৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৯
রুপান্জলি
মাঝে কেটেছে আরও চারদিন। এই চারদিনে প্রকৃতির সাথে পল্লবের একটা মোটামুটি আকারের বন্ধুত্ব হয়েছে। আর কারোর সাথে কথা না বললেও প্রকৃতির সাথে টুকটাক কথা বলে সে। মেয়েটা খাইয়ে দিতে চাইলে খুব একটা ফিরিয়ে দিতে পারে না। বিষয়টা নিয়ে অর্পনা, ইরাদ, অরুণ, পল্লবের পরিবার বেশ খুশি। যদি কোনোভাবে প্রকৃতিকে ঘিরে পল্লবের একটা পিছুটান তৈরি হয়, তাহলে বোধহয় ছেলেটা সুযোগ পেলেই পালিয়ে যাওয়ার রাস্তা খোঁজা বন্ধ করে দেবে। তবে পুরোপুরি ভরসা পাচ্ছে না অর্পনা। এর আগেও পল্লবকে যতবার খুঁজে পেয়েছে, ততবার সম্পর্কের মায়ায় বাঁধার চেষ্টা করেছিল। ছেলেটা কোনো সম্পর্ককেই পরোয়া করেনি, এমনকি নিজের মা-বাবার সম্পর্কটাকেও না। এখন প্রকৃতির মাধ্যমে আদৌ পল্লবের জীবনে কোনো ইফেক্ট পড়বে কিনা, তার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না অর্পনা। তবুও আশা ছাড়া যাবে না। কোনো না কোনোভাবে পল্লবকে আটকে দিতেই হবে, নয়তো পল্লবের পরিবারের কী হবে? কে দেখবে ওদের? আর তারাই বা বাচবে কি করে?
,,, অর্পনা সকাল সকাল পল্লবের জন্য রান্না করা খাবারটা প্যাক করে প্রকৃতি ও আরণ্যককে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। প্রথমে তারা হাসপাতালে যাবে, তারপর পল্লবকে খাইয়ে ছেলে-মেয়ে দুটোকে কোচিং সেন্টারে দিয়ে বাড়ি ফিরবে। গত চারদিন যাবৎ এটাই হয়ে আসছে। অর্পনা প্রতিদিন প্রকৃতি আর আরণ্যককে নিয়ে হাসপাতাল হয়ে তারপর কোচিং সেন্টারে দিয়ে আসে, আর ফিরিয়ে আনার বেলায় আগের মতো বিহান গিয়ে নিয়ে আসে। পল্লব মামুর কাছে যাবে বলে প্রকৃতি আরণ্যকের হাত ধরে লাফাতে লাফাতে আগেভাগেই বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার বেলায় দরজার সামনে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডদের হাই দিতেও ভুলল না। অর্পনা মেয়ের কাণ্ড দেখে তপ্ত শ্বাস ফেলে পিছু পিছু এগিয়ে গেল। বাপ, চাচা, ফুপু সবার স্বভাব নিয়ে জন্ম নিয়েছে মেয়েটা। গাড়ির কাছে আসতেই ছেলে-মেয়ে দুটোকে ব্যাক সিটে তুলে দিয়ে অর্পনা ড্রাইভিং সিটে উঠে বসল। গাড়িটি মির্জা বাড়ির লম্বা গেট পেরিয়ে কিছুটা সামনে এগোতেই উল্টো পথ থেকে আরও একটি গাড়ি এগিয়ে এলো। সহসাই ব্রেক কষে জায়গায় থেমে গেল অর্পনা। দৃষ্টি সামনের দিকে স্থির।গাড়িটির দরজা খুলে বেরিয়ে এলো সিদ্বার্থ। সে ঘুরে গিয়ে অপর পাশের দরজা খুলে দিতেই বেরিয়ে এলো ইরাদ। মেয়েটার পরনে বেগুনি রঙের পিওর মসলিন শাড়ি, হাতে, কানে, গলায়, নাকে সোনার অলংকার।
বড্ড অন্যরকম লাগছে দেখতে। সাদা রং ব্যতীত মেয়েটাকে কখনো অন্য রঙে দেখা যায়নি, অথচ অন্য রংগুলোতে মেয়েটাকে কতটা মায়াবতী লাগে, তা কি জানে এই রমণী? ইরাদ গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতেই ইরাদের নরম হাতখানা আঁকড়ে ধরল সিদ্বার্থ। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে অর্পনার গাড়ির দিকে। প্রাণপ্রিয় বান্ধবীকে নিজের মামাতো ভাইয়ের কাছে প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট পেতে দেখে খুব একটা খারাপ লাগল না অর্পনার; বরং আনন্দে হৃদয়খানা উৎফুল্ল হয়ে উঠল। লোকে বলে, ভালোবাসা নাকি স্থান-কাল, রূপ-সৌন্দর্যের পরোয়া করে না। তার জ্বলজ্বলে প্রমাণ অর্পনার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এই তো ব্ল্যাক টি-শার্ট আর হোয়াইট জগার্স পরিহিত সিদ্বার্থ। চেহারাটা অনেকটাই তার মায়ের মতো। সৌন্দর্যের দিক থেকে বড় ভাইয়ের থেকেও কম নয়। আমেরিকার একজন নামকরা মডেল। অথচ তার পাশে দাঁড়ানো রমণির সৌন্দর্য সিদ্বার্থের সৌন্দর্যের ধার ছোঁয়ারও ক্ষমতা রাখে না। তবুও ছেলেটা ইরাদকে পাগলের মতো ভালোবাসে। অর্পনার এখনো মনে পড়ে সেই সাড়ে চার বছর আগের ঘটনা। হার্ট ট্রান্সপ্লান্টের পর অর্পনা যখন কিছুটা সুস্থ হলো, ওর কাছে ফোন অ্যালাও করার পর অর্পনা যখন প্রথমবার ফোনটা অন করেছিল, সিদ্বার্থের কল, এসএমএস আর ভয়েস নোটিফিকেশনে ১১–১৩ মিনিট যাবৎ অর্পনার ফোন হ্যাং হয়ে পড়েছিল। অর্পনা ইরাদের অবস্থা সম্পর্কে তখনো কিছু জানত না।
অসুস্থ থাকার কারণে দ্বীপ কিছুই জানায়নি। তবে সিদ্বার্থের কল, এসএমএস দেখে কিছু একটা আশঙ্কা করে অর্পনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইনবক্স চেক করতেই জানতে পারল তার অসুস্থ থাকা অবস্থায় ইরাদের সাথে ঠিক কী কী হয়েছিল। অর্পনা তৎক্ষণাৎ সিদ্বার্থকে কল-ব্যাক করেছিল। ছেলেটার সে কী কান্না! বারবার জিজ্ঞেস করছিল”” তার মাই লাভ ঠিক আছে কিনা? তার মাই লাভ কি কাঁদছে? তার মাই লাভ এখন কোথায় আছে? মাই লাভ এখন সেফ আছে তো?”” সিদ্বার্থের পাগলামি দেখে অর্পনা হাসবে নাকি ইরাদের জন্য কাঁদবে, বুঝেই পাচ্ছিল না তখন। এরপর থেকে টানা সাড়ে চার বছরে এমন কোনো দিন ছিল কি, যেদিন সিদ্বার্থ ইরাদের খোঁজ নেয়নি? চোখের দেখা দেখেনি?ইরাদ জানে, এই সাড়ে চার বছরে সিদ্বার্থ ইরাদের কোনো খোঁজ নেয়নি। অথচ অর্পনা জানে, সিদ্বার্থ না থাকলে ইরাদ এত সহজে এমন ভালো একটা পর্যায়ে পৌঁছাতেই পারত না। দূর থেকেও যে কাউকে আগলে রাখা যায়, ভালোবাসা যায়, জীবনের জটিল পথটা সহজ করে দেওয়া যায়, তা সিদ্বার্থকে না দেখলে বুঝতেই পারত না অর্পনা।
