অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ৩০
শ্রাবণী ইয়াসমিন
টিক টিক শব্দ করে ঘড়ির কাটা ঘুড়ে চলেছে। সব কিছু যেন থমকে আছে। টেবিলের ওপর রাখা ডিভিডি প্লেয়ারটা চলছে ল্যাপটপে। আনায়া চোখমুখ শক্ত করে টেবিলের ওপর রাখা ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে আছে। সেইখানে জেভিয়ার এরই ভিডিও চলছে। যেইখানে জেভিয়ার একটা ক্লাবে হাতে তার ম/দের গ্লাস এবং আঙুলের ফাকে দিয়ে সিগারেট এর ধোয়া বেরোচ্ছে আর সে ব্যস্ত কোনো এক সুন্দরী রমণীর ওষ্ঠের সুধা পান করতে।
অ্যাশলি একবার ল্যাপটপের দিকে তাকাচ্ছে তো একবার আনায়ার দিকে তাকাচ্ছে। সকালেই মেয়েটা কেমন হাউমাউ করে কাদছিলো অথচ এখন কত শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে নিজের স্বামীর পর নারীর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ভিডিও দেখছে। ভিডিও পুরোটা শেষ হওয়ার আগেই আনায়া ঠাস করে ল্যাপটপ টা বন্ধ করে ফেলল।
চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অ্যাশলির দিকে তাকালো। অ্যাশলিও তার দিকেই তাকিয়ে আছে। আনায়া হঠাৎ মুচকি হেসে বলল, “এইখানে আজ যা হলো আর যা দেখলে সব তোমার এবং আমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। আশা করব আমার ছোট বোনের মত আমার কথা রাখবে!”
আচমকাই অ্যাশলি আনায়াকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আনায়ার চোখ পানিতে ভরে আসছে। প্রথমত তার স্বামী তাকে নাকি বিক্রি করার জন্য নিয়ে এসেছে। আবার পর নারীর সাথে এমন ঘনিষ্ঠ মহূর্তের ভিডিও। তার ভেতর দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছে অথচ সে প্রকাশ করতে পারছে না।
অ্যাশলি আনায়াকে ছেড়ে দিয়ে বলে, “তুমি বলে নিজেকে শক্ত করে রাখতে পারছো। তোমার জায়গায় অন্যকেউ হলে এমনকি আমি নিজে হলেই কেদেকেটে ভাসিয়ে দিতাম।”
আনায়া হালকা হেসে বলে, “পরিস্থিতি মানুষকে সব শিখিয়ে দেয়।”
জেভিয়ার দুপুরের খাবার খেয়ে বিছানায় বসে ল্যাপটপে মনোযোগ দিয়ে কিছু করছে।
তাদের বাড়িতেই আজ অ্যালেক্স আর অ্যাশলিকে জোর করে রেখে দিয়েছে আনায়া।
জেভিয়ার অবশ্য এতে কিছু মনে করেনি কারণ অ্যালেক্সকে সে ছোট ভাইয়ের মতোই ভাবে।
আনায়া নিচে থেকে ধীরে রুমে এলো। ওকে দেখে জেভিয়ারের চোখ থেমে গেল তার মুখে।
ল্যাপটপটা সাইডে রেখে গভীরভাবে তাকিয়ে রইলো আনায়ার দিকে। কি যেন হয়েছে মেয়েটার, নয়তো এত চুপচাপ কেন থাকবে আজ?
জেভিয়ার সোজা হয়ে বসে গম্ভীর গলায় বলল,
“এইখানে এসো।”
আনায়া বিনাবাক্যে চুপচাপ এগিয়ে এলো।
জেভিয়ার ওকে ঘুরিয়ে নিজের উরুর ওপর বসিয়ে নিলো। আনায়ার কানের পেছনের চুল সরিয়ে দিয়ে নিচু গলায় বলল,
“কি হয়েছে, মন খারাপ?”
