা কে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাবে । সেই একটু কিছুই পুড়ে গেলো ।
অংকুরের উত্তর পেলো না সুরবালা । ও এদিক ওদিক তাকালো । শুধালো কন্ঠ নরম করে…
“ খিদে পেয়েছে আপনার ?
“ নাহ ।
সহসা ভরাট কন্ঠে উত্তর করলো অংকুর ।
“ তাহলে এখানে কি করছেন ?
“ কিছু না , ঘরে যাও তুমি ! উঠেছো কেনো ?
“ বাহ রে , নিজে বিকট শব্দ তুলে ঘুম ভাঙ্গালেন আমার । এখন জিজ্ঞেস করছেন উঠেছি কেনো ? কটা বাজে দেখেছেন ? আপনি এখনো ঘুমান নি কেনো ? না ঘুমিয়ে এতো রাতে রান্না ঘরে কি করছেন আপনি ? কি চাই এখানে ?
“ বললাম তো কিছু না । যাও তুমি ।
খানিক শক্ত ঠেকলো কথাটা । একেই নিজের প্রতি বিরক্ত অংকুর । তার উপর সুরবালার খবরদারি ।
সুরবালা কথা না শুনে এগিয়ে আসলো । পোড়া গন্ধ নাকে বিঁধেছে অনেক আগেই । ও সোজা অংকুরের পিছনের পাতিল টার দিকে তাকালো । অমনি হা বনলো । অস্ফুটে বললো…
“ কি করেছেন এসব ?
এসব কি ?
আর চেপে রাখতে পারা গেলো না । উত্তর করলো অংকুর…
“ পায়েস !
“ পায়েস ? এগুলো পায়েস ?
কোন দিক থেকে এগুলো পায়েস মনে হচ্ছে ?
“ পুড়ে গেছে !
সুরবালার চোখের দিকে তাকিয়ে শীতল কন্ঠে বলল অংকুর । সুরবালা মুখ শিথিল করলো । শান্ত হয়ে বললো….
“ পায়েস খেতে ইচ্ছে হয়েছে , আমাকে বললেই পারতেন ! এভাবে একা একা মাতব্বরি করতে এসেছেন কেনো ? আমি পায়েস বানাতে পারি । সংগ্রাম জোয়ার্দারের জন্মদিনে মামি যখন পায়েস বানাতো , তখন আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম । শিখে গেছি । একবার বানিয়েও ছিলাম সংগ্রাম জোয়ার্দারের…..
বাকি কথা গলায় আটকালো । আপন খেয়ালে বলতে নিচ্ছিল এসব কথা । অংকুরের নীরব চাহনিতে চোখ পড়তেই থেমে গেলো সুরবালা । জবানে বাঁধ টানলো । ঢোক গিললো সে । চোখে ঘন পলক ফেলতেই অংকুর চোখ সরালো ওর থেকে । ঠোঁটের কোণে নীরবে নিজেকে উদ্দেশ্য করে তাচ্ছিল্যের হাসি ফোটালো অংকুর । মুখ ফিরিয়ে নিলো । সুরবালা নিজেকে ধাতস্থ করে প্রসঙ্গ পাল্টালো গলা ভিজিয়ে নিভু স্বরে….
“ নাহহ , শুনুন !
আমি পায়েস রাঁধতে পারি । বানিয়ে দেবো ? খাবেন ?
“ প্রয়োজন নেই !
“ কেনো ?
“ পায়েস টা আমার জন্য ছিলো না । তোমার জন্য ছিলো । সেদিন বলেছিলে ২৪ চৈত্র তোমার জন্মদিন । বারোটা বেজে গেছে , আজ ২৪ চৈত্র । হঠাৎ মনে পড়েছিল তারিখটা , ভাবলাম একটু শুভেচ্ছা জানাই তোমায় । খালি মুখে শুভেচ্ছা জানাই কি করে ! মা আমার জন্মদিনে পায়েস বানায় । তাই তোমার জন্যেও বানানোর চেষ্টা করেছিলাম একটু । কিন্তু হলো না । পুড়ে গেছে ।
হতবাক হয় সুরবালা । চাহনি হয়ে আসে অবিশ্বাস্য ।
দৃষ্টি নরম । সুরবালা তাকায় পায়েসের পাতিল টার দিকে । অংকুর কথা শেষ করে চলে যেতে নিলো । তৎক্ষণাৎ পিছন থেকে ওর হাত টা টেনে ধরলো সুরবালা । চকিতে তাকালো অংকুর । প্রথমেই নিজের হাতের দিকে , অতঃপর সুরবালার দিকে । সুরবালা বললো মোলায়েম কন্ঠে….
