Home অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ১৫

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ১৫

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ১৫
শ্রাবণী ইয়াসমিন

[মস্কো, রাশিয়া – সকাল ১০:৪৫ মিনিট | ]
রাশিয়ার রাজধানী মস্কো।
বাইরে হালকা তুষারপাত। আকাশে সূর্য উঠেছে ঠিকই, তবে তার আলো বরফে ঢেকে গেছে। মস্কোর কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল স্কাইস্ক্র্যাপারটার গায়ে সকালের আলো পড়েছে, যেন একটা সোনালি পর্দা গায়ে মেখে বসে আছে দানবাকার এক ভবন।
‘Drevan Corporation Headquarters’
রাশিয়ার অন্যতম বিলাসবহুল, প্রভাবশালী এবং প্রাচীন ব্যবসায়ী সাম্রাজ্যের নাম।
এই একটি কোম্পানির অধীনে আছে বিলিয়ন ডলারের রিয়েল এস্টেট, হোটেল চেইন, আন্ডারগ্রাউন্ড সিকিউরিটি নেটওয়ার্ক, মাইনিং এবং মাল্টি-পারপাস হেলথ এন্টারপ্রাইজ। শুধু রাশিয়াতেই নয়, লন্ডন, দুবাই, স্পেন, সুইডেন, কানাডা সহ ২৭টি দেশে আছে এদের শাখা। প্রতিটি শহরে আছে এমনই আকাশ ছোঁয়া বিল্ডিং, যেগুলোর গায়ে ঝুলে থাকে শক্তির ছাপ। ভয় আর শ্রদ্ধার মিশেল।

এইসব সাম্রাজ্যের কর্ণধার এখন একাকী বসে আছেন ২৪ তম তলার কোণার রুমে।
মিস্টার. জন ড্রেভান ।
বয়স ৬৫ ছুঁই ছুঁই, তবুও চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। তার রুমটাও যেন এক রহস্যময় জাদুঘর কাঠের পুরোনো বুকশেলফ, দেয়ালে হরেক দেশের ম্যাপ, আর পিছনের দেয়ালে ঝুলে থাকা রেড অ্যান্ড ব্ল্যাক লোগো—DREVAN GROUP।
তিনি বসে আছেন বিশাল কাঁচের জানালার পাশে, সামনে ফাইল খোলা, এক হাতে কফির কাপ, সামনে ল্যাপটপ এর স্ক্রীন জ্বলজ্বল করছে।
কেবিনের দরজা খুলে এক আত্মবিশ্বাসী পায়ের আওয়াজ ভেসে এল। কালো কোটে মোড়া, মাথায় হালকা রূপালি চুল, মুখে পরিপক্ব হাসি। লোকটি ঢুকেই বলল,
— হেই জন! হাও আর ইউ, ওল্ড ম্যান?
স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে চেয়ারের হ্যান্ডেলে হাত রেখে দাঁড়িয়ে পড়ল সে।
জন ড্রেভান মুখ তুলে তাকালেন। কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্থির। তারপর ঠোঁটের কোণে এক শান্ত হাসি ফুটে উঠল।

— লিও! ইউ এরোগেন্ট বা’স্টা’র্ড…. বেচে আছিস নাকি, হুম?
— বেচেও আছি, নেচে কুদেও বেরাচ্ছি।
হেসে উঠে নিজের মতো করে বসে পড়ল রুমের কোণার চেয়ারে। চোখে ছিল খেলার ছলে বন্ধুত্বের ছায়া।
কথার এক পর্যায়ে হঠাৎ Leo গলা নামিয়ে বলল,
— শুনলাম জেভিয়ার ফিরছে?
জন ড্রেভান চোখ নামিয়ে কিছুটা গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
— হুম। এইবার আসলেই ধরে বেধে আগে ওর বিয়েটা দিয়ে নিবো। বয়স তো আর কম হলো না ৩০ চলছে। ওর মত বয়সে আমি এক বাচ্চার বাপ হয়ে গিয়েছিলাম।
মিস্টার লিও হাসতে হাসতে বলেন,

