Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৪৬ (২)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৪৬ (২)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৪৬ (২)
রুপান্জলি

বিছানায় শুয়ে ঊশখুশ করছে অর্পনা। মাথাটা গরম হয়ে আছে,, রাগ হচ্ছে ভিষন। কিছুক্ষণ আগেও পরশী আর মেধা এসে ওর কানের কাছে নানান কথা বলে গিয়েছে। দ্বীপকে পাঞ্জাবিতে মারাত্মক লাগে, একদম এক পলকে থমকে যাওয়ার মতো। বর্তমানে দ্বীপ রেগুলার পাঞ্জাবি পরছে,, পাঞ্জাবি পরেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। অর্পনা বুঝে না রাজনীতি বীদরা অলওয়েজ পাঞ্জাবি পরে কেনো? মাঝে মধ্যে মনে হয় পাঞ্জাবি আর রাজনীতি বোধহয় একে অপরের পরিপূরক। এটা নিয়েই পরশী আর মেধা অনেক কথা বলেছে। দ্বীপের সম্পর্কে এটা ওটা বলে অর্পনার মাথাটা হেং করে দিয়েছে। তাদের দুজনার বাক্যালাপে সবচেয়ে বেশি হিট করেছে পরশীর বলা এই কথাটা “” ভাইয়া
নিজেকে অবিবাহিত দেখানোর চেষ্টা করছে,, সবাইকে বুঝাতে চাচ্ছে সে সিঙ্গেল।

এই মুহুর্তে নিশ্চয়ই অনেক মেয়ে ভাইয়াকে নক দিবে,, কথা বলতে চাইবে। তুমি যেহেতু ভাইয়াকে পাত্তা দিচ্ছোনা সেহেতু ভাইয়া মেয়েদের মেসেজের রিপ্লাই দিলেও দিতে পারে। তারপর আর কি? তারপর কিছুই না,, এমনি বললাম আরকি!! “”” এই এমনি বললাম আরকি, কথাটাই জ্বালাতন করছে তাকে। শান্তি পাচ্ছেনা,, দ্বীপ কি সত্যি ই এমন কিছু করবে? অন্য মেয়েদের মেসেজের রিপ্লাই দিবে? নাহ!! দ্বীপ খুব বিশ্বস্ত একজন হাসবেন্ড,, কখনোই এরকম কাজ করবে না। অর্পনা দ্বীপকে নিজের থেকেও বেশি বিশ্বাস করে,, কিন্তু নারী মন,, সবচেয়ে বড়ো কথা অর্পনা একজন বউ। বউরা কেনো যেনো স্বামীকে নিয়ে রিস্ক নিতে পারেনা। ইদানীং তো পরিবেশ পরিস্থিতি ভালো না। পরশী তো দেখালো, একজন মহিলা নাকি স্বামীর পরকীয়ার জন্য ছেলেকে রেখে আত্মহত্যা করেছে। অর্পনা তাদের চিনেনা তবে পরশী বলেছে লোকটা নাকি মিডিয়া পারসন, বেশ সেলিব্রিটি,, আর সেলিব্রিটিরা নাকি ভালো হয়না। ভালো থাকতে চাইলেও আসেপাশের পরিবেশ তাকে ভালো থাকতে দেয়না। এই কারনেই অর্পনার বুকটা ধুকপুক করছে,, না চাইতেও মন অশান্ত হচ্ছে। ইচ্ছা করছে দ্বীপকে কল দিয়ে অনেক কথা শুনাতে কিন্তু এতে দ্বীপ বুঝে যাবে অর্পনা দ্বীপের প্রতি দূর্বল।

“” নিজের দূর্বলতাকে কখনো দূর্বল জায়গাটা চিনাতে নেই,, কদর কমে যায়। কেউ যখন খুব করে বুঝতে পারে তুমি তার প্রতি দূর্বল তখন থেকেই তার অবহেলার মাত্রা বেড়ে যাবে। তোমায় নগন্য ভাব্বে,, মনে করবে তোমায় চাইলেই পাওয়া যায় তাই দাম দেওয়ার প্রয়োজন মনে করবে না। “” আর এই অবহেলা, নগন্যতা অর্পনার সাথে যায়না। অর্পনাকে যে ভালোবাসবে সে তাকে তার ঠিক ঠাক মূল্য দিয়েই বাসতে হবে,, মূল্যহীন ভালোবাসা তার কাম্য নয়। এর পরিবর্তে সে আমরন নির্বাসন গ্রহন করতেও রাজি। অর্পনা অনেকটা সময় নিয়ে ভাবলো,, মনটাকে শান্ত করা প্রয়োজন । অগত্যাই ভাবনা চিন্তা কাটিয়ে ফেইসবুকে গিয়ে মেইন আইডি লগ আউট করলো। ইরাদের আইডি লগ ইন করে সেই আইডি থেকে একটা ফেইক আইডি বানালো। ভেবে চিন্তে আইডির নাম দিলো “মরিচিকা” তারপর দ্বীপের আইডি সার্চ করলো,, আইডিটা পাবলিক,, রাজনীতি বীদ তো,, পাবলিক রাখাটা প্রয়োজন। অর্পনা কখনো দ্বীপের আইডি চেক করেনি, আজ ঘুরে ঘুরে দেখলো,, লোকটা তেমন কোনো পোস্ট করেনি। শুধু সাত বছর আগের একটা পোস্ট রয়েছে যেখানে দ্বীপ আর বিহান ইদগাহে্ নামাজ পড়তে গিয়েছিলো, সেখানেই তোলা একটা ছবি। তাও কোনো ক্যাপশন দেওয়া নেই,, আর আদার্স যতো পোস্ট আছে সেগুলো দলের ছেলেরা, এভারেস পারসনরা উনার সাথে তোলা ছবি গুলো উনাকে ট্যাগ করে পোস্ট করেছে। অর্পনা মেসেজ অপশনে গিয়ে মেসজ করলো —
,,, দূরত্ব কি ভালোবাসা বাড়ায় নাকি চলে যাওয়ার বাহানা বানায়?””

