Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৭ (২)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৭ (২)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৭ (২)
রুপান্জলি

সকাল সকাল রুম থেকে রেগেমেগে বের হলো অরুন। রাগের তোপে শ্যামলা মুখখানি লাল রং ধারণ করেছে। করিডর দিয়ে হাঁটতে গিয়ে চলতি পথে হুট করেই ধাক্কা খেল কারোর সঙ্গে। চোখ তুলে তাকাতেই দেখল ইরাদ ফোন হাতে তার সামনে দাঁড়িয়ে। অরুনকে দেখে মুখ কালো করে চলে যেতে নিলে তখনই খপ করে হাত টেনে ধরল অরুন—

— দাঁড়া!! এড়িয়ে যাচ্ছিস, ভালো কথা। যাওয়ার আগে একটা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যা।
,,,, ইরাদ দাঁড়াল ঠিকই, তবে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে। অরুন তোয়াক্কা না করে রাগী কণ্ঠে শুধাল— বৃষ্টির হাতে কার নাম লিখে দিয়েছিস? ওটা কে?
,,, ইরাদের মাঝে কোনো ভাবাবেগ দেখা গেল না। সে কাঁধ উঁচিয়ে বলল—
— আমি কিছু জানি না। আমাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে কেন? যার হাতে লেখা আছে, তাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করুক।
,,, বিরক্তিতে ‘চ’ যুক্ত শব্দ করে এদিক-ওদিক তাকাল অরুন। ইরাদ ফের চলে যেতে নিলে আবার ডাকল—
— যাস না, শুন।
,,, ইরাদ ঠায় দাঁড়িয়ে রইল, তবে এবারেও অরুনের দিকে ফিরে তাকাল না। অরুন আমতা-আমতা করে বলল—
— একটু আমার রুমে যেতে পারবি?
,,, এই পর্যায়ে অরুনের দিকে ফিরে তাকাল ইরাদ। ভ্রু কুঁচকে শুধাল— কেন? রুমে গিয়ে কী করব?
,,, অরুনকে কেমন অপ্রস্তুত দেখাল। সে গলা খাঁকারি দিয়ে প্রতিউত্তর করল — অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে মনে হয়। একটু যা।

,,, বলেই হনহন করে নিচে চলে গেল। মুহূর্তেই ইরাদের ভ্রু জোড়া শিথিল হয়ে এলো। অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে মানে? কে অজ্ঞান হয়েছে? বৃষ্টি? তাহলে অরুন কোথায় গেল? মেয়েটাকে ওই অবস্থায় ফেলেই রুম থেকে বেরিয়ে গিয়েছে? হায়রে পাষাণ পুরুষ! পুরুষ জাতি মানেই স্বার্থপর। যার আশায় মেয়েটা বাবা-মা ছেড়ে এতটা পথ পাড়ি দিয়ে এখানে এলো, সেই কিনা মেয়েটাকে এভাবে অবহেলার সাগরে ভাসিয়ে দিচ্ছে?
ইরাদ সময় নষ্ট না করে এগিয়ে গেল অরুনের রুমের দিকে। অরুন আর বৃষ্টিকে পরশীর রুমের এক রুম পরে আর সিদ্ধার্থের রুমের পাশের রুমটায় থাকতে দেওয়া হয়েছে। সিদ্ধার্থ গত ভোররাতের ন্যায় এখনো করিডরের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে আছে। চলতি পথে হুট করেই দুজনের চোখাচোখি হলো। সঙ্গে সঙ্গে নজর ফিরিয়ে বাইরে তাকাল সিদ্ধার্থ। ইরাদের কেন যেন ভালো লাগল না বিষয়টা। বুকের ভেতর কেমন চিনচিনে ব্যথার আবির্ভাব ঘটল। তবে সেসব আপাতত মন দেওয়ার সময় নেই তার। অরুনদের রুমের দরজা খোলাই ছিল, যার ফলে সহজেই ভেতরে ঢুকতে পেরেছে ইরাদ। রুমে ঢুকতেই নজর আটকাল মেঝের এক কোণায় গুটিশুটি মেরে পড়ে থাকা একটা ছোট্ট দেহের ওপর। মেয়েটার বয়স কত হবে? ১৮ কিংবা ১৯। অথচ বিয়ে হয়েছে ২৮ বছর বয়সী যুবকের কাছে। বয়সের কতটা তফাৎ! এই সময়টা বৃষ্টির সখের বয়স, আবেগের বয়স। অথচ কপাল মন্দ হওয়ায় স্বামীর ভালোবাসা পাওয়ার বদলে অবহেলা পেতে হচ্ছে। ঠিক যেনো ইরাদের মায়ের কপাল। ইরাদ টি-টেবিল থেকে গ্লাসভর্তি পানি নিয়ে বৃষ্টির কাছে গেল। মাথাটা টেনেটুনে কোলে রেখে কিছুটা পানি মাথায় ও চোখে-মুখে ঢেলে দিল। কিছু সময়ের মাঝেই জ্ঞান ফিরে এলো মেয়েটার। চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে ইরাদকে দেখতেই কী মনে করে যেন দু’হাতে ইরাদের পেট জড়িয়ে ফুঁপিয়ে উঠল মেয়েটা। অস্ফুট স্বরে আওড়ালো—
— আমার সব শেষ হয়ে গিয়েছে, আপু। আমি থেমে গিয়েছি। আর ছুটতে পারব না জীবন নামক মাঝির পিছু পিছু।