আনায়া হালকা হেসে জেভিয়ারের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “না, এমনি একটু মাথা ব্যথা করছে।”
জেভিয়ার স্থীর ভাবে আনায়ার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আনায়াকে আরও কাছে টেনে নিলো। দুপাশে পা দিয়ে বসিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“আমার চোখের দিকে তাকিয়ে তুমি মিথ্যে বলবে আর আমি সেটা ধরতে পারব না? এটা কেমন করে ভাবলে তুমি? আমার শত্রুরাও আমার চোখে তাকিয়ে মিথ্যে বলতে পারে না।”
আনায়া যেন কথা খুঁজে পেলো না। গলা শুকিয়ে আসছে , বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আছে। সে
একটা ঢোক গিলে আস্তে করে বলল,
“সত্যি, আজ সকাল থেকেই শরীরটা ভালো লাগছে না খুব।”
জেভিয়ার নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
আনায়া চোখ নামিয়ে রাখল, তবুও অনুভব করতে পারছে জেভিয়ার এর গভীর দৃষ্টি। জেভিয়ার আনায়ার কোমড় ধরে পোশাক এর ভেতর দিয়ে হাত গলিয়ে পিঠে স্পর্শ করতেই আনায়ার সর্বাঙ্গ কেপে ওঠে। আনায়া জেভিয়ার এর কামনা বুঝতে পেরে তাৎক্ষণিক নীচু স্বরে বলে ওঠে,
“তুমি… তুমি নিশ্চয়ই খুব টাইয়ার্ড । তোমার রেস্ট নেওয়া উচিত।”
জেভিয়ারের ঠোঁটে একচিলতে হাসি খেলল,
“তোমার জন্য আমি অলওয়েজ সট্রং।”
আনায়া কিছু বলল না। সকালের দৃশ্যটা আবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। সেই ভিডিও, সেই রমণীর সাথে ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত। নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করছে যে সবই মিথ্যে, তবুও বুকের গভীরে একটা ভয় কাজ করছে।
সে চোখ বন্ধ করে হালকা স্বরে বলল,
“আজ শরীরটা সত্যিই ভালো লাগছে না, প্লিজ জেভিয়ার… একটু বিশ্রাম নিতে দাও।”
জেভিয়ারের মুখের ভাঁজ বদলে গেল। গলায় হালকা বিরক্তি নিয়ে বলল,
“একদিন তো গ্যাপ দিয়েইছিলাম, আজও?”
আনায়া মাথা নিচু করে আস্তে বলল,
“হুম…”
ঘরে কিছুক্ষণ চুপচাপ নীরবতা নেমে এল।
তারপর জেভিয়ার নিঃশব্দে ওর কাছ থেকে সরে গেল। কোনো কথা না বলে শুধু তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, তারপর ল্যাপটপটা টেনে নিল সামনে।
আনায়া ধীরে পাশ ফিরে চোখ বন্ধ করল। তার মনে হয় এই মানুষটার সামনে দাঁড়িয়ে সে যেন নিজের সব শক্তি হারিয়ে ফেলে। ভেতরটা কাঁপে, অথচ মুখে কিছুই বলতে পারে না।
বাইরে ঝরনার পানি টুপটাপ শব্দে পড়ছে,
স্বচ্ছ কাচের ওপারে ভেসে উঠছে নরম আলো।
বিশাল রুমের ভেতর নিস্তব্ধতা। অ্যালেক্স চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে, অ্যাশলির বুকে মাথা রেখে। অ্যাশলির বুকের ভেতর ধকধক করছে হৃদপিণ্ড। প্রতি সেকেন্ডেই যেন তার গতি বাড়ছে একটু একটু করে।
অ্যালেক্সের শক্ত বাধনের জোরে অ্যাশলি চেষ্টা করেও ছুটে যেতে পারছে না। সে নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল,
“ছাড়ো না… দম বন্ধ হয়ে আসছে।”
অ্যালেক্স ধীরে মাথা তুলে তাকালো তার দিকে।
এক মুহূর্ত চুপ করে শুধু দেখল অ্যাশলির চোখ, তার মুখ, সেই নিঃশ্বাস।
