Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৮ (২)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৮ (২)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৮ (২)
রুপান্জলি

আরশাদ জামান রাত্রির মৃতদেহ বাড়ির আঙিনায় এনে রাখার পর পল্লব শুধু এক ঝলক তার প্রলয়ঙ্কারীকে দেখেছিল। এরপর আর দেখার প্রয়োজন মনে করেনি। বেরিয়ে গিয়েছিল নিজের মতো। তার এসব বিশ্বাস হয় না। নিশ্চয়ই ন্যাকাটা সবার সঙ্গে প্র্যাঙ্ক করার জন্য নাটক সাজিয়েছে। তবে তার মস্তিষ্কটা যে বড্ড বেয়াড়া! জ্বালিয়ে মারছিল তাকে। মনের বুঝ সে মানতেই চায় না। তার মতে, সত্যিই রাত মারা গিয়েছে। অগত্যা মস্তিষ্ককে পোষ মানাতে সারাদিনব্যাপী অকারণেই মদ্যপান করল ছেলেটা। সারাদিন মদ্যপান শেষে মস্তিষ্ক যখন বুঝতে বাধ্য হলো নাদানের কিছু হয়নি, তখনই শাহাবুদ্দিনের ঘর থেকে বেরিয়ে এলো সে। এরপর আর কিছু মনে নেই। ঠিক নয় দিনের মাথায় যখন হুঁশ ফিরল, তখন বাবা, মা, অনাহিতা, অহমিকা, অর্পনা, দ্বীপ, বিহান, মেধা, ইরাদ, পরশিকে দেখে সে শুধু সবার মাঝে দুজন মানুষকে খুঁজে বেড়িয়েছে—অরুণ আর রাত। বারবার জিজ্ঞেস করছিল, ” ওদের কি বিয়ে হয়ে গিয়েছে?

কোথায় আছে ওরা? রাত ঠিক আছে না? অরুণ ঠিক আছে? ” বারবার ওদের সঙ্গে দেখা করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল ছেলেটা। ধীরে ধীরে অস্বাভাবিক আচরণ করতে লাগল।ঐ সময়টাতে অরুণ দেশে ছিল না। দিন দুই আগে অরুণের বাবা-মা জোরপূর্বক অরুণকে নিয়ে ইতালিতে চলে গিয়েছিলেন, যার ফলস্বরূপ অরুণের সঙ্গে পল্লবের দেখা করানো সম্ভব হয়ে ওঠেনি। বাকি থাকে রাত্রি। সে তো এই পৃথিবীতেই নেই। তার সঙ্গে পল্লবের দেখা করানো কি আদৌ সম্ভব? তবে পল্লব সেসব মানতে নারাজ। মানতে না চেয়ে ছেলেটা যখন একেবারে অশান্ত হয়ে উঠল, ঘরে ভাঙচুর করতে থাকল, তখন একপ্রকার বাধ্য হয়েই রাতের কবরের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাকে। সচক্ষে কবর দেখার পরও সত্যিটা মানতে রাজি নয় সে। একবারের বেশি রাত্রির কবরের পানে তাকিয়েও দেখেনি। জেদ নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল কবরস্থান থেকে। পল্লবের বাবাও গিয়েছিলেন ছেলের পিছু পিছু। পল্লবের মতে, তার নাদানের বাচ্চার কিছু হয়নি। সবাই অকারণে মিথ্যা কথা বলছে। রাত্রি নিশ্চয়ই তাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য লুকিয়ে রয়েছে। তবে পল্লব তো ছেড়ে দেওয়ার বান্দা নয়।

যেভাবেই হোক নাদানের বাচ্চাকে খুঁজে বের করবে সে। বের করে খুব কষ্ট দেবে—যতটা কষ্ট সে এখন পাচ্ছে, তার থেকেও কয়েক গুণ বেশি। কতক্ষণ পালিয়ে বাঁচবে তার হাত থেকে? অগত্যা অনেকটা পথ ঘুরে ঘুরে “”রাত… রাত. “” বলে চিৎকার করল ছেলেটা। পল্লবের বাবাও ঘুরলেন ছেলের পিছু পিছু। শত বোঝানোর পরও ছেলেটা কিছু বুঝতে নারাজ। পল্লবের মাথায় যা চেপেছে, সেটাকেই সত্যি ভেবে সারাদিন পথে-ঘাটে খুঁজে বেড়াল রাত্রিকে। সন্ধ্যা হতেই ছেলেকে নানাভাবে বুঝিয়ে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন পল্লবের বাবা। সেই রাতে পল্লবের কারণে বাড়িতে চরম অশান্তি হলো। প্রথমবারের ন্যায় পল্লবের বাবার হাতে মার খেলেন পল্লবের মা। কেন মা হয়ে ছেলেকে শুরুতেই প্রশ্রয় দিয়েছিলেন তিনি? এখন ছেলে একটা মেয়ের জন্য পাগলামি করে বেড়াচ্ছে। এই বয়সে এসে এসব নাটক সহ্য করার কথা ছিল উনার? একটা মাত্র ছেলে! কোথায় বাবা-মায়ের চিন্তা করবে, তা না করে কোথাকার না কোথাকার মেয়ের জন্য মদ গিলে রাস্তাঘাটে পড়ে থাকছে। সুস্থ হতে সময় লাগছে নয় দিন।

এরপরও ছেলের ক্ষান্ত হওয়ার নাম নেই। পাগলামি করে বেড়াচ্ছে, বাড়িতে ভাঙচুর করছে। এসবেতে টাকা যায় না? টাকা কি নদীর বুক চিরে ভেসে আসে? উনার কষ্টের কামাই এভাবে জলাঞ্জলি দেওয়ার জন্যই কি এই ছেলেকে জন্ম দিয়েছিলেন তিনি? কুলাঙ্গারের বাচ্চা তৈরি করেছেন একটা!এরকমই হাজারটা আফসোস আর অভিযোগ নিয়ে সারা রাত ঘরে তাণ্ডব চালিয়েছিলেন মধ্যবয়সী লোকটা। সেই রাতেই সবাইকে লুকিয়ে বাড়িছাড়া হয়েছিল পল্লব। পথে-ঘাটে ঘুরে ঘুরে সে শুধু রাতকে খোঁজে। ম্যাক্সিমাম টাইমে কমলাপুর রেলস্টেশনে গিয়ে বসে থাকে। এই পথেই নাকি গিয়েছিল নাদানটা? নিশ্চয়ই এই পথেই ফিরবে? দিনের পর দিন, রাতের পর রাত পেরিয়ে যায়, তবুও নাদানটা ফিরে আসে না। ধরনীতেই যখন রাত নেমে আসে, তখন কংক্রিটের রাস্তায় গা হেলিয়ে শুয়ে থাকে ছেলেটা। আকাশে সদ্য উদীয়মান চাঁদের দিকে তাকিয়ে আওড়ায়—
— প্রলয়ঙ্করী, তুই বড্ড নিষ্ঠুর! কী ক্ষতি করেছিলাম তোর? এতটা কাঁদাচ্ছিস কেন? ফিরে আয় না।
,,, পরপরই ঠোঁট নাড়িয়ে গায় —
চান্দের মতো মুখটা যখন ভাসতো নয়ন জলে, আদর কইরা মুইছা দিতাম গালে, ঘাটে আইসা পাশে বইসা জড়াইতো…

