Home অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ২৯

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ২৯

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ২৯
শ্রাবণী ইয়াসমিন

২ দিন পর…
রাত মোটামুটি গভীর হয়ে এসেছে। ঘড়ির কাঁটা তখন আনুমানিক বারোটা কি একটার টার মাঝামাঝি।
আনায়ার বুকের ভেতর মুখ গুঁজে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে জেভিয়ার। তার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা যেন আনায়ার শরীরের ভেতর মিশে যাচ্ছে।
হঠাৎ করেই মোবাইলের রিংটোনে ভেঙে গেল জেভিয়ারের ঘুম। আনায়ার ঘুমও খানিকটা হালকা হয়ে এলো। চোখ দুটো কুঁচকে নড়েচড়ে আবার স্থির হয়ে গেল সে।
জেভিয়ার দ্রুত হাত বাড়িয়ে ফোনটা হাতে নেয়, ভলিউম একদম নিচে নামিয়ে দেয়। তারপর একবার আনায়ার দিকে তাকায়। মেয়েটা আবার ঘুমে তলিয়ে গেছে। সে নিঃশব্দে উঠে দাঁড়িয়ে বারান্দায় চলে যায়। ফোন কানে তুলতেই তার কপালে গভীর তিনটে ভাঁজ পড়ে। চোয়াল শক্ত হয়ে যায়।“ধরে রাখ ওকে আমি আসছি।”গম্ভীর ভাবে বলে কথা শেষ করেই ফোন কেটে দেয় সে।
রুমে ফিরে এসে তাড়াহুড়ো করে পোশাক পালটে নেয়। তারপর ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে আনায়ার পাশে গিয়ে বসে। শান্ত মুখে হাত ছুঁয়ে দেয়।
একটা আলতো চুমু খায় গালে। ফিসফিসিয়ে বলে,

“আমি একটু বাইরে যাচ্ছি দুপুরের মধ্যেই চলে আসব।ভয় পেয়ো না। তোমার পুরো সুরক্ষার ব্যবস্থা করেই যাচ্ছি আমি।”
আনায়া যেন আধঘুমে কিছুটা বুঝলো নাকি কে জানে তবুও চোখ মেলল না। শুধু ‘উম উম’ শব্দ করে আবার ঘুমের গভীরে হারিয়ে গেল। জেভিয়ার কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তার দিকে। মুখে অদ্ভুত কোমলতা। তারপর নিঃশব্দে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল সে।
সিড়ি দিয়ে নামতে নামতে জেভিয়ার ভরাট গলায় হঠাৎ ডেকে উঠলো, “টাইসন, ভেনম” সঙ্গে সঙ্গেই অন্ধকার থেকে উঠে এলো দুটি বিশাল, মানুষ খে*কো জাতের কুকুর। লালচে চোখে তারা তাকিয়ে আছে, দাঁত উঁচিয়ে গর্জন করছে।
জেভিয়ার তাদের দিকে ধীরে এগিয়ে গিয়ে প্রথমে টাইসনের, তারপর ভেনমের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, “তোদের ম্যাডামের দায়িত্ব দিয়ে যাচ্ছি তোদের খেয়াল রাখিস।” এরপর সে কিচেনে গিয়ে ফ্রিজ থেকে দুটি বড় মাংসের পিস বের করলো। কুকুরদুটোর সামনে ফেলে দিয়ে বললো, ” খেয়ে নে রাত জাগতে হবে তোদের। কোনো জানোয়ার এলে ওদের ছিড়ে খেয়ে ফেলার জোর লাগবে তো!”
কুকুর গুলো দাঁত উঁচিয়ে মাংসে ঝাঁপিয়ে পড়লো। জেভিয়ার গ্যারাজের দিকে এগিয়ে যাওয়া দৃশ্যের সঙ্গে কুকুরদের ভয়ানক গর্জন রাতের অন্ধকারে গুঁড়িয়ে গেলো। গাড়ি গর্জন করে বাইরে বেরিয়ে গেল, আর সঙ্গে নিয়ে গেলো এক অজানা গন্তব্যের ছায়া।

