অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২৫
তোনিমা খান
বহুক্ষণ যাবৎ কলিং বেল চাপলেও দরজা না খোলায় অধৈর্য্য হয়ে ইমরোজ এবার দরজা ধাক্কা দিলো জোরে জোরে। এই পর্যায়ে দরজাটা খুলে গেল, ভেসে উঠল সৃজার ন্যায় এক পরিচিত আদল। ইমরোজ হাঁফ ছেড়ে বলল,
–“সুপ্তি, তোমার বোন কোথায়? না আমার ফোন ধরছে, না দেখা করছে আর না অফিসে যাচ্ছে।”
সুপ্তি থমথমে মুখে বলল,
–“আপনার যদি আপুর প্রতি বিন্দুমাত্র খেয়াল আর ভালোবাসা থাকতো তবে আপনি জানতেন, আপু আজ দুদিন যাবৎ জ্বরে ভুগছে।”
ইমরোজ আশ্চর্য হলো। উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
–“জানার কোনো মাধ্যম তো থাকা লাগবে? তোমরা কেউ ফোন ধরছো না আর না সৃজা।”
–“আপনি একবার আসতে পারতেন, অথচ তার সময় হয়ে ওঠে না আপনার।
শুধু শুধু আপুকে ইউজ করছেন কেন?”, সুপ্তি শক্ত কণ্ঠে বলল।
–“ইউজ? হোয়াট কাইন্ড অফ ল্যাঙ্গুয়েজ সুপ্তি? আমায় এতদিন ধরে এই চিনেছো?”
–“আপনি যেটা চিনাচ্ছেন সেটাই চিনছি। যদি সত্যি সত্যি ভালোবেসে থাকেন তবে তাকে বিয়ে করুন, যথাযথ সম্মান দিন।”
–“সেটা করার জন্য ও তো আমার সময়ের প্রয়োজন। আমার পরিস্থিতি জানো তুমি, আমি চাইলেই হুটহাট কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারি না।”
সুপ্তি তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
–“সুখ তো আপনার! ঘরে বাইরে আনন্দ! আপনি যখন আপনার স্ত্রীর সাথে থাকবেন না তখন ডিভোর্স দিন তাকে। আপনি তো ছোট বাচ্চা নন! নাকি আপনার চাওয়া পাওয়ার কোনো গুরুত্ব নেই আপনার বাড়িতে।”
কথাটা বেশ আঘাত হানলো ইমরোজের ব্যক্তিত্বে।
সে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
–“বাড়িতে আমি যেটাই বলি, সেটাই এক কথা হয়।”
–“কিন্তু আমার এমনটা মনে হয় না। আপনাকে আপনার ভাইয়ের আর মায়ের ইশারায় নাচা পুতুল মনে হয়। তাদের কৈফিয়ত ছাড়া তো আপনি কিছুই করার অধিকার রাখেন না।”
–“আমি যৌথ পরিবারে থাকি সুপ্তি। বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করো।”
–“আপনি বোঝার চেষ্টা করুন আপুর অবস্থা! কতদিন কারোর জীবনে তৃতীয় ব্যক্তি হয়ে থাকবে?”
–“সৃজা আমার জীবনের তৃতীয় ব্যক্তি নয় বরং একমাত্র ব্যক্তি।”
–“বাহ্, তবে বিয়ে করুন।”
–“শিঘ্রই করবো। আমি আর সময় নষ্ট করব না।”, ইমরোজের দৃঢ় কণ্ঠে সুপ্তি ঠোঁট বাঁকিয়ে দরজা ছেড়ে দেয়। ইমরোজ তাদের মায়ের সাথে দেখা করে সোজা সৃজার রুমে ঢুকে যায়।
বিছানায় শুয়ে থাকা সৃজা তাচ্ছিল্য হাসলো ইমরোজের চিন্তিত মুখ দেখে। খোঁচা দিয়ে বলল,
–“মৌনতার সেবা নেয়া হয়েছে? এখানে কেন এলে? আমি তো কোনো কাজের না?”
