Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২৩

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২৩

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২৩
তোনিমা খান

দীর্ঘদিন ঘরবন্দি থাকার পর, আজ বড়ো সাহস করে নিলীমা সিকদার বাড়ির এড়িয়ার বাইরে বেরিয়েছে। একদমই না বের হয়ে পারছিল না। তপোবন সিকদার যা পাঠিয়েছে তাতে আগামী এক মাসে বাজার আর লাগবে না। এখানে আসার পর থেকে অনেক অর্ডার পাচ্ছে। এর কৃতিত্ব মেজো গিন্নির রসকষ মিশ্রিত অতিরঞ্জিত প্রসংসার। তার আত্মীয়-স্বজন থেকে শুরু করে বান্ধবী—সবার পোশাকের অর্ডার এখন সেই পায়। তার জন্যই প্রয়োজনীয় কিছু উপকরণ কিনতে যাবে।
শুকতারা স্কুলে। সিকদার বাড়ির বাচ্চাদের সাথে এক গাড়িতে করে স্কুলে যায় আবার ফিরে আসে। এখানেও কৃতিত্ব তপোবনের। এখন আর ভঙ্গুর এই মন মস্তিষ্কে মেয়ে দু’টো নিয়ে নিলীমার চিন্তা হয় না। ভরসা বলতে তপোবন সিকদার। তার কিছু হয়ে গেলেও সে দেখে রাখবে তার মেয়েদের।
পড়নের বোরখাটা আরেকটু টেনেটুনে চোখদুটো কোনমতে একটু খুলে রাখলো নিলীমা। যেন শ”কু”নদের নজরে না পড়ে। সে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে বাড়ির পথ ধরে। পথিমধ্যে পরিচিত এক ডাকে সে ফিরে তাকায়।

–“কথা’র মা না আপনে?”
স্বল্প জনমানবে আচ্ছন্ন এড়িয়ায় থাকা একটা বিকাশ এবং ফ্লাক্সিলোডের দোকান। নিলীমা সতর্ক দৃষ্টি ফেলে এগিয়ে গিয়ে চাপা স্বরে বলল,
–“ভালো আছেন, সাদেক ভাই?”
আন্দাজে মারা ঢিল সঠিক প্রমাণিত হতেই সাদেক চেয়ারে গা এলিয়ে দেয়। রসিয়ে রসিয়ে বলে,
–“ভালোই আছি। তা আপনার কি খবর? পলাতক আছেন? বড়লোক বুড়া ব্যটার কাছে কচি মাইয়া বিয়া দিছেন, এখন তো আর পলাতক থাকার কথা না। তপোবন সিদকারের তো উচিৎ মাথায় কইরা নাচা আপনাদের। তা কি করে না? দেখতেই বুঝায়, বিলাই চোখের ভারী ধুরন্ধর লোক! সহজে কারোর নাগালে আসে না। আপনাদের মুখে ঝামা ঘষে দিয়ে, কচি বউ নিয়ে ফূর্তি করতাছে তাই না?”
নিলীমার চোয়াল শক্ত হয়ে যায় নিচু মন মানসিকতায়। তবুও কথা বাড়ায় না। এই লোকটাকে বহুবছর যাবৎ চেনে সে। কথার বাবা থাকাকালীন সময়ে এর থেকেই লেনদেন করত সে। সুবিধা অসুবিধায় কতো কাজে আসত তাদের।
কিন্তু যেদিন থেকে ঐ কাপুরুষ লোকটা তাদের সঙ্গ ছেড়ে দিয়েছে সেদিন থেকে পুরো পৃথিবী তাদের সঙ্গ ছেড়ে দিয়েছে। পরিচিত, কাছের মানুষগুলোর সে কি ঘৃণ্য চেহারা দেখে আসছে! সে থমথমে গলায় বলল,

–“ডেকেছেন কেন, কিছু বলবেন সাদেক ভাই?”
সাদেক মাথা নেড়লো।
–“আপনার জন্য টাকা আসছে আবারো। এবার আরো‌ বড় অংকের। কোত্থেকে আসে এই টাকাগুলো? আজ বলেই ফেলুন। কার বিছানা গরম করেন যে মাসে মাসে এত টাকা পাঠায়? ভা/তা/র তো দেখি মালদার!”
এমন ঘৃণ্য কথা খুব একটা অস্বাভাবিক নয় নিলীমার জন্য। বিগত দশ বছরের মতো আজো গলাধঃকরণ করে এমন মন্তব্য। ধিমি স্বরে শুধায়,
–“কত এসেছে?”
–“দশ হাজার।”
সাদেক সতর্কতার সহিত বলে। নিলীমা হাসল। সে জানে সাদেক মিথ্যা কথা বলেছে। এর থেকেও বেশি টাকা এসেছে। কিন্তু কার থেকে এসেছে? কে তাকে আড়ালে সাহায্য করার চেষ্টা করে? বিগত দশ বছর যাবৎ এমনভাবেই প্রতিমাসে তার নামে টাকা আসে। কখনো কম, কখনো বেশি। কিন্তু প্রতিবারের মতো আজো সেই টাকায় হাত দেয়ার ইচ্ছা পোষণ করে না নিলীমা।

