Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৪৯+৫০

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৪৯+৫০

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৪৯+৫০
সাজিয়া জাহান সুবহা

নিরিবিলি লেকের পাড়৷ মৃদু মন্দ বাতাস বইছে। ঢেউ বিহীন স্বচ্ছ পানি গুলোর দিকে তাকিয়ে রয়েছে মিহাদ। কিন্তু তার পাশে অবস্থানরত মেয়েটার দৃষ্টি তারই দিকে। অনিমেষ তাকিয়ে আছে সে। যেন কত জনমের তৃষ্ণা মিটাচ্ছে। মিনিট পাঁচেক হয়েছে ইরা এসেছে। আসার পর থেকেই তাকিয়ে আছে। এবার অস্বস্তি লাগতে শুরু করেছে মিহাদের। সম্মুখে দৃষ্টি রেখেই সে গম্ভীর কন্ঠে বললো,

‘ কিছু বলার না থাকলে ডেকেছিস কেনো? তোর কাছে অফুরন্ত সময় থাকতে পারে কিন্তু আমার কাছে নেই। অন্য কাজও আছে আমার। কি বলবি দ্রুত বল। ‘
গম্ভীর কন্ঠ-টা ইরা’র সকল আশা ভরসা গুড়িয়ে দিলো। এতগুলো দিন পর স্ব-চক্ষে মিহাদকে দেখে বুকের ভিতর টা উথাল-পাতাল হয়ে উঠেছে তার। ইচ্ছে করছে প্রশস্ত বুকটাতে ঝাপিয়ে পড়তে। মন বলছে, এই বুকে মাথা রাখলে সব দুঃখ মিলিয়ে যাবে৷ মিহাদ নিজেও গলে যাবে৷ পূর্বের সব ভুলে গিয়ে পুণরায় আপন করে নিবে তার ইরাবতী – কে। কিন্তু সেই সুযোগটা তো পাচ্ছেই না ইরা। আসার পর থেকে এখনো অবধি মিহাদ ঠিক করে তাকাইনি অবধি তার দিকে। না একটাবার জানতে চেয়েছে, সে ভালো আছে কিনা। মিহাদের এমন নিষ্ঠুরতা ইরার কোমল মন মানতে পারছে না৷ চার বছরে কখনো এমন আচরণ করেনি ছেলেটা। প্রতিনিয়ত ভালোবাসা দিয়ে ভরিয়ে রেখেছিলো৷ এতো এতো যত্ন, ভালোবাসায় অভ্যস্ত করিয়ে এখন হঠাৎ কেন দূরে ঠেলে দিচ্ছে তার ইরাবতী কে?

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

‘ ইরা! কিছু বলার না থাকলে ডেকেছিস কেনো? এত ফালতু সময় থাকলে নিজের হবু বরের কাছে যা। আমি এত বেকার নয়। ‘
ইরা দাঁতে দাঁত চেপে হজম করে কথাগুলো। মিহাদের পরিবর্তন সব চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে তার। এই যে সে শক্ত কন্ঠে কথা শুনাচ্ছে, তুই করে সম্মোধন করছে, ইরা বলে ডাকছে। এসব পূর্বে করেনি। মিহাদকে ইরা তুই বলে সম্মোধন করলেও, ইরাকে সর্বদা তুমি করেই সম্মোধন করতো মিহাদ। এসব কিছু এখন বেশ কানে লাগছে ইরার। নিজেকে সামলে সে ক্ষীণ গালায় বলে,

‘ এই জায়গাটার কথা তোর মনে আছে? ‘
‘ মনে থাকবে না কেনো! বন্ধুদের সাথে এখানেই তো আড্ডা দিতাম সবসময়। ‘ নির্লিপ্ত কণ্ঠ মিহাদের।
ইরা’র মুখ চুপসে গেলো সেকথা শুনে। কম্পিত কন্ঠে সে পুণরায় বললো,
‘ আমি বন্ধুদের কথা বলছিনা। আমাদের দুজনের কথা বলছি। চার বছর আগে এখানেই তুই আমাকে প্রপোজ করেছিলি। সেটা মনে নেই? ‘
মিহাদের মনোভাব বুঝা গেল না। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড নিরব চোখে তাকিয়ে রইলো সে লেকের পানিতে। পরমুহূর্তেই বিরক্ত কন্ঠে জবাব দিলো,

‘ এতো কিছু মনে রেখে লাভ টা কি? ভুলে গিয়েছি আমি। পারলে তুই ও ভুলে যা। বিয়ে করে হাসবেন্ড কে নিয়ে সুখে থাক। আমাকে বিরক্ত করিস না প্লিজ। ‘
‘ ভুলে যাব? এতো সহজ সবকিছু? তুই নিষ্ঠুর হয়ে গিয়েছিস কিন্তু আমি তো পারছি না হতে। শত চেষ্টা করেও তো কিছু ভুলতে পারছি না। তোকে ভুলতে পারছি না। বারবার মনে হচ্ছে তুই কিছু লোকাচ্ছিস আমার কাছ থেকে৷ আবার মনে হচ্ছে আমার ভালোর জন্যই হয়তো আমাকে দূরে ঠেলে দিচ্ছিস। ‘

কথাটুকু বলার সঙ্গে সঙ্গে ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো মিহাদ। তার চোখ দুটোর ভাষা বুঝতে আজ ব্যার্থ হলো ইরা। কিন্তু মিহাদ তাকিয়ে রইলো অনিমেষ। ইরার চোখ দুটোর নিচে কালো হয়ে আছে। চেহারাও শুকিয়ে গেছে বেশ। আগের সেই গোলগাল মুখশ্রী নেই এখন আর। চেহারার লাবণ্য কমে গিয়েছে। টলমল করছে চোখজোড়া। গোপনে ঢোক গিলে পুণরায় দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো মিহাদ। তার এমন নির্লিপ্ততায় ইরা আবারো আশাহত হলো। পুণরায় মুখ ফুটে কিছু বলবে, এমন সময় পেছন থেকে ভেসে আসলো এক মেয়েলী কন্ঠ। মিহাদের নাম ধরে ডাকছে। আওয়াজ শুনে দুজনেই ফিরে তাকালো। চঞ্চল পায়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে হ্যাংলা পাতলা গড়নের একটি মেয়ে। মুখ দেখে বয়সের আন্দাজ করতে পারলো না ইরা। কিন্তু তার চেয়ে বছর দুয়েক ছোট হবে হয়তো। মেয়েটা কাছে আসা মাত্রই মিহাদ প্রশ্ন ছুড়ল,

