৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৬
রুপান্জলি
বসার ঘরে মাদুর বিছিয়ে মেয়েগন-রা মেহেদী দেওয়ায় মেতেছে। আগে মির্জা বাড়ির ঈদ গুলো এতোটা জমজমাট ছিলো না কারন মানুষের বড্ড অভাব ছিলো। যারা ছিলো তারা তখন তীব্র বেখেয়ালি ছিলো তবে এখন দ্বীপের বউয়ের ফ্রেন্ডরাই এসে পুরো বাড়ি মাতিয়ে রেখেছে। আরশাদ জামানের মতো করে অর্পনা আর তার ফ্রেন্ডদের নিয়ে বিকালে শপিং এ গিয়েছিলো দ্বীপ। সেই শপিং শেষ করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সারে আটটা বেজেছে। এখন বাজে দশটা। এই রাতেই মেহেদী পরতে বসেছে মেয়েরা,, এই আড্ড আরও ঘন্টা দুয়েক থাকবে তারপর সবাইকে ড্রাইভার সমেত বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হবে। বসার ঘরের একপাশে ছেলেরা আর অন্যপাশে মেয়েরা গোল হয়ে বসেছে। রাত্রি মন দিয়ে মেধাকে মেহেদী পড়াচ্ছে,,ওর একহাত পড়ানো শেষ হলে ইরার এক হাতে পরাবে। একটু আগে পরশীর এক হাতে দেওয়া শেষ করলো মাত্র। ইরাকে পরানোর পর আবার পরশির অন্যহাতে পরাবে,, এভাবেই চক্রাকারে ঘুরে ঘুটে তিনজনার হাতের চারোপাশে পরিয়ে দিবে। রাত্রি যেহেতু সাজগোজের ব্যাপারে বেশ পারদর্শী তাই তার হাতের মেহেদী ও অসম্ভব সুন্দর হয়। বিহান, বসে মনোযোগ দিয়ে বউয়ের হাতের মেহেদী ডিজাইন দেখছে,, অরুন ফোন ঘেটে রাত্রির জন্য মেহেদী ডিজাইন বের করছে। অর্পনা উপর থেকে দ্বীপের বাহু ধরে টানতে টানতে নিচে নামালো, এসব মেহেদী অনুষ্ঠান ভালো লাগেনা দ্বীপের, আগে কখনো এটেন্ড ও করেনি আর মাদুরে বসা তো তার একদম অপছন্দের কিন্তু উপায় নেই। অর্পনা ওকে টেনে টুনে এনে মাদুরের উপর বসালো।
,,, দ্বীপ অর্পনার পাশাপাশি বসলেও তার দৃষ্টি ফোনে,, কিযে বিরক্ত হলো অর্পনা। এই লোকটাকে সে এতো কষ্ট করে টেনে টুনে আনলো কই তার দিকে তাকিয়ে থাকবে তা না ফোনের দিকে তাকিয়ে আাছে। অর্পনা খপ করে ফোনটা কেড়ে নিলো সাথে সাথে ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকালো দ্বীপ। এরকম হুট করে টেনে নেওয়ায় কে টেনেছে সেটা না বুঝেই এভাবে তাকিয়েছে,, মিয়িয়ে গেলো অর্পনা, শঙ্কোচ ভরা দৃষ্টিতে তাকালো,, ধমক দিবে নাকি? ওর দৃষ্টি দেখে দমে গেলো দ্বীপ,, নিজেকে শান্ত করে নরম সরে বললো — এভাবে হুট হাট ফোন ধরে টান দিতে নেই সোনা, আমি তো কাজ করি। যদি কোনো ডকুমেন্ট ডিলেট হয়ে যায়?
,,, অর্পনা জানতো না দ্বীপ যে ফোনেও কাজ করে, সে নিজের ভুল বুঝতে পেরে ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বললো — সরি!! বাট এখন কাজ না করুন,, আমরা একসাথে আছি না? বউয়ের সাথে থাকলে কাজ করা ব্যাড ম্যানার্স।
,,, দ্বীপ ঠোঁট বাকিয়ে ক্ষিন হাসলো,, ডকুম্যান্ট ফাইল থেকে বের হয়ে ফোনটা অর্পনার কাছেই ফিরিয়ে দিলো,, অর্পনা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই বললো– রাখো তোমার কাছে।
,,, অর্পনা কোলের উপর রাখলো, দ্বীপ একটা হাত অর্পনার পিছনে নিয়ে ওর কোমর টেনে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো, আপাতো দৃষ্টিতে দ্বীপের হাতের অবস্থান টের না পাওয়া গেলেও অর্পনা অনুভব করছে তার পুরুষটা তাকে নিরবে আগলে রেখেছে। দ্বীপ অর্পনার থেকে নজর সরিয়ে মেধার হাতের দিকে তাকালো। জীবনের এতোগুলো বছরে দ্বীপ কখনোই মেহেদী পরা হাত দেখেনি। এটা অস্বাভাবিক হলেও সত্যি,, দ্বীপ আগে এতোটাই বেখেয়ালি ছিলো যে চাঁদ রাতের দিন বাড়ি ফিরতো ভোর রাতে, সারা রাত ক্লাবে ছেলে পুলে বন্ধু বান্ধবের সাথে আড্ডা দিতো। সকালে ঘুম থেকে উঠে সবার শেষে ঈদের নামাজ পড়তে যেতো। নামাজ পরে বাড়ি ফিরে একটু মিষ্টি, শেমাই খেয়ে বাড়ি থেকে বের হতো আবার ফিরতে ফিরতে বিকাল। তাও ফিরতে চাইতো না, রোমানা বেগম রান্নাবান্না করে বার বার ফোন দিয়ে একপ্রকার বাড়ি ফিরতে বাধ্য করতো। দুভাই বিকালে এসে দুপুরের খাবার খেয়ে বেরুতো আবার ফিরতো রাত বারোটায়। তখন পরশী ঘুমে কাদা। মেধা খুব একটা বাংলাদেশে থাকতো না,, দ্বীপ অসুস্থ হওয়ার দের বছর আগে আরিবের জন্ম হয়েছে,, এতোকিছুর মাঝে ভাইবোনদের সাথে সময় কাটানো হয়ে উঠেনি, নিজ হাতে সালামি দেওয়া হয়নি, যা দিয়েছে যার যার একাউন্টে ট্রান্সফার করে দিয়েছে। তাছাড়া অন্য কোনো নারীর দিকে তাকানোর আগ্রহ ও জাগেনি কোনোদিন,, যার ফল স্বরুপ আজো পর্যন্ত তার মেহেদী পরা হাত দেখা হয়ে উঠেনি। দ্বীপ মেধার হাত থেকে নজর সরিয়ে অর্পনার দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো — তুমি এটা পরবেনা?
,,, অর্পনা নাকোচ করে বললো– নাহ!! আমি এসব পছন্দ করিনা, বিরক্ত লাগে।
,,, ওহ আচ্ছা!!
,,, অর্পনার কেনো যেনো মনে হলো লোকটা তার কথায় সন্তুষ্ট হয়নি কিন্তু কি করার? সে তো এসব সত্যি ই পছন্দ করেনা। অর্পনা আর দ্বীপ এসে বসতেই মেধা বললো —
,,, চলো তাহলে এবার আমরা গেমটা খেলি, সবার বেশ ভালো লাগবে।
,,, মেয়েরা সবাই শায় জানালো, বিহান তার বউয়ের কথায় শায় জানাতে বাধ্য,, পল্লব কিছুটা অন্যমনোষ্ক,, অরুনের সমস্যা নেই,, সে আড্ডায় শামিল হতে প্রস্তুত। দ্বীপের ভাবান্তর নেই সে মুলত অর্পনার জন্য এখানে এসে বসেছে। ওভাবে বুকে মাথা রেখে আবদার করলে ফিরানো দায়, দ্বীপ মেয়েটাকে এড়াতে পারেনা। অর্পনা কিছুটা দ্বীধা নিয়ে বললো– প্লিজ ট্রুথ ডেয়ারের কথা বলো না,, আমার কাছে ওটা জাস্ট ডিজগাস্টিং লাগে।
,,, মেধা সাথে সাথে নাকোচ করে বললো– ওহুম!! এটা থ্রুট ডেয়ার না,, এই গেমটা মেইনলি আমি নিজে আবিষ্কার করেছি আর নাম দিয়েছি “” এক্সপেকটেশন বাই রিয়্যালিটি “”
,,, পরশী হাতে ফু দিয়ে মেহেদী শুকাচ্ছিলো, এরুপ নাম শুনে কৌতুহল নিয়ে বললো — মানে? এটা আবার কি কালারের গেম? জীবনেও তো নাম শুনিনি।
,,, শুনার কথাও না, বলেছিতো এটা আমার নিজের তৈরি করা গেম। আর এটার মানে হচ্ছে,, আমরা আমাদের জীবনে জীবন সঙ্গি আসার আগে যেমন জীবনসঙ্গি চেয়েছি,, বর্তমানে কি তেমনটাই পেয়েছি? নাকি অন্যরকম? কতোটা মিল আছে? কতোটা মিল নেই? এগুলোই প্রকাশ করতে হবে। কিন্তু শর্ত আছে,, কোনোভাবেই উত্তর শুনে জীবনসঙ্গীর উপর রাগ অভিমান করা যাবে না। সবাইকে মন খোলা উত্তর দিতে হবে,, এবার বলো সবাই রাজি?
,,, সবাই রাজি হতেই পরশি হৈহৈ করে উঠলো, পরোক্ষনেই কিছু একটা ভেবে মুখ কাদো কাদো করে বললো– কিন্তু আমাদের মতো সিঙ্গেলরা কি করবে? আমাদের তো জীবনসঙ্গী হলো না,, আমরা কার কথা বলবো?
