অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭৩
সাজিয়া জাহান সুবহা
ডিসেম্বর মাসের প্রথম ভোর। বলা যায় কুয়াশাজড়ানো, নির্মল, স্নিগ্ধ ভোর। শিশিরে শিক্ত ঘাস, পাতায় তখনো সূর্যি মামার রূপের আলো টিকরে পড়েনি। সে আজও মুখ লুকিয়ে আছে ঘন মেঘের আড়ালে। ফলস্বরূপ বাড়াবাড়ি রকমের ঠান্ডা হয়ে আছে তাপমাত্রা। হাড়হীম করা ঠান্ডা পানি দিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে মাত্রই ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েছে সায়েরী। গা কাঁপছে ঠকঠক। ঘুমে ঢুলুঢুলু দুই চোখ। তোয়ালে দিয়ে মুখ-হাত মুছে ধাম করে পুণরায় এসে বিছানায় শুয়ে পড়লো সে। মাথা হতে পা অবধি ঢেকে ফেললো কম্ফোর্টারের আড়ালে। সেকেন্ড দুয়েকের মাঝে কর্ণগোচর হলো মুঠোফোনের কর্কশ শব্দ। বালিশের নিচ হতে অনবরত বেজে চলেছে সেটা। চোখ বুজে রাখা অবস্থাতেই তা হাতিয়ে নিলো সায়েরী। না দেখে,আন্দাজেই রিসিভ করলো কল। কানে চেপে মিনমিন কন্ঠে আওড়াল,
‘ আজকের ওয়েদার বেশিই ঠান্ডা তাইনা? আপনি নিশ্চয় ঘুমাচ্ছেন? বেশ তো, এতো ঠান্ডার মাঝে বাহিরে যাওয়ার কি দরকার! আপনি ঘুমান, সাথে আ.. ‘
‘ সুবহা!!! ‘ স্পষ্ট কন্ঠের এক রাশভারি ডাক।
‘ ওহ-হো! ঘুমাচ্ছেন না? ‘ গাল ফোলাল সায়েরী।
‘ এটা ঘুমানোর সময়? তুমি আবারো ফাঁকিবাজি করার চেষ্টা করছো? তোমাকে নিয়ে আম… ‘
বাকি কথাগুলো শোনার আর প্রয়োজন বোধ করলো না সায়েরী। নাক-মুখ কুঁচকে মোবাইল নামিয়ে রাখলো বালিশের উপর। উঠে বসে কম্ফোর্টার জড়িয়ে নিলো গায়ে। শুধু মাত্র মুখখানা দেখা যাচ্ছে। সেই অবস্থাতেই স্ক্রিনে দৃষ্টি তাক করলো সে। সাফওয়ানের আবছা কন্ঠ তখনো বেজে চলেছে। হুহ! লেকচার ঝারছে। যেনো কোথাকার কোন প্রফেসর সে। কিন্তু সায়েরী তো মোটেও বাধ্য ছাত্রী নয়। একটুও না। তাইতো, এই ফ্রিতে পাওয়া লেকচারারের আবছা কন্ঠ-টুকু শুনে সে ভেংচি কেটে বললো,
‘ বাজতে থাকুন, আপন শক্তিতে। ‘
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
ঘড়ির কাঁটা আটটার ঘরে পৌঁছাতেই তাড়াহুড়ো করে ডাইনিং স্পেস ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো সায়েরী। নাটেলা লাগানো আধখাওয়া ব্রেড দুটো হাতে নিয়ে, চেয়ার হতে ব্যাগ তুলে নিলো কাঁধে। কিচেনে অবস্থানরত মেহরিন বেগমের উদ্দেশ্যে “আম্মু বের হচ্ছি” বলতে বলতে ঘরের চৌকাঠ পার হতে উদ্যত হলো সে। তৎক্ষণাৎ তার চঞ্চল পদচারণ থমকালো আবরারের কন্ঠে,
‘ দাঁড়া। আমি পৌঁছে দিয়ে আসবো। ‘
সায়েরীর খাবার গলায় আটকে গেল। কেশে উঠলো অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে। আবরার তখনো খাওয়ায় মশগুল। তার দিকে একপলক তাকিয়ে সায়েরী জোরপূর্বক হাসলো।
‘ আমি একাই যেতে পারবো ভাইয়া। রাস্তায় দাঁড়ালেই তো গাড়ি পেয়ে যায়। তোমার আসার কি দরকার? ‘
আবরার শুনেও একথার কোন প্রতিউত্তর করলো না। চট জলদি খাওয়া শেষ করে উঠে সায়েরীকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। যেতে যেতে গম্ভীর কন্ঠে আদেশ ছুড়ল,
‘ জলদি আয়.. ‘
বাইক বের করে রাস্তায় নামতেও সময় নিলনা আবরার। চিন্তাগ্রস্ত সায়েরী বুঝে উঠতে পারলো না কীভাবে পরিস্থিতি সামলাবে। সাফওয়ান ভাই নিশ্চয় রাস্তায় দাঁড়িয়ে! আবরার যদি দেখে ফেলে তাকে? চিন্তায় বিভোর হয়ে সে ব্যাগ হতে মোবাইল বের করতে চাইলো৷ কিন্তু সেই সুযোগ টুকু আর দিলনা আবরার। জোর গলায় হাক ছাড়তেই সায়েরী ছুটে এলো। চেপে বসলো বাইকে। তাদের বাড়ির রাস্তা পেরিয়ে পরবর্তী রাস্তাতেই দাঁড়ায় সাফওয়ানের গাড়ি। সেই রাস্তাতে বাইক উঠতেই সায়েরী দূর থেকে দেখার চেষ্টা করলো। কুয়াশাজড়ানো রাস্তায় দূর থেকে কিচ্ছুটি দেখা গেল না। কিন্তু সায়েরী রিস্ক নিতেও চাইলো না। কাছাকাছি পৌঁছে কালো রাঙা টয়োটা গাড়িটির আবছা অবয়ব দেখা মিলতেই সে কাঁধ ঝাঁকাল আবরারের। বিপরীত দিকে হাত উঁচিয়ে বলে উঠলো,
‘ ভাইয়া! ওটা..ওই বাসাটা রহমান আঙ্কেলদের না? ‘
‘ হ্যাঁ। তুই আজ নতুন দেখছিস নাকি? ‘
‘ ন-না ম..মানে ওখানে দেখো, বারান্দায় জারবেলা ফুল দেখা যাচ্ছে। তোমাকে কতবার বলেছিলাম আমাকে কয়েকটা চারা এনে দাও। দিলে না তো। ‘
‘ জারবেলার কথা কখন বলেছিস? আর ওগুলো আর্টিফিশিয়াল। এই শীতকালে চারা আনলেও লাভ নেই। পরে এনে দিব। ‘
সায়েরী বুঝদারের মতো মাথা নাড়ে। বড় করে স্বস্তির শ্বাস ফেলে ঘাড় ফিরিয়ে তাকায় পেছনে ফেলে আসা গাড়িটির দিকে। গাড়ির মালিক নির্ঘাত তব্দা খেয়ে বসে আছে। থাকুক বসে। তারই বা কি দোষ!