‘ এখানে কি করছ ফারিহা? ‘
‘ বান্ধবীদের সাথে এদিক দিয়েই যাচ্ছিলাম। তোমাকে দেখে এসেছি। কি করছ এখানে? মেয়েটা কে? ‘
চঞ্চল কন্ঠের কথাগুলো শুনে ইরা’র কপালে ভাঁজ পড়লো। তাছাড়া মেয়েটা এমন অধিকার দেখিয়ে কথা বলছে কেনো মিহাদের সাথে? তাও এমন তুমি সম্মোধন করে! অজানা এক অস্থিরতায় বুক ধরফর করে উঠলো ইরার। অন্যদিকে ফারিহা নামক মেয়েটার প্রশ্নের জবাবে মিহাদ শান্ত কন্ঠে বললো,

‘ আমার ফ্রেন্ড, ইরা। ‘
ইরা চকিতে নজর তুলে তাকালো এহেন জবাবে। কথাটা কানে লেগেছে খুব। আর কত রকমভাবে কষ্ট দিবে এই ছেলে ওকে!
অন্যদিকে ফারিহা হাস্যজ্বল মুখে ইরাকে উদ্দেশ্য করে বলছে,
‘ ওহ! এটা ইরা আপু? সবারই ছবি দেখেছি, তবুও চিনতে পারছি না। কেমন আছেন আপু? ‘
ইরা ক্ষীণ স্বরে জবাব দিলো, ভালো। বিপরীতে আর প্রশ্ন করলো না কোনো। কেন যেন কথা বলছে ইচ্ছে করছে না এই মেয়ের সাথে। তাকে উদাসীন দেখে ফারিহাও আর কথা বাড়ালো না। মিহাদের পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ধীর কন্ঠে বললো ,

‘ কতবার ফোন দিয়েছি। রিসিভ করোনি কেনো? ‘
‘ সাইলেন্ট ছিল। খেয়াল করিনি। ‘
দুজনের এই ধীর কন্ঠের কথোপকথন ঠিক কানে আসলো ইরা’র। অবিশ্বাস্য নয়নে সে ফ্যালফ্যাল নজরে তাকিয়ে রইলো দুজনের দিকে। মিহাদের বাহু ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে ফারিহা। বিন্দু পরিমাণ দুরত্ব নেই মাঝে। মেয়েটার চেহারায় কেমন এক লাজুক লাজুক ভাব। কথার মাঝে স্পষ্ট অধিকার বোধ। এসবের মানে কি দাঁড়ায়! বক্ষস্পন্দন অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপছে ইরা’র। ফারিহা মিষ্টি হেসে বিদায় জেনে পুণরায় নিজের পথে ফিরে গেছে। সে প্রস্থান করা মাত্র ইরা ক্ষুব্ধ কন্ঠে মিহাদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ল,

‘ মেয়েটা কে মিহাদ? ‘
মিহাদ নিশ্চুপ৷ তার এহেন নিরবতায় ইরা’র রাগ হয়। অস্থির অস্থির লাগছে ভীষণ। কত খারাপ চিন্তা কিলবিল করছে মস্তিষ্কে। নিজেকে সামলাতে না পেরে সে মিহাদের কাছে এসে আচমকা কলার চেপে ধরে। চেঁচিয়ে উঠে পুণরায় প্রশ্ন করে,
‘ আমি জানতে চাইছি মেয়েটা কে? উত্তর দিচ্ছিস না কেনো? ‘
‘ ও কে হয় সেটা তোকে জানানোর প্রয়োজন মনে করছিনা আমি। পাবলিক প্লেসে সিনক্রিয়েট করবি না ইরা। কলার ছাড়। ‘
ইরা’র উচ্চ কন্ঠের বিপরীতে মিহাদও ধমকে উঠেছে তাকে। তা শুনে আপনাআপনি হাত আলগা হয়ে আসলো ইরা’র। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে উঠলো। ধরা গলায় সে পুণরায় বলে উঠলো,

‘ ত..তুই রিলেশনশিপে আছিস? ‘
কথাটা বলতে গিয়ে তার বুকে রক্তক্ষরণ চলছিলো যেন৷ প্রশ্ন করলেও সে মনে প্রাণে চাইলো মিহাদ যেন এক্ষুনি বলে, এমন কিছু না। সে ভুল ভাবছে। তাছাড়া মিহাদের উপর তো ইরার অগাধ ভরসা আছে। আর যা-ই হোক, ইরাবতী ব্যাতিত অন্য কোনো মেয়েকে নিজের সঙ্গে কখনো জড়াবে না মিহাদ। কক্ষনো না।
কিন্তু তার এই সকল দম্ভ,অহংকার, ভরসা এক নিমিষে গুড়িয়ে দিয়ে মিহাদ কাঠ কাঠ কন্ঠে জবাব দিলো,
‘ হ্যাঁ আমি রিলেশনশিপে আছি। তাও গত ৬মাস যাবত। ফারিহা আমার প্রেমিকা হয়। আর কিছু? ‘
তীর হয়ে বুকে বাঁধলো যেন উত্তরটা। অবিশ্বাস্য! এমন হতেই পারে না। কক্ষনো না।

‘ মিথ্যে বলছিস তুই। আ..আমি আমি বিশ্বাস করি না এসব। ‘
‘ আমি তোকে বিশ্বাস করাতে আসিনি এখানে। নিজেই জানতে চেয়েছিলি। আমি আগেই বলেছিলাম। বিশ্বাস করিসনি এটা তোর দায়। ‘
একটু থেমে ফের বলে,

‘ দেখ ইরা, সবার পছন্দ অপছন্দ সবসময় একই রকম থাকবে এমন তো কোনো কথা নেই। একটা সময় তোর প্রতি ভালোলাগা ছিল কিন্তু এখন সেটা বদলে গেছে। এজন্য বলছি, আমার পিছনে অযথা সময় নষ্ট না করে মুভ অন কর। ড. জাদিদ ভীষণ ভালো পাত্র। তুই ভালো থাকবি উনার সাথে। ‘
‘ আর হ্যাঁ। এভাবে বারবার আমাকে ডেকে এনে পুরনো কথা তুলবি না। আমি মনে রাখতে চাইনা ওসব। পাস্ট তো সবারই থাকে। তাই প্লিজ, নিজেও সেসব ভুলে ভালো থাক। আর আমাকেও থাকতে দে। আশা করছি আজকের পর আর আমাকে বিরক্ত করবি না। ‘

