অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ২৭+২৮
সাজিয়া জাহান সুবহা
ভোর সাড়ে পাঁচটা। ঘরের বাইরে থেকে ভেসে আসা চেঁচামেচি’র আওয়াজে ঘুম ছুটে গেলো বছর সাত একের বাচ্চা ছেলেটার৷ ঘুম ঘুম মস্তিষ্কে এমন চেঁচামেচি শুনে তড়াক করে উঠে বসলো সে৷ গুটি গুটি পায়ে জানলার কাছে এসে দাড়ালো৷ পায়ের পাতা উঁচু করে সম্মুখের বাসাটার দিকে নজর দিয়েই চোখ বড় বড় হয়ে গেলো তার৷ সমবয়সী বন্ধুর ছোট চাচি প্রসব যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। তাকে ঘিরে বাড়ির সকলের হইচই চলছে। বাচ্চা ছেলেটা বুঝে উঠতে পারলো না ঠিক কি হচ্ছে৷ তবে একরাশ কৌতুহল ধরা দিলো মনে। নিমিষেই সপরিবার দুটো সি এন জি করে বেরিয়ে পড়লো হসপিটালের উদ্দেশ্যে।
জানলা দিয়ে উঁকি দেওয়া ছেলেটার টনক নড়লো যেনো। দ্রুত ফ্রেশ হয়ে, ছুটে বেরিয়ে গেলো সে রুম থেকে৷ ইতোমধ্যে তার বাবা, মাও ঘুম ছেড়ে উঠে পড়েছে। ছেলেটা সোজা বাবার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। জেদ ধরলো, বন্ধুর ফ্যামিলি যেখানে গিয়েছে, সেও সেখানে যাবে৷ সকাল সকাল ছেলের এমন জেদ দেখে বাবা ভীষণ বিরক্ত হলেন। অনেক বলে কয়েও ছেলেকে দমাতে পারলেন না তিনি। শেষে বাচ্চাটার জেদের কাছে হার মেনে তার চাচা বাইকে চড়িয়ে ছুটলো হসপিটালের উদ্দেশ্যে। খোঁজ নিয়ে দুজন গেলো অপারেশন থিয়েটারের সামনে। সেখানেই উপস্থিত পেশেন্টের পরিবার। করিডোরে রাখা চেয়ারে বসা সাত বছরের অন্য একটি ছেলে এবং পাশে তার দাদাভাই। বন্ধুকে দেখে অন্য ছেলেটা যখন চাচার হাত ছেড়ে ছুটে আসলো, ঠিক সেই মুহূর্তে অপারেশন থিয়েটার হতে বেরিয়ে আসলো নার্স৷ হাতে সাদা তোয়ালে দ্বারা জড়ানো সদ্য জন্মানো ছোট্ট দেহটি আগলে রাখা। ডাক্তারের সাথে যখন বড়রা কথা বলতে ব্যাস্ত তখনই নার্স সবার আগে বেঞ্চে বসা দাদা ভাইয়ের কোলে তুলে দিলো সদ্য জন্ম নেওয়া মেয়েলি শরীর-টা।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
পাশে বসা ছেলেটা খুশিতে “আমার বোন, আমার বোন” বলে লাফাচ্ছে। অন্য ছেলেটা তখনো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে। বেঞ্চে বসা দাদা ভাইয়ের কোলে ছোট্ট পুতুলের মতো একটি শরীর। জানালার কাঁচ ভেদ করে সকালের মিষ্টি হলদে রোদ এসে পড়ছে তার মুখে৷ যার ফলে অত্যাদিক সাদা দেখাচ্ছে তাকে। গাল, ঠোঁট টকটকে লাল। একেবারে ইঁদুর ছানার মতো ছোট্ট হাত, চিকন চিকন আঙ্গুল। পিটপিট করে চোখ খোলার চেষ্টায় সে। নাতনিকে কোলে নিয়ে খুশিতে দাদা ভাইয়ের চোখ জ্বলজ্বল করছে৷ বিড়বিড় করে দোয়া পড়ে তিনি ফু দিলেন নাতনির শরীরে। প্রশস্ত হেসে নাতনির গালে নাক ডুবিয়ে বললেন ” আমার সুবহা রাণী! ”
সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা যেনো উৎসাহ পেলো বেশ। এতোক্ষণ যাবত দেখতে থাকা ছোট্ট আদুরে মেয়েটার লালছে নরম গালে টুকুশ করে চুমু খেলো সে৷ দাদা ভাইয়ের মতো করেই বললো, ” আমার সুবহা রাণী! ” তার এমন কান্ডে হেসে ফেললো সকলে। দাদা ভাই রসিকতার ভঙ্গিতে বললেন,
‘ একি সান দাদুভাই! তুমি আমার নাতনির প্রথম চুমুটা এভাবে চুরি করে নিলে? এ তো ভারী অন্যায়! ‘
আবারো হেসে উঠলো সকলে। শুরু হলো বাচ্চাটাকে নিয়ে একেক জনের কাড়াকাড়ি। একবার বাবা কোলে নিচ্ছে, একবার চাচা তো একবার বড় মা। ছোট্ট সাত বছরের ভাইটাও লাফাচ্ছে কোলে তুলার জন্য। অন্য ছেলেটা তখন দাদা ভাইয়ের কাছে আদুরে কন্ঠে জানতে চাইলো,
‘ বাবুকে তুমি সুবহা রাণী কেনো বলেছো দাদু? সবাই তো বাবু বলছে? ‘
তার এমন কথায় দাদা ভাই হেসে ফেললেন। হাত টেনে কাছে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
‘ ওটা বাবুর নাম রেখেছি গো দাদু ভাই৷ এই দেখো ভোর সকালে পৃথিবী আলোকিত করে এসেছে আমার ছোট্ট দিদি ভাই। এজন্য নাম রেখেছি সুবহা। মানে হচ্ছে ভোর, সকাল। বুঝেছো এবার? ‘
ছেলেটা মাথা নাড়ালো৷ অর্থাৎ বুঝেছে৷ দাদা ভাইয়ের সাপোর্টে সে নিজের ছোট ছোট হাতে কোলে তুললো ছোট্ট মেয়েটাকে। মেয়েটা পিটপিট চোখ মেলে তাকালো সেই মুহূর্তে। লম্বা পাপড়ি যুক্ত ডাগর ডাগর চোখজোড়া দেখে ছেলেটা খুশিতে বাক-বাকুম তখন৷ উৎসাহ নিয়ে দাদা ভাইকে বলছে, ” দেখো দেখো! বাবু আমাকে দেখছে। ”
তার কন্ঠটা শুনে আচমকা কেঁপে উঠে চিকন সুরে কেঁদে উঠলো বাচ্চাটি। ইতোমধ্যে বাচ্চাটার নানা বাড়ির লোকজনও হাজির। কান্নার আওয়াজ শুনেই নানু এসে দ্রুত কোল তুলে নিলো তাকে। একটু দোল দিতেই আবারো শান্ত হয়ে পড়লো সে৷ অন্যদিকে শূন্য হাতে বাচ্চা ছেলেটা ভার মুখে দাঁড়িয়ে। মনে মনে বেশ রাগ হলো তার৷ কই অন্য কারো কোলে তো কাঁদলো না।
তার কোলেই কেনো কাঁদতে হলো! সে আদর করেই তো নিয়েছে। ব্যাথা তো দেইনি।
সে যখন গভীর ভাবনায় বিভোর, তখন হঠাৎ চোখে মুখে পানির ছটা এসে পড়তেই মুখ কুঁচকে ফেললো। পিটপিট করে বাদামি চোখজোড়া মেলে তাকাতেই আচমকা চোখ আটকে গেলো সামনের দৃশ্যটুকু দেখে৷ শুভ্র রঙের সিল্কের শাড়ি গায়ে একজন মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে রুমের জানালার কাছে। যার মুখের একপাশ দেখা যাচ্ছে শুধু। কোমড় বেয়ে নেমেছে অবধি লম্বা ভেজা চুল। হাত দিয়ে বারে বারে নেড়ে দিচ্ছে চুলগুলো। রিনি রিনি চুড়ির শব্দে মুখরিত চারপাশ। জানলার সাদা পর্দা আরেকটু মেলে দিয়ে সে পিঠ থেকে সব চুল সরিয়ে ডান কাধে রাখলো৷ ফলস্বরূপ দূর থেকেই দেখা মিললো উন্মুক্ত বাম ঘাড়ের মাঝামাঝি স্থানে লাল,কালো তিল দুটো। দূর থেকেই তীব্র ভাবে আকর্ষণ সেগুলো। ঘুমু ঘুমু চোখে ছেলেটা মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে রইলো সেদিকে। ছিমছাম, মেয়েলি গড়ন। দৃশ্যমান হয়ে আছে শাড়ির আড়ালে ভেজা পিঠ, সরু কোমড়৷ হুট করে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছন ফিরে তাকালো মেয়েটি। মুখটা দৃশ্যমান হওয়ার আগেই তড়াক করে ঘুম থেকে উঠে বসলো সাফওয়ান। চুল,মুখ বেয়ে পানি গাড়িয়ে পড়ছে তার। নিজের দিকে তাকিয়ে ভারী অবাক হলো সে। সামনেই দেখলো পানির গ্লাস হাতে তার মা তাহুরা খান দাঁড়িয়ে। সাফওয়ানকে উঠতে দেখে তিনি গ্লাস রেখে দ্রুত বেডে এসে বসলেন৷ সাফওয়ানের ভেজা চুলে হাত বুলিয়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে বললেন,
