অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২৯ (৩)
তোনিমা খান
সংসার, সন্তান, অসম এই সম্পর্ক সামলে রূপকথা নিজের পড়াশুনার গতি বাড়ায়। আজ ঘরে আর তেমন কোনো কাজ না থাকায় ঘরের মেয়ে বউরা খানিক নিশ্চিন্তে।
রূপকথা সুযোগ পেতেই কোমড় বেঁধে নেমেছে মায়ের দায়িত্ব পালনে।
বিছানার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা তানশান এবার বিরক্তি নিয়ে তাকালো রূপকথার দিকে। কৈশোরের ভাঙা গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
–“আপনি আমায় বিরক্ত করছেন। সবসময় আপনার জেদ মানব না আমি। জোরজবরদস্তি আমার পছন্দ নয়। আমি যখন বলেছি তেল দেবো না, তখন দেবো না।”
তেলের বোতল হাতে রূপকথার পা থেমে গেল ছেলেটির শক্ত কণ্ঠে। জড়তা এসে হানা দিলেও লম্বা নিঃশ্বাস ফেলল! হার মানা যাবে না। যেখানে তার লক্ষ্যই হলো জোরপূর্বকের মা হওয়া। সে নম্র কণ্ঠে বলল,
–“সপ্তাহে একবার অন্তত মাথায় তেল দিতে হয় তানশান। এসো একটু তেল দিয়ে দেবো। মাথাটা ঠান্ডা থাকবে, ভালো লাগবে।”
–“আমার মাথা এমনিতেই ঠান্ডা থাকে। এখন এই সকালে আমি তেল দিয়ে স্কুলে যাব? আমাকে তো চোর চোর দেখাবে।”
–“তেল দিলে চোর চোর লাগে না বরং আরো ভদ্র লাগে।”
–” আশ্চর্য! আপনি তো পেছনেই পড়ে আছেন। আপনার না কলেজে যেতে হবে? পরীক্ষা আছে? সেদিকে মনোযোগ দিন। আমাকে নিয়ে এতো চিন্তা করতে হবে না আপনার। আপনাকে সম্মান করি বলি কখনো কোনকিছু করতে বাঁধা দেই না, কিন্তু আপনি তো মাথায় চড়ে বসছেন।”, শেষের কথাটি বড্ডো কঠোর শোনালো। রূপকথার জোর কেমন যেন নড়বড়ে হয়ে গেল। তবুও পিছু হাঁটে না। পথটা যেমন কঠিন, সৃষ্টিকর্তা সেই পথ পাড়ি দেয়ার জন্য ঠিক ততটা সহজ পন্থাও তাকে দিয়েছে।
সে আর কোনোরূপ বাকবিতন্ডা না করে সেন্টার টেবিল থেকে নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে শব্দ করে কিছু পড়তে শুরু করলো।
–“এই টমাটু, চল পালিয়ে যাই। তারপর বিয়ে করি, বছর দুই পর বাচ্চা হবে। আমাদের সংসার হবে। তুই আমি আর আমার টমাটুর বাচ্চা— আমরা একসাথে পড়াশুনা করব। আহ্! জীবন কি সুন্দর!” এতটুকু পড়ে থামলো রূপকথা। কোনাচোখে দেখে নেয় থমকে দাঁড়ানো নিজের ছেলের। ভ্রু নাচিয়ে সুর টেনে টেনে বলল,
–“আসলেই জীবন কি সুন্দর, তাই না তানশান?”
তানশান হতভম্ব দৃষ্টিতে রূপকথার পানে তাকায়। এই চিরকুটটা সেদিন সুনেহরা তাকে দিয়েছিল। যেটা সে বইয়ের ভেতর লুকিয়ে রেখেছিল। কিন্তু এটা মিমির কাছে গেল কি করে? লজ্জা, অস্বস্তিতে কান গরম হয়ে উঠল তানশানের।
এক প্রকার ছুটে যায় রূপকথার কাছে। উৎকণ্ঠা নিয়ে হড়বড়িয়ে বলে,
–“আপনি…আপনি কারোর প্রাইভেসিতে হস্তক্ষেপ করতে পারেন না। এটা ঠিক নয়। আপনি যেটা ভাবছেন এমন কিছু নয়। ওটা..ওটা আমার নয়। না মানে, আমি এমন ছেলে নই। আপনি আমায় খারাপ ভাবছেন কেন?”
উট পাহাড়ের নিচে আসতেই রূপকথা দম নিলো। এক গাল হেসে বলল,
–“এটা তোমার নয়? পাজি ছেলে মায়ের সাথে মিথ্যা বলছো? আমি বোকা? এই যে এতো গুলো চিরকুট! একটাও তোমার নয়? একটায় আবার জবাব ও লেখা আছে! কি যেন? দাঁড়াও পড়ে শোনাচ্ছি।”
বলেই রূপকথা ফোন ঘাঁটতে লাগল। তানশান অবাক হয়ে গেল রূপকথাকে ফোন ঘাঁটতে দেখে। তারমানে সে ছবি তুলে রেখেছে? তার চেয়েও বড় কথা তার হাতে লাগলো কি করে চিরকুট গুলো? সে তো বাইরে যাওয়ার পোশাকগুলোর মাঝে লুকিয়ে রেখেছিল।
রূপকথা কাঙ্খিত চিরকুটটি পেতেই শব্দ করে পড়তে লাগল,
–“এই যে দুষ্টু মেয়ে! কখনো নিজের এই দুষ্টুমি গুলোকে হারিয়ে ফেলো না। এগুলোকে ধরে রেখো”
পড়েই রূপকথা বিস্ময় নিয়ে বলে উঠল,
–“বাব্বাহ্! দাঁড়াও তোমার পাপাকে বলছি।”
তানশান মাথা হেঁট করে দাঁড়িয়ে ছিল। রূপকথার কথায় সে হতভম্ব হয়ে শুধায়,
–“পাপা? আপনি এগুলো পাপাকে বলবেন?”