— হ্যা হ্যা, তুই আবার অনেক ফাস্ট সব কাজেই।
— হয়েছে হয়েছে আর হাসতে হবে না পরে দেখা যাবে আমাকে বেয়াই বানানোর আগেই স্ট্রোক করে উপরে চলে গিয়েছিস। জেভিয়ার ফিরুক, ফিরলেই তোর মেয়েকে আমি আমার ঘরে তুলবো। তৈরি হয়ে থাক তুই।
হঠাৎই, কেবিনের দরজাটা এবার আরেকবার খুলল।
চুপচাপ, পরিপাটি, নিখুঁত আচরণে ঢুকল এক যুবক। বয়স বড়জোর ২৬-২৭, ধূসর স্যুট, হাতে কালো লেদারের ফাইল। চোখে পাতলা ফ্রেমের চশমা, মুখায়ব অনেকটা তীক্ষ্ণ তার বাবা জন ড্রেভেন এর মত। যে কেউ দেখলে একবারেই বলবে, বাপ কা বেটা।
এরিক্স ড্রেভান। জন ড্রেভানের ছোট ছেলে।
কেবিনে ঢুকেই সামনের কাঁচের টেবিলের ওপরে ফাইল রেখে বলল—
— গত রাতের সব ট্রান্সফার কম্পলিট। সব জায়গায় কনফার্মেশন চলে এসেছে। তিনটা ইউনিটই ডেলিভারি হয়ে গিয়েছে।
জন কফির কাপ হাতে তাকালেন।

— স্মুথ ছিল?
— সব ইউনিট পৌঁছেছে নির্ধারিত সময়ের আগে। নো ডিসরাপশন, নো ট্র‍্যাকিং।
এক সেকেন্ড থেমে, সে চোখ তুলে যোগ করে,
— সিকিউর চ্যানেলে টাকা ঢুকেছে সকাল ৬:৪২ এ। টোটাল প্রফিট হয়েছে ১২০ মিলিয়ন ডলার।
ইউনিট-১ থেকে: ৬০ মিলিয়ন ডলার
ইউনিট-২ থেকে: ২০.৮ মিলিয়ন ডলার
ইউনিট-৩ থেকে: ৩৯.২ মিলিয়ন ডলার
জন ঠোঁট চেপে কিছুক্ষণ চুপ রইল। তারপর ফাইল খুলে চেয়ে দেখলেন।
— নতুন স্টক রেডি হয়েছে?
— হুম কাজ চলছে ওইটার।
জন কিছুটা গম্ভীর সুরে বললেন,
— কোয়ালিটি খারাপ হলে কিন্তু চলবে না এরিক্স। লাস্ট ব্যাচ টা অনেক ডিস্টার্বফুল ছিলো।
এরিক্স নিঃশব্দে জবাব দেয়,
— এইবার একদম ইয়াং, আনট্রেসড, কম্পলিয়েন্ট ইউনিট সিলেক্ট করা হচ্ছে। কোনো স্ক্র‍্যাচ থাকবেনা।
একটা ঠাণ্ডা নিঃশ্বাস ফেললেন জন।
— আমার কাছে শুধু টাকাটা গুরুত্বপূর্ণ না, পরিষ্কার রেকর্ডও চাই।

৫ দিন পর~
দেখতেই দেখতে পাঁচ দিন কেটে গেছে।
আজ রাতে আনায়া এবং জেভিয়ার এর রাশিয়া যাওয়ার ফ্লাইট। এই কয়েক দিনে জেভিয়ারের আচরণ ছিল আশ্চর্যরকম স্বাভাবিক। কোনো রাগ, কোনো ধমক বা আগ্রাসী মনোভাব কিছুই না। যেন একেবারে পরিপাটি একজন মানুষ, যার মধ্যে হিংস্রতা বলে কিছু নেই। সব ঠিকঠাকই ছিল, বাহ্যিকভাবে।
কিন্তু যেদিন আনায়া প্রথম শুনেছিল যে রাশিয়া আসলে জেভিয়ারের স্থায়ী ঠিকানা, আর সেখানেই তার পরিবার- বাবা এবং ভাই থাকে, তখন যেন বুকের ভেতরটা ধাক্কা খেয়েছিল।
আনায়া জিজ্ঞেস করেছিলো,