গন্তব্যে পৌঁছেও আবরার গেল না। কোচিং সেন্টারের প্রবেশ মুখেই দেখা মিলেছে রাতুল নামক মানবটির। যাকে সায়েরীর টিচার হিসেবে নিয়োগ করেছিলো আবরার। ছেলেটাকে আগে কখনো দেখেনি সায়েরী। তাই তো, বাইক থেকে নেমেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলো সে। অপেক্ষায় ছিলো আবরারের ফিরে যাওয়ার। আবরারকে দেখামাত্র রাতুল এগিয়ে এলো। হ্যান্ডশেক করে কথা বাড়ালো। তৎক্ষনাৎ পার্শ্ববর্তী স্থানে দন্ডায়মান সায়েরীকে চাপা স্বরে ধমকে উঠলো আবরার,
‘ বেয়াদবের মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? টিচারকে সালাম দিতে হয়,জানিস না? ‘
সায়েরী থতমত খেয়ে গেলো। সালাম জানালো সঙ্গে সঙ্গে। রাতুলের মুখে মিটিমিটি হাসি। মাথা নেড়ে সালাম গ্রহণ করে সে বললো,
‘ ভেতরে যাও, আমি আসছি। ‘
সায়েরী জোরপূর্বক হাসে। গুটিগুটি পায়ে ভেতরে ঢুকে। চটজলদি মোবাইল বের করে সাফওয়ানকে কল করবে বলে। কিন্তু ভাগ্য খারাপ! না আছে ব্যালেন্স। না তো ইন্টারনেট কানেকশন। পূর্বে কখনো জরুরি কোন কারণে সাফওয়ানকে ফোন করা হয়নি। এমন বাজে পরিস্থিতিতে পরেনি। কিন্তু সাফওয়ান ভাই বোধহয় আগে থেকেই জানতো, এক না এক দিন এমন এক পরিস্থিতির স্বীকার তাকে হতেই হবে। তাইতো, রাতুল নামক মাননটিকে সে পূর্বে থেকেই সবটা জানিয়ে রেখেছে। ভাগ্যিস জানিয়েছিলো, নয়তো আজ আবরারের কাছে কেমন ধরা টাই না পড়তো! বুকে হাত চেপে বড় করে শ্বাস ফেললো সায়েরী। আপনমনে বিড়বিড় করলো,
‘ আমি মাথামোটার কপালে এমন এক সোয়ানা কীভাবে জুটে গেল! ‘
মিনিট দুয়েকের মাথায় উক্ত স্থানে উপস্থিত হলো রাতুল। সায়েরী ফিরে চাইলো। কানে মোবাইল চেপে রাখা অবস্থাতেই তার দিকে তাকিয়ে রাতুল মৃদু হাসলো। কল কেটে ছোট্ট স্বরে জানালো,
‘ যাও, সাফওয়ান এসেছে। ‘
তার বলতে দেরি হলেও, সায়েরীর ছুটে যেতে দেরি হলোনা। গেইট পেরিয়ে বাহিরে কদম ফেলামাত্র সাফওয়ানের অবয়ব দেখে স্বস্তি পেলো সে। কাছে এগোতে নিয়ে চোখে চোখ পড়তেই হঠাৎই ফিক করে হেসে দিলো সে। পরমুহূর্তেই নিজের মুখ নিজেই চেপে ধরে আটকে ফেললো শব্দটুকু। কালো মাস্কের আড়ালে ঢাকা সাফওয়ানের বাদামি চোখ দুটোতেও দেখা দিল মৃদু হাসির আভাস। সায়েরী কাছাকাছি পৌঁছাতেই সে হাত বাড়ালো। শক্ত করে টিপে দিলো মেয়েটার ফুলো গাল।
‘ তোমার ওভার পজেসিভ বড় ভাইয়ের কাছে আজ ধরা পড়লে এই গালদুটোর রক্ষে থাকতো না। আর তুমি ভয় না পেয়ে হাসছো? ‘
সায়েরী ফের হাসলো। আবরারের নাকের নিচে এভাবে সবাই মিলে ঘোল খাওয়ানোর ব্যাপারটায় না চাইতেও হাসি পেয়ে যাচ্ছে তার। হাসিমাখা গলায় সে প্রতিউত্তর করলো,
‘ আমার গাল লাল হলে আপনিও কি অক্ষত থাকতেন? এই পর্বত সমান উঁচু নাকটা এতক্ষণে রক্তে ভেসে যেতো। ‘
সাফওয়ান অসন্তুষ্ট নজরে ভ্রুঁ কুঁচকে তাকায়। কিন্তু মুখ ফুটে বললো না কিছু। সায়েরীর ধরে রাখা হাতটার শীতলতা অনুভব করে নীরবে। মেয়েটা কেনো যে ভারী পোষাক পরে না! গাড়ির দরজা খুলে দিতেই ঝটপট উঠে বসলো সায়েরী। সাফওয়ান নিজেও ড্রাইভিং সিটে বসে গায়ের লেদার জ্যাকেট টা খুলে সায়েরীর গায়ে চড়িয়ে দিলো। আজ আর বকলো না। জানে, বলেও লাভ বিশেষ নেই। সায়েরী বিনা বাক্যে চট জলদি বড়সড় জ্যাকেট-টার আড়ালে ঢেকে ফেললো নিজের ছোটখাটো দেহশ্রী। জ্যাকেটের কলার উঁচিয়ে নাকের কাছাকাছি টেনে চোখ বুজে লম্বা শ্বাস টানলো। নাসারন্ধ্রে টেনে নিলো সাফওয়ানের শরীরের কড়া সুভাসটুকু। এতো এতো ভালো লাগে এই সুঘ্রাণ! একদম মন কোটরে বন্ধি করে রাখার মতো। সায়েরীর সিট বেল্ট লাগানো অবস্থায় আড়চোখে এই দৃশ্য টুকু দেখে সাফওয়ানের ঠোঁট জোড়া প্রসারিত হলো। একমাত্র এই জ্যাকেটের আড়ালে গুটিশুটি মেরে বসে থাকার জন্যই যে মেয়েটা সুয়েটার পরে আসে না, তা জানে সে। এজন্যেই প্রথম কয়েকদিন কড়া কথা বললেও, এখন কিচ্ছুটি বলে না।
‘ তোমার ভাই হঠাৎ এমন স্পাইগিরি শুরু করেছে কেনো? কি গন্ডগোল পাকিয়েছো তুমি? ‘
সাফওয়ানের গম্ভীর স্বরের এহেন কথায় সায়েরী ভাবুক হলো কিছুটা। বিগত দুটো সপ্তাহ ধরে সত্যিই আবরার কড়া শাসনে রেখেছে তাকে। ফোন চালাতে দেখলে বকে, রাত জাগে জানলে বকে, অসময়ে একা একা পিউদের বাসায় যেতে চাইলে বকে। আরও কতো কিছু। এগুলো কি তার আগত বোর্ড এক্সামকে কেন্দ্র করে, না অন্য কোন কারণে তা সায়েরী জানে না। জানার জন্য আহামরি মাথাও ঘামায়নি সে। এখনো দায়সারা ভাবে জবাব দিলো,
‘ বছর তো শেষ। এপ্রিলে আমার বোর্ড এক্সাম। তাইতো এমন স্ট্রিক্ট হয়েছে। ‘
সায়েরী সরল গলায় কথাটা বললেও সাফওয়ান সেকথায় কোন ধ্যান দিল না। তার চোখ দুটোতে লুকিয়ে স্পষ্ট চিন্তার আভাস।
বেলা সাড়ে তিনটা। সূর্যের কড়া রোদে উজ্জ্বল ধরনী। ব্যস্ত, কোলাহলপূর্ণ সড়কের একধারে দন্ডায়মান কালো টয়োটা গাড়িটি। ড্রাইভিং এবং ফ্রন্ট সিটে বসে থাকা ভিন্ন দুই মানব-মানবীর চোখে-মুখে আলাদা এক জেদ লক্ষনীয়। নিত্যনতুন কান্ডের মতো, আজও মতের অমিলে নিজেদের মাঝে নীরব জেদ চেপে বসেছে দুজন।
‘ বসে থাকবেন এখানে? আমি তবে একাই চলে যাই? ‘
সায়েরী বললো কোমল স্বরে। কিন্তু কোমল স্বরটিতেও স্পষ্ট জেদের আভাস। সাফওয়ান কঠোর চাহুনি নিক্ষেপ করে তার দিকে। মেয়েটা দেখেও পরোয়া করলো না। নিজ সিদ্ধান্তে অটল থেকে বলে উঠলো,
‘ এভাবে তাকাচ্ছেন কেনো? আমি তো আসতে চেয়েছি আমার বন্ধুদের সাথে। রোজ তো ওদের সঙ্গেই ফিরি। আজ আমাদের ফুচকা খাওয়ার প্ল্যান ছিলো। আপনার জন্য ওরা আমাকে ফেলে চলে গিয়েছে। বেশ, এখন আপনিই খাওয়াবেন। ওইতো, ফুচকাওয়ালা মামাটা তাকিয়ে আছে। ডাকুন উনাকে.. ‘
সাফওয়ান শক্ত করে ঠোঁটে ঠোঁট চাপলো। দীর্ঘ পনেরো মিনিট ধরে সে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রেখেছে। কারণ কি! সায়েরীর অহেতুক জেদ৷ ফুচকা ব্যতীত এক কদম এখান থেকে নড়তে নারাজ সে। এই আন-হাইজেনিক খাবারটা দেখলেই সাফওয়ানের গা গুলিয়ে উঠে। ব্যাপারটা সায়েরীকে বুঝাতে চেয়েও সে ব্যর্থ হলো। মেয়েটার এমন জেদি স্বভাব দেখে সে আপনমনে ভাবলো, এই মেয়ে কোন ধাতু দিয়ে তৈরি?