কথাগুলো বলে আর এক সেকেন্ডও অপেক্ষা করলো না সে। প্রস্থান করলো ধুপধাপ পা ফেলে। ইরা নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে। প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না কোনো। অনুভূতি হীন হয়ে পড়েছে যেন সে। কেবল অনুভব করছে বুকের বাম পাশে তীব্র এক ব্যাথা। যেন কেউ হৃদপিণ্ড টেনে হিচড়ে বের করে আনছে। অসহ্য ব্যাথায় শ্বাস আটকে আসলো তার। বুকে হাত চেপে জোরে জোরে শ্বাস ফেললো সে। এমন সময় তার পাশে কারো উপস্থিতি ঠের পেয়ে ঝাপসা চোখে তাকাতেই দেখা মিলল জাদিদের। ইরা’র কাছে এসে সে ব্যাস্ত কন্ঠে বললো,
‘ সরি, আসলে একটা ইমার্জেন্সি কেইস ছিলো বলে দেরি হয়ে গেল। আর আপনি হঠাৎ অসময়ে এখানে ডেকেছেন কেনো? ‘

কথাগুলো বলতে বলতে হাতের মোবাইলটা বন্ধ করে পকেটে ঢুকিয়ে নিলো সে। এরপর চোখ তুলে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো ইরার দিকে। তাকিয়েই চমকে উঠলো সে ইরা’র রক্তিম মুখশ্রী দেখে। মেয়েটা বুকে হাত চেপে অস্বাভাবিক ভাবে শ্বাস টানছে। জাদিদ সবে মাত্র হাত বাড়িয়েছে এমন সময় ধপ করে ঘাসের উপর বসে পড়লো ইরা। শরীরের ভার ধরে রাখতে পারছে না সে। তার এহেন দুর্দশা দেখে জাদিদ নিজেও বসে পড়লো পাশে। অনেকটা সঙ্কোচ নিয়েই ইরার বাহু ধরে উদ্বিগ্ন কন্ঠে প্রশ্ন করলো,
‘ ইরা! ঠিক আছেন আপনি? এমন করছেন কেনো? ‘

তাকে আশ্চর্য করে দিয়ে আচমকা বুকে উপর ধপ করে পড়লো ইরা। ভেজা কন্ঠে থেমে থেমে বলে উঠলো,
‘ অ..আমি ঠিক নেই জাদিদ। আমার..আমার শ্বাস থেমে যাচ্ছে। বুকে যন্ত্রণা হচ্ছে। মরে যাচ্ছি আমি। ‘
বলতে বলতে ফুঁপিয়ে উঠলো সে। তার এহেন প্রতিক্রিয়ায় জাদিদ হতবাক। বুঝে উঠতে পারলো না হল কি! তার বুকের মধ্যিখানে মাথা রেখে এলোমেলো সুর কাঁদছে ইরা। তার চুলে হাত বুলিয়ে জাদিদ ক্ষীণ স্বরে বললো,
‘ কাঁদছেন কেনো ইরা! আমাকে বলুন, প্লিজ! ‘

শব্দ করে কাঁদছে মেয়েটা। জবাব দিচ্ছে না কোনো। মিহাদের কথাগুলো কানে বাজছে এখনো। বেহায়া মন বিশ্বাস করতে চাচ্ছে না। একদম মানতে চাচ্ছে না যে তার মিহাদ এখন তার নেই। অন্য কারো হয়ে গিয়েছে। ভেবেই ডুকরে উঠলো সে৷ জাদিদের শার্ট চেপে উন্মাদের মতো বলতে লাগলো,
‘ মিহাদ কেনো এমনটা করলো আমার সাথে? আম..আমি কি ক্ষতি করেছি ওর! কেনো এত কষ্ট দিচ্ছে আমাকে? ওই মেয়েটা! মেয়েটা ওর প্রেমিকা হয়! এসব সত্যি! সব! আমার কেনো বিশ্বাস হচ্ছে না তবে? আমি কেনো মানতে মারছি না ওকে অন্য কারো সাথে? কেনো? ‘

কেমন হৃদয় বিদারক সুরে কাঁদছে মেয়েটা। জাদিদের বুক কাঁপছে তা দেখে। কোথাও গিয়ে আবার হিংসা জাগছে মিহাদের প্রতি। ভাবল,এই ভালোবাসাটুকু কেনো তার হলোনা!
ইরা কান্নারত অবস্থায় চোখ মেলে তাকালো জাদিদের দিকে। এরপর আচমকা জাদিদের হাত ধরে এলোমেলো কন্ঠে বলে উঠলো,

‘ জাদিদ! আপনি বলুন, বলুন যে মিহাদ মিথ্যে বলেছিলো। এমন হতেই পারে না। আমার মিহাদ অন্য কোনো মেয়েকে ভালো ভাসতে পারে না। এটা..এটা অসম্ভব। আপনি বলুন না। একবার বলুন, প্লিজ। নয়তো আমি মরে যাবো। মিহাদকে অন্য মেয়ের সাথে মেনে নিতে পারবো না। কক্ষনো না। ‘

কি এক করুণ কন্ঠের আহাজারি। জাদিদের চোখ টলমল করে উঠলো ইরার এমন অস্বাভাবিক আচরণে। এই কন্ঠে তার বুকের ভিতরটা ফালাফালা হয়ে যাচ্ছে যেন৷ ঢোক গিলে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করলো সে। এরপর প্রথমবারের মতো গালে হাত রাখলো ইরার। মেয়েটা অনুভূতি হীন চোখে তাকিয়ে। জাদিদ যথেষ্ট মার্জিত, নরম কন্ঠে বললো,
‘ আপনি কেনো মরবেন ইরা? কার জন্য? যার কারণে মরতে চাচ্ছেন, তার কাছে আপনার মূল্য কতটুকু সেটা জানেন আপনি? আদো কি তার জীবনে কোনো প্রভাব পড়বে আপনি মারা গেলে? আপনি মিহাদকে অন্য কারো সাথে মেনে নিতে পারছেন না, কারণ আপনি তাকে ভালোবাসেন তাই। কিন্তু সে তো দিব্যি আপনাকে ছাড়া ভালো আছে। আপনি মরে গেলে হয়তো তার জীবন আরও সহজ হয়ে উঠবে। পিছুটান থাকবে না কোনো। ‘

