শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৫২
সুরভী আক্তার
আজকাল শ্যামার এক গান লেগেই থাকে । সে যাবে সেই সুখের নীড়ে । রোজ একবার করে হলেও মনে করিয়ে দেয় সংগ্রাম কে । সংগ্রাম সেভাবে গুরুত্ব দেয় না । বরাবরই এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে সংগ্রাম । শ্যামা এটা বেশ লক্ষ্য করেছে । তবুও হাল ছাড়ে নি । সংগ্রাম কে মনে করিয়ে দেয় বারবার । এইতো আজ সকালে ।
সংগ্রাম সবে মাত্র ঘুম থেকে উঠেছে । আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসেছে । শ্যামা নিচে নেমেছে ঘুম থেকে উঠেই । সংগ্রামের ওঠার সময় ঠাহর করে এক কাপ চা নিয়ে ঘরে আসলো সে । রোজ এক সময়ই ঘুম থেকে ওঠে সংগ্রাম ।
শ্যামা চা নিয়ে এসে দেখে, বিছানায় বসে হাই তুলে চোখ ডলছে সংগ্রাম । শ্যামা দুদিকে মাথা নাড়ালো । ঘরে ঢুকে চায়ের কাপ খাটের পাশের টেবিলের উপর রাখলো । সংগ্রাম তাকালেও শ্যামা প্রতিক্রিয়া দেখালো না । বরং সংগ্রাম কে এড়িয়ে সংগ্রামের গা থেকে হেঁচকা টানে কম্বল সরিয়ে গোছাতে লাগলো সেটা । তব্দা খেলো সংগ্রাম । গোল গোল চোখে তাকিয়ে ডাকলো…
“ বেগম , কাছে এসো !
শুনলো না শ্যামা । রোজ রোজ শ্যামার কপালে গাঢ় চুমু না আঁকা অবধি দিন শুরু হয় না সংগ্রাম জোয়ার্দারের । সংগ্রাম আবার ডাকলো , ঘুমের ঘোরে কন্ঠ এখনো স্বল্প কাতর…
“ কাছে আসুন সাহেবান । আপনাকে দেওয়া উষ্ণ পরশে প্রভাতের সূচনা করি নিজের । তিক্ত প্রভাতে মিষ্টতার স্বাদ আস্বাদন করি ।
“ প্রভাত নেই এখন ।
তাকিয়ে দেখুন , সূর্যি মাথার উপর উঠে গেছে । ডাকছে আপনাকে ।
সংগ্রাম বারান্দার দিকে তাকায় , আলো ফুটেছে পুরোপুরি । সূর্যের ঝলকানি তীর্যক ভাবে ঘরের ভেতর ঢুকছে, বারান্দার পর্দার ফাঁক গলিয়ে । বোঝাই যাচ্ছে ভারী তেঁতে আছে সূর্য । আর শ্যামা ও । তবে শ্যামা কেনো তেঁতে আছে ?
কপাল গুটায় সংগ্রাম । শ্যামা কম্বল গুছিয়ে একপাশে রাখলো । বড় আলমারি খুলে সংগ্রামের শাল বের করলো । পাঞ্জাবি ও বের করলো । সেগুলো সাজিয়ে রাখলো খাটের উপর । একবারও সম্পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে না সংগ্রামের দিকে । ঠাঁয় বসে থেকে ওকে পর্যবেক্ষণ করলো সংগ্রাম । হাঁফ ছাড়ল । নিচে নেমে নিজেই অগ্রসর হলো শ্যামার দিকে । শ্যামা কে টেনে নিলো নিজের কাছে । ওতোপ্রত ভাবে জড়িয়ে কপালে চুমু এঁকে বললো….
“ কি হয়েছে ?
“ সেটা আপনাকে শুনতে হবে না । ছাড়ুন , কাজ আছে আমার । হেঁশেলে যেতে হবে ।
“ হেঁশেলে অনেকে আছে । কিন্তু আমার কাছে কেউ নেই । আমার কাছে তোমাকে চাই । আগে বলো কি হয়েছে ?
মুখ বিপরীতে ঘোরায় শ্যামা । অল্প সময় বাদ অভিমানী কন্ঠে বলে….
“ কতদিন ধরে বলছি আমি সুখের নীড়ে যাবো । নিয়ে যাচ্ছেন আমায় ?
স্বাভাবিক হয় সংগ্রাম । মুখশ্রীর আবেশ দূর হয় । সোজা হয়ে দাঁড়ায় ও । নরম কন্ঠ খানিক তপ্ত ভার করে….
“ সেখানে গিয়ে কি করবে ?
“ আমি যেতে চেয়েছি , ইচ্ছে হয়েছে যাওয়ার ।
“ বায়না ধরছো ছোটদের মতো !
“ আপনি কোনো একবার বলেছিলেন, আপনার কাছে আবদার করতে !
“ তুমিও কোনো একবার বলেছিলে, কারোর কাছেই তুমি আবদার করো না !
“ কথা পেচাচ্ছেন ?
কি আছে ঐ সুখের নীড়ে ? কে আছে ? এতো বার বলার পরেও আমাকে কেনো নিয়ে যাচ্ছেন না ওখানে ?
শ্যামার শক্ত কন্ঠে খানিক তেজ । ও এভাবে কথা বলে না । অবাক হলো সংগ্রাম । ভ্রু তীক্ষ্ণ করে তাকালো ।
শ্যামা কে ছাড়লো । আলাদা করলো নিজের থেকে । স্বাভাবিক কন্ঠে বলল….
