৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬৩
রুপান্জলি
,,, চারটা নাগাদ বাড়ি ফিরলো দ্বীপ। সারাদিনের খাটুনি, এদিক-ওদিক ছোটাছুটিতে হাপিয়ে উঠেছে সে। এই মুহূর্তে তার শান্তির বড্ড প্রয়োজন, যা শুধুমাত্র অর্পনার মাঝেই রয়েছে। দ্বীপ ক্লান্ত পায়ে রুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো। রুমজুড়ে ঘুটঘুটে অন্ধকার দেখে ভ্রু জোড়া গুটিয়ে নিলো। কয়েক কদম এগিয়ে রুমের লাইট জ্বালাতেই ড্রিম লাইটের লাল আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠলো ঘরখানা। দ্বীপ এদিক-ওদিক তাকিয়ে অর্পনাকে খুঁজেও যখন পেলো না, তখনই কর্ণকুহরে প্রবেশ করলো নিরবিচ্ছিন্ন গিটারের স্বর। যেন কেউ গিটার বাজাচ্ছে না, বরং গিটারের উপর নিজের রাগ মেটাচ্ছে। দ্বীপ মস্তিষ্ক সজাগ রেখে এগিয়ে গেলো গিটারের শব্দ ধরে। পায়ে পায়ে বারান্দার কাছে পৌঁছাতেই বুঝলো থাই লক করা। দ্বীপ ফিরে এসে ড্রয়ার খুলে ডুপ্লিকেট চাবিটি নিয়ে লক খুলে থাই সরালো। সাথে সাথে কানে এসে বাড়ি খেলো মেইলি কোমল স্বর—
,,, কিচ্ছু চাইনি আমি, আজীবন ভালোবাসা ছাড়া,
আমিও তাদেরই দলে, বারেবার মরে যায় যারা।
না না, কিচ্ছু চাইনি আমি আজীবন ভালোবাসা ছাড়া,
আমিও তাদেরই দলে, বারেবার মরে যায় যারা।
,,, ঘুটঘুটে অন্ধকারাচ্ছন্ন বারান্দায় একফালি চাঁদের আলো ছুটে এসে বাড়ি খাচ্ছে রমনির চোখে-মুখে, যার ফলস্বরূপ চাঁদের মতোই স্নিগ্ধ লাগছে তার বদনখানা। রমনি বড্ড অবহেলায় বসে আছে বারান্দার মেঝেতে। গিটারের ভার বহন করার শক্তি পায় না আজকাল। ডাক্তার পুরোপুরি নিষেধ করেছেন ভারী কিছু বহন করতে, যার ফলস্বরূপ গিটারটার স্থান হয়েছে মেঝেতে।অর্পনার এহেন অবস্থা দেখে অবাক হলো দ্বীপ। ঠোঁট ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো—
,,,, ভেলোরা!!
,,, পরিচিত কণ্ঠে নিজের পছন্দ করা নাম শুনে অর্পনার হাতটা থেমে গেলো। শক্ত তারে বহুক্ষণ হাত চালানোর ফলে কখন যে হাতের চারটে আঙুল কেটে রক্ত ঝরতে শুরু করেছে, টের পেলো না রমনি। দ্বীপ এখনো খেয়াল করেনি তা। তবুও বিচলিত পায়ে এগিয়ে এলো। চট করেই বসে পড়লো অর্পনার পাশে। অর্পনা আবছা আলোয় দ্বীপের অস্থির মুখাবয়ব টের পেয়ে ক্ষীণ হেসে আওড়ালো—
— আপনি? এত দ্রুত? আপনি তো বলেছিলেন ফিরতে ফিরতে সকাল হবে।
,,, দ্বীপ অস্থির ভঙ্গিতে অর্পনার কপাল ছুঁলো। গাল, গলায় হাত ছুঁইয়ে শুধালো—
— কী হয়েছে তোমার? এত রাতে জেগে আছো কেন? ঘুমাওনি? তোমাকে না ঘুমাতে বললাম?
,,, বলতে বলতে চোখ গেলো অর্পনার হাতের দিকে। ছুঁইয়ে ছুঁইয়ে রক্ত পড়ছে। দ্বীপ তাড়াহুড়ো করে আগলে নিলো ডান হাতখানা। অস্থির চিত্তে আরও একবার অর্পনার দিকে তাকালো। পরপর কোনো বাক্য ব্যয় না করেই মেয়েটাকে কোলে তুলে নিলো। অর্পনা কেমন অনুভূতিশূন্য হয়ে তাকিয়ে রইলো। যেন সে বিশ্বাস করতে পারছে না, দ্বীপ এত দ্রুত চলে এসেছে। দ্বীপের তো এখন আসার কথা ছিলো না, সে তো নিষেধ করেছিলো রাত করে ড্রাইভ করতে। লোকটা এতো পাগল কেনো? অর্পনা যদি জানতো দ্বীপ পাগলের মতো ছুটে চলে আসবে তাহলে কখনোই এসব করতো না। আল্লাহ জানে এখন এই লোক কতোটা রেগে যায়।
রুমে এসে অর্পনাকে বিছানায় বসিয়ে দিলো দ্বীপ। ড্রয়ার খুলে ফার্স্ট এইড বক্স এনে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। তুলো দিয়ে পরিষ্কার করতে লাগলো ক্ষতস্থান থেকে চুইয়ে পড়া র*ক্তগুলো। অর্পনা বিরক্ত ভঙ্গিতে একবার হাতের দিকে তাকালো, পরপর দ্বীপের দিকে। হাতটা যে কখন কাটলো, সে তো বুঝতেই পারেনি। ওদিকে ফোনে এখনো লাইভ চলছে। অর্পনা চিন্তিত স্বরে বললো—
— আমার ফোনে লাইভ চলছে। ফোনটা একটু নিয়ে আসবেন?
,,, দ্বীপ উত্তর করলো না। ধীরে ধীরে ব্যান্ডেজ করতে করতে নিচের সার্ভেন্ট লাইনে কল করলো। নির্দেশ দিলো উপরে খাবার নিয়ে আসার জন্য। এত রাতে সব সার্ভেন্ট বোধহয় ঘুমিয়ে কাদা। হুট করেই আদেশ পেতেই রুম ছেড়ে বেরিয়ে এলো দুজন মেইড। খাবার সাজাতে লাগলো মালিকের নির্দেশ অনুসারে।দ্বীপকে খাবার আনার নির্দেশ দিতে দেখে অর্পনা বললো—
— এত রাতে খাবার দিয়ে কী হবে? আমি তো রাতে খেয়ে…
,,, দ্বীপ মাঝপথে থামিয়ে দিলো— আমি গতদিন থেকে এখনো পর্যন্ত কিছু খাইনি।
,,, অর্পনা অবাক হলো— ওমা কেন? আজ না আয়োজন ছিল? মাহফিলেও তো খাওয়া-দাওয়া হলো। খাননি কেন?
,,, দ্বীপ অর্পনার হাতে সাদা রঙের ব্যান্ডেজ প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে সরল স্বীকারোক্তি দিলো— তোমাকে কষ্ট দেবো আর নিজে কষ্ট পাবো না, এটা যে বড্ড অন্যায় হয়ে যায়, ভেলোরা। তাই কষ্ট কিছুটা ভাগাভাগি করে নেওয়ার প্রচেষ্টা চালালাম। যদিও তোমার কষ্টের কাছে এসব কিছুই না।
,,, অর্পনা বুঝলো দ্বীপ কিসের কথা বলেছে। তবুও না বোঝার ভান করে বললো— কিসের কষ্ট? কোন কষ্টের কথা বলছেন?