–“আমার উত্তর কি হবে আপনি তো জানেন-ই সাদেক ভাই। ঐ টাকা দিয়ে, ছেলে মেয়ে নিয়ে একটা সুন্দর জীবন যাপন করেন, আসি।”
সাদেককে উদ্বিগ্ন দেখাগেল। এতো বছর যাবৎ সে যদি স্বাচ্ছন্দে একটা জীবন যাপন করছে তা এই নিলীমার টাকা দিয়েই। আজ পর্যন্ত কখনো এই টাকা নেয়নি এমনকি তার থেকে এক টাকা ধার ও নেয়নি। এত বিপদে পড়েছে কিন্তু কখনো তার দ্বারপ্রান্ত হয় নি সে খানিক উৎকণ্ঠা নিয়ে বলে,
–“মেয়েমানুষের এতো তেজ থাকা ভালো না। কে পাঠায় এত গুলো টাকা? শুধু শুধু তো আর পাঠায় নি। তোমার কোনো ভাতার-ই পাঠায়। তাহলে না নিয়া আমারে ঋণী করতাছেন কেন? ঢং দেখান? আমার কি কম আছে নাকি? আমি যা ইনকাম করি তা দিয়া আমার ছেলে মেয়ে ভাইসা যাইবে।”
নিলীমা উদাসীন কণ্ঠে বলল,

–“আমি তো জানি আমি কি, সাদেক ভাই। আর আমি এটাও জানি, আমার জন্য কেউ টাকা পাঠাইবে এমন কেউ আমার নেই। তবে কার পাঠানো টাকা নিয়ে আমি আবার কার দায়ে পড়ব। আর সেই দায় মেটানোর সামর্থ্য আমার নেই। ঋণ মুক্ত একটা জীবন আছে আমার, অন্তত এতটুকুর কারণে দিনশেষে একটা শান্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারি। আসি, দোয়া করবেন আমার মেয়েদুটোর জন্য।”
বলেই নিলীমা পা চালায়। সাদেক কপাল কুঁচকে উদ্বিগ্নতা নিয়ে তাকিয়ে রইল। ড্রয়ার খুলে মোবাইল টা বের করে পুনরায় দেখলো। বিশ হাজার টাকা এসেছে নিলীমার জন্য। আজ পর্যন্ত এমন বিশ হাজার, ত্রিশ হাজার টাকা করে কম টাকা আসেনি। সে সবসময় অর্ধেক টাকা বলতো। কিন্তু নিলীমা তো সেই অর্ধেক টাকাও নেয় না। এই টাকা দিয়েই সে এক তলা একটা দালান গেঁথে ফেলেছে। এখন মাঝেমধ্যেই নিজেকে অপরাধী মনে হয়। কার হক মারছে সে? এর পরিণতি তো ভালো হবে না। এখানে তার দোষ কোথায়? সে তো বলেছে নিলীমাকে কিন্তু সে না নিলে তার কি করার?

সিকদার বাড়ির পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতেই হঠাৎ করে নিলীমার পা থমকায়। সম্মুখে চায়ের দোকানে গজা, মিন্টুদের দলবলসহ দেখে সে ঘেমে উঠল। তারা এখন এখানে আড্ডার জায়গা বানিয়েছে শুধু মাত্র তার আর তার মেয়ের জীবনটা শেষ করার জন্য। সে তটস্থ ভঙ্গিতে হাঁটতে লাগলো। তবে ভয় যেন চলন বাচনভঙ্গিতে স্পষ্ট। আশেপাশে বেশ কয়েকজন মানুষ রয়েছে। এই বোরখায় তাকে চেনা সম্ভব নয়। সে সাহস করে পা চালায়। কিন্তু নৈকট্য যতোই বাড়ছিলো বুকের ধুকপুক ততোই বাড়ছিল। এই বুঝি চিনে ফেললো তাকে। কিন্তু তেমন কিছুই হলো না। গজা মিন্টু তাকে চেনেনি। তাদের অতিক্রম করতেই নিলীমা হাঁফ ছাড়ল। আর একবারো পিছু না ফিরে যতোদ্রুত সম্ভব পা চালায়।
চায়ে চুমুক দিতে দিতেই গজা দ্রুত পায়ে হাঁটতে থাকা মহিলাটিকে দেখে। সন্দিহান তার দৃষ্ট। সে সন্দিগ্ধ গলায় বলে,
–“এই মিন্টু দেখ তো ঐ মহিলাকে! আমার কেন জানি মনে হইতাছে ওটা কথা’র মা।”
মিন্টু তড়াক চাহনিতে তাকায় মহিলাটির দিকে। তবে কিছু বলে ন। মহিলাটি ইতিমধ্যেই দৃষ্টিসীমায় ঝাঁপসা। অন্তরালের ক্ষোভ পুনরায় উজ্জ্বীবিত হয়। এই মা মেয়ের একটা কেও না খেতে পারলে তাদের শান্তি নেই। আজকের তৃষ্ণা?

প্রতিটা বাবা মায়ের স্বপ্ন থাকবে তার ছেলে মেয়েটা আদর্শে তাদের প্রতিরূপ হবে। এটা দোষের কিছু নয়। তবে জোরপূর্বক কোনকিছু হাসিল করতে চাওয়া ভুল।‌ তামজিদ জোবায়েদের ও ভুলটি ঠিক এই জায়গা থেকেই। সে আজ পর্যন্ত কখনো ছেলের সাথে দু দন্ড শান্তভাবে কথা বলেনি, বোঝায়নি কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল। ছেলে মেয়ের অর্ধেক শিক্ষা নির্ভর করে বাবা মায়ের উপর। সেখানে তারা যদি কর্মব্যস্ততা, ইগো, রাগ ধরে রেখে সন্তানের সাথে দূরত্ব রাখে তবে ফলাফল অবশ্যই তাকে আশাহত করবে। তাই প্রত্যেক বাবা মায়ের উচিৎ অর্থকরী’র চেয়ে সন্তানকে সময় এবং বন্ধুসুলভ বাবা-মা উপহার দেয়া।
–“এরপরেও তুমি বলতে চাও আমি ওকে ঘরে রাখব? তপোবনের কাছে আমার একটু যা মানসম্মান ছিল তাও নষ্ট করে দিয়েছে। আগে তো অনার্স লেভেলের স্টুডেন্টদের বিরক্ত করত, এখন সে ইন্টার লেভেলের ছোট ছোট মেয়েদের বিরক্ত করছে। মাওয়ালি একটা! ওকে কিছু বলো মৈতি। নয়ত আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না।”
তামজিদ জোবায়েদ চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ক্ষিপ্ত স্বরে বললেন। মৈতি রাগে ঠোঁটে ঠোঁট চাপলো। আক্ষেপ জানিয়ে বলল,