,,, বলেই পল্লবের দিকে তাকালো কিন্তু সে তাকিয়ে আছে মেধার হাতের দিকে। লোকটা কি মেহেদী আর্ট শিখছে নাকি? মেধা বললো– সিঙ্গেলদের জন্য ও শান্তনা পুরস্কার রয়েছে,, তোমরা শুধু তোমাদের এক্সপেকটেশন কথা বলবে। কেমন জীবন সঙ্গি চাও, কি পছন্দ? না পছন্দ? সব বলবে। পরে আমরা তেমন দেখে জীবন সঙ্গী খুজে বের করে তোমাদেরকে মিঙ্গেল বানিয়ে দিবো। খুশি?
,,, কথাটা ইরাদের দিকে তাকিয়ে বলেছে, ইরাদ মুচকি হেসে শায় জানালো। অর্পনা দ্বীপের বাহুতে মাথা রেখে ওর দিকে তাকাতেই দ্বীপের সাথে চোখাচোখি হলো, লোকটা তাকিয়ে ছিলো নাকি? রোমানা বেগম মেইডদের দিয়ে বিভিন্ন রকমের খাবার পাঠালেন,, মেইডরা যেতেই খেলা শুরু হলো। গেইমের নিয়মটা ট্রুথ ডেয়ারের মতোই। অরুন সবার মাঝখানে কাচের বোতল ঘুড়ালো যা ঘুরে ফিরে সেই তার কাছেই এসে পৌছালো,, হইহই করে উঠলো সবাই। অরুন একবার রাত্রির দিকে তাকিয়ে মাথা চুলকে বললো — রাগ করিস না জান!! আসলে আমার কাজিন ম্যারেজ করার বেশ ইচ্ছা ছিলো কিন্তু বড়ো হতেই তর প্রেমে ফেসে গিয়েছি। বাদ বাকি সব এক্সপেকটেশনের বাহিরে পেয়েছি,, আমার রাত জোৎস্নার চেয়েও অধিক সুন্দরী আর আদুরে। আমি কখনো ভাবতেই পারিনি আমার ভাগ্য এতোটা ভালো হবে।
,,, অভিমান করার নিয়ম না থাকলেও অভিমান হলো রাত্রির, বললো– এই জোৎস্না কে? তর কাজিন?
,,, রাত্রির কথা শুনে শব্দ করে হেসে উঠলো সবাই,, অরুন সুধরে নিয়ে বললো — নারে গাধি, জোৎস্নার রাতের কথা বলেছি। আর কাজিন কি? ওদের এখন নিজের বোনের নজরে দেখি আমি,, বোকা।
,,, রাত্রি মুখ বাকালো, নিয়ম না থাকায় বেশি রাগ দেখাতে পারলো না তবে রাগটা জমিয়ে রাখলো,, পরে ঠিক উসুল তুলে নিবে। আবার বোতল ঘুড়ানো হলে এবার ইরার কাছে থামলো। ইরাদ কিছু না ভেবেই বললো — আমি চাই আমার জীবনে এমন কেউ আসুক যে আমার উপরটা নয় ভিতরটা খুজবে,, বাহ্যিক রুপ নয় আমার ব্যাক্তিত্বের প্রেমে পরবে এবং মন থেকে আমাকে রেসপেক্ট করবে।
,,,অর্পনা সাথে সাথে বললো — হুম!! একদম সিড ভাইয়ার মতো তাইতো?
,,, ইরাদ সাথে সাথে চোখ রাঙালো অর্পনা হাসলো,, হঠাৎই কোমরে শক্ত হাতের চাপ পরতেই দ্বীপের দিকে তাকালো অর্পনা,, দ্বীপ দাত কটমট করে তাকিয়ে আছে,, অর্পনা একটু নিস্পাপ হাসলো মানে আর কখনো অন্য পুরুষের নাম নিবেনা মুখে। এবার বোতল এসে ঠেকলো অর্পনার কাছে,,, অর্পনা বললো — আমি ছোট বেলায় ড্রিম দেখতাম আমার জীবন সঙ্গি আমার পাপ্পার মতো সুপার ম্যান হবে,, সবসময় আমাকে আগলে রাখবে আর যারা যারা আমাকে কষ্ট দিবে তাদেরকে জাস্ট ফিনিস করে দিবে। সারাক্ষণ ফাইটিং গেইম আর পাপাকে ফাইট করতে দেখার পর এর থেকে বেশি কিছু ভাবতে পারিনি।আমার স্বপ্ন পূরন হয়েছে,, আমার হাসবেন্ড আলহামদুলিল্লাহ আমার ভাবনার চেয়েও বেশি পসেসিভ। তবে একটা প্রবলেম ছিলো, আমি স্মো*ক পছন্দ করতাম না অথচ উনি পারমানেন্ট স্মো*কার ছিলেন,, এখন তো ছেড়ে দিয়েছে,, আমার আর কোনো অভিযোগ নেই। আ’ম স্টিল হেপি।
,,, বলেই দ্বীপের দিকে তাকালো, দ্বীপ শান্ত দৃষ্টিতে ওর দিকেই তাকিয়ে। অর্পনার উত্তরে সবাই হইহই করে হাত তালি দিলো। এবার বোতল এসে পরলো পারশীর কাছে,, সে পল্লবের দিকে তাকিয়ে লাজুক হেসে বললো–
,, আমার জীবন সঙ্গি হবে আমার ভাইয়াদের মতো যত্নবান,, যে সারাক্ষণ আমাকে আগলে রাখবে, অনেক এফোর্ট্স দিবে আর আমার সকল আবদার পূরন করবে। সাথে আমার ভাইয়াদের মতোই সুন্দর হেন্ডসাম হবে।
,,, বিহানের কাছাকাছি ই ছিলো পরশী, সে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো– আমাদের থেকেও ভালো ছেলে এনে দিবো তকে,, একদম রানী করে রাখবে।
,,, আবারও হাত তালিতে মুখরিত হলো পরিবেশ,, এবার বোতল ঘুড়ালো বিহান, ঘুরে গিয়ে পল্লবের পায়ের কাছে ঠেকলো। বিহান পল্লবের উদ্দেশ্যে বললো — কি পল্লব বাবু? আপনি কেমন জীবন সঙ্গি চান?
,,, পল্লব বিস্তর হেসে জবাব দিলো — আমি বিয়েই করবোনা ভাইয়া তাই ওসব বাদ।
,,, মেধা বললো– কেনো কেনো? বিয়ে করবেনা কেনো শুনি? ছেকা টেকা খেয়েছো নাকি?
,,, রাত্রি বললো — হুম!! ১৮ নারীর এক্স সে।
,,, পল্লব কিছু বললো না, ইরাদ নাকোচ করে বললো — আরে না আপু, এসব মিথ্যা। আমি ওকে কলেজ লাইফ থেকে দেখছিনা? আমি বাধে কোনো মেয়ের সাথে কোনোদিন কথাই বলেনি।
,,, রাত্রি মুখ বাকালো, এই ছেলেকে দেখলেই বুঝা যায় অতিতে এক গাদা প্রেম করেছে, এখনো করে। নয়তো এতো সুন্দর ছেলে আবার সিঙ্গেল থাকে নাকি? রাতকে মুখ বাকাতে দেখে ক্ষিন হাসলো পল্লব, বললো–
,,,আমি চাই আমার জীবনে এমন কেউ আসুক যে নিজের মতো চলতে জানবে আমাকে প্রয়োজন পরবেনা, ন্যাকামি করবেনা, আবদার করবেনা, তার আবদার ভরা মুখ দেখলে যতো যাই হয়ে যাক সেই আবদার পূরন করার জন্য বুক পুড়বে না। যার মুখটা আদুরে হবেনা, যার কন্ঠ আমায় সতেজ করবে না,, যার স্পর্শ আমার জন্য সর্বনাশ হবে না, যার মুখ দেখলে তাকে ভালোবাসতে মন চাইবেনা। যার শুন্যতা আমাকে পোড়াবেনা,, যে আমার জীবন থেকে চলে গেলেও আমার চোখ ভিজবেনা,, থাকবে না ভাবলে নিজেকে পাগল পাগল লাগবেনা। আমি আগাগোড়া এমন একজনকে চাই যে আমার কাছে কোনো এক্সপেকটেশন রাখবে না।
,,, পল্লবের এহেন উত্তরে সবাই কেমন থমকে গেলো। এগুলো কারোর এক্সপেকটেশন হতে পারেনা,, এগুলো অভিযোগ। পল্লবের প্রতিটি কথার ভাজে মিশে আছে কারোর প্রতি এক অব্যাক্ত অনুভুতি। হয়তো সবকয়টাই পল্লবের সাথে হয়, হয়তো সে কাউকে ভালোবাসে আর তার আবদার পূরন করতে না পারলে বুক পুড়ে, চলে যাবে ভাবলে চোখ ভিজে উঠে,, থাকবেনা ভাবলে পাগল পাগল লাগে। সবাই থমকালেও মুখ বাকালো রাত্রি,, তার মোটা মাথায় এসব ঢুকে না। সে বললো–
,,, থাক ভাই, বাদ দে,, এই দুনিয়ায় এমন রোবট টাইপের মেয়ে ভাঙা হাড়িকেন দিয়ে খুজলেও পাওয়া যাবেনা। সুতরাং তর কোনোদিন বিয়েই হবেনা, তকে কেউ বিয়ে করবেও না।
,,, পল্লব মুচকি হেসে বললো– এজন্যই বলেছি আমি বিয়ে করবো না।
,,, সবার থমথমে মুখ দেখে শব্দ করে হেসে ফেললো পল্লব,, বললো — সবাই এতো সিরিয়াস হয়ে গেলে কেনো? কান্টিনিউ করো,, ওকে আমি ঘুড়াচ্ছি।