ইমরোজ দীর্ঘশ্বাস ফেললো। দীর্ঘ এক সপ্তাহের বিরহ কাটিয়ে সে বিনা দ্বিধায় কম্ফোর্টারের আড়ালে চলে যায়। ব্যাকুলতার সাথে বলে,
–“যেদিন থেকে তুমি আমার জীবনে এসেছো সেদিন থেকে আমি তোমায় ছাড়া একদিন ও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারিনি, সৃজা। তুমি আমার শক্তি, অহংকার! তোমায় হারানোর কথা আমি কখনো চিন্তা করতেও পারিনা অথচ তুমি লাগাতার এমন এলিগেশন দাও।”
–“তুমি এমনি কাজ করো। এভাবে আমি আর চলতে পারছি না ইমরোজ। হয় মৌনতাকে ডিভোর্স দেবে নয়তো আমায় ভুলে যাবে।”
–“তোমায় ভোলা অসম্ভব।”
–“তবে মৌনতাকে বের করবে নিজের জীবন থেকে।”
রাত বাড়ছে। অথচ কনকনে এই শীতের রাতে নায়েল জাগ্রত। মা, ফুপি আর চাচির আশেপাশে ঘুরঘুর করছে। এই ঘুরঘুর করার মূল কারণ হচ্ছে মা বলেছে, আজ সে মা বাবার সাথে ঘুমাবে। ছোট্ট এই মস্তিষ্ক ইদানিং বুঝতে শিখেছে সে খুব বিরল সময়েই বাবা মায়ের সাথে ঘুমাতে পারবে, রোজ পারবে না।
মৌনতা কখনো চাইতো না নায়েলের এই অভ্যাস হোক! বরং চাইতো নায়েল জীবনের বাড়ন্ত সময়টুকু বাবা মায়ের বুকেই কাটাক। অথচ ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! যেখানে স্বামী সন্তান সংসার নিয়ে একটা সুন্দর সময় পার করবে সেখানে সে নিজের সর্বোচ্চ ধৈর্য্য দিয়ে লড়ছে নিজের সংসার টিকিয়ে রাখার যুদ্ধ।
টলটলে নেত্রে মৌনতা ফিসফিসিয়ে আওড়ায়,
–“এমন কঠিন জীবন আল্লাহ কাউকে না দিক। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে কোনো সন্তানকে না পড়তে হোক!”
সময় গড়ালো। পোড়া কপাল মা-মেয়ের অপেক্ষা ফুরালো না। ইমরোজ আসলো না বাড়িতে। গলায় দলা পাকানো কিছু বিদঘুটে অনুভূতিরা তীব্রতর হতে লাগলো। আশাহত মেয়েকে নিয়ে মৌনতা উপরে চলে আসে।
পথিমধ্যে ভাসুরকে তানশানের ঘর থেকে বের হতে দেখে চঞ্চল কদমে ছুটে এলো মৌনতা। পিছু ডাকলো। তপোবন স্মিত হাসলো মৌনতা আর নায়েলকে দেখে। আদুরে কণ্ঠে বলে,
–“আমার মা দেখি এখনো জেগে আছে। এখনো ঘুমায়নি মৌন?”
মৌনতা ম্লান কণ্ঠে বলল,
–“না ভাইজান, বাবার জন্য অপেক্ষা করছিল।”
–“ইমরোজ আসেনি এখনো?”, তপোবন কপাল কুঁচকে শুধায়।
–“না ভাইজান।”
–“সে কি কথা? ও এত রাত পর্যন্ত কোথায় কি করে?”
মৌনতা ফাঁকা ঢোক গিললো। এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে বলল,
–“ভাইজান, আপনাকে একটা অনুরোধ করবো?”
তপোবনের মুখশ্রী গম্ভীর হলো। গমগমে স্বরে বলল,
–“ভাইজানের কাছে এত অনুনয় করে কেন কথা বলতে হবে মৌন? যা চাই নির্দ্বিধায় বলবে।”
মৌনতা ম্লান হাসলো। বলল,
–“ভাইজান, নতুন প্রজেক্টের কাজ শুরু হয়েছে?”
–“তা তো শুরু হয়েছে অনেকদিন, মৌন। শেষের পর্যায়ে এসেও গিয়েছে।”
–“ভাইজান, এবার ওর বাবা কনস্ট্রাকশন সাইটে না গেলে হয় না?”