৫টা গরু জবাই করে পরশীর গায়ে হলুদের আয়োজন করা হচ্ছে, যার ফলস্বরূপ বেলা ১২টা থেকেই মির্জা বাড়ির বাগানে রান্নাবান্নার ধুম পড়েছে। মাত্রই গরু কেটে, রান্নাবান্নার আয়োজন ঠিকঠাক বুঝিয়ে দিয়ে রুমে এলো দ্বীপ। তার পরনের সাদা টি-শার্টখানা গরুর রক্তে চুপচুপে হয়ে আছে প্রায়। প্রকৃতিকে সামলাতে সামলাতে ক্লান্ত হয়ে চোখ লেগে এসেছিলো অর্পনার। পরনের শাড়িটা এলোমেলো হয়ে শীর্ণ দেহের পাতলা উদরখানি কিছুটা দৃশ্যমান। রুমে ঢুকতেই দ্বীপের নজর আটকাল সেই কাটা-ছেঁড়া উদরটায়। অনুভূতির দাপোদাহে শক্তপোক্ত ঢোক গিলল মানব। একটুখানি ছুঁয়ে দেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠল প্রাণটা। কিন্তু বাধাস্বরূপ অর্পনার পাশে বসে আছে দ্বীপের ফটোকপি। প্রকৃতি ঘুমন্ত মায়ের পাশে বসে ছোট ছোট কিউব দিয়ে বিল্ডিং বানাচ্ছে। পরনে বিড়াল গেঞ্জি আর বিড়াল প্যান্ট, চুলগুলো ঝুঁটি করা। তার পাশে গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে স্রিফান। সে একমনে প্রকৃতির বানানো বিল্ডিংটা পর্যবেক্ষণ করছে। প্রকৃতি বড় হওয়ার পর স্রিফানকে দূরে রাখা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। মেয়েটা বুঝ হওয়ার পর থেকে স্রিফান বলতে অজ্ঞান। যতবার স্রিফানের কাছে নিয়ে গিয়েছে, ততবার স্রিফানকে বাড়িতে আনার আবদার করেছে। আবদার না রাখায় কেঁদে-কুটে একাকার অবস্থা করায় শেষ পর্যায়ে অর্পনা মেনে নিতে বাধ্য হলো। ভয় কাটিয়ে স্রিফানকে বাড়িতে, এমনকি নিজের রুমে থাকার পারমিশন দিল। প্রথম দিকে স্রিফানকে খুব ভয় পেলেও, যখন দেখল স্রিফান তার হিংস্র রূপ শুধু বাইরের মানুষকেই দেখায়, ঘরের মানুষের সঙ্গে সে একটা নাদান বাচ্চা, আর সবচেয়ে বেশি কেয়ারিং অর্পনার প্রতি, তখন থেকেই অর্পনার ভয়ভীতি কমে এসেছে। ধীরে ধীরে ভালোবাসতে শুরু করেছে কুকুরটাকে। বর্তমানে স্রিফান অর্পনার আরও একটা সন্তান। ঘরে কারোর আগমন টের পেতেই চোখ তুলে তাকাল প্রকৃতি। রক্তে জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাপ্পাকে দেখে লাফিয়ে উঠল সে। পা লেগে সদ্য তৈরি করা বিল্ডিংটা ভেঙে গেলেও তাতে ভাবান্তর হলো না ছোট্ট প্রকৃতির। সে “” পাপ্পা, পাপ্পা “” করতে করতে ছুটে গেল। মুহূর্তেই শোনা গেল অর্পনার কর্কশ ধ্বনি—

