Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ২৩+২৪

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ২৩+২৪

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ২৩+২৪
সাজিয়া জাহান সুবহা

“শুনো মেয়ে! আর কখনো এমন ডার্ক কালার পড়ে, খোলা চুলে বাইরে আসবে না। রোদে মুখ বের করে কখনো টোল পড়া হাসি হাসবে না”
পুরুষালী কন্ঠের ফিসফিসিয়ে বলা বাক্যটুকু কানে বেজে উঠতেই চোখ বুজে ফেললো সায়েরী। ঠোঁট চেপে বালিশে মুখ গুজে দিলো। যতোবারই সাফওয়ানের বলা কথা মনে পড়ছে, ততবারই কান গরম হয়ে উঠছে তার। চোখে ভাসছে মুহূর্তটা। হুট করে কতোটা কাছাকাছি এসে পড়েছিলো সাফওয়ান! নিজের দু’হাতের মাঝে বন্ধি করে নিয়েছিলো অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকা সায়েরী’কে৷ না ছোঁয়েও দাগ বসিয়ে দিলো সায়েরীর কিশোরী মনে। এই যে মেয়েটা এখন ছটফট করছে কথাটা ভেবে। বুঝে উঠতে পারছে না কেনো হঠাৎ এই কথাটা বললো সাফওয়ান ভাই! শুধু এটুকু বুঝতে পারছে, সেই মুহূর্ত থেকে এখনো অবধি ধুকপুক ধুকপুক করে চলছে তার বুকে ভিতরটা। গাল গরম হচ্ছে সেই মুহূর্তে সাফওয়ানের নেশাময় গভীর বাদামি চোখজোড়া মনে পড়তেই।

“সায়ু, উঠ না এবার। ভর সন্ধ্যায় কেউ শুয়ে থাকে?”
তোহার কথাটা কর্ণগোচর হতেই চট করে উঠে বসলো সায়েরী। কিন্তু তার মস্তিষ্কে এখনো আগের কথায় ঘুরছে। বিড়বিড় করে সে আওড়াল,
‘ উনি যে এমন গুড লুকিং হয়ে ঘুরে বেড়ায় সবসময়, আমি কি কিছু বলেছি? এমনিতে তো হুমকি ধামকি দিয়ে বুক কাঁপায়, এখন আবার নতুন টেকনিক নিয়ে এসেছে কাঁপা-কাঁপি’র। উফফ্! একেবারে জ্বালিয়ে খেলো!! ‘
সায়েরীকে এমন বিড়বিড় করতে দেখে ভ্রুঁ কুঁচকালো তোহা। অবাক কন্ঠে বললো,
‘ এমন বিড়বিড় করে কাকে কি বলছিস তুই? ‘

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

সায়েরী মাথা নেড়ে বুঝালো “কিছু না”৷ এরপর হঠাৎ মনে পড়লো সাফওয়ানকে বলা ডাক্তারের কথাগুলো। মোবাইলে সময় দেখলো একবার। তারা ফিরেছে প্রায় ৪ঘন্টা হচ্ছে। এতোক্ষণে নিশ্চয় মেডিসিনের প্রভাব কেটে গিয়েছে সাফওয়ানের। আচ্ছা, বুকে কি খুব ব্যাথা করছে তার! করারই কথা। কতোটা গভীরভাবে কেটেছে৷ একটাবার গিয়ে দেখবে কি! যা হয়েছে সব তার জন্যই তো হয়েছে৷ মানবতা বলেও কিছু আছে তার মধ্যে। একটাবার গিয়ে খোঁজ নেওয়া উচিৎ। ভাবতে ভাবতে বেড থেকে নেমে পড়লো সে। আলগোছে হাত খোপা করে গায়ে উড়না জড়িয়ে নিলো। এরপর নিজের ছোট্ট ফার্স্ট এইড বক্সটা নিয়ে বেড়িয়ে গেলো রুম থেকে৷ পেছন থেকে তোহা ডাকলো কয়েকবার। এদেরকে উত্তর দেওয়া মানে কথার জালে ফেঁসে যাওয়া। তাই পাত্তা দিলো না সে৷

নিস্তব্ধ করিডোর। হওয়ারই কথা। আজ সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি ঘুরাঘুরি করে মাত্র কিছুক্ষণ আগেই ফিরেছে সকলে। এখন বিশ্রাম করছে যার যার রুমে। সাফওয়ান আলাদাভাবে যে রুমটা সায়েরীর জন্য বুকিং করেছিলো সেটা ছেড়ে দিয়েছে সায়েরী। বান্ধবীদের সাথে আগের রুমেই থাকছে সে। সেই রুমটাতে সাফওয়ান এবং মিহাদ থাকবে বলে ঠিক করেছে৷ যেহেতু আর মাত্র একটা দিন, তাই রুম ছাড়লো না। তবে সাফওয়ান আপাতত আগের রুমটাতে আছে। সেই অনুযায়ী রুমটার দিকে এগিয়ে গেলো সায়েরী। কিন্তু দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে মত বদলে গেলো তার। ইচ্ছে করলো না সাফওয়ানের মুখোমুখি হতে। মনে মনে দোয়া করতে লাগলো ভিতরে যেনো সাফওয়ান বাদে অন্যরা থাকে৷ কেউ একজনকে বক্সটা দিতে পারলেই হলো। লম্বা শ্বাস ফেলে নক করলো দরজায়৷ একবার, দুইবার, চারবার..। কয়েক সেকেন্ড কেটে যাওয়ার পরেও সাড়া পেলো না কারো৷ উপায় না পেয়ে দরজা একটুখানি ফাঁক করে উঁকি দিলো ভিতরে। কিন্তু কারো অস্তিত্বের দেখা মিললো না। সায়েরী একবার ভাবলো ফিরে যাবে৷ এভাবে কয়েকজন ছেলের রুমে না বলে ঢুকে পড়াটা দৃষ্টিকটু দেখায়। কিন্তু পরমুহূর্তে ভাবলো এতো ভাবনা চিন্তার কি আছে! বক্সটা রেখেই তো ফিরে আসবে সে!
ভাবনা মতো গুটি গুটি পায়ে ঢুকে পড়লো সে৷ সবেমাত্র বক্সটা টেবিলের উপর রাখছিলো এমন সময় পেছন থেকে ভেসে আসলো পরিচিত কন্ঠস্বর,

‘ তুমি কি করছো এখানে? ‘
আকস্মিক কন্ঠটা শুনে চমকে উঠলো সায়েরী। পিছন ফিরতে গিয়ে হাত ফসকে বক্সটা পড়লো পায়ের উপর৷ ব্যাথায় মৃদু আর্তনাদ করে উঠলো সে। স্থির হয়ে গেলো টেবিলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে। কম্পিত আঁখি তুলে তাকাতেই দেখলো বারান্দার দরজা পেরিয়ে রুমে এসে দাঁড়িয়েছে সাফওয়ান। সিক্ত উন্মুক্ত দেহ৷ কাপড় বলতে পরণে একটা কালো ট্রাউজার মাত্র৷ গলায় ঝুলানো সাদা একখানা তোয়ালে। ভেজা চুলগুলো কপালে লেপ্টে। হাতে ধরে রাখা গ্রে কালারের টি-শার্ট। ছোট ছোট চোখ করে সে তাকিয়ে আছে সায়েরীর দিকে৷ চোখে মুখে ফুটে উঠেছে বিরক্তভাব। সাফওয়ানের উদাম শরীরে চোখ পড়তেই মাথা নিচু করে ফেললো সায়েরী। আটকে যাওয়া কন্ঠে বললো,