— তুমি তো বলেছিলে তুমি এখানে থাকো?
— ব্যবসার কারণে থাকা হয়।
জেভিয়ার শান্তভাবে বলেছিল।
আনায়ার কাছে ব্যাপারটা অদ্ভুত লেগেছিল। এতদিন ধরে একসাথে থেকেও সে জানতো না জেভিয়ারের আসল পরিচয়। এমনকি তার বাবার পরিচয়ও আড়ালে ছিল। কেন?
জবাবে জেভিয়ার শুধু হালকা হেসে বলেছিল,
— সময় হলে সব জানবে, লাভ বার্ড। সব কথা একসাথে বললে বুঝবে না তুমি। কিছু সত্য সময় চায়।
জবাবটা ছিল ধোঁয়াটে, কিন্তু তার কণ্ঠে এমন এক নিশ্চয়তার ছায়া ছিল যা মুহূর্তের জন্য হলেও আনায়াকে স্থির করেছিল।
তবু, মনের গভীরে একটা প্রশ্ন থেকে গিয়েছিল—
— সে কী এমন লুকোচ্ছে যার জন্য সময় দরকার?

সন্ধ্যার নরম আলোটা যেন একটু বেশি চুপচাপ আজ।
আনায়া দাঁড়িয়ে আছে বিমানবন্দরের ভিআইপি টার্মিনালের সামনে। পাশেই জেভিয়ার, একদম গম্ভীর মুখে। চারপাশে ওর সিকিউরিটি টিম ব্যস্ত সবকিছু যেন নিখুঁতভাবে সাজানো। ব্যাগপত্র আগেই ঢুকে গেছে ভেতরে।
প্রাইভেট বিমানের ভেতরে ঢুকতেই ঠান্ডা পরিবেশ, মেঝেতে কার্পেট, বাতাসে হালকা পারফিউমের গন্ধ। আনায়া চারপাশে তাকিয়ে নিঃশব্দে হাঁটে। ভিআইপি লাউঞ্জটা যেন আনায়ার কাছে হোটেলের লবি মনে হলো – সোফা, ল্যাম্প, সাউন্ডপ্রুফ নিরবতা।
বিমানে ওঠার সময় কোনো ঝামেলা হয়নি।
ওদের সরাসরি নিয়ে যাওয়া হলো বিজনেস বোর্ডিং পয়েন্ট দিয়ে।
আনায়ার চোখ বড় হয়ে গেল বিমানের ভেতরটা দেখে।
বিলাসবহুল বলতে যা বোঝায়, একদম সেই।
প্রাইভেট কেবিনের মতো আলাদা সিট, কাঠের ফিনিশিং, বড় স্ক্রিন, সিট একদম ফ্ল্যাট করে বিছানা বানানো যায়।
বেডশিট, কম্বলের কাপড় এতটাই নরম যেন তুলো।
আর সিটে বসতেই যে খাবারের মেনু ধরিয়ে দিলো, সেটা দেখেই আনায়ার মাথা ঘুরে গেল সব ইনটারন্যাশনাল নাম, কিছু সে জীবনে শোনেওনি।

পাশের সিটে বসে জেভিয়ার এক হাতে সিটের রিমোট টিপছে, অন্য হাতে ফোন।
বিমান আকাশে উঠেছে তখন মাত্র কিছুক্ষণ। জানালার বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার, দূরে দূরে ছোট ছোট আলো মেঘের গায়ে ছায়ার মতো ভেসে আছে।
কিন্তু হঠাৎ করে বিমানের করিডোরে দুইজন মানুষের পায়ের শব্দ কানে এল। আনায়া ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
একজন লম্বা, হালকা চাপ দাড়িওয়ালা পুরুষ, কালো ক্যাজুয়াল ট্রাউজার আর হুডি পরা।
চেহারায় অদ্ভুত এক আত্মবিশ্বাস। আর তার পাশে যে মেয়েটিচেনা মুখ। খুব চেনা।
ইলোরা।
আনায়ার শরীরটা ঝটকা খেয়ে উঠল যেন। চোখ আটকে গেল ওর দিকেই। তার চোখে কিছু টা বিস্ময়।
অ্যালেক্স,জেভিয়ারের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় একবার তাকাল আনায়ার দিকে। তার চোখে কী যেন একধরনের বিশ্লেষণ ছিল। তবে কিছু না বলেই সে জেভিয়ারের কাঁধ ছুঁয়ে নিচু গলায় বলল,