,,, অর্পনার এই নির্লিপ্ত ভাবগতিগুলো বড্ড বিরক্ত করে দ্বীপকে। বর্তমানে মেয়েটার চোখ-মুখ দেখে যে কেউ বুঝতে পারবে তার ভেতরে কতটা তাণ্ডব চলছে, তবুও নিজেকে কতটা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে দেখো। দ্বীপ কিছু একটা আশঙ্কা করে অর্পনার সম্পূর্ণ শরীর স্ক্যান করলো। পেটের কাছের জামায় নজর আটকে যেতেই হুট করেই রেগে গেলো দ্বীপ। চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত চাপলো। ব্যান্ডেজ করা হাতটা চেপে ধরলো হাতের মুঠোয়। সাথে সাথে ব্যথায় ককিয়ে উঠলো মেয়েটা। দ্বীপ দাঁতে দাঁত পিষে জামায় শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগটুকুর দিকে আঙুল তাক করে বললো—
— বে*য়াদবের বাচ্চা! এগুলো কী? কী করেছিস? আর কোথায় কোথায় করেছিস, দেখা আমাকে। ওয়েট!
,,, বলেই অর্পনার জামায় হাত দিলো। সাথে সাথে বাধা প্রয়োগ করলো অর্পনা। দ্বীপের হাত থেকে জামা সরাতে চেয়ে বললো—
— আর কোথাও না। কী করছেন? ছাড়ুন, দ্বীপ! মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে নাকি?
,,, সত্যিই মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে দ্বীপের। উন্মাদের মতো টেনে তুললো অর্পনার পরনের পোশাক। যেমনটা ভেবেছিলো, তাই হয়েছে। পেটের একপাশে সরু, চিকন অথচ লম্বা ব্লেডের আঁচড়। হাতের বাহুতেও একটা দাগ রয়েছে। অর্পনার হাত ছেড়ে এবার গলায় হাত গলিয়ে দিলো দ্বীপ। পুরুষালি শক্ত হাত দ্বারা চেপে ধরলো ঘাড়টা। সাথে সাথে ব্যাথায় মুচড়ে উঠলো অর্পনা। দ্বীপ ঘাড় চেপে মুখটা একদম কাছে নিয়ে এলো। চোখে চোখ রেখে শুধালো—
— এই! তোকে আর কীভাবে বোঝালে তুই বুঝবি, আমি তোর চেহারার জন্য তোকে ভালোবাসি না? আমি শুধু তোকে ভালোবাসি। বর্তমানে আমার ভালোবাসার একান্ত ভাগিদার তুই। ওফ! কী করলে বুঝবি বল? তোর চেহারা অ্যা*সিড দিয়ে ঝলসে দিলে বিশ্বাস করবি? কিন্তু এটাও তো আমি করতে পারবো না। কারণ তোকে আমি ভালোবাসি। তোকে ভালোবাসি মানে বুঝিস তুই? আমি তোকে ভালোবাসি এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে আমি তোর কাছে সবচেয়ে অসহায়। এতোটাই অসহায়, যতটা অসহায় থাকে জলবিহীন মাছ। বিশ্বাস কর, অ্যা*সিড দিয়ে তোর মুখ ঝলসে দিলে যদি তোর একটু ও কষ্ট না হতো, তাহলে আমি তাই করতাম। ওয়েল! সার্জারি করবি? চল, সার্জারি করে তোর চেহারা পাল্টে দেই।
,,,, বলেই অর্পনার ঘাড় ছেড়ে হাত ধরে টান দিলো। অর্পনা জোর খাটিয়ে বাধা প্রয়োগ করে আওড়ালো—
— মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে আপনার? আমি এসব করবো কেন? আর কে বলেছে আমি এসব ভাবছি?
,,, বলেই টেনে হাত ছাড়িয়ে নিলো। দ্বীপের রাগের মাত্রা বাড়লো আরও কয়েক কদম। অর্পনার উন্মুক্ত বাহু এক হাতে চেপে ধরে হিসহিসালো—
— তাহলে কী করবি? এগুলো? তুই এমন কেন, ভেলোরা? প্রতিটি কথার ভিন্ন মানে বের করে নিস, কাউকে আপন ভাবিস না। তুই ভালোবাসা চাস, আবার ভালোবাসা গ্রহণ করতেও রাজি না। তোকে নিয়ে আমি কী করবো? কীভাবে ঠিক করবো তোকে? জীবনটা এত জটিল নয়। আরেকটু সহজভাবে ভাবতে শিখ। দেখবি, সব সহজ হয়ে যাবে।
,,,, অর্পনা এবার ত্যাজ দেখিয়ে দ্বীপের হাতটা বাহু থেকে সরিয়ে দিলো। মুহূর্তেই পাল্টে গেলো তার অভিব্যক্তি—
— কী সহজ হয়ে যাবে? আমার জীবন? আমার জীবন কোনোদিন সহজ হবে না। দেখুন না, আমার জীবনটা কোথা থেকে কোথায় চলে গেলো। ছোট থেকে যাদের বাবা-মা ভাবলাম, তারা আমার বাবা-মা না। আবার যারা আমার বাবা-মা, তারা আমার কাছে থাকলো না, মরে গেলো। আমি কি এসবই প্রাপ্য? মানুষ কি একটু সুখ আশা করতে পারে না? এখন আমি যদি বলি কেউ আমায় ভালোবাসে না, তাহলে হয়তো মস্ত বড়ো ভুল হবে। হ্যাঁ, অনেকেই আমায় ভালোবাসে, তীব্রভাবে ভালোবাসে। কিন্তু আমার মতো করে কেউ আমায় ভালোবাসে না। কেউ বুঝতে চায় না আমি কী চাই, আমার কী লাগবে। ছোট থেকেই সবাই কেমন বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করে নিলো আমায়। আমার পাপ্পা যখন আমায় কুড়িয়ে আনলো, দাদা-দাদি বেশ খুশি হয়েছিলো। কারণ তাদের নাতি-নাতনি নেই, তাদের ছেলের একটা সন্তান নেই। আমি তাদের নাতি-নাতনি আর তাদের ছেলের সন্তানের রিপ্লেসমেন্ট। আগে মাম্মাকে আমি বেশ অপরাধী ভাবতাম, অথচ এখন বুঝি মাম্মা ঠিকই করেছিলো।
ন্যায্য দাম দিয়েছে আমায়। মাম্মা আমাকে নিজের সন্তানের জায়গায় না বসিয়ে আরও একজনের জীবনে সন্তানের বিকল্প হওয়া থেকে রক্ষা করেছে। কিশোরী বয়সে আদ্রিয়ান কাইসারকে ভালোবেসেছিলাম। কত কত পাগলামি করেছি তার জন্য, সেসবের সাক্ষী একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। একদিন পাগলামি করতে করতে তাকে মনের কথা জানালাম। সে আমায় কী বললো জানেন? বললো, আমার মাঝে নাকি আকৃষ্ট হওয়ার মতো কিছু নেই। বুঝতে পারছেন কী না থাকার কথা বলেছে?আমি তখন এখনকার থেকেও চিকন ছিলাম, সাথে অবিবাহিত ছিলাম, বয়স মাত্র ১৭+। ওই সময়টাতে আমার বডি ফিটনেস কতটা হওয়ার কথা? যেমন আর পাঁচটা মেয়ের হয়, তেমনটাই তো? তবে আমার আরও কম ছিলো। বোঝাই যেতো না আমি ছেলে নাকি মেয়ে। এটা কি আমার দোষ? আল্লাহ আমাকে বানিয়েছেই এইভাবে। আদ্রিয়ান ঠিক ওই দিক থেকেই আঘাত করেছিলেন আমায়। যখন ম*লেস্টাররা আমার পিছু করেছিলো, তখন আমি উনাকে কল দিয়েছিলাম। উনি আমায় কী বলেছিলেন জানেন? এখাবে বলেছে “”তুমি মেয়ে নাকি? তোমার মাঝে মেয়েদের কিছু আছে? কিভাবে রে*প করবে তোমাকে? রে*প হতে হলে আগে মেয়ে হতে হয়। তুমি তো মেয়েই না।””