“ আমার জন্য পায়েস রান্না করছিলেন আপনি ?
সুরবালার হাতটা নিজের হাত থেকে ছাড়িয়ে দেয় অংকুর । দায় সারা জবাব দেয়…
“ হুম ।
বলেই পা বাড়াতে গেলে ফের টেনে ধরলো সুরবালা । বিরক্ত হলো অংকুর । পিছু ফিরে কন্ঠ উঁচিয়ে ধমক দিলো…
“ সমস্যা কি তোমার ? বারবার হাত টেনে ধরছো কেনো ?
চমকালো সুরবালা । পিছিয়ে গেলো হাত ছেড়ে ।
অংকুরের মুখো ভঙ্গিমা নিরেট । চোখের দৃষ্টি তীর্যক । চোখ নামিয়ে নিলো সুরবালা ।
অংকুর সম্বিতে ফেরে সুরবালা কে দেখে । চোখ বুজে নিজেকে সংবরণ করে হাত মুঠো করে ডাকে….
“ সুরবালা !
আমি ঘরে যাচ্ছি । মাকে বলবো , কাল পায়েস বানিয়ে দেবে তোমার জন্য ।
“ আমি এই পায়েসটা খাবো !
কপাল কুঁচকালো অংকুর ।
“ পুড়ে গেছে ওটা ।
“ যাক তবুও খাবো ।
পাশ থেকে একটা চামচ নিয়ে একটু পায়েস তুললো সুরবালা । চটপট মুখে তুললো সেটুকু । সহসা মুখে প্রগাঢ় উৎসুকতা ফুটালো । পায়েস টুকু গিলে বললো উৎফুল্ল হয়ে…
“ বাবড়ি ওয়ালা , এটা পায়েস ?
পুড়ে যাওয়া পায়েসের এতো স্বাদ । পুরো ভিন্ন স্বাদের পায়েস । খেয়ে দেখুন , লা জবাব হয়েছে । বেশ ভালো খেতে , এই নিন , খেয়ে দেখুন !
বলতে বলতে আরেক চামচ তুলে ধরলো অংকুরের সম্মুখে । ওকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে খাইয়ে দিল পায়েস টুকু । খেয়ে মুখ কুঁচকালো অংকুর । স্বাদটা অদ্ভুত !
বালা হাসি সমেত ভ্রু নাচিয়ে শুধালো…
“ বেশ মজা ,তাই না ?
অংকুরের কুঁচকানো মুখে চেয়ে । ঠোঁট চেপে হাসলো সুরবালা । আরেক চামচ তৃপ্তি করে খেলো নিজে । ফের বললো…
“ বেশ ভালো রেঁধেছেন বাবড়ি ওয়ালা । রং মিস্ত্রীর কাজ ছেড়ে একটা খাবারের হোটেল দিতে পারেন । এমন রান্না দুষ্কর আজকাল । অদ্ভুত হলেও স্বাদটা বেশ ভালো । বিক্রি বাট্টা ভালো হবে দেখবেন ! আমিও আপনার সাথে আছি ।
অংকুর কপাল গুটিয়ে খানিক হেসে ফেললো সুরবালার মশকরা বুঝে । অংকুর কে হাসতে দেখে ঢোক গিলে হাঁফ ছাড়ল সুরবালা । সেও হাসলো তাল মিলিয়ে । অংকুরের ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা একটা চালের দানা নির্দ্বিধায় হাত বাড়িয়ে মুছিয়ে দিলো ।
তাজ্জব বনলো অংকুর । সুরবালা তাড়া দিলো…
“ চলুন । ঘুম পাচ্ছে । বাকি টুকু কাল খাবো ।
