Home অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ১৭

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ১৭

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ১৭
শ্রাবণী ইয়াসমিন

আনায়া আতংকিত চেহারায় ধীরে ধীরে তার মাথা পেছনে ঘুরিয়ে তাকাতেই সে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। অন্ধকারের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা একটামাত্র ছায়া তার মুখে শোকস্তব্ধ নীরবতা।
চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ, তবুও গলার টানটা কড়া।
“নিচে কী করছো?” জেভিয়ার কিছুটা গম্ভীর কণ্ঠে সুধালো।
আনায়া গলার স্বর যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রেখে মাথা নিচু করে বলে। “পানি ছিলো না তাই নিচে এসেছিলাম”।
জেভিয়ার আনায়া কে তীক্ষ্ণ চোখে একবার পরখ করে ঠাণ্ডা গলায় বললো, “পানি খাওয়া শেষ?”
আনায়া মাথা নাড়লো। একটুও সময় নষ্ট না করে জেভিয়ার হেঁটে এলো তার দিকে। মুহূর্তেই কোলে তুলে নিলো আনায়াকে। আনায়া প্রথমে কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। তার চোখ পড়ে জেভিয়ারের মুখে—

ক্লান্ত, চুপচাপ, মলিন অথচ তীব্রভাবে অসহনশীল।
একটা কথাও না বলে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকে জেভিয়ার। তার কোলের ভিতর বসে থাকা আনায়া শুধু শুনতে পায় তার বুকের ভেতরে ধ্বনি তোলা নিঃশ্বাস।
রুমের ভেতরে প্রবেশ করেই দরজাটা পেছন থেকে টেনে বন্ধ করলো জেভিয়ার। চোখে গভীর ক্লান্তি, ঠোঁটে কোনো অনুভূতির রেখা নেই।
আনায়াকে নামালো না, বরং সরাসরি বিছানার উপর ফেলে দিলো ধীরে তারপর সে ও জড়িয়ে ধরলো আনায়াকে নিজের সাথে। একটা নরম অথচ শক্ত, পাঁজর চেপে ধরা মতো আলিঙ্গন। আনায়ার নিঃশ্বাস আটকে যেতে লাগলো।
তার কণ্ঠে হঠাৎ অস্ফুট শব্দে বেরিয়ে এলো,
“ছাড়ো জেভিয়ার নিশ্বাস নিতে পারছি না”। তার শরীরটা ছটফট করতে লাগলো কিছুটা, নিঃশ্বাস ধরা একচিলতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো চোখে।
জেভিয়ার হাস্কি স্বরে বলে, “হুশ্‌শশ নড়বে না একদম। এনার্জি নিচ্ছি আমি।
তার বাহু একটু ঢিলা হলো। আনায়া ক্লান্ত এক নিঃশ্বাস ফেলে হাওয়ার মতো গলে গেলো তার বুকে। নিঃশব্দে গুটিয়ে গেলো, জেভিয়ারের বুকের মাঝেই।

আধো আধো ঘুমের ভেতর আনায়ার শরীরটা যেন একটু কেঁপে উঠছে। অজান্তেই মুখটা ভাঁজ পড়ে গেলো। সে বুঝতে পারলো কিছু একটা ছুঁয়ে যাচ্ছে তাকে। খুব ধীরে, নিঃশব্দে অথচ তীব্র স্পর্শে।
ঘুম জড়ানো চোখে পিটপিট করে তাকাতেই, প্রথমে কিছু বুঝে উঠতে পারলো না। একটা গা ছমছমে গরম শ্বাস তার ত্বকে ছড়িয়ে পড়ছে। তার দৃষ্টি নামলো নিচের দিকে,
নিজের পেটের উপর চোখ পড়তেই ভোখ বড় বড় হয়ে যায়। তার জামার নিচের অংশটা উপরে উঠে গেছে, উন্মুক্ত ত্বকের উপর জেভিয়ারের ঠোঁট,নিভৃতে, নিঃশব্দে, অনবরত চুম্বন করে চলেছে সে। একটা পরম মগ্নতা তার চোখে।
আনায়া হতবাক হয়ে চেয়ে আছে। গা ঘেঁষে থাকা সেই উষ্ণতা, সেই কল্পনাতীত মুহূর্তের বাস্তবতা যেন তার শরীরকে অবশ করে দিচ্ছে।
“জেভিয়ার” কণ্ঠটা খুব আস্তে, নরম হয়ে বেরিয়ে এলো তার ঠোঁট থেকে।
কিন্তু জেভিয়ার থামলো না। শুধু নিচু গলায় বলে উঠলো,
“লাভ বার্ড, তোমার গায়ের গন্ধ আমার ঘুম কেড়ে নিচ্ছে। আমি দম নিতে পারছি না। মাই বডি ওয়ান্টস ইউ ব্যাডলি।”