কী না থাকার কথা বলেছে, বুঝতে পেরেছেন তো আপনি? কথার গভীরতা কিন্তু অনেক। উনি কিন্তু রাগ-অভিমান করে কথাটা বলেননি, বরং মনে যা ছিলো তাই উগরে দিয়েছেন। সেদিন আমি এক লহমায় মরে গিয়েছিলাম। আদ্রিয়ানের এই কথাটুকু আমায় ভেতর থেকে জাস্ট শেষ করে দিয়েছিলো। আমার কী অপরাধ ছিলো? ভালোবেসেছিলাম, এটা অপরাধ?সেদিন অকারণে তিনি আমার নারীসত্তাকে রাস্তায় নামিয়ে এনেছিলেন। তারপর দেখুন, আদি কিন্তু আমাকে ঘৃণা করতো। মানে ব্যক্তি আমাকে, অর্পনাকে খুব ঘৃণা করতো। তার মতে অর্পনা একটা স্লা*ট ছিলো, যে তার সাথে রাতবিরেতে অসৎ কাজ করতে গিয়েছে। অথচ যেদিন জানতে পারলো অর্পনাই পৃথা জামান, তখন তার রূপ বদলে গেলো। আপনি ভাবতে পারছেন? পৃথাকে আদি কতটা ভালোবেসেছিলো, যে তার বিকল্প হিসেবে সবচেয়ে ঘৃণা করা স্লা*ট অর্পনাকে মানতেও আদির কোনো প্রবলেম ছিলো না। উনি কিন্তু আমাকে ভালোবাসেননি। বরং আমাকে পৃথার রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করেছেন। পৃথাকে ভালোবেসে অর্পনার পেছনে ছুটেছেন। আমি যদি পৃথা না হতাম, তাহলে উনি কোনোদিন আমার কাছে আসতেন না,, ক্ষমা চাওয়া তো দূর। শুরুর দিকে তো উনার কোনো অনুশোচনাই ছিলো না। যেন যা করেছে, বেশ করেছে। তিনি ফুল কনফিডেন্ট ছিলেন, উনি বললেই আমি নাচতে নাচতে সবকিছু ক্ষমা করে দিয়ে উনার বউ হয়ে যাবো। ফা*ক অফ! দিয়েছি লাইফটা হেল করে, এবার মর যাহ! কিছু আসে যায় না আমার।
তারপর বছর খানিক আগে, হুট করেই একদিন আমার কানের কাছে আজরাইল এসে বললো “তুই আরও একবার মরে যা, তোর আয়ু ফুরিয়েছে” ছন্নছাড়া মেয়েছেলের মতো একটা ডায়েরি পড়ে আপনাকে খুঁজতে গিয়েছিলাম। মাথায় কী কাওড়ামি চাপছিলো আল্লাহ জানে। একটা পাগলকে দেখে মনে আমার প্রেমের জোয়ার বয়ে গেলো। নিজের কপালটা নিজে খেলাম। কত বড়ো আহাম্মক আমি! ওখানে গিয়ে দেখি, আমি আবারও কারোর রিপ্লেসমেন্ট। দেওয়ালে আঁকা পারুর ছবিতে যখন নিজের মুখ দেখলাম, তখন এক মুহূর্তের জন্য নিজেকে পারুর জায়গায় ভেবে নিয়েছিলাম। আপনি তো তখন অবুঝ ছিলেন। কিছু বুঝতেন না, কিছু চিনতেন না। আপনি তো আমাকে চান ও নি। আমার চেহারা যদি পারুর মতো না হতো, তাহলে কোনোদিন নিজের কাছে ঘেঁষতেও দিতেন না। সবার মতো মেরে ধরে তাড়িয়ে দিতেন। সেদিক থেকে আপনি সম্পূর্ণ নির্দোষ। সব দোষ আমার আর আমার কপালের। মরার কপালে আল্লাহ কষ্ট দেওয়ার চক্করে সুখ দিতেই ভুলে গিয়েছে। নয়তো আমার মতো ছন্নছাড়া আবার দ্বিতীয়বার কাউকে ভালোবাসবে কেন? তাও আবার এমন কাউকে, যে আগে একজনকে ভালোবেসে বর্তমানে পাগল। আমি তো গাধা ছিলাম না। এটা তো যে কেউ বুঝবে, বি প্র্যাকটিক্যাল, ব্রো!”” একটা ছেলে একটা মেয়েকে হারিয়ে এমনি এমনি পাগল হয়ে যায় না। যেখানে ছেলেদের কাজ মেয়েদের ইউজ করে করে ছুড়ে ফেলে দেওয়া, বছরের পর বছর অপেক্ষা করিয়ে বাবা-মায়ের দোহাই দিয়ে পালিয়ে যাওয়া, সেখানে দুই মাসের প্রেম আর একটা নামমাত্র বিয়ের জন্য একটা ছেলে এমনি এমনি পাগল হয়ে যাবে না। এই ভালোবাসায় আঙুল তোলাও পাপ হয়ে যাবে।”
এটা বুঝতে পারার পরেও আমার মাথার কাওড়ামি কমলো না। সব বোঝার পরেও, সব জেনেও আমি বোকার মতো আপনাকে বিয়ে করে নিলাম। আমাকে ভালোবাসতে একপ্রকার বাধ্য করলাম। এখন আমি কোন মুখে অভিযোগ করবো? আমি নিজের ইচ্ছায়ই তো আপনার জীবনে পারু সেজে এসেছি। নিজেকে স্বেচ্ছায় তৈরি করেছি পারুর রিপ্লেসমেন্ট। এরপরেও আমার অভিযোগ খাটে? খাটে না। আমি আপনার উপর আঙুল তুলতে পারি না। আপনার তো কোনো দোষ নেই। আপনি আপনার জায়গায় ঠিক কিন্তু আমার মন তো মানতে চায় না। আমার মন বারবার আমাকে শুধায়” আমি কে? আমার দাম কী? আমি কী পেলাম? আমাকে কে চাইলো? আমি যার স্ত্রী, যার সাথে জোরপূর্বক সংসার সাজালাম, সে কি আসলেই আমাকে কখনো চেয়েছিলো? আমি কি তার পছন্দের কেউ? না তো। আমি তার জীবনে ভেসে আসা কচুরিপানা, যাকে সে চাইলেই ছুড়ে ফেলতে পারতো, কিন্তু ফেলেনি।