— উই উইল বি আপ ফ্রন্ট।
জেভিয়ার কেবল একবার মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
অ্যালেক্স সামনে চলে গেলে ইলোরা কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল ওদের পাশে। তার চোখে সেই চিরচেনা বিদ্রূপ। আনায়ার দিকে তাকিয়ে হালকা তির্যক হাসি দিয়ে বলল,
— এই ভ্রমণটা বড্ডো মজার হতে চলেছে….তাই না, আনায়া?
এই বলেই সামনে চলে যায় ইলোরা।
আনায়া মুখ ঘুরিয়ে নিল। তার গলা শুকিয়ে গেছে যেন। বুকের ভিতর হঠাৎ চাপ ধরে এসেছে।
কিন্তু জেভিয়ার ইলোরার দিকে চোখ তুলে তাকানো তো দূরের কথা, যেন সে কারও অস্তিত্বই অনুভব করছে না।
ইলোরা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে, একটা ঠাণ্ডা হাসি দিয়ে চলে গেল সামনের দিকে।
আনায়া মাথা নিচু করে বসে রইল। তার বুকের মধ্যে এখন হাজারটা প্রশ্ন ছটফট করছে।
— সে এখানে কেন? ও আমাদের সাথে যাচ্ছে কেন?”

আনায়ার গলা শুকিয়ে গেছে। কিছু একটা বলতে চাচ্ছে, কিন্তু যেন শব্দরা তার ঠোঁটের কাছেই এসে থেমে যাচ্ছে।
কিছু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা করছিল, জেনে নিতে ইচ্ছা করছিল, “ইলোরা কেনো আসছে?”
কিন্তু হঠাৎ একটা দৃশ্য ঝাপটা মেরে ভেসে উঠল চোখের সামনে—
সেদিনের জড়িয়ে ধরা, জেভিয়ারের বুকের মধ্যে ওর মুখটা গুঁজে রাখা, তাকে ঘিরে থাকা সেই চাপা উষ্ণতা।
সবকিছু মিলেমিশে এক অদ্ভুত আবেশে মনটাকে এলোমেলো করে দিলো। চোখের পাতার নিচে যেন হঠাৎ কুয়াশা জমে গেল। দেখা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ঝাপসা
চোখে কিছু নেই, তবুও ভিজে যাচ্ছে দৃষ্টি। না চাইতেই এক ফোঁটা পানি পড়লো গাল বেয়ে।
আনায়া চুপচাপ বসে থাকল। তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, কিন্তু চোখটা গুমরে উঠছে।
পাশেই বসে আছে জেভিয়ার, ঠিক তার কয়েক ইঞ্চি দূরে। তার শরীরের উত্তাপ এখনো টের পাওয়া যাচ্ছে।
কিন্তু মনে হচ্ছে যেন তারা দুইজন দুই মহাদেশের মানুষ।
বড্ডো দূরে।