তার গলায় একধরনের মোহাবিষ্ট কাঁপন। আনায়া চুপচাপ, নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে বুঝতে পারছে না সে লজ্জিত, স্তব্ধ, নাকি গভীর কোনো আবেশে আটকে গেছে।
তার দৃষ্টি পড়ে জেভিয়ারের চোখে যেখানে আছে ক্ষুধা, অধিকার আর একধরনের অবসেসিভ পাগলামি, যা তাকে দিন দিন আরও গ্রাস করে নিচ্ছে।
জেভিয়ার আনায়ার দিকে ঝুকে তার শরীরের অর্ধেক ভর তার ওপর ছেড়ে দেয়। সে আনায়ার ঘাড়ে মুখ গুজে হিসহিসিয়ে বলে, “গায়ে কি অ্যালকোহল মেখে রাখো আমাকে মাতাল করার জন্য?”
আনায়া কিছুই বলতে পারে না তার ঠোঁটজোড়া কাপছে অনবরত। জেভিয়ার একটু উচু হয়ে আনায়ার মুখ বরাবর তার মুখ রাখের তাদের মাঝে শুধু ১ ইঞ্চি পরিমাণ দুরত্ব।
জেভিয়ার এর গরম নিশ্বাস তার মুখে আছড়ে পড়ছে। আনায়া চোখ বুজে নেয়। আচমকাই তার মনে পড়ে যায় নিচে দেখা তার দৃশ্যের কথা। আনায়া ফট করে চোখ খুলে কিছু বলতে চায় জেভিয়ার কে। তবে জেভিয়ার আনায়ার ঠোঁটের ওপর তার শক্তপোক্ত আঙুল হালকা ভাবে চেপে ধরে থামিয়ে দেয়। জেভিয়ার অদ্ভুত ঘোর লাগা চোখে তাকিয়ে আছে।
হঠাৎ সে আনায়াকে ছেড়ে উঠে বসে তাকে নিজের কোলে বসিয়ে নেয়। আনায়া জেভিয়ার এর উন্মুক্ত শক্তপোক্ত কাধে নিজের হাত রাখে। জেভিয়ার আনায়ার পিঠে হাত গলিয়ে তার পরনের পোশাক খুলে নেয়। আনায়ার সম্পূর্ণ শরীরে চোখ বুলিয়ে মোহাবিষ্টের ন্যয় বলে,

“আমি যখন তোমার সাথে থাকবো ইউ ডোন্ট নিড টু ওয়্যার ইনার। ইউর টি’টস আর ইন পারফেক্ট শেইপ এক্স্যাক্টলি হাউ দে শ্যুড বি ফর মি।”
আনায়া লজ্জায় চোখ বন্ধ করে নেয়। আর গাল দুটো গরম হয়ে গিয়েছে। আনায়া ভেবে পায় না, “এই ছেলেটা এত বেহায়াপনা কথা খোলাখোলি ভাবে বলে কি করে? এর কি একটুও লজ্জা করে না এইসব সরাসরি বলতে?”
জেভিয়ার একটু শব্দ করেই হেসে ফেলে। সে আনায়ার ঠোঁট জোড়া দখল করে নিয়ে কিছুক্ষণ পর ছেড়ে দেয়। জেভিয়ার ইশারায় আনায়ার বুকের দিকে দেখিয়ে এক হাতে আনায়ার ভেজা ঠোঁটে স্লাইড করতে করতে বলে,
” ইউ নো? তোমার এই বাটার বল’স গুলো আমাকে ডাকছে। বলছে, প্লিজ জেভিয়ার টেস্ট আস।”
আনায়া জেভিয়ার ঘাড়ে একটা জোড়ে কামড় বসিয়ে দিয়ে বলে, ” প্লিজ থামো জেভিয়ার। তোমার এইসব কথায় আমার কেমন যেন অনুভূত হচ্ছে।”