,,, নারে প্রলয়ঙ্কারী, তুই কোনোদিন আমায় জড়িয়ে ধরিসনি। কেন ধরবি বল? আমি তো আর তোর প্রেমিক না। অপ্রেমিককে কেউ জড়িয়ে ধরে নাকি? তবে একদিন জড়িয়ে ধরিস, যেদিন আমার মুক্তির দিন আসবে। তোর সঙ্গে নিয়ে যাস আমায়। আচ্ছা! পরপারে আমার সঙ্গে দেখা করবি তো? হবি আমার?
,,, পল্লব প্রশ্ন করে ঠিকই, তবে ওপাশ থেকে উত্তর আসে না। পল্লব যতই এই চাঁদের মাঝে নিজের চাঁদকে কল্পনা করুক না কেন, এই চাঁদ তো আর পল্লবের চাঁদ নয়। তাই এই চাঁদ পল্লবের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করে না। এভাবেই পেরিয়ে যায় গোটা দশ দিন। এই দশ দিনে পানি ব্যতীত কিছুই খায়নি পল্লব। সারাদিন তৃষ্ণার্ত পথিকের ন্যায় রেললাইনের দিকে তাকিয়ে থাকে। কত লোক আসে-যায়, শুধু পল্লবের চাঁদ আসে না। মেয়েটা এত অবাধ্য হয়ে গেল কবে? জানে না পল্লব।অপরদিকে পল্লবকে খুঁজে না পেয়ে তার পরিবার, অর্পনা, ইরাদের প্রাণ যায় যায় অবস্থা। সারাদিন এদিক-ওদিক খুঁজেও ছেলেটার হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। সঙ্গে ফোনও নেয়নি, কোনোমতেই যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না।

রাত চলে যাওয়ার পর অর্পনার অসুস্থতার পরিমাণ এমনিতেই বেড়ে গিয়েছিল। এখন পল্লবকেও পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে অরুণও বাংলাদেশে নেই। সব মিলিয়ে পুরো বিধ্বস্ত অবস্থা অর্পনার। ঠিকমতো খেতে চায় না, ঘুমাতে চায় না, মেডিসিন নিতে চায় না। এমনকি গর্ভের বাচ্চাটার জন্যও চিন্তা নেই তার। দ্বীপকে তো দেখেও দেখে না। একপ্রকার দিশেহারার মতো জীবন পার করছে। অর্পনার কথা ভেবে লোক লাগিয়ে রমনার প্রতিটি বার, অলিগলিতে থাকা ম*দ, গাঁ*জার দোকানসহ আরও নানান জায়গায় খোঁজ চালিয়েছে দ্বীপ-বিহান। একপ্রকার হন্যে হয়ে খুঁজে চলেছে পল্লবকে। কেউ হয়তো কল্পনাই করতে পারেনি, পল্লব রেললাইনের এদিকে থাকতে পারে। দ্বীপ আশঙ্কাবশত আজিমপুর কবরস্থানের আশেপাশেও গার্ড সেট করে দিয়েছিল। পল্লব যেহেতু রাত্রিকে ভালোবাসে, একবার না একবার তো কবরে আসবেই। অথচ দ্বীপকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে একবারের জন্যও কবরে পা মাড়ায়নি পল্লব। পা মাড়াবে কী? সে তো বিশ্বাসই করে না, তার নাদানের বাচ্চা এই পৃথিবীতে নেই।

,,, পল্লব নিখোঁজ হওয়ার তিন দিনের মাথায় থানায় গিয়েছিলেন পল্লবের বাবা। প্রথম দিকে অ্যাডাল্ট ছেলে হওয়ার দরুন থানায় মামলা নিতে চায়নি। এরপর যখন সাত দিন পেরিয়ে গেল, তখন একপ্রকার অনীহা নিয়েই খাতায় পল্লবের নাম উঠিয়েছিল থানার ওসি। এরপর কতটা কী খোঁজ করেছিল জানা নেই। পল্লবের বাবা যতবার অসহায়ের ন্যায় থানার দোরগোড়ায় পৌঁছেছেন, পুলিশ জানিয়েছে খোঁজাখুঁজির কাজ চলছে, কিন্তু এখনো কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

,,, গোটা দশ দিন পেরিয়ে যাওয়ার পরও যখন রাত্রি ফিরে এলো না, তখন পল্লব সিদ্ধান্ত নিল, সে ট্রেনে উঠবে। একটার পর একটা ট্রেনে উঠে উঠে রাত্রির খোঁজ চালাবে। আল্লাহ সহায় থাকলে কোনো না কোনো ট্রেনে ঠিক রাত্রির সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে যাবে তার।চব্বিশ বছরের তরতাজা যুবক অবুঝের ন্যায় ট্রেনে উঠে বসল। ট্রেনে যখন একে একে মানুষ ভর্তি হলো, তখনই পল্লবের সিটের সামনে এসে দাঁড়াল এক মধ্যবয়স্ক মহিলা। হাতে কাপড়ের ব্যাগ। চিকন স্বরে জানাল, পল্লবের বসা সিটটা নাকি এই মহিলার। তবে পল্লব সেটা মানতে রাজি নয়। সে সবার আগে এসে বসেছে এই সিটে। এই সিট তো তার। সে কেন এই মহিলার জন্য সিট ছেড়ে দেবে? আর যদি সিট ছেড়েও দেয়, তাহলে সে বসবে কোথায়? আর না বসলে সে প্রলয়ঙ্কারীকে খুঁজে পাবে কী করে? ভালো করে বলার পরও যখন পল্লব সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়াল না, তখনই মহিলাটি চেঁচামেচি শুরু করে দিল। ঝামেলার আভাস পেয়ে ছুটে এলো হেল্পার। কী হয়েছে জানতে চাইতেই মহিলাটি পল্লবের নামে নালিশ জানিয়ে সম্পূর্ণ ব্যাপারটা খুলে বলল। মহিলাটির কথা শুনে হেল্পার পল্লবকে টিকিট দেখাতে বললে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল ছেলেটা। তার কাছে তো টিকিট নেই, টাকাও নেই, কিছুই নেই। দশ দিন যাবৎ একই পোশাক পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

