Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭৫

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭৫

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭৫
সাজিয়া জাহান সুবহা

তমসাচ্ছন্ন নিস্তব্ধ প্রহরী। থেকে থেকে ঝিঁঝি পোকার শব্দ বাজছে কর্ণগোচরে৷ সেই সঙ্গে ল্যাপটপের কী-বোর্ডের উপর আঙ্গুল চালানোর টাশটাশ শব্দধ্বনি। বারান্দার বেতের সোফায় বসে, একনাগাড়ে দীর্ঘক্ষণ কী-বোর্ডে আঙ্গুল চালিয়ে ক্ষনিকের জন্য থামলো সাদিফ। কপালে সুক্ষ্ম ভাঁজ ফেলে তাকিয়ে রইল ল্যাপটপ স্ক্রিনে। একটি সিস্টেম ডিজাইনের কাজ করছিলো সে। তাড়াহুড়ায় দ্বিতীয় বারের মতো ভুল করে বসেছে। এবারে নিজেই বিরক্ত হলো। মাথাটা ধরে আছে সন্ধ্যা হতে। তবুও জরুরি কাজ বিধায় করতে বসেছিলো। কিন্তু এবারে বেশ অতিষ্ঠ লাগছে। বেডরুম হতে টুকটাক শব্দ শুনতে পেয়ে সে উঁচু কন্ঠে বলে উঠলো,

‘ আমার কফি এনেছো? ‘
অল্পক্ষণ নিরবতা। অতঃপর ভেসে এলো নাজরাতের ক্ষীণ প্রতিউত্তর, ‘ আনছি। ‘
সময় কাটলো আরও কিছুক্ষণ। নিজ কর্মে মশগুল সাদিফের সম্মুখের টেবিলের উপর খানিক শব্দ করে ঠাঁই জমালো একটি মাঝারি আকৃতির কফি কাপ। শব্দ শুনে এক পলক চোখ তুলে তাকালো সে৷ কিন্তু শাড়ি পরিহিতা অবয়বটি পলকের মাঝেই বেডরুমে ফিরে গিয়েছে। হালকা গোলাপি শাড়ির আঁচলটুকু নজরে এসেছে কেবল। সেদিকে বিশেষ নজর দিলোনা সাদিফ। কাজ নিয়ে সে মহা ব্যস্ত। গরম কফিতে এক চুমুক বসিয়ে মাথাটা একটু হালকা করার প্রয়াস চালালো সে। পুণরায় কাজে হাত দিতে উদ্যত হতেই হঠাৎ বেডরুমের উজ্জ্বল সফেদ বাতিটুকু নিভে গেলো। ড্রিম লাইটের ক্ষীন আলো বারান্দায় প্রবেশ করে না। ফলস্বরূপ ঘুটঘুটে অন্ধকারে নিমজ্জিত হলো সম্পূর্ণ বারান্দা। সাদিফ ভ্রুঁ কুঁচকালো। ঘাড় ফিরিয়ে থাই গ্লাসের মধ্য দিয়ে দেখার চেষ্টা করলো বউকে। মেয়েটা লাইট নিভিয়ে ড্রেসিং হতে নিজের মোবাইল,ইয়ারপড তুলে নিচ্ছে। অর্থাৎ বিছানায় যাবে ঘুমানোর জন্য। সাদিফ দারুণ আশ্চর্য হলো এই দৃশ্যে। তাকে একটাবার ডাকলোও না! তাছাড়া মাত্র সাড়ে দশটা অতিক্রম হয়েছে এখন। এতো তাড়াতাড়ি তো কখনো ঘুমায়না নাজরাত। হয় পড়াশোনায় ব্যস্ত থাকে, নয়তো সাদিফের সঙ্গে ব্যস্ত থাকে। তবে আজকের এই দৃশ্য এমন ব্যতিক্রম কেনো?

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

সাদিফের মনে পড়লো, আজ সারাটাদিনে নাজরাত বেশ চুপচাপ ছিলো। প্রয়োজন ব্যাতিত একটা বাক্যও বলেনি। কিন্তু কারণ কি? অনেক ভেবেও নিজের কোন দোষ বের করতে পারলো না সে। বেশি ভাবলোও না। চট করে উঠে দাঁড়ালো। লম্বা কদমে পলকের মাঝেই এসে থামলো নাজরাতের সম্মুখে৷ মেয়েটা সবে মাত্র বিছানার কাছাকাছি এসেছে,শায়িত হওয়ার আগেই বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো সাদিফ। বেশ চিন্তিত গলায় শুধালো,
‘ এতো তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যাবে? শরীর খারাপ লাগছে নাকি? ‘
কথার তালে হাতের তালু ছোঁয়ালো নাজরাতের কপালে,গালে। মেয়েটা এবারেও চুপচাপ। সাদিফ ফের বললো,
‘ কি হয়েছে? শরীর খারাপ লাগছে?
‘ কিছু হয়নি। এমনিই ঘুম পাচ্ছে, সরো। ‘

কন্ঠটা থমথমে। অনেকটা অনুভূতিহীন। সাদিফের চিন্তা বাড়লো এতে। তাকে পাশ কাটিয়ে বিছানায় শুতে উদ্যত হওয়া নাজরাতের কটিদেশ জড়িয়ে পুণরায় কাছে টেনে আনলো তাকে। কন্ঠে উদ্বিগ্নতা ঢেলে বললো,
‘ এমন হয়ে আছো কেনো? রাগ করেছো? আমি কিছু করেছি? ‘
ছাড় পাওয়ার তাগিদে ছটফটিয়ে উঠলো নাজরাত। সাদিফের কথা শুনে চোখ তুলে তাকালো এবারে। বললো,
‘ কিছু করার জন্য আমার সঙ্গে কথা বলার ফুরসত পাচ্ছো তুমি? কিছু হয়নি। আমি নিজের সঙ্গে নিজে রেগে আছি। সরো, আজকেও রাতভর কাজে ডুবে থাকো। ‘

অভিমানী কন্ঠের স্পষ্ট অভিযোগ। কন্ঠটাও কেঁপেছে কথার তালে। দৃষ্টি টলমল করছে কি! সাদিফ হতবিহ্বল হলো এমন দৃশ্যে। তাকে পাশে কাটিয়ে বিছানায় চুপচাপ শুয়ে গেলো নাজরাত। ব্ল্যাঙ্কেট জড়িয়ে নিলো গলা অবধি। সাদিফ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। গত তিন দিন ধরে সে ভীষণ ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। সারাটাদিন অফিসে কাটিয়ে, রাত্রি বেলা পুণরায় ডুবে থাকতে হয়েছে ল্যাপটপ স্ক্রিনে। গত রাত্রিতেও মেয়েটা বেশ অনেক্ষন অপেক্ষায় ছিলো। বেশ কয়েকবার বলেছিলো যেনো ঘুমিয়ে যায়,কাজ সকালে করে। কিন্তু সাদিফ গুরুত্ব দেয়নি সেকথার। নাজরাত ঘুমানোর ঘন্টাখানিক পরেই রুমে ফিরেছিলো সে। এসব কারণেই তবে বউ তার অভিমান করেছে? কারণ সব উদঘাটন করতে পেরে চোখ খিচল সাদিফ। আপনমনে নিজেকেই গালাগাল করলো। অতঃপর বাধ্য স্বামীর মতো এগোলো বউয়ের রাগ ভাঙ্গানোর উদ্দেশ্যে। তার দিকে পিঠ করে শুয়ে থাকা নাজরাতের কানের কাছে মুখ নিয়ে মৃদু স্বরে ডাকলো সে,

‘ নাজরাত! ‘
প্রতিউত্তর পেলো না কোন। সাদিফের মুখ ছোট হয়ে এলো। কন্ঠে নিদারুণ এক নিষ্পাপ ভাব ফুটিয়ে বললো,
‘ আচ্ছা, স্যরি আমি। এমন ভুল আর কক্ষনো হবে না। তুমি তো জানো আমার কিছু ইম্পর্ট্যান্ট কাজ ছি.. ‘
‘ হ্যাঁ জানি। সবই জানি। আজ ইম্পর্ট্যান্ট কাজের বাহানা দিচ্ছো, কাল অন্য বাহানায় দূরে দূরে থাকবে। সবাই ঠিকই বলে, বিয়ের পর ছেলেদের ভালোবাসা উধাও হয়ে যায়। কিন্তু তুমি তো এক বছর হতে না হতেই আমাকে ভুলে যাচ্ছো! ‘
কান্না মিশ্রিত, তেজস্বী স্বরের প্রতিউত্তর টুকু শুনে আচমকা সাদিফ হেসে ফেললো। স্পষ্ট দেখলো নাজরাতের গাল ভিজেছে চোখের জলে। নিঃশব্দে হেসে ঝুঁকে এলো সে। বউয়ের ভেজা গালে গাল ঘষে বললো,

‘ এতো সিলি বিষয়ে কাঁদতে হয়? ‘
নাজরাত মুখ ফিরিয়ে নিলো। ফের কিছু বলতে চাইলে তক্ষুনি তার গায়ের উপর হতে ব্ল্যাঙ্কেট সরিয়ে দিলো সাদিফ। হাত টেনে উঠাতে চেয়ে বললো,
‘ বললাম তো আর এমন ভুল হবে না। উঠো এখন। আমার সঙ্গে বারান্দায় বসে কফি খাবে, চলো। রাতভর গল্প করবো। গত তিন দিনে যা যা শুনতে পারিনি সব আজ বলে পুষিয়ে দিও। এসো.. ‘
নাজরাতের উঠার অপেক্ষাটা আর করলো না সে। খুলে রাখা চাদরখানা কাঁধে তুলে পরপরই পাজা কোলে তুলে নিলো বউকে। মেয়েটা কোন বিরোধিতা করলো না। আর না আগ বাড়িয়ে সায় জানালো। চুপটি করে পড়ে রইলো সাদিফের বুকে। বারান্দার বেতের সোফার উপর নাজরাতকে বসিয়ে নিজেও তার পাশ ঘেঁষে বসলো সাদিফ। বউকে বুকে টেনে দুজনের উপর জড়িয়ে নিলো চাদরটি। গরম কফির কাপটা নাজরাতের হাতে ধরিয়ে দিয়ে কাঁধে থুতনি রাখলো সে।