— এই অবস্থায় মেয়েকে কোলে নেবেন না। যান, গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসুন। প্রকৃতি!! স্টে হিয়ার।
,,,, অর্পনার এই পাতলা ঘুম নিয়ে বড্ড বিরক্ত দ্বীপ। ভেবেছিল ফ্রেশ হয়ে এসে আদরের সহিত অর্পনাকে ডেকে তুলবে। নাহ! এই রমণীর সঙ্গে বোধহয় এসব খুব একটা যায় না। পাপ্পার কোলে যেতে না পেরে ঠোঁট উল্টে আগের জায়গায় ফিরে গেল প্রকৃতি। দ্বীপ বিরক্তিকর নিশ্বাস ফেলে ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমে চলে গেল। ঠাস করে ওয়াশরুমের দরজা লাগানোর শব্দ হতেই চোখ মেলে তাকাল অর্পনা। উঠে বসতেই স্রিফান ধীরে ধীরে কোলে এসে বসল। অর্পনা স্রিফানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে স্রিফানের জন্য বরাদ্দ করা প্লেটে ডগ ফুড দিয়ে তা মেঝেতে রেখে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। ফিরে এলো হাতভর্তি করে খাবারের প্লেট নিয়ে। বেলা পেরিয়ে যাওয়ায় সকালের নাস্তা না এনে একেবারে দুপুরের খাবার নিয়ে এসেছে। ইদানীং লোকটা যা ব্যস্ততা দেখাচ্ছে! নাস্তা আনলে দেখা যাবে, এই নাস্তা খেয়ে বের হবে, আজ আর ঘরে ফেরার নাম নেবে না। খাবারটা টি-টেবিলের ওপর রেখে সিদ্ধ ডিমটার খোসা ছাড়িয়ে প্রকৃতির দিকে এগিয়ে গেলো। মুহূর্তেই নাক সিটকে বালিশে মুখ গুঁজে নিল প্রকৃতি—

— চি, চি!! আমি এচব কাবো না। মিচ বলেচে, যালা দিম কায়, তালা পলিক্কায় গোলাল দিম পায়।
,,, প্রতিদিন নতুন নতুন বাহানা শুনতে শুনতে অর্পনা বিরক্ত প্রায়। সে কপালে ভাঁজ ফেলে গম্ভীর কণ্ঠে আওড়াল— কালকেই যাব তোমার কোচিং সেন্টারে। কোন মিস তোমাকে এসব শেখায়, তার একটা খবর নিতে হবে।
,,, মায়ের কথায় যেন আঁতকে উঠল প্রকৃতি। খোঁজ নিলে তো মাম্মা জেনে যাবে, প্রকৃতি ওদের নাম নিয়ে মিথ্যা মিথ্যা গল্প বলে। তাই দ্রুত দুদিকে মাথা নেড়ে বলল— না, না। মিচ বলেনি, ছোয়ান বলেচে।
,,,, অর্পনা একটু ঝুঁকে বিছানার পাশ থেকে ফোনটা নিতে নিতে বলল— আচ্ছা!! আমি এখনই সোহানের আম্মুকে কল দিচ্ছি। কেন সোহান তোমাকে এসব উল্টোপাল্টা কথা শিখাবে ? সোহানের একটা পানিশমেন্ট হওয়া দরকার।
,,, প্রকৃতির মনটা ধপ করেই খারাপ হয়ে গেল। সে মাথা নিচু করে সরল স্বীকারোক্তি দিল — ছোয়ান বলেনি। পকিতি মিত্তা মিত্তা গপ্প বলেচে।

,,, তাহলে তো প্রকৃতিকেই পানিশ করতে হবে।
,,, মায়ের কথায় লাফিয়ে উঠল প্রকৃতি। মাম্মার দিকে তাকাতেই দেখল, মাম্মা রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। বেচারি আজ ভালোই বিপদে পড়েছে। তাই কোনো উপায়ান্তর না পেয়ে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে লাগল — পাপ্পা!!! ও পাপ্পা!! মাম্মা মাচ্চে। গ্রাম্মা!! গ্রাপ্পা!! মাম্মা মাচ্চে। বাচাও! বাচাও! বাচাও!
,, রোমানা বেগম বোধহয় কাছেই ছিলেন। নাতনিকে এভাবে চিৎকার করে কাঁদতে দেখে ছুটে এলেন রুমে। অর্পনা কপালে বিরক্তির ভাঁজ ফেলে মেয়ের দিকেই তাকিয়ে। সে কখন মারল এই মেয়েকে? চিৎকার করে কাঁদছে, ভালো কথা, চোখের পানি কোথায়? নাটকের তো একটা লিমিট থাকা প্রয়োজন। মেয়েটা তার সব লিমিট ক্রস করে যাচ্ছে। রোমানা বেগম নাতনিকে কোলে নিয়ে অর্পনার দিকে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে শুধালেন— আমার নাতনি কাঁদছে কেন? মেরেছো?

,,, অর্পনা চোখেমুখে বিরক্তির রেশ ধরে রেখেই বলল— আপনার নাতনিকে মারতে হবে কেন? বড় চাচার মতো নাটকবাজ হয়েছে না? কিছু হলেই নাটক শুরু। প্রতিটা দিন খাওয়াতে নিলেই যত বাহানা, এ এটা বলেছে, ও ওটা বলেছে, সে সেটা বলেছে। মাথাটা জাস্ট খারাপ করে দিচ্ছে।
,,,, অর্পনার মুখ থেকে কথা বেরোতে দেরি, রুমের ভেতর বিহানের আগমন ঘটতে দেরি নেই। সে কেমন চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে শুধাল— এই মেয়ে, কী বললে? আমি নাটকবাজ? ন্যাচার আমার মতো নাটকবাজ হয়েছে? বেশ করেছে, হয়েছে। চলো তো, মা। তোমাকে আরও নাটক কীভাবে করতে হয়, শিখিয়ে দিচ্ছি। তোমার মা হচ্ছে আমার জনম-জনমের শত্রু। তার সঙ্গে বড় একটা প্রতিশোধ প্রতিশোধ খেলা খেলতে হবে।