সেদিন হেল্পারসহ আরও কয়েকজনের হাতে বেদম মার খেল ছেলেটা। প্রতিরাতে যেমন করে রেললাইনের পাশে কংক্রিটের রাস্তায় শুয়ে থাকে, অমনই করে মার খেয়ে পড়ে রইল রাস্তায়। শরীরের ব্যথায় কাতরাতে থাকা পল্লব তখনও একটা নামই জপে যাচ্ছে। অথচ চাঁদের কোনো হদিস নেই। প্রলয়ঙ্কারী যে বড্ড পাষাণ। সেই রাতেই আশপাশের লোকেদের মাধ্যমে পল্লবের খোঁজ পায় ইরাদ। ফেসবুকে পল্লবকে ঘিরে করা তার পোস্ট দেখেই ইরাদকে কল করে আহত পল্লবের সন্ধান দেয় অচেনা মানুষগুলো। ইরাদ তৎক্ষণাৎ আরশাদ জামানকে নিয়ে ছুটে গিয়েছিল সেখানে। মার খাওয়ার ফলে অর্ধমৃত পল্লবকে আবারও হাসপাতালে ভর্তি করানো হলো। টানা ছয় দিন চিকিৎসা চলার পর আবারও হাসপাতাল থেকে পালিয়ে গেল পল্লব। এবার আর বাইরে খোঁজাখুঁজি করেনি কেউ। প্রথমবার যেহেতু রেলস্টেশনের পাশ থেকে পাওয়া গিয়েছিল, এই পর্যায়েও সবাই মিলে রেলস্টেশনের আশেপাশেই পল্লবের খোঁজ চালাল। একটু খুঁজতেই পেয়েও গেল। জোরপূর্বক বাড়ি নিয়ে যেতেই আবারও পালানোর চেষ্টা করল পল্লব। পালাতে না পেরে রুমে ভাঙচুর, পাগলামি করতে লাগল। ছেলের এই কষ্ট সহ্য করতে না পেরে পল্লবের বাবা পল্লবকে নিয়ে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে গেলেন।

ভেবেছিলেন, ডাক্তার দেখালে বোধহয় ছেলেটা একটু শান্ত হবে। যতই রাগারাগি করুক না কেন, দিনশেষে ছেলেটা তো উনারই সন্তান। অথচ চলতি পথে আবারও পালাল পল্লব। এরপর তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। এদিকে অর্পনার অবস্থা দিনকে দিন আরও খারাপ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। পেটে বেবি থাকার দরুন পাগলামির নিরাময়স্বরূপ কিছু করা সম্ভব ছিল না। একটা যে ঘুমের ওষুধ খাওয়াবে, তারও জো ছিল না। শুধু হার্টের ওষুধগুলোই চলত। এই পর্যায়ে পল্লবকে নিয়ে ভাবার আর সময় পেল না দ্বীপ। ঠিকমতো কাজে যাওয়াও সম্ভব হয়ে ওঠে না। সারাক্ষণ অর্পনার সঙ্গে সঙ্গে থাকতে হয়। দ্বীপ অফিসে না যাওয়ায় আবারও দুই বছর আগের ন্যায় বিহান একা হাতে সব সামলাতে থাকে। এই ছেলেটাকে আল্লাহ এত পরিমাণ ধৈর্য ক্ষমতা দিয়েছেন যে, পুরো একটা জীবন সে দ্বীপের নামেই কাটিয়ে দিল। বিহান না থাকলে বোধহয় এত দিনে দ্বীপের কোনো অস্তিত্বই টিকে থাকত না। এত কিছুর পরও বিহান কোনোদিন এক টুকরো অভিযোগ করেনি। সে বরাবরই ভাইয়ের জীবন সুন্দর করতে তৎপর।

,,,, পল্লবের বাবা ছেলের খোঁজ না পেয়ে পুলিশের দোরগোড়ায় যাওয়া ব্যতীত আর কিছুই করতে পারেন না। এর মধ্যে আরশাদ জামানও ডিউটির খাতিরে সুহাসিনীকে নিয়ে অন্যত্র চলে যান। আইনি বিভাগের কাজগুলো তো এমনই, তারা পরিবার বোঝে না, সেখানে পারিবারিক সমস্যা তো দূরের ব্যাপার। রাত্রি চলে যাওয়ার পর সুহাসিনী নিজের জবটা ছেড়ে দেয়, নিজেকে সবসময়ের মতো ঘরবন্দি করে নেয়। যার জন্য জীবনে এতটা লড়াই করল, সেই যখন নেই, তখন এত লড়াইয়ের প্রয়োজন কী? ইরাদ একলা মানুষ। লোকবল নেই, কোনো শক্তি-সামর্থ্যও নেই। তবুও একা একা খুঁজে বেড়ায় পল্লবকে। পরশীটা অবশ্য সাথ দেয় তাকে, কিন্তু বাচ্চা একটা মেয়ে, তাকে নিয়ে তো সব জায়গায় যাওয়া যায় না। এই সবকিছু ছাপিয়েও পল্লবকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। এর পাঁচ মাসের মাথায় প্রকৃতির জন্ম হলো। একপ্রকার হাফ ছেড়ে বেঁচেছিল দ্বীপ। এখন অন্তত অর্পনাকে সব ধরনের ওষুধ খাওয়ানো যাবে। এরপর মেয়েকে পেয়ে কিছুটা শান্ত হয়েছিল অর্পনা। নিয়মিত ওষুধ খেত, মেয়ের যত্ন নেওয়া থেকে শুরু করে দ্বীপের যত্ন নেওয়া—সবটাই করার চেষ্টা করত। কিছুটা স্বাভাবিক সংসার যাকে বলে। দ্বীপ আবারও স্বাভাবিকভাবে নিজের কাজ ও রাজনীতিতে মনোনিবেশ করে। অর্পনা কিছুটা সুস্থ হতেই এবার নিজে লোক লাগিয়ে পল্লবকে খুঁজে বেড়াতে শুরু করল। আরশাদ জামানও তখন ঢাকায়। পুরো দমে পল্লবের খোঁজ চালানো হলো পুরো শহরজুড়ে। কথায় আছে না? “” রাজ্যের রাজা যখন আহত হয়ে পড়ে, তখন পুরো রাজ্যটাই কেমন মরমর হয়ে যায়। “” গত সাতটা মাস পুরো মির্জা বাড়ির এমনই অবস্থা ছিল। অর্পনা সুস্থ হয়ে উঠতেই আবারও কেমন সবকিছু স্বাভাবিক হতে থাকল।

