Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১৭

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১৭

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১৭
সাজিয়া জাহান সুবহা

সন্ধ্যা নামার আগ মুহূর্তে স্বর্ণমন্দির থেকে ফিরার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলো সকলে। তোহার শরীর সকাল থেকেই দুর্বল হয়ে ছিলো। লং জার্নি একেবারেই সহ্য করতে পারে না সে। আজও আসার পথে বমি হয়েছিলো তিনবার। হোটেলে এসে রেস্ট করার সময় না পাওয়ায় শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছিলো তার। সব বন্ধুদের নাড়ি নক্ষত্র সম্পর্কে অবগত থাকা আয়ান চট করে ধরে ফেললো তোহার ব্যাপারটা। বুঝতে পারছিলো এতো মানুষের ভীড়, কোলাহলে শরীরটা আরো খারাপ হচ্ছে তোহার। তাই সিন্ধান্ত নিয়েছিলো তোহাকে নিয়ে হোটেলে ফিরে যাওয়ার৷ বের হওয়ার আগে একবার খোঁজ করেছিলো সায়েরীর। ফায়াজও তখন অন্যত্র ছিলো বলে আয়ান ভেবে নিয়েছিলো দুজন একসাথে আছে। তাই এতো মাথা না ঘামিয়ে ফিরে গেলো হোটেলে। অন্যদিকে বাকিরা ভেবে নিলো আয়ান এবং তোহার সাথেই হয়তো ফিরে গিয়েছে সায়েরী। তাই নিশ্চিত মনে জায়গাটা ঘুরে সন্ধ্যা নামার আগ মুহূর্তে রওনা দিলো হোটেলের উদ্দেশ্যে।

স্বর্ণমন্দিরে আসার অল্প কিছুক্ষণ পরই তীব্র মাথা ব্যাথায় অসহ্য হয়ে মিহাদ হোটেলে ফিরে গিয়েছিলো। চোখ মুখ লাল হয়ে ভয়াবহ অবস্থা হয়ে গিয়েছিলো তার। শুধু সাফওয়ানকে জানিয়ে গিয়েছিলো সে। সাফওয়ানের কাছাকাছি থাকায় ইরা শুনলো সবই। সেই সাথে ভিতরটা ছটফট করে উঠলো মিহাদের অবস্থা দেখে। ছেলেটা তো এমন না। সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজলেও সর্দি আসেনা। তবে হঠাৎ এমন ভয়াবহ মাথা ব্যাথা কেনো হলো সেটা ভেবেই ভেতরটা অস্থির হয়ে উঠলো তার৷ না পারছিলো ছুটে যেতে। না পারছিলো সহ্য করতে৷ তবুও নিজেকে শান্ত রাখার যথাসম্ভব চেষ্টা করে স্বর্ণমন্দির ঘুরলো সন্ধ্যার আগ অবধি। সাফওয়ানের জন্য অবশ্য কেউ এতোটা ভাবলো না৷ সে ছোট বাচ্চা নয় যে হারিয়ে যাবে। আবার ভেবে নিলো হয়তো বা মিহাদের সাথে আছে। বেস্ট ফ্রেন্ড বলে কথা।
বিপত্তি ঘটলো হোটেল ফিরার পর৷ নিজেদের জন্য বরাদ্দকৃত রুমে একা একা তোহাকে শুয়ে থাকতে দেখল নাজরাত এবং সাফ্রিন। বিষ্ময় নিয়ে সাফ্রিন জানতে চাইলো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

‘ তুই একা কেনো তোহা! সায়ু কোথায়? ‘
চমকালো তোহা। সায়েরী কোথায় মানে কি। ওদের সাথেই তো থাকার কথা। নিজের বিষ্ময় ভাব কাটাতে না পেরে বেড থেকে উঠে বসে তোহা বললো,
‘ সায়ু তো আসেইনি আমাদের সাথে। ওর তো তোদের সাথে থাকার কথা। ‘
হতভম্ব মুখে একে অপরের দিকে তাকালো সাফ্রিন এবং নাজরাত। কাঁধের ব্যাগটা বেডে ছুড়ে মেরে সাফ্রিন দ্রুত পা বাড়ালো আয়ানের কাছে। পিছু পিছু ছুটলো বাকি দুজন। অস্থিরতায় শরীর খারাপ যেনো হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো তোহার৷ সবে মাত্র রুমে এসে বিছানায় গা বিলিয়ে দিয়েছিলো ফায়াজ এবং নুহাশ। এমন মুহূর্তে দরজা ধাক্কাধাক্কি শুরু করেছে দেখে বাধ্য হয়ে আয়ান খুললো দরজা৷ পরপরই সাফ্রিনের মুখে সায়েরীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না শুনে চমকে উঠলো সে। ত্বরিৎ শরীরের সব ক্লান্তি ছুড়ে ফেলে দৌঁড়ে আসলো ফায়াজ। নিজেকে স্বান্তনা দিতে দিতে সে বললো,