‘ এসব ভুল কথা। মিহাদ আমাকে ভালোবাসে। ‘ কম্পিত কন্ঠ ইরা’র।
‘ এটা বলে আপনি নিজেকে বুঝ দিচ্ছেন। আমাকে না। বাস্তবতা দেখুন ইরা। ছ’মাস যাবত গুমরে গুমরে মরছেন৷ এই ছয় মাস কিন্তু যথেষ্ট সময় কাউকে ভুলে গিয়ে সামনে এগোনোর। আপনি এগুতে পারেননি বলে মিহাদও যে পারবে না, এই ভাবনাটা ভুল। সে নিজের জীবনে যথেষ্ট হ্যাপি আছে আপনাকে ছাড়া। কিন্তু আপনি নিজের সাথে সাথে পরিবার, বন্ধুবান্ধব সবাইকে কষ্ট দিচ্ছেন৷ ভেবে দেখেছেন, আপনি ভুল কোনো পদক্ষেপ নিলে আঙ্কেল, আন্টির কি হবে? তাদের প্রথম সন্তান আপনি। এভাবে উনাদের ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবলেনও কি করে? ‘
এই কথাগুলো শুনে ইরা’র কান্না থেমে গেছে। অনেকটা ভাবুক দেখাচ্ছে তাকে। তার ক্লান্ত দেহটা পুণরায় বুকে টেনে নিলো জাদিদ৷ জড়িয়ে ধরলো না। কেবল মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে পুণরায় বললো,

‘ মুভ অন মানে যে একজনের পর অন্য একজনের সাথে নিজেকে জড়িয়ে নিতে হবে, এমন নয়। আপনি নিজের জন্য সামনে এগোন। নিজেকে ভালোবাসুন, সময় দিন। জীবনটা কে নিজের মতো উপভোগ করুন। সবার জীবনেই একটা না একটা সময় সঠিক মানুষটা এসেই যায়। অপেক্ষা কেবল সময়ের। সেই ক্ষেত্রে আপনার জন্য আমি যদি সেই মানুষটা হয়ে থাকি তবে আমি সবসময় পাশে আছি আপনার। আগেও আপনাকে জোর করিনি। এখনো করবো না। আমার ভাগ্যে আপনি না থাকলেও আমি শুভাকাঙ্ক্ষী হয়ে সবসময় আপনার পাশে থাকবো। কথা দিলাম। ‘

ইরা চোখ তুলে তাকালো। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিললো দুজনের৷ চিকন ফ্রেমের চশমার আড়ালে কালো মণির চোখজোড়া ভাবুক করে তুললো ইরা’কে। নিজের সাথে নিরব এক যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটিয়ে সে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললো,
‘ আপনার মা’কে জানিয়ে দিন, আমি বিয়ের জন্য রাজি। আর কোনো টালবাহানা নয়। উনার ইচ্ছেমতো দিন তারিখ ঠিক করতে বলুন। ‘
অনাকাঙ্ক্ষিত কথাগুলো শুনে জাদিদ হতবাক। গত চার মাস ধরে সে এই বাক্যগুলো-ই শুনতে চাচ্ছিলো। কিন্তু আজ কেন যেন মন থেকে খুশি হতে পারছে না সে। নিজেকে সামলে নিয়ে সে নম্র কন্ঠে বললো,
‘ ইরা! তাড়াহুড়ো করার কোনো প্রয়োজন নেই। আপনি নিজেকে সময় দিন। আপনার সময় দরকার। ‘
‘ সময়ের কাটার সাথে আমি আরও বেশি তলিয়ে যাচ্ছি জাদিদ। এবার পুরনো সব কিছু থেকে রেহাই দরকার। আর কোনো কথা নয়। যা বলেছি তা করুন৷ প্লিজ! ‘

জাদিদ গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। সব সিদ্ধান্ত এতো তাড়াহুড়ো করে নিতে নেই৷ কিন্তু একথা মন মাঙ্গা মেয়েটাকে কে বুঝাবে এখন? কথায় আছে, মেয়েদের সর্বোচ্চ জেদ হলো প্রেমিকের সঙ্গে বিচ্ছেদ করে অন্য কাউকে বিয়ে করে নেওয়া। ইরা’র ভাঙ্গা মনও হয়তো এমনই জেদ চেপে বসেছে।

সময়টা এখন গোধূলি বিকেল। লেকের পানিতে কমলা রাঙ্গা সূর্যটাকে ডুবতে দেখা যাচ্ছে। তা দেখে ইরার মনে পড়ে গেল চার বছর আগের কথা। যেদিন, ঘন বর্ষনে এই লেকের পাড়ে মিহাদ তার কাছে ভালোবাসার স্বীকারোক্তি করেছিলো। আর আজ এই লেকের পাড়ে ই সব পিছুটান ছুড়ে ফেলে গেল সে। আর তার দেওয়া আঘাত এখন অন্য কেউ সুস্থ করার প্রচেষ্টায়। একই যায়গা, কিন্তু কত ভিন্ন ভিন্ন কাহিনি জুড়ে গেল তাতে।
দুজনের নিরবতা ভেদ করে জাদিদের মোবাইলের নোটিফিকেশনের শব্দ হলো। ইমার্জেন্সি কিছু হতে পারে বলে জাদিদ পকেট হতে মোবাইল বের করে চোখ বুলালো স্ক্রিনে। “FARIHA” নামক আইডি হতে ছোট্ট একখানা বার্তা এসেছে৷ তা পড়ে গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেললো জাদিদ। পুণরায় মোবাইলটা পকেটে ঢুকিয়ে দৃষ্টি ফেলল ইরার দিকে। অনিমেষ চোখে তাকিয়ে থেকে আপনমনে বললো,
‘ আমাকে ক্ষমা করবেন ইরা। কিন্তু আপনাকে পাওয়ার জন্য এটুকু স্বার্থপর আমাকে হতে হয়েছে। ‘