,,, এর দুই বছরের মাথায় আলাল উদ্দিন বেপারির গোপন ডেরায় পল্লবের দেখা পায় বিহান। স্বাভাবিক দুনিয়ায় আলাল উদ্দিন বেপারি একজন মাছ বিক্রেতা, যার সর্বমোট আঠারোটি মাছের খামার রয়েছে। বিশাল মাপের মাছ ব্যবসায়ী সে। দেশে-বিদেশে চালান হয় তার মাছ, অথচ সত্যি অর্থে সে একজন ড্রাগ ব্যবসায়ী।
বাংলা ম*দ, গাঁ*জা থেকে শুরু করে নানান দেশীয়-বিদেশীয় বৈধ-অবৈধ ড্রাগের চালান দেয় ফিশ ট্রান্সপোর্ট বক্সের মাধ্যমে। সেই সঙ্গে পথঘাট থেকে ছেলে-পুলেদের ধরে এনে বাজে নেশায় আসক্ত করে নিজের কাজে ব্যবহার করে। এই বিষয়গুলো দ্বীপ-বিহানদের মতো কিছু কিছু রাজনীতিবিদদের সামনে পরিষ্কার থাকলেও বাইরের দুনিয়ার কাছে এই খবর বড্ড গোপনীয়। এই গোপনীয়তা অবশ্য রাজনীতিবিদরাই রক্ষা করে। রাজনৈতিক ক্যাচাল সামলাতে রাজনীতিবিদদের নানান পদের লোকেদের সঙ্গে উঠাবসা করতে হয়, তাদেরকে স্বার্থের জন্য নিজেদের আয়ত্তে রাখতে হয়। ঠিক এই কারণেই রাজনীতিবিদরা কখনো সৎ থাকতে পারে না। এমনই একটা কাজের সূত্রে আলাল উদ্দিন বেপারির ডেরায় গিয়েছিল বিহান। এমন একটা জায়গায় পল্লবকে দেখে কেমন অবাক বনে গেল মানুষটা। আগের সেই সুন্দর, সুস্বাস্থ্যবান, স্মার্ট ছেলেটা এখন আর আগের মতো নেই। শুকিয়ে এইটুকুন হয়ে গিয়েছে। মাথার সিল্কি চুলগুলো জট পাকিয়ে কাঁধ সমান লম্বা হয়ে পড়ে রয়েছে। মুখখানা প্রায় দাড়ি-গোঁফে ভর্তি।

কতকাল ধরে গোসল করে না কে জানে? খুব পরিচিত কেউ না হলে এই রূপে থাকা পল্লবকে চিনতে পারা সম্ভব না। ছেলেটা ঘরের এক কোণায় বসে চুরুট টানছিল। বিহানকে বোধহয় খেয়াল করেনি। বিহানের মনে তীব্র অস্বস্তি কাজ করলেও আলাল উদ্দিনের সামনে বিচলিত হওয়ার মতো ভুল করল না। কোনোভাবে যদি আলাল উদ্দিন বুঝতে পারে পল্লব বিহানের খুব কাছের কেউ, তাহলে বিষয়টা খুব বাজে রূপ নেবে। বিহান মাথা ঠান্ডা রেখে কিছুটা কৌশল করেই আলাল উদ্দিনকে জিজ্ঞেস করল, “” এই ছেলেটা কে? এখানে কী করছে? কতদিন যাবৎ আছে? “” বিনিময়ে আলাল উদ্দিন জানাল, ছেলেটা তার গোপন এবং বিশ্বস্ত কর্মচারী।ছেলেটা পাগল। সারাক্ষণ চাঁদ, চাঁদ করে। খাওয়া-দাওয়া, গোসলের বালাই নেই। আলাল উদ্দিন যখন যা বলে, তাই করে দেয়। পাগল হলেও ছেলেটার মাথায় তীব্র বুদ্ধি রয়েছে। যখন যেখানে বলবে, ঠিক সেখানেই মাল সাপ্লাই দিয়ে দেয়। তবে সবটাই রাতের বেলায়। দিনের বেলায় সে কোনো কাজ করতে রাজি না। কীভাবে পৌঁছায়, না পৌঁছায়, সেই বিষয়েও কারোর কোনো ধারণা নেই। দিন শেষে হাতে টাকা পৌঁছে যায়, শুধু এটুকুই জানে। এর বিনিময়ে ছেলেটার আলাদা কোনো ডিমান্ড নেই। সে শুধু কাজ ছাড়া বাকিটা সময় নেশায় ডুবে থাকতে চায়। আলাল উদ্দিন এখনো পর্যন্ত যতটা ছেলেকে ধরে এনেছে, তাদের মধ্যে এই প্রথম ছেলে, যে স্বেচ্ছায় বেপথে গিয়েছে। প্রতিনিয়ত নেশা করতে করতে নিজেকে একদম ধ্বংসের শেষ প্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে। আলাল উদ্দিন যেন কোনো রূপ সন্দেহ না করে, তাই বিহান আগ বাড়িয়ে জানতে চাইল, ছেলেটার নাম কী। আলাল উদ্দিন বলতে পারলেন না।

প্রথম দিকে ছেলেটাকে বহুবার নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন, কিন্তু ছেলেটা নাম বলতে নারাজ। নাম তো দূরের থাক, একটা বাক্যও আওড়ায় না। সারাক্ষণ চুপচাপ থাকে। কাজ করতে বললে করে দেয়, আর নেশার ঘোরে “”চাঁদ, চাঁদ “” বলে কাকে যেন ডাকে। হয়তো প্রেমিকা-টেমিকা হবে। তাই তিনি ছেলেটার নাম দিয়েছেন চাঁদ পাগলা। আপাতত ছেলেটাকে এই নামেই ডাকা হয়। সেদিন কথা না বাড়িয়ে ফিরে এসেছিল বিহান। বাড়িতে এসে দ্বীপকে বিষয়টা জানাতেই দ্বীপ গভীর ভাবনায় মিশে গেল। পল্লব যেহেতু এই মুহূর্তে আলাল উদ্দিনের খুব ঘনিষ্ঠ কর্মচারী, সেহেতু খুব সহজে পল্লবকে সেখান থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব না। স্বাভাবিকভাবেই আলাল উদ্দিনের সকল গোপন ব্যবসার আগাগোড়া সম্পর্কে ধারণা রয়েছে পল্লবের। পল্লব হাতছাড়া হওয়া মানে আলাল উদ্দিনের সকল অপকর্ম ফাঁস হয়ে যাওয়া। এই মুহূর্তে পল্লব যদি নিজ থেকেও চায়, তারপরও এই পথ থেকে ফিরে আসা সম্ভব না। সবশেষে একটাই উপায় থেকে যায়, সেটা হলো আলাল উদ্দিনের সঙ্গে কৌশল করে পল্লবকে কিনে নেওয়া কিংবা জিতে নেওয়া। সেটা হতে পারে গ্যাম্বলিংয়ের মাধ্যমে। এসব অপকর্মের সঙ্গে জড়িত লোকগুলো বরাবরই জুয়ার প্রতি আসক্ত থাকে। দ্বীপ জুয়াটাকেই টার্গেট করল। বিহানের সঙ্গে চুক্তি হলো, দুদিনের মাথায় আলাল উদ্দিনের ডেরার উদ্দেশে রওনা হবে দুজন। যখন ফিরবে, পল্লবকে সঙ্গে নিয়েই ফিরবে। কথামতো দুদিনের মাথায় সন্ধ্যার পরপর অফিস থেকে সোজা আলাল উদ্দিনের গোপন ডেরায় পৌঁছাল দুজন।

