Home অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ২৩

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ২৩

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ২৩
শ্রাবণী ইয়াসমিন

ঘর্মাক্ত শরীরে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে জেভিয়ার।
তার সামনেই মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ে আছে এক লোকের লাশ। ঘাড়ের মধ্যে গভীরভাবে ঢুকে আছে ধারালো ছুরি।
জেভিয়ারের ভেজা কপালের সাথে চুল লেপ্টে আছে, পরনে শুধু কালো ট্রাউজার আর চিকন হাতার গেঞ্জি।
তার চেহারায় কোনো আতঙ্ক নেই, বরং এক অদ্ভুত শীতলতা। সে বাম হাতের উলটো পিঠ দিয়ে কপালের ঘাম মুছে নিলো, তারপর ধীর ভঙ্গিতে নিচু হয়ে লা*শটার পাশ থেকে র*ক্তে ভেজা একটা কাগজ তুলে নিলো।
চোখের সামনে কাগজটা মেলে ধরতেই তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো এক বিদ্রূপাত্মক হাসি।
জেভিয়ার মুহূর্তেই লাশটার ঘাড় সোজা করে ধরে তার নিথর কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“আমার নাম জেভিয়ার… শুনেছিস? আবারও বলছি… আমার নাম জেভিয়ার। আর জেভিয়ারকে ফাঁসানোর জন্য যে জাল বিছিয়েছিস, সেই জালে তোরা একে একে নিজেরাই আটকে মরবি। তবুও আমার আসল আমি কে উন্মোচন করতে পারবি না। তুই কেন, তোর পরের চৌদ্দ পুরুষের বংশধরও না।”

ছুরিটা এক ঝটকায় টেনে বের করলো সে। র*ক্ত ছিটকে এসে গেঞ্জি আবারও লাল করে দিলো।
জেভিয়ারের চোখে তখন এক অদ্ভুত ক্ষো*ভ। যেন এই র*ক্তই তার যুদ্ধক্ষেত্রের ইন্ধন।
জেভিয়ার ঘাড় হেলিয়ে পেছনের সিঁড়ির দিকে তাকাল।
উপরে, রুমে আনায়া এখনো গভীর ঘুমে ডুবে আছে।
গত রাতের ধকল তাকে ভোরের আলো পর্যন্ত নিঃশেষ করে ফেলেছিল। তাই এখন ঘুম ভাঙার কোনো সম্ভাবনাই নেই।
কিছুক্ষণ আগেই তার কাছে অ্যালেক্সের মেসেজ এসেছিলো, “বাড়িতে আনায়ার নামে এক পার্সেল এসেছে। ডেলিভারি ম্যানটা অচেনা।”

জেভিয়ার জানে, এটা স্রেফ পার্সেল নয়। তাই দরজা খুলে দাঁড়িয়ে ছিলো সে। শিকারি যেমন শিকারের আগমনের প্রতীক্ষায় থাকে,অভ্যর্থনা জানানোর জন্য নয় ছিন্নভিন্ন করার জন্য।
ঠিক তখনই গেটের কাছে লোকটা এসে কলিংবেল টিপতে যাবে, তার আগেই জেভিয়ার নিঃশব্দে সামনে গিয়ে দাঁড়াল। লোকটার বুক কেঁপে উঠল। চোখে-মুখে স্পষ্ট আতঙ্ক। মনে হলো, যেন জেভিয়ার ঠিক তারই অপেক্ষায় ছিল।
জেভিয়ারের ঠোঁটে ফুটে উঠলো এক শীতল, ভয়ংকর হাসি। ধীর অথচ ধারালো কণ্ঠে বলল, “মার্সারের কাছ থেকে কি পার্সেল এসেছে আমার লাভবার্ডের জন্য? আমি কি একটু… চেক করতে পারি, প্লিজ?”
লোকটার চোখে আতঙ্ক জমে বরফ হয়ে গেলো।
জেভিয়ারের প্রতিটি শব্দ তার কানে কেঁপে উঠলো ধাতব প্রতিধ্বনির মতো।
জেভিয়ার ঠোঁটে হাসি টেনে বলল, “প্লিজ… কাম ইনসাইড। বাহিরে দাঁড়িয়ে কেন? আমি যত খারাপই হই না কেন, বাড়িতে আসা অতিথিদের সবসময় আমার বেস্টটা দিয়ে আপ্যায়ন করার চেষ্টা করি। হোক সেইটা শত্রুপক্ষের লোক।”