“ ভুত আছে ।
শ্যামা কপাল গুটিয়ে তীক্ষ্ণ করে । সংগ্রাম বলে ঠোঁট চেপে…
“ সত্যি বলছি । ঐ বাড়িটা একটা ভুতুড়ে বাড়ি । দেখলেই ভয় পাবে । বিশাল বড় বাড়ি , আমাদের জমিদার বাড়ি যতটা বড় ঠিক ততটাই । তবে জমিদার বাড়ির মতো চাকচিক্য নেই ও বাড়িতে । অন্ধকার থাকে সবসময় । মাঝে মাঝে এর ওর আনাগোনা দেখা যায় । কার আনাগোনা দেখা যায় , এটা কিন্তু কেউ জানে না । মনে রেখো,ভুত আছে কিন্তু ।
ভয় দেখানোর তাগিদে কথা গুলো ভয়ার্ত অদ্ভুত স্বরে বলল সংগ্রাম । শ্যামা বুঝলো ওর রসিকতা কারবার । চোখ সুক্ষ্ম করে কোমরে হাত গুজে বললো…
“ থাক ।
তবুও যাবো । দেখবো আমি আর কে কে আছে ।
“ কে কে আছে মানে কি ? আর কে আবার থাকবে ?
ওখানে আমাদের কেউ নেই । ভুতের সাথে সাথে মাতব্বর দৌলত গাজি থাকেন তার পরিবার নিয়ে , বলেছিলাম তোমায় !
“ আমি যেতে চাই । দেখতে চাই ঐ ভুতুড়ে বাড়ি । আপনাদের সুখের নীড় । মাতব্বর গাজির পরিবার কে দেখতে চাই । উনি তো অসুস্থ বলেছিলেন , ওনাকে দেখতে যাওয়া সওয়াবের কাজ ।
শীতল হয়ে আসলো সংগ্রাম । শ্যামা বেশ আগ্রহী । নিশ্চয়ই কেউ ওকে উস্কেছে সুখের নীড় সম্বন্ধে ।
সংগ্রাম বললো নরম কন্ঠে…
“ আচ্ছা, তাহলে কালকে নিয়ে যাবো ! এবার খুশি ?
চিকচিক করে ওঠে শ্যামা । হাফ ছাড়ে । সন্দিহান হয়ে শুধোয়….
“ সত্যিই ?
“ আমি কি কোনো দিন মিথ্যে বলি ?
তবে একটা শর্ত আছে ?
শ্যামার প্রশ্নাত্মক চাহনি দেখে সংগ্রাম নিজে থেকেই বললো…
“ যাবো আর আসবো । বেশিক্ষণ থাকতে পারবো না ।
“ আচ্ছা ।
আপনার চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে । আপনি খেয়ে নিন । আমি নিচে যাই এখন ।
মুহুর্তেই খুশিতে গদগদ হয়ে গেলো শ্যামা । সংগ্রাম কে ছাড়িয়ে পাশ কাটাতে গেলে সংগ্রাম আবার টেনে ধরলো ওকে । সামনাসামনি দাঁড় করিয়ে কপালের পাশের ছোট ছোট চুল গুলো আলগোছে কানের পাশে গুজে দিলো । সেদিকে লক্ষ্য করে খানিক ঝুঁকে কানের লতিতে হাল্কা ঠোঁট ছোঁয়ালো । ঠোঁট ছোঁয়ানো স্থানে আঙ্গুল বুলিয়ে ফিসফিস করলো নিরেট কন্ঠে….
“ শোনো বেগম , আমি হীনা যদি অন্যের কথায় কান দিয়েছো , তাহলে এই কান কেটে ফেলবো একদম ।
শ্যামা কপাল গুটালো । হিসহিসিয়ে বলা কথা গুলো অস্পষ্ট হয়ে কর্নপাত হলেও বোধগম্য হলো না ।
দুপুর গড়িয়েছে অনেকক্ষণ হলো । সূর্যি ঢলে পড়েছে পশ্চিম দিগন্তে । গ্রামের ছোট্ট একটা প্রাথমিক হাসপাতাল ।
সেখানে হাঁসফাঁস অবস্থায় পায়চারি করছে আফতাব । নাভিশ্বাস উঠে গেছে ওর । দড়দড় করে ঘামছে সে । চিবুক গড়িয়ে গলা বেয়ে নামছে ঘামের স্রোত । চোখ মুখে আতঙ্ক । শ্বাস প্রশ্বাস দ্রুত ছুটছে ।
পাশেই ওর বাবা দাঁড়িয়ে । তার মুখেও ভয়ার্ত আভা স্পষ্ট । সামনের ঘরটায় ময়নাকে ঢোকানো হয়েছে ।
এইতো মেয়েটা সকাল থেকে দুপুর অবধি সুস্থ ছিলো । এরপর হঠাৎ কি হলো কে জানে ?
