অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১৮
তোনিমা খান
বছর দুয়েক আগের সেই প্রাণবন্ত, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী মৌনতা অচিরেই কোথায় হারিয়ে গিয়েছে। কথায় আছে শারীরিক রোগের থেকেও মানসিক চাপ বেশি যন্ত্রনাদায়ক। আর সেটা যদি হয় নিজের একমাত্র ভিত্তিকে হারিয়ে ফেলার মানসিক যন্ত্রণা তবে তো এক টুকরো হাসি যেন বিলাসীতা! যেই স্বামীকে নিজের সবটা মেনে একটা সুখী সংসার গড়ার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে যায় সেই স্বামী দিনশেষে অন্যত্র নিজের সুখ খোঁজে। এই যন্ত্রণা কি কম ছিল যে এখন শরীরটাও সায় দেয় না?
“সংসার করতে হলে ধৈর্য সহ্যের প্রয়োজন।” শাশুড়ির এই এক কথা মেনে চলতে চলতে আজ মৌনতা ভীষণ ক্লান্ত। মাঝেমধ্যে একটু ভালোবাসার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে অন্তঃস্থল। অথচ তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়ার মতোও একজন মানুষ নেই। অস্থিমজ্জা কামড়ানোর ন্যায় অসহনীয় ব্যথা দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করতে করতে মৌনতা দুর্বল চাহনি ফেললো ঘড়ির পানে।
বারোটা বাজে ইমরোজ এখনো আসছে না। সে ঘন ঘন শ্বাস ফেললো। দিনের এই অন্তভাগে শরীর একদমই ভেঙে আসে।
এই কনকনে শরীর রাতে তার সারা শরীর ঘামছে। নিজের বাম পা’টা কেউ সযত্নে নিজের কোলে তুলে নিতেই আঁচলে গলা মুছতে মুছতে মৌনতা উদাসীন দৃষ্টি ফেললো রোজের দিকে। সম্মুখের চেয়ারে বসা রোজ আলতো হাতে পা টিপতে লাগলো। মৌনতা নিষেধ করল,
–“পা ছাড়ো, রোজ।”
–“বেশি কথা বলো না, মৌন বউ। ভাইজানকে ডাক্তার দেখানোর কথা বলছো না কেন?”
–“বলেছিলাম।”
–“কি বলেছে?”
–“ব্যস্ত, তোমার সাথে চলে যেতে বলেছে।”, মৌনতা ম্লান হেসে বলল। এই জীবনে স্বামীর থেকে একটু ভালোবাসা পাওয়া তার জন্য স্বপ্নতুল্য।
রোজ চোখ তুলে তাকায়। বলল,
–“আমার সাথেই চলো তবে, কি সমস্যা?”
মৌনতার দৃষ্টি টলটল করে ওঠে। কেন কেউ বোঝে না তার ও একটা মন রয়েছে। অন্তঃস্থল যে একটু একটু করে গুমড়ে গুমড়ে মরে যাচ্ছে কেউ কি টের পাচ্ছে? হাজারো পরিশ্রম, অসুস্থতার মাঝেও ঐ একটা মানুষের একটু সহানুভূতি তাকে শক্তিশালী করে তোলার জন্য যথেষ্ট! নিজের যত্ন নিতে নিতে আজ সে ক্লান্ত! উদাসীন কণ্ঠে বলল,
–“এই ব্যথা সবসময় তো থাকে না। হুটহাট হয়, চিন্তা করো না।”
–“সেটাই তো কেন হয়? দেখা তো প্রয়োজন। আর তোমার শরীরের ও অবস্থা তো ভালো লাগছে না আমার। শুকাতে শুকাতে কোথায় গিয়েছ?”
–“নায়েল হওয়ার পর থেকেই তো এমন শুকাচ্ছি। এক সময় মোটু বলতে আর এখন শুকাচ্ছি এখন আবার শুকনা বলো! তোমরা চাও কি?”
মৌনতার গা ছাড়া কণ্ঠে রোজ থমথমে মুখে বলল,
–“তোমায় সুস্থ সবল দেখতে চাই।”
মৌনতা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রোজের দিকে। ম্লান কণ্ঠে বলল,
–“অথচ যেই মানুষটার আমার সুস্থতা চাওয়ার কথা সেই মানুষটা জানেই না আমি অসুস্থ!”
–“তোমাদের মধ্যে কোনো সমস্যা হচ্ছে মৌন বউ?”
–“কোনো সমস্যা না হোক তার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছি রোজ। দোয়া করো যেন আমি জিতে যাই।”
ফ্যাকাসে নেত্রদ্বয় থেকে নোনাজল গড়ানোর জন্য ছটফট করছে ঠিক যেমনটা প্রতিনিয়ত ছটফট করে মৌনতার অন্তঃস্থল! জবা আর মাজেদা মলিন চোখে দেখে মানুষটাকে। এই পরিবারে এত বছর যাবৎ আছে, তারা বোঝে বদলে যাওয়া সম্পর্কের নড়বড়ে অবস্থা!
রোজ ঝিমুনি দিয়ে বসা জবাকে জিজ্ঞাসা করে,
–“আপা, আপনার কি অবস্থা? এমন ঝিমিয়েই জীবন পাড় করে দিতে চাচ্ছেন? বিয়ে করবেন না?”
জবা অনীহা প্রকাশ করে বলল,
–“জীবনে সুখ পাইতে হইলে এই বেডা মানুষ থিকা দূরে থাকতে হইবো, আফা। একবার বিয়ে করছিলাম না? সারাদিন মানুষের বাসায় কাজ করে তার সংসারে টাকা দাও, আবার মাইর ও খাও। সম্মান তো নাই একটুও! মানুষ-ই মনে করত না। তার চাইতে এখন হাজার গুণ ভালো আছি। পরিশ্রম করি—টাকা আর শান্তি দুইডাই আছে।”
মৌনতা মৃদু হেসে বলল,
–“জীবনে প্রথমবার জবাকে বুদ্ধিমতি মনে হয়েছে।”
–“তো আফনার কি আমারে বেকুব মনে হয়?”
–“ছোট ভাইজানের সাথে যা করিস তাতে তাই মনে হয়। যেচে কে কুয়াতে ঝাপ দেয়? কোনদিন দেখবি তার হাতে তুই একটা দুইটা খেয়েছিস।”
–“ক্যান আমার পাও নাই? সে মারবে আর আমি খাড়াইয়া থাকমু? হুহ! বয়েই গেছে।”
জবা মুখ বাঁকিয়ে বলল। রোজ আর মৌনতা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। তন্মধ্যেই কলিং বেল বেজে উঠল। সহসা মৌনতার চোখ চকচক করে উঠল। চঞ্চল কণ্ঠে বলল,
–“দরজা খোল, জবা। তোর মেজো ভাইজান এসেছে মনে হয়।”
জবা উঠতে উঠতে বলল,
–“হে হইলেই ভালো! ঐ জল্লাদ হলে কিন্তু আমার মেজাজ বিগড়ে যাবে।”
–“এক থাপ্পড়ে তোর মেজাজ ঠিক জায়গায় আনতেও এরোজ বাবার সমস্যা হইবে না, জবা।”, মাজেদা পান চিবুতে চিবুতে বললেন। জবা তেতে উঠল,
–“মেজাজ খারাপ করবা না, বুড়ি!”
জবা দরজা খুলতেই তার ভাবনা সঠিক করে দিয়ে এরোজের ফোলা ফোলা ফর্সা মুখটি ভেসে উঠল। লালচে টলটলে নেত্র তুলে এরোজ খেকিয়ে উঠল,
–“মুখের সামনে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? সর!”