ঘড়ির কাটায় ঠিক ঠিক নয়টা। ডুপ্লেক্স বাড়িটার নিচ তলায় কেবল এক পুরুষালী কন্ঠ ব্যাতিত অন্য কোনো শব্দ নেই। লিভিং স্পেস পেরিয়ে ডাইনিং স্পেসের মাঝ বরাবর বসানো ডাইনিং টেবিলটার দুই প্রান্তে বসা দুজন। সায়েরী গালে হাত দিয়ে তাকিয়ে রয়েছে সাফওয়ানের দিকে। যে ভ্রুঁ দ্বয়ের মাঝে কিঞ্চিৎ ভাঁজ ফেলে বইয়ে দৃষ্টি রেখে গুরুত্বপূর্ণ একটি ম্যাথ বুঝিয়ে দিচ্ছে সায়েরীকে৷ কিন্তু মেয়েটার সেদিকে ধ্যান থাকলে তো! তার মোহিত দৃষ্টি জোড়া সম্মুখের প্রেমিক পুরুষ টাকে দেখছে অনিমেষ। একদম খুটিয়ে খুটিয়ে মাথার চুল হতে, পুরুষালী দাম্ভিক চোয়াল দ্বয় দেখছে। তার কিশোরী মন নৃত্য করছে এই ভেবে যে, সম্মুখের এই সুদর্শন মানবটা তাকে পছন্দ করে! শুধু পছন্দ? উঁহু। তার চেয়েও বহুগুণে বেশি কিছু। এই বেশি কিছুটার নাম নিশ্চয়ই ভালোবাসা! কিন্তু মুখ ফুটে বললো না কেনো আজ অবধি! এই যুগে এসে বিনা প্রেম নিবেদনেও কোনো প্রেম হয় বুঝি? তাছাড়া দুজনের এই বেনামি সম্পর্কটাকে প্রেম হিসেবেও তো ধরা যাচ্ছে না৷ প্রেমিক পুরুষ কি এমন হয় নাকি?

‘ বুঝেছ? না আবার বুঝিয়ে দিব? ‘
ভাবনার মাঝে সাফওয়ানের কন্ঠ শুনে সায়েরীর ঘোর কাটে। তড়িঘড়ি করে গাল হতে হাত সরিয়ে ঠিকঠাক হয়ে বসলো সে৷ কিন্তু জবাব দিবে টা কি? সে তো খাতার দিকে ফিরেও তাকায় নি। আমতাআমতা করে সে বলে উঠলো,
‘ এ..এত দূর থেকে ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারিনি। অ..আমি..আমি ওখানে আসি? ‘

আঙ্গুল দিয়ে সাফওয়ানের পাশের চেয়ারে ইশারা করে উক্ত কথাটা বললো সে। তা শুনে সাফওয়ান নিরব চোখে তাকিয়ে রইলো সায়েরীর দিকে। মেয়েটার কাছ থেকে যত দূরে দূরে থাকতে চাচ্ছে, ততটাই মেয়েটা বাধ্য করছে কাছাকাছি আসতে। রায়ানের বার্থডে পার্টির রাতটার পর সাফওয়ান মনের সাথে একপ্রকার যুদ্ধ করে নিজেকে আটকে রেখেছে সায়েরীর কাছাকাছি যাওয়া থেকে। এমনিতেই মেয়েটা আগের মত সমীহ করে চলে না তাকে। একটু আধটু ভয় পায় শুধু। স্বাভাবিক প্রেমিকদের মতো আচরণ করলে কবে না মাথায় চড়ে বসে। দেখা গেল, তখন এই ম্যাথম্যাটিকস সাফওয়ানের উপর দিয়েই ঝাড়বে সে। এই সাহস টুকু তার ঢের আছে। আজ আবার হয়েছে অন্য কান্ড। কলেজ ইউনিফর্ম পরিহিতা সায়েরীর বাম ঘাড়ের তিল দুটো বারবার সাফওয়ানের মনযোগে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছিলো। দূর থেকেই কেমন সম্মোহন করছিলো তাকে।

অস্থিরতা টুকু বুকে চেপে সাফওয়ান গম্ভীর গলায় সায়েরীকে আদেশ দিয়েছিলো চুল খোলে দেওয়ার জন্য৷ সায়েরী সেটাই করলো বাধ্য মেয়ের মতো। কিন্তু তাতে সাফওয়ানের অশান্ত মন শান্ত হওয়ার বদলে আর-ও অস্থির হয়ে উঠলো। সায়েরীকে খোলে চুলে দেখাটা তার অন্য এক নেশা। এই রূপে দেখলেই ইচ্ছে করে দিঘল কেশ গুলোতে মুখ ডুবাতে। নিজের এই ইচ্ছেটাও চেপে বসেছে সে। এতটা সময় ধরে নিজেকে ধৈর্যের কারাগারে বন্দি রেখে লাভটা হলো কি? শেষমেশ মেয়েটা নিজেই কাছে আসার আর্জি জানাচ্ছে। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে সে মাথা নেড়ে সায় দিলো সায়েরীর কথায়। তা দেখা মাত্র সায়েরী উজ্জ্বল মুখে, ঝটপট ব্যাগপত্র নিয়ে এসে বসলো সাফওয়ানের পাশের চেয়ারে। মাঝে একহাত সমান দুরত্ব দুজনের।

সাফওয়ান ফিরে তাকালো না সেদিকে। বাম হাত দ্বারা ঘাড় ম্যাসেজ করে অস্থিরতা টুকু দমন করে ফেললো সে। পুণরায় মনযোগ দিলো বইয়ের দিকে। সায়েরীকেও এবার বেশ সিরিয়াস দেখাল। হতেই হলো। নাহলে পরবর্তীতে এই ম্যাথ সলভ করতে দিলে যদি করতে না পারে। তবে সাফওয়ানের ধমক আর খোচা মারা কথা হতে রক্ষা পাবে না সেটা সে ভালো করেই জানে।
সময় কাটলো আধ ঘন্টা। পরপর দুটো সৃজনশীল সলভ করার পর সায়েরী লম্বা দম নিলো। একেবারে কোমর ধরে গেছে তার। তাতে হাত গিয়ে চেয়ারে গা এলিয়ে দিলো সে। সাফওয়ান ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়ে পুণরায় বইয়ে হাত দেওয়া মাত্র সায়েরী আৎকে উঠলো,

‘ মেরে ফেলবেন নাকি!! আর একটা শব্দও মাথায় ঢুকবে না আমার। একদম ফুল হয়ে গেছে ব্রেনের হার্ডডিস্ক। কোথাও একটু ও যায়গা ফাঁকা নেই আজকের জন্য। এই দেখুন, কপালের দুইপাশে রগ গুলো কেমন লাফালাফি করছে বেশি শিক্ষিত হয়ে গেছে বলে। দেখুন, দেখুন। ‘
বলতে বলতে মাথাটা সাফওয়ানের দিকে ঝুকাল সে। সাফওয়ান কপাল কুঁচকে তাকিয়ে। সায়েরীর কপালে এক আঙ্গুল ছুঁয়ে মাথাটা পুণরায় ঠেলে দিতে দিতে সে জবাব দিলো,