আমার আপনার উপর একটু ও অভিযোগ নেই, দ্বীপ। আমি শুধু নিজেকে অভিযোগ করি। কী করলাম জীবনে? এতো কিছু করে কী পেলাম?এত যে ভালোবাসার পিছু ছুটলাম, যেই ভালোবাসাটা দিনশেষে পাচ্ছি, সেটা কি আদৌ আমার? অন্যের ভাগের ভালোবাসা, কৌশলে, জোরপূর্বক নিজের করেছি। নিজেকে খুব নিচ মনে হয়। ভালোবাসা পাওয়ার লোভে এতটা নিচে আমি কী করে নামলাম? আপনারা-আপনারা তো বেশ ছিলেন। একজন গ্রাম্য সাদাসিধা মেয়েকে ভালোবেসে পাগল হয়ে গিয়েছে রাজনীতিবিদ দ্বীপ জোহান মির্জা। কত সুন্দর গল্প আপনাদের! আমি আপনাদের সেই সুন্দর গল্পটাতে তৃতীয় ব্যক্তি হয়ে কেন ঢুকলাম? কেন ভাগ বসালাম নিজের বড়ো বোনের ভালোবাসায়? আপনার তো এখন পারুর কাছে থাকার কথা ছিলো অথচ আজ একদিনের জন্য গিয়েছেন বলে খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন আপনি,, ভাবছেন আমি বোধহয় কষ্ট পাচ্ছি। আমার তো কষ্ট পাওয়ার অধিকার ই নেই,, পারু তো আমার কাছ থেকে আপনাকে কেড়ে নেয়নি বরং আমি নিয়েছি। এই এত এত আফসোস, অভিযোগ নিয়ে আমি কীভাবে শান্তিতে বাঁচবো? বলুন!! শান্তি পাই না আজকাল,, পাইনা বলেই নিজেকেই আঘাত করি। এতে আমার শান্তি লাগে, স্বস্তি পাই। যখন শরীর জ্বলে ওঠে, তখন অন্তরের জ্বলনটা কমে যায়। নিজেকে আর নিচ মনে হয় না।
,,, বলেই দ্বীপের দিক থেকে চোখ সরালো অর্পনা। তবে দ্বীপের চোখের তীব্রতা আরও বাড়লো। ফোঁসফোঁস করে উঠলো মুহূর্তেই। এই যে এতক্ষণ অর্পনা এত এত কাতর বাক্য ব্যয় করলো, তাতে দ্বীপের বিন্দুমাত্র ধ্যান নেই। তার ব্রেইন এখনো থমকে আছে অর্পনার বলা সেই কথাটায়””আদ্রিয়ান আমাকে ভালোবাসেনি।””
তার মানে অর্পনা ওই ব্লা*ডি ফু*লটাকে পায়নি বলে এখনো আফসোস করে? দ্বীপের রাগ বাড়লো। অর্পনাকে আঘাত করার জন্য হাত তুলতে গিয়েও হাত গুটিয়ে নিলো। এই মেয়েটাকে সে মারতে পারে না। মায়া লাগে যে। তবে তার রাগ কমলো না একটুও। আদ্রিয়ানকে জায়গায় পুঁতে দিতে মন চাচ্ছে। ওই কু*ত্তার বাচ্চাকে কু*ত্তা লাগিয়ে খুঁজছে দ্বীপ।বাংলাদেশ, আমেরিকা, কানাডা, রাশিয়া, ইতালি, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, ভারত, পাকিস্তান যেখানে যেখানে যাওয়ার ফ্রি ভিসা রয়েছে, সব জায়গায় খোঁজ চলছে। প্রতিটি দেশে আদ্রিয়ান কাইসারের নামে তেরো-আঠারোটি মামলা চলছে। দিনকে দিন মামলার পরিমাণ বাড়ছে। টাকা ঢালছে। পুলিশ টিম তন্নতন্ন করে খুঁজে চলেছে। ট্র্যাকিং কুকুর থেকে শুরু করে রাশিয়ান আর ইতালিয়ান মাফিয়াদের পেছনেও টাকা ঢালছে দ্বীপ, কিন্তু আদ্রিয়ানের টিকিটির দেখা নেই।কতদিন লুকিয়ে থাকবে? একবার হাতের কাছে পেলে সবার আগে কু*ত্তার বাচ্চার জবানটা টেনে বের করবে দ্বীপ। কত বড়ো স্পর্ধা হলে তার বউকে স্লা*ট বলে!
আর “জানিম”!! এই জানিম শব্দটা মাথায় এলেই দ্বীপের মাথায় হাই ভোল্টেজে ফায়ার চলে। ইচ্ছা করে পৃথিবীটা ধ্বংস করে দিতে সাথে অর্পনা জামান নামক রমনিকেও। অর্পনার কথায় এমনিতেই রেগে ছিলো দ্বীপ, ওকে আরও রাগিয়ে দিতে ফুঁপিয়ে উঠলো অর্পনা। এই পর্যায়ে দ্বীপের রাগ আকাশ ছুঁলো। অর্পনাকে আঘাত করতে না পেরে হাতের কাছের ফার্স্ট এইড বক্সটা ছুড়ে মারলো নিচে। আকস্মিক কাণ্ডে কেঁপে উঠলো অর্পনা। চেচিয়ে উঠলো দ্বীপ —
— কী হয়েছে? কাঁদছিস কেন? আদ্রিয়ানের ভালোবাসা পাসনি বলে আফসোসে মরে যাচ্ছিস? কিছু হলেই শুধু আদি, আদি, আদি! আদি কী ভাই? সব কথায় আদি কেন আসবে? ওকে কেন ভালোবেসেছিলি তুই? ওর মাঝে কী পেয়েছিলি? সৌন্দর্য? সুন্দরের প্রেমে পড়েছিলি? ও কেন তোকে স্লা*ট বলবে? ঐ সুযোগটা পাবে কেনো? এখনো জানিম বলে ডাকে। কু*ত্তার বাচ্চা! জানিম অর্থ বুঝিস? তুই কি ওর প্রাণ? তুই আমার প্রাণ, আমার ভালোবাসা, আমার বউ, আমার সব তুই। ও কেন তকে প্রান ডাকবে? আমার বউকে আমার সামনে কেউ প্রাণ বলে ডাকছে, আর আমার বউ তাকে বাঁচানোর জন্য মরিয়া হয়ে যাচ্ছে। এসব কেন সহ্য করবো আমি? তোকে মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করে মাটির নিচে পুঁতে দেই।
,,, বলেই আবারও আঘাত করতে নিয়ে ফিরে এলো। লাথি বসালো হার্ডবোর্ডের বেডে। অর্পনা এই পর্যায়ে টললো না। সমান তালে চিৎকার করলো—
— দিন, পুঁতেই দিন! আমি ক্লান্ত। সেই সাত বছর বয়স থেকে ফ্যামিলি, সমাজ, ক্লাসমেট, ভাগ্য, নিয়তির সাথে লড়াই করতে করতে এখন ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। কী হলো, মারুন! মেরে শেষ করে দেন। আমার এই টানাপোড়েনের জীবন আর ভালো লাগছে না। পারু আমার বোন জানার পর থেকে প্রতিনিয়ত আফসোসে আফসোসে মরে যাচ্ছি। জীবনে ভালোবাসা পেতে কী কী করলাম, কতটা ছলনা করলাম! উফ, মরি না কেন আমি?
,,, “মরি না কেন?” এই কথাটায় যেন দ্বীপের মাথা কাজ করাই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। সে কিছুক্ষণ থম মেরে অর্পনার দিকে তাকিয়ে রইলো। অর্পনাও তাকালো দ্বীপের দিকে। ঝড়ের পূর্বে প্রকৃতি যেমন শান্ত থাকে, দ্বীপকে তেমন শান্ত মনে হচ্ছে। থম মেরে তাকিয়ে থাকলেও গলার একপাশের শিরা তীব্র হাড়ে কাঁপছে, কপালের নীল রগ লাফাচ্ছে। ধীরে ধীরে শ্বাসের গতি তীব্র হলো। অর্পনার ভাবনাই সত্যি হয়েছে।অর্পনার সাথে রাগ মেটাতে না পেরে পুরো ঘরে ভাঙচুর করেছে দ্বীপ। পরপর হনহন করে রুম থেকে বেরিয়ে বারান্দায় চলে গেলো। দ্বীপের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে উঠলো অর্পনা। ভালো লাগছে না কিছু।