অ্যাশলি বিছানার ওপর দুই পা জড়িয়ে বসে আছে। একটু আগেই খাওয়া শেষ করে ঘরে ফিরেছে। আজ ঠিক দুই দিন হয়ে গেলো অ্যালেক্সের সঙ্গে তার আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। কিন্তু যোগাযোগই বা হবে কীভাবে? অ্যাশলির তো নিজের কোনো ফোন নেই, যে সে নিজেই কল করবে বা মেসেজ দেবে।
তবুও মনটা আজ অদ্ভুতভাবে ছটফট করছে। অ্যালেক্স কি একবারও তার কথা ভাবছে না? দু’দিনেই কি ভুলে গেলো তাকে? ভুলে না গেলে অন্তত একবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করতো না?
অ্যাশলির অবুঝ মনটা বিষণ্ণতায় ভরে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। চোখের সামনে ভেসে উঠছে অ্যালেক্সের চেহারা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, গম্ভীর মুখ, আর সেই কণ্ঠস্বর যা তাকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দিতো।
সে বড় করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তারপর ধীরে হাত বাড়িয়ে বেডসাইড ল্যাম্পের সুইচ টিপে বন্ধ করে দিলো। ক্লান্ত দেহ নিয়ে পড়লো বিছানায়।
বেশ গভীর রাত। ঘুমে আচ্ছন্ন অ্যাশলির হঠাৎই মনে হলো চেহারার ওপর উষ্ণ নিশ্বাস পড়ছে। অচেতন ঘুম ভেঙে এসে চোখ পিটপিট করতে করতে তাকাতেই দেখলো এক ছায়ার মতো কিছু তার ওপর ঝুঁকে আছে। ভয়ে চোখ বড় বড় হয়ে উঠলো, চিৎকার করতে যাবে, ঠিক তখনই একটা শক্ত হাতে তার ঠোঁট চেপে ধরলো।

“হুশশশ ধরা পড়াতে চাও নাকি আমাকে?”
চেনা পরিচিত কণ্ঠস্বরটা কানে আসতেই অ্যাশলির বুকের ভেতরের আতঙ্ক যেন মুহূর্তেই গলে গেলো। এ যে অ্যালেক্স!
অ্যালেক্স মুখ ছেড়ে দিতেই অ্যাশলি ফট করে পাশে হাত বাড়িয়ে বেডসাইড ল্যাম্পটা জ্বালালো। হলদে আলোয় স্পষ্ট হয়ে উঠলো সেই মুখ উশকোখুশকো চুল, বাদামি চোখে ক্লান্তির ছাপ, আর খয়েরি ঠোঁট। চেহারায় অদ্ভুত শুকনো ভাব, যেন কয়েকদিনের অবসাদে ভেঙে পড়েছে সে।
অ্যালেক্স একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো অ্যাশলির চোখের দিকে। আচমকাই সে অ্যাশলিকে টেনে নিলো নিজের বুকে, শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো যেন ছেড়ে দিলে সবকিছু হারিয়ে যাবে তার।
অ্যাশলি কাপাকাপা হাত তুললো, কিন্তু অ্যালেক্সের পিঠ ছুঁতে গিয়েও থেমে গেলো মাঝপথে। ভয়ের সঙ্গে এক অচেনা দ্বিধা যেন আটকে দিলো তাকে।
অ্যালেক্স তার কাঁপতে থাকা আঙুলগুলো টের পেলো। একটু ফিসফিস করে, ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি টেনে বললো,“চাইলে হাত রাখতে পারো আমি খুবলে খাবো না। ভয় পেয়ো না।”
অ্যাশলির বুকের ভেতরটা ধুকুপুক করতে থাকলো।

ধীরে ধীরে অ্যাশলির হাত নেমে এলো অ্যালেক্সের পিঠে, কাঁপা আঙুলে ছুঁয়ে দিলো তার উষ্ণ শরীর। আর সেই মুহূর্তে অ্যালেক্স আরও শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরলো, যেন তাকে বুকের ভেতর মিশিয়ে ফেলতে চায়।
কিছুক্ষণ নীরব আলিঙ্গনের পর অ্যালেক্স ধীরে ধীরে অ্যাশলিকে ছেড়ে দিলো। তবে তার দৃষ্টি আটকে রইলো অ্যাশলির চোখে। গভীর, নীলাভ অস্থির সেই চোখের দিকে অ্যালেক্স তাকিয়ে রইলো দীর্ঘক্ষণ।
ধীরে সামনের দিকে ঝুকতে শুরু করলো সে। অ্যাশলি পেছনের দিকে সরে যেতে লাগলো, ধীরে ধীরে বিছানার বালিশে গিয়ে ঠেকলো। শ্বাস দ্রুত হয়ে উঠছিলো তার। এক পর্যায়ে কাঁপা গলায় বলে উঠলো, “দ…দেখুন….এত কাছে আসছেন কেন আপনি?”
অ্যালেক্সের ঠোঁটে বাকা এক হাসি ফুটে উঠলো। নিচু স্বরে ফিসফিস করে বললো,“অক্সিজেন ছাড়া মরে যাচ্ছিলাম আমি তাই তো এত রাতে চুরি করে তোমার কাছ থেকে অক্সিজেন নিতে এলো।”