আফতাব বাড়িতে ছিলো না , ওর বাবাও ছিলো না । জমিতে ছিলেন দুই বাপ ছেলে । দুপুরে খেতে এসেই বিপত্তির সম্মুখীন হয়েছেন উভয়েই ।
ওদের বাপ ছেলে কে খাবার বেড়ে দিয়েছেন খালেদা । ময়না কে বললেন কলপাড় থেকে পানি নিয়ে আসতে । ময়না কথা মতো কলপাড়ে এগোলো । আফতাব ওর সাথে কথা বলার সুযোগ পায় নি আর । বেশ কদিন ধরেই মিইয়ে গেছে ময়না । ঝিমোয় শরীর ।
শরীরে শক্তি নেই এমন অবস্থা । নেতিয়ে পড়েছে পুরোপুরি । গালের পাশে কালসিটে দাগ পড়েছে পোড়া স্থানে । ময়না ঠিকঠাক তাকায় না আফতাবের দিকে ।
বাপ ছেলে খাচ্ছিলো ওরা । কিছুক্ষণ পেরোলেও ময়না আসলো না পানি নিয়ে । খালেদা একবার গলা উঁচিয়ে ডাকলেন । সাঁড়া পাওয়া গেলো না । বেশ খানিকটা সময় পেরোনোর পর আফতাব খাবার ছেড়ে সেদিকে মনোযোগ দিলো । খালেদা উঠে গেলেন দেখার দরুন । কলপাড়ে গিয়ে আঁতকে উঠলেন তিনি । ঝংকার তুলে চেঁচিয়ে উঠলেন । কলের পাশে লুটিয়ে পড়ে আছে ময়না । ধ্যান জ্ঞান নেই । জগটা পড়ে আছে মাথার কাছে । জগে পানি ভরেছিলো , এখন উপুড় হয়ে সমস্ত পানি চুঁইয়ে চুঁইয়ে গড়াচ্ছে মাটিতে । ময়নার শরীরের শাড়িটা ভিজে গেছে । হুঁশ নেই ওর । আফতাব চিৎকার শুনে খাবার ফেলে ছুটে আসলো । ধক্ করে উঠলো ওর চিত্ত । হুড়মুড়িয়ে বসে ময়না কে ধরে ডাকলো , মুখে পানি ছেটালো , তবুও হুঁশ ফিরল না ওর ।
অতঃপর অবস্থা বুঝে তৎক্ষণাৎ ওকে গ্রামের প্রাথমিক হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে । শরীরের ভার নেই বললেই চলে । গা ছাড়া হয়ে গেছে মেয়েটা ।
ডাক্তার দেখছেন ওকে । মহিলা বিভাগের ডাক্তার আলাদা । আফতাব পানি টুকুও খায় নি খাবারের পর । খাবার টুকুও শেষ করতে পারে নি । গলা শুকিয়ে কাঠ । চিন্তায় ছটফট করছে ও । ময়নার শরীরটা লক্ষ্য করেছে ও । ফ্যাকাশে হয়ে গেছে ফর্সা চামড়া । নানান আজগুবি চিন্তা আসছে আফতাবের মাথা । ঠোঁট মুখ শুকিয়ে যাচ্ছে । খালেদা কে বাড়িতে রেখে এসেছে । ওর বাবা এসেছে সাথে ।
একজন মহিলা ডাক্তার বেরোলেন সামনের ঘরটা থেকে । মুখ কুঁচকানো তার । আফতাব শুল্ক ঢোক গিলে ছটফটিয়ে উঠলো । তড়িতে এগিয়ে যেতেই ভরাট কন্ঠে ভদ্র মহিলা শুধালেন….
“ আপনি ওনার স্বামী ?
উত্তরে থমকালো আফতাব । অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো । আফতাবের বাবা ছেলের ইতস্ততা বুঝে উত্তর করলেন ।
“ হ । আমার পোলার বউ হেয় । কি হইছে আমার বউমার ?
ভদ্র মহিলা উত্তর করলেন না । আফতাব কে বললেন…
“ আপনি আসুন আমার সাথে ।
পাশে নিজের কক্ষে প্রবেশ করলেন তিনি ।
আফতাব পিছু পিছু ঢুকলো । শরীরে পুরনো একটা ফতুয়া , আর ময়লা লুঙ্গি । মুখ শুকিয়ে গেছে । ভদ্রমহিলা আফতাব কে চেয়ার দেখিয়ে বসতে বললেন । নিজে থেকেই বললেন….
“ আপনার স্ত্রীর বয়স কতো ?
ঠোঁট ভিজিয়ে উত্তর করলো আফতাব….
“ ষোলো !
কেনো , কি হয়েছে ময়নার ? ও এভাবে হঠাৎ জ্ঞান হারালো কেনো ? বলুন না ?
মহিলা পূর্ণ দৃষ্টিপাত করলেন । বললেন…
“ আপনাকে দেখে শিক্ষিত আর সভ্য মনে হচ্ছে । যা বলবো , একবারই বুঝবেন আশা করি । দুবার বলতে হবে না নিশ্চয়ই । আপনার স্ত্রীর গর্ভপাত হয়েছে , এটা জানেন ? নাকি নিজে গর্ভপাত করিয়েছেন ?
বজ্রপাত হলো আফতাবের মাথায় । আকাশ ভেঙ্গে পড়লো যেনো ।
ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো সে । ভয়ার্ত সূক্ষ্ম নয়ন জোড়া আঁতকে উঠলো, বৃহৎ আকার ধারণ করলো । বসা অবস্থায় পিছিয়ে গেলো সে ।
শ্বাস রুদ্ধ হলো কন্ঠ নালিতে । অস্ফুটে উচ্চারণ করলো…
“ গর্ভপাত ?
“ জ্বি , গর্ভপাত !
জানেন না আপনি ? আপনার স্ত্রী দুমাসের গর্ভবতী ছিলো । এটা তো জানেন ?