তারপর হালকা হেসে বলল, “চলো, বিয়ে করি আমরা।”
অ্যাশলি হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। চোখ নামিয়ে ফেলল নিচের দিকে। গালের পাশে লাল আভা ফুটে উঠল।
অ্যালেক্স আবার বলল, “এই কাজটা শেষ হলেই ফিরে যাবো বাড়ি, আর প্রথম কাজ হবে তোমাকে বিয়ে করা। আর পারছি না তোমার থেকে দূরে থাকতে, অ্যাশ।”
অ্যাশলি কিছু বলল না, শুধু চোখ বন্ধ করে হাসল খুব হালকা করে যেন সেই একটা বাক্যে সারা পৃথিবীর শান্তি খুঁজে পেয়েছে।
অ্যাশলি ধীরে ধীরে উঠে বসল। তার বুকের ভেতর এখনো ধুকপুক করছে। অ্যালেক্সও সোজা হয়ে বসল তার পাশে। অ্যালেক্স মৃদু স্বরে বলল,
“কি হলো?”
অ্যাশলি দু’হাত জড়ো করে নিজের কোলে রাখল। নিচু স্বরে, কণ্ঠে কাঁপুনি নিয়ে বলল,
“আপনি সত্যি আমাকে বিয়ে করবেন তো?”
অ্যালেক্স কিছু না বলে তাকে টেনে নিল কাছে।
আঙুল দিয়ে তার চুল সরিয়ে কপালে হালকা একটা চুমু খেলো।
“অবশ্যই করব,” সে দৃঢ় কন্ঠে বলল। “আমাকে ভরসা করো না?”
অ্যাশলি দৃষ্টি নামিয়ে ফেলল। একটু থেমে, বিচলিত গলায় বলল, “ভরসা তো করি… কিন্তু…”
অ্যালেক্স ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কিন্তু কি?”
অ্যাশলি মাথা নেড়ে ছোট্ট করে বলল,
“কিছু না… শুনুন… আমাদের আলাদা একটা সংসার হবে, ঠিক আছে? সেইখানে শুধু আপনি আর আমি থাকবো।”
অ্যালেক্সের ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে উঠল।
সে হাত বাড়িয়ে অ্যাশলির হাত চেপে ধরল।
“সেইখানে শুধু তুমি আর আমি নই,সেইখানে থাকবে আমাদের প্রিন্স আর প্রিন্সেসরাও।” সে নরম স্বরে বলল।
অ্যাশলির চোখে হালকা জল চিকচিক করে উঠল। মুহূর্তের মধ্যেই ভেতরটা ভরে গেল এক অদ্ভুত উষ্ণতায়যেন সত্যিই সেই সংসারের ছবি দেখতে পাচ্ছে সে।
রাত ১০টা। পুরো বাড়িটা নিস্তব্ধ। শুধু ঘড়ির টিকটিক শব্দ। জেভিয়ার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শার্টের বোতাম লাগাচ্ছে। আজ একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে তাকে বাইরে যেতে হবে।
তবে অ্যালেক্স আজ তার সঙ্গে যাচ্ছে না।
ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে আবার হাতঘড়ির স্ট্র্যাপ ঠিক করল সে। আনায়া তখন চুপচাপ বিছানায় বসে ল্যাপটপে তার গল্প টাইপ করছে।
জেভিয়ার একবার তার দিকে তাকাল। আজ আনায়াকে অদ্ভুত লাগছে চুপচাপ, চোখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। কিন্তু জেভিয়ার ভাবে, হয়তো শরীরটা ভালো না, তাই এমন। এই অবস্থায় তাকে একা রেখে যেতে ইচ্ছা করছে না তবুও যে বাধ্য, তাকে যেতেই হবে।
সব প্রস্তুতি সেরে জেভিয়ার ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল আনায়ার দিকে। তার সামনে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে নরম গলায় বলল,
“আমার আজ যাওয়ার একটুও ইচ্ছা ছিলো না তবে বিশ্বাস করো আমাকে যেতেই হবে। কথা দিচ্ছি, ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ফিরে আসব।
তুমি সাবধানে থেকো, ঠিক আছে?”