যখন থেকে জানতে পেরেছে পারু ওর বড়ো বোন, তখন থেকেই সবকিছু কেমন এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। আর কেউ জানুক আর না জানুক, আল্লাহ আর সে নিজে তো খুব ভালো করেই জানে, দ্বীপকে কী পরিমাণ মানসিক যন্ত্রণা আর টানাপোড়েনের মাঝে রেখে তাকে ভালোবাসতে বাধ্য করেছে অর্পনা। এতকিছু না করলে দ্বীপ কোনোদিনই অর্পনাকে ভালোবাসতো না। এটাই ফ্যাক্ট! আক্ষরিক অর্থে অর্পনা নিজের বোনের গল্পের তৃতীয় ব্যক্তি। এর থেকেও বড়ো যন্ত্রণার কী হতে পারে? অর্পনা হাঁটু উপরে তুলে তাতে মুখ গুঁজে দিলো। তখনই রুমে নক করলো কেউ। শুধু একবারই করেছে। এর থেকে বেশি নক করার অনুমতি নেই তাদের।
অর্পনা বুঝলো, মেইডদের মধ্যে কেউ খাবার নিয়ে এসেছে। প্রথম দিকে ভাবলো দরজা খুলবে না। পরক্ষণেই মাথায় এলো, দ্বীপ গত রাতে তার সাথে খাওয়ার পর আর কিছু খায়নি। সে দুহাতে চোখ মুছে ড্রেস ঠিকঠাক করে দরজা খুলে দিতেই মেইড ভেতরে আসার অনুমতি চাইলো। তবে অর্পনা অনুমতি দিলো না। বর্তমানে ঘরের ভেতরের অবস্থা যা-তা হয়ে আছে। এমনিতেও নিজের ঘরের ঝামেলা বাইরের মানুষের কাছে প্রকাশ করা অর্পনার পছন্দ না। সে ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটিয়ে খাবারগুলো নিয়ে দরজা আটকে দিলো। স্টাডি টেবিলের উপর খাবারগুলো রেখে আবারও ফিরে গেলো নিজের জায়গায়। কোনোরূপ বাক্য ব্যয় না করে দুদিকে দুটো কুশন রেখে চুপচাপ একপাশে শুয়ে পড়লো। চোখ বুজে নিতেই বারান্দার থাই লাগানোর শব্দ হলো। যেই তরে গিয়েছিলো দ্বীপ, সেই তরেই বেরিয়ে এলো। রুমে এসে ড্রয়ার খুলে চাবি নিলো। নিশ্চয়ই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবে? গিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে থাকবে? আফসোসে অর্পনার বুক ভেঙে এলো। আজ কেন নিজেকে আঘাত করে দ্বীপকে রাগিয়ে দিলো সে? দ্বীপ সত্যি সত্যিই বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। বিষয়টা বুঝতেই চোখ মেলে তাকিয়ে উঠে বসার প্রয়াস চালালো অর্পনা। মেয়েটা উঠে বসতেও পারেনি, একজোড়া পুরো ঠোঁট তেড়ে এসে আঁকড়ে ধরলো তার নরম ওষ্ঠজোড়া। মুহূর্তেই জায়গা হলো বিছানায়। অর্পনা গুঙিয়ে উঠলো। দ্বীপের থেকে ছাড়া পাওয়ার চেষ্টা করেও সফল হলো না মেয়েটা। বুকে হাত দিয়ে ঠেলে-ঠুলেও সরাতে পারলো না কঠোর মানবটাকে। দ্বীপ উন্মাদ, বেপরোয়া। নিজের রাগ, ক্ষোভ, তৃষ্ণা মিটিয়ে তারপর মুক্ত করলো অর্পনাকে। সেকেন্ড খানেক সময়ও পেরোতে পারেনি, দ্বীপ মুখ গুঁজে দিলো অর্পনার বুকে। ওর দুটো হাত টেনে মাথার উপর রাখলো— জড়িয়ে ধর। আমার প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে। এতোটাই রাগ হচ্ছে যে তকে জাস্ট,, ওফফ!! শক্ত করে ধর না। (ধমকের স্বরে)
,,, অর্পনা ধরলো না, বরং হাতটা সেভাবেই ফেলে রাখলো। দ্বীপ আর আদেশ করলো না। মুখ ডুবিয়ে দিলো অর্পনার গলদেশে। গভীর স্পর্শে রাঙিয়ে দিতে থাকলো জায়গাটা। ধীরে ধীরে তার স্পর্শ আরও গভীর হলো। এই পর্যায়ে না চাইতেও জড়িয়ে ধরতে বাধ্য হলো অর্পনা। দ্বীপ মির্জা বেশ চতুর। কখন কোনটা কীভাবে আদায় করতে হয়, সেই কৌশল খুব ভালোই আয়ত্তে আছে তার। অর্পনা দ্বীপের স্পর্শের কবল থেকে বাঁচতে না পেরে ফুঁপিয়ে উঠলো। ওকে কাঁদতে দেখে মুখ তুলে তাকালো দ্বীপ। দুহাত দিয়ে অর্পনার চোখ মুছে দিয়ে পুরো মুখে চুম্বন করলো। পরপর সরে এলো উপর থেকে। টেনে অর্পনার মাথাটা রাখলো নিজের বাহুর উপর। হাত-পা টেনে নিজের উপরে তুলে দিলো। এই পর্যায়ে মুখোমুখি হলো দুজন। অর্পনা চোখ বুজে কাঁদছে। দ্বীপ অর্পনার গাল আঁকড়ে নাকে নাক ঠেকালো। ঠোঁট ঠেকলো ঠোঁটে। চোখের অবস্থান সরাসরি। দ্বীপ ফিসফিস করে ডাকলো—
— তাকাও। তাকাও আমার দিকে।(অর্পনা তাকালো না।) কে বলে পারুর মতো চেহারা না হলে আমি তোমাকে কখনো ভালোবাসতাম না? হ্যাঁ, হয়তো বাসতাম না। কখন বাসতাম না জানো? যদি পারু বেঁচে থাকতো কিংবা তার ফিরে আসার ০.০১%ও আশা থাকতো, তাহলে কোনোদিনই আমি তোমাকে ভালোবাসতাম না। আবার একইভাবে আমার জীবনে যদি পারু না আসতো, ওর কোনো অস্তিত্বই না থাকতো, তাহলে হয়তো আমি তোমার প্রেমেই পড়তাম। তোমাকেই ভালোবাসতাম। তখন হয়তো আমাদের গল্পটা একরকম হতো, এখন অন্যরকম হয়েছে। গল্প অন্যরকম মানেই ভালোবাসার মূল্য কম, এমন তো নয়, বোকা। তুমি হয়তো আমার প্রথম ভালোবাসা নও, তবে তুমি আমার শেষ এবং শেষ ভালোবাসা। তোমার পর দ্বীপ মির্জা কারোর দিকে চোখ তুলেও তাকাবে না। আর যদি তাকায় ও, তাহলে আমি নিজ হাতে সেদিন দ্বীপ মির্জার চোখ তুলে নেবো। প্রমিজ। বিশ্বাস করো আমায়।