প্রশ্ন করার পর হুট করে আপনা আপনি উত্তর টুকুও মাথায় খেলে গেল। কথায় আছে, ছেলেদের পাজরের হাড় দিয়েই তাদের পার্টনারকে বানানো হয়। একথা মাথায় আসতেই হতাশায় ভরা শ্বাস ফেললো সাফওয়ান। বুঝলো, সমস্যা তবে ভিন্ন কোন ধাতু-তে নয়। সমস্যা ঠিক তার পাজরে, হাড়ে-হাড়ে, নিউরনে-নিউরনে। সায়েরীর পরিবর্তে এবার আপনমনে নিজেকে বকতে বকতেই গাড়ি ছেড়ে বের হলো সে। হাঁটা ধরলো অপজিট রোডে ফুসকা ওয়ালার স্টলের দিকে। তাকে যেতে দেখেই সায়েরীর ঠোঁট জোড়ায় খেলে গেল বিজয়ের হাসি। অবশ্য ব্যাপারটা নতুন নয়, প্রায়শই তার জেদের কাছেই তো হার মানে এই কঠোর ব্যক্তিত্ব ধারী যুবক।
সাফওয়ান প্লেটের পরিবর্তে পার্সেল নিয়ে নিলো। অপেক্ষারত দশ মিনিট গুলো কাটিয়ে দিল মোবাইল স্ক্রল করে। বিল পরিশোধ করে রাস্তা পার হলো। কিন্তু গাড়িতে উঠার আগ মুহুর্তে হঠাৎ দৃষ্টি গেল অদূরে। চিরপরিচিত পুরুষালি অবয়ব টুকু দেখে এক মুহুর্তের জন্য থমকাল সে। ব্যক্তিটির কপালে সুক্ষ্ম ভাঁজ লক্ষণীয়। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই সাফওয়ান অবচেতনে হাত দিল মুখে। মাস্ক নেই। ব্যাপারটা উপলব্ধি করতে পেরে চোখ খিচল সে। আপনমনে হিসহিসিয়ে উঠলো, ‘শিট! শিট! শিট! ‘
একপ্রকার তাড়াহুড়ো করেই গাড়িতে চেপে বসলো সে। খোলা কাঁচের বাহিরে মুখ বের করে বসে থাকা সায়েরীর বাহু ধরে এক টান মেরে সরিয়ে নিলো তাকে। কালো কাঁচগুলো উঠিয়ে দিয়ে রীতিমতো ধমকে উঠলো,
‘ কতোবার বলেছি মাঝ রাস্তায় কাঁচ নামাতে না। কথা শুনো না কেনো? ‘
সাফওয়ানের এমন প্রতিক্রিয়া দেখে সায়েরী আশ্চর্য হলো বেশ। বুঝে উঠতে পারলো না ঘটনা। ব্যস্ত হাতে স্টিয়ারিং চেপে গাড়ি ঘোরালো সাফওয়ান। তার চোখেমুখে গাঢ় গাম্ভীর্য। কপালে স্পষ্ট তিনটে ভাঁজ। যেনো কিছু নিয়ে বেজায় চিন্তিত। হঠাৎ কি থেকে কি হলো সায়েরী কিচ্ছুটি বুঝে উঠতে পারলো না। কেবলমাত্র আন্দাজ করলো, কোথাও কিছু একটা স্বাভাবিক নেই। বুকের মাঝে বেজে গেল অজ্ঞাত কোন বিপদ সংকেত।
সন্ধ্যা সাতটা। খান বাড়ির লিভিং রুমে বসে টিভি দেখছে সাফ্রিন,সাম্য এবং সামান্তা। “Maleficent” মুভি চলছে স্ক্রিনে। ডানা হারানোর পরবর্তী, লোমহর্ষক দৃশ্য চলমান। এমন মুহূর্তে হঠাৎই সদর দরজা পেরিয়ে ঘরে ঢুকলো সাফওয়ান। সাফ্রিনের বেখেয়ালি নজর একপলক সেদিকে তাকিয়েছিলো। নজর ফিরিয়ে নেওয়া স্বত্তেও পরমুহূর্তে আবারও ফিরে তাকালো সে। ততক্ষণে তুফানের গতিতে প্রস্থান করেছে সাফওয়ান। কিন্তু সাফ্রিন স্পষ্ট দেখল, ভাইয়ের অসম্ভব রাগী চেহারা। জলন্ত এক অগ্নিকুণ্ড যেনো। শীতের সন্ধ্যায় হাফ হাতা টি-শার্ট পরে কোথা থেকে ফিরে এলো? ছিলো কোথায় সারাটিদিন? কার সঙ্গে তর্ক করে এমন অগ্নিকুণ্ড হয়ে ফিরে এসেছে?
কিচেনে কর্মরত তাহুরা খানের কাছে ছুটে গেল সাফ্রিন। তাকে দেখেই তাহুরা খান বলে উঠলেন,
‘ তোমার বাবাকে একটা কল দাও, সাফা। দেখো কোথায় আছে। দুপুরেও খেতে আসেনি। মিটিং ছিলো বলেছিলো। কিন্তু এখনো এলো না কেনো? ছেলেটাও দুপুরে বেরিয়েছে, আর আসার নাম নেই। এদের নিয়ে আমি কি যে ক.. ‘
‘ ভাইয়া তো এসেছে আম্মু। এইমাত্র এলো৷ দেখে মনে হলো রেগে আছে খুব। তুমি যাও না, দেখো কি হয়েছে। ‘
তাহুরা খানের কথার মাঝে সাফ্রিন প্রতিউত্তর করলো। তার কথাটা শুনে বিচলিত হলেন তাহুরা খান। উনার ছেলের যে বড়োই গম্ভীর মেজাজ। গুরুতর রেগে গেলে আশেপাশের কারোর রক্ষে থাকে না। ব্যাপারটা সকলেই জানে। আজও বোধহয় তেমনই রেগেছে। নয়তো সাফ্রিন এমন ছুটে আসতো না। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে তিনি দ্রুত হাঁটা ধরলেন সিড়ি পথে। পেছনে চিন্তিত মুখে সাফ্রিন তাকিয়ে রইল কেবল। ভাবলো, এই রাগের কারণ কোনো ভাবে সায়েরী নয়তো?
সাম্য-সামান্তার সঙ্গে বসে অবশিষ্ট মুভি টুকু শেষ করলো সাফ্রিন। ঠিক কতক্ষণ কেটে গেলো সেই সম্পর্কে ধারণা নেই তার। তাহুরা খানের মোবাইলটা তার কাছেই রয়েছে। সেখানে একমাত্র মামার কল এসেছে দেখে এবারে সে মায়ের খোঁজ করলো। কিচেনে,বেডরুমে না পেয়ে খেয়াল হলো সাফওয়ানের রুমের কথা। এতক্ষণ যাবত সেখানে বসে আছে নাকি! দোতলার পশ্চিম দিকে সবচেয়ে কর্ণারের বড়সড় রুমটিই হলো বাড়ির বড় ছেলের বেডরুম। সেটি সহ প্রায় অনেক গুলো রুমই সাউন্ডপ্রুফ। করিডর পেরিয়ে সাফওয়ানের রুমের কাছাকাছি পৌঁছাতেই আকস্মিক সাফ্রিনের কানে বিঁধল ভাইয়ের উচ্চ কন্ঠস্বর। যেনো ঝগড়ায় লিপ্ত কারো সাথে। কিছু ভেঙ্গেছে বুঝি?চুরমারের শব্দ হলো কেনো? চঞ্চল কদমে ছুটে এলো সে। ভিজিয়ে রাখা দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতে উদ্যত হয়েও থমকে গেলো হঠাৎ। চোখে মুখে ছেয়ে গেল হতবিহ্বল ভাব। দেখলো, রুমের ফ্লোর জুড়ে ফ্লাওয়ার ভাসের ভাঙা টুকরোর ছড়াছড়ি। বেডের পাশেই ফ্লোরে একটি বড়সড় মিরর ছিলো। যা বর্তমানে চুরমার হয়ে ছড়িয়ে আছে চতুর্দিকে। সাফওয়ানের ডান হাতের উল্টো পিঠ চুইয়ে চুইয়ে রক্ত ফোটা গাড়িয়ে পড়ছে ফ্লোরে। তার অবয়ব জুড়ে বিধ্বংসী ভাব পরিলক্ষিত। যেন ঝড় বয়ে গিয়েছে তার উপর। একই সঙ্গে তান্ডব চলেছে রুমের মধ্যে। অসম্ভব শক্ত চোয়াল, রক্তিম আভা ছড়ানো কপালে ধপধপ করছে নীল মোটা রঙ। এ কেমন রূপ! কেনো জন্মালো এই বিধ্বংসী ক্রোধ!
