Home অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ১১

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ১১

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ১১
শ্রাবণী ইয়াসমিন

আনায়া হঠাৎই এক আতঙ্কে চিৎকার করে উঠে বসল।
— তার শ্বাস হু হু করে উঠছে, বুকটা দারুণভাবে ওঠানামা করছে।
চোখ দুটো বিস্ফারিত, সমস্ত শরীর ঘেমে একাকার, চাদরটা ভিজে গেছে তার গায়ের ঘামে। বুকের ভেতর থেকে যেন একটা অজানা কাঁপুনি সারা দেহে ছড়িয়ে পড়েছে।
সে কিছুক্ষণ নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করে। দু’হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরে, যেন কোনোভাবেই মস্তিষ্কের ভিতরের ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পেতে পারে। সে নিজেকেই নিজে বোঝাতে থাকে,

— ওটা স্বপ্ন ছিলো শুধুই স্বপ্ন সবটাই কেবল একটা ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন!
সে চাদরটা সরিয়ে ধীরে ধীরে পাশে তাকায়, কিন্তু বিছানার পাশটা খালি।
আনায়ার দৃষ্টি ছুটে যায় ঘরের চারদিকে। নিঃসঙ্গ শূন্যতা যেন হঠাৎ আরও বেশি ভারি হয়ে উঠেছে।
কোথাও জেভিয়ারের ছায়াও নেই। আনায়া ভাবে জেভিয়ার হয়ত কোনো কাজে বেরিয়েছে দ্রুতই চলে আসবে। এই ভেবেই আনায়া বিছানা থেকে নামতে যায়
ঠিক তখনই হঠাৎ সে নিজেকে দেখে থমকে যায় তার শরীরে কিছুই নেই। পুরো নগ্ন অবস্থায় চাদরের নিচে ছিলো সে।
তার চোখের পাতা লজ্জায় কিছুটা ভারী হয়ে পড়ে। ঠোঁট কামড়ে নিচু হয়ে পড়ে। মনে পড়ে যায় গত রাতের প্রতিটা মুহূর্ত, প্রতিটা স্পর্শ, জেভিয়ারের গলার ঘন গভীর আওয়াজ, চোখের সেই উগ্র গভীরতা আর নিজেকে হারিয়ে ফেলার মতো যে অনুভূতিটা তাকে একেবারে নিংড়ে দিয়েছিলো।
তার মুখটা একেবারে লাল হয়ে যায়। আনায়া মাথা নাড়তে নাড়তে উঠে পড়ে, বেডের পাশে রাখা নিজের ড্রেসটা পরে নেয়, ফ্রেশ হয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। চোখের নিচে হালকা ফোলাভাব, চুলগুলো এলোমেলো। তবে তবুও তার মুখে একধরনের কোমল শান্তি, একটা নিভৃত কোমল লজ্জা।
সে কিচেনে গিয়ে হালকা নাস্তা করে নেয় ব্রেড, বাটার আর একটা আপেল যেইগুলা জেভিয়ারই রেডি করে রেখে গিয়েছিলো তার জন্য। এরপর নিজের ছোট্ট কাজের ডেস্কে গিয়ে বসে পড়ে।

অনেকদিন ধরেই সে নিজের লেখালেখির দিকটা অবহেলা করেছে। আজ হঠাৎ মনে হলো, ভেতরের কষ্টগুলোকে, অনুভূতিগুলোকে, কথাগুলোকে আবার কীবোর্ডে মেলে ধরা দরকার। এইখানে আশার কিছুদিন পরই জেভিয়ার তাকে একটা ল্যাপটপ কিনে দিয়েছিলো তার লেখালেখি করার জন্য।
মনটা আজ হালকা, একটা অদ্ভুত ফুরফুরে ভাব। তাই সে মুগ্ধ হয়ে বসে পড়ে ল্যাপটপ খুলে। তার আঙুল কীবোর্ডে ছুটে চলে, একের পর এক শব্দ, বাক্য, আবেগ যেন আবার সে তার পুরনো পৃথিবীতে ফিরে যাচ্ছে।
ঠিক তখনই বাড়ির কলিং বেলটা হঠাৎই বাজে উঠে। আনায়ার আঙুল থেমে যায় কীবোর্ডে। চোখটা ছুটে যায় দরজার দিকে। সে একটু অবাক হয়। এই সময়ে কে এলো?
আনায়া ভাবলো হয়ত জেভিয়ার চলে এসেছে তাই দ্রুত গিয়ে দরজা খুলে দেয়। কিন্তু দরজা খোলার সাথে সাথে সে যেন আরেকদফায় অবাক হয়ে যায়। তার সামনে এক অপরুপ সৌন্দর্যের অধিকারী এক নারীমূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটা আনায়াকে পা থেকে মাথা অবধি চোখ বুলিয়ে হালকা হেসে বলল,