–“হ্যাঁ, বলব না? তার ছেলে যে বড় হয়ে গিয়েছে, এটা তাকে বলতে হবে না? বলব ছেলেকে বিয়ে দিতে আর তার ছেলের বউয়ের কষ্ট দূর করতে।”
–“বিয়ে? ছেলের বউ?”, তানশানের পুনরায় হতভম্ব কণ্ঠে রূপকথা জেদি কণ্ঠে বলল,
–“হুঁ, দাঁড়াও তোমার পাপাকে বলছি।”
–“আপনি কি বলবেন?”
–“এই যে তার ছেলে বখে গিয়েছে।”
–“আমি মোটেও বখে যাইনি। এগুলো আমার নয়। আমি শুধু ফেলতে ভুলে গিয়েছি। আপনি এগুলো পাপাকে বলতে পারেন না। আপনার কি লজ্জা করবে না এগুলো পাপার সামনে বলতে?”,
রূপকথা নিরুদ্বেগ বলল,
–“তুমি করতে পারলে আমার বলতে লজ্জা কেন লাগবে? আমি তো বলবই।”
শীতের এই সকালেও তানশান ঘেমে উঠল। বাবা যদি জেনে যায় তবে সে লজ্জা, অস্বস্তিতে কখনো তার চোখে চোখ মেলাতে পারবে না বাবার সাথে। কেন যে সে এইগুলো জমিয়ে রাখতে গেল! সে পরিস্থিতি সামলে উঠতে না পেরে বোকাসোকা কণ্ঠে বলল,
–“তাহলে আমিও পাপাকে বলে দেবো আপনি ও বখে গিয়েছেন।”
–“আমি?”, রূপকথা কপাল কুঁচকে শুধায়।
–“হ্যাঁ, আপনাকে আমি বলছি যে আমি এগুলো ফেলতে ভুলে গিয়েছি তারপরেও আপনি এগুলো নিয়েই পড়ে আছেন। আপনার ভালোলাগছে এগুলো তাই না? পাপাকে বলে দেবো আপনি বখে গিয়েছেন।”
রূপকথা হাসলো তানশানের বোকা কথায়। ছেলেটাকে এমন অপ্রস্তুত করতে পেরে তার বেশ আনন্দ লাগছে। সে কিছু বলতে যাবে তার আগেই ভারী এক কণ্ঠ আন্দোলিত হলো।
–“কে বখে গিয়েছে?”
হঠাৎ করেই তপোবনের ভারী কণ্ঠ ভেসে আসতেই তানশান চমকায়। হড়বড়িয়ে বলল,
–“কেউ না পাপা, নাথিং।”
–“না তানশানের পাপা, সামথিং সামথিং!”, রূপকথা তৎক্ষণাৎ ফোড়ন কাটল।
তানশান ঘন ঘন মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,
–“নো পাপা, নাথিং নাথিং। তার কথা বিশ্বাস করো না।”
তপোবন বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে ছেলে আর স্ত্রীকে।
–“না, তানশানের পাপা। সামথিং সামথিং, আমি সত্যি কথা বলছি। আমার কাছে প্রমাণ আছে।”, রূপকথা তেজি কণ্ঠে বলতেই তানশান চোখ বড়বড় করে তাকায়। ছুটে গিয়ে দুইহাতে রূপকথার মুখ চেপে ধরে টেনে বারান্দায় নিয়ে যায়। ফিসফিসিয়ে বলে,
–“আপনি এগুলো পাপার কাছে বলবেন না। পাপার চোখে চোখ রাখতে পারব না আমি। পাপা আমায় খারাপ ভাববে। সে অনেক কষ্ট পাবে। আমি আর এমন কখনো করবো না। আপনি এই মেয়েটার কাছে জিজ্ঞেস করবেন আমি ওর সাথে কখনো কথাও বলিনি। ও জোর করে আমার ব্যাগে এগুলো ঢুকিয়ে রাখে।”
রূপকথা সরু চোখে তাকায়। মুখ থেকে ছেলের হাত সরিয়ে শানিত কণ্ঠে বলে,
–“ঠিক আছে যাও বলব না। কিন্তু আমি যা বলবো তাই করতে হবে। নয়তো এই যে ছবিগুলো সব তোমার পাপাকে দেখাবো।”
তপোবন বারান্দায় উঁকি দেয়। দু’জনের হাবভাব অবলোকন করে শুধায়,
–“কি ফুসুরফুসুর করছো দু’জনে?”
বাবার কণ্ঠে তানশান আলাভোলা হেসে চঞ্চল কণ্ঠে বলল,
–“কিছু না…কিছু না পাপা। মিমিকে বলছিলাম আমায় তেল দিয়ে দিতে কিন্তু সে রাজিই হচ্ছে না।”
রূপকথা চোখ বড়বড় করে তাকায় ধুরন্ধর ছেলের পানে। তানশান ইশারায় তাকে শান্ত হতে বলে। অতঃপর দ্রুত রূপকথার হাত ধরে বাবার পাশ কাটিয়ে ঘরে নিয়ে যায়। নিজ উদ্যোগে সেন্টার টেবিল থেকে তেলের বোতলটা রূপকথার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
–“নিন, তেল দিয়ে দিন।”
রূপকথা ঠোঁট চেপে হাসি আটকায় এবং ইচ্ছেমতো তেল দিয়ে দেয়। আর তানশান চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তপোবন তখনো দু’জনের কান্ড বোঝার চেষ্টা করছে। তেল দেওয়া হতেই তানশান আয়নার দিকে তাকায়। তাকাতেই তার চেহারা কাঁদো কাঁদো হয়ে গেল। তাকে চোরের মতো দেখাচ্ছে। আরেকটু পরেই তেল গড়িয়ে গড়িয়ে পড়বে কপাল বেয়ে। সে দাঁতে দাঁত চেপে তাকায় রূপকথার পানে যে এক গাল হেসে দাঁড়িয়ে আছে। চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
–“এখন সালমান খানের মতো মাঝখান দিয়ে একটা সিঁথি ও কেটে দিন। তাহলেই তো আপনার ষোলকলা পূর্ণ হবে।”
–“দেবো? সুন্দর লাগবে!”, রূপকথা উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলতেই তানশান চাপা স্বরে চেঁচিয়ে উঠল,
–“নাআআআ!”