,,,, বলতে বলতে প্রকৃতিকে নিয়ে চলে গেল। কিছুটা স্বস্তি পেল অর্পনা। বাচ্চা লালন-পালন করা কী যে বিরক্তিকর, সেটা বাচ্চা হওয়ার পরেই বোঝা যায়। কিছুটা স্বস্তি পেলেও ডিমের প্লেটের দিকে তাকিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেলল। মেয়েটা চরম জ্বালায়, খেগে চায়না, গোসল করতে চায়না, সারাক্ষণ উল্টা পাল্টা বায়না আর কান্নাকাটি। এই মেয়ের চক্করে অর্পনার পাগল হয়ে যাওয়ার জোগার। ওদিকে অরিন্দম বার বার কল দিচ্ছে কোথায় যেনো কনসার্ট আছে। সিডিওল অনুযায়ী দুদিন পর সেখানে যেতে হবে। সংসার, ব্যাক্তিগত জীবন, প্রোফেশন সামলাতে সামলাতে ক্লান্ত সে। অর্পনাকে চিন্তিত দেখে রোমানা বেগম ডিমের প্লেটটা হাতে নিয়ে চলে যেতে যেতে আশ্বাস ভরা কন্ঠে বললেন— চিন্তা করো না, আমি খাইয়ে দেব।
,,, অর্পনা যেনো ফের স্বস্তি পেলো। শ্বাশুড়ির সাথে তার এখনো খুব একটা বনে না তার পরেও তাকে এই বাড়িতে দ্বীপের পর সবচেয়ে বেশি কেয়ার করে এই মানুষটা। অর্পনা ফোন হাতে আবারও শুয়ে পরলো, লোকটা বেরুনোর আগে একটু পাপ্পার সাথে কথা বলা যাক। ভেবেই পাপ্পাকে ভিডিও কল দিলো। পাপ্পা বর্তমানে ঢাকা নেই, অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবেই একটা কেইসে সাতক্ষিরা যেতে হয়েছে। ফিরতে ফিরতে কদিন লাগে কে জানে। বিষয়টা নিয়ে অর্পনার মন খারাপ। উনার ডিউটির কথা মাথায় রেখে বিয়ের ডেট ফিক্সড করা হয়েছে তবুও একটা না একটা কেইস পরেই গেলো। আইনি বিভাগের কাজগুলো বরই বিরক্তিকর।

সময়টা মাগরিবের কিছুটা আগের মুহূর্তে।
বিকেলের পরপরই বাড়ির মেয়ে-বউরা নিজেদেরকে শাড়ি-গহনায় আবৃত করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তার মধ্যে অনন্যা আর বৃষ্টিও একজন। অনন্যা সারাজীবন বিদেশে থাকার দরুন শাড়ি শব্দটার সঙ্গে খুব একটা পরিচিত নয়। অথচ বৃষ্টি স্বভাবের দিক থেকে সম্পূর্ণ তার উল্টো। বৃষ্টি মেয়েটা কাজকর্মের দিক থেকেও বড্ড সুনিপুণা। ওর কাজের দক্ষতা দেখলে কেউ বুঝতেই পারবে না, মেয়েটা এত বড় বাড়ির মেয়ে আর সারাজীবন ইতালিতে থেকে বড় হয়েছে। অনেকটাই মেধা আপুর মতো শান্ত, দক্ষ, সুন্দরী আর সুনিপুণা।
ইরাদ কখনোই কোনো অনুষ্ঠানে খুব একটা সাজে না। খুব প্রয়োজন হলে নতুন একটা জামা পরে, তাও সাদা রঙের। তাই এই বেলায়ও সাজল না। সে চুপচাপ কোলে বালিশ নিয়ে বসে বসে বৃষ্টির কার্যকলাপ দেখছে। মেয়েটা প্রথমে অনন্যাকে সাজাল, বর্তমানে শাড়ি পরিয়ে দিচ্ছে। কত সুন্দর করে কুচি করছে! পুরো মনোমুগ্ধকর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ইরাদ।