ইরাদ যখন নতুন নতুন বিজনেস ওপেন করে, তখন একের পর এক যে অর্ডারগুলো এসেছিল, সবই সিদ্বার্থের হায়ার করা। প্রথম যে ভিডিওটা ভাইরাল হয়েছিল, সেই ভিডিওটাও সিদ্বার্থই লোক লাগিয়ে বিরামহীন শেয়ারের মাধ্যমে ভাইরাল করিয়েছিল। আরও নানাভাবে ইরাদের পথ চলাটা সহজ করে দিয়েছে সিদ্বার্থ। আর সবটাই করেছে ইরাদ যেন নিজেকে একজন সফল নারী হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। এর কিছুই ইরাদ জানে না। জানানোর প্রয়োজনও মনে করেনি সিদ্বার্থ। ভালোবাসা এত প্রকাশ করা ভালো না। কিছু কিছু আয়োজন গোপন করে রাখতে হয়। সিদ্বার্থের প্রতি অন্তরের অন্তস্তল থেকে গভীরভাবে কৃতজ্ঞ অর্পনা। ভাগ্যিস সে ইরাদের জীবনে এসেছিল। ভালোবেসে ইরাদকে দোটানায় ফেলেছিল। নয়তো আজ হয়তো ইরাদও অরুণ আর পল্লবের মতো অপূর্ণতার দহনে জ্বলে-পুড়ে অঙ্গার হতো। আদ্রিয়ান কাইসারকে তো চেনে অর্পনা। খুব ভালো করেই চেনে। এতটাই চেনে, যতটা আদ্রিয়ান কাইসার নিজেকেও চেনে না। ওই লোকটা ইরাদকে কখনো ভালোবাসত না। শুধু ইরাদ নয়, কাউকেই বাসত না। ভবিষ্যতেও বাসবে না, বাসতেই পারবে না। ওই মানুষটা অর্পনা ব্যতীত বাকি মেয়েদের রাস্তার কীট ব্যতীত কিছুই মনে করে না। পৃথা ব্যতীত আর কারোর দাম নেই উনার কাছে আদ্রিয়ানের কথা মনে আসতেই হুট করে অর্পনার মনটা বিষণ্ন হয়ে উঠল। কোথায় আছেন উনি? ভালো আছেন? কেন পরিবারের সাথে যোগাযোগ রাখেননি? বেঁচে আছেন তো? এই কথাটা মাথায় আসতেই অর্পনার মস্তিষ্কটা কেমন জ্বলে উঠল। কপালের মাঝখানটায় ধপধপ করে ব্যথার উৎপত্তি ঘটল। “” বাঁচবে না কেন? আজব! অবশ্যই বেঁচে আছে। হয়তো পরিবারের সাথে যোগাযোগ রাখেননি। এটা তো নতুন কিছুই নয়। আগেও তো খুব একটা কারোর সাথে যোগাযোগ রাখেননি।””
এতগুলো দিন মনকে এই কথাটা মানাতে পারলেও আজ কেন যেন পারল না রমণী।
,,, অর্পনার ভাবনার মাঝেই ইরাদকে নিয়ে গাড়ির কাছে চলে এলো সিদ্বার্থ। ইরাদকে অর্পনার গাড়ির ব্যাক সিটে আরণ্যক আর প্রকৃতির পাশে বসিয়ে ডোর লক করে সরে আসতেই ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে বাইরে বের হলো অর্পনা। সিদ্বার্থ ঘুরে দাঁড়াতেই অর্পনার মুখোমুখি হলো। অর্পনার দৃষ্টিতে শঙ্কা। সিদ্বার্থের ভ্রু জোড়া কেমন গুটিয়ে এলো। ভ্রু নাচাতেই অর্পনা একটু সামনের দিকে যাওয়ার জন্য ইশারা করল। সিদ্বার্থ বিনা বাক্যে এগিয়ে গেল সামনের দিকে। অর্পনাও গেল পিছু পিছু। দুজন সিদ্বার্থের গাড়ির কাছে এসে পৌঁছাতেই অর্পনা শুধাল— উনার সাথে যোগাযোগ হয়?
,,, নাম বলার প্রয়োজন পড়েনি। সিদ্বার্থ এমনিতেই বুঝে নিয়েছে অর্পনা কার কথা বলেছে। সে কেমন মলিন হেসে শুধাল— হঠাৎ?
,,, অর্পনা উপরের ঠোঁট দিয়ে নিচের ঠোঁট চেপে ধরে এদিক-ওদিক নজর সরিয়ে অপ্রস্তুত কণ্ঠে আওড়ালো— উত্তরটা দিলে আমার অস্বস্তিটা কম হতো।
,,, এই পর্যায়ে সিদ্বার্থ কেমন ভাবুক হয়ে পড়ল। খানিক ভেবে অর্পনার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন করল— ভাইয়াকে মনে পড়ে তোমার? এখনো ভুলে যাওনি?
,,, অর্পনা এবার সিদ্বার্থের গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। দৃষ্টিতে এখনো অপ্রস্তুত ভাব। চোখের পাতা অনবরত নড়ছে। সিদ্বার্থ তখনো উত্তরের আশায় অর্পনার থেকে চোখ সরায়নি। অর্পনা অপ্রস্তুত ভাবটুকু কাটিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে আওড়ালো — আমরা কখনো কাউকে ভুলে যাই না, সিদ্বার্থ। শুধু ছেড়ে থাকতে শিখে যাই।
,,, অর্পনার এই সহজ কথাটার মিনিংটুকুও বড্ড ঘোলাটে ঠেকল সিদ্বার্থের কাছে। আদ্রিয়ান আর অর্পনার মধ্যকার সম্পর্ক হোক কিংবা অসম্পর্ক, এর সমীকরণটা কোনোদিন বুঝতে পারেনি সে। সবচেয়ে বেশি গোলকধাঁধা মনে হয় এই অর্পনা নামক চরিত্রটাকে। মেয়েটার মন আর আচরণের মাঝে বিস্তর ফারাক। কোনোটা দেখে কোনোটা আন্দাজ করার জো নেই। সিদ্বার্থের মতে, এই মেয়েটার সাথে কেউ যদি একটা জীবনও কাটিয়ে দেয়, তারপরেও মেয়েটাকে একটা জায়গায় স্থির করতে পারবে না। মূল চরিত্রটাকে ব্যাখ্যা করা সেই মানুষের পক্ষে সম্ভব হবে না বোধহয়। সিদ্বার্থ কেমন দ্বিধাভরাট কণ্ঠে আওড়াল
— তোমাদের মধ্যকার হিসাবটা কখনো মেলাতে পারিনি আমি। আমাকে সাহায্য করবে?