–“এমন করেই এসেছো সবসময়! কখনো তো দু দন্ড ছেলেটার সাথে ভালো করে কথা বলোনি। তবে কেন শুনবে ও তোমার কথা? কখনো মাথায় হাত রেখে আদর করে বুঝিয়েছ—যে বাবা এমন করে বুড়ো বাপটাকে কেন কষ্ট দিচ্ছিস? তা না কথায় কথায় শুধু খবর আছে!”
–“মাথায় হাত রেখে? তুমি কি বলতে চাইছো, অত বড় দামড়া ছেলেকে এখন আমি কোলে বসিয়ে দু চারটে চুমু খেয়ে বলব, বাবা তোর পায়ে পড়ি এগুলো করিস না? তোমার ঐ বেয়াদব ছেলে সেটা ডিজার্ভ করে?”
তামজিদ জোবায়েদের চিৎকারে তন্দ্রাগ্রস্থ তৃশানের কর্নদ্বয় সচকিত হয়। অক্ষিপটে ভেসে উঠলো সেই রাগান্বিত টলমলে আঁখির মুখটি। কপাল কুঁচকে যায়।
মেয়েটি তার নামে নালিশ করেছে বাড়িতে গিয়ে? তাকে ভয় দেখায়? কত বড়ো সাহস! হাতের কাছে একবার পেয়ে নিক নালিশ করার অবস্থায় রাখবে না। ভাবতেই বালিশে মুখ ডুবিয়ে হেসে উঠল তৃশান। মেয়েটির পেছনে লাগতে ভালো লাগছে তার। তার থেকেও ভালো লাগে শুধু শুধু রেগে যাওয়া! এমন একটু আধটু রাগ দেখার জন্য হলেও সে পিছু ছাড়বে না।
বাবার লাগাতার চিৎকারে সে বিছানা থেকে উঠে দাড়ায়। তখনো মায়ের সাথে বাকবিতন্ডা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। সে শর্টসের উপর ট্রাউজার পড়তে পড়তে বিড়বিড় করে,

–“ওহ্ শিট! প্রিন্সিপাল স্যার সব জায়গায় ঝামেলা করে।”
পরপরই আওড়ায়,
–“আমার ভোলাভালা মাকে এত কথা শোনানোর জন্য তোমার খবর আছে নির্বোধ ফেইরিটেইল।”
রূপকথার দিনগুলো একটু একটু করে গুছিয়ে আসছে। সংসার, বৈবাহিক জীবনের জটিল মোড়গুলো আবেগের বশে নয় বরং বাস্তবতার সাথে ঘুরতে শিখছে।
ছোট্ট মেয়েটি বুঝে গিয়েছে আবেগ ধরে বাঁচলে সে আঁটকে থাকবে অসম বিবাহের ঐ পিছুটানের মাঝেই। তাই সে বাস্তবতা আঁকড়ে বহুদূর এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সংসারে নিজের দায়িত্বটুকু যথাসাধ্য সামলে সে শাশুড়ি, ননদ, জা এর থেকে বিদায় নিয়ে দ্রুত নিজের ঘরে যায়।
তপোবন আজ দেরি করে আসছে। সে হায়ার ম্যাথের নতুন অধ্যায় একা একা করতে পারছে না। সন্ধ্যা থেকে অন্য বিষয়গুলো পড়লেও এখন অংক করতেই হবে। সে বই খাতা নিয়ে ছুট লাগায় তানশানের কাছে। দরজায় নক করতেই ঠিক বাবার ন্যায় গম্ভীর আওয়াজ ভেসে আসে। বরাবরের ন্যায় রূপকথা মাথা ঢুকিয়ে উঁকি দিয়ে শুধায়,

–“আসব?”
তানশান এক পলক তাকিয়ে, পুনরায় লেখায় মনোযোগ দেয়। গম্ভীর গলায় বলে,
–“অনুমতি নেয়ার প্রয়োজন নেই। যখন ইচ্ছা আসতে পারেন।”
রূপকথা মৃদু হেসে ধন্যবাদ বলে ঢুকে যায়। নম্র কণ্ঠে বলে,
–“আমি একটা অংক পারছি না। একটু দেখিয়ে দেবে।”
–“পারলে দেবো।”
তানশান বলতেই রূপকথা অপরপাশের চেয়ারে বসে। হায়ার ম্যাথের একটি সমাধান। তানশান দেখলো। এগুলো আজ পাপার করিয়ে দেয়ার কথা। সে পারে না এগুলো। তার বেসিক ভালো থাকায় রূপকথাকে ধরতে তার সময় লাগেনি। যেহেতু তার বেশিরভাগ সময়টা বইয়ের সান্নিধ্যে কাটে।
সে ছোট মুখে বলল,
–“আমি সমাধানটা পারি না, দুঃখিত। পাপা এগুলো আজ করাবে আপনি অপেক্ষা করুন। পাপা একটু পরেই আসবে।”
–“ওহ্ আচ্ছা।”