শাড়ি পরানো শেষ হতেই বৃষ্টি রেডি হতে নিজের রুমে চলে গেল। ইরাদও নড়েচড়ে বসল কিছুটা। তখনই রুমে এলো অর্পনা। জোরপূর্বক ইরাদকে লাল পাড়ের একটা সাদা শাড়ি ধরিয়ে দিয়ে যেভাবে এসেছিল, সেভাবেই চলে গেল। ইরাদ প্রথমে ভাবল পরবে না। পরবর্তীতে মাথায় এলো, অর্পনা অসুস্থ। ওকে রাগিয়ে দেওয়া বোধহয় ঠিক হবে না। তাই চুপচাপ শাড়ি নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। সে আবার কারোর সামনে ড্রেস চেঞ্জ করতে পারে না। সেটা মেয়ে হোক কিংবা ছেলে, হওয়ার প্রশ্নই আসে না।
টানা ১০ মিনিট সময় নিয়ে শাড়ি পরে ওয়াশরুম থেকে বের হতেই একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সাক্ষী হলো ইরাদ। সিদ্ধার্থ আর অনন্যা খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে। বিষয়টা শুধু কাছাকাছিতেই থেমে নেই। সিদ্ধার্থের সঙ্গে একপ্রকার মিশে আছে মেয়েটা। সিদ্ধার্থ অনন্যার কোমর পেঁচিয়ে ধরেছে। আকস্মিক ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দ হতেই অনন্যার কোমর থেকে হাত সরিয়ে নিল সিদ্ধার্থ। সরে যেতে চাইলে ছাড়ল না অনন্যা, বরং ব্যথাতুর শব্দ করে সিদ্ধার্থের বুকের কাছের গোল্ডেন শেরওয়ানিটা টেনে ধরল। অনন্যা কী কারণে ব্যথাতুর শব্দ করেছে, তা জানে না ইরাদ। তার চোখে শুধু একটা দৃশ্যই ভাসমান হচ্ছে—সিদ্ধার্থ আর অনন্যা কাছাকাছি। ঠিক ততোটাই কাছাকাছি, যতটা সেদিন ভোররাতে ইরাদ ছিল। সিদ্ধার্থ সেদিন ওর গালে নাক ঘষে বলেছিল, “ভালোবাসি” তাহলে আজ অনন্যাকে কী বলছে? ভালোবাসার কথাই বলছে কি? ইরাদের চোখেমুখের সেই ঘৃণার রেশ তরতর করে বেড়ে চারগুণ হলো। মুহূর্তেই চোখ জোড়া ছলছল করে উঠল। সিদ্ধার্থ শেরওয়ানিতে আটকে থাকা অনন্যার চুলগুলো ছাড়িয়ে ইরাদের দিকে তাকাতেই দুজনের চোখাচোখি হলো। ইরাদ উপরের ঠোঁট দিয়ে নিচের ঠোঁট চেপে ধরে কান্না আটকানোর চেষ্টা করে ওই অবস্থাতেই রুম থেকে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার আগে রুমের দরজা টেনে লক করে যেতে ভুলল না।

,,,, ইরাদের কাণ্ডে অবাকের চরম সীমায় পৌঁছে গেল অনন্যা। সিদ্ধার্থ ব্লুটুথ নিতে তার রুমে এসেছিল। অনন্যা যেহেতু শাড়িতে অভ্যস্ত নয়, তাই শাড়িতে পেঁচিয়ে পড়ে যেতে নিয়েছিল। তখনই সিদ্ধার্থ ধরে নেয় ওকে। আর ওই সময়টাতেই ইরাদ দরজা খুলে বেরিয়ে আসে। অনন্যা ঠোঁট উল্টে সিদ্ধার্থের দিকে তাকিয়ে শুধাল— ও কি তোমাকে আবারও ভুল বুঝল, ভাইয়া?
,,, সিদ্ধার্থ দরজার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল— ওর কাজই তো এটা। এই পৃথিবীতে যত অন্যায়, যতো পাপ, খারাপ কাজ আছে, সবকিছুর দায় একান্তই আমার। একটাবার তলিয়ে দেখতেও চাইবে না, এতে আমার কোনো দোষ আছে কিনা। ওর মনের যত ঘৃণা আর ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে, সবটা বোধহয় আমার নামেই লেখা।
,,, অনন্যা না চাইলেও ফিক করে হেসে ফেলল— তোমাকে বড্ড অসহায় লাগছে, ট্রাস্ট মি।
,,, সিদ্ধার্থ হতাশ কণ্ঠে আওড়াল— ভালোবাসলে মানুষের অবস্থা এমনই হয় রে। ভালোবাসলে বুঝবি।
,,, সিদ্ধার্থের কথায় তেতে উঠল অনন্যা। তর্জনী আঙুল তাক করে বলল— এই, এই!! নিজের ফিয়ন্সির সামনে অন্য কাউকে ভালোবাসার কথা বলছ, লজ্জা করছে না তোমার?
,,,, সিদ্ধার্থ দু-পা এগিয়ে অনন্যার মাথায় আস্তে করে থাপ্পড় বসিয়ে বলল— মজা করিস না তো, ভালো লাগছে না।