,,,, বলেই বোতল ঘুরালো,, এটা আবারও অর্পনার কাছে গিয়ে ঠেকলো। এটা বাদ, আবার ঘুড়ালো,, এবার পরলো দ্বীপের কাছে। থমথমে পরিবেশ মূহুর্তেই ঘোমট রুপ ধরলো। সবাই চোখ বড়ো বড়ো করে একে অপরের দিকে তাকালো। মেধা মুচকি হেসে বললো–
,,, থাক ভাইয়ার বলতে হবে না,, ভাইয়া সরি!! ধমক দিও না। তাহলে আমি কেদে ফেলবো।
,,, দ্বীপ সত্যি ই ধমক দিতো,, এমনি তার এসব পছন্দ না আবার পারশোনাল বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করবে। ইট্স জাস্ট বেড ম্যানার্স। তবে একটা কথা ভুললে চলবে না,, বাঘের ও বাঘিনী থাকে,, সিংহের ও সিংহি থাকে,, অর্পনা দ্বীপের দিকে চোখ রাঙিয়ে বললো — উনি বাদ পরবে কেনো? উনিও এখানে বসে আছে। ( আবদারের কন্ঠে) বলুন না হাসবেন্ড, প্লিজ!! তাহলে আমি ধরে নিবো আমি আপনার মনের মতো না। আমি কষ্ট পাবো বলে সত্যিটা বলছেন না।
,,, বলেই দূরে সরতে চাইলো,, কোমর চেপে আটকে দিলো দ্বীপ,, বিরক্তিকর দৃষ্টি নত করে সাবলীল স্বীকারুক্তি দিলো– জীবনসঙ্গী নিয়ে ভাবার সময় হয়নি কোনোদিন,, এক নির্জিব দুপুরে সি*গারেটের দোহাই দিয়ে আমার জীবনে প্রেম এসেছিলো, তাকে অকারনেই ভালোবেসেছি, সে সময় সুযোগ বুঝে আমায় পাগল বানিয়ে পালিয়ে গিয়েছে। তারপর আবার অজান্তে একটা সম্পর্ক এলো,, যাকে আবারও বিনাকারণে ভালোবেসে ফেললাম। আপাতত তাকে ভালোবেসে আমি অর্ধ মৃত আর আমার প্রান তার হাতেই বন্দি ,, সে পালিয়ে গেলে কাফন পরাটা বাকি থাকবে শুধু।
,,, ভালোবাসার এই স্বীকারোক্তি বড্ড অনাকাঙ্ক্ষিত ছিলো,, সেদিন ধমকের স্বরে আই লাভ ইউ বলার পর আর কখনোই ভালোবাসি বলেনি দ্বীপ,, তাকে শুনতে চাইতেও মানাও করেছে,, বলেছে আর কখনো বলবেনা। অর্পনা মেনে নিয়েছিলো,, সে নিজেও দ্বীপকে একবারের জন্য ভালোবাসি বলেনি। ভালোবাসলে বার বার ভালোবাসি ভসলোবাসি বলে জাহির ও করতে হয়না,, আচরনেই বুঝা যায়। তবুও দ্বীপের এই সরল স্বীকারোক্তি অর্পনাকে শান্তি দিলো,, সে পারুকে হিংসা করেনা। কারন সে ইম্মেচিউর নয়,, যেখানে একটা মানুষ মৃত, ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই,, তাকে কখনো কষ্ট দেয়নি,, কোনো ক্ষতি করেনি তাকে নিয়ে হিংসা করাটা বড্ড ছেলেমানুষী। অর্পনা অতোটাও ছেলেমানুষ নয়,, অতিত ভেবে বর্তমান নষ্ট করা তার ধাচে নেই। এই পর্যায়েও হাত তালির জোয়ার বইলো,,, আবার বোতল ঘুরানো হলে সেটা গিয়ে পল্লবের কাছে ঠেকলো,, বাদ পরলো এটা। আবার ঘুরানো হলে ইরার কাছে পরলো,, এটাও বাদ। তৃতীয় বারের মতো গিয়ে পরলো বিহানের দিকে। মেধা বিহানের দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচালো। বিহান গভীর শ্বাশ টেনে সরল মনে বললো–
,,, আমার ইচ্ছা ছিলো আমার জীবন সঙ্গি তীব্র চঞ্চল হবে,, কিন্তু আমার মেধা রানী বেশ শান্ত,
,,, বাকি টুকু বলার ফুসরত পেলোনা ছেলেটা,, মেধা ঠাস করে উঠে দাড়ালো। হাতে একটা মেহেদী ছিলো সেটা বিহানের দিকে ছুড়ে মেরে বললো– থাক তুই তর চঞ্চল মেয়ে নিয়ে,, মনের মতো দেখে বিয়ে করে নে। আর কখনো যদি আমার কাছে এসেছিস বিহান মির্জা তাহলে তর খবর আছে।
,,,, বলেই মেয়েটা হন হন করে উপরের দিকে যেতে লাগলো,, বিহান তাড়াহুড়ো করে উঠে দাড়ালো,, প্রেগন্যান্ট হওয়ার পর তার বউটা কেমন যেনো খিটখিটে হয়ে গিয়েছে,, বিহান মেধার পিছু পিছু যেতে যেতে বললো–
,,, আরে বউ শুন!! তুই ই তো শর্ত দিয়েছিস রাগ অভিমান করা যাবেনা, এখন তুই ই উল্টো রাগ করছিস। মেধা রানী শুনোতো,, ও মেধা!! আল্লাহ!! আমাকে কোন পাগলে পেয়েছিলো যে এভাবে বউয়ের কথা বিশ্বাস করতে গেলাম।
,,, বলতে বলতে মেধার উড়নার আচল টেনে ধরলো,, মেধা ছাড়িয়ে নিতে টানাটানি করছে। সিঁড়ির কাছে পোছাতেই জোর পূর্বক কোলে তুলে নিলো বিহান। মেধা তখনো ছুটাছুটি করছে। ওদের কান্ড দেখে খিলখিল করে হেসে উঠলো সবাই। অর্পনা আফসোসের স্বরে বললো — ইসস!! ব্যাচারা। একবার এক গুনিজন বলেছিলেন,, বউ আর বাশের চিপা একই কোম্পানির দুই মডেল। একবার ফেসে গেলে জান বাচানো দায়।
( এই গেইমটা মেবি আগে কেউ খেলেনি কারন এটার আবিষ্কারক আমি নিজে,, আর হে!! আমরা এটা আমার বড়ো মামুর বিয়েতে খেলেছিলাম। আল্লাহ!! অসম্ভব মজা হয়েছিলো। কয়েকটা কাপলের ঝগড়া বাদিয়ে দিয়েছিলাম সেদিন,, তারা বিয়ের দিন পর্যন্ত রাগ করে ছিলো আর স্বামীগুলো আমাকে দোষারোপ করেছিলো)
,,, অর্পনা পা টিপে টিপে ঘরে এলো, দ্বীপ সোফায় বসে কোলে ল্যাপটপ রেখে কাজ করছে, সামনে ফাইল পত্র সাজানো। ইসস!! লোকটা ঈদের আগের দিনো কাজ করছে, সারাদিন এতো কি কাজ? সারাক্ষণ শুধু ফোন নয়তো ল্যাপটপ নয়তো ফাইল। এসবের ভিরে যেনো তার কোনো জায়গাই নেই। অর্পনা ধীরে ধীরে দ্বীপের সামনে গিয়ে দাড়ালো, কদম এতোটাই ধীর ছিলো যে তিখ্ন বুদ্ধিজীবি দ্বীপ ও সেটা টের পায়নি। অর্পনা দ্বীপের সামনে দাড়িয়ে দুটো হাত দ্বীপের চোখের সামনে মেলে ধরলো। কাজের মাঝে হঠাৎ এমন করায় বিরক্ত হতে চেয়েও হতে পারলো না দ্বীপ। অর্পনার হাত ভর্তি মেহেদী। দুহাতের তালুর মাঝখানে সুন্দর করে দ্বীপের নাম লেখা। দ্বীপ ল্যাপটপটা সরিয়ে অর্পনার হাত দুটো হাতের ভাজে নিলো,, খুঁটিয়ে খুটিয়ে পুরোটা ডিজাইন অবলোকন করতে করতে প্রশ্ন করলো —
,,, তুমি তো পছন্দ করোনা,, তাহলে পরলে যে?
,,, আপনি চেয়েছেন তাই পরেছি।
,,, দ্বীপ অর্পনাকে টেনে কোলের উপর বসিয়ে দিলো,, হাত দুটো পরখ করতে করতে বললো — মন পড়তে জানো নাকি?
,,, অর্পনার ঠোট কিঞ্চিৎ বেকে গেলো,,চোখে মুখে রহস্যের আভাস — আমি যা জানি তা আপনি জানতে পারলে নিজের জানার ক্ষমতা হাড়িয়ে ফেলবেন।
,,, দ্বীপ ভ্রু গুটালো,, তবে খুব একটা আমলে নিলো না। এক হাতে মেহেদী ছুয়ে বললো–
,,, এটা তো শুকিয়ে গিয়েছে, ধুবেনা?
,,, অর্পনা বিরক্তিকর শ্বাস ফেলে বললো– ওহুম, ধুলে ভালো রং হবেনা। উঠাতে হবে কিন্তু উঠানোটাই আমার ঝামেলা লাগে।
,,, দ্বীপ অর্পনার বিরক্তিভরা মুখটার দিকে তাকালো। ওকে টেনে আরককটু কাছে এনে বললো– রিল্যাক্স!! আমি উঠিয়ে দিচ্ছি।
,,, বলে একটু একটু করে উঠাতে লাগলো ,, এতোক্ষণ নিচে বসে থাকায় অর্পনার পিঠ ব্যাথা হয়ে গিয়েছে। সে দ্বীপের বুকে হেলান দিয়ে বুকে মাথা রেখে চোখ বুঝে বললো — আমার ঘুম পেয়েছে,, আমি ঘুমাই?