জবা তড়িঘড়ি করে সরে গেল। মৌনতা আর রোজ দীর্ঘশ্বাস ফেললো। ইশারায় বলল,
–“তাড়াতাড়ি লেবু পানি দিয়ে আয় নয়তো আব্বুজান উঠে যাবেন।”
জবা আজ আর তিড়িং বিড়িং করে না মৌনতার অসুস্থতার কারণে। তৈরি করা লেবুর শরবত নিয়ে ছুটলো। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকা এরোজকে পিছু ডেকে বলল,
–“নেন নেন ভাইজান। এইডা খাইয়া নেন। মাথা ঠিক জায়গায় আইসা যাইবো।”
নিজের কথায় নিজেই জিভ কাটে জবা। এরোজ চলছে তো চলছে। সে এবার পথ রোধ করে দাঁড়ায়। এরোজ থমথমে মুখে তাকায়। জবা ভীষণ আত্মবিশ্বাসের সাথে ডোন্ট কেয়ার মুডে বলল,
–“নেন খাইয়া নেন। দেখবেন মাথাডা হালকা হইয়া গেছে।”
বিগত দিনে মৌনতার হাত থেকে গ্লাস ছোড়েনি বলেই জবার মধ্যে এই আত্মবিশ্বাস। তবে তার আত্মবিশ্বাসকে দূরছাই করে দিয়ে এরোজ গমগমে স্বরে বলল,
–“সামনে থেকে সর।”
এরোজ দুলছে। চোখের সামনে সব ডাবল ডাবল দেখাচ্ছে। জবা কপাল কুঁচকে বলল,
–“এইডা খান। এইযে আফনে দুলতাছেন সব ঠিক হইয়া যাইবো।”
ধৈর্য্যের শোচনীয় পর্যায়ে থাকা এরোজ সহসা গ্লাসটা ছুঁড়ে ফেলে গর্জে উঠল,
–“তোকে সরতে বলেছি কতক্ষণ ধরে? আমার পথ আঁটকে দাঁড়ানোর সাহস হয় কি করে, হ্যাঁ?”
জবা সহ মৌনতা রোজ কেঁপে উঠল সেই হুঙ্কারে। গ্লাসটি গিয়ে সাদা মারবেল টাইলসে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। আতঙ্কিত জবা দিকদিশা হারিয়ে উল্টোদিকে ছুটে চলে গেল। তকদির সিকদার আজ দেরিতে ঘুমাতে যাওয়ার সে জেগে ছিল। এহেন হুঙ্কারে সে ছুটে বের হয়। সে জানে মৌনতা রাত জাগে প্রায়শই!
সে ছুটে এসে শুধায়,
–“কি হয়েছে মৌনতা?”
মৌনতা দীর্ঘশ্বাস ফেললো শশুরের কণ্ঠে। পায়ের ব্যথা ভুলে ছুটে যায় বসার ঘরে। বিনম্র কণ্ঠে বলল,
–“কিছু হয়নি আব্বুজান। জবার হাত থেকে গ্লাস পড়ে গিয়েছে।”
মৌনতার কথা আর গ্রহণযোগ্য রইলো না এরোজের দোদুল্যমান দেহ দেখে। তকদির সিকদার হিসহিসিয়ে বললেন,
–“ঐ অপদার্থ আবার নেশা করে ঘরে এসেছে? ওর সাহস কি করে হয় আমার ঘরের শান্তি নষ্ট করার? এই বেয়াদব দাঁড়া!”
তকদির সিকদার সেই রাতে পাল্টা হুঙ্কার ছাড়লেন। মৌনতা শশুরকে অনুরোধ করে বলল,
–“আব্বু রাত হয়েছে। এত রাগারাগী করার প্রয়োজন নেই, আব্বু। আপনার প্রেশার এমনিতেই হাই, আপনি গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন। আমি তাকে লেবুর শরবত দিচ্ছি।”
–“এমন আর ক’দিন চলবে বলতে পারো? আস্ত এক মাওয়ালি হয়ে গিয়েছে। এসেছে মাত্র ক’দিন! অথচ মানুষ আমায় এখনি টিটকারী কেটে বলে, আমি টাকা দিয়ে একটা মাতাল গুন্ডা লালন পালন করি।”, তকদির সিকদার রেগে বললেন। অথচ এরোজ নির্বিকার হেলতে দুলতে উপরে উঠে গিয়েছে।
শশুরকে ঠান্ডা করে ঘরে পাঠিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো মৌনতা। অতঃপর দ্রুতহাতে লেবুর শরবত বানিয়ে আর একটা ট্রেতে রাতের খাবার সাজিয়ে রোজের হাতে ধরিয়ে দিলো।
–“এটা দিয়ে আসো, রোজ। নয়তো ওভাবেই না খেয়ে পড়ে থাকবে আর আম্মা সকালে উঠে আমায় বকবেন।”
রোজ বিতৃষ্ণা ভরা দৃষ্টি ফেলে উপরে গেল। তার ভালোলাগে না ভাইজানকে এমন দেখতে। এই মানুষটা ছিল তার ঘরের সবচেয়ে চমৎকার মানুষ। তার খুব কাছের বন্ধু! অথচ এখন তার দিকে একবার চোখ তুলে তাকায় ও না। কেমন জীবন থেকে উদাসীন হয়ে গিয়েছে।
নিশুতি রাতে কনকনে ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করে বের হয়ে এরোজ একহাতে মাথা মুছতে লাগলো। রোজ ভয়ে ভয়ে ঘরে ঢুকে টেবিলে খাবার রাখলো। অতঃপর ভাইয়ের দিকে সতর্ক দৃষ্টি ফেলে এক ছুটে বেরিয়ে যায় কামড়া থেকে।
নিভে আসা সরু নেত্রে ছুটন্ত বোনকে দেখে এরোজ এক পলক দৃষ্টি ফেললো টেবিলের দিকে। ধীর পায়ে এগিয়ে যায় ট্রেটির দিকে। লোভনীয় খাবারের মধ্য থেকে শুধু লেবুর শরবতটা তুলে নিলো। এক পলক উদাসীন দৃষ্টি ফেলে ঢকঢক করে খেয়ে নিয়ে বিছানায় গিয়ে ধপ করে শুয়ে পড়ে। দরজা সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা তপোবন ক্ষীণ নিঃশ্বাস ফেললো। অতিরিক্ত চেঁচামেচি শুনে বের হয়েছিল অথচ অন্তঃস্থলে এখন অনুতাপে জর্জরিত ! ছেলেটার এই দশার কারণ যে সে নিজেই!
ফের কলিং বেল বাজলো। ইমরোজ ও চলে এসেছে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ঘরে চলে যায়।
পড়াশুনার প্রতি প্রবল আগ্রহ রূপকথার। আর সেই আগ্রহকে ত্বরান্বিত করার জন্য তপোবনের মতো পথপ্রদর্শক। রূপকথা আজ আরো দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়ে উঠল। নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস বাড়ছে তার। এখন মনে হয় সে ঝড়ে পড়বে না। রাত সাড়ে বারোটা পর্যন্ত তপোবনের কাছে পড়েছে রূপকথা। আর তানশান বারোটা পর্যন্ত। নিয়মানুযায়ী তানশান বারোটা বাজার দশ মিনিট আগেই বিছানায় যায়। দশ মিনিট মায়ের ডায়রি পড়ে তারপর ঘুমিয়ে যায়।
তপোবন তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তবে বিগত রাতের মতো আজও তার ঘুম ভেঙে গেল নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করা মৃদু শব্দে। সে ঘুম জড়ানো নেত্রে লাইট জ্বালাতেই বিগত দিনের মতো ব্যাথায় কুঁচকানো মুখটি ভেসে উঠল। সে ডানে বামে মাথা নাড়ে কম্ফোর্টার সহ রূপকথাকে নিচে দেখে। অবুঝ কণ্ঠে শুধায়,
–”আশ্চর্য! তুমি প্রতিদিন ওখানে কি করো? আমি তো বুঝতে পারছি না, এতো বড় বিছানা থেকে তুমি পড়ে যাও কি করে?”