‘ হয়তো নীতি আপুদের সাথে এসেছে ও। তোরা সবদিকে খোঁজ না নিয়ে কীভাবে বলছিস সায়ু হারিয়ে গিয়েছে। নিচে চল, আশেপাশে একবার ভালো করে দেখ। ফোন দিয়েছিলি ওকে? ‘
বিরস মুখে মাথা দোলায় নাজরাত। অর্থাৎ ফোন দিয়েছে৷ কিন্তু ওর মোবাইল বারবার বন্ধ বলছে। অস্থিরতায় বুকের ভিতরটা ধুকপুক করতে লাগলো তাদের। হোটেলের সবখানে দেখলো কিন্তু কোথাও সায়েরীর অস্তিত্ব খুঁজে পেলো না৷ বারবার তাদের মনে পড়তে পাগলো আগের বারের দুর্ঘটনাটা। কিন্তু এবার যে রাত হতে চললো। কোথায় গেলো মেয়েটা! কোনো বিপদ হলো নাতো! সকলে একত্রিত হলো হোটেলের বাম দিকে বিশাল লনে। একে অপরের দিকে তাকিয়ে বুঝালো ব্যার্থতা। একে একে সবুজ ঘাসের উপর ধপ ধপ করে বসে পড়লো সবাই। বাহির থেকে আসার পর বিন্দু পরিমাণ বিশ্রামের সুযোগ হলো না কারো। ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসতে লাগলো সকলের। আয়ান অস্থিরতায় ছটফট করতে করতে স্বীদ্ধান্ত নিলো টিচারদের জানানোর। তারা প্রাথমিক খোঁজ তো নিয়েছে। এবার সবাইকে জানানো অত্যন্ত জরুরি। তারা হোটেলের ভিতর ঢুকছিলো এমন সময় নীতি এবং রায়ান আসলো। এসেই সাফ্রিনের কাছে জানতে চাইলো সাফওয়ানকে দেখেছে কিনা? দ্বিতীয় দফা চমকে উঠে সাফ্রিন আতংকের সাথে বললো,

‘ ভাইয়াকেও খোঁজে পাচ্ছো না! ‘
ভ্রুঁ কুঁচকালো নীতি। ভাইয়াকেও মানে..আর কে হারিয়েছে? আর সাফওয়ান তো হারিয়ে যাওয়ার মতো বাচ্চা নয়। উপস্থিত ছয় জনের চিন্তাগ্রস্ত মুখ দেখে নীতি বললো,
‘ সাফওয়ান হয়তো বা আছে আশেপাশে। এমনিতে অনেক্ষন যাবত দেখছি না বলেই জিজ্ঞেস করছিলাম। তোমাদের কি হয়েছে? এমন হয়ে আছো কেনো? ‘
‘ সায়েরীকে খুঁজে পাচ্ছি না নীতি আপু৷ সব জায়গায় খোঁজ নিয়েছি। ফোনটাও বন্ধ বলছে৷ স্বর্ণমন্দির থেকে আমাদের কারো সাথেই ফিরেনি ও। ‘

অনাকাঙ্ক্ষিত কথাটা শুনে হতভম্ব হয়ে গেলো নীতি এবং রায়ান। হঠাৎ যেনো টনক নড়লো দুজনের। সাফওয়ানকেও আসার পথে দেখেনি কোথাও। মিহাদ বলেছে ওর সাথে আসেনি। হোটেলে সকলে পৌঁছেছে আধ ঘন্টা হতে চললো। এখনো কেনো ক্লান্ত শরীর নিয়ে একা একা বাইরে থাকবে? মোবাইলটাও মিহাদের কাছে রেখে গিয়েছে৷ জ্বিব দিয়ে শুষ্ক ঠোঁট জোড়া ভিজিয়ে নীতি ভাবলো সাফওয়ান এবং সায়েরী দুজন কি একসাথে কোথাও আটকে গিয়েছে। কোনো বিপদ হলো না তো ওদের!!
‘ আপু, আমার মনে হয় টিচারদের ইনফর্ম করা উচিৎ। ‘
আয়ানের কথায় ঘোর বিরোধিতা করে নীতি বললো,
‘ নাহ! আমার মনে হচ্ছে ওরা দুজন এক সাথে আছে। আর এটা যেহেতু কলেজ ট্যুর। দুজনের এভাবে নিখোঁজ হওয়া নিয়ে নানা কথা রটাবে স্টুডেন্টরা৷ আমার মনে হয় আজ রাতটা ওয়েট করা দরকার। ‘
নীতির কথায় চরম বিরক্ত হয়ে ফায়াজ বললো,