আনায়া মাথা তুলল। চোখে হালকা হাসি, ঠোঁটে ক্লান্ত কোমলতা ফুটিয়ে তুলে সে জেভিয়ারের হাতটা ধরে শান্তভাবে বলল, “সমস্যা নেই, তুমি যাও। আমি অপেক্ষা করব…”
এক মুহূর্তের জন্য জেভিয়ার তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে কাছে ঝুঁকে আনায়ার ঠোঁটে হালকা এক চুমু দিয়ে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল জেভিয়ার।
জেভিয়ার বেরিয়ে যাওয়ার প্রায় দশ মিনিট পরই আনায়া ধীরে ধীরে উঠল। ল্যাপটপের স্ক্রিনটা নিভিয়ে রেখে নিঃশব্দে দরজা খুলল সে।
রাতের বাতাসে হালকা শীত। চাঁদের আলো গায়ে লাগছে কাঁচের জানালা দিয়ে।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে পৌঁছাল বনের পাশের সরু পথে। সেইখানেই দাঁড়িয়ে আছে একটা কালো গাড়ি। গাড়ির হেডলাইট জ্বলছে, মনে হচ্ছে যেন গাড়ির মালিক জানতো
ঠিক এই সময়, এই জায়গায় আনায়া আসবে।
গাড়ির সামনে যেতেই ড্রাইভিং সিটে বসা লোকটি জানালার কাচ নামিয়ে নিচু গলায় বলল,
“ব্যাক সিটে বসুন, ম্যাম। বস পাঠিয়েছেন।
আপনাকে জেভিয়ার ড্রেভেনের লোকেশনে নিয়ে যেতে হবে।”
আনায়ার ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল। কিন্তু জেভিয়ারের নাম শুনে আর কিছু না ভেবে
চুপচাপ গাড়ির পিছনের সিটে বসে পড়ল।
গাড়ি চলতে শুরু করল। অন্ধকার রাস্তা, ঘন গাছপালা,শুধু মাঝে মাঝে রাস্তার বাতি আলো ফেলছে আনায়ার মুখে। তার বুকের ভেতর দুরুদুরু করছে তবে ভয় থেকে না, বরং এক অজানা আশঙ্কা থেকে।
অবশেষে গাড়িটা এসে থামল। আনায়া অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল, এটা তো জেভিয়ারদেরই বাড়ি!
কিন্তু আজ বাড়িটা যেন পুরো অন্য রকম।
সবদিকে আলোকসজ্জা, ফুল, সাজসজ্জা
যেন কোনো উৎসব হচ্ছে এখানে।
আনায়া স্থির দাঁড়িয়ে রইল দরজার সামনে।
তার মনে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরছে, “আজ এত আয়োজন কিসের?৷আর কেন জেভিয়ার আমাকে কিছুই বলল না?”