–“সেই থেকে কি ফুসুরফুসুর করছো তোমরা দু’জন? আমায় বলা যাবে?”, তপোবন পুনরায় শুধায়। দৃষ্টিতে তার বিস্ময়! এমন তেল তানশান জীবনে কখনো দেয়নি।
তানশান এক গাল বোকাসোকা হেসে বলল,
–“নাথিং পাপা। কিছু না, মজা করছিলাম দু’জনে।”
তপোবনের ভ্রু টানটান হয়ে গেল ছেলের কথায়। ওষ্ঠকোনা ঠিকরে বের হচ্ছে স্মিত হাসির উজ্জ্বলতা। সে আজ পর্যন্ত কখনো এমনভাবে তেল দিতে পারেনি ছেলেকে। গোসলের এক ঘন্টা আগে তেল দিয়ে দেয় আর তারপর ধুয়ে ফেলত। এটাই তার তেল দেওয়ার রুটিন ছিল।
সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছেলে আর স্ত্রীর কাজ পর্যবেক্ষণ করে।
–“তোমাদের স্কুল কলেজে যেতে হবে আজ, তা কি মনে আছে?”
–“হ্যাঁ, যাব তো!”, রূপকথা চঞ্চল কণ্ঠে বলল।
তপোবন ছেলের পানে চেয়ে শুধায়,
–“আব্বু, আপনি কি আজ স্কুল বন্ধ দেয়ার চিন্তায় আছেন?”
তানশান আরশি থেকে দৃষ্টি সরিয়ে করুণ চোখে তাকায় বাবার দিকে। মলিন মুখে বলল,
–“নো পাপা, আমিও যাব।”
তপোবন আশ্চর্য হয়ে গেল ছেলের এহেন জবাবে। সে গলা খাঁকারি দিয়ে শুধায়,
–“এভাবেই যাবে?”
–“আর কিছু করার মতো তো নেই।”, তানশান মিনমিন করে বলে ওয়াশরুমে চলে গেল। ছেলে যেতেই তপোবন হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে তাকায় ঠোঁট চেপে হাসতে থাকা স্ত্রীর পানে। শুধায়,
–“আমার ছেলেটাকে এমন নাস্তানাবুদ করলে কেন?”
রূপকথা কপাল কুঁচকে বলল,
–“আপনার ছেলে ত্যাড়ামি করে আমার সাথে। আজ শাস্তি দিয়েছি, দেখবেন এরপর থেকে একদম সোজা হয়ে গিয়েছে।”
রূপকথার কণ্ঠে মায়েদের মতো অসন্তোষ! তপোবন মোটেই হস্তক্ষেপ করলো না এই বন্ধুসুলভ সম্পর্কের মাঝে। তাদেরকে তাদের মতো ছেড়ে দিয়ে বলল,
–“তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিচে এসো আমি অপেক্ষা করছি।”
–“আচ্ছা।”
তপোবন অভ্যাস অনুযায়ী ছেলের ব্যাগ গোছাতে গেলে দেখলো ব্যাগ আগেই গুছিয়ে রাখা। বিগত বহুদিন যাবৎ ছেলের সব কাজ কেউ ভীষণ সানন্দে নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। সে মৃদু হেসে ঘর থেকে বের হতে হতে এক পলক ফিরে তাকায় ব্যস্ত স্ত্রীর পানে। যে কি-না মায়েদের মতো রেগেমেগে বলছে,
–“তানশান, ভেজা তোয়ালে বিছানায় রাখবে না।”
তখন বেলা এগারোটা চল্লিশ। ব্রেক টাইম হওয়ায় কলেজ প্রাঙ্গণের বকুল তলায় তখন স্টুডেন্টদের ভীড়। তেমনি এক ছায়াতলে ঝিমুচ্ছে ক্লাসের বিবাহিত তিন রমনী। কথোপকথনের মূল বিষয়বস্তু ও বিবাহ’ই। কিছু কিছু মেয়ে আবার কানাঘুষা করলো,
–“বিবাহিত—ডেট এক্সপায়ার্ড। এদের কাজ হলো স্বামী সংসার নিয়ে আলোচনা করা।”
এতে তিন বান্ধবী যারপরনাই নিরুদ্বেগ! মানুষের কথা দিয়ে কি যায় আসে? তারা নাহয় পরীক্ষার পেপারে নিজেদের যোগ্যতা দেখাবে। সব শুনে নৈমি পা দোলাতে দোলাতে বলল,
–“এরমানে সে তোমায় ভালোবাসে।”
নূর বিক্ষিপ্ত মেজাজে বলল,
–“আরে ভাই কি ভালোবাসা বাসি শুরু করছোস? কবুল বললেই একটা ভালোবাসা টাইপ ফিলিং এসে যায়।”
এতক্ষণে নূরের একটা কথা বেজায় পছন্দ হলো রূপকথার। সে মৃদু হেসে বলল,
–“ঠিক বলেছো। যাকে নিয়ে আমি কখনো কল্পনাও করতে পারিনা, আজ তাকে আমার ভালোলাগে শুধু মাত্র এই শব্দটার কারণেই। আমার মনে হয়, আমার পুরো ব্যস্ততামুখর দিন আর জীবনের শেষ ঐ মানুষটার কাছে গিয়ে।”
নূর আর নৈমি স্মিত হাসল। বলল,
–“এখন আর এটাকে ভালোলাগা বলো না, ভালোবাসাই বলো। তুমি তোমার তানশানের পাপাকে ভালোবেসে ফেলেছো।”
–“আর তোমার ছেলে? সে তোমায় ভালোবাসে নাকি খারাপ ব্যবহার করে?”, নূরের প্রশ্নে রূপকথা মৃদু হেসে বলল,
–“আমার আরেকজন অভিভাবক! ভীষণ গম্ভীর, আমায় শাসন করে আবার আমার শাসন ও মাথা পেতে নেয়।”
নৈমি তাকিয়ে রইল একটা বিদঘুটে জীবনব্যবস্থার শিকার হয়েও কি করে মেয়েটি প্রাণ খুলে হাসছে!