,,, এই পর্যায়ে চোখ মেলে তাকালো অর্পনা। দ্বীপের বলা প্রতিটি কথার তপ্ত নিশ্বাস আছড়ে পড়েছে অর্পনার চোখে-মুখে। কথার ফাঁকে ফাঁকে একজোড়া পুরো ঠোঁট ছুঁয়ে গিয়েছে তার নরম ওষ্ঠ। অর্পনা না চাইতেও কেঁপে উঠলো বারংবার। তবে চোখে তার অন্য ভাষা। সে বোধহয় বিশ্বাস করতে পারছে না, দ্বীপ ওকে সত্যিই এতোটা ভালোবাসে। দ্বীপ বুঝলো মেয়েটার চোখের ভাষা। ফের বোঝানোর মতো করে বললো— হয়তো তোমাকে আমি প্রথম দেখায় ভালোবাসিনি, তবে তোমার প্রতি আমার ভালোবাসাটা একটু একটু করে জন্ম নিয়েছে। তুমি কি জানো? যা ধীরে ধীরে জন্মায়, তা কতটা মজবুত হয়? একটা বিল্ডিংয়ের ক্ষেত্রেই দেখো। ভিত্তি তৈরি করার সময় তুমি যতটা টাকা, শ্রম আর সময় দেবে, বিল্ডিং ততোটাই মজবুত আর দীর্ঘস্থায়ী হবে। তোমার প্রতি আমার ভালোবাসাটাও তেমন। এই ভালোবাসাটুকু হালাল। বহু কষ্ট, দূরত্ব, টানাপোড়েনের মাঝে তৈরি হওয়া। এই ভালোবাসায় আঙুল তোলার সাধ্য কার, বলো? কেউ আঙুল তুলতে চাইলে তার আঙুল কেটে আমি থ্যা*তলে দিবো।
,,,, অর্পনা এবার ঠোঁট ভেঙে কেদে দিলো — আমি ভালো না,, আমি আমার বড়ো বোনের ভালোবাসায় ভাগ বসিয়েছি,, আপনাকে জোর করে বাধ্য করেছি আমাকে ভালোবাসতে।
,,, দ্বীপ জানে এসব,, অর্পনা কোন দিক থেকে গেইম শুরু করে আর কোন দিকে গিয়ে শেষ হয়,, তা এতোদিনে দ্বীপের আয়ত্তে চলে এসেছে কিন্তু কিছুই বলার নেই। অর্পনার জায়গায় অন্য কেউ হলে তাকে কেটে,লবন মরিচ ছিটিয়ে রোদে শুকাতো দ্বীপ,, তাকে নিয়ে মাইন্ড গেইম খেলার অপরাধে কঠোর থেকে কঠোর শাস্তি দিতো কিন্তু এটা অর্পনা। এই মেয়েটার সাথে কঠোর হতে পারেনা সে,, এইতো কিছুক্ষণ আগেও বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যাবে বলে ঠিক করেছিলো অথচ দরজার বাহিরেও পা রাখতে পারেনি। কোনো এক চৌম্বকীয় আকর্ষণের বলে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছে,, অর্পনার বুকে মুখ গুজতেই মাথায় উঠা সকল রাগ এক লহমায় মিটে গিয়েছে। এই মোয়েটার সঙ্গ তাকে শান্তি দেয়, স্বস্তি দেয়। ঠোঁট ভেঙে কাদতে থাকা অর্পনার ঠোঁটে আবারও ভালোবাসার পরশ আকলো দ্বীপ — নিজেকে খারাপ বলো না,, তোমাকে কিছু বলার হলে আমি বলবো,, খারাপ হও কিংবা ভালো তুমি আমার,, জাজ করার রাইট শুধু আমার আছে। এই রাইট আমি কাউকে দেইনি,, এমনকি তোমাকেও না। আজকের পর একই ভুল করবে না,, তাহলে আমার শক্ত হাতের মার পরবে তোমার গালে। তোমার প্রতি বিন্দুমাত্র অভিযোগ নেই আমার। তোমাকে পেয়ে আমি সন্তুষ্ট। নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবান মনে হয়। আমার মায়ের পর তুমিই একমাত্র ব্যক্তি, যে আমাকে সবচেয়ে বেশি বোঝে। প্লিজ, ডোন্ট ক্রাই। কাঁদলে অসুস্থ হয়ে পড়বে।
,,,, স্বামীর আদরে পুলকিত হলো অর্পনা,, এতোদিন তার ছলনা সম্পর্কে দ্বীপের জেনে যাওয়ার ভয়,, পারুর প্রতি করা তার অন্যায়,, সব মিলিয়ে মানসিক যন্ত্রণায় মরে যাচ্ছিলো সে। এখন কেনো যেনো সস্থি লাগছে। দ্বীপ অর্পনাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো,,অনেকটা সময় পেরুলো এভাবেই। হুট করেই অর্পনার কি হলো কে জানে? দ্বীপের গলার ভাজে মুখ ডুবিয়ে দাত বসিয়ে দিলো। আকষ্মিক কামড়ে ব্যাথায় ককিয়ে উঠলো দ্বীপ,, অর্পনাকে ছাড়াতে চাইলো,, মেয়েটা ছাড়ছে না। দ্বীপ চ যুক্ত শব্দ করে সুধালো– কি হলো? কামড়াচ্ছিস কেনো? জলাতঙ্ক হয়েছে?
,,, অর্পনা উত্তর করলো না,, জায়গা পরিবর্তন করে অ্যাডম্স অ্যপলে টার্গেট করলো,, কামড় বসাতেই কেসে উঠলো দ্বীপ। অর্পনা সরে এলো,, এক হাতে দ্বীপের কলার চেপে ধরে বললো–
— আপনি কেন ছোটবেলায় আমার জীবনে এলেন না? একই শহরেই তো ছিলাম। আধা ঘণ্টার দূরত্ব। রিকশায় করে যেতে দশ মিনিট লাগে। কেন এলেন না বলুন? আপনাকে এখন আমি মেরে ফেলবো।
দ্বীপ কামড় দেওয়া জায়গাটাতে হাত ছোয়ালো,, জ্বলছে ভিষন,,বিরক্তির স্বরে বললো– দশ মিনিটে পঞ্চাশ টাকা ভাড়া। তর বাপ কি আমাকে পঞ্চাশ টাকা দিয়ে রেখেছিলো? তখন তো বেকার ছিলাম। কীভাবে যাবো?
— পায়ে হেঁটে যেতেন। নির্বাচনের সময় তো ছেলেপুলে নিয়ে পুরো থানা ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। তখন একটু যেতে পারলেন না?
— গেলে কী হতো? তুই তো তখন বাচ্চা। আমার যখন প্রেমের বয়স, তখন তুই প্রেমের ‘প’ও বুঝিস না।
— দ্বীপের কথায় বেকে বসলো অর্পনা,, অন্যপাশে ঘুরে শুয়ার প্রয়াস চালাতে চালাতে মুখ ঝামটালো — চুপ করুন। বাহানা দেবেন না। নিজের বউকে সবাই মিলে এত এত কষ্ট দিলো, আপনার কিছু এলো-গেলো না? বাঁচাতে ও গেলেন না? সার্থপর।
,,দ্বীপ ক্ষতস্থানে হাত বুঝাচ্ছিলো,, অর্পনাকে ঘুরে শুতে দেখে দুহাতে ঝাপটে ধরলো– আরে, এটা আবার কেমন বাচ্চামি? আমি তখন কীভাবে জানবো, তুমি-ই যে আমার বউ হবে?
,,, মনের কানেকশন থাকলে ইউটিউব দিয়েও যোগাযোগ করা যায়,, আমাকে শিখাতে আসবেন না।
,,, অতি শোকে পাগল হয়ে গিয়েছিস? যাহ!! টেবিল থেকে খাবার নিয়ে আয় খিদা পেয়েছে।
,,, নিজের টা নিজে নিয়ে খাক।
,,, নিজে খেলে তকে বিয়ে করেছি কেনো? মার খেতে না চাইলে যাহ!!
,,, নিষ্ঠুর মানব! ” অসুস্থ বউ দিয়ে কাজ করায়।
,,, যাবি?