,,, ছাদের রেলিঙে পা ঝুলিয়ে বসে আছে দ্বীপ,, ফ্ল্যাট টা ১০ তলার, আর সে এখন ১০ তলা ছাদের উপর বসে। হাতে কো*কেনের সিরিন্জ, দৃষ্টি আকাশে, চোখ দুটো ফ্যাকাশে হয়ে আছে,, ইচ্ছা করছে এখান থেকে একবার নেমে দেখতে কষ্ট কমে কিনা। ১০ তলা থেকে পরে গেলে তো কষ্ট কমার কথা নয়তো একেবারে সেরে যাবার কথা। তার কি একবার ট্রাই করা উচিৎ? ওহুম!! একদমি না,, সে মরে গেলে অর্পনার কি হবে? অর্পনার তো কেউ নেই, সে চলে গেলে অর্পনা আরও একা হয়ে যাবে,, নাহ মরা যাবে না। দ্বীপের ভাবনার মাঝে তার পাশাপাশি এসে বসলো কেউ,, তখনি দক্ষিণ দিক থেকে মৃধু হাওয়া বইলো, দ্বীপের সিল্কি চুল গুলো উড়ে গেলো অবলীলায়,, বাতাসে সাথে সাথে একফালি রেশমের ন্যায় কেশ এসে উপচে পরলো ওর চোখে মুখে। পাশে বসা ব্যাক্তির দিকে তাকালো দ্বীপ,, কালো শাড়ী পরিহিত এক রমনি বসে আছে পাশে। দ্বীপ এক ধ্যানে তাকিয়ে রইলো,, পারু মুচকি হেসে বললো — তুমি এতো টেন্সড কেনো বেবি? কিছু হয়েছে

,,, দ্বীপ ঝাপশা চোখে তাকিয়ে রইলো, পারু আবার বললো — অর্পনাকে মিস করছো?
,,, দ্বীপ বোকার মতো মাথা ঝাকিয়ে বললো — খুব, বুকটা ফাকা ফাকা লাগছে।
,,, ওকে ভালোবাসো?
,,, দ্বীপের ঝাপসা চোখে পানি জমা হলো, বুকটা কাঁপছে,, মাথাটা ঝিমঝিম করছে,, সে চোখ ঘুরিয়ে আকাশ পানে তাকিয়ে বললো — ভালোবাসায় এতো তাপ কেনো পারু? মাত্রারিক্ত হলে বুঝি এভাবেই পুড়তে হয়? যেভাবে অর্পনা পোড়াচ্ছে?
,,, পারু হাসলো,, হাসির শব্দ শুনে তাকালো দ্বীপ। ইদানীং নেশা না করলে পারু আসেনা,, কথাও বলেনা। দ্বীপ যখন খুব নেশা করে নেশায় বুধ হয়ে থাকে তখনি পারুর দেখা মিলে। সেই জন্যই আজো নেশা ছাড়তে পারেনি দ্বীপ। যদি নেশা ছাড়তে হয় তাহলে পারুকেও ছাড়তে হবে। এটা কি আদেও সম্ভব? পারু হাঁসতে হাঁসতে বললো — তুমি গিয়েছো দ্বীপ, আরও একবার ভালোবাসার জমুনায় ভেসে গিয়েছো।
,,, দ্বীপ পারুর দিকে গভীর চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো — তোমার হিংসা হয় না?
,,,পারু ফের হাঁসলো, হাঁসতে হাঁসতে চোখে পানি জমা হলো, দ্বীপ দেখলো সেই ছল ছল করা চোখ। — মরা মানুষের আবার হিংসা কি দ্বীপ? আমি তো অর্পনার প্রতি কৃতজ্ঞ,, সে কতোটা নিখুঁত ভাবে গুছিয়ে দিচ্ছে তোমায়, আমার ভালো লাগছে।

,,, মরা মানুষ,, এই বাক্যটা দ্বীপের বক্ষ ছেদ করলো,, বক্ষ পিড়ায় চোখের পানি বাধা মানলো না। তাকে সবাই কি পেয়েছে? কয়লা? যে যেভাবে পারছে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দিচ্ছে। দ্বীপ এক হাতে চোখ ডলে বাচ্চাদের মতো করে বললো — তুই কোনো চলে গেলি পারু? গেলি যখন আমায় নিয়ে গেলিনা কেনো? মাঝে তো ছয়টা বছর ছিলো, সাথে করে নিয়ে যেতি। তাহলেই তো আমার আধপোড়া জীবনে পুরোপুরি জ্বলসে যাওয়া অর্পনার আগমন ঘটতো না। আর না ওর অনলে আমার আধপোড়া মনটা পুড়ে ছাই হতো। যখনি অর্পনার অতিতের কথা মাথায় আসে আমার বড্ড লাগে,, বুকের এইখানটায় যেনো কেও খামচে ধরে। ওর জ্বলসে যাওয়া জীবনটা আমি কিভাবে রঙিন করবো পারু? সবাই বলে দ্বীপ মির্জার কূটিলতার কাছে নাকি কেউ টিকতে পারেনা অথচ অর্পনার বেলায় আমি নির্বোধ। কিছু বলতে পারিনা, রাগ দেখাতে পারিনা, কষ্ট দিতে গেলে শতগুণ বেশি আঘাত আমার বুকে এসে লাগে। কি মরনে মরলাম আমি? এই মরন তো আমার কাম্য ছিলোনা পারু,, এর থেকে তো তর মতো চিরনিদ্রায় যাওয়া উত্তম। মাঝে মধ্যে মন চায় মরে যাই,, অর্পনার জন্য পারিনা। আবার মন চায় ওকে নিয়ে মরে যাই,, কিন্তু ও তো দুনিয়ায় এসে কিছুই পেলোনা। আমি সহ অনেকেই ওকে যন্ত্রনার অনলে ডুবিয়ে দিলাম। ওর ও তো কিছু পাওয়া উচিৎ, প্রান খুলে নিশ্বাস নেওয়া উচিৎ,, নিজেকে ভেঙে চুরে স্বাভাবিক জীবন ঝাপন করা উচিৎ। বিশাল পৃথিবীর বুকে জন্ম নেওয়ার পরেও অর্পনা শূন্য হাতে ফিরে যাবে,, এতো বড়ো অন্যায় কি করে হতে দেই বল?