,,, অর্পনা ঠোঁট বাঁকিয়ে ক্ষীণ হাসল — সব হিসাব মিলতে হবে, এমন কোনো নীতিকথা লেখা হয়েছিল কোথাও? সব হিসাব মিলতে নেই। কিছু কিছু হিসাব বেহিসাবের খাতায় গচ্ছিত রাখাই ভালো। বাই দ্য ওয়ে… আমার উত্তরটা?
,,, সিদ্বার্থ কেমন অপারগ দৃষ্টিতে তাকাল। মুহূর্তেই ছেলেটার দৃষ্টি ছলছলে হয়ে উঠল। কণ্ঠও ভেঙে এলো খানিকটা — আমার কাছে কোনো উত্তর নেই, অর্পন। ইরাদের সাথে ঝামেলা হওয়ার সপ্তাহখানেক আগেও ভাইয়া আমার সাথেই ছিল। এর মধ্যে হুট করেই একদিন আমাকে টেক্সট পাঠালো ” ভাইয়া নিজের জীবনটা নিজের মতো কাটাতে চায়। এই জীবন থেকে একটু বিরতি নিয়ে নিজেকে নতুন রূপে আবিষ্কার করতে চায়। আমরা যেন তার খোঁজ না করি। সময় হলে ভাইয়া ঠিক ফিরে আসবে।” কিন্তু এখনো তো ফিরল না। ভাইয়ার কি বিরতি নেওয়া শেষ হয়নি? ড্যাড সারাক্ষণ ভাইয়ার জন্য আফসোস করে। মমকেও মন খারাপ করতে দেখা যায় ইদানীং। কী থেকে কী হয়ে গেল! আমার ভাইয়াকে মেনে নিলে খুব ক্ষতি হতো, অর্পন? দ্বীপ মির্জা কি আমার ভাইয়ের থেকেও বেশি ভালোবাসে তোমায়?
,,,, অর্পনা কেন যেন চট করেই উত্তরটা দিতে পারল না। বলতে পারলো না, হ্যা বাসে। কেন পারছে না, সে নিজেও জানে না। অর্পনা কোনোদিন ভালোবাসা পরিমাপ করতে চায়নি, করেওনি কোনোদিন। সে কোনোদিন জানতে চায়নি দ্বীপ তাকে বেশি ভালোবাসে, নাকি পারমিতা হামিদকে। অনুরূপ নিজেকেও কোনোদিন জিজ্ঞেস করেনি তাকে কে বেশি ভালোবেসেছে? দ্বীপ, নাকি আদ্রিয়ান? এসব পরিমাপ করতে হয় না। যে ভাবনা আমাদের যন্ত্রণা দেয়, সেই ভাবনা মনে আনতে নেই। এতে মন নষ্ট হয়, সঙ্গে সম্পর্কও।
,,, মগবাজার পেরিয়ে সাতরাস্তার মোড়ে পৌঁছাতেই রাস্তা কিছুটা ক্লিয়ার হলো। এই সময়টাতে মগবাজারে প্রতিদিনই টুকটাক জ্যাম পড়ে, তবে আজকের জ্যামটা একটু বেশিই ছিল। জ্যাম ছেড়ে রোড ক্লিয়ার হতেই অর্পনা গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে দিল। তার মনটা বিষণ্ন, খুব একটা ভালো লাগছে না। স্টিয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে কী মনে করে যেন অরুণের দিকে আড়চোখে তাকালো। প্রথম দিকে অরুণের সঙ্গে কথা না বললেও পল্লব ফিরে আসার পর অর্পনা কিভাবে কিভাবে যেন অরুণের ডাকে সাড়া দিয়ে ফেলেছিল। ছেলেটা একটু আবেগপ্রবণ কথা বলতেই অর্পনা আর রাগ ধরে রাখতে পারল না। রাগ ধরে রেখেই বা কী হবে? মানুষের জীবন কতদিনের? আল্লাহ কার হায়াত কতটুকু দিয়েছেন, জানা নেই। তাই যতটা সময় পাওয়া যায়, ততটা সময় রাগ ভুলে প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গে কাটানোই উত্তম। অর্পনার সঙ্গে অরুণের চোখাচোখি হতেই অরুণ মুচকি হেসে ভ্রু নাচালো। ছেলেটাকে বরাবরই খুব ডিস্টার্ব লাগে, অথচ চোখে চোখ পড়লে বিনিময়ে মুচকি হেসে নিজেকে খুশি দেখানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে যায় অরুণ। যেন ওর থেকে সুখী ব্যক্তি পৃথিবীতে দুটো হতে পারে না। অর্পনা একবার ফ্রন্ট মিররে তাকিয়ে ছেলে-মেয়ে দুটোকে দেখে নিল। ইরার হাতের চুড়ি নিয়ে খেলছে দুজন। পরপরই মিরর থেকে চোখ সরিয়ে নজর সামনে স্থির রেখে ধীর কণ্ঠে শুধালো— বৃষ্টিকে নিয়ে কিছু ভেবেছিস?
,,, অর্পনার কথায় ভ্রু বাঁকিয়ে এলো অরুণের— কী ভাবব? কিছু ভাবার কথা ছিল?
,,,, মেয়েটাকে এতটা অবহেলা করা কি খুব প্রয়োজন? তুই কি বাস্তবতা বুঝিস না? কেন ন্যাকা ছেলে-পুলেদের মতো আচরণ করছিস?
,,, কোনটাকে ন্যাকামি মনে হয় তোর?
,,, অর্পনা সোজাসাপ্টাই ব্যাখ্যা করল— অরুণ! মেয়েটাকে বিয়ে করেছিস তুই, সংসার করছিস। সব হচ্ছে, শুধু ভালোবাসা ছাড়া। ভালো না বাসিস, একটুখানি কেয়ার, এফোর্ট, এগুলো অন্তত ডিজার্ভ করে মেয়েটা। মানলাম, সে দ্বিতীয় নারী। তাই বলে এতটা মূল্যহীন? ওর কোনো দাম নেই? মনে করে দেখ তো, যখন দ্বীপ আমায় সেইমভাবে অবহেলা করেছিল, তখন তোর কতটা কষ্ট হয়েছিল। তখন আমার যন্ত্রণাটা পরিমাপ করতে পারলে, আজ নিজের স্ত্রীরটা কেন পারছিস না?