এতসব ভাবনার মাঝেই হঠাৎ সামনের সিটে বসা কালো পোশাকধারী ড্রাইভার জানালার কাচটা পুরোপুরি নামাল। মুখে কালো মাস্ক এ আবৃত। সে কর্কশ কন্ঠে বলল,
“এইখান থেকে সোজা বাড়ির পেছনে গ্যারাজের কাছে যাবেন, ম্যাম। গ্যারাজের ভেতরে বাম পাশে পুরোনো একটা দেয়াল ঘড়ি ঝুলে আছে
ওটা সরালেই একটা চাবি প্রবেশ করানোর মুখ পাবেন। এই চাবিটা সেখানে ব্যবহার করবেন।
বাকি কাজ আপনাকেই করতে হবে। তবে সাবধান কেউ যেন আপনাকে দেখতে না পায়, ভুলেও না।”
এইটুকু বলেই সে আনায়ার দিকে একটা ছোট্ট রুপালি চাবি বাড়িয়ে দিল।
আনায়া কয়েক সেকেন্ড চাবিটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে সেটি মুঠোর ভেতর চেপে ধরল।
পা ফেলে এগোতে লাগল ধীরে ধীরে।
প্রতিটি পদক্ষেপে মাটির নিচে শুকনো পাতা মচমচ শব্দ করছে, মনে হচ্ছে যেন প্রতিটি শব্দ তার ভয়কে আরও জাগিয়ে তুলছে।
আনায়া জানে না সামনে কী অপেক্ষা করছে
কিন্তু বুকের ভেতর টান টান একটা অনুভূতি।
সে জানে ভালো কিছু নয়, বরং কিছু ভয়ঙ্কর তার জন্য অপেক্ষা করছে। অদ্ভুত এক আশঙ্কা তার প্রতিটি নিঃশ্বাসে ঘুরপাক খাচ্ছে।
আনায়া গ্যারাজের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। দরজাটি অর্ধেক খোলা, কিন্তু ভেতর থেকে প্রায় পুরোপুরি অন্ধকার। বাইরে থেকে কিছু আলো ঢুকছে যার কারণে ভেতরের কিছুটা দৃশ্য পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।
ভেতরে একবার পা ফেলতেই কেমন একটা বাজে দুর্গন্ধ তার নাকে লাগল। সে চেষ্টা করল নিজের বমি নিয়ন্ত্রণ করতে, কিন্তু পারল না তৎক্ষণাৎ পেট উগড়ে সব বের হয়ে এলো। শরীর দুর্বল লাগল, মাথা ঘুরছে, এবং কেন এমন হচ্ছে সে নিজেও জানে না।
কিছুক্ষণ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে নিজের নড়াচড়া থামিয়ে আনায়া ধীরে ধীরে ধাতস্থ হলো। শক্ত হয়ে উঠে, হাতে থাকা ছোট চাবিটা ধরে গ্যারাজের ভেতরে এগিয়ে গেলো। দেয়ালের বাম পাশে ঝুলে থাকা পুরনো ঘড়ির কাছে পৌঁছে সে ধীরে সেটি সরাল।
ঠিক তখনই সে খুঁজে পেলো একটি ছোট চাবি প্রবেশ করার জায়গা। এতই ছোট যে, কোনো অজান্তেই সেটিকে ফাটলের মতো ভাবা যেতো। প্রথম দেখায় মনে হবে এটি শুধু দেয়ালের একটি ফুটো।
চাবিটা ঢুকিয়ে দেয়ালটিকে চাপ দিতেই দেয়াল আলগা হতে শুরু করলো, আর আনায়া অবাক হয়ে গেলো। ধীরে ধীরে দেয়ালটির ফাঁক বড় হতে লাগলো।
এক মুহূর্তে সে বুঝলো—এই দেয়ালের পেছনে এমন এক গোপন জায়গা আছে, যার কথা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না।
ভেতরে প্রবেশ করতেই চারপাশে মৃদু, টিমটিমে আলো যা অচেনা কোনো জগতের দরজা খুলে দিয়েছে। আনায়া কয়েক পদ এগোতেই শুনতে পেলো একটি রুম থেকে গোঙানির শব্দ। শব্দটা তারমনকে এক অদ্ভুত আতঙ্কে পূর্ণ করল।
হঠাৎই তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এলো। মনে হচ্ছিল, পেছনে ফিরে ছুটে পালিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই। কিন্তু এক মুহূর্তের দ্বিধা পেরিয়ে সে নিজের মনে ঠিক করল এতদূর এসে ফিরে যাওয়ার কোনো মানেই নেই।
একটি দরজার ফাঁক হয়ে সে ঝুঁকল। এবং ঠিক তখনই আনায়া তার হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরল , চোখের সামনে নিজের বিশ্বাস হারাতে বসেছে। তার চোখের সামনে যা দেখল, তা যেন বাস্তবতার বাইরে এক ভয়ঙ্কর সত্য।
হৃদয় জুড়ে ঘৃণা আর রাগের মিশ্রণে তার শরীর কেঁপে উঠল। নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে ভেবে পেল সে তো হাতে কিছুই নেই। এমন নিরস্ত্র অবস্থায় কীভাবে সে এতগুলো মানুষের বিরুদ্ধে লড়াই করবে?