‘ স..সরি। আম..আমি আসলে… ‘
তার কথায় পাত্তা না দিয়ে সাফওয়ান বিরক্ত মুখে বললো,
‘ তোমার কি মাথার সাথে সাথে হাতে পায়েও সমস্যা আছে নাকি? নরমাল মানুষের মতো বিহেব করা যায়না?? ‘
ব্যাস! এতোক্ষণের মানবতার সাগরে হাবুডুবু খাওয়া সায়েরী এবার টুস করে পড়লো জমিনে৷ ক্ষুন্ন মনে ফ্লোর থেকে বক্সটা তুলে টাশ করে রাখলো টেবিলের উপর। ক্ষিপ্ত স্বরে বললো,
‘ আপনার হয়তো এটার প্রয়োজন হতে পরে ভেবে নিয়ে এসেছি। নয়তো আমার কোনো ইচ্ছে নেই নিজের খালি মস্তিষ্ক আর অস্বাভাবিক হাত, পা নিয়ে আপনার মতো অতি স্বাভাবিক মানুষকে বিরক্ত করার। ‘
ভ্রুঁ কুঁচকে তাকালো সাফওয়ান। ব্যাঙ্গ করে বললো,

‘ এই ঊনচল্লিশ কেজির শরীর নিয়ে তুমি আমার সাথে ঝগড়া করতে এসেছো? বডি দেখেছো আমার? কানের নিচে একটা পড়লে দুদিন যাবত বেডে পড়ে থাকবে, বেয়াদব মেয়ে! ‘
রাগ বাড়লো সায়েরীর। পেয়েছে কি লোকটা? সবকিছু নিয়ে খোচা মারতেই থাকে৷ ঠোঁট চেপে সে তেড়ে আসলো সাফওয়ানের দিকে৷ যেতে যেতে আঙুল তুলে বললো,
‘ আমার ওজন নিয়ে আপনার কি সমস্যা? আমাকে মোটেও হালকা ভাবে নি……আহহ!!! ‘
আকস্মিক পা ফসকে গেলো তার। ভয়ে চোখ খিচে ফেললো। এই বুজি ধপাস করে পড়লো মুখ থুবড়ে! গেলো গেলো! এই সুইট, কিউটা ফেইসটার ইন্না-লিল্লাহ হয়েই গেলো এবারে৷ কোমর! কোমর ভেঙ্গেছে কি? কিন্তু কই! কিছু ফিল হয়না কেনো! বন্ধ চোখে সে বিড়বিড় করে বলেই ফেললো,

‘ ব্যাথা লাগে না কেনো!! ‘
তখনই কানে আসলো সাফওয়ানের ব্যাঙ্গাত্মক কন্ঠ,
‘ ভালো মানুষি সহ্য হচ্ছে না? ব্যাথা পেতে চাও! ছাড়বো কোমর? ‘
ফট করে চোখ খুললো সায়েরী। দেখা মিললো মুখের কাছাকাছি সাফওয়ানের মুখটার৷ অনুভব করলো সাফওয়ান পুরুষালি হাত তার কোমর পেঁচিয়ে। স্বস্তির শ্বাস ফেললো সে৷ যাক! এই যাত্রায় তার কোমর-টা বেঁচে গেলো। তখনই পেঁচিয়ে রাখা হাত দিয়ে সায়েরীর সরু কোমর খামচে ধরলো সাফওয়ান। ব্যাথা পেলো সায়েরী। ছটফটিয়ে উঠতেই সাফওয়ানের আরেকটু জোর প্রকাশ করে কোমড় খামচে ধরে গম্ভীর কন্ঠে বললো,

‘ ডোন্ট ইউ ডেয়ার নেক্স টাইম। আমার দিকে আঙ্গুল তুলে কথা বলার সাহস আজ অবধি কারো হয়নি। দ্বিতীয়বার এই ভুল করতে দেখলে হাতটাই গুড়িয়ে দেবো। আই রিয়েলি ডোন্ট লাইক ইট! ‘
ছোট ছোট চোখ করে তাকালো সায়েরী। সাফওয়ানের হাত ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লো চট করে। সাফওয়ান ভাবলো সমসময়ের মতো এবারেও তার কথায় চুপসে যাবে সায়েরী। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে সায়েরী ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো,

‘ আই ডোন্ট লাইক ইট…বললেই হলো? নিজের বেলায় হাত গুড়িয়ে দিবেন। আর আপনার কি মনে হয়! আপনার এসব খোচা মারা কথা শুনে আমি খুব লাইকের সাগরে ডুবে মরছি? ‘
সাফওয়ান হতবাক। সায়েরীর চোখে মুখে চাপা রাগ। সাফওয়ান নিজেও দমে যাওয়ার পাত্র নয়। তার উপর আবার কেউ তার দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে কথা বলছে, ব্যাপারটা যথেষ্ট তার মস্তিষ্ক বিগড়ে দেওয়ার জন্য। রাগে কিড়মিড়িয়ে সে বলে উঠলো,

‘ আওয়াজ নামিয়ে কথা বলো বেয়াদব মেয়ে। ভুলে গিয়েছো কার সামনে দাঁড়িয়ে আছো তুমি? ‘
এই পর্যায়ে এসে ভিতরে ভিতরে দমে গেলো সায়েরী। কিন্তু প্রকাশ করলো না। রাগী ভাব ধরে রেখেই পা বাড়ালো দরজার দিকে। ঠিক তখনই সাফওয়ান হেঁচকা টান মেরে নিজের সাথে চেপে ধরলো সায়েরীকে। হাত মুচড়ে ধরলো পিঠের সাথে। ব্যাথায় ছটফটিয়ে উঠলো সায়েরী। কিন্তু সাফওয়ান পাত্তা দিলো না সেদিকে। দাঁতে দাঁত চেপে সে বললো,

‘ তেজ দেখাচ্ছো? সাফওয়ান খান’কে তেজ দেখাচ্ছো! এই মুহূর্তে আমার শক্ত হাত দিয়ে মুচড় মারলেই ভেঙ্গে গুড়িয়ে যাবে তুমি বেয়াদব মেয়ে। খবরদার যদি আর কখনো মুখে মুখে তর্ক করতে আসো বা চোখ রাঙ্গাতে আসো। ‘
সাফওয়ানের হাতের মুঠোয় পিষ্ট হচ্ছে সায়েরীর নরম হাত। ব্যাথায় কুকিয়ে উঠলো সে৷ চোখ ছাপিয়ে জল গড়ালো মুহুর্তেই। কান্না জড়িত কন্ঠে বললো,

‘ ছ..ছাড়ুন! লাগছে আমার!! ‘
সাফওয়ান যেনো শুনেও শুনলো না৷ এতোক্ষণের তেজ গলে কান্নারত, দুর্বল সায়েরী’কে দেখে সে বেশ শান্তি পেলো। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরক করলো সায়েরীর চুপসে যাওয়া মুখ। অনেক্ষন শুয়ে থাকার ফলে মুখে তৈলাক্ত ভাব জমে আছে সায়েরীর। চিকচিক করছে শ্যামবর্ণ মুখশ্রী। ডাগরডাগর চোখের ঘন কালো পাপড়িগুলো কেঁপে কেঁপে উঠছে। লালছে নাকটা ফুসফুস করছে কান্না থামানোর প্রচেষ্টায়৷ ডার্ক মেরুন জামার উপর হলদে শরীরটা জ্বলজ্বল করছে। ছোট ছোট এলোমেলো চুল লেপ্টে আছে ফোলা ফোলা ভেজা গালে। এক পলকের জন্য সাফওয়ানের ইচ্ছে করলো নিজের হাত দিয়ে এই অভদ্র চুলগুলোকে সরিয়ে দিতে। এমন অসভ্যের মতো লেপ্টে থাকার কোনো মানে হয়? পরমুহূর্তে নিজেদের অবস্থা দেখে টনক নড়লো তার। সায়েরীর হাত ছাড়তে ছাড়তে আনমনেই বলে ফেললো,