ফের ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে আফতাবের শরীর । চোখ নামিয়ে নেয় ও । মস্তিষ্ক নিগুড় হয়ে আসে ।
অপ্রস্তুত পরিস্থিতি সামাল দিতে ধীরে উচ্চারণ করে…
“ জানতাম ?
“ আপনার স্ত্রী এখন আর অন্তঃস্বত্ত্বা নয় । ওর বাচ্চা টা নষ্ট হয়ে গেছে । নষ্ট হয়েছে না নষ্ট করিয়েছেন , সেটা ঠিকঠাক পরীক্ষা করলে ঠিক জানতে পারবো ।
এখন আসি ওর এই অবস্থার বিষয় নিয়ে , একেই আপনার স্ত্রীর বয়স কম । শরীরের দিক থেকেও ছোট্ট, দূর্বল । গর্ভধারণের জন্যই উপযুক্ত ছিলো না সে । এই বয়সে গর্ভধারণ , তার উপর এখন গর্ভপাত । শরীরে সয় নি । দূর্বল হয়ে পড়েছে আপনার স্ত্রী । রক্তস্বল্পতা আছে । চেহারা ফ্যাকাশে , দেখলেই বুঝতে পারবেন । গর্ভপাতের দরুন শরীর থেকে রক্ত ঝড়েছে অনেক । কিন্তু এসব তো আপনার জানার কথা , আপনার স্ত্রী আপনাকে এসব বলে নি ?
আফতাব উত্তর করতে পারে না ।
ঘোলাটে হয়ে আসে আশপাশ । ও শুধোয় কোনো রকমে….
“ ময়না কেমন আছে এখন ?
“ শরীর দূর্বল । মানসিক অবসাদ , আর শরীরের শক্তি কমে এই দূর্বলতা থেকেই জ্ঞান হারিয়েছিল । ওনার বিশ্রামের প্রয়োজন । পুষ্টিকর খাবার আর ফল মূল খাওয়াবেন বেশি করে । রক্তস্বল্পতা কেটে যাবে । ঘাটতি পূরণ করতে হবে । আর খেয়াল রাখবেন ওনার । শিক্ষিত হয়েও এই বিষয়গুলো কেনো এতটা কম গুরুত্ব দেন বুঝি না । প্রথম বার গর্ভপাত হলে অধিকাংশ মেয়ে গর্ভধারণের ক্ষমতা হারায় , এটা জানা নেই আপনার ? স্ত্রীর খেয়াল রাখতে পারেন নি ?
আফতাব নির্বিকার । দৃষ্টি নিচুতে । ভদ্রমহিলা আবার বললেন….
“ বেশি ভাববেন না ।
এবার থেকে যথেষ্ট সাবধান হবেন । দ্বিতীয় বার যেনো এই পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে না হয় , সেদিকে খেয়াল রাখবেন । ওনার জ্ঞান ফিরলে ওনাকে বাড়িতে নিয়ে যেতে পারেন । ঔষধ লিখে দেবো, নিয়ম করে খাওয়াবেন ।
আফতাব বেরিয়েছে ডাক্তারের সম্মুখীন থেকে । ঔষধ লিখে হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়েছেন তিনি ।
ও বেরোতেই আফতাবের বাবা ধড়ফড় করে শুধালো….
“ আব্বা , কি হইছে ? কি কইলো ডাক্তার ম্যাডাম ?
হাসার চেষ্টা করে আফতাব । চোখ লুকিয়ে ফিকে স্বরে বলে…
“ কিছু না আব্বা ।
ময়নার শরীর একটু দুর্বল । আর , এ কারনেই অজ্ঞান হয়ে গেছে । জ্ঞান ফিরলে বাড়িতে নিয়ে যেতে পারবো ।
“ তাইলে যা , দেইখা আয় জ্ঞান ফিরলো কি না । আমি এইহানে আছি । তুই যা… আমারে কাগজ খান দে । আমি ঔষধ কিন্না লইয়া আহি আপাতত ।
আফতাবের হাত থেকে কাগজটা নিয়ে হাসপাতালের বাইরে বেরোলেন ওর বাবা ।
সামনে কেবিনের দরজা । দরজার ওপারে ময়না । আফতাব কাঁপছে তিরতির করে । ওর আন্দাজে সবটা পরিষ্কার হতে বাকি নেই । বুক কাঁপছে ওর । মাথায় ঘোরপাক খাচ্ছে হাজার চিন্তা ।
ও ধীরে সুস্থে ঘরটায় ঢুকলো । সাদা চাদরের উপর জ্ঞান হীন বেঢাল হয়ে পড়ে আছে ময়না । একজন সেবিকা আফতাবের পিছু পিছু আসলেন রক্ত নিতে । আফতাব তৎক্ষণাৎ বারন করলো । রক্ত নিতে হবে না , একেই রক্ত কম শরীরে । গর্ভপাত হয়েছে , গর্ভপাতের কারনটা না হয় অজানাই থাক ।
সুরবালার জন্মদিন উপলক্ষে সকাল সকাল নিজ হাতে পায়েস রেঁধে ছিলেন শায়লা । তিনি তো আগে জানতেনই না । জানলে কাল রাতেই সবটা করতেন । আজ সকালে জানার পর আফসোস করলেন তিনি ।