,,, ঘরের ভেতরকার কথাগুলো অর্পনার মুখ থেকে শুনে বড্ড রাগ হলো অরুণের। কত বড় সাহস হলে ওই মেয়েটা অর্পনার কাছে তার নামে নালিশ করে! আজকে একবার বাড়িতে ফিরে নিক, সবার আগে লাথি দিয়ে ঘর থেকে বের করবে। তারপর বাকি হিসাব কীভাবে মেটাতে হয়, জানা আছে অরুণের। রাগের তোপে ছেলেটা দাঁতে দাঁত চেপে বলল— তোর সঙ্গে বৃষ্টির তুলনা যায় না, অর্পন। তুই দ্বীপ ভাইয়ার জন্য ঠিক কতটা স্যাক্রিফাইস করেছিস, তার সবটাই আমার নিজ চোখে দেখা। আর ওকে অবহেলা করলাম কই? জীবনে আছে, থাকবে। আমি তো আর ছেড়ে দিচ্ছি না, তাই না? যা লাগছে, তাই পাচ্ছে। খাওয়া-পরা সব দিচ্ছি। এরপর আর কী লাগে?
,,, অরুণের কথাগুলো বড্ড লেইম লাগল অর্পনার কাছে। এই অরুণকে তো সে চিনতেই পারছে না। মানুষ কেমন হুটহাট পাল্টে যায়, তাই না? অর্পনা কিছুটা বিক্ষিপ্ত মেজাজে আওড়াল— একটা মেয়ে কি শুধু খাওয়া-পড়ার জন্যই বিয়ে করে? বৃষ্টির বাবা কি বৃষ্টিকে খাওয়াতে-পরাতে পারত না? তোদের থেকে কম আছে ওদের? বরং—
,,, বাকি কথা শেষ করার ফুরসত দিল না অরুণ। রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে গাড়ির ড্যাশবোর্ডে চাপড় মেরে রাগান্বিত কণ্ঠে আওড়াল— খাওয়াতে-পরাতে পারলে আমার কাছে বিয়ে দিয়েছে কেন? ওরা কি জানত না, আমি রাতকে ভালোবাসতাম? বৃষ্টি তো সবটাই জানত। বিয়ের আগেই বলেছি, ভালোবাসা, কেয়ার, এফোর্ট এসব কিছু চাওয়া যাবে না। যেভাবে রাখব, সেভাবেই থাকতে হবে। সবটা মেনেই তো এসেছিল। এখন আফসোস করে লাভ কী?
,,, অরুণের আচরণে কেঁপে উঠল অর্পনা। মেন্টালি স্টেবল না থাকার দরুন ইদানীং হুটহাট বিকট শব্দ হলেই ভেতরটা কেঁপে ওঠে। বিষয়টা বুঝতে পেরেই দুর্বল দৃষ্টিতে তাকাল অরুণ। তার তো মনেই ছিল না, অর্পনা অসুস্থ। অর্পনা নিজের ভয়-ভীতি ভুলে আড়চোখে ছেলে-মেয়ে দুটোর দিকে তাকাল। ভেবেছিল, হঠাৎ শব্দে ভয় পাবে দুজন। তবে ওদেরকে খুশি মনে ফোনে কার্টুন দেখতে দেখে স্বস্তি পেল মেয়েটা। চোখের ইশারায় ইরাদকে ধন্যবাদ জানাল। ইরাদও বিনিময়ে চোখের ইশারায় অর্পনাকে আশ্বস্ত করল। অরুণ এখনো দুর্বল দৃষ্টিতে অর্পনার দিকে তাকিয়ে। একটু ঝুঁকে পানির বোতলটা নিয়ে ছিপি খুলে অর্পনার দিকে এগিয়ে দিয়ে নরম স্বরে বলল—
— সরি দোস্ত, ভয় পেয়েছিস?
,,, অর্পনা গাড়ির স্পিড কিছুটা কমিয়ে পানিটুকু নিয়ে কয়েক ঢোক খেয়ে বোতলটা ফিরিয়ে দিয়ে উত্তর করল— এর চার ভাগের এক ভাগ কেয়ারও যদি বৃষ্টিকে করতি, তাহলে মেয়েটা নিজেকে অভাগা মনে করত না।
রাত ১১টা ৩ মিনিট,,,
,,,, সবার খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকে যেতেই মেধার সঙ্গে মিলে-মিশে কাজগুলো সামলে মাত্রই ঘরে এলো অর্পনা। বাড়িতে শাশুড়ি আর চাচি-শাশুড়ি দুজনের মধ্যে একজনও উপস্থিত নেই। দুজন মিলে বিহানের নানিবাড়িতে গিয়েছেন। বিহানের বড়ো মামার শরীর ভীষণ খারাপ। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের কারণে উনি মাঝে-মধ্যেই খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। আজ সকালেই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বিকেলের দিকে বড়ো চাচা-শ্বশুর ও ছোট চাচা-শ্বশুরও গিয়েছিলেন। তবে রাত আটটার পরপরই ফিরে এসেছেন। যার দরুন খাওয়া-দাওয়ার পর্বটা শেষ হতে একটু দেরিই হয়েছে।
রুমে এসে পুরো ঘরে চোখ বুলাতেই সোফায় বসে কাজ করতে থাকা দ্বীপ মির্জাকে দেখা গেল। পরনে থ্রি-কোয়ার্টার আর হাফহাতা গেঞ্জি। একমনে কিবোর্ডে টাইপ করে ল্যাপটপে কিছু একটা নোট করছে তার পাশে গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে স্রিফান। রুমের টেম্পারেচার হাই দেখে নাক কুঁচকালো অর্পনা। এমনিতেই কাজ করে গরম লাগছে, তার ওপর রুমের তাপমাত্রাও বেশি। গরমের ওপর গরম পড়ে আরও অস্বস্তি লাগছে। অর্পনা এগিয়ে গিয়ে বিছানার কোণা থেকে রিমোটটা নিয়ে টেম্পারেচার ১৮-তে নামিয়ে দিল। তারপর খোঁপা করা চুলগুলো খুলে দিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল চুল আঁচড়ানোর উদ্দেশ্যে। হঠাৎ রুমের তাপমাত্রা কমে আসতেই কাজ থামিয়ে অর্পনার দিকে তাকালো দ্বীপ। এমনিতেই শীতকাল, তার ওপর এসির ঠান্ডা। শীতের তোপে দ্বীপের শরীরে কাঁপুনি ধরল। তবে কিছু বলল না। অর্পনার সঙ্গে মেয়েকে ঘরে আসতে না দেখে গলা খাঁকারি দিয়ে শুধালো — সুইটহার্ট কোথায়?