‘ বলো, আর কি কি অভিযোগ আছে? ‘
সাদিফের আধখাওয়া কফিতে চুমুক বসিয়ে কয়েক সেকেন্ড নিরবতায় কাটিয়ে দিলো নাজরাত। অতঃপর, ক্ষীণ গলায় জানালো,
‘ আজ দুপুরে তোমার জন্য রান্না করেছিলাম। তুমি আসোনি। ‘
অপ্রত্যাশিত জবাব। যা শুনে সাদিফ সত্যিই অপরাধবোধে ভুগলো। মেয়েটা তাকে সকালে হয়তো জানিয়েছিলো একথা। দুপুর নাগাদ ফেরার আর্জি করেছিলো। কিন্তু তাড়া ছিলো বলে সেদিকে বিশেষ ধ্যান দিতে পারেনি সে। ইশ! বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে গেলো যেনো এটা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নাজরাতের ঘাড়ে ঠোঁট ছোঁয়াল সে। নিম্ন কন্ঠে ক্ষমাও চাইলো। সেই ক্ষীণ অপরাধী কন্ঠটা শুনে এবারে নাজরাতের মন নরম হলো। গলে গেলো অভিমানের পাহাড়। নতুন করে ফিরে এলো চঞ্চলতা। একই কাপে দুই জোড়া ঠোঁটের চুমুকে ফুরিয়ে এলো কফি। কিন্তু ফুরালো না দুই পক্ষের কথার ঝুলি। একে অপরের উষ্ণ আলিঙ্গনে ডুবে শীত শীত অনুভূতি টুকু অগ্রাহ্য করে গেলো তারা। রাতভর চললো মিষ্টি কথার ঝুলি। মিলিয়ে গেলো মান-অভিমান। কেবল গাঢ় হলো অনুভূতির সাম্রাজ্য।

ভোরের প্রথমের কিরণের সঙ্গে ঘুম ছুটে গিয়েছে ইরার। বিধ্বস্ত এক দুঃস্বপ্ন দেখে শীতের মাঝেও ঘেমে উঠেছে সে। ধরফরিয়ে উঠে বেশ অনেক্ষন থম মেরে বসে রইলো নিজ স্থানে। মিহাদ! আজ বহুমাস পর সেই প্রেমিক পুরুষ স্বপ্নে দেখা দিয়েছে৷ স্বপ্নেও ভালোবাসায় ডুবিয়ে রেখেছিলো তাকে। পুরনো সেই দিনের মতো৷ যখন দুজনের মাঝে কোন দুরত্ব, ভয়, সংশয় ছিলো না। কেবল ভালোবাসা ছিলো। কিন্তু আজ! ইরা আশেপাশে তাকালো। এই ঘর তার নয়। এই ঘর জাদিদ নামক অন্য এক সুপুরুষের। যে সম্পর্কে ইরার স্বামী হয়। কত কিছু বদলে গেলো! ভালোবাসা হেরে গেলো। কিন্তু সেই স্থান হতে আজও নড়তে পারলো না মেয়েটা। নতুন জীবনের দিকে যেই কটা কদম এগিয়ে ছিলো বিগত কিছুদিনে, আজ এই এক স্বপ্ন বাধ্য করলো কদম ফিরিয়ে নিতে। মনে হলো যেনো মিহাদের জন্য জমানো ভালোবাসা সব সে অন্যের খাতায় লিখে দিচ্ছে। এটা ঠিক হচ্ছে না। এই অনুভূতির উপর অন্য কারো রাজত্ব চলতে পারে না। তার সকল অনুভূতির মালিকানাধীন একমাত্র মিহাদ। অন্য কেউ নয়, কারোর নয়।

বেলা প্রায় সাড়ে ন’টা হতে চললো৷ হাসপাতালের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার জন্য জাদিদ পুরোপুরি তৈরি। অন্যমনস্ক ভঙ্গিমায় কব্জিতে ধূসর রাঙা চেইনের ঘড়িটি পড়লো সে। মন পড়ে রইলো ইরার কক্ষে, ইরার কাছে। এতো বেলা হয়ে গেলো। কিন্তু মেয়েটা এখনো বের হলোনা রুম থেকে। ঘুম ভাঙ্গেনি নাকি? রাতে মাহবীরের কান্নাকাটিও শোনা যায়নি। অর্থাৎ ঘুমের মাঝে জ্বালায়নি বাচ্চাটা। তবুও ইরা এতো বেলা করে ঘুমাচ্ছে কেনো? শরীর খারাপ করেছে কি? মনের মাঝে একগাদা উদ্বিগ্নতা ছেয়ে গেলো জাদিদের। সম্পূর্ণ পরিপাটি হয়ে বের হলো রুম থেকে। বিগত কিছু দিনের অভ্যাস সরূপ বিনা অনুমতিতে চট করে দরজা খুলে কদম রাখলো ইরা’র কক্ষে। ডিভানে বসে মাহবীরকে ফিড করাচ্ছিলো ইরা। জাদিদের হঠাৎ আগমনে হকচকিয়ে গেলো সে। ঘুরে বসলো মুহুর্তেই। জাদিদ নিজেও বুঝে উঠতে পারেনি এহেন অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে পড়বে। অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বাড়ন্ত কদম পুণরায় পিছিয়ে নিলো সে। ভিজিয়ে দিলো দরজা। দৃষ্টি নামিয়ে বললো,

‘ দুঃখীত, ইরা। আমি শুধু দেখতে এসেছিলাম আপনারা ঠিক আছেন কিনা। ‘
‘ কারো কামরায় ঢুকতে হলে যে নক করে ঢুকতে হয়৷ এই জেনারেল নলেজটুকু আপনার মাঝে নেই, ড. জাদিদ? ‘
ইরার কন্ঠে তেজ, মুখভঙ্গিমায় অসন্তুষ্টি। জাদিদ বিষ্ময়ে হতবুদ্ধি হলো। ভুল শুনেছে কি! এমন রূঢ় আচরণ! তাও কিনা ইরা করছে! বিগত দিনগুলোতে অগণিত বার বিনা অনুমতিতে রুমে ঢুকেছে সে৷ কই! তখন তো কোন অসন্তুষ্টি দেখায়নি মেয়েটা। বরং তার স্বতঃস্ফূর্ত ভাব দেখে জাদিদ ভুলে বসেছে নিজের কায়দাটুকু। আপনমনে খারাপ লাগা টুকু চেপে গেলো জাদিদ। নম্র সুরে পুণরায় বললো,

‘ আপনি ঠিক আছেন, ইরা? ‘
মাহবীরকে দোলনায় শুইয়ে দিয়ে ঘুরে দাঁড়ালো ইরা৷ জাদিদ তখনো চৌকাঠে দাঁড়িয়ে। সুশীল পুরুষটার মুখপানে চেয়ে ইরা পূর্বের ন্যায় কঠোরতা দেখাতে পারলো না৷ তবে আবেগী-ও হলোনা। নির্লিপ্ত কণ্ঠে জানতে চাইলো,
‘ আপনার কিছু বলার ছিলো? ‘
ভাবখানা এমন, যেনো প্রয়োজন ব্যতীত ইরার দরজার কড়া নাড়া নিষেধ। জাদিদ আহত হলো হঠাৎই ইরার এহেন পরিবর্তনে। কিন্তু বরফের ন্যায় শীতল ব্যক্তিত্বের মানবটার মুখদেখে আজও কোন আহত ভাব পরিলক্ষিত হলো না। না তো তার আচরণে প্রকাশ পেলো কোন বিষাদ।

‘ আপনি এতো দেরিতে উঠেছেন দেখে মনে হলো হয়তো শরীর খারাপ। ব্রেকফাস্ট করতেও বের হননি এখনো৷ আমার হাসপাতালে যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। খাবেন না? ‘
‘ খিদে নেই। আপনার তাড়া হলে চলে যান। আমি তো বলিনি অপেক্ষা করতে। ‘
ফের সেই একই নির্বিকার কন্ঠ। জাদিদ চরম আশ্চর্য হলো। এই ফ্ল্যাটে শিফট হওয়ার কিছুদিন পর ইরা নিজেই বলেছিলো, একা খেতে তার ভালো লাগে না। সেই থেকে সময় না মিললেও দুই পক্ষই চেষ্টা করে একই সঙ্গে খাওয়ার। অথচ আজ সেই ভালো লাগাটুকুও উবে গেলো! কেনো? কি এমন হলো হঠাৎ?
‘ মাহবীরকে একটু দেখে যাই? ‘

বেশ নিভু নিভু গলায় অনুমতি চাইলো জাদিদ৷ মাহবীরের জন্মের পর এই প্রথম হয়তো এমনটা করার প্রয়োজন পড়েছে। ইরা’র এমন অপরিচিতা আচরণ জাদিদকে বাধ্য করেছে ছেলেকে দেখতে চাওয়ার অনুমতি নিতে। না দেখেও পারবে না৷ রোজ হাসপাতালের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার পূর্বে ছেলে-বউ দুজনকে দেখে যাওয়াটা বাজে অভ্যাসে পরিণত হয়েছে কিনা।
ইরা সম্মতি দিলো না ঠিক। তবে নিরবে সরে দাঁড়ালো দোলনার পাশ হতে। তাতেই সম্মতি বুঝে নিয়ে এগিয়ে এলো জাদিদ৷ ঘুমন্ত মাহবীরের কপাল ছুঁল আলতো ঠোঁটে। অতঃপর তাকালো ইরা’র দিকে। যার নজর মাহবীরের দিকে সীমাবদ্ধ।

‘ আপনার কিছু লাগলে জানাবেন। আর, আমি দ্রুত ফিরার চেষ্টা করবো। ‘
এবারেও নিরুত্তর রমনী। ইরা’র জীবনের পূর্ব ঘটনা গুলোর রেশ ধরে হয়তো তার মন খারাপ এই ভেবে জাদিদ-ও বিশেষ ঘাটাল না তাকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেরিয়ে গেলো কামরা হতে। মিতু টেবিল সাজিয়ে দুজনার অপেক্ষায় বসে ছিলো। কিন্তু তাকে আশ্চর্য করে দিয়ে খালি মুখেই বেরিয়ে গেলো জাদিদ। অন্যদিকে পুণরায় বন্ধ হলো ইরা’র রুমের দরজা। মিতু বেকুবের মতো চেয়ে চেয়ে দেখলো এই অস্বাভাবিক সম্পর্কে জড়িয়ে থাকা দম্পতির অস্বাভাবিক আচরণ। না শুনলো কোন ঝগড়া, না কোন তর্কাতর্কি। তবে কীসের এই নীরব মান-অভিমান?