তাহুরা খান স্তব্ধ, বিমূঢ় চিত্তে থমকে দাঁড়িয়ে আছেন সাফওয়ানের চেয়ে দশ হাত দুরত্বে। বুকে চেপে রেখেছেন একহাত। উনার নজরে অবিশ্বাস্য ঠেকছে ছেলের এমন উন্মাদনা। পূর্বে কখনো এই আকাশচুম্বী রাগ দেখেননি তিনি। সাফওয়ান কখনো মায়ের সম্মুখে এতোটা উন্মাদ রূপে ধরা দেয়নি। কিন্তু আজ! আজ কি হলো! ধরফরিয়ে উঠা বুকে হাত চেপে তাহুরা খান অস্পষ্ট কন্ঠে বললেন,
‘ শ-শান্ত হও তুমি। সাফওয়ান! আব্বা, আমার কথা শো..
‘ আমাকে তুমি বুঝ দিতে আসবে না, আম্মু। বাচ্চা নই আমি। আ’ম নট অ্যা ব্লাডি টিনেজার!!!! ‘
তাহুরা খানের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ভারিক্কি স্বরে গর্জে উঠলো সাফওয়ান। কথার তালে এক লাথি মারলো বেডের নিচের দিকের, কাঠের অংশে। সেই শব্দে উপস্থিত মা-মেয়ে দুজনেই ভয়ে চোখ খিচল। হিংস্র রাগে ফোঁসফোঁস শ্বাস ফেলছে সাফওয়ান। সেদিক তাকিয়ে সাফ্রিন ভয়ে নিজ স্থানে জমে আছে। তবে তাহুরা খান এগোলেন। সাবধান পায়ে এগিয়ে, ছেলেকে টেনে বসালেন বিছানায়। আকাশচুম্বী ক্রোধ টুকু এক মুহুর্তের জন্য গিলে নিতে বাধ্য হলো সাফওয়ান। মায়ের হাত ঝার দিয়ে উঠে চলে যাওয়ার মতো অভদ্রতামি টুকু করতে চেয়েও করলো না। ফার্স্ট এইড বক্স হতে তুলো বের করলেন তাহুরা খান। তাতে বিটাডিন লাগিয়ে পরিষ্কার করলেন সাফওয়ানের ক্ষতস্থান। কর্ম অব্যাহত রেখেই শান্ত সুরে বললেন,
‘ এতোটা অধৈর্য হচ্ছো কেনো? মাথা ঠান্ডা রেখে করো যা করার। রাগের মাথায় নির্বোধেরা পদক্ষেপ নেয়। আমার ছেলে নিশ্চয়ই নির্বোধ নয়? ‘
মায়ের মন ভোলানো কথাতেও টললো না সাফওয়ান। সেই একই কঠোর মুখাবয়ব তার। কথার প্রেক্ষিতে সহসা সে রাশভারি কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ আমি অযোগ্য! আই মিন হাউ কুড হি স্যে দিস টু মি, মা? নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করার মতো সময় এখনো এসেছে আমার? প্রয়োজন হয়নি বলেই তো কিছু করিনি এতদিন। সবটা জানা স্বত্তেও আমাকে এভাবে বললো কেনো? এতগুলো বছরে সে আমাকে এই চিনেছে? ‘
তাহুরা খান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। স্পষ্ট দেখলেন, ছেলের রাগত্ব কন্ঠের পেছনে লুকায়িত বিষাদটুকু। চোখের কোন রক্তিম হয়ে আছে। আপন কারো কাছ থেকে অপ্রত্যাশিত, অপছন্দের কথা গুলো শুনে নিশ্চয়ই ভীষণ কষ্ট পেয়েছে ছেলেটা! কষ্টের কথা তো কক্ষনো মুখ ফুটে বলে না সে। সবেতে রাগ দেখায়,জেদ দেখায়। এইযে হাত কাটলো, এভাবেই তো বুকের যন্ত্রণা সব লুকিয়ে ফেলে শরীরের যন্ত্রণার আড়ালে। মায়ের মন ভাড় হয়ে এলো। একটাই তো রত্ন উনার। এভাবে বিধ্বস্ত হতে দেখে কি ভালো লাগে! ফ্লোরের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে রয়েছে সাফওয়ান। আপন মনে যেন চক কষছে বহু কিছুর। তাহুরা খান হাত বাড়ালেন। সাফওয়ানের চুলে আঙ্গুল ডুবিয়ে কিছু বলতে উদ্যত হয়েছেন সবে, এমন মুহূর্তে হঠাৎই দাঁড়িয়ে পড়লো সাফওয়ান। ফসকে গেল আধখোলা ব্যান্ডেজ। ঠিকঠাক বাঁধাও হয়নি সেটা। সাফওয়ান পাত্তা দিলনা। অদ্ভুত, অস্বাভাবিক ভাবে নাকের নিচে আঙ্গুল ঘষল। অস্থির চিত্তে এদিকে সেদিক পায়চারি করলো বার দুয়েক৷ অতঃপর, তাহুরা খানকে আশ্চর্য করে দিয়ে বলে উঠলো,
‘ আমার ফাইনাল এক্সাম জানুয়ারিতে শেষ। গ্যাপ তো চলছেই। আমি বিজনেস জয়েন করবো, আম্মু। উমম..নাহ, জয়েন না। আ’ল স্টার্ট মাই অওন বিজনেস। মেঝো চাচ্চু হেল্প করতে পারবে তাইনা? ‘
চরম বিষ্ময়ে কথা হারিয়ে ফেললেন তাহুরা খান৷ ফ্যালফ্যাল নজরে কয়েক সেকেন্ড কেবল তাকিয়ে রইলেন ছেলের দিকে৷ যখন দেখলেন, সাফওয়ান তাড়াহুড়ো ভঙ্গিতে কাউকে ফোন করছে। ঠিক তখনই দাঁড়িয়ে পড়লেন তিনি। বেশ কড়া গলায় বললেন,
‘ মাথা ঠিক আছে তোমার? বিজনেস স্টার্ট করবো বললেই কি হয়ে যায়? গ্রেজুয়েট হলেই হবে? এর পর আর পড়াশোনা নেই? কোনো এইম নেই তোমার? ‘
মোবাইল থেকে দৃষ্টি তুললো সাফওয়ান। এক শান্ত, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তাক মায়ের দিকে। অত্যন্ত শীতল তবে দৃঢ় গলায় প্রতিউত্তর করলো,
‘ আমার লাইফের বিগেস্ট এইমটাই তো সায়েরী। ওকে হাসিল করার জন্য বাকি সব কুরবান করতে রাজি আছি। ‘
তাহুরা খান বিবশ হয়ে রইলেন। ছেলের এহেন প্রতিক্রিয়া দেখে বড্ড নাখোশও হয়েছেন তিনি। মাত্র চব্বিশ-পঁচিশ বছর বয়সে বিয়ে করাটা আহামরি কোন ব্যাপার নয়। কিন্তু সাফওয়ান যে নিজেকে প্রমাণ করার উন্মাদনায় নিজের বাকি জীবন ধ্বংস করার পথে নামার পয়তরা করছে, ব্যাপারটা মা হয়ে মোটেও সহ্য করতে পারছেন না তিনি। বিজনেস এবং পড়াশোনা একত্রে সামলানো চারটে খানি কথা নয়। যদি হতো ফ্যামিলি বিজনেস, তাও মানা যেতো। কিন্তু সাফওয়ান যেভাবে নিজেরই আলাদা পরিচয় গড়ে তুলবে বলে উঠেপড়ে লেগেছে, এমন উন্মাদ সিদ্ধান্তে সবটা বরং বিগড়ে যাবে। একুল-ওকুল সব কুলই সে হারাবে।
অগোছালো বেশভূষা নিয়েই রুম ত্যাগ করছিলো সাফওয়ান। হঠাৎই তার পদচারণ থমকালো মায়ের কন্ঠে৷ স্পষ্ট শুনলো মায়ের তেজস্বী কন্ঠের একাধিক বাক্য,
‘ যার জন্য এসব করছো তার কাছে তোমার মূল্য কতটুকু সেটা জানতে চেয়েছো কখনো? ওই এক মেয়ের জন্য তুমি সব কিছু ছাড়তে,নিজের ক্যারিয়ার ধ্বংস করতে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছ। জিজ্ঞেস করে দেখেছো ও আদৌ সবার উর্ধ্বে তোমাকে রেখেছে কিনা? ‘
কানের কাছে ঝাঁ ঝাঁ করে বাজলো কথাগুলো। প্রতিধ্বনিত হলো একাধিকবার। গলার কাছে আটকে থাকা শুকনো ঢোক গলঃধরণ করলো সাফওয়ান৷ দরজার হাতলে চেপে বসা হাতটার জোর বৃদ্ধি পেলো। আপনমনে নিজেকেই বুঝ দিলো, এসব প্রশ্ন একদম অহেতুক। সুবহা ভালোবাসে তাকে। ভীষণ ভালোবাসে, সবকিছু উজাড় করে দেওয়ার মতোন ভালোবাসে। ঐ অবুঝ মেয়েটার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, প্রেমানুভূতি সব তাকে ঘিরেই। সেই অনুভূতির কাছে এসব প্রশ্ন নেহাৎ ছেলেমানুষী আলাপ।
কিন্তু মন কি বুঝলো একথা! বুঝলো না তো। এই প্রথম মন গহীনে জমলো ক্ষীণ দ্বিধা। প্রশ্নগুলো কি করে দেখবে একটাবার?