— হাই, আমি ইলোরা, জেভিয়ার এর বন্ধু। তুমি নিশ্চয়ই আনায়া?
আনায়া হালকা মুচকি হাসল।
— হ্যাঁ, আমি আনায়া।
সে দরজাটা পুরোপুরি খুলে দিয়ে একপাশে সরে দাঁড়াল।
— ভেতরে আসুন না প্লিজ।
ইলোরা তার লম্বা, নিখুঁত শরীরটা নিয়ে ধীরে ধীরে ঘরের ভেতর ঢুকল।আনারসের মতো তীব্র ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে তার শরীর থেকে। সে বুক সোজা করে ডানদিকের সোফায় বসল, যেন ঘরের প্রতিটা কোণ আগে থেকেই চেনে।
আনায়া একটু জড়সড় ভঙ্গিতে বলল,
— আপনি বসুন, আমি কিছু বানিয়ে আনছি..
কিন্তু তার কথা শেষ হওয়ার আগেই ইলোরার ঠোঁটে খেলল বিষাক্ত হাসি।
সে আড় চোখে আনায়ার গায়ের পোশাক দেখে আবার সেই তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল—
— তুমি তো দেখছি পুরো বাড়িটার পাশাপাশি বাড়ির মালিককেও নিজের করে নিয়েছো অতি দ্রুত।
আনায়ার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। সে থমকে দাঁড়াল।

— জি?
তার গলা কেঁপে উঠল, ভ্রু কুঁচকে তাকাল। সে সত্যিই বুঝতে পারছে না, মেয়েটা কী বলতে চাইছে।
ইলোরা তখন চোখ সরিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,
— কিছু না। তোমার সাথে গল্প করতে এলাম। কিছু করতে হবে না আমার জন্য। তোমার কথা অনেক শুনেছি, ভাবলাম একবার দেখা করি। একটু আড্ডা হোক, তাই না?”
সে আবার আনায়ার দিকে তাকাল। তাকে বসার ইঙ্গিত দিল। আনায়া ধীরে ধীরে গিয়ে তার উল্টোদিকে সোফায় বসল। সে বোঝার চেষ্টা করছিল এই মেয়েটা আসলে কী চায়।
অ্যাশ ঠোঁটে এক ধরনের মেকি কোমলতা এনে বলল—
— জেভিয়ারকে কীভাবে চেনো তুমি?
আনায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শান্ত স্বরে বলল,
— চেনার সুযোগই তো পাইনি। তবে প্রথম দেখা হয়েছিল নানু আপার পুরোনো বাড়িতে।
সে থেমে গেল। কিছু কথা নিজেদের ব্যক্তিগত রাখাই ভালো।
অ্যাশ হঠাৎ একটু সামনে ঝুঁকে এসে প্রশ্ন করল,
— আমাকে চেনো তুমি?
আনায়া মাথা নেড়ে বলল,
— না, আপনার কথা কখনো শুনিনি আমি।
এই প্রথমবার ইলোরার চোখে একদম খোলা ঈর্ষা ঝলকে উঠল। সে হাসল, কিন্তু সেই হাসিতে অদ্ভুত শীতলতা।
— আমি জেভিয়ারের এক্স গার্লফ্রেন্ড। তুমি জানো তো,
আমার আর ওর সম্পর্কটা খুব গভীর ছিল। আমরা অনেক ক্লোজ ছিলাম একে অপরের সাথে।