‘ ওসব তোমার মোটা মাথায় থাকতে থাকতে অতিষ্ঠ হয়ে গেছে, তাই লাফাচ্ছে। তাদেরও সেল্ফ রেস্পেক্ট আছে। এমন আলসেমির গোডাউনে আর কত পরে থাকবে! ‘
ঠোঁটে ঠোঁট চেপে সায়েরী বিড়বিড় করে, ‘ আবার অপমান! ‘
সাফওয়ানের কানে আসে সেকথা। অধর কোণে ফুটতে চাওয়া হাসিটুকু গিলে ফেললো সে। সায়েরী তখন অগোচরে একটু একটু করে বইখাতা ব্যাগে ঢুকাচ্ছে। এখন আর পড়বে না মানে পড়বে না।
‘ আপা! রান্না শেষ। বাড়মু না টিফিনে দিমু? ‘

কিচেন থেকে ভেসে আসা মেয়েলি কন্ঠ-টা শুনে সায়েরী লাফিয়ে উঠলো। ‘ আসছি ‘ বলে উঠতে গেলেই সাফওয়ান পুণরায় হাত টেনে বসিয়ে দিলো তাকে। পায়ের সাহায্যে চেয়ার টেনে আচমকা চেয়ারসহ কাছাকাছি নিয়ে আসলো সায়েরীকে। আকস্মিক এমন কান্ডে সায়েরী হকচকিয়ে গেলো। সাফওয়ান বইটা তার দিকে ঠেলে দেওয়া মাত্র সে অসহায় গলায় বলে উঠলো,
‘ আর একটা কিছু মাথায় ঢুকবে না বিশ্বাস করুন। একদম হান্ড্রেড পার্সেন্ট মেমোরি ফুল। আজ আর না করি, প্লিজ!! ‘

সাফওয়ান নরম হলো কিছুটা। মাথা নিচু করে সামান্যতম কাছাকাছি এসে শান্ত গলায় বললো,
‘ আগামী তিন দিন আমি বিজি থাকব। পড়াতে পারব না। ‘
‘ কেনো? ‘ কৌতুহলী কন্ঠ সায়েরীর।
‘ পরশু ইলেকশন। সেসব নিজেই ঝামেলা আছে। ‘
সায়েরী সুর টেনে বুঝদারের মতো বললো, ‘ ওহ!!! ‘
পরমুহূর্তেই আবার খুশিমনে বিড়বিড় করলো, ‘ তিনদিন তবে ঘুমাতে পারব! আহা! ‘
সাফওয়ান না শুনেও বুঝে ফেললো তার মনোভাব। বাঁকা হেসে সায়েরীর আধ বোচা নাকটা টেনে দিলো সে। বইয়ের দিকে ইশারা করে বললো, ‘ ওদিকে তাকাও। ‘
সায়েরী তাকাতেই এবার সে চিহ্নিত করে দেওয়া ম্যাথগুলো দেখিয়ে বললো,
‘ এই কয়েকটা ছাড়া পুরো চ্যাপ্টার ক্লিয়ার করবে। তিন দিন সময় আছে। ফাঁকিবাজি করেছ তো খবর আছে। ‘
সায়েরী ইয়া বড় বড় চোখে তাকিয়ে। মুখ ফুটে কিছু বলতেই নিচ্ছিলো এমন সময় সাফওয়ান কলম দিয়েই ঠোঁট চেপে ধরলো তার। মুখ নামিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বললো,

‘ চুপ! তোমার পড়ালেখা নিয়ে একদম কম্প্রোমাইজ করব না আমি। তাই বলেও লাভ নেই। যা বলেছি তাই করবে। প্রবলেম থাকলে আমি পরে সলভ করে দিব। এখন যাও, কলেজের টাইম হয়ে গেছে। ‘
সায়েরী গাল ফুলিয়ে কিয়ৎক্ষণ তাকিয়ে রইলো সাফওয়ানের দিকে। এরপর দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
‘ আপনি জানেন আপনি কতটা খারাপ? ‘
সাফওয়ান হাসি চেপে মাথা দোলাল। মুখোমুখি হয়ে ফিসফিস কন্ঠে বললো,
‘ অবশ্যই জানি। আমি তোমার ভাবনার চেয়েও দিগুণ খারাপ, বোকাপাখি। তাই অযথা বায়না করে লাভ নেই। ‘
সায়েরী দ্রুত দৃষ্টি সরাল। সাফওয়ানের কন্ঠে বোকাপাখি সম্মোধন টা শুনলেই কান,গান গরম হয়ে উঠে তার। লজ্জায় হাঁসফাঁস লাগে ভীষণ। তার তো আবার লজ্জার শেষ নেই।
এলোমেলো বইখাতা সব সেভাবেই রেখে উঠে গেল সে। তা দেখে সাফওয়ান কপাল কুঁচকে বলে,

‘ এসব কে গোছাবে? ‘
‘ অবশ্যই আপনি। আপাতত আমার এনার্জি নেই এতকিছুর। ‘ নির্লিপ্ত কন্ঠ সায়েরীর।
সাফওয়ান তপ্ত শ্বাস ফেলে। সে যতই তর্জন, গর্জন করুক না কেনো। সায়েরী ঠিকই কোনো না কোনো ভাবে শোধ তুলে সেটার। ইটের বিপরীতে পাটকেল যাকে বলে। দুটোতেই সমান সমান জেদ। কেউ যেন কম নয় কারো চেয়ে।

কিচেনে কর্মরত অল্প বয়স্ক মেয়েটা হলো গ্রীন ভ্যালি’র কেয়ার টেকার করিম চাচার একমাত্র কন্যা। নাম হলো শিমলা। মাত্র ষোল বছর বয়স তার। গ্রীন ভ্যালি’র উত্তর দিকে দুই কামরার ছোট্ট ঘরটাতে তারা মা,বাবা এবং মেয়ে মিলে থাকে। পূর্বে কখনো সাফওয়ান উপস্থিত থাকা অবস্থায় মেয়েটা এই ঘরে আসেনি। প্রয়োজন পড়েনি কখনো। কিন্তু বিগত দুদিন আগে সাফওয়ান হঠাৎ আদেশ ছুড়েছে রোজ সকাল বেলা এসে যেন হালকা কিছু রান্না করে দিয়ে যায়। সেই থেকে আজ দুদিন যাবত এই কাজ করছে সে। মেয়েটা বেজায় চঞ্চল, বাচাল। তাই তো সায়েরীর সাথে তার বেশ ভালো খাতির। সাফওয়ানের ভাষ্যমতে দুজনই একই মানের মাথামোটা।
খাবার প্যাক করে টিফিন বক্সে ঢুকাতে ঢুকাতে শিমলা নিম্ন কন্ঠে বলে,