‘ এই অসহ্য ড্রেসটা এক্ষুণি চেঞ্জ করবে। ‘
ঝটকা মেরে হাত ছাড়িয়ে নিলো সায়েরী। টলমল ক্ষিপ্ত চোখে একপলক সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে৷ যেতে যেতে সাফওয়ানের শেষের কথা মনে করে বিড়বিড় করে বললো,
‘ অসহ্য ড্রেস! এখন আমার জামা-কাপড় নিয়েও তার চুলকানি! খুলবো না আমি জামা৷ শুধু আজ কেনো আগামী দুইদিন ধরে এটা পরেই ঘুরঘুর করবো৷ দেখি মহাশয় চুলকাতে চুলকাতে চর্মরোগের রোগী হয়ে যায় কিনা!! ‘
অন্যদিকে সায়েরীর গমন পথের দিকে ফ্যালফ্যাল করে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলো সাফওয়ান। যেতে যেতে সায়েরী যে লুক দিয়ে গেলো, সেটা দেখেই ভরকে গেছে সে। এই মেয়ের সাহস দিনদিন আকাশ ছোঁয়া হচ্ছে দেখি! পরমুহূর্তে টেবিলের উপর রাখা হরেক রকমের স্টিকার লাগানো ফার্স্ট এইড বক্সটা দেখে একটুখানি দমে গেলো। ক্ষনিক আগে দেখা ওই কান্নারত মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই ফুস করে শ্বাস ফেললো সে৷ নিজ মনেই আওড়ালো,
‘ বয়স এখনো হাটুর তলায়৷ অথচ সাফওয়ান খান’কে এলোমেলো করে দিচ্ছে। অসহ্য মেয়ে! ‘

হোটেলের নিচে বিশাল লনে গোল হয়ে বসে আড্ডার আসর জমিয়েছে স্টুডেন্টস’রা৷ এক জায়গায় কাঠ দিয়ে আগুন ধরিয়েছে। ঠিক তাকে কেন্দ্র করে বসেছে সকলে। প্রত্যেক ইয়ারের স্টুডেন্ট’স ঘাসের উপর একেক জায়গায় ভাগ ভাগ হয়ে বসা। রাত অনেক হয়েছে বলে অর্ধেকের বেশি ছেলে মেয়ে রুমে ফিরে গিয়েছে৷ অনার্স ফাইনাল ইয়ারের অধিকাংশ ছেলে মেয়ে এখনো বসা৷ আড্ডার মাঝে হুট করেই তারা আবদার করে বসলো সাফওয়ানের কন্ঠের গান শুনার৷ কিন্তু সাফওয়ানের শরীর সায় দিলো না৷ উপরে উপরে স্বাভাবিক থাকলেও বুকে টনটনে ব্যাথা হচ্ছে তার৷ সে খুব কৌশলে গানের আবদার তুলে দিলো মিহাদের দিকে৷ না চাইতেও সকলের আবদারে রাজি হয়ে গেলো মিহাদ৷ জিমন আগে থেকেই সাফওয়ানের গিটারটা নামিয়ে রেখেছিলো। সেটা হাতে নিয়ে মিহাদ চোখ তুলে তাকালো ইরা’র দিকে৷ ইরা আগে থেকেই তাকিয়ে ছিলো ।হুট করে চোখাচোখি হওয়ায় বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠলো তার৷ কিন্তু মিহাদ স্বাভাবিকভাবে চোখ সরিয়ে নিলো। গিটারের টুংটাং শব্দে নিরবতা ছেয়ে গেলো চারপাশে। পরক্ষণেই শুনা গেলো মিহাদের কন্ঠ,

Bhula dena mujhe
Hai alvida tujhe
Tujhe jeena hai mere bina
Safar yeh hai tera
Yeh raasta tera
Tujhe jeena hai mere bina

একটু শুনেই বুক ধরফর করে উঠলো ইরা’র৷ ব্যথিত, অবিশ্বাস্য নয়নে সে তাকিয়ে রইলো মিহাদের দিকে। ঠিক সেই মুহুর্তে চোখ খুললো মিহাদ। চোখ রাখলো ইরা’র ছলছল দুই চোখে৷ বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠলো তার। তার নিজের চোখও লাল হয়ে আছে। দৃষ্টি সরিয়ে নিলো সে। জ্বলতে থাকা কাঠ গুলোর দিকে চোখ রেখে আবারো গেয়ে উঠলো,

Ho teri saari shoharaten
Hai yeh dua
Tujhi pe saari rehmaten
Hai yeh dua
Tujhe jeena hai mere bina
Bhula dena mujhe
Hai alvida tujhe
Tujhe jeena hai mere bina…!!

আর শুনতে পারলো না ইরা। কান্না আটকে দ্রুত পায়ে চলে গেলো সেই স্থান ছেড়ে। সে উঠে যেতেই থেমে গেলো মিহাদের কন্ঠ। ফ্যালফ্যাল নয়নে তাকিয়ে রইলো ইরার যাওয়ার পথে। বন্ধুরাও দীর্ঘ শ্বাস ফেললো দুজনের অবস্থা দেখে। কারো মুখে কথার রা নেই। বুঝে উঠতে পারছে ঠিক কাকে দোষ দিবে। মিহাদের কষ্ট না দেখাতেও চোখে পড়ে যাচ্ছে তাদের৷ শুধু একটা কথার জবাব পাচ্ছে না কেউ। এতো কষ্ট সহ্য করেও কেনো মিহাদ ফিরিয়ে নিচ্ছে না তার ইরাবতী’কে? কিসের এই লুকোচুরি তার!!
সকলের এমন নিরবতায় একে একে উঠে গেলো অন্যান্য স্টুডেন্ট’রা৷ সাফওয়ানদের চেয়ে দশ হাত দুরত্বে বসে আছে সায়েরী এবং তার বন্ধু বান্ধব’রা। অনেক আগে থেকেই ইরা এবং মিহাদকে চিনে বলে তাদেরও মন ভাড় হয়ে উঠলো। একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে তারা। বুঝতে পারছে না হলোটা কি!
তপ্ত শ্বাস ফেলে তারাও উঠে দাঁড়ালো ভিতরে যাওয়ার জন্য। তখনই তাদের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠলো মিহাদ। অবাক হওয়ার ভান ধরে বললো,

‘ আরে, পিচ্ছি’রা! তোমরা কোথায় যাচ্ছো? আসো এখানে বসে আড্ডা দেই কিছু সময়। আসো, আসো। ‘
সিনিয়র বলে মুখের উপর না করলো না কেউ। তাছাড়া, এদের সাথে একটু ভালো ভাব তাদের। তাই সাতজন গিয়ে গোল হয়ে বসলো একে একে৷ বসতে গিয়ে সায়েরী লক্ষ্য করলো সাফওয়ানের পাশের জায়গাটুকু-ই শুধু খালি৷ না বসে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো সে৷ অন্যপাশে তোহা ছিলো সে সায়েরীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ইশারায় জিজ্ঞেস করলো, কি হয়েছে?
সায়েরী স্বাভাবিকভাবে জবাব দিলো,

‘ আমি এইখানে বসবো না। তুই এদিকে আয়৷ ‘
তার কথাটা কর্ণগোচর হতেই মোবাইল থেকে চোখ তুলে তাকালো সাফওয়ান। অন্যরাও অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে৷ এইতো আজ সকালেই না সায়েরী সবার সামনে জড়িয়ে ধরেছিলো সাফওয়ান’কে! বিকালে সাফওয়ান তাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছেও গিয়েছিলো। এখন আবার হলো কি দুটোর মাঝে? সকলের অদ্ভুত দৃশ্য উপেক্ষা করে সায়েরী আবারো তোহাকে উদ্দেশ্য করে বললো,
‘ কি হলো আয়! ‘
নড়েচড়ে বসলো তোহা৷ ব্যাক্তিগত ভাবে সে নিজেও বেশ ভয় পায় সাফওয়ান’কে৷ যথা সম্ভব দুরত্ব বজায় রেখেই চলে৷ তাই এখন হঠাৎ পাশাপাশি বসার কথা উঠতেই গা কাঁটা দিয়ে উঠলো তার৷ সাফওয়ান তখনো ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধারালো দৃষ্টিতে সায়েরীর দিকে তাকিয়ে। তার এমন চাহুনি মিহাদের নজরে পড়তেই সে বলে উঠলো,