একটি পুরাতন বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে জেভিয়ার। গায়ে কালো হুডি, মুখে মাস্ক এবং মাথা হুডির টুপি দিয়ে ঢেকে রাখা কানে ব্লুটুথ চেপে কারও সাথে কথা বলছে।
— বস, আমি শুধু এক ঘণ্টা ক্যামেরা গুলো কে হ্যাক করে নিজের কন্ট্রোলে রাখতে পারবো। এরপর অটোমেটিক সিস্টেম সব আগের মত হয়ে যাবে। আপনার কাছে মাত্র ১ ঘণ্টা সময় আছে। এর মাঝেই যা করার সব করতে হবে।
জেভিয়ার হালকা বাকা হেসে বলল,
— এইটা তো অনেক সময়। আই নিড জাস্ট অনলি ফিফটিন মিনিটস। তুমি শুধু আমাকে আপডেট জানাবে বাকিটা আমি সামলে নিবো।
এই বলেই জেভিয়ার বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে।
জেভিয়ার ধীরে ধীরে পুরনো ওই ধূসর বাড়িটার ভেতরে প্রবেশ করে। তার পা ফেলার শব্দ নেই, নিঃশব্দ হবার ট্রেনিং সে বহু আগেই নিয়েছে।
দেয়ালে টাঙানো একটা ভাঙাচোরা আয়নার সামনে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে থেমে যায় একটা দরজার সামনে। দরজাটা আধা খোলা। ভেতর থেকে হালকা গলায় কিছু হাসাহাসির শব্দ আসছে। সে একবার নিঃশ্বাস নিয়ে ধীরে মাথাটা সামান্য ঢুকিয়ে দেখে।
সেই মুহূর্তেই তার চোখ দুটো নড়েচড়ে ওঠে।
ঘরটা মাঝারি সাইজের, চারদিকে ময়লা মেঝে আর ভাঙা আসবাব। কিন্তু সবচেয়ে কষ্টকর দৃশ্যটা ছিল মাঝখানে দাঁড়ানো ১০-১২টা কিশোরী মেয়ে সবার বয়স ১৫-১৬ এর মধ্যে। তাদের চোখে ভয়ের ছায়া, চুল এলোমেলো, হাত বাঁধা কেউ কাঁদছে, কেউ কেবল তাকিয়ে আছে ফাঁকা চোখে।
চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে নয়জন সশস্ত্র পুরুষ। তাদের হাতে গান, চোখে শিকারির হিংস্রতা।
জেভিয়ার চোখ বুলিয়ে নেয় ঘরটার গঠন, জানালা কোথায়, দেয়ালের কোন অংশ দুর্বল, আর কোন জায়গায় কিছু রাখার সুযোগ আছে। ডানদিকে কোণার দিকে একটা কাঠের টেবিল রাখা সেখানে চা, সিগারেট আর কিছু মোবাইল ছড়ানো।

জেভিয়ারের চোখ আটকে গেল মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে থাকা তিনজন গার্ডের ওপর। এরা খুব কাছে দাঁড়িয়ে, কথা বলছে। যদি এখন একসাথে তিনজনকে সরানো যায়, তাহলে ঘরটার কন্ট্রোল মুহূর্তের জন্য তার হাতে চলে আসবে। কিন্তু এরপরই বাকি ৬ জন যে ভয়ংকর প্রতিক্রিয়া দেখাবে। আর সবচেয়ে বড় ভয় মেয়েগুলোর যদি কেউ গুলির মাঝে এসে পড়ে?
জেভিয়ার নিজে নিজে পুরো খেলা টা আগে সাজালো। সামনে ৩ জন লোককে মারার পর বাকি ৬ জন তার ওপর অ্যাটাক করবে। তাই তাদের মারার পর জেভিয়ার এর হাতে সময় থাকবে ২.৭ সেকেন্ড। কারণ লোকগূলোর গান লোড করতে আর নিশানা ফিক্সড করতে এই সময় টুকু লাগবে। এর মাঝেই জেভিয়ার এর টেবিলের পেছনে চলে যেতে হবে।
জেভিয়ার ধীরে ধীরে পকেট থেকে সাইলেন্সার লাগানো গানটা বের করল। তার হৃদস্পন্দন ধীরে ধীরে কমে আসছে। সে ভয় পায় না নিজেকে নিয়ে নয়। কিন্তু ওই ছোট ছোট মেয়েগুলোর যদি ক্ষতি হয়ে যায়?
সে ঠোঁট কামড়ে ঘড়ির দিকে তাকাল।
তিনটা নিঃশব্দ গুলি বাতাসে ছুটে গেল।
মুহূর্তেই তিনটি দেহ শব্দ না করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।