–“হ্যাঁ, না যাক কোনো সমস্যা নেই। আমি চলে যাবো।”, তপোবনের নিরুদ্বেগ কণ্ঠে মৌনতা উজ্জ্বল দৃষ্টি ফেললো। হাসিমুখে বলল,
–“ধন্যবাদ ভাইজান।”
কিন্তু তপোবনের দৃষ্টি গোচর হয় মৌনতার বিচলন। সে স্নেহের সাথে নিজের হাত তার মাথায় রেখে শুধায়,
–“কোনো সমস্যা মৌন? শরীর ঠিক আছে? তোমায় চিন্তিত দেখাচ্ছে।”
মৌনতা ম্লান হাসলো। পৃথিবীর সবাই তার দূরবস্থা বোঝে অথচ মানুষটা দেখেও দেখে না। সে বলল,
–“শরীর ভালো আছে ভাইজান। শুধু ধৈর্য্য সহকারে অপেক্ষা করছি বাকি সমস্যাগুলোও একদিন ঠিক হয়ে যাবে।”
–“মৌন, কোনো সমস্যা থাকলে ভাইজানকে খুলে বলো। ভাইয়েরা বড় হয়েছে, নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন রয়েছে। ভাইজান চাইলেই নাক গলাতে পারি না। কিন্তু তোমাদের কাছে তো সমসময় অধিকার রয়েছে ভাইজানের কাঁধে নিজেদের সব সমস্যা তুলে দেয়ার। তাই নির্দ্বিধায় ভাইজানকে বলতে পারো।”
তপোবনের আশ্বস্ত ভরা কণ্ঠে মৌনতা মৃদু হেসে বলল,
–“আপনার মতো একজন বড় ভাই পাওয়ায় নিজেকে মাঝেমধ্যে ভাগ্যবতী মনে হয় কিন্তু!”
–“আবার কিন্তু কেন মৌন?”, তপোবনের গম্ভীর কণ্ঠে মৌনতা না বোধক মাথা নাড়লো। বলল,
–“কিছু না ভাইজান। আমি আপনার সময় নষ্ট করছি আপনার তো রূপকথাকে পড়াতে হবে। আপনি যান, আমরাও গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।”
বলেই মৌনতা পা চালিয়ে চলে গেল নায়েলকে নিয়ে। তপোবন সেদিকে চেয়ে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেললো। আজ ছয় বছরের বেশি! যেদিন থেকে মেয়েটিকে দেখেছে সেদিন থেকে তার চোখের মনি হয়েই আছে। কোনো খুঁত নেই, নেই কোনো অভিযোগ।
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরের দিকে পা বাড়ায়।
নিশুতি রাতের পাখিরা ডাকতে শুরু করেছে। যদিও শহরাঞ্চলে তা শোনার উপায় নেই। বাইরে থেকে নাইট গার্ডের বাঁশির শব্দ ভেসে আসছে।
বইয়ে মুখ গুঁজে থাকা রূপকথা উদাসীন চিত্তে বসে রয়েছে চেয়ারে। মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাচ্ছে মৌনতার রুগ্ন, মূর্ছা যাওয়া দৈহিক অবস্থা। সে এসেছে থেকেই খেয়াল করেছে মৌনতা অস্বাভাবিক রকমের অসুস্থ থাকে। একটু কথা বললেই হাঁপিয়ে যায়, কয়েকবার মাথা ঘুরিয়ে পড়েছে, হাঁটতে চলতেও কষ্ট হয়। অথচ এত অসুস্থতাও তাকে কাবু করতে পারে না। সেদিন তো রান্না করার সময় তার নাক দিয়ে রক্ত পড়ছিল। শরীরে জোর না থাকলে ও সে কাজ করতে পিছুপা হয় না। মেজো ভাইজানের চোখে কি পড়ে না তার এতো অসুস্থতা? ভাবনার মাঝেই খট করে বাথরুমের দরজা খোলার শব্দে রূপকথা হড়বড়িয়ে বইয়ে মুখ গুঁজলো।
তানশানের পাপা বলেছিল এখন তার পড়া ধরবে। সে শেষ বারের মতো শব্দ করে পড়তে লাগলো।