জেভিয়ার বাকা হেসে বলে, ” আই নো হোয়াট ইউ নিড বেইবি।”
সে আনায়ার বুকের মাঝখানে নিজের খসখসে হাতের আঙুল দিয়ে স্লাইড করতে থাকে। একটু ঝুকে আনায়ার বুকের স্পর্শকাতর জায়গার আশেপাশে নিজের নাক দিয়ে ঘষতে থাকে। আনায়ার শিরশিরে অনুভূতি হচ্ছে।
বেশ কিছুক্ষন পর আনায়া কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলে,
“জেভিয়ার এমন করছো কেনো?”
জেভিয়ার ভাবলেশহীন ভাবে বলে, “কি করছি?”
“উফফ দেখতে পারছো না? আমাকে কি বুঝতে পারছো না?” শেষের কথাটা আনায়া বেশ অসহায় কণ্ঠে বলে।
জেভিয়ার আনায়ার কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলে, ” আই ওয়ান্ট আস টু বি ইন সিক্সটি-নাইন পজিশন, রাইট নাও।”

আনায়া চোখ বড় বড় করে জেভিয়ার এর দিকে তাকায় যেন সে পৃথিবীর সব থেকে আজব কথা শুনে ফেলেছে।
জেভিয়ার আবারও বলে, ” আর ইউ রেডি লাভ বার্ড?”
আনায়া মাথা দুপাশে নাড়াতে থাকে তবুও জেভিয়ার তার উত্তর উপেক্ষা করে তাকে বিছানায় ফেলে দিয়ে তার সম্পূর্ণ শরীরে চুম্বন করতে থাকে। সে আনায়ার পায়ের কাছে গিয়ে থেমে যায় এরপর বলে, ” লাভ বার্ড কোমড়ের নিচে একটা বালিশ দিয়ে নিবে? তোমার কম্ফোর্ট ফিল হবে!”
আনায়া তার দিকে অসহায় চোখে তাকায়। জেভিয়ার সেইটা পরোয়া না করে আনায়ার কোমর নিচে একটা নরম বালিশ দিয়ে দিয়ে বলে,
“লেট মি টেস্ট ইওর সুইটনেস বেইবি, স্লোওলি বাট ডিপলি। বিকজ টুনাইট আই নিড টু অওন ইউ উইথ মাই টাং।”
জেভিয়ার হঠাৎই নিচু হয়ে গিয়ে অনায়াসে তার কোমরের কাছ থেকে চুমু আঁকতে আঁকতে সামনে এগোতে থাকে। তার জিভ একেকটা জায়গায় থেমে, তারপর আবার চলতে থাকে নরম, তীব্র, ভয়ানক আসক্তির ছোঁয়ায়।
আনায়া নিজের শরীরটা ধরে রাখতে পারছে না। সে নিশ্বাস ফেলছে গম্ভীর ছন্দে, তার মুখ থেকে অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে আসছে অসহ্য অপেক্ষার চাপা অভিব্যক্তি।