–“তোমার কখনো অভিযোগ হয় না?”
রূপকথা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। শুধায়,
–“কার উপর?”
–“আল্লাহ তায়ালা আর তোমার পরিবার?”
–“প্রথম প্রথম হতো কিন্তু এখন হয় না।”
–“কেন?”
–“সৃষ্টিকর্তার উপর অভিযোগ করার অধিকার আমার নেই, তিনি যা করেন আমাদের ভালোর জন্য করেন। আর আমি অনেকের থেকে ভালো একটা পর্যায়ে আছি। আমায় আগলে রাখার মতো শক্তপোক্ত কেউ আছে, আর আমিও দু’জন ভঙ্গুর মানুষের জীবনকে একটু সুখময় করার সুযোগ পাচ্ছি।”, রূপকথা উদাসীন চিত্তে বলল।
–“তবে আজ থেকে একদম পাক্কা গিন্নিদের মতো সংসার শুরু করে দেবে, আর তোমার বরকেও সঠিক পথে আনবে।”
রূপকথা স্মিত হাসল। ব্রেক টাইম শেষ হলে ক্লাসের উদ্দেশ্যে যায়। তবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল দু’দিন কলেজে আসলেও ঐ বেয়ারা লোকটা তাকে বিরক্ত করতে আসেনি।
রাগে গজগজ করতে থাকা সৃজাকে জোরপূর্বক বাহুডোরে আগলে নেয় ইমরোজ। গালে হাত বুলিয়ে নম্র সুরে অনুনয় করে বলল,
–“আমায় একটু সময় দাও, জান। আমি সবটা ঠিক করে দেবো আর কিছুদিনের মধ্যে।”
–“ছাড়ো ইমরোজ! আমায় ছোঁবে না। তুমি এগুলোই বলে আসছ আজ দেড় বছর যাবৎ।”
–“এতদিন যখন ধৈর্য্য ধরেছো তখন আরেকটু ধৈর্য্য ধরো প্লিজ, সৃজা। পোরশু যশোর যাবো আমরা, আবার আমরা নিজেদের মতো সুন্দর সময় কাটাবো। তুমি কি কি শপিং করতে চাইছিলে তা সব করব। এখন রাগ করে থেকো না, আমি সহ্য করতে পারছি না তোমার থেকে দূরত্ব। তুমি জানো না আমি এই ক’দিন কত ছটফট করেছি তোমার জন্য!”
ইমরোজের অনুনয় ভরা কণ্ঠে সৃজার মন না গললেও শপিং এর কথায় ঠিকই তার মন নরম হলো। সে গম্ভীর গলায় বলল,
–“আমার সবসময় পড়ার জন্য কিছু গোল্ড এর জুয়েলারি কিনতে হবে।”
ইমরোজ তৎক্ষণাৎ হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে বলল,
–“যা কেনার প্রয়োজন কিনবে শুধু এখন একটু হাসিমুখে কথা বলো আমার সাথে।”
সৃজা প্রসন্ন হয়ে গেল। সে মৃদু হেসে হাত বাড়িয়ে ইমরোজের গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
–“আমার ও কষ্ট হয়েছে তোমার থেকে দূরে থাকতে। পোরশু কখন আমরা যশোরে যাবো? আর কতদিনের জন্য?”
–“পোরশু বিকালে, এক সপ্তাহের জন্য।”
–“নাহ, আমরা দুই সপ্তাহ থাকবো। অন্য কোথাও ঘুরতে যাবো।”
সৃজার এহেন আবদার ও ইমরোজকে মানতে হয় নতুবা রেগে যাবে।
তাদের মনমালিন্য দূর করার জন্য ক্ষীণ অন্তরঙ্গতা বাড়তেই কারোর পায়ের আওয়াজ বিঘ্ন ঘটালো। ইমরোজ গলা খাঁকারি দিয়ে দূরে সরে যায়, সৃজাও নিজের জায়গা বদলে নিলো।
ততক্ষণে বিনা অনুমতিতে তপোবন কামড়ার দরজা খুলে প্রবেশ করে। প্রবেশ করতেই তার মধ্যে কিছুটা বিরক্তি সৃষ্টি হলো সৃজাকে দেখে। এই দৃশ্য তাকে প্রায়শই দেখতে হয় মূলত বিরক্তিটা এর জন্যই। বড় ভাইজানকে দেখে ইমরোজ নিজ চেয়ারে শিরদাঁড়া সোজা করে বসে।
বড় ভাইজান কখনো নক করে কক্ষে ঢোকে না। এটা তার কাছে চরম বিরক্তিকর একটা ব্যাপার। কিন্তু কিছু বলতেও পারে না, বড় ভাই বলে। সৃজা বিনম্র কণ্ঠে তপোবনকে দেখে বলল,
–“আসসালামুয়ালাইকুম স্যার!”
তপোবন সালামের জবাব দিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
–“মিস সৃজা, আপনার কি কোন কাজ নেই? আপনি এখানে কি করছেন?”
সৃজা হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে বলল,
–“স্যার, আমি কাজ করছিলাম। কিন্তু স্যারের কাছে কিছু দরকারে এসেছি।”
কালো টাইট ফিটিং প্যান্ট, শার্ট পরিহিত সৃজার থেকে এক পলক দৃষ্টি ফেলল তপোবন। অনতিবিলম্বে সেই দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। সে কখনো কারোর পোশাক পরিচ্ছদের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না, এমনকি পরিবারের কারোর বিষয়েও না। তবে আজ আর নিজেকে দমাতে পারে না। খানিক অসন্তোষের সাথে বলল,
–“টু বি অনেস্ট! আমি আপনাকে কখনো কাজ করতেই দেখি না। বেশিরভাগ সময়ই এখানে সেখানে ঘুরতে দেখা যায়। আপনি কি ভুলে যাচ্ছেন যে আপনি একজন আর্কিটেক্ট, কোনো মডেল না। আপনি যে ধরণের পোশাক পড়েন তা আমাদের অফিসের পরিবেশের সাথে যায় না।”
সৃজার মুখশ্রী লাল হয়ে উঠল এহেন অপমানে। সে আশ্চর্য হয়ে বলল,
–“আমার ড্রেসআপে তো আমি কোনো সমস্যা দেখছি না, স্যার। এটা তো আধুনিকতার অংশ!”
