Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৩১+৩২

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৩১+৩২

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৩১+৩২
সাজিয়া জাহান সুবহা

মাঝে কেটেছে দুইদিন। কলেজ প্রোগ্রাম, ট্যুর এসবের চক্করে সকলের পড়াশোনা লাটে উঠেছে একেবারে। এইতো, মাসটা পেরুলেই ফার্স্ট টার্ম পরীক্ষার রুটিন দিয়ে দিবে। তা ভেবেই মুখ ভার হলো সকলের। এই না কিছুদিন হলো তারা দ্বিতীয় বর্ষে উঠেছে! ওমনি পরীক্ষা নামক ঝড় শুরু! লাইব্রেরি রুমের মাঝামাঝি সিটে বসে দ্রুত হাতে অ্যাসাইনমেন্ট করছিলো নুহাশ। সাফ্রিনের খাতা থেকে সব কপি করছে সে। আজকেই লাস্ট ডেট। কিন্তু সে লিখা শুরু করেছে মাত্র একদিন হলো। প্রতিবারের মতো এবারেও তাকে সবার শেষে জমা দিতে হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। পাশের সিট থেকে সায়েরী লিখা শেষ করে লম্বা শ্বাস ফেললো,

‘ আহ বাবা! শেষমেশ ফুরালো। ‘
কন্ঠ শুনে নুহাশ কলম থামিয়ে তাকালো সায়েরীর দিকে। তার এখনো অর্ধেকের বেশি লিখা বাকি। নিমিষেই মেজাজ চটে গেল তার। পেপার ঠেলে বলে উঠলো,
‘ ধ্যাঁত্তেরি,বা*ল! ‘
উপস্থিত পাঁচ জন হুট করেই তাকালো নুহাশের দিকে। সায়েরী নুহাশের মনোভাব বুঝতে পেরে খিলখিল করে হেসে উঠলো।
‘ বলেছিলাম না তোর আগে শেষ করবো? দেখলি তো! ‘
‘ বেশি লাফাঝাফা করবি না তিন ফুটের মাইয়া। তোর অর্ধেকের বেশি লিখা তো প্রতিবার এই আয়াইন্নার বাচ্চা লিখে দেই। আজ আমার এমন একটা বন্ধু নাই দেখে লিখা শেষ করতে পারলাম না বা*ল। ‘
আয়ান বই থেকে মুখ তুলে তাকালো। গমগমে গলায় বললো,
‘ এক সপ্তাহ হয়েছে আমি তোকে আমার অ্যাসাইনমেন্টের কপি দিয়েছি। আর তুই লিখছিস পরশু রাত থেকে। এখানে কি আমার দোষ? প্রতিবারই এমন করিস তুই। ‘
সাফ্রিন আয়ানের কথায় সায় জানিয়ে বললো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

‘ শুধু ওকে বলে লাভ কি! এই মেয়েকে দেখ, তোর আশকারা পেয়ে ওর আলসেমি আকাশ ছোঁয়া হচ্ছে দিনকে দিন। এবারেও মাত্র শেষের চ্যাপ্টার-টা লিখেছে নিজে। বাকিটা তোকে দিয়েই লিখিয়েছে। এই দুজনকে নিয়ে কি যে হবে! ‘
আয়ান কিছুই বললো না। সায়েরীর জন্য সাত খুন মাফ, এমনই মনোভাব তার। ফায়াজ এবং তোহা বই খাতা গুছিয়ে নিচ্ছে। ক্লাস শুরু হবে একটু পর। ক্লাসে যেতে হবে তাদের। নিজের পেপার সব গুছিয়ে সায়েরী পানির বোতল হাতে নিয়েই দেখলো পানি শেষ। অগত্যা একা একাই ছুটলো সে পানি আনার জন্য৷ বাকিরা নিজ নিজ কাজে ব্যাস্ত।

নাজরাতের অ্যাসাইনমেন্ট-টা নিজের টার সাথে গুছিয়ে নিলো তোহা। ভাগ্যিস সাফ্রিনের সাথে নাজরাত আগে ভাগেই লিখা কমপ্লিট করে ফেলেছিলো। নয়তো হানিমুনের চক্করে সব ভেস্তে যেতো। সাফ্রিনের কানে কথাগুলো বলে মিটিমিটি হাসছিলো দুজন। মিনিট কয়েক পেরুনোর পর হতদন্ত পায়ে লাইব্রেরিতে প্রবেশ করলো সায়েরী। চোখে, মুখে ভয়ানক উৎকন্ঠা তার। বোধহয় দৌড়ে এসেছে, যার কারণে হাঁপাচ্ছে সে। থুতনিতে জমা ঘামটুকু হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে বন্ধুদের দিকে তাকালো সে। তারা গোলগাল চোখে তাকিয়ে আছে সায়েরীর দিকে। সায়েরীর ফ্যাকাসে মুখ দেখে রীতিমতো হতবাক সকলে। হুট করে কি হলো এই মেয়ের! একটু আগ অবধি দিব্যি হাসিমুখে বসেছিলো। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে কি এমন হলো! আয়ান সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। সায়েরীর কাছাকাছি এসে উদ্বিগ্ন কন্ঠে বললো,

‘ কি হয়েছে? পানি না নিয়েই ফিরে এলি কেনো? শরীর খারাপ লাগছে? ‘
চোখে জল জমলো সায়েরীর। ঠেলেঠুলে বেরিয়ে আসতে চাইলো চোখ বেয়ে। কিন্তু সায়েরীর শক্ত মনোবলের জন্য তা সম্ভব হলো। আয়ানের দিকে না তাকিয়েই সে কম্পিত কন্ঠে বললো,
‘ আ..আমি, আমি বাড়ি যাবো। ‘
বলতে না বলতেই হাত বাড়িয়ে ব্যাগ তুলে নিলো সে। উপস্থিত পাঁচ জন ফ্যালফ্যাল নজরর তাকিয়ে আছে। সায়েরী ব্যাগ কাঁধে তোলার আগেই আয়ান কেড়ে নিলো ব্যাগ। কারো তোয়াক্কা না করে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সায়েরীর হাত টেনে লাইব্রেরি থেকে বের হতে হতে বললো,

‘ নিশ্চয়ই আজও না খেয়ে এসেছিস, তাই খিদের জ্বালায় মাথা উলোটপালোট হয়ে আছে তোর। আমার খেয়ালই ছিলো না সময়ের দিকে। চল ক্যানটিনে। আগে খেয়ে নে। তারপর বাকি কথা। ‘
সায়েরী প্রতিউত্তর করলো না কোনো। সে জানে আয়ান ভুলিয়ে ভালিয়ে ঠিকই পেটের কথা বের করে আনবে এখন৷ তাছাড়া সায়েরী চেয়েও আয়ান এবং নাজরাতের কাছে কিচ্ছুটি লুকিয়ে রাখতে পারে না কখনো। তাই চুপচাপ আয়ানের সাথে সে চলতে লাগলো ক্যানটিনের উদ্দেশ্যে। সায়েরী’কে মাঝামাঝি টেবিলের একটা চেয়ারে বসিয়ে আয়ান গিয়েছে খাবার নিয়ে আসতে৷ হাতে দুই কাপ চা নিয়ে সে সবে পিছন ফিরেছে এমন সময় হঠাৎ কানে আসলো সায়েরী’র আতংকিত কন্ঠের ডাক, ‘ আয়ান!!! ‘
আয়ান চমকালো। দ্রুত পায়ে সায়েরীকে রেখে যাওয়া স্থানে ফিরে দেখতে পেলো অনার্স ফাইনাল ইয়ারের চারজন সিনিয়র সায়েরীকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। তার মাঝে ভীতু মুখে দাঁড়িয়ে সায়েরী। কানে আসে একজন ছেলে হেসে বলছে,

‘ তখন ওভাবে পালিয়ে আসলে কেনো? আরে আমরা কি খারাপ কিছু বলেছিলাম? নাকি…ওমন পয়সাওয়ালা একজনকে পেয়ে আমাদের চোখে পড়ছে না? ‘
বলেই হু হা করে হেসে উঠলো চারজন। কথাগুলো শুনে গা জ্বলে উঠলো আয়ানের। হাতের কাপ ছুড়ে ফেলে একজনকে ঠেলে সায়েরী’কে আগলে দাঁড়ায় সে। সম্মুখে উপস্থিত চারজনের দিকে তাকিয়ে গলায় কাঠিন্য ঢেলে বলে,
‘ কি হচ্ছেটা কি এখানে? এভাবে একটা মেয়েকে হ্যারেস করতে লজ্জা করছে না আপনাদের? ‘
হঠাৎ আয়ানের আগমনে চমকে উঠেছিলো ছেলেগুলো। লক্ষ্য করলো সায়েরী পেছন থেকে একহাতে আয়ানের বাহু খামচে ধরেছে। সেটা দেখে হেসে উঠলো তারা। বাঁকা নজরে আয়ানের হ্যাংলা, পাতলা শরীরটা দেখে বললো,

‘ ওহ-হো! এখানে দেখি নাগরের কমতি নেই। তা এই শরীর দিয়ে পোষাইতো নাকি তোমা….. ‘
বাকি কথাটুকু শেষ করার আগেই আয়ানের শক্ত হাতের ঘুষিতে ছেলেটার কথা থেমে গেলো। রক্তবর্ণ ধারণ করেছে আয়ানের মুখ। ছেলেটা উঠে দাঁড়ানোর আগেই আয়ান তার কলার চেপে ধরে আবারো ঘুষি বসিয়ে দিলো। গর্জে উঠে বললো,
‘ তোর সাহস কি করে হয় ওর সম্মন্ধে এমন নোংরা কথা বলার? ‘

উপস্থিত বাকি তিনজন ছেলে পেছন থেকে আয়ানকে আঘাত করে৷ তা দেখে ডুকরে কেঁদে উঠলো সায়েরী। ভয়ে,উত্তেজনায় সর্বাঙ্গ অসম্ভব কাঁপছে তার। মুহূর্তেই ক্যানটিন হই হুল্লোড়ে ভরে উঠলো। ফায়াজ, নুহাশরা নিজেদের ব্যাগপত্র গুছিয়ে ধীরে সুস্থে আসছিলো। কিন্তু ক্যান্টিনে উপস্থিত হওয়ার পর এই দৃশ্য দেখে চমকে উঠলো তারা। ভীড় ঠেলে আয়ানকে সরিয়ে আনলো জোর করে। ইতিমধ্যে আয়ানের ঠোঁট ফেটে রক্ত বেরুচ্ছে। গালে, কপালেও জখম হয়ে গিয়েছে। উপস্থিত আরো অনেক ছেলে মিলে দুই পক্ষের মারপিট থামালো। সাফ্রিন এবং তোহা এক জায়গায় জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। হঠাৎ কান্নারত সায়েরীকে মুখ চেপে দৌঁড়ে সিড়ির দিকে যেতে দেখে চমকে উঠলো তারা। সায়েরীর নাম ধরে ডাকতে ডাকতে তারাও পিছনে ছুটলো।

আয়ানের মতো শান্ত ছেলেটার হঠাৎ এই রূপ হজম করতে পারছে না ফায়াজ এবং নুহাশ। কিছু যে জানতে চাইবে তার আগেই সাফ্রিন এবং তোহার মুখে সায়েরীকে ডাকতে শুনে সেদিকে পা বাড়ালো আয়ান। পেছনে নুহাশ এবং ফায়াজ। তাদের গমন পথের দিকে তাকিয়ে ছিলো রবিন নামক ছেলেটা। যে এতোক্ষণ আয়ানের হাতে মার খেয়েছে। জুনিয়র একটা ছেলের হাতে এতোগুলো মানুষের সামনে মার খেয়ে তার অহংকারে আঘাত লাগলো ভীষণ। তরতরিয়ে বাড়লো চাপা ক্ষোভ। নিজের ক্ষোভটুকু মেটাতে সে পাশের জনকে বললো মোবাইল দিতে। ছেলেটা মোবাইল এগিয়ে দিতেই রবিন মিনিট খানিক কিছু একটা করে বাঁকা হাসলো। তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা এই দৃশ্য চেয়ে চমকে উঠলো। ভীত স্বরে বললো,

‘ এটা কি করলি! মাথা ঠিক আছে তোর? এখানে মেয়েটার সাথে যার নাম জড়িয়ে আছে সে জানলে জিন্দা গেড়ে দিবে আমাদের। ‘
রবিন নামক ছেলেটা দায়সারা ভাবে হাসলো। বললো,
‘ আরে কার আইডি থেকে গিয়েছে এটা খুঁজে পেলেও চিনতে পারবে না। যেই মেয়ের জন্য আজ আমাকে অপমানিত হতে হয়েছে, সেই মেয়ের তেজ আমি মাটিতে মেশাবো। ‘
উপস্থিত বাকি তিনজন ফাঁকা ঢোক গিললো। ব্যাপারটা যতোটা সহজভাবে রবিন নিচ্ছে ততোটাও সহজ নয়। যে মানুষটা এসবের সাথে জড়িয়ে পড়েছে সে একবার খুঁজে বের করতে পারলে কি হবে ভেবেই বুক কেঁপে উঠছে তাদের।

বন্ধ রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে আয়ান,নুহাশ,ফায়াজ,সাফ্রিন এবং তোহা। অনবরত ক্লাস রুমের দরজায় করাঘাত করে চলছে তারা। নিস্তব্ধ বারান্দা। তিনতলার এই দিকটা সম্পূর্ণ ফাঁকা। আশেপাশে ক্লাসরুম গুলোও ফাঁকা পড়ে আছে। আয়ান অধৈর্য হয়ে শক্ত হাতে দরজায় আঘাত করে বলে উঠলো,
‘ সায়ু! সায়ু দরজা খোল। দেখ, আমরা সবাই আছি এখানে। কেউ কিছু বলতে পারবে না। বেরিয়ে আয় প্লিজ!! ‘
উপাশ থেকে সাড়া শব্দ আসলো না কোনো। পাঁচজনেরই ভয়ে বুক কাঁপছে। হঠাৎ একই সাথে সকলের মোবাইল নোটিফিকেশনের শব্দ হলো। কেউ অবশ্য পাত্তা দিলো না সেদিকে। তোহার মোবাইলটা হাতেই ছিলো। কৌতুহল বশত সে নোটিফিকেশন চেক করতে গিয়ে চমকে উঠলো। মৃদু স্বরে চেঁচিয়ে বললো,