আকাশের বুক চিরে ওদের বিমান এগিয়ে চলেছে।
আর আনায়ার বুকের মধ্যে জমতে থাকা প্রশ্নেরা
তাদের উত্তর খুঁজে ফিরছে এক নির্জন মরুভূমির মতো নীরবতায়।
হঠাৎ করেই জেভিয়ার এক হাতে ওকে টেনে নিলো।
টানটা খুব বেশি জোরে ছিল না, কিন্তু এতটাই হঠাৎ যে আনায়ার শরীর হেলে গিয়ে তার বুকের ওপর গিয়ে ঠেকল। পরক্ষণেই সে নিজে কোলে বসিয়ে নিলো আনায়াকে।
আনায়া কাঁপা গলায় বলল না কিছুই। শুধু নিঃশ্বাস আটকে রইল বুকের কোথাও। জেভিয়ার ধীরে ধীরে কানে গোঁজা এয়ারপিসটা খুলে ফেলল। চোখ তুলে তাকাল আনায়ার চোখে। সেই চোখে এখনো পানি লেগে পাপড়িগুলো ভারি হয়ে আছে।
কিন্তু সে কিছু বলল না। না মুছল চোখের পানি , না থামালো ওর বিষণ্নতা।
বরং ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো আনায়ার ভেজা পাপড়িতে।
আনায়া একটুও নড়ল না। শরীরটা কেমন অবশ হয়ে আসছিল।
এরপর জেভিয়ার নিজের ফোন থেকে আরেকটা এয়ারপিস বের করে ওর কানে গুঁজে দিলো।
চোখ নামিয়ে ইশারা করল ফোনের স্ক্রিনের দিকে।

— দেখো…
আনায়া ধীরে ধীরে নিচে তাকাল।
ফোনের স্ক্রিনে তখন ভাসছে “365 Days: This Day” সিনেমার একটা সোজাসাপ্টা বেডরুম সিন। আনায়া কিছুটা লজ্জা মিশ্রিত কন্ঠে বলল,
— ছিহ্ তুমি এইসব দেখো? লজ্জা লাগে তোমার এইসব দেখতে?
— প্র‍্যাক্টিকালি করতেই যখন লজ্জা লাগেনা, তখন দেখতে কি লজ্জা পাওয়ার কথা?
জেভিয়ার সোজাসাপ্টা উত্তর করল।
আনায়া একবার তাকাল ফোনের স্ক্রিনে তেমন কিছু বোঝা যাচ্ছে না, শুধু পর্দায় দৃষ্টি আটকে আছে।
অদ্ভুত একটা অস্বস্তি হচ্ছে তার।
কয়েক সেকেন্ড পর নিজে থেকেই চোখ নামিয়ে নিল সে।
শরীরটা সামান্য দূরে সরাতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে জেভিয়ারের দিকে তাকাতে গেল। কিন্তু চোখ আটকে গেল মাঝপথেই।
জেভিয়ারের গলার নিচে, স্পষ্টভাবে ফুলে থাকা এডামস অ্যাপেলটা দৃষ্টি কাড়ল।
আনায়ার দৃষ্টি আটকে গেল ওখানেই। ওর সবথেকে প্রিয় জিনিসগুলোর একটা। আনায়া হাতটা বাড়িয়ে দিল ছুঁতে,
তবে ছোঁয়ার আগেই, জেভিয়ারের শক্ত হাতে কবজি ধরা পড়ল।
সে ঝুঁকে এসে নিচু গলায় বলল,

— ডোন্ট টাচ ইট, লাভ বার্ড।
একটু থেমে ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে আবার বলল,
— পরে নিজেকে কন্ট্রোলে রাখতে পারবো না।
আনায়া তড়াক করে চোখ নামিয়ে ফেলল। মুখে লজ্জার লাল ছাপ স্পষ্ট। এইবার জেভিয়ার আর কিছু বলল না।
ফোনটা অফ করে সাইডে রেখে দিল। তারপর আনায়ার কোমরে দুইহাত রেখে নিজের দিকে ঘুরিয়ে আরও কাছে টেনে আনল।
আনায়া এবার পুরোপুরি ওর দিকে ঘুরে আছে,দুই পা এসে পড়েছে জেভিয়ারের দুই পাশে,একদম মুখোমুখি।
আনায়া জিভ দিয়ে নিজের ঠোঁট ভিজিয়ে একটা শুকনো ঢোক গিলে নিচের দিকে তাকায়, তার কেমন লজ্জা লাগছে এইখানে তাও এইভাবে বসতে জেভিয়ার এর কোলে।
জেভিয়ার আনায়ার ভেজা ঠোঁট জোড়া নিজের শুকনো হাতের আঙুল দিয়ে সফট ভাবে স্লাইড করতে করতে ফিসফিস করে বলে,