তবে নিজের ছেলের করা কান্ড শুনে হেসেছেন অনেক । অবাক হওয়ার চেয়ে হাসি পেয়েছে বেশি । কালকের পুড়ে যাওয়া পায়েস টুকু একটু চেখে দেখেছেন । ছেলে তার বউয়ের জন্য একটুই তো সখ করে রেঁধে ছিলো ! এটুকু ভেতর ভেতর বিশাল প্রভাব ফেললো তার উপর । তার ছেলে বদলে গেছে ।
বিকেলের পর রিক্তা, আরশ , জবা আর আলামিন,এরা চারটে এসেছে । কোনো ভাবে অংকুরের মুখে শুনেছে সুরবালার জন্মদিনের কথা । অমনি হামলে পড়েছে । বাড়িতে রান্নাবান্না হয়েছে অনেক ।
রাতের খাবার এ বাড়িতে খেয়ে তবেই ফিরবে ওরা । বন্ধুরা মিলে ছাদে আড্ডা দিয়েছে অনেকক্ষণ । অংকুর নিশ্চুপে ওদের সঙ্গ দিয়েছে । আড্ডায় ও কথা বলে না বরাবর ।
আজও নিশ্চুপ । সুরবালা ওদের সাথে নেই । রিক্তা একবার টেনে টুনে নিজেদের সাথে বসিয়েছিলো ওকে । তবে জড়তায় বেশিক্ষণ ওদের সাথে বসে থাকতে পারে নি সে । ছাদ থেকে নেমে এসেছে ও । বিশেষত জবার গায়ে পড়া ভাবের জন্য । এই মেয়েটার চটচটে স্বর মোটেও পছন্দ নয় ওর । সুযোগ পেলে কিছু না কিছু বলে দেয় ।
অংকুরের সাথে চিপকে থাকার চেষ্টা করে ।
তার উপর কাল থেকে এই বাবড়ি ওয়ালা এড়িয়ে যাচ্ছে ওকে । আজ একটা বার ও তাকায় নি সুরবালার দিকে । কথা তো অনেক দূর । নিজে থেকে সুরবালা যা বলেছে তাই শেষ ।
সন্ধ্যার পর খেতে বসেছে সকলে । শায়লা বসেন নি । সুরবালা আর জাহানারা খাবার পরিবেশন করে দিচ্ছে । ওরা বন্ধুরা বসেছে সকলে । মোটামুটি অনেক প্রকার পদ রান্না হয়েছে । সুরবালা খাবার বেড়ে দিয়ে একপাশে দাঁড়ালো । দাঁত পিষে খিটখিটে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো অংকুরের দিকে । ভেতর ভেতর বিভৎস ফুঁসছে ও । অংকুর নতজানু হয়ে গিলছে আপন মনে । ওর পাশের চেয়ারটায় জবা । সুরবালা কে দেখিয়ে আদিখ্যেতা করে ও এই চেয়ারে বসেছে । অংকুর একবারও বারন করলো না ওকে ? ওর ঢলাঢলি সহ্যে করে অংকুর । একটুও বিরক্তি প্রকাশ করে না , বাঁধা প্রদান করে না । সুরবালার সামনে বারবার অংকুর কে নানান বাহানায় ছলচাতুরি দিয়ে স্পর্শ করে জবা , হাত ধরে কথায় কথায় । তবুও অংকুর নির্বিকার । কোনো প্রকার বাধা প্রদান করে না ও ।
রিক্তা এসবে বিরক্ত হয় , কিন্তু অংকুর হয় না ।
সুরবালা শুধু দেখেই যাচ্ছে । সহ্য করছে ।
খেতে খেতে রিক্তা প্রশ্ন করলো….
“ খাবার কে রেঁধেছে সুরবালা , তুমি ?
অংকুরের থেকে চোখ নামিয়ে নেয় সুরবালা । পরমুহূর্তে রিক্তার দিকে তাকিয়ে উত্তর করে মুচকি হেসে…
“ আমি সাহায্য করেছি শুধু ।
পিছন থেকে শায়লা গলা বাড়ালেন…
“ জানিস রিক্তা , কাল রাতে অংকুর চুপিচুপি ওর বউয়ের জন্য পায়েস রেঁধেছিলো ।
চট করে খাবার গিলে অংকুরের দিকে তাকালো সকলে । আরশ অবিশ্বাসে শুধায়…
“ কি বলছেন আন্টি ? অংকুর , আর পায়েস ?
“ হ্যাঁ রে । বউয়ের জন্মদিনে পায়েস রাঁধতে চেয়েছিলো । কিন্তু পারে নি । পুড়িয়ে ফেলেছে । কিন্তু তবুও তো চেষ্টা করেছিলো । ভেবে দেখ , আমার গোমড়া মুখো কেশবতী কতটা বদলে গেছে । বউকে ভালোবাসে কতটা দেখেছিস ? তুই কোনদিন রিক্তার জন্য কিছু রান্না করেছিস ? করিস নি তো ? কিন্তু আমার গোমড়া মুখো করেছে । ওকেই জিজ্ঞেস করে দেখ ।
আরশ চটপটিয়ে বললো…
“ কি রে অংকুর ? সত্যি ? তুই সুরবালার জন্য পায়েস রেঁধেছিলি কাল ।
অংকুর গা ছাড়া, নির্বিকার । উত্তর করার একটুও প্রয়োজন বোধ করলো না । রিক্তা খোচালো আরশ কে…
“ আবার বেশরমের মতো জিজ্ঞেস করছো কেনো ? শুনলেই তো । আর ওকে জিজ্ঞেস করলে কোনো দিন সোজাসাপ্টা উত্তর পাবে ? তুমি কখনো রেঁধেছো আমার জন্য কিছু ? কতদিন হলো আমাদের বিয়ে হয়েছে !