‘ ইয়া আল্লাহ! ‘
হৃদপিণ্ড ধরাস ধরাস করে লাফাচ্ছে তার। টলমল করছে মোবাইল ধরে রাখা হাত৷ যেকোনো মুহূর্তে হাত ফসকে মোবাইল পড়বে পড়বে ভাব। তোহার চিৎকার শুনে এবং তার চোখে মুখের ভয়ানক উৎকন্ঠা দেখে বাকিরা সায়েরীর দিক থেকে মনযোগ সরিয়ে তোহার দিকে তাকালো। ফায়াজ কেড়ে নিলো তোহার মোবাইল। এবং প্রায় সাথে সাথে স্ক্রিনে দৃষ্টিপাত করেই চোখজোড়া বড় বড় হয়ে গেলো তার। একে একে বাকিরাও দেখলো। কারো মুখ দিয়ে কথা বের হলো না কোনো। সাফ্রিন ভয়ে উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়লো জমিনে। মোবাইল হাতে স্তব্ধ হয়ে আছে আয়ান। কলেজ গ্রুপে এই মাত্র একটা ছবি পোস্ট করা হয়েছে। স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে বান্দরবানের প্রথম রাতে আঘাতপ্রাপ্ত সায়েরীকে কোলে নিয়ে হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সাফওয়ানের দৃশ্যটুকু। খুবই স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে সাফওয়ানের কোলে চোখ বুজে পড়ে আছে সায়েরী। সাফওয়ান মাথা ঝুকিয়ে আছে তার দিকে। দেখে মনে হচ্ছে কপালে চুমু খাচ্ছে সে সায়েরীর। আয়ান বিষ্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলো সাফওয়ান কিংবা সায়েরী কারো শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্ন নেই। সম্পূর্ণ জায়গা জুড়ে সাফওয়ান এবং সায়েরী ব্যাতিত অন্য কোনো ব্যাক্তির অস্তিত্বও নেই। এতো নিখুঁত এডিটিং দেখে রীতিমতো হতবাক সে। এটাই তবে কারণ ছিলো একটু আগে সায়েরীর চরিত্র নিয়ে বাজে ইঙ্গিত তোলার! চোয়াল শক্ত হলো আয়ানের। বন্ধ দরজার পানে তাকিয়ে স্তব্ধ সাফ্রিনের দিকে তাকালো সে। গমগমে গলায় বললো,

‘ সাফওয়ান ভাই’কে ফোন দে। এই মুহূর্তে উনাকে কলেজে দেখতে চাই আমি। ‘
সাফ্রিন চমকালো এই কন্ঠ শুনে। মোবাইল বের করেছিলো এমন সময় হতদন্ত পায়ে সেই স্থানে ছুটে আসলো নীতি, রায়ান এবং জিমন। সবার দিকে এক পলক তাকিয়ে নীতি উদ্বিগ্ন কন্ঠে বললো,
‘ সায়েরী কোথায়? ‘
সাফ্রিন ইশারায় বন্ধ রুমের দিকে ইশারা করলো। অস্থিরতায় মাথা চেপে ধরলো নীতি। বিড়বিড় করে বললো,
‘ এসব কি হয়ে গেলো! আল্লাহ! ‘
সাফ্রিন নিজের অস্থিরতা লুকিয়ে কম্পিত কন্ঠে বললো,

‘ ভ..ভাই জানে? ‘
মাথা নাড়লো নীতি। বললো,
‘ ওকে ফোনে পাচ্ছিনা। মিহাদ গিয়েছে। এবার সাফওয়ান-ই শেষ ভরসা। সায়েরী! ও ঠিক আছে তো? ‘
জবাব দিতে পারলো না কেউ। কারো সাহস হলো না সায়েরীকে পুণরায় ডাকার। সকলে চিন্তা মুখে রুমের বাইরে এলোমেলো ভাবে দাঁড়িয়ে রইলো। তোহা সায়েরীর চিন্তায় কেঁদে দিয়েছে। কলেজে সকলের মাঝে টান টান উত্তেজনা বিরাজ করছে। আধ ঘন্টা আগের দৃশ্য বদলে এখন সবখানে গুঞ্জনে ভরপুর। টিচারগণ নিজেদের মাঝেই পরামর্শে ব্যাস্ত। ক্লাসের সময় পেরিয়ে গেলেও কারো হেলদোল হলো না। তরতাজা নিউজ নিয়েই সকলের যতো কৌতুহল। নিরবতা কেটে হঠাৎ মোবাইল বেজে উঠলো জিমনের। স্ক্রিনে ভেসে উঠলো সাফওয়ানের নাম। খানিকটা আড়ালে গিয়ে কল রিসিভ করলো সে।

‘ বল। নিউজ দেখেছিস? ‘
……………….
‘ আমি কন্টাক্ট করবো? এভাবে দিবে? ‘
…………………….
‘ ওকে ওকে। হয়ে যাবে তুই আয়। ‘
……………………….
‘ হ্যাঁ। জানিনা ঠিক আছে কিনা। ‘
……………………….
‘ আচ্ছা। আমি বাবাকে বলছি। তুই দ্রুত আয়৷ ‘
কল কেটে রায়ানকে ডাকলো সে। সাফওয়ানের বলা কথাগুলো জানাতেই রায়ান বললো,
‘ এতো তাড়াতাড়ি দিবে ওরা? ‘
জিমন মোবাইলে কিছু একটা করতে করতে জবাব দিলো,
‘ কমিশনারের ছেলে হওয়ার কিছুতো ফায়দা তুলতেই হয় দোস্ত। চল, কাজে লেগে পড়। যা হবে সব লাইভ ট্যালিকাস্ট চলবে। রেকর্ডিং করার দ্বায়িত্ব তোর আর আমার। ‘
বাকিদের রেখে দুজন চলে গেলো। কেটে গেলো মিনিট বিশেক।
তিন তলার বারান্দা থেকে মাঠের দিকে চিন্তিত মুখে তাকিয়ে ছিলো নীতি। হঠাৎ গেইট পেরিয়ে ঢুকা কালো বাইকটা দেখে চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো তার। চঞ্চল কন্ঠে বললো,
‘ সাফওয়ান এসেছে! ‘

বাকিরাও উৎসুক নজরে তাকালো। মনে মনে একটুখানি স্বস্তি পেলো যেনো। গেইট পেরিয়ে ধূলো উড়িয়ে ঢুকেছে সাফওয়ানের কালো বাইক। বাইকের উপর কালো শার্ট এবং কালো প্যান্ট গায়ে সে টানটান হয়ে বসা। বাতাসে এলোমেলো উড়ছে তার ব্রাউন, সিল্কি চুলগুলো। বাইক থামিয়ে দ্রুত নেমে দাঁড়ালো সে। সবসময়ের ফর্সা মুখশ্রী আজ অনেকটা লালছে হয়ে আছে। সেই সাথে অন্য দিনের চেয়ে অতিমাত্রায় গম্ভীর হয়ে আছে সুন্দর মুখখানা। বোধহয় অনেকটা তাড়াহুড়ো করে কলেজে এসেছে সে। যার কারণে শার্টের টপ তিনটে বোতাম খোলা। যার ফাঁকে ফর্সা বুকের লালছে ক্ষত চিহ্ন উঁকি দিচ্ছে। কলেজের ঝাঁক ঝাঁক স্টুডেন্ট উৎসুক নজরে তাকিয়ে আছে সেদিকে। ফিসফিস করছে অধিকাংশ ছেলে। মেয়েরা আপাতত এই সুদর্শন মানবের আকর্ষণীয় রূপ দেখতে ব্যাস্ত। বাইক পার্ক করেই উন্মুক্ত বুক বোতাম লাগিয়ে ঢেকে নিলো সাফওয়ান। তীক্ষ্ণ চোখে একবার পরখ করলো সবদিক। তার গভীর বাদামি চোখজোড়ার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেখে চুপসে গেলো অনেক মুখ। সাফওয়ান পাত্তা দিলো না সেদিকে। শার্টের হাতা ফোল্ড করতে করতে সে দ্রুত পায়ে এগুলো অনার্স ভবনের দিকে। মিহাদ নিজের বাইক পার্ক করে সাফওয়ানের পায়ে পা মিলিয়ে চলছে। প্রিন্সিপাল এবং কয়েক জন টিচার হঠাৎ পথ রুখে দাঁড়ালো তার। সাফওয়ান গম্ভীরমুখে সালাম দিলো প্রথমে। টিচারদের কেউ-ই অন্যদিনের মতো হাসিমুখে কথা বললো না আজ৷ সাফওয়ান নিজেও চাই না তারা কেউ কিছু বলুক। তাই কেউ মুখ খোলার আগেই সে বলে উঠলো,

‘ আমি আপনাদের সব কথা শুনবো, স্যার। তবে এখন হাতে সময় নেই। ‘
মাত্র উপস্থিত হওয়া জিমন এবং রায়ানের দিকে ইশারা করলো সাফওয়ান। জিমন ঝটপট উত্তর দিলো,
‘ পাঁচ মিনিটের মধ্যে পেয়ে যাবো। ‘
উত্তর শুনে আবারো প্রিন্সিপালের দিকে তাকালো সাফওয়ান। বললো,
‘ পাঁচ মিনিটের মধ্যে সকল স্টুডেন্ট যেনো অডিটোরিয়ামে জড়ো হয়। সাথে আপনারাও আসুন। আপনার সব প্রশ্নের উত্তর আমি সেখানে দিবো। এখন আসি। ‘
বলেই আবারো সামনের দিকে সামনের দিকে অগ্রসর হলো সে। মাঝে এক সেকেন্ডের জন্য থামলো। রায়ানের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো, ‘ সে কই? ‘
রায়ান মিটিমিটি হেসে জবাব দিলো,

‘ তৃতীয় তলায় আছে। ফাঁকা ক্লাসরুমে। দরজা আটকে বসে আছে। ‘
উত্তর পেয়ে আর এক সেকেন্ডও নষ্ট করলো না সাফওয়ান। গটগট পায়ে উঠে গেলো তৃতীয় তলায়। রুমের সামনে উপস্থিত সকলের দিকে একপলক তাকিয়ে সে গিয়ে দাঁড়ালো বন্ধ দরজার সামনে। এরপর ধমাধম শব্দ তুলে করাঘাত করলো দরজায়। নিস্তব্ধ রুমে কান্নারত সায়েরী আচমকা এমন ভারী আওয়াজে ভয় পেয়ে গেলো। পরপর কানে আসলো সাফওয়ানের রাশভারি কন্ঠ,
‘ তুমি কি দরজা খুলবে, না আমি দরজা ভেঙ্গে ভিতরে আসবো? ‘
কন্ঠটা শুনে চমকে উঠলো সায়েরী। কেঁপে উঠলো বুক। নড়াচড়ার ক্ষমতা হারালো যেনো সে। অধৈর্য কন্ঠে সাফওয়ান আবারো বলে উঠলো,
‘ পাঁচ অবধি কাউন্ট করবো। এর মধ্যে দরজা না খুললে আমি দরজা ভেঙ্গে ভিতরে আসবো কিন্তু। নাও চয়েস ইজ ইউর্স সুবহা। ‘

সায়েরী চট করে দাঁড়িয়ে পড়লো বসা থেকে। সে জানে মোটেও ফাঁকা আওয়াজ দিচ্ছে না সাফওয়ান। এই ছেলে যা বলে তা করেই ছাড়ে। অন্যদিকে সাফওয়ান সায়েরীর জবাব না পেয়ে মাত্র কাউন্ট ডাউন শুরু করছিলো। এমন সময় হুট করে খুলে গেলো রুমের দরজা। চমকে উঠলো সাফওয়ান ব্যাতিত অন্যরা৷ দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলো সাফওয়ান। সম্মুখে সায়েরীর অসম্ভব ফোলা চোখ, মুখ দেখে বুক কেঁপে উঠলো তার। রুমে ঢুকেই পায়ে ঠেলে পুণরায় দরজা লাগিয়ে দিলো সে। তা দেখে ভয়ে গলা শুকিয়ে আসলো সায়েরীর। সাফওয়ানের এমন লালছে মুখখানা দেখে তার ভয় বাড়লো। সে বুঝলো, এই লালছে ভাব রাগের। অতিরিক্ত ভয়, উত্তেজনায় থরথর করে কেঁপে উঠলো তার ছোট্ট দেহ। চোখের পানি বাঁধ ভাঙ্গতে চাইলো। মন বলছে, সাফওয়ান ভাই আজ তাকে জিন্দা গেড়ে ফেলবে। তার জন্য এই মানুষটার সম্মান ধূলিসাৎ হয়েছে। আজ নিশ্চয়ই সাফওয়ানের হাত থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না তাকে। কেউ না! সাফওয়ান কি করবে? সেই সন্ধ্যায় জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়ার অভিযোগে আজ বকবে? নাকি এমন বিশ্রী একটা ছবি জনসম্মুখে আসার জন্য থাপ্পড় মারবে! কি করবে?

মিনিট বিশেকের কান্নায় সায়েরী’র চোখ, মুখ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। টকটকে লাল, টলমল চোখজোড়া ভীতিকর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সম্মুখে স্থির মানবের দিকে। নাকের ডগাও লালছে হয়ে আছে। ফোলা ফোলা গালে চোখের জলের সুক্ষ্ম দাগ বসে গিয়েছে। থেমে থেমে কাঁপছে পাতলা ঠোঁট জোড়া। সাফওয়ান এই দৃশ্য দেখে এক মুহুর্তের জন্য থমকালো। রাগ,ক্ষোভ কোথাও হাওয়া হয়ে গেলো যেনো। সেখানে এসে ভর করলো আকাশ-সম আদুরে এক অনুভূতি। আনমনে এক কদম এগিয়ে গেলো সে। যা দেখে বুকের ভিতর ধ্ক করে উঠলো সায়েরী’র৷ ভয়ে দুই, তিন কদম পিছিয়ে গেলো সে। তার শ্বাস চলছে অস্বাভাবিক গতিতে। তীব্র আতংকে ডুকরে কেঁদে উঠলো সে। হঠাৎ তার এমন প্রতিক্রিয়া দেখে চমকে উঠলো সাফওয়ান। মুখ ফুটে কিছু বলবে তার আগেই বেঞ্চের সাথে লেপ্টে গিয়ে ক্রন্দনরত সায়েরী এলোমেলো সুরে বললো,

‘ আ..আমি..আমি কিছু ককরি নি। ব..বিশ্বাস করুন৷ আম..আমি জানতাম না ওরা..ওরা ছবি তু…. ‘
কথার মাঝে আচমকা তার হাত টেনে ধরলো সাফওয়ান। হেঁচকা টানে তাকে মিশিয়ে নিলো নিজের প্রসস্থ বুকের সাথে। সায়েরী মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো,
‘ হুশ! শান্ত হও। রিলেক্স! কান্না করছো কেনো? আমি কিছু বলেছি? বকেছি? ‘
বিষ্ময়ে কিংকর্তব্যবিমুঢ় সায়েরী’র মস্তিষ্ক এলোমেলো হয়ে পড়লো যেনো। অপরিচিত এক অনুভূতি ছেয়ে গেলো সর্বাঙ্গে। থরথর করে কাঁপতে লাগলো তার ছোট দেহ৷ সেই কম্পন অনুভব করে সাফওয়ান আরো একটু দৃঢ় করলো হাতের বন্ধন। চুলের মাঝে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মাথা ঝুকিয়ে সায়েরীর কানের কাছে মুখ নিয়ে সে শীতল কন্ঠে বললো,