জোরে জোরে পড়তে পড়তেই রূপকথা একপলক উদাসীন ব্যস্ত চোখে পিছু ফিরে তপোবনকে দেখে নেয়। তবে আবার বইয়ের দিকে তাকাতে গেলে তার মস্তিষ্কে হঠাৎ অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু একটা আঁটকে গেলো। নিজের চোখকে ভুল প্রমাণিত করার প্রয়াসে সে চকিতে আবার পিছু ফিরে তাকালো।
সহসা চোখদুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। সর্বদা পায়জামা, পাঞ্জাবিতে থাকা লোকটিকে কালো ট্রাউজার আর ঢিলেঢালা কালো ফুল স্লিভসের গেঞ্জিতে দেখে সে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইল। একটু পরিবর্তনেই যেন লুকায়িত সুগঠিত এক পরিপাটি সত্ত্বা বেরিয়ে এসেছে।
নিজের বর্তমান গন্ডি হিসেব করলে, তার মনে হলো এর থেকে সুদর্শন বোধহয় আর কিছু হতে পারে না।
বহুবছরের অনভ্যাসের অস্বস্তি লুকাতে তোয়ালেতে অনবরত মুখ মুছতে থাকা তপোবনের জড়তা আরো বেড়ে গেল রূপকথার এমন হতভম্ব দৃষ্টি দেখে। নিজের মেকি ব্যস্ততা আরো বাড়িয়ে সে লম্বা লম্বা কদমে আরশির সামনে দাঁড়ায়। আজ দশ বছর সে গেঞ্জি ট্রাউজার পড়েছে।
তাকে দেখতে অদ্ভুত লাগছে কি? না-কি ছ্যাঁচড়াদের মতো লাগছে? অস্বস্তি ঘিরে ধরলো তপোবনকে। সকলে নিশ্চয়ই তাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে। এই বয়সে এসে নিজেকে হাসির পাত্র হিসেবে দেখার মতো লজ্জা জনক ব্যপার আর কিছু হতে পারে না। অস্বাভাবিক পরিমানের অস্বস্তি সামলাতে না পেরে নিজের কাজে নিজেই পস্তাতে লাগলো তপোবন।
সে গলা খাঁকারি দিয়ে উঠল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার প্রচেষ্টায়। গম্ভীর গলায় বলল,
–“পড়া হয়েছে? হলে দাও। এত রাত জাগার প্রয়োজন নেই। রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যাবে, আর ভোর বেলা উঠে পড়তে বসবে।”
রূপকথা স্পষ্ট দেখলো তপোবনের মুখ লুকানো। অদ্ভুত ভাবে তার ওষ্ঠকোনে মিটিমিটি হাসি ফুটে উঠল। সে ভাবতে পারেনি লোকটা তার কথা এতটা গুরুত্ব সহকারে নেবে। সে মিটিমিটি হাসতে হাসতে বইটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
–“হয়েছে; নিন ,ধরুন।”
তপোবন বইটা নিলো না। সে আরশির সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই চুলে হাত গলাতে গলাতে বলল,
–“দরকার নেই, আমি জিজ্ঞেস করছি তুমি বলতে থাকো।”
রূপকথা মাথা নেড়ে সায় জানায়। তপোবন পুরো ঘরময় হাঁটে আর রূপকথাকে সূত্র জিজ্ঞাসা করছে। আর রূপকথা সে মিটিমিটি হাসছে আর জবাব দিচ্ছে। ওষ্ঠকোনা থেকে তার হাসি সরছে না তপোবনের অস্বস্তিভরা মুখটি দেখে। কেমন অদ্ভুত আচরণ করছে লোকটি। বারবার মুখে, চুলে হাত দিচ্ছে তো কখনো গেঞ্জি ধরে টানাটানি করছে, আর নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করছে।
পড়া জিজ্ঞাসা করা শেষ হতেই তপোবন এগিয়ে আসে রূপকথার কাছে। চেয়ার টেনে তার পাশে বসে আড়চোখে মেয়েটির দিকে তাকায়। মেয়েটির সামনে থেকে খাতাটা নিতে নিতে থমথমে মুখে শুধায়,
–“সেই থেকে হেসে যাচ্ছেন কেন, মুরুব্বি?”