আস্তিন গুটিয়ে রাখা কালো শার্ট আর কালো প্যান্ট পরিহিত তপোবন পেছনে হাত বেঁধে গুরুগম্ভীর গলায় বলল,
–“আমাদের অফিসের সকলে আধুনিক পোশাক আশাক পরে। কিন্তু তাদের মধ্যে আর আপনার মধ্যে পার্থক্যটা শালীনতা নিয়ে। আশাকরি এরপর থেকে শালীনতা বজায় রেখে পোশাক পরিধান করবেন। আর ঘোরাঘুরি না করে একটু কাজেও ফোকাস দিন।”
সৃজার চোখমুখ অচিরেই গরম হয়ে উঠেছে। কাউকে সর্বোস্ব বিলিয়ে দিয়েও দিনশেষে সেই অপমান অপদস্থ হয়ে সে থমথমে মুখে বলল,
–“স্যার, আমি কাজের উদ্দেশ্যেই ইমরোজ স্যারের কাছে এসেছি।”
তপোবন তৎক্ষণাৎ শানিত কণ্ঠে বলল,
–“আপনার কাজ ইমরোজের তত্ত্বাবধায়নে থাকা কাজগুলো করা, নাকি সারাদিন ইমরোজের সাথেই থাকা। আমি কি কিছু ভুল বললাম মিস সৃজা? আমি খুব কম সময়ই আপনাকে আপনার ডেস্কে দেখি। সবাই যেখানে কাজ করে হাঁফিয়ে উঠছে সেখানে আপনি গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরছেন। অথচ মাস শেষে বেতনটা তো আপনি সমপরিমাণই পাচ্ছেন। এতে করে তো তাদের সাথে অন্যায় হয়ে যায় তাই না?”
ইমরোজ এতক্ষণ বাদ মুখ খুললো।
–“ভাইজান আপনি ওকে এভাবে জেরা করছেন কেন? ও কাজ ছাড়া কখনো আসে না এখানে। আর আমিই এখন ওকে ডেকেছি।”
ইমরোজ ব্যগ্র কণ্ঠে বলল। চোখেমুখে তার মৃদু ক্ষোভের আভাস। আজ এতো বছর হয়ে গেল এখনো তাকে সব বিষয় নিয়ে কৈফিয়ত দিতে হয়। এটা তার ইগো হার্ট করে। সে এখন আর ছোট নয়।
ধূসর বর্ণের দৃষ্টিদ্বয় সরু হয়ে গেল। তীর্যক চাহনি ভাইয়ের দিকে স্থির রেখে তপোবন নিজ জায়গায় অটল রইল। পুনরায় সৃজার দিকে তাকিয়ে কঠোর গলায় বলল,
–“মিস সৃজা, আগামী সপ্তাহ থেকে আপনার কাজের সেক্টর চেইঞ্জ করে দেয়া হবে। আপনি মেন্টালি সেভাবে প্রস্তুতি নেবেন।”
সৃজা আর ইমরোজ আকাশ থেকে পড়ল। সৃজা অবাক কণ্ঠে শুধায়
–“অন্য সেক্টর মানে? স্যার আমি এই সেক্টরের কাজে দক্ষ, অন্য সেক্টরের কাজ কিভাবে করব?”
–“দরকার পড়লে শিখিয়ে দেয়া হবে, আর যদি না পারেন তবে চাকরি থেকে রিজাইন করে নেবেন। আমি তো আর আপনাকে ঘোরাফেরা করার বেতন দিতে পারি না।”
–“আমি ঘোরাফেরা করি? স্যার আপনার হয়তো কোথাও ভুল হচ্ছে। আমি নিজের সব কাজ যথাসময়ে সম্পন্ন করি।”, সৃজা প্রগলভ কণ্ঠে বলল।
–“আপনার কাজের গতি দেখেই আমি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আপনার দ্বিমত থাকতেই পারে। আর এর সমাধান ও রয়েছে। ইউ ক্যান রিজাইন এনি টাইম।”, তপোবন গমগমে স্বরে বলল।
ইমরোজ আর রাগ ধরে রাখতে পারল না,
–“ভাইজান আপনি বেশি বেশি করছেন। সৃজা যথেষ্ট কর্মঠ একজন মেয়ে। আমার বেশিরভাগ কাজে ওই সাহায্য করে। আর তাছাড়া আমার আন্ডারে কে কাজ করবে না করবে সেটা আমি বিবেচনা করব, আপনি না।”
তপোবনের দৃষ্টি সূচালো হয় আরো। তবে এই দৃষ্টিতে রাগের আভাস নেই। তার দ্বারা শাসন হয় কিন্তু রাগ দেখানো হয় না। সে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা সৃজার উদ্দেশ্যে বলল,
–“মিস সৃজা, আপনি এখন যেতে পারেন।”
তপোবনের আদেশ রূপি নম্র কণ্ঠে সৃজা রীতিমতো রাগে কাঁপতে লাগল। সে জ্বলন্ত দৃষ্টি ইমরোজের দিকে নিক্ষেপ করে গটগট করে বেরিয়ে গেল কামড়া থেকে।
সৃজা বেরিয়ে যেতেই তপোবন গমগমে গলায় ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বলল,
–“তুই হয়তো ভুলে যাচ্ছিস, অফিসে কাকে রাখা হবে না হবে সেটা সম্পূর্ণ আমার বিষয়। আর আমার সিদ্ধান্তের উপর আজ পর্যন্ত কেউ আঙুল তোলেনি। আব্বু পর্যন্ত নয়। সৃজা অন্য সেক্টরের কাজ আত্মস্থ করে নিয়ে কাজ করতে পারলে ওয়েলকাম, নয়তো তাকে ইস্তফা দেয়া হবে। এটা আমার শেষ সিদ্ধান্ত।”