‘ কাম ডাউন সুবহা। আমি কিছু বলবো না৷ একদম বকবো না৷ ডোন্ট প্যানিক। ‘
শান্ত, শীতল কন্ঠটা কর্ণগোচর হতেই চোখ বুজে ফেললো সায়েরী। চোখ বেয়ে পুণরায় জল গড়ালো তার। কম্পিত হাত তুলে সে শক্ত করে খামচে ধরলো সাফওয়ানের পৃষ্ঠদেশ। ঠিক এটুকু ভরসার-ই প্রয়োজন ছিলো তার। যা পেয়ে আবেগে আপ্লূত হয়ে ফুঁপিয়ে উঠলো সে৷ ক্রন্দনরত কন্ঠে বললো,
‘ আম..আমি কিচ্ছু ককরিনি। ব..বিশ্বাস করুন। ‘
সাফওয়ান প্রথমে জবাব দিলো না কোনো। বুকের মাঝে থেমে থেমে নিরব কান্নায় কেঁপে কেঁপে উঠা মেয়েটাকে সামলে উঠতে সময় দিলো একটু। এক পর্যায়ে কান্না থামলো সায়েরী’র। তবে হেঁচকি তুলছে মাঝে মাঝে। সাফওয়ান পুণরায় ঝুকে আসলো সায়েরীর কানের কাছে। ঠান্ডা স্বরে বললো,

‘ সিড়িতে দাঁড়িয়ে রবিন কি বলেছিলো তোমাকে? ‘
সায়েরী চমকালো। ঘন্টা খানিক আগের দৃশ্যটুকু চোখের সামনে ভেসে উঠতেই শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠলো তার। সাফওয়ানের শার্ট আকড়ে ধরা হাত আরো শক্ত করলো। সাফওয়ান অনুভব করলো সবই। সায়েরী চুলের ভাঁজে আঙ্গুল সঞ্চালন করে শীতল কন্ঠে সে বললো,
‘ কোনো লুকোচুরি চাইনা আমি। যা হয়েছে সবটা বলো। আই ওয়ান্ট টু নো, ইচ অ্যান্ড এভ্রি ডিটেইলস। ‘

সায়েরী ঢোক গিললো। কেনো যেনো মনে হলো সাফওয়ানের কন্ঠে মিশে রয়েছে চাপা ক্রোধ৷ রবিন নামক ছেলেটার কথা মাথায় আসতেই অন্যমনস্ক হয়ে গেলো সায়েরী। মনে পড়ে গেলো ঘন্টা খানিক আগের ঘটনা। বোতল হাতে সে যখন লাইব্রেরি রুম থেকে বেরিয়ে নিচে যাচ্ছিলো, অনার্স ভবনের দ্বিতীয় তলার সিড়িতে হঠাৎ তার পথ রুখে দাঁড়িয়েছিল রবিন এবং তার সঙ্গের তিন ছেলে। আকস্মিক তাদের আগমনে সায়েরী ভয় পেয়েছিল খুব। তাছাড়া বান্দরবানের ঘটনার পর থেকে স্বাভাবিক কিছুতেই সায়েরী ভয় পেয়ে যায় ভীষণ। সেখানে আজ চারজন যুবক’কে এমন পথ আটকে দাঁড়াতে দেখে অবচেতন মন ভয়ে, আতংকে কেঁপে উঠেছিলো তার। ছেলেগুলো সায়েরী’কে আগাগোড়া দেখে খুব বিশ্রীভাবে হাসলো। সায়েরী’র গা ঘিনঘিন করে উঠলো সেই হাসি দেখে। চোখ, মুখ যথাসম্ভব শক্ত করে সে বলে উঠলো,

‘ পথ ছাড়ুন। ‘
রবিন ফিচেল হেসে জবাব দিলো ,
‘ এখনো তো ধরতেই পারলাম না। তার আগেই ছেড়ে দিবো? ‘
সায়েরী শক্ত চোখে তাকালো। ধাক্কা দিয়ে রবিনকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে বললো,
‘ পথ ছাড়ুন নয়তো আমি চিৎকার করবো। ‘
সায়েরী’র বাড়ন্ত হাতটা খপ করে চেপে ধরলো রবিন। কদম এগিয়ে মুখোমুখি হলো সায়েরীর। ফিসফিস করে বললো,
‘ এতো ভাব নিচ্ছো কেনো ডার্লিং! ওমন হ্যান্ডসাম এবং রিচ একজনকে হাত করে এখন আমাদের চোখে পড়ছে না নাকি? ‘
‘ কিসব বাজে কথা বলছেন? ছাড়ুন বলছি। ‘
‘ আহ! এতো ছটফট করছো কেনো? আচ্ছা ওয়েট, তোমাকে তোমার রঙ্গলীলা’র হট পিকচার’টা একটু দেখাই। এ্যাঁই ছবিটা একটু দেখা তো! ‘

রবিনের বলা মাত্রই পাশ থেকে একজন মোবাইল স্ক্রিন মেলে ধরলো সায়েরী’র সামনে। স্ক্রিনে সাফওয়ানের এবং নিজের এমন আপত্তিকর ছবি দেখে পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেলো সায়েরী’র। অবিশ্বাস্য নয়নে সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো ছবিটার দিকে। তার এমন প্রতিক্রিয়া দেখে ছেলেগুলো হেসে উঠলো। রবিন সায়েরী’র হাতটা আরো জোরে চেপে ধরে নিচু কন্ঠে বললো,
‘ এতো অবাক হচ্ছো কেনো ডার্লিং! বাই দ্যা ওয়ে, আমাকে একবার সুযোগ দিয়ে দেখো। সাফওয়ান খান’র চেয়ে বেশি সেটিসফাইড করবো। আর টাকা নিয়েও কোনো চিন্তা করতে হবে না। আমি ওর চেয়েও মোটা অংকের টাকা দি……

‘ কি হচ্ছে কি এখানে? ‘
কথার মাঝে হঠাৎ করে অন্য কারো কন্ঠ ভেসে আসতেই চমকে উঠলো সকলে। পরিচিত কন্ঠস্বর শুনে সায়েরী মনে জোর পেলো। রবিন অন্যমনস্ক হতেই সায়েরী ঝটকা মেরে ছাড়িয়ে নিলো নিজের হাত। ছেলেগুলো পিছন ফিরতেই দেখলো মিহাদ দাঁড়িয়ে আছে গম্ভীরমুখে। এতোগুলা ছেলের মাঝে সায়েরীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কপালে ভাঁজ পড়লো মিহাদের৷ সায়েরী রক্তশূণ্য ফ্যাকাসে মুখ দেখে মনে সন্দেহ জাগলো তার। ছেলেগুলোকে ঠেলে উপরে উঠলো সে। সায়েরী টলমল চোখে কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে তাকালো তার দিকে। মিহাদ চিন্তিত কন্ঠে বললো,
‘ তুমি এখানে কি করছো? কি হয়েছে? মুখের এই অবস্থা কেনো? ‘
গলায় দলা পাকানো কান্নাটুকু গিলে কিছু একটা বলতে চাইলো সায়েরী। কিন্তু বলতে পারলো না। হাতে অসম্ভব ব্যাথা লাগছে। সেই স্থানে আর এক মুহূর্ত না থেকে দ্রুত পায়ে পুণরায় সে ফিরে গেলো লাইব্রেরি রুমে। মিহাদ প্রশ্ন মুখে তাকিয়ে ছিলো সায়েরীর গমন পথের দিকে। তারপর খেয়াল হলো আশেপাশে ছেলেগুলো নেই। সুযোগ বুঝে পালিয়েছে।

‘ সুবহা! ‘
সাফওয়ানের ডাক শুনে ঘোর কাটলো সায়েরী’র। এতোক্ষণে খেয়াল হলো সে সাফওয়ানের দু’হাতের মাঝে বন্ধি হয়ে আছে। সায়েরী মুখ তুলে তাকালো। সরাসরি চোখ পড়লো সাফওয়ানের গাঢ় বাদামি চোখজোড়ায়। সেই চোখে আজ রাগ, বিরক্তির পরিবর্তে অন্য কিছু ধরা দিচ্ছে। যা দেখে অজানা অনুভূতি সায়েরীকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। চট করে দৃষ্টি নামিয়ে নিলো সে। দ্রুত সরে আসলো সাফওয়ানের বাহু বন্ধন থেকে। সাফওয়ান আটকালো না তাকে। শুধু গলায় জোর ঢেলে আবারো আগের প্রশ্নটা করলো। এবারে জবাব আসলো সায়েরীর পক্ষ থেকে। কোনো কিছু লুকাল না সে। ঠিকঠিক সম্পূর্ণ ঘটনা খুলে বললো৷ এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে হাঁপিয়ে উঠলো সায়েরী। সাফওয়ানের কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখে চোখ তুলে তাকালো সে। এবং হঠাৎ করেই যেনো আৎকে উঠলো।

সাফওয়ানের অসম্ভব লাল চোখ, শক্ত চোয়াল দেখে গলা শুকিয়ে আসলো তার। লক্ষ্য করলো রাগে ফুলে উঠেছে সাফওয়ানের কপালের নীলচে রগ। ক্রোধান্বিত দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে আছে সায়েরীর হাতের দিকে। নিজের হাত বাড়িয়ে হঠাৎ সায়েরীর নরম হাতের কব্জি ছুঁয়ে দিলো সে৷ যেখানে স্পষ্ট চার আঙ্গুলের লালছে ছাপ পড়ে আছে। আচানক সাফওয়ান এমন ব্যাবহারে সায়েরী অবাক হলো৷ কিন্তু এমন ভয়ংকর রেগে যাওয়ার কারণ খুঁজে পেলো না কোনো।
ভিড়িয়ে রাখা দরজা ঠেলে ভিতরে উঁকি দিলো মিহাদ। সাফওয়ান এবং সায়েরী দুজনই ফিরে তাকালো তার দিকে। মিহাদের চোখ শুরুতেই গিয়ে ঠেকল সাফওয়ান এবং সায়েরীর মিলিত হাতের দিকে। যা দেখে একটুখানি বিষম খেলো সে। সাফওয়ানের এই প্রেমিক প্রেমিক রূপ হজম করতে বেশ কষ্ট হচ্ছে বেচারার। সাফওয়ান গম্ভীরমুখে মিহাদের দিকে তাকাতেই সোজা হয়ে দাঁড়ালো মিহাদ। বললো,
‘ অল সেট। সবাইকে অডিটোরিয়ামে জড়ো করেছি। ‘

সায়েরী ড্যাবড্যাব চোখ করে তাকিয়ে রইলো দুই বন্ধুর দিকে। তার একহাত তখনো সাফওয়ানের হাতে। মিহাদের কথা শুনে সাফওয়ান চোখ নামিয়ে একপলক তাকালো সায়েরী’র অবাক মুখখানার দিকে। এরপর আঙ্গুলের ভাঁজে সায়েরী’র আঙুল মিশিয়ে শক্ত করে হাত চেপে ধরে বললো, ‘ চলো। ‘
বলে আর এক সেকেন্ড ও দাঁড়ালো না সে। লম্বা লম্বা পা ফেলে বেড়িয়ে গেলো রুম থেকে। রুমের বাইরে উপস্থিত সকলে উৎসুক নজরে তাকিয়ে ছিলো। সায়েরী ভোঁতা মুখে ঠোঁট উলটে তাকালো আয়ানের দিকে। বোঝাতে চাইলো ‘কি হচ্ছে এখানে?’ আয়ান বলতে পারলো না কিছু। সে নিজেই ঘোরের মধ্যে আছে। সাফওয়ানের পায়ের গতির সাথে গতি মেলাতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে সায়েরী’র। তবুও কিছু বললো না সে। সাফওয়ান সোজা তাকে নিয়ে হাজির হলো অডিটোরিয়ামে। ঝাঁক ঝাঁক স্টুডেন্ট দাঁড়িয়ে সেখানে। পাখির কিচিরমিচিরের মতো কানাঘুষা চলছিলো। এরমধ্যে হঠাৎ সাফওয়ান, সায়েরী’র আগমনে থেমে গেলো সব। প্রশ্নবিদ্ধ চোখে সকলে তাকিয়ে রইলো তাদের দিকে।

অডিটোরিয়ামে সিমেন্ট দ্বারা বাধাই করা উঁচু স্থানে সায়েরীকে নিয়ে দাঁড়ালো সাফওয়ান। তার সম্মুখে খানিকটা নিচু স্থানে সব স্টুডেন্ট এবং টিচার দাঁড়ানো। সাফওয়ানের পেছন দিকে বিশাল সাদা পর্দা। সামনে স্পিকার। খানিকটা দূরে চেয়ারে বসা রায়ান। তার কোলের উপর ল্যাপটপ। পাশেই অন্য একটা চেয়ারে প্রজেক্টের রাখা। মনযোগ সহকারে ল্যাপটপে কিছু একটা করছিলো সে। এমন সময় পকেটে থাকা মোবাইলের রিংটোনের শব্দ আসে কানে। মোবাইল হাতে নিতেই দেখে আবরারের কল। বেশ অনেক্ষন যাবত সাফওয়ান, মিহাদ,জিমন সকলের ফোনের কল করে চলছে সে। নিশ্চয়ই ছবিটা দেখে এমন অস্থির হয়ে আছে। এতোক্ষণ যাবত কেউ তার কল রিসিভ না করলেও এবার বাধ্য হয়ে কল রিসিভ করলো রায়ান। আবরারকে কিছু বলতে না দিয়ে সে দ্রুত বলে উঠলো,
‘ আমি জানি তুই কেনো ফোন দিয়েছিস। তবে আপাতত তোর প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় নেই। গ্রুপেই থাক। সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবি। রাখছি। ‘

কল কেটে আবারো নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো সে। সায়েরীর বন্ধুরা সব এক জায়গায় জড়ো হয়ে আছে। ঢিপঢিপ বুক সকলের। পাশেই চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে মিহাদ এবং নীতি। সাফওয়ানের সোজা অনেকটা দূরে মোবাইলের ক্যামেরা অন করে দাঁড়িয়ে আছে জিমন। সকলের দিকে একপলক তাকিয়ে সায়েরী’র হাত ছেড়ে দিলো সাফওয়ান। সায়েরী’র ভীতু মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে বললো,
‘ ডোন্ট বি টেন্সড। যা হবে চুপচাপ দেখবে শুধু। নাও, স্টে রাইট দেয়ার। ‘
কথাটা বলেই স্পিকারের সামনে এসে দাঁড়ালো সে৷ কপালে পড়ে থাকা চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করে গম্ভীরমুখে তাকালো উপস্থিত সকলের দিকে। চাপা গুঞ্জনে ভরপুর চারিদিক। সকলের মনযোগ পেতে সাফওয়ান এবার স্পিকার তুলে রাশভারি কন্ঠে বলে উঠলো,

‘ এটেনশন প্লিজ! আমি কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে চাই। ‘
কথা থেমে গেলো সকলের। কৌতুহলী চোখে সবাই সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে। সায়েরী একরাশ অস্বস্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে। সে বুঝে উঠতে পারছে না সাফওয়ান কি করতে চাইছে। যা-ই করুক, তাকে এভাবে দাড় করিয়ে রেখেছে কেনো! ভাবনার মাঝে আবারো কানে আসলো সাফওয়ানের গম্ভীর কন্ঠ,