রূপকথা এবারেও নিরুত্তর ধীরস্থির উঠে বসে। এই প্রশ্নের জবাব নেই তার কাছে। তপোবন বিছানা থেকে নেমে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। ফিরে আসে কোলবালিশ হাতে। সেটি রূপকথার পাশে দিয়ে রূপকথাকে মাঝখানে শুতে বলে। রূপকথা আর দ্বিরুক্তি করে না। চুপচাপ শুয়ে পড়ে।
তবে গতরাতের মতো আজও ঘুমানোর আধা ঘন্টা পরই তপোবন বুঝতে পারল, প্রতি রাতে রূপকথার খাট থেকে পড়ে যাওয়ার কারণ। এক হাতে তার পেট জড়িয়ে কাঁধে মাথা দিয়ে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে রূপকথা।
মেয়েটির ঘুমের ধরণ নির্দেশ করছে, মেয়েটির ঘুমের ধরণ একদম বাজে। আগাতে আগাতে তপোবনের এবার পড়ে যাওয়ার উপক্রম। তাই সে এবার আগানোই বন্ধ করে দিলো। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে রূপকথাকে একহাতে আগলে নিয়ে তাকে সহ মাঝে চলে গেল। হাত বাড়িয়ে লাইট নিভিয়ে আবার চোখ বোঝার চেষ্টা করে।
তার মুখশ্রীতে নেই কোন বিরক্তিভাব বরং কিছু মিষ্টি স্মৃতিচারণ হতেই ঠোঁটের কোনে আলতো হাসি ফুটে উঠল।
বহু বছর পর সেই পুরোনো কিছু অভিজ্ঞতা নতুন রূপে ধরা দিচ্ছে। যেগুলো না চাইতেও তপোবন উপভোগ করছে। হুটহাট অভিমান দেখানো, অধিকার বোধের সাথে হাত আঁকড়ে ধরা, আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে ঘুমানো, তার দৈনন্দিন কাজগুলো আরো সহজ করে দেওয়া— এই অনুভূতিগুলো যেন নতুন রূপে তার জীবনে আগমন করেছে। জড়তাহীন ভাবে পৃষ্ঠদেশ আঁকড়ে ধরা হাতটি আরেকটু জড়িয়ে নিলো মেয়েটিকে। অযুহাত বলতে এতটুকুই—যেন মেয়েটি পড়ে না যায়।
নতুন সকাল নতুন সব দায়িত্ব নিয়ে হাজির হয় রূপকথার কাছে। এই দায়িত্বগুলো যে তার বিকৃত জীবনযাত্রা আরেকটু কঠিন করার প্রয়াসে তা বুঝতে বাকি থাকে না রূপকথার। নির্জনা বেগম আজ সকাল সকাল উঠে রূপকথাকে কাজে নামিয়েছে। সকালের নাস্তা থেকে শুরু করে, প্রত্যেকের খুঁটিনাটি চাহিদাগুলো তাকে দিয়ে পূরন করানো। এবং দুপুরের রান্নার জন্য লম্বা একটা খাবারের লিস্ট ধরিয়ে দিয়েছে। এগুলো তাকে রান্না করতে হবে। মৌনতাকে ধারেকাছেও যেতে দেয়নি নির্জনা বেগম। সে অসুস্থ!
সকাল আটটা। রূপকথা লম্বা লিস্ট হাতে দাঁড়িয়ে আছে রান্নাঘরে। গতকাল রাতে তপোবন তো বলেছিল আজ সে কলেজে যাবে! হয়তো আজ আর যাওয়া হবে না। সে মলিন হেসে মৌনতার দিকে তাকায়। মৌনতা অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো রূপকথার দিকে। সে আর রোজ বেশ বুঝতে পারলো এটা রূপকথাকে কলেজে না যেতে দেওয়ার পরিকল্পনা।
মৌনতার শরীর অনেকটা ভালো এখন। সে সব কাজ করতে পারবে। তার প্রচুর রাগ হলো শাশুড়ির কাজে। এমন দিন তাকে কোনদিন দেখতে হয়নি। সে তো পড়াশুনা ছেঁড়েই দিয়েছিল। তবে রূপকথা! ছোট্ট এই মেয়েটিকে সে বড় হতে দেখতে চায়। ঘরের সকলে ধীরে ধীরে উপস্থিত হয় খাবার ঘরে নাস্তার করার জন্য। তবে বরাবরের মতো এরোজ নেই। রূপকথা আর মৌনতা সকলকে খাবার পরিবেশন করে।
সকলের খাওয়া হতেই তপোবন রূপকথার দিকে তাকায়। আচমকা নিজের উদ্দেশ্য ভেসে আসা গম্ভীর স্বরে, ঝিমুনি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রূপকথা চকিতে চোখ তুলে তাকায়। তাকাতেই তপোবন বলল,
–“কলেজে যেতে হবে তোমায়। তুমি এখনো এখানে বসে আছো কেন? খাওয়া হয়েছে না? হলে এসো। তানশানের সাথে একসাথে বেরিয়ে পড়বে, হাতে সময় কম।”
নির্জনা বেগম চোখ তুলে তাকায় ছেলের দিকে। চাপা আক্রোশে বলল,
–“ও কলেজে গেলে ঘরের রান্না কে করবে তপোবন? মৌনতা অসুস্থ! তুমি কি দেখছো না? নাকি এখন বুড়ো বয়সে বাবা মাকে কাজের লোকের হাতের রান্না খাওয়াবে?”
তপোবন শান্ত দৃষ্টি ফেললো মায়ের পানে। গম্ভীর মুখে বলল,
–“আম্মা, কাজের লোক আর পরিবারের লোক বলে কিছু হয় না। সবাই মানুষ! তাদের রান্না খেলে আমাদের প্রাণ তো আর যাবে না? রূপকথার কলেজ আছে, পড়াশুনা আছে। ওর হাতে এক বছর সময় আছে, ওকে প্রচুর পড়তে হবে। মৌনতাও অসুস্থ, ওর বিশ্রামের প্রয়োজন। এমতাবস্থায় করনীয় কিছু নেই, বাধ্যতামূলক আমাদের অন্য কোনো ব্যবস্থা নিতে হবে। আর জবা এতো দিনে আমাদের সকলের খাবারের ধরন ভালোভাবে আয়ত্ত করে নিয়েছে। ওর রান্নাও সুস্বাদু। তোমার কি কোনো সমস্যা রয়েছে আব্বু?”
তপোবনের প্রশ্নে তকদির সিকদার না বোধক মাথা নাড়ে। বলল,
–“আমার কোন সমস্যা নেই, তপোবন। তোমার স্ত্রী, তুমি পড়াবে তাতে কারো কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়।”
সরব নির্জনা বেগম রাগান্বিত চোখে তাকায় তার দিকে। দাঁতে দাঁত চেপে কিছু বলতে নিলে তকদির সিকদার তার হাত চেপে ধরল। চোখে শাসায় তাকে। অতঃপর হাসিমুখে বড় ছেলের বউয়ের দিকে তাকায়। স্নেহের কণ্ঠে বলে,
–“আজ তোমার কলেজের প্রথম দিন বুঝি? অনেক অনেক দোয়া তোমার জন্য এগিয়ে যাও। পরিবার পরিজনকে সাথে নিয়ে আগাও।”
বলেই তিনি চেয়ার আর ছেঁড়ে উঠে দাঁড়ায়। পকেট থেকে এক হাজার টাকার একটি নোট বের করে রূপকথার হাতে দেয়। মাথায় হাত দিয়ে বলে,
–“এটা রাখো।”
–“কিন্তু..”, রূপকথা ব্যগ্র কণ্ঠে কিছু বলতে গেলেই তকদির সিকদার তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
–“কোনো কিন্তু নয়, আব্বু খুশি হয়ে দিয়েছি তোমায়। এখন যাও, তপোবনের সাথে যাও। দেরি হয়ে যাবে তোমার।”
তপোবন জবার দিকে তাকিয়ে শুধায়,
–“একা সব রান্না করতে পারবি, জবা? নাকি আমি আরেকজন হেল্পারের ব্যবস্থা করব?”