‘ আব্বা, কি হয়েছে! ঘুমের মধ্যের এমন ছটফট করছিলে কেনো? এতোবার ডেকেছি আমি৷ শরীর খারাপ করেছে নাকি? ‘
স্তম্ভিত সাফওয়ানের কানে একটা কথাও যেনো ঢুকল না৷ আশ্চর্য চিত্তে সে ভেবে চলছে একটু আগের দেখা স্বপ্ন দুটোর কথা। স্বপ্নের মধ্যে স্বপ্ন! এ কেমন কথা। এসব কি দেখলো! প্রথমত সতেরো বছর আগের ঘটনাটা। হুট করে পুণরায় এই ঘটনা স্বপ্নরূপে দেখার মানে টা কি? পরবর্তীতে তার রুমের জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা। কে ছিলো সেটা? সে স্পষ্ট দেখেছে রুমটা তারই। শুধু মেয়েটা ছিলো অচেনা। নিজের ২৪ বছরের যৌবনে এই প্রথম কোনো মেয়ের স্বপ্ন দেখলো সে। মস্তিষ্ক ফাঁকা ফাঁকা ঠেকছে তার। নিজের কাছে নিজেকেই কেমন অচেনা লাগছে। আজকাল হচ্ছে কি তার সাথে! বিরক্তি-তে দু’হাতে চুল খামচে ধরে মাথা ঝুকিয়ে বসে রইলো সে। সাফওয়ানের এমন আচরণ দেখে তাহুরা খান ব্যতিব্যস্ত হতে পড়লেন। একটামাত্র ছেলে উনার৷ সামান্য জ্বর, ঠান্ডা লাগলেই উনার বুক ধরফরিয়ে উঠে। আর আজকে তো ছেলের হাবভাবে অস্থিরতায় ছটফটিয়ে উঠছে তার মাতৃ হৃদয়। প্রথমত তার ছেলে এমন বেলা করে ঘুমাই না কখনো। এজন্যই ডাকতে এসেছিলেন তিনি। কয়েকবার ডাকার পরেও সাফওয়ানের সাড়া পেলেন না, তারউপর ঘুমের ঘোরে কেমন ছটফট করছিলো সে। তাহুরা খান এবার সত্যিই বেশ ভয় পেলেন। ছেলের হলো কি! এমন উদ্ভট আচরণ করছে কেনো? উদ্বিগ্ন কন্ঠে তিনি আবারো বললেন,
‘ আব্বা, শরীর খারাপ লাগছে বেশি! ডাক্তার আসতে বলবো? ‘
এতোক্ষণে যেনো মায়ের উপস্থিতি ঠের পেলো সাফওয়ান। এলোমেলো চুলগুলো ব্যাক ব্রাশ করে ঝটপট বেড থেকে নেমে দাঁড়ালো। টি-শার্ট টেনেটুনে ঠিক করে তাকালো মায়ের চিন্তাগ্রস্ত মুখখানার দিকে। মুচকি হেসে মাথা ঝুকিয়ে চুমু খেলো মায়ের চুলের ভাঁজে। আশ্বস্ত গলায় বললো,
‘ কাউকে ডাকতে হবে না আম্মু। একদম ঠিক আছি আমি। ‘
এরপর কাবার্ড থেকে প্রয়োজনীয় কাপড় বের করে ওয়াশরুমে ঢুকতে ঢুকতে বললো,
‘ কাউকে বলে এক কাপ কফি পাঠাও রুমে। কড়া করে বানাতে বলবে। ‘
বিছানা গুছিয়ে তাহুরা খান নিজেই ছুটলেন কফি বানানোর উদ্দেশ্যে। উনার যা চুজি ছেলে, কোনো কিছু একটু এদিক সেদিক হলেই সারাটাদিন বোম হয়ে থাকবে৷ আজ আবার কড়া কফি বানাতে বলেছে মানে কড়া কফি-ই লাগবে৷ বিড়বিড় করে কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে রুম ত্যাগ করলেন তিনি। মনে মনে ভাবলেন, তার মতো শান্তশিষ্ট মানুষটার কপালেই জুটতে হলো এমন আগুনের গোলার মতো স্বামী – সন্তান!
বেলা সাড়ে এগারোটা কি তার একটু বেশি৷ গত রাতে বৃষ্টি হওয়ায় আজ প্রকৃতি খুব স্নিগ্ধ। ঘরের সামনের ছোট্ট উঠোনে ব্যাট, বল হাতে দাঁড়িয়ে সায়েরী। তার পরণে বড় সাইজের একটা জার্সি। সাথে কালো জিন্স। জার্সির সাইজ দেখেই বুঝা যাচ্ছে এটা তার নয়। লম্বা চুলগুলো বরাবরের মতোই খোঁপায় আটকানো। হাতের ব্যাট খানা সামনে উপস্থিত ৯বছরের মিনহা’র হাতে তুলে দিয়ে সে প্যান্টের মধ্যে জার্সিটা গুজে দিলো। সব ঠিকঠাক করে বেশ ভাব নিয়ে দাঁড়ালো খেলার উদ্দেশ্যে। ঘরের ভিতর থেকে সায়েরীর মা চেঁচাচ্ছে তাকে উদ্দেশ্য করে। সায়েরী বিরক্ত হলো বেশ৷ আজ বাসায় এলাহি আয়োজন। মনে হচ্ছে জামাই আপ্যায়ন করবে তারা। এগারোটায় ঘুম থেকে উঠে এসব দেখে চোখ কপালে উঠেছে তার। বারকয়েক মা’কে জিজ্ঞেস করেও উত্তর মিললো না কোন। তিনি মুখখানা গম্ভীর করে ঠাশ ঠাশ আওয়াজ করে কাজে ব্যাস্ত। কারণটাও সায়েরী। এই অবধি হাজারবার ডেকেছে তাকে। কিন্তু নবাবজাদি উঠেছে ঠিক ঠিক এগারোটা বাজে। তারউপর খাওয়া দাওয়া না করেই বেরিয়ে গেছে বাইরে। রাগ হওয়াটাই স্বাভাবিক। সায়েরী সেদিকে পাত্তা না দিয়ে খেলার প্রস্তুতি নিলো। তখনই হাজির হলো মিনহার সম-বয়সী দুই ছেলে মেয়ে। রিনি এবং দীপ্ত। হৈচৈ করে প্রথম কয়েক রাউন্ড শেষ তাদের৷ এক পর্যায়ে দীপ্ত ভার মুখে বললো,
‘ এটা কিন্তু ঠিক না সায়েরী আপু৷ তুমি চিটিং করছো। ‘
মিনহা, রিনি এবং দীপ্তও সায় জানালো তার কথায়। ঠিক সেই মুহূর্তে দোতলার বারান্দায় এসে দাড়ালো আবরার৷ আওয়াজ শুনে নিচে তাকিয়ে সায়েরীকে দেখে বড্ড বিরক্ত হলো সে। গলা উঁচু করে বললো,
‘ সায়ু! তুই আবারো আমার জার্সি চুরি করেছিস? তোর এই স্বভাবটা কবে যাবে বল তো? ‘
উত্তরে দাঁত কেলিয়ে হাসলো সায়েরী। জার্সিটা কাধের দিকে একটু হেলে দিয়ে ভাব নিয়ে বললো,
‘ আউট-ফিট ম্যাচিং না হলে খেলায় ফিল আসে না ভাইয়া৷ বিনিময়ে তুমি চাইলে আমার একটা গাউন পরে ঘুরতে পারো৷ আমি মাইন্ড করবো না। ‘
তার এমন কথা শুনে উচ্চস্বরে হেসে উঠলো বাকি তিনজন। আবরার কিছু বলতে না পেরে আবারো রুমে চলে গেলো৷ বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে সায়েরী মেকি হেসে বললো,
‘ এই শেষ বার৷ এবারে আউট করতে পারলে ব্যাট তোদের দিয়ে দিবো পাক্কা৷ এবার নো চিটিং।
কথামতো বল ছুড়লো দীপ্ত৷ সায়েরীর ধরে রাখা ব্যাট ছুঁয়ে বল উড়ে গেলো বাউন্ডারির বাইরে। ঝনঝন করে কাঁচ ভাঙ্গার শব্দ কানে এলো। বাচ্চা তিনজনের মাথায় হাত৷ সায়েরী নিজেও ভয় পেয়ে গেলো। মাত্রই বাইকের আওয়াজ পেয়েছিলো তারা৷ পরপরই কাঁচ ভাঙ্গার শব্দ। সায়েরী মনে মনে ভাবলো আজ আর তার রক্ষে নেই। হাতের ব্যাট ফেলে সে দ্রুত গেইটের দিকে ছুটলো। গেইট খুলে বেরুবে এমন সময় অন্যপাশ থেকে বিদ্যুৎ গতিতে ভিতরে ঢুকলো কেউ৷ আকস্মিক ধাক্কায় তাল সামলাতে না পেরে সায়েরী ঝাপটে ধরলো মানুষটার কলার। আচমকা এমন হেচকা টানে মানুষটাও তাল সামলাতে পারলোনা। ফলস্বরূপ দুজনের স্থান হলো কাঁদা মাটিতে। শরীরের উপর এতো ভারী একজন এসে পড়তেই সায়েরীর মনে হলো তার হাড়গোড় সব ভেঙ্গে গুড়িয়ে গেছে। চোখ মুখ খিচে সে ঝাঁজালো কন্ঠে বললো,
‘ আহ!! কোন হাতিরে? উফফ আল্লাহ এমন ভারী শরীর কারো হয়! খাবার খায় না লোহা….