“জেভিয়ার এমন করো না!” সে কেঁপে ওঠে।
জেভিয়ার থামে না। তার চোখ যেন ধূসর দাবানল।
সে আনায়ার ঠোঁটে ঝুঁকে আসে আবারও। চুমুটা প্রথমে ধীরে, তারপর আগুন হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। জিভ একে অন্যকে খুঁজে পায় ভিজে, পাগল করা, মোহাচ্ছন্ন।
জেভিয়ারের আঙুল আনায়ার পিঠ বেয়ে নামছে নিচে
আর আনায়ার বুকের মাঝখান থেকে একটা চাপা গোঙানি বেরিয়ে আসে।
“আই লাভ দ্য সাউন্ডস ইউ মেইক… সো গডড্যাম পারফেক্ট।” সে বলে, আর একটা নিঃশ্বাসে আনায়ার ঘাড়ের পাশে মুখ গুঁজে চুমু আঁকে।
আনায়া চোখ বন্ধ করে, কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বললো,
“তুমি আমাকে পুরোদমে শেষ করে দিচ্ছো।”
জেভিয়ার গর্জে ওঠে মৃদু কণ্ঠে,
“তুমি আমার ফেইভরিট ডিসট্রাকশন, লাভ বার্ড।”

সকাল হয়েছে বেশ কিছুক্ষন আগেই তবে আনায়া এঝনো তার বিছানা ছাড়েনি। তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে কাল রাতের দেখা দৃশ্য। যার হিসাব সে মেলাতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। পাশেই জেভিয়ার উপুর হয়ে ঘুমে তলিয়ে আছে। কাল রাতে ঘুমাতে তাদের বেশ রাত হয়েছে। আনায়া তার অভ্যাসবশত উঠে পড়লেও জেভিয়ার এখনো উঠেনি।
সে ধীর পায়ে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসে। চোখে এখনও ভাসছে রাতের সেই তীব্র অভিজ্ঞতা। জেভিয়ারের আঙুল, তার দৃষ্টি, আর…

নিজেকে খানিক শক্ত করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, ভেজা চুলটা তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে ওয়াশরুম থেকে বের হয়। বিছানায় তাকিয়ে দেখে জেভিয়ার নেই। আনায়া ভ্রু কুচকে সিড়ি বেয়ে নিচে নামতে থাকে।
ডাইনিং টেবিলে বসে ব্রেকফাস্ট করছে জেভিয়ার। ফুল ফর্মাল রেডি। চুল সেট, পারফিউমের হালকা গন্ধ ঘিরে আছে তাকে। কেউ তাকে দেখলে কাল রাতের পুরুষ আর এইখানে বসে থাকা পুরুষের মাঝে মিলই খুজে পাবে না।
টেবিলের এক মাথায় বসেছেন জেভিয়ার এর বাবা জন ড্রেভেন। চোখে গম্ভীরতা, ঠোঁটে নিঃশব্দ অভিব্যক্তি। আনায়াকে দেখে কেবল একবার তাকালেন, তারপর আর কিছু বললেন না।
আনায়া কেমন যেন খুচখুচে অস্বস্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। জেভিয়ার তাকে চোখের ইশারায় তার পাশে বসতে বলল। আনায়া একটু হকচকিয়ে গেলেও বসে পড়ে।
এমন সময় হঠাৎ তার দৃষ্টি পড়ে ডাইনিং এর এক কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই সার্ভেন্ট মেয়েটির দিকে। তার চুল বাঁধা, মুখে অদ্ভুত শান্ত এক অভিব্যক্তি। কিন্তু আনায়ার চোখ হঠাৎ কেঁপে ওঠে।
এই তো! এই মেয়েটিকে তো সে গতরাতে দেখেছিলো।