জেভিয়ার মেঝের দিকে স্লাইড করে ডানদিকের টেবিলের পেছনে আশ্রয় নিল। ঘরের ভেতর চিৎকার শুরু হয়ে গেল। বাকি ছয়জন গার্ডরা তীব্র রাগে, বিভ্রান্তিতে গুলি। ছোঁড়ে কিন্তু তারা বুঝতে পারে না কারা আক্রমণ করল।
মেয়েগুলোর চোখে আশার আলোর একটা ক্ষীণ ঝলক দেখা গেল।
টেবিলের আড়ালে আশ্রয় নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুরো ঘরটা কেঁপে উঠল গুলির আওয়াজে। বাকি ছয়জন গার্ড ভয় আর রাগে জর্জরিত হয়ে এলোপাথাড়ি গুলি ছুঁড়তে শুরু করল জেভিয়ারের দিকে। কিন্তু জেভিয়ার স্থির। ঠান্ডা। নিঃশব্দ।সে দেরি করে না। সামনের কাঠের টেবিলটা এক ঝটকায় কাত করে নেয় নিজের সামনে, ঢাল বানিয়ে নেয় নিজের শরীরের জন্য। কাঠে গুলির পর গুলি এসে বিদ্ধ হতে থাকে। কিন্তু জেভিয়ার জানে না কতটা সময় সে এখান থেকে কভার পাবে।
সে টেবিলের আড়াল থেকে হাফ-বডি ঘুরিয়ে একের পর এক গুলি ছোঁড়ে।
একসময় ঘরের বাতাস ভরে যায় বারুদের গন্ধে, আতঙ্কে কাঁপতে থাকা কিশোরী মেয়েগুলোর চোখে চোখ রেখে সে অন্ধকারের ভেতর ছায়ার মতো নড়ে চলে।

জেভিয়ার একে একে সবাইকে গুলি করে ফেলতে থাকে।
এখন বাকি একজন। সে বুঝে গেছে এই লোকটা কোনো সাধারণ মানুষ নয়। সে আতঙ্কে পজিশন চেঞ্জ করে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়ায়, এবং গুলি ছুঁড়তে গিয়েই দেখে তার বন্দুক ফাঁকা!
ঠিক তখনই জেভিয়ার দৌড়ে টেবিলের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে।
সে পজিশন বদলে গুলি ছোঁড়ে একেবারে নিখুঁতভাবে
একটা গুলি গার্ডের ডান হাতে। আরেকটা গুলি তার বাম হাঁটুতে। চিৎকার করে পড়ে যায় সে। তার হাতে থাকা বন্দুকটা ছিটকে গিয়ে পড়ে মেঝেতে।
পুরো ঘর জুড়ে তখন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। শুধু মেয়েগুলোর কাঁপা নিঃশ্বাস আর আহত গার্ডের গোঙানির শব্দ ভেসে আসে।
জেভিয়ার ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় তার দিকে। তার পায়ের চলার ছন্দ যেন মৃত্যু নিয়ে এগিয়ে আসছে।
ভয়ার্ত সেই আহত লোকটার চোখ বড় বড় হয়ে যায়—
—ত…তুই কে…? কার জন্য এইসব কাজ করছিস?
জেভিয়ার কোনো উত্তর দেয় না।
সে খুব ঠান্ডা কণ্ঠে নিজের ব্লুটুথে বলে উঠে—