— আই নিড টু টেস্ট দিস, লাভ বার্ড। রাইট নাও।
সাথে সাথে জেভিয়ার আনায়ার ঠোঁট জোড়া আকড়ে ধরে। আনায়া জেভিয়ার এর শার্ট খামচে ধরে বুকের দিকে। প্রায় ৩/৪ মিনিট পর আনায়ার ঠোঁট ছেড়ে দেয় জেভিয়ার। তার চোখ গুলো লাল হয়ে আসছে। এই মেয়ে তার আশেপাশে থাকলেই নিজেকে কন্ট্রোলে রাখা কষ্টসাধ্য হয়ে যায়।
হঠাৎই জেভিয়ার সিটে মাথা হেলান দিয়ে আনায়ার দিকে তাকায়। এরপর আনায়ার বসার স্টাইল দেখে বাকা হেসে চোখ সরু করে বলে,
— নাইস পজিশন বেইবি। পারফেক্ট একদম।
আনায়া লজ্জায় মাথা নুইয়ে ফেলে। সে সরে যেতে চায় তবে জেভিয়ার তাকে শক্ত করে ধরে আছে। আচমকাই সেইখানে ইলোরা এসে উপস্থিত হয়। আনায়াকে জেভিয়ার এর কোলে এইভাবে বসে থাকতে দেখে তার চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। সে কিছুটা জোরে ডেকে ওঠে,
— জেভিয়ার….
ইলোরার কন্ঠ শুনে আনায়ার ভেতরে কিছুটা ক্রোধের জন্ম হয়। যার ফলে জেভিয়ার যখনই ইলোরার দিকে তাকাতে যাবে তখনই আনায়া জেভিয়ার এর দু গালে হাত দিয়ে ইলোরার সামনেই জেভিয়ার এর ঠোঁট এর সাথে নিজের ঠোঁট মেশায়। জেভিয়ার এতে কিছুটা অবাক হলেও সে কিছুটা আচঁ করতে পেরে মনে মনে হেসে সে আনায়াকে নিজের সাথে একদম মিশিয়ে নেয়।

ইলোরার রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছে। সে আরও এগিয়ে আসে। আর আনায়া ইলোরার উপস্থিতিতে সে যেন আরও নিজের জেদ প্রকাশ করতে থাকে।
সে হঠাৎ জেভিয়ারের ঠোঁটজোড়া নিজের ঠোঁটে চেপে ধরে আগের চেয়ে বেশি জেদে, বেশি অধিকারবোধে জোরে কামড়াতে থাকে। ঠোঁটের মাঝে শ্বাস আটকে আসে দুজনের। জেভিয়ার প্রথমে কিছুটা থমকে গেলেও পরমুহূর্তেই আনায়ার শরীরটা নিজের বুকের সঙ্গে এমনভাবে চেপে ধরে, যেন বাইরের কোনো কিছু তাদের আলাদা করতে পারবে না।
ইলোরা দাঁড়িয়ে থাকে অসহায়, অপমানিত, অগ্নিশর্মা।
আনায়া থমকে যায়। তার মুখে নোনতা স্বাদ আসছে কেন? চোখ বড় হয়ে আসে তার।
ওইটুকু কামড়ে এতটা রক্ত!
— আম.. আমি এতটা চাপ দিলাম নাকি?
তার চোখে কেবল বিস্ময়, একটু অপরাধবোধও হয়তো।