হঠাৎ ভেতরে থেকে একটি গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো। সেই কণ্ঠ যেন সরাসরি আনায়ার হৃৎস্পন্দনে প্রবেশ করে দিল, তার ভেতরের সত্তাকে কেঁপে তুলল।
আনায়া আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। দেহে এক অজানা তাড়না জেগে উঠল ভয়ের মাঝে কৌতূহল, কৌতূহলের মাঝে এক অদ্ভুত সাহস। সে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগোল, হাত শিথিল হয়ে গেলেও মনটায় যেন লড়াই চলছিল।
শেষে এক গভীর শ্বাস নিয়ে সে দরজা ধাক্কা দিয়ে খুলে দিল। ভেতরে প্রবেশ করতেই সমস্ত অনুভূতি থেমে গেল। সামনে যা দেখল, তা এমন এক দৃশ্য, যা তার মস্তিষ্ককে স্তব্ধ করে দিল অথচ সে জানত, এখান থেকে তার জীবন আর আগের মতো থাকবে না।
মাটিতে সম্পূর্ণ উ/ল/ঙ্গ অবস্থায় পড়ে আছে একটি বাচ্চা মেয়ে তার মুখ গড়িয়ে র/ক্ত ঝড়ছে গাল বেয়ে। মেয়েটি শূন্য চোখে তাকিয়ে বড়বড় নিশ্বাস ফেলছে। যেন সে নিজের মৃ/ত্যু/র প্রহর গুনছে। অথচ এই অবস্থতেও অনবরত মেয়েটির যো/নী/পথে একটি
মোটা রড প্রবেশ করাচ্ছে এক লোক এবং উপভোগ করছে । এবং সে যো/নী/পথ দিয়েও রক্ত ঝড়ছে। তার দেহের বিভিন্ন অংশে সিগারেট দিয়ে পো/ড়া/নোর দাগ। গায়ের বিভিন্ন অংশে গভীর ক্ষ/ত।
আর তার থেকে আরেকটু দূরেই আরেকটি বাচ্চা মেয়ের লা/শ সে জ্ঞান শূন্য চোখে বুজে আছে হয়ত বেচে নেই। সেই মৃ/ত লাশকেও ছাড় দিচ্ছে না জা/নো/য়ার গুলো সেই লা/শ/টাকেও ধ/র্ষ/ণ করা হচ্ছে। মৃ/ত বাচ্চাটাকেও এই পশু গুলো ছাড় দিচ্ছে না।
তাদের থেকে কয়েক ফুট দূরত্বে অবস্থিত একটা চেয়ারে বসে টেবিলের ওপর পা তুলে বসে আছে জেভিয়ার। তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মেয়ে লাইটার চালু করে ধরে রেখেছে আর জেভিয়ার ঠোঁটে সিগারেট চেপে ধরে লাইটার থেকে আগুন ধরাচ্ছে।
এই মহূর্তে আনায়াকে দেখে জেভিয়ার নিজেই যেন থতমত খেয়ে যাবে। এক লোক সেইখানে আনায়াকে দেখে চেচিয়ে বলে উঠে, ” এই কে রে তুই? এইখানে আসলি করে? তোকে তো….”