বাকি কথাটুকু শেষ করার আগেই সায়েরীর মাথার একপাশ থেকে মুখ তুললো সাফওয়ান। তার তীক্ষ্ণ ধারালো দৃষ্টি বুকের নিচে লেপ্টে থাকা সায়েরীর অবাক মুখশ্রী’তে৷ আকস্মিক সাফওয়ানকে দেখে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো সায়েরী। আমতাআমতা করে একটুখানি হাসার চেষ্টা করে বললো,
‘ বড় ভাই! আ..আপনি! সরি হ্যাঁ.. ওটা হাতি হবে না। ভুলে বলে ফেলেছি। গালতি সে মিসটেক! ‘
আগের চেয়েও দ্বিগুণ শক্ত হলো সাফওয়ানের চোয়াল। চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,
‘ কানের নিচে দুটো পড়লে কোনটা হাতি কোনটা মিসটেক সব বেরিয়ে যাবে অসহ্য মেয়ে৷ উঠো মাটি থেকে! ‘
শেষের কথাটা অনেকটা ধমকের সুরে বললো সাফওয়ান। যা শুনে কেঁপে উঠলো সায়েরী। মিনমিন কন্ঠে বললো,
‘ উঠবো কীভাবে? আমার উপর তো আপনি… ‘
ত্বরিত গতিতে উঠে দাঁড়ালো সাফওয়ান। বিরক্ত মুখে নিজের শরীরের দিকে তাকালো। শার্ট, প্যান্ট কাঁদায় মাখামাখি হয়ে আছে একেবারে। আবারো রাগী চোখে তাকালো সে সায়েরীর দিকে। এমন চাহুনিতে রীতিমতো হাঁটু কাঁপছে সায়েরীর। তার নিজের শরীরও কাঁদায় মাখামাখি হয়ে আছে৷ কোমড়ে বেশ ব্যাথাও পেয়েছে। মনে মনে একগাদা বকা ছুড়লো সে সাফওয়ানকে। লোহা খায় নাকি এই ছেলে? এতো শক্ত, এতো ভারী বাপ রে বাপ। ভাবনার মাঝে সে লক্ষ্য করলো বাচ্চা পার্টি ইতোমধ্যে লেজ গুটিয়ে পালিয়েছে৷ সায়েরী তাজ্জব বনে গেলো। তাকে এভাবে বাঘের গুহায় ফেলে সবকয়টা পগারপার! শালা মিরজাফরের দল সব!
সাফওয়ান সায়েরীকে এই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করতে আবরারের আগমন ঘটলো। দুজনের অবস্থা দেখে সে কপাল চাপড়ে বললো,
‘ সায়ু! আবার কোন ঝামেলা বাঁধিয়েছিস তুই? ‘
গাল ফোলাল সায়েরী। জবাব দিলো না কোন। তার দোষ বলবে কেনো সবখানে? সে বলেছিলো নাকি এমন রকেটের গতিতে ছুটে আসতে? এসেছে কেনো? না আসলে তো পড়তো না৷ সায়েরীর দিকে পাত্তা না দিয়ে সাফওয়ান বিরক্ত গলায় বলে উঠলো,
‘ বলেছিলাম আমার বাসায় আয়৷ তা না, এখানেই জরুরি তলবে ডাকতে হলো আমাকে। দেখেছিস হাল? বাইকের হেড লাইটটাও ভেঙ্গে দিয়েছে। এবার আমি কিছু বললেই দোষ! ‘
আবরার কিছু বলার ভাষা পেলো না। সাফওয়ানকে বললো তার সাথে আসতে। সায়েরীর দিকে ধারালো দৃষ্টি ছুড়লো সাফওয়ান। যা দেখে ভড়কে গেলো সায়েরী। নজর লুকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। পরপরই খেয়াল করলো সাফওয়ান হনহনিয়ে চলে যাচ্ছে ভিতরে৷ হুহ! জাহান্নামে যা।
বাসায় ঢুকে আবারো মায়ের একগাদা বকুনি শুনতে হলো সায়েরীকে। তাদের আদরের দুলাল সাফওয়ানের সাথে এই কি অবস্থা করেছে, কান্ডজ্ঞান নেই.. আরো কতো কি! বিরক্ত হয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লো সায়েরী। সাফওয়ান’কে নিয়ে এদের এতো আহ্লাদ দেখে রীতিমতো গা জ্বলছে তার।
গতরাতে সায়েরী যখন ভয়ে অস্থির হয়ে ছিলো,সেই মুহূর্তে তার গলায় আঁচড়ের দাগগুলো দেখে নানান প্রশ্ন করছিলো তার মা৷ উপায় না পেয়ে সকলের সামনে সব সত্য কথা উগলে দিলো সায়েরী। সবটা শুনে একদিকে যেমন আৎকে উঠেছিলো সকলে, অন্যদিকে ভাবছিলো সাফওয়ান না থাকলে কি হলো তাদের মেয়ের! সারা রাত এই ঘটনা মাথায় ভনভন করছিলো সকলের৷ শেষ রাতে সায়েরীর বাবা জানালো সকালেই যেনো সাফওয়ানকে বাড়িতে ডাকা হয়। দুপুরে তার জন্য খাবারের আয়োজন করা হবে৷ কথামতো আজ সাফওয়ান এসেছে এই বাড়িতে। আবরার শুধু জরুরি তলবে ডেকেছিলো তাকে৷ কিন্তু বাসায় এসে এসব কিছু শুনে ভারী অস্বস্তিতে পড়লো সাফওয়ান। সবাই কেমন বারবার কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে তাকে। এসব দেখে সে মনে মনে ভাবছে, না আসলেই বোধহয় ভালো হতো। কিন্তু আবার আবরারের পরিবারের অমায়িক ব্যাবহারে বিরক্তি দূরে সরে গেলো তার৷ ছোট থেকেই এই মানুষগুলোর সাথে তার বেশ সখ্যতা৷ আজ যেনো সেটা আরো পাকাপোক্ত হলো৷
ডাইনিং টেবিলটা খাবারের বাটিতে ভরপুর। সাফওয়ান লক্ষ্য করে দেখলো অধিকাংশ আইটেম তার পছন্দের। এসব যে আবরারের কারসাজি বুঝতে বাকি রইলো না তার। মিনহার পাশে চেয়ার টেনে বসলো সে। নাদুসনুদুস দেখতে ফর্সা মিনহার আদুরে গাল টেনে দিলো। বিনিময়ে মিনহা মিষ্টি করে হাসলো। তার দিকে তাকিয়ে সাফওয়ান বিড়বিড় করে বললো,
‘ বড়বোন পাটকাঠি হলে কি হবে, ছোটটা একদম মাশাল্লাহ! ‘
গোসল শেষে সোজা কিচেনে আসলো সায়েরী। উদেশ্য খাবার নিয়ে আবার রুমে ঢুকে পরবে৷ খেয়ে একটা জবরদস্ত ভাত ঘুম দিবে। আজ আর মায়ের তোপের মুখে পড়া যাবেনা। দেখা গেলো ভষ্ম করে দিয়েছে তাকে। চুপিচুপি কিচেনে এসে নিজের কাজ করছে এমন সময় হাসি ঠাট্টার আওয়াজে ডাইনিংয়ের দিকে চোখ গেলো তার৷ যদিও পর্দা মেলে রাখা৷ কিন্তু অল্পখানি ফাঁক দিয়ে স্পষ্ট দেখতে পেলো সাফওয়ান ভাই নামক রসকষহীন, কাঠখোট্টা ছেলেটা আজ হেসে হেসে কথা বলছে৷ সায়েরী যেনো ছোট খাটো একটা ধাক্কা খেলো বুকে। মনে মনে বললো, এই ছেলের হাসি এতো সুন্দর বলেই কি সে হাসতে কিপটামি করে? হুহ! আজ কেমন সায়েরীর বাবা, চাচার সাথে দুনিয়ার গল্প জুড়ে দিয়েছে। এমনিতে তো মুখ দিয়ে ধমকা ধমকি ছাড়া সুন্দর কথা বেরই হয়না।
মুখ ফিরিয়ে আবারো নিজের কাজে মন দিলো সে৷ সেই মুহূর্তে তার মা আসলো কিচেনে। সায়েরীর প্লেটের দিকে নজর পড়তেই আবারো রেগে গেলেন তিনি। এমন দামড়ি মেয়েকে যদি রোজ বলে কয়ে খাওয়াতে হয় তাহলে কার মেজাজ ভালো থাকে?