,,, যাচ্ছি।
,,,,প্রেগন্যান্সির পর থেকে প্রতিদিন সকালে ১ ঘণ্টা করে হাঁটাহাঁটি করে মেধা। সাথে অবশ্য বিহান থাকে। কাঁধ পেঁচিয়ে বুকের সাথে আগলে নিয়ে দুজনেই পুরো বাগানজুড়ে হাঁটাহাঁটি করে সম্পূর্ণ সকালটা।তবে আজকের বিষয়টা একটু ভিন্ন। ভোররাতে ফেরার দরুন এখনো পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে বিহান, যার ফলস্বরূপ মেধাকে নিয়ে বেরিয়েছে পরশী।এদিকে ভোররাতে দ্বীপ ফেরার পর অর্পনার আর ঘুমানো হয়ে ওঠেনি। দুজনের মান-অভিমান, কথাবার্তার মাঝেই রাত পেরিয়ে ধরনীতে ভোরের আগমন ঘটেছে। অগত্যা আর ঘুমালো না অর্পনা। দ্বীপকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে এনেছে লোকটার অত্যাচারের হাত থেকে।
বারান্দা থেকে মেধা আর পরশীকে দেখে নিচে নেমে এলো। মেইডকে কফি দিতে বলে বাগানে এসে দুটো গাছের ডাল একত্র করে বাঁধা বড়ো দোলনাটাতে বসলো। তার সামনেই হাঁটাহাঁটি করছে মেধা আর পরশী। পরশী মেয়েটা বেশ ধান্দাবাজ। সে মেধাকে সঙ্গ দিচ্ছে কম, গাছের ফল পর্যবেক্ষণ করছে বেশি।
মির্জা বাড়িটির দৈর্ঘ্য-প্রস্থ বিশাল। সামনের দিক আর বামপাশটায় ফুলের বাগান হলেও ডানপাশে বিশাল ফলের বাগান রয়েছে। দেশীয় থেকে শুরু করে বৈদেশিক ফলেরও অগণিত চারা রয়েছে এখানে। প্রতিটি গাছ বাগানের মালি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বহু পুরোনো গাছ হওয়ার দরুন ম্যাক্সিমাম দেশীয় গাছ ডালপালা মেলে আকাশ ছুঁয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে অনেক গাছেই ফল রয়েছে। আমের মৌসুম শেষ হওয়া সত্ত্বেও ২৩ টা গাছে এখনো কাঁচা-পাকা আম রয়েছে। কোনটা কোন জাতের আম, অর্পনা চিনে না। পরশীকে জিজ্ঞেস করলে ও সব নাম গড়গড় করে বলে দেয়, কিন্তু অর্পনা মনে রাখতে পারে না। কাঁঠাল গাছেও কাঁঠাল আছে কয়েকটা। এত বড়ো ফলের বাগানে একটাই কাঁঠাল গাছ। কারণ মির্জা বাড়িতে বিহান আর আরিব ব্যতীত কেউ কাঁঠাল খায় না। মৌসুমের শুরুতে সাথী বেগম কাঁচা কাঁঠালের তরকারি রান্না করলেও সেটা মাহিদ মির্জা ব্যতীত কেউ ছুঁয়েও দেখে না।কাঁঠালের সাথে চরম বিদ্বেষ রয়েছে মির্জা বংশের।আম আবার সবাই খায়, শুধু দ্বীপ বাদে। ওই লোক যে কী খায়, সেটা ওই লোকই জানে। যেকোনো ফল সামনে নিয়ে এগিয়ে দিলেই বলবে” আমি এসব পছন্দ করি না, নিয়ে যাও।”
জাম জিনিসটার প্রতি দ্বীপের মাত্রারও বাইরে বিদ্বেষ রয়েছে। সহ্যই করতে পারে না। অথচ অর্পনা জাম খেতে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। এই তো সেদিন, আত্মীয়দের বাড়িতে পাঠানোর জন্য মালিকে দিয়ে আঠাশ কেজি জাম পাড়ানো হলো। সেখান থেকেই পরশী এক বাটি জাম আর লবণ-মরিচ অর্পনার ঘরে রেখে গিয়েছিলো। সন্ধ্যার দিকে নামাজ পড়ে বই নিয়ে বসার কালে জামের বাটিটা পাশে রেখেছিলো অর্পনা। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে একটা-দুটো মুখেও পুরেছিলো। কিন্তু সেই মুখে পুরাটা স্থায়ী হলো না বেশিক্ষণ। দ্বীপ মির্জার একটা বাজে স্বভাব রয়েছে। একটা না, অনেকগুলোই। তার মধ্যে একটি হলো— সে কাজে যাওয়ার বেলায় অর্পনাকে একবেলা বিরক্ত করবে, আবার ফিরে এসেও একবেলা বিরক্ত করবে। সেদিনও তার ব্যতিক্রম হলো না। সন্ধ্যায় ফিরে প্রয়োজনীয় ফাইলপত্র বিছানায় একপ্রকার ছুড়ে ফেলেই অর্পনার কাছে এগিয়ে গেলো। জ্বালাতন করলো কিছুক্ষণ। চুম্বন করার কালে যখনই অর্পনার মুখে জামের স্বাদ পেলো, লোকটার কী রাগ! সেই রাগের তোপে পড়ে আরও কিছুক্ষণ জ্বালাতন সহ্য করতে হলো অর্পনাকে।
,,,সব দুঃখ-কষ্টের ভিড়ে অর্পনার ভালো সময়টুকু এই দ্বীপ মির্জার নামেই কাটে। দ্বীপ যতক্ষণ কাছে থাকে, মনেই হয় না সে অপূর্ণ। তার নিজের বলতে কেউ নেই। মনে হয়, এই লোকটাই তার পৃথিবী, যে তাকে এক আকাশ সমান ভালোবাসায় মুড়িয়ে রেখেছে।
,,আকাশ-কুসুম ভাবনায় বিভোর থাকা অর্পনা দুই ননদের কার্যকলাপ দেখতে দেখতে হঠাৎই খেয়াল করলো, গেস্ট রুমের পেছনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কেউ। ভ্রু গুটালো অর্পনা। ভালো করে খেয়াল করলো ছেলেটাকে। বয়স আনুমানিক ১৪-১৫। হুট করেই যেন বিষয়টা ধরতে পারলো সে। পরশীর উদ্দেশ্যে বললো— পরশ! যাও তো, ওই পিচ্চিটাকে ডেকে নিয়ে আসো। বলবে, তোমার আপু ডাকছে।
,,, এসব ডাকাডাকির জন্য উস্তাদ পরশীয়া মির্জা বড়ো ভাবির আদেশ পেয়ে নাচতে নাচতে সেদিকে চলে গেলো। চলতি পথে দু-একবার গাছ ধরে ঘুরপাকও খেয়েছে। মেয়েটার কাণ্ডে আফসোস করে উঠলো মেধা।কবে না জানি লাফাতে লাফাতে হাত-পা ভেঙে বসে!পরশী সেসব পাত্তা দিলো না। ছুটে গিয়ে দাঁড়ালো গেস্ট রুমের বারান্দার সামনে। পরশীকে দেখে হকচকিয়ে গেলো আরাফাত। পরশী দুটো লম্বা দম নিয়ে আঙুল তাক করে বললো—
— এই যে পিচ্চি! তোমাকে আমার বড়ো ভাবি ডাকছে। সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসো।
,,, আরাফাত পিচ্চি ডাক শুনে বিরক্ত হলো। তবে মেয়েটা অপরিচিত বলে কিছু বললো না। এটা গ্রামের কেউ বললে এতক্ষণে মেরে একদম মাথা ফাটিয়ে দিতো। আরাফাত একবার বাড়িতে সারি সারি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডদের দিকে তাকালো। কেমন ভয়ানক ভয়ানক চেহারা! রোদে দাঁড়িয়ে থাকার দরুন প্রতিটি লৌহমানবের চেহারা কালো রং ধারণ করেছে। হাতে থাকা স্নাইপার রাইফেল দেখে আরাফাতের আত্মা শুকিয়ে আসার জোগাড়।
সে যদি এদের ভয় না পেতো, তাহলে অনেকক্ষণ আগেই আপার কাছে চলে যেতো।
আরাফাতকে গার্ডদের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকালো পরশীয়া। শুধালো—
— কী হলো? আসছো না যে?
,,, আরাফাত গার্ডদের দিকে ইশারা করে বললো— ওনাদেরকে আমার ভয় লাগছে। আমি একা একা আসতে পারবো না। আমাকে এসে নিয়ে যান।
,,, পরশী ঠোঁট উল্টে গার্ডদের দিকে তাকালো। বাগানে তাদের উপস্থিতি বিরাজমান হওয়ার দরুন প্রতিটি গার্ড সোজা নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। এক সেকেন্ডের জন্য ঘাড় এদিক-ওদিক কিংবা নজর এদিক-ওদিক করার সাহস পাচ্ছে না। প্রত্যেকটা গার্ড তার বাবা-ভাইদের ভয়ে তটস্থ। একপলকের জন্য তাদের দিকে তাকালেও শাহিন মির্জা এই বাগানের নিচেই মাটি চাপা দিয়ে দেবে এদের। এর জন্য কাউকে কৈফিয়ত দেওয়ারও প্রয়োজন পড়বে না। কারণ প্রতিটি গার্ড পরশীর বাবা-চাচাদের টাকায় কেনা। এই কাজে যুক্ত হওয়ার আগেই গোটা করে এগ্রিমেন্ট করে এসেছে,, বেইমানির ফল মৃত্যু।সুতরাং এদেরকে ভয় পাওয়ার মতো কিছুই খুঁজে পেলো না পরশী। জন্মের পর থেকেই গার্ডদের সাথে ওঠাবসা তাদের। বুঝ হওয়ার পর বাবার কোলে বসে রিভলভার নিয়ে খেলেছে পরশী। এগুলো তার কাছে দুধভাত ছাড়া কিছুই না।
পরশী গার্ডদের থেকে নজর সরিয়ে আরাফাতের উদ্দেশ্যে বললো— থাকো, আমি আসছি।
,,আরাফাত শায় জানালো, ছুটে গেলো পরশী, ফিরে এলো আরাফাতকে নিয়ে। ফোন স্ক্রোল করা অর্পনা পাশে ওদের উপস্থিতি টের পেয়ে ফোন থেকে মুখ তুলে আরাফাতের দিকে তাকালো, ইশারায় পাশে বসতে বললে আরাফাত ইতস্তত করে বসে পড়লো। আরাফাত বসতেই ওকে রেখে পরশী চলে গেলো মেধার কাছে। অর্পনা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ছেলেটার মুখটা পরখ করলো। পুরো মুখে, ঠোঁট আর কপালের গড়নটা একদম তার মতো। চেহারা লম্বা, নাকটা টিকালো, খাড়া; চোখটা অত বড় নয়, তবে তার মতো চোখের পাপড়িগুলো বড় বড়। ঠোঁটের নিচে পারুর মতো একটা তিল আছে। চেহারার গঠন আলাদা হলেও যে কেউ দেখলে বুঝবে অর্পনার সাথে কানেকশন আছে এই ছেলের। আপাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভ্রু নাচালো আরাফাত। অটোমেটিক অর্পনার ঠোঁট বেঁকে এলো। সে বললো
— এই ভ্রু নাচানো কত থেকে শিখেছো?