,,, পারু আবারও খিলখিল করে হেসে উঠলো,,রাগ হলো দ্বীপের। সে ব্যাথায় কাতর আর পারু মজা নিচ্ছে? মেয়েটা তো বড্ড পাজি,, দ্বীপ রেগে মেগে কিছু বলতে নিবে তখনি তার অবাধ্য প্রেমিকা অবাধ্যের মতো হাওয়ার সাথে মিলিয়ে গেলো। দ্বীপের বুকটা ধ্বক করে উঠলো, সে বাতাসে পারুকে খুজতে নিতেই আচমকা হাতে টান লাগলো। টান খেয়ে ধরফরিয়ে উঠলো দ্বীপ, বিহান এক হাতে দ্বীপের কলার ধরে চোয়াল বরাবর ঘুসি মারলো। ঘুসি খেয়ে বোকার মতো তাকিয়ে রইলো দ্বীপ, কি হয়েছে বুঝতে পারলো না শুধু চোয়ালে হালকা ব্যাথা অনুভব হলো। বিহান ওর হাত থেকে কোকেন ভর্তি সিরিন্জটা কেড়ে নিয়ে ছাদে ফেলে পা দিয়ে পিষে দিয়ে ধমকে উঠলো — লুসারের বাচ্চা! ওখানে উঠেছিস কেনো? আর একা একা কার সাথে কথা বলছিলি? এসব কি? কিসের ইনজেকশন নিতে চাইছিস তুই?
,,, দ্বীপ কলার থেকে বিহানের হাত ঝারা দিয়ে ফেলে বললো — ওটা কো*কেন,, ফেলে দিলি কেনো? তর বাপের টাকায় কিনেছি?

,,, বিহানের মাথায় রাগ চাপলো, সে আবারো দ্বীপের চাপায় ঘুষি বসাতে গিয়ে থেমে গেলো,, পরপর দ্বীপের বাহুতে ধাক্কা মেরে বললো — এসব নিয়ে নিয়ে আর কতোদিন? ঠিক মতো খাবার খাসনা,, ঔষধ খাসনা। বাঁচতে না চাইলে মির্জা বাড়িতে যা,, ওখানে তর মরন তর জন্য অপেক্ষা করছে।
,,, দ্বীপ মলিন হেসে বললো– করছে না,, ও আমায় ঘৃণা করে,, আমায় দেখলে ওর বমি পায়,, খেতে পারেনা। ওর অবহেলা মেনে নিতে পারলেও ঘৃণা মেনে নেওয়া অসম্ভব,, প্রতিমুহূর্তে মৃত্যু যন্ত্রণা দেয়।
,, বিহান হাঁসলো,, ওকে হাঁসতে দেখে রাগ হলো দ্বীপের। সবাই ওকে নিয়ে হাঁসছে,, ওর অনুভুতিকে সবার মজা মনে হচ্ছে? বিহান দ্বীপকে টেনে রেলিঙে হেলান দিয়ে দাড় করালো,, তারপর কাধে হাত রেখে বললো – তর বউ তকে মেসেজ দিয়েছে।

,, কি মেসেজ?
,,, দূরত্ব কি ভালোবাসা বাড়ায়, নাকি চলে যাওয়ার বাহানা বানায়?
,,, মজা নিচ্ছিস? ও কখনো এমন মেসেজ করবে না।
,,, ফোন বের করে চেক কর,,
,,,, বিহানের কথায় পকেট হাতরে ফোন বের করলো দ্বীপ,, চেক করে কিছু না পয়ে বিহানের দিকে তাকাতেই সে বললো মেসন্জার চেক করে দেখতে। দ্বীপ বরাবরই মেসেঞ্জার লগ আউট করে রাখে যেনো কেউ মেসেজ দিয়ে বিরক্ত করতে না পারে। এমনিতেও তাকে কেউ খুব একটা কল দেয়না৷ কাজের সূত্রে যারা দেয়, তারা বিহানের ফোনে কল করে। দ্বীপ ম্যাসেন্জার লগ ইন করে মেসেজ টা দেখে ভ্রু কুচকে বললো — এটা তো” মরিচিকা”।
,,, এটা তর বউয়ের ফেইক আইডি। তর বউ তো জানেনা ওর ফোনের আইডি কিংবা ইমেইল জিমেইল নয় বরং ওর পুরো ডিভাইস ই তর আয়ত্তে।

,,, ওকেহ!! বুঝলাম, বাট তুই জানলি কি করে?
,,, তর ল্যাপটপে কিছু কাজ করছিলাম,, হঠাৎ S25 Ultra থেকে নোটিফিকেশন এলো। প্রথমে ফেইসবুক আইডি লগ আউট,, পরপর রুমজাহিন ইরাদ আইডি লগ ইন হলো অতঃপর “মরিচিকা” ফেইক আইডির উৎপত্তি হলো। এই আরকি,,
,,, বিহানের কথায় রাগ হলো দ্বীপের, ওকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে বললো– অন্যের পারশোনাল জিনিসে হাত দেওয়া অভ্যাস হয়ে গিয়েছে? যখন দেখলি S25 Ultra থেকে নোটিফিকেশন এসেছে, আমায় ডাকতি,, তুই কেনো চেক করলি?