‘ আপনার মনে হওয়া নিয়ে রাতটা এভাবেই পার করে দিলে সায়ুর যদি কোনো ক্ষতি হয়ে যায় তখন? ‘
‘ তোমরা বুঝতে পারছো না ফায়াজ৷ একটা ছেলে, একটা মেয়ে এতো ভীড়ের মধ্য থেকে হুট করে গায়েব হয়ে গিয়েছে শুনলে, ওদের নিয়ে আজেবাজে কথা বানিয়ে খোঁজ শুরু করার আগেই শেষ করে দিবে৷ আর এসব হলে বদনাম-টা সাফওয়ানের না বরং সায়েরীর হবে। তাছাড়া আমার মনে হচ্ছে দুজন একসাথে আছে। আর যেখানে সাফওয়ান আছে, সেখানে সায়েরীর ক্ষতি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা থাকতেই পারেনা।

নীতির কথায় যুক্তি খুঁজে পেলেও মন শান্ত হলো না ফায়াজ কিংবা অন্য কারো। না হওয়ারই কথা। সময় এখন প্রায় সন্ধ্যা ৭:৩০টা। চারপাশ ঘন অন্ধকারে তলিয়ে। সময় বাড়ার সাথে সাথে বাড়বে অন্ধকার। না জানে মেয়েটা কি অবস্থায় আছে এখন৷ তাদের ছয় জনের চিন্তাগ্রস্ত মুখ দেখে রায়ান জিহানকে ফোন করতে করতে বললো,
‘ আমি জানি এভাবে হাতে হাত গুটিয়ে রাখলে কিছুই হবে না। তবে নীতি যা বলছে ঠিকই বলছে। ধরো আমরা সবাইকে জানিয়ে দিলাম এই ব্যাপারে, আর ওরা সুস্থ শরীরে ফিরে আসলো। তখন কথাটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে ভাবতে পারছো? সায়েরীর মান সম্মানের কথাটা একবার ভাবো। (একটু থেমে) আমি জিহানকে ফোন করছি। আমার মনে হয় মন্দিরের আশপাশটা আমাদের একবার খোঁজ নেওয়া দরকার। তোমরা থাকো আমরা বরং গিয়ে দেখি। ‘
রায়ানের কথায় কিঞ্চিৎ আশার আলো খুঁজে পেলো তারা। জিহান এবং রায়ানের সাথে যোগ দিলো আয়ান, ফায়াজ ও নুহাশ। ইতিমধ্যে ইরা এবং মিহাদের কানেও পৌঁছে গেলো খবরটা।টকটকে লাল চোখ মুখ নিয়ে মিহাদও ছুটলো বাকিদের সাথে। মেয়েরা চিন্তিত মুখে অপেক্ষা করতে লাগলো হোটেল রুমে। আশা রাখলো যেনো ভালো কোনো আপডেট পায়৷

ঠিক কতো সময় ধরে জঙ্গলের উঁচু নিচু জায়গায় হাঁটছে জানা নেই সায়েরীর। কিন্তু অসম্ভব রকমের পা ব্যাথা করছে তার৷ ক্লান্তিতে শরীর ভেঙ্গে আসতে চাইছে। অথচ পথ যেনো ফুরাবার নয়। এতো সময় ধরে হাঁটার পরেও কোনো কূল কিনারা মিললো না। মৃদু আলোয় মাথা উঁচু করে সাফওয়ানের দিকে এক পলক তাকালো সায়েরী। ঠোঁট চেপে কপালে ভাঁজ ফেলে সাবধানে পা ফেলছে সাফওয়ান। সায়েরী বুঝে উঠতে পারলো না আদো ক্লান্তি নামক কিছু আছে কিনা এই ছেলের। কেমন নির্বিকারে ধুপধাপ পায়ে চলছে তো চলছেই। আর সহ্য হলো না সায়েরীর। হাতের মুঠোয় আঁকড়ে ধরা সাফওয়ানের শার্টের উরন্ত অংশটা ছেড়ে ধপ করে বসে পড়লো মাটির উপর। আকস্মিক তার এমম কাজে থমকে গেলো সাফওয়ান। পিছন ফিরে ফ্ল্যাশ লাইট ধরলো সায়েরীর মুখ বরাবর। তাকে এভাবে বসে থাকতে দেখে ভ্রুঁ কুঁচকে বললো,