‘ আমাকে নিশ্চয়ই চিনেন সবাই। যারা চিনেন না তাদের জন্য বলছি। আই এম সাফওয়ান তেহজিব খান। আই রিপিট…সাফওয়ান তেহজিব খান! আর যেই মেয়েটাকে আমার পাশে দেখতে পাচ্ছেন, সে আমার বেস্ট ফ্রেন্ডের ছোট বোন হয়। সেই সাথে কলেজে আমার জুনিয়র, সায়েরী সুবহা। দুই সপ্তাহ আগে আমরা যে ট্যুরে গিয়েছিলাম, সেখানের একটা ইন্সিডেন্ট নিয়ে খুবই আপত্তিকর একটা ছবি কেউ কলেজ গ্রুপে শেয়ার করেছে। আমি জানি না মানুষটা কে। আর এই মুহূর্তে জানতেও চাচ্ছি না। আমি শুধু আপনাদের সামনে নিজের এবং এই মেয়েটার ইমেজ ক্লিয়ার করতে এসেছি। যদিও আমরা দুজন-ই জানি এমন কোনো সম্পর্ক আমাদের মাঝে নেই, যেমন ভাবে ছবিটা উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু তবুও, আপনাদের মধ্যে হতে কেউ যেনো এই মেয়েটার ক্যারেক্টার নিয়ে কোনো বাজে ইঙ্গিত তুলতে না পারে সেজন্যই এখানে আসা।

কথাটুকু বলেই সাফওয়ান তাকালো রায়ানের দিকে। সাফওয়ানের ইশারা পাওয়া মাত্র রায়ান প্রজেক্টর চালু করলো। নীলচে আলো গিয়ে পড়লো সাফওয়ানের পেছনের বিশাল সাদা পর্দায়। সাথে সাথে সেখানে ভেসে উঠলো বান্দরবানের সেই রাতে হোটেলের সামনে সায়েরীকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্যটুকু। সাফওয়ানের সম্মুখে নীতি, ইরা, মিহাদ,রায়ান এবং জিমন দাঁড়িয়ে। নীতি সায়েরীর কপাল ছুঁয়ে দেখছে। বাকিরাও ঠোঁট নেড়ে বলছে কিছু একটা। এটুকু দেখানোর পর পুণরায় বন্ধ হয়ে গেলো প্রজেক্টের। আবারো গুন গুন আওয়াজে মুখরিত হয়ে উঠলো চারপাশ। সাফওয়ান তাকালো সায়েরীর দিকে। সে আগে থেকেই ছলছল চোখে তাকিয়ে ছিলো সাফওয়ানের দিকে। সাফওয়ান কিছু বললো না। মুখশ্রী গম্ভীর করে পুণরায় স্পিকার মুখের সামনে ধরে বলতে আরম্ভ করলো,

‘ এতোক্ষন যেটা দেখেছেন সেটা ছিলো হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ। নিশ্চয়ই চোখে পড়েছে আমাদের দুজনের শরীরে রক্তের দাগ ছিলো। এবং সাথে আমার বন্ধু, বন্ধবীরাও ছিলো। সেদিন সন্ধ্যা বেলা স্বর্ণ মন্দির থেকে ফিরে আমরা নিজেরা বাইরে বেরিয়েছিলাম। যেহেতু পাহাড়ি রাস্তা তাই ওর (সায়েরী) সাথে ছোট খাটো একটা এক্সিডেন্ট হয়েছিলো। ফলস্বরূপ আমি ওকে প্রোটেক্ট করে কোলে নিয়ে হোটেল অবধি এসেছিলাম। না কি আমরা কোনো কোয়ালিটি টাইম স্পেন্ড করছিলাম এমন খোলা ময়দানে। সাক্ষী হিসেবে আমাদের বন্ধুরা এবং হোটেলের সিসিসিটিভি ফুটেজ মজুদ আছে। আমার বন্ধু আমাকে দ্বায়িত্ব দিয়েছিলো ওর বোনের খেয়াল রাখার। এবং আমি সেটাই পালন করেছি। এনিওয়ে, আমার যা ক্লিয়ার করার ছিলো আমি করে দিয়েছি। এর বাইরে গিয়েও যদি কারো কিছু বলার থাকে তবে নিজেদের মাঝেই বলুন। বাই এনি চান্স, যদি আমার কান অবধি কোনো ভুলভাল স্ক্যান্ডাল আসে, দ্যান আই ওন্ট স্পেয়ার এনিওয়ান। [ I wont spare anyone] ‘

শেষের কথাটা বেশ জোর দিয়েই বললো সাফওয়ান। যা শুনে একটু হলেও বুক কাঁপলো সকলের। সাফওয়ান এবার একহাত পকেটে ঢুকিয়ে বুক টানটান করে দাঁড়ালো। প্রিন্সিপালের দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু গম্ভীর কন্ঠে বললো,
‘ আপনার কিছু বলার আছে স্যার?’
আচমকা সাফওয়ানের এমন প্রশ্নে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলেন প্রিন্সিপাল। তবুও দ্রুত মাথা নেড়ে বোঝালেন কিছু বলার নেই। যা দেখে সাফওয়ানের বন্ধুরা ঠোঁট চেপে হাসলো। স্পিকার ঠিক জায়গায় রেখে ফিরে আসতে গিয়েও হঠাৎ থেমে গেলো সাফওয়ান। ঘাড় ঘুড়িয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো ভিড়ের মধ্যে। চোখাচোখি হলো রবিন নামক ছেলেটার সাথে। সাফওয়ানের চোখের ভয়ংকর দৃষ্টি দেখে রবিন হকচকিয়ে গেলো। অজানা আতংকে গলা শুকিয়ে আসলো তার। ডানে বামে তাকিয়ে নজর লুকাল সে। তার এমন চুপসে যাওয়া মুখ দেখে সাফওয়ান হাসলো মনে মনে। এরপর নজর সরিয়ে সে পুণরায় হাত ধরলো সায়েরী’র। বড় বড় পা ফেলে স্থান ত্যাগ করলো। এতোক্ষণে সব কিছু জিমন লাইভ দেখাচ্ছিলো গ্রুপে। যাতে করে আর কারো মনে কোনো সংশয় না থাকে। আর থাকলেও সাফওয়ানের হুমকি শুনে কার-ই বা সাধ্য আছে চোখ তুলে কিছু বলার?
সায়েরীকে তার বন্ধুদের কাছে ছেড়ে সাফওয়ান এগিয়ে গেলো নিজের বন্ধুদের কাছে। সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই মিহাদ তার কাধ চাপড়ে বললো,

‘ ওরে শালা! মিনিটের মধ্যেই পল্টি খেয়ে গেলি? কি সুন্দর কাহিনি! আমি নিজেই বিশ্বাস করে ফেলেছি। ‘
সাফওয়ান কিছু বললো না। বাকিরা হাসছে। সন্তুষ্টির হাসি। ছেলেটা কিভাবে যেনো সবকিছু মিনিটের মধ্যে সমাধান করে ফেলতে পারে। বন্ধুমহলের বড় থেকে বড় সমস্যার একমাত্র সমাধানের নাম “সাফওয়ান”। আবরারের টেক্সট চেক করছিলো সাফওয়ান। এমন সময় মিহাদ দুষ্টু হেসে বললো,
‘ সবই ঠিক ছিলো। শুধু একটা কথা ভুল বললি। ‘
সাফওয়ান ভ্রুঁ কুঁচকে তাকালো। তা দেখে মিহাদ মেকি হেসে জবাব দিলো,

‘ বন্ধুর বোনের জায়গায় ‘আমার নব প্রেমিকা’ বলা উচিৎ ছিলো। বলতেই পারতি, আমার একটামাত্র নাদুসনুদুস, বাচ্চা প্রেমিকা। তাকে কোলে নিবো না কাঁধে নিয়ে ঘুরবো, এটার কৈফিয়ত আমি আপনাদের দিতে যাবো কেনো? হুয়াই? ‘
মিহাদের কথায় উচ্চস্বরে হেসে উঠলো সকলে। সাফওয়ান বিরক্ত চোখে তাকিয়ে রইলো শুধু। বললো না কিছু। সুযোগ পেয়ে মিহাদ আরো কিছুক্ষণ করলো তাকে। খোঁচা মেরে বললো,
‘ রুমের দরজা বন্ধ করে এতোক্ষণ কি করছিলি রে? আমাকে চাইলে বলতেই পারিস। একদম খবর লিক হবে না, তোর কসম। ‘
অতিষ্ঠ হয়ে স্থান ত্যাগ করলো সাফওয়ান। মিহাদ পেছন থেকে তখনো চেঁচাচ্ছে।

আয়ানের আঘাতপ্রাপ্ত জায়গাগুলো ক্লিন করে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দিচ্ছে তোহা। একটু আগেই ফায়াজ গিয়ে এসব কিনে এসেছে। ব্যাথায় চোখ মুখ শক্ত করে রেখেছে আয়ান। যা দেখে বুক ব্যথা হচ্ছে তোহার৷ খুব যত্ন সহকারে সে ব্যান্ডেজ করছে। মাঝে মাঝে আবার আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলছে, ‘ ব্যথা লাগছে? লাগলে বলবি। ‘ তার এমন চুপসে যাওয়া মুখ দেখে আয়ান মনে মনে হাসলো। তোহাকে দেখে মনে হচ্ছে যেনো ব্যথাটা আয়ানের না, বরং তারই লেগেছে। আয়ান পুরোটা সময় শুধু তোহার দিকেই তাকিয়ে ছিলো। তার একটুখানি ব্যথায় মেয়েটার চোখ মুখ কেমন বিষন্ন হয়ে গিয়েছে। দেখেই বুঝা যাচ্ছে, আয়ানের কষ্টে তার ভিতরটা জর্জরিত হয়ে যাচ্ছে। আয়ান ভাবলো, আগেও কেউ একজন ভালোবাসে বলে দাবি করেছিলো৷ কিন্তু এই ছোট ছোট যত্ন উপভোগ করেনি সে৷ এমন বিষন্ন চেহারা দেখার সুযোগ হয়নি তার। চোখ বুজে শ্বাস নিলো আয়ান। হাত বাড়িয়ে তোহার বোচা নাক টিপে দিলো। সাথে সাথেই বিরক্ত মুখ তাকালো তোহা। যা দেখে আয়ান দুষ্টু কন্ঠে বললো,

‘ এমন প্যাঁচার মতো মুখ করে আছিস কেনো? একদম প্যাঁচাদের নানী লাগছে তোকে। ‘
তোহার রাগ লাগলো বেশ। ছেলেটার দুঃখে তার ভিতরটা ক্ষয় কয়ে যাচ্ছে। অথচ সে মজা লুটছে! রাগ করে সে আয়ানের ক্ষত স্থানে চাপ দিলো। সাথে সাথে ব্যথায় মুখ দিয়ে অস্ফুট আওয়াজ করলো আয়ান৷ তোহা রাগ্বত স্বরে বললো,
‘ করলাম না আর তোর সেবা। আমি তো প্যাঁচা। মানুষের মতো কাউকে খুঁজে এনে বল সেবা করতে। যত্তসব। ‘
তোহা উঠতে গেলেই আয়ান হাত চেপে আটকে ফেললো তাকে। তোহার রাগী চেহারা দেখে শব্দ করে হেসে উঠলো সে। তোহা কটমট চোখে তাকালো তার দিকে। যা দেখে ঠোঁট চেপে হাসি আটকালো আয়ান। বললো,

‘ আচ্ছা, আচ্ছা! আর কিছু বলবো না। ঠোঁটের পাশে রক্ত পড়ছে। ওটাতে মেডিসিন লাগিয়ে যা। ভীষণ জ্বলছে..উফফ্!!’
আয়ানের ব্যথাতুর কন্ঠটা শুনে সব ভুলে আবারো সেবা করতে মগ্ন হয়ে উঠলো তোহা। তুলোয় সামান্য সেভলন লাগিয়ে সেটা লাগাতে গেলো আয়ানের ঠোঁটের নিচে৷ কিন্তু সেদিকে চোখ যেতেই আচমকা বুক কেঁপে উঠলো মেয়েটার। চঞ্চল হলো দৃষ্টি। বুকের কম্পন ধরা দিলো হাতেও৷ সাহস হলোনা এই হাত দিয়ে ছেলেটার ঠোঁট স্পর্শ করার৷ অদ্ভুত এক অস্বস্তি ঘিরে নিলো তাকে। আয়ান শুরুতে খেয়াল না করলেও খানিক পর ব্যাপারটা বুঝতে পেরে নিজেও অস্বস্তিতে পড়ে গেলো। আমতাআমতা করে বললো,
‘ আ..ব এটা রাখ। এখানে বেশি ব্যথা পায়নি। এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে। তুই যা, সায়ুকে দেখ গিয়ে। ‘
আয়ানের বলা মাত্রই উঠে গেলো তোহা। দ্রুত পায়ে চলে গেলো সায়েরীর কাছে। তার গমন পথের দিকে তাকিয়ে তাপ্ত শ্বাস ফেললো আয়ান। মাথা থেকে সব চিন্তা ঝেরে নিজেই ঠোঁটে ঔষধ লাগিয়ে নিলো।

বাড়ি ফিরবে বলে একা একাই ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে আসলো সায়েরী। নিজের অ্যাসাইনমেন্ট বন্ধুদের কাছে জমা দিয়ে এসেছে। এই মুহূর্তে বাড়ি ফিরে একটু রিলেক্স হতে চাই সে। আয়ান এবং ফায়াজ চেয়েছিলো তাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে। সে নিজেই না করে দিয়েছে। শুধু শুধু তার জন্য এমনিতেই অনেক ভুগতে হয়েছে সকলের। সবকিছু মিটে যাওয়ার পরেও শান্তি পাচ্ছে না সে মনে। বারবার কান্না পাচ্ছে। আনমনে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ ধাক্কা লাগলো কিছু একটার সাথে। নাকে ব্যথা পেলো বেশ। চোখ, মুখ কুঁচকে মাথা তুলে তাকালো সে। আবারো সাফওয়ান ভাই! এইতো মানুষটা বরাবরের মতোই বিরক্ত মুখে তাকিয়ে। এখন নিশ্চয়ই গম্ভীরমুখে বলবে,
‘ এই মেয়ে! উঠতে বসতে ধাক্কা খাওয়া কি তোমার জন্মগত দোষ? ‘
কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে সাফওয়ান এমন কিছুই বললো না। বরং সায়েরীর লালচে নাকের ডগা আলতো ছুঁয়ে দিলো শান্ত কন্ঠে জানতে চাইল,

‘ ব্যাথা পেয়েছো? ‘
ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো সায়েরী। সাফওয়ানের এমন ভালোমানুষি হজম করতে কষ্ট হচ্ছে বেচারির। সে একটুখানি সরে দাঁড়ালো। নিম্ন কন্ঠে বললো,
‘ থ্যাঙ্কিউ। দ্বিতীয় বারের মতো, আমার সম্মান বাঁচানোর জন্য। ‘
বলেই পাশ কাটিয়ে যেতে উদ্যত হলো সে। সহসা তার হাত চেপে ধরলো সাফওয়ান। টেনে নিলো নিজের অনেকটা কাছাকাছি। দুজনের মাঝে ইঞ্চিখানেক দুরত্ব মাত্র। সায়েরী ফ্যালফ্যাল নজরে তাকিয়ে রইলো। সাফওয়ান নিজেও গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে। সায়েরীর ফোলা ফোলা মুখশ্রী, লালচে নাক, চোখ, ঠোঁট। গালের উপর সুক্ষ্ম পানির দাগ, সবটা পরখ করে ফাঁকা ঢোক গিললো সে। কান্না করলে এতোটা আদুরে লাগে মেয়েটাকে! সাফওয়ানের গাঢ় চাহনি দেখে শিরশির করছে সায়েরী’র ছোট্ট দেহ। ঢিপঢিপ করছে বুক। এই ছেলের চোখে নির্ঘাত কোনো নেশা আছে। নয়তো এমন মাতাল চাহনি হয় কারো? সাফওয়ানের ঘোর কাটাতে সায়েরী ক্ষীণ স্বরে ডাকলো, ‘ স..সাফওয়ান ভাই!’