অ্যাশলির বুকের মধ্যে ঝড় উঠছে যেন। চোখ বন্ধ করে মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিলো, যেন পালাতে চাইছে। কিন্তু অ্যালেক্স এক ঝটকায় তার মুখ নিজের হাতে ঘুরিয়ে দিলো আবার।
অ্যাশলির ঠোঁট অজান্তেই কাঁপতে শুরু করলো। চোখ শক্ত করে বন্ধ। অ্যালেক্স মাথা কাত করে তার ঠোঁটের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো। আঙুলের ডগা দিয়ে আলতোভাবে তার ঠোঁট ছুঁয়ে স্লাইড করতে করতে বললো,“এডাল্ট কবে হবে তুমি?”
অ্যাশলি হঠাৎ চোখ মেলে তাকালো তার দিকে। এত কাছে অ্যালেক্সকে দেখে বুক কেঁপে উঠলো তার, মনে হলো কথাগুলো কোথাও গিলে ফেলছে তাকে। অ্যালেক্সের দৃষ্টি আর ঠোঁটের টান থেকে আরেক মুহূর্তও পালাতে পারলো না সে।
মুহূর্তের মধ্যেই অ্যালেক্স ঝুঁকে পড়লো, নিজের ঠোঁট মিশিয়ে দিলো অ্যাশলির কাঁপা ঠোঁটের সাথে।
অজান্তেই অ্যাশলির হাত উঠলো, শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ হলো অ্যালেক্সের দুই কাঁধের শার্টের কলারে। যেন তাকে ঠেকাতে চাইছে, অথচ একই সাথে আঁকড়ে ধরছে।
কিছুক্ষণ পর অ্যালেক্স ধীরে সরে এলো। অ্যাশলি হাঁপাতে হাঁপাতে ফিসফিস করে বললো, “চলে যান… আমার বোন এসে পড়লে সাংঘাতিক কাহিনি হয়ে যাবে।”
অ্যালেক্স চোখ নামালো না, স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে নিচু স্বরে বললো,“মনে চাচ্ছে না তোমাকে ছেড়ে যেতে। আজ রাতটা থেকে যাই?”

অ্যাশলি ভ্রু কুঁচকে হঠাৎ উঠে বসল। কণ্ঠে বিরক্তি নিয়ে বলল, “পাগল আপনি? এখনই যান।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে, আবার চিন্তিত কণ্ঠে জিগ্যেস করে, “কিন্তু এসেছেন কী করে?”
অ্যালেক্স ঠাণ্ডা ভঙ্গিতে বারান্দার দিকে ইশারা করলো।
অ্যাশলি চোখ বড় করে তাকালো,“করেছেন কী! এত রিস্ক নিয়ে এইভাবে কে আসে? আপনি পাগল?”
অ্যালেক্স ঘোরের মাঝে থেকেই বলে ওঠে,“হ্যাঁ… তোমার জন্য।”
আচমকাই অ্যালেক্সের পকেটে থাকা ফোনটা জোরে বেজে উঠলো। ঘরের নিস্তব্ধতায় শব্দটা যেন আরও তীক্ষ্ণ শোনালো। অ্যালেক্স দ্রুত ফোন বের করে কানে তুলতেই অপর প্রান্ত থেকে ভেসে এলো গমগমে কণ্ঠস্বর জেভিয়ারের।