‘ শুকনো মাটিতে আছাড় খাওয়া কি তোমার জন্মগত দোষ? যেখানে সেখানে ধুপ ধাপ চিৎ হয়ে যাও কেনো? ‘
সাফওয়ানের কথাটা কানে যেতেই গাল ফুলালো সায়েরী। লাইটের প্রভাব থেকে বাঁচতে চোখের উপর হাত রেখে দাম্ভিক কন্ঠে বললো,
‘ আমার কোন জন্মগত দোষ নেই। আর আমি পড়ে যাইনি বরং ইচ্ছে করে বসেছি। ‘
‘ মানে কি? এখানে বসে মশার কামড় খাওয়ার শখ হয়েছে তোমার! ‘
ঠোঁট উল্টালো সায়েরী৷ কাতর গলায় বললো,
‘ জানিনা কিসের শখ হয়েছে৷ কিন্তু আমার ভীষণ খিদে পেয়েছে। একটুও শক্তি নেই হাঁটার। ‘
মাঝ জঙ্গলে সায়েরীর এমন বাক্য শুনে দাঁতে দাঁত পিষলো সাফওয়ান। একে তো এই মেয়ের জ্ঞানহীন কান্ডে এখানে ফেঁসে গিয়েছে৷ কোথায় অপরাধবোধ নুইয়ে থাকবে তা না৷ ফরমায়েশ করছে খিদে লেগেছে বলে। নিজের রাগটুকু দমিয়ে সে বললো,

‘ এখন কি আপনার জন্য আমি ভোজনের আয়োজন করবো? না মানে কোন কোন ইতালিয়ান আইটেম এই মুহূর্তে হাজির করলে আপনার হাঁটার শক্তি ফিরে আসবে, আর আমরা এই আপদ থেকে বেরুতে পারবো, একটু বলুন।
এমন শান্ত কন্ঠের বাঁশ শুনে থমথম খেয়ে গেলো সায়েরী। আমতা আমতা করে বললো,
‘ আ..আমি বলিনি আমার জন্য কিন্তু আনতে হবে। আমি শুধু চাচ্ছিলাম অল্প কিছুক্ষণ রেস্ট করে তারপর আবার হাঁটবো। আপনার মতো এমন হাই পাওয়ারফুল ডোজের বডি নয় আমার। আমি আর হাঁটতে পারবো না। ‘
‘ তুমি হাঁটতে পারবে না বলে কি তোমার শরীরে কবে চার্জ হবে সেই আশায় বসে থাকবো আমি? একে তো নিজের গাধামি কাজে আমাকেও ফাঁসিয়েছো। এখন আবার নাটক শুরু করেছো। তোমার শুকরিয়া করা দরকার যে আমি তোমাকে একা রেখে তখন ফিরে যাইনি। ‘
একে একে এতোবার সাফওয়ানের খোঁচা মারা কথা শুনে তেতে উঠলো সায়েরী। উঁচু গলায় বললো,

‘ হ্যাঁ তো যান না। চলে যান। আমি কি বলেছিলাম আমার জন্য এখানে ফেঁসে যেতে? না এখন আটকে রেখেছি? আমার জন্য আর কষ্ট পোহাতে হবে না। আপনি নিজের রাস্তা খুঁজুন। আমি আমারটা দেখে নিবো। ‘
ঠোঁট চেপে ভ্রুঁ কুঁচকে তাকালো সাফওয়ান। খানিকটা কৌতুক কন্ঠে বললো, ‘ আর ইউ সিউর?? ‘
বিপরীতে মুখ ঘুরিয়ে নিলো সায়েরী। অর্থাৎ তার কোনো যায় আসে না৷ সায়েরীর প্রতিক্রিয়া দেখে বাঁকা হাসলো সাফওয়ান। এবং সায়েরীকে চমকে দিয়ে হুট করে বন্ধ করে দিলো ফ্ল্যাশ লাইট। আকস্মিক এমন কান্ডে ভয়ে চিৎকার করে দাঁড়িয়ে গেলো সায়েরী। দিকবিদিকশুন্য হয়ে অন্ধকারে দুহাতে ঝাপটে ধরলো সাফওয়ানের এক বাহু। তার এমন প্রতিক্রিয়া দেখে নিঃশব্দে হাসলো সাফওয়ান। সায়েরীর কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো,