,,, দ্বীপ চোখ নামিয়ে বুকে লেপ্টে থাকা রমনির পানে তাকালো,, হাত ছেড়ে খোপা করা চুলগুলো খুলে বেনি করে দিলো। পকেটে অর্পনার ইউজকৃত তুলি ছিলো,, দ্বীপ সচারাচর রাখে,, মেয়েটা বেখেয়ালি,, সারাক্ষণ চুল ছেড়ে রাখে,, তীব্র গরমেও চুল বাধে না তাই দ্বীপ রেখে দেয়,, যদি প্রয়োজন পরে,, এইতো এখনি প্রয়োজন পরলো। দ্বীপ বেনির শেষ প্রান্তে তুলিটা পেচিয়ে দিলো,, পরপর নিজের প্রয়োজনীয় সকল কাজ বাজ সাইডে সরিয়ে বউয়ের মেহেদী তোলার কাজে মনোনিবেশ করলো।
,,, অর্পনা মাত্রই গোসল সেরে বের হয়েছে,, দ্বীপ এখনো ওয়াশরুমে। বেলা বাজে ৬ টা ৪২। অর্পনা তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে বারান্দার পর্দাটা টেনে দিলো, তার গায়ে শুধু একটা টাওয়াল, বিছানায় ড্রেস রাখা আছে,, এজন্যই রুমে চলে এসেছে, আপাতত এখানেই চেন্জ করবে। অর্পনা মন দিয়ে চুল মুচছিলো, হঠাৎই দ্বীপের ফোন বেজে উঠায় সে এগিয়ে গেলো।ফোনটা হাতে নিতেই দেখলো “” আব্বু “” দিয়ে সেইভ করা নম্বর থেকে কল এসেছে। অর্পনা ভাবলো মাহিদ মির্জার নাম্বার তাই দ্বীপের উদ্দেশ্য বললো, — শুনছেন? আব্বু আপনাকে কল দিচ্ছে,, আমি কি ধরবো?
,,, ওয়াশরুমের দরজা খোলা থাকায় দ্বীপের কাছে সহজেই পৌছালো ডাকটা, সে উত্তরে সায় জানাতেই অর্পনা কল ধরলো অথচ ওপাশ থেকে ভেসে এলো অচেনা স্বর — আসসালামু আলাইকুম আব্বা,, ভালা আছেন?
,,, অর্পনা কিছুটা থমকালো, শব্দটাতে তার কেমন বুক কাপলো,, সে দ্বিধান্মিত কন্ঠে সুধালো — ওয়ালাইকুম আসসালাম!! কে বলছেন? আপনি তো আব্বু না, আপনি কে?
,,, ওপাশের ব্যাক্তিটি কেমন তাড়াহুরো করেই বললো — তুমি কে আম্মা? দ্বীপের বউ? অপরাজিতা?
,,, অর্পনাও তড়িৎ গতিতে ভুল সুধরে দিয়ে বললো — হ্যা!! আমি উনার বউ কিন্তু অপরাজিতা না আমার নাম অর্পনা জামান।
,,, ওপাশের ব্যাক্তিটি খানিক চুপ রইলো,, অর্পনা দু একবার ডাকার পর প্রতিত্তোর করলেন — আমারে তুমি চিনবা না আম্মা, দ্বীপ কই? তোমার কাছে আছে?
,,,অর্পনা একটু স্বাভাবিক হলো,, তাকে যেহেতু আম্মা বলে ডাকছে তাই এবার সম্মোধন করে বললো — আঙ্কেল!! দ্বীপ তো ওয়াশরুমে একটু অপেক্ষা করুন, চলে আসবে।
,,, না আম্মা, আমার কাজ আছে,, তুমি দ্বীপরে বইলো আমি ফোন দিছি, ঈদের পর তোমার স্বামীর সাথে একবার আইসো মা,, আমি আবার সময় কইরা ফোন দিমুনে।
,,, লোকটার কথায় স্পস্ট লোকটা বেশ তাড়ায় আছে,, অর্পনা নরম সরে বললো — একটু অপেক্ষা করুন, চলে আসবে।
,,, তখনি পরপর চার পাচটা গরুর ডাক শুনা গেলো। লোকটা তীব্র তাড়া নিয়ে বললো– নাগো মা, গরু ডাকতাছে খাওন দেওয়া লাগবো, তুমি দ্বীপরে বইলো,, আমি এক্কেবারে নামাজ পইড়া আইসা ফোন দিমু। রাখি, আসসালামু আলাইকুম!!
,,, অর্পনা সালামের উত্তর দিলো, লোকটা ফোনটা কেটে দিতেই সে কিছুক্ষণ থম মেরে দাড়িয়ে রইলো। লোকটা কে? তাকে চিনে নাকি? নাম তো অন্যটা বললো,, দ্বীপ আবার আব্বু দিয়ে সেভ করে রেখেছে। পরক্ষণেই বুঝলো বিষয়টা,, হয়তো অর্পনা আর অপরাজিতা নামটা কাছাকাছি বলে কারোর নামের সাথে গুলিয়ে ফেলেছে। অর্পনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুল মুছতে লাগলো তখনি ওয়াশরুম থেকে বেড়িয়ে এলো দ্বীপ, তার পরনেও শুধু তোয়ালে, অর্পনা ঠোঁট টিপে হাসলো। রাজনীতি বীদ দ্বীপ মির্জা তার সামনে কিভাবে ঘুরে বেড়ায়, বাহিরের লোক কি তা জানে? অর্পনাকে হাসতে দেখে এগিয়ে এলো দ্বীপ, হাত থেকে তোয়ালেটা নিয়ে অর্পনার চুল ভালো করে মুছে দিতে দিতে বললো — হাসছো কেনো?
,,, এমনি,,
,,, আব্বুর সাথে কথা হয়েছে?
,,, আব্বু? উনি তো আব্বু না, কে যেনো। কন্ঠ শুনিনি কোনোদিন ।
,,, হুম, ওটা তোমার শ্বশুর আব্বু না, ওটা পারুর আব্বু।
,,, পারুপুর?
,,, হুম!! কি কথা হলো?
,,, বললো আপনার সাথে উনার বাড়ি যেতে আর উনি নামাজ থেকে এসে আপনাকে কল দিবে।
,,, আচ্ছা!! বুঝলাম, জয়পুর যাবে?
,,, না না, আমি কেনো?
,,, সমস্যা কোথায়? যেতেই পারো।
,,, বোকা আপনি? উনারা কষ্ট পাবেনা?
,,, ওহুম!! বরং উনারা খুশি হবে,, হামিদ আব্বু খুব ভালো মানুষ।
,,, দ্বীপের মুখে আব্বু ডাক শুনে অর্পনার বুকটা কেমন করে উঠলো, কষ্ট হলো কোথায় যেনো,, চাপিয়ে রাখলো না,, দ্বীপের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলো — আপনি বুঝি উনাকে আব্বু ডাকেন? আমার পাপ্পাকে তো কখনো পাপ্পা ডাকতে শুনলাম না।
,,, দ্বীপ মুচকি হাসলো– তোমার পাপ্পার নম্বরটা সার্চ দেও তো,
,,, অর্পনা সার্চ দিলো, “” পাপ্পা “” দিয়ে সেভ করা। অর্পনার বুকের ভিতরে জমা অন্ধকার টুকু মিলিয়ে গেলো, অর্পনার ঠোঁটে হাসি ফুটতেই সেই ঠোঁটে চুমু খেলো দ্বীপ , বললো — এদিকে আসো চেন্জ করিয়ে দিচ্ছি।
,,, অর্পনা মানা করলো না বরং দ্বীপের উন্মুক্ত বুকে হাত রাখলো, সেখানে আলতো করে চুমু খেয়ে মধু মিশ্রিত কন্ঠে সুধালো —
,, শুনুন না হাসবেন্ড।
,,, বলুন।
,,, আমার একটা জব লাগবে
,,, জব? তুমি তো জব করতে চাওনা,, তাহলে হঠাৎ?
,,, আমার জন্য না সিমান্ত ভাইয়ার জন্য।
,,, অর্পনার মুখে অচেনা পুরুষের নাম শুনে ভ্রু গুটালো দ্বীপ,, সাথে সাথে নিশ্বাস ভারি হলো,, চোখের রং বদলালো। সে দাতে দাত চেপে প্রশ্ন করলো– কে এই বান্দা?
,,,অর্পনা দ্বীপের গলার ভাজে হাত রাখলো, আলতো করে হাত বুলিয়ে শান্ত করার প্রচেষ্ঠা চালিয়ে বললো– আরে রাগছেন কেনো? আমি পারশোনাল্লি চিনি না। আচ্ছা, আপনি সিমি আপুকে তো চিনেন?
,,, কোন সিমি?
,,, আরে পারুপুর ফ্রেন্ড, সিমিপু, এইযো পারুপুর রুম মেইট যে ছিলো,, চিনছেন না?
,,, এবার বোধয় মনে করতে পারলো দ্বীপ — হুম, তারপর?
,,, সিমি আপু আর সীমান্ত ভাইয়া ক্লাসমেইট, ভার্সিটি থেকে একসাথে পড়ালেখা, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা প্রেম। আপুর ভার্সিটি শেষ হতেই উনার বাবা অন্য একটা জায়গায় উনার বিয়ে ঠিক করেন,, উনি উনার বাবাকে রাজি করাতে পারলেও সীমান্ত ভাই রাজি করাতে পারেননি। উনার বাবা মা এতো দ্রুত ছেলেকে বিয়ে করাতে রাজি না। অগত্যা সিমি আপু বিয়ের দিন বাড়ি থেকে পালিয়ে একেবারে ঢাকায় চলে আসে। নিজে নিজে কাজ করে তিনটে বছর ধরে ঢাকায় সারভাইব করে যাচ্ছে। এখন সীমান্ত ভাইয়ের বাবা মা উনাকে বিয়ে করাতে রাজি কিন্তু সিমি আপুকে নয়। সিমি আপুর নাকি বয়স বেশি, এই বয়স্ক বউ ওরা বিয়ে করাবে না। এরুপ কথা শুনে সীমান্ত ভাই ও ঝগড়াঝাঁটি করে বাড়ি-ঘর, সম্পদ-পরিবার ছেড়ে একেবারে বেড়িয়ে এসে সিমি আপুকে এক প্রকার জোর করেই বিয়ে করে নেয়। বর্তমানে ওরা একটা ভারা বাসায় আছে,, আমি চাচ্ছিলাম যদি সীমান্ত ভাইকে একটা জব,,
,,, বলেই মাথা নত করে নিলো অর্পনা। ততোক্ষণে অর্পনার ড্রেস পরা ডান। দ্বীপ ওর নিচু করে রাখা মুখটা উপরে তুলে বললো — আমার ভাগের ৫০% সম্পদ-বিজন্যাসের মালিকানা তোমার। তুমি চাইলেই এমপ্লয়ি যুক্ত করতে পারো,, এতে আমার পারমিশ লাগবেনা।
,,, অর্পনার যেনো সম্ভিত ফিরলো,, সহসা দ্বীপের বুকে ধাক্কা মেরে চোখে মুখে অহংকার ভাব এনে বললো– ওহ, আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম। অকারনেই আপনাকে এতক্ষণ তৈলমর্দন করলাম,, টাইম ওয়েস্ট।
,,, দ্বীপ ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকালো,, অর্পনার দিকে এগুতে এগুতে বললো — কি বললে? আমাকে তুমি তৈলমর্দন করেছো?