আলোর ফাঁকে তার মুখের সেই কাঁপুনি, কাটা ধরানো গালের পাশে নীলচে দাগ, সেই শূন্য চোখ।
আজকে যেন কিছুই হয়নি এমন স্বাভাবিক মুখে দাঁড়িয়ে আছে সে। চা পরিবেশন করছে, টেবিলে ফল সাজাচ্ছে।
আনায়ার ভেতরটা অদ্ভুতভাবে গুঁড়িয়ে যায়।
আনায়ার চোখ আটকে থাকে সেই মেয়েটার ওপর।
সার্ভেন্ট মেয়েটা ঠিক যেন কিছুই হয়নি এমন স্বাভাবিক আচরণ করছে। মুখে একটুও ক্লান্তি নেই, চোখের নিচে কাল রাতের সেই দাগগুলোও আজ যেন জাদুর মতো গায়েব!
আনায়া এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। কিছু একটা অস্বাভাবিক, এতটাই নিখুঁত হয়ে ওঠা অস্বাভাবিক!
সেই মেয়েটা এবার হঠাৎই আনায়ার দিকে তাকিয়ে বলে,
“কিছু লাগবে ম্যাম?”
এক মুহূর্তের জন্য আনায়ার ঘোরটা ভাঙে। মেয়েটার গলা একদম স্বাভাবিক, চোখে ভয় তো দূরের কথা, কোনো টানটান ভাবও নেই। আনায়া চমকে উঠে সামান্য মাথা নাড়ে।
“না, কিছু লাগবে না।”

সে চোখ নামিয়ে নেয়।ভেতরে ভেতরে কেমন যেন গুলিয়ে যেতে থাকে সবকিছু। খাবারটা কোনোরকমে শেষ করে উঠে দাঁড়ায় আনায়া।তবে খেয়াল করে, জেভিয়ার এখনো পাশেই বসে আছে। তার খাওয়া অনেক আগেই শেষ তবুও ফোনে ব্যস্ত হয়ে ঠিক একই জায়গায় রয়ে গেছে।
আনায়া ধীরে উঠে দাঁড়াতেই জেভিয়ার ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে দেয়। তারপর হঠাৎ করেই আনায়ার কব্জিটা ধরে নেয় শক্ত করে। আনায়া কিছু না বলে পেছন পেছন হাঁটতে থাকে।
ঠিক তখনই পেছন থেকে ভারী অথচ স্থির গলায় জেভিয়ারের বাবার কণ্ঠ ভেসে আসে,
“যাওয়ার আগে আমার সঙ্গে দেখা করে যেও। কথা আছে।”
জেভিয়ার থেমে যায়। তবে ঘাড় ঘোরায় না। স্রেফ কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর কোনো উত্তর না দিয়েই আবার পা বাড়ায় ওপরের দিকে।

রাশিয়ার সেরেমেতিয়েভো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বাইরে ঠান্ডা হাওয়া কাঁপিয়ে দিচ্ছে চারপাশ।
গায়ে কালো কোট, চোখে কালো চশমা এরিক্স দাঁড়িয়ে আছে গেট-৫ এর সামনের একটা গাড়ির পাশে।
তার চোখ ধীরে ধীরে মানুষগুলোর মুখ স্ক্যান করে যাচ্ছে।
হঠাৎ করে সে এক মুখ দেখে স্থির হয়ে যায়।
দূর থেকে এক ব্যক্তি এগিয়ে আসছে লম্বা, ঘাড় উঁচু, ডান পাশের গালে একটা গাঢ় কাটা দাগ চোখে দাগ যেন কোনো পুরোনো ঘটনার স্মৃতি বহন করে চলেছে। কাছে আসতেই তাকে দেখে এরিক্সের মুখে একঝলক হাসি খেলে যায়।
লোকটা এগিয়ে এসে এক ঝটকায় এরিক্সকে বুকে টেনে নেয়।

“ওয়েলকাম টু রাশিয়া, ব্রোহ”। এরিক্স হাসিমুখে বলে।
“হয়তো এইবার আমরা শেষ খেলাটা খেলতে যাচ্ছি।”
চোখের কোণে বিদ্রুপের রেখা। লোকটা ব্যাগটা গাড়ির পাশে রেখে পকেট থেকে মোবাইল বের করে। দ্রুত এক নম্বরে ডায়াল দেয়।
“হেয় ভিক্টর… কোথায় আছো?
অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে গলা,
“ভাই বাংলাদেশেই আছি। মেয়েটার খোজও পেয়েছিলাম তবে এখন পাচ্ছিনা আর হুট করে গায়াব হয়ে গেলো।”
লোকটা হেসে ওঠে টানা কয়েক সেকেন্ড।
“বাংলাদেশেই থেকে যাও তুমি… তোমাকে এখন আর এখানে দরকার নেই। জেভিয়ার আনায়াকে নিয়ে রাশিয়ায় চলে এসেছে। আর তুমি ওইখানে মেয়ে খুজতে থাকো।”
এই বলে ফোনটা কেটে দেয় সে। আরেকবার এরিক্সের চোখে চোখ রাখে। এরিক্স ঠাণ্ডা স্বরে বলে,
“ভিক্টর চুপ করে থাকবে না। সে ফিরবে, আমিও চাই সে ফিরুক। খেলাটা সমানে সমানে না হলে জমে না ঠিক।”
লোকটা ফুঁ দিয়ে সিগারেট ধরায়।
” আই জাস্ট ওয়ান্ট হার অর নাথিং। এতদূর আমি শুধু এসেছি ওর জন্য। যেকোনো মূল্যেই হোক আমার ওকে চাই।”

আনায়া মাথা নিচু করে বসে আছে বেডের কোণে।
তার চোখ চোখ টলমল করছে। তার ঠিক সামনে জেভিয়ার হাঁটু গেঁড়ে বসে আছে। এক হাতে সে আনায়ার হাত ধরে রেখেছে শক্ত করে।
একটু আগেরই কথা~
জেভিয়ার তাকে রুমে এনে খুব ঠান্ডা ভাবে বলেছিলো,
” আজ একটু পর আমার ব্যবসায়ীক কাজের সুত্রে অন্য শহরে যেতে হবে।”
আনায়া শুধু চুপচাপ শুনছিলো তার কথা। জেভিয়ার আবারও বলে, ” সেইখানে আমার মাসখানেক থাকতেও হবে।
তখন থেকেই আনায়া কিছু বলেনি। শুধু বসে আছে অপ্রকাশ্য এক অভিমান বুকে নিয়ে।
জেভিয়ার কিছুক্ষণ তার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকেও চোখ নামিয়ে নেয়। তার তো কিছু করার নেই। তার যেতেই হবে আজ। আর সে তার লাভ বার্ড কেও নিতে পারবে না সাথে। সে চাইলেও এইটা কখনোই সম্ভব না।
সে ধীর কণ্ঠে বলে,

“কিছু বলো লাভ বার্ড! আমি জানি তোমাকে আমার আরও আগে জানানো উচিত ছিলো তবে আমি জানাতে পারিনি। তবে বোঝার চেষ্টা করো আমার যাওয়া টা খুবই দরকার। না গেলে ব্যবসায় লস হয়ে যাবে।”
আনায়া চোখ মেলে জেভিয়ার এর দিকে তাকায়,
“দ্রুত ফিরে আসবে তো? আমাকে কি ভুলে যাবে?”
জেভিয়ার এবার উঠে এসে একটানে আনায়াকে জড়িয়ে ধরে শক্ত করে। তার গলার একদম পাশে মুখ রেখে ফিসফিস করে বলে—
“তুমি শুধু বিষ নও, তুমি এমন এক মিষ্টি বিষ যা আমার আত্মাকেও ছুয়ে দিয়েছে।
ইউ আর অ্যা’ন অ্যাডিকশন ফ্রম হুইচ আই কান্ট রিকভার।”
আনায়া চোখ বুজে ফেলে। জেভিয়ার ওঠানামা করা বুকের সাথে মিশে থাকে।

জেভিয়ার গাড়িতে বসে আছে। তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে তার বাবার বলা কথা গুলো। আনায়াকে বিদায় জানিয়ে সে তার বাবার কাছে গিয়েছিলো দেখা করতে। জন ড্রেভেন খুবই কঠোর ভাবে জানিয়েছেন,
” আমি কোনোদিন কথা দিয়ে কথার খেলাফ করিনি। আশা করব তুমিও আমার নীতি মেনে চলবে। কথা দিয়ে কথা না রাখা পুরুষদের পুরুষ বলে না, তারা হচ্ছে কাপুরুষ।”
তিন লাইনের এই একটা কথাই যথেষ্ট ছিলো জেভিয়ার এর টনক নাড়ানোর জন্য। সে কখনো দুর্বল হতে শেখেনি। দুর্বলতা তার পায়ের কাছে এসে মাথা নত করে, সে করে না। সে মাথা নত করতে শেখেনি।

রাশিয়ার উত্তরাঞ্চলের এক পরিত্যক্ত কারখানার ভেতরে,
মাটির প্রায় তিনতলা নিচে থাকা গোপন চেম্বার যেখানে আলো কম, নিরাপত্তা সর্বোচ্চ, আর আলোচনার বিষয়
অন্ধকার জগতের শক্তির ভারসাম্য।
চতুর্মুখী এক কালো গোল টেবিল। চারজন বসে।
তাদের গায়ে লম্বা কোট, মুখ মাস্কে ঢাকা।
কেউ কারো আসল নাম জানে না জানে কেবল কোডনেম আর ক্ষমতার মাত্রা।
প্রথমজন বলল,
“ইউক্রেন বর্ডার দিয়ে নতুন অস্ত্র চালান যাবে,
সেমি-অটোমেটিক থেকে শুরু করে লং-রেঞ্জ স্নাইপার পর্যন্ত। তবে প্রোটেকশন দরকার হবে। আমাদের ঢাল কে হবে এবার?”
দ্বিতীয়জন গলার স্বর নিচু করে বলল:

“রোমানিয়া ও বুলগেরিয়া থেকে রিক্রুট করা হচ্ছে ১৪-১৭ বছর বয়সী কিশোর তাদের দিয়ে কাজ করানো হবে।
ওরা সহজে ধরাও পড়ে না, এবং মরলেও কেউ খোঁজে না।”
তৃতীয়জন ফাইল ছুঁড়ে দিল টেবিলে।
“এই সপ্তাহে ১৭টা মেয়েকে সরানো হয়েছে তুরস্ক হয়ে দুবাই এর পরের চালান যাবে বাংলাদেশ থেকে।
সোর্স চুপচাপ কাজ করছে। কিন্তু একটা সমস্যা একটা মেয়ে আনায়া ম্যারি। তাকে ফলো করা হচ্ছে, কিন্তু সে কারো হেফাজতে আছে। কেউ তাকে গার্ড দিচ্ছে। কে, সেটা এখনো ক্লিয়ার না।”
চতুর্থজন, যিনি এতক্ষণ চুপ ছিলেন, গলায় থেমে থেমে বললেন,
” আনায়া ম্যারির বিষয়টা পরেও দেখা যাবে। সে শুনেছি রাশিয়াতেই আছে এবং মিস্টার ডেভিডও রাশিয়াতে এসেছে আজ তাই চাপ কম। সহজেই মেয়েটাকে সময় বুঝে তাদের কাছে তুলে দেওয়া যাবে।”
বাকিরা কেউ আর কথা বাড়ালো না। এদের মাঝে সব থেকে প্রভাবশালী লোক ইনি। তার ওপর কথা বলা মানেই নিজে মৃ*ত্যুকে নিজে বরণ করে নেওয়া নিজ হাতে। আর এইখানে কেউ তাদের মে*রে ফেলে রাখলেও আজীবনেও কেউ জানতে পারবে নাকি সন্দেহ।
লোকটা আবার বল,

“অ*স্ত্র, ড্রা*গস, হিউম্যান কমোডিটিসবই চলছে। কিন্তু এবার বড় টার্গেট হলো পলিটিকাল ইনফ্লুয়েন্স।
বাংলাদেশের ভেতরে কিছু দুর্বল জায়গা তৈরি হচ্ছে
যেখান থেকে নতুন রুট চালু করা যাবে।
দ্বিতীয়জন আবার বলে,
“ড্রা*গ ট্রাফিকিংটা এখন আমাদের মূল ইনকাম।
কো*কেন, হে*রো*ইন, ফে*ন্টানিল সব চলছে। আমেরিকায় ঢুকানোর জন্য নতুন কনটেইনার রুট খোলা দরকার।
ইন্দোনেশিয়া বা বাংলাদেশ থেকে পার্সেল পাঠানো সুবিধাজনক।”
তৃতীয়জন কিছুটা গর্জন করে বলে,
“বাজার চাই। আর বাজার তৈরি করতে গেলে সন্ত্রাস লাগবে, ভয় লাগবে, ক্ষুধা লাগবে। আর হবো আমরা সেই ক্ষুধার জ্বালানী।”

রাত ১:৪৫ মিনিট | জেভিয়ারের ম্যানশন।
আনায়ার ঘুম আসছে না। আজ সে একা। জেভিয়ার নেই, আর সার্বক্ষণিক থাকা সেই নিযুক্ত সার্ভেন্টও
কিছুক্ষণ আগেই বলে গেছে, “আপনার বিশ্রাম দরকার, আমি আমার রুমে যাচ্ছি ম্যাম।”
জেভিয়ারই মূলত আজ তার জন্য নতুন একজন সার্ভেন্ট এর ব্যবস্থা করে গিয়েছে যা তার সাথে সার্বক্ষণিক থাকবে। যাতে আনায়ার একা অনুভূত না হয়। এছাড়াও জেভিয়ার তাকে সময় করে একটু পর পর কল মেসেজ করেই যাচ্ছে।
আনায়া জেভিয়ার এর এত পরিবর্তন এর কারণ খুজে পাচ্ছে না। লোকটা কি সত্যি পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে নাকি তার সামনে আলগা মুখোশ পড়ে আছে?
ঘরটা বেশ উষ্ণ, হিটারের কারণে বাইরে ঠান্ডার রেশ টের পাওয়া যায় না। তবুও একটা অদ্ভুত খালি শূন্যতা আনায়াকে অস্থির করে তুলেছে।
সে ধীরে ধীরে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াল। ঠান্ডার ছোঁয়ায় কাপতে লাগল গা। সিল্কের রাত্রিকালীন পোশাক গায়ে,
হাত দুটো বুকের কাছে জড়ানো।
হঠাৎ চোখ আটকে গেল এক অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্য।

বাড়ির পেছনের গ্যারাজ থেকে বেরিয়ে আসছে জন ড্রেভেন।জেভিয়ারের বাবা। কিন্তু যা সে দেখছে, তা স্বাভাবিক নয়। তার গায়ের পোশাকের এক পাশ লাল হয়ে আছে। র*ক্ত।
আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার এই ঠান্ডার মধ্যেও লোকটা যেন ঘেমে উঠেছে।
পেছনের একটি ল্যাম্পপোস্ট এর আলোতেই র*ক্তের ছোপ গুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
আনায়া ঠোঁট কামড়ে থেমে রইল। তার চোখে বিশ্বাস হচ্ছে না। এই লোকটা এত রাতে র*ক্তে ভেজা পোষাক জড়িয়ে কোথা থেকে আসছে?

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ১৬

ঠিক তখনই জন ড্রেভেন চোখ তুলে তাকাল ব্যালকনির দিকে। সরাসরি আনায়ার চোখে চোখ। আনায়া মুহূর্তেই জমে গেল। একটা ভয়, চাপা আতঙ্ক আর সন্দেহ তার বুক চেপে ধরল।
কিন্তু ভয়ের অদ্ভুত ব্যাপার হলো ভড়কে যাওয়ার বদলে, জন ড্রেভেনের চোখে যেন একটা অনড় ঠান্ডা চাহনি।
কোনো লজ্জা নেই, কোনো গোপন ভয়ও না।
সেই চোখের চাহনি দেখে আনায়ার বুক ধক করে উঠল।
সে পেছনে ঘুরে ঘরে ফিরে এল দরজাটা স্লাইড করে বন্ধ করতেই, হঠাৎ গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেল। তার মাথায় তখন কেবল একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে,
“এত রাতে তিনি গ্যারাজে কি করছিলেন?আর র*ক্তটা এল কোথা থেকে?”

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ১৮