রূপকথা নিভন্ত স্বরে বলে। তানশান হাতের লেখাটা শেষ করে ওয়াশরুমে যায়। রূপকথা তখন অলস চোখে চারিপাশে অবলোকন করে। ঘরটা এলোমেলো। সে এক পলক বাথরুমের দরজার দিকে তাকিয়ে দ্রুত উঠে দাঁড়ায়। হাওয়ার গতিতে পুরো ঘরটা গোছাতে লাগলো‌। ছেলেটা যদি ভালো চোখে না দেখে তার জিনিসপত্র ছোঁয়া! তাই এতো হম্বিতম্বি।
এই জটিল জীবনে তপোবন আর তার এই সম্পর্কটা নিয়ে তার চিন্তা না থাকলেও, তানশানের সাথে নিজের এই সম্পর্কটা নিয়ে তার খুব চিন্তা হয়। সে আপ্রাণ চেষ্টা করে ছেলেটার সাথে তার কোনো ঘৃন্য সম্পর্ক তৈরি না হোক। তাই তানশান বিরক্ত হবে এমন সব কাজ সে এড়িয়ে চলে।
তানশান বের হতেই রূপকথা হাতের কাপড়টা আঁকড়ে বোকাসোকা কণ্ঠে কৈফিয়ত দিয়ে বলে,
–“এলোমেলো হয়ে ছিল। পড়া নেই, ভাবলাম এগুলো গোছাই।”
তানশান তার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বলল
–“এগুলো আপনার করার প্রয়োজন নেই। জবা ফুপি ঘুমানোর আগে গুছিয়ে দিয়ে যাবে।”
রূপকথা সতর্ক কণ্ঠে বলে,

–“আমার হাতে কোন কাজ নেই। আমি করি। শুধু শুধু জবা আপাকে কষ্ট দেয়ার দরকার নেই।”
–“আপনি ম্যাথে একদমই পিছিয়ে আছেন। এগুলো করে সময় নষ্ট করলে, আপনি ডাক্তার হতে পারবেন না। পড়তে বসুন।”
সদ্য কৈশোরের পরিবর্তন গুলো সুস্পষ্ট ভাঙা গম্ভীর কণ্ঠে শাসনের আভাস। রূপকথা মৃদু হাসল, তার আরেক মুরুব্বি।
সতর্ক কণ্ঠে বলল,
–“এখানে বসেই পড়ি? আসলে ঐ ঘরে একা একা পড়তে ভালো লাগে না।”
রূপকথার কথায় কৈফিয়ত। তানশান নিরুদ্বেগ পড়তে পড়তে বলল,
–“পড়ুন।”
রূপকথা হাসি মুখে বলল,
–“ধন্যবাদ।”
তবুও কাপড় গোছানো ছাড়ে না। সে সতর্কতার সহিত কাপড়চোপড় গুলো গুছিয়ে রেখে, ঝটপট তানশানের সম্মুখ বরাবর বসে পড়ে পড়তে।
তপোবন আসল ঠিক এগারোটা নাগাদ। অভ্যাস অনুযায়ী ছেলের ঘরে উঁকি দিতেই, প্রশান্তিদ্বায়ক এক দৃশ্য দেখে বুকের ভার কমে তার। স্ত্রী সন্তান একসাথে পড়াশুনা করছে। সে দু’জনকে বিরক্ত করে না। নীরবে চলে যায়।

খাওয়া-দাওয়া শেষে নিজের সব কাজ শেষ করে তপোবন দু’জনকে পড়াতে বসে। রূপকথা আর তানশানকে একই ম্যাথ করায় সে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত একই ম্যাথ তানশান একবারে বুঝে গেলেও রূপকথা সপ্তম বারেও বুঝতে পারে না। তপোবন ধৈর্য্য সহকারে তাকে বোঝায়। এতদিন শুধু সূত্র পড়াত এখন ম্যাথ করায়। সূত্র মুখস্থ থাকলেও, সূত্রের প্রয়োগে রূপকথা একদম দূর্বল। মুখস্থ করার থেকে নিজে আত্মস্থ করা কঠিন এক প্রক্রিয়া লাগলো রূপকথার কাছে।
বহুবার চেষ্টা করতে করতে আর ব্যর্থ হতে হতে রূপকথার মুখশ্রী একটাসময় লাল হয়ে উঠল ব্যর্থতায়। সে তবুও চেষ্টা করে। ততক্ষণে তানশানের চারটা ম‌্যাথ শেষ। এটা আরো হতাশার কারণ হলো রূপকথার। তার চোখমুখ ঠিকরে কান্না বেরিয়ে আসে লাগাতার ব্যর্থতায়। তপোবন মেয়েটির কান্নায় উদ্বিগ্ন হয়।
ঠিক একই ভাবে তানশানের চোখমুখে চাপা উদ্বেগ ছেয়ে গেলো। সে আর পাঁচটা ছেলেদের থেকে ভিন্ন। আচার আচরণে তার রুষ্ঠতা নেই। মা মরা ছেলেটির মধ্যে আছে শুধু মায়া, দয়া আর ভালোবাসা। তাই কারোর কান্না তার অস্বস্তির কারণ। সে উদ্বেগ নিয়ে বলে,