সাফওয়ান দৃষ্টি সরালো না। তবে ঘোর কেটেছে তার। সায়েরীর ধরে রাখা হাতটা মুচড়ে হুট করেই পিঠে চেপে ধরলো সে৷ সায়েরী চমকে তাকাতেই সাফওয়ান মাথা নিচু করে সায়েরীর কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে ফিসফিস করে বললো,
‘ কথায় কথায় কেঁদে ভাসানোর অভ্যাসটা কমাও, বোকাপাখি। হুট করে কোনো অঘটন ঘটিয়ে ফেললে তখন কিন্তু দোষ দিতে পারবে না। তোমার এই লাল লাল গালগুলো এখনো আমাকে সিডিউস করছে। এখন যদি আমি এদের ফাঁদে পা দি-ই৷ কেমন হবে ভাবো তো!! ‘

ভরদুপুর। দরজা,জানালার পর্দা লাগিয়ে রুম কিছুটা অন্ধকার করে গায়ে চাদর জড়িয়ে শুয়ে আছে সায়েরী। সেই কখন ফিরেছে কলেজ থেকে। কিন্তু পরনের কাপড় বদলাইনি এখনো। একপ্রকার ঘোরে ডুবে আছে সে। থমকে আছে সেই মুহুর্ত’র মাঝে, যখন সাফওয়ান তার সন্নিকটে এসে অপ্রত্যাশিত কথাগুলো বলেছিলো। অপ্রত্যাশিত! হ্যাঁ অপ্রত্যাশিত-ই তো৷ সাফওয়ানের মতো একজনের কাছ থেকে কখনোই এমন নরম, শরম মিষ্টি কথা আশা করা যায় না। আর কি যেনো ডেকেছে? বোকাপাখি! সায়েরী নিজের ছোট্ট মাথায় জোর প্রকাশ করেও এই ডাকের কোন অর্থ খুঁজে পেলো না। এ কেমন ডাক! অনেক ভেবেও কূল কিনারা পেলো না। শক্ত করে চোখ বুজলো সে৷ ভুলতে চাইলো কথাগুলো। কিন্তু কানে বারবার সাফওয়ানের ফিসফিস কন্ঠটা বেজেই চলছে।

এখনো ধরফর করছে বুক৷ কথাগুলো বলার সময় সাফওয়ানের উত্তপ্ত ঠোঁট অনেকটা অনিচ্ছায় একটুখানি ছুঁয়ে দিয়েছিলো সায়েরীর কান। সেই সময়ের শিরশিরানি ভাবটা এখনো বিরাজ করছে সায়েরী’র শরীরে। মানুষটার অল্পখানি ছোঁয়াতে-ই সব কেমন এলোমেলো হয়ে উঠে সায়েরী’র। যেখানে আজকাল সাধারণ কোনো ছেলের সামান্য বাঁকা দৃষ্টি সায়েরী’র মনে ভয়ের উৎপত্তি ঘটায়। সেখানে একমাত্র সাফওয়ান সেই ব্যাক্তি, যার দৃষ্টি, স্পর্শ কোনোটা-তে বিন্দুমাত্র অস্বস্তি হয়না তার৷ বরং সাফওয়ানের কাছাকাছি থাকলে নিজেকে সবথেকে বেশি সুরক্ষিত মনে হয়। এই যেমন আজ, সাফওয়ান বিনা অনুমতিতে তার হাত চেপে ধরেছিলো, সায়েরীর অনেকটা কাছাকাছি এসে কথা বলেছিলো। সেই মুহূর্তে সায়েরীর তীব্র অস্বস্তি, ভয়,আতংকে দূরে সরে যাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু সেরকম কিছুই করতে পারেনি সে। বরং অপরিচিত এক অনুভূতির জোয়ারে ভেসে চোখ বুজে শক্ত করে দাঁড়িয়ে ছিলো শুধু। নাম না জানা এক অনুভূতি সর্বত্রে বিরাজ করছিলো তার। যেখানে ছিলো কিঞ্চিৎ ভয়,লজ্জা এবং সীমাহীন ভালোলাগা। সেই সময়ের অনুভূতি-টা অদ্ভুত ধরনের ছিলো। ভীষণ অদ্ভুত!

দরজা খোলার শব্দ পেয়ে সায়েরী মুখের উপর থেকে চাদর সরিয়ে তাকালো। ভাতের প্লেট হাতে তার মা এসেছে। যা দেখে মুখ কুঁচকে ফেললো সায়েরী। কিছু যে বলতে যাবে তার আগে মায়ের গম্ভীর মুখখানা দেখে কথাগুলো গিলে ফেললো সে। মেহরিন বেগম এসে প্রথমেই সায়েরীর পরনের জামা কাপড় বদলাতে না দেখে বকাঝকা করলো কিছুক্ষণ। বাধ্য হয়ে ওয়াশরুমের ঢুকল সায়েরী। পেছনে তখন মা রুমের এলোমেলো কাপড় গুছিয়ে রাখতে রাখতে সায়েরীকে বকছে। সায়েরী যেনো কিছু শুনতেই পেলো না এমন ভান করে ওয়াশরুমের দরজা আটকে দিলো। পরনের কাপড় খুলতে গিয়ে আচমকা নাসারন্ধ্রে তীব্র ভাবে ধাক্কা লাগলো জেন্টস পারফিউমের সুঘ্রাণ। সায়েরী চমকে উঠলো কিছুটা।

বুকের দিকের কাপড়ের অংশ তুলে নাকে লাগালো। আরো তীব্র ভাবে নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করছে ঘ্রাণ টা। চোখ বুজে কিছু সময় ঘ্রাণটা নিজের মাঝে ঢুকিয়ে ফেলার ব্যার্থ চেষ্টা চালালো সায়েরী। মনে হচ্ছে যেনো মানুষটা তার সামনেই আছে। তার প্রসস্থ বুকে মুখ ডুবিয়ে এই ঘ্রাণ উপভোগ করছে সায়েরী। ভাবনাটা মাথায় আসতেই সায়েরী দ্রুত চোখ মেললো। নিজের ভাবনায় নিজেই লজ্জা পেলো বেশ৷ ছিঃ ছিঃ কেমন বাজে চিন্তা ভাবনা। দ্রুত ফ্রেশ হয়ে সে ভদ্র মেয়ের মতো মায়ের সামনে গিয়ে গিয়ে বসতেই তার মা যত্ন করে ভাত তুলে দিলো মুখে। সায়েরীকে এমন ভাবুক হয়ে থাকতে দেখে তার মা চিন্তিত হলো কিছুটা। বান্দরবানের সেই ঘটনার পর থেকে রোজ রাতে তিনি সায়েরীর সাথেই ঘুমান৷ নয়তো মাঝ রাতে আচমকা ঘুম ভেঙ্গে গেলে ভয়ে ছটফট করে সায়েরী। কান্না করে রাত পার করে ফেলে। ঘুম ভাঙ্গার সাথে সাথে মায়ের সান্নিধ্যে থাকলে এমনটা হয়না। ভয় কাটিয়ে উঠার সাহস পায়৷

‘ মুখটা এমন চুপসে রেখেছিস কেনো সকাল থেকে? কলেজ থেকেই তাড়াতাড়ি ফিরে এসেছিস। কিছু হয়েছে? ‘
ভাবনায় বিভোর সায়েরী মায়ের কন্ঠে বাস্তবে ফিরলো। মনে পড়ে গেলো কলেজের ঘটনা৷ এতো কিছু হয়ে গিয়েছে কিন্তু পরিবারের কেউ জানে না। সে জানাতেও চাইনা৷ শুধু শুধু টেনশন দিয়ে কি লাভ! আলতো হেসে সে জবাব দিলো,
‘ কিছু হয়নি আম্মু। মাথা ব্যাথা করছিলো বলে ফিরে এসেছি। ‘
এরপর কয়েক সেকেন্ড থেমে আচমকা বলে উঠলো,

‘ আচ্ছা আম্মু! ধরো একটা মানুষ অনেক বছর ধরে তোমাকে চিনে। তোমার চেয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত সে। তোমাকে ওই মানুষটা একদম পছন্দ করেনা। তুমিও করো না। কিন্তু হঠাৎ করে মানুষটা ভালো হয়ে গেলো। তোমাকে আগের মতো সবসময় বকে না। ওই একটু উল্টো পালটা দেখলে বকে। কিন্তু বাকি সময় ভদ্র হয়ে কথা বলে। তোমার বিপদে হেল্প করে। এসবের মানে কি? এভাবে হুটহাট একটা খারাপ মানুষ ভালো হয়ে যাওয়ার কারণ কি?’
মেয়ের কথায় কিছু সময় নিরবতা পালন করলেন মেহরিন বেগম৷ এরপর শান্ত কন্ঠে জবাব দিলেন,

‘ মানুষ সবসময় একই রকম থাকে না। সময়ের সাথে সাথে সব মানুষ বদলায়, সকলের চাওয়া পাওয়া বদলায়। হতে পারে মানুষটা খারাপ। কিন্তু ভালো হতে কতোক্ষন? আর যেখানে তোর কথা, আমি বলবো তোকে বকাঝকা করে মানে সে নিশ্চয়ই রুচিসম্পন্ন কেউ৷ তোর আচরণ যে কেমন তা আমার চেয়ে ভালো আর কে জানবে? হতে পারে মানুষটা তোর ভালোই জন্যই বকাঝকা করে। আবার হেল্প করেছে বললি। তাহলে খারাপ হলো আর কোন দিক দিয়ে?বকাঝকা করে মানে কি মানুষটা খারাপ? আমিও সবসময় বকাবকি করি। ‘

‘ তুমি আর সে এক হলে নাকি! আচ্ছা বাদ দাও। পেট ভরে গেছে এবার যাও। আমি ঘুমাবো। ‘
মেহরিন বেগম বেরিয়ে যেতেই পুণরায় বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লো সায়েরী। মাথায় কিলবিল করছে সাফওয়ানকে অজস্র চিন্তা। “সময়ের সাথে সকলের চাওয়া পাওয়া বদলায়।” মায়ের বলা কথাটা মনে পড়তেই হৃদস্পন্দনের গতি বাড়লো যেনো। ওই গোমড়ামুখো, যমরাজ, দৈত্য দানব, এক কথায় রষকষ বিহীন মানুষটা তাকে পছন্দ করে? এমনটা হতে পারে কি!
বালিশে মুখ গুজে দিলো সায়েরী। এই সময়ে তার দুই ঘন্টা ঘুম হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু আজ ঘুম-ও বেইমানি শুরু করেছে। মন, মস্তিষ্ক সাফওয়ানের চিন্তা কিলবিল করছে।

রাত এগারোটা। কোলাহলপূর্ণ পার্টি হলের এককোনায় হার্ড ড্রিংকস হাতে বসে আছে রবিন। পাশে তার ঘনিষ্ঠ দুজন বন্ধু। দুজনের মুখ চিন্তায় থমথমে হয়ে আছে। রবিন তাদের দিকে একপলক তাকিয়ে গ্লাসের অবশিষ্ট তরল পদার্থ এক ঢোকে পেটে চালান করে দিলো। বুক ফুলিয়ে দাম্ভিক গলায় বললো,
‘ ফালতু টেনশন করে মোড নষ্ট করছিস তোরা৷ ভুলে গেলি আমি কে? এমপি তানভীর চৌধুরীর ছোট ছেলে, রবিন চৌধুরী। ওই সামান্য পলিটিশিয়ান নওশাদ খান’র ছেলের কোনো যোগ্যতা নেই আমার সাথে লড়ার। আর লড়বে কেনো? ওই মিডল ক্লাস মেয়েটার জন্য? হা হা। এসব মেয়ে আমাদের পকেটে পকেটে থাকে। ‘
‘ সামান্য পলিটিশিয়ান? ভুল বললি। নওশাদ খান এবং তার ভাইয়ের যতো নামডাক আছে না, ততটা তোর এমপি বাবার আছে বলেও মনে হয়না আমার। ‘

কটমট চোখে তাকালো রবিন। ছেলে দুজনের কোনো হেলদোল হলো না। বরং আগের মতো চিন্তায় মগ্ন দেখালো দুজনকে। রবিন সেদিকে পাত্তা না দিয়ে বড় আনন্দের সাথে গানের তালে তালে গা দুলাচ্ছে। আচমকা বিদ্যুৎ চলে গেলো। থেমে গেলো গান বাজনা। ডান্স ফ্লোরে শরীর দুলাতে থাকা ছেলে মেয়েরা বড় বিরক্ত হলো এমন কান্ডে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে ছেয়ে গেলো সবদিক। আচমকা এমন হওয়ার কোনো কারণ খুঁজে পেলো না হল ম্যানেজার। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে সকলে যখন বিরক্তিতে চেঁচামেচি করছে, এমন সময় আচমকা বিকট শব্দে কাঁচ ভাঙ্গার শব্দ আসলো। পরপরই শুনা গেলো পুরুষালি কন্ঠের আর্তনাদ। ভয়ে তটস্থ হয়ে গেলো সকলে। মোবাইলের ক্ষীণ আলোয় এদিকওদিক চোখ বুলিয়ে কিচ্ছুটি উদ্ধার করতে পারলো না কেউ৷ এর মিনিট খানিক পর পুণরায় আলো জ্বলে উঠলো। প্রাণ ফিরে পেলো সকলে। রবিনের সাথে থাকা দুই বন্ধু চোখের পলক ফেলে পাশে তাকাতেই বিষ্ময়ে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে গেলো। ফ্লোরে কাঁচের বোতলের ছোট ছোট টুকরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। সেই সাথে বিন্দু বিন্দু রক্তকণা। অবাক করা বিষয় হলো রবিন সেই স্থানে উপস্থিত নেই। আশেপাশে খোঁজার পরেও কোনো হদিস
পাওয়া গেলো না রবিনের। বন্ধু দুইজন ভয়ে তটস্থ হয়ে রইলো। ঘোর বিপদের আভাশ পাচ্ছে। মন বলছে এটা মোটেও স্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। শরীর বেয়ে দরদর করে ঘান ছুটলো দুজনের। চোখাচোখি হতেই মুখ দিয়ে আপনাআপনি একটা নাম-ই বেরিয়ে আসলো দুজনের, “সাফওয়ান খান!”