হাসপাতালে পৌঁছেও কাজে বিশেষ মন দিতে পারলো না জাদিদ। বারে বারে চেক করলো মুঠোফোন। মাহবীর সময়ে-অসময়ে কাঁদলেই ইরা ভিডিও কল করে। বাবার এক ঝলক দেখলে, কন্ঠ শুনলে বাচ্চাটা শান্ত হয় মুহুর্তেই। কিন্তু আজ সারাটাদিনেও একটাবার কল এলো না। জাদিদের ভেতরটা ছটফট করতে থাকলো। বাসায় ফিরে ইরাকে কাছে বসিয়ে জানতে ইচ্ছে হলো কেনো এমন অস্বাভাবিক আচরণ করছে সে। জাদিদের উপর কোন কারণে রেগে আছে? না নিজ জীবনের হারানো সম্পর্ক গুলো নিয়ে ডিসটার্ব হয়ে আছে? কি হয়েছে তা অন্তত জানাক তাকে। কথা বলুক, মন খুলে ইজহার করুক সকল গোপন অনুভূতি’র।

দ্রুত বাড়ি ফেরার তাড়া থাকলেও ইমারজেন্সি কেইসের দরুন জাদিদ ফিরতে পারলো না। শেষ মুহূর্তে দুটো সার্জারী কেইস সামলাতে হয়েছে। হাসপাতাল হতে রওনা দিয়েছে রাত বারোটার পর। ব্যাকুল হয়ে ফ্ল্যাটে ফিরলো সে। আজও কাউকে বিরক্ত করলো না। এক্সট্রা চাবির সাহায্যে প্রবেশ করলো ঘরে। আবছা অন্ধকারের মাঝে লিভিং রুমে নিজের ব্যাগ ফেলে তার অবাধ্য কদম এগিয়ে চললো ইরা’র কামরার দিকে। যত এগোলো, তত গাঢ় ভাবে কানে এলো মাহবীরের ক্রন্দনরত ধ্বনি। একনাগাড়ে তীক্ষ্ণ সুরে কাঁদছে। জাদিদ অধিক হারে উদ্বিগ্ন হলো এবারে। সেই সকালের পর আর দেখা পায়নি বাচ্চার। কোন খোঁজ ও নেওয়া হয়নি। তাইতো এখন এই কান্না টুকুও বেশি বেশি মনে হচ্ছে তার কাছে। ইরা’র দিকটা বিশেষ না ভেবে সে দরজার হাতল ঘোরালো। আশ্চর্যজনক ভাবে ভেতর থেকে আটকানো দরজাটা। এই বিষয়টিও জাদিদকে অবাক করলো। সকালে নিজের করা বোকামি টুকুর জন্য বেশ লজ্জিত হলো পুণরায়৷

দরজার কড়া নাড়লো বারে বারে চার বার। ভেতর হতে ইরা’র কোন সাড়া পাওয়া গেলো না। পরপর আরও দুইবার ধুমধাম শব্দের সঙ্গে জাদিদের কন্ঠ ভেসে আসতেই দরজা খুলতে বাধ্য হলো ইরা। তার কোলের মাঝে হাত পা ছড়িয়ে অনবরত কাঁদছে মাহবীর। লাল হয়ে এসেছে তার দেহ। ইরা’র চেহারা জুড়ে থমথমে ভাব। বাচ্চার জ্বালানতে অতিষ্ঠ সে।
‘ ও এভাবে কাঁদছে কেনো? কতক্ষণ ধরে কাঁদছে? মিতুকে ডাকতে পারতেন। আমাকে ফোন করলেও হতো। দেখি এদি.. ‘
‘ ওর কান্না আজ নতুন নয়। আমার বাচ্চা আমি সামলে নিতে পারবো। কাউকে বিরক্ত হতে হবে না। অনেক রাত হয়েছে। আপনি ঘুমাতে যান। ‘

জাদিদের বাড়ন্ত হাত, উদ্বিগ্ন কন্ঠের বুলি সবটা এক লাহমায় থমকে গেলো। “আমার বাচ্চা” শব্দ দুটো তার কানে লাগলো বিষের মতো। তীব্র অবিশ্বাস নিয়ে ইরা’র মুখপানে চাইলো সে। এইমাত্র কথাটা বলে ইরা কি বুঝাতে চেয়েছে? জাদিদকে কেনো মনে করিয়ে দিলো যে সে মাহবীরের পিতা নয়? কোনভাবে কি বাবা হয়ে উঠার জন্য কোন কিছুতে ঘাটতি রেখে দিয়েছে সে? জাদিদের ভেতরটা চুরমার হলো। ইরা’র শত রূঢ় আচরণ, অবহেলা, অবজ্ঞা তাকে এতোটা আহত করেনি। কিন্তু এই মুহুর্তে তার অন্তর গুড়িয়ে গেলো। চশমায় ঢাকা পড়া স্বচ্ছ চোখ দুটো কেমন রক্তিম হয়ে এলো। মাহবীর অশ্রু চোখে চেয়ে ছিলো বাবার দিকে। জাদিদ একপলক তার দিকে তাকিয়ে বুকে পাথর চাপলো। নজর ফিরিয়ে স্থান ত্যাগ করলো দ্রুত।

একনাগাড়ে কেঁদে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়েছে মাহবীর। তাকে আর দোলনায় না ইরা। বিছানায় রেখে সেও পাশেই বসে রইলো। ছেলের দিকে তাকিয়ে সারাটাদিনের মানসিক ভোগান্তি, গুমোট অনুভূতি সব ঠিকরে বেরিয়ে এলো এই মধ্যরাতে। আচমকা হু হু করে কেঁদে ফেললো সে। কেনো কাঁদলো তা সে নিজেও জানে না। অদ্ভুত এক দ্বন্দ্ব চলছে তার মন-মস্তিষ্কে। একই সঙ্গে বাচ্চার ভোগান্তি, সবটা মিলিয়ে কেমন বিষিয়ে উঠেছিলো হঠাৎ। নিজেকে সামলে যখনই মাহবীরকে বুকে টেনে নিলো, তখন আচমকা মনে পড়লো জাদিদের সঙ্গে করা আচরণ গুলো। দিনের শুরু থেকে শেষ অবধি সবটা স্মরণ করে নিজের চোখে নিজেই নিচে নেমে গেলো সে। অপরাধবোধে দগ্ধ হলো অন্তর। তার শূন্য, অন্ধকারাচ্ছন্ন পৃথিবীতে সূর্যের আলো হয়ে তাকে আলোকিত করলো যে ব্যক্তি। তার সঙ্গেই কিনা এতোটা অমানবিকতা দেখিয়েছে সে! নিজের এমন অধঃপতন নিজের কাছেই সহ্য হলো না। একটাবার ভাবলো এক্ষুনি গিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিবে জাদিদের কাছে। পরমুহূর্তেই ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অস্থিরতা টুকু দমিয়ে রাখলো।

বেলা সাড়ে আটটা নাগাদ ঘুম ভাঙ্গলো ইরা’র। ঘুমন্ত মাহবীরের দিকে চোখ বুলিয়ে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে এলো সে। ব্যস্ত কদমে কক্ষ ত্যাগ করলো জাদিদের কক্ষের উদ্দেশ্যে। ডাইনিং-এ তখন কাজে মশগুল মিতু। ইরা সেদিকে ধ্যান দিলো না। জাদিদের কামরার ভিজিয়ে রাখা দরজায় কড়া নাড়লো কম্পিত হাতে। একবার, দুইবার, তিনবার। সাড়া না পেয়ে উঁকি দিয়ে দেখলো সে৷ রুমটি ফাঁকা। জাদিদের অস্তিত্ব নেই কোথাও। ওয়াশরুম, বারান্দা সবখানে খোঁজ নিয়েও যখন জাদিদকে পেলো না। তখন গিয়ে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো তার। মিতুর কাছে জানতে চাওয়া মাত্র সে জানালো আরও আধ ঘন্টা পূর্বে বেরিয়ে গিয়েছে জাদিদ। ইরা বেশ আশ্চর্য হলো একথা শুনে। জাদিদ কখনো তাকে না জানিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে বের হয়না। ইমারজেন্সি হলে অন্তত মেসেজ দিয়ে হলেও জানিয়ে রাখে। আজও কি তবে কোন ইমারজেন্সি কেইস পড়ে গিয়েছে? রুমে ফিরে মোবাইল চেক করলো ইরা। কোন মেসেজ, কল কিচ্ছুটি নেই। নিজ থেকে কল দিতে গিয়েও কেমন যেন জড়তা কাজ করছে। সামনাসামনি সবটা মিটিয়ে নিলেই ভালো। জাদিদ ফিরে আসুক। কিছু ঘন্টা নাহয় অপেক্ষা করা যাবে।

কেটে গেলো দিনের অর্ধেক প্রহরী। সন্ধ্যা পেরিয়ে চাঁদ উঁকি দিলো আকাশে। জাদিদের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে একটা সময় বাচ্চার কারণে বাধ্য হয়ে রুমে ফিরে শুয়ে পড়লো ইরা। তৃতীয় বারের মতো জাদিদের নাম্বারে কল করলো। বন্ধ পেলো এবারেও। ইরা চিন্তিত হলো। অপরাধবোধ জাগলো। কিন্তু করার মতো কিছুই অবশিষ্ট রইলো না। মাহবীরকে ঘুম পাড়াতে নিয়ে কবে যে তারও চোখ লেগে এলো, তা নিজের টের পেলো না সে।
পরদিন ভোর বেলা এক বিরল ঘটনা ঘটলো। ইরা জানতে পারলো, জাদিদ রাতভর বাড়ি ফিরেনি। নাইট শিফট থাকলে সবসময় যে মানব আগেভাগে জানিয়ে রাখে, কল করে খোঁজ খবর নেয়। সেই পুরুষটা গোটা একরাত বাড়ি ফিরেনি, একথা ইরা জানলো পরদিন ভোরে। সে চিন্তিত হলো বেশ। উদ্বিগ্ন চিত্তে জাদিদের নাম্বারে কল করলো। সৌভাগ্যক্রমে এবারে সংযোগ পাওয়া গেলো। তৃতীয় দফা রিং হতেই কল রিসিভ করলো জাদিদ৷ তার ঘুমহীন কন্ঠ শোনালো বেজায় গম্ভীর। ইরা’র ভেতরটা কেমন মিইয়ে গেলো এই কন্ঠে। কথা খুঁজে না পেয়ে সে জানতে চাইলো,

‘ আপনি বাড়ি ফিরবের কবে? বীর আপনাকে দেখতে না পেয়ে ভীষণ কাঁদছে। ‘
উপাশ হতে এক ভারী দীর্ঘশ্বাসের শব্দ এলো। পরপরই শোনা গেলো পুরুষটার নির্জীব কন্ঠ,
‘ আমার আসার কি প্রয়োজন? আপনার ছেলেকে সামলানোর জন্য আপনি তো আছেনই। ‘
এহেন অপ্রত্যাশিত প্রতিউত্তর শুনে ইরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হলো। এইমাত্র কথাটুকু যে জাদিদ বলেছে তা বিশ্বাস করাটা কষ্টসাধ্য ভীষণ। ইরা’র মনে পড়লো একদিন পূর্বে জাদিদকে বলা নিজের কথাটুকু। সেদিন ইরা’র ছেলে বলে জাদিদকে সে যেমন অবজ্ঞা করেছিলো, আজ তারই উত্তর ফিরিয়ে দিয়েছে জাদিদ। কিন্তু ইরা মানতে পারছে না একথা। তার নিরবতার মাঝেই কল কেটে দিয়েছে জাদিদ। ইরা পুণরায় কল দিতে গিয়েও আটকে ফেললো মনকে। সর্বাঙ্গ কেমন গ্লানিবোধে দগ্ধ হয়ে উঠেছে তার। রুমজুড়ে পায়চারি করতে করতে সে কম্পিত হাতে টাইপ করলো,