‘ এই জায়গায় কি সমস্যা সায়েরী? বসো না। ‘
সায়েরী নাছোড়বান্দা হয়ে জবাব দিলো,
‘ নাহ! আমি এখানে বসবো না৷ আমার অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে কিছু মানুষের সস্তা চামড়া জ্বলে উঠে কিনা, তাই! ‘
কথাটা শুনার সাথে সাথে ধপ করে জ্বলে উঠলো সাফওয়ানের চোখ। চোয়াল শক্ত হলো৷ হুট করে দাঁড়িয়ে মুখোমুখি হলো সায়েরীর। আচমকা তার এমন ব্যাবহারে ভয় পেয়ে দুই তিন কদম পিছিয়ে গেলো সায়েরী। সাফওয়ান ক্ষিপ্ত গতিতে এগোতে নিচ্ছিলো এমন সময় পেছন থেকে তাকে টেনে ধরলো মিহাদ। সেই সাথে সাফ্রিন নিজ জায়গা থেকে উঠে দৌড়ে আসলো। সায়েরীকে সরিয়ে দিয়ে অস্থির কন্ঠে বললো,
‘ সায়ু, সায়ু! বসতে হবে না তোর এখানে৷ আমি বসছি। তুই যা প্লিজ, আমার জায়গায় গিয়ে বোস! ‘
অন্যদিকে মিহাদও সাফওয়ানকে বসাতে বসাতে শান্ত গলায় বললো,
‘ ভাই, কাম ডাউন! বাচ্চা মেয়ে সে। সবসময় এমন নাকের আগায় বারুদ নিয়ে ঘুরিস কেনো বলতো৷ বাদ দে৷ শান্ত হয়ে বোস!! ‘

সাফওয়ান বসে পড়লো চুপচাপ। ঠিক তার সামনেই ফায়াজ এবং আয়ানের মাঝখানে সায়েরী৷ সাফওয়ান কয়েক সেকেন্ড চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে রইলো তার দিকে। সায়েরী তাকালো না ভুলেও৷ বুকের ভিতরটা ভয়ে ঢিপঢিপ করছে তার৷ মনে মনে নিজেই নিজেকে বলছে, কি দরকার ছিলো এতো পটর পটর করার? হল তো এবার?
দুজনের এমন ব্যাবহার দেখে নীতি কপাল চাপড়ে বললো,
‘ তোরা কি বলতো? একটা দিনও শান্তিতে কাটানো যায়না নাকি? এই দেখলাম সকাল থেকে বিকাল অবধি এতো ভাব৷ রাত হতে হতে আবারো সাপে নেওলে’র মতো শুরু! ‘
নীতির কথা শুনে হেসে উঠলো বাকিরা। মিহাদ হাসি চেপে বলে উঠলো,

‘ আরে এই দুজনের তো ছোট বেলা থেকেই দেখে আসছি। তখন যদিও ভাবটাই বেশি ছিলো। কিন্তু এখন পুরোটা উল্টো। আসলে তোরা অবুঝ থাকতেই ভালো ছিলি৷ তখন কি সুন্দর, একে অপরকে চোখ হারাতো৷ এখন দেখ, চোখের দেখা দেখলেই যুদ্ধ লেগেই যায়! ‘
মিহাদের কথা শুনে সায়েরী-সহ বাকিরা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে৷ সায়েরী বুঝে উঠতে পারছে না কবে এই দৈত্য দানবটার সাথে গলায় গলায় ভাব ছিলো তার। সাফওয়ান আড়চোখে সায়েরীর হতভম্ব মুখটার দিকে তাকিয়ে চাপা স্বরে বললো,

‘ মিহাদ,চুপ কর! ‘
কথাটা যেনো মিহাদ শুনেও শুনলো না। আগুন জ্বলতে থাকা অংশে আরো একটা শুকনো কাঠ ঢুকিয়ে দিতে দিতে হুট করে বলে উঠলো,
‘ তবে তোমাদের এই ঝগড়া, তর্কাতর্কি এলাউড আছে বুঝলে, সায়েরী! সাফওয়ানের অধিকার আছে তোমার উপর!! ‘
কথাটা শুনা মাত্রই ভরকে গেলো সায়েরী। হতভম্ব মুখে তাকিয়ে রইলো মিহাদের দিকে৷ উপস্থিত অন্যদের অবস্থাও একই৷ প্রশ্ন চোখে তারা মিহাদ এবং সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে। অধিকার আছে মানে কি! সায়েরীর উপর সাফওয়ানের অধিকার থাকবে কিভাবে! সাফওয়ান চোখ তুলে তাকালো সায়েরীর দিকে। মাঝে জ্বলতে থাকা কমলা রঙের আগুন শিখায় জ্বলজ্বল করছে সায়েরীর হলদে মুখ। অবিশ্বাস্য, হতবাক নয়নে সে ফ্যালফ্যাল করে সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে৷ মাথায় ঘুরছে একটাই কথা৷ কীভাবে তার উপর সাফওয়ানের ভাইয়ের অধিকার আছে??

মিহাদের কথা শুনে সকলে যখন গভীর চিন্তায় মগ্ন, তখন সাফওয়ান অস্থির চিত্তে হাসফাস করে উঠলো। চেহারায় খানিকটা বিব্রতবোধ দেখা দিচ্ছে। মনে হলো তার করা কোনো হাস্যকর কান্ড সকলের সামনে উন্মোচন করতে চলেছে মিহাদ। অন্যদিকে সাফওয়ানের মুখের অবস্থা দেখে মিহাদ মিটিমিটি হাসছে। সাফওয়ান চোখের ইশারায় “খেয়ে ফেলবো” টাইপ লুক দিলেও কোনো ভাবান্তর হলোনা মিহাদের। ইশারা’তে সে বুঝিয়ে দিচ্ছে ” কি বন্ধু! জানিয়ে দিই তোমার অল্প বয়সের পাকনামি?” দুজনের এমন চোখাচোখি কথায় বেশ বিরক্ত হলো নীতি। মিহাদকে উদ্দেশ্য করে বললো,

‘ এতো নাটক না করে খোলাসা করে বল যা বলার। অর্ধেক কথা বলে সবাইকে ভাবনায় ফেলে এমন ইশারা ইশারা খেলছিস কেনো? ‘
নড়েচড়ে বসলো মিহাদ৷ ভাবখানা এমন, যেনো গভীর কিছু ঘটিয়েছে সাফওয়ান। মিহাদের কান্ড কালাপ দেখে সাফওয়ান শক্ত চোখে তাকালো। শেষ বারের মতো করে বুঝিয়ে দিলো, “তুই একবার মুখ খোল শুধু, এই মুখ আমি সারাজীবনের জন্য বন্ধ করবো।” সবটা বুঝেও মিহাদ অনড় নিজের সিদ্ধান্তে। সায়েরীর দিকে তাকিয়ে সে বলতে লাগলো,

‘ সায়েরী, তুমি নিশ্চয়ই জানো সাফওয়ান ফ্যামিলি নিয়ে জন্মের পর প্রায় বারো বছর ঢাকাতে ছিলো৷ একদম তোমাদের বাসার সামনের বাসাটায়। মনে আছে? ‘
খানিকটা ভাবুক হলো সায়েরী। ভেবেচিন্তে জবাব দিলো,
‘ মনে তো নেই। তবে আব্বুদের কাছে শুনেছি। ‘
মিহাদ মাথা নেড়ে বললো,