‘ কি হলো? তুমি না একা একা রাস্তা খুঁজবে? এতটুকু-তেই সব হাওয়া বেরিয়ে গেলো? ‘
সাফওয়ানের বাহুতে মুখ গুজে চোখ বন্ধ করে রয়েছে সায়েরী। দুহাতে সাফওয়ানের বাহু আরো একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সে ভীতু কন্ঠে বললো,
‘ প..প্লিজ এমনটা করবেন না। লাইট অন করুন দয়া করে৷ নাহয় এই অন্ধকারে আমি মরেই যাবো। ‘
ভয়ের চোটে কন্ঠ কেঁপে কেঁপে উঠছিলো সায়েরীর। সাফওয়ান বুঝল বেশ ভালোভাবে জব্দ হয়েছে সে। তাই লাইন অন করে মুখের উপর ধরলো সায়েরীর৷ অবশেষে চোখ মেললো সায়েরী। ছলছল চোখের অভিমানী দৃষ্টি মেলে তাকালো সাফওয়ানের বাদামি চোখজোড়ার দিকে। তারপর হুট করে বাহু ছেড়ে কিঞ্চিৎ দুরত্বে দাঁড়িয়ে নাক টেনে বললো, ‘ চলুন। ‘

সাফওয়ান কিছু বললো না৷ শুধু নিজের শার্টের খোলা অংশটা একটু নেড়ে ইশারায় বুঝালো আঁকড়ে ধরতে। সায়েরী ধরলো না৷ গাল ফুলিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। সাফওয়ান বুঝলো একে বলে লাভ নেই। তাই বাধ্য হয়ে পা বাড়ালো সামনের দিকে। তার পাশাপাশি হাঁটছে সায়েরী৷ পিনপতন নীরবতা চারিদিকে। মাঝে মাঝে কানে আসছে ঝিঁঝি পোকার ডাক। সে সাথে শুকনো পাতার উপর দুজনের পা ফেলানোর মচমচ আওয়াজ।

আরো ঘন্টা খানিক হাঁটলো দুজন। সায়েরীর মোবাইলের চার্জ ফুরিয়ে আসলো। হয়তো আর আধ ঘন্টা মতো চলবে৷ এবার সাফওয়ানও ক্লান্তবোধ করলো বেশ। আড়চোখে সে তাকালো সায়েরীর মুখপানে। স্বল্প আলোয় দেখলো চোখ বুজে বুজে আসছে সায়েরীর৷ মুখ নিয়ে নিশ্বাস নিয়ে নিয়ে হাঁটছে। সাফওয়ান বুঝলো এবার সত্যিই অনেক বেশি ক্লান্ত মেয়েটা। একটু বিশ্রাম নেওয়াই যায়। সায়েরীর মুখের দিকে তাকিয়ে এসব কল্পনা করতে করতে যখনই সাফওয়ান কিছু বলার জন্য মুখ খুলবে, তখন হঠাৎ ডান দিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে ফেললো সায়েরী। বিষ্ময়ে সাফওয়ানের হাত চেপে ধরে চেঁচিয়ে উঠলো,

‘ সাফওয়ান ভাই!! ওদিকে… ওটা? ওটা কি??? ‘
সায়েরীর হঠাৎ প্রতিক্রিয়া দেখে কিঞ্চিৎ চমকালো সাফওয়ান৷ দৃষ্টি অনুসরণ করে ডান দিকে তাকিয়ে তার মুখ চকচক করে উঠলো। অনেকটা দূরে গাছগাছালির আড়াল হতে লালছে আলো বেড়িয়ে এসেছে কয়েক জায়গা থেকে। দেখে মনে হচ্ছে কোনো বসতবাড়ি হতে হলদে বাল্ব জ্বলছে। সায়েরী উৎফুল্ল চোখে তাকালো সাফওয়ানের দিকে। চোখ দিয়েই যেনো অনুরোধ করছে, চলুন না ওখানে গিয়ে দেখি!