খাওয়ার মাঝে আনমনে পর্দার ফাঁকে চোখ যেতেই আচমকা বিষম খেলো সাফওয়ান। আশ্চর্য চিত্তে ফ্যালফ্যাল করে কয়েক সেকেন্ড দেখতেই থাকলো সামনের দৃশ্যটুকু। শুভ্র রঙের জামা গায়ে জড়িয়ে কিচেনের ছোট্ট টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে সায়েরী। মুখের একপাশ একটুখানি দেখা যাচ্ছে শুধু। ভেজা লম্বা চুলগুলো পিঠময় ছড়িয়ে রাখা। মায়ের বকুনি শুনতে শুনতে আনমনে পিঠের ভেজা চুল ডান কাধে নিয়ে আসলো সে৷ দৃশ্যমান হয়ে উঠলো খানিকটা ভেজা পিঠ, সরু কোমর। আকস্মিক এই দৃশ্য দেখে সাফওয়ানের মনে পড়ে গেলো সকালে দেখা স্বপ্নের কথা। বুক ধরফরিয়ে উঠলো তার। এতোটা মিল! তার তাকানোর মাঝে সায়েরী হঠাৎ করেই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। তার দিকে নয় বরং পাশে বসা মিনহার দিকে৷ যে বোনের বকুনি শুনার দৃশ্য দেখে মিটিমিটি হাসছে৷ তাকে হাসতে দেখে ভেংচি কাটলো সায়েরী। চোখ সরাতে গিয়ে চোখাচোখি হলো সাফওয়ানের সাথে৷ তার এমন বিষ্ময় ভরা চোখজোড়া দেখে সায়েরী একটুখানি ঘাবড়ালো যেনো।
পরপরই প্লেট নিয়ে চলে গেলো রুমে৷ নিজের ভিতরের অস্থিরতাটুকু দমিয়ে পুণরায় খাবারে মনযোগ দিলো সাফওয়ান। কিন্তু মন, মস্তিষ্কে তখনো গেড়ে আছে সায়েরী নামক মানবীটার নাম৷
ভর দুপুরে আকাশের অবস্থা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে৷ হাওয়া বাতাসে উড়ছে গাছের ডালপালা। ছোটখাটো তুফান চলছে যেনো। সময়টা দুপুর সাড়ে তিনটা হলেও প্রকৃতির এমন ভয়াবহ রূপ দেখে মনে হচ্ছে সন্ধ্যা ছয়টা৷ সায়েরীর আর ভাত ঘুম দেওয়া হলো না। মায়ের আদেশে ছুটলো ছাদ থেকে শুকনো কাপড় নিয়ে আসার উদ্দেশ্যে। ইতিমধ্যেই লোডশেডিংয়ের কারণে চারপাশ আরো অন্ধকার হয়ে পড়েছে৷ ব্যস্ত পায়ে ছাদে গিয়ে পৌঁছাতেই হঠাৎ দেখলো দরজার সাথে হেলান দিয়ে সাফওয়ান দাঁড়ানো। বাতাসে তার সিল্কি চুল এলোমেলো উড়ছে। সায়েরী একটুখানি থমকালো তাকে দেখে।
পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে আচমকা তার হাত চেপে ধরলো সাফওয়ান। ভয়ে তটস্থ সায়েরী ছটফটিয়ে উঠলো। হাত ছাড়াতে চাইলো পুরোদমে। তার এমন আচরণে সাফওয়ান বেশ বিরক্ত হলো। সে চেয়েছিলো শান্তিমতো কথা বলতে৷ কিন্তু ভুলে গিয়েছিলো যে, এই মেয়ের সাথে শান্ত স্বভাবটা ঠিক যায় না। বিরক্ত হয়ে ধরে রাখা হাতটা মুচড়ে সায়েরীর পিঠে চেপে ধরলো সে। চাপা স্বরে ধমকে উঠলো। কেঁপে উঠলো সায়েরী। থেমে গেলো ছটফটানি। সাফওয়ান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরখ করছে তাকে। চোখ, নাক, ঠোঁট বেয়ে নিচের দিকে নামছে দৃষ্টি। হাই নেক ড্রেস পড়ায় খুব সহজেই সাফওয়ানের চোখের সামনে ধরা দিলো সায়েরীর বাম ঘাড়র আকর্ষণীয় তিল দুটো। সহসা বুক কেঁপে উঠলো তার৷ চোখ বুজে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো সে। মনে পড়ে গেলো সপ্নে দেখা মেয়েটার ঘাড়েও ঠিক এমনই দুটো তিল দেখেছিলো সে। বুঝতে আর বাকি নেই মেয়েটা কে ছিলো। কিন্তু মনে মনে নিজের উপর তার বিরক্ত লাগছে এই ভেবে যে, সে কেনো সায়েরীকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে যাবে! এমন অধঃপতন কবে থেকে হলো তার? সাত সকালে কিনা বন্ধুর বোনকে নিয়ে আবুল তাবুল স্বপ্ন দেখছে। তার ব্যাক্তিত্বের সাথে যায় একথা! ভাবনার মাঝে কানে এলো সায়েরীর করুন কন্ঠ,
‘ ছ..ছাড়ুন! ব্যাথা পাচ্ছি। ‘
সাফওয়ান ছাড়লো না। বরং নিজের ভিতরের রাগটুকু দমাতে না পেরে আরও জোর প্রকাশ করে চেপে ধরলো হাত৷ সায়েরীর চোখে চোখ রেখে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,
‘ সমস্যা কি তোমার মেয়ে? জন্ম হওয়ার আগেই ঘুম কেড়ে নিয়েছো। বড় হওয়ার পর ঘুমে এসে ডিস্টার্ব করছো৷ আমাকে কি ফ্রি পেয়েছো নাকি হ্যাঁ। যা ইচ্ছে করে যাবে আর চুপচাপ সহ্য করবো?? ‘
কথাগুলো শুনে বিষ্ময়ে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে গেলো সায়েরী। সে কবে ঘুমে এসে ডিস্টার্ব করলো। পাগল নাকি যে ঘুমন্ত বাঘকে যেচে এসে শিকার করতে বলবে! ভাবনার মাঝে আচমকা সাফওয়ান তার ফোলা ফোলা গাল জোড়া চেপে ধরলো। বৃদ্ধা আঙ্গুল ডান গালে, বাকি চার আঙ্গুল বাম গালে। চেপে ধরে সায়েরীর মুখখানা নিজের মুখের কাছাকাছি এনে শান্ত কিন্তু গাঢ় স্বরে বললো,
‘ লিসেন, মিস সুবহা! একমাস সময় দিলাম। এই একমাসে ভুলেও যেনো আমার ত্রিসীমানায় তোমাকে না দেখি৷ পরিস্থিতি আমার অনুকূলের বাইরে চলে যাচ্ছে কিন্তু। পুরোপুরি হাত ছাড়া হয়ে গেলে সাফওয়ান খান’র মায়াজাল থেকে কখনো বেরুতেই পারবে না তুমি। ‘
গাল ছেড়ে ধুপধাপ পা ফেলে ছাদ থেকে নেমে গেলো সাফওয়ান। পেছনে ফেলে গেলো স্তম্ভিত সায়েরী’কে৷ যে ফ্যালফ্যাল নজরে সাফওয়ানের গমন পথের দিকে তাকিয়ে। কি বললো কিছুই মাথায় ঢুকলো না তার। আলতো করে গালে হাত বুলালো সে। এই মানুষটা ছুঁয়ে দিলেই কেমন কারেন্ট লেগে যায় শরীরে। এখনো ধরফর করছে তার বুক। হৃদস্পন্দনের অস্বাভাবিক গতি কানে বাজছে। শরীর কাঁপছে মৃদু মৃদু। বৃষ্টির ছটা এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে শরীর। কিন্তু সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই তার৷ মাথায় ঘুরছে একটাই কথা,