‘ মনে না থাকারই কথা৷ তুমি তখন বেশ ছোট ছিলে তখন আঙ্কেল ( সাফওয়ানের বাবা) ব্যাবসায়ীর সূত্রে পূণরায় সিলেট উনার বাবার বাড়ি ফিরে গিয়েছিলো। সে যায় হোক, আসল কথায় আসি। আমি,আবরার এবং সাফওয়ান কিন্তু একই এলাকায় থাকতাম তখন। সেই সূত্রে একদম বাল্যকালের বন্ধুত্ব আমাদের৷ আর আমার যতোদূর মনে পড়ে…তোমার যখন জন্ম হয়েছিলো তখন আমাদের বয়সের প্রায় সাতের কাছাকাছি। তিন বন্ধুর মধ্যে আবরারের ঘরে ছোট্ট আদুরে বোন হয়ে তুমি যখন আসলে, তখন আমার সাফওয়ানের হিংসে হয়েছিলো বেশ। এর কারণ অবশ্য তোমার বজ্জাত ভাই আবরার৷ তুমি এতোটা আদুরে ছিলে যে আমরা বারবার চাইতাম একটু কোলে তুলতে। কিন্তু ওই বজ্জাত ব্যাটা সবসময় ঝগড়া করতো তোমাকে নিয়ে৷ একেবারে চাইতো না তোমাকে আমরা কোলে নিই। যদিও সুযোগ পেতাম, তখন শর্ত জুড়ে দিতো, খেলায় তাকে আউট করা যাবেনা, স্কুলের পর এই খাওয়াতে হবে সেই খাওয়াতে হবে। আমি অবশ্য বেশি সুযোগ পেতাম না। বাসা কিছুটা দূরে ছিলো বলে। তবে এই ছেলে (সাফওয়ানকে ইশারা করে) সারাটাদিন তোমার মায়ের আশেপাশে ঘুরঘুর করতো। আন্টি অবশ্য না করতো না। আর মজার ব্যাপার কি হলো জানো? ‘

মিহাদ বলতে বলতে হঠাৎ প্রশ্নটা করে সায়েরীর দিকে তাকিয়ে রইলো উত্তরের আশায়। এতোক্ষণ গভীর মনযোগ দিয়ে শুনতে থাকা সায়েরী আচমকা কথা থেমে যাওয়ার উৎসুক নজরে তাকিয়ে রইলো মিহাদের। ঘোরে ডুবে গিয়ে উত্তর দিতেও ভুলে গেলো সে। সাফওয়ানের পাশ থেকে সাফ্রিন কৌতুহলী কন্ঠে জানতে চাইলো,
‘ কি হয়েছিলো? ‘
‘ হয়েছিলে তুমি। ‘
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো সাফ্রিন। অবাক কন্ঠে বললো,
‘ কি? ‘
মিহাদ মাথা নেড়ে বললো,

‘ হুম! যতোদূর মনে আছে সায়েরীর চার কি সাড়ে চার মাস পর তোমার জন্ম হয়েছিলো৷ কিন্তু ততোদিনে সায়েরী মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে হাসতে শিখে গিয়েছে, গালে হাত দিয়ে ড্যাবড্যাব চোখ করে তাকিয়ে থাকতো, আর অদ্ভুত অদ্ভুত শব্দ করতো৷ আর তুমি তখন নিতান্তই কয়েকদিনের শিশু ছিলে৷ তাই সাফওয়ানের টান আগের মতো ছোট্ট পুচকি সায়েরীর দিকেই বেশি ছিলো৷ স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পর থেকে সারাক্ষণ সে সায়েরীর কোলে নিয়ে রাখতো। ঘুমোলে আন্টি’কে বলে আসতো, সায়েরী উঠলেই যেনো তাকে ডাক দেই। এসব নিয়ে আবরারের সে কি রাগ! তারপর সায়েরী একটু হাটতে শিখলো, কথা বলতে শিখলো। তখন অদ্ভুত ভাবে সাফওয়ান ছাড়া কিছু বুঝতেই চাইতো না সে৷ আমার এখনো মনে আছে। ওর বয়স তখন এক বছরের কাছাকাছি প্রায়৷ সায়েরী তখন আদো আদো গলায় আম্মু এবং বাবা ডাকতো। এবং আশ্চর্যজনক ভাবে ওর তৃতীয় বলা শব্দটি ছিলো “সান”। অর্থাৎ সাফওয়ান। পরবর্তীতে যেটা সান ভাই’তে রূপান্তর হয়েছিলো। ‘

হতবিহ্বল হয়ে সায়েরী তাকিয়ে রইলো মিহাদের দিকে৷ “সান ভাই!” সিরিয়াসলি! ড্যাবড্যাব চোখে সে সরাসরি তাকালো সাফওয়ানের দিকে। যে কপালে ভাঁজ ফেলে, ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ফোন স্ক্রল করছে। ভাবখানা এমন যেনো মিহাদের বলা একটা বাক্যও তার কানে যাচ্ছে না। গেলেও সে জানে না সাফওয়ান নামক বান্দা’টা কে। সে চিনেই না এমন কাউকে। অন্যদিকে সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে সায়েরী ভাবতে লাগলো এই রসকষহীন, কাঠখোট্টা ছেলেটাকে সে এত্তো আদর করে সান ভাই ডাকতো! আর এই গম্ভীর মানব কিনা তাকে আদরের দুলালির মতো ট্রিট করতো! সিরিয়াসলি! এটাও শুনার ছিলো এই জীবনে! তার ভাবনার মাঝে মিহাদ আবারো বলে উঠলো,
‘ সেসব কথা নাহয় বাদ দিলাম। সায়েরীর যখন আড়াই কি তিন বছর বয়স, তখন স্কুলে আসা যাওয়ার জন্য আঙ্কেল সাইকেল সাফওয়ানকে। বেশ সুন্দর আর দামী ছিলো সেটা। তখনকার জন্য বলতে গেলে অনেক টাকা। আবরারের বেশ পছন্দ হয়েছিলো সেটা। সে যখনই সাফওয়ানের কাছে সাইকেল ধার চাইতো, এই চতুর ছেলে বিনিময়ে বলতো সে সায়েরীর সাথে খেলবে, তাকে আটকানো যাবে না। আবরার তখন গলে একেবারে পানি পানি হয়ে যেতো।

সাইকেলটা সাফওয়ানের বেশ শখের ছিলো। কাউকে ছুঁতে দিতো না। খুব যত্ন করে রাখতো। কিন্তু হঠাৎ একদিন এই দুই বজ্জাত পোলাপাইন নিজেদের মধ্যে চুক্তি করে বসলো, সাফওয়ান নিজের শখের সাইকেল আবরার কে দিয়ে দিবে। কিন্তু শর্ত একটাই, বিনিময়ে আড়াই বছরের সায়েরীকে সে নিজের কাছে নিয়ে আসবে। সেটাও আবার পারমানেন্টলি। সাইকেলের লোভে আবরার ভাবলো না কিছু৷ রাজি হয়ে গেলো। অন্যদিকে সায়েরীকে নিয়ে সাফওয়ান তখন উধাও। বাসার সকলের সে কি দুশ্চিন্তা। আন্টি’র কাঁদতে কাঁদতে বেহাল অবস্থা তখন। শেষে খবর পাওয়ার পর সাফওয়ানের আম্মু জানালো সায়েরী উনাদের ঘরে। আঙ্কেল আন্টি যখন নিতে আসলো তাকে৷ তখনই বেঁকে বসলো সাফওয়ান। সায়েরীকে রুমে ঢুকিয়ে খেলনা দিয়ে বসিয়ে দরজা আটকে দিয়েছিলো। মানে সে যেতে দিবে না মানে দিবেই না।