,,, দ্বীপের রাগান্মিত ফেইস দেখে বিহান পিছাতে পিছাতে বললো — তর আবার পারসোনাল কি ভাই? আর এমনিতেও আমি জানি, তর বউ তকে কোনোদিন রোমান্টিক মেসেজ পাঠাবে না। আমার তো মনে হয় তর বউয়ের মতো নিরামিষ এই পৃথিবীতে খুব কম মানুষ ই আছে। যেখানে মেয়েরা স্বামীর একটু খানি আগ্রহ পাওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকে, সেখানে তর বউ তকে পাত্তাই দেয়না।
,,, এপর্যায়ে ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো দ্বীপ,,অর্পনার এই পাত্তা না দেওয়াটা তাকে যতটা কষ্ট দেয় তার অর্ধেক পরিমান ভালো লাগাও কাজ করে। দ্বীপ মুচকি হেসে বিরবিরালো– সি ইজ ডিফারেন্ট,, এবসোলোটলি ডিফারেন্ট।
,,, বিহান শুনলো না সেই বিরবির করে বলা কথাটা। সে নিজের মতো করে বললো — ধর, তর বউ তকে একদিন নিজ মুখে ভালোবাসি বললো, তর কেমন লাগবে?
,,,, বিহানের কথায় থমকে গেলো দ্বীপ,, বুকের বাম পাশটাও সমান হারে থমকে গিয়েছে। সে বুকের বামপাশে হাত ডলে সচল করতে চেয়ে বললো– বোধহয় মরেই যাবো আমি।

,, দ্বীপ চোখে মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে রুমে এলো,, আজ নেশা চড়ে গিয়েছে। চোখ পিটপিট করে নিজেকে ঠিক করতে চাইলো,, অর্পনার সাথে কথা হয়না বহুদিন। আজ যখন সে অপরিচিত সেজে মেসেজ দিলো দ্বীপ নাহয় সেই অপরিচিতর সাথে কথা বলেই নিজের মনকে বুঝ দিবে। দ্বীপ বিছানায় গেলো না বেড ঘেঁষে মেঝেতে বসে পরলো। সামনে লেপটপটা রেখে তাদের রুমের সিসি ক্যামেরা লাইভে গেলো,, সামনে ভাসছে অর্পনা শুয়ে থাকার দৃশ্য। মেয়েটা বিছানায় হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে, গায়ে উড়না নেই,, চুল গুলো ছড়িয়ে আছে বিছানায়। এই চুলগুলো দ্বীপের বড্ড প্রিয়। সে মাথা নামিয়ে স্ক্রিনে ভাসা অর্পনাতে চুমু খেলো কয়োকটা। সময় নিয়ে অর্পনাকে দেখতে দেখতে ম্যাসেন্জারে ডুকলো,, মরিচিকা আইডিতে ঢুকে রিপ্লাই করলো–
,,, বাড়ায় বোধহয়।
,,, অর্পনা চোখ বুঝে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সাজাচ্ছিলো। মেসেজের শব্দ হতেই চোখ মেলে তাকালো,, মেসেঞ্জার অন করে দ্বীপের রিপ্লাই দেখে মন ভার হলো। পরশী তবে ঠিক কথাই বলেছে? লোকটা অন্য মেয়েদের রিপ্লাই দেয়। অর্পনা মুখ মলিন করে উত্তর দিলো — কি বাড়ায়? ভালোবাসা নাকি চলে যাওয়ার বাহানা?
,,, অর্পনার মুখোভঙ্গি দেখে দ্বীপ ক্ষিন হাঁসলো,, ছোট করে লিখলো — ব্যাক্তিবেধে ডিপেন্ট করে,, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভালোবাসা বাড়ে আবার কখনো দূরত্ব বেড়ে যায়।

,,, অর্পনা নাক কুঁচকালো, উত্তরটা পছন্দ হয়নি বোধয়। রিপ্লাই করলো— কখনো ভালোবেসেছিলেন?
,,, হয়তো!!
,,, এখন বাসেন না,।
,,,নাহ!!
,,, অর্পনার মন ভার হলো — আপনি কি বিবাহিত?
,,, দ্বীপের ঠোঁট থেকে যেনো হাঁসি সরছেই না,, ভালো লাগছে তার,, উত্তর করলো — কিছুদিন আগে টিবিতে শো হয়েছে দেখেননি?
,,, আমি ওসব দেখিনা তাই জানা নেই।
,,, নেট ঘেটে দেখে নিন।
,,, আপনার মুখ থেকে শুনতে চাই।
,,, হুম, আমি বিবাহিত।
,,, আাপনার বউকে ভালোবাসেন না?
,,, না!!
,,, অর্পনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে লিখলো — ভালো।
,,, রাগ করলেন?
,,, আমি কেনো?
,,, নাহ!! শুনেছি মেয়েদের কষ্টে নাকি অন্য মেয়েদের বুক ফাটে। আমার বউকে ভালো না বাসার অপরাধে আপনি নিশ্চয়ই আমায় শাস্তি দিতে চাচ্ছেন?