—অ্যালেক্স… ইমিডিয়েটলি পুলিশ ইনফর্ম করো। লোকেশন এক্টিভেটেড। রিকভারি টিমও পাঠাও, আর মেডিকেল ইউনিট নিশ্চিত করো। মেয়েগুলোকে সিকিউর করতে হবে এদের জীবনের এক ইঞ্চিও আর ঝুঁকিতে যাবে না।
ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর আসে,
— ওকে পুলিশ ট্র্যাক ওপেন। ইউনিট ইনফর্মড। দশ মিনিটের মধ্যে লোকেশন হিট হবে।
জেভিয়ার তখন হাঁপাতে হাঁপাতে আশেপাশে চোখ বুলিয়ে নেয়। তবুও তার দৃষ্টি কেবল মেয়েগুলোর মুখের দিকে
ভয়ে জমে থাকা চোখ, কাঁপতে থাকা হাত, বাঁচার চিৎকার সবকিছুর মাঝেও এক ধরনের শান্তি ফিরে আসে তার চোখে।
ব্লুটুথে শেষ কথাটা বলেই অ্যালেক্স দ্রুত লাইনটা কেটে দেয়। তার চোখ মনিটরের স্ক্রিনে নিবদ্ধ। দ্রুত কিছু কী-বোর্ড কমান্ড দিয়ে লোকেশন, সিসিটিভি ফুটেজ, ইনফো সব ইনক্রিপ্টেড ফর্মে পুলিশের স্পেশাল ইউনিটকে পাঠিয়ে দেয়। তার ঠোঁটে হালকা এক গর্বের হাসি।
অ্যালেক্স,জেভিয়ারের সবচেয়ে বিশ্বস্ত শিষ্য। একসময় রাস্তার এক সাধারণ ছেলে ছিল, কিন্তু জেভিয়ারের হ্যাকিং স্কিলের ছায়ায় বেড়ে উঠেছে এক ভয়ংকর সাইবার জিনিয়াসে। তারা জানে এই মিশনে ভুল মানেই মৃত্যু। কিন্তু যখন গুরু হল জেভিয়ার, তখন ভয় শব্দটা অভিধানে থাকে না।
ঘরের মধ্যে তখন ধোঁয়া আর বারুদের গন্ধে বাতাস ভারী।
মেয়েগুলোর চোখে এখনও ভয় জমে আছে।
তারা দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে, কাঁপতে কাঁপতে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আছে।
জেভিয়ার ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে যায়।
তার পা পড়ে ধীরে, কিন্তু শব্দ যেন মেঝে ফাটিয়ে দেয়।
একটা মেয়ে ফিসফিস করে কাঁদতে কাঁদতে বলে ওঠে,

— প্লিজ আমাদের মারবেন না প্লিজ।
— আপনিও কি ওদের মত?
— আমরা আর কিছু করব না, দয়া করে মারবেন না।
একসাথে কয়েকটা ভয়ভীত সুরে বেরিয়ে আসে সেই কথা। জেভিয়ার থেমে দাঁড়ায়। তার চোখে গভীর ছায়া, ঠোঁটে নিস্তব্ধ এক অভিব্যক্তি।
গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দেয়—
— মারতে হলে এত ঝুঁকি নিয়ে আসতাম না।
একটু থেমে বলে,
— তোমাদের বাড়িতে পাঠানোর ব্যবস্থা করছি। নিরাপদ জায়গায়। ভয় পেও না। এখন থেকে কেউ আর তোমাদের গায়ে হাত দিতে পারবে না।
তার গলায় এমন এক নিশ্চয়তার ছোঁয়া ছিল, যা এই মেয়েরা বহুদিন শুনে নি। কয়েকটা মেয়ে হালকা কেঁদে ফেলে। কেউ কেউ বিশ্বাস করতে পারে না।
এদিকে মেঝেতে পড়ে কাতরাচ্ছে সেই গুলিবিদ্ধ লোকটা,
ডান হাতে গুলি, বাম পায়ে গুলি। রক্ত গড়িয়ে মেঝে লাল হয়ে গেছে। জেভিয়ার হেঁটে গিয়ে তার কলার চেপে ধরে এক ঝটকায় তাকে টেনে তুলে। লোকটা যন্ত্রণায় কঁকিয়ে ওঠে। জেভিয়ার সরাসরি তার চোখে তাকায়। শীতলতা আর বিদ্রূপে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,