–“ও একা কেন ভাইজান! আমি আছি তো। আমার শরীর অনেকটা সুস্থ। আমি পারব সব করতে। আপনারা এতো চিন্তা করবেন না। নিজের অসুস্থতা নিয়ে আমি এখন লজ্জায় পড়ছি।”, মৌনতা লজ্জিত কণ্ঠে বলল। তপোবন এগিয়ে আসে তার কাছে। মৌনতার মাথায় হাত রেখে বলে,
–“অসুস্থতা নিয়ে লজ্জার কি আছে? এত দিন কি তুমি একাহাতে সব সামলাও নি? আজ যখন তুমি অসুস্থ তখন কি আমরা বিরক্ত হবো কেন? এমনটা আর কখনো ভাববে না। আমরা তোমায় আবার সুস্থ সবল হাসিখুশি দেখতে চাই। নিজের খেয়াল রাখো। ভাইজান দুঃখিত মৌন! তুমি দেখছো আমার পরিস্থিতি, আর ধন্যবাদ!”
মৌনতা স্মিত হাসলো। তপোবনকে সেই বলেছে শাশুড়ির পরিকল্পনার কথা।
রূপকথা আড়চোখে শাশুড়ির দিকে তাকায়। থমথমে মুখে বসে আছে সে। মৌনতা রূপকথার পাশে এসে দাঁড়ায় কপাল কুঁচকে বলে,
–“যাচ্ছো না কেন?”
রূপকথা মলিন মুখে তাকায় মৌনতার দিকে। মলিন কণ্ঠে বলল,
–“আপনি তো অসুস্থ ভাবি। আমি চলে গেলে এতো গুলো রান্না আপনাকে একা করতে হবে।”
মৌনতা স্নেহের হাসি দিয়ে বলল,
–“পিচ্চি মেয়ের কত চিন্তা! আমি এখন ঠিক আছি। তুমি নিশ্চিন্তে কলেজে যাও, আর মন দিয়ে পড়াশুনা করো। এতো দিন তো এগুলো আমি একাই করে এসেছি। জবা, মাজেদা চাচি আছে না! তারা আমায় সাহায্য করে। আর আমার কুটনী ননদিনীর ও আজ কলেজ নেই। তাকে দিয়েও আজ কাজ করাবো।”
মৌনতার কথায় রোজ কটমট করে তাকায় তার দিকে। মৌনতা দেখেও না দেখার ভান করল।
রূপকথা প্রফুল্ল চিত্তে তপোবনের পিছু পিছু যায়।
মৌনতা আর রোজ হাসিমুখে একে অপরের দিকে তাকায়। রোজ যখন ইন্টার পরীক্ষা দেয়। তখন তার পড়াশুনা নিয়েও ঝামেলা করছিল নির্জনা বেগম। সে রোজকে আর পড়াশুনা করতে দেবে না। বিয়ে দিয়ে দেবে। তার ভাষ্যমতে অতিরিক্ত পড়াশুনা করলে মেয়েরা হাতির পাঁচ পা দেখে বসে আর সংসার করতে চায় না। তখনো তপোবন প্রতিবাদ করে। আর জোরপূর্বক রোজকে ভার্সিটিতে পড়ায়। কিন্তু মৌনতার ক্ষেত্রে তার কোন জোর খাটেনি। কেননা ইমরোজ নিজেও চাইতো না মৌনতা পড়াশোনা করুক। স্ত্রীকে পড়াশুনা করার অনুমতি দেয় না কিন্তু সে জীবনসঙ্গী হিসেবে চায় কর্মজীবী একজন আধুনিক মেয়ে। মাঝেমধ্যে মৌনতার নিজের ভাগ্যের উপর হাসি পায়। কত সংসারে দেখা যায় নারীর উদাসীনতায় ঘর ভেঙে যায় আর পুরুষ আপ্রান চেষ্টা করে সংসারটা টিকিয়ে রাখার। কিন্তু এখানে? এখানে সে আপ্রান চেষ্টা করে যাচ্ছে তার সংসারটা টিকিয়ে রাখার।
বছরের শুরুর দিকে কলেজে প্রোগ্রামের কমতি থাকে না। আজও হয়তো তেমনি কোন প্রোগ্রাম রয়েছে। পুরো কলেজ কেমন জমজমাট, সুসজ্জিত। কলেজ ড্রেস পড়া সাথে একটা লেদারের ব্যাগ নিয়ে বিভ্রান্তি নিয়ে এলোমেলো পায়ে হাঁটছে রূপকথা। কলেজে আসতেই তানশান তার স্কুলের ভবনে চলে গিয়েছে। আর তাকে বলেছে এই দিকে আসতে। সে তো নিজের ক্লাসই খুঁজে পাচ্ছে না। হাঁটতে হাঁটতেই সে একটা ক্লাস রুমের সামনে অনেকগুলো ছেলেমেয়ে দেখে। সে তাদের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। ইতস্ততানিয়ে তাদের মধ্যে একজনকে ডেকে উঠল,
–“এই যে শুনছেন?”
মিনমিনে নারী কণ্ঠে সাদা পোশাকের এক যুবক কৌতুহলী নয়নে পিছু ফিরে তাকা । বিভ্রান্তি মাখা এক মুখ অক্ষিপটে আঁটকে যেতেই সে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞাসা করে
–“কি চাই?”
রূপকথা বিনম্র কণ্ঠে শুধায়,
–“ভাইয়া, ইন্টার সেকেন্ড ইয়ার বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের ক্লাসটা কোথায়? দয়াকরে, একটু বলবেন!”
ছেলেটি কিয়ৎকাল অদ্ভুত নয়নে রূপকথার আপাদমস্তক দেখলো। ভ্রু নাচিয়ে শুধায়,
–“তুমি ইন্টার মিডিয়েটে পড়ো?”
রূপকথা হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়লো। যুবকটি নিজের আশেপাশে তাকায়। সকলে মিটিমিটি হাসছে। যুবকটি গম্ভীর গলায় বলল,
–“তুমি ঠিক জায়গায় এসেছ। এটাই তোমার ক্লাস। কিন্তু তোমার ক্লাসের তো এখনো আধা ঘন্টা বাকি। তুমি বরং এখানে বসে এই খাতার লেখাগুলো হুবহু এই খাতায় তুলে ফেলো।”
যুবকটি রূপকথার হাতে দু’টো খাতা ধরিয়ে দিয়ে বলল। রূপকথা ভ্রু কুঁচকে শুধায়,
–“এগুলো কি? আমি এটা লিখবো কেন?”
–“তুমি ক্লাস করতে চাও তো?” , যুবকটির প্রশ্নে রূপকথা উপরনিচ মাথা নাড়লো। যুবকটি স্মিত হেসে বলল,
–“তাহলে এটা লিখে সম্পন্ন করো।”
বলেই যুবকটি হেঁটে চলে যায়। যেতে যেতে একটা মেয়েকে বলে যায় রূপকথাকে পাহাড়া দিতে। মেয়েটি রূপকথাকে তাড়া দিয়ে বলল,
–“কি হলো লেখো। ক্লাস করার ইচ্ছা আছে নাকি?”