রূপকথা তড়িৎ গতিতে হাসিমুখ লুকিয়ে নিলো। ঘন ঘন মাথা নেড়ে মিনমিনে গলায় বলে,
–“না না, হাসছি কোথায়!”
তপোবন লিখতে লিখতে বলে,
–“তবে আমি বোধহয় ভুল দেখছি, তাই না?”
রূপকথা হাসি চেপে বলে,
–“হতে পারে।”
তপোবন এক পলক সরু দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মেয়েটির দিকে। মেয়েটি যে তাকে দেখেই হাসছে! সে হতাশার নিঃশ্বাস ফেললো। কেন যে সে এগুলো পড়তে গেল!
প্রতিরাতের মতো বিছানার দুই প্রান্তে দুটি দেহ জায়গা করে নিলো। নিজেদের মধ্যকার দূরত্ব দেখতে ভুললো না তপোবন। এক হাতের ও বেশি দূরত্ব। এ যে নিছকই সাময়িক—ভেবেই মুচকি হাসলো সে। তবে মনের মাঝে শঙ্কা আর উশখুশ ভাব গেল না। মেয়েটি একবার দেখলো ও না, সে যে পোশাকে পরিবর্তন এনেছে। সে উল্টোদিকে কাত ফিরে শুয়ে থাকা অবস্থাতেই গলা খাঁকারি দিলো। গুরুগম্ভীর গলায় শুধালো,
–“সন্ধ্যায় তো খুব করে বললে রঙচটা পোশাক পড়তে? বললে তো না কেমন লাগছে?”
রূপকথার চোখ প্রায় লেগে এসেছিল। কিন্তু তপোবনের কথায় তার তন্দ্রাচ্ছেদ ঘটে। সেও উল্টোদিকে কাত ফিরে শুয়েই বলল,
–“রঙচটা পোশাক পড়েছেন বুঝি?”
তপোবনের শান্ত মুখশ্রীতে উৎকণ্ঠা ছুঁয়ে গেল।
উৎকণ্ঠা নিয়ে শুধায়,
–“কেন এটা রঙচটা পোশাক লাগছে না?”
রূপকথা নাকোচ করে বলে,
–“উঁহু, এটা তো কালো রঙ।”
–“এর থেকে রঙচটা পোশাক পড়লে দেখাবে চানাচুর ওয়ালার মতো।”
তপোবনের সরব গম্ভীর গলায় রূপকথা ফিক করে হেসে উঠল। তপোবনের ওষ্ঠকোনেও মৃদু হাসি ফুটে ওঠে রূপকথার সেই খিলখিলিয়ে হাসিতে। শুধায়,
–“খারাপ লাগছে?”
রূপকথার জবাব আসল না। তপোবনের হতাশা আরো বাড়লো নিজের পরিবর্তন নিয়ে। সে নিস্তব্ধতা আঁকড়েই চোখ বন্ধ করে ওমনি ভেসে আসে মিষ্টি নারী কণ্ঠ।
–“একদম তানশানের সুদর্শন পাপার মতো লাগছে। কে বাবা, কে ছেলে বোঝার উপায় নেই।”
তপোবনের মুখে হাসি ফুটে উঠল। পুনরায় চোখ বুজে বলে,
–“ধন্যবাদ।”
শব্দ মিলিয়ে গেলো অন্ধকার আর রাতের নিস্তব্ধতায়। রাত বাড়তেই শীতের প্রকোপ বৃদ্ধি পায়, বৃদ্ধি পায় তপোবনের মুচকি হাসিও। কিন্তু কমতে লাগলো দু’জনের মধ্যকার দূরত্ব, কমতে লাগলো সম্পর্কের জড়তা। তপোবন মুচকি মুচকি হাসছে আর বুকের উপর গাল দাবিয়ে শুয়ে থাকা নারীটিকে আবছা আলোয় দেখছে। হাতে নগ্ন পৃষ্ঠদেশের স্পর্শে, সে হাত বাড়িয়ে মেয়েটির শাড়ির হদিস খোঁজে। কিন্তু পায় না। প্রতিদিন-ই এমনি পরিস্থিতিতে পড়ে।
নিরুপায় সে সেভাবেই মেয়েটিকে নিজের কম্ফোর্টার দিয়ে আড়াল করে নেয়। কাত ফিরে ঘুমন্ত মেয়েটির পৃষ্ঠদেশ আগলে নিজেও ঘুমানোর প্রয়াস করে। কিন্তু ঘুম ধরা দেয় না। বক্ষমাঝে লেপ্টে থাকা নারী অবয়ব বুকের অভ্যন্তরে জায়গা করে নেওয়ার দুধ্বর্ষ প্রয়াস চালাচ্ছে যে!