,,, চাচ্ছিনা।
,, আমি চাচ্ছি।
,,, কি চাচ্ছেন?
,,, আমাদের সাক্ষাৎ হোক।
,,, কিভাবে সম্ভব?
,,, আপনি চাইলেই সম্ভব।
,,, আপনি আমায় চিনেন?
,,, আপাতত না।
,,, তাহলে?
,,, তাহলে আবার কি? সাক্ষাৎ কালিন পরিচিত হবো।
,,, একটা অচেনা মেয়ের সাথে দেখা করবেন আপনার বউ রাগ করবে না?
,,, সে এখনো রাগ করে আছে।
— মানে?
,,, দ্বীপ বেডের বোর্ডে মাথা হেলিয়ে লিখলো– আপাতত আমরা সেপারেশনে আছি,, দুজনার মাঝে বেশ দূরত্ব। দেখতে পারিনা, ছুতে পারিনা, কথা হয়না, কিছুই না।

— আপনার কষ্ট হয়না?
,,, কষ্ট হবে কেনো? আমি তো ভালোবাসিনা।
,,, ওহ!! তাহলে ডিভোর্স দিয়ে দিন।
,,, ভাবছি দিয়ে দিবো।
,,, অর্পনা থম মেরে ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলো, লোকটা তাকে ডিভোর্স দিয়ে দিবে? বলতে পারলেন এটা? ওকে এভাবে থম মেরে বসে থাকতে দেখে দ্বীপ মেসেজ পাঠালো — আপনার কি চোখ জ্বালা করছে? কাঁদবেন?
,,,দ্বীপের কথায় থতমত খেয়ে গেলো অর্পনা, ধরফরিয়ে উঠে বললো — আমি কেনো কাঁদবো, আজব?
,,, মনে হলো আপনি কেঁদে দিবেন,, মেবি এখন নাক ফুলাচ্ছেন, চোখে পানি জমা হয়েছে কি?
,,, অর্পনার সন্দেহ হলো, লোকটা কি ধরে ফেলেছে এটা সে? হওয়ার আশঙ্কা আছে, এই দ্বীপ মির্জা বড্ড চতুর। অর্পনা তারাহুরো করে লিখলো — আচ্ছা ভালো থাকবেন,, আর কখনো কথা হবেনা।
,,, দ্বীপ ঠোট কামরে হেসেঁ লিখলো — ওহুম, ভালো থাকবো না, আমার সম্পর্কে এতো কিছু তদন্ত করলেন,, আপনার সম্পর্কে কিছু বলবেন না?

,,, ইন্টারেস্ট পাচ্ছিনা।
,,, আপনার ইন্টারেস্ট ডিস-ইন্টারেস্টে কি এসে যায়? আপনি আমার সম্পর্কে জানলেন এখন আমরও উচিৎ আপনার সম্পর্কে জানা।
,,, জেনে লাভ? এতো জানাজানি দিয়ে কাজ কি?
,,, ভাবছি বউকে ডিভোর্স দেওয়ার পর আপনাকে বিয়েটা করে নিবো।
,,, মেসেজটা টাইপ করে চোখ বুঝে নিলো দ্বীপ,, ওপাশের রিয়্যকশন দেখার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করলো। পরপর চোখ মেলে লেপটপের স্ক্রিনে নজর রেখে মেসেজটা সেন্ড করলো। অর্পনা স্ক্রিনেই তাকিয়ে ছিলো, মেসেজটা পড়ে দাঁতে দাঁত চাপলো। ফোনটা শক্ত করে ধরে দ্বীপের জন্য বরাদ্ধকৃত কুসনটা পায়ের কাছে নিয়ে লাত্থি মেরে নিচে ফেলে দিলো। পরপর চোখ মুখ শক্ত করে টাইপ করলো —
,,, কি বললেন? আপনি আমায় ডিভোর্স দিয়ে আবার বিয়ে করবেন? করুন,, ক্যারেক্টারলেস পুরুষ। পরশী ঠিকি বলেছিলো, পুরুষ মানেই ভেজাল। এই মুহুর্তে আপনি আমায় তালাক দিন। তালাক না দিলে তর শিখানো প্রসেসেই তকে খুন করবো দ্বীপ মির্জা,, এক্স দিয়ে তর হৃদপিণ্ডটা কাটবো সবার আগে। তারপর সেটা পায়ের তলায় রেখে দুমড়ে মুচড়ে শেষ করে দিবো। !!

,,,, মনের সব রাগ ঢেলে দিয়ে টাইপ করলেও সেন্ড করা হলো না,, ওহুম সেন্ড করা যাবেনা। তাহলে দ্বীপ মির্জা বুঝে যাবে সে অর্পনা। মেসেজ সেন্ড করতে না পেরে অর্পনার রাগ আরও বাড়লো,, দ্বীপের আইডিটা ব্লক করে ফোনটা ফ্লোরে ছুড়ে মারলো। সর্বশক্তি দিয়ে ছুড়ে মারায় ফোনটা কুসনের পাশে মুখ থুবরে পরলো। নাহ!! রাগ কমছে না। অর্পনা উঠে দ্বীপের ফাইল সেল্ফে গেলো। এখানে ছয়দিন আগে দুটো ফাইল রাখা হয়েছে,, এই ফাইল দুটো রেডি করতে দ্বীপের টানা ১১ দিন সময় লেগেছে,, দেওয়ার সময় ওকে বলেছিলো এগুলো খুব ইম্পর্ট্যান্ট, যেনো সাবধানে রাখে। তখন খুবি সাবধানে রেখেছিলো অর্পনা, এখন এগুলোকে নষ্ট করতে মন চাচ্ছে। অর্পনা ফাইল দুটো হাতে নিয়ে ধাম করে নিচে ছুড়ে মারলো। হনহন করে বেলকনিতে গেলো,, কর্নারে সেট করা মিনি ফ্রিজ থেকে সাতটা স্পিড নিলো। এগুলো দ্বীপ ওর জন্য আনিয়ে রেখেছিলো, যেনো খেয়ে মাথা ঠান্ডা রাখতে পারে। অর্পনার তৃপ্তি লাগছে,, ফাইল দ্বীপের,, স্পিড গুলো দ্বীপের টাকায় কিনা, আর সে নিজেও দ্বীপের বউ। নিজের মাধ্যমে নিজের লাইফ হেল হওয়া কাকে বলে, অর্পনা দ্বীপকে হাড়ে হাড়ে টের পাওয়াবে। অর্পনা রুমে এসে ফাইল দুটো মেলে ছয়টা বোতল উপুর করে সম্পূর্ণ তরল ঢেলে দিলো। ঢালা শেষ করে নিচে বসলো,, হাতে থাকা অবশিষ্ট স্পিডের ক্যাপ খুলে এক ঢুকে অর্ধেকটা শেষ করে দম নিলো। তারপর তরলে ভেজা কাগজ গুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে হাতে নিয়ে দুমড়ে মুচড়ে দাঁতে দাঁত পিষে বললো — যেখানে আমার জায়গা হবেনা আমি সেটার অস্তিত্বই রাখবো না। সকালের জন্য অপেক্ষা কর দ্বীপ মির্জা,, তর বিয়ে করার সাধ মিটাচ্ছি।