শহুরে ছেলেমেয়েদের কর্মকান্ডে অনভ্যস্ত রূপকথা, অবুঝ পানে তাকায়। বাধ্য হয়ে সে লিখতে বসে। দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ মিনিট পর যখন রূপকথা লেখা শেষ করল, তখন মেয়েটি নিজের ফোন থেকে মাথা তুলে তাকায়। রূপকথার থেকে খাতাটা নিয়ে বাহ্বা জানিয়ে বলল,
–“লেখা শেষ? গুড! এটা অনার্সের স্টুডেন্টদের ভবন। তোমাদের ভবন ঐ যে দক্ষিণ পাশের প্যাস্টেলে রঙের দালানটা আছে না? ঐটা, যাও। কাউকে জিজ্ঞেস করলেই বলে দেবে তোমার ক্লাস কোনটা।”
বলেই মেয়েটি গটগট করে চলে গেলো। আর রূপকথা বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল। সকলে মিলে তাকে বোকা বানিয়ে যে নিজেদের কার্য হাসিল করেছে সেটা বুঝতে বাকি রইলো না। রূপকথা তাচ্ছিল্য হাসল। শহুরে ছেলেমেয়েরা এত বিগড়ে যাওয়া? একদিকে সে পড়াশুনা করার জন্য মরিয়া আর একদিকে সকল সুযোগ-সুবিধা পাওয়া ছেলেমেয়ে গুলো ফূর্তি করে বেড়ায়। তার ও ঠিক দশ মিনিট পর রূপকথা নিজের ক্লাসে পৌঁছায়। ততক্ষণে একটা ক্লাস হয়ে গিয়েছে।
–“হেই হ্যান্ডসাম, উড ইউ লাইক টু গো ফর আ ডেট উইথ মি?”
নিঃশব্দে চিরকুটটি পড়তেই তানশানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। সে ঘাড় কাত করে নিজের বা পাশে তাকায়। তার পাশের সাড়ির বেঞ্চিতে ঠিক তার বরাবর গালে হাত দিয়ে বসে থাকা সুনেহরা এক গাল হেসে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিসিয়ে বলল,
–“আই উড লাইক টু ডাই উইথ ইউ। ওয়ানা গো উইথ মি? ”
সুনেহরার চোখ মুখ জুড়ে বিস্ময়। সে চঞ্চল কণ্ঠে বলল,
–“ইশ! আমার এখনও মরার বয়স হয়নি। তাই আমি তোর প্রস্তাবে ইচ্ছুক নই। আমার মতো সফট, সুইট, সুন্দর মেয়ের এখনো দুনিয়া কাঁপানো বাকি আছে।”
তানশান চাপা রাগান্বিত স্বরে বলল,“তো দুনিয়া কাঁপাও গিয়ে আমাকে কেন কাঁপাচ্ছ?”
“হায়! রাগলে ঠোঁট দুটো লাল হয়ে যায়। ইচ্ছে করে খেয়ে ফেলি। আমার দুনিয়াটাই তো তুই। আমি তো আমার দুনিয়াকেই কাঁপাচ্ছি।”
সুনেহরা বুকে হাত দিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো। তানশান হতভম্ব হয়ে গেলো সুনেহরার কথায়। মুহুর্তেই রাগে গাল সহ নাক-কান লাল হয়ে গেলো। এমন অশ্লীল কথা শুনে নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারল না সে। সে রাগান্বিত স্বরে বলল,
–“আর একবার এমন অসভ্য কথা বললে, আমি স্যারকে বলে দেবো।”
–“দে, বলে দে। আমি কি ডেকে দেবো স্যারকে? স্যার যখন জিজ্ঞেস করবে তখন কি বলবি? আমি কি বলেছি তোকে?”
সুনেহরা ডোন্ট কেয়ার মেজাজে বলল। তানশান নিভে গেলো। সে স্যারকে কিভাবে বলবে ঐ অসোভ্য কথা! সে রাগে গজগজ করে উঠল। তৎক্ষণাৎ ক্লাস শিক্ষক ডেকে উঠল তানশানকে।
তানশান হতচকিত দাঁড়িয়ে যায়। ক্লাস টিচার গম্ভীর গলায় শুধায়,
“তানশান ক্লাস টাইমে কি কথা বলছিলে? ক্লাসে মনোযোগ নেই কেন, তোমার? তোমায় ইদানিং বেশ বেখেয়ালি দেখা যায়। ক্লাসে কি কথা বলার জন্য আসো?”
তানশানের মুখশ্রী থমথমে ধারন করলো লজ্জা, অপমানে। সে বিনম্র কণ্ঠে সাফাইয়ের সুরে বলল,
–“স্যার…”
–“তানশানের কোন দোষ নেই, স্যার। আপনি তো জানেন-ই ওকে মারলেও কথা বলে না। আমি ওকে ডিস্টার্ব করছিলাম। একটা পড়া জিজ্ঞাসা করছিলাম।”
সুনেহরার ব্যগ্র কণ্ঠে তানশান কপাল কুঁচকে তাকায় তার দিকে। ক্লাস টিচার ধমকে উঠল তাকে,
–“ক্লাসে টিচার থাকতে ওর কাছে জিজ্ঞেস করতে হবে কেন? ক্লাস ফাঁকি দেয়ার চেষ্টা তাই না? যাও বেরিয়ে যাও ক্লাস থেকে। আমার ক্লাসে যেন তোমায় আর না দেখি।”
সুনেহরা নির্বিকার মাথা নেড়ে ব্যাগ থেকে একটা ললিপপ হাতে নিয়ে, হেলেদুলে বেরিয়ে গেল ক্লাস থেকে। তানশান হা করে তাকিয়ে রইল সুনেহরার দিকে। এই মেয়ে ঠিক কোন প্রজাতির সে ভেবে পায় না। লজ্জা, আত্মসম্মানবোধ বলতে আদৌ কিছু তার মাঝে আছে? আজ থেকে এই মেয়ে তাকে বিরক্ত করে না। সেই ক্লাস এইট থেকে। টিচার তানশানকে বসার অনুমতি দিলে সে তপ্তশ্বাস ফেলে বসে পড়ল। আড়চোখে একবার তাকায় করিডোরে অলস পায়ে হাঁটতে থাকা সুনেহরার দিকে।
তিনটা ক্লাস হয়েই তানশানের ছুটি হয়ে যায়। আজো তাকে তার ক্লাস ফিলোরা বিরক্ত করেছে। তানশান বিক্ষিপ্ত মেজাজে ড্রাইভারের সাথে তাড়াতাড়ি বাড়িতে চলে আসে। তানশান বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে নিচে আসতেই মৌনতা ফল কেটে তার কাছে আসে। তানশানের পাশে টেবিলে বসে জিজ্ঞাসা করে,
–“তানশান আব্বু, একা আসলে যে! রূপকথার ক্লাস শেষ হয়নি?”
তানশান খেতে খেতে শান্ত স্বরে বলল,
–“আমি কিভাবে জানব, মেজো মা! সে তো কলেজে পড়ে। তার ক্লাস ভিন্ন সময়ে হয়, আমার ক্লাস ভিন্ন সময়ে হয়।”
–“ওহ্।”
মৌনতা ছোট্ট করে জবাব দেয়। পরপরই বলে,
–“অল্প খাবে তানশান। একটু পরে পেট ভরে ভাত খাবে। এগুলো খেয়ে পেট ভরে বসবে না।”
তানশান মাথা নেড়ে শুধায়,
–“কি রান্না করেছ, মেজো মা?”
–“বাগেরহাট থেকে আনা বড় রুই মাছ। ভাজা ভাজা করে ভুনা করেছি। খুব মজা হয়েছে। আরো অনেককিছু করেছি, খেতে গিয়ে দেখবে।”, মৌনতা হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলল।
তানশান চোখ মুখ কুঁচকে নিলো তার কথায়। বলল,
–“আমি মাছ খাইনা, মেজো মা। তুমি জানো না? আমি এগুলো খেয়েই পেট ভরে ফেলব।”
–“আরো অনেককিছু রান্না করেছি তানশান। তোমার পছন্দের হাঁসের মাংস ও আছে।”
মৌনতার কথায় তানশান মাথা নেড়ে সায় জানায়।
সে খেয়ে নায়েলের কাছে চলে যায়।
কিন্তু দু’টো বেজে গেলেও রূপকথা আসলো না বাড়িতে। তখন মৌনতা আর রোজের মাথায় চিন্তা জেঁকে বসলো। রোজ তপোবনকে ফোন লাগায় কিন্তু তাকে ব্যস্ত পেলো। তখনি সদর দরজা থেকে ব্যস্ত পায়ে তপোবন ঢুকলো। কানে তার ফোন ঠেকানো। রোজ ছুটে যায় তপোবনে’র কাছে। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে শুধায়,
–“ভাইজান, বড় ভাবি কোথায়?”