,,, অর্পনা পিছাতে পিছাতে মাথা নাড়িয়ে হুম বুঝালো। দ্বীপ খপ করে হাত ধরতে নিলে দৌড়ে বিছানায় উঠে পরলো অর্পনা, দ্বীপ সেদিকে তেড়ে যেতে নিলে আবারও লাফিয়ে বিছানা থেকে নিচে নেমে পরলো। দ্বীপ ঘুরে ধরতে চাইলে অর্পনা প্রানপন ছুটে দরজার কাছে গেলো,, তাড়াহুড়ো করে দরজা খুলে দিলো দৌড়, হাপাতে হাপাতে আওড়ালো — আল্লাহ গো বাচাও।
,,, পিছন থেকে ধেয়ে এলো রুক্ষ গম্ভীর স্বর– এই মেয়ে, দাড়াও। পরে গিয়ে ব্যাথা পেলে কপালে দুঃখ আছে।
,,, কে শুনে কার কথা? সে দৌড়ে করিডর পেরিয়ে সিরি বেয়ে একবারে নিচে এসে থামলো,, লম্বা চুল গুলো ভিজে চুপচুপা, ড্রাই করার সুযোগ পেলো না যে। শ্বাশুড়ি রান্নাঘরে শেমাই পাকাচ্ছে, চাচি শ্বাশুড়ি মেঝেতে বসে নারু, লাড্ডু, সন্দেশ পাকাচ্ছে।অর্পনাকে তাড়াহুড়ো করে নামতে দেখে ডাকলেন সাথি বেগম,,
,,, কি হয়েছে আম্মু, এভাবে ছুটছো কেনো?
,,, অর্পনা ছুটে এসে চাচি শ্বাশুড়ির সামনে দাড়ালো,, কৌতুহল নিয়ে প্রশ্ন করলো — আন্টি!! তুমি এসব নিজে বানাতে পারো? কত্তো সুন্দর হচ্ছে।
,,, সাথী বেগম এক গাল হেসে বললেন — খাবে?
,,, অর্পনা মাথা নাড়িয়ে না বুঝালো পরপর ধপ করে বসে পরলো সাথি বেগমের পাশে, নাড়ুর পুর হাতে নিয়ে বললো — আমিও বানাই?
,,, সাথী বেগম শায় জানালেন, নারকেলের পুরটা একটু গরম, অর্পনা ফু দিতে দিতে গোল গোল করে হাত ঘুড়াতে লাগলো কিন্তু পুরটা পুরোপুরি গোল হচ্ছেনা, ভেঙে যাচ্ছে। অর্পনা বিচলিত, আন্টিরটা গোল হলে তারটা কেনো হচ্ছেনা? অর্পনার চোখ মুখ দেখে বিষয়টা আন্দাজ করলেন সাথি বেগম, উৎসাহ দিলেন– প্রথমবারে অসম্ভব সুন্দর বনিয়েছো,, সময় নিয়ে চেষ্টা করো আরও ভালো হবে।
,,, অর্পনা এবার সময় নিয়ে হাত ঘুড়াতে থাকলো। ক্ষনে ক্ষনে চাচি শ্বাশুড়ির হাতের দিকে তাকাচ্ছে আর হাত ঘুরাচ্ছে। অর্পনা আধা ঘন্টা সময় নিয়ে নয়টা নারু বানিয়ে আরেকটাতে হাত দিতেই রান্নাঘর থেকে ভেসে এলো রোমানা বেগমের স্বর — এইযে মেয়ে,, একটু এদিকে এসো।
,,, বহুদিন পর শ্বাশুড়ির ডাক শুনে ভ্রু কুচকালো অর্পনা, চাচি শ্বাশুড়ির দিকে তাকিয়ে ইশারায় জানতে চাইলো তাকে ডাকছে নাকি? সাথি বেগম মাথা নাড়িয়ে শায় জানালো। তৎক্ষনাৎ রান্নাঘর থেকে আবার ডাক এলো — কানে কথা যাচ্ছেনা? ডাকছি তো নাকি? শ্বাশুড়ি না মানো, চাচি শ্বাশুড়ি তো হই।
,,, অর্পনা এবার শিউর হলো তাকে ডাকছে,, সে একটা নারু মুখে দিয়ে আর পাঁচ ছয়টা হাতে নিয়ে রান্নাঘরে গেলো। অর্পনার উপস্থিতি টের পেয়ে রোমানা বেগম বললেন — আমার ছেলে সবরকম মিষ্টি-ডেসার্ট খায়না,, সে সুগার ফ্রী খাবার খায়। এখন বেচে আছি, শিখে নেও, কে জানে কবে মরে যাই?
,,, অর্পনা গিয়ে শ্বাশুড়ির পাশে দাড়ালো, উকি ঝুকি দিয়ে দেখলো শ্বাশুড়ি কি কি বানিয়েছে। অর্পনার পাপ্পা শুধু একটা শেমাই রান্না করতে পারে সেটা হলো দুধে ভিজানো শেমাই, অর্পনা ঈদে ওটাই খেতো৷ সাথে আরও অনেক ডেসার্ট থাকতো তবে সেসব রেস্টুরেন্ট থেকে অর্ডার করা। মাঝেমধ্যে এমন ও সময় গিয়েছে পাপ্পা ডিউটির কারনে অন্য বিভাগে থাকতো, তখন তাকে একা একাই ঈদ কাটাতে হতো। তখন তো রুম থেকেই বের হতো না, সারাদিন কানে হেডফোন লাগিয়ে অনলাইন গেইম খেলতো নয়তো ঘুমিয়ে থাকতো। সেসব এখন অতিত, এবারের ঈদটা বড্ড স্পেশিয়াল। এইতো এবার ও পাপ্পা ঢাকায় নেই, নোয়াখালী আছে,, সকালে জানালো দুদিন পর ফিরবে তবুও তার একা একা লাগছেনা,, বড্ড সুখ সুখ লাগছে। রোমানা বেগম ছেলের বউয়ের আপাদমস্তক পরখ করে বিরক্তির স্বরে বললেন– চুলের এই হাল কেনো? ভিজে ভুজে একশা,, ঠান্ডা লাগবে না?
,,, অর্পনার বলতে ইচ্ছা করলো, আপনার ষাড়ের মতো ছেলেটা আমাকে পিছন থেকে তাড়া করেছে বলেইতো আমার চুল ভিজা আরও একটা কারন আছে সেটা হলো আপনার ছেলে কালকে রাতে চরম অবাধ্যতা করেছে। এই দুটো কারনেই আমার চুল ভিজা কিন্তু বলতে পারলো না, সব কথা সবখানে বলা ঠিক না। অর্পনাকে চুপ থাকতে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন রোমানা বেগম,, নিজের শাড়ির আচল দিয়ে ভালো মতো মুছে দিতে লাগলেন চুল গুলো। অর্পনা ঠোঁট বাকিয়ে হেসে বললো — শ্বাশুমা!! আপনি কি আমার প্রতি কেয়ারিং?
,,, একদমি না,,
,,, বুঝি বুঝি, বুঝলেন? আমার মতো বউমা কোনো শ্বাশুড়ি ই হাত ছাড়া করতে চায়না। যাই বলেন আর তাই বলেন,, আপনার পোলাটা কিন্তু জোস, একদম কর্ড়া।
,,, তুমি কি কোনদিন ভদ্র হবে না?