অংকুর কে দেখো , শেখো কিছু । বেটা , উপরে উপরে গম্ভীর কাঠ কাঠ হলেও ভেতরে ভেতরে কেমন দেখেছো ? আমাদের সুরবালা আসার পর , ও কতটা পরিবর্তন হয়েছে !
বাহ্ রে অংকুর , তোকে দেখছি আর অবাক হচ্ছি । ভালোবাসা আসলেই পাথরেও ফুল ফোঁটায়….
কি সুরবালা , ফুল ফুটিয়েছো আমাদের গোমড়া মুখোর মনে ?
সুরবালার লজ্জা লাগে । মনটা কেমন ছ্যাঁত করে ওঠে । লাজুক হেসে চোখ নামিয়ে নেয় ও । এদিকে অংকুরের প্রতিক্রিয়া নেই এখনো । ও সেই একই ভাবে মাথা নামিয়ে খেয়েই যাচ্ছে । যেনো আশেপাশে কিছুই নেই । মুখে টু শব্দও নেই । জবা মুখ বাঁকালো সবার কথা শুনে ।
রিক্তা চোখ পাকিয়ে বললো আরশের উদ্দেশ্যে…
“ আজকে গিয়ে রান্না শিখবে । যদি আমাকে না রেঁধে খাইয়েছো , তাহলে তোমার একদিন কি আমার একদিন । আজ থেকে আমি আর রাঁধতে পারবো না ।
চিপায় পড়লো আরশ । মুখের খাবার টুকু গলায় বিধলো । কোনো রকমে গিলে বললো…
“ এখানে আবার আমাকে টানছো কেনো ?
“ তুমি আমাকে ভালোবাসো কি না সেটা দেখার জন্য । আমি তোমাকে ভালোবাসি,তাই এতদিন রান্না করে খাইয়েছি । এবার দেখবো তুমি আমাকে কতটুকু ভালোবাসো….
পেছন থেকে শব্দ করে হেসে উঠলেন শায়লা । সুরবালা মৃদু হাসলো ওদের দুটো কে দেখে ।
এতক্ষণে মুখ খুললো অংকুর । খাবারের দিকে দৃষ্টি রেখেই তাচ্ছিল্য হেসে আচমকা বললো…
“ ভালোবাসা সুন্দর , যদি সেটা দ্বিপাক্ষিক হয় তবেই । তোরা দুজন দুজনকে ভালোবাসিস , ভালোবেসে বিয়ে করেছিস , সংসার করছিস , এখানে আলাদা করে আর দেখা দেখির কি আছে ? এসব উল্টো পাল্টা অযৌক্তিক চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেল । চুপ চাপ খা ।
রিক্তা সচকিতে চায় । খানিক কপাল গুটায় । অতঃপর আরশ সহ একে অপরের দিকে চাওয়া চাওয়ি করে ভ্রু নাচায় । সুরবালা ধীরে নরম দৃষ্টি পাত করে অংকুরের দিকে । তাৎক্ষণিক শুকনো কেশে ওঠে অংকুর । খাবার গলায় লেগেছে হয়তো । ভড়কালো সুরবালা । ছলকে উঠে দ্রুত কদমে ওর দিকে এগোলো । গ্লাসে পানি ঢেলে সেই গ্লাস এগিয়ে দেওয়ার আগেই পাশ থেকে আরেকটা হাত এগিয়ে দিলো আরেকটা গ্লাস । থামলো সুরবালা । জবার বাড়িয়ে দেওয়া গ্লাস তড়িঘড়ি করে নিয়ে গলায় পানি ঢাললো অংকুর । অতঃপর শ্বাস ফেললো । শায়লা বলে উঠলেন…
“ আস্তে খাবি তো । খাওয়ার সময় কথা বলতে যাস কেনো । চুপচাপ খাওয়ার শেষ কর ।
তিনি থামতেই জবা গায়ে পড়ে বললো…
“ ঠিক আছিস অংকুর ? আরো পানি খাবি ?
উত্তর পাবে না জেনেও সুরবালা কে দেখিয়ে আদিখ্যেতা করলো । উত্তর না পেয়ে আবার বললো বেশি ঢং দেখিয়ে…
“ ভাত তুলে দেবো অংকুর ? ভাত নিবি ?