তপোবনের ভ্রু কুঁচকে গেলো সে সংক্ষেপে কথা শেষ করে, বোনের দিকে তাকায়। শান্ত স্বরে শুধায়,
–“রূপকথা কোথায় মানে? ওরা এখনো ঘরে আসেনি? আজ তো কলেজে কোনো অনুষ্ঠান রয়েছে। তাড়াতাড়ি ছুটি হয়েছে।”
–“তানশান তো এসেছে ভাইজান। কিন্তু বড় ভাবি আসেনি। তুমি একটু খোঁজ নাও না!
রোজের কথায় তপোবন অবাক হয়ে গেলো। আশ্চর্য হয়ে শুধায়,
–“তানশান একা এসেছে? কলেজ ছুটি হয়েছে তো দুই ঘন্টা হয়ে গিয়েছে!”
সে সাথে সাথে হাঁক ছেড়ে ছেলেকে ডাকলো। বাবার ডাকে তানশান ছুটে এসে উপর থেকে উঁকি দেয়।
–“কি হয়েছে পাপা?”
–“রূপকথা কোথায়, তানশান?”, বাবার প্রশ্নে তানশান কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
–“আমি কি করে জানব সে কোথায়? আমার ক্লাস শেষ তাই আমি চলে এসেছি। সে কি এখনো আসেনি?”
তপোবন হতবাক হয়ে বলল,
–“আশ্চর্য তানশান! একই প্রতিষ্ঠানে পড়ো তোমরা। তুমি বাসায় ফিরছ তাকে একবার জিজ্ঞেস করবে না, সে ফিরবে কিনা? তার ক্লাস শেষ হয়েছে কিনা? দুই ঘন্টা হয়ে গিয়েছে কলেজ ছুটি হয়েছে। অথচ রূপকথা এখনো আসেনি। ড্রাইভার কাকার তো তোমাদের দুজনকে একসাথে নিয়ে আসার কথা ছিল। তোমার থেকে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীনতা আশা করিনি, তানশান। পাপা আরো নিশ্চিন্তে ছিলাম তোমার কারণে। কোনো সমস্যায় পড়লে তুমি সাহায্য করতে পারবে, এই ভেবে! ইয়া আল্লাহ! রূপকথা এখানকার কিছু চেনে না, তানশান। একা কি করছে, কোথায় গিয়েছে আল্লাহ জানে।”
তপোবন উদ্বিগ্নতা নিয়ে বলল। সে ফোন বের করে, রূপকথা কে ফোন দেয়ার জন্য। কিন্তু বেজে যাচ্ছে কেউ রিসিভ করছে না। সে দ্রুত নিজের ঘরে যায়। তার ধারনা সঠিক! রূপকথার ফোন সহ সকালে তার দেয়া হাত খরচের জন্য পাঁচশো টাকা, সেন্টার টেবিলের উপরেই পড়ে আছে। সে এক প্রকার ছুটে বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে।
বদ্ধ কলেজ গেট সংলগ্ন বর্ডার গার্ডেনিং এর বাঁধাই করা শানের উপর, হাঁটু আঁকড়ে গুটিয়ে বসে আছে কলেজ ইউনিফর্ম পরিহিতা রূপকথা। মেদহীন , রুগ্ন মুখটি চেপে রাখা কান্নায় ফোলা ফোলা, থমথমে লালচে বরন ধারণ করছে।
সেই সাড়ে বারোটা থেকে সে এখানে বসে আছে। তপোবন, তানশানের অপেক্ষা করতে করতে কলেজ এখন মানবশূন্য। তবুও কারোর দেখা নেই। কারোর কি খেয়াল নেই সে একা এখানে? না-কি তাকে মানুষ বলেই গন্য করে না! অক্ষিপটে মা বোনের মুখশ্রী ভেসে উঠল। মায়ের থেকে এক সেকেন্ড চোখের আড়াল হলেও তো মা হুলস্থুল বাঁধিয়ে দিতো। সেখানে আজ সে বড় এই শহরের রাস্তায় একা বসে আছে। নিজেকে এতোটা একা, গুরুত্বহীন কখনো মনে হয়নি রূপকথার।
মানুষটার কাছে কি তার কোনো গুরুত্ব নেই? শুধু মুখেই দায়িত্বের ছোড়াছুড়ি! একটাবার কেউ কি খোঁজ ও করছে না তার?
পুনরায় গাড়ির আওয়াজ আসতেই রূপকথা চকিতে চোখ তুলে তাকায়। কিন্তু গাড়িটি তার জন্য থামলো না। দ্রুতগামী গাড়িটি তাকে অতিক্রম করে বহুদূরে চলে গেল। ফের অনাহুত’র ন্যায় বসে রইল রূপকথা। ক্ষুধায় পেট ব্যথা করছে এখন। সে ব্যাগ থেকে পানি বের করে মুখে তুলতে নিলেই এক রুক্ষ কণ্ঠ ভেসে আসল,
–”পানি দাও তো!”
ললাটের বা পাশে আঘাতপ্রাপ্ত জায়গাটিতে টিস্যু চেপে ধরা একটি ছেলে, লম্বা লম্বা পা ফেলে রূপকথার পাশে গিয়ে ধপ করে বসে পড়ল। টিস্যুটি ততক্ষণে রক্তাক্ত হয়ে ভিজে উঠেছে। ছেলেটি তবুও নির্বাক। কপাল কুঁচকে বিশ্রী ভাষায় কিছু গালি দিলো। পানি হাতে রূপকথা চোখ তুলে তাকায়। ছেলেটিও ঝাঁপসা দৃষ্টিতে তাকায় রূপকথার দিকে। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলে যেতেই, রূপকথা সন্তপর্ণে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিয়ে দূরে সরে বসে। ছেলেটি সেদিকে পাত্তা না দিয়ে জিজ্ঞেস করে,
–”পানি আছে না? দিচ্ছো না কেন?”
রূপকথা আড়চোখে এক পলক রক্তমাখা ললাট দেখলো। এটা যে সকালের সেই অভদ্র, বখে যাওয়া ছেলেটি।
সকালের সেই চাপা রাগ উজ্জীবিত হয়। কিন্তু প্রকাশ করলো না। দয়া’র জায়গা থেকেই পানির বোতলটি বের করে সিমেন্টের শানের উপর রেখে, আবার নিজের আড়ষ্টতা আঁকড়ে বসে রইল। তৃশান, বিক্ষিপ্ত মেজাজে পানির বোতলটি হাতে নিয়ে পানি পান করে। একা একা বিরবির করে বলে,
–”ঐ মা** বা** কালকের সূর্য উদয় দেখবে, হাসপাতালের বেডে বসে বসে। কাপুরুষ! তৃশান জোবায়েদের উপর পেছন থেকে আঘাত করে পালিয়ে যাবে কোথায়? দরকার পড়লে কবর থেকে উঠিয়ে নিয়ে আসব।”
কপালে টিস্যু চেপে তৃশান কাউকে ফোন লাগায়। ক্ষিপ্ত স্বরে বলতে লাগলো,
–”ঐ শা*লাকে এক ঘন্টার মধ্যে হাজির করবি আমার সামনে। নয়তো তোদের সকলের হাত পা ভাঙবো আমি।”
একের পর এক গা/লি শুনে রূপকথা কোনা চোখে তাকায় তৃশানের দিকে। চোখের কোনা বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে তো পড়ছে। থামার নাম নেই। ছোট্ট এই যুবতি মনটিতে পরিস্থিতির আড়ালে চাপা পড়া এক নমনীয় সত্ত্বা রয়েছে। যেটা কারোর দুঃখ-কষ্ট দেখতে পারে না। সে ব্যাগের চেইন খুলে কয়টা ব্যান্ড এইড বের করে। অতঃপর নীরবে তিনটা ব্যান্ড এইড ছেলেটির পাশে শানের উপর রেখে দিল। এগুলো রোজ দিয়েছে তাকে। নতুন জুতা পড়লে পায়ে ফোস্কা পড়ে তাই।
ফোন কেটে পকেটে ঢুকিয়ে নিতে গেলে তৃশানের দৃষ্টি হঠাৎ গিয়ে আটকায় ব্যান্ড এইড গুলোর দিকে। সে ভ্রু কুঁচকে তাকায় একবার ব্যান্ড এইড গুলো আরেকবার মেয়েটির দিকে। এটা যে সকালের সেই বিভ্রান্তি মাখা মুখটি। তবে চেহারায় বেহাল দশা এখন যেন এক দিক দিশাহারা পথিকের ন্যায়। সে ব্যান্ড এইড গুলো হাতে নিয়ে শুধায়,
–”এগুলো দিয়ে কি করব? খাবো নাকি মাথায় দেবো?”