কিন্তু জেভিয়ার?
তার চোখে একটুও রাগ নেই।
বরং ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত বাকা হাসি।
রক্ত মুছে না ফেলেই, ভেজা ঠোঁট নিয়েই জেভিয়ার ধীরে ধীরে আনায়ার দিকে তাকায়। একেবারে গভীরভাবে।
আনায়ার দিকে তাকিয়ে জেভিয়ার এক আঙুল দিয়ে নিজের ঠোঁটের র’ক্ত মুছে নিয়ে বলে,
— লাভলি! সো মাচ ইন্ট্রেস্টিং। আই লাভ দিস জেলাসি।
এরপর থেকে রোম্যান্স এর সময় ইলোরা কে এনে দাড় করিয়ে রাখবো। যাতে এমন দু একটা হার্ড কিস তুমি নিজে থেকে আমাকে দাও।
আনায়া নিজের চোখদুটো খিচে ধরে রেখেছে। যেন চোখ বন্ধ করলেই সে মুহূর্তটা মুছে ফেলতে পারবে। যেন ইলোরার সামনে এমন কিছু করে ফেলা ওর মতো লাজুক, শান্ত একটা মেয়ের পক্ষে অসম্ভব ছিল।
সে নিজের ভেতরেই বারবার প্রশ্ন ছুঁড়ে মারছে,

– আমি… আমি এটা করলাম কীভাবে?
আর জেভিয়ার?
সে একটুও বিচলিত না হয়ে ধীরে ধীরে আনায়ার মুখ থেকে হাত সরিয়ে দেয়। এরপর কোনো কথা না বলে নিজের সিটটা একটু নামিয়ে একদম ফ্ল্যাট করে দেয়। যেন একটা ছোট্ট বেড।
তারপর একহাতে আনায়াকে টেনে ওই সিটের মাঝে বসিয়ে দেয় নিজের দিকে মুখ করে, বুকের সঙ্গে প্রায় লাগিয়ে।
আনায়ার মুখে তখনো লজ্জা, অস্বস্তি. কিন্তু জেভিয়ারের চোখে সেই একরোখা অধিকার আর রহস্যময় এক শান্ত তাপদাহ।
এইবার সে কেবিনের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা এয়ার হস্টেসের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলে,
— আই ওয়ান্ট প্রাইভেসি।
মেয়েটি বুঝতে পেরে সাথে সাথে জিভ কেটে কাঁধ নাড়িয়ে বলে,

— অস কোর্স, স্যার।
তখনই সে কাছে এসে ধীরে ধীরে চারপাশের বিলাসবহুল কেবিন ঘেরা শুরু করে দেয় একটা মোটা পর্দা টেনে দেয় পাশ ঘিরে, একটা লাইট ডিম করে দেয়, আর এক ধরণের সাউন্ডপ্রুফ সিস্টেমও চালু করে যেন বাইরের কোনো শব্দই ভেতরে না আসে।
চারপাশ এখন একদম নিস্তব্ধ।
এমনভাবে ঘেরা যেন এখন ওদের এই কেবিনটা একটা ছোট্ট ঘর শুধু ওদের দুজনের জন্য।
এয়ার হস্টেস চোখ নামিয়ে বিনয়ের সাথে বলে,
— ইফ ইউ নিড ইনিথিং, জাস্ট প্রেস দা বেল।
তারপর একটুও শব্দ না করে চলে যায়।
আনায়া টের পাচ্ছে, জেভিয়ার আবার কাছে আসছে।
তার নিঃশ্বাস গা ঘেঁষে লাগছে।
আনায়া চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলতে চায়, “আমি এতটুকু বাড়াবাড়ি করে ফেললাম?
কিন্তু জিভ যেন তালুতে আটকে গেছে।
জেভিয়ার এইবার তার চিবুকে হাত দিয়ে মুখটা উপরে তুলে নেয়।