‘ আপনি কি আমার উপর রেগে আছেন,জাদিদ? ‘
‘ সেদিনের ব্যবহারের জন্য আমি ভীষণ দুঃখীত। ‘
‘ বাড়ি ফিরে আসুন দয়া করে। আমাকে কথা বলার একটা সুযোগ দিন। ‘
‘ বীরের জন্য হলেও ফিরে আসুন। ও আপনাকে ছাড়া একটুও ভালো নেই। ‘
এমন অসংখ্য বার্তা পাঠালো সে৷ প্রতিটি বার্তা সিন করেছে জাদিদ। কিন্তু ফিরতি বার্তা পাঠায়নি কোন। অপেক্ষায় থাকতে থাকতে দম বন্ধ হয়ে এলো ইরা’র। অনুশোচনায় ছটফট করতে লাগলো। এভাবে সময় কাটলো প্রায় অনেক্ষন। হঠাৎই নোটিফিকেশনের শব্দে কেঁপে উঠলো মেয়েটা। কাঙ্ক্ষিত আইডিটি স্ক্রিনে ভেসে উঠতেই দ্রুত আঙ্গুল চালিয়ে ঢুকলো সেথায়। সঙ্গে সঙ্গে স্ক্রিনে ভেসে উঠলো এক বিশালাকৃতির বার্তা।
‘ ইরা! আপনি জানেন আমি আপনাকে ভালোবাসি। কেনো বাসি, তা কখনো বলা হয়নি। ভাবতে পারেন ভালোবাসা কারণ ছাড়া হয়। এতে নির্দিষ্ট কোন কারণ থাকে না। কিন্তু আমার কাছে কারণ ছিলো। আপনাকে ভালোবাসার, আপনার প্রতি অনুভূতি ঘিরে তোলার যথেষ্ট কারণ ছিলো।

আমি আমার পরিবারের কাছে কতোটা অবজ্ঞার ছিলাম তার সবটায় আপনার জানা৷ আমি কখনো কারো নজরে পারফেক্ট ছেলে, ভাই হতে পারিনি৷ আপন জন গুলোর ভালোবাসা কখনো পাইনি। আমি ভালবাসার কাঙ্গাল ছিলাম। সেই একই কাঙ্গাল রূপে আমি আপনাকে দেখেছিলাম বাবার হাসপাতালে, তার পেশেন্ট হয়ে৷ আপনার মুষড়ে পড়া রূপের মলিনতা টুকু আকর্ষণ করেছিলো আমাকে। প্রথম দিন কথা বলেই বুঝেছিলাম, কোথাও না কোথাও আমরা একই পথেক পথিক। আপনার প্রতি মায়া হতো। সেই মায়াটুকু কবে ভালোবাসায় রূপ নিলো আমি জানি না। আমার মনে হয়েছিলো, আপনজনের ভালোবাসা না পাওয়ার মতো কষ্ট আপনার মতো করে আর কেউ বুঝবে৷ ভেবেছিলাম, আপনাকে আপনাকে আপন করে আমি আপনার জীবনে সবটুকু অপূর্ণতা পূর্ণ করে দিবো। যে-ই ভালোবাসার জন্য আপনি কাঙ্গাল হয়ে ছিলেন, সেই বুক উজাড় করা ভালোবাসা আমি আপনাকে বাসবো।

বিনিময়ে কিন্তু আমি নিঃস্বার্থ ছিলাম না, ইরা। খানিকটা স্বার্থ আমারও ছিলো। ভালোবাসা পাওয়ার স্বার্থ। যেই স্বার্থের আশায় আপনাকে নিজের অর্ধাঙ্গিনী করেছিলাম। এখনো অবধি সেই আশার আংশিক ভালোবাসাও পাইনি আমি। কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে পেয়েছিলাম আমার ছেলে মাহবীর কে। ওকে পেয়ে আমি আমার জীবনের সবটুকু সুখ পেয়ে গিয়েছি এমন অনুভূতি হয়েছিলো। ওর ছোট্ট শরীরটা সবার আগে আমার কোলে উঠার অধিকার দিয়েছিলেন আপনি। সেটা ছিলো আমার জন্য বিশাল বড় প্রাপ্তি।

আমার শৈশবের সবটুকু হাহাকার আমি ওর মাধ্যমে মিটিয়ে নিয়ে চেয়েছি। যেই মমতার জন্য আমি তড়পেছি, তার চেয়েও দ্বিগুণ ভালোবাসা দিয়ে আমি বীরকে বড় করতে চেয়েছি। এতে করে আমার আর কোন আফসোস থাকবে না জীবনে। কিন্তু আমার চাওয়াটুকু বোধহয় বড্ড বেশি ছিলো। আমার মনে রাখা উচিত ছিলো, মাহবীর আমার রক্ত নয়। না তো আমি আপনার প্রকৃত স্বামী। যে সম্পর্ক শুরুই হয়েছে মিথ্যা, বিচ্ছেদ এবং কেবল দায়িত্বের জোরে। সেই সম্পর্কে আমার এতোটা আশা রাখাটা বোধহয় উচিত হয়নি। আমি জানি না আপনি আদৌও কখনো এই সম্পর্কটিকে সত্যিকার অর্থে টিকিয়ে রাখবেন কিনা। আর যা-ই করুন না কেনো। মাহবীরকে আমার কাছ থেকে দূরে অন্তত রাখবেন না, প্লিজ। অনুরোধ আমার, আপনার স্বামী না হতে পারি, কিন্তু বীরের বাবা হয়ে আজীবন আমি ওর পাশে থাকতে চাই। এটুকু অধিকার অন্তত কেড়ে নিবেন না আমার কাছ থেকে।

পৃথিবীর নিঃস্বার্থ সম্পর্কগুলোর মধ্যে বন্ধুত্ব নামের বন্ধনটি নিঃসন্দেহে অনন্য। বিশেষত, নারীদের মাঝে গড়ে ওঠা গভীর বন্ধুত্ব কিংবা “বেস্ট ফ্রেন্ড” নামক যে সম্পর্ক, তা একেবারেই তুলনাহীন। এই সম্পর্ক রক্তের নয়, তবু আত্মার এমন এক বাঁধনে গাঁথা, যেখানে দূরত্ব কিংবা ব্যবধান কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।
একজন যখন নিঃশব্দে কোনো দুঃসময় পার করে, তখন অন্যজন কোন এক রহস্যময় টানে তা অনুভব করে ফেলে। হুট করে একটু খোঁজ নেয়, “সব ঠিক তো?” সেই খোঁজের আড়ালে উন্মোচিত হয় অপরপক্ষের ভেতরের এক গোপন উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, ব্যথা। প্রকৃত বন্ধুত্বে এমন আত্মিক টান অতি স্বাভাবিক। যদি টান না থাকে, তবে বুঝে নিতে হয়, ঘাটতি রয়েছে সম্পর্কে।

আর যাদের মাঝে এই আত্মিক সম্পর্কের সেতুবন্ধন গড়ে উঠেছে, তারাই প্রকৃত অর্থে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ। কারণ, জীবনের প্রতিকূল মুহূর্তে কারো কাঁধে মাথা রেখে নিঃশব্দে কাঁদার সৌভাগ্য যার আছে, সে-ই প্রকৃত সুখী।
এমনই এক সৌভাগ্যবতী রমনী হলো ইরা। সদ্য নতুন এক প্রণয় সাগরে গা ভাসাতে গিয়েও, পিছুটানের কারণে অদূর ভবিষ্যতের সবটুকু সুখ পায়ে ঠেলে দিয়ে মেয়েটা কেমন ভেঙ্গে পড়েছিলো। জাদিদের একটিমাত্র বার্তায় ইরার ভেতরটা চুরমার করে তুলেছিলো অনুশোচনায়৷ পরিপাটি বিছানার কোণ ঘেঁষে ফ্লোরে অগোছালো ভঙ্গিতে বসে ছিলো সে। মুখশ্রীর উজ্জ্বল ত্বকটি ফ্যাকাসে, রক্তিম হয়েছিলো তখন। দুগালে ছাপ বসে গিয়েছিলো নোনাজলের। এমনই এক দুর্বিষহ মুহুর্তে হঠাৎ করেই তার বেডরুমের দরজা খোলার শব্দ হলো বেশ কড়াভাবে। একই সঙ্গে ভেসে এলো চিরপরিচিত নারী কন্ঠের উচ্ছ্বাসিত স্বর,

‘ সারপ্রাইজ!!!!! ‘
ইরা চমকিত নজর মেলে তাকায়। রক্তিম,ঝাপসা চোখে দেখে প্রিয়’র চেয়েও প্রিয় বান্ধবী নীতি’কে৷ মাহবীরকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নীতি। কাঁধের একপাশে ঝুলছে লেডিস ব্যাগ। যতটা উচ্ছ্বাসিত বদনে কক্ষে কদম ফেলেছে সে, ইরাকে দেখে তৎক্ষনাৎ থমকে গিয়েছে পুরোপুরি। মুখের হাসিটুকু মিলিয়ে গিয়ে ছেয়ে গিয়েছে উদ্ধিগ্নতা৷ সঙ্গে সঙ্গে মিতুকে ডাক দিলো সে৷ মিতু কাছেই ছিলো, উপস্থিত হওয়া মাত্র মাহবীরকে তার কোলে সপে দিয়ে রুমের দরজা লাগালো নীতি৷ চঞ্চল কদম এগিয়ে আসতে আসতে ব্যাগ ছুড়ে ফেললো বিছানায়। পরপরই বিছানার কোণ ঘেঁষে ফ্লোরে ইরা’র পাশে বসে পড়লো সে৷ ভগ্ন ইরা’র গাল ছুঁয়ে উত্তেজিত গলায় শুধালো,

‘ কি হয়েছে তোর? এই অবস্থা কেনো? ‘
ইরা’র থমকে যাওয়া অবয়ব নতুন উদ্যমে জেগে উঠলো যেনো। নীতির এটুকু সঙ্গ পেয়ে মেয়েটা পূর্বের চেয়েও বেশি ভেঙ্গে পড়লো৷ বান্ধবীকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো হু হু করে। নীতি হতবিহ্বল হলো ইরা’র এমন প্রতিক্রিয়ায়। কোন কারণে মেয়েটার এই হাল তা ভেবে পেলো না সে৷ কেবল আগলে নিলো বুকে৷ মাথায় একাধিকবার হাত বুলিয়ে ফের আওড়ালো,
‘ দোস্ত! বলবি তো কি হয়েছে? এভাবে কাঁদছিস কেনো? ‘
‘ জাদিদ ভাই হাসপাতালে তাইনা? উনার সঙ্গে কোন ঝামেলা হয়েছে কি? কেনো কাঁদছিস? ‘
ইরা হেঁচকি তুলে কাঁদছে৷ নীতির কথার প্রতিউত্তর স্বরূপ মেয়েটা দুদিকে মাথা নেড়ে বোঝায় কোন ঝামেলা হয়নি৷ পরপরই ক্রন্দনরত কন্ঠে বলে,