,,, অর্পনা চিরুনি নিয়ে বিছানায় বসে সিঁথি বরাবর চুলগুলো দুই ভাগ করতে করতে উত্তর দিল — মেধাপুর কাছে। আমার শত্রুর সঙ্গে থাকবে বলে বায়না ধরেছে। (বিড়বিড় করে) শত্রুর মেয়ে একটা।
,,, দ্বীপ বিষয়টাতে সন্তুষ্ট হলো নাকি অসন্তুষ্ট, বোঝা গেল না। সে শুধু নেশাগ্রস্তের মতো একবার অর্পনাকে দেখে নিল। মুহূর্তেই যেন রুমের শীতল আবহ কোথায় হারিয়ে গেল। অর্পনার দিক থেকে দৃষ্টি না সরিয়েই কাজটা পেন্ডিং রেখে ল্যাপটপের শাটডাউন করে পরনের টি-শার্টটা খুলে ফেলল। মুহূর্তেই স্যান্ডো গেঞ্জির আড়ালে থাকা প্রশস্ত কাঁধ আর বুকের কিছুটা অংশ উন্মুক্ত হয়ে উঠল।অর্পনা চুলগুলো দুই ভাগ করে কাঁধের দুপাশে রেখে দ্বীপের দিকে তাকাতেই থতমত খেয়ে গেল। একটু আগেই না লোকটার শীত করছিল বলে রুমের তাপমাত্রা বাড়িয়ে রেখেছিল? তাহলে এখন এই তাপমাত্রায় টি-শার্ট খুলে ফেলার মানে কী?
অর্পনার তাকিয়ে থাকার মাঝেই দ্বীপ এক হাতে ঘাড় ডলতে ডলতে ওর দিকে তাকিয়ে ভ্রু বাঁকাল। মুহূর্তেই চোখ সরিয়ে নিল অর্পনা। লোকটার হাবভাব একদমই সুবিধার ঠেকছে না। বিয়ের এত বছর পর এসেও লোকটার সঙ্গে একা ঘরে থাকতে ভয় পাচ্ছে সে। কেমন আমতা-আমতা করে বলল — আমি প্রকৃতিকে নিয়ে আসি, কেমন? রাতে আবার উঠে কান্নাকাটি করলে সমস্যা হবে।
,,, বলতে বলতে চিরুনি রেখে উঠে দাঁড়ালো অর্পনা। কয়েক পা এগোতেই ঝড়ের বেগে হেঁটে এসে ওর কোমর আঁকড়ে ধরল দ্বীপ। আলতো করে টান দিতেই অর্পনার মাথা ঠেকল দ্বীপের বুকে। লোকটার হৃদস্পন্দন অনিয়ন্ত্রিতভাবে কাঁপছে, আর তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে অর্পনার পুরো শরীরও থরথর করে কাঁপছে। অর্পনার অবস্থা দেখে সূক্ষ্ম হাসল দ্বীপ। ওর দিকে ঝুঁকতে গিয়ে দুজনের উচ্চতার পার্থক্যটা মেপে মনে মনে বিদ্রূপ করে আওড়াল — ওয়্যামেন!!
,,, দ্বীপের সেই নীরব বিদ্রূপের আভাস পেল না অর্পনা। সে অবিরাম ছটফট করতেই ব্যস্ত। মেয়ে সঙ্গে থাকলে লোকটা একটু ভদ্র-সভ্য থাকে ঠিকই, কিন্তু মেয়েটা পাশে না থাকলে উনার চেয়ে অভদ্র, অসভ্য আর বেপরোয়া মানুষ পুরো দুনিয়া খুঁজলেও পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ। কোন আক্কেলে যে সে প্রকৃতিকে মেধার কাছে রেখে এসেছিল! এখন ইচ্ছে করছে নিজের মাথাটা নিজেই দেওয়ালে ঠুকে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতে। কিন্তু তা তো আর সম্ভব নয়। বিষয়টা মাথায় আসতেই অর্পনা মিনমিন করে বলল — ছাড়ুন না… প্রকৃতিকে নিয়ে আসি। মেয়েটা রাতে উঠে কাঁদলে,,,
,,, দ্বীপ বিরক্তিতে ‘চ’ সূচক শব্দ করে অর্পনাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। মুহূর্তেই খোলা চুলগুলো ছড়িয়ে পড়ল অর্পনার চোখে-মুখে। হাফ কার্ল চুলগুলোর ফাঁকে ডাগর ডাগর হরিণী চোখজোড়া দ্বীপের বক্ষস্পন্দন আরও দ্বিগুণ করে দিল। দ্বীপ মোহিত নজরে তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে তর্জনী আঙুল তুলে চুলগুলো মুখ থেকে সরিয়ে কানের পিঠে গুঁজে দিল। পরপর আঙুল দ্বারা কানের লতি বেয়ে গালে আলতো করে স্লাইড করতে করতে ফিসফিস করে আওড়াল — ওহুম!! মাঝেমধ্যে আলাদা রুমে থাকা ভালো, এতে পাপ্পার একটু সুবিধা…
,,,, বলতে বলতে অর্পনার মুখটা উপরে তুলে ঝুঁকে আসতেই চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিল অর্পনা। ডান হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরল মানবের পরনের স্যান্ডো গেঞ্জির অংশ, বাম হাত দ্বারা আঁকড়ে ধরল নিজের পরনে থাকা জামাটা। শরীর এখনো থরথর করে কাঁপছে। প্রথম দিকে দ্বীপ কাছে আসলে খুব একটা প্যানিক করেনি অর্পনা, তবে প্রকৃতির জন্মের দুই বছরের মাথায় লাস্ট অসুস্থ হওয়ার পর থেকে এই অবস্থা। এটা ভালো দিক নাকি খারাপ দিক জানে না দ্বীপ। শুধু জানে, অর্পনাকে এভাবে কাঁপতে দেখলে খুব একটা খারাপ লাগে না তার, বরং তার মনে আলাদা একটা অনুভূতি কাজ করে। ভাবনা রেখে অর্পনার অবস্থা দেখে হুট করেই হেসে ফেলল দ্বীপ। পরপরই বাধন আলগা করে দিয়ে ফিসফিস করে আওড়াল—
— চেঞ্জ করে আসো, আমি নিচ থেকে আসছি।
,,,, বলেই অর্পনাকে ছেড়ে নিচের দিকে হাঁটা দিল দ্বীপ। মুহূর্তেই অবাক বনে গেল অর্পনা। এই লোক কখন কী করে, তা শুধু এই লোকই জানে। অর্পনা ঠোঁট কুঁচকে মনে মনে দ্বীপের বদনাম করতে করতে ল্যাপটপ, ফাইলগুলো জায়গামতো তুলে রাখল। পরপর ওয়াশরুমে ঢুকে কাবার্ড রুম থেকে ড্রেস চেঞ্জ করে টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে বের হলো। বের হতে না হতেই বাটিতে করে কুসুম গরম তেল নিয়ে ঘরে ঢুকতে দেরি করল না দ্বীপ। মুহূর্তেই অর্পনার বুকটা ধক করে উঠল। কোন দিক দিয়ে গিয়ে কোন দিক থেকে পালাবে, বুঝে পাচ্ছে না মেয়েটা। দ্বীপ তেলের বাটিটা সোফার হাতলে রেখে ড্রেসিং টেবিলের কাছে এগিয়ে গিয়ে চিরুনিটা নিয়ে অর্পনার দিকে তাকাল। মুহূর্তেই খেই হারিয়ে রুম থেকে ছুটে পালাতে চাইল অর্পনা। অর্পনা যেই তোড়ে পা চালিয়েছে, তার থেকেও অধিক তোড়ে এগিয়ে গিয়ে অর্পনার হাত টেনে ধরল দ্বীপ।আতকে উঠল অর্পনা। হাত ছাড়ানোর প্রয়াস চালাতে চালাতে শঙ্কিত ভরাট কণ্ঠে আওড়াল — কী করছেন? আমি এখন তেল-টেল দেব না। আগামীকাল আমার কনসার্ট আছে। হাত ছাড়ুন… ছাড়ুন না। আল্লাহ গো, বাঁচান।