“শত্রুপক্ষ…”
শব্দটা লোকটার কানে যেন ঘন্টাধ্বনির মতো বাজতে লাগলো। মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তাহলে… জেভিয়ার জেনে গিয়েছে তার পরিচয়?
জেভিয়ার হাত বাড়িয়ে বলল, “আপনার কাছে যে কাগজটা আছে, দিতে পারবেন কি?”
লোকটা কাগজটা শক্ত করে চেপে ধরে রাখল, চোখের কোণে আতঙ্ক খেলা করছে। কিন্তু দিতে চাইল না।
জেভিয়ার চোখ বন্ধ করল। ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক মুচকি হাসি ফুটে উঠল।
“প্লিজ… অনুরোধ করছি আমি। দিন… প্লিজ।”
লোকটা তাও দিল না। তার আঙুল আরও শক্ত হলো কাগজের ওপর।
এইবার জেভিয়ার চোখ খুলল। হাসিটা প্রশস্ত হলো, ঠান্ডা অথচ অস্বস্তিকর। সে ধীরে ধীরে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল।

“ঠিক আছে… অপেক্ষা করুন। আপনার জন্য কিছু ফলমূল কেটে আনি।”
লোকটার বুক ধড়ফড় করছে। ঘামের ফোঁটা কপাল বেয়ে নামছে। আগে সে কখনো জেভিয়ার ড্রেভেন এর মুখোমুখি হয়নি। শুধু শুনেই এসেছে তার সামনে পড়লে যে কেউ ঘাবড়ে যেতে বাধ্য।
লোকটা এই সুযোগে সে চুপিসারে চেয়ার থেকে উঠে দরজার দিকে এগোল। পালানোর চেষ্টা করতেই, কিন্তু তার আগেই জেভিয়ারের হাত দিয়ে এক টানে লোকটার কলার ধরে টেনে আনল সামনে।
পরের মুহূর্তেই জেভিয়ারের হাতের কুনুইয়ের মাঝে চাপা পড়ল তার গলা। শ্বাসরোধ হতে লাগল। আর জেভিয়ারের অন্য হাতে ধরা ফল কাটার ছুরি চকচক করে উঠল।
হঠাৎই ছুরিটা লোকটার ঘাড়ের ডান পাশে ঢুকে গেল।
তারপর একই সাথে টেনে বের করা হলো। এমন বারবার কয়েকবার করতেই মুহূর্তেই গরম র*ক্ত ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে এল, দেয়াল, মেঝে ভিজিয়ে দিলো,
এমনকি ছিটকে এসে লাগল জেভিয়ারের মুখেও।
গরম র*ক্তের ছোঁয়া জেভিয়ারের ঠোঁটে পড়তেই,
সে আঙুল বুলিয়ে তা মুছে নিল। চোখে সেই একই শীতল উন্মাদনা।
ঠোঁট দিয়ে ধীর এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। এক হাত থেকে র*ক্তমাখা ছুরিটা টেবিলের ওপর ঠক করে ফেলে দিয়ে, সে লোকটার নিস্তেজ দেহটাকে কলার ধরে ঝাঁকিয়ে ছেড়ে দিলো।
শরীরটা মেঝেতে ধপ করে আছড়ে পড়ল।
র*ক্ত ছিটকে চারপাশে ছোপ ছোপ হয়ে ছড়িয়ে গেল।
কিছুক্ষণ জেভিয়ার স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কপাল বেয়ে নামা ঘাম র*ক্তের ফোঁটার সাথে গুলিয়ে গড়িয়ে পড়ছে গালের পাশে।

২৫ তলার বিশাল এক অফিস কক্ষ। ভেতরে চারপাশ অন্ধকার, শুধু টেবিলের মাঝখান থেকে ছড়িয়ে আসা সাদা আলো।
এক পাশে বসে আছে জন ড্রেভেন। তার পাশেই কড়া চাহনিতে গম্ভীর মুখে এরিক্স ড্রেভেন।
সামনের দুই চেয়ারে জায়গা নিয়েছে দু’জন লিও হেনরিক্স আর ইলোরা। লিওর চোখে সবসময়কার সেই ঈর্ষণীয় আত্মবিশ্বাস, আর ইলোরার মুখে গভীর চিন্তার ছাপ।
চারজনের দৃষ্টি নিবদ্ধ বড় স্ক্রিনের দিকে। সেখানে ভেসে উঠেছে এক মুখোশধারী পুরুষের ছবি।
কালো মাস্কে ঢাকা মুখ। কিন্তু তার হাতের অংশে আঁকা নীল রঙের বিচ্ছুর ট্যাটুটা স্পষ্টভাবে জ্বলজ্বল করছে।
এই ট্যাটুই তাকে আলাদা করে চেনে সবাই। যে কেউ একবার দেখলেই বুঝবে এইটা কে হতে পারে।
সে এক রহস্যময় পুরুষ, একজন সুপুরুষ, যার চেহারা সচরাচর কারো দেখা হয়নি শুধু তারা বাদে যারা তার সাথে রাত কাটিয়েছে। নিস্তব্ধতার ভেতর হঠাৎ এরিক্স বলে উঠল,