‘ আ-আমি অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি, দোস্ত। জাদিদ..জাদিদকে ভীষণ কষ্ট দিয়েছি। ‘
নীতি বেশ আশ্চর্য হলো এহেন প্রতিউত্তর শুনে৷ জোর করে ইরা’র মুখ তুললো। ভেজা গাল মুছে দিয়ে বললো,
‘ খোলাসা করে বল কি হয়েছে? এভাবে কাঁদলে আমি কীভাবে বুঝবো? ‘
ইরা’র হেঁচকি থামলো না কোনোভাবেই। অবিরাম অশ্রু গড়াচ্ছে গাল বেয়ে৷ দুই একবার বলতে চেয়েও কান্নার কারণে কিচ্ছুটি বলতে পারলো না সে। অগত্যা ফ্লোর হতে নিজের মোবাইলটি কুড়িয়ে নিয়ে জাদিদের দেওয়া মেসেজটি দেখালো নীতিকে৷ নীতি বড় স্বাভাবিক ভাবেই দৃষ্টিপাত করেছিলো স্ক্রিনে৷ কিন্তু সময়ের ব্যবধানে মুখাবয়ব কঠিন হয়ে উঠলো তার। সবটা পড়ার পর সে চোখ পাকিয়ে তাকালো ইরা’র দিকে। গম্ভীরমুখে বললো,
‘ ইরা! ডোন্ট টেল মি কি তুই মিহাদের ব্যাপার নিয়ে জাদিদ ভাইয়ের সঙ্গে মিস বিহেভ করেছিস। ‘
ইরা নজর লুকালো অপরাধীর ন্যায়। তাতেই নীতি স্পষ্টত বুঝলো সব। এবং সঙ্গে সঙ্গে মেজাজ বিগড়ে গেল তার। ক্ষণিক পূর্বেও যে বান্ধবীর জন্য দরদ উতলে পড়ছিলো, মুহুর্তেই তা উবে গেলো। উদয় হলো রাগ, বিরক্তি। ধমকের সুরে ইরাকে বলে উঠলো,

‘ ন্যাকা কান্না বন্ধ কর। ফটাফট বল কি করেছিস তুই? একটা শব্দ ও বাদ দিবি না৷ সবটা বল। ‘
বান্ধবীর স্বভাব সম্পর্কে খুব ভালোভাবে অবগত বিধায় দ্বিতীয় বার ধমক শোনার অপেক্ষা আর করলো না ইরা। ভঙ্গুর কন্ঠে একে একে সকল ঘটনা জানিয়ে দিলো নীতিকে। সবকিছু শুনে নীতির মেজাজ তুঙ্গে উঠলো। কিন্তু তা প্রকাশ করতে পারলো না সে। কোথাও গিয়ে ইরা’র প্রতি মায়াও হলো। মেয়েটাকেও যে সম্পূর্ণ দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না। সে নিজেও পরিস্থিতির স্বীকার। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নীতি বলে উঠলো,
‘ জাদিদের ভাইয়ের সঙ্গে এমন আচরণ করাটা একেবারেই উচিত হয়নি, ইরা। দুরত্ব বাড়ার আগে ক্ষমা চেয়ে নে৷ তোকে আর মাহবীরকে নিজের চেয়ে দূর করার জন্য ভাইয়াকে বাধ্য করিস না। ‘
ইরা পুণরায় কাঁদে। ধরা গলায় আওডায়,

‘ সে কাল থেকে বাড়ি ফিরছে না। আমাকে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ অবধি দিচ্ছে না। ‘
ইরা পুণরায় ডুকরে উঠলো। তার চেহারা জুড়ে অসহায় ভাব, হাঁসফাঁস চিত্ত। মেয়েটাকে আগাগোড়া লক্ষ্য করে তার মুখোমুখি ঘুরে বসলো নীতি। দুহাতের আদলে কান্নারত মুখশ্রীটি তুলে নিয়ে বেশ নির্বিকারে জানতে চাইলো,
‘ জাদিদ ভাইকে ভালোবাসিস? ‘
ইরা কেমন কেঁপে উঠলো একথায়। সর্বাঙ্গে তরঙ্গ খেলে যাওয়ার মতো অনুভূতি হলো। এক পলকের জন্য থমকালো হৃদস্পন্দন। পরমুহূর্তেই কথাটা ফের কর্ণগোচর হতেই দ্বিগুণ বেগে স্পন্দিত হলো হৃদযন্ত্র। ফ্যালফ্যাল নজরে তাকিয়ে রইলো কিয়ৎক্ষণ৷ নীতি পুণরায় বললো,
‘ কি হলো? জবাব দে। ভালোবাসিস ভাইয়াকে? ‘
ইরা’র থুতনি কাঁপে পুণরায়। গাল বেয়ে আরও দুই ফোঁটা অশ্রু গড়ায়৷ অবুঝ কিশোরীর ন্যায় মাথা নেড়ে এলোমেলো সুরে প্রতিউত্তর করে,

‘ আমি জ..জানিনা। নতুন করে ভালোবাসতে আমার ভীষণ ভয় হয়, নীতি। আম..আমি যাদেরকেই ভালোবেসে আপন করে নিয়েছিলাম সবাই আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে। আমার আপন বলতে জাদিদ আর বীর ছাড়া এখন আর কেউ নেই। আমি..আমি ওদেরকে হারাতে পারবো না দোস্ত। জাদিদকে হারাতে চাই না আমি। তার মতো করে আমাকে আর কেউ আগলে রাখতে পারবে না৷ কেউ আমাকে জাদিদের মতো ভালোবাসতে পারবে না। সে আমার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছে। আমি ভেবেছিলাম মিহাদকে ছাড়া আমি মরেই যাবো। কিন্তু এখন..এখন জাদিদকে ছাড়া একটা দিনও কাটাতে পারিনা৷ তার সঙ্গ ছাড়া আমার দিনই শেষ হয়না। জাদিদকে ছাড়া আমি বীরকেও সামলে রাখতে পারিনা, কিচ্ছুটি ভাবতে পারিনা। আমি জানিনা আমি তাকে ভালোবাসি কিনা। কিন্তু জাদিদকে কষ্ট দিয়ে আমি নিজেও ভালো নেই। গতকাল সারাটাদিন আমি ছটফট করছিলাম তার কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য, তার কন্ঠটা শোনার জন্য। আমি তাকে এভাবে কষ্ট দিতে চাইনি দোস্ত। বিশ্বাস কর, আমার ভেতরটা পুড়ে যাচ্ছে। ‘

একনাগাড়ে মন গহীনের সবটুকু গোপন অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ করে লম্বা দম নিলো ইরা। তার নয়ন জোড়া তখনো সিক্ত। নীতি হতবিহ্বল চিত্তে তাকিয়ে ছিলো বান্ধবীর দিকে৷ অজ্ঞাত কোন কারণ বশত তার নিজের চোখের কোণ-ও ঝাপসা হয়ে এসেছে। ইরা’র কথাগুলো শুনে তার ঠোঁটের কোণে ঈষৎ হাসির রেখা ফুটলো৷ বুক থেকে বিশাল কোন পাথর সরে গেলো যেনো। বান্ধবীকে পুণরায় বুকে জড়িয়ে নিলো সে। চুলের ভাঁজে শব্দ করে চুমু খেয়ে উৎফুল্ল চিত্তে বলে উঠলো,

‘ জান আমার! এমন ভাবে জাদিদ ভাইয়ের সামনে বললে সে তো এতক্ষণে গলে পানি পানি হয়ে যেতো। ‘
একটু থেমে পুণরায় বললো,
‘ ইশ!! আমাদের বীরের আম্মু তবে শেষমেশ তার বাবাইকে ভালোবেসে-ই ফেললো! ‘
ইরা বিমূঢ় হলো একথায়। কান্না থামলো এক পলকের জন্য। শরীর জুড়ে শিরশিরে অনুভূতি। তার বিবশ প্রতিক্রিয়া দেখে নীতি শব্দ করে হাসে৷ পুণরায় ইরা’র গাল মুছে বলে,
‘ অবশ্য জাদিদ ভাইয়ের মতো এক সুপুরুষের সঙ্গে গোটা একটা বছর একই ছাদের নিচে থাকলে, তার ভালোবাসার বিপরীতে তাকেও ভালো না বেসে থাকাটাই বরং অস্বাভাবিক। আমি জানতাম তোর জবাব এমন কিছুই হবে। অ্যান্ড আ’ম গ্ল্যাড টু হিয়ার দিস। ‘
ভেজা দৃষ্টিতে, মূর্তির মতো বসে রয়েছে ইরা। নীতি এবার গম্ভীরমুখে বসলো তার মুখোমুখি। ইরা’র দুহাত নিজের হাতের মুঠোয় চেপে শান্ত সুরে বলে উঠলো,
‘ আমি একটু হলেও বুঝতে পারছি তোর মনে কি চলছে। জাদিদ ভাইয়ের সঙ্গে মুভ অন করতে তুই দ্বিধায় ভুগছিস তাইতো? ‘

ইরা মাথা দোলায়। নীতি পূর্বের চেয়েও জোর দিয়ে চেপে ধরে তার দুই হাত। বলে,
‘ মিহাদকে তুই কখনো ভুলতে পারবি না সেটা জাদিদ ভাইয়া নিজেও জানে, ইরা। আমরা সবাই জানি। কিন্তু ওর স্মৃতি নিয়ে, মাহবীরকে নিয়ে তুই একাকী ক’বছর কাটাবি,বল? এখন যেই নামমাত্র সম্পর্কে জড়িয়ে আছিস জাদিদ ভাইয়ের সঙ্গে, এভাবে সারাজীবন তো থাকা যাবেনা। ভাইয়াও মানুষ। আবেগ, অনুভূতি, চাহিদা তারও আছে। গোটা একটা বছর ছাড় দিয়েছে বলে কি সে তোর জন্য গোটা জীবন উৎসর্গ করে দিক এটা চাইছিস তুই? এমনটা আদৌও সম্ভব? মানুষটা তোকে অসম্ভব ভালোবাসে, ইরা। নিজের ভালোবাসার চেয়েও বেশি সে তোর ভালোবাসাকে সম্মান করে। আর তার বিনিময়ে তোর কাছ থেকে যদি স্বামীর মর্যাদা টাই না পায়, তাহলে কিন্তু উনার চেয়েও বেশি তুই নিজের কাছে অপরাধী হবি। মাহবীরের কথাটাও একবার ভাব। ও বড় হয়ে যদি দেখে অন্য সবার চেয়ে ও মা-বাবার সম্পর্ক অন্যরকম।

তখন বাচ্চাটার উপর কেমন প্রভাব পড়বে? তুই কি চাস এমন অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মাঝে বড় হয়ে ওর মন, মস্তিষ্কে বিরূপ প্রভাব পড়ুক? সবচেয়ে বড় কথা, মিহাদ নিজেও চেয়েছে যেনো তোর আর জাদিদ ভাইয়ের সংসার গড়ে উঠে। এজন্যেই তো তোদের বিয়ে নিয়ে এতো তোরজোর করেছিলো ও। তাহলে তুই কোন যুক্তিকে নিজের সুখ সব পায়ে ঠেলে দিচ্ছিস? এমন আবেগী হয়ে জীবন কাটানো যায় না দোস্ত। বাস্তবতা দেখ, তোর সামনে একটা স্বর্গের মতো সংসার সাজানো আছে। একটাবার সাহস করে কদম বাড়িয়ে দেখ না। জাদিদ ভাইয়াকে একটাবার সুযোগ দিয়ে দেখ। আমার বিশ্বাস, সে তোকে আর কোন পিছুটানে আটকে যেতে দিবে না। ‘