— তুইই চার্লি… তাই না?
লোকটা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে মাথা নাড়ে।
জেভিয়ার তার মুখের সামনে মুখ এনে ধীরে বলে,
— বহুদিন ধরে তোকে খুঁজছি।
একটা শ্বাস নিয়ে চোখ ছোট করে দেখে,
— শেষমেশ পেলাম তাহলে।
চার্লির চোখে তখন একসাথে আতঙ্ক, অনুশোচনা, আর অদ্ভুত এক অন্ধকার ছায়া। জেভিয়ার ঠোঁটে এক ভয়ংকর বাকা হাসি ফুটিয়ে বলে,
— ভয় পাস না তোকে এখন কিছু করবো না।
তার গলায় কোনো রাগ নেই, চিৎকার নেই, কিন্তু সেই নির্লিপ্ত বিষের মতো ঠান্ডা কণ্ঠে ভয় আর মৃত্যুর ঘ্রাণ মিশে যায়।
চার্লির কলার ধরে টানতে টানতে সে যখন পেছনের দিকে ঘুরতে যাবে, ঠিক তখনই নীরবতায় ভেসে আসে এক কাঁচা কণ্ঠ। একটা কোমল, ক্ষীণ কিন্তু স্পষ্ট কণ্ঠস্বর,

— আপনি আমাদের কেন বাঁচালেন?
জেভিয়ারের পা থেমে যায়। সে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায়। চোখ চলে যায় সেই কণ্ঠের উৎসের দিকে।
সামনের মেয়েটা বাকিদের থেকে একটু আলাদা। বয়স খুব বেশি হলে পনেরো।
হালকা উষ্কখুষ্ক চুল, যেন কিছুতেই সামলে রাখা যায় না।
চুলে হালকা হলদে আভা, এমন এক অদ্ভুত সোনালি বাদামি রঙ, যেন রোদ মাখানো শুকনো পাতার মতো।
চোখে ভয় নেই আছে শুধু অজস্র প্রশ্ন।
জেভিয়ার এর চোখ আটকে যায় মেয়েটার চোখে। এক মুহূর্তে সেই চোখ দুটো মিলিয়ে যায় আরেকজনে চোখের সাথে।
তার লাভ বার্ড।
ঠিক এমনই তো তার চোখ তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি খেলে যায়, অনেকটা অচেতনে।
জবাবে সে শুধু বলে—

— এইটাই আমার ডিউটি।
একটা ছোট্ট কিন্তু নিঃসঙ্গ স্বর।
মেয়েটা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে জেভিয়ারের দিকে, যেন বোঝার চেষ্টা করছেএই মানুষটা কে? কী এমন আছে তার ভেতরে?
কিন্তু জেভিয়ার তখন অন্য এক জগতের ঘোরে ঢুকে গেছে।
তার বুকের বাঁ পাশ ভারি হয়ে উঠছে। একটা মুখ, একটা হাসি, সবকিছু একসাথে তার স্মৃতিতে ভেসে উঠছে।
তার লাভ বার্ড এখন কী করছে?
সে চোখ বন্ধ করে একটা শ্বাস নেয়।
তার হাতের মুঠো শক্ত হয়ে আসে। চোখে ফিরে আসে দৃঢ়তা।
সে চার্লিকে আবার টেনে ধরে।
সাথে সাথেই ব্লুটুথে বলে—
— অ্যালেক্স, মেয়েগুলাকে ফাস্ট ট্র্যাক রেস্কিউ টিমের হাতে তুলে দাও। মিডিয়া যেন টের না পায়। আমি বের হচ্ছি। এখনই।