,,, থাপ্পড় খেয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল অনন্যা। মূলত সে সত্যিই সিদ্ধার্থের ফিয়ন্সি। তবে সিদ্ধার্থকে ভালোবাসে না, এমনকি বিয়ে করারও বিন্দুপরিমাণ শখ নেই। অনন্যার বড় ভাই সিদ্ধার্থের খুব ভালো বন্ধু। তার থেকেই ইরাদের সম্পর্কে জানতে পেরেছে অনন্যা। প্রথম দিকে ভেবেছিল বিয়েতে না করে দেবে। কিন্তু যখনই অর্পনার সঙ্গে কথা হলো, তখনই সিদ্ধার্থের সঙ্গে এনগেজমেন্ট করতে রাজি হয়েছে সে। পরিবার থেকে ছয় মাসের মাথায় বিয়ে ঠিক করা হলেও বর্তমানে তাদের প্ল্যান কিছুটা অন্যরকম। অনন্যা হাসি থামিয়ে বলল — যাই হোক! ভাইয়া কল দিয়েছিল। তোমার এখানকার ঝামেলা মিটে গেলে আমাকে দ্রুতই আমেরিকায় ব্যাক করতে হবে। সামনেই এক্সাম।

,,, এই পর্যায়ে আরও কিছুটা চিন্তিত হলো মানব। চিন্তার তোপে কপালে কেমন ভাঁজ পড়ল দু-তিনটা। কণ্ঠে তীব্র অনীহা ঢেলে চিন্তিত কণ্ঠে আওড়ালো
— এই ঝামেলা কি আদৌ মিটবে? ইরাদ আমাকে প্রচণ্ড রকমের ঘৃণা করে। সেই ঘৃণা ছাপিয়ে ওর মনে এত দ্রুত ভালোবাসা স্থাপন করা খুব একটা সহজ হবে না রে। এই প্রথম মনে হচ্ছে অর্পনার প্ল্যান ফ্লপ করবে। ওর মাইন্ড গেম এবার সাকসেস না হওয়ার চান্স ৯৫%।
,,, অনন্যা দৃঢ় কণ্ঠে আওড়াল— বাকি ৫%-ই হিট করবে। অর্পনার হিস্ট্রিতে ফেইলিউর বলতে কোনো ওয়ার্ড খুঁজে পেয়েছ?
,,, সিদ্ধার্থ কেমন মলিন হাসল। অনন্যা যদি জানত, অর্পনা আগাগোড়া পুরোটাই ফেইলিউর। এই শহরে তার কোনো অস্তিত্বই নেই, যেখানে অস্তিত্ব আছে, সেখানটাও শূন্য। কতখানি কষ্ট বুকে চেপে মেয়েটা বেঁচে আছে, তা কি অনন্যা ঠাওর করতে পারবে কোনোদিন? সিদ্ধার্থের আর কথা বাড়াতে ইচ্ছে করল না। বাইরের দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই কানে এলো,,,
— তুমি কি জানো? ইরাদ তোমাকে ভালোবাসে?

,,, তড়িৎগতিতে পেছন ফিরে চাইল সিদ্ধার্থ। অনন্যার কথায় ভ্রু কুঁচকাল। চোখের ইশারায় জিজ্ঞেস করল, “”আসলেই? “” অনন্যা মাথা ঝাঁকিয়ে সায় জানিয়ে বলল — আমার সিক্সথ সেন্স বলছে, ইরাদ তোমাকে শুধু ভুলই বোঝেনি, বরং তোমার ওপর মারাত্মকভাবে অভিমান করেছে। আর আমি ভুল না হলে, ইরাদ এখন কাঁদবে। কাঁদতে কাঁদতে চোখ মুখ ফুলিয়ে ফেলবে। তোমার উচিত একবার ইরাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা। ভুলক্রমেও যদি ইরাদ কাঁদে বা তার কথায় অভিমান ফুটে ওঠে, তাহলে আজকের সময়টা তোমার হাতে।
,,, বলেই চোখ টিপল অনন্যা। সিদ্ধার্থ উপরের ঠোঁট দিয়ে নিচের ঠোঁট চেপে ধরল। কিছুক্ষণ ভাবনায় মত্ত থাকার পর হুট করেই তার চোখ জোড়া চিকচিক করে উঠল। অনন্যার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই অনন্যা ভ্রু উঁচাল। মুহূর্তেই মাথা কাত করে ডিল ওকে করল সিদ্ধার্থ। অনন্যা এগিয়ে এসে হাত উঁচাতেই সিদ্ধার্থ হাত উঁচিয়ে হাই-ফাইভ করল। সিড আর অনন্যার সম্পর্কটা ভাই-বোনের মতো। অন্যরা যেখানে বন্ধুর বোনকে নিয়ে অলীক ভাবনা সাজায়, সেখানে সিদ্ধার্থ অনন্যাকে বোন ব্যতীত তেমন কিছুই ভাবেনি। অনন্যার ক্ষেত্রেও তাই। শুধু বিষয়টা তাদের ফ্যামিলিই মানতে নারাজ। তাদের মতে, বিয়ে হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। তাই বর্তমানে একটাই সমাধান,, সিদ্ধার্থ ইরাদকে বিয়ে করে নিলেই অনন্যার মুক্তি। তখন আর কেউ কিছু বলতে পারবে না।