যেহেতু জুয়া খেলার আসর বসানোর কথা আগে থেকেই আলাল উদ্দিনকে জানানো হয়েছিল, তাই ডেরায় সাত-আটজন নিয়ে আগে থেকেই আসর জমিয়ে রেখেছিল আলাল উদ্দিন।পৌঁছানোর পর কথা ছিল জমজমাট জুয়ার আসর ও মদ্যপানের প্রতিযোগিতা দেখার। অথচ গিয়ে দেখল, জুয়ার বোর্ডের পাশে ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে থাকা সাতটি লাশ। ভেতরের ঘর থেকে মরণযন্ত্রণায় কাতরানোর শব্দ আসছে। দ্বীপ-বিহান দ্বিধান্বিত দৃষ্টিতে একে অপরের দিকে তাকিয়ে শব্দ অনুসরণ করে ভেতরে পৌঁছাতেই মাটিতে পড়ে কাতরাতে থাকা পল্লবকে দেখতে পেল। হাতে ড্রাগসের ইনজেকশন। পল্লবের পাশে কুঠার হাতে হাঁটু ভাঁজ করে বসে আছে অর্পনা। পরনে থাকা অনিয়ন কালারের শার্টটা রক্তে ভিজে কালো রং ধারণ করেছে। লম্বা চুলগুলোতে করা খোঁপাটা খুলে অর্ধেকটা নেমে এসেছে। এক হাতে কুঠার থাকলেও অন্য হাতে রিভলভারের অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে। সমানে ফোঁপাচ্ছে মেয়েটা। পিছনে কারোর পদধ্বনির শব্দ পেতেই ফোঁস করে উঠল অর্পনা। পাশ থেকে রিভলভার নিয়ে শব্দ অনুসারে শুট করতেই বিহান আর দ্বীপ দুদিকে সরে গেল। অর্পনার কাণ্ডে দাঁতে দাঁত চাপল দ্বীপ। ধমকের স্বরে আওড়াল— স্টপ, অর্পনা!! আমি দ্বীপ।

,,, দ্বীপের কণ্ঠ শুনে ঘুরে তাকাল অর্পনা। সামনে দ্বীপকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ফুঁপিয়ে উঠল। কাঁপা কাঁপা পায়ে উঠে দাঁড়াতে চেয়েও খেই হারিয়ে নিচে পড়ে যেতে নিলে মুহূর্তেই ঝুঁকে পড়ল দ্বীপ। দুহাতে অর্পনাকে আগলে নিয়ে মেঝেতে বসে পড়ল। অর্পনা দ্বীপের দিকে তাকিয়ে ফোঁপাতে ফোঁপাতে পল্লবের দিকে আঙুল তাক করে নালিশ করার মতো করে বললো — দেখুন না, ওরা পল্লবকে কী বানিয়ে দিয়েছে। ও তো কখনো নেশা করত না। ওকে ড্রাগস পুশ করে দিয়েছে, পাগলও বানিয়ে দিয়েছে।
বলেই ঝরঝর করে কেঁদে দিল মেয়েটা। অর্পনার কাণ্ডে দ্বীপ রাগ করবে, নাকি ওর কান্না থামাতে শান্তনা দেবে, ভেবে পেল না।অর্পনা কাঁদতে কাঁদতে কাতর দৃষ্টিতে দ্বীপের দিকে তাকিয়ে রইল। হয়তো স্বামীর কাছ থেকে বাহবা পেতে চাইছে, শুনতে চাইছে “” তুমি যা করেছ, একদম ঠিক করেছ।”” অথচ দ্বীপ এরকম কোনো বাক্যই আওড়াল না। বরং অসন্তোষভরা কণ্ঠে বলল—

— ওরা কিছু করেনি, ভেলোরা। পল্লব নিজেই এই পথে এসেছে। স্বেচ্ছায় ড্রাগস নিয়েছে।
মুহূর্তেই কান্না ভুলে ফুঁসে উঠল অর্পনা — হ্যাঁ, স্বেচ্ছায় নিয়েছে, তাতে কী? তাতে ওরা নির্দোষ হয়ে যাবে? ওরা পল্লবকে প্রশ্রয় না দিলে, এখানে জায়গা না দিলে, সে এতটা বেপথে যেতে পারত? বলুন! এই যে ওর হাতে থাকা ড্রাগসটা, এর প্রাইস কত? ভাবতে পারছেন? বাইরে থাকলে এত টাকা কোথায় পেত সে? কীভাবে কিনত? প্র্যাকটিক্যালি ভাবুন, দ্বীপ। ওর একার পক্ষে এতটা বিগড়ে যাওয়া আদৌ সম্ভব ছিল? ওরা সবাই মিলে আমার পল্লবকে ধ্বংস করে দিয়েছে। তাই আমিও ওদের মেরে দিয়েছি। হিসাব বরাবর।
,,,,বলেই ফোঁসফোঁস করে উঠল অর্পনা। তার ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি। লোকগুলোকে বোধহয় কুপিয়েছিল। ফলস্বরূপ শরীরের সঙ্গে সঙ্গে চোখে-মুখেও রক্ত লেপ্টে রয়েছে। এমতাবস্থায় রমনিকে দেখতে বড্ড ভয়ঙ্কর ঠেকছে, ঠিক যেন দ্বীপ মির্জার ব্লাড ভেলোরা।

ভাগ্যিস আজকে এসেছে। আজ সবাই মদ খেয়ে মাতাল ছিল, বিদায় অর্পনা একা কাজটা করতে পেরেছে। যদি আজ না এসে অন্য কোনো দিন আসত, তাহলে কী অবস্থা হতো অর্পনার? বিষয়টা ভেবে চিন্তিত হওয়ার পাশাপাশি চরম বিরক্ত হলো দ্বীপ। মেয়ে মানুষ একটু কমবেশি বুঝবে, এটা মানা যায়; কিন্তু সঠিক বুঝলেই সমস্যা। অর্পনা যেটা বিবেক দিয়ে চিন্তা করছে, পল্লবের ক্ষেত্রে আসলেই কি সেই বিবেকটা খাটে? অর্পনা মানুক আর নাই-বা মানুক, পল্লব স্বেচ্ছায় নিজেকে ধ্বংস করেছে। এমনভাবে দিনের পর দিন নেশা করে গিয়েছে, যেন খুব দ্রুতই এই পৃথিবী থেকে মুক্তি পায় সে। হয়তো আলাল উদ্দিন বেপারি যুবক ছেলে-পুলেদের ধরে এনে নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য তাদেরকে নেশায় আসক্ত করে তোলে, কিন্তু পল্লবের ব্যাপারটা আলাদা। পল্লব যে পরিমাণ নেশা করেছে, একটা ছেলেকে নেশায় আসক্ত করতে এতটা মাদকের প্রয়োজন পড়ে না। বিরক্তির সঙ্গে সঙ্গে দ্বীপের এবার রাগও হলো। রাগ সামলাতে না পেরে হাত উঁচিয়ে কপালে আঙুল দ্বারা ম্যাসাজ করে মাথা ঠান্ডা করার প্রয়াস চালাল। পরপর গাঢ় নিশ্বাস ফেলে অর্পনার গাল আঁকড়ে ধরে হতাশ কণ্ঠে আওড়াল—