–“ভাইজান আপনিও বোধহয় ভুলে যাচ্ছেন, আমিও এই কোম্পানির একজন ওনার। আমার অধিকার রয়েছে নিজের পছন্দ মতো কাউকে নিয়োগ দেয়ার। আর এটা বড় কোনো ইস্যু নয়। কিন্তু আপনি এটাকে এতো গুরুতর ভাবে নিচ্ছেন কেন?”, ইমরোজ রাগান্বিত স্বরে বলে। তপোবন তখনো শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইমরোজের রাগান্বিত চোখদুটোর দিকে। শান্ত স্বরেই বলে,
“গুরুতর ভাবে দেখতে হচ্ছে কারন একজন সাধারন কর্মচারীর জন্য আমার ভাই ওভার রিয়্যাক্ট করছে। তার বড় ভাইয়ের সাথে রাগ দেখাচ্ছে। আমি এটাকে এখনো এতটা গুরুতরভাবে নেয়নি ইমরোজ। আশাকরি আমার নেয়ার প্রয়োজন পড়বে না। আমার ভাইয়েরা বড় হয়েছে, তাদের ব্যক্তিগত জীবন হয়েছে। তাই আমি তাদের স্পেস দিয়েছি একদম ছেড়ে দেইনি। আমায় এই বিষয় নিয়ে দ্বিতীয় বার কথা বলতে না হয়।”
তপোবনের কঠোর কণ্ঠে ইমরোজ পাথরের ন্যায় শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তপোবন গা ঝাড়া দিয়ে লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
–“কতক্ষণ যাবৎ ডাকছিলাম আমার রুমে? কয়বার ডেকে পাঠালাম আসিসনি কেন?”
–“আমি কুকুর নই যে তুমি যখন তখন ডাকবে আর আমি জিভ বের করতে করতে ছুটে যাব। আমার নিজের ব্যক্তিগত ব্যস্ততা রয়েছে।”
ইমরোজের ক্ষিপ্ত কণ্ঠে তপোবনের ভারী কায়া ঈষৎ কেঁপে উঠল। তপোবন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল ভাইয়ের দিকে। এই কি সেই ছোট্ট ইমরোজ? যে মা যাওয়ার পর থেকে তার বুকের সাথে লেগে বসে থাকতো? শুকনো ঢোক গিললো তপোবন। এগিয়ে যায় ভাইয়ের দিকে। বড় ভাইয়ের কাছে বরাবরের জন্য আদরের এই ভাইগুলো।
চেয়ারে বসা ভাইকে কাঁধ জড়িয়ে নিজের সাথে আগলে নিয়ে শুধায়,
–“ভাইজানের উপর রাগ হয়েছে? ভাইজান যা করি তা তোদের ভালোর জন্য করি, ইমরোজ। সামান্য একটা বিষয় নিয়ে এত রাগ?”
ইমরোজ লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করে। ভুল করা যাবে না! ভাইজানের সন্দেহ হয় এমন কোনো কাজ করা যাবে না। সে গমগমে স্বরে বলল,
–“বাদ দাও ভাইজান। তুমি সবসময় তোমার মন মর্জি চালিয়ে যাবে আমি কিছুই বলতে পারব না। বললে তো উল্টো আমি বেয়াদব হয়ে যাব আব্বুর কাছে।”
বলেই সে চেয়ার ছেড়ে উঠে কামড়া থেকে বেরিয়ে গেল। তপোবন ও উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলে ভাইয়ের পথ ধরে নিজের কক্ষে প্রবেশ করে।
তপোবনের অফিস কক্ষে তখন পিনপতন নীরবতা। ভাইয়ের নত শির দেখে ইমরোজ তাচ্ছিল্য হাসল।
বড় ছেলের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা তকদির সিকদার নীরবতা ভেঙে শুধায়,
–“তপোবন, তুমি কি এখন এসে বুঝতে পেরেছো যে তোমার গুণধর ভাই ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গিয়েছে?”
তপোবন মাথা তুলে তাকায় বাবার মুখপানে। গম্ভীর গলায় বলল,
–“আব্বু, ওর সাথে খারাপ ব্যবহার না করে আমাদের উচিৎ ওকে সঠিক পথে আনার উপায় খোঁজা।”
–“ওকে আর কোনো প্রকার ভালো আচরণ দ্বারা তুমি সঠিক পথে আনতে পারবে না। এটা আমি সেদিন ই তোমায় জানিয়েছিলাম। এরোজ, একটা মিনিট ও ঐসব ছাইপাশ ছাড়া থাকতে পারে না। ওকে রিহ্যাবে দিতে হবে তারপর গিয়ে একটা ভালো মেয়ে খুঁজে বিয়ে দিতে হবে। দায়িত্ব কাঁধে না ওঠাতে ওঠাতে ও আজ এই পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে।”
তপোবন আশা ভরসার শেষ পর্যায়ে থাকায় আর কোনো উপায় পায় না। বাবার কথায় সায় জানিয়ে বলল,
–“আমি একজন সাইকিয়াট্রিস্ট এর সাথে যোগাযোগ করেছি। সে আপাতত বলেছে ওকে কোনোভাবেই একা রাখাই যাবে না। ওকে যেকোনো উপায়ে কানাডা যাওয়া থেকে আটকাতে হবে।”
ইমরোজের টনক নড়ে বাবা ভাইয়ের কথায়। সে গলা খাঁকারি দিয়ে খানিক গম্ভীর গলায় বলল,
–“তোমরা কি ভাবছো ওকে আঁটকে রেখে রিহ্যাবে দেবে? আর সেটা ঐ ষাঁড় গরু চুপচাপ সহ্য করে নেবে?”