আরাফাত এক হাতে শার্টের কলার টেনে বললো— জন্ম থেকেই আমি এসবের বেশ পারদর্শী।
অর্পনা এবার ঠোঁট প্রসারিত করে হাসলো— তুমি অনেকটাই আমার মতো, ভ্রু নাচানো আর কথাবার্তাও।
,,আরাফাত যেন এতে বেশ খুশি হলো। আপার সাথে মিল আছে, তাই। অর্পনা আবারও জিজ্ঞেস করলো— খেয়েছো কিছু?
,,,আরাফাত মুখ বিকৃত করে বললো— হুম, খেয়েছি। একটা সাদা পোশাক পরা মহিলা এসে সকাল সকাল কফি দিয়ে গেলো।
— মুখটা এমন করলে যে? কফি খেতে পছন্দ করো না?
— করি, বাট মিষ্টিটা… উনি আমাকে তেতো কফি দিয়েছিলেন।
— ওটাকে ব্ল্যাক কফি বলে। ব্ল্যাক কফি স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
,,, তখনই একজন মেইড কফি হাতে বাগানে এলো। অর্পনাদের সামনে দাঁড়াতেই আরাফাত মুখ ফিরিয়ে নিলো। হাসলো অর্পনা। মেইড কফির কাপ দিয়ে চলে যেতেই অর্পনা কফিতে চুমুক দিয়ে বললো— যা বলছিলাম, এখন থেকে প্রতিদিন ব্ল্যাক কফি খাবে। ভালো লাগবে, মন-মস্তিষ্ক সতেজ থাকবে।
,,, ‘প্রতিদিন’ কথাটা শুনে চমকালো আরাফাত। সকাল থেকে ভাবছিলো আপা মনে হয় তার সাথে কথাই বলবে না, আবার কাছে রাখা তো দূরের কথা। এখন আপার মুখে এমন কথা শুনে কেমন আমতা আমতা করে বললো— আপা… মানে আপু, আমি কি এখন থেকে তোমার কাছেই থাকবো?
,,অর্পনা উত্তর না দিয়ে ফের প্রশ্ন করলো— প্রথমে কি বলে ডেকেছিলে?
,,,অর্পনার মুখ গম্ভীর। মূলত অর্পনার চেহারাটাই এমন। তার ঠোঁটে হাসি না থাকলে, সে রেগে না থাকলেও তাকে রাগী রাগী মনে হয়। আরাফাত কেমন ভয় পেলো, ফের আমতা আমতা করে বললো— আসলে আমরা ওখানে সবাই বড় আপুকে আপা বলে ডাকি, তাই… সমস্যা নেই, এরপর থেকে আমি তোমাকে আপু বলেই ডাকবো।
,,,অর্পনা আবারও কফিতে চুমুক দিয়ে নাকচ করে বললো— আপাই ডেকো, ডাকটা সুন্দর।
,,আরাফাত যেন স্বস্তি পেলো। ‘আপু’ ডাকটা তার কাছে কেমন ফরমাল ফরমাল মনে হয়। যেন মন রক্ষার্থে ডাকা কোনো শব্দ, যা দ্বারা মানুষকে ইমপ্রেস করার একটা ব্যাপার থাকে। ‘আপা’ ডাকটা বড্ড কাছের, আপন, আর সবচেয়ে আলাদা। তাই এই ডাকটাই সে প্রেফার করে বেশি। আরাফাতের কিছু একটা মনে হতেই প্যান্টের পকেট থেকে একটা কাগজ বের করলো। এটা সে ফেরার পথে নিয়ে এসেছে। আরেকটা দশ টাকার ডেইরি মিল্ক চকলেটও ছিল পকেটে। অর্পনা আরাফাতের দিকেই তাকিয়ে ছিল। আপাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মিষ্টি করে হাসলো ছেলেটা। এই হাসিটা অর্পনার কাছে অচেনা, তবে বড্ড সুন্দর। আরাফাত প্রথমে কাগজটা এগিয়ে দিয়ে বললো— এটা তোমার। আব্বা আমাকে দিয়ে লিখিয়েছিল তোমার জন্য। সময় করে পড়বে।
,,, অর্পনা কাগজটা নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো, খুলতে সাহস পেলো না। আরাফাত এবার চকলেটটা এগিয়ে দিলো— এটা বাড়ির মোড়ের দোকান থেকে এনেছি। ছোটবেলায় নাকি তুমি একা একা ওই দোকানে চলে যেতে? মা বলেছিল।
,,‘মা বলেছিল’ কথাটায় অবাক হলো অর্পনা। আগ্রহ ভরে সুধালো— তোমার মা আমার ব্যাপারে তোমাকে বলেছিল?
— আব্বাও তো বলতো, পারু আপাও বলতো, সবাই বলতো। ছোট থেকেই তোমার কথা শুনে শুনে বড় হয়েছি।
— আমি কীভাবে হারিয়ে গিয়েছিলাম তুমি জানো?
— জানি, তবে আমার থেকে না শুনে তোমার হাতে থাকা কাগজটা পড়ো। পড়লেই জানতে পারবে।
,,,অর্পনা কিছু বললো না। কাগজটা রেখে দিলো ট্রাউজারের পকেটে। অনেকটা সময় চুপ রইলো ভাইবোন। কেউ কারোর সাথে আগে থেকে পরিচিত না, তবুও দুজনার শরীরে একই রক্ত বইছে, ডিএনএ সেম।আরাফাতই নীরবতা ভেঙে বললো— তোমার হৃদয়ের খবর কী, আপা?
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৬২
অর্পনা প্রথমে বুঝলো না। বুঝতে পেরে শব্দ করে হেসে ফেললো— আলহামদুলিল্লাহ, ভালো। অন্যান্য রোগীর বেলায় হৃদয় বেইমানি করলেও আমার নতুন হৃদয়টা সভ্য, একবারও আমাকে অপরিচিত ভাবেনি।
আরাফাত সেসব কানে তুললো না। বিমোহিত নজরে তাকিয়ে থেকে আওড়ালো— তোমাকে হাসলে খুব সুন্দর লাগে, আব্বুর মতো।
,, আব্বুর মতো হাসে অর্পনা অথচ আব্বুকে দেখার ভাগ্য হলো না তার। আম্মু তার গল্প করতো অথচ আম্মুর কোলে মাথা রেখে গল্প শুনার ভাগয় হলো না অর্পনার। এতো সুন্দর ভাগ্য হওয়া কি খুব প্রয়োজনীয়? মানুষ এতোটা অপূর্ন হয়?