— তোর ওদেরকে ভুল মনে হয়েছে, মারতে ইচ্ছা করেছে, আমাকে বলতি। আমি ব্যবস্থা করে দিতাম। এখানে কেন? এই মুহূর্তে এতগুলো লাশ কী করব আমি? কীভাবে সামলাব এসব?
,,, অর্পনা ভেবেছিল, দ্বীপ বোধহয় এবার তার ভেতরের কষ্টটা ঠাওর করতে পারবে। অথচ লোকটা পারল না, উল্টো অভিযোগ করছে। তীব্র অভিমানে গাল থেকে দ্বীপের হাতখানা সরিয়ে দিল অর্পনা। দুহাতে চোখ মুছে কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে শক্ত কণ্ঠে আওড়াল—
— সামলাতে হবে না। আমাকে জেলে দিয়ে দিন। ফাঁসি হলে হবে, যাবজ্জীবন হলেও সই।
,,, মুহূর্তেই রাগে ফেটে পড়ল মানন। রমনির পানে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে তেড়ে গিয়ে নরম চোয়ালখানা চেপে ধরল। রাগের তোপে মানবের নাকের পাটা ফুলে উঠেছে, কপালের রগখানা ধপধপ করে লাফিয়ে উঠল— কুত্তার বাচ্চা! বলেই খালাস, না? তোর জেল, ফাঁসি হলে আমার মেয়ের কী হবে?
,,, আজ বহুদিন পর ঘটল ঘটনাটা। অর্পনার হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত দ্বীপ একবারের জন্যও অর্পনার সঙ্গে রুড বিহেভ করেনি। অথচ আজ আবারও আঘাত করল। অর্পনার মনে জমা অভিমানটুকু কেমন তরতর করে বেড়ে উঠল। সহসা চোয়াল ছাড়ানোর প্রয়াস না চালিয়ে চোখ বুজে নিল রমনি। অভিমানী কণ্ঠে উত্তর করল—

— আপনি না বলেছিলেন, আপনি আরশাদ জামানের মতো বাবা হবেন? আমি না থাকলে আমার মেয়েকে সামলাতে পারবেন না?
,,, অর্পনার বলা এহেন বাক্যে দ্বীপের সদ্য ওঠা রাগটা কেমন ধপ করেই নিভে গেল। হাতের চাপ কমিয়ে গালটা নরমভাবে আঁকড়ে ধরে কাতর কণ্ঠে শুধাল
— তাহলে আমার কী হবে?
,,, এই পর্যায়ে অর্পনাও কেমন নরম হয়ে এলো। চট করে বন্ধ চোখের পাতা খুলে নজর স্থির করল মানবের ধূসর রঙা বিড়াল চোখে। কান্নাভেজা চোখে তাকিয়ে মোহাচ্ছন্নের ন্যায় শুধাল — আমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবেন না?
,,, অর্পনার গালখানা আরও নিবিড়ভাবে আঁকড়ে ধরল দ্বীপ — তোর কী মনে হয়?
,,, অর্পনা উত্তর করল না। দ্বীপের হাতখানা গাল থেকে সরিয়ে মানবের শক্তপোক্ত বুকে মাথা ঠেকিয়ে অস্ফুট স্বরে আওড়াল — আই হেইট ইউ, দ্বীপ মির্জা।

,,, দ্বীপের বুকটা কেমন শীতল হয়ে এলো। এতক্ষণকার রাগ, চিন্তা, বিরক্তি সব কেমন এক নিমিষেই মিলিয়ে গেল। সে অর্পনার কোমরখানা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ছোট্ট নাজুক শরীরটা আরও গভীরভাবে আগলে নিল। মাথায় চুমু খেয়ে আওড়াল — লাভ ইউ টু।
,,,, সত্যি সত্যিই হয়তো দ্বীপের একটা জীবন উৎরে দেওয়ার জন্য বিহানের জন্ম হয়েছিল। সেদিন খুবই কৌশলের সঙ্গে বাঁচিয়ে দিয়েছিল অর্পনাকে। আলাল উদ্দিনের ফিশ ট্রান্সপোর্ট বক্সে সযত্নে তার ও তার সঙ্গিদের লাশ কেটে-কুটে সাজিয়ে রেখে লোক দিয়ে নিজেদের শিপে তুলে বুড়িগঙ্গা নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছিল। ভাগ্যিস সময়টা রাতের শুরুতে ছিল আর ডেরাটাও প্রায় ফাঁকাই ছিল। খুব একটা মানুষ না থাকায় ভেতরের দিকে যারা উপস্থিত ছিল, তাদেরকে টাকা দিয়ে নিজেদের দলে টানা সম্ভব হয়েছে।

অথচ এত কিছু করার পরও পল্লবকে এই পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেনি অর্পনা। কথায় আছে না? যে স্বেচ্ছায় মরতে চায়, তাকে ঠেকায় কার সাধ্য? ছেলেটা বোধহয় ঠিকই করে নিয়েছে, সে আর কোনোদিন স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে না। আলাল উদ্দিনের ডেরা থেকে পল্লবকে ফিরিয়ে আনার পর অর্পনা আবার অসুস্থ হয়ে পড়ে। দিনের অর্ধেকটা সময় পাগলামি করা, ওষুধ খেতে না চাওয়া, নিজেকে অসুস্থ মানতে না চাওয়া, হ্যালুসিনেশনের মাত্রা বেড়ে যাওয়া, নিজেকে অকারণে আঘাত করা আরও কয়েক রকমের প্রবলেম দেখা যায় অর্পনার মাঝে। প্রকৃতির তখন দুই বছর আড়াই মাস চলে। অর্পনা খুব একটা মেয়ের খেয়াল রাখতে পারে না। সারাদিন মেয়েটাকে বাড়ির লোকেরা কোনো রকম আগলে নিলেও রাতের পুরোটা সময় দ্বীপ একা হাতেই সামলায় প্রকৃতিকে। অর্পনার ওপর মাঝেমধ্যেই খুব রাগ হয় দ্বীপের। বন্ধু-বান্ধবের শোকে নিজের সংসারের কথা মাথায় নেই রমনির। পৃথিবীতে কি আর কারোর বন্ধু-বান্ধব নেই? অথচ বেশিক্ষণ সেই রাগটা ধরে রাখতে পারে না। এদের বন্ধুত্বটা দেখেছে দ্বীপ, সঙ্গে পাঁচজনের করা ভাগ্যের সঙ্গে নিষ্ঠুর অভিযাত্রাটুকুও। প্রথম কয়েক মাস অর্পনাকে মেডিসিন খাওয়াতে সক্ষম না হলেও, এরপর বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে মেডিসিন খাওয়াতে সক্ষম হয় দ্বীপ। হয়তো প্রতিদিন খাওয়ানো যায় না, তবে যতটা খাওয়ানো যায়, ততটা দিয়েই তো বেঁচে আছে দ্বীপের সঙ্গে। এটাই অনেক।,,,