এইটুকুন নয় বছরের ছেলে সবার সামনে চেঁচিয়ে বলেছিলো, “সুবহা’কে আমি কিনে নিয়েছি। তার মানে ও আমার কাছে থাকবে!” বাপরে কি তেজ তার! সবাই কতো করে বুঝালো তাকে, কিন্তু সে মানতেই চাচ্ছিলো না। ঘন্টা দুয়েক পার হওয়ার পর যখন খিদে পেটে সায়েরী কান্না করছিলো, সবাই বুঝালো এখন ও বেশ ছোট, ওর দেখাশোনা করার আম্মুকে লাগবে৷ তখন গিয়ে গললো এই ব্যাটা। সায়েরীকে ফিরিয়ে দিতে হয়েছিলো। তবে আবরার কিছু বলতে আসলেই নিজের অধিকারের জ্ঞান ঝারতো৷ সে কি যুদ্ধ চলতো দুজনের বাপরে বাপ!! প্রায় পাঁচ বছর অবধি দেখে যাচ্ছিলাম এসব। এরপর তো সায়েরীর পাঁচ বছর হওয়ার পর ওরা ফিরে গিয়েছিলো সিলেটে। সেদিন সায়েরীর সে কি কান্না! তারা যাওয়ার আবার এসেছিলো বারো বছর পর পার্মানেন্টলি। কিন্তু দেখো, বারো বছরে সব ভুলে বসে আছে। আগে যেমন গলায় গলায় ভাব ছিলো, এখন দেখলেই একে অপরের গলা চেপে ধরার জন্য উঠে পড়ে লাগে!

গভীর মনযোগে মিহাদের কথা শুনতে থাকা সকলে এবার মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো একে অপরের। এর পর আচমকা উচ্চ স্বরে হেসে উঠলো। হাসতে হাসতে ডলে পড়ছে এসে অন্যের গায়ে। চুপচাপ শুধু, সাফওয়ান, সায়েরী এবং ফায়াজ। বাকিরা হাসতে হাসতে পেট চেপে ধরলো। সায়েরী গাল ফুলিয়ে বসে আছে। মিহাদের এতো এতো কথার বিপরীতে সে ঠোঁট উলটে একটা কথায় শুধু বললো,

‘ আমি এতোটা ঠুকনো! ভাইয়া আমাকে সাইকেলের বিনিময়ে বেচে দিতে পারলো! ‘
তার কথায় এবার ফায়াজও হেসে ফেললো। মোবাইল স্ক্রল করতে থাকা সাফওয়ান নাকের নিচে আঙ্গুল ঘষে হাসি আটকালো। নীতি কোনো রকমে পেট চেপে সাফওয়ানের উদ্দেশ্যে বললো,
‘ তুই এতোটা বাচ্চা পাগল আমি তো জানতামই না। ইশশ! কি মিস-টাই না করে দিলাম। ‘
নড়েচড়ে বসলো সাফওয়ান। মোবাইল পকেটে ঢুকিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বললো,
‘ অনেক রাত হয়েছে। এবার সবার ভিতরে যাওয়া উচিৎ। ‘

আর কোন প্রতিউত্তর করলো না কেউ। সাফওয়ান, মিহাদ,রায়ান এবং জিমন বাদে সকলে উঠে গেলো চুপচাপ। আড়চোখে সায়েরীকে একটুখানি পরখ করলো সাফওয়ান। গাল ফুলিয়ে রেখেছে সে। মুখে অমাবস্যা ছেয়ে গিয়েছে যেনো। মনে হচ্ছে সাইকেলের বিনিময়ে সায়েরীকে বেচে মস্ত বড় অন্যায় করে ফেলেছে আবরার। এই অন্যায় ক্ষমার যোগ্য নয় একেবারে। সাফওয়ান মনে মনে কল্পনা করলো, ঠিক এই জায়গায় আবরার থাকলে কি অবস্থা হতো বেচারার। মাথার চুলের আর আস্ত থাকতো না হয়তো!

সবাই চলে যাওয়ার পর আচমকা কিছু বুঝার আগে মিহাদের গর্দান চেপে পিঠে ধরাম করে এক ঘুসি বসিয়ে দিলো সাফওয়ান। ব্যাথায় মাগো, বাবাগো বলে চিল্লিয়ে উঠলো মিহাদ। সাফওয়ান আবারো হাত উঠাতে গেলে দৌড় লাগালো সে অন্যদিকে। শার্টের হাতা গুটিয়ে নিতে নিতে সাফওয়ান পাকড়াও করছে তাকে। কাছাকাছি এসে আবারো ঘাড় চেপে ধরলো মিহাদের৷ একেবারে ঘাসের উপর সেঁটে গেলো মিহাদ। তার গালে লাগাতার দুই, তিনটা থাপ্পড় মারতে সাফওয়ান বলতে লাগলো,
‘ কথা বলার জন্য আর কোন টপিক ছিলো না? এতো জন জুনিয়রের সামনে আমার প্রেজটিজের তেরোটা না বাজালে শান্তি হচ্ছিলো না তোর, তাইনা? ‘
সাফওয়ানের রাগী,বিব্রতকর মুখটা দেখে মিহাদ হেসে কুটিকুটি হচ্ছে। সবে মাত্র ছাড়া পেয়েছে, এমন সময় সে বলে উঠলো,

‘ ইশশ! আরেকটা কথা বলতে তো ভুলেই গিয়েছিলাম। ‘
সাফওয়ান ভ্রুঁ কুঁচকে তাকাতেই সে এক গাল হেসে বলে উঠলো,
‘ তোরা সবসময় বর, বউ খেলতি। উইথ অল ইন্সট্রুমেন্ট’স! ‘
মিহাদের বলতে দেরি। কিন্তু সাফওয়ানের প্রতিক্রিয়া করতে দেরি নেই। ধরাম করে এক লাথি বসিয়ে দিলো সে মিহাদের নিতম্ব’তে। অন্যদিকে রায়ান এবং জিমন হাসতে হাসতে প্রায় ডলে পড়েছে। মিহাদ নিজেও ব্যাথা পাওয়া জায়গায় হাত দিয়ে ডলছে এবং হাসছে। পুণরায় নিজের জায়গায় এসে বসলো সাফওয়ান। জিমনের দিকে হাত বাড়িয়ে দিতেই সে একটা ব্যাগ এগিয়ে দিলো৷ যার ভিতর থেকে বিয়ারের বোতল বের করতে করতে সাফওয়ান বললো,

‘ স্টাফ’কে বলে রেখেছিস? ‘
জিমন মাথা নেড়ে বললো,
‘ হুহ! টাকা দিয়ে রেখেছি৷ আমরা না বলা অবধি গেইট খোলা থাকবে৷ ‘
জ্বলতে থাকা আগুনটুকু নিভিয়ে চারজন গেলো হোটেলের পেছন সাইডে৷ আবারো গোল হয়ে বসে ছোট ছোট চুমুক দিতে লাগলো বোতলের মুখে। মিহাদ বাদে বাকি তিনজন দুয়েক চুমুক দিয়েই বসে রইলো। মিহাদ শূন্য চোখে তাকিয়ে গটগট করে শেষ করে দিলো অর্ধেক বেশি। তার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে বাকিরা। নিজেরটা শেষ করে পাশ থেকে সাফওয়ানের টাও তুলে নিলো সে। একই ভঙ্গিতে শেষ করে ফেললো প্রায় অনেকখানি। ভ্রুঁ কুঁচকে তাকালো সাফওয়ান। আজও বুঝে উঠতে পারলো না বন্ধুর হয়েছে টা কি। আগে ইরা রাগ করবে বলে আড্ডায় বসেও সিগারেট ছুঁয়ে দেখতো না।