,,, পাপ্পা!! মেয়েতাকে দেকো, কি কিউত!!
,, হুম, এমদম স্ট্রবেরির মতো।
,,, ছালিতে কত্তো চুন্দ লাগে, চত্তি না?
,,, হুম!! একদম অপ্সরা।
,,, চুল গুলো কত্তো বলো, এদ্দম পলিদেল মতো।
,,, ঘ্রানটা আরও সুন্দর।
,,, মেয়েতাকে বিয়ে কব্বে?
,,, করাই যায়। জিজ্ঞেস করো তো, আমাকে বিয়ে করবে কিনা?
,,, এইদে চুন্দলি!! আমাল পাপ্পাকে বিয়ে কব্বে? কললে তোমাকে চক্কেত দিবো। এত্তাগুলা ইম্মি ইম্মি চক্কেত। (দুহাত দুদিকে ছড়িয়ে)

,,, বলেই খিলখিল করে হেসে উঠলো প্রকৃতি। মেয়ের সঙ্গে সঙ্গে দ্বীপও ক্ষীণ হাসলো। অর্পনা ইরাদকে শাড়ি দিয়ে এসে নিজেও ড্রেস চেঞ্জ করে গায়ে শাড়ি জড়িয়ে মাত্রই আয়নার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। দ্বীপ বোধহয় রান্নাবান্নার দিক সামলে ফ্রেশ হওয়ার জন্য রুমে এসেছিল। অথচ লোকটা তাকে আয়নার সামনে দেখে ফ্রেশ হওয়ার কথা বেমালুম ভুলে, মেয়েকে দলে টেনে তাকে বিব্রত করার চেষ্টায় মেতেছে। অগত্যা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে ব্যস্ত থাকা অর্পনা আয়নার মাধ্যমেই দুই বাপ-মেয়ের দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙালো। পাত্তা দিলো না দ্বীপ। সে নির্বিকার চিত্তে অর্পনার ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত স্ক্যান করলো। ঠোঁটে কিঞ্চিৎ বক্র হাসি, চোখে মাদকতা। দ্বীপের মাদকীয় চোখের চাহনি বুঝে আসতেই অর্পনার ভেতরটা কেমন কেঁপে কেঁপে উঠলো। এক বাচ্চার মা হওয়ার পরও লোকটার চাহনিতে কাবু হওয়ার মতো কোনো রিজন খুঁজে পেলো না রমণী। এই চোখে কী আছে, কে জানে? প্রথম সাক্ষাৎে এই চোখের মায়াতেই তো পড়েছিল সে। এই বিড়াল চোখে নিজের জন্য ভালোবাসা, মোহ, মাদকতা দেখার জেদ চেপেছিল অন্তরে। জানতে ইচ্ছা করছিল, এই লোকটা কাছে এলে কেমন অনুভূত হয়। সেই অনুভূতির সন্ধানেই লোকটাকে নিজের করতে কত ছলাকলা করলো। আজ এই চাহনিতেই ওলটপালট হচ্ছে তার অন্তর।
অনুভূতির জোয়ার সামলে মুহূর্তেই চোখ সরিয়ে অন্যত্র নজর স্থির করলো অর্পনা। তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন দ্বীপ নিমিষেই অর্পনার মনোভাব ঠাওর করতে পারলো। মুহূর্তেই ঠোঁট কামড়ে হাসলো সে। ফের টিজ করে বললো

— উত্তরটা তো দিলে না, সুন্দরী!! বিয়ে করবে আমায়? বউ হবে আমার?
,,, পাপ্পার সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতিও যুক্ত হলো — কিগো চুন্দলি, উত্তল তা দাও।
,,, অর্পনা দাঁতে দাঁত চেপে লোকটার বখাটেপনা দেখে যাচ্ছে। কত বড় বদমাশ হলে মানুষ নিজের মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বউকে টিজ করে? অর্পনা বিক্ষিপ্ত মেজাজে উত্তর করলো— আপনি কি বাচ্চা? দ্বীপ!! কী শুরু করেছেন? মেয়েটাকে এসব কী শিখাচ্ছেন আপনি?
,,, দ্বীপ নিষ্পাপ মুখ করে ঠোঁট উল্টালো, যেন কিছুই করেনি। তখনই দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিলো হলুদ শেরওয়ানি গায়ে থাকা আরণ্যক।— হ্যালো সবাইকে!!
,,, প্রকৃতি হাত উঁচিয়ে হ্যালো দিলো। আরণ্যক ছুটে এলো বড় আম্মুর কাছে। পারফেক্ট গম্ভীর লুক নিয়ে তাকিয়ে শুধালো — চ্যাম্প!! আমাকে কেমন লাগছে?
,,, অর্পনা একটু ঝুঁকে আরণ্যকের জেল দিয়ে সেট করা চুলগুলো আরেকটু ঠিকঠাক করে দিয়ে বললো
— খুব সুন্দর!! একদম বাবার মতো হয়েছো।
,,, বাবার মতো হয়েছো শুনে বড্ড খুশি হলো আরণ্যক। ছুটে গেলো বড় বাবার কাছে।— আমাকে কেমন লাগছে, পপ্স?