সেহরির সময় নিচ নামলো অর্পনা,, গতকাল সবার সাথে ইফতারি করে তার খুব ভালো লেগেছে। তাই আজ সবার সাথে সেহরি করতে নিচে নেমে এসেছে। নিচে নামতেই আরিব দৌড়ে গিয়ে অর্পনার দিকে হাত বাড়ালো,, ওকে কোলে নিতে। ছেলেটার ৮ বছর অথচ সবসময় কোলে উঠার জন্য তৎপর থাকে। দেখতে তেমন নাদুস নুদুস না,, চিকন চাকন গরনের,, হাইটেও অতো লম্বা না,, দেখতে ৫, ৬ বছরের বাচ্চাদের মতো দেখায়। অর্পনা হাত বাড়িয়ে কোলে নিলো,, কোলে নিতেই তার দম বেড়িয়ে আসার যোগার,, কদিন আগেও ঔজন মেপেছে সে, বর্তমানেও সে স্টিল ৪০ কেজি। এক কেজিও বাড়েনি,, এ নিয়ে দ্বীপের বাড়াবাড়ির শেষ নেই। অর্পনাকে সারাক্ষণ খাওয়ার মাঝে রেখেছে। এতো খাওয়ার পরেও তার সাস্থের একই হাল। তাইতো আরিবের মতো একটা চিকন বাচ্চাকেও কোলে নিতে গিয়ে তার দম বেড়িয়ে যাচ্ছে। আরিবকে অর্পনার কোলে দেখে ধমকে উঠলেন সাথী বেগম– আরিব,, তুমি কি বাচ্চা? এই বয়সে কেউ কোলে উঠে,, অর্পনা নামিয়ে দাও,, প্রতিটা দিন ভোর রাতে উঠবে আর সবাইকে জ্বালাবে। নামো দ্রুত,, আরিব মার খাবে?

,,, মায়ের বকা শুনে আরিব নেমে যেতে চাইলে অর্পনা নামালো না। কোলে করে এনে চেয়ারে বসালো। আরিব অর্ধ উঠা দাঁত বের করে হেসে পাশের চেয়ার হাত দিয়ে মুছে দিতে দিতে বললো — বসো বড়ো ভাবি,, আমরা একসাথে খাবো।
,,, আরিবের পাশে বসলো অর্পনা, আরিব অর্পনার উড়নার আচল টেনে আঙুলে পেঁচাতে লাগলো। দৃশ্যটি দেখে অর্পনার সেদিন রাতের কথা মনে পরে গেলো, যখন দ্বীপ ওর উড়না টেনে হাতে পেঁচাচ্ছিলো। ঐ সময়টা ঠিক ঠাক থাকলেও এখন কেমন যেনো লাগলো। সে এদিক ওদিক তাকিয়ে নিজের ভাবনা ঠিক করলো। সময় পেরুতেই একে একে সবাই এসে শামিল হলো। অর্পনাকে খাবার টেবিলে দেখে বড্ড খুশি হলেন মাহিদ মির্জার, শাহিন মির্জা আর মাহিন মির্জা। তিন ভাই মিলে ছেলের বউয়ের সাথে আড্ডা দিচ্ছেন,, অর্পনার বেশ ভালো লাগছে। ওদের কথোপকথনের মাঝে টেবিলে রোমানা বেগম এলেন।ডাল ভর্তি কাচের বাটিটা রেখে থমথমে স্বরে বললো — অর্পনা!! ছেলেটাকে আসতে বলেছিলে?

,,, অর্পনা মাথা নত করে বললো– না আন্টি, বলা হয়নি।
,,, অর্পনার কথাটা যেনো উনার কানে বিষের মতো ঠেকলো,, কন্ঠে তিক্ততা ঢেলে বললো– কেনো হয়নি? তোমাকে কতোবার কল দিতে বলা হয়েছিলো? তোমার শ্বশুর কতবার বলেছে? আমি কতোবার বলেছি? একটা কথাও কানে তোলার প্রয়োজন মনে করলে না? আজ ছয়টা দিন হলো ছেলেটা বাড়ি ফিরেনা। বড়ো ছেলের সাথে সাথে মেঝোটাও গেলো। আমি মনে হয় একমাত্র মা, যে ছেলেদেরকে অনাহারে রেখে নিজে ভালো মন্দ খাই।
,,, বলতে বলতে উনার কন্ঠ ভেঙে এলো। মেধা মিনমিনে স্বরে বললো — আম্মু!! ওকে বললে কি হবে? ভাইয়া তো এরকমি।
,,, তেতে উঠলেন রোমানা বেগম — এরকমি মানে? এরকম হবে কেনো? বিয়ে করেছে, বাড়িতে বউ আছে। বাহিরে থাকবে কেনো? ও কেমন বউ হয়েছে? ওর কোনো দায়িত্ব নেই? ওর কি উচিৎ না বউয়ের দায়িত্ব পালন করা? ছেলেটাকে আঁচলে বেঁধে রাখা?
,,,, মাহিদ মির্জা নাকোচ করে বললেন — ও কিভাবে বেঁধে রাখবে রোমানা? ঐ ছেলে কারোর কথা শুনে? মেয়েটাকে বকো না,, ওর তো কোনো দোষ নেই।
,,, কেনো বকবো না ভাইজান। জোহান আমার ছেলে,, ওকে ছাড়া রমজান কাটাচ্ছি,, কতোটা কষ্ট হয় জানেন? গলা দিয়ে খাবার নামতে চায়না। এখন আবার এটা বলবেন না যে আমি জোহানকে জন্ম দেইনি বলে আমার কোনো কষ্ট হতে পারেনা।

,,, শ্বাশুড়ীর ব্যাবহারে অবাক হলো অর্পনা,, কখনো ভাবতে পারেনি উনি এমন ব্যাবহার করবে। পরক্ষণেই বাস্তবতার কথা মাথায় আসতেই অবাকতা কাটিয়ে বললো— আপনাদের ছেলেকে আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলিনি অন্টি। উনি নিজে থেকেই গিয়েছেন।
,,, অর্পনার সামান্য কথাটাও সহ্য হলো না রোমানা বেগমের। যেনো আগে থেকেই ভেবে রেখেছেন, ও কিছু বললেই মনের সব রাগ উগরে দিবেন। ভাবনা হাসিল করতে চেঁচিয়ে উঠলেন– মুখে মুখে তর্ক করবে না মেয়ে, ছেলেটা সুস্থ হওয়ার পর তুমি উঠে পরে লেগেছো কিভাবে ওকে আবার অসুস্থ বানানো যায়। একটা দিন দেখলাম না ছেলেটার সাথে ভালো ব্যাবহার করতে। সারাক্ষণ ত্যারা ত্যারা কথা। তোমার হাতের চুড়ি কোথায়? জানো না বিয়ের পর চুড়ি পরতে হয়? চুড়ি না পরলে স্বামীর ক্ষতি হয় জানো না? তুমি কি বাচ্চা? বয়স তো কম হয়নি,, বিয়ে হয়েছে, বিয়ের পর স্বামীর মন কিভাবে রক্ষা করতে হয় বুঝোনা? দুটো মিষ্টি কথা বলতে পারোনা? মেধাকে দেখেছো? ও কিন্তু এই বাড়ির মেয়ে,, মাহিন ভাইয়ের একমাত্র মেয়ে,, কতো আদরের জানো? এক হাতে বাড়ির বেশিভাগ কাজ করে,, স্বামী কাজ থেকে ফিরলে পানি এগিয়ে দেয়, চা কফি যা লাগে সব বানিয়ে দেয়। নিজের স্বামীকে তো দেয় দেয় ই সাথে সাথে তোমার স্বামীকেও সব এগিয়ে দেয়। তোমাকে তো কেউ কাজ করতে বলেনি,, অন্তত আমার ছেলের দিকটা তো দেখবে নাকি? তোমার সেদিকেও কোনো হুস নেই। আমার ছেলে চরিত্রবান বলে এখনো এসব সহ্য করছে অন্য কেউ হলে কবেই ছেড়ে দিতো

,,, এটুকু কথায় এতো কথা শুনার পরেও অর্পনার রাগ হলো না। সে সবার সাথে রাগেনা,, সবাইকে প্রতিদ্বন্দ্বীও বানায়না। তার মতে বন্ধুত্ব যেমন ব্যাক্তি বেধে হয় তেমনি শত্রুতাও ব্যাক্তি বেধেই তৈরি করতে হয়। সবাইকে হুট হাট শত্রু কিংবা রাগের বস্তু বানিয়ে দিতে নেই,, এতে তার রাগের সম্মানহানি হবে। অর্পনা অত্যন্ত শান্ত স্বরে বললো — আন্টি!! মির্জা গালিবকে তো চিনেন? তাইনা? উনি একবার বলেছিলেন,,
” এই দুনিয়া সার্থপরতায় ভরপুর গালিব,, তুৃমি কোন সমস্যার কথা বলছো? মানুষ জানাজায় ও শামিল হয়,, নিজের সওয়াবের আশায়।

,,আসলেই মানুষ সার্থপর। ভেবে দেখুন ৯ মাস আগের কথা,, যখন আমি আপনার অসুস্থ ছেলের বউ হয়ে মির্জা বাড়িতে এসেছিলাম তখন কত্ত তোষামোদ করেছিলেন। আর আজ যখন আপনার ছেলের সাথে একটু কথা কাটাকাটি করলাম,, আপনার ছেলে বাড়ি থেকে চলে গেলো,, অমনি হাজারটা কথা শুনাচ্ছেন। কেনো আন্টি? এতো দ্বিচারিতা কিসের? আজ আমি অভদ্র, অসভ্য, অকর্মা হলে সেদিনো একই ছিলাম,, বরং একটু বেশি ই অভদ্র ছিলাম। তখন প্রশংসা করেছিলেন কেনো? আপনার অসুস্থ ছেলেকে সামলিয়েছি বলে? যাই হোক,, আমি কাউকে বলিনি আমায় নিয়ে সংসার করতে। আপনার ছেলেকে আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতেও বলিনি,, তার নিজের প্রবলেম হয়েছে তাই চলে গিয়েছে। আর যদি বলেন ছেলে ছাড়া রমজান পালন করার কথা,, তাহলে বাকি ছয় বছর কোথায় ছিলেন? তখন কি অসুস্থ ছেলের কাছে গিয়ে সেহরি-ইফতার করেছিলেন? করেননি,, একটা দিন অসুস্থ ছেলের সাথে থেকেছিলেন? উনি যখন মানুষকে মারধর করতো গিয়েছিলেন উনার কাছে? আন্টি!!