–“এখানে আর করার মতো কিছু কি আছে যে ওকে আটকাতে সাহায্য করবে?” , তকদির সিকদার চিন্তিত কণ্ঠে বললেন।
–“উপায় তো তুমিই মাত্র বললে।”
–“কিহ?”
–“ওর বিয়ের ব্যবস্থা করো। থেকে যাওয়ার একটা রিজন ও হবে আর সঙ্গী ও হবে।”
তকদির সিকদার আর তপোবনে ইমরোজের পানে তাকায়। তকদির সিকদার চাপা আক্রোশে বললেন,
–“ওকে কেউ মেয়ে দেবে?”
–“দেবে না কেন? ওকে না দিলেও আমাদের ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড দেখে অবশ্যই দেবে। আর আমার কাছে একটা ভালো মেয়ে আছে।”
–“সত্যিই? কে? কোথায় থাকে?”, তকদির সিকদার উৎসুক কণ্ঠে শুধালো।
ইমরোজ সতর্ক কণ্ঠে বলল,
–“সৃজা আছে না? ওর ছোট বোন, খুব ভালো ওয়েল এডুকেটেড একটা মেয়ে। এরোজের সাথে খুব ভালো মানাবে। বিদেশী পরিবেশে চলার মতো একটা আধুনিক মেয়ে।”
–“আধুনিক হলে কি হবে মেয়ে ভালো?”, তপোবনের শংকিত কণ্ঠে ইমরোজ বিদ্রুপ করে বলল,
–“তোমার ভাই ভালো? নেশাখোর, বদমেজাজি সেই হিসেবে সৃজার বোন যথেষ্ট ভালো একটা মেয়ে। নেহাৎ আমি আমার ভাইয়ের ভালো চাই দেখে ওর কথা বললাম। নয়তো সৃজার বোন আরো ভালোকিছু ডিজার্ভ করে।”
তপোবন দ্বিরুক্তি করতে গিয়েও বাবার কথায় আঁটকে গেল। তকদির সিকদার গম্ভীর গলায় বললেন,
–“তোমার নিজের দিকটাও দেখতে হবে তপোবন। তোমার ভাইয়ের যা দশা তাতে আমাদের কেউ ভালো মেয়ে দেবে? সেখানে সৃজাকে আমরা বহু বছর যাবৎ চিনি আমার মনে হয় ভালোই হবে।”
তপোবনের শুধুমাত্র একটা সুস্থ স্বাভাবিক ভাইকে ফেরত চাই। সে অতিরিক্ত ভাবলো না মাথা নেড়ে সায় জানলো।
–“ঠিক আছে আব্বু। তোমরা দেখো, ভালো হলে তো আমরা কথা বলব।”
তকদির সিকদার সায় জানিয়ে বললেন,
–“তুমি তবে যশোর থেকে আসো তারপর নাহয় এই বিষয়ে কথা হবে বাড়িতে। ঐ কু”লা”ঙ্গা”র তো আবার তোমার কথা ছাড়া আর কারোর কথা শোনে না।”
ইমরোজ নড়েচড়ে উঠল। উৎকণ্ঠা নিয়ে শুধায়,
–“ভাইজান যশোর যাবে মানে? আমি সেদিন বলেছিলাম না আমি যাব?”
তকদির সিকদার নাকোচ করলেন,
–“নাহ, সবসময় তুমি যাবে কেন? তোমার পরিবার সন্তান আছে। তাদের সাথে সময় কাটাও, মৌনতার দিকে খেয়াল নাও। মেয়েটা দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে, চোখমুখ ওক এমন দেখা যায়। এর চেয়ে তুমি বরং মৌনতা আর নায়েলকে নিয়ে কোথাও থেকে ঘুরে আসো।”
ইমরোজ ফের মেজাজ হারাতে নিলো।
–“আব্বু, মৌনতা সারাদিন ঘরে থাকে ওর আবার কি হবে? নিজের যত্ন না নিয়ে সারাদিন টো টো করে বেড়ালে শরীর খারাপ তো করবেই তাই না? আর আমি এই কাজ আজ এত বছর যাবৎ করে আসছি, আমি এগুলো ভালো বুঝি ভাইজানের থেকে।”
তপোবন গাম্ভীর্যতা ভাঙল।
–“আমি এই কাজগুলো কখনো করিনা এরমানে এই নয় যে আমি এই কাজগুলো পারি না, ইমরোজ। আমি ঠিক সামলে নেবো। মৌনতা আর নায়েল সারাদিন ঘরে থাকে মানে এই নয় যে তাদের একঘেয়েমি আসে না। আব্বু যা বলছে তাই শোন, মৌনতা আর নায়েলকে নিয়ে কোথাও একান্তে ঘুরে আয়।”
বলেই তপোবন উঠে দাঁড়ায়। তানশান আর নায়েল আর্জি রেখেছে চাইনিজ খাবে, সেগুলো নিয়ে বাড়িতে যাবে।
ইমরোজ অসন্তোষের দৃষ্টিতে তাকায় বাবার দিকে।
–“এগুলো কি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না আব্বু? আমি আমার স্টাফদের বলে সব তৈরি করে রেখেছি ওখানে যাওয়ার জন্য।”
তকদির সিকদার চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে বললেন,
–“বারণ করে দাও কোনো সমস্যা নেই।”
বলেই সেও চলে গেলেন। আর ইমরোজ! পেপার ওয়েটটা ছুঁড়ে ফেলে রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে বসে রইল। সৃজাকে যে কথা দিয়েছে বেশকিছুদিন একসাথে থাকবে, আনন্দ করবে।
রাত তখন এগারোটা! এরোজকে টলতে টলতে উপরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠে। সোফায় বসা নির্জনা বেগম এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেই দিকে। কিয়ৎকাল বাদ জবাকে বলল,
–“লেবুর শরবত বানিয়ে রেখেছিস?”