,,, দ্বীপ আরণ্যককে টেনে কোলে নিয়ে বললো
— পিওর জেন্টলম্যান।
,,, খুশিতে ডগমগ হয়ে গেলো ছেলেটা। মা বলেছে একদম চাঁদের টুকরো লাগছে, বাবা বলেছে একদম আমার আমার লাগছে। এত এত কমপ্লিমেন্ট বোধহয় আশাই করেনি ছেলেটা। প্রকৃতি গাল ফুলিয়ে বললো— ফলেস্ত!! তল ছাথে আমি লাজনীতি কব্বো না।
,,, কেনো?
,,, তুই আমাকে জিগেচ কলিচনি কেনো? তকে চুন্দ লাজ্জে নাকি?
,,, আরণ্যক চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে প্রকৃতির হাত ধরে বললো— চল, আমরা পরশী মাম্মাকে দেখে আসি। যেতে যেতে জিজ্ঞেস করবোনে সুন্দর লাগছে কিনা।
,,, প্রকৃতি যেন খুশি হয়ে গেলো। তার পরনে এখনো বিড়াল গেঞ্জি আর বিড়াল প্যান্ট। মেয়েটা কেন যে মেয়েদের পোশাক পরতে চায় না, কে জানে? স্বভাবটা বোধহয় মায়ের থেকেই পেয়েছে। দুজন মিলে লাফাতে লাফাতে ঘর থেকে বের হতেই দ্বীপ বিছানা ছেড়ে উঠে এলো। অর্পনা যেন এই ভয়টাই পাচ্ছিল। লোকটা এগিয়ে এসে ধীরে ধীরে অর্পনার শাড়ি ভেদ করে পাতলা উদরে হাত ছোঁয়ালো। ধীরে ধীরে উদরখানা আয়ত্তে নিয়ে আচমকা টান বসাতেই দ্বীপের বুকে আছড়ে পড়লো রমণী। ধীরে ধীরে অর্পনার কাঁধ থেকে চুল সরিয়ে তাতে মুখ ডুবিয়ে দিলো মানব। অর্পনা হাঁসফাঁস করে উঠে ছোট্ট করে আওড়ালো — ছাড়ুন, কেউ চলে আসবে।

,,, ছাড়লো না দ্বীপ। ধীরে ধীরে অবাধ্য হতে থাকলো তার স্পর্শ। অর্পনাও সায় না দিয়ে পারলো না তাতে। দুজনেই যখন অনুভূতির জোয়ারে ভাসমান, তখনই ঘরের দরজায় টোকা পড়লো। মুহূর্তেই ছিটকে দূরে সরে গেলো দুজন। বাইরে থেকে ইরাদের কণ্ঠ ভেসে এলো — আসবো?
,,, ইরাদের কণ্ঠ শুনে দ্বীপ তাড়াহুড়ো করে বারান্দায় চলে গেলো। অর্পনা শাড়ির আঁচল টেনে ঠিকঠাক করে আঁচল দিয়ে থুতনিতে জমা সদ্য ঘামটুকু মুছে বললো— আয়!
,,, নিরবিচ্ছিন্ন মন নিয়ে রুমে ঢুকলো ইরাদ। শ্যামলা নাকটা কেমন লাল রং ধারণ করেছে। চোখের পাপড়িগুলো ভেজা। অর্পনা প্রথম দর্শনেই বুঝে ফেললো, কাহিনি কিছুটা গড়বড় আছে। তখনই ফোনে ম্যাসেজ আসলো। ফোনটা ড্রেসিং টেবিলের সামনেই রাখা ছিল। অনন্যার ম্যাসেজ দেখে তপ্ত নিশ্বাস ফেললো রমনি। পরপর ইরাদের দিকে তাকিয়ে শুধালো — কিছু বলবি?

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৭

,,, ইরাদ যেন কথা মুখস্থ করে রেখেছে — আমাকে আর্জেন্ট একটু বাড়িতে যেতে হবে। কিছুক্ষণ আগেই একজন কাস্টোমার জানালো, আগামীকালই নাকি তার ছবিটা লাগবে। কালকে সে নিজে এসে প্রোডাক্ট নিয়ে যাবে। অনেক টাকার ব্যাপার। আমি চাচ্ছি না টাকাটা মিস দিতে। আমি বরং যাই, তুই কী বলিস?
,,, অর্পনা মানা করলো না। ঘাড় বাঁকিয়ে সায় জানিয়ে বললো— ১০টার আগে ফিরে আসিস। তখন ডান্স প্রোগ্রাম হবে। আর ড্রাইভারের সঙ্গে যাবি। একা একা গেলে মেরে ঠ্যাং খোঁড়া করে দিবো।
,,,, ইরাদ মাথা ঝাঁকিয়ে সায় জানালো। তবে কিছুটা অবাকও হয়েছে। অর্পনা তো তাকে ছাড়ার পাত্রী না। অন্ততপক্ষে তার বানানো মুখস্থ বিদ্যাগুলো তো বিশ্বাস করারই কথা না। তাহলে? বুঝে পেলো না মেয়েটা।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here