অথচ কয়েকমাস যাবত সিগারেট ছাড়া একটা দিনও শেষ করে না সে। আজ আবার নেশা করছে অধৈর্য হয়ে। বিরক্ত নিয়ে মিহাদের হাত থেকে বোতল কেড়ে নিলো সে। তবে ততক্ষনে তিন বোতল সাবাড় করে ফেলেছে মিহাদ। শুধু মাত্র চারটা এনেছিলো চার বন্ধু মিলে একটু এনজয় করবে ভেবে। তাছাড়া এক বোতলে নেশা একেবারে হয়না বললেই চলে। শুধু ফ্যান্টাসির জন্য খাওয়া।কিন্তু পরপর তিন বোতল শেষ করে টালমাটাল অবস্থা মিহাদের। সাফওয়ান ধমকের সুরে তাকে বললো,

‘ অনেক হয়েছে মিহাদ! তোর এসব উশৃংখল চলা ফেরা আমি আর নিতে পারছি না। একটাবার বলে তো দেখ কি সমস্যা হয়েছে। আমি আছি তো নাকি, সমাধান করার জন্য! ‘
তার কথায় আচমকা উন্মাদের মতো হু হা করে হেসে উঠলো মিহাদ। ঘাসের উপর শরীর এলিয়ে দিয়ে বললো,
‘ কি সমাধান করবি? পারবি না। কেউ পারবি না সমাধান করতে। ‘
তারপর আবার বুকের বা পাশটা চেপে ধরলো সে৷ ধরা গলায় বললো,
‘ আমার এখানটা পুড়ে যাচ্ছে, দোস্ত! কষ্ট হচ্ছে৷ ভীষণ কষ্ট হচ্ছে৷ দে, বিয়ারটা দে। এটা দিয়ে মরবে হয়তো এই আগুন পোকা। আমার এই দহন সহ্য হচ্ছে না৷ একদম সহ্য হচ্ছে না। ‘

নেশার ঘোরে কথা জড়িয়ে আসছে মিহাদের। বাকি তিনজন হতভম্ব মুখে তাকিয়ে আছে তার দিকে৷ এতোগুলা বছরের বন্ধুত্বে কখনো মিহাদকে এমন ভেঙ্গে পড়তে দেখে নি তারা। সর্বদা সবার চেয়ে হাসিখুশি থাকতো সে। আজ নেশার ঘোরে বেস্ট ফ্রেন্ড নামক বন্ধুটার এই অবস্থা দেখে সাফওয়ান থমকে গেলো। হাত টেনে বসিয় দিলো মিহাদকে। গালে আলতো চাপড় মেরে বললো,
‘ মিহাদ! তাকা আমার দিকে৷ বল কি হয়েছে তোর? আই প্রমিজ আমি সব ঠিক দিবো। একটাবার বল শুধু। ‘
মিহাদ আবারো হাসলো। নেশার ঘোরে জড়িয়ে যাওয়া কন্ঠে বললো,
‘ বলবো। ইরাবতী’কে বলেবো। সবটা বলবো। ‘
মিহাদের কথা শুনা মাত্রই জিমন চঞ্চল কন্ঠে বললো,

‘ আরে নেশায় আছে যখন বলে দিতে পারে৷ আমাদের না বলে ইরা’কে বললেই হলো। এক কাজ করি, ইরাকে ডেকে আনি। কি বলিস? ‘
ফর্সা হাতের উল্টো পিঠে জড়িয়ে রাখা মোবাইল ওয়াচে সময় দেখে নিলো সাফওয়ান। গম্ভীর কন্ঠে বললো,
‘ রাত প্রায় ১টা বাজে৷ এতো রাতে ইরা’কে ডাকা ঠিক হবে না৷ ‘
তার কথায় সায় জানালো রায়ান৷ পরক্ষনে আবার বললো,
‘ মিহাদ’কে তোর রুমে নিয়ে যায় চল। তারপর ইরাকে বলিস ওর সাথে কথা বলে নিতে। ওদের যা মিটমাট করার করে নিবে৷ ‘

মনে এখনো খচখচানি বিরাজ করলেও রাজি হয়ে গেলো সাফওয়ান। জিমন এবং সে মিলে মিহাদকে ভিতরে নিয়ে গেলো। রায়ান গেল ইরাকে ডেকে আনতে৷ নেশার ঘোরে আবুল তাবুল বকছে মিহাদ। মুখটা থেমে নেই একেবারেই। রুমের কাছাকাছি আসতেই ইরাও এসে হাজির হলো। কান্না করে চোখ, মুখ ফুলিয়ে রেখেছে সে। টলমল চোখে মিহাদের অবস্থা দেখে অভিমান গাঢ় হলো। মিহাদকে জিমনের সাপোর্টে রেখে ইরার দিকে এগিয়ে গেলো সাফওয়ান। ইরার কান্নারত ফ্যাকাসে মুখটার দিকে তাকিয়ে আলতো হাতে একপাশ থেকে জড়িয়ে ধরে বললো,
‘ ইডিয়ট-টা নেশা করে হুশে নেই একেবারে৷ তবুও তোর নাম নিয়ে যাচ্ছে বারবার। ট্রাই করে দেখ কিছু জানতে পারিস কিনা। ‘
মাথা নেড়ে সায় জানালো ইরা। মিহাদকে রেখে যেতে যেতে সে আবারো ইরার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, – টেক ইউর টাইম।

তিনজন বেরিয়ে পড়তেই দরজা বন্ধ করে দিলো জিমন। তারপর পা বাড়ালো নিজেদের রুমের উদ্দেশ্যে। মিহাদ নিভু নিভু চোখে, টলমল শরীরে দাঁড়িয়ে। তার দিকে একপলক তাকিয়ে দরজা লক করে দিলো ইরা৷ চোখ মুখ শক্ত করে মনে মনে বললো আজ একটা এসপার উসপার করেই ছাড়বে সে। মিহাদ ইরার দিকে এক কদম এগোতে গিয়ে হঠাৎ ঢলে পড়ে ইরার গায়ে৷ ইরা হকচকিয়ে গেলেও সামলে নিলো। নেশার ঘোরেও মিহাদ অনুভব করে তার ব্যাক্তিগত মানুষটার নরম দেহের উষ্ণ ছোঁয়া। দুহাতে মেয়েটার কোমর জড়িয়ে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো সে। ঘাড়ে মুখ গুজে মৃদু কন্ঠে ডাকলো, – ইরাবতী!
এতোগুলা মাস পর প্রিয় মানুষটার প্রেমময়ী স্পর্শে কেঁপে উঠলো ইরা’র দেহ, মন। চোখ বুজে আসলো আপনা আপনি। গাল বেয়ে একফোটা অশ্রু গড়ালো৷ কম্পিত হাত দিতে আকড়ে ধরলো মিহাদের শার্ট৷ ধরা গলায় বললো,
‘ তুমি আমাকে বলেছিলে তুমি সিগারেট ছেড়ে দিয়েছো। অথচ এখন ড্রিংক করাও শুরু করে দিয়েছো। এতোটা অধ:পতন হয়েছে! ‘

ঘাড়ে মুখ গুজে রাখা একটুখানি হাসলো। হাতের বাঁধন আরেকটু দৃঢ় করে জড়িয়ে আসা কন্ঠে বললো,
‘ ছেড়ে দেওয়ার কথা তো তোমাকেও ছিলো না৷ তবুও ছাড়তে হয়েছে তো। এখন এসবই একাকীত্বের সঙ্গী। ‘
কথাটা শুনে মিহাদের বুকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে চাইলো ইরা। কিন্তু সম্ভব হলো না। মিহাদের সম্পূর্ণ শরীরের ভার তার উপর। ইরা অভিমানী কন্ঠে বললো,
‘ আমি তো বলিনি ছাড়তে। বারবার রিকুয়েস্ট করেছিলাম। তবুও কেনো ছেড়ে দিয়েছিলে? উত্তর দাও মিহাদ। আজ আমার উত্তর চাই৷ ‘