‘ হ্যালো! হ্যালো মিহাদ? রায়ান বলছি। শুনতে পাচ্ছিস? হ্যালো! ‘
চোখ ভর্তি ঘুম নিয়ে রায়ানের কথায় পিটপিট করে তাকালো মিহাদ৷ রাত প্রায় বারোটা বাজতে চলেছে৷ প্রচন্ড রকমের মাথা ব্যাথার কারণে রাত ১০টার আগেই মেডিসিন নিয়ে শুয়ে পড়েছিলো সে। রায়ানের কল পেয়ে কাঁচা ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ায় বড্ড বিরক্ত হলো সে। ঘুম জড়ানো কন্ঠে বললো,
‘ কোন শালার পুত মরেছে যে মাঝ রাতে ফোন দিয়ে আমাকে জ্বালাচ্ছিস তুই? শালা, নীতি’র বয়ফ্রেন্ড না হলে এই মুহুর্তে এসে খুন করতাম তোকে। তুই জানিস আমি কোথায় ছিলাম? মালদ্বীপে ছিলাম, মালদ্বীপ। কতো সুন্দর হানিমুনে হানি’কে নিয়ে রোমান্টিক টাইম স্পেন্ড করছিলাম। সহ্য করতে পারলি না তুই৷ আমার সুখে বা ট্যাং না ঢুকালে তো শান্তি হয়না তোদের। মরণ হয়েছে না আমার মরণ? ‘

‘ ভাই, বুঝার চেষ্টা কর। বিরাট ঝামেলা হয়ে গিয়েছে৷ সা..সাফওয়ান, সাফওয়ান ওই রবিনকে তুলে এনেছে। ‘
মুহুর্তেই ঘুম উবে গেলো মিহাদের। লাফিয়ে উঠলো শুয়া থেকে। অবাক কন্ঠে বললো,
‘ কাকে তুলে এনেছে? ‘
‘ আরে রবিন চৌধুরী। আজকে যে এতো কান্ড ঘটালো। ‘
‘ মানে…কিভাবে কি হলো? ‘
‘ আমাকে নিয়ে হুট করে ***পার্টি হলে গিয়েছিলো। আমাকে বলেছিলো গাড়ি স্টার্ট রেখেই যেনো বসে থাকি। ও ভিতরে যাওয়ার মিনিট খানিকের মধ্যেই দেখলাম হল’র লাইট সব নিভে গিয়েছে। কিন্তু আশেপাশে ঠিকই কারেন্ট ছিলো। আর কেউ না জানুক। আমি ঠিক বুঝে গিয়েছিলাম এই কাজ কার। কিন্তু এই ছেলে যে মাত্র পাঁচ মিনিটের মাথায় রবিনের মাথা ফাটিয়ে কাঁধে তুলে নিয়ে আসবে এই কথা কে জানতো? আমার ভয় লাগছে দোস্ত। প্লিজ তোরা আয়। গ্রীণ ভ্যালি তেই আছি আমি। আমার পক্ষে কোনো ভাবে সম্ভব না সাফওয়ান’কে কোনো কিছু থেকে আটকানো। না জানি কি চলছে এই ছেলের মাথায়। ‘
গায়ে কাপড় জড়াতে জড়াতে মিহাদ ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বললো,

‘ এজন্যই সাফওয়ান আমাদের না জানিয়ে তুই ভীতুর ডিমকে সাথে নিয়েছে। ও ভালো করেই জানে, তোর সামনে রবিনকে আঘাত করার আগে তুই নিজেই সেন্সলেস হয়ে পড়ে থাকবি। ‘
‘ এভাবে বলিস না দোস্ত। প্লিজ তাড়াতাড়ি আয় তোরা। আমার ভয় করছে। ‘
‘ আহারে সোনা বাচ্চা। দোকান থেকে ললিপপ কিনে চুষতে থাকো৷ আ’ম কামিং। ‘
টেনশনে হাত, পা রীতিমতো তরতরিয়ে কাঁপছে রায়ানের। অতি মাত্রায় ভদ্র ছেলে সে। জীবনেও ঝগড়া বিবাদের মধ্যে ছিলো না। অথচ তার কপালেই কিনা এমন ভয়ংকর সব বন্ধু বান্ধব জোটার ছিলো! একমাত্র প্রেমিকা নীতি, যে কিনা ছেলেদের চেয়েও এগিয়ে। তাদের ব্যাপারখানা এমন যে নীতি নিজে রায়ানকে দ্বায়িত্ববান প্রেমিকের মতো আগলে রাখে।

চিন্তিত অবস্থায় লিভিংরুমে পায়চারী করছিলো রায়ান। গ্রীণ ভ্যালি পৌঁছেছে দশ পনেরো মিনিট হচ্ছে। এসেই অচেতন রবিন’কে বেসমেন্টে ফেলে রেখে বেডরুমে ঢোকেছিলো সাফওয়ান। এতোক্ষণ পর রুম থেকে বের হলো। সিড়ি বেয়ে নামতে নামতে রায়ানের চিন্তিত মুখ দেখে তীর্যক হাসলো সে। রায়ানের চোখ সাফওয়ানের দিকে যেতেই অবাক হয়ে গেলো সে। আস্ত একটা মানুষের মাথা ফাটিয়ে তাকে অপহরণ করে চিল মুডে শাওয়ার নিয়ে ফিরেছে সাফওয়ান! তার ভেজা চুল, স্নিগ্ধ রূপ এটাই জানান দিচ্ছে। ডাইনিং টেবিল থেকে পানি ভর্তি জগ তুলে নিয়ে বেসমেন্টের দিকে এগিয়ে গেলো সাফওয়ান। তাকে অনুসরণ করে রায়ানও পা বাড়ালো। ভয়ার্ত কন্ঠে বললো,

‘ ক..কি করতে চাচ্ছিস তুই? দেখ, মাথা ঠান্ডা কর। সামনাসামনি বসিয়ে একটু ধমক দিলেই হবে। ‘
রুমের ফ্লোরে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকা রবিনের কাছাকাছি চেয়ার রেখে তাতে আয়েসী ভঙ্গিতে বসলো সাফওয়ান। কপালে লেপ্টে থাকা এলোমেলো ভেজা চুল ব্যাকব্রাশ করে শান্ত কন্ঠে জবাব দিলো,
‘ মাথা ঠান্ডা করার জন্যেই শাওয়ার নিয়ে ফিরেছি। এবার বাকিটা এই বাস্টার্ড -টার উপর ডিপেন্ড করে। ‘
কথাটা বলেই জগ ভর্তি পানি ছুড়ে মারলো সে রবিনের মুখ বরাবর। সঙ্গে সঙ্গে খুকখুক করে কেশে উঠলো রবিন। তীব্র ব্যাথায় কপাল চেপে ধরলো। মনে পড়ে গেলো অন্ধকারে কেউ কাঁচের বোতল দিয়ে তীব্রভাবে আক্রমণ করেছিলো তাকে। মুহুর্তেই চটে গেল সে। চোখ মেলে তাকাতে তাকাতে রাগ্বত স্বরে বলে উঠলো,

‘ কোন মা**** – রে? সাহস কিভাবে হয় রবিন চৌধুরী’র গায়ে হাত তোলার? ‘
ঝাপসা চোখে সাফওয়ানের মুখখানা দেখে একটুখানি বিচলিত হলো রবিন। সাফওয়ান বাঁকা হাসলো। পায়ের উপর পা তুলে গা এলিয়ে বসে বললো,
‘ এবার বুঝলি তো.. কার এতো সাহস হয়েছে?
ব্যাথা উপেক্ষা করে উঠে দাঁড়ালো রবিন। মনে মনে অল্পখানি দমে গেলেও সেটা প্রকাশ করলো না সে। বরং হাসার চেষ্টা করে বললো,

‘ কার জন্য আমাকে শাস্তি দিতে এখানে নিয়ে এসেছিস তুই? বেস্ট ফ্রেন্ডের বোন বলে এতো ইম্পর্ট্যান্স দেওয়ার কি আছে? আরে এসব মেয়ের স্বভাব-ই হচ্ছে বড়লোকের ছেলে ফাঁসিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়া। এমন বহুত দেখেছি। আমাদের দুজনের বাবা কিন্তু একই লাইনে আছে। আমার সাথে হাত মিলিয়ে নে৷ লাভে থাকবি। এসব মারামারি বাদ দিয়ে বরং আমরা ওই মেয়েকে শেয়ার করতে পা……. ‘

বাকি কথাটুকু বিকট আর্তনাদের নিচে চাপা পড়লো রবিনের। যেই একটু শক্তি সঞ্চয় করে দাঁড়িয়ে ছিলো, পুণরায় মাথা চেপে লুটিয়ে পড়লো সে ফ্লোরে। সম্মুখে কাঁচের জগের ভাঙ্গা হাতল ধরে রক্তিম মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে সাফওয়ান। রবিনের প্রথম দিকের কথাগুলো শুনে ভেতরে ভেতরে রাগ উদয় হচ্ছিলো তার। কিন্তু শেষের কথাটা শুনে রক্ত টগবগিয়ে উঠেছে। চোয়াল শক্ত করে কাঁচের জগ দিয়ে ভয়ংকর ভাবে আঘাত করেছে রবিনের মাথার বাম দিকে। আকস্মিক সাফওয়ানের এমন প্রতিক্রিয়ায় রায়ান হকচকিয়ে গেলো। সাদা ফ্লোরে টকটকে তাজা লাল রক্ত দেখে গা গুলিয়ে আসলো বেচারার। রাগে শরীরের শিরা উপশিরা অবধি টগবগিয়ে উঠেছে সাফওয়ানের। বাদামি চোখজোড়া রক্তিম আকার ধারণ করেছে। রবিন ফ্লোরে ছিটকে পড়ে এক সেকেন্ডের জন্যও স্থির হতে পারলো না, তার আগেই তেড়ে গেলো সাফওয়ান। হুংকার ছেড়ে শক্ত ঘুষি বসিয়ে দিলো রবিনের চোয়াল বরাবর। ঠিক সেই মুহুর্তে হুড়মুড়িয়ে বেসমেন্টে প্রবেশ করলো মিহাদ এবং জিমন। সাফওয়ানের এই রূপ দেখে এবং রবিনের অবস্থা দেখে আৎকে উঠলো তারা। দুজন গিয়ে ঝাপটে ধরলো সাফওয়ানকে। তবুও বিন্দু পরিমাণ সরাতে পারলো না। হিংস্র বাঘের মতো গর্জে উঠলো সাফওয়ান,

‘ ইউ ব্লাডি বি**! তোর সাহস কীভাবে হয় ওকে নিয়ে বাজে কথা বলার? ইউ ওয়ান্ট টু ইন্টিমেট উইথ মাই গার্ল হা? মাই গার্ল!!! ‘
সাফওয়ানের হুংকারে সম্পূর্ণ বাড়ি কেঁপে উঠলো যেনো। রবিনের অবস্থা দেখে জিমন হতদন্ত গলায় বললো,
‘ সাফওয়ান! সাফওয়ান ছাড় ওকে। অনেক হয়েছে। আর মারলে মরেই যাবে। এমপির ছেলে ও, বিরাট কেস হয়ে যাবে দোস্ত ছাড়!
বাহুতে চেপে রাখা জিমনের হাত ঝটকা মেরে ছাড়িয়ে নিলো সাফওয়ান। গর্জে উঠে বললো,
‘ ফা*ক ইউর কেস। হাউ ডেয়ার হি! হাউ ডেয়ার দিস বাস্টার্ড? ওর সাহস কীভাবে হয়ে আমার জিনিসে হাত বাড়ানোর? ব্লাডি বি**। হাউ ডেয়ার ইউ টু টাচ হার? ‘

রবিনের কন্ঠনালী চেপে ধরে শেষের কথাটা বললো সাফওয়ান। কপালের রগ দপদপ করে ফুলছে তার। চোখ ঠিকরে রক্ত গড়াবে যেনো। রবিন শ্বাস নিতে পারছে না। চোখমুখ অন্ধকার ঠেকছে তার। এই বুজি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলো। রায়ান সহ বাকি তিনজন মিলে একপ্রকার জোর করে ছাড়িয়ে নিলো রবিনকে। সাফওয়ান নিজ ইচ্ছায় ছেড়ে দিলো এবার। তবে রাগ কমেনি এখনো। বুক ফুলিয়ে ঘন ঘন শ্বাস ফেললো সে। মুষ্টিবদ্ধ হলো হাত। কোনো ভাবে যেনো রাগটা দমাতে পারছে না সে। জিমন তার অবস্থা দেখে একপাশ থেকে ধরে রেখেছে। মিহাদ রবিনের শ্বাস চলছে কিনা চেক করছিলো। মৃদু মৃদু শ্বাস চলছে বুঝতে পেরে সে স্বস্তির শ্বাস ফেলে বললো, ‘ আল্লাহ বাঁচিয়েছে। ‘

একথা শুনে আচমকা জিমনকে ধাক্কা দিয়ে পুণরায় রবিনের দিকে তেড়ে গেলো সাফওয়ান। ক্ষিপ্ত গতিতে মুচড়ে ধরলো রবিনের ডানহাত। কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই শরীরের সব শক্তি দিয়ে মুচড় মারলো রবিনের হাত মুচড় মারলো সাফওয়ান। অর্ধচেতন রবিন শরীরের অবশিষ্ট শক্তি নিয়ে আর্তনাদ করে উঠলো। পরপরই জ্ঞান হারালো। এই দৃশ্য দেখে বোবা বনে গেলো উপস্থিত তিন মানব। সাফওয়ান উঠে দাঁড়ালো। হাত ঝাড়তে ঝাড়তে গটগট পায়ে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে। হতভম্ব মিহাদ এবং জিমন একে অপরের দিকে তাকাতে গিয়ে লক্ষ্য করলো দেয়ালের সাথে লেপ্টে দাঁড়িয়ে থাকা রায়ান থরথর করে কাঁপছে। জিমন নিজেকে সামলে কোনো রকমে বললো,

‘ ওকে হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে৷ দেরি করলে হিতে বিপরীত হতে পারে। না জানি কি হবে। বেঁচে আছে এই অনেক। ‘
ফ্লোরে পা ছড়িয়ে বসে থাকা মিহাদ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলো রক্তাক্ত রবিনের দিকে। জিমনের কথা তার কানে গেল বলে মনে হলোনা। আপনমনেই সে বলে উঠলো,
‘ কথা শুনেছিস তুই ওর? মাই গার্ল বলছিলো। শালার কনফেশন নেই কিচ্ছু নেই। কিন্তু একজন মরার পথে। এই রূপ দেখলে তো বাচ্চা মেয়েটা হার্ট ফেইল করবে! কি হবে এই দুজনের? সামনের দিনগুলোর কথা ভেবেই আমার বুক ধরফর করছে। ‘