“ ও কি নেবে ,কি নেবে না,সেটা তোকে ভাবতে হবে না । ভাবার জন্য আর দেওয়ার জন্য ওর বউ আছে । তুই চুপচাপ খা ।
মুখ বাঁকায় জবা । আড়চোখে সুরবালা কে দেখে ফিচেল হাসে ঠোঁট চিপে । সুরবালা চোয়াল শক্ত করে । জ্বলে ওঠে । দাঁত চেপে হাতের গ্লাসটা ঠক করে টেবিলের উপর রাখে । তৎক্ষণাৎ খানিক চমকানোর ভঙ্গিতে বাঁকা চোখে তাকায় অংকুর । সুরবালা মুখ ফিরিয়ে এখান থেকে চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়াতে গেলে পিছন থেকে বাঁধা পড়লো । আলতো টান পড়লো শাড়ির আঁচলের এক কোণে । ঝট করে তাকালো সুরবালা । টেবিলের নিচ থেকে বাম হাত দিয়ে দুই আঙ্গুলে ওর আঁচলের এক কোণা টেনে ধরেছে অংকুর । অথচ দৃষ্টি এদিকে নেই । ও ব্যস্ত প্লেটে হাত চালাতে । চরম বিরক্ত হলো সুরবালা । নাকের পাটা ফুলে উঠলো ওর । ঠোঁট ফুলিয়ে ঝটকা টান মেরে নিজের আঁচল ছাড়িয়ে নিলো অংকুরের থেকে । ফোঁস করে গটগটিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলো । ওকে ওভাবে যেতে দেখে ঠোঁট কামড়ে আরশ কে ইশারায় পরিস্থিতি বোঝালো রিক্তা । হাসলো দুজনে একে অপরের দিকে তাকিয়ে ।
খাওয়া শেষে অংকুর সবার আগে ঘরে উঠেছে । রিক্তা’রা চলে যাবে একটু দম নিয়ে । অংকুর ঘরে ঢুকলো । সুরবালা কে পেলো না ঘরে । এদিক ওদিক চোখ বুলিয়ে বারান্দার দিকে এগোলো সে । সুরবালা পিছু ফিরে বুকে হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । কথা বলার বাহানা খুঁজলো অংকুর । বললো রাশভারী গলায়….
“ মা খেতে ডাকছে নিচে । গিয়ে খেয়ে নাও ।
ওদিক থেকে উত্তর নেই । আর না কোনো নড়চড় । অংকুর ঠোঁট ভিজিয়ে আবার বললো…
“ কি হলো , যাও ।
“ আমাকে নিয়ে কাউকে ভাবতে হবে না । কেউ একজন এখানে কেনো এসেছে ? বান্ধবী ভাত বেড়ে দিচ্ছে , গান্ডে পিন্ডে গিলুক গিয়ে ।
মৃদু হাসলো অংকুর । ঠোঁট চেপে বললো…
“ সেই কেউ একজনের খাওয়া শেষ । তুমি গিয়ে খেয়ে নাও এখন !
“ খাবো না । চলে যান আপনি ।
“ আচ্ছা , যাচ্ছি !
গা ছাড়া ভাবে চলে যেতে নিলো অংকুর ।
সুরবালা তড়িতে পিছু ফিরলো । অংকুর কে পা বাড়িয়ে যেতে দেখে কটমটিয়ে উঠলো । ওর আগে গটগট করে এগিয়ে এসে সামনে পথ রোধ করে দাঁড়ালো । ঝাইঝাই করে উঠলো…
“ সমস্যা কি আপনার ? কেনো বিয়ে করেছেন আমায় ? এসব তামাশা দেখানোর জন্য ? আমি আপনার হাত ধরলে গায়ে ফোস্কা পড়ে যায় আপনার ! রেগে মেগে তেঁতে ওঠেন আমার উপর । আর ঐ মেয়েটা , ঐ মেয়েটা ঢলাঢলি করলে খুব ভালো লাগে ? ও হাত ধরলে ভালো লাগে আপনার ? ওর ঢলাঢলি , গায়ে পড়া , খুব উপভোগ করেন আপনি ?
“ সুরবালা ! কিসব বলছো ?
“ ঠিকি তো বলছি । আমি দেখিনি ভেবেছেন , সব দেখেছি আমি ! আপনাকে তো বলেছিলাম ঐ মেয়ের থেকে দূরে থাকতে । কথা কানে যায় নি আপনার ? কেনো ছোঁবে ঐ মেয়ে আপনাকে ? আপনি বিবাহিত সেটা জানে না ? ও আপনার পাশে বসে খাবে কেনো ? আমি তো পানি দিচ্ছালাম আপনাকে , ওর থেকে পানি নিয়ে খেলেন কেনো আপনি ? বলুন , ওকে এতো লাই দেন কেনো ? কে ও….
“ ও আমার শুধুই বন্ধু !
“ বন্ধু নয় বান্ধবী । আকাশ পাতাল তফাৎ এতে । আপনার তো আরো বান্ধবী আছে । তারা তো ওর মতো নয় । তাহলে ও কেনো এমন ?
ইতিমধ্যেই চোখ ছলছল করছে সুরবালার । গলা কাঁপছে । নাক টানলো ও । নাকের ডগা লালচে হয়ে এসেছে । পূর্ণ দৃষ্টিতে ওকে পরখ করলো অংকুর । মনে মনে হাসলো মৃদু । উপরে কঠোরতা বজায় রেখে বললো…
“ ও এমন হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে ।
তোমার জেনে লাভ নেই…
বলেই পাশ কাটালো সুরবালা কে । এহেন কথায় আপনা আপনি চোখ থেকে পানি গড়ালো সুরবালার । ঝট করে হাতের উল্টো পিঠে পানি টুকু মুছলো সুরবালা । ওষ্ঠ উল্টে নাক টেনে পিছু ফিরে মুখ আড়াল করলো ।
অংকুর বাইরে বেরিয়েই রিক্তার মুখোমুখি হয়েছে । বুকে হাত গুটিয়ে সুক্ষ্ম নেত্রে তাকিয়ে আছে রিক্তা । কপাল গুটালো অংকুর । নিজে মুখ খোলার আগেই রিক্তা বললো চট করে…
“ কি হয়েছে বলতো ? তোদের মাঝে সব ঠিকঠাক তো ?
“ বেঠিক কিছু নেই ।
“ সুরবালা কে ওমন করে বললি কেনো তাহলে ?