মাথা নেড়ে সায় জানালো সাফওয়ান। খুশিতে এবার আগে আগেই পা বাড়ালো সায়েরী। তার ঠিক পেছনে লাইট হাতে এগিয়ে আসছে সাফওয়ান। মিনিট বিশেকের মধ্যে তারা পৌঁছে গেলো কাঙ্খিত জায়গায়। পৌঁছে স্বস্তির শ্বাস ফেললো দুজন। জায়গা দেখে মনে হচ্ছে এটা কোনো গ্রাম৷ ছোট ছোট অনেকগুলো কুড়েঘর সারি সারি করে বাঁধা। আবার কয়েকটা ঘর মাটির তবে দোতলা, তিনতলা এমনও রয়েছে। জঙ্গলের ভেতর থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসলো তারা। যেহেতু রাতের সময়,তাই মানুষের আনাগোনা খুব কম। ধীর পায়ে গ্রামের সরু পথ ধরে হাঁটতে লাগলো দুজন। আচমকা পেছন থেকে ডেকে উঠলো কেউ। ফিরতেই দেখা পেলো তিনজন যুবকের। চেহারা দেখে মনে হচ্ছে চাকমা/মারমা।ধবধবে ফর্সা মুখশ্রী সকলের। মুখ দেখে বয়স আন্দাজ করার রেশ মাত্র নেই৷ তবে পোশাক দেখে সাফওয়ান বুঝলো ওরা মারমা জাতি। সে যখন খেয়াল করলো যুবক তিনজন অদ্ভুত চোখে সায়েরীর আগাগোড়া লক্ষ্য করছে, তখন মোবাইলটা পকেটে ঢুকিয়ে সায়েরীকে সম্পূর্ণ ঢেকে সামনে এসে দাড়ালো। তার এমন কান্ডে যুবক তিনজন ধাতস্থ করলো নিজেদের৷ একজন স্পষ্ট শুদ্ধ ভাষায় জানতে চাইলো,

‘ আপনারা কোথা থেকে এসেছেন? ‘
সাফওয়ান একটু ভাবুক হলো। এভাবে সত্যিটা বলা ঠিক হবে না৷ কিন্তু এই ঝামেলার বস্তা কে কি বলে পরিচয় দিবে? সাফওয়ান যখন আকাশ কুসুম ভাবনায় ব্যাস্ত তখন তার পিছন থেকে উঁকি ঝুঁকি দিতে থাকা সায়েরী বিরক্ত হয়ে উঠলো এই নীরবতায়। চট করে সাফওয়ানের পাশে দাঁড়িয়ে সে অকপটে বললো,
‘ আসলে আমরা কলেজ ট্যুরে বান্দরবান ঘুরতে এসেছিলাম। দুর্ভাগ্যক্রমে জঙ্গলের মধ্যে হারিয়ে গিয়েছি। সে যাই হোক, এখান থেকে মেইন রোড কোন দিকে একটু বলতে পারবেন? ‘

সায়েরীর অকপট স্বীকারোক্তি শুনে চমকালো সাফওয়ান। রাগও হলো। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সে ছেলেগুলোর দিকে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করলো তাদের মনের ভাবনা। কিন্তু তিনজনই গোলগাল চোখে তাকিয়ে থাকা ছাড়া কিছুই বললো না। এরমধ্যে সেখানে মধ্যবয়সী দুজন মহিলা এসে হাজির হলো। সায়েরীর মনে হতে লাগলো এখানের সব মানুষদের চেহেরা একই রকম। মহিলা দুজনই কোমর থেকে হাঁটু পর্যন্ত লম্বা একটি কাপড় পরিধান করেছে, কলার ছাড়া একটি জ্যাকেট এবং একটি টারবান বা পাগড়ি পরিধান করেছে মাথায়। তাদের অদ্ভুত বেশভূষা দেখে ফিক করে হেসে দিলো সায়েরী। চোখ গরম করে তাকালো সাফওয়ান। সহসা ঠোঁট চেপে চুপ হয়ে গেলো সে। মহিলা দুজন গোলগাল চোখে সায়েরী, সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত ভাষায় কথা বললো ছেলে তিনজনের সাথে। বিপরীতে ছেলেগুলো কি জবাব দিলো কিছুই বুঝলো না সায়েরী। সে একটুখানি পাশ ঘেঁষলো সাফওয়ানের। চাপা কন্ঠে বললো,

‘ ওরা এভাবে চ্যা ম্যা করে কথা বলছে কেনো? একটু আগেই না বাংলা বললো!! ‘
সায়েরীর বলা “চ্যা ম্যা” শব্দটা শুনে নাকের নিচে আঙ্গুল ঘষে হাসি আটকালো সাফওয়ান। সেও চাপা কন্ঠে জবাব দিলো,
‘ ওরাও বাংলাদেশি। তবে উপজাতি। এটা ওদের স্থানীয় ভাষা। ‘
সায়েরী ঠোঁট গোল করে “ওহ” বলে আবারো আগাগোড়া সে দেখতে লাগলো উপস্থিত উপজাতি গুলোকে। হঠাৎ তাদের মধ্যে থেকে একজন মহিলা সায়েরীর দিকে তাকিয়ে কিসব বলে উঠলো। চমকালো সায়েরী। অবাক কন্ঠে সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে বললো,