দেয়ালের ঘড়ির কাঁটা যেন থেমে গেছে। বাতাসে হালকা একটা চাপা ভার, যেটা শব্দহীন হয়েও হৃদয়ের গভীর কোণ চেপে ধরে।
আনায়া নিঃশব্দে বসে আছে সোফায়। এক হাতে একটা কুশন বুকের সাথে চেপে ধরেছে, আর অন্য হাতে নিজের আঙুল ঘুরিয়ে যাচ্ছে বারবার। চোখ দুটো থমথমে, ঠোঁটদুটো শক্ত করে চেপে রাখা।
ইলোরার বলা কথাগুলো ঠিক মাথার মধ্যে বাজছে—
“আমি জেভিয়ারের এক্স গার্লফ্রেন্ড। আমাদের সম্পর্কটা খুব গভীর ছিল আমরা অনেক ক্লোজ ছিলাম একে অপরের সাথে।”
সেই প্রতিটি শব্দ যেন কাচ ভাঙার মতো চিড় ধরাচ্ছে আনায়ার আত্মবিশ্বাসে। সে চুপচাপ চোখ বন্ধ করে বসে থাকে কিছুক্ষণ। কিন্তু মাথার মধ্যে চিন্তা একটার পর একটা ধাক্কা দেয়—
তাহলে জেভিয়ার আমাকে যেভাবে ছুয়েছে সেইভাবে সেই মেয়েটিকেও ছুয়েছে?
সেই চোখের গভীরতা, সেই ঠোঁটের উষ্ণতা শুধু আমার জন্য ছিলো না? ও কি তাহলে আমাকে শুধু একটা সময়ের ভালো লাগা হিসেবে দেখেছে?

তার বুকটা হঠাৎ ভার হয়ে ওঠে। শ্বাস নিতেই কষ্ট হয়। গলার কাছটা জ্বালা করে, কান্নাটা আটকে আছে
একটা নিঃশব্দ আর্তনাদ, যেটা গলা দিয়ে বেরোতে চাইছে কিন্তু মানসিক শক্তির ভারে আটকে আছে।
সে নিজের দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলে। হঠাৎ তার মনে হয়, জেভিয়ার তাকে ঠকিয়েছে। কী এমন ছিলো তার চোখে, তার শরীরে, তার ছোঁয়ায় যেটা আলাদা ছিলো ইলোরার থেকে?
ঠিক তখনই বাইরের দিক থেকে এক গাড়ির ব্রেক চাপার শব্দ ভেসে আসে। আনায়া একটু চমকে উঠে। সে জানে,এই শব্দটা সে চিনে, জেভিয়ারের গাড়ি।
আনায়া ধীরে ধীরে উঠে জানালার দিকে এগিয়ে যায়। বুকটা ধুকধুক করছে। একটা ক্ষীণ আশা হয়তো সে ফিরে এসে সব বুঝিয়ে বলবে। হয়তো সবটাই একটা ভুল বোঝাবুঝি।
কিন্তু জানালার পর্দাটা সরাতেই তার যেন তার শ্বাস আটকে দেয়। জেভিয়ারের গাড়ি থেমেছে। দরজা খুলেই সে বেরিয়েছে আর ঠিক তখনই ইলোরা ছুটে গিয়ে জেভিয়ারের বুকের মধ্যে মুখ গুজে জড়িয়ে ধরে ফেলে তাকে।
না, কোনো দ্বিধা নেই। অ্যাশলির চোখে জল নেই। মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। আর জেভিয়ার তাকে একবারেও ঠেলে দেয় না। ঠান্ডাভাবে দাঁড়িয়ে থাকে, তাকিয়ে থাকে অইলোরার মাথার ওপর।
এই দৃশ্যটাই ভেঙে চুরমার করে দেয় আনায়ার পৃথিবী।

তার বুকটা হুহু করে ওঠে, কান্না চেপে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। চোখের কোণে জল জমে ওঠে।
সে জানালার পাশ থেকে সরে আসে। দেয়ালের পাশে ঠেস দিয়ে দাঁড়ায়, আর হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে রাখে, যেন কোনোক্রমেই সেই আর্তনাদ বেরিয়ে না আসে।
সে ধীরে ধীরে বসে পড়ে মেঝেতে। কাঁধ কাঁপতে থাকে।
চোখ থেকে কান্না গড়িয়ে পড়ে নিঃশব্দে।
এমন কান্না, যার শব্দ নেই, কিন্তু ব্যথা সমস্ত দেহজুড়ে বাজে।
অভিমানে, দুঃখে, অবিশ্বাসে আনায়া একটাই অনুভব করে সে ভেঙে গেছে।
জেভিয়ার যেন বুঝে উঠতে পারে না কি হলো তার সাথে। যখনই সে বুঝতে পারে সে এক ধাক্কায় অ্যাশলি কে সরিয়ে দিয়ে নিজের পোশাক ঝাড়তে থাকে বিরক্তিতে ভ্রু কুচকে। অ্যাশলি আবার জেভিয়ার এর কাছে গিয়ে গলা জড়িয়ে ধরে বলে,