দিনগুলো বড্ডো এলোমেলো, অগোছালো, অশান্তিপূর্ণ এবং অসুস্থ। কেউ পুড়ছে বা কেউ দুঃখে দুঃখে মরছে, তো কেউ নতুন অনুভূতির সাথে পরিচিত হচ্ছে।
মানুষটা না বললেও তার ছোট ছোট বিষয়গুলোর খেয়াল রাখা, প্রয়োজনীয় সবকিছু এগিয়ে দেওয়া, সংসারের হাল ধরা, পড়াশুনার নাম করে ছোট্ট ছেলেটির বন্ধু হওয়ার প্রক্রিয়ায় রূপকথা অসুস্থ, অসম এই সম্পর্কে এগিয়েছে বহুদূর।
আজানের ধ্বনি শোনা যাচ্ছে তখন। রূপকথার ঘুম ভাঙে সবসময় তপোবনের পরে। কিন্তু তার থেকেও বিভ্রান্তিকর ব্যপার হলো, সে নিজেকে পেল তপোবনের কম্ফোর্টারের আড়ালে আর তপোবনের পাশে থাকে তার কম্ফোর্টার। এই অদল বদল কখন হয়, কিভাবে হয় সেই সমীকরণ মেলাতে পারে না রূপকথা।
তার ঘুমের ধরণ খারাপ না। অন্তত প্রতি সকালে তার পোশাক আশাকের ধরণ তো এটাই বলে। তবুও কে জানে ঘুমের মধ্যে কি করে? লোকটা তো কখনো কিছু বলেও না। খারাপ কিছু করলে তো অবশ্যই বলতো!
চিন্তা করতে করতেই সে কম্ফোর্টারের আড়ালে নিজেকে দেখে নেয়। স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো নাসারন্ধ্র থেকে। অন্তত পোশাকটা ঠিক থাকে, নয়তো লজ্জায় মাথা কাটা যেত। ওয়াশরুম থেকে শব্দ ভেসে আসছে, সে দ্রুত বিছানা থেকে নামে। কাবার্ড থেকে তপোবনের পাঞ্জাবি সহ প্রয়োজনীয় জিনিস বের করে রাখে। তপোবন বের হতেই দেখতে পায় রূপকথা সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে মৃদু হেসে বলল,
–“উঠে পড়েছ? নামাজ পড়ে, কিছু খেয়ে পড়তে বসবে।”
রূপকথা মাথা নেড়ে সায় জানায়। বিছানার উপর পাঞ্জাবি পায়জামা দেখে তপোবন বলল,
–“ধন্যবাদ কথা, কিন্তু এগুলোর দরকার নেই। গুছিয়ে রেখে দাও। আজ এভাবেই নামাজ পড়ে আসি।”
–“কিন্তু আপনি তো সবসময় পাঞ্জাবি পড়ে নামাজ আদায় করেন।”, রূপকথা অবুঝ নয়নে তাকিয়ে বলে। তপোবন স্মিত হেসে বলল,
–“সবসময় তো পড়ি! আজ নাহয় এভাবেই পড়ি।”
রূপকথা আনত স্বরে বলল,
–“গতকাল আমি ওভাবে বলতে চাই নি। এমনি-ই বলেছি, হয়তো ভালো লাগবে এটা ভেবে। অস্বস্তি হলে আপনার পড়তে হবে না এমন পোশাক।”
–“ভালো লাগবে বলে? তারমানে ভালো লাগছে না?”, তপোবন ভ্রু নাচিয়ে শুধায়। সরব লাজে ছেঁয়ে যায় ফোলা ফোলা মুখশ্রী। এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে মিহি স্বরে বলে,
–“আপনাকে সবকিছুতে, সবভাবেই সুন্দর লাগে। কিন্তু আমি চাই না কেউ অস্বস্তি নিয়ে কোনো কাজ করুক।”
–“তোমায় কে বলল, আমি অস্বস্তি নিয়ে এই পোশাক পড়ছি?”
–“আমি বুঝতে পারি!”
–“আপনি ভুল বুঝতে পারেন, মুরুব্বি। আমি আগেও পড়তাম এমন পোশাক। কিন্তু বিগত কয়েক বছর একটু এড়িয়ে চলেছি। তাই একটু আনকম্ফোর্টেবল লাগছে। চিন্তা করো না। এগুলো গুছিয়ে রাখো।”, তপোবন মৃদু হেসে বলে।
রূপকথা জবাব দেয় না। সেভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে। তপোবন বের হওয়ার আগে অভ্যাস অনুযায়ী স্কন্ধে আতর ঘঁষে নেয়। রূপকথা রোজকার এই দৃশ্য দেখতে দেখতে বলে,
–“আমি রোজ কলেজে যাব না।”
–“কেন, ফাঁকিবাজি?”, তপোবন তার দিকে ফিরে তাকিয়ে শুধায়। রূপকথা না বোধক মাথা নাড়লো।
–“এমনিই, আমি সপ্তাহে দুইদিন কলেজে যাব।”
–“প্রতিদিন কলেজে না গেলে তুমি পারবে না কিছু। এমনিতেও তুমি কোচিং করছ না।”, তপোবন উৎকন্ঠা নিয়ে বলল
রূপকথা ম্লান হেসে বলল,
–“এর মধ্যে যেটুকু যা পারি তাতেই হবে।”
তপোবন এগিয়ে আসে। বলে,
–“কেউ কিছু বলেছে? দেখো রূপকথা, আম্মা বয়স্ক মানুষ। চিন্তাধারা অন্যরকম। সে বলবেই এমন অনেক কথা। তার কথায় তুমি লক্ষ্যচ্যূত হলে তোমার ক্ষতি।”
রূপকথা ডানে বামে মাথা নেড়ে বলল,
–“আম্মা কিছু বলেনি। আমি নিজে থেকেই যেতে চাই না। এমনিতেও কলেজে তেমন একটা ক্লাস হচ্ছে না এখন। আপনি যেটুকু পড়াচ্ছেন তাতেই আমি অনেক এগিয়ে যাব। চিন্তা করবেন না।”
–“কিন্তু যখন পুরোদমে ক্লাস শুরু হবে তখন রেগুলার যাবে। এমনিতেই জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক দিয়ে তুমি পিছিয়ে গিয়েছ। আমি চাই না তুমি তোমার জীবনের বেঁচে যাওয়া লক্ষটা থেকেও দূরে সরে যাও। দিনশেষে তোমায় একজন ডাক্তার হিসেবে দেখতে চাই, রূপকথা।” , তপোবন গম্ভীর গলায় বলল। রূপকথা মলিন হেসে বলল,
–“জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে সেই পিছিয়ে যাওয়াই, আমায় আমার লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করছে। তবে এটা পিছিয়ে যাওয়া কি করে হলো? বরং এটা আমার সামনে আগানোর একমাত্র কারণ। যদি জীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ দিকটা থেকে পিছিয়ে না যেতাম, তবে হয়তো এতদিনে আমি নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতাম।”
বরাবরের মতোই এমন কথার প্রেক্ষিতে তপোবন নীরব রইলো। রূপকথা তাড়া দিয়ে বলে,
–“আপনার দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
তপোবন কার্ডিগানটা হাতে নিয়ে বলল,
–“আসছি।”
রূপকথা তাকিয়ে থাকে তার গমনের পথের দিকে। ঘর থেকে বের হতেই তপোবন বুক ভরা নিঃশ্বাস ফেললো। ছেলে তাকে দেখে কেমন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবে, সে জানে না।
ছেলের ঘরের দরজা খুলে ধীরপায়ে ঢুকলে বিছানায় কাউকে দেখতে পেল না। সে এগিয়ে যায় বিছানার কাছে। মিনিটের মাঝে পুরো বিছানা সহ ঘরটা গুছিয়ে নেয়। ওজু করে তানশান ঠক ঠককরে কাঁপতে কাঁপতে বের হয় ওয়াশারুম থেকে। ছেলের গায়ে হাঁফ হাতার একটা টিশার্ট দেখে, তপোবন বিরক্তিকর নিঃশ্বাস ফেললো। দ্রুত ছেলের সোয়েটার আর তোয়ালে হাতে এগিয়ে গেল। এগিয়ে দেওয়া সোয়েটার আর তোয়ালেটা তানশান নিলো না বরং দ্রুতপায়ে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে যায় বাবার বুকে। কাঁপতে কাঁপতে বলে,
–“ওহ্ পাপা, এত শীত কেন?”
ওষ্ঠকোনে স্নেহের হাসি নিয়ে তপোবন নিজের সোয়েটার আর বলিষ্ঠ দুই হাতের আড়ালে ছেলের অবয়ব আড়াল করে নেয়।
বাবার বুকের উষ্ণতায় তানশান নিজের কাঁপন কমায়। শীত একটু কমতেই সে সোয়েটার পরে নেয়। তবে হঠাৎ করেই তার চোখ যায় বাবার পোশাকের দিকে। সে চকিতে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায় বাবার দিকে। আচমকাই প্রফুল্ল হেসে উঠলো সে। আশ্চর্যের কণ্ঠে বলল,
–“ওয়াও পাপা! ইউ আর লুকিং সো হ্যান্ডসাম!তোমায় কি সুন্দর লাগছে, পাপা। কেউ তো বলবেই না তুমি আমার পাপা। একদম আমার মতো দেখতে লাগছে তোমায় পাপা।”
তপোবন জড়তা ভুলে কপাল কুঁচকে নিলো ছেলের কথায়। থমথমে মুখে বলল,
–“আমায় দেখতে তোমার মতো লাগছে না। তোমায় দেখতে আমার মতো লাগে।”
–“সেটা তো জানি। কিন্তু এই পোশাকে তোমায় একদম আমার মতো লাগছে। তুমি কেন এমন পোশাক পড়ো না? সবসময় পাঞ্জাবি পড়লে তোমায় ভালো লাগে না। মাঝেমধ্যে এসব পোশাক পড়বে। তারপর আমরা সবাইকে চমকে দেবো একই পোশাক পড়ে।”, তানশানের আনন্দমুখর কণ্ঠ। তপোবন ছেলের চুলের ভাঁজে হাত গলিয়ে দিয়ে শুধায়,
–“এই পোশাকে ভালো লাগছে?”
–“খুব, একদম আগের মতো দেখতে লাগছে। এখন থেকে এমন পোশাক পড়বে?”, তানশান হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে বলল।
তপোবন মাথা নেড়ে বলে,
— “আচ্ছা পড়ব। এখন চলো, জামায়াত শুরু হয়ে যাবে।”
তানশান মাথা নেড়ে সায় জানায়। তপোবন বের হতে নিয়েও পিছু ফিরে এসে ছেলের মাথায় শীতের টুপি পড়িয়ে দেয়। আর আদেশের সুরে বলে,
–“খুলবে না কিন্তু!”
তানশান মুখ গোমড়া করে নিলো। গম্ভীর গলায় বলল,
–“ওকে।”
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২৪
তপোবন হেসে তার কাঁটা কাঁটা চুলের ভাঁজে অনবরত হাত বুলিয়ে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়। দিনশেষে আগলে রাখা ছোট্ট এই সত্ত্বা আর তার মুখের হাসি তার সকল সুখের কারণ! সে পুনরায় টুপিটা পড়িয়ে দিলো। অতঃপর বাবা ছেলে মসজিদের উদ্দেশ্যে রওনা হয়, আজ আর দাদুভাই নেই। সে বাগেরহাটে।