,,, শুনুন শাশুমা!! পৃথিবীতে ভালো মানুষের দাম নেই। আজকে আমি আপনাকে একবেলা ভাত খাওয়াবো আপনি কালকে ভুলে যাবেন কিন্তু আমি যদি আজকে আপনার সামনে থেকে খাবার কেড়ে নেই তাহলে আপনি সারাজীবন আমাকে মনে রাখবেন। মনে রাখানোর জন্য হলেও অভদ্র হওয়া জড়ুরি।
,,, রোমানা বেগম অর্পনার চুল গুলো হাত দিয়ে ঝেড়ে দিতে দিতে বললেন — অনেক জ্ঞানের কথা বলেছেন মা, এবার দাড়ান এখানে,, শেমাই রান্নাটা দেখুন৷
,,, অর্পনা সেকেন্ডের গতিতে কিচেন ক্যাবিনেটের উপর উঠে বসলো, — শুরু করুন, আমি দেখছি। যদিও আপনার ছেলের ভাগ্যে আমার রান্না খাওয়া নেই তবুও বলছেন যখন শিখেই নিচ্ছি।
,,,, রোমানা বেগম তপ্ত শ্বাস ফেললেন,, উনি ভাবতেও পারেননি ওনার জেদি ছেলেটার বউ এমন উড়নচণ্ডী হবে। এখন আর ভেবে কি হবে? যা হওয়ার তো হয়েই গেলো।অগত্যা ভাবনা রেখে অর্পনাকে দেখিয়ে দেখিয়ে দুই প্রকার মিষ্টি বানালেন একটা খেজুর আর বাদাম দিয়ে আরেকটা ছানা আর সুগার ফ্রী পাওডার দিয়ে,, অর্পনা উড়না দিয়ে বাতাস করতে করতে দেখলো সেসব,, মাঝে নাড়ু শেষ হয়ে যাওয়ায় কিচেনের উপর তলা থেকে পপকর্ন নামিয়ে খেলো মাঝেমাঝে শ্বাশুড়িকেও সাধলো,, উল্টাপাল্টা প্রশ্ন করলো,, যেমন এটা কি? এটা কেনো দেয়? না দিলে কি হবে?ছানা ছাড়া ছানার মিষ্টি কিভাবে বানায়? ছানা কাটাতে ভিনেগার লাগে কেনো? আগের দিন বাহিরে রেখে দিলেই তো দুধ নষ্ট হয়ে যাবে পরে জ্বাল করলে এমনি ছানা কেটে যাবে,, অনার্থক টাকা নষ্ট। আপনাকে বিয়ে করে বড়ো আব্বুর শুধুই লস হলো,, আপনি আয় উন্নতি করতে জানেন না। শ্বশুরির হাতের সাথে হাত মিলিয়ে দেখলো কে বেশি ফর্সা। আরও অনেক রকম উদ্ভট প্রশ্ন, কাজ করলো আর এই সবকিছু করলো একমাত্র শ্বাশুড়িকে জ্বালাতে,, অভদ্র ডাকটা তার বড্ড প্রিয় আর শ্বাশুড়ির মুখ থেকে শুনাটা আরও বেশি প্রিয় হয়ে দাড়িয়েছে। রোমানা বেগম দাতে দাত চেপে সহ্য করে গেলেন,, কপাল করে বউমা পেয়েছে বলে কথা। উনার জীবন পোড়াতে জ্বালানীর প্রয়োজন নেই, বড়ো ছেলের বউটাই যথেষ্ট। রোমানা বেগম এবার সুগার ফ্রী শেমাই রান্না করতে নিলেন,, কিছু একটা ভেবে অর্পনাকে বললেন– ছেলের বউ!! আপনাকে যদি এক কাপ কফি দেই,, আপনি কি কিছুক্ষণের জন্য এই উদ্ভট প্রশ্ন গুলো করা বাদ দিবেন?
,,, অর্পনা ভাবলো পরোক্ষনেই শ্বাশুড়ির দিকে চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বললো — ঘুষ দিতে চাচ্ছেন? দিতে চাচ্ছেন যখন দিন,, থাকবোনে কিছুক্ষণ চুপ।
,,, রোমানা বেগম সস্থির নিশ্বাস ফেলে এক কাপ কফি বানিয়ে দিলেন, অর্পন নিলো পরপর শ্বাশুড়ির রান্নায় মনোযোগ দিলো। দ্বীপ, বিহান নামাজের জন্য রেডি হয়ে নিচে নেমেছে,, বিহান গিয়ে দুটো লাড্ডু একসাথে মুখে পুরে নিলো। ওর কান্ডে বিরক্ত হলো দ্বীপ, হনহন করে চলে যেতে নিয়ে চোখ আটকালো রান্নাঘরে। এরুপ দৃশ্য পৃথিবীর প্রতিটি ছেলের স্বপ্ন,, মা আর বউকে একসাথে হাসতে দেখলে একজন পুরুষের মনে আর কোনো দুঃখ থাকেনা। ঈদের এই দিনটাতে এরুপ দৃশ্য দেখে দ্বীপের মনে জমা রাগটুকু মিলিয়ে গেলো, সে এগিয়ে গেলো রান্নাঘরের দিকে,, পিছন থেকে মাকে জড়িয়ে ধরলো। হঠাৎ পরিচিত ঘ্রাণ আর আচানক কান্ডে চমকে উঠলেন রোমানা বেগম। দ্বীপ মায়ের মাথায় চুমু খেয়ে বললো — ঈদ মোবারক আম্মু।
,,, রোমানা বেগম দ্বীপকে ছাড়াতে চেয়ে বললেন– আমি কারোর মা না, ডাকার হলে নিজের মাকে গিয়ে মা ডাকুক। আমায় যেনো সবাই চাচি বলেই ডাকে।
,,, দ্বীপ আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো — আচ্ছা!! বিহানকে বলবো চাচি বলে ডাকতে,, আমার আম্মু শুধুই আমার আম্মু।
,,, হয়েছে, আর বাচ্চামি করতে হবেনা। আজ তোমার বউকে ডেকে কথা বলেছি বলে এসেছো, এমনিতে তো মাকে মনেও পরেনি।
,,, পরেছে আম্মু,, আমাকে ছাড়া তুমি যতটা কষ্ট পেয়েছো আমিও ততোটাই কষ্ট পেয়েছি বরং একটু বেশি ই কষ্ট পেয়েছি।
,,, তাহলে আসলে না কেনো?
,,, তোমার জন্য এই বাড়িতে অনেকেই আছে আম্মু কিন্তু আমার অর্পনার জন্য আমি ছাড়া কেউ নেই। যেদিন আমি ছাড়াও ওর জন্য তোমরা থাকবে সেদিন আমায় এতো কঠোর হতে হবেনা, তোমরাই ওকে আগলে রাখতে পারবে। থাকো আম্মু, লেইট হয়ে যাচ্ছে,, ( মাকে ছেড়ে অর্পনার কাছে গিয়ে ওর কপালে চুম্বন করে) যাচ্ছি সোনা, রান্না শিখে দ্রুত রেডি হও,, ফিরে এসে যেনো তোমায় দেখে আমি একদম থমকে যাই।
,,, বলেই যেই তরে এসেছিলো সেই তরে চলে গিয়েছে লোকটা, ফেলে গিয়েছে এক হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকা রমনিকে। কেউ কাউকে এতোটা অধিকার নিয়ে পরিচয় করায় বুঝি? আমার অর্পনা,, এতে কতোটা অধিকার লুকিয়ে থাকে? কতোটা ভালোবাসা থাকে? রোমানা বেগম ও অবাক হলেন,, কে বলবে উনার ছেলেটা রগচটা, অধৈর্য, নিয়মহীন। দিনকে দিন ছেলেটা কতো পরিপাটি হচ্ছে, সংসার মানে বুঝছে, বউকে আগলে রাখছে,, এই উড়নচণ্ডীর মাঝে বুঝি এতো মায়া আছে? যেই মায়ায় উনার ছেলেটা এতো গোছানো হয়ে যাচ্ছে? রোমানা বেগম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন ছেলের বউকে,, অল্প একটু মায়া খুজতে গিয়ে অসীম মায়া খুজে পেলেন। মনে পরে গেলো, সেদিনের বলা কথা গুলো। মেয়েটাকে কতো ভাবে আঘাত করেছিলেন তিনি, চোখ জোড়া জ্বালা করে উঠলো,, নমনীয় স্বরে জিজ্ঞেস করলো,,,
,,,আমার কথায় সেদিন খুব কষ্ট পেয়েছিলে?
,,, অর্পনা কেমন করে যেনো হাসলো — আমের পোকারা জানেনা মিষ্টির সাধ কি, কারন তারা মিষ্টির মধ্যেই জন্মায়। আমিও জানিনা কষ্ট কি কারন,,, কারন কিছুই না, নাথিং!!
,, বলেই ক্যাবিনেট থেকে লাফিয়ে নেমে পরলো ,, যেতে যেতে হাত উচিয়ে বললো– বায় শাশুমা, টাকা রেডি করুন। আমার কিন্তু সালামি চাই।
,, তপ্ত শ্বাস ফেললেন রোমানা বেগম,, সেদিন মেয়েটার মা বাকে নিয়ে একটু বেশি ই বাজে কথা বলেছিলেন তিনি,, অনুসূচনা হচ্ছে
,, মির্জা বাড়ির রান্নাঘরে এখন তুমুল হাড়ে রান্নার ধুম পরেছে,, বিরিয়ানি, কাবাব, কোরমা, নানান পদের চিকেন, কয়েক রকম গোস্ত, একটার পর একটা রান্না চাপাচ্ছেন দুই জা মিলে,,এই রান্না বেলা সারে বারোটা পর্যন্ত অব্যহত থাকবে তারপর জোহর নামাজ পরে সবাই একসাথে বসে খাওয়া দাওয়া করবে। অর্পনার বন্ধু বান্ধবরাও দুপুরের দিকেই আসবে,, রোমানা বেগম অবশ্য বলেছিলেন যেনো তাদের সকাল সকাল ডেকে নেয় কিন্তু অর্পনা মানা করেছে। ওদের ও পরিবার আছে,, পরিবারের সাথে ঈদ পালন করে তারপর নাহয় আসুক। এই ঈদটা অর্পনার জন্য যেমন স্পেশাল তেমনি পুরো মির্জা বাড়ির জন্য ও স্পেশাল। বাড়ির ছেলে দুটো সাথে আছে বলে কথা সাথে কতো কতো মেহমান। সবার জন্যই মন ভরে রান্না করেছেন রোমানা বেগম আর সাথী বেগম।