পল্লবকে আলাল উদ্দিনের ডেরা থেকে ফিরিয়ে আনার পর টানা পাঁচ মাস চিকিৎসার আওতায় রাখা হয়েছিল। কিন্তু কার পল্লবকে? সে কখনো ফিরতেই চায়নি, আর না বাঁচতে চেয়েছে। একটুখানি পালানোর ফুরসত পেতেই আবারও পালাল ছেলেটা। রাতের আকাশে চাঁদের পানে তাকিয়ে তাকিয়ে সে আবারও তার প্রলয়ঙ্করীকে খুঁজতে শুরু করল। এবার আর ট্রেনে চড়ার মতো ভুল করল না। উল্টো হাঁটা ধরল রেললাইনের পথ ধরে। যেদিকে চোখ গেল, যেতে ইচ্ছা হলো, গন্তব্যহীন চলে গেল। পল্লব নামক ছেলেটার লাক খুব খারাপ। তার হ্যালুসিনেশন হয় না। মানসিক বিকারগ্রস্ত লোকেরা যখন মাত্রাতিরিক্ত খারাপ পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন নাকি তাদের হ্যালুসিনেশন হয়। বাস্তব আর নিজের তৈরি করা কল্পনার মাঝে তফাত খুঁজে পায় না। অথচ পল্লবের এমন কিছুই হয় না। চাঁদ হারিয়ে যাওয়ার পর এত নেশা করল, নিজেকে এতটা টর্চার করল, তাও চাঁদকে একটাবারের জন্য দেখতে পেল না। তবে কি পল্লব এখনো পুরোপুরি অসুস্থ হতে পারেনি? কতদিন লাগবে ওই রকম অসুস্থ হতে, যতটা অসুস্থ হলে চাঁদকে দেখা যায়? আরও কতটা নেশাদ্রব্য পান করলে পল্লব একেবারে ধ্বংস হয়ে যাবে? জানা নেই ছেলেটার।

পল্লব পালিয়ে যাওয়ার মাস চারেকের মাথায় আবারও পল্লবকে খুঁজে বের করে অর্পনা। তিন মাস ট্রিটমেন্ট চলার পর আবারও পালিয়ে যায় ছেলেটা, আর ফিরে আসে পরশীর বিয়ের দিন। এবারেও ছেলেটাকে আটকে দিল অর্পনা, ইরাদ। অরুণও সাথ দিল তাতে।রাত্রির লাশের সঙ্গে সেদিন একটা ডায়েরিও এসেছিল। সেখানে লেখা প্রতিটি অক্ষর প্রত্যেকের জানা। প্রথম দিকে অরুণ পল্লবের সঙ্গে অভিমান করে থাকলেও চার বছর পর প্রাণের চেয়েও প্রিয় বন্ধুটার এমন অবস্থা দেখে অভিমান ধরে রাখতে পারেনি। কার সাথেই বা অভিমান করবে? যে দিনের সম্পূর্ণটা সময় দিশেহারার মতো কাটিয়ে দেয়, তার সঙ্গে আদৌ কি অভিমান খাটে? পল্লবকে এভার কেয়ার হাসপাতালের সাইকিয়াট্রি বিভাগে ভর্তি করানো হয়েছে আজ ছয়দিন। এই ছয়দিনে তিন বন্ধু মিলে একবার হলেও এসে দেখা করে গিয়েছে পল্লবের সঙ্গে। চারজন মিলে একটা ছোটখাটো আড্ডার ব্যবস্থা করেছে, যেখানে তিনজন অনবরত কথা বললেও পল্লব ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া কিছুই করেনি। অর্পনা জানে না, পল্লবকে সে এভাবে কতক্ষণ আটকে রাখতে পারবে। তবে এবার সর্বোচ্চ সতর্ক হয়েছে সে। পল্লবের কেবিনের সামনে প্রতিনিয়ত গার্ড দাঁড়িয়ে থাকবে। এক মুহূর্তের জন্যও ছেলেটাকে নজরের বাইরে যেতে দেবে না।

প্রতিদিনকার ন্যায় আজকেও আড্ডা দিতে বসেছে তিনজন। নানান কথায় পল্লবকে নিজেদের মাঝে শামিল করার চেষ্টা চালাচ্ছে। অথচ ছেলেটার তাতে ধ্যান নেই। সে বালিশে গা হেলিয়ে একমনে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। পল্লবের শরীরটা ভালো নেই। নেশা করতে করতে ভেতরে জখম সৃষ্টি করেছে। দুটো কিডনিই প্রায় ড্যামেজ। স্মৃতিশক্তির মাত্রা কম। খুব কাছের কাউকে ছাড়া অন্যদের চেনে না। চেনে কিনা জানা নেই, তবে ফিরেও তাকায় না। পল্লবকে পাওয়ার পর তার পরিবার এসেছিল। পল্লব শুধু সবাইকে এক ঝলক দেখেছে। কারোর সঙ্গে কোনো কথা বলেনি। অনাহিতা অনেকবার কেঁদে কেঁদে মাফ চেয়েছে, ওদের কাছে ফিরে আসার অনুরোধ জানিয়েছে। তবে পল্লব কোনো উত্তর করেনি। শুধু মা যখন কাঁদছিল, তখন পল্লবও মায়ের বুকে মুখ গুঁজে বারবার “চাঁদ আমার কাছে আসে না, মা ” বলে কেঁদেছিল। তাছাড়া আসার পর থেকে অর্পনা, অরুণ, ইরাদ কারোর সঙ্গেই কথা বলেনি। অরুণ কত ডাকল, ইরাদ জড়িয়ে ধরে কাঁদল। অর্পনার ভালোবাসা তো মারের মাধ্যমেই প্রকাশ পায়।

দ্বীপ আর অর্পনার কিছু কিছু বিষয় অকারণেই মিলে যায়। এই যে মারের মাধ্যমে ভালোবাসা প্রকাশ করা এই দিকটাতে দুজনের চরিত্রই এক। অর্পনা নিজেকে সামলাতে না পেরে পল্লবকে মেরেছিল পর্যন্ত। অভিযোগ জানিয়েছিল, কেন বারবার তাদেরকে ছেড়ে যায়। মার খেয়েও পল্লব একটা বাক্য ব্যয় করেনি। শুধু অর্পনা যখন মারতে মারতে ক্লান্ত হয়ে পল্লবের কাঁধে মাথা হেলিয়ে দিয়েছিল, তখন ছেলেটা হাত উঁচিয়ে অর্পনার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিল। ঠিক ওই সময়টাতেই ইরাদ আর অরুণ ঝাঁপটে ধরেছিল পল্লব-অর্পনাকে। বহুদিন পর এতটুকুই ছিল তাদের মিলনের দৃশ্য। আল্লাহ চাইলে বোধহয় আরও হবে।হয়তো রাত বেঁচে নেই, তবে অর্পনা স্বপ্ন দেখে একদিন পল্লব সুস্থ হয়ে যাবে। তারপর তারা চারজন মিলে প্রতিদিন রাতের কবরে যাবে। রাত তো আসে তার কাছে। রাত যখন আসবে, তখন অর্পনা সবাইকে বলবে। এভাবেই, এভাবেই একদিন মিলিত হবে পাঁচজন। ভাবনা রেখে অর্পনা বাড়ি থেকে আনা খাবারের অংশ থেকে আরেকটু খাবার এগিয়ে দিল পল্লবের দিকে। ছেলেটা নিল না। অনেকক্ষণ যাবৎ চেষ্টা করেও এক টুকরো খাবার খাওয়ানো যায়নি। খাবার না খেলে ওষুধটা খাওয়াবে কী করে? অর্পনার ভাবনার ঘোর কাটিয়ে আকস্মিক কেবিনের দরজা ঠেলে উঁকি দিল সিদ্ধার্থ। তার কোলে ছোট্ট প্রকৃতি। সে দুহাতে দরজাটা আরেকটু সরিয়ে উঁকি দিয়ে হাত উঁচিয়ে বলল — হাই, এব্বিয়ান।