“আমি লোকেশন সেন্ড করছি, এখুনি চলে আসো। আর আমার প্রাইভেট প্লেসে ট্রাস্টেড কাউকে পাঠাও ইমিডিয়েট। আনায়া বাড়িতে একা রয়েছে। তার কোনো ক্ষতি হবে না, অবশ্য। তাও ভয় পেতে পারে একা। তাই দ্রুত কাউকে পাঠাও। রাখছি। আর তুমিও ফাস্ট চলে আসো।”
কথাগুলো ছুঁড়ে দিয়ে কল কেটে দিলো জেভিয়ার।
ফোন কানে ধরে কিছুক্ষণ চুপ হয়ে রইলো অ্যালেক্স। তার চোখে এখন অন্যরকম দৃঢ়তা। এক ঝলকে অ্যাশলির দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বললো, “চলো।”
অ্যাশলি বিস্ময়ে থমকে গেলো। কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলো,“মানে? কোথায় যাবো আমি?”
অ্যালেক্স ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে গভীর নিঃশ্বাস ফেললো। তারপর চোখে একরকম অস্থির তাড়া নিয়ে বললো,“যেতে যেতে বলছি এখন চলো। তোমাকে ছাড়া বিশ্বস্ত আর কাওকে দেখছিনা।”
অ্যাশলি হতভম্ব হয়ে উঠলো। “আরেহ আমি কী করে যেতে পারি এইখান থেকে আপুকে না জানিয়ে? আর এখন রাত কয়টা বাজে দেখেছো?”
অ্যালেক্স সোজা হয়ে বললো,“দেখেছি। বাট ইট’স আর্জেন্ট। চলো, প্লিজ।”
বলার সঙ্গে সঙ্গে সে অ্যাশলির হাত ধরলো।
অ্যাশলি টান খেয়ে সামনে এগিয়ে গেলো।

“না, না এভাবে কোথাও যেতে পারবো না!”
অ্যালেক্স কোনো উত্তর না দিয়ে ধীরে ধীরে তাকে টেনে নিয়ে যেতে থাকলো দরজার দিকে। তার হাতে যেন এখন ইস্পাতের মতো শক্তি।
অ্যাশলি চেষ্টা করলো হাত ছাড়াতে, কিন্তু অ্যালেক্সের মুঠো থেকে বেরোনো বৃথা। তার বুকের ভেতর ধড়ফড় করছে, ভয় আর উত্তেজনা একসাথে জমে যাচ্ছে। তবুও সে পেছনে তাকাতে তাকাতে, ধীরে ধীরে, অ্যালেক্সের সঙ্গে বাইরে চলে গেলো।
গাড়ির সিটে পা গুটিয়ে বসে আছে অ্যাশলি। বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠছে, চোখে টলটল করছে জল। কান্না আটকাতে পারছে না, তবুও চেষ্টা করছে শক্ত থাকতে। তার মাথায় ঘুরছে একটাই প্রশ্ন, অ্যালেক্স কি তাকে বিক্রি করে দিবে? নাহয় কেউ ফোন দিলো, আর এইভাবে জোর করে টেনে নিয়ে যাচ্ছে কেন? নিশ্চয়ই এমনি এমনি নয়।
গাড়ির জানালার বাইরে রাতের অন্ধকারে ছায়া ছায়া জঙ্গল। রাস্তা যেন ক্রমেই ফাঁকা আর ভয়ানক হয়ে উঠছে। প্রতিটি বাঁকে অ্যাশলির বুকের ধুকপুকানি বেড়ে যাচ্ছে আরও।
অবশেষে দীর্ঘ চল্লিশ মিনিটের ভীতিকর যাত্রা শেষে গাড়ি থামলো। অ্যালেক্স দরজা খুলে বাইরে নামতেই অ্যাশলিও কাঁপতে কাঁপতে নেমে এল। আর নামার সাথেই তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে ছানাবড়া হয়ে গেলো।
চারপাশ নিস্তব্ধ, অন্ধকার, আর হঠাৎই অ্যালেক্স গলা ছেড়ে হাক দিলো,“টাইসন!”