–“আপনি কাঁদছেন কেন?”
ছেলেকে থামাতে গিয়েও থামালো না তপোবন। নীরবে অবলোকন করে ছেলেকে। তানশান ফের উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
–“কেউ একবারেই সব বিষয়ে পারদর্শী হয়ে যায় না। আপনি আগে ম্যাথ মুখস্থ করতেন ,তাই আপনার কাছে এখন কঠিন লাগছে। কয়েকদিন নিয়মিত চর্চা করলেই আপনি পারবেন।”
পুনরায় বলতে শুরু করে,
–” আপনি জানেন, আমি যখন নাইনে উঠি তখন বায়োলজিতে মাত্র ছত্রিশ পেয়ে কোনোমতে পাশ করেছিলাম। সেখান থেকে আমি আশির ঘরে এখন মার্ক উঠাই। কারণ আমি নিয়মিত চর্চা করি। কিন্তু আপনি তো তাও ম্যাথ কত ভালো পারেন। আরেকটু চেষ্টা করলে আরো ভালো পারবেন।”
রূপকথা লাল হওয়া অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকায় তানশানের দিকে। তানশান উঠে এসে টেবিলের মাঝ বরাবর কনুই ঠেকায়। রূপকথার খাতার দিকে নির্দেশ করে বলে,
–“লিখুন এর পরের অংশ। আমি বলে দিচ্ছি। ধীরে ধীরে আপনি পেরে যাবেন।”
তানশানের কথামতো, রূপকথা লিখতে শুরু করে আর তানশান বলে দিতে লাগলো। সে পুরো ম্যাথটা করতেই, তানশান পুনরায় বলল,

–“নিন, এখন না দেখে নিজে চেষ্টা করুন। না পারলে আমি বলে দেব।”
রূপকথা চোখের পানি মুছে ম্যাথটি করতে শুরু করে। আশ্চর্য জনক ভাবে সে ম্যাথটি করতে সফল হয় শুধু দু একবার পথ ভুলে গেলে সেটা তানশান ধরিয়ে দিয়েছে। মুখস্থ ব্যতীত নিজের দক্ষতায় কোন ম্যাথ সলভ করতে পারার সেই না বলতে পারা আনন্দে, রূপকথার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে তানশানের দিকে উচ্ছ্বসিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
–“তানশান, আমি পেরেছি।”
একজন ছাত্র কোনো বিষয় আত্মস্থ করতে পারলে যেমন অনুভূতি হয়, তার থেকেও দ্বিগুণ অনুভূতি অনুভব করতে পারে তার শিক্ষক। তেমনি তানশানের চোখেমুখেও সমপরিমান আনন্দ দেখা গেল।
তার গাম্ভীর্যতা ঠিকরে স্মিত হাসি বেরিয়ে আসে। ছোট্ট করে বলে,
–“গুড।”

বুকে হাত গুঁজে এতক্ষণ ধরে পর্যবেক্ষণ করা তপোবনের ওষ্ঠকোনে লেগে থাকা স্মিত হাসি প্রগাঢ় হয়, সম্মুখের জিতে যাওয়া দুটি হাসি মুখ দেখে। অন্তঃস্থল বলে ওঠে সে তার সন্তানটিকে সঠিক শিক্ষা দিতে পেরেছে। তার সন্তানটি থেকে পুরো পৃথিবী সহ কাছের মানুষ গুলো নিরাপদ। যে জেনেবুঝে কখনো কাউকে কষ্ট দেবে না।
সে প্রগাঢ় হেসে রূপকথাকে বলল,
–“দেখেছো শুধু শুধু হার মেনে নিয়েছিলে।
তুমি জানো! তানশান তো তাও বায়োলজিতে ছত্রিশ পেয়ে পাশ করে গিয়েছিল। কিন্তু আমি যখন তানশানের স্ট্যান্ডার্ডে ছিলাম, তখন বাইশ পেয়ে বায়োলজিতে ফেইল করেছি। সেই লজ্জায় আমি এক সপ্তাহ স্কুলে যাইনি। রাতে লুকিয়ে লুকিয়ে কেঁদেছি মানুষের সাথে চোখ মেলাবো কি করে! ক্লাসের টপ বয় কি-না ফেইল করেছে? সেই দিক থেকে তোমরা তো কত এগিয়ে আছো। কিন্তু খবরদার! এই বিষয় নিয়ে আমায় কিন্তু লজ্জা দেবে না দু’জনে। বায়োলজিতে খারাপ হলে কি হবে আমি ম্যাথে’র রাজা ছিলাম।”
তপোবন দাম্ভিকতা নিয়ে বলল।
তানশান আর‌ রূপকথা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল তার কথায়। তানশান হাসতে হাসতে অবাক কণ্ঠে শুধায়,

–“সিরিয়াসলি পাপা? তুমি ফেইল করেছিলে? আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।”
তপোবন কপাল কুঁচকে গম্ভীর গলায় বলে,
–“বিশ্বাস না করার মতো কিছু নেই। তোমার এই বায়োলজির দূর্বলতাও আমার থেকেই পেয়েছ! আশ্চর্য আমার সবকিছু কপি করছো কেন তুমি?”
তানশান লাজুক হাসে। নম্র কণ্ঠে বলে,
–“আই লাইক টু কপি ইউ। কিন্তু এগুলো অজান্তেই বেশি হয়।”
তপোবন হেস ছেলের মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দেয়। আলগোছে দু’গাল চেপে এগিয়ে গিয়ে ছেলের কপালে চুমু দিয়ে বলে,
–“এমনি পাপার আদুরে বাচ্চা হয়ে থাকো সবসময়। কখনো কাউকে কষ্ট দেবে না, অসম্মান করবে না।”
তানশান মাথা নেড়ে সায় জানায়। রূপকথা ম্লান দৃষ্টিতে দেখে বাবার আরেক চমৎকার রূপ। পৃথিবীতে বাবাদের ও ভিন্ন রূপ রয়েছে। কেউ সন্তানদের মাঝপথে কঠিন এই পৃথিবীতে একা ফেলে রেখে চলে যায়, তো কেউ বাঁচেই সন্তানের জন্য। মানুষটার জন্য মুগ্ধতা বাড়ে বৈকি কমে না। সে স্মিত হেসে আবারো ম্যাথটি করতে লাগলো। এবার আর তানশানের একটু সাহায্যের ও প্রয়োজন পড়ল না।