সকাল সকাল থমথমে মুখে ঘরের দরজার চৌকাঠে বসে আছে করিম । মুখ কাচুমাচু খানিক । ফুলিকে এক প্রকার বাধ্য হয়ে বিয়ে করেছে সে । সংগ্রাম নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে দিয়েছে । ফুলি কে নিজের সিদ্ধান্ত জানানোর সুযোগ টুকুও দেয় নি । আর করিম তো সিদ্ধান্ত জানানোর সাহসই পায় নি । দু’জনেই জোর পূর্বক বাধ্য হয়েছে বিয়ের জন্য । সংগ্রাম ওদের দুটোর বিয়ে দিয়ে বাড়িতে রেখে গেছে নিজ দায়িত্বে । করিমের মা মফিলা বেগম কে মানিয়েছে সংগ্রাম । করিমের বাবা নেই । মা বেশ ঝগরুটে , রগচটা স্বভাবের । খেই খেই করে সবসময় । সংগ্রাম ওদের রেখে চলে যেতেই খ্যাক খ্যাক করে করিম কে চেপে ধরেছিলেন মফিলা বেগম । এতো বড় ছেলে কে দু’ঘা বসাতেও দ্বিধা করেন নি । এই বয়সেও মায়ের হাতে মার খেয়ে খেয়ে অভ্যস্ত রহিম করিম । ওদের মা কেমন , তা ওদের হাড়ে হাড়ে জানা । বাকিরা ওদের ভয় পায় , আর ওরা ভয় পায় ওদের জল্লাদ মাকে । কাল থেকে করিম কে বাড়িতে খেতে দেন নি মফিলা বেগম । ফুলি পরের ঘরের মেয়ে । ওর উপর খবরদারি করতে বাঁধছেন তিনি । তার উপর জমিদার সংগ্রাম জোয়ার্দার নিজে দাঁড়িয়ে থেকে এই মেয়েটার সাথে বিয়ে দিয়েছে করিমের । ফুলি কে তেমন কিছু বলেন নি তিনি । তবে ভেতর ভেতর চটে আছেন মারাত্মক । ফুলি কে একটুও পছন্দ হয় নি তার । কারনটা গায়ের রং কালো । করিম ও কালো , কালোয় কালোয় ঘর পেতেছে ।
তবে ফুলির নিশ্চল মলিন চেহারা দেখে খানিক মায়া করেছেন মফিলা বেগম । শুনেছেন মেয়েটার মা মারা গেছে কদিন আগে । এই দুনিয়ায় আর তার কেউ নেই । এজন্যই ওর একটা গতি করে দিয়েছে সংগ্রাম জোয়ার্দার ।
ফুলি ঘরে । কাল থেকে মুখে টু শব্দও উচ্চারণ করে নি । সংগ্রাম নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছে ওর উপর । ও বাঁধা দিতে পারে নি । বরং গুঁড়িয়ে গেছে আরো ।
করিম বাইরে খেয়েছে কাল । আজ সকাল সকাল পেট চুইচুই করছে খিদের চোটে । পেট চেপে দরজার কাছে বসে আছে ও । ঘুমিয়েও শান্তি হয় নি ও ফুলকপির জন্য । মাটিতে শুতে হয়েছে ওকে ।
রহিম আজ ছাড় পেয়েছে । কাল থেকে বেশ প্রফুল্ল ও । করিম কে ওভাবে দরজার চৌকাঠে কাঁচুমাচু হয়ে বসে থাকতে দেখে এগিয়ে আসলো রহিম । খ্যাট খ্যাট করে হেসে উঠলো । করিম চোখ সরু করে তাকাতেই ভ্যাঙালো রহিম…
“ কি হে কালার জামাই । বিয়ার পরদিন এমনে বইয়া আছোস ক্যান ? বউ পিডাইছে বাসর রাইতে ? আম্মার হাতে মাইর খাওয়ার পর শেষ রাইতে বউয়ের হাতে মাইর খাইছোস ?
বলেই হো হো হেসে উঠলো রহিম । কটমট করে তাকালো করিম ।
“ ওরে খাসি , হাসতাছোস ক্যান এমনে । আম্মার কানে তোর হাসি গেইলে সব দাঁত উপড়ায় ফেলবো একদম । ডাকমু আম্মারে ?
অমনি হাসি থামিয়ে চুপসে গেল রহিম । একেই কাল থেকে বেজায় চটে আছেন মফিলা । রহিম গলা ঝাড়লো । চাপা কন্ঠে বলল ভ্রু উপরে তুলে…
“ সম্মানিয় বড় ভাই , কাইল থাইকা আম্মা আপনেরে কিচ্ছু খাইতে দেয় নাই । কেমন বোধ করতাছেন আপনি ?
তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো করিম । ঝটকা মেরে উঠে দাঁড়ালো । তেড়ে গেলো রহিমের দিকে….
“ তোরে তো খাইছি আমি । খাঁড়া রে দামড়া….
রহিম ছাড়লো না ।
মুখ ভেংচি কাটলো ।
“ এহহ্ , কালার জামাইয়ের তাল দেখো !
আমারে তেজ না দেখাইয়া বউরে গিয়া দেখা ! পাইছোস তো কালা একখান বউ । আমি ভাই সুন্দর দেইখা একখান মাইয়ারে বিয়া করুম । অমন , কালা বউ নিমু না আমি । আমার বউ হইবো ধলা সুন্দরী…
“ তোর মতো কালা খাসিরে ধলা সুন্দরী বউ দিবো কেডায় ? আমার কালা হইলেও তো একখান বউ জুটছে , তোর তো হেইডাও নাই ।
“ আমি তোর থাইকা এক বছরের ছোট । এইডা ভুইলা যাইতাছোস ক্যান ? আমার বিয়া করোনের বারো মাস বাকি আছে এহনো । বারো মাস পর একখান ফটফটা মাইয়া দেইখা রঙ্গ কইরা বিয়া করুম আমি । তুই দেখবি আর জ্বলবি । তেল পিঠার মতো ফুলবি…
“ বারো মাস পরের ঘটনা পরে দেখা যাইবো । এহন তুই দেখ আর জ্বল । তেল পিঠার মতো ফোল ।
খাঁড়া এইহানে , আমি আমার বউটারে চুম্মা দিয়া আহি কয়ডা । চুম্মা দেওনের লাইগা বউ পাইছি একখান । তোর তো হেইডাও নাই । নিজের গালে নিজেই চুমা দে রে পাঠা । আমি যাই আমার বউয়ের কাছে ।
বলেই ফিচেল হেসে ঘরে ঢুকলো করিম । পিছু ফিরে রহিম কে দেখে মুখ বাঁকিয়ে খট করে মুখের উপর দরজা লাগিয়ে দিলো । তব্দা মেরে দাঁড়িয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল রহিম ।
পরমুহূর্তে নেত্র যুগল সুক্ষ্ম করে ফোঁস করে শ্বাস ফেললো । গলা উঁচিয়ে খড়খড়ে গলায় আওয়াজ তুললো….
“ আম্মা, তোমার বড় পোলায় দিন দুপুরে রঙ্গ করতাছে । দেহো , দরজা আটকাইছে এই দিনের বেলা ! আমার লুঙ্গি হেতির ঘরে আছে , আমি চাইতাছি কিন্তু দিতাছে না । ডাকতাছি , শুনতাছেও না । হুনতাছো আম্মা…..
ফুলি রহিমের উঁচু কন্ঠে ঘরের ভেতর থেকেই ভ্যাবাচ্যাকা খেলো খানিক । করিম দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে ছিলো । ঠাস করে দরজা খুললো রহিমের এমন উচ্চ বাক্যে ।
শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৫১
অমনি ফিক করে হেসে উঠলো রহিম । হাসি প্রগাঢ় করার আগেই গজগজ করে হাজির হলেন মফিলা । পান চিবুতে চিবুতে দপাদপ পা ফেলে আসলেন । তেড়ে এসে ঘ্যাস ঘ্যাসে গলায় ফোঁস করে উঠলেন ফনা তুলে…
“ আইজ যদি তোগো দুইডার চামরা না ক্যালাইছি , তাইলি আমিও মফিলা না ।
কই রে নবাবজাদা, বিয়া কইরা রঙ্গ শুরু করছোস ? এই রঙ্গের বশে যদি কালায় কালায় অমাবস্যার পয়দা করোস , তাইলে মতিনের ডিগিতে চুবাইয়া মারমু তোরে ! কথাটা যেন মাথায় থাকে….
তব্দা খায় ফুলি । করিম ঘর ছেড়ে বেরিয়েছে । ফুলি পিছু পিছু উঁকি দিলো ।
“ ও আম্মা , আমি কিছু করি নাই । তোমার এই কালা পাঠা আমার নামে ভুয়া অপবাদ দিতাছে । আমি তো এরে ছাড়ুম না । ওরে খাসি , আইতাছি দাঁড়া….