ইরার ধাক্কাধাক্কি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে মিহাদ পূণরায় মুখ গুজলো ঘাড়ে। একহাতে ঘাড়ের চুল সরিয়ে উত্তপ্ত ঠোঁট ছোঁয়ে দিলো কানের নিচে। কেঁপে উঠলো ইরা। সরে আসতে গিয়েও বাধা পড়লো মিহাদের পুরুষালি হাতের বন্ধনে। কাধে ঠোঁট ছুঁইয়ে মিহাদ ব্যাকুল কন্ঠে বললো,
‘ আজ দূরে সরিয়ে দিয়ো না৷ প্লিজ ইরাবতী! ‘
মিহাদের লালচে ছলছল চোখজোড়ার দিকে তাকিয়ে চোখ ছাপিয়ে জল গড়ালো ইরার৷ তা দেখেই অস্থির হলো মিহাদের প্রেমিক হৃদয়। হাত বাড়িয়ে গাল মুছে দিলো। কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে বললো,
‘ ডোন্ট ক্রাই, জান! তোমার চোখের জল আমার সহ্য হয়না। ‘

অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নিলো ইরা। শক্ত হাতে সরিতে দিতে চাইলো মিহাদের শক্তপোক্ত শরীর। কিন্তু ব্যার্থ হলো সে। দু’হাতে তার হাতজোড়া চেপে কপালে কপাল টেকাল মিহাদ। অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে তাকালো। যে দৃষ্টি বড্ড নেশাময় টেকল ইরার কাছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হলো তার। ধরফর করে উঠলো বুক। কম্পিত ঠোঁট নেড়ে আটকে যাওয়া গলায় ডাকলো, ‘ ম..মিহাদ!! ‘

ডাকটা শুনলো কিনা বোঝা গেলোনা। তবে মিহাদের বাদামি অধর ঘোরের মধ্যেই এগিয়ে এলো ইরার লালছে অধরজোড়ার কাছাকাছি। নড়তে গিয়েও ব্যার্থ হলো ইরা। চোখ বুজে নিতেই অনুভব করলো নিজের অধরে মিহাদের অধরের উত্তপ্ত স্পর্শ। ক্ষণে ক্ষণে সে স্পর্শ তীব্র হলো। বেহুশে ওষ্ঠ সুধা পান করতে করতে ইরার কটিদেশ বেঁধে ফেললো মিহাদ। আবেশে তার বাহু খামচে ধরলো ইরা। অনুভূতি তুঙ্গে উঠলো মিহাদের। নিমেষে উষ্ণ ছোঁয়াগুলো নেমে এলো গলায়, ঘাড়ে। কাঁপা-কাঁপি’তে টালমাটাল অবস্থা ইরা’র। আচমকা কানের লতিতে ব্যাথা অনুভব করতেই ঘোর কাটলো তার। ধ্ব্ক করে উঠলো বুকের ভিতরটা। কি করছে সে! মিহাদ নাহয় নেশার ঘোরে আছে। কিন্তু সে তো সজ্ঞানেই আছে। কেনো বাধা দিচ্ছে না তবে! কামিজের ফাঁক গলিয়ে উন্মুক্ত পেটে মিহাদের হাতের ছোঁয়া পেতেই টনক নড়লো তার৷ ছিটকে সরে আসতে চাইলো। কিন্তু ব্যার্থ হলো মিহাদের পুরুষালি হাতের শক্তির কাছে৷ ছটফটিয়ে উঠলো সে৷ হতদন্ত হয়ে ডাকলো,

‘ ম.. মিহাদ! মিহাদ স্টপ ইট। প্লিজ মিহাদ ঘোরার মাঝে এমন কিছু করিস না যার জন্য পরে তোকে পস্তাতে হয়! ‘
ইরার কথায় মিহাদ কি বুঝলো কে জানে৷ নিভু নিভু চোখ মেলে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো ইরার দিকে৷ এরপর অদ্ভুত কন্ঠে বললো,
‘ তুমিও দূরে সরিয়ে দিচ্ছো, ইরাবতী! চলেই তো যাবো। এখন একটু কাছে থাকি? একটুখানি থাকবো প্লিজ! ‘
দুহাতের মাঝে তার মুখটা নিয়ে ইরা বুঝানোর স্বরে বললো,
‘ আমি দূরে সরিয়ে দিচ্ছি না মিহাদ। না তোকে যেতে দিবো। আমরা সারাজীবন একসাথে থাকবো। যেমনটা দুজন মিলে ভেবে রেখেছিলাম, তেমন করেই থাকবো। ‘
গালে রাখা হাতজোড়া আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরলো মিহাদ। ধরা গলায় বললো,

‘ আমিও থাকতে চাই, ইরা। সারাজীবন থাকতে চাই। কিন্তু… ‘
ভ্রুঁ কুঁচকালো ইরা। বললো,
‘ কিন্তু? কিন্তু কি? ‘
ইরার একহাত বুকের বাম পাশে চেপে ধরে মিহাদ বললো,
‘ জানি না কি। কিন্তু.. এইযে দেখো! এখানে ভীষণ পুড়ছে ইরাবতী। প্রতিনিয়ত তোমার শূন্যতা জ্বালিয়ে দিচ্ছে আমাকে। ‘
এরপর পূণরায় ইরাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
‘ আই নিড ইউ ইরা! এসব থেকে একটু শান্তি চাই আমি। তোমার সঙ্গ চাই। আই ব্যাডলি নিড ইউ, জান! প্লিজ ডোন্ট টেল মি টু গো অ্যাওয়ে! ‘

শেষের কথাটুকু জড়িয়ে গেলো। কন্ঠ বুজে আসলো মিহাদের। কিন্তু ইরা বুঝে নিলো সবটা। বুঝতে পারলো তার প্রেমিক পুরুষটা ভালো নেই। একেবারেই ভালো নেই। কানের নিচে ছোট ছোট উষ্ণ ছোঁয়ায় রাঙিয়ে তুলতে মিহাদ। ইরা’র হঠাৎ কি জানি কি হলো। মস্তিষ্ক ভুলে গেলো সব যুক্তি। বিবেক হার মানলো মন পিঞ্জিরায় জমানো চারবছরের ভালোবাসার কাছে। দুহাতে মিহাদকে কাছে টেনে নিলো সে। মন বলছে, মিহাদকে আটকে জন্য এটাই যদি শেষ রাস্তা হয়,তবে তাই হোক!
ইরা’র সান্নিধ্য পেয়ে আরো বেসামাল হয়ে উঠলো মিহাদ। স্পর্শের তীব্রতা বাড়লো। ইরার ওষ্ঠজুগলে নিজের ওষ্ঠ ছুঁইয়ে নেশাময় কন্ঠে বললো,

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ২১+২২

‘ ইরাবতী! ভালোবাসি। ভীষণ ভালোবাসি! ‘
জবাব দিলো না ইরা। ঘনঘন শ্বাস ফেলে চোখ বুজে দুহাতে জড়িয়ে নিলো শরীরে সাথে লেপ্টে থাকা ভারিক্কি শরীরটা। নিজেও এগোলো একধাপ। কিছু আর্তনাদ এবং সীমাহীন ভালোলাগা নিয়ে বাড়লো সম্পর্কের গভীরতা৷ তবে পূর্ণতা কি মিললো আদো? মিলিত হলো ঠিক, কিন্তু মিলন কি লিখা রয়েছে ভাগ্যে?

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ২৫+২৬