কনকনে শীতের রাত! একে একে দৈনন্দিন জীবনের আলোগুলো ক্লান্তির ছায়াতলে নিভে যেতে লাগলো। ধরণী নিমজ্জিত হয় গা ছমছমে নীরবতায়।
মৃদুমন্দ সমীরণে দোদুল্যমান রোডসাইড গাছের পাতায় বিদীর্ণ চাঁদের আলোয় নিস্তব্ধ নির্জন রজনী তখন আবেশিত। জনমানবহীন রাস্তায় অলসতার রেশ ধরে হেঁটে যাচ্ছে দুই মানব মানবী। দু’জনের আপাদমস্তক জড়তা, পার্থক্য আর দূরত্বের দ্বন্দ্ব স্পষ্ট! তবুও ধরিত্রীর বুকে চলতে হলে হাসিমুখে এগুলোকে দূরছাই করে চলতে হবে। এতে তাদের কোনো দ্বন্দ্ব নেই বরং তারাও এই দূর ছাই অনুভূতি লালন করেই একে অপরের পাশ ঘেঁষে চলছে সে বহুক্ষণ।
কিন্তু তমসা ভেদ করে চাঁদের আলোয় স্পষ্ট মানবীর হঠাৎ কুঁচকানো কপাল ঠিক বোধগম্য হলো না তপোবন নামক ভারী এক অবয়বের। দূর্বোধ্য সেই অনুভূতি নিয়েই স্বভাবসুলভ আবার বলতে শুরু করল ভুতের গল্প—যেটা বিগত দশ মিনিট যাবৎ বলে আসছে সে। তবে এবার খানিক পর্যবেক্ষণের সরু দৃষ্টি তার!

–“এটাকে চার রাস্তার মোড় বলে। এখানটাতে একটা ছাব্বিশ সাতাশ বছরের ছেলেকে মে/রে ফেলা হয়েছিল। তার নামটা খুব অদ্ভুত ছিল জানো! বিদ্যুৎ, তার নাম ছিল বিদ্যুৎ।”
গায়ের শাল আরো নিবিড়ভাবে জড়িয়ে নিয়ে রূপকথা এবার প্রবল উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকায় ভারী মুখপানে। চঞ্চল কণ্ঠে শুধায়,
–“কেন? কেন? কেন মেরে ফেলেছিল?”
পেছনে হাত বেঁধে হাঁটতে থাকা তপোবন পেছন ঘুরে এক পলক তাকায় অনতিদূরে হাঁটতে থাকা স্ত্রীর দিকে। লেইট নাইট পর্যন্ত পড়াশুনা করার নিদারুণ একঘেয়েমি দূর করতেই এই হাঁটতে বের হওয়া। সে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলল,
–“রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ছিল। কু/পি/য়ে মে/রে এখানটাতে—ঐ যে গাছটার ডালের সাথে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল।”
রূপকথা ভয়ার্ত কণ্ঠে হড়বড়িয়ে বলে,

–“কোথায়, কোথায়? কোন ডাল? কোন গাছ?”
তপোবন রূপকথার মাথার উপর আঙুল তাক করে শান্ত স্বরে বলল,
–“ঐ যে তোমার মাথার উপর যেই ডালটা—যেটা থেকে মাত্র তুমি পাতা ছিঁড়লে, ওটায়।”
রূপকথা বৃহৎ নেত্রে তাকায় একবার তপোবনের গম্ভীর মুখশ্রীর দিকে‌, আরেকবার নিজের হাতে থাকা পাতার দিকে তো আরেকবার নিজের মাথার উপর ঝুলে থাকা গাছটির দিকে।। মাত্রই ছিঁড়েছিল। আচমকা সে পাতাগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বিকট চিৎকার করে উঠল।
এক ছুটে এসে তপোবনের কনুই আঁকড়ে ধরে জোরে জোরে আয়াতুল কুরসি পড়তে লাগল। চোখদুটো টলটল করছে ভয়ে।
তপোবনের এতক্ষণের চেপে রাখা হাসি উন্মুক্ত হয়। সে হো হো করে হেসে উঠল মেয়েটির টলটলে নেত্রদ্বয় দেখে। রূপকথা অবাক হয় সেই অট্টহাসি দেখে। হাসির তালে ধূসর নেত্রদ্বয় কেমন ভয়ঙ্কর ধূসর ঠেকল। সে কনুই ছেড়ে ভয়ার্ত নেত্রে তাকায়। ফিসফিসিয়ে শুধায়,

–“এই যে তানশানের পাপা শুনছেন? আপনি অমন করছেন কেন? এত জোরে তো আপনি হাসেন না।”
তপোবন হাসতে হাসতে মুখটি নামিয়ে নেয় ছোট্ট স্ত্রীর মুখের দিকে। ভারী কণ্ঠে বলে,
–“কে তানশানের পাপা? আমি তো বিদ্যুৎ!”
তপোবনকে অবাক করে দিয়ে রূপকথা ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। কাঁদতে কাঁদতে বলতে শুরু করল,
–“আমি জানতাম আপনি আমার স্বামী না। আপনার মাঝে ভুত ভর করেছে তাই না? আমায় মেরে ফেলবেন? এই শয়তান আমার স্বামী কই। আমার স্বামীকে ফিরিয়ে দে। তানশানননন… বাঁচাওওও”
রূপকথা চিৎকার করে কাঁদছে আর পিছু হাঁটছে। তপোবন অবাক হয়। মেয়েটি যে ভুতে ভয় পায় এই ধারণা সত্য প্রমাণ করার জন্যই একটু দুষ্টুমি করছিল। কিন্তু বুঝতে পারেনি এত ভয় পেয়ে যাবে। সে হেসে মেয়েটির দিকে এগিয়ে গেলে রূপকথা জোরে জোরে দোয়া পড়তে লাগল। তপোবন শান্ত স্বরে বলে,