‘ অ্যানাকন্ডা-টা এসব কি বকে গেল? ‘
মাঝে কেটে পাঁচটা দিন। ট্যুর থেকে ফিরার পর দিন ইরা দূর্বল শরীর নিয়েই জেদ ধরলো মামা বাড়ি নারায়ণগঞ্জ যাবে কিছু দিনের জন্য৷ তার মা, বাবা এমন অবস্থায় তাকে এতো দূর পাঠাতে রাজি হলো না। কিন্তু শেষ অবধি ইরা’র জেদের কাছে হার মেনে সেদিনই পৌঁছে দিয়ে আসলো তাকে নারায়ণগঞ্জ। এই দু’দিনে ইরা আগের চেয়েও বেশি বিমর্ষ হয়ে ছিলো। জোর করে মুখে তুলে না দিলে খাওয়ার কথা মুখেও তুললো না। মেয়ের অবস্থা দেখে মা’য়ের প্রেশার ডাউন হয়ে পড়েছে৷ তবুও বাধ্য হয়ে ইরাকে তার মামা বাড়ি পাঠিয়ে দিলো। সম বয়সী ভাই,বোনদের সাথে কিছু দিন থাকলে যদি মেয়েটা সহজ একটু হয়, এই আশায়। এই পাঁচদিনে মিহাদও ছিলো সকলের নাগালের বাইরে৷ ক্যাম্পাসে আসেনি। ফোন করলেও সময় মতো পাওয়া যায়নি।
দুজনের এমন হাল দেখে এখন মহা বিরক্ত বন্ধুমহল। এই দুজনের সমস্যা সমাধানের জন্য নীতি বেশ কয়েকবার সাফওয়ানের সাথে কথা বলেছিলো৷ এবং আশ্চর্যজনক ভাবে তখন সে লক্ষ্য করলো, বন্ধুমহলের সবচেয়ে এক্টিভ পার্সনটা কেমন যেনো উদাসীন হয়ে থাকে আজকাল। সাফওয়ান স্বভাবগত ভাবে একটু চুপচাপ থাকতে পছন্দ করে সেটা সকলের জানা৷ তবে বন্ধুদের সাথে সে থাকে একেবারে অন্যরকম, হাসিখুশি৷ কিন্তু ইদানীং সেই ছেলে অত্যাধিক গম্ভীর হয়ে থাকে। নিজের ভিতরে কোথাও যেনো হারিয়ে গেছে সে৷ তার আচরণে নীতি ভারী অবাক। হলো কি ছেলেটার? এমন গুরুগম্ভীর বন্ধু তো তাদের ছিলো না। এই সাফওয়ান’কে আজকাল বড্ড অচেনা ঠেকছে তাদের কাছে৷
পড়ন্ত বিকেল। পাশাপাশি গাড়িতে সাদিফ, নাজরাত। গাড়ি চলছে আপন গতিতে। গন্তব্য সিলেট৷ জানালার বাইরে মুগ্ধ দুই চোখ আটকে আছে নাজরাতের। নিশ্চুপ হয়ে সে প্রকৃতি দেখতে ব্যস্ত। কিন্তু মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে ঘন্টা খানিক আগের ঘটনা৷ এক প্রকার হুট করে বিকেলে সাদিফ এসে হাজির হয়েছিলো তাদের বাসায়৷ তার আগমনে নাজরাত চমকে গিয়েছিলো বেশ৷ অথচ পরিবারের অন্যরা ছিলো খুব স্বাভাবিক। যেনো আগে থেকেই জানতো সব। আসলেই তাদের জানা ছিলো যে, সাদিফ আসবে৷ অজ্ঞাত ছিলো কেবল নাজরাত। সাদিফ আসার কিছু মুহূর্ত পর হঠাৎ নাজরাতের ছোট চাচি এসে তাকে সুন্দর একখানা শাড়ি পরিয়ে পরিপাটি করে দিলো। নাজরাত ভেবেছিলো, হয়তো কিছু মুহূর্তের জন্য কোথাও ঘুরতে যাবে তারা৷ কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে চাচি বললো সাদিফের সাথে সে সিলেট যাচ্ছে চারদিনের জন্য। কথাটা শুনে নাজরাত হতবাক হয়ে ছিলো৷ কবে, কখন এই পরিকল্পনা হলো কিচ্ছুটি জানে না সে। সাদিফ নিজেও বললো না কিছু। হতবাক নাজরাতের কোনো কৌতুহলী কথার জবাব না দিয়ে তাকে একপ্রকার ঠেলে পাঠিয়ে দিলো সাদিফের সাথে। সেই থেকে সাদিফের সাথে গাড়িতে বসা সে৷ সাদিফের প্রতি একটু অভিমানও হলো বটে। কেনো আগে থেকে জানালো না কিছু? এতোক্ষন যাবত চুপ থেকে এবার ধৈর্য হারালো নাজরাত। মুখ ফিরিয়ে সাদিফের দিকে তাকিয়ে নিম্ন কন্ঠে বললো,
‘ আমরা হঠাৎ সিলেট কেনো যাচ্ছি? ‘
গাড়ি চালাতে চালাতে নাজরাতের দিকে ফিরে তাকালো সাদিফ। মুচকি হেসে বললো,
‘ হানিমুনে যাচ্ছি। প্রি হানিমুন। ‘
নাজরাত ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো। প্রি হানিমুন? প্রি ওয়াডিং শুনেছিলো কিন্তু এই প্রি হানিমুন কি জিনিস! নড়েচড়ে বসলো সে৷ আমতাআমতা করে বললো,
‘ প্রি হানিমুন মানে? আমিতো শুনেছিলাম আপনার নানু বাড়ি যাচ্ছি। এটা হানিমুন হলো কীভাবে? ‘
সাদিফ যেনো বেশ অবাক হলো এমন ভান করে বললো,
‘ হানিমুন সম্পর্কে বেশ জ্ঞান আছে দেখছি। যাক, এই অধমটার জন্য ভালোই হলো। ‘
আকস্মিক কথাটা শুনে লজ্জায় মাথা নুইয়ে ফেললো নাজরাত। সাদিফের ঠোঁটে তখনো মুচকি হাসি ঝুলে আছে। নাজরাত মুখ ফিরিয়ে পুণরায় জানলার বাইরে মনযোগ দিলো। তার লজ্জামাখা মুখশ্রী দেখে এবার খানিকটা শব্দ করে হেসে উঠলো সাদিফ। একহাতে নাজরাতের হাত টেনে চুমু খেলো হাতের উল্টো পিঠে। কেঁপে উঠলো নাজরাত। চোরা চোখে তাকালো সাদিফের দিকে। ড্রাইভিংয়ে মনযোগ রেখেই সাদিফ স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,
‘ দুদিন আগেই নানু মনি ফোন করে বলেছে তোমাকে নিয়ে যেনো সিলেট থেকে ঘুরে আসি। নানু সিলেটেই থাকে৷ মামাদের বিজনেস ৮০% ঢাকায়। বড় মামা এবং ছোট মামা ঢাকাতেই শিফট হয়ে গিয়েছে পুরোপুরি, পাঁচ বছর যাবত। নানু নিজের বাড়িঘর ছেড়ে ঢাকায় থাকতে চান না। সিলেটে মেঝ মামার পরিবার থাকে। সেখানের বিজনেস তিনি দেখাশোনা করেন। নানু সেখানে বেশ যত্নে আছে। নানু চাচ্ছিলেন তিনি থাকতে থাকতে তোমাকে যেনো সবটা নিজে দেখাতে পারে। উনার নাত বংশের প্রথম নাতবউ তুমি। এজন্য শখটা তোমাকে নিয়েই বেশি। ‘