মন্ত্রমুগ্ধের মতো স্থির হয়ে নীতির সবকথা শুনলো ইরা। অবচেতনে গায়ের প্রতিটি পশম দাঁড়িয়ে গেলো তার। বুক জুড়ে কেমন এক তোলপাড় বয়ে যাচ্ছে। অল্পক্ষণ নিরবতায় কাটিয়ে হঠাৎ মুখ খুলল সে। অবচেতনে বলে উঠলো,
‘ মিহাদ কিংবা মাহবীর, কারো দোহায় দিয়ে আমি নতুন জীবনে পদার্পণ করতে চাইছি না, নীতি৷ এবার আমি আমার জন্যও বাঁচতে চাই। ‘

নীতি একমুহূর্তের জন্য থমকে গেলো অনাকাঙ্ক্ষিত বাক্যগুলো শুনে। বলা বাহুল্য, সে নিজেও এটাই চেয়েছিলো। কেবলমাত্র ইরা’র মন ভোলানোর জন্যে মিহাদ এবং মাহবীরের প্রসঙ্গ টেনেছিলো সে। কিন্তু আপনমনে চাচ্ছিলো ইরা যেনো কারো দিক বিবেচনা না করে। কেবল নিজের অনুভূতি মেনে জাদিদকে গ্রহণ করে নেয়। শুধু এবং শুধুমাত্র জাদিদকে ভালোবাসে বলেই যেনো একটাবার সুযোগ দেয়৷ এবং হলোও তাই। দীর্ঘ দেড়টি বছর পর প্রিয় বান্ধবীর চৌকাঠে সুখ কড়া নাড়তে চলেছে, ভেবেই খুশিতে নীতি হুশ জ্ঞান হারিয়ে ঝাপটে ধরলো ইরাকে। অপ্রস্তুত ইরা টাল সামলাতে না পেরে গড়িয়ে পড়লো ফ্লোরে। নীতির বাচ্চামো কান্ড দেখে ভাবলো, কে বলবে এই মেয়ের বয়স চব্বিশ গড়িয়ে পঁচিশ হতে চলেছে! বান্ধবীর সম্মুখে ওর স্বভাব সব এখনো অষ্টাদশী কিশোরীর ন্যায়।

ঠান্ডা ফ্লোরে দুজন পাশাপাশি চিৎ হয়ে শুয়ে রইলো। বুক ফুলিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আহত সুরে ইরা বলে উঠলো,
‘ জাদিদ বাসায় ফিরছে না। আমার কলও ধরছে না। এমন করলে আমি কীভাবে তার কাছে ক্ষমা চাইবো? ‘
নীতি নীরব রইলো কিয়ৎ ক্ষণ। পরমুহূর্তে কি যেনো ভেবে চট করে উঠে বসলো। বেশ আমোদিত স্বরে বলে উঠলো,
‘ তোর এতজন বেস্ট ফ্রেন্ড থাকতে এতো চিন্তা করা লাগছে কেনো? তুই একটাবার শুধু ভাইয়ার সামনে যা। বাদ বাকি সব আমরা অ্যারেঞ্জ করছি। ‘
ভ্রুঁ কুঁচকে তাকালো ইরা। নীতির হাবভাব মোটেও সুবিধার ঠেকল না তার কাছে। এই মেয়ে আসলে করতে চাইছে টা কি?

সন্ধ্যা সাতটা। গতকাল নাইট শিফট ছিলো বলে আজ জাদিদ মোটামুটি ফ্রি। গুটিকয়েক পেশেন্ট যাদের সার্জারী হয়েছিলো বিগত দুই দিনে। তাদেরকে অবজারভেশনে রেখেছিলো সে। হসপিটাল আওয়ার শেষ হলেও বাড়ি ফেরার ইচ্ছা জাগলো না তার। এই মুহুর্তে শেষজনের কন্ডিশন অবজার্ভ করে এসে নিজ কেবিনে প্রবেশ করলো জাদিদ। তার কেবিনটা মোটামুটি বড় বলা চলে। ডেক্স,চেয়ার এবং পেশেন্ট বেড ব্যতীত উত্তর দিকে নিজ পছন্দের দুটি ছোট ছোট সিঙ্গেল সোফা সেট করেছে সে। সম্মুখে একটি ছোট্ট কাঁচের টেবিল। কেবিন তুলনামূলক বড় হওয়ায় সব আসবাব বেশ চমৎকার ভাবে সেট করা। সিঙ্গেল সোফার একটিতে এসে বসলো জাদিদ। পা জুড়া লম্বাকার ভাবে ছড়িয়ে দিয়ে সোফায় গা এলিয়ে দিলো। গোটা একটা রাত নির্ঘুম ছিলো বিধায় শরীর মেজমেজ করছে তার। ক্লান্ত লাগছে ভীষণ। শরীরের ক্লান্তির চেয়েও মনের ক্লান্তি দ্বিগুণ। সকালে সেই একটা মেসেজের পর ইরা’র সঙ্গে আর কথা হয়নি তার। না সে নিজ থেকে কোন মেসেজ দিয়েছে, আর না তো ইরা। মেয়েটা যে কীভাবে এখনো এমন নির্বিকার হয়ে আছে তা ভেবেই বুকে চিনচিনে ব্যথার উপদ্রব ঘটলো। এতগুলো মাসেও সে নিজের ভালোবাসায় ইরাকে আটকাতে পারেনি! এই ভেবে ক্ষণে ক্ষণে হতাশায় ভরা দীর্ঘশ্বাস ফেলছে সে।

কেবিনের নিরবতা ভেঙ্গে বদ্ধ দরজায় কড়া নাড়লো কেউ। জাদিদ বিরক্ত হলো কিঞ্চিৎ। সবাইকে জানিয়েই এসেছিলো সে একটু রেস্ট করতে চায়। কেউ যেনো বিরক্ত না করে। তবে এই অসময়ে কে এলো? মুখাবয়ব স্বাভাবিক করে সোজা হয়ে বসলো সে। স্বভাবসুলভ শীতল সুরে আওড়াল, ‘ কাম ইন। ‘
পরপরই দরজা খোলার শব্দ হলো। অনাগ্রহী দৃষ্টিতে দরজার পানে একপলক সেদিকে তাকিয়ে কেমন চমকে উঠলো জাদিদ। চোখ জোড়া স্থির হয়ে গেলো অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে ইরা’র দর্শন পেয়ে। হতবিহ্বল চিত্তে চট করে দাঁড়িয়ে পড়লো সে। অস্ফুট স্বরে ডেকে উঠলো, ‘ ইরা! ‘

দ্বিধান্বিত চিত্তে কেবিনে প্রবেশ করেছিলো ইরা৷ ঢিপঢিপ করছিলো বুকের ভেতরটা। কিন্তু জাদিদের দেখা পেয়ে হঠাৎই কেমন হাহাকার করে উঠলো অন্তরঃস্থল। নীতির শিখিয়ে দেওয়া বুলি সব খেই হারালো। জাদিদের দেহজুড়ে স্পষ্ট ক্লান্তির রেশ। বেশভূষা এলোমেলো। যা দেখে পুণরায় ইরা’র মাঝে অপরাধবোধ জেগে উঠলো। কাঁপলো দৃষ্টি। একই সঙ্গে কম্পিত পদযুগলের তালে মুহুর্তেই রমনী ছুটে এলো। থমকে থাকা জাদিদের বুকে মুখ গুঁজে দুইহাতে ঝাপটে ধরলো পৃষ্ঠদেশ। নিজেকে শত স্থির রাখতে চেয়েও ব্যর্থ হলো সে। না চাইতেও ফুঁপিয়ে উঠলো।
আচানক ইরা’র এমন প্রতিক্রিয়ায় বোকা বনে গেলো জাদিদ। তার দুইহাত অবচেতনে উঠে এলো ইরা’র পিঠে। হতবুদ্ধির মতোন মেয়েটার কান্না দেখে বিহ্বল স্বরে কিছু বলতে উদ্যত হয়েছিলো সে। পূর্বেই শোনা গেলো ইরা’র ক্রন্দনরত সুর,

‘ আ’ম স্যরি জাদিদ। আমি চাইনি আমার কোন কথায় আপনি অপমানিত হোন। মাহবীরকে কখনো আপনার কাছ থেকে দূর করার চিন্তাও করিনি কখনো। আমি জানি না সেদিন আমার কি হয়ে গিয়েছিলো। আ’ম সো স্যরি। আমাকে ভুল বুঝবেন না, প্লিজ!!! ‘
ইরা’র কান্নায় নিজের খারাপ লাগা সব চেপে গেলো জাদিদ। দীর্ঘশ্বাস ফেলে জোর করে মেয়েটার মুখ উপরে তুলল। ইরা তখনও জাদিদকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। কেবলমাত্র মাথা উঁচিয়ে তাকালো সে। তার ভেজা গাল মুছে দিয়ে জাদিদ বললো,
‘ আপনাকে কেনো মনে হলো আমি আপনাকে ভুল বুঝেছি? ‘
ইরা নাক টানে। ভাঙ্গা গলায় জবাব দেয়,

‘ আপনি রাতভর বাড়ি ফিরেননি। কাল সারাদিন মোবাইল বন্ধ করে রেখেছিলেন। আর আজকে এখনো অবধি হাসপাতালেই আছেন। এসবের মানে আমি আর কি ধরবো? ‘
নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেললো জাদিদ। ইরাকে বসিয়ে দিলো সোফায়। এবং নিজে ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসলো ইরা’র সম্মুখে। টেবিল হতে গ্লাস ভর্তি পানি ইরা’র দিকে এগিয়ে দিয়ে জানালো,
‘ কাল নাইট শিফট ছিলো। এর আগের রাতে মোবাইল চার্জ করা হয়নি। কাল সারাদিনও চার্জে দেওয়ার সুযোগ পাইনি। এজন্যেই বন্ধ ছিলো। ‘
‘ ম..মানে বলতে চাইছেন আপনি রেগে নেই? ‘
‘ উঁহু। ‘
‘ তাহলে এখনো এখানে কি করছেন? ‘