,,, অর্পনার কপালে ছোট একটা পাথরের টিপ দিয়ে মোহিত নজরে তাকিয়ে রইলো ইরাদ,, অর্পনা এতোক্ষণ চোখ বুঝে চোখের আইলাইনার শুকাচ্ছিলো। যখন অনুভব করলো সামনের রমনিটি তার স্বামীর হক নষ্ট করছে তখনি চোখ মেলে ইদারের মাথায় চাটি মারলো। ইরাদ বরাবরের ন্যায় সাদা গাউন পরেছে তবে এর সাথে লাল উড়নাও রয়েছে,, এটা গতকাল দ্বীপ ওদের সবাইকে কিনে দিয়েছিলো,, অর্পনার ও সেইম ড্রেস পরার কথা কিন্তু পরেনি,, আগে সে তার স্বামীর মন মতো সাজবে তারপর বন্ধু বান্ধবের সাথে ম্যাচিং ম্যাচিং পরবে। মাথায় চাটি খেয়ে ভ্রু গুটালো ইরাদ,, অর্পনা আবার চাটি মেরে বললো — আমার দ্বীপের হকে নজর দিবি না,, তাহলে একদম চোখ তুলে ফেলবো।
,,, ইরাদ মুখ বাকিয়ে অর্পনার সদ্য সাজুগুজু করা গাল দুটো টেনে বললো — ওরে আমার জামাই পাগলি,, নামাজ শেষ হয়ে গিয়েছে আপনার স্বামী চলে আসবে নিচে যান।
,,, অর্পনা নিচে গেলো না বরং দৌড়ে বারান্দায় গেলো,, এখান থেকে গেইট সরাসরি দেখা যায়। অর্পনাকে বারান্দায় দেখে গার্ডরা সব সতর্ক হয়ে মাথা নিচু করে নিলো,, এই মুহুর্তে দ্বীপের বারান্দায় আগুন লেগে গেলেও সেদিকে তাকানোর সাহস তাদের নেই। অর্পনার অপেক্ষার প্রহর কাটিয়ে মির্জা বাড়ির গেইটে পরপর চারটে গাড়ি থামলো,, গাড়ি থেকে বের হয়ে গেইটের ভিতর পা রাখলো মির্জা বাড়ির ছয় পুরুষ। প্রত্যেকের পরনে সোনালী রঙা পান্জাবী আর শুভ্র পায়জামা, মাথায় ঝলঝল করছে শুভ্র রঙা টুপি।
দ্বীপ, বিহান, আরিব আর তিন শ্বশুরকে বাড়ির দিকে এগিয়ে আসতে দেখে দৌড়ে রুমে এলো অর্পনা ,, ইরাদকে নিচে আসার তাগিদা দিয়ে আবারও ছুটে গেলো নিচের দিকে। তার পরনে লাল পাড়ের গোল্ডেন শাড়ি,, দ্বীপের সাথে মিলিয়ে মিলিয়ে কিনেছে। শাড়ির পাড়টাতে মোটা করে লেইস এবং স্টোন ওয়ার্ক করা,, শাড়ির জমিনেও স্টোনের নিখুত কাজ। কানে, গলায়, হাতে শ্বাশুড়ির গহনা,, লম্বা চুলগুলো অবাধে ছেড়ে রাখা,, টুকটাক সেজেছেও মেয়েটা,, ইরাদ সাজিয়ে দিয়েছে। ওকে নিচে নামতে দেখে মেধা আর পারশীও পিছন পিছন নেমে এলো,, মেধা প্রেগন্যান্ট হওয়ায় সিরি দিয়ে ওকে ধরে ধরে নামাচ্ছে পরশী৷ মেধার পরনেও লাল পাড়ের গোল্ডেন শাড়ি, অর্পনার শ্বাশুড়ি দুজন ও একই শাড়ি পরেছে। পরশীর পরনে লাল পাকিস্তানি থ্রিপিস যার পুরোটা গোল্ডেন চেইন আর স্টোন ওয়ার্ক করা। মোট কথা পুরো মির্জা বাড়ি আজ গোল্ডেন আর লাল-সাদার সংমিশ্রণে সেজে উঠেছে। অর্পনা নিচে নামতেই সবার মুখোমুখি হলো,, দ্বীপ আরিবকে কোলে নিয়ে বিহানের সাথে কি নিয়ে যেনো আলোচনা করছিলো,, অর্পনার দিকে চোখ পরতেই কথা বন্ধ করে থম মেরে দাড়িয়ে রইলো। অর্পনা দ্বীপের দিকে তাকিয়ে একটা মিষ্টি হাসি উপহার দিলো,, দ্বীপের মনে হলো সে এই মুহুর্তে মিষ্টান্ন আহার করে ঈদের সর্বোচ্চ আনন্দ উপভোগ করেছে,, এর থেকে মিষ্টি বোধহয় অমৃত ও নয়। অর্পনা আগে শ্বশুরের কাছে গেলো,, তার শ্বাশুড়ি বেচে নেই,, আব্বুর নিজের বলতে গেলে সে আর দ্বীপ ব্যাতিত কেউ ই নেই। তাই তার সবার আগে আব্বুর কাছে যাওয়া উচিৎ। ছেলের বউকে এগিয়ে আসতে দেখে মাথায় হাত রাখলেন মাহিদ মির্জা, অর্পনা আগ বাড়িয়ে শ্বশুরকে জড়িয়ে ধরলো,, কোমল স্বরে বললো — ঈদ মোবারক আব্বু!!
,,, মাহিদ মির্জা অনুভব করলেন উনি আজ পুরো একজীবনের আনন্দ একসাথে পেয়ে গিয়েছেন,, এর থেকে সুন্দর ঈদ বোধহয় বহুদিন আগে এসেছিলো যখন দ্বীপের মা বেচে ছিলো। রাহিতা মারা যাওয়ার পর এই বেপরোয়া ছেলেকে নিয়ে কখনোই এতোটা সুন্দর ঈদ কাটানো হয়নি। তিনি ছেলের বউয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন — ঈদ মোবারক আম্মাজান।
,,, দ্বীপ এখনো বোকার মতো তাকিয়ে আছে,, সে কোথায় কার সামনে আছে জানা নেই,, তার কোলে থাকা আারিবটাও যে কখন হাত ফসকে নিচে নেমে বড়ো ভাবির কাছে চলে গিয়েছে টের পেলোনা। বিহান মেধাকে সিড়িতে দেখে দৌড়ে গেলো সেদিকে, চট করে সবার সামনেই কোলে তুলে নিলো। এটা নতুন কিছু না, মেধা প্রেগন্যান্ট হওয়ার পর থেকেই ওকে সিড়ি বাইতে দেয়না বিহান। যখন নিচে নামতে হয় কোলে করে নামায় আবার উপরে উঠাতে হলেও কোলে করেই উঠায়। মেধাকে বিহানের কাছে ছেড়ে দৌড়ে নিচে নামলো পরশী, সেও গেলো বড়ো ভাবির কাছে। আরিব বড়ো ভাবির কোমর জড়িয়ে বললো — ঈদ মোবারক বড়ো ভাবি!! আমার সালাম দাও।
,, তখনি পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো পরশী,, বললো — ঈদ মোবারক বড়ো ভাবি!! আমাকেও সালামি দাও।
,,, বাড়ির পুরুষরা বাড়ি ফিরেছে বুঝতে পেরে হাত মুছতে মুছতে রান্নাঘর থেকে বেড়িয়ে এলেন রোমানা বেগম,,, মেয়ের আবদার শুনে ধমকে উঠলেন — বড়ো ভাবির কাছে সালামি চাচ্ছো কেনো? ভাবি কত থেকে দিবে? ভাইয়াকে চোখে দেখছো না? ভাইয়ার কাছে যাও।
,,, পরশী মুখ কাদো কাদো করে সরে এলো,, অর্পনা শ্বাশুড়ির বিরোধিতা করে পরশী আর আরিবের গাল ছুয়ে বললো — ভাবি কতথেকে দিবে মানে? ভাবি কি গরিব নাকি? তোমরা অপেক্ষা করো আমি আসছি।
,,, মেয়েটা যেই তোরে এসেছে,, সেই তোরেই আবারও দৌড়ে উপরে চলে গেলো,, দ্বীপ এখনো ঠাই দাড়িয়ে মেয়েটার পদাচরন খেয়াল করছে। মাহিদ মির্জা, শাহিন মির্জা, মাহিন মির্জা সোফায় বসলেন,, মাহিদ মির্জার পা এখন বেশ খানিকটা ভালো হয়েছে,, তিনি হাটতে চলতে পারেন। মাহিদ মির্জা বসেই রোমানা বেগমের উদ্দেশ্যে বললেন — রোমানা, সাথীকে ডাকো,, সালামি নিয়ে যাও।
,,, মির্জা বাড়িতে দারুণ একটা নিয়ম বহাল রেখেছেন মাহিদ মির্জা,, তিনি ছোট ভাই থেকে শুরু করে ছোট ভাইয়ের বউ, ছেলে মেয়ে সবাইকে ঈদে সালামি দেন। শাহিন মির্জা, মাহিন মির্জাও একই পথের পথিক। সবার জন্য বরাদ্ধ করা সালামি গুলো সবাইকে দিয়ে দিলেন। সাথী বেগম, রোমানা বেগম সালামী নিয়ে আবারও রান্নাঘরে চলে গেলেন। অর্পনা চলে যেতেই দ্বীপ সম্ভিত ফিরে পেয়ে বাবা চাচার সাথে বসেছে,, মেধাকে নামিয়ে দিয়ে বিহান ও বসেছে দ্বীপের পাশে। মাহিদ মির্জা, শাহিন মির্জা, মাহিন মির্জার থেকে সালামি নেওয়ার পর মেধা, পরশী, আরিব দ্বীপ বিহানের কাছে গেলো। দ্বীপ আগে থেকে সালামি ঠিক করে রাখেনি তাই বলেছে একাউন্টে ট্রান্সফার করে দিবে,, এগুলো পুরোনো অভ্যাস তাই তিনজন ভালোই খুশি হলো কারন ভাইয়া একাউন্টে পাঠালে মোটা এমাউন্ট পাঠায়। সামনাসামনি নিশ্চয়ই এতো টাকা দিবেনা? তবে বিহান আগে থেকে টাকা রেডি করে রেখেছিলো। সে তিনজনার হাতে তিনটে খাম ধরিয়ে দিলো আর আরেকটা খাম পকেটে রেখে দিলো। এটা তার বদমাশ বোন টোনের। রুমে আরও চারটা রেডি করা আছে সেসব দুপুরে অর্পনার বন্ধু মহলকে দিবে। মেধা তার জন্য বরাদ্বকৃত খামটা নিয়ে বিহানের উদ্দেশ্যে বললো — এখন বোনের সালামি দিয়েছো,, ঘরে গিয়ে বউয়েরটা দিবে,, ঠিক আছে?