সে আর কথা দীর্ঘ করতে পারলো না তার আগেই জেভিয়ার এর বন্দুকের গুলি তার মাথা ক্ষ/ত করে দিয়েছে। আনায়া কাপাকাপা পায়ে দাড়িয়ে আছে যে কোনো মহূর্তে সে হয়ত পড়ে যাবে। হলোও তাই এত সব দৃশ্য যেন সে আর সহ্য করতে পারলো না। লুটিয়ে পড়লো মাটিতে।
আনায়া চোখ পিটপিট করে তাকাতেই থমেই চোখে পড়ল সোনালি ঝাড়বাতির আলো, নরম পর্দা, আর সুগন্ধি ঘরের বাতাস। চারপাশে তাকিয়ে তার বুকের অস্থিরতা বেড়ে গেলো। এই জায়গাটা তো সে চেনে না! সে তো ছিলো গ্যারাজে। তাহলে এখানে এলো কীভাবে?
আনায়া ধীরে উঠে বসতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ঘরের কোণায় বসে থাকা একটা ছায়া নড়ল। সে দৃষ্টি ফেলতেই দেখল জেভিয়ার। কালো শার্টে, ঠান্ডা চোখে, নিঃশব্দে বসে আছে তার দিকে তাকিয়ে।
আনায়া কে জাগতে দেখেই জেভিয়ার উঠে দাড়ালো। আনায়া তৎক্ষণাৎ বলল,
“কাছেও আসবে না আমার। একদম না।”
জেভিয়ার একবারের জন্যও থামল না। সে কিছু না বলেই আনায়ার দিকে এগিয়ে এল।
“অসুস্থ কবে থেকে তুমি?” জেভিয়ারের গলা নিচু, ভারী। “আমাকে জানাওনি কেন?”
আনায়া চুপচাপ তাকিয়ে রইল তার চোখের দিকে। তার দৃষ্টিতে এখন হাজারো প্রশ্ন, ভয়, রাগ আর ভাঙা বিশ্বাসের ভার। ঠিক তখনই দরজা খোলার শব্দ হলো। একজন মেয়ে ভিতরে এলো।
একই সেই মেয়ে, যে একটু আগে জেভিয়ার এর সাথে ছিলো।
তার চোখ একবার আনায়ার দিকে স্থির হলো, তারপর জেভিয়ারের কাছে গিয়ে বলল,
“বস, সব কিছু পারফেক্টভাবে ডেলিভার্ড হয়ে গেছে।”
জেভিয়ার তখনও আনায়ার চোখের দিকেই তাকিয়ে ছিল। “এখান থেকে যাও তুমি।” জেভিয়ার গম্ভীর ভাবে বলল। মেয়েটি এক মুহূর্তও দেরি করল না, নিঃশব্দে ঘর ছেড়ে চলে গেল।
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা যেন আনায়ার বুকের ভেতর ঝড় তুলে দিল। তার চোখ টলমল করে উঠল, ঠোঁট কাঁপছে, আর নিজেকে আর ধরে রাখা যাচ্ছে না। তার ভেতরের শক্ত দেয়ালগুলো একে একে ভেঙে পড়ছে।
জেভিয়ার ধীরে তার কাছে গিয়ে বসে পড়ল।
দু’হাত তুলে আনায়ার মুখটাকে নিজের হাতের আজলায় নিল। সে নরম কণ্ঠে বলল,
“লাভবার্ড?”
আনায়া আর নিজের ভেতরটা ধরে রাখতে পারলো না। জেভিয়ারের মুখের দিকে তাকিয়েই ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল, সে ভাঙা কন্ঠেই বলল, “অন্য নারী দেহ স্পর্শ করেও আমার কাছে কেন সাধু পুরুষ সাজতে গেলে তুমি? কেন?”