,,, কে শোনে কার কথা? দ্বীপ কোনোদিন কারও কথা শুনেছে নাকি? হিসাবমাফিক আজ অর্পনার চুলে তেল দেওয়ার দিন। প্রতি সপ্তাহেই রবিবার সাথি বেগম দুই ছেলের বউকে টেনে-হিঁচড়ে জোর-জবরদস্তি করে মাথায় নিজ হাতে তৈরি করা অর্গানিক তেল দিয়ে দেন। আজও দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তিনি বাড়িতে উপস্থিত থাকতে পারবেন না বিধায় যাওয়ার আগে দায়িত্বটা দুই ছেলেকে দিয়ে গিয়েছেন। বিষয়টা তো অর্পনা জানত না। সে ভেবেছিল, আজকের মতো এই তেলের অত্যাচার থেকে বেঁচে যাবে সে। অথচ লোকটাকে দেখো! চাচির চামচা একটা। চাচি যা বলবে, তাই শুনতে হবে কেন? এখনই সে শ্বশুরের ঘরে যাবে। তারপর শ্বশুরের কাছে শ্বশুরের ছেলের নামে নালিশ জানিয়ে আসবে। কত বড় সাহস হলে তাকে রাতবিরেতে এমন বিরক্ত করে! মনে মনে বকাঝকা করতে করতে হাত ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করে যাচ্ছে অর্পনা, তবে দ্বীপের দানবীয় শক্তির সঙ্গে পেরে উঠছে না। এমনভাবে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, যেন অর্পনা তার শত্রুপক্ষ। মেয়েটা নিজেকে ছাড়াতে না পেরে কেমন কাঁদো কাঁদো স্বরে আওড়ালো — ও দ্বীপ, শুনেন না! আপনি না আমার আপন জামাই? ছয়বার কবুল করে বিয়ে করেছি আপনাকে। এমন শত্রুর মতো বিহেভ করছেন কেন? প্লিজ, আজকের মতো মাফ করে দেন। আমি পরের সপ্তাহে দেব, প্রমিজ।
,,, দ্বীপ পাত্তাই দিল না। টেনে নিয়ে ধপ করে মেঝেতে বসিয়ে দিল। পরপর নিজে সোফায় বসে দুপা দিয়ে চেপে ধরল অর্পনার সর্বকায়া। বন্দি পাখির ন্যায় ছটফট করে উঠল মেয়েটা। হাজারটা বাক্য আওড়িয়ে দ্বীপের থেকে ছাড়া পেতে চেয়েও ছাড়া পেল না। সর্বশেষ না পেরে কামড় বসিয়ে দিল মানবের হাঁটুর ওপর। তবুও মানবের ভাবাবেগ হলো না। সে গরম তেলটা হাতের তালুতে নিয়ে দুটো হাত মিলিয়ে ঘষে ধীরে ধীরে অর্পনার চুলের ভাঁজে ছুঁইয়ে দিতে লাগল।
প্রথম দিকে লাফালাফি করার চেষ্টায় থাকলেও, যখন অর্ধেকটা চুলে তেল দেওয়া সম্পন্ন হলো, তখন মাথায় আরাম বোধ হতেই কেমন মুখ চুন করে বসে রইল অর্পনা। এই লোকের সঙ্গে আর একটা কথাও বলবে না সে। এতদিন জানত মির্জা বাড়িতে তার একটাই শত্রু, এখন মনে হচ্ছে এই শ্বশুরের ছেলেটাও ভাইয়ের সঙ্গে মিলেমিশে তার সঙ্গে শত্রুতা করে বেড়াচ্ছে। এত এত শত্রুর ভিড়ে কিভাবে যে সে টিকে থাকবে,ভাবতেই বোরিং লাগছে। তেল দেওয়া যখন শেষের দিকে পৌঁছাল, তখনই অল্পবিস্তর নরম হয়ে এলো অর্পনা। আড়চোখে তাকাল লোকটার হাঁটুর দিকে। জোরপূর্বক দ্বীপের হাঁটুর ভাঁজ থেকে নিজের একটা হাত ছাড়িয়ে দ্বীপের পরনের থ্রি-কোয়ার্টারটা টেনে উপরে তোলার চেষ্টা করল। মুহূর্তেই থমকে গেল দ্বীপের হাতজোড়া। অবাক লোচনে তাকিয়ে রইল মেয়েটির পানে। অর্পনা ধীরে ধীরে থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্টটা সরিয়ে কামড় দেওয়া জায়গাটা উন্মুক্ত করল। ইসস!! দুপাশ থেকে দাঁতের দাগ বসে গিয়েছে। অর্পনা ধীরে ধীরে ঝুঁকে গেল হাঁটুর কাছটায়। ঠিক যেখানে কামড়ের দাগ স্পষ্ট হয়ে রয়েছে, ঠিক সেখানে মুখ নামিয়ে দাগ বরাবর দাঁত বসিয়ে আরও সজোরে কামড় বসাল। এই পর্যায়ে ব্যথায় চোখ খিঁচে নিল দ্বীপ। ঠোঁট ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো— ওফফ!! বেয়াদবের বাচ্চা!! সর।
,,,, পাত্তা দিল না অর্পনা। মনের খায়েশ মিটিয়ে তারপর ক্ষান্ত হলো। তখন শক্ত থ্রি-কোয়ার্টারের জন্য ভালো মতো কামড়টা লাগেনি, এখন ভালো মতো দিতে পেরে শান্তি লাগছে। দ্বীপ কিছু বললো না, শুধু দাঁত কটমট করে কামড় দেওয়া জায়গাটা আর অর্পনার কাঁধটা দেখে নিল। এর হাজার গুণ প্রতিশোধ নেওয়া হবে রাতে। আপাতত এই বেয়াদবের সঙ্গে লাগতে যাবে না সে। হাঁটুর সমান মেয়ে, বিয়ের পাঁচ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও এখনো হাজব্যান্ডের সঙ্গে কীভাবে বিহেভ করতে হয় শিখেনি। মাথায় তেল দেওয়া শেষ হতেই দ্বীপ লম্বা ঘন চুলগুলো তিন ভাগে ভাগ করে শক্ত একটা বেণি করে অর্পনাকে ছেড়ে দিল। ছাড়া পেতেই হুড়মুড় করে বিছানায় উঠে বসল অর্পনা। ঠিক বিছানার মাঝখানটায় বসে গাল ফুলিয়ে দ্বীপের দিকে তাকিয়ে রইল। মেথির গন্ধে নাকটা কেমন পিটপিট করছে। সে একদমই মেথির ঘ্রাণ সহ্য করতে পারে না। মন চাচ্ছে এখনই মাথাটা ওয়াশ করে আসতে। অর্পনা দ্বীপের দিকে তাকিয়ে থাকলেও দ্বীপ অর্পনার দিকে ফিরেও তাকাল না। নিজের মতো ওয়াশরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে ফিরে এসে রুমের লাইট অফ করে ড্রিম লাইট জ্বালিয়ে অর্পনার পাশাপাশি এসে বসল। মুহূর্তেই হাঁটু উঁচিয়ে সেটা দুহাতে জড়িয়ে ধরে হাঁটুতে থুতনি ঠেকাল অর্পনা। বড্ড মন খারাপ তার। একে তো মাথায় এত তেল, তার ওপর লোকটাকে দুই দুবার কামড় দিল যে, এখন মায়া লাগছে। অর্পনার মনমরা হাবভাব দেখে ভ্রু কুঁচকাল দ্বীপ। অর্পনার ওপর সে বেশ রেগে আছে, তাই শক্ত কণ্ঠে শুধালো — কী হলো? সং-এর মতো বসে আছো কেন? শুয়ে পড়ো।
,,, অর্পনা হাঁটুতে মাথা ঠেকিয়ে মলিন কণ্ঠে আওড়ালো— আমি শুবো না, আপনি ঘুমান।
— তুমি না ঘুমালে আমি ঘুমাবো কী করে?