“আমার মনে হয় না ভাই জানতে পেরেছে যে আমরাও এর পেছনে আছি। জানলে এতক্ষণে বড় ঝড় বয়ে যেত।”
ইলোরা নিঃশব্দে মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো। জন ড্রেভেন এবার সামনের দিকে ঝুঁকে ডেভিডের উদ্দেশ্যে বলল,
“আপনার কি মনে হয়? এখন আমাদের কি করা উচিত?”
স্ক্রিনের ভেতর থেকে ভেসে এলো ডেভিড মার্সারের কণ্ঠ।
সে হেলান দিয়ে বসল, যেন কোনো দুশ্চিন্তাই নেই।
তারপর হাই তুলল একবার।
“মৌনতা বিরাট কোনো ঝড়ের আগাম সংকেত। এইটা জানেন তো?”
এরিক্স ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “মানে?”
ডেভিড নিজের দুই হাত একসাথে জড়ো করল। তার কণ্ঠে এক অদ্ভুত এক গাম্ভীর্য, “জেভিয়ার আগা থেকে গোড়া সবই জানে। তবে সে চুপ কেন আছে ঠিক বলতে পারছি না।”
কথার ধার কেটে হঠাৎই লিও হেনরিক্স চেয়ারে হেলান দিয়ে আঙুলে আঙুল ঠুকতে ঠুকতে বলল, “আচ্ছা, এইসব বাদ দাও। আগে বলো এইবার কয়টা মেয়ে জোগাড় হলো? আর ভিক্টরই বা কোথায়? ও ছাড়া মেয়ে জোগাড় হবে কি করে?”

এরিক্স ঠোঁটে হালকা বিরক্তি টেনে উত্তর দিলো, “ভিক্টর আছে,?মেয়েদের কাজ তো ও-ই করে। মেয়ে হয়েছে প্রায় আঠারোটার মতো। আর দুইটা হলেই ডেলিভারি দিয়ে দেবো। এই ঝামেলা আর ভালো লাগছে না।”
সে হঠাৎ থেমে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে যোগ করল, “এর আগে একটা মেয়ে পালিয়েছিলো কি যেন নাম অ্যাশলি।
ওকে তো আর চিরুনি তল্লাশি করেও পাওয়া গেল না।
নইলে উনিশটার মতো হয়ে যেতো, আর একটা হলেই কাজ শেষ হতো।”
জনের মুখ সঙ্গে সঙ্গে রাগে লাল হয়ে উঠল। সে টেবিলে ঘুষি মেরে উঠল চিৎকার করে বলে, “পালিয়েছে মানে?
আমাকে আগে জানাওনি কেন? এখন যদি পুলিশকে ইনফর্ম করে দেয়?”
এরিক্স ভ্রু কুঁচকে কিন্তু শান্ত গলায় বলল, “রিল্যাক্স, ড্যাড। ওর কাছে কোনো প্রুভই নেই। আর ওর এত সাহসও কুলাবে না যে পুলিশে কমপ্লেইন করবে।

করতে হলে এতদিনে করে ফেলত। হয়তো এই দেশও ছেড়ে পালিয়েছে। দেখে নিও।”
কথার মাঝেই হঠাৎ ডেভিড ফোন কেটে দিলো।
স্ক্রিন কালো হয়ে গেল। কোনো বিদায় নেই, কোনো সৌজন্য নেই। সবাই একসাথে বিরক্ত হয়ে তাকালেও কিছু করার নেই। কারণ ডেভিড মার্সারের স্বভাবটাই এমন। তার কথা শেষ হলেই সে আর এক মুহূর্তও কারও কথা শোনার প্রয়োজন বোধ করে না।
ঘরে এক মুহূর্তের জন্য অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো।
এরিক্স চেয়ারটা ঠেলে একটু সামনের দিকে ঝুঁকল।
চোখে এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে বলল,
“তবে আর যাই হোক, ভিক্টরকে না পেলে আমরা এইবার সত্যি পথে নামতাম। ছেলেটা প্রচুর তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন।
জেভিয়ারের মতই।”
ইলোরা হেসে উঠল।
ঠোঁটের কোণে বিদ্রূপের রেখা খেলা করছে।
“এমনি এমনি তো আর ওরা বেস্টফ্রেন্ড ছিলো না।
মেন্টালিটি মিলতো বলেই একসময় বেস্টফ্রেন্ড ছিলো।”