কথাগুলো শুনে অদ্ভুত আনন্দ ধরা দিলো নাজরাতের মনে। পারিবারিক বিয়ের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো বোধহয় এটাই। খুশি খুশি একটা ভাব নিয়েই সে বসে রইলো চুপচাপ। একহাত তখনো সাদিফের হাতের মুঠোয়। বেশ কিছুক্ষণ পর নিরবতা ভঙ্গ করে সাদিফ গান চালিয়ে দিলো। একলা পরিবেশে রোমান্টিক একটা গান৷ দুজনে যেনো গানের মাঝেই ডুবে গেলো৷ সিলেট পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত ৮টা বেজে গেলো প্রায়৷ ইতিমধ্যে বেশ কয়েকবার ফোন করে ফেলেছে সাদিফের নানু। অবশেষে ৮টার দিকে এসে পৌঁছালো দুজন৷ গাড়ি যখন সারি সারি নারিকেল গাছের মাঝে সরু রাস্তা দিয়ে এগোচ্ছিলো, নাজরাত তখন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে৷ রাস্তাটা অদ্ভুত সুন্দর। রাতের পরিবেশ হওয়ায় খুব কম দেখা যাচ্ছে। তবে হেড লাইটের আলোয় যতোটুকু দেখা মিললো ততোটুকু দেখেই মুগ্ধ হলো সে৷ রাস্তাটা গিয়ে শেষ হলো বিশাল লোহার গেইটের সামনে।
কালো এবং সোনালী রঙ মেশানো খুব সুন্দর কারুকার্য তাতে৷ হর্নের আওয়াজে দারোয়ান এসে গেইট খুলে দিলো। বিশাল বাংলোর সম্মুখে থামলো গাড়ি।গাড়ি থেকে নেমে আশেপাশে তাকিয়ে বেশ অবাক হলো নাজরাত। এতো বড় বাংলো সামনাসামনি কখনো দেখেনি সে। দেখেই বুঝা যাচ্ছে বাংলো-টা আদিযুগের৷ তবে বেশ অনেকটা আধুনিকতার ছোঁয়া রয়েছে তাতে। গাড়ির আওয়াজ শুনেই সাদিফের মেঝ মামা এবং তার দুই পুত্র সন্তান বেরিয়ে আসলো। পেছনে ঘরের প্রবেশ পথে নানু দাঁড়িয়ে সাথে একজন মাঝবয়েসী মহিলা। সাদিফ এবং নাজরাতকে বেশ যত্নের সাথে ভিতরে নিয়ে গেলো তারা। সাদিফের নানু জাহুরা খান স্বস্তি পেলেন এতো ঘন্টা পর। সকলের সাথে কুশলাদি করার পর জাহুরা খান বললেন অনেক লম্বা সময় ধরে জার্নি করে এসেছে বিধায় এবার তাদের বিশ্রাম করা দরকার। তিনি আশেপাশে তাকিয়ে ভ্রুঁ কুঁচকে বললেন,
‘ রূপসা কোথায়? ‘
এরপর জোরে হাঁক ডাকলেন। ভেতর ঘর হতে রূপবতী এক মেয়ে বেরিয়ে আসলো। মেয়েটার উদাসীন দুই চোখ নাজরাতের উপর নিবদ্ধ। নাজরাত লক্ষ্য করলো রূপসা নামক মেয়েটিকে। নামের মতোই বেশ সুন্দর দেখতে সে। বয়স হয়তো নাজরাতের মতোই উনিশ-বিশ হবে। জাহুরা খান পরিচয় করিয়ে দিলেন রূপসা’কে। সাদিফের মেঝ মামার একমাত্র মেয়ে সে। বড় দুই ভাইয়ের পর রূপসার জন্ম। জাহুরা খান তাড়া লাগালেন। দ্রুত ফ্রেশ হয়ে যাতে খাবার খেয়ে নিতে পারে এজন্য সাদিফ, নাজরাতকে রুমে পাঠিয়ে দিলেন। রূপসার বড় ভাই রূপম লাগেজ হাতে এগিয়ে যাচ্ছে সিড়ি বেয়ে উপরের দিকে। তাকে অনুসরণ করে এগোচ্ছে সাদিফ এবং নাজরাত। রুমের দরজার কাছে গিয়ে রূপম দাঁড়িয়ে গেলো। ট্রলি রেখে মুচকি হেসে বললো,
‘ ফ্রেশ হয়ে নাও ভাইয়া। লেইট হলেও সমস্যা নেই। আজ আমরা ডিসটার্ব করবো না। ‘
বয়সে সাফওয়ানের বছর একের ছোট রূপম৷ সাদাসিধে, সভ্য একটা ছেলে। সচরাচর কারো সাথে ঠাট্টা করতে দেখা যায় না তাকে। কিন্তু আজ রূপমের স্বাভাবিক মুচকি হাসিটা অস্বাভাবিক লাগলো সাদিফের কাছে। তবে কিছু বললো না সে। রূপম চলে গেলে রুমের দরজা খোলে নাজরাত আগে প্রবেশ করলো ভিতরে। সহসা চোখ সামনে যেতেই থমকে গেলো সে। বুকে বিরাট ধাক্কা লাগলো যেনো। চোখজোড়া বড় বড় হয়ে গেলো অতী বিষ্ময়ে। পেছনে ট্রলি নিয়ে সাদিফ ঢুকলো। নাজরাতকে এমন স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রুঁ কুঁচকালো সে৷ কিছু বলতেই নিচ্ছিলো কিন্তু সামনের দৃশ্যটুকু দেখে সে নিজেই হতভম্ব হয়ে গেলো।
অবশ হয়ে আসলো ট্রলি ব্যাগ আগলে রাখা হাত। এরপর আচমকা নাজরাতের কথা মাথায় আসতেই দ্রুত নিজেকে সামলে নিলো সে। ঘাড় ফিরিয়ে নাজরাতের বিষ্ময় ভরা মুখটা পরখ করলো। এরপর আবারো তাকালো ফুলে ফুলে সজ্জিত বিছানাটার দিকে। হরেক রকমের তাজা ফুল দিয়ে সজ্জিত বিছানা। মাঝে লাভ শেপ দিয়ে সাদিফ,নাজরাতের নাম লিখা। বেড সাইড টেবিল, ড্রেসিং, এবং টি-টেবিলেও গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে আছে। তার উপর ছোট বড় অনেকগুলো মোমবাতি জ্বলছে। আলো আঁধারের মাঝে কমলা রাঙা অগ্নিশিখা’র আলোয় পরিবেশটাকে রোমাঞ্চকর করে তুলেছে। তাজা ফুলের ঘ্রাণে ম-ম করছে চারিদিক। রুমের আগাগোড়া চেক করে ফাঁকা ঢোক গিললো সাদিফ। গলা খাঁকারি দিয়ে নাজরাতের উদ্দেশ্যে বললো,
‘ সরি। আসলে আমি জানতাম না এই ব্যাপারে কিছু। কাজিনরা হয়তো মজা করেই এসব…. ‘
সাদিফের কন্ঠে ঘোর কাটলো নাজরাতের। ঘন ঘন শ্বাস ফেলে নিজেকে সামলে নিলো সে। আমতাআমতা করে বললো,
‘ ই..ইট’স ওকেহ! আমি..আমি কিছু মনে করিনি। ‘
নাজরাতের জড়তা ভরা কন্ঠটা স্পষ্ট ঠের পেলো সাদিফ। গোপনে তপ্ত শ্বাস ফেললো সে। দরজা বন্ধ করে ব্যাগটা সোফায় রাখতে রাখতে বললো,
‘ তুমি গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও। আমি এসব ঠিক করছি। ‘
বলতে বলতে বেড থেকে ফুল সরাতে উদ্যত হলো সাদিফ। নাজরাত জড়তা নিয়েই বলে উঠলো,
‘ এসব নাহয় পরে করা যাবে। আপনি আগে ফ্রেশ হয়ে আসুন। আমার দেরি হবে। ‘
সাদিফ আর কথা বাড়ালো না কোনো। কাপড়চোপড় নিয়ে ঢুকে গেলো ওয়াশরুমে। দরজা বন্ধ হতেই লম্বা করে শ্বাস ফেললো নাজরাত। এতোক্ষণ যেনো দম আটকে দাঁড়িয়ে ছিলো সে। হাসফাস করতে করতে সোফায় গিয়ে ধপ করে বসে পড়লো সে। সজ্জিত বিছানার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে আওড়ালো, ‘ অসম্ভব! ‘