— আমার ঘুমের সঙ্গে আপনার ঘুমের এত কানেকশন কী? নিজের ঘুম নিজে ঘুমান না। ওপাশে জায়গার অভাব পড়েছে?
,,, অর্পনার কথায় রাগান্বিত হলো মানব। রাগের তোপে মাথাটা ধপধপ করছে। তবুও রাগ দেখাবে না বলে শান্ত স্বরে শুধালো — আমাদের বিয়ের কয় বছর হয়েছে?
,,, অর্পনা চোখ উঁচিয়ে দ্বীপের দিকে তাকালো। কেমন দ্বিধাভরাট কণ্ঠে শুধালো — প্রায় ছয় বছর! কেন?
— এতগুলো বছর আমি কোথায় ঘুমিয়েছি?
,,, দ্বীপের প্রশ্নে তেতে উঠলো অর্পনা। এমনিই জোর করে মাথায় তেল দিয়ে দিয়েছে, এখন আবার কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেওয়া হচ্ছে। কামড় দেওয়ার জন্য এতক্ষণ যে আফসোসটা হচ্ছিল, তা যেন এক লহমায় মিলিয়ে গেল। সে রাগে নাক ফুলিয়ে হিসহিস করে আওড়াল — বিয়ের পর থেকে জ্বালিয়ে যাচ্ছেন। নিজের হাতির মতো ওজনটা আমার মতো মশার ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। কতবার দম আটকে মরে যেতে নিয়েছিলাম, জানেন? মানুষেরা দেখি বউকে আদর করে বুকের ওপর নিয়ে ঘুম পাড়ায়। কেউ কেউ তো কোলে নিয়েও ঘুম পাড়ায়। শুধু আমার কপালেই এসব উদ্ভট মানুষ জুটেছে। ঘুমাবো না আমি আজকে। আপনি একা একা ঘুমান।
,,,, দ্বীপ যেন চরম বিরক্ত হলো। এটা আবার কেমন কথা হলো? অন্য কেউ বউকে বুকের ওপর নিয়ে ঘুম পাড়ায় বলে তাকেও একই কাজ করতে হবে? অর্পনা কি জানে না? দ্বীপ অর্পনার বুকে মুখ না গুঁজলে ঘুমাতে পারে না। অভ্যাসটা তো দ্বীপ নিজে তৈরি করেনি, বরং অর্পনাই সময় নিয়ে অভ্যাস করিয়েছে তাকে। এখন এত আপত্তি কিসের? দ্বীপ আরেকটু এগিয়ে গিয়ে অর্পনার মুখোমুখি বসে বিরক্তির স্বরে আওড়ালো — এটা তো স্বাভাবিক ব্যাপার। প্রতিদিনই হয়। এতে এত রাগ করার কী আছে? আজব!
,,, অর্পনার এত কথার ভিড়ে দ্বীপের এহেন নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলা কথাটা অর্পনার শরীরে যেন আগুন ধরিয়ে দিল — হ্যাঁ! আজবই তো। আপনার কাছে এসব আজবই ঠেকবে। জীবনে কোনোদিন বলতে পারবেন যে, আমার বউ আমার বুকে মুখ গুঁজে ঘুমিয়েছে? আমার বউকে আমি আদর করে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছি? পারবেন?
,,, এই পর্যায়ে আরও বিরক্ত হলো মানব। বিরক্তিতে কপালে তিনটা ভাঁজ পড়লো, নাকের পাটাটা ফুলে উঠলো নিমিষেই। অত্যন্ত তিক্ত স্বরে আওড়ালো
— তোকে একবার বলেছি যে আমি এসব বলতে চাই? আমার এসব বলার প্রয়োজন নেই। আয়, এদিকে আয়।
,,, বলেই আকস্মিক অর্পনার পা ধরে টান দিলো। মুহূর্তেই বিছানার ওপর ধপ করে পড়ে গেল অর্পনা। দ্বীপের ঠোঁটে বাঁকা হাসি, যেন বিশ্ব জয় করে নিয়েছে। বিছানা নরম হলেও হুট করে পড়ার দরুন ঘাড়ে ব্যথা পেয়েছে অর্পনা। ব্যথায় ককিয়ে ওঠার প্রয়োজন মনে না করে ফুঁসে উঠলো। দ্বীপের ঠোঁটে থাকা বিশ্বজয়ের হাসিটাকে স্থায়ী হতে দেবে না বলে অর্পনা যেই না উঠে বসতে চাইবে, অমনি অর্পনার বুকে মুখ গুঁজে শরীরের সম্পূর্ণ ভার ছেড়ে দিলো দ্বীপ। চিংড়ি মাছের ন্যায় ছটফট করে উঠলো অর্পনা। দুহাতে দ্বীপের কাঁধ ধরে দূরে সরানোর চেষ্টা করে দাঁতে দাঁত চেপে আওড়ালো
— সরুন বদমাশ লোক! হাতি একটা, দানব, বনমানুষ। আজকেই আপনার সঙ্গে আমার শেষ রাত। কালকেই বাপের বাড়ি চলে যাবো আমি।
,,, হুট করেই শক্ত বাধনটা আলগা করে দিলো দ্বীপ। অর্পনার বুক থেকে মুখ তুলে মুখটা রমনির মুখ বরাবর আনলো। মানবের মুখখানা মলিন, চোখজুড়ে অজস্র কাতরতা। দ্বীপের এরূপ চাহনিতে কেমন ভড়কে গেল অর্পনা। লোকটা কি কথাটা সিরিয়াসলি নিয়ে নিল? কিন্তু সে তো এমনি কথার কথা বলেছে। দ্বীপ অর্পনার চোখে চোখ রেখে কেমন মলিন কণ্ঠে শুধালো — চলেই তো যাবে। শেষ রাতে একটা শেষ ইচ্ছা রাখবে?