জেভিয়ার হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে আনায়াকে নিজের বুকে টেনে নিয়ে বলল নরম কন্ঠে বলল,
“আমি জানি না তুমি কি বলছো… তবে তুমি যা ভাবছো, অমন কিছুই না।”
আনায়া জেভিয়ার এর বুকে নিজের হাতের নখ দাবিয়ে দিলো। শার্টের ওপর দিয়ে মনে হচ্ছে চামড়া ভেদ করে ফেলবে। আনায়া জেভিয়ার কে আঘাত করতে করতে বলল,
“আমার কষ্ট হচ্ছে, জেভিয়ার। আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। আমি মেনে নিতে পারছি না। আমার মস্তিষ্ক আর নিতে পারছে না। আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি। তুমি কেন এমন করলে?”
জেভিয়ার এবারও চেষ্টা করল তাকে ঠান্ডা করতে। সে আরো কোমল ভাবে বলল,
“তুমি এত স্ট্রেস নিও না। তুমি ভুল ভাবছো।”
কিন্তু আনায়া তার স্পর্শ ঝেড়ে ফেলতে চাইল।
দু’হাত দিয়ে তাকে ধাক্কা দিল। কিন্তু গায়ের জোরের সাথে পারলো না। তারপরও নিজের কণ্ঠে দৃঢ়তা রেখে বলল,
“থাকতে চাই না আমি তোমার সাথে।
তোমার ছোঁয়া আমার ঘৃণা লাগছে ছাড়ো আমাকে।”
জেভিয়ারের ঠোঁটের কোণে তীব্র এক রাগ জমে উঠলো। সে আনায়ার চোয়াল শক্ত করে চেপে ধরে বলল,
“আমার ছোঁয়া তোর যতই জঘন্য লাগুক। তাও তোকে আমার স্পর্শই নিতে হবে। তোকে আমার সাথেই থাকতে হবে। প্রয়োজনে তোর জান নিয়ে সেই নিষ্প্রাণ দেহ আমার কাছে রেখে দিবো৷ তাও আমি তোর শেষ ঠিকানা হবো।”
এই বলেই জেভিয়ার উঠে দাঁড়াল। তার হাত মুষ্ঠি করে পাশের চেয়ারে সজোরে একটা লাথি মারল। চেয়ারটা মেঝেতে আছড়ে পড়ে শব্দ করল, আর সেই শব্দে যেন ঘরের নিস্তব্ধতা কেঁপে উঠল।
আর কোনো কথা না বলেই জেভিয়ার দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজা খুলে বেরিয়ে গেলো।
আনায়া শুধু তাকিয়ে রইল তার পেছনের দিকে, নিঃশব্দে। তার ঠোঁট কাঁপছে, বুক ভারী হয়ে আসছে। একসময় নিজেকে আর সামলাতে না পেরে সে ফুপিয়ে উঠল চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে, তার বুকের ভেতরটা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে।
কীভাবে সে বোঝাবে জেভিয়ারকে, তার ভালোবাসার এই মানুষটাই আজ তার সবচেয়ে গভীর যন্ত্রণার কারণ!
সময় থমকে আছে ঘরে। হঠাৎই দরজার দিক থেকে ভেসে এলো এক পরিচিত কণ্ঠ,
একটা কটাক্ষময় হাসির সুর,
অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ২৯
“হ্যালো, সিস্টার-ইন-ল… শুনলাম আমার ভাই নাকি বাবা হতে চলেছে?”
আনায়া চমকে তাকাল দরজার দিকে।
দেখল, এরিক্স কালো স্যুটে, ঠোঁটে বিকৃত হাসি।
আনায়ার মুখ শুকিয়ে গেল। এক মুহূর্ত স্তব্ধ থেকে সে বলল,
“মানে… কী বলছেন আপনি ?”
এরিক্স হালকা হাসল, ঘরের ভেতরে ঢুকে ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এল। মাসে বলল নিচু স্বরে বলল মানে এইটাই যে,
“আমাদের রাশিয়ার কিং অফ দ্যা ব্ল্যাক এম্পাইয়ার, এখন বাবা হতে যাচ্ছে। আর সেই তার রক্তের অংশ,আপনার গর্ভেই রয়েছে।”