এমনো সময় গিয়েছে উনি আমার নরম হাতগুলোতে শক্ত দাঁতের কামর বসিয়েছিলেন। ( অর্পনার কথায় চোখ নামিয়ে নিলেন রোমানা বেগম,, অর্পনা মুচকি হেঁসে বললো) লজ্জা পাবেন না, ওটা ভালোবাসার চিহ্ন ছিলোনা। আমার হাতে কামর দিয়ে রাগ মিটাতেন। দাগ গুলো দেখাতে ইচ্ছুক না। উনি যখন হাতে কামর দিতেন আমি চুপচাপ সহ্য করতাম,, আপনার ছেলেকে দেখেছেন না? কতো হাইট, কতো ওজন উনার,, তার তুলনায় আমি কিছুই না। তবুও উনি ভয় পাবেন বলে উনার যাবতীয় সব কাজ আমি করতাম। গোসল, খাওয়া, ঘুম এমনকি সকল ধরনের পাগলামি উনি আমার উপরেই জাহির করতেন। এগুলো কিন্তু উনি বাধ্য ছেলের মতো করে নেয়নি,, এসব মানাতে গিয়ে আট মাসে আমায় অনেক আঘাত সহ্য করতে হয়েছে,, মার খেতে হয়েছে। আমার পাপ্পা আমায় কখনো ফুলের টোকাও দেয়নি, অথচ আপনার ছেলের অসুস্থতার প্রথম দুইমাস আমি তিন বেলা থেকে ছয় বেলাই মার খেতাম। তখন কিন্তু আমার হাতের চুড়ি কিংবা নাকের ফুল আমায় হেল্প করেনি।

আপনার ছেলেকে সুস্থ রাখতে আমার চুড়ির প্রয়োজন নেই আন্টি,, আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখলে আমি অর্পনা একাই যথেষ্ট। আমি চাইলে উনাকে আরও একবার উন্মাদ বানিয়ে দ্বিতীয় বার সুস্থ করতে পারবো। ইনশাআল্লাহ!! তাই আমার এফোর্ট নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন না। আমি যতোটা ধৈর্য ধরতে পারি ততোটা আপনি নিজের স্বামির জন্য ও পারবেন না। আমার কথা শুনে ভাবতে পারেন, আমার পাপ্পা আমায় ভালো শিক্ষা দেয়নি,, আসলে পাপ্পা আমায় যথেষ্ট ভালো শিক্ষা দিয়েছেন কিন্তু আমি নিতে পারিনি। কারন, অতিরিক্ত ভদ্রতা আমার পোষায়না। আপনার ছেলেকে বলবেন,, আমার মতো অভদ্রকে নিয়ে সংসার করতে অসুবিধা হলে মুক্তি দিয়ে দিতে,, আমার কোনো আপত্তি নেই। এমনিতেও আমি অতো মূল্যহীন না যে সংসারের জন্য কারোর পায়ের তলায় পরে থাকবো। আপনার ছেলে আমায় মাথায় করে রেখেছে বলেই এখানে আছি নয়তো কবেই মির্জা বাড়িতে লাত্থি মেরে চলে যেতাম।

,,, বলতে বলতে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ালো অর্পনা,, মেধা ওর কথা শুনে থমকে তাকিয়ে রয়েছে। পরশি মিটিমিটি হেসে লুকিয়ে লুকিয়ে অর্পনাকে উড়ন্ত চুমু দিলো। ইসস!! তার ভাবির এটিটিউড,, পরশীর খুব ইচ্ছা, ভাবির মতো এটিটিউড নিয়ে চলবে কিন্তু মায়ের জন্য পারানা। অর্পনার জায়গায় যদি এখন সে থাকতো তাহলে এতোক্ষণে পিঠে গুনে গুনে আট-দশটা জুতার বারি পরতো। অর্পনাকে উঠতে দেখে আরিব দ্রুত অর্পনার উড়না ধরে বললো — উঠছো কেনো ভাবি? খাবেনা?

,,, অর্পনা সন্তর্পণে উড়না ছাড়িয়ে নিলো,, শাহিন মির্জা বউয়ের দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকালেন। বলার আর সময় পেলোনা? খাবার টেবিলে এতো কথা বলার কি মানে? তিনি অর্পনার দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বললেন– তোমার শ্বাশুড়ির কথায় কিছু মনে করোনা, সে জোহানের বেলায় একটু বেশি ই পসেসিভ। বসো আম্মু, না খেয়ে যেওনা।
,,, অর্পনা উত্তর করলো না,, মাহিদ মির্জা ডাকলেন কয়েকবার, যেতে মানা করলেন। অর্পনার মাথায় রাগ, এখানে থাকলে সে ভাঙচুর শুরু করে দিতে পারে,, তাই আপাতত শ্বশুরের কথা না মেনে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে নিতেই পরশী দৌড়ে গিয়ে ওর হাত টেনে ধরলো,, অর্পনা হাত ছাড়িয়ে নিয়ে উপরের দিকে হাটা দিলো। ওর এরুপ কান্ডে রোমানা বেগম খেঁকিয়ে উঠে বললেন — দেখলেন, কতোটা বেয়াদব? শ্বশুর চাচা শ্বশুরকেও সম্মান করার প্রয়োজন মনে করলো না,, ত্যাজ দেখিয়ে চলে গেলো। মেয়ে মানুষের এতো ত্যাজ ভালো না। এতো ত্যাজ নিয়ে বিয়ে করা গেলেও সংসার করা যায়না। মেয়ে মানুষ থাকবে মেয়ে মানুষের মত

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৪৬

,,, কথা শেষ করার আগেই সিঁড়ি গোড়ার বড়ো ফুলদানিটা আছড়ে পরলো, সবাই অহাম্মক বনে গেলো। এই মেয়ে দ্বীপের থেকেও কয়েক কাটি উপরে। চিন্তায় হায় হায় করে উঠলেন রোমানা বেগম,, এই মেয়ে এতো ত্যারা,, তার জেদি জোহানকো সামলাবে কি? উল্টো জোহানকেই না এই মেয়ের পিছন পিছন ঘুরতে হয়।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৪৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here