,,, বিহান মেধার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বললো– আপনি বললে জান কোরবান মেডাম,, টাকা পয়সা তো হাতের ময়লা।
,,, মেধা লজ্জা পেলো,, আব্বুদের সামনে কিসব কথা বলছে এই লোক? আদব কায়দা কবে শিখবে? অর্পনা ছুটতে ছুটতে নেমে এলো,, হাত ভর্তি খাম। বসার ঘরে পা রাখতেই দ্বীপ সোফার হাতলে হাত রেখে বৃদ্ধাঙ্গুল আর তর্জনী আঙুল থুতনিতে ঠেকিয়ে অর্পনার দিকে তাকিয়ে রইলো,, মেয়েটাকে দেখে তার গলা শুকিয়ে গিয়েছে,, অর্পনার নরম উষ্ঠের অল্প একটু ছোয়া পেলে বিষয়টা মন্দ হতো না বরং দ্বীপের তৃষ্ণা কিছুটা কমতো। অর্পনা পরশী, আরিব আর মেধার হাতে তিনটে খাম ধরিয়ে দিলো। মেধা অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো — আমায় কেনো? আমি তো বড়ো।
,,, অর্পনা মুচকি হেসে রিপিট প্রশ্ন করলো — আমি তোমার বড়ো জা না?
,,, মেধা আর কিছু বলতে পারলো না তবে বেশ খুশি হয়েছে,, সালামির সংখ্যা বেড়েছে যে? অর্পনা এবার বিহানের সামনে গেলো। একটা খাম এগিয়ে দিয়ে বললো– বিহানের বাচ্চা!! আপনি যদি আমাকে সুন্দর করে ভাবি ডেকে ঈদ মোবারক বলেন তাহলে আপনাকে সালামি দেওয়া হবে।
,,, বিহান অর্পনার বাড়িয়ে দেওয়া খামটা খপ করে টেনে নিয়ে বললো — বদমাশ ভাবি!! ঈদ মোবারক।
,,, অর্পনা মুখ বাকালো, ভালো কথা বললেও বিহানের বাচ্চা তার বদনাম করে। এবার গেলো তিন চাচা শ্বশুরের সামনে,, বললো — আমার পাপ্পা তো আমাকে মাম্মা বলে ডাকে তাই আমি প্রতি ঈদে আমার পাপ্পাকে সালামি দেই,, এবারেও পাপ্পার জন্য রেখেছি। আপনারাও তো আমাকে আম্মা ডাকেন তাই এগুলো আপনাদের।
,,, বলেই তিনটে খাম এগিয়ে দিলো। আবেগে আপ্লুত হলেন তিন ভাই,, সবচেয়ে বেশি আবেগ ঘন হলো মাহিদ মির্জার মন। তিনি বরাবরই ছোট ভাইদের সালামি দেন কিন্তু সবার বড়ো হওয়ার খাতিরে বহুদিন সালামি পাওয়া হয়না,, আগে উনার আব্বা, চাচারা দিতো। তারাও বেচে নেই,, উনার ভাগেও সালামি পরেনা। তিন ভাই এক গাল হেসে ছেলের বউয়ের থেকে সালামি নিলো আবার ছেলের বউকেও দিলো। অর্পনা এবার হাতে থাকা অবশিষ্ট খাম দুটো নিয়ে রান্নাঘরের দিকে যেতে নিলো তখনি নজর আটকালো দ্বীপের দিকে,, লোকটা শুরু থেকে ওর দিকে আর ওর হাতের দিকে তাকিয়ে আছে। লোকটা কি চাচ্ছে অর্পনা উনাকে সালামি দিক? সে দ্বীপের সামনে দাড়িয়ে ভ্রু কুচকে বললো — আমার হাতের দিকে তাকিয়ে আছেন কেনো? আপনাকে একদম সালামি দেওয়া হবে না। হাসবেন্ডরা কখনো বউয়ের থেকে এসব পায়না,, তাই তাকিয়ে থেকে লাভ নেই।
,,, বলেই চলে গেলো,, দ্বীপ বিরক্ত হলো। সে কি এই মেয়ের টাকার দিকে তাকিয়ে ছিলো নাকি? সে তো মন দিয়ে অর্পনার মেহেদী রঙা হাত দুটো পরখ করছিলো। মেহেদী দিলে মেয়েদের হাত এতোটা সুন্দর হয় নাকি? দ্বীপ তো জানতো না,, সে কেমন অপ্রস্তুত হয়ে পরছে।
,,,, অর্পনা একরাশ বিরক্তি নিয়ে রুমে এলো,, নিচে তার বন্ধুরা বসে আছে আর এই লোক তাকে বার বার মেসেজ পাঠাচ্ছে রুমে আসার জন্য । খাওয়া দাওয়া শেষে শ্বশুর চাচা শ্বশুররাও নিচেই বসে আছে,, এভাবে চলে আসায় কি ভাব্বে? রুমে এসে পা রাখতেই হুট করে ওর হাত টেনে ধরে ওকে দেওয়ালের সাথে মিশিয়ে নিলো দ্বীপ,, খট করে দরজাটা লক করে দিলো। হাসফাস করে উঠলো অর্পনা,, লোকটা ঝুকে দরজা লক করায় একদম লোকটার বুকের সাথে মিশে গিয়েছে সে,, অনুভব করলো লোকটার খরখরা একটি হাত ওর শাড়ি বেধ করে উন্মুক্ত উদর ছুয়েছে,, কেপে উঠলো মেয়েটা,, দেয়ালের সাথে আরও সিটিয়ে গেলো। দ্বীপ অর্পনার মুখমুখি দাড়িয়ে আপাদমস্তক পরখ করে ছেড়ে রাখা আচলটা গুটিয়ে উপরে তুলে নিলো। লজ্জায় চোখ বুঝে নিলো অর্পনা,, কোমরে ঠান্ডা কিছুর স্পর্শ পেটেই থরথর করে কেপে উঠলো সম্পূর্ণ কায়া। যখন বুঝলো দ্বীপ তার কোমরে কিছু একটা লাগাচ্ছে তখন ধীরে ধীরে চোখ খুলে নিজের কোমরে তাকালো। একটা মাঝারি সাইজের চেইন ওর কোমরে পরিয়ে দিচ্ছে দ্বীপ,, চেইনটা স্বর্নের তবে তাতে ছোট ছোট হিরা চকচক করছে।
চেইন পরানো শেষ করে মাদকিয় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো দ্বীপ। সর্বনাশা লক্ষন পেয়ে দ্রুত শাড়ির আচল নামিয়ে দিলো অর্পনা,, রুমে এসি চলা সত্বেও লোকটার কপালে ঘাম জমা হয়েছে,, অর্পনা আচল টেনে মুছে দিলো সেটা,, দ্বীপ সন্তর্পণে অর্পনার হাতটা একহাতে ধরে নিলো পরপর অন্য হাতটা ধরে দুটো হাত দুহাতের আজলায় নিলো। একবেলায় তীব্র রং ধারন করেছে,, হলুদ ফর্সা হাতে খয়েরী রংটা চকচক করছে। এই হাত দুটো সারাদিন জ্বালিয়েছে তাকে,, অর্পনা যখন খাবার টেবিলে খাবার বেড়ে দিচ্ছিলো দ্বীপ তখন তীব্র তৃষ্ণা নিয়ে ওর হাত দুটোর দিকেই তাকিয়ে ছিলো। এখন সেই তৃষ্ণা মিটাবার পালা। দ্বীপ অর্পনার হাতের জায়গায় জায়গায় চুম্বন করতে লাগলো। কিছু সময়ের মাঝেই শতাধিক চুমুতে রাঙিয়ে দিলো হাত দুটো। অর্পনা তীব্র শিহরনে বার বার কেপে কেপে উঠছে,, সে যদি জানতো উপরে তার জন্য সর্বনাশ অপেক্ষা করছে তাহলে কখনোই এই লোকের কাছে ধরা দিতো না। অর্পনা কাপতে কাপতে ভাঙা স্বরে আওড়ালো — কি করছেন? পাগল হলেন নাকি?
,,, দ্বীপ চোখ তুলে তাকালো,, চোখ বুঝে রাখা অর্পনার চোখের পাতায় চুমু খেয়ে আবদার করলো — আমার জন্য সবসময় মেহেদী পরবে? আমি প্রতিদিন প্রতি ক্ষনে এই মেহেদী রাঙানো হাত দেখতে চাই,, পরবে?
,,, অর্পনা চোখ মেলে তাকালো,, দ্বীপের ধূসর রঙা বিড়াল চোখে চোখ রেখে আওড়ালো,,
( গানের গভীরতা বুঝতে অর্থ লিখে দিলাম,, পড়ো)
Tere naam se ji loon
(তর নামে বাচবো)
Tere naam se maar jaaon
( তর নামেই মরবো)
Tere jaan ke sadke main,, kuch asa kar jaun,,
( তর জন্য সব করতে পারি)
Tune keya kar dalaaa
( তুই আমার সাথে কি করেছিস)
Mar gai main, mitgayi main
( আমি মরে গিয়েছি,, শেষ হয়ে গিয়েছি)
hoo ji haaji,, ho gayi main
(হ্য!! হয়ে গিয়েছি)
Teri dewani,,, dewani,, teri dewani,, dewani..
( তর জন্য পাগল আমি,, তর জন্য পাগল আমি)
,, অর্পনার গাওয়া গানটা যেনো তার অনুভুতিকে প্রকাশ করার জন্যই লেখা হয়েছিলো। দিস সং মেইড ফর জাস্ট অর্পনা। ওর নাড়ানো ঠোট আর চোখের ভাষা বলে দিচ্ছে এই প্রতিটি লাইন সে দ্বীপের জন্যই ব্যাক্ত করেছে। অর্পনা থামতেই অর্পনাকে হতবিহ্বল করে দিয়ে দ্বীপ অর্পনার কপালে কপাল ঠেকিয়ে আওড়ালো,,,
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৫৫
Tune keya kar dalaaa
( তুই আমার সাথে কি করেছিস)
Mar gai main, mitgayi main
( আমি মরে গিয়েছি,, শেষ হয়ে গিয়েছি)
hoo ji haaji,, ho gayi main
(হ্য!! হয়ে গিয়েছি)
Teri dewani,,, dewani,, teri dewani,, dewani..
( তর জন্য পাগল আমি,, তর জন্য পাগল আমি)