সত্যিই তার জন্য অসম্ভব। আকদ্ হয়েছে ঠিকঠাক এক মাস পেরুলো না। বর এক জায়গায় সে অন্য জায়গায়। মানুষটাকে ঠিক করে জানার, বোঝার সুযোগ অবধি পেলো না এখনো। প্রথম দেখায় সাদিফের প্রতি মুগ্ধ হয়েছিলো সে। যা ছিলো ভালোলাগা ছিলো। এখনো সেটা ভালোলাগা অবধি সীমাবদ্ধ। এই কয়েকদিনে সাদিফ তার অল্পখানি কাছাকাছি এসেছিলো ঠিকই৷ অধিকার ছিলো বলেই এসেছে। নাজরাতের কোনো সাধ্য ছিলো সাদিফকে বাঁধা দেওয়ার। সে চাইনি বাঁধা দিতে। তবে সেই অল্পখানি কাছাকাছি আসাটা এখনই গভীরে নিয়ে যাওয়া মোটেও সম্ভব নয়। দুজনের সম্পর্কের গভীরতা মোটেও এমন পর্যায়ে আসেনি এখনো। নাজরাত সময় চাই। ভালোলাগা থেকে গভীর ভালোবাসায় আবদ্ধ হতে চাই। মন ছুঁয়ে তবেই শরীর অবধি পৌঁছাতে চাই। ঠিক যেমন সাদিফ তাকে ভালোবাসে, সেও চাই সাদিফকে ভালোবাসতে। পবিত্র সম্পর্কে আবদ্ধ হয়ে গিয়েছে ঠিকই। কিন্তু সম্পর্কটা প্রকৃতভাবে ভালোবেসে তবেই এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।
দরজা খোলার আওয়াজে ঘোর ভাঙ্গলো নাজরাতের। চুল মুছতে মুছতে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসলো সাদিফ। নাজরাত তাকালো না সেদিকে। ব্যাগ থেকে একে একে প্রয়োজনীয় কাপড় বের করে একপ্রকার ছুটে গিয়ে ঢুকে গেলো ওয়াশরুম। প্রায় মিনিট বিশেক পর বের হলো সে। ওয়াশরুমের দরজা একটুখানি ফাঁক করে উঁকি দিয়ে দেখলো সাদিফ আছে কিনা। রুমের কোথাও তার দেখা না পেয়ে নিশ্চিত মনে এলোমেলো শাড়ির কুঁচি সামলে বেরিয়ে আসলো সে। ভেজা চুল বেয়ে টপটপ পানি গড়াচ্ছে তার। ড্রেসিংয়ের সামনে গিয়ে চঞ্চল হাতে মাথা নিচু করে শাড়ির কুচি ঠিক করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো সে। তখনই তার পিঠ ঘেঁষে দাঁড়ালো কেউ। আচমকা এমন হওয়ার ভয়ে লাফিয়ে উঠলো নাজরাত। সরতে গেলে আকস্মিক তার উন্মুক্ত কোমড় ধরে আটকে ফেললো পেছনের মানুষটা। নাজরাত থমকালো। সম্মুখে সাদিফকে দেখে একটুখানি স্বস্তি পেলো মনে। নাজরাতের ভীত গ্রস্ত মুখখানা দেখে সাদিফ বললো,
‘ কাম ডাউন। এতো ভয় পাচ্ছো কেনো? আমি ছাড়া কেউ নেই এখানে। ‘
ঘন ঘন ঢোক গিলে নিজেকে শান্ত করলো নাজরাত। বললো,
‘ আপনি তো ছিলেন না এখানে। হুট করে এভাবে…ভ..ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ‘
সাদিফের সাড়াশব্দ নেই। তার জবাব না পেয়ে চোখ তুলে তাকালো নাজরাত। দেখলো গভীর নজরে সাদিফ তাকিয়ে তার পানে। লজ্জায় গাল গরম উঠলো নাজরাতের। ছাড় পেতে চাইলো। কিন্তু হাত সরানোর বদলে নিজের দুহাতে শাড়ির ফাঁক দিয়ে নাজরাতের কোমড় পেঁচিয়ে ধরলো সাদিফ। শিউরে উঠলো নাজরাত। নড়াচড়ার ক্ষমতা পেলো না কোনো। সাদিফ তাকিয়েই থাকলো পলকহীন চোখে৷ ঢিপঢিপ বুকে নাজরাত নিজেকে বুঝালো, ‘ কিছু হবেনা। কিছু করবে না। জড়িয়েই তো ধরেছে। এক্ষুনি ছেড়ে দিবে। ‘
কিন্তু তাকে সম্পূর্ণ মিথ্যে প্রমাণ করে আচমকা সাদিফ তার শীতল ঠোঁটজোড়া ছুঁইয়ে দিলো নাজরাতের ভেজা গালে। কেঁপে উঠে চোখ খিচে ফেললো নাজরাত৷ তার দেহের কম্পন স্পষ্ট ঠের পেলো সাদিফ। বাঁকা হেসে পরপরই সে গভীর চুমু খেলো নাজরাতের কানের নিচে৷ আবেশে সাদিফের টি-শার্ট খামছে ধরলো নাজরাত। কেঁপে উঠলো দৃশ্যমান রূপে৷ বিনিময়ে সাদিফ আরো একটু গভীর করলো আলিঙ্গন। খানিকক্ষণ পর নিজ থেকে ছেড়ে দিলো তাকে৷ নাজরাত তখনো স্তব্ধ হয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে। সাদিফ নিজেই হাত বাড়িয়ে এলোমেলো কুচি ঠিক করে দিলো। নাজরাতের ভেজা চুল ঠিক করে দিয়ে মাথায় আঁচল টেনে দিলো। এতোকিছুর পরেও নাজরাতের নড়চড় না দেখে গলা খাঁকারি দিলো সে। নাজরাত তাকাতেই বলল,
‘ দাঁড়িয়ে আছো কেনো! আরো লাগবে? ‘
বিষ্ময়ে চোখ বড় বড় হয়ে গেলো নাজরাতের। এরপর লজ্জায় আর তাকালোই না সাদিফের দিকে। ব্যাস্ত পায়ে ছুটলো নিচে। পেছনে ঠোঁট চেপে হাসতে হাসতে সাদিফ আসলো৷ দুজন নিচে এসে পৌঁছাতেই খাবাবের আয়োজন করা হলো। সাদিফের মেঝো মামা,মামী,রূপম,রাহাত, রূপসা এবং জাহুরা খান মিলে খেতে বসলেন বিশাল ডাইনিং টেবিলে। হাসি ঠাট্টার মাঝে খাবার পর্ব শেষ হলো। এর মধ্যে নাজরাত একটা জিনিস লক্ষ্য করলো। তা হলো, রূপসা নামক মেয়েটা। সে নাজরাতের দিকে কেমন করে যেনো তাকাচ্ছে। সেই দৃষ্টিতে রাগ,ক্ষোভ নেই। তবে কিছু একটা আছে যা নাজরাত ধরতে পারছে না। আসার পর সকলের সামনে রূপসা যে একটু কথা বলেছিলো, এরপর নাজরাতের আশেপাশেও আসেনি সে।
আশ্চর্য হলো নাজরাত। এই মেয়ের সাথে কোন জনমের শত্রুতা তার! রূপসার চিন্তা ঝেরে নাজরাত আড্ডায় মনযোগ দিলো। কিন্তু এখানে ছেলেরা মিলেই দেশ,রাজনীতি, ব্যাবসা এসবের কথা বলে চলেছে। জাহুরা খান আড্ডা ছেড়ে উঠে গেলেন৷ রুমে গিয়ে ঔষধ খেতে হবে উনার। নাজরাতের চুপসানো মুখ দেখে তিনি জানতে চাইলেন কোনো অসুবিধে হচ্ছে কিনা। মাথাব্যথার মিথ্যা অযুহাত দিলো নাজরাত। এবং সুযোগ পেয়ে গেলো রুমে ফিরার। রুমে ঢুকে মোবাইল বের করে দ্রুত তিন বান্ধবীকে ভিডিও কল লাগালো সে। সবার আগে ভেসে উঠলো সাফ্রিনের ফর্সা, হাস্যজ্জল মুখশ্রী। নাজরাতকে দেখে সে দুষ্টু কন্ঠে বললো,
‘ আরে ভাবিইইইই! কি ব্যাপার? হানিমুনে গিয়ে রাত বিরাতে ফোনালাপের ইচ্ছে জাগলো কেনো? আমি তো ভেবেছিলাম দুয়েকদিন আপনার দেখাই পাবো না। ‘