–“রূপকথা রিল্যাক্স! আমি তপোবন। কোনো ভুত নই; তোমার সাথে মজা করছিলাম।”
রূপকথা ছুটতে লাগলো পিছের দিকে। চেঁচিয়ে বলে,
–“সর শয়তান। কাছে আসবি না। আমি আয়াতুল কুরসি পারি কিন্তু!”
তপোবন হতভম্ব। সে লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে গিয়ে মেয়েটিকে বোঝানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু সে বুঝছেও না থামছে না। সে অতিষ্ট হয়ে বলল,
–“রূপকথা স্টপ! আমি তোমার স্বামী তপোবন। তানশানের পাপা। বিশ্বাস করো, কোনো ভুত নই। দেখো আমিও আয়াতুল কুরসি পড়ছি।”
তপোবন জোরে জোরে আয়াতুল কুরসি পড়তে লাগলো। রূপকথার গতি থামে। সে ধীরপায়ে ফিরে আসে। সতর্ক কণ্ঠে পুনরায় শুধায়,

–“আপনি আমার স্বামী তো?”
তপোবন খানিক বিরক্ত হয়ে বলল,
–“না আমি বিদ্যুৎ!”
রূপকথা ফের চিৎকার করে কেঁদে উঠলো। তপোবন বিরক্তি ভুলে এবার গা দুলিয়ে হেসে উঠল। মেয়েটি পুনরায় ছোটার আগেই আকস্মিক ঝট করে কোলে তুলে নিলো। হতবাক রূপকথা চেঁচিয়ে উঠল,
–“ছাড়ুন ছাড়ুন, আমি তানশানের কাছে যাব। হুঁশ হুঁশ!”
তপোবন হাসতে হাসতে বলল,
–“বোকা মেয়ে! ভুত বলে কিছু হয় না। আর এখানে কাউকে মারাই হয়নি। আমি মিথ্যা বলেছি, তোমায় ভয় দেখানোর জন্য।”
রূপকথা ছটফট করতে করতে বলে,
–“আয়াতুল কুরসি পড়ুন তবে।”
তপোবন স্ত্রীর কথামতো আয়াতুল কুরসি পড়ল।
আশ্বস্ত রূপকথা হাতের উল্টোপিঠে চোখ মুছে আড়চোখে তাকায় অতি নিকটে থাকা ভারী মুখপানে। মিনমিনে স্বরে বলে,

–“নামিয়ে দিন।”
তপোবন ভ্রুক্ষেপ করে না তার কথা
বরং বিস্ময় নিয়ে বলে,
–“তুমি দেখছি বিপদে পড়লে আগে তানশানের নাম নাও। আমার থেকে বেশি তোমার তানশানের উপর বিশ্বাস বেশি।”
–“আপনার পর তানশানই আমার সকল সমস্যার সমাধান করে। গতকালকে আমি ক্ষুধায় ভুগছিলাম তখন সে নিজ থেকে এসে আমায় ক্যান্টিনে নিয়ে বার্গার খাইয়েছে।”
–“সত্যি?”, তপোবন অবাক হয়।
–“হু, আর ঐ বেয়ারা লোকটার থেকেও বাঁচিয়েছিল।”
তপোবনের ঠিক এতটুকুই চাওয়া ছিল তানশানের থেকে। সে আশ্বস্ত হয়ে বলল,
–“ভীষণ ভালো!”
–“নামিয়ে দিন।”
তপোবন এবারো নামালো না।
–“আর দুইমিনিট পরেই বাসা। একটু চলি, এক্সারসাইজ হয়ে যাবে।”
–“কি অদ্ভুত! এক্সারসাইজ করার জন্য আপনি আমার মতো পাটকাঠি পেলেন?”, রূপকথা কপাল কুঁচকে শুধায়।
তপোবন হেসে ফেললো। শুধায়,