— এটা আমার জন্য নতুন না, লাভ বার্ড। কিন্তু তোমার এই ভাঙচোরা ভাব, এই অপরাধবোধের ছায়া—এইটাই সবচেয়ে বেশি টানে আমাকে।
তার ঠোঁট আনায়ার কানের কাছে নেমে আসে।
— নাও আই গট মাই প্রাইভেসি। লেট’স সি হাও ফার মাই লাভ বার্ড ক্যান ফ্লাই টুনাইট।
আনায়া কেপে ওঠে। জেভিয়ার আনায়ার গলায় মুখ গুজে দেয়। আনায়া বড় বড় নিশ্বাস ফেলতে থাকে। জেভিয়ার বসে তার কোলে আনায়াকে বসায় সেই প্রথম স্টাইলে তার দু পাশে আনায়ার দু পা দিয়ে। জেভিয়ার আনায়ার কানের পিঠে চুল গুজে দিয়ে বলে,
— টেইক এভরিথিং অফ এন্ড গেট অন টপ অফ মি।
আনায়া চোখ বড় বড় করে ফেলে। জেভিয়ার আনায়ার গা থেকে নিজেই সব খুলতে থাকে। এরপর সে আনায়ার বুকে মুখ গুজে দিয়ে একটি বড় নিশ্বাস ফেলে। এরপর সে টান মেরে আনায়াকে আবার নিজের কোলে বসিয়ে নিয়ে আনায়ার মাঝে সে ডুবে যেতে থাকে। তবে আচমকাই আনায়া হালকা চিৎকার করে ওঠে,
— আহ্, জেভিয়ার কি করছো?
জেভিয়ার ভাবলেশহীন ভাবে হাস্কি স্বরে জবাব দেয়,
— নিউ পজিশন ট্রাই করছি বেইবি।
আনায়া জেভিয়ার কাধ খামচে ধরে। তার চোখের কোণে পানি জমছে তবে এর মাঝেও সে অদ্ভুত সুখ খুজে পাচ্ছে। এই পুরুষের কাছে শেষ হওয়ার মাঝেও অদ্ভুত এক শান্তি রয়েছে।

ঠিক দুপুরের দিকে টার সকলে রাশিয়ার বিশাল এয়ারপোর্টের বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের অপেক্ষাতে রয়েছে তিনটা বিলাশবহুল কালো রঙের গাড়ি। আশেপাশে অনেকেই তাদের দিকে চেয়ে আছে।
কারণ এইখানে এত মানুষের মাঝে দাড়িয়ে আছে দেশের অন্যতম সাকসেসফুল ইয়াং বিজনেসম্যান জেভিয়ার ড্রেভেন। যা তাদের সকলের কাছে বেশ পরিচিত চেহারা।
এরিক্স ড্রাইভিং সিটে বসে আছে এবং আড়চোখে বারবার পেছনে বসে থাকা আনায়ার দিকে তাকাচ্ছে আর বাকা হাসছে। জেভিয়ার গাড়িতে উঠে বসতে যাবে এমন সময় ইলোরার বাবা মিস্টার লিও জেভিয়ার কে ডেকে ওঠেন,
— জেভিয়ার! আমার গাড়িতে চলো, অনেক দিন পর দেখা হলো আর, এমনি তেও তোমার সাথে আমার খুবই ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে। গাড়িতে যেতে যেতে না হয় কথা হয়ে যেত।
জেভিয়ার অসম্মতি জানানোর আগেই এরিক্স গাড়ির জানালা দিয়ে মাথা বের করব বলে,

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ১৪

— হ্যা হ্যা আংকেল আপনি ঠিকই বলেছেন। এই ব্রো তুই বরং আংকেল এর সাথে যা আমি আনায়াকে নিয়ে যাচ্ছি। চিন্তা করিস না ব্রো।
জেভিয়ার তীর্যক চোখে তাকালো এরিক্স এর দিকে। তবে চেয়েও আর মানা করতে পারলো না। সে অ্যালেক্স কে আনায়ার গাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে সে ইলোরার বাবার গাড়িতে উঠে পড়ে।
গাড়ি চলতে শুরু করে। আনায়া তাকিয়ে আছে জেভিয়ার এর গাড়ির দিকে। সেই গাড়িতে ড্রাইভিং সিটের পাশে বসেছে ইলোরার বাবা এবং পেছনের সিটে বসে ইলোরা এবং জেভিয়ার। ইলোরা তার দিকেই তাকিয়ে উপহাসের হাসি হাসছে।
আনায়ার কেমন বুকে চিনচিনে ব্যাথা হচ্ছে। সে এখন বুঝতে পারছে ইলোরাও কেনো সাথে এসেছে। তবে তার এমন কেন লাগছে? যেন সে তার সব কিছু এই দেশের মাটিতেই হারাতে চলেছে।

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ১৬