‘ এই মহিলা আমাকে গালি দিয়েছে?? ‘
উচ্চ কন্ঠে বলা কথাটা শুনে সাফওয়ান সহ বাকি ছেলে তিনজনও চমকালো। সাথে সাথেই তাদের মধ্য থেকে একজন বলে উঠলো,
‘ ছিঃ ছিঃ গালি দিতে যাবে কেনো? উনি বলেছেন, আপনারা আমাদের মেহমান। এভাবে গ্রামে এসে চলে যাবেন কেনো! একটু আপ্যায়ন করার সুযোগ দিন। ‘
দাঁত দিয়ে জিহ্ব কেটে বোকা বোকা হাসি দিলো সায়েরী। তবে আপ্যায়ন করার কথাটা শুনে খুশি হলো বেশ। সাফওয়ানের মতামত না নিয়ে নিজেই বললো,

‘ অবশ্যই আপ্যায়ন করতে পারেন। আপনাদের ড্রেস..না মানে আপনাদের সংস্কৃতি দেখে আমার ভীষণ ভালো লাগছে। এখানে আরো কিছুক্ষণ থাকা-ই যায়, তাই না?? ‘
শেষের প্রশ্নটা সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে করলো সে। উত্তরে গম্ভীর কন্ঠে সাফওয়ান বললো,
‘ আমি কি বলেছি ভালো লেগেছে? চুপচাপ মেইন রোডের খুঁজ নিয়ে এখান থেকে বেরুতে পারলেই বাঁচি। ‘
গাল ফুলালো সায়েরী। এভাবে বলার কি আছে! মানুষগুলো সব কেমন সেইম সেইম, কিউট কিউট। এদের থেকে দুই একটা “চ্যা ম্যা” কথা শিখে বন্ধুদের ক্ষ্যাপানো যেতো। কিন্তু না। সে তো ভুলেই গিয়েছিলো, আস্ত একটা দৈত্য মানব সাথে নিয়ে ঘুরছে সে।
এরইমধ্যে মহিলা দুজন জোর করে নিজেদের সাথে নিয়ে আসলো তাদেরকে। সাফওয়ান বিরক্ত হলেও সায়েরী বেজায় খুশি। যেতে যেতে সাফওয়ান একজনের কাছ থেকে জানতে চাইলো হাইওয়ে কোন দিকে। ছেলেটা পথ দেখিয়ে বললো,

‘ এই সরু পথ দিয়ে আধ ঘন্টা হাঁটলেই মেইন রোড ধরা যায়। অথবা, এই বাম দিকের জঙ্গলের ভিতর পনেরো, বিশ হাঁটলেও মেইন রোড ধরতে পারবেন। ‘
ছেলেগুলো স্পষ্ট বাংলা শুনে সায়েরী জিজ্ঞেস করলো কীভাবে এতো সুন্দর বাংলা শিখেছে। বিপরীতে একজন জানালো তারা অনেক বছর ধরে বান্দরবান ঘুরতে আসা ভ্রমণকারীদের নানান কাজে সাহায্য করে আয় করছে৷ পাশাপাশি অনেককেই গাইড করে। সেই সুবাদে বাংলা ভাষা শিখা হয়েছে।
কথা বলার সময় ছেলেগুলোর দৃষ্টি সায়েরীর শরীরের প্রতিটা ইঞ্চিতে ঘুরে বেড়াচ্ছিলো। পাশাপাশি হাঁটতে থাকা সাফওয়ান সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখলো সবই। একজন প্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে হিসেবে অন্য ছেলের কামুকী দৃষ্টি খুব সহজেই ধরা পড়লো তার কাছে। সায়েরীর কনুই টেনে নিজের পাশে এনে সে নিজে হাঁটতে লাগলো মধ্যবর্তী স্থানটাই। তার এমন অদ্ভুত কাজের অর্থ সায়েরীর ছোট্ট মাথায় না ঢুকলেও ছেলে তিনজন বুঝতে পারলো বেশ ভালো করে। এবং বুঝতে পেরেই নিজেদে সংযত করে নিলো।