,,,, সিদ্ধার্থ কেমন দ্বিধান্বিত দৃষ্টিতে ভাগনির পানে তাকিয়ে শুধাল — এব্বিয়ান কী, মা?
,,, প্রকৃতি মিনি সাইজের ডান হাতখানার তর্জনী আঙুল তুলে একে একে সবাইকে দেখিয়ে বলল — মাম্মা, ইলা মাম্মা, অলু মামু, পলু মামু—চবাই এব্বিয়ান।
,,, নাম শুনে ফিক করে হেসে দিল ইরাদ। অর্পনার দিকে তাকিয়ে বলল — নামগুলোকে জাস্ট ধুয়ে দিল তোর মেয়ে। কার মতো বিচ্ছু হয়েছে বল তো?
,,, অর্পনা খাবারটা পল্লবের মুখের কাছে বাড়িয়ে রেখেই নাক কুঁচকে বিরক্তির স্বরে আওড়াল — কার মতো আবার! চাচার মতো হয়েছে। শত্রুর মেয়ে একটা।
,,, অর্পনার মুখভঙ্গি দেখে অরুণ হাসতে হাসতে এগিয়ে গিয়ে প্রকৃতিকে ভেতরে নিয়ে এলো। সিদ্ধার্থ আবারও দরজা আটকে বাইরে চলে গেল। বন্ধুদের মাঝে তার থেকে কাজ নেই। প্রকৃতিকে নিয়ে ভেতরে ঢুকতেই সে পল্লবের কাছে যেতে চাইল। অরুণ প্রথমে মানা করলেও অর্পনা ইশারায় সায় জানাতেই প্রকৃতিকে পল্লবের বেডে নামিয়ে দিল অরুণ।প্রকৃতি হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গিয়ে পল্লবের কোলে উঠে বসল। পল্লব খুশি হয়েছে নাকি বিরক্ত হয়েছে, জানা নেই। সে প্রকৃতির দিকে একধ্যানে তাকিয়ে রইল। প্রকৃতি একটু উঁচু হয়ে পল্লবের দাড়ি-গোঁফওয়ালা গালে আলতো করে চুমু খেয়ে বলল—

— তোমাল কি মন কালাপ, পলু মামু? কাচ্চো না যে? তুমি ও কি পকিতিল মতো কেতে অপচ্চদ্দ (অপছন্দ) কলো?
,,, পল্লব উত্তর করল না। প্রকৃতি এতে কিছু মনে করেনি। পাপ্পা তো বলেছে, পলু মামু মাম্মার মতোই অসুস্থ। তাই পলু মামুকে মাম্মার মতো কেয়ার করতে হবে। হাসপাতালে এসে একদম দুষ্টামি করা যাবে না, কাঁদাও যাবে না, জেদও করা যাবে না। তাই প্রকৃতি লক্ষ্মী বাচ্চার মতো চুপচাপ দুটো হাত নিজের গালে রেখে মিষ্টি হেসে শুধাল — পকিতি অনেক কিউত না? এদ্দম মাম্মাল মতো?
,,, আজ ছয়দিন পর সবাইকে ছাপিয়ে প্রকৃতির কথায় উত্তর করল পল্লব — হুম! সুন্দর।
,,, আকস্মিক পল্লবের উত্তর শুনে উপস্থিত তিনজনই কেমন অবাক বনে গেল। তিনজনকে আরও অবাক করে দিয়ে প্রকৃতি এবার ছোট ছোট হাতে পল্লবের মাথায় হাত বুলিয়ে শুধাল—

— তায়লে তুমি সুত্থ হয়ে আমাছ ছাথে থাব্বে? আমাছ ছাথে তাকলে তোমায় এতোগুলো ইম্মি ইম্মি চক্কেত দিবো। তুমি হালিয়ে গেলে মাম্মা কত্থ পায়, কাদে। মাম্মা কত্থ পেলে পকিতিও কত্ত পায়। তুমি যেও না, মামু।
,,, মেয়ের কথায় অবাকের পর অবাক হচ্ছে অর্পনা। এটুকু মেয়ে তাকে এতটা নোট করে? কীভাবে করে? নাকি ওই লোকটা মেয়েকে এসব শেখায়? মেয়েটা যে ধীরে ধীরে অর্পনার মায়ের রূপ নিচ্ছে, তা কি ওই লোকটা জানে? জানে বোধহয়। সে নিজেই তো মেয়েকে বরাবর মা হওয়ার ট্রেনিং দিয়ে যাচ্ছে। আচ্ছা! লোকটা এত ভালো কেন? সারাক্ষণ তাকে কীভাবে খুশি রাখা যায়, সেই চিন্তায় মগ্ন থাকে। এতটা ভালোবাসার কি সত্যিই প্রয়োজন ছিল? প্রকৃতি এখনো পল্লবের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। পাকামো করে অর্পনার হাত থেকে খাবার নিয়ে ছোট ছোট হাতে পল্লবের দিকে খাবারটা এগিয়েও দিল। প্রথম দিকে ছেলেটা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলেও নিষ্পাপ প্রকৃতির আদুরে বাক্যগুলো উপেক্ষা করতে পারল না।প্রকৃতি এক হাতে পল্লবের মাথায় হাত বুলিয়ে, আরেক হাতে পরোটার টুকরোটা এগিয়ে দিয়ে আদুরে স্বরে বলল — একতু কাও। পকিতিল মতো দুসতো কত্তে হয় না। একতু কাও।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৮

,,, প্রকৃতির আচরণে অর্পনা বোধহয় একটু আশার আলো দেখতে পেল। মানবজীবন চক্রে একটা নিয়ম খুব ভালো করে লক্ষ করা যায়। মানুষ প্রথমে ভালোবাসার মায়ায় পড়ে, এরপর সম্পর্কের, তারপর সন্তানের। ‘সন্তান’ শব্দটাতে এমন একটা মায়া থাকে, যে মায়ায় পড়ে জঘন্য থেকেও জঘন্য রূপের মানুষটাও ভালো হয়ে যায়, অন্ধকার পথ মাড়িয়ে আলোর পথে ফিরে আসে।প্রকৃতি কি কোনোভাবে সেই মাধ্যম হতে পারে? পল্লব তো প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিচ্ছে। এমন কি হতে পারে না, যে পল্লব প্রকৃতির মায়ায় পড়ে একটা জীবন সুস্থ, স্বাভাবিকভাবে কাটিয়ে দিল?

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here