বর্তমান~~
গোধূলি বিকেল। ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে সায়েরী। তার শূন্য দৃষ্টি দূর আকাশের হলদে সূর্যাস্তের দিকে। মাথার উপর থাকা ওড়নার অংশটা ঢলে পড়েছে দমকা হাওয়ায়। খোপা করা স্বত্তেও এলোমেলো কিছু চুল বিরক্ত করছে চোখমুখে। তার ভাবনার ছেদ পড়লো কারো ডাকে। তার নাম ধরে ডাকছে কেউ। পরিচিত কন্ঠটা কর্ণগোচর হতেই ঘাড় নিচু করে তাকালো সায়েরী। পাশের বাড়ির বারান্দা থেকে শাড়ি পড়া এক মেয়ে হাস্যজ্জল মুখে সায়েরীকে ডাকছে। মেয়েটাকে দেখে এক চিলতে হাসি ফুটলো সায়েরীর ঠোঁটের কোণে৷ আমোদিত গলায় সে বললো,

‘ পিউ দি! কবে এসেছো তুমি? ‘
‘ আরে বাসায় আয় তুই। অনেক কথা বলার আছে। ‘
সায়েরী মাথা নেড়ে জানান দিলো, “এক্ষুনি আসছি। ”
ধীরপায়ে সিড়ি বেয়ে নেমে গেলো সে। অথচ এই মেয়েটাই বছর তিনেক আগে ছাদ টপকে পিউ নামক মেয়েটার বাসার ছাদে প্রবেশ করতো৷ দুই বাড়ি একেবারে পাশাপাশি। খুব সহজেই এক ছাদ থেকে অন্য ছাদে প্রবেশ করা যায়। সায়েরী ছাদ থেকে নেমে প্রথমেই কিচেনে ঢুকলো। তার মায়ের উদ্দেশ্যে বললো,
‘ পিউ দি এসেছে আম্মু। আমি ওখানে যাচ্ছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবো। ‘

মায়ের অনুমতি নিয়ে বেরিয়ে গেলো সায়েরী। মেয়ের গমন পথের দিকে ফ্যালফ্যাল নজরে তাকিয়ে রইলেন মেহরিন বেগম। এটা কি উনার সেই মেয়ে, যে সর্বদা গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াতো? ঘর থেকে বেরিয়ে গেইট পেরুনোর সময় চিল্লিয়ে বলতো, ” আম্মু! পিউ দি’র বাসায় গেলাম ” বিপরীতে মা কি বললো না বললো যায় আসে না। আগে সর্বাক্ষণ হৈ চৈ করে মাতিয়ে রাখতো সারা বাড়ি। অথচ এখন! সারাটাদিন বাসায় থেকেও প্রয়োজন ব্যাতিত টু শব্দটি করে না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে পুণরায় কাজে মনযোগ দিলেন মেহরিন বেগম। মেয়ের চিন্তায় চিন্তার বয়স যেনো দ্বিগুণ বেড়ে গিয়েছে তার। সবটা কি আর ঠিক হওয়ার নয়??
পিউদের বাসায় গিয়ে পৌঁছাতেই সায়েরী’কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো পিউ। সায়েরী মুচকি হেসে বললো,

‘ কি ব্যাপার মিসেস পিউ? আজ বেশি বেশি খুশি মনে হচ্ছে? ‘
পিউ হাসলো। সায়েরীকে নিয়ে সোফায় বসতে বসতে বললো,
‘ বলবো বলবো। আগে বল, কেমন আছিস? ‘
‘ ভালো। তুমি বলো। কেমন কাটছে সংসার? ‘
‘ আর সংসার! আড়াই বছর হতে চললো। খারাপ না। ভালোই আছি। আলহামদুলিল্লাহ। ‘
কথার মাঝে পিউ’র মা মিষ্টির প্লেট নিয়ে হাজির হলেন। সায়েরীর সামনে প্লেট রেখে বললেন,
‘ বুড়ি! কথা না বলে আগে মিষ্টিমুখ কর। খালামণি হতে যাচ্ছিস। ‘
চমকে উঠলো সায়েরী। পিউ’র দিকে তাকিয়ে অবাক কন্ঠে বললো, ” সত্যি? ”
পিউ লাজুক মুখে মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালো। আনন্দে সায়েরী ঝাপটে ধরলো তাকে। উউচ্ছ্বসিত কন্ঠে বললো, “কনগ্রেচুলেশন’স দি!!! ”

পিউ’র মা দুজনকে দেখে হেসে উঠলেন। কিচেনের দিকে যেতে যেতে বললেন,
‘ সায়ু! আজ রাতে এখানেই খেয়ে যাবি কিন্তু। জামাই আসবে রাতে। তুই থাকলে খুশি হবে। ”
সায়েরী পিউ’কে জিজ্ঞেস করলো,
‘ ভাইয়া আসবে রাতে? ‘
‘ হ্যাঁ। ওর গুরুত্বপূর্ণ মিটিং ছিলো বলে আসতে পারেনি আমার সাথে। আমাকে জোভান ড্রপ করে দিয়ে গেছে। ‘
‘ আজ রাতেই ফিরে যাবে? ‘
‘ কথা তো এমনই ছিলো। ও চাচ্ছেই না আমি এখানে থাকি। প্রেগ্ন্যাসির খবরটা পাওয়ার পর থেকে এত্তো পজেসিভ হয়ে গিয়েছে! প্রেম করার সময়ও কখনো এতো পজেসিভ হতে দেখিনি ওকে। ‘
সায়েরী মুচকি হেসে বললো,
‘ বাব্বাহ! ভাইয়া রোমান্টিক জানতাম। তবে এতো বেশি রোমান্টিক এইটা তো ভাবিনি। বাচ্চার মা’কে চোখে হারাচ্ছে তাহলে? ‘

পিউ হাসে। সোফায় গা এলিয়ে পেটে হাত বুলায়। লম্বা শ্বাস ফেলে বলে,
‘ সময়গুলো কতো দ্রুত কেটে গেলো তাইনা রে? মনে হচ্ছে এইতো সেদিন, আমার কলেজের সামনে থেকে ও আমাকে জোর করে অন্য জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল। অনেকটা সাদামাটা ভাবে প্রপোজ করেছিল। পাগলটা ভেবেছিলো আমার বন্ধুর সাথে আমার কোনো সম্পর্ক আছে। আমার তো ওকে শুরু থেকেই পছন্দ ছিলো। তাই এক কথায় রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। ছুটিয়ে প্রেম করেছি প্রথম দেড়
বছর। তারপর একদিন…তোর মনে আছে, আমি ওর সাথে রাগ করে কথা বন্ধ করে দিয়েছিলাম? তোর মাধ্যমে ফুল আর চকলেট পাটিয়েছিলো। হাজারটা সরি লেটার ছিলো ফুলের মধ্যে হা হা হা। আমি তো এসব দেখেই গলে গিয়েছিলাম। তারপর তুই যখন বললি ওর কাছ থেকে এসব নিতে দেখে সাফওয়ান ভাই তোকে……. ‘
কি বলে ফেলেছে খেয়াল হতেই জিহ্বায় কামড় বসালো পিউ। লক্ষ্য করলো সায়েরীর হাসিমুখ চুপসে গিয়েছে মুহুর্তেই। চটজলদি সোজা হয়ে বসলো সে। ছোট্ট করে বললো, সরি!

সায়েরী প্রতিউত্তর করলো না কোনো। এরইমধ্যে সেখানে হাজির হলো পিউ’র বড় ভাই পিয়াস। সবে মাত্র অফিস থেকে ফিরেছে সে৷ সোফায় সায়েরীকে বসা অবস্থায় দেখে সে অবাক হওয়ার ভান করে বললো,
‘ কুনোব্যাঙ আজ ঘর ছেড়েছে দেখি! সূর্য কি দক্ষিণ দিকে উঠলো নাকি আজ? ‘
পিউ হেসে উঠলো। সায়েরী নিজেও মৃদু হাসে। পিউ’র সাথে কুশলাদি করে পিয়াস ক্লান্ত শরীর নিয়ে বসলো সায়েরীর পাশে। মাথায় টুকা দিয়ে বললো,

‘ দিনদিন অতি মাত্রায় সভ্য,শান্ত হয়ে যাচ্ছিস দেখি। ব্যাপার কি? বিয়ে শাদি করার পরিকল্পনা করছিস না তো? সভ্য ঘরের সভ্য বউ হওয়ার প্রেকটিস চলছে নাকি হুহ? ‘
সায়েরী শান্ত কন্ঠের জবাব,
‘ চলছে হয়তো। নিজে দুই বাচ্চার বাবা হয়ে বসে আছো৷ আর আমি একটা বিয়ে করতে পারবো না? ‘
পিয়াস ভারী অবাক হয়ে তাকালো। সায়েরী যে প্রতিউত্তর করবে এই আশা ছিলোই না তার। আশ্চর্য হয়ে সে বলে উঠলো,

‘ আরেব্বাস! বোবাপাখি দেখি আজ তোতাপাখি রূপে ফিরে এসেছে। ভালো, খুব ভালো। ‘
পিউ শব্দ করে হেসে উঠলো। সায়েরী বুঝলো এখানে আরেকটু থাকলে এই ভাই বোন দুজন মিলে আজ খুব পঁচাবে তাকে৷ তাই উঠে গেলো চট করে। তার হাবভাব দেখে পিউ বলে উঠলো,
‘ ভুলেও চলে যাওয়ার চিন্তা করবি না। মা কি বলেছে শুনিস নি? একেবারে রাতে খেয়ে যাবি। ‘
‘ ভাইয়া আসলে তখন আবার আসবো দি। এখন যেতে হবে। রাতে এখানেই খাবো প্রমিস। এখন যায় প্লিজ! ‘
‘ আরে শুন তো…. সায়ু!! ‘
পিউ’র ডাক কানে গেলেও দাঁড়ালো না সায়েরী। বাতাসের দাপটে উড়তে থাকা উড়নাটা সযত্নে মাথায় চেপে ফাঁকা রাস্তার দিকে তাকালো একপলক। শূন্য মস্তিষ্কে হানা দিলো অতীতের কিছু দুষ্টু, মিষ্টি স্মৃতি…..

অতীত ~~
কলেজে সাফওয়ান এবং সায়েরী কে নিয়ে এতোসব ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরের দিনের কথা। সেদিন নাজরাত এই ঘটনা সম্পর্কে জেনেছে অনেক দেরীতে। পরপরই বন্ধুদের সাথে কথা বলে সম্পূর্ণ ঘটনা শুনলো সে। কথা হয়নি কেবল সায়েরীর সাথে। বিকেল থেকেই ফোন বন্ধ পাচ্ছিলো তার। শেষমেশ সংযোগ করতে পারলো পরের দিন কলেজ টাইমে। সায়েরীর সাথে ভিডিও কলে কথা বলার সময় সে কি দুশ্চিন্তা তার চোখে মুখে। অথচ যাকে নিয়ে এতোসব ঘটনা ঘটলো সে ঢুলু ঢুলু চোখে নাজরাতের একের পর এক চিন্তায় ভরা কথা শুনছে। অন্যসময় হলে সায়েরী নিজেই এই ঘটনা আকড়ে ধরে গুম মেরে থাকতো। কিন্তু কাল সাফওয়ানের অদ্ভুত আচরণের সাক্ষী হয়ে বেচারি অন্য সব বেমালুম ভুলে বসেছে। তাছাড়া কলেজে সকলে অতি মাত্রায় স্বাভাবিক ব্যাবহার করছে। করবে না-ই কেনো? কার সাধ্য আছে স্বয়ং সাফওয়ান খান’র হুমকি শুনার পরেও বাঘের গুহায় মুখ দেওয়ার!
সায়েরীর ভাবনায় ছেদ পড়লো নাজরাতের কন্ঠে। একপ্রকার বিরক্ত হয়েই সে নাজরাতের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো,
‘ তোর মেলোড্রামা শেষ হবেটা কবে? রীতিমতো ঘুম পাচ্ছে আমার। এবার অফ যা বইন। ‘

‘ মেলোড্রামা! টেনশনে আমি শেষ হয়ে যাচ্ছিলাম আর তুই বলছিস মেলোড্রামা? আবার বলছিস ঘুম পাচ্ছে? সবেতেই তোর এতো ঘুম পায় কি করে? টেনশনের ছিটাফোঁটা ও দেখতে পারছিনা তোর মুখে। এ্যাঁই সত্যি করে বলতো, কাল এই ঘটনার পর সিরিয়াস কিছু হয়েছে নাকি? তোকে হাড়ে হাড়ে চিনা আছে আমার। নিশ্চয়ই এই ঘটনার পর অন্য কিছু ঘটেছে। যার কারণে আগেরটা মাথাতেই নেই তোর। ফটাফট বল। কি ঘটিয়েছিস আবার? ‘
ঘুম উবে গেলো সায়েরী’র। একটুখানি চিন্তিত দেখালো তাকে। নাজরাতকে বলা ছাড়া কোনো কথা পেটে হজমই হয়না তার। তাই এবারো কিচ্ছুটি লুকানোর চেষ্টা করলো না। সবে মুখ খুলেছে বলবে বলে এমন সময় সাফ্রিন এবং তোহা ডাক দিলো তাকে। ক্লাস টাইম হয়ে গিয়েছে। যেকোনো মুহূর্তে টিচার ঢুকবে। অগত্য কল কেটে দিলো সে।
কথা শেষে বারান্দা থেকে রুমে প্রবেশ করলো নাজরাত। ঠিক সেই মুহূর্তে বাহির থেকে সাদিফও ঢুকলো রুমে। নাজরাতের দিকে তাকিয়ে বিষন্ন গলায় বললো,

‘ প্যাকিং করে নাও। আজ বিকেলেই রওনা দিবো। ‘
সাদিফের দিকে তাকিয়ে কপালে ভাঁজ পড়লো নাজরাতের। মাঝে দুটো দিন পেরিয়ে গিয়েছে। দুজনের মধ্যকার দূরত্ব কমেছে অনেকখানি। সাদিফের উপস্থিতিতে এখন কেবল লজ্জা এবং ভালোলাগা বয়ে যায় নাজরাতের মনে। আগের সেই অস্বস্তি, ভয় এসবের রেশ কেটে গিয়েছে। সাদিফের বিষন্ন কন্ঠটা শুনে নাজরাত বললো,
‘ আপনার মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে আপনি নানু বাড়ি ছেড়ে যেতেই চাচ্ছেন না। ‘
কথাটা বলেই সে বেডের উপর থাকা খোলা লাগেজে কাপড় ভাজ করে ঢুকাতে লাগলো। হঠাৎ অনুভব করলো পেছন থেকে আলগোছে তাকে নিজ বাহুতে আবদ্ধ করে ফেলেছে সাদিফ। তার কানের কাছে মুখ এনে সাদিফ শান্ত কন্ঠে জবাব দিলো,