নিজের মধ্যে জেঁকে বসা আ’ত’ঙ্ক, ভয় সামলে উঠতে না পারা মেয়েটি রাগন্বিত চোখে তাকায় তৃশানের দিকে। চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
–”এগুলো খাওয়ার আর মাথায় দেয়ার হলে, আপনি সেটাই করুন। খেয়ে ফেলুন!”
নিতান্তই পিচ্চি একটা মেয়ে! সে কি-না তৃশান জোবায়েদের উপর রাগ দেখাচ্ছে? তৃশানের ভ্রু উঁচিয়ে গেল। সে নিগুঢ়পানে পর্যবেক্ষণ করে মেয়েটির আপাদমস্তক। কলেজ ড্রেস পড়া সাথে হিজাব। উজ্জ্বল শ্যামলা গায়ের বরণ। মুখশ্রী কেমন থমথমে, চোখদুটো টলটলে। যেন টোকা দিলেই অশ্রুরা গড়িয়ে পড়বে। কলেজ তো ছুটি হয়েছে সেই বারোটা নাগাদ! এখন বাজে দু’টো দশ! মেয়েটি এখনো এখানে বসে আছে কেনো? সে স্বভাবসুলভ রুক্ষ স্বরে বলল,
–”এগুলো দিয়ে সাহায্য করেছ না-কি আমার মেজাজ খারাপ করছো? এগুলো কি আমি একা একা আমার মাথায় লাগাব?”
–”মানে? আমার সাহায্য করা কি ভুল হয়ে গিয়েছে?”, রূপকথার অবুঝ কণ্ঠ।
–”এটাকে সাহায্য বলে? যেই সাহায্য আমার কোনো উপকারেই আসবে না? এটা লাগিয়ে দেবে কে?”, তৃশানের কথায় রূপকথা থমথমে মুখে হাত বাড়িয়ে দিলো তৃশানের দিকে। গম্ভীর গলায় বললো,
–”দিন, আমি লাগিয়ে দিচ্ছি। আমি আবার শহুরে ছেলেমেয়েদের মতো উচ্ছ্বন্নে যাওয়া নই। যারা সাহায্যের নামে মানুষকে বোকা বানায়।”
তৃশানের ওষ্ঠকোনা বেঁকে গেলো, সকালের ঘটনার প্রেক্ষিতে খোঁটা শুনে। সে তেরছা চোখে তাকিয়ে শুধায়,
–”তো, তুমি কোন সভ্য, আদর্শ গ্রামের মানুষ? আমাদের ও বলো। আমরা শহরের উচ্ছ্বন্নে যাওয়া মানুষ গুলো সেখানে গিয়ে একটু আধটু সভ্য হয়ে আসব।”
রূপকথা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রাগ সংবরন করে এগিয়ে যায় তৃশানের কাছে। হাত থেকে ব্যান্ড এইড গুলো নিয়ে, সেগুলো তৃশানের কপালে লাগিয়ে দিতে লাগলো। দুপুরের জনমানবহীন পথ। শুনশান পথের ধারে নিজের উপর নুইয়ে আসা এক নারী অবয়ব, সাথে নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করা মিষ্টি আতরের সুগন্ধে অজান্তেই তৃশানের মুখে স্মিত হাসি ফুটে উঠল। ব্যথায় বদ্ধ নেত্র সরব খুলে তাকায় ঘর্মাক্ত, আ’ত’ঙ্ক জর্জরিত,থমথমে মুখটির দিকে। রুক্ষ ভাবে আঘাতপ্রাপ্ত জায়গায় ব্যান্ড এইড লাগাচ্ছে। রাগ ঝাড়ছে তার উপর! সে টলমলে চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে মিহি স্বরে শুধায়,
–”কলেজ তো ছুটি হয়েছে কখন! এখনো বাড়ি না গিয়ে এখানে বসে আছো কেন? প্রেমিকের জন্য অপেক্ষা করছিলে?”
সরব ব্যথা জায়গায় সজোরে চাপ অনুভব করতেই তৃশান চোখমুখ কুঁচকে নিলো। প্রশ্নের জবাব এভাবে দিলো মেয়েটি! ভাবতেই গা দুলিয়ে হেসে উঠল সে। রূপকথা বিরক্তি চাহনি নিক্ষেপ করে তার দিকে। সে হেসে শুধায়,
–”হারিয়ে গিয়েছো?”
“তা দিয়ে আপনি কি করবেন?”, রূপকথার ক্ষিপ্ত কণ্ঠে তৃশান নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল,
–”কিছু করার আছে নাকি? থাকলে করবো! তাই বলো।”
রূপকথা জবাব দেয় না। সে দ্রুত নিজের কাজটা সম্পন্ন করার চেষ্টা করে। তৃশান পুনরায় শুধায়,
–”নাম কি?”
–”তা দিয়ে আপনার কাজ কি?”
–”তোমার বাড়ি নিয়ে যাবো পালকি।”
–”মতি ভ্রষ্ট হয়েছে নাকি?”
–”তাই মনে হচ্ছে কি?”
তৃশানের শান্ত স্বরে রূপকথা হাত থামিয়ে, শানিত দৃষ্টিতে তাকায় তার দিকে। শেষ বারের মতো ব্যান্ড এইডটা ভালোকরে চেপে দিয়ে সরে আসে। আবার ব্যাগ আঁকড়ে অদূরে গিয়ে বসে পড়ে। নিজেকে বড্ডো অসহায় লাগছে! আর কত অপেক্ষা করবে! নাকি তাকে নিতেই আসবে না কেউ! ঠোঁট ভেঙে কান্না আসে রূপকথার।
তৃশান গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। কোনা চোখে কান্না চেপে রাখা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল,
–”সমস্যা কি? এখানে, একা একটা মেয়ে বসে আছো কেন? দুপুরের সময়। নির্জন জায়গা বিপদ হয়ে যাবে। বাসা কোথায়? কারোর নিতে আসার কথা? আমায় বলতে পারো। শহরের ছেলেরা এতোটাও খারাপ হয় না। অন্তত এই তৃশান জোবায়েদ তো না! গুন্ডা, বখাটে হতে পারি কিন্তু অকৃতজ্ঞ নই। কারোর উপকার নেয়ার অভ্যাস আমার নেই।। তাই উপকার ফিরিয়ে দেবো। কিভাবে দেবো সেটা বলো!”