“ তুই বুঝবি না । আর এখনো এখানে কি করছিস ? বাড়ি যাবি না । যা ভাগ…
“ যাচ্ছি । তবে শোন , কাল আবার আসবো । খেতে নয় , খাওয়াতে । রান্না করে নিয়ে আসবো । তো বন্ধুর হাতে প্রথম রান্না । সুরবালা কেও খাওয়াবো । মনে রাখিস , কাল আমাদের বাড়ি থেকে বিশেষ কিছু আসবে । রাতে বাড়িতে রান্না করতে বারন করে দিস ।
ওরা চলে গেছে । তবুও আর নিচে নামে নি সুরবালা । শায়লা ওকে নিচে ডাকে নি । বরং খাবার সাজিয়ে দিয়েছে অংকুরের হাতে । ঘরে এসে খাবারের প্লেট টেবিলের উপর রাখলো অংকুর । সুরবালা কাত হয়ে বিছানায় শুয়ে । অংকুরের উপস্থিতি বুঝে চোখ বুজে রাখার ভান ধরলো সে । অংকুর ভার গলায় বলল…
“ খেয়ে নাও !
আমি ও ঘরে গেলাম । কাজ আছে আমার !
বলেই চলে গেলো অংকুর । আর একটা বারও ফিরে চাইলো না সুরবালার অভীমানের পানে ।
হাসপাতাল থেকে ময়নার নিথর ভারহীন অচল দেহ খানা বিকেলের পর বাইয়ে নিয়ে এসেছে আফতাব । সে এখনো নীরব । মাথায় একাধিক চাপ আছড়ে পড়ছে । তবুও সংযত সে । ময়না কে কিচ্ছুটি বলে নি । বলার চেষ্টাও করে নি । ময়না বিভৎস চমকে আছে । জড়িয়ে আছে ভয়ে ।
এখন রাত প্রায় দশটা বাজতে চললো । আফতাব দের বাড়ির বাইরে সরু পথ ধরে এগোলে সামনে একটা বিশাল কাঠাল গাছ আছে । রাতের অন্ধকারে সেই গাছের নিচে বেশ কয়েকটা কালো ছায়া মূর্তির উপস্থিতি লক্ষণীয় । এখন গ্রামে সবার কাছে নিশুতি রাত । এর মধ্যেই ঘুমিয়েছে সকলে । মানিক আর ওর বউ মালেকা আজ বহুদিন ধরে এ বাড়িতে ছিলো না । শশুর বাড়িতে ছিলো মানিক । ফিরেছে দুদিন হলো । রোজ রাত করে মদের আড্ডায় যায় সে । আজ ও ব্যাতিক্রম হয় নি ।
মদ খেয়ে মাতাল হয়ে দুলতে দুলতে ফিরছে বাড়ির পথ ধরে । নেশার ঘোরে বকছে ভুজুং ভাজুং ।
টলে পড়ছে বারবার । আবার উঠে দাঁড়িয়ে হাটা ধরছে । শশুর বাড়ি গিয়েও এমনটাই করেছে । তাই ও বাড়ির ভাত উঠে গেছে । বিরক্ত হয়ে দুদিন আগে মানিকের শশুর মেয়ে জামাই কে এ বাড়িতে ফেলে গেছেন । ওখানে মাতব্বরি করতে পারে না মানিক । মালেকার বাবা ডাকাত । সেখানে মাতব্বরি করা মানে নিজের উপর বিপদ ডেকে আনা । মালেকার রগচটা,ডাকাত বাবা কে হাড়ে হাড়ে ভয় পায় মানিক । বিয়েটা মূলত ডাকাতই ধরে বেঁধে দিয়েছেন । মানিক শুধু মালেকার উপর সুযোগ নিতে চেয়েছিল । কিন্তু বিপদে পড়ে, ফেঁসে গেছে যাঁতাকলে । মদ ছাড়তে পারে না মানিক । এটা তার নিত্যদিনের অভ্যাস । এই মদ খেয়ে মাতাল হওয়ার দরুন নিজেদের গ্রামে জামাইয়ের জন্য মানসম্মান নেই মালেকার বাবার ।
মানিক টলতে টলতে আসতে গেলে পথের মাঝে সেই কাঁঠাল গাছটার নিচে আচমকা খাম্বা মতো কিছু একটার সাথে ধাক্কা খেলো । অমনি লুটিয়ে পড়ল মাটিতে । উঠে দাঁড়ালো আবার । অন্ধকারে নেশার ঘোরে কিছু দেখতে পেলো না । ফের এগোতে গেলে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো । মাথা ঝাঁকিয়ে ঘ্যাস ঘ্যাস করে অনুমান ধরে বলে উঠলো মানিক…
শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৫১ (২)
“ কি রে শ্লা …
রাস্তার মাঝে যোম আইলো কনে থাইকা ।
কথা শেষ হতে না হতেই ওকে পেঁচিয়ে ধরলো কেউ । মোটা মাথাটা একটা চটের বস্তা দিয়ে ঢেকে চেপে ধরলো কেউ । গুঙ্গিয়ে উঠলো মানিক । নেশার টালে জোরে গলা তুলতে মস্তিষ্ক সায় দিলো না । চেঁচাতে পারলো না মানিক ।
সময় পার না করে অন্য একজন ওর পা দুটো ধরে দুজন মিলে চেংদোলা করে ছুটলো কোনো এক খানে ।