আনায়া বিছানায় থম মেরে বসে আছে। দু’হাত শক্ত করে পেটে চেপে রেখেছে। পেটটা ভীষণ মোচড়াচ্ছে,
চেষ্টাও করছে উঠে দাঁড়াতে কিন্তু শরীর সাড়া দিচ্ছে না।
ঘুমও ভাঙেনি পুরোপুরি, দুপুরের মধ্যেই এই যন্ত্রণা শুরু হয়ে গেছে। শুরুর দিকে পাত্তা দেয়নি, ভেবেছিলো হয়তো সাধারণ ব্যাথা। কিন্তু ধীরে ধীরে ব্যথাটা যেন অসহ্য হয়ে উঠছে।
একসময় তরাক করে চোখ মেলে তাকাল। গায়ের ওপর থেকে ব্ল্যাংকেট সরাতেই চোখ পড়ল বিছানার চাদরে,
তারপরই বিরক্তি আর অস্বস্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে উঠলো।
চারপাশে তাকালো কিন্তু জেভিয়ার নেই। এতদিনে একবারও তার খেয়াল হয়নি যে এই সময়টা তার পিরিয়ডের ডেট ঘনিয়ে এসেছে।
কোমর, হাত-পা ব্যথায় দম বন্ধ হয়ে আসছে, মোটেও নড়াচড়া করতে পারছে না। তার মধ্যে আবার এই নতুন উটকো ঝামেলা এসে হাজির।
ঠিক তখনই ওয়াশরুমের দরজা খুলে বের হলো জেভিয়ার। আনায়ার চোখে পড়তেই আরও গুটিয়ে নিলো নিজেকে, চাদরটা বুক পর্যন্ত টেনে ধরল।
জেভিয়ার ভ্রু কুঁচকে থেমে গেল কিছুক্ষণ।
ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে গিয়ে থেমে দাঁড়াল বিছানার সামনে।
“হোয়াট’স রং?”
আনায়া তাড়াতাড়ি মাথা নাড়িয়ে বলল,

“কিছু না।”
কিন্তু জেভিয়ারের চোখ এক মুহূর্তের জন্যও সরল না।
সে আনায়ার চেহারা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। ঠোঁটের এক কোনা ফুলে আছে, ঘাড় থেকে গলার অংশজুড়ে ছোপ ছোপ লাল দাগ জমাট বেঁধে আছে, চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ঝরে পড়েছে কপালে।
জেভিয়ার একবার ঢোক গিলল। এরপর একটু ঝুকে জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলে, “ব্ল্যাংকেটের ভেতরে আসব আমি?”
আনায়া চোখ কপালে তুলে তরাক করে তাকাল তার দিকে।
“পাগল তুমি? আমি সোজা হয়ে বসতেই পারছি না!
আমার পুরো শরীর ব্যথা করছে।
যেখানে যেখানে বাইট দিয়েছো সব জায়গায় জ্বলছে।
মনে হচ্ছে কেউ আমার রক্ত শুষে নিয়ে গেছে।”