রাত তখন সাড়ে দশটা। শীতের সময় বলে দশটা নাগাদ খেয়েদেয়ে লেপের নিচে গুটিয়ে যাওয়ার তাড়ায় রয়েছে সকলে। ক্ষুন্ন মনে বাবার জোরাজুরিতে খেয়ে উঠলো সায়েরী। মনটা তার বেজায় খারাপ। আজ কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পর আবরারের বেশ ঝাড়ি শুনেছে সে। এক একটা ধমক কলিজা কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো। তার ভুল একটাই। কলেজ ছুটি হয়েছে তিনটায়। কিন্তু সে বাড়ি ফিরেছে চারটা বাজার অল্প কয়েক মিনিট পূর্বে। এই একঘন্টা কোথায় ব্যস্ত ছিলো সেই কৈফিয়ত যথাযথ দিতে না পারার কারণে আবরার বেশ চটেছিলো। একে তো বকেছে, তার উপর একটাবার দেখা না দিয়ে সন্ধ্যায় বেরিয়ে গেছে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে। দুই বাবার মিলে এই একটাই ছেলে যেহেতু, তাই দুই বোনের ব্যাপারে আবরারের সব রকমের নিষেধাজ্ঞা, আদেশ সকলেই মাথা পেতে নেয়। বোন দুটো যে তারই দ্বায়িত্ব। সায়েরী বুঝে সেসব। তাও অভিমান হয়। এমন কড়া কথা শোনার অভ্যাস নেই কিনা।
বেডরুমে প্রবেশ করতেই দেখলো বিছানায় পড়ে থাকা ফোনটা অনবরত বাজছে। সাফ্রিনের কল। কেটে যেতে না যেতেই ফের নতুন উদ্যমে বাজতে লাগলো। সায়েরী অবাক হলো কিছুটা। এতো কিছু জরুরি তলব! রয়েসয়ে ফোন কানে তুললো সে। কিচ্ছুটি বলার সুযোগ টুকু পেলো না। পূর্বেই শোনা গেল সাফ্রিনের উত্তেজিত কন্ঠস্বর,
‘ সায়ু! হ্যালো! ভাইয়ার সাথে কথা হয়েছে তোর? সে কোথায় আছে জানিস? ‘
সায়েরী ভড়কে গেলো আচম্বিত কথাগুলো শুনে। এভাবে বলছে কেনো?
‘ কিছু হয়েছে? তুই এমন হাইপার হয়ে আছিস কেনো? ‘
‘ তুই কিচ্ছু জানিস না? ‘
‘ কি জানবো? হয়েছে কি বলবি তো? ‘
‘ সন্ধ্যা বেলা ভাইয়া আম্মুর সাথে ভীষণ রাগারাগি করেছে। রুমের মধ্যে ভাংচুর করেছে। আমি জানি না কি হয়েছে। শুনেও কিছু বুঝতে পারিনি। কিন্তু ভাইয়া একদম স্বাভাবিক ছিলো না সায়ু। আম্মুর সাথে এমন রাগারাগি করতে দেখিনি আগে। হঠাৎ কি হলো আমি জানি না। ভাইয়া তখনই বেরিয়ে গেছে, এখনো ফিরেনি। আম্মু ভীষণ টেন্সড। বাবাই তো বাড়ি ফিরে খেয়ে রেস্ট করছে। জানেও না এসব কিছু। আমি..আমি বুঝতে পারছি না কি করবো। তুই একটু ফোন করে দেখ না.. ‘
একনাগাড়ে কথাগুলো বলে দম নিলো সাফ্রিন৷ অন্যদিকে সায়েরী থমকে দাঁড়িয়ে। কান ভোঁ ভোঁ করছে। অস্থিরতায় উষ্ণতা ছড়াচ্ছে দেহ। রাগারাগি, ভাংচুর করে বাড়ি ছেড়েছে সাফওয়ান ভাই? কেনো? আর এখন রাত প্রায় এগারোটা বাজে। এখনো সে ফিরে আসেনি! হঠাৎ কি হলো?
‘ সায়ু? ‘
‘ হ-হুম! বল.. ‘
‘ তুই জানিস না কি হয়েছে? তোদের কি ঝগড়া হয়েছিলো? ‘
‘ একটুও না। তুই জানিস না সাফওয়ান ভাই কেমন? আমাদের মাঝে ঝগড়া হলেও অন্যদের কানে যেতে দিবে সে? আর এমন কিছু তো হয়নি। সব ঠিকঠাক চলছে। ‘
এবারে সাফ্রিনের চিন্তা আরও বাড়লো। চোখের সামনে যা যা দেখেছে, তার পর থেকে আর স্থির থাকতে পারছে না মেয়েটা। সাফ্রিন কল কাটলো। পরমুহূর্তে সায়েরী ব্যস্ত হলো সাফওয়ানের খোঁজ পাওয়ার আকাঙ্খায়। সাফওয়ানের দুটো নাম্বারেই ফোন দিলো সে। ভাগ্যক্রমে একটাতে কল ঢুকেছে। রিং বাজতে বাজতে কেটে গিয়েছে পরপর তিনবার৷ চতুর্থবারে গিয়ে ভাগ্য সহায় হলো। রিসিভ হলো অপর পাশ থেকে।
রাত এগারোটা। ঘন কুয়াশায় মোড়ানো এক শীতল পরিবেশ। হাড়হিম করা ঠান্ডা আবহাওয়া। অন্য দিন হলে এতক্ষণে সায়েরী নিজেকে গুটিয়ে ফেলতো নিজের আরামদায়ক বিছানার কোমল,উষ্ণ কম্ফোর্টারের আড়ালে। কিন্তু আজকের দৃশ্য ভিন্ন। মেয়েটার চোখে বিন্দুমাত্র ঘুমের রেশ নেই। দেহ জুড়ে অস্থিরতা, চাঞ্চল্য ভাব। মেহরিন বেগমের আপত্তি স্বত্তেও এই শীতের রাতে, নগ্ন পায়ে, পাতলা চাদর গায়ে জড়িয়ে সে ছুটে এলো ছাদে। বরাবরের মতো আজও পিউ এর নাম বেচে এসেছে। পেছনে তখনো চেঁচাচ্ছেন মেহরিন বেগম। সায়েরী পাত্তা দিলনা। ছুটন্ত কদমে ছাদে এসে নিঃশব্দে দরজায় খিল দিল। অতঃপর ঘুরে তাকালো অদূরে। দক্ষিণ দিকের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে এক পুরুষালি অবয়ব। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে রেলিংয়ের উপর বসে আছে সে। গায়ে শুধুমাত্র একটি টি-শার্ট, জিন্স। সায়েরী ভ্রুঁদ্বয় কুঁচকে এলো তা দেখে৷ দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিললো ঠিক সেই মুহুর্তে। সেভাবে তাকিয়েই চঞ্চল কদমে এগিয়ে এলো সায়েরী। রেলিং হতে নামলো সাফওয়ান। কাছাকাছি পৌঁছাতেই শোনা গেল সায়েরীর ব্যস্ত স্বর,
‘ আপনার কি হয়েছে? বাসায় রাগারাগি করেছেন কেনো? ‘
সেই কথার জবাব এলো না কোনো। বরং সাফওয়ান নিজেই ঝুঁকে এলো। ডান হাত বাড়িয়ে নির্বিকারে জড়িয়ে নিলো ছোট খাটো মেয়েলি দেহশ্রীটির লতানো কোমর। বলিষ্ঠ হাতে জোর প্রকাশ করে পলকেই শূন্য তুলে নিলো মেয়েটাকে। বসিয়ে দিলো রেলিংয়ের উপর। অনেকটা তার কাছাকাছি, মুখোমুখি। আকস্মিক কান্ডে বেশ চমকালো সায়েরী। ভরসার আশায় কোমল দুইহাত আপনা আপনি উঠে এলো সাফওয়ানের দিকে। জড়িয়ে নিলো গলা,কাঁধ। পুরুষোত্তম দেহটি হিমশীতল। যেনো হিমালয়ের বরফে জমিয়ে রাখা হয়েছে। ছুঁয়ে দিয়ে নিজেই কেঁপে উঠলো সায়েরী। গভীর ভাবে ফের ছুঁল সাফওয়ানের গলা, গাল,বাহু। বিহ্বল চিত্তে নিজ দেহে জড়িয়ে রাখা চাদরখানা খুলতে উদ্যত হয়ে বলে উঠলো,
‘ আপনি পাগল হয়েছেন? এতো ঠান্ডার মাঝে এমন পাতলা টি-শার্ট পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে কেনো? শীত লাগছে না? ‘
সায়েরীর কন্ঠে কিঞ্চিৎ তেজ,কিছুটা চিন্তার আভাস। চাদর টুকু নিজ দেহ হতে আলাদা করতে সক্ষম হলো না সে। সাফওয়ানের হিমশীতল এক হাত চাদর সমেত তাকে জড়িয়ে নিয়েছে বক্ষভাজে। অন্যহাতে স্পর্শ করলো সায়েরীর কানের নিচে। তাতেই চোখ তুলে তাকালো মেয়েটা। সাফওয়ানের বৃদ্ধ আঙ্গুল মৃদুভাবে স্পর্শ করছে তার ফুলো গাল। বাদামি মণি দুটোতে কিসের যেনো নিরব হাহাকার। সাদাটে অংশটিতে লালছে ভাব লক্ষণীয়। যেই চোখে নিজের জন্য ঘোর দেখে এসেছে এতকাল, সেই চোখের দৃষ্টি আজ অন্যরকম, অচেনা, অস্থিরতায় মোড়ানো। সায়েরীর বুক জুড়ে অদ্ভুত এক উত্তেজনা ছেয়ে গেলো। পলকহীন চোখে তাকিয়ে ক্ষীণ স্বরে আওড়াল,
‘ কি হয়েছে আপনার? ‘
বিপরীতে এক গভীর শ্বাস পড়লো মুখজুড়ে। দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে শক্ত করে ঢোক গিললো সাফওয়ান। তাতেই কন্ঠনালীর অ্যাডামস এ্যাপল টি ধীরে উপর নিচ হলো। দৃঢ় করলো দুই হাতের বাঁধন। পূর্বের চেয়েও বেশি ঘনিষ্ঠ হলো। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে শীতল গলায় বলে উঠলো,
‘ লেটস গেট ম্যারিড, সুবহা। ‘
কানের কাছে প্রবল শব্দে বজ্রপাত ঘটলো যেনো।তেমন করেই চমকে উঠলো সায়েরী। চোখে মুখের দুশ্চিন্তা টুকু কেটে গেল নিমেষেই। বিষ্ময়ে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হলো সে। ভুল শুনেছে বুঝি!
‘ ক..কি বললেন? ‘
সায়েরীর কম্পিত স্বর। সাফওয়ান টের পেলো মেয়েটার অস্বাভাবিক রকমের আশ্চর্য প্রতিক্রিয়া। সাফওয়ান কে ধরে রাখা হাতটা ঢিলে হয়ে এসেছে তার। গোলগাল চোখদুটোতে রাজ্যের বিষ্ময়। সাফওয়ান টললো না। এবারে দৃঢ় হলো কন্ঠস্বর,
‘ বিয়ে করতে বলেছি। যার ইচ্ছে হয় মেনে নিবে। না নিলেও আই ফাকিং ডোন্ট কেয়ার এবাউট এনিওয়ান। তুমি বলো, আমার সাথে যাবে? ‘
বিবশ চিত্তে মেয়েটা কেবল দেখেই গেল সাফওয়ান কে। কথা বলার ভাষা হারিয়েছে যেনো। তার প্রতিউত্তরের অপেক্ষায় থেকে সাফওয়ান পুণরায় বলে উঠলো,
‘ কোনো কারণে তোমার ফ্যামিলির কেউ,কিংবা আমার ফ্যামিলির কেউ আমাদের মেনে না নিলে, ওদের বিরুদ্ধে যেতে পারবে? ক্লিয়ার আন্সার চাইছি। স্পিক আপ, সুবহা। ইয়েস অর নো? ‘
এই শেষ কথাগুলো শুনে সায়েরীর হুশ ফিরলো হঠাৎ করেই। বাক্যগুলো কর্ণধার হতে না হতেই, সাফওয়ানের কথা থেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটা মৃদু ধাক্কা দিলো সুডৌল বক্ষ ভাঁজে। স্পষ্ট কন্ঠে প্রতিক্রিয়া জানালো,
” অসম্ভব! এসব কি বলছেন আপনি? ”
ধাক্কা খেয়েও নড়লো না সাফওয়ান। কিন্তু সায়েরীর পক্ষ হতে সরাসরি রিজেকশন ব্যাপারটা মেনে নিতে পারলো না সে। মুহুর্তেই পাল্টে গেল তার শান্ত মেজাজ৷ ফিরে এলো সন্ধ্যা থেকে জমিয়ে রাখা সকল রাগ। সায়েরী প্রতিউত্তর করার সঙ্গে সঙ্গে তার থুতি খামচে ধরলো সাফওয়ান। আকস্মিক মেজাজ খুইয়ে সে গর্জে উঠলো চাপা স্বরে,
‘ অসম্ভব কেনো? কম আদর, যত্ন দিয়েছি? এর চেয়ে বেশি আর কি লাগবে হ্যাঁ??? ‘
আতর্কিত হামলায় পেছন দিকে হেলে পড়লো সায়েরী। সাফওয়ানের ভয়,ছাদ থেকে নিচে পড়ে যাওয়ার ভয় দুটোতে মিলে তার নাজেহাল অবস্থা৷ খামচে ধরেছে সাফওয়ানের টি-শার্ট। এমন রূঢ় ব্যবহারে মেয়েটার দৃষ্টি টলমলিয়ে উঠলো। ছটফট করছে দেখে না চাইতেও তাকে ছাড়তে বাধ্য হলো সাফওয়ান। কিন্তু দূরে সরতে পারলো না। দুইহাতে তার টি-শার্ট ধরে পুণরায় কাছে টেনে নিয়েছে সায়েরী। খরশান চোয়ালদ্বয় কোমল দুইহাতে আগলে নিয়ে ধরা গলায় আওড়াল,
‘ আপনি কেনো এসব বলছেন? আমার কথাটা শুনোন। আমি বিয়ে করবো না বলিনি। এখন এসবের জন্য উপযুক্ত সময় না। আপনার গ্রেজুয়েশন টা অন্তত কমপ্লিট হোক আগে৷ এখন তো আপনি কিছুই করছেন না। এভা…আহ!!! ‘
সায়েরী নিজের বাক্যটুকুর সমাপ্তি টানার ফুরসত পেলো না। পূর্বেই ক্রোধে অন্ধ হয়ে তার কাছ থেকে দূরে সরলো সাফওয়ান। চোখের পলকে এক লাত্থি বসালো রেলিঙের সঙ্গে সারিবদ্ধ ভাবে সাজিয়ে রাখা মাটির টবে। কয়েক হাত দূরে ছিটকে পড়ে টুকরো টুকরো হলো সেটা। সেই সঙ্গে হিংস্র বাঘের ন্যায় গর্জে উঠলো সাফওয়ান,
‘ ব্লাডি সেলফিশ বিচ! ‘
অনাকাঙ্ক্ষিত এই প্রতিক্রিয়ায়, এমন জঘন্য অপবাদ শুনে সায়েরীর সকল অহমিকা দুমড়েমুচড়ে গেলো। এইমাত্র এমন জঘন্য বাক্যটি কি তাকে উদ্দেশ্য করে বলেছে সাফওয়ান ভাই? কেনো বললো? কোন মুখে বললো?
ভাবনার মাঝে হঠাৎই টান পড়লো বাহুতে। মেয়েলি, কোমল বাহুদ্বয় খামচে ধরে সায়েরীকে নিজের দিকে টেনে এনেছে সাফওয়ান। রক্তিম চোখে চেয়ে, ভারিক্কি স্বরে হিসহিসিয়ে উঠলো সে,
‘ কিছু করছি না তাই মুখের উপর না বলতে একবারও বাঁধলো না? তোমারও মনে হচ্ছে আমার কোনো যোগ্যতা নেই নিজেকে গড়ে তোলার? এমপি নওশাদ খানের নাম ছাড়া আমি আর কিছু নয়, এটাই মনে হচ্ছে তো? ‘
টলমলে চোখে চেয়ে সায়েরী ডানে বামে মাথা নাড়ে একাধিকবার। প্রতিউত্তর করার সুযোগ পায়না। সিড়ি পথ থেকে ভেসে আসে মেহরিন বেগমের উচ্চ কন্ঠ। টব ভাঙ্গার শব্দ শুনে সায়েরীকে ডাকছেন তিনি। উত্তর না পেলে যে সোজা ছাদে চলে আসবে তা বুঝতে পেরে ছটফটিয়ে উঠলো সায়েরী। অনেকটা ছুড়ে ফেলার মতোই তার বাহু ছাড়লো সাফওয়ান। সায়েরীর গাল ভিজে উঠলো এমন আচরণে। এতো শক্ত করে খামচে ধরেছিল যে দুই বাহু ব্যথায় টনটন করছে। গাল মুছে সে দরজার কাছটায় এদিকে গেলো। কন্ঠস্বর যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে উচ্চ কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ ধাক্কা লেগে টব পড়ে গিয়েছে, আম্মু। ঠিক আছি আমি। তোমাকে আসতে হবে না। আমি একটু পর নামছি। ‘
মেহরিন বেগম দুই সিড়ি উঠে সায়েরীর উত্তর শুনে আর এগোলেন না। সময় অসময়ে ছাদে গিয়ে পিউর সঙ্গে আলাপ জমানোর অভ্যাস টা সায়েরীর সেই ছোট্ট বেলার। তাই ব্যাপারটা তেমন আমলে নিলেন না তিনি। সায়েরী নেমে যাবে ভেবেও অজানা টানে পুণরায় ফিরে এলো পূর্বের স্থানে। অনেক কথা জমা হলো কণ্ঠনালীতে। কিন্তু মুখ ফুটে কিচ্ছুটি উচ্চারণ করার শক্তি, সাহস মিললো না। আবছা আলোয়, ঝাপসা দৃষ্টি নামাতেই হঠাৎ চোখের পাতা কেমন কেমন কেঁপে উঠলো তার। সেই কম্পনের সঙ্গে টপটপ করে ফের দুই ফোঁটা অশ্রুকণা ঝরলো নীরবে, নিভৃতে। ভেজা দুগাল সে মুছে নিলো উত্তেজিত চিত্তে৷ দুই হাত সমান দুরত্বে দন্ডায়মান মানবটার ডান হাতের তালুতে রক্তাক্ত ব্যান্ডেজ মোড়ানো দেখে, বুকের ভিতরটা কেমন কেঁপে উঠেছে। উদগ্রীব হয়ে উঠেছে কোমল হৃদয়। সাফওয়ানের রক্তাক্ত হাত দেখে ক্ষনিক পূর্বে তার করা সকল উগ্র আচরণ, ক্ষিপ্ততা ভুলে বসলো মেয়েটা। মনে গহীনে ধরা দিলো দুশ্চিন্তা। চঞ্চল কদমে চোখের পলকেই সাফওয়ানের পাশ ঘেঁষে দাঁড়ালো সে। কোমল দুই হাতে তুলে নিলো ওই পোক্ত, বলিষ্ঠ, রক্তাক্ত হাতখানা। উত্তেজনা, উদ্বিগ্নতায় তার ভঙ্গুর কন্ঠ শোনালো পূর্বের চেয়েও বেশি কম্পিত। ঠোঁট চেপে কান্না থামানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে সে থেমে থেমে বলে উঠলো,
‘ আ..আপনার হাতে কি হয়েছে, সাফওয়ান ভাই? এতো র-রক্ত কেনো? কোথায় ব্যথা পেয়েছেন? ‘
ক্রন্দনরত কন্ঠটিতে এক সমুদ্র উদ্বেগ, বিষাদ। টলমলে আঁখি জোড়া ফের অশ্রু ঝরাতে প্রস্তুত হলো যেন। তার এমন ভগ্ন রূপ প্রেমিক পুরুষটার দৃষ্টি গোচর হলো কি! হয়নি তো। ছেলেটা ফিরেও তাকালো না। আবছা অন্ধকারের মাঝে দাঁড়িয়ে, বাম হাতের বৃদ্ধ আঙ্গুল এবং তর্জনী সমেত দুই চোখ চেপে রেখেছিলো সে। ক্রোধে জর্জরিত হয়ে থাকা মেজাজে কেবল একটুখানি শীতলতা বয়ে আসছিলো। এমন মুহুর্তে মেয়েলি কন্ঠের এমন অহেতুক প্রশ্নে ফের তরতরিয়ে বাড়লো ক্রোধের মাত্রা। ক্ষনিক পূর্বের সেই উত্তর টুকু কানে বাজলো। শক্ত হলো চোয়াল৷ তীব্র রাগে কিড়মিড়িয়ে উঠে,রক্তাভ চোখে ঘাড় ফিরালো সে। কোমল হাত জোড়ার মধ্য থেকে নিজের রক্তাক্ত হাত খানা ঝাটকা মেরে ছাড়িয়ে নিলো। চাপা স্বরে গর্জে উঠলো ফের একবার,
‘ এতো আদিখ্যেতা দেখাতে কেউ বলেছে তোমাকে? নিচে যেতে বলেনি? যাচ্ছো না কেন? ‘
তীব্র ভয়ে কেঁপে উঠলো সায়েরী। কিন্তু উদ্বিগ্ন কন্ঠে পুণরায় শুধালো,
‘ কিন্তু আ..আপনার হা… ‘
‘ জাস্ট গো অ্যাওয়্যে, সুবহা। তোমার কথা শুনতে বিরক্ত লাগছে আমার। ‘
ঘায়েল সিংহের ন্যায় হুংকার ছাড়লো সাফওয়ান। সায়েরী ছিটকে সরে গেলো। ঝাপসা চোখে তাকিয়ে, অনুভূতি হীন হয়ে স্থির দাঁড়িয়ে রইলো। তাকে যেতে না দেখে এবার সাফওয়ান নিজেই ঘুরে দাঁড়ালো। কদম এগোলো রেলিংয়ের দিকে। একটাবার ফিরে তাকালো না। দেখলো ওই প্রিয় মুখটা কেমন বিবশ চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। যেই মেয়ের চোখ দেখে মনের কথা বুঝে ফেলার ক্ষমতা রাখতো সে, আজ সেই রমনীর দৃশ্যমান বিধ্বস্ত রূপ দেখেও বিন্দুমাত্র কাঁপলো না তার পাথর হৃদয়। যার হাসি শোনার জন্য দুই কান উদগ্রীব থাকতো, সেই প্রেয়সীর কান্নার শব্দ শুনেও হাত বাড়িয়ে বুকে ঠাঁই দিলনা তাকে। মাত্র কয়েক ঘন্টায় এতো পরিবর্তন! এতো নির্দয়, নিষ্ঠুর আচরণ কীভাবে মেনে নিবে সায়েরী? সে তো একটুও অভ্যস্ত নয় এসবে। আদর, আহ্লাদে মাথায় তুলে রাখতো যে, আজ হঠাৎই তার পক্ষ হতে এমন তুচ্ছতাচ্ছিল্য মেনে নিবে কি করে?
চিন্তায়, যন্ত্রণায় হঠাৎই দুইহাতে মুখ ঢেকে ডুকরে উঠলো সায়েরী। হাউমাউ করে কেঁদে ফেললো। নিজের অনুভূতি আটকাতে পারছে না সে। আটকাতে জানেও না। কখনো প্রয়োজন পড়েনি লুকিয়ে রাখার। তার ভালোলাগা, ভালোবাসা, চাওয়া-পাওয়া, মান-অভিমান সবটা ছিলো প্রকাশ্য। উজাড় করে ভালোবেসেছে। বিনিময়ে আজ কি শুনতে হলো? “ব্লাডি সেলফিশ বিচ!” কেনো শুনলো? এতো জঘন্য কথাটা যে সাফওয়ান ভাই তাকে উদ্দেশ্য করে বলেছে, ব্যাপারটা এখনো সে বিশ্বাস করতে পারছে না। তার সাফওয়ান ভাই এমন নয়। বাকি দুনিয়ার কাছে নিষ্ঠুর,নির্দয় হলেও তার কাছে এক দায়িত্বশীল, নমনীয় প্রেমিক পুরুষ সে। তবে আজ কেনো এমন নির্মমতা দেখালো? কি কারণ?
প্রশ্নগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠতেই কান্না থামালো সায়েরী। ভেবে দেখলো, সাফওয়ান নিজেই নিজেকে বার বার অযোগ্য বলে উল্টো সায়েরীকে বকেছে। অথচ মেয়েটা এমন কিছু উচ্চারণ করেইনি। তবে সাফওয়ান কেনো এই কথার রেশ টেনে আনলো? অন্য কেউ কি তাকে বলেছে একথা? এজন্যেই কি মানুষটা এমন রেগে ছিলো?
ছুটন্ত পায়ে ছাদ থেকে নেমে এলো সায়েরী। মনে জমা প্রশ্ন গুলোর উত্তর খোঁজা জরুরি। সাফওয়ান ভাইয়ের রাগ ভাঙ্গানো এর চেয়ে বেশি জরুরি। আর নিজেকে সামলানো! নাজুক মন যে কিছুতেই সামলে উঠছে না। বারে বারে চোখ ভিজে উঠছে। নিজ রুমে ফিরে এসে সে মোবাইল তুলে নিলো সাফ্রিনকে কল করবে বলে। অথচ হাতজোড়া অসম্ভব রকমের কাঁপছে। ঝাপসা হয়ে আছে দৃষ্টি। অস্থিরতা, উত্তেজনা, দুশ্চিন্তায় তার মাথা ঘুরে উঠলো। আটকে এসেছে নিঃশ্বাস। বুকের মধ্যিখানে বারে বারে হাত দিয়ে মালিশ করলো সে। হা মুখ করে শ্বাস টানছে। তাতেও ফিরছে না স্বাভাবিকতা।
এমন মুহুর্তে কক্ষে আগমন ঘটলো মেহরিন বেগমের। দুধের গ্লাস হাতে নিয়ে মেয়ের রুমে এসে উনার বুকে মোচড় দিয়ে উঠলো। টেবিলে গ্লাস রেখে দিকবিদিকশুন্য হয়ে ছুটে তিনি আসলেন সায়েরীর কাছে। মেয়ের এমন অস্থিরতা দেখে আহাজারি জুড়ে দিলেন। অ্যাংজাইটি অ্যাটাক! ব্যাপারটা বুঝতে বেগ পেতে হলো না উনাকে। বান্দরবানের সেই দুর্ঘটনার পর একই সপ্তাহে বেশ কয়েকবার এমন অ্যাংজাইটি অ্যাটাকের স্বীকার হয়েছিলো সায়েরী। ডাক্তারের পরামর্শে, বন্ধুদের সহযোগিতায় বেশ দ্রুত কাটিয়ে উঠেছিলো বিভীষিকাময় দিনগুলো। বিগত আট নয় মাসে তো মেয়েটা ফুটন্ত গোলাপের মতো জ্বলজ্বল করে বেঁচে আছে। রূপ, লাবন্য, চঞ্চলতায় সবদিক মুখরিত করে রাখে সে। মেহরিন বেগম কতশত বার মুগ্ধ হয়েছেন মেয়ের দিকে তাকিয়ে!
সেই জ্বলজ্বল চাঁদটার জীবনে ফের কোন বলায় নেমে এলো? কি হলো মেয়ের? কেনো এতগুলো মাস পর পুণরায় স্বীকার হলো অ্যাংজাইটি অ্যাটাকের? আপনমনে কথাগুলো ভেবে মেহরিন বেগম প্রায় কেঁদেই ফেললেন। উনার আহাজারি শুনে ছুটে আসলেন সায়েরীর বাবা সহ আবরারের মা-বাবা এবং মিনহা। দুই বাবা হাই প্রেশারের ঔষধ খেয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে যান বলে আজ ঘুম ঘুম চোখেই ছুটে এসেছেন। ঘরের চঞ্চল প্রদীপটার এমন নাজেহাল অবস্থা দেখে সকলে স্তম্ভিত। আন্দাজ করলেন, আবছা অন্ধকারে ছাদে গিয়েছে বলে কিছু দেখে হয়তো ভয় পেয়েছে। আয়াতুল কুরসি পড়ে গায়ে ফুক দিলেন। সময়ের ব্যবধানে শ্বাস প্রশ্বাস ক্ষমতা খানিকটা স্বাভাবিক হলো সায়েরীর। কিন্তু মায়ের সংস্পর্শে এসে ভঙ্গুর মেয়েটা আরও দুর্বল হলো। ভেতর থেকে দুমড়েমুচড়ে গেলো যেনো। বুকে মুখ গুঁজে রাখা অবস্থায় আটকে আসা কন্ঠে, কান্না মিশ্রিত গলায় বলে উঠলো,
অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭২
‘ আ..আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে, আম্মু। বুকে ব্যথা লাগছে। ‘
অস্পষ্ট কন্ঠটা বুঝে নিলেন মেহরিন বেগম। বিচলিত হলেন বেশ। পুণরায় সায়েরীর মাথায় হাত বুলিয়ে বুকে মালিশ করতে লাগলেন। সায়েরীর ধ্যান নেই কোনো দিকে। মায়ের বুকে মুখ গুঁজে ডুকরে উঠলো সে। অস্পষ্ট, মিহি স্বরে আহাজারি করে উঠলো,
‘ আমি তাকে মোটেও অযোগ্য বলিনি, আম্মু। সাফওয়ান ভাইকে বলো না এভাবে যেন মুখ ফিরিয়ে না নেয়। আ..আমি আমি সহ্য করতে পারছি না। উনাকে আমি অযোগ্য বলিনি তো। কখনো বলবো ও না। আমার জন্য উনার চেয়ে যোগ্য আর কেউ হতেই পারে না। কক্ষনো না। ‘