‘ আপনারা কি ফজরের নাশতা দশটায় করেন নাকি আপা? তাড়াতাড়ি উঠেও দশটায়? ‘
‘ একদম না। এই স্বাস্থ্য সচেতন মানবটা সাতটার খাবার দশটায় খাবে বলে তোমার মনে হয়? ‘
‘ তাইলে এই খাবার কিসের? ‘

সায়েরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে। জবাব না দিয়ে ভাবে দুদিন আগের কথা। এই তো পরশু দিনের কথা। সায়েরী বরাবরের মতোই দেরিতে ঘুম থেকে উঠেছিল বলে না খেয়েই চলে এসেছিল গ্রীণ ভ্যালি। তাছাড়া ঘুম থেকে উঠা মাত্র খাবার দেখলেই গা গুলিয়ে আসে বলে বেশির ভাগ সময়ই দেরিতে খায় সে। সেদিনও এমনই হয়েছিল। গ্রীণ ভ্যালি থেকে সোজা গিয়েছিল কলেজে। লেট হয়ে গিয়েছিল বলে খাওয়ার সময়টুকু পায়নি। পরপর তিনটা ক্লাসের করে ব্রেক টাইমে একটা চিপস খেয়ে খিদে মিটিয়েছিল। কাকতালীয় ভাবে সেদিনই ছুটির সময় সাফওয়ান পৌঁছে দিতে চেয়েছিলো তাকে। ঘটনা ঘটল সেখানেই। সারাটাদিন খালি পেটে ছিলো বলে বৃদ্ধ গাড়িতে আচমকা গা গুলিয়ে উঠেছিল তার।

অস্থির চিত্তে দ্রুত গাড়ি থামাতে বলে সে। পরপরই দরজা খুলে গলগল করে বমি করে দিয়েছিলো সে। শরীরটা নেতিয়ে পড়েছিল একেবারে। মাঝপথে আচানক সায়েরীর এহেন দুর্দশা দেখে সাফওয়ান বিষ্ময়ে কিংকর্তব্যবিমুঢ় তখন। পরপরই বোতল বের করে পানি খাইয়ে দিলো সায়েরীকে ৷ পরে যখন জানতে পারলো আসল কারণ। তখন তার রাগ দেখে কে! বেচারি সায়েরীর প্রাণ পাখি উড়াল দিতে দিতে বেঁচে গিয়েছিলো৷ কিন্তু কে জানতো, পরদিন থেকেই খাবার নিয়ে এই নতুন নিয়ম জারি করা হবে! এখন সময় থাকলে গ্রীন ভ্যালি’তে খেতে হয়, নয়তো বা গাড়িতে। সায়েরীর পড়াশোনা নিয়ে সাফওয়ান যেমন স্ট্রিক্ট, তার চেয়েও দিগুণ স্ট্রিক্ট দেখা যায় তাকে এই সময়৷ যা এতগুলো বছর যাবত সায়েরীর মা জননী করতে পারেনি। তা অনাসয়ে, সামান্য ত্যাড়া চোখের চাহনি দিয়ে সাধন করে ফেলেছে সাফওয়ান। সায়েরী ভাবে, তার মা যদি এই দৃশ্য দেখত তবে সাফওয়ান কে মাথায় তুলে রাখত। রাজার মুখুট পরিয়ে রাখত। আর কত কি যে করত তা ভাবনার বাইরে।

দশটা প্রায় বাজতে চলেছে। সায়েরী লিভিং রুমে ঘুরঘুর করছে। শিমলা কাজ শেষ করে ফিরে গিয়েছে। সাফওয়ান আপাতত নিজের রুমে। নিশ্চয়ই কাপড় পরিবর্তন করতে গেছে। হুহ! এই ছেলের এত রঙ ঢং৷ স্থান ভেদে কাপড় পরিবর্তন করে চলে। সায়েরী’র মহা অপছন্দ এই ব্যাপারটা। এত বেশি পারফেকশনিস্ট হতে হবে কেনো? পুরুষ মানুষ যেহেতু এক কাপড়ে চারদিন পার করে দিবে তা না। সকালে জগিং স্যুট হিসেবে হাফ হাতা কোনো টি-শার্ট এবং ট্রাউজার পরবে। সেসব পরা অবস্থায় সায়েরী পিক করে দশটা অবধি থাকবে৷ পরিবর্তে কলেজের জন্য আবার ফুল হাতা শার্ট অথবা টি-শার্ট এর উপর শার্ট গলিয়ে, সুন্দর গেবাডিং প্যান্ট পরবে৷ মানে হয় এসবের! ঢংয়ের যেন শেষ নেই। ভাবতে ভাবতেই ভেংচি কাটে সায়েরী৷ সে জানে, এসব মেয়ে পটানোর ধান্দা ছাড়া আর কিছু নয়। আবার এটা ভেবেও তার কোমল মনে মন খারাপের মেঘ জমে। বিড়বিড় করে আওড়ায়,
‘ সবসময় এতো গম্ভীর হয়ে থাকলে ভালো লাগে? একটু রোমান্টিক হলে কি ক্ষতি হয়? ‘

ভেবেই দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে। আন রোমান্টিক অপ্রেমিক’টার জন্য অপেক্ষা করতে করতে তার চোখ যায় লিভিং রুমের দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা বড় শোপিশ হোল্ডার টা দিকে। সেখানের উপর অবহেলায় পড়ে আছে সাফওয়ানের চকচকে কালো গিটারটা৷ আগে ছিলো না। হয়তো গতকালই রাখা হয়েছে। সায়েরী পায়ের পাতা উঁচু করে হাত বাড়ালো সেদিকে। কিন্তু অসাবধান বশত হাতের নাগালে এসেও হাত থেকে ফসকে গেলো তা। চোখের পলকে ধরাম করে এসে পড়লো সায়েরীর পায়ের পাতায়। মুহুর্তেই আর্তনাদ করে উঠলো সায়েরী। যতটা না ব্যাথা পেয়েছে, তার চেয়েও বেশি আচমকা ঘটনায় ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠেছে সে। পায়ে হাত চেপে ফ্লোরে বসে পড়লো সে। তখনই চোখ গেল গিটার টার দিকে৷ তার চকচকে কালো গায়ে স্পষ্ট ফাটলের চিহ্ন। তা দেখে আৎকে উঠলো সায়েরী। সেই সাথে কানে আসলো সাফওয়ানের উদ্বিগ্ন কন্ঠের ডাক, ‘ সুবহা! ‘

দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসছে সাফওয়ান। চোখে, মুখে চিন্তার চাপ তার। সায়েরীর বুক ঢিপঢিপ করে৷ মনে পড়ে যায় কয়েক মাস আগে কলেজে এভাবেই একবার সাফওয়ানের গিটারটা ফেলে দিয়েছিল বলে কত কথায় না শুনতে হয়েছিল তাকে। আজ তো ভেঙ্গেই ফেলেছে। এবার কি হবে! ভীতু দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে রইলো। সাফওয়ান এগিয়ে আসে। সায়েরীর সামনে থেকে গিটারটা পায়ে ঠেলে দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো সে৷ প্রায় সাথে সাথেই নরম গালটাতে হাত রেখে চিন্তিত কন্ঠে সুধাল,

‘ কি হয়েছে? ব্যাথা পেয়েছ কোথাও? ‘
অপ্রত্যাশিত এই আচরণে সায়েরী বাকহারা। ঢোক গিলে সে কোনো রকমে বলে, ‘ অ..আপনার গিটার… ‘
সাফওয়ান কপালে ভাঁজ ফেলে সায়েরীর সর্বাঙ্গে চোখ বুলায়। ফিরেও তাকায় না গিটারের দিকে। সায়েরীর কথা শুনে সে এবার লক্ষ্য করে পায়ে হাত চেপে বসে আছে সায়েরী। তা দেখেই সে সায়েরীর হাত সরিয়ে পা ছুঁয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,

‘ পায়ে গিটার পরেছে? দেখি! বেশি ব্যাথা পেয়েছ? ‘
‘ আপনার গিটার ভেঙ্গে গেছে। ‘
‘ আমি কি জিজ্ঞেস করেছি? ‘ সাফওয়ানের কন্ঠে রাগ৷
সায়েরী দমে গেল তা শুনে। ধীর কন্ঠে জবাব দিলো,
‘ অতটাও লাগেনি। ভয় পেয়ে চিৎকার করেছিলাম৷ ‘
‘ জুতো কোথায় তোমার? পা খালি কেন? ‘

সায়েরী জবাব দিলো না একথার। সাফওয়ানও আর কথা বাড়ালো না। উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দেওয়া মাত্র তার হাত ধরে উঠে দাঁড়ালো সায়েরী। পরপরই সাফওয়ানের আদেশে সোফায় গিয়ে বসলো সে। আড়চোখে তাকালো গিটার টার দিকে। আশ্চর্য ব্যাপার! সাফওয়ান এত সময়ে এই অসহায় বস্তু টার দিকে ফিরেও তাকালো না! এটা না তার পছন্দের গিটার! আজ কতগুলো বছর অবধি আগলে রেখেছে। আর আজ পাত্তাও দিচ্ছে না! আচমকা পায়ের পাতায় ঠান্ডা কিছুর স্পর্শ পেয়ে কেঁপে উঠলো সে। বিষ্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলো সাফওয়ান ফ্লোরে বসে আইস ব্যাগ চেপে ধরেছে সায়েরীর পায়ের পাতায়। এই দৃশ্যে সায়েরী চমকে উঠলো। দ্রুত পা সরিয়ে নিতে গেলে সাফওয়ান অন্য হাতে চেপে ধরলো তা। বিরক্ত চোখে তাকাতেই সায়েরী দ্রুত গলায় বলে উঠলো ,

‘ ক..কি করছেন? পায়ে হাত দিয়েছেন কেনো? উঠুন। ‘
‘ ডিসটার্ব করবে না সুবহা। অলরেডি অনেক লেট হয়ে গেছে কলেজের জন্য। ‘
সায়েরী পুণরায় কিছু বলতে গেলে সাফওয়ানের চাহনি দেখে দমে যায়। সাফওয়ান মিনিট দুয়েক আইস ব্যাগ লাগিয়ে উঠে দাঁড়ালো। সায়েরীর স্নিকার্স জোড়া এনে দিয়ে নিজেই ফিতা লাগিয়ে দিলো সেগুলোর। সায়েরী তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে গেল শুধু। বাবার পরে এই দ্বায়িত্ব আজ অন্য কেউ পালন করেছে। সাফওয়ানের এই ছোট ছোট যত্নে মনটা পুলকিত হয়ে উঠেছে তার। সাফওয়ান জুতোর ফিতা লাগানোর মাঝেই সায়েরী মিনমিন কন্ঠে বললো,

‘ আপনার পছন্দের গিটারটা ভেঙ্গে ফেলেছি। এজন্য কোনো শাস্তি দিবেন না? ‘
সাফওয়ান চোখ তুলে তাকালো তার দিকে। দুই হাঁটুতে ভর দিয়ে সায়েরীর কাছাকাছি এসে নিম্ন কন্ঠে জবাব দিলো,
‘ পছন্দের জিনসটার উর্ধ্বে গিয়ে পছন্দের মানুষ ঠাই পেয়েছে। তার জন্য সব গুনাহ মাফ। ‘

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৪৭+৪৮

সম্মোহনী কন্ঠের এটুকু বাক্যে লজ্জায় নেতিয়ে পড়লো সায়েরী। নজর সরিয়ে নিলো দ্রুত। লজ্জায় গাল ফুলে উঠেছে তার। অদ্ভুত এক ভালো লাগায় বুকের ভিতর টা শীতল হয়ে এসেছে। পেটে যেন উড়ুউড়ু করছে একঝাঁক রঙিন প্রজাপতি। পূর্বে যে এই মানবকে অপ্রেমিক বলে আখ্যায়িত করেছিল। তা ফিরিয়ে নিতে এক সেকেন্ডও বিলম্ব করলো না সে। কাছ ঘেষে, মিষ্টি মিষ্টি কথা বললেই কি প্রেমিক হয়ে যায় নাকি? এই যে সাফওয়ান নামক দাম্ভিক মানুষটা নিজের সত্তার বিপরীতে গিয়ে, সব কিছুর উপরে সায়েরীকে স্থান দিয়েছে। এটাই তো প্রকৃত প্রেমিক পুরুষের সব চেয়ে বড় উদাহরণ। যার কাছে সুবহা নামক রমণী-টি সম্মানের, ভালোবাসার, দ্বায়িত্বের। একান্ত সাফওয়ানের দ্বায়িত্ব যেন সে৷ ভবিষ্যৎ দ্বায়িত্ব। যা এখন থেকেই নিজের মতো গড়ে তুলছে সে৷ একদম সাফওয়ান তেহজিব খান’র মত মতো।

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৫১+৫২