জেভিয়ার হালকা অধর বাঁকিয়ে দিলো। চোখে ঝিকমিক করছে ভয়ংকর এক উন্মাদনা, “তা দেখেই তো বোঝা যাচ্ছে। তবে চিন্তা করো না, আমি আছি না? তোমার সব ব্যথা দূর করে দেবো। তুমি শুধু একবার বলো, আ’ম রেডি জেভিয়ার। তারপর দেখো ব্যথা কীভাবে উধাও হয়ে যায়।”
আনায়া বোকা চোখে তাকিয় বলে, “মানে?”
জেভিয়ার ঠোঁটের কোনা বাঁকিয়ে এক অদ্ভুত হাসি দিলো।
“আরে শোনো নি? কাটা দিয়ে কাটা তুলতে হয়। তাই তো একবার কাছে এসে ব্যথা দিয়েছি, এইবার কাছে এসে ব্যথার উপশম করে আসবো।”
আনায়া ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে হাতের কাছে থাকা কুশনটা জেভিয়ার দিকে ছুড়ে মারল। জেভিয়ার সেইটা এক হাতে ধরে ফেলল। ধীরে ধীরে আনায়ার দিকে এগিয়ে গেল এবং গায়ের ব্ল্যাংকেট খুলতে হাত বাড়াতেই,
আনায়া হাত শক্ত করে বলল, “নো, প্লিজ জেভিয়ার। আমার পিরিয়ড…”
কথা এখানেই থেমে গেল। জেভিয়ার চুপচাপ কয়েক মুহূর্ত ধরে তাকিয়ে রইল। তার চোখে গভীর মনোযোগ।

“প্রয়োজনীয় সব আছে?” সে ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করল।
আনায়া মাথা নাড়িয়ে বলল না।
জেভিয়ার ফোস করে নিশ্বাস ছেড়ে বলে, “আচ্ছা, বসো।
আমি পাঁচ মিনিটে আসছি।
আনায়া তার হাত ধরে বলল, “আমাকেও নিয়ে যাও।”
জেভিয়ার একটুখানি ভ্রু কুঁচকে তাকাল,
“তুমি তো সিক। কি করে যাবে?
আনায়া কপট জেদ দেখিয়ে বলল, “যাবো মানে, যাবোই।”
জেভিয়ার আর কিছু বলল না। সে আনায়াকে নিজের একটি টিশার্ট পরতে দিলো, আর আরেকটি প্লাজু হাতে ধরিয়ে বলল, “ফাস্ট পড়ো, লেট হয়ে যাচ্ছে।”
আনায়া ঠোঁট উলটে বলল, “আমি এইসব পড়ে যাবো না।”
জেভিয়ার ভারী কন্ঠে বলল, “পড়বে নাকি শুধু টিশার্ট গায়ে দিয়েই,তুলে নিয়ে যাবো?”
আনায়া দ্রুত প্লাজু পড়ে নিল। এই ছেলেকে দিয়ে বিশ্বাস নেই পড়ে দেখা যাবে এইভাবেই নিয়ে গিয়েছে। মাথার চুলগুলো হাত দিয়ে ঠিক করতে লাগল। কারণ সে জানে জেভিয়ার এখন তাকে তৈরি হওয়ার জন্য এক সেকেন্ডও সময় দেবে না।

হলোও তাই কোনো রকম আগাম বার্তা ছাড়াই জেভিয়ার আনায়াকে বিছানা থেকে ধরে পাজাকোলে তুলে নিল।
আনায়া বিব্রত হয়ে মাথা নিচু করে আস্তে আস্তে বলল,
“জেভিয়ার, আমাকে নামিয়ে দাও প্লিজ, ব্লি*ডিং হচ্ছে। তোমার লেগে যাবে।”
জেভিয়ার তার দিকে না তাকিয়েই গম্ভীর মুখে বলল,
“তো?”
আনায়া ইতস্তত করে আরেকবার বলল, “তুমি নোংরা হয়ে যাবে!”
জেভিয়ার ভাবলেশহীন ভাবে বলল,
“নোপ।”
তারপর আনায়া আর কিছুই বলেনি।
জেভিয়ার আনায়াকে কোলে নিয়েই পুরো শপিং মল ঘুরে বেরাচ্ছে। আনায়ার শরীরে মোটা জ্যাকেট পেচিয়ে রাখা।
পাশপাশে থাকা মানুষেরা আড়চোখে এই যুগলকে খেয়াল করছে। কেউ কৌতূহল দিচ্ছে, কেউ চুপচাপ তাকিয়ে আছে। আনায়া শুরুতে লজ্জায় রঙে রঙিন হয়ে যাচ্ছিল।
কিন্তু ক্রমশ অনুভব করল কী অদ্ভুতভাবে ভালো লাগছে এই অবস্থাটা। কার না ভালো লাগবে, যখন এমন শক্তিশালী, যত্নশীল মানুষটি তাকে কোলে নিয়ে ঘুরছে?
জেভিয়ার আনায়ার প্রয়োজনমতো সব কিছু কিনে দিচ্ছে। অনেকগুলো স্যানিটারি ন্যাপকিন, চকোলেট, চিপস এমনকি আনায়ার পছন্দের মিষ্টি জিনিসগুলোও।
আনায়া ভাবল যদি সে প্রতিদিন পাঁচটা করে খায়, তবুও শেষ করতে তার এক বছর লেগে যাবে।
হঠাৎই আনায়ার চোখ পড়ল শপিং মলের আইসক্রিম সেক্টরে। চোখ বড় হয়ে গেল, মুখে অল্প বিস্মিত হাসি।
আনায়া নিজের ছোট্ট চিকন আঙুল দিয়ে জেভিয়ার এর গালে হালকা খোচা দিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“আইসক্রিম চাই!”
জেভিয়ার আনায়ার দিকে একবার তাকিয়ে ভ্রু উচিয়ে মাথা দু পাশে নেড়ে আইসক্রিম কেনার দোকানের দিকে এগোল।
আনায়া ভাবছিল, হয়তো অনেকগুলো আইসক্রিম দিবে,
কিন্তু জেভিয়ার শুধু একটা আইসক্রিম কিনে আনায় দিল। আনায়ার মুখ ছোট হয়ে গেল, চোখে একটু হতাশা ।
জেভিয়ার আনায়ার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুচকে বলল,
“কি হলো?”
আনায়া ভ্রু কুচকে বলল, “একটা মাত্র?”
জেভিয়ার গম্ভীর।ভাবেই উত্তর দিল,
‘এমনি ওয়েদার, ঠান্ডা। তার মধ্যে আইসক্রিম খেলে ঠান্ডা লাগবে। তাই একটাই এনাফ।”
আনায়া ভ্রু কুচকে আরও জেদ দেখিয়ে বলল,