–“ওজন কত? ঊনচল্লিশ নাকি চল্লিশ?”
রূপকথা নাকোচ করে বলল,
–“আপনি ভুল! আমার ওজন এক চল্লিশ।”
এমনি মৃদুমন্দ কথোপকথনের সাথে তারা কিয়ৎকাল কাটিয়ে দিলো। বাড়ির গেটে ঢুকতেই রূপকথা নামার জন্য ছটফটিয়ে উঠলেও সে নামতে পারে না। তপোবন ঠিক সদর দরজায় গিয়েই তাকে নামাবে।
পোর্চে সাজিয়ে রাখা সোফায় আর টি টেবিলে পা ছড়িয়ে নিস্তেজ দেহে বসে থাকা অবয়বে নিদারুণ কৌতুহলী মুগ্ধতা জেঁকে বসে এহেন অপূর্ব দৃশ্যে! উন্মত্তের ন্যায় সিগারেটে সুখটান দিতে থাকা এরোজ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আবছা আলোয় একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকা দুই মানব মানবীর দিকে। মস্তিষ্ক মুগ্ধ হয় অথচ অন্তঃস্থল প্রশ্নবিদ্ধ! এক জীবনে কি দুইবার ভালোবাসা যায়?
এরোজ নির্নিমেষ চেয়ে রইল। কর্নকুহরে আন্দোলিত হয় সবার একটাই কথা! জীবন কারোর জন্য থেমে থাকে না। তার ও উচিৎ সেই বিদঘুটে মুহুর্ত ভুলে নতুন করে জীবন শুরু করা।
কতটা বিদঘুটে পরামর্শ! তার তো ভাবলেই গা শিউরে ওঠে কারোর সাথে দেখা গোটা এক জীবনের স্বপ্ন ভুলে যাওয়ার কথা মনে করলেই। সেখানে দ্বিতীয় বার জীবন শুরু করা নেহাৎ ই দুঃস্বপ্ন!
অসহনীয় ব্যথায় বিদীর্ণ অন্তঃস্থল—কখন যে চোখের কার্নিশ বেয়ে নেমে এলো দু’ফোঁটা নোনাজল, সে নিজেও বুঝতে পারল না।
অসহায়ত্ব আর ঘৃণায় ছটফট করে উঠল ভঙ্গুর অন্তঃস্থল! এরোজ হার মানা পথিকের ন্যায় ফিসফিসিয়ে আওড়ায়,
–“দ্বিতীয়বার জীবন শুরু করা যদি এতটাই সুন্দর হয় তবে আমার একদম চাই না এমন দ্বিতীয় জীবন। আমি বরং আজীবন প্রথম জীবনের যন্ত্রনা আঁকড়ে ধরে বাঁচব! কারণ প্রথম জীবন যে অপার্থিব সৌন্দর্যে মোড়া ছিল। সেই সৌন্দর্যকে হারানোর জন্য সকল শাস্তি শীরধার্য! হোক না সেটা মৃত্যুর ন্যায় যন্ত্রণাদ্বায়ক!”

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পি.সিতে ক্ষুদ্র এক কাজ সম্পন্ন করতে থাকা তপোবন গলা খাঁকারি দিলো। তবুও বিফল হলো বিছানা গোছাতে ব্যস্ত রমনীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে। এই পর্যায়ে সে মুখ খোলার তীব্র প্রয়োজনীয়তা অনুভব করল। পি.সির স্ক্রিনে দৃষ্টি রেখেই সে চাপা স্বরে বলল,
–“অনেকগুলো ফ্রক কিনেছিলাম না? সেগুলো পড়ে ঘুমাও।”
রূপকথা কাজ থামিয়ে চোখ তুলে তাকায়। তাকে সব ধরনের পোশাক কিনে দিয়েছে যেন কলেজে কিংবা বাইরে যেতে হলে পড়তে পারে। কিন্তু শাশুড়ির কারণে আজ পর্যন্ত সে শাড়ি ব্যতীত অন্যকিছু পড়ার সাহস করেনি। সে মিহি স্বরে বলল,
–”আম্মা তো জামা কাপড় পড়া পছন্দ করে না। সকালে উঠে সেই আবার শাড়ি পড়তে হবে। তার থেকে এটা পড়ে ঘুমানোই ভালো।”
–“আগে নিজের কম্ফোর্ট! তোমার ঘুমাতে সমস্যা হলে তুমি যা ইচ্ছা তাই পড়বে তাতে কেউ কিছু বলবে না।”
–“কিন্তু আমার তো সমস্যা হয় না।”
–”কিন্তু আমার তো খুব সমস্যা হয়।”
–“হ্যা?”
তপোবন কৃত্রিম হেসে বলল,

–“না মানে, তোমায় দেখে মনে হয় শাড়ি পড়ে ঘুমাতে তোমার অনেক কষ্ট হয়।”
রূপকথা তৎক্ষণাৎ নাকোচ করে বলল,
–“নাতো, আমার একটুও কষ্ট হয় না। আমার ঘুম খুব ভালো! একটুও কাপড় এলোমেলো হয় না, জড়িয়েও যায় না।”
সহসা তপোবন খুক খুক করে কেশে উঠল। ভ্রুযুগল টানটান হয়ে যায় মেয়েটির দৃঢ় কণ্ঠে।
–“কি হলো আপনি কাঁশছেন কেন?”
তপোবন বোকাসোকা হাসল। বলল,
–“নাহ, কিছু না। আসলেই তোমার ঘুম খুব ভালো।”
রূপকথা মৃদু হেসে বলল,
–“হ্যা, মা সবসময় বলে আমি নাকি তাকে সারারাত একইভাবে জড়িয়ে ধরেই ঘুমাই। একটুও নড়াচড়া করি না।”
–“একদম ঠিক বলে।”, তপোবন জোরপূর্বক হেসে বলল।
–“আপনি ঘুমাবেন না?”
–“আসছি, তুমি ঘুমাও।”

তপোবন নিজের কাজটুকু শেষ করে শ্রান্ত দেহে বিছানায় পিঠ এলিয়ে দিলো। রাত গভীর থেকে গভীর হয়, সাথেই গভীর হয় নৈকট্য! তপোবন স্মিত হেসে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ঘুমিয়ে থাকা এলোমেলো বস্ত্রের মেয়েটিকে দেখে নিজেও চোখের পাতা এক করে।
অন্তস্থলে হরহামেশা জেগে ওঠা প্রশ্নের জবাবে নিজ মনে আওড়ায়,

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২২

–“দ্বিতীয়বার ভালোবাসা কঠিন! তার চেয়েও কঠিন প্রথম ভালোবাসাকে লুকানোর যন্ত্রনা! কিন্তু বাস্তবতা মেনে কাউকে হাসিমুখে আগলে নেয়া ভীষণ সহজ!”
সেই সহজলভ্যতাই আজ ছোট্ট মেয়েটিকে বক্ষমাঝে আগলে রাখার শক্তি জোগায়। ম্লান হেসে তপোবন বক্ষমাঝে এটে থাকা দেহটিকে আরেকটু দৃঢ়হাতে আগলে নিলো।

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২৪