একটা কুড়েঘরে বেতের চেয়ারে বসতে দিলো সাফওয়ান, সায়েরীকে। ঘরে লম্বা শিকের হারিকেন জ্বলছে দুটো। মোটামুটি ভালো রশ্নি ছড়াচ্ছে। মহিলা দুজন ব্যস্ত হলো আপ্যায়ন করতে। সাফওয়ান পকেট থেকে সায়েরীর মোবাইলটা বের করে দেখলো সেটা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। একজন ছেলেকে বললো যোগাযোগের কোনো উপায় আছে কিনা এখানে? ছেলেগুলো নিজেদের মধ্যেই খুচুরখুচুর করছিলো আর বোতল থেকে জল জাতীয় কিছু পান করছিলো। হঠাৎ সাফওয়ানের আওয়াজে চমকালো তারা। হুট করে একজন জবাব দিলো,
‘ এখানে টেলিফোন লাইন আছে৷ আপনি আসুন আমার সাথে। আমি নিয়ে যাচ্ছি। ‘
সায়েরীর দিকে একপলক তাকালো সাফওয়ান। এখানে যেহেতু দুই তিনজন মহিলা আছে, সাফওয়ান ভাবলো ছেলেগুলোর সাথে তাকে না নেওয়ায় ভালো। সাফওয়ান বেরিয়ে পড়লো একজনকে নিয়ে। অন্য দুজন ছেলে ঘর ছেড়ে কোথাও একটা গিয়েছে। হাঁটতে হাঁটতে অন্ধকারে পৌঁছে গেলো সাফওয়ান। হঠাৎ ছেলেটা মনে পড়ার ভঙ্গিতে বললো,

‘ ইশশ! সাথে করে আলো আনতেই ভুলে গিয়েছি। আপনি দাঁড়ান, আমি এক্ষুনি হারিকেন নিয়ে আসছি। ‘
সাফওয়ান দাঁড়ালো। অপেক্ষা করতে করতে পার হলো প্রায় অনেক্ষন। এক পর্যায়ে কপালে ভাঁজ পড়লো তার। এতো দেরি হওয়ার তো কথা নয়! তাছাড়া এই জায়গাটা গভীর অন্ধকারে ঘেরা। চোখের সামনে হাত এনেও নিজের হাতের অস্তিত্ব খুঁজে পেলো না সে। সাফওয়ান ভাবলো একবার ফিরে গিয়ে দেখা উচিৎ। তাছাড়া সায়েরীকেও একা রেখে এসেছে। অপরিচিত কিছু মানুষের উপর এভাবে নির্ভর করা উচিৎ হয়নি। সে যখন ফিরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো, তখন কানে আসলো কারো ধুপধাপ পদচারণ। মনে হলো দৌঁড়াচ্ছে। সাফওয়ান ভাবলো হয়তো বা ছেলেটা হারিকেন নিয়ে আসছে। সে নিজেও এগিয়ে গেলো দুয়েক কদম। মনে হলো মানুষটা খুব কাছে। তার এলোমেলো দৌঁড়ানোর শব্দ খুব কাছ থেকে বাজছে কানে। অন্ধকারে কারো এভাবে ছুটে চলার মানে খুঁজে পেলো না সাফওয়ান। সে নিঃশব্দে কয়েক কদম এগিয়ে গেলো। হঠাৎ তার প্রশস্ত বুকটার সাথে ধাক্কা লাগলো কারো। মানুষটা সরে আসতে গিয়েও হঠাৎ দুইহাতে ঝাপটে ধরলো সাফওয়ানকে। তার প্রশস্ত বুকে মুখ গুজে কেঁদে উঠলো হু হু করে। থমকে গেলো সাফওয়ান। কান্নার আওয়াজে কেঁপে কেঁপে উঠলো তার সর্বাঙ্গ। অজানা আতংকে বুক ভারী হলো সাফওয়ানের। কম্পায়মান এক হাত রাখলো মানুষটার চুলের ভাঁজে। শীতল কন্ঠে ডাকলো,

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১৬

— সুবহা!!
সাফওয়ানের পিঠ খামচে ধরে ডুকরে উঠলো সায়েরী। তার অশ্রুতে ভিজে উঠেছে সাফওয়ানের বুক। সায়েরীকে একটুখানি শান্ত করার উদ্দেশ্যে একহাত তার পিঠে রেখে জড়িয়ে ধরতেই চমকে উঠলো সাফওয়ান। ধ্ক করে উঠলো বুক! সরাসরি তার হাত পরেছে সায়েরীর পিঠের উন্মুক্ত অংশে। সাথে সাথেই হাত সরিয়ে নিলো সাফওয়ান। ভাবলো, কেনো হলো এমনটা! সায়েরী’র জামা তো এমন ছিলো না। কোথায় গেলো তার শরীরে জড়ানো শুভ্র রঙের উড়নাটা! হঠাৎ কয়েক জোড়া পদচারণের শব্দে কান খাড়া করলো সাফওয়ান। অনুভব করলো তার বুকে মুখ গুজে রাখা সায়েরী কান্নার দমকে কেঁপে কেঁপে উঠছে। সাফওয়ান সতর্ক হলো। সায়েরীর মাথায় ও কোমরে হাত রেখে জড়িয়ে নিলো আরেকটু গভীরে। ধীর কদম ফেললো ঘন অন্ধকারের দিকে।

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১৮