জাদিদ জবাব দিতে পারলো না। মুখ ফুটে জানাতে পারলো না অভিমানী বাক্যগুলো। নজর ফিরিয়ে চট করে দাঁড়িয়ে পড়লো সে। হাত ঘড়িতে সময় দেখে প্রসঙ্গ পালটে বলে উঠলো,
‘ এতো ভাবার মতো কিছু হয়নি। বাড়ি ফিরবো, আসুন। বীরকে মিতুর কাছে রেখে এসেছেন কি? এতো ছোট বাচ্চাটাকে এভাবে একা ফেলে আসার কি দরকা… ‘
জাদিদের কন্ঠ থামলো হঠাৎ। ইরা তার শার্ট টেনে ঘুরিয়ে ফেলেছে নিজের দিকে। পুণরায় গভীর আবেশে দখল করেছে বক্ষস্থল। মাথা উঁচিয়ে তাকিয়ে আছে মায়াময়ী দৃষ্টিতে। এই দৃষ্টির অর্থ বুঝতে অক্ষম জাদিদ। তার পুরুষালি বক্ষে দ্রিমদ্রিম শব্দ হচ্ছে। সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে অন্যরকম এক উষ্ণতা। পরপর দুটো ঢোক গিললো সে। মুখ ফুটে বলতে চাইলো কিছু। পূর্বেই শোনা গেলো ইরা’র শান্ত, শীতল কন্ঠের অবাঞ্ছিত বাণী,

‘ আমাকে আবার বিয়ে করবেন, জাদিদ? মাহবীরের খাতিরে নয়। এবার শুধু আমার জন্য, আমাদের জন্য। ‘
আকস্মিক এমন বাক্যে জাদিদের দেহ হতে রূহ বেরিয়ে গিয়েছে এমন ভাবেই স্থির হয়ে গেলো সে। এইমাত্র কর্ণধার হওয়া বাক্যগুলো প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো বারে বারে। শিরদাঁড়া বেয়ে তরঙ্গ নামলো যেনো। কাঁপলো শক্তপোক্ত অবয়বটি। কিচ্ছুটি প্রতিউত্তর করার ভাষা পেলো না সে। তার নির্জীব প্রতিক্রিয়া দেখে ইরা’র মুখশ্রীতে আঁধার নামে। মাথা ঠেকায় বুকে। ধরা গলায় আওড়ায়,
‘ একের পর এক আপনজন হারিয়ে আমার ভেতরটায় ভয় জমে গিয়েছিলো, জাদিদ। এতকিছুর পর নতুন করে ভালোবাসার মতো সাহস পাইনি আমি। কিন্তু আপনাকে ঘিরে অনুভূতি জমানো থেকেও আটকাতে পারিনি নিজেকে। আমাকে ফিরিয়ে দিবেন না, প্লিজ৷ আপনাকে ছাড়া এক প্রহর-ও কাটতে চায় না এখন। আমার শূন্য জীবনে যে ভালোবাসা নিয়ে আপনি হাত পেতে আছেন, তা আমি সাদরে গ্রহণ করে নিয়েছি। আপনিও আমাকে নিজের করে নিন। ‘

দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর যে ভালোবাসার জন্য, যেই অনুভূতি কথন শোনার জন্য তড়পাচ্ছিল জাদিদ। অবশেষে আজ তা শুনতে পেরে আবেগে টইটম্বুর হলো সে। চশমায় ঢাকা চোখদুটো ভরে উঠলো আনন্দাশ্রু-তে। দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো ইরাকে। চিবুক নামিয়ে গভীর আবেশে চুমু খেলো ইরার চুলের ভাঁজে। আবেগে জড়িয়ে গেলো তার গভীর কন্ঠ,
‘ আপনাকে আমি ভীষণ ভালোবাসি, ইরা। ‘
বিপরীতে কান্না চোখে, মিহি হাসলো ইরা। জাদিদের উষ্ণ বুকে ডুবে গিয়ে ক্ষীণ গলায় প্রতিউত্তর করলো,
‘ আমি আপনার ভালোবাসায় আজীবন ডুবে থাকতে চাই, জাদিদ। ‘
জাদিদের অধর প্রসারিত হলো এই মিষ্টি প্রতিউত্তরে। প্রশান্তির হাসি হাসলো সে। দুজনে দীর্ঘক্ষণ ডুবে রইলো একে অপরের উষ্ণ আলিঙ্গনে। অতঃপর হঠাৎই নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো ইরা। তার দুই গালে লজ্জার লালিমা ছেয়ে গিয়েছে। জাদিদের দিকে তাকালো না সে। তখন ছুটে আসতে গিয়ে হাত ফসকে পড়ে যাওয়া শপিং ব্যাগটি তুলে নিলো। জাদিদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে আমতাআমতা করে বলে উঠলো,
‘ শার্ট চেঞ্জ করে এটা পড়ে নিন। বের হবো। ‘

জাদিদ ভ্রুঁ কুঁচকালো। প্যাকেট হতে বের করলো একটি সোনালী রঙের পাঞ্জাবি। এই মুহুর্তে পাঞ্জাবি পড়ার কি প্রয়োজন তা ভেবে পেলো না সে। এতক্ষণে গিয়ে লক্ষ্য করলো, ইরার গায়েও একই রঙের একটি সোনালী জামদানী শাড়ি। ভারী চমৎকার দেখতে সেটি। প্রায় মাস চারেক আগে চড়া দামে জাদিদ নিজে কিনেছিলো এটি। ইরা আজকের পূর্বে কখনো পরেনি এই শাড়িটি। দুই হাতভর্তি চুড়ি, কানে দুল, গলায় চিকন সোনার চেইন সব মিলিয়ে কেমন নরজকাড়া সুন্দর দেখাচ্ছে ইরাকে। গভীর ভাবে লক্ষ্য করতে গিয়ে জাদিদ নরজ সরাতে পারলো না। তার এই ঘোরলাগা দৃষ্টির কবলে পড়ে ইরা হাঁসফাঁস করে উঠে। তাড়া দিয়ে বলে,

‘ দাঁড়িয়ে আছেন কেনো? আমাদের দেরি হচ্ছে তো। ‘
‘ কিন্তু এসব পরে যাবো কোথায়? ‘
‘ সে নাহয় গেলে দেখতে পারবেন। আপনি চেঞ্জ করুন তাড়াতাড়ি। ‘
‘ এখানেই? ‘
‘ হ্যাঁ। আর নয়তো কোথায়? ‘
ইরা’র তাড়া দেওয়া দেখে জাদিদ আর দ্বিমত করার জো পেলো না। একে একে শার্টের বোতাম সব খুলে পাঞ্জাবি জড়িয়ে নিলো গায়ে। চকচকে নতুন পাঞ্জাবিটি। একেবারে তারই মাপের। নিজের দিক লক্ষ্য করে সে ইরার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ল,

‘ এটা আপনি কিনেছেন? ‘
ইরা মাথা দুলিয়ে সায় জানালো। জাদিদের দিকে পূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকাতেই নজরে আসলো কলারের দিকে ঝুলন্ত প্রাইস ট্যাগ-টি। এগিয়ে গেলো সে৷ পায়ের পাতা উঁচু করে দুহাতে জোর দিয়ে ছিড়তে নিলো ট্যাগ দুটো। দুজনের মাঝে দুরত্ব তখন ইঞ্চিখানেক। জাদিদ গাঢ় চোখে তাকিয়ে রয়, কন্ঠে খাদ নামিয়ে বলে,
‘ এই শাড়িতে আপনাকে লাগামছাড়া সুন্দর লাগছে, মাহবীরের আম্মু। ‘
জাদিদের উষ্ণ শ্বাস আছড়ে পড়েছে ইরার মুখের একপাশে। মেয়েটার শ্বাস আটকে আসে। হাতের জোর হারায়। সেই অবস্থাতেই চোখ তুলে তাকালো সে। সরাসরি দৃষ্টি মিললো চশমার আড়ালে ঢাকা জাদিদের ঘোরলাগা দৃষ্টির সঙ্গে। তীব্র লজ্জায় আরক্তিম হলো ইরা’র দুই গাল। ট্যাগ দুটো ছিড়ে দ্রুত নিজ স্থানে ফিরে এলো সে। আমতাআমতা করে বলে উঠলো, ‘ যাওয়া যাক? ‘

জাদিদ মিটিমিটি হাসছে। ইরা’র কথা শুনে হাত দিয়ে ইশারা করে সে। ইরা দ্রুত বেরিয়ে যায়। নিজের প্রয়োজন সামগ্রী সব তুলে নিয়ে, স্টাফকে ইনফর্ম করে জাদিদ নিজেও এগিয়ে গেলো ইরার পাশাপাশি।
গ্রাউন্ড ফ্লোরে এসে দেখা মিললো নীতি’র। মাহবীরকে কোলে নিয়ে এদিকে সেদিক হাঁটছিলো সে। এটা সেটা দেখিয়ে মন ভুলিয়ে রাখছিলো বাচ্চাটার। গোলগাল চোখে সবদিক দেখছিলো মাহবীর। নীতিকে দেখে স্বাভাবিকভাবেই বেশ অবাক হলো জাদিদ। দুজনার দিকে তাকিয়ে গাল ভরে হাসলো নীতি। জাদিদের সঙ্গে কুশলাদি করে মাহবীরকে এগিয়ে দিলো তার দিকে। বাবার দর্শন পেয়ে মুহুর্তেই চঞ্চল হয়ে উঠলো বাচ্চাটা। হাত,পা নেড়ে অস্পষ্ট স্বর তুললো একাধিক। উপস্থিত তিনজন হেসে ফেললো তার প্রতিক্রিয়া দেখে। জাদিদ নিঃশব্দে হেসে ছেলের দুই গালে চুমু খেলো শব্দ করে।

‘ এখানেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সময় পার করলে হবে? আমাদের দেরি হচ্ছে তো! ‘
নীতির কথায় জাদিদের ধ্যান ভাঙ্গে। সে পুণরায় জানতে চাইলো,
‘ আমরা যাচ্ছি কোথায়? ‘
‘ সে নাহয় গন্তব্যে পৌঁছে জানা যাবে,ভাইয়া। বীরকে আমাকে দিন। গাড়ি বের করুন। বাকিরা অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। ‘
এই দুই বান্ধবীর কাছে জবাব পাবে না তা বুঝতে পেরে জাদিদ আর কথা বাড়ালো না। গাড়ি আনলক করে ফ্রন্ট সিটের ধার মেলে দাঁড়ালো সে। উঠে বসলো ইরা। ব্যাক সিটের দরজাও খুলে দিলো নীতির জন্য। মাহবীরকে কোলে নিয়ে নীতি বসলো ব্যাক সিটে। অতঃপর ড্রাইভিং সিটে এসে বসলো জাদিদ। নীতির শেয়ার করা লোকেশন অনুযায়ী এগিয়ে চললো অজানা গন্তব্যে।