এক মুহূর্তের মধ্যেই অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে এলো এক বিশাল কুকুর। ভয়ংকর চেহারা, লালচে চোখ, দাঁত বের করে শ্বাস নিতে নিতে এগিয়ে এলো তাদের দিকে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে কুকুরটা লেজ নাড়তে শুরু করলো অ্যালেক্সকে দেখে।
অ্যালেক্স শান্ত কণ্ঠে বললো, “তুমি সেফ জায়গায় আছো অ্যাশ। ভয় পেয়ো না। কুকুরটাকে ফলো করো, আমি ভেতরে যেতে পারবো না। আমি আছি এখানেই যাও।”
অ্যাশলি আতঙ্কিত চোখে তার দিকে তাকালো। মুখে কোনো কথা নেই, শুধু বুকের ভেতর ভয় জমে আছে।
অ্যালেক্স তখনো এক দৃষ্টিতে হাতঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে বারবার, যেন সময়ের সাথে তার ভেতরে লুকানো তাড়া ক্রমশ বেড়ে চলেছে।
অ্যালেক্স নিঃশ্বাস ফেলে বললো,“যাও অ্যাশ, আমার লেইট হচ্ছে। ভেতরে আমার বসের ওয়াইফ আছেন। ভয় পেয়ো না, যাও।”

অ্যাশলি গিলে ফেললো তার ভেতরের ভয়। ধীরে ধীরে পা ফেলতে লাগলো সামনের বিশাল দরজার দিকে। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন কাঁপিয়ে তুলছিলো তার বুকের ভেতর।
ভেতরে ঢুকতেই বিস্ময়ে নিশ্বাস আটকে এলো। এটা কি সত্যিই কোনো বাড়ি নাকি কোনো রাজার রাজপ্রাসাদ? ঝাড়বাতির ছায়া, বিশাল করিডোর, দেয়ালে ঝুলে থাকা অদ্ভুত সব ছবি সবকিছু যেন অচেনা এক জগৎ।
টাইসন নীরব গর্জন করতে করতে এগোতে থাকলো সামনের দিকে। অ্যাশলি অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার পেছনেই হাঁটলো। শেষমেশ কুকুরটা থেমে গেলো এক কক্ষের সামনে।
অ্যাশলি ধীরে ধীরে দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিলো। ভেতরে অন্ধকার ঘেরা, কেবল সামান্য আলোয় চোখে পড়লো কেউ একজন বিছানায় শুয়ে আছে, সারা শরীর ব্ল্যাংকেটে ঢাকা।
মুহূর্তে বুক ধুকপুক করতে লাগলো অ্যাশলির। খুব সাবধানে ভেতরে পা রাখলো।
চারপাশে ঘন অন্ধকার, দেখতে কষ্ট হচ্ছিলো। অনেকটা হাতড়ে হাতড়ে সে গিয়ে পৌঁছালো একপাশে রাখা সোফার কাছে। আর সেখানে চুপচাপ বসে পড়লো, বুকের ভেতর অনবরত প্রশ্ন ঘুরতে লাগলো আমি আসলে কোথায় এসেছি?

ভোরের আলো জানালার ফাঁক গলে ঘরে ঢুকে পড়েছে। আনায়া পিটপিট করে চোখ খুললো। আজ যেন ঘুম ভেঙে গেলো খুব তাড়াতাড়ি, হয়তো জেভিয়ারের গায়ের পরিচিত গন্ধটা ছিল না পাশে।
ধীরে ধীরে উঠে বসতেই চোখে পড়লো সোফায় অপরিচিত কারো ছায়া। চমকে উঠে সে চিৎকার করে উঠলো।
আনায়ার চিৎকারে অ্যাশলি ধড়মড় করে জেগে উঠলো। কখন যে সোফায় বসে থাকতে থাকতে তার চোখ লেগে গিয়েছিলো, খেয়াল নেই। এলোমেলো চুলে, ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে রইলো সামনে দাঁড়ানো সেই নারীর দিকে।
অ্যাশলি উঠে বসতেই আনায়াকে দেখে তার চোখ বড় হয়ে গেলো। মুহূর্তেই তার ঠোঁট ফসকে বেরিয়ে এলো, “এঞ্জেল ”।
আনায়া ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকালো। কণ্ঠে কঠোরতা নিয়ে বলল, “তুমি কে?”
অ্যাশলি তোতলাতে তোতলাতে বললো,
“আমি… আমি জানি না। মানে কাল অ্যালেক্স আমাকে এখানে নিয়ে এসেছিলো। বলেছিলো আপনার সাথে থাকতে…”
আনায়ার দৃষ্টি আরও তীক্ষ্ণ হলো। ঠান্ডা স্বরে জিজ্ঞেস করলো, “আমি বলেছি, তুমি কে? নাম বলো। আর তুমি জানো না মানে কী?”