— এমন করছো কেন জেভি?
জেভিয়ার ঝাড়া দিয়ে অ্যাশলির হাত ফেলে দিলে অ্যাশলির গাল চেপে ধরে বলে,
— এইখানে আসার কারণ কি?
অ্যাশলি হাসতে হাসতে বলে,
— তোমার আনায়াকে কে দেখতে এসেছিলাম। দেখা শেষ এখন তাই চলেই যাচ্ছিলাম আর তোমাকে দেখে নিজের উত্তেজনা টা ধরে রাখতে পারিনি।
জেভিয়ার রেগে দাত কিড়মিড় করে বলে,
— আমার লাভ বার্ড যদি তোর জন্য একটুও হার্ট হয় বা তুই ইচ্ছা করে হার্ট করে থাকিস। তোকে টুকরো টুকরো করে আমার পোষা কুকুর কে খাইয়ে দিবো। মাইন্ড ইট।
ইলোরা রাগে চেচিয়ে বলে ওঠে,
— কি আছে সেই আনায়ার মাঝে যা তুমি আমার মাঝে দেখতে পারছো না? আমি কি হট না? আমার কি ফিগার ভালো না? আমি তোমাকে ওই মেয়ের চেয়েও বেশি শান্তি দিতে পারবো।
জেভিয়ার হিংস্র বাঘের মত গর্জন করে বলে,
— স্টপ ইউর ফা*কিং মাউথ। আমার লাভ বার্ড আমার হৃদয়ের রাজ্যের একমাত্র রাণী। সে আমার অন্ধকার পৃথিবীর একমাত্র আলো। তোর শরীর আমার ক্ষুধা জাগায় না। কিন্তু ওর নিরব উপস্থিতি আমার রক্তে আগুন ধরিয়ে দেয়।
আমার অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা একমাত্র তার কাছেই মেটে।
সে আমার নরকীয় জীবনে এক স্বর্গীয় সুখ।

আনায়া বিছানায় মুখ গুজে ফুপিয়ে চলেছে। পরপর হিচকি তুলেই চলেছে। হঠাৎ সে তার ঘাড়ে ঠান্ডা স্পর্শ অনুভব করে। আনায়া ফট করে উঠে বসে দেখে জেভিয়ার তার দিকেই ঝুকে আছে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে। আনায়া কিছু বলার আগেই জেভিয়ার বলল,
— ইলোরা কি বলেছে তোমায়?
আনায়া নিজেকে শক্ত দেখানোর ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে কাপাকাপা গলায় বলে যা সত্যি তাই-ই বলেছে। কেনো এখন তোমার সমস্যা হবে নাকি আমিও চলে যাবো বলে?
— চলে যাবে মানে? কোথায় যাবে তুমি?

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ১০

— তোমাকে ছেড়ে আমি চলে যাবো জেভিয়ার তোমার মত জঘন্য পশুর সাথে আমি থাকতে পারবো না। আমার নিজের প্রতি আমার ঘেন্না হচ্ছে এখন কেন আমি তোমাকে আমার শরীরে স্পর্শ করতে দিয়েছি।
জেভিয়ার চোখ বন্ধ করে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে তবে আনায়ার একেকটা কথা তার গা জ্বালিয়ে দিচ্ছে। তার লাভ বার্ড তাকে বিশ্বাস করছে না? তাকে ছেড়ে চলে যেতে চাইছে?
আনায়া আবারও বলতে যাবে তার আগেই জেভিয়ার তার মুখ শক্ত করে চেপে ধরে বলে,
— শা’ট আপ, লাভ বার্ড। এখন আর একবার ছেড়ে যাওয়ার কথা বললে তুমি কঠিন একটা পানিশমেন্ট পাবে আই সোয়্যার…………

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ১২