আজকের দিনটি বোধহয় জাদিদের জন্য একটি “চমকপ্রদ” দিন। ক্ষণে ক্ষণে কেমন চমকে যাচ্ছে ইরা’র একের পর এক পদক্ষেপে। এই মুহুর্তেও সে চমকিত নয়নে তাকিয়ে রয়েছে একটি দালানের দিকে। যার দেয়ালে খচিত রয়েছে “কাজী অফিস” নামক পরিচয়। জাদিদ বেকুবের মতো তাকিয়ে রয় সেদিকে। পরমুহূর্তে ঘাড় ফিরিয়ে তাকায় ইরা’র দিকে। মেয়েটার প্রতিক্রিয়া ভীষণ স্বাভাবিক। যা জাদিদকে আরও অবাক করে তুলছে। তাকে এমন স্থির দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হইহট্টগোল লাগিয়ে দিলো একের অধিক পুরুষালি কন্ঠ। আবরার, জিমন,রায়ান তিন বন্ধু একত্রে বলতে লাগলো,

‘ এতো দেরি করে আসলে হয়? কাজীকে জোর করে বসিয়ে রেখেছি এক ঘন্টা যাবত। ‘
‘ তা নয়তো কি! ক্লায়েন্ট নেই দেখে উনি কবেই অফিস বন্ধ করে দিতে চাচ্ছিলো। কত কাঠখড় পুড়িয়েছি আরেকটু খোলা রাখার জন্য। ‘
‘ এখন আবার এখানে দাঁড়িয়ে আছি কেনো তাহলে? সব কিছু তো রেডি আছে। শুভ কাজে দেরি কিসের? ‘
জাদিদ অতি বিষ্ময়ে সত্যিই বোবা বনে গিয়েছে। ড্যাবড্যাব নজরে সে অবলোকন করলো ইরা’র বন্ধুদের৷ সুন্দর দুটো বর মালা, দুই কেজি মিষ্টি সহ নিজেরাও সেজেগুজে প্রস্তুত হয়ে এসেছে। ছেলেরা সকলে পাঞ্জাবি জড়িয়েছে গায়ে, এবং নীতি পরেছে একটি হালকা গোলাপি শাড়ি। তাদের তোরজোর দেখে মনে হলো কতো কতো মাস ধরে এই বিয়ের প্রস্তুতিতে নেমেছে তারা! তপ্ত শ্বাস ফেলে না চাইতেও বন্ধুদের পাগলামি দেখে হেসে ফেললো জাদিদ। ভাবলো,তার বউটা সব হারালেও ভাগ্য গুণে এমন কিছু পাগলাটে বন্ধু পেয়েছে। এরা থাকতে জীবনে সমস্যা নামক শব্দটিকে বড্ড অহেতুক লাগে।
কাজি অফিসে ঢুকতে গিয়ে দেখা গেলো জিমন আরও একটিবার ডায়াল করছে নির্দিষ্ট একজনের নাম্বারে। এবারেও রেসপন্স না পেয়ে সে রীতিমতো তেতে উঠলো,

‘ এই শালা সিলেটে গিয়ে কোন সংসার পাতিয়ে রেখেছে কে জানে! আজও ফোন তুলতে না। ‘
রায়ানের ডাক পেয়ে মোবাইল পকেটে ঢুকিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলো সে। সকলে মনস্থির করলো কাজীর দিকে।
একদা যেই বিয়ের খিলাফ ছিলো এই গোটা বন্ধুমহল সহ স্বয়ং ইরা। আজ পুণরায় জাদিদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে জড়াতে এসেছে সে। এবং তাদের নতুন জীবনের শুভাকাঙ্ক্ষী, সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত তারই বন্ধুরা। সকলে বেশ হাসিহাসি মুখে মাতিয়ে রেখেছে কক্ষটি। ক্যামেরাবন্দী করছে মুহুর্তটি। ইরা আজ জাদিদের নামে কবুল পড়লো সম্পূর্ণ সজ্ঞানে,মন থেকে,বিনা কোন দ্বিধায়। আজ কোন পিছুটান স্মরণে এলো না তার। কারো প্রতীক্ষায় স্তব্ধ হয়ে রইলো না সে। মুখ জুড়ে লেপ্টে রইলো স্নিগ্ধ হাসি।

বিয়ে পড়ানো শেষ হতেই একে একে বন্ধুরা মালা এগিয়ে দিলো দুজনকে। চমৎকার ভাবে বেশ কয়েকটি ছবিও তুললো জিমন। মাহবীরকে মাঝে রেখে হাসিমুখেই মুহুর্তটুকু ক্যামেরাবন্দী করলো জাদিদ-ইরা। মিষ্টিমুখ শেষে বন্ধুদের আবদারেই সকলে মিলে বের হলো অজানা এক গন্তব্যে। এই সন্ধ্যারাত কাটলো বেশ আমেজের সঙ্গে। রাত প্রায় ন’টার সময় জাদিদ সকলকে নিয়ে গেলো একটি রেস্টুরেন্টে। বিয়ের দাওয়াত স্বরূপ রাতের খাওয়া দাওয়া হলো জাদিদের পক্ষ থেকে। অতঃপর, যার যার গন্তব্যে ফিরে গেলো সকলে।

জাদিদ-ইরা যখন নিজেদের আপার্টমেন্টে ফিরে এলো,তখন রাত প্রায় দশটা। ঘুমন্ত মাহবীরকে কোলে নিয়ে ইরা শুরুতেই এগিয়ে গেলো সিড়ি পথে। পেছনে দুই হাত ভর্তি কিছু শপিং ব্যাগ নিয়ে এগিয়ে আসছে জাদিদ। মিতু দুজনের অপেক্ষাতেই ছিলো। ইরাকে দেখে গাল ভরে হাসলো সে। জাদিদের পূর্বে ইরা নিজেই বেডরুমের দিকে কদম বাড়িয়েছে। জাদিদ এলো মিনিট এক পরে। ভিজিয়ে রাখা দরজা ঠেলে কক্ষে প্রবেশ করামাত্র তাজা ফুলের তীব্র সুগন্ধি ঢলে পড়লো তার নাসারন্ধ্রে। আজকের দিনের শেষ চমকটা পেয়ে তার হাত ফসকে শপিং ব্যাগ সব ফ্লোরে আছড়ে পড়লো। কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে দেখতে লাগলো হরেক রকমের ফ্রেশ ফুল দ্বারা সজ্জিত বিছানাটার দিকে। বার কয়েক পলক ঝাপটিয়ে বুঝার চেষ্টা করলো, ভুল দেখতে কিনা। নাহ! প্রতিবারে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ফুলেল বিছানাটি। জাদিদ ঢোক গিলে। নজর ফিরিয়ে দেখে ইরাকে। মাহবীরকে দোলনায় শুইয়ে দিয়ে ভারী কাপড় টুকু খুলে দিচ্ছে ইরা। তার প্রতিক্রিয়া এমন, যেনো এই সজ্জিত বিছানা সে দেখেয়নি। সত্যিই দেখেনি নাকি? জাদিদ কাঁপা গলায় ডাকে,

‘ ইরা! ‘
মাহবীরের কাপড় খুলতে থাকা ইরা’র দুইহাত একমুহূর্তের জন্য কেমন কেঁপে উঠলো। ব্যাপারটা নজরে এলো না জাদিদের। ইরা নিজেকে বেশ স্বাভাবিক দেখানোর প্রচেষ্টা চালিয়ে, জাদিদের দিকে না তাকিয়েই বলে উঠলো,
‘ দাঁড়িয়ে আছেন কেনো? ফ্রেশ হয়ে আসুন। ‘
জাদিদের মস্তিষ্ক এলোমেলো তখন। মাথা চুলকে দরজা লাগিয়ে শপিং ব্যাগ সব যথাস্থানে তুলে রাখলো সে৷ ইরা মাহবীরকে ভালোভাবে ঘুম পাড়িয়ে ঘুরে দাঁড়াতেই মুখোমুখি হলো জাদিদের। চোখ তুলে তাকানো মাত্র জাদিদ বিছানার দিকে ইশারা করে বলে উঠলো,
‘ আপনার বন্ধুরা হয়তো বেশি বেশি ভেবে ফেলেছে। আপনি নিষেধ করেননি কেনো? ‘
‘ প্রয়োজন মনে করিনি,তাই। ‘

ইরার নির্লিপ্ত প্রতিউত্তর। জাদিদ হাত বাড়িয়ে ইরা’র কোমর জড়িয়ে ধরে। দুজনার মধ্যাকার এক ইঞ্চি সম দুরত্ব টুকুও ঘুচিয়ে নিলো সে। অপর হাত রাখলো ইরা’র মাথার পেছনটায়। ললাটে এক শুষ্ক চুম্বন দিয়ে বলে উঠলো,
‘ ইউ ক্যান টেক ইউর টাইম, ইরা। ভালোবাসা চেয়েছি বলে সবকিছুতে এতো তাড়াহুড়ো করতেও বলিনি। ‘
জাদিদের পাঞ্জাবির অংশ মুঠোবন্দি করে ছোট্ট চুম্বনটুকু অনুভব করলো ইরা। অতঃপর চোখ তুলে তাকালো। ক্ষীণ সুরে প্রতিউত্তর করলো,

‘ যে ভালোবাসার প্রতীক্ষায় এতকাল কাটিয়েছেন, সেই শুভ মুহূর্তটি আজ থেকে শুরু হোক এটাই চাই। নিজের জন্য অনেক সময় ব্যয় করেছি। এবার বাকি জীবনের সবটুকু প্রহর আপনাকে নিয়ে কাটাতে চাই। ‘
জাদিদ পুলকিত হলো এই প্রতিউত্তরটুকু শুনে। আজকের দিনটি তার জন্য এতো এতো সৌভাগ্য বয়ে আনবে, তা সে কখনো ভাবেনি। ইরাকে বিয়ে করেছে এক বছর হলো। অথচ, আজ মনে হচ্ছে এই রমনী সত্যিই তার। আবেগে,আবেশে দ্বিতীয় বারের মতো ইরা’র কপালে চুমু খেলো সে। এবারের স্পর্শটুকু বেশ গভীর, বেশ উষ্ণ। তার একহাত বারেবারে ছুঁয়ে দিলো ইরা’র মোলায়েম গাল। কাছাকাছি টেনে নিলো মুখশ্রীটি। দুজনার চোখে গভীর ঘোর। বক্ষস্থলের অনুভূতি টালমাটাল। দুজনেরই জানা, আজ তাদের পূর্ণতার রাত। জগৎ সংসারের সব ভাবনা ভুলে, একে অপরের ভালোবাসায় সিক্ত হওয়ার রাত।

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭৪

সেই রাতে ঝর নেমেছিল নিরব শব্দে। বাতাসে মিশে ছিল প্রেমের ঘ্রাণ। উথাল-পাতাল ভালবাসার ঢেউয়ে ভেসে চলেছিল এক নবদম্পতি। আক্ষরিক অর্থে সংসার জীবনের গোটা একটি বৎসর কেটে গেলেও, প্রকৃত অর্থে আজকের এই মধুময় দিনটি থেকেই শুরু হয়েছে তাদের বৈবাহিক জীবন। দু’টি মন আজ সত্যিকার অর্থে সুখ খুঁজে বেড়ালো দুজনার মাঝে। সন্ধান মিললো সেই প্রেমানুভূতির, যেই অনুভূতি প্রস্ফুটিত হয়েছে পরস্পরকে ঘিরে।

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭৬