অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ২১
শ্রাবণী ইয়াসমিন
আনায়া দাঁড়িয়ে আছে বিশাল কাচঘেরা জানালার সামনে। কাচের ওপাশে দূরে বরফে ঢাকা জলরাশি, অসীম নীলাভ আকাশ আর মাঝে মাঝে ঝড়ো বাতাসে দুলতে থাকা গাছ। চারপাশে নির্জনতা, মানুষজনের কোনো ছায়া নেই।
এই বাড়িটা যেন দ্বীপের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে পাশে শুধু গর্জন করা সমুদ্র। রুমটা বেশ বড়, সাজানো ঝলমলে, দামি ঝাড়বাতি, সাদা পর্দা, ভারী আসবাবপত্র সবকিছু রাজকীয়। কিন্তু এই ঐশ্বর্যই যেন তাকে শ্বাসরুদ্ধ করে তুলছে।
আনায়া ধীরে ধীরে কাচ ছুঁয়ে ফিসফিস করে,
“এতো কাছাকাছি আকাশ, অথচ আমি এক ফোঁটা বাতাসও নিতে পারছি না।”
তার পায়ের কাছে রাখা আছে ইলেকট্রিক ধাতব চেইন যেটা দরজার কাছে গোপনে লক হয়ে আছে। বাইরে পা রাখলেই সিগন্যাল বেজে উঠবে।
অদূরে দেয়ালে বসানো সিসিটিভি ক্যামেরা তার প্রতিটি নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করছে। সে জানে ডেভিড ঠিক এভাবেই তাকে দেখতে চাইছে। একটা কাচের খাঁচার ভেতরে বন্দি পাখি।
দরজার বাইরে দুইজন বিশাল দেহী রাশিয়ান গার্ড দাঁড়িয়ে আছে। একদম অনুভুতি শূন্য ভাবে।
আনায়া নিঃশব্দে নিজের বুক জড়িয়ে ধরল। মনে পড়ছে সেই ছোটবেলার ভয়ের স্মৃতি, আরেকবার যেন একই অন্ধকার ঘর, একই বন্দিত্ব তাকে গ্রাস করছে। হঠাৎ দরজার লক ঘুরে খোলার শব্দ হলো। ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল ডেভিড। তার ঠোঁটে অদ্ভুত সেই হাসি।
সে আনায়ার দিকে তাকিয়ে তার কপালের ওপর উড়তে থাকা চুলগুলো কানের পিছে গুজে দিতে দিতে মৃদু হেসে বলল,
“স্বাগতম আমার স্বর্গে, ডার্লিং। বাইরে যা খুশি দেখতে পারো, কিন্তু মনে রেখো, তুমি এখানে বন্দি আমার জন্য। শুধু আমার জন্য।”
আনায়া ধীরে ধীরে পেছনের দিকে সরে গিয়ে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল। নিজের শরীরটা গুটিয়ে নিল, যেন এভাবে অন্তত ডেভিডের দৃষ্টির আগুন থেকে আড়াল পাওয়া যাবে।
ডেভিড তীর্যক চোখে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“আমার ছোঁয়া কি এত ঘৃণা লাগে তোমার, ডার্লিং?”
আনায়া মুখ ফিরিয়ে নিল। চোখে জমে থাকা অশ্রু গোপন করতে চাইল।
ডেভিড নিচু স্বরে হাসল, সেই হাসিতে বিদ্রূপ আর বিষ মিশে আছে।
“জেভিয়ারের ছোঁয়া কি তাহলে খুব প্রিয় তোমার? খুব শান্তি দেয় তাই না?’
আনায়ার বুক ধক করে উঠল। সে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু গলা শুকিয়ে এলো।
ডেভিড হঠাৎ সামনে ঝুঁকে তার চোয়াল শক্ত করে ধরে ফেলল। তার আঙুলের চাপ এতটাই নির্মম যে আনায়ার চোয়াল ভেঙে যাবে মনে হলো।
দাঁত কিঁচিয়ে সে বলল,
“তোকে পেতে আমি কি না করেছি বল! তোকে খুঁজতে কত র*ক্ত ঝরিয়েছি, কত লোক মেরেছি, কত দেশ ঘুরেছি। আর তুই… তুই আজ তার ছোঁয়ায় নিয়ে শান্তি খুঁজিস।”
ডেভিড চাপা গলায় ফিসফিস করে বলল,
“কি ভাবিস তুই? জেভিয়ার তোকে ভালোবাসে? এই বলেই হো হো করে হাসতে লাগলো। “ওই তোকে শুধু একটা…..
পুরো কথা শেষ হওয়ার আগেই হুরমুর করে রুমে একজন গার্ড প্রবেশ করবে।
গার্ড হাপাতে হাপাতে ঘরে ঢুকে পড়ল। তার কপালে ঘাম জমে উঠেছে, বুক দুলছে দ্রুত শ্বাসে। ডেভিড ভ্রু কুঁচকে বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকাল, যেন এই অবাঞ্ছিত ব্যাঘাত সহ্য হচ্ছে না।
গার্ড গিলে নিয়ে কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“স…স্যার বাহিরে মিস্টার ড্রেভেন এসেছেন। আমরা আমরা জানি না কীভাবে সে এই লোকেশন জানলো।”
ডেভিডের চোখ মুহূর্তের জন্য রাগে ঝলসে উঠল, কিন্তু তার মুখে কোন অভিব্যক্তি খুঁজে পাওয়া গেল না। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল, তারপর ধীরে ধীরে পর্দার দিকে এগোল।
সাদা পর্দা সরিয়ে দিল সে। বিশাল কাচঘেরা জানালার ওপাশে হঠাৎ পুরো দৃশ্য যেন পরিষ্কার দেখা গেল।
দূরে সমুদ্রের ধারে এক বিশাল খোলা হেলিপ্যাডের মতো জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে কালো রঙের এক দানবসদৃশ প্রাইভেট জেট। তার ধাতব দেহ সমুদ্রের হিমেল হাওয়ায় ঝিকমিক করছে।
কিছুটা দূরে জেটের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে মাত্র দুইজন গার্ড। ডেভিডের চোখ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। সে জানালার কাচে মুখ কাছাকাছি এনে একাগ্র হয়ে খুঁজতে লাগল। সমুদ্রের দিকটায় তাকাল ঝড়ো হাওয়ায় দুলছে গাছগুলো।
আকাশের দিকটায় তাকাল অসীম নীলাভ রঙ মিশে যাচ্ছে কালো মেঘে। তারপর আবার জেটের কালো অন্ধকার কেবিনের দিকে চেয়ে রইল।
জেভিয়ার নেই।
ডেভিডের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। ভেতরে কী ভাবছে তা তার মুখ থেকে বোঝার উপায় নেই। কেবল চোখে হিংস্র কৌতূহল আর আতঙ্কের মিশ্র আগুন জ্বলছে।
আনায়ার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠল। সে নিঃশব্দে জানালার আড়াল থেকে তাকিয়ে রইল কালো জেটের দিকে। তার মনে হলো কোথাও একটা শীতল স্রোত বইছে, হয়তো জেভিয়ার ঠিক এখানেই আছে, অদৃশ্য হয়ে তাকেই লক্ষ্য করছে।
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এলো। শুধু সমুদ্রের গর্জন আর বাতাসের তীব্র শব্দ ভেসে আসছে।
ডেভিড অবশেষে সরে দাঁড়াল। ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠল না সম্পূর্ণ রাগ, না সম্পূর্ণ ভয়, বরং কোনো অদ্ভুত খেলায় মেতে ওঠা শিকারীর আনন্দ।
হঠাৎ, দুইটা তীব্র গুলির শব্দ একসাথে প্রতিধ্বনিত হলো ঘরের ভেতর। আকস্মিক বিস্ফোরণের মতো শব্দে আনায়ার বুক কেঁপে উঠল। সে আতংকে চিৎকার করে কাচের পাশে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল।
ডেভিড মুহূর্তেই ছিটকে ঘুরে দাঁড়াল। চোখ র*ক্তবর্ণ হয়ে উঠেছে আর ঠিক তখনই দৃশ্যটা তার চোখে পড়ল পিছনে দাঁড়িয়ে আছে জেভিয়ার। হাতে চকচকে কালো বন্দুক, ধোঁয়া এখনো উড়ছে নলের মুখ থেকে।
মেঝের ঠিক মাঝখানে লুটিয়ে পড়েছে সেই গার্ডটা, যে কয়েক মুহূর্ত আগে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে খবর দিয়েছিল। তার বুকের ভেতর থেকে রক্ত ঝরছে নদীর মতো, ছড়িয়ে পড়ছে সাদা কার্পেটে।
আনায়ার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল। সে নিঃশ্বাস নিতে পারছে না, বুকের ভেতর ধুকপুকানি অস্বাভাবিক বেড়ে গেল।
এই প্রথমবার সে এত কাছ থেকে জেভিয়ারকে দেখছে মানুষ খুন করতে সাথে হাতের বন্দুক, মুখে অদ্ভুত শীতলতা।
ডেভিড দাঁত কিঁচিয়ে উঠল, কিন্তু মুহূর্তের জন্যও তার মুখ থেকে কোনো কথা বের হলো না। যেন মুহূর্তের জন্য তার ভাষা হারিয়ে গেছে।
জেভিয়ার বন্দুক নামিয়ে আনায়ার দিকে তাকাল।
তার চোখ অদ্ভুত শান্ত কিন্তু সেই শান্তির গভীরে জমে আছে ভয়ংকর ক্ষোভ,, যা তার চেহারায় প্রকাশ পাচ্ছে।
সে ধীরে ধীরে আনায়ার দিকে এগিয়ে এল। আনায়ার বুকের ভেতর শ্বাসটা যেন আটকে গেল।
হঠাৎ টাস করে একটা চড় পড়ল আনায়ার গালে।
শব্দটা ঘরের ভেতরও যেন প্রতিধ্বনিত হলো।
আনায়ার মাথা একপাশে ঝুঁকে গেল। ঠোঁটের কোণে রক্ত জমে উঠল। সে কিছু বলার আগেই
টাস টাস করে আরও দু’বার চড় মারল জেভিয়ার।
প্রতিটি আঘাতে তার দুর্বল শরীর ভেঙে পড়তে লাগল। হাঁটু কেঁপে মেঝের দিকে ভেঙে পড়ার মতো হয়ে গেল।
কিন্তু মাটিতে পড়ার আগেই জেভিয়ার ঝুঁকে তার চুলের মুঠি শক্ত করে টেনে ধরল। আনায়া যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল। তার চোখ থেকে অশ্রু ঝরতে লাগল অনিয়ন্ত্রিতভাবে।
জেভিয়ারের নিঃশ্বাস গরম হয়ে উঠেছে, চোখ জ্বলছে নিয়ন্ত্রণহীন রাগে। তবুও কণ্ঠস্বর শান্ত,করে বলে,
“আমার থেকে পালাতে চাইছিস? অন্য কাওকে দেহ দিয়ে দিবি? তোর কলিজা এত বড় হিয়ে গিয়েছে? আমার জিনিস আমি আমার করে রাখতে জানি। তোকে মেরে তোর লাশ আমি বাড়িতে সাজিয়ে রাখবো তাও কেও পাবে না তোকে।”
ঘরের বাতাস জমে গেল। ডেভিডও যেন এই দৃশ্য দেখে নিজেও নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কারণ এই হলো সেই জেভিয়ার, যাকে সে জানে।
জেভিয়ার আনায়ার মাথার পেছন থেকে চুলের মুঠি আরও শক্ত করে চেপে ধরল। তার ঠোঁটে অদ্ভুত ভয়ংকর এক হাসি ফুটে উঠল।
সে ঝুঁকে আনায়ার কানে ফিসফিস করে বলল,
“ইউ নিড স্পেশাল পানিশমেন্ট থেরাপি, লাভ বার্ড…”
আনায়ার বুক কেঁপে উঠল, চোখ ভিজে উঠল আতঙ্কে এবং ব্যাথয়। তার শরীরটা কাপতে লাগল অনিয়ন্ত্রিতভাবে।
জেভিয়ার হঠাৎ চুল ছেড়ে দিল, বন্দুক হাতে নিয়ে পেছনে সরে দাঁড়াল। ঠাণ্ডা স্বরে বলল—
“বাহিরে যাও। তুমি। আমার আর ডেভিডের কিছু বোঝাপড়া বাকি।”
আনায়া কাঁপতে কাঁপতে কয়েক পা এগোল। দরজার কাছে পৌঁছাতেই হঠাৎ কারও গর্জনে পা থেমে গেলো।
“স্টপ! আনায়া!”
ডেভিডের চিৎকারে সে থেমে গেল। ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল। ডেভিড এবার সামনে এগিয়ে এল। হাতে একটা কাগজ। ঠোঁটে বিকৃত এক হাসি। সে কাগজটা জেভিয়ারের দিকে বাড়িয়ে দিল।
“দেখো আনায়া আমার নামে করে দিয়েছে নিজেকে। সে এখন আমার। চিরতরে।”
জেভিয়ার কাগজটা ঠাণ্ডা চোখে নিল। ধীরে ধীরে পড়ল পুরোটা। তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই শুধু নিস্তব্ধতা।
তারপর, সে ধীরে ধীরে পকেট থেকে একটা কালো লাইটার বের করল। সেইটা চালু করতেই আগুন জ্বলে উঠল। ডেভিডের চোখের সামনে, কাগজটা আস্তে আস্তে জ্বলে ছাই হয়ে গেল।
ধোঁয়ার গন্ধে ঘর ভরে উঠল। জেভিয়ারের ঠোঁটের কোণে শীতল এক হাসি ফুটল।
“তুমি ভুল জায়গায় বাজি ধরেছ, ডেভিড। কারণ জেভিয়ার কখনো বাজি হারতে শেখেনি এন্ড হু এল্স উড নো দ্যাট বেটার দ্যান ইউ?”
আনায়া সিটে বসে আছে মুখ ঘুরিয়ে জানালার দিকে। তার চোখ দিয়ে নিরবেই পানি গড়িয়ে পড়ছে। একের পর এক অশ্রুবিন্দু গাল বেয়ে নামছে নিচে।
জেভিয়ার সামনের সিটে বসে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। কিন্তু যতই সে চুপচাপ থাকার চেষ্টা করে, মেয়েটার এই অবিরাম কান্না তার মাথার ভেতর আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে।
হঠাৎ সে ধপ করে উঠে দাঁড়াল। গলা ভারী হয়ে উঠল রাগে।
“চুপ করো! একদম চুপ করো! না হলে এখনই এক ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দিব তোমাকে। কোনো প্যারাস্যুটও নিতে দিব না।”
আনায়া চমকে ঘুরে তাকাল তার দিকে। চোখ লালচে হয়ে আছে কান্নায়, তবুও সে চুপ করল না।
বরং ঠোঁট ফুলিয়ে, গাল ফোলানো ভঙ্গিতে কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“পারোই তো ওইটা মানুষকে কষ্ট দিতে। কষ্ট দেওয়া ছাড়া তোমার আর কিছুই আসে না।”
তার কণ্ঠ ভাঙা, কিন্তু তাতে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত অভিমান স্পষ্ট। চোখের ভেতর রাগ স্পষ্ট হলেও ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক শীতল হাসি ফুটে উঠল।
সে ধীরে ধীরে ঝুঁকে আনায়ার মুখের কাছাকাছি গেল, চোখ সরাসরি তার চোখে গেঁথে দিল।
“কষ্ট দিই কারণ আমি চাই তোমাকে ভাঙতে। ভেঙে গুড়িয়ে দিতে। যাতে তুমি বুঝতে পারো আমি তোমার প্রতিটা গন্তব্যের শেষ ঠিকানা। আমি যেমন যত্ন করে গড়তে পারি তেমনই অযত্ন করে ভেঙে গুড়িয়ে দিতেও পারি।”
আনায়া জানালার বাইরে চোখ ফেরাল, কিন্তু কান্না থামাল না। আর জেভিয়ার তার ভেতরের ঝড় দমিয়ে রাখতে পারল না। কোনো সতর্কতা ছাড়াই,
সে আচমকাই ঝাঁপিয়ে পড়ল আনায়ার দিকে।
তার ঠোঁট শক্তভাবে চেপে বসল আনায়ার ঠোঁটে, এমনভাবে যেন বহু বছর ধরে আটকে রাখা ক্ষুধা একসাথে বেরিয়ে এলো। আনায়ার শ্বাস রুদ্ধ হয়ে গেল। সে পেছনে হেলে সিটের গায়ে ঠেস দিয়ে পড়ল, দুই হাত দিয়ে জেভিয়ারকে ঠেলে সরাতে চাইল, কিন্তু তার শক্তির সামনে সব ব্যর্থ।
জেভিয়ারের হাত শক্ত করে আনায়ার ঘাড়ে গেঁথে আছে, যেন কোনো শিকারকে চেপে ধরে রাখা শিকারী। তার চুম্বনে ছিলো পাগলামী, দখলদারি, আর অদম্য তৃষ্ণা। যেন বহুদিন শুকনো মরুভূমিতে হাহাকার করে থাকা এক যাত্রী হঠাৎ জল পেয়ে গেছে।
আনায়া কাঁপছিল, চোখ দিয়ে টলটল করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল, কিন্তু জেভিয়ার এক বিন্দুও থামল না। বরং আরও গভীর, আরও তীব্রভাবে তার ঠোঁটের প্রতিটি স্বাদ পান করতে লাগল।
শ্বাস নিতে না পেরে আনায়া দুর্বল হয়ে পড়ল, তবুও তার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত টান জন্ম নিল।
ভয় আর ঘৃণার ভেতর কোথাও যেন দগদগে আগুনের মতো এক অজানা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়তে লাগল।
জেভিয়ার এক সেকেন্ডের জন্য ঠোঁট সরিয়ে নিঃশ্বাস ফেলল, চোখ সরাসরি আনায়ার চোখে গেঁথে দিল।
তার ঠোঁটে এখনও সেই শিকারীর মতো হিংস্র হাসি,
“তুমি কাঁদছো কেন? তুমি যতই পালাও, যতই ঘৃণা করো তোমার প্রথম, শেষ, সবকিছু শুধু আমি।”
কথা শেষ করে আবারও ঝাঁপিয়ে পড়ল।
জেভিয়ারের ঠোঁট যখন অদম্য আগ্রাসনে আনায়ার ঠোঁটকে গ্রাস করে নিয়েছে। আনায়ার শ্বাস আটকে আসছে। তার চোখের সামনে ঝাপসা ভাবে ভেসে উঠছে সেই অভিশপ্ত দৃশ্য,
জেভিয়ার আর ইলোরার চুম্বনের দৃশ্য। যেন জ্বলন্ত আগুনের মতো সেই স্মৃতি ফিরে এসে তার বুক ছিঁড়ে ফেলল।
আনায়ার গলা দিয়ে ফুপিয়ে ওঠা শব্দ বের হয়ে এলো। চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে পড়ল।
জেভিয়ার সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল।
সে আনায়ার মুখ থেকে ঠোঁট সরিয়ে নিল, কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।
তারপর হঠাৎই হাত তুলে আনায়ার গালে হালকা চাপড় দিল। না রাগে নয় বরং এক অদ্ভুত ভালোবাসায় ।
সে জিভ দিয়ে নিজের ঠোট ভিজিয়ে উদ্বীগ্ন কণ্ঠে সুধালো,
“কি হয়েছ, লাভবার্ড? আমি কি বেশি হার্ড হয়ে গিয়েছিলাম?”
আনায়া হাঁপাচ্ছিল, চোখে জমে থাকা অশ্রু শুকাতে পারছিল না। জেভিয়ার নিচু হয়ে কণ্ঠস্বর একেবারে নরম হয়ে গেল,
“সরি, লাভবার্ড…আ’ম সরি।”
তার আঙুল দিয়ে আস্তে করে আনায়ার অশ্রুভেজা গাল ছুঁয়ে দিল। আনায়ার বুক ধুকপুক করছে থেমে থেমে। তার চোখ লালচে, ঠোঁট কাঁপছে। জেভিয়ার যখন আঙুল দিয়ে তার অশ্রু মুছতে চাইলো, তখনই আনায়া ঝটকা দিয়ে মুখ সরিয়ে নিল।
ভাঙা গলায়, কিন্তু তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে উঠল,
“ছুঁবে না আমায়… তোমার ইলোরার কাছে যাও।
যেভাবে… যেভাবে কিস করেছিলে তাকে, সেইভাবেই।”
জেভিয়ার এর চেহারায় আচমকাই এক টুকরো হাসি ফুটে উঠলো।
সে ধীরে ধীরে ঝুঁকল আনায়ার দিকে, খুব নিচু স্বরে বলল,
” ওর টায় তেতো টেস্ট ছিলো। তোমার টায় আমি চকোলেট এর টেস্ট পাই। এর জন্য দেখো না তোমার ফুল বডি আমি টেস্ট করি।”
এক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল জেভিয়ার। তার ঠোঁটের কোণে সেই বাকা হাসি। জেভিয়ার আন্দাজ করতে পারলো আনায়ার ক্ষোভের কারণ। অ্যালেক্স তাকে এই বিষয়ে আগেই অবগত করে রেখেছিলো।
কিন্তু জেভিয়ার এবার রাগ করল না। বরং ঝটকা মেরে আনায়াকে নিজের কোলে টেনে নিল।
আনায়া হাপাতে হাপাতে ছটফট করতে লাগল,
“ছাড়ো আমাকে… প্লিজ ছেড়ে দাও!”
কিন্তু তার শরীর শক্ত বন্ধনে আটকে গেল জেভিয়ারের বাহুতে। এক বিন্দুও নড়ার জায়গা নেই।
জেভিয়ার মাথা নামিয়ে আনল।
তার ঠোঁট আনায়ার কানের সাথে ছুইছুই করছে
শ্বাসের গরমে আনায়ার শরীর আরও কেঁপে উঠল।
ফিসফিসে কণ্ঠে জেভিয়ার বলল “এইটুকুও ভরসা নেই তোমার?তোমার জেভিয়ার কখনো, কাউকে স্বেচ্ছায় ছুঁতে পারে?”
তার কণ্ঠে হালকা কাঁপন কিন্তু সেই কাঁপনের ভেতরেই লুকিয়ে আছে শীতল উন্মাদনা।
এক সেকেন্ড থেমে জেভিয়ার হাসল,
“শুধু মনে রেখো লাভবার্ড, আমার শরীর, আমার তৃষ্ণা, আমার পাপ সবটা শুধু তোমার জন্য। অন্য কাউকে আমি এইসবের ভাগ দেবো না।”
আনায়ার বুক ধকধক করছে, চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছে। কিন্তু জেভিয়ারের বাহুতে বাঁধা সে কোথাও যেতে পারছে না।
জেভিয়ারের চোখে এবার অদ্ভুত এক শীতলতা।
সে আনায়ার মুখের কাছে মুখ এনে দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলে, “সত্যিটা জানো, লাভবার্ড?
ইলোরাকে আমি চুম্বন করিনি। ও আমাকে নেশা করিয়েছিল, তারপর যা করেছে সবটাই ওর জোর করে চাপানো।
আর একটা কথা মনে রেখো যে মানুষ স্বেচ্ছায় কাউকে ছোঁয়, তার ছোঁয়া আলাদা হয়। তুমি এতদিন আমার ঠোঁটের ছোয়া পেয়েছো,
বলতে পারোনি? বোঝোনি? এই মাথায় এতটুকু ব্রেইনও নেই তোমার?”
জেভিয়ারের কণ্ঠে কটাক্ষ ভরা ক্ষোভ।
আনায়া ভয়ে আর অভিমানে ঠোঁট কামড়ে বলল,
“কিস তো কিস। স্বেচ্ছায় কোনটা, আর অনিচ্ছায় কোনটা এইটা আবার বোঝা যায় নাকি?”
জেভিয়ার হঠাৎ হেসে উঠল—
সেই পরিচিত হিসহিসে চোখে জ্বলে উঠল দাহ্য উন্মাদনা। “অবশ্যই বোঝা যায়, লাভবার্ড। তুমি যদি না বোঝো তাহলে আমি তোমাকে বোঝাবো। লেট মি শো ইউ দিস।”
সে পকেট থেকে ফোন বের করল। ক্যামেরা অন করতেই স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে আনায়ার ভীত মাখা মুখ। জেভিয়ার তার কণ্ঠ নামিয়ে আনল, ফিসফিস করে বলল,
” ফিল করতে পারছি না বেইবি! দু পাশে পা দিয়ে বসো।”
আনায়া লজ্জায় আড়ষ্ট হিয়ে গেল। আনায়াকে কোলে শক্ত করে আটকে রেখে জেভিয়ার ঝুঁকে এলো। ক্যামেরার সামনে ঠোঁটের সঙ্গে ঠোঁটের মিলনে সামিল হলো দু’জনেই। জেভিয়ার আনায়াকে ছাড়ল না এক মুহূর্তের জন্যও।
তার হাত শক্ত করে আনায়ার চিবুক ধরে রেখেছে,
যেন দুনিয়া ভেঙে গেলেও প্রমাণ করবে এই চুম্বনই আসল, এইটুকুই সত্যি।
দীর্ঘ, উত্তাল মুহূর্তের পর অবশেষে জেভিয়ার আনায়াকে ছাড়ল। তার চোখ ধীরে ধীরে খুলল লালচে, আগুন জ্বলছে, এবং বুক ভারী ভারী নিঃশ্বাসে উঠানামা করছে।
আনায়া তখনো চোখ বুজে রেখেছে, লজ্জায় পুরো শরীর কাপছে তার।
জেভিয়ার মুচকি হেসে ঝুঁকে বলল—
“এইটাকে বলে স্বেচ্ছায় কিস করা বুঝলে, লাভবার্ড? এখন তুমি যেইটা দেখেছো সেইটা আর এইটা মিলিয়ে দেখো।
আনায়া পিটপিট করে তাকালো, চোখে লজ্জার ছায়া। নিশ্বাসগুলো ঘনঘন, ছোট ছোট ঢেউয়ের মতো বেরোচ্ছে। এতদিন পর এত কাছে থেকে জেভিয়ারের স্পর্শ, তার উত্তপ্ত ছোঁয়া, হয়তো ঠিক এ কারণেই এমন হচ্ছে।
জেভিয়ার আনায়ার দিকে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিলল। ফিসফিস করে বলল, কণ্ঠস্বর ভরা কামনায়,
“লাভবার্ড, আমার বডি কিন্তু এখন একদম রেড সিগন্যাল দেখাচ্ছে। প্লিজ, তুমি কিছু খেয়ে নাও, গায়ে একটু শক্তি জোগার করো। নাহলে দেখা যাবে হাফটাইমের মধ্যেই তুমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে।”
আনায়া চোখ সরু করে তাকাল, এক ভ্রু উভিয়ে বলল,
“যে মেয়ে একটানা দুই ঘণ্টার লোড নিতে পারে,
তাকে তুমি দুর্বল, বে বোকামির পরিচয় দিয়ে দিলে না, জেভিয়ার?”
জেভিয়ারের চোখে, মুখে হালকা হাসি ভেসে উঠলো।
জেভিয়ার সবে শাওয়ার শেষ করে, চুল মুছতে মুছতে ধীরে ধীরে রুমের দিকে এগোল।
কিন্তু রুমে প্রবেশ করতেই তার ভ্রু কুচকে গেল।
চারপাশে অদ্ভুত অন্ধকার নিস্তব্ধতা।
সে হাত বাড়িয়ে সুইচবোর্ডের দিকে এগোল।
হাতে মাত্র স্পর্শ পড়তেই রুমে লালচে আভা জ্বলে উঠল, একটু আলো, কিন্তু অদ্ভুতভাবে ঘরটিকে আরও রহস্যময় করে তুলল।
জেভিয়ার চোখ স্বাভাবিক করতে একটু ঘুরিয়ে তাকাল। তখনই তার সামনে ভেসে উঠল একটি প্রতিবিম্ব। কেবল তার থেকে কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে একজন নারী।
জেভিয়ার পায়ের তলায় জমে থাকা ফ্লোরের ঠাণ্ডা অনুভব করল, কিন্তু চোখ থেকে সরানো গেল না।
নারীর সেই স্থির দৃষ্টি, লালচে আভায় ভেসে ওঠা ফিগার সবকিছু যেন এক অদ্ভুত এম উন্মাদনার সুন্দরতা তৈরি করছে।
জেভিয়ার চোখ মুহূর্তের জন্য আটকে গেল।
মেয়েটির শরীরের প্রতিটি ভঙ্গি লালচে আভায় ভেসে উঠল।
মেয়েটি পরেছে লাল রঙের সিল্কের চিকন বেল্টের পোষাক যা ছোট, লম্বায় হাটুর খানিকটা ওপরে শেষ হচ্ছে। চুলগুলো খুলে রাখা, ঢিপঢিপ আলোয়ও পুরো শরীরের রূপ, গঠন ও বাক স্পষ্টভাবে ফুটে উঠছে।
জেভিয়ার নিজের অজান্তেই গিলে ফেলল শুকনো ঢোক। মেয়েটি হেলান দিয়ে বাকা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে, বাম হাতের আঙুকে ঝুলছে হ্যান্ডকাফ।
জেভিয়ার চোখে আগুনের মতো ঝলমল শুরু হল।
হঠাৎ ভেতরে অদ্ভুত এক উত্তেজনা, শীতল উন্মাদনা। সে মোটেও আর নিয়ন্ত্রণে নেই।
সে ধীরে ধীরে আনায়ার দিকে এগিয়ে গেলো জেভিয়ার সামনে গিয়ে দাড়াতেই আনায়া জেভিয়ার এর ঘাড়ের দু পাশে হাত রেখে পায়ের গোড়ালি উচু করে জেভিয়ার এর কান বরাবর ধীর কন্ঠে বলে,
“টুডে আই ওয়ান্ট টু ট্রাই সামথিং ডিফরেন্ট। ”
জেভিয়ার ভ্রু উচিয়ে বলে, “কি ট্রাই করতে চান আপনি ম্যাডাম?”
আনায়া জেভিয়ার এর গলা জড়িয়ে ধরে বলে, “এমন কিছু ট্রাই করব, যেইটায় তুমি নিজে থেকে বলতে বাধ্য হবে- জাস্ট কিল মি লাভবার্ড।”
জেভিয়ার আনায়াকে তীক্ষ্ণ চোখে পরোখ করে সাথে সাথে কোলে তুলে নিয়ে বেডে নিয়ে যেতে যেতে বলে, ” লেটস সি…..”
আনায়াকে বিছানা ফেলে জেভিয়ার তার দিকে ঝুকে পড়ে তার নরম ওষ্ঠজোড়া আবার দখল করে নেয়। এবং এক হাতে আনায়ার দেহের দেহের উচু চূড়ায় চাপ প্রয়োগ করতে থাকে।
আনায়াকে জেভিয়ার এক হাতে তে নিজের কোলে বসিয়ে নেয় দু পাশে পা দিয়ে। এবং আনায়ার গায়ের পোশাকের কাধের স্ট্র্যাপ নামাতে থাকে। আচমকাই আনায়া থেমে গিয়ে মাথা দূরে সরিয়ে নেয়। জেভিয়ারের চোখে উন্মাদনা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। সে বিরক্তি চোখে তাকায় আনায়ার দিকে।
আনায়া পেছন থেকে হ্যান্ডকাফ টা সামনে এনে জেভিয়ার এর সামনে তুলে ধরে বলে, “পেছনে যাও বিছানার হেডবোর্ডের কাছে।”
জেভিয়ার কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে তীক্ষ্ণ হেসে পেছনে চলে যায়। আনায়া জেভিয়ার পেটের ওপর দু পাশে পা দিয়ে বসে জেভিয়ার এর হাত তুলে হ্যান্ডকাফ দিয়ে হেডবোর্ডের সাথে আটকে দেয়।
জেভিয়ার শান্ত চোখে চেয়ে আছে। আনায়া নিজেই তার পোশাক খুলে নিজেকে উন্মুক্ত করে জেভিয়ার এর কোলে আগের মতই বসে থাকে। জেভিয়ার আনায়াকে চোখ দিয়ে সম্পূর্ণ টা স্ক্যান করে ঢোক গিলে বলে,
“তুমি আসলে ঠিক কি করতে চাইছো?”
আনায়া জেভিয়ার এর দিকে ঝুকে ফিসফিস করে বলে,
“তুমি শুধু আমাকে এখন দেখেই যাবে। আর কিছুই করতে পারবে না। এন্ড দিস ইজ ইওর পানিশমেন্ট হানি।”
জেভিয়ার অসহায় কন্ঠে মিনতি করে বলে,
“প্লিজ লাভবার্ড, খুলে দাও এইটা। মরে যাচ্ছি আমি।”
আনায়া মুচকি হেসে নিজের চুলগুলো পেছনে নিয়ে জেভিয়ার এর বিশেষ অঙ্গে নিজের নিজের হাত বুলিয়ে বলে, ” হার্ড হয়ে আছে অনেক। ”
অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ২০
” সব খুলে বসে থাকবে আমাকে পাগল করার জন্য। আর এইটা কি রাবার হয়ে থাকবে?” জেভিয়ার ভ্রু কুচকে বিরক্তি নিয়ে বলে।
আনায়া হেসে ওঠে খিলখিল করে। জেভিয়ার চোখ বন্ধ করে একটা বড় নিশ্বাস নিয়ে ঠান্ডা কন্ঠে বলে,
” যদি এইটা আমার খুলতে হয়, তুমি দাড়ানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে কিছুদিনের জন্য। এখন সেইটা কি তুমি চাও?”