নাজরাত কপাল কুঁচকালো। কিছু বলবে এমন সময় একই সাথে মোবাইল স্ক্রিনে ভেসে উঠলো তোহা এবং সায়েরীর মুখ। তোহাকে স্পষ্ট দেখা গেলেও ড্রিম লাইটের সল্প আলোয় সায়েরীর মুখ অস্পষ্ট হয়ে আছে। কাঁচা ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ায় সে বিরক্ত কন্ঠে বললো,
‘ আজব মুসিবত তোরা। তোদের চোখে নাহয় আল্লাহ ঘুম দেয়নি। তাই বলে কি আমাকেও শান্তিতে ঘুমুতে দিবি না নাকি? এইযে, সাদিফ ভাইয়ের বউ! ঘুম নেই চোখে? এই রাত বারোটায় আমাদের সাথে কিসের এতো প্রেমালাপ হ্যাঁ? তোর জামাই কই? ‘
সায়েরীর কথা শুনে তোহা ধমকে উঠলো তাকে। বললো,
‘ কিসের আলাপ তোর মোটামাথায় ঢুকবে না। গর্দভ কোথাকার। আর নাজরাত কি সিলেটে ঘুমুতে গিয়েছে নাকি? সে গিয়েছে হচ্ছে আমাদের খালামণি ডাক শুনানোর প্রসেসিং করতে। এখন টিপস জেনে নিতে কল দিয়েছে। তাই নারে নাজ! বল। ‘
তিনজনের উল্টাপাল্টা কথা শুনে রাগে মাথা দপদপ করে উঠলো নাজরাতের। ফুঁসে উঠে বললো,
‘ তাই তোর মাথা। ওই তোদের কে বলেছে আমার সিলেটে আসার ব্যাপারে হ্যাঁ? আমি নিজেই জানলাম এখানে আসার আগমুহূর্তে। ‘
নাজরাতের কথা শুনে সাফ্রিন দাঁত কেলিয়ে জবাব দিলো,
‘ এই মহা মূল্যবান খবরটা আমি সাপ্লাই করেছি। ভালো করেছি না ভাবিইইই? ‘
‘ চুপ কর অসহ্য! কি ভাবি ভাবি লাগিয়ে রেখেছিস? আমি আছি আমার জ্বালায়। কোথায় ভাবলাম তোরা কোনো সলিউশন দিবি। তা না! যত্তসব অশ্লীল কথাবার্তা! ‘
তোহা উৎসুক নজরে তাকালো। কৌতুহলী গলায় বললো,
‘ এতো জ্বলা জ্বলি কিসের গো বান্ধবী! কোথায় জ্বলছে শুনি? ‘
তোহার কথায় খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো সাফ্রিন। নাজরাত দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
‘ তোহার বাচ্চা!! তোরে যদি সামনে পায়….. ‘
নাজরাতের রাগ দেখে তোহা দ্রুত সামলে নিলো নিজেকে। সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললো,
‘ আচ্ছা আচ্ছা, সরি। এবার বল কি সমস্যা? ‘
মোবাইলের ব্যাক ক্যামেরা দিয়ে ফুল দিয়ে সাজানো বিছানাটা দেখালো নাজরাত। সবটা দেখে তোহা এবং সাফ্রিন বিষ্ময়ে কথা বলতেই ভুলে গেলো। পানি যে এতোদূর গড়িয়ে যাবে ভাবতেই পারেনি তারা। ঘুমু ঘুমু চোখে সবটা দেখে সায়েরী বলে উঠলো,
‘ হাউ কিউট! আমার ইচ্ছে করছে ফুলগুলো জড়িয়ে জম্পেশ একটা ঘুম দিই। ‘
এমন সিরিয়াস মুহূর্তে সায়েরীর কথাটা শুনে বিরক্তিতে মুখ ঝামটি মারলো বাকি তিনজন। তোহা ফুঁসে উঠে বললো,
‘ এই গাধার বাচ্চারে লাত্থি দিয়ে বের কর এখান থেকে। কোন জাতের গাধা রে এই মেয়ে! ওই তুই ঘুম ছাড়া কি দুনিয়াতে আর কিছু ভাবতে পারিস না? আনরোমান্টিক মহিলা! ‘
সায়েরী ঠোঁট উল্টালো। কিছু বলতে চাইলো। কিন্তু পারলো না। ঘুমে চোখ ভেঙ্গে আসতে তার। তোহাকে প্রতিউত্তর করার শক্তি পাচ্ছে না। তার অবস্থা দেখে তোহা আবারো বলে উঠলো,
‘ কি দেখে এই মেয়ের সাথে বন্ধুত্ব করলাম বলতো! আবরার ভাইয়ার পরিবার দেখি একে বড় হতেই দিবে না। আশ্চর্য মেয়ে মানুষ! আমাদের মতো প্রো রোমান্টিক বান্ধবী থেকেও সে রোমান্স এর র অবধি জানে না। এই গাধীটার বর কে হবে আল্লাহ মালুম। বেচারার জন্য এখন থেকেই আফসোস হচ্ছে আমার। ‘
নাজরাত বললো,
‘ তার বরকে সাইডে রাখ। আপাতত আমার বরের কথাটা ভাব। এই বিছানায় সাদিফের সাথে ঘুমানো কোনো ভাবেই সম্ভব না। দেখা গেলো লজ্জায় হার্ট ফেইল করে শক্ত হয়ে আছি। ‘
সাফ্রিন দুষ্টু হেসে বললো,
‘ ঘুমাতে বলছে কে? আমরা তো খালামনি ডাক শুনতে আগে থেকেই চারপায়ে খাঁড়া। ‘
‘ সাফার বাচ্চা! চিন্তায় আমার জান বের হয়ে যাচ্ছে আর তোরা এসেছিস ফাজলামো করতে? ভুল হয়েছে তোদের কল করে। রাখলাম আমি। যা ইচ্ছে কর তোরা। ‘
রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে কল কেটে দিলো নাজরাত। মিনিট খানিকের মধ্যে সাফ্রিন এবং তোহা বেশ কয়েকটা মেসেজ পাঠালো তাকে। নাজরাত চোখ দিলো না সেদিকে। এই দুই লাগামছাড়া মেয়ের পাল্লায় পরা যাবে না। চোখ বুজে সোফায় মাথা এলিয়ে দিলো সে। চিন্তায় মাথা ফেটে যাচ্ছে তার। তার উপর এতো ঘন্টার জার্নি করে আসায় ক্লান্ত লাগছে ভীষণ।
বসে থাকতে থাকতেই একটা সময় গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো সে। তার মিনিট দশেক পর রুমে আসলো সাদিফ৷ সোফায় ঘুমন্ত নাজরাতকে দেখে একটুখানি চমকালো সে। দরজা লক করে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো নাজরাতের কাছে। এরপর তাকে পাজা কোলে তুলে বিছানায় শুইয়ে দিলো। ঘুমের ঘোরেই সাদিফের বুকের কাছের টি-শার্ট খামচে ধরলো নাজরাত। সাদিফ হাসলো। হাত বাড়িয়ে টেবিল ল্যাম্প বন্ধ করে শুয়ে পড়লো নাজরাতের গা ঘেঁষে। ড্রিম লাইটের সল্প আলোয় নাজরাতের ঘুমন্ত মুখখানার দিকে অনিমেষ তাকিয়ে রইলো।
অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ২৫+২৬
কতোবার এই মুহূর্তটা নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলো সে। আজ সত্যি হয়ে ধরা দিয়েছে সেটা। মুচকি হেসে নাজরাতের কপালে চুমু খেলো সে। পরপরই নাজরাতকে বুকে জড়িয়ে চোখ বুজলো। শরীর ও মন জুড়ে প্রশান্তির হাওয়া বয়ে চলছে যেনো। মনে মনে বললো, এই রাত দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ হোক। তার ভালোবাসার মানুষটা এভাবেই সর্বদা তার বুক পিঞ্জিরায় আবদ্ধ থাকুক!!