,,, দ্বীপের চাহনি, মলিন স্বর সব মিলিয়ে অর্পনা নিজেও সিরিয়াস হয়ে পড়লো। অকারণেই বুকের বাম পাশটা কেমন চিনচিন করে উঠলো। লোকটা কি তাকে সত্যি সত্যিই যেতে দেবে নাকি? অর্পনা কেমন দ্বিধাভরাট কণ্ঠে আওড়ালো — কী ইচ্ছা?
,,,, দ্বীপ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটু ঝুঁকে অর্পনার ঠোঁটে শব্দ করে চুমু খেয়ে বললো — চলো, আরেকটা বেবি নেই।
,,, মুহূর্তেই ফুঁসে উঠলো অর্পনা। শক্ত করে চেপে ধরলো মানবের সিল্কি চুল। একটা মানুষ কতটা বদ হলে এরকম সিরিয়াসভাবে উদ্ভট কথা বলতে পারে? চুলে ব্যাথা পেলেও দ্বীপ অর্পনার গলায় মুখ গুঁজে শব্দ করে হেসে ফেললো। মুহুর্তেই থমকে গেলো রমনি। লোকটার হাসির সঙ্গে নিঃসৃত হওয়া গরম নিশ্বাস অর্পনার গলদেশ ছুঁতেই আরও শক্ত করে চেপে ধরলো মানবের চুল। অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়লো রমনির শ্বাস-প্রশ্বাস। দ্বীপ অর্পনার গলদেশ ছেড়ে কানের কাছে পৌঁছালো। কানের লতিতে ভেজা চুম্বন করে ফিসফিসানো স্বরে বললো — একটু আদর দাও।
,,, দ্বীপের আবদার শুনে কী বলবে, ভেবে পেলো না রমনি। এত বড়ো লোক এসেছে আদর নিতে। সে কেমন বিরক্তিভরা কণ্ঠে আওড়ালো — আপনি কি বাচ্চা?
,,, দ্বীপ দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বললো — ওহুম, তোমার আদুরে বিড়াল।
,,, মুহূর্তেই মুখ ভেংচালো অর্পনা — বিড়াল না ছাই! সারাক্ষণ সিংহের মতো তর্জন-গর্জন করে, অত্যাচার করে। এখন বিড়াল সাজতে এসেছে। বদমাশ লোক।
,,, এত কথা মোটেও ভালো লাগছে না দ্বীপের। সে মুখ তুলে অর্পনার মুখের দিকে তাকিয়ে নিষ্পাপ কণ্ঠে আওড়ালো — ভেলোরা! আদর দাও, ভালো লাগছে না।
,,, কী জ্বালা হলো অর্পনার! কোথায় উনি ওকে আদর-টাদর করবেন, তা না উল্টো ঢং করে বেড়াচ্ছেন। কিছু বললো না মেয়েটা। এসব তো আর নতুন কিছু না, তাই না? কদিন পরপরই এসব বাচ্চামি, ঢংগুলো সহ্য করতে হয় তাকে। একদিকে মেয়ে, আরেকদিকে বাবা এদের জ্বালাতনে রোজ রোজ পিষ্ট হচ্ছে সে। মনে মনে বিরক্ত হলেও মুখ ফুটে কিছু বললো না রমনি। উল্টো দ্বীপের মুখটা দুহাতের আজলায় নিয়ে কপালে চুমু খেলো। পরপর গালের দুপাশে, নাকে, থুতনিতে, ঠোঁটে। চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে বার কয়েক চুমু খেতেই দ্বীপ আবারও অর্পনার বুকে মুখ গুঁজে দিলো। অর্পনা দ্বীপের চুলগুলো আলতো করে টেনে দিতে দিতে বিরবির করে দ্বীপের গুষ্টি তুলে বকাঝকা করতে লাগলো। এই বংশে বিয়ে করাটাই তার অপরাধ হয়েছে। সারাক্ষণ কীভাবে তাকে অত্যাচার করা যায়, সেই ভাবনায় বিভোর থাকে এরা। এক জীবনে তার আর শান্তি পাওয়া হলো না।
,,, আমানিশার অন্ধকার পেরিয়ে ধরনীর বুকে আলোর রেখা ফুটলো। সামুদ্রিক প্রবাহ, শঙ্খচিলের ডাক, ঢেউয়ের গর্জনে মুখরিত হচ্ছে চারপাশ। অন্ধকার পথ মাড়িয়ে সমুদ্রের নিকট এগিয়ে যাচ্ছে এক কিশোর। পরনে ক্যাটক্যাটা হলুদ পাঞ্জাবি। চুলগুলো উশকোখুশক, বাতাসের তোপে কপালের এদিক-ওদিক দোল খাচ্ছে। বাম হাতে ঘড়ি, ডান হাতে এক মুঠো নীল চুড়ি। তার গন্তব্য সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা কিশোরী পর্যন্ত। কিশোরীর পরনে নীল শাড়ি। বাতাসের তোপে শাড়ির আঁচলখানা উড়ছে। চুলগুলো বাধনহারা, যার দৈর্ঘ্য কোমরের নিচ পর্যন্ত। কিশোর একদৃষ্টিতে কিশোরীকে পরখ করতে করতে এগিয়ে গেল কিশোরীর পানে। কাছাকাছি পৌঁছাতেই মেয়েটি ধীরে ধীরে সমুদ্রের দিকে এগোতে লাগলো। কিশোরটিও এগিয়ে গেল মেয়েটির পিছু পিছু। একপর্যায়ে মেয়েটি সমুদ্রের পানিতে নেমে পড়লো। সমুদ্রে তখন বড়ো বড়ো ঢেউয়ের সমাগম। কিশোরের বুকটা কেমন ধক করে উঠলো। তখনই বড়ো একখানা ঢেউ এসে ভাসিয়ে নিয়ে গেল কিশোরীকে। মুহূর্তেই চিৎকার করে উঠলো কিশোর — চাঁদ!!
,,,, কিশোরের চিৎকার শুনে খিলখিল করে হেসে উঠলো মেয়েটা। সমুদ্রের ঢেউ ফুঁড়ে বেরিয়ে এসে কিশোরের দিকে না ঘুরে সমুদ্রের পানেই দৃষ্টি রেখেই আওড়ালো — পাগল!! ভয় পেয়েছিস? যাইনি কোথাও। আয়, আমার কাছে আয়।
,,, ডাক শুনে কিশোরটিও এগিয়ে গেল সেদিকে। কিশোরের ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি। সেই হাসি সমেতই ঘুম থেকে ধড়ফড়িয়ে উঠলো পল্লব। মুহূর্তেই নিজেকে আবিষ্কার করলো চার দেওয়ালের মাঝে। বিষণ্ন হাসলো ছেলেটা। কেন যেন মনে হচ্ছে, তার মুক্তির দিন ঘনিয়ে আসছে, ছেলেটা অকারণেই ঠোঁট নাড়িয়ে বেসুরো গলায় গাইলো—
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৮ (২)
ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে,
রইবো না আর বেশিদিন তোদের মাঝারে।
হায়রে, ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে,
রইবো না আর বেশিদিন তোদের মাঝারে।