“না! আমার একটায় হবে না, আরও চাই!”
জেভিয়ার আনায়ার কথা উপেক্ষা করে বলল,
“নো, আর পাবে না।”
আনায়া এবার বাচ্চাদের মত ঠোঁট উলটে বলল,
“আই ওয়ান্ট মোর, জেভিয়ার!”
জেভিয়ার তার দিকে চোখ সরু করে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেলল।
“বাড়িতে গিয়ে নেই, তখন দেখবো কত নিতে পারো।”
আনায়া বোকার মতো কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে জেভিয়ার এর ঘাড়ে নখ চেপে দিয়ে বলল,
“জেভিয়াররররররররর…”
জেভিয়ার হালকা হেসে বলল,
“ইয়াপ, লাভবার্ড আ’ম লিসেনিং।”

কাচের টেবিলের ওপর কলম দিয়ে খটখট শব্দ তুলে যাচ্ছে ভিক্টর। তিনদিনের মধ্যে দুটো মেয়ে যোগাড় করা কি মুখের কথা নাকি? হ্যা বোধহয়। ভিক্টর এর কাছে এইগুলো চেস খেলার মতই সহজ। তবে সে আজকাল এইসব খেলায় মজা পাচ্ছে না।
প্রতিদ্বন্দ্বী মন মত হচ্ছে না তার। প্রতি খেলায় বাজিমাত করলে সে খেকার প্রতি আগ্রহ কাজ করে না। তার প্রিয় প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলো তার এক্স বেস্ট ফ্রেন্ড জেভিয়ার। যার সাথে খেলতে গেলে ঘাম ছুটে যেত।
তবে আজকাল জেভিয়ার কে পাওয়া যাচ্ছে না এই নিয়ে বড়োই হতাশ ভিক্টর। সে তো কোনোদিন ভাবতেও পারেনি জেভিয়ার কোনো মেয়ের প্রতি অ্যাডিক্টেড হয়ে পড়বে।
আজ ভিক্টরের তাদের বন্ধুত্বের পুরোনো দিনের কথা বেশ মনে পড়ছে। না চাইতেও বুক ফুড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসছে।

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ২২

বর্তমান থেকেও আরও ৯ বছর আগের কথা…..
২০১৩সালের কথা…
জেভিয়ার এবং ভিক্টর দুজনেই তখন টগবগে যুবকের খাতায় নাম লিখিয়েছে। জেভিয়ার এর বয়স তখন ২১ এ পা দিয়েছে সবে। জেভিয়ার এর থেকে ভিক্টর ৪ মাসের বড়।
তবে জেভিয়ার এর সাথে ছোট থেকেই বের ভালো বন্ধুত্ব ছিলো তার। তবে হঠাৎ একদিন সব ওলোট পালোট হতে লাগলো যেদিন থেকে ভিক্টর প্রথম কোনো নারীর সাথে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হলো।

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ২৪