‘ নানুবাড়ি নয়, বউকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। ‘
নাজরাত থমকালো। পরমুহূর্তেই সাদিফের কথা শুনে হেসে ফেললো। সাদিফের যেনো সহ্য হলো না এই হাসি। সে নাজরাতকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে অবুঝ কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ চলো এখান থেকে তোমাকে নিয়ে সোজা আমাদের বাসায় চলে যায়। বিয়ে তো হয়েই গিয়েছে। আর কোনো প্রোগ্রাম লাগবে না। তাছাড়া তোমার প্রিপারেশনেও কোনো কমতি আসবে না, আই প্রমিস ইউ। আমি একদম বিরক্ত করবো না। ‘
সাদিফের কথা শুনে নাজরাত লজ্জা মুখে শব্দ করে হেসে উঠলো। পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে বললো,

‘ আপনি পাগল হয়ে গিয়েছেন। ‘
নাজরাত পাশ কাটিয়ে গেলেও বেশি দূর আগানোর আগে পূণরায় সাদিফ কাছ ঘেঁষলো তার। নাজরাত হকচকিয়ে গেলো। সাদিফ হুট করে এতোটা কাছাকাছি এসে পড়ায় পেছাতে গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের উপরই বসে পড়লো সে। সাদিফ টেবিলের দুইপাশে হাত রেখে ঝুঁকে আসলো তার দিকে। অত্যন্ত শান্ত গলায় বললো,
‘ আমি মোটেও ফাঁকা আওয়াজ দিচ্ছি না কিন্তু। ভেবে চিনতে উত্তর দাও। বাকিটা আমি সামলে নিবো। ‘
‘ ম..মানে কি? আপনি পাগল… ‘
‘ আন্সার মি নাজরাত। ইয়েস অর নো? ‘
‘ সাদিফ….. ‘
‘ ইয়াস অর নো? ‘

সেকেন্ডে দুই এক সাদিফের মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে থেকে নাজরাত কাটকাট কন্ঠে জবাব দিলো, “নো।”
সাদিফের মুখখানা চুপসে গেলো একেবারে। সোজা হয়ে দাঁড়াতেই নাজরাত নিজেও দাঁড়ালো তার মুখোমুখি। শান্ত কন্ঠে বললো,

‘ অযথা পাগলামি করছেন আপনি। আমি মোটেও আমার পড়াশোনার জন্য মানা করছি না। আমি জানি আপনারা আমাকে যথেষ্ট সাপোর্ট করবেন এই ব্যাপারে। কিন্তু আপনি ভেবে দেখুন, আমার বাবা’রা শর্ত দিয়েছিলো এক্সামের আগে যাতে আমাকে উঠিয়ে না নেওয়া হয়। ইনফেক্ট আমি নিজেই বলেছিলাম এটা। সেখানে আজ দুই চার দিন বরের সাথে একত্রে থেকে নিজ থেকে শ্বশুর বাড়ি উঠে গেলাম। এটা কেমন দেখায়? মানুষ কি ভাববে বলুন? ‘
সাদিফ মন দিয়ে শুনলো। বুঝতে পারলো ব্যাপারটা খুবই দৃষ্টিকটু দেখায়। কিন্তু মন যে মানতে চাইছে না। তপ্ত শ্বাস ফেলে সে দুই হাতে কোমর জড়িয়ে কাছে টেনে আনলো নাজরাতকে। শক্ত আলিঙ্গন করে বিষন্ন গলায় বললো,
‘ তোমার এসব লজিক আমার মনকে কীভাবে বুঝাবো বলোতো। সে তো মানতেই চাইছে না। ‘

নাজরাত মৃদু হাসলো। আলতো হাতে নিজেও জড়িয়ে ধরলো সাদিফের পৃষ্টদেশ। খুব করে বলতে চাইলো ” আমিও আপনাকে ভীষণ মিস করবো সাদিফ। আমারো মন পুড়ছে। ভীষণ পুড়ছে। ” কিন্তু বলতে পারলো না। চুপটি করে পরে রইলো সাদিফের বাহুডোরে। মিনিট খানিক পেরিয়ে যাওয়ার পর আচমকা কিছু মনে পড়তেই চট করে মাথা তুললো সে। বলবে কি বলবে না ভাবতে ভাবতে আমতাআমতা করে বললো,
‘ রূপসা আপু আপনাকে পছন্দ করে। এটা কি আপনি জানতেন? ‘
সাদিফকে বিন্দুমাত্র বিচলিত দেখালো না। স্বাভাবিক কন্ঠেই সে জবাব দিলো,
‘ জানতাম। ‘
চুপসে গেলো নাজরাত। পুণরায় জানতে চাইলো,

‘ আপনাদের যে বিয়ের কথা বলেছিলো নানু। এর আগে থেকেই জানতেন? আপনিও পছন্দ করতেন তাকে? ‘
বিচলিত হলো নাজরাতের কন্ঠস্বর৷ সাদিফ অনুভব করলো তার বউ ইনসিকিউর ফিল করছে তার সাথে অন্য মেয়ের কথা ভেবে। ব্যাপারটা বেশ উপভোগ করছে সাদিফ৷ মনে মনে হাসলো সে। এরপর নাজরাতের চুপসানো মুখ দেখে পুণরায় জড়িয়ে ধরলো তাকে। শান্ত কন্ঠে বললো,
‘ নানু রূপসার সাথে আমার বিয়ের কথা বলার পর আমি নিজেই ভাবি’কে তোমার কথা বলে দিয়েছিলাম। আমার নিজস্ব পছন্দ আছে শুনে কেউ আর আপত্তি তুলেনি। কিন্তু রূপসা খুব এগ্রেসিভ হয়ে উঠেছিল। নিজে এসে বলেছিলো আমাকে পছন্দ করে বলে। অবশ্য ওর দোষ নেই। নানু নিজেই কথায় কথায় বলতো ওকে আমার বউ করবে বলে। মেয়েটা এসব মনে পুষে রেখেছিলো। আমি একদম জানতাম না এসবের ব্যাপারে। যতোদিনে জানতে পারলাম, তখন আমার মনে কেবল তোমার বসবাস। তাই রূপসা’কে অনেক বুঝিয়ে শান্ত করেছিলাম। নয়তো মেয়েটা উল্টাপাল্টা কিছু করে বসতো। ‘

সবটা শুনে গোপনে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো নাজরাত। রূপসার সাথে এই ব্যাপারে কোনো কথা হয়নি। সে চাইনি স্বাভাবিক সম্পর্কটা অস্বস্তিকর করে তুলতে। হয়তো রূপসাও এমনটাই চেয়েছে। শাড়ির ফাঁক গলিয়ে কোমরে উষ্ণ ছোঁয়া পেতেই আচমকা কেঁপে উঠলো নাজরাত। দ্রুত সরে আসতে চাইলো। কিন্তু বহু আগে থেকেই সাদিফ নিজের বলিষ্ঠ হাত দিয়ে আটকে ফেলেছে তাকে। নাজরাতের কানে ঠোঁট ছুঁইয়ে সাদিফ বলে উঠলো,
‘ ডোন্ট ওয়রি ম্যাডাম। আপনার বর সর্বদা আপনারই ছিলো। আছে। সারাজীবন থাকবে। তাকে নিয়ে ইনসিকিউর হওয়ার কোনো কারণ নেই৷ ‘

অনুভূতির জোয়ারে টালমাটাল নাজরাতের শ্বাস ঘন হয়ে উঠলো। যা বেসামাল করে তুলেছে সাদিফকে। নিমেষে ওষ্ঠ যুগলের উষ্ণ স্পর্শে নাজরাতের গ্রীবাদেশ রাঙিয়ে তুললো সে। নাজরাত শক্ত হাতে খামচে ধরলো সাদিফের বাহুদ্বয়। পরপরই অনুভব করলো তার কম্পিত অধরের মাঝে খুব ব্যাস্ততার সাথে প্রবেশ করছে সাদিফের পুরুষালি অধর৷ সময়ের সাথে সাথে যার তীব্রতা বাড়লো। শক্ত হল হাতের বন্ধন।

কলেজ ছুটি হয়েছে। এবার বাড়ি ফেরার পালা সকলের। অনেকে বেরিয়ে পড়েছে ইতোমধ্যে। সায়েরী চারপাশে ব্যাস্ত নজরে তাকিয়ে অনার্স ভবনের দিকে পা বাড়ালো। সকালের দিকে জিমন তাকে বলেছিলো ছুটির পর যেনো একটু লাইব্রেরি রুমের সামনে দেখা করে। কি যেনো গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। কথামতো সায়েরী পৌঁছে গেলো লাইব্রেরি রুমের সামনে। এই ফ্লোরে কেউ নেই। সম্পূর্ণ ফাঁকা। বারান্দার রেলিঙে ভর দিয়ে মাঠের দিকে দৃষ্টি রেখে সাফওয়ানের কথা ভাবতে লাগলো সায়েরী। আজ মূলত কলেজে এসেছে সে সাফওয়ানকে দেখার জন্য। কেনো যেনো মনটা বড্ড অশান্ত হয়ে আছে কাল থেকে। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত মানুষটার দেখা পেয়েও যেনো পেলো না সে। একঝলক দেখেছিলো, যখন সে ক্লাসরুমে ছিলো। জানলার পাশে হেঁটে গিয়েছিল সাফওয়ান। কিন্তু ঠিকঠাক দর্শন মিলেনি। বিষন্ন মনে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো সে। আজকাল কি যে হচ্ছে তার! এসব উদ্ভট কান্ড কখনো করেনি সে। প্রথমবার সাফওয়ানের রূপে মোহিত হয়েও এতোটা উতলা হয়নি। কিন্তু এখন! যে মানুষটার ছাড়া মাড়াতে হবে বলে সে পথ পরিবর্তন করে চলতো। আজ কিনা তাকে একপলক দেখার আশায় ঘুম ছেড়ে ঠিক সময়ে কলেজে এসে হাজির হয়েছে। মানা যায় একথা!
জিমনের ডাকে ঘোর কাটলো সায়েরী’র। ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতেই নজরে আসলো টকটকে একগুচ্ছ লাল গোলাপ হাতে নিয়ে হাসিমুখে এগিয়ে আসছে জিমন। ফুলগুলো দেখে সায়েরী নিজেই হেসে ফেললো। কাছাকাছি এসে জিমন বললো,

‘ কেমন আছো? ‘
সায়েরী মাথা নেড়ে জবাব দিলো,
‘ একদম ফিট আছি। কিন্তু আপনাকে দেখে দেবদাস দেবদাস লাগছে কেনো? ‘
জিমন চুপসানো মুখে জবাব দিলো,
‘ সে তোমার চেয়ে ভালো আর কে জানবে? ‘
সায়েরী খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। দুহাত বাড়িতে দিতেই জিমন লাল গোলাপের বুকে এবং একটা চকলেট বক্স এগিয়ে দিলো তার দিকে। ফুলগুলো হাতে নিয়ে চোখ বুজে লম্বা শ্বাস টানলো সায়েরী। কি সুন্দর ঘ্রাণ! ফুলগুলো বুকে জড়িয়ে এবার চোখ পাকিয়ে তাকালো সে জিমনের দিকে। কন্ঠস্বর গম্ভীর করে বললো,

‘ এবার কি নিয়ে ঝগড়া করেছেন শুনি? ‘
হতাশ কন্ঠে জিমন জবাব দিলো,
‘ সে অনেক কাহিনি বোন। আপাতত আমার প্রেমিকাকে একটু বুঝাও। তিনদিন ধরে নাজেহাল অবস্থা করে রেখেছে আমার। ‘
‘ সে নাহয় বুঝালাম। কিন্তু বিনিময়ে আমার লাভ? ‘
জিমন হাসলো। ব্যাস্ত ভঙ্গিতে সময় দেখে বললো,
‘ আজ রাতে পিউ আমাকে আনব্লক করলে। কাল ফুচকা, চিপস,আইস্ক্রিম তিনটার-ই ট্রিট দিব। ‘
‘ আহ! এই না হলো আমার জিজু৷ এবার তো রাতে না ঘন্টাখানিকের মধ্যেই আপনাকে আনব্লক করবে পিউ দি। ‘
জিমন দুহাত মোনাজাতের ভঙ্গিতে ধরে বললো,
‘ আমিন! আমিন! ‘

সায়েরী আবারো হেসে উঠলো। তাকে বিদায় জানিয়ে দ্রুত পায়ে নেমে গেলো জিমন। সায়েরী নিজেও যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েছে, এমন সময় খেয়াল হলো তার জুতোর ফিতা খুলে গিয়েছে৷ চকলেট বক্স এবং বুকেটা রেলিংয়ের উপর রেখে সে অনভিজ্ঞ হাতে ফিতা বাঁধলো। আজ অবধি ঠিকঠাক ফিতা বাধাটা রপ্ত করতে পারলো না সে। কোনো রকমে গিট গিয়েই উঠে দাঁড়ালো। ফুল এবং বক্সটা হাতে নিয়ে সবে মাত্র ঘুরে দাঁড়িয়েছে, এমন সময় আচমকা শক্ত হাতের থাবা পড়লো তার নরম হাতে। হাত টেনে ঝড়ের বেগে কেউ ধাক্কা দিয়ে লাইব্রেরি রুমে ঢুকিয়ে দিলো তাকে। সেল্ফের সাথে বাড়ি লাগতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিলো সায়েরী।

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ২৯+৩০

কিন্তু হাত থেকে ছিটকে পড়লো চকলেট বক্সটা। ভেঙ্গে চুরচুর হয়ে গেলো তার একপাশ। সেকেন্ড দুয়েকের মাঝে ঘটে যাওয়া ঘটনায় তাজ্জব বনে গেলো সায়েরী। চোখ তুলে সামনে তাকানোর আগেই তার হাত থেকে ফুলগুলো ছিনিয়ে নিলো কেউ। জোরে টান পড়ায় হাতে বেশ ব্যাথা পেলো সায়েরী। হতভম্ব মুখে সামনে দাঁড়ানো মানুষটাকে দেখে আরো বেশি অবাক হলো সে। কিছু বুঝে উঠার আগেই মানুষটা ক্ষিপ্ত গতিতে পা দিয়ে পিসে ফেললো তাজা ফুলগুলো। এরপর ঝরের বেগে কাছে এসে শক্ত করে চেপে ধরলো সায়েরী’র ডানহাত। এবং অন্যহাতে চেপে ধরলো সায়েরী ফুলোফুলো গালজোড়া। এহেন আক্রমণে মস্তিষ্ক শূন্য হয়ে পড়লো সায়েরীর। কি হচ্ছে, কেনো হচ্ছে কিচ্ছুটি মাথায় ঢুকছে না তার। ফ্যালফ্যাল নজরে সে চোখ তুলে তাকিয়ে আছে সম্মুখের মানবটার দিকে। যার রক্তিম চোখ, ক্ষিপ্ত দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে সায়েরীর মুখশ্রীতে। এই দৃষ্টি দিয়েই যেনো যে খুন করবে আজ সায়েরী নামক অবুঝ বালিকাটি’কে!!

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৩৩+৩৪