রূপকথা বিরক্তি চাহনি নিক্ষেপ করে অত্যাধিক পরিমানে কৃতজ্ঞ যুবকটির দিকে। নিজের গুন নিজে গাওয়া মানুষ কখনো গুনী হয় না। এই লোক ও সুবিধার না। তাই সে চুপ রইলো।
তৃশান ঘাড় ত্যাড়া মেয়েটিকে দেখতে দেখতেই সিগারেট ধরায়। সেখানে বসেই ফুঁকতে থাকে। প্রায় অনেকক্ষণ যাবৎ সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে তৃশান।রূপকথার ঠোঁট তিরতির করে কাঁপছে, কান্না চেপে রাখায়। সে চোখ তুলে তাকায় তৃশানের দিকে। তৃশান মেয়েটিকে দেখছিল, সরব অসহায় চাহনি দেখে সে খিক খিক করছ হাসল। ডানে বামে মাথা নেড়ে শুধায়,
–”বাড়ির ঠিকানা জানো না?”
রূপকথা ডানে বামে মাথা নাড়লো। তৃশান অবাক হলো বেশ। কেউ বাড়ির ঠিকানা কিভাবে জানে না। সে জিজ্ঞেস করে,
–”তবে বাড়ির নাম কিংবা কোন অভিভাবকের নাম তো জানো! সেটা বলো আমি ঠিকানা বের করে দিচ্ছি।”
রূপকথা মিহি স্বরে বলল,
–”তপোবন সিকদার।”
–”কি? অভিভাবক?”, তৃশান কপাল কুঁচকে শুধায়। রূপকথা হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়লো। তৃশান কৌতুহলী গলায় বলল,
–”তপোবন ভাইদের বাসাতে থাকো? আমি তো তাদের সকলকে চিনি। কিন্তু তোমায় তো কখনো দেখিনি। গ্রাম থেকে এসেছো, এখানে পড়তে?”
রূপকথা হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়লো। তৃশান তাকে আশ্বস্ত করে বলল,
–”তাহলে তো কোন সমস্যাই নেই। চলো তোমায় দিয়ে আসি। তপোবন ভাইজান তো এত দায়িত্বজ্ঞানহীন না। তবে তোমায় কেউ নিতে আসলো না কেন?”
রূপকথা জবাব দিল না। তৃশান পুনরায় বলল,
–”এখানে বসো, আমি বাইক নিয়ে আসছি।”
রূপকথা বসে রইল। তৃশান যাওয়ার সাথে সাথে একটি দ্রুতগামী অডি কার গতি শ্লথ করে রূপকথার সামনে।
দীর্ঘ অপেক্ষা ফুরিয়ে কাঙ্খিত মানুষটির দেখা পেতেই, অভিমানে জর্জরিত মেয়েটির আঁখিদ্বয় থেকে টপটপিয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। গাড়ি থেকে হন্তদন্ত হয়ে বের হওয়া তপোবন দরজা আঁকড়ে ধরছ ফোঁস করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো রূপকথাকে দেখে। সে দ্রুত এগিয়ে যেতেই রূপকথা চোখ মুছে ব্যাগ আঁকড়ে দাঁড়িয়ে যায়। রাজ্যের উদ্বিগ্নতা ম্লান হয়ে আসে তপোবনের। রূপকথার সম্মুখে দাঁড়াতেই, রূপকথা টলমলে আঁখি তুলে অভিমানী কণ্ঠে বলল,
–”আপনাদের কারোর যদি সময় নাহয় আমায় নিতে আসার তবে দরকার নেই। আমায় ঠিকানা বলে দেবেন, আমি একা একাই চলে যাবো। আর যদি আমাকেই বোঝা মনে হয়, তবে আমায় বাগেরহাটে দিয়ে আসবেন।”
বলেই সে গটগট করে হেঁটে চলে যায়। গিয়ে গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। তপোবন তখনো ঊর্ধ্বশ্বাসে সামলে উঠার চেষ্টা করছে। মেয়েটির মুখ দর্শনের ঠিক পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত কি গিয়েছে তার উপর, তা শুধু সেই জানে। সে লম্বা লম্বা পা ফেলে রূপকথার পাশে এসে দাঁড়ায়। গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে নম্র কণ্ঠে বলল,
–”আমার স্ত্রী আমার জন্য বোঝা নয়। আমার আরেকটি অংশ! আমার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব!”
এতোটুকু বলে থামে তপোবন। পুনরায় অনুতপ্ত হয়ে বলল,
–”দুঃখিত কথা! আমি ড্রাইভার কাকাকে বলেছিলাম তোমাকে আর তানশানকে একসাথে নিয়ে যেতে। কিন্তু তারা ভুল করে ফেলেছে। এরপর থেকে আর এমন হবে না। কেউ না নিতে আসলে আমি আসব।”
রূপকথা প্রত্যুত্তর করে না আর না তাকায় তপোবনের অনুতপ্ত মুখটির দিকে। সে সিটে বসে পড়ে। তপোবন এক পলক কান্নারত অভিমানী মুখটির দিকে তাকিয়ে, ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ে।
তৃশান বাইক নিয়ে আসতেই দেখলো নির্দিষ্ট জায়গায় মেয়েটি নেই। তাকে উদ্বিগ্ন ও দেখা গেলো। সে ছুটে যায় গেট দারোয়ানের কাছে। জিজ্ঞাসা করে এখানে বসা মেয়েটি কোথায়! সে বলে তাকে কেউ এসে নিয়ে গিয়েছে। তৃশান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।
অনুশোচনায় দগ্ধ তানশান নত মস্তকে দাঁড়িয়ে আছে বাবার সামনে। পেছনে হাত বেঁধে সরু দৃষ্টিতে তপোবন ছেলেকে দেখছে। মুখাবয়ব কঠোর! তানশান মাথা তুলে বলে,
–”স্যরি পাপা! তুমি তো আমায় বলে দাওনি যে তাকে সাথে করে নিয়ে আসতে হবে।”
“তোমার এই স্যরি কি আদৌ কোন কাজের তানশান? আজ খারাপ কিছু হয়ে যেতে পারতো। ড্রাইভার কাকা তো চাকরি করে, তার এসব দিকে খেয়াল না রাখলেও হবে। কিন্তু তুমি? তুমি তো তার পরিবার তাই না! আমি বলবো, তারপর তুমি— তোমার পরিবারের পাশে দাঁড়াবে? আজ তার জায়গায় পরিবারের অন্য কেউ থাকতে পারতো। তোমার উচিৎ ছিলো তার দিকে খেয়াল রাখা।”
তানশান জবাব দিতে পারলো না। তপোবন পুনরায় বলে,
–”সেদিন তো তুমি আমায় বলেছিলে, আমার অবর্তমানে তার ঢাল হবে। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে আমি হয়তো ভুল করছি তোমার ওপর ভরসা করে। তানশান তুমি আর আমি ব্যতীত তার আর কেউ নেই। আমার অবর্তমানে তোমাকেই দেখতে হবে তাকে, তার খেয়াল রাখতে হবে। তুমিও যদি অগ্রাহ্য করো, তবে আমি না থাকলে তো তার আর কেউ থাকলো না।”
তানশান চোখ তুলে তাকায় বাবার গম্ভীর মুখটির দিকে। বাবাকে আশ্বাস দিয়ে থমথমে মুখে বলে,
–”আর কখনো এমন হবে না পাপা। আমি সবসময় দেখে রাখবো তাকে।”
তপোবন জবাব দিলো না। কিয়ৎকাল নীরাবতায় আচ্ছন্ন হয় বাবা ছেলে। তপোবন গাম্ভীর্যতা ভেঙে আদেশের সুরে বলল,
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১৭
–”কোচিংয়ের সময় হয়ে গিয়েছে, তৈরি হয়ে নাও।”
তানশান নিরবে কাবার্ডের কাছে গিয়ে শার্ট আর প্যান্ট বের করে। পরনে তার ঢিলেঢালা একটা টিশার্ট আর শর্টস! তপোবন উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলে ছেলের ব্যাগ গোছাতে লাগলো। একদিনের শিক্ষা আজীবন পথনির্দেশ করবে। কেননা সে ব্যতীত এই পৃথিবীতে রূপকথার দ্বিতীয় অভিভাবক যে তানশান। তাকে দায়িত্ববান হতে হবে রূপকথার প্রতি!