অ্যাশলির গলা শুকিয়ে এলো। অস্থির হাতে জামার কোণা মুঠো করে ধরে বললো, “আমার নাম অ্যাশলি।”
আনায়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। মাথায় জেভিয়ারের কথা ভেসে উঠলো “আমি সিকিউরিটির ব্যবস্থা করে যাচ্ছি।” হয়তো এই মেয়েকেই পাঠানো হয়েছে। কিন্তু সামনেই দাঁড়িয়ে আছে যে মেয়ে, তাকেই তো দেখে মনে হচ্ছে এখনো আধো বাচ্চা।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে আনায়া একটু নরম স্বরে বললো, “ফ্রেশ হয়ে নাও। আমি ব্রেকফাস্ট রেডি করছি।”
কিচেনে দাঁড়িয়ে আনায়া চুলায় রাখা পাত্রে নজর রাখছিলো। ভেতর থেকে ভাপ উঠছে। হঠাৎ চোখ পড়লো ডাইনিং টেবিলের ওপরে একটা বিশালাকৃতির ধারালো ছুরি রাখা। অদ্ভুত লাগলো তার। ছুরির নিচে কাগজের একগাদা ফাইলচাপা।
কৌতূহল সামলাতে না পেরে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো। হাত বাড়িয়ে ছুরিটা সরাতেই একটা কাগজ আলগা হয়ে বেরিয়ে এলো। সাদা পাতায় কালো অক্ষর। প্রথম লাইন পড়তেই তার চোখ থেমে গেলো।

“চুক্তিপত্র—জেভিয়ার ও ডেভিড।”
আনায়ার চোখ বড় বড় হয়ে এলো। আবার পড়লো, যেন চোখ ভুল করছে কিনা যাচাই করছে। কিন্তু না অক্ষরগুলো স্পষ্ট। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে জেভিয়ার নিজেই নাকি তাকে ডেভিডের হাতে তুলে দিতে রাজি হয়েছিলো।
কাগজটা হাতে কাঁপতে লাগলো। শরীর যেন শীতল হয়ে গেছে। ভেতরে তীব্র কম্পন এটা কি রাগে, না যন্ত্রণায় বুঝতে পারছে না সে।
তার বুকের ভেতর শুধু একটাই প্রশ্ন গর্জে উঠছে— এটা কি সত্যি?
জেভিয়ার, যে মানুষটাকে সে নিঃশর্তে ভালোবেসেছে, যে প্রতিটি মুহূর্তে তাকে আঁকড়ে ধরেছে সেই মানুষ কি করে তাকে বিক্রি করার চুক্তি করতে পারে?
চোখ জলে ঝাপসা হয়ে এলো। ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে শুধু ফিসফিস করে উঠলো,
“না এটা অসম্ভব জেভিয়ার এমনটা করতে পারে না পারে না!”

আনায়া আবারও টেবিলে তাকাল। চোখ পড়লো আরও এক জিনিসের উপর একটি ডিভিডি প্লেয়ার আর তার নিচে আরও কিছু কাগজ। কৌতূহল ও অজানা আতঙ্কে, সে আরও একটি কাগজ খুলে সামনে ধরল। চোখ পড়তেই পায়ের তলার মাটি যেন সরে যেতে লাগল।
কাগজের উপর জেভিয়ার এর পরিচয় ও সই স্পষ্ট। সেখানে লেখা ছিল ৩ হাজার মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে জেভিয়ার ডেভিড এর কাছে আনায়াকে তুলে দিতে সম্মত হয়েছেন।
আনায়া শ্বাস আটকে রইল। হৃদয় যেন থেমে গেলো। তার ভেতরে এক অজানা ব্যথা, ক্ষোভ আর বিশ্বাসঘাতকতার মিশ্রণ একসাথে জাগল।

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ২৮

তার হাত কাঁপতে লাগল। চোখ ভিজে এলো। নিজেকে ধরে রাখতে সে চেষ্টা করল, কিন্তু ফেটে পড়া কান্না আটকাতে পারল না। আঙুল দিয়ে শেষ চিরকুটটা খুলল,
“নিজের ভালোবাসার মানুষের এই ভয়ংকর সত্য জেনে কেমন অনুভব করছো আনায়া পাখি? যদি আরও কিছু জানার থাকে তোমাকে লোকেশন দিচ্ছি সেইখানে চলে এসে স্বচোক্ষে দেখে নিও আজ রাতে কেমন?”…

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৩০