জবা ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলল,
–“তার ঘরে রাইখা আইছি।”
–“খাবারটা একটু উপরে দিয়ে আসিস, যদি ইচ্ছা হয় তবে খেয়ে নেবে।”
–“আচ্ছা চাচি।”
নির্জনা বেগম চলে যেতেই জবা মুখ বাঁকিয়ে বিড়বিড় করে,
–“ঠ্যাকা পড়েছে নাকি জমের গুহায় যাইবো। না খাইয়ে থাকুক!”
এরোজ টলতে টলতে নিজের ঘরের পথে হাঁটছিল তন্মধ্যেই দূরন্ত গতিতে ছুটন্ত এক ছোট্ট দেহ তার পায়ে বেঁধে পড়ে গেল। সহসা এরোজের টলমলে চিত্ত নড়ে উঠল বাচ্চা বাচ্চা কণ্ঠে বিকট আর্তনাদে।
এরোজ ঝাঁপসা নেত্রে তাকায় পড়ার সাথে সাথে চিৎকার করে কেঁদে ওঠা নায়েলের পানে।
–“মাম্মাআআআ! বুবু!”
এরোজ কপাল কুঁচকে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে মেঝেতে গড়িয়ে পড়া নায়েলকে তুলে নিলো। ক্রন্দনরত নায়েল হকচকিয়ে গেল এরোজকে দেখে। ফের কেঁদে উঠল,
–“মাম্মাআআআ ভয় পাইইইই!”
কর্ণকুহরে সেই ভয়ার্ত আর্তনাদ মৃদু প্রদাহ সৃষ্টি করলেও এরোজ নির্বিকার শান্ত স্বরে বলল,
–“চিৎকার করো না নায়েল। কোথায় ব্যথা পেয়েছো ছোট পাপাকে বলো।”
নায়েল অস্থির চিত্তে এদিক ওদিক তাকায় ঘরভরতি মানুষ কাউকে দেখতে না পেয়ে অসহায় দৃষ্টিতে সরে যেতে নিলো। কিন্তু এরোজ তার হাত ধরে আঁটকে দেয়। ক্রন্দনরত ডাগর ডাগর নেত্রপানে নিজের লালচে নিভু নিভু দৃষ্টি স্থির রেখে নরম সুরে বলল,
–“কোথায় ব্যথা পেয়েছো আমায় বলো।”
নায়েল কান্না থামিয়ে সতর্ক দৃষ্টি ফেলল এরোজের মুখপানে। মৃদু হেঁচকি তুলতে তুলতে বলল,
–“আমি তোমায় ভয় পাই।”
–“ভালো।”
এরোজ মৃদু হেসে তার পা দেখতে লাগল। নায়েল ফের বলল,
–“তুমি আমাল পাপাকে মালতে চেয়েছো আমাল মনে আছে।”
কোথাও গুরুতর ব্যথা পায়নি নায়েল। কিন্তু মেঝেতে আচমকা পড়ায় ব্যথা পেয়েছে। এরোজ ক্ষীণ নিঃশ্বাস ফেলে মেয়েটির পানে তাকায়। ক্ষীণ কণ্ঠে বলে,
–“স্যরি।”
বাম হাতে চোখ মুছে নিলো নায়েল। শুধায়,
–“তুমি কি গুড বয় হয়ে গিয়েছো? লাগ কমে গিয়েছে? আর কাউকে ভয় দেখাবে না?”
এরোজ শান্ত দৃষ্টি ফেলে শুধায়,
–“এমনটা কখন বললাম?”
নায়েল বাঁকা চোখে চেয়ে বলল,
–“সুন্দল কলে কথা বলছো যে?”
এরোজ স্মিত হাসল তার কথায়। তার কৌতুহল উপেক্ষা করে বলল,
–“আর ছোটাছুটি করবে না, নয়তো আবার পড়ে যাবে।”
–“তোমার মুখ থেকে পঁচা গন্ধ আসছে।”
এরোজ এবার বিরক্ত হয়ে গেল।
–“তুমি ব্যথা পাওনি? ব্যথা ছাড়া তোমার সব মনে আছে।”
নায়েল পায়ের পানে তাকায়। টলমলে চোখে চেয়ে ব্যথিত সুরে বলল,
–“বুবু পেয়েছি।”
এরোজ কপাল কুঁচকে শুধায়,
–“বুবু কি?”
–“ব্যতা!”
অদ্ভুত সব কথায় এরোজ স্মিত হাসল। কিছু বলতে যাবে তার আগেই কেউ ছুটে এসে নায়েলকে কোলে তুলে নিলো। মৌনতা এরোজের পানে ভয়ার্ত দৃষ্টি ফেলে হড়বড়িয়ে শুধায়,
–“কি হয়েছে মা? কাঁদলে কেন? কেউ কিছু বলেছে? বকা দিয়েছে?”
নায়েল না বোধক মাথা নাড়লো। আহ্লাদী কণ্ঠে বলল,
–“লাগী পাপার পায়ের সাথে ধাক্কা খেয়ে পলে গিয়েছি। বুবু পেয়েছি!”
মৌনতা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। মেঝেতে বসা বিরক্তিকর লোকটির দিকে এক পলক দৃষ্টি ফেলে দ্রুত পায়ে সেখান থেকে চলে গেল। যেতে যেতে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
–“বুবু সেরে যাবে, মা। মাম্মা আদর করে দেবো।”
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২৯ (২)
নায়েল মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে কাঁধে শুয়ে পড়লো। টুকুর টাকুর দৃষ্টি এঁটে আছে তখনো মেঝেতে বসে থাকা এরোজের পানে। একটাসময় এরোজ দৃষ্টি সীমানায় হারিয়ে গেল।
আর এরোজ? মেঝেতে বিছিয়ে রাখা কার্পেটের উপর এঁটে থাকা নির্নিমেষ ধূসর দৃষ্টি একটা সময় ভীষণ ঝাঁপসা অনুভব হলো। বদনে ছুঁয়ে যাওয়া অলসতা ভেঙে নড়েচড়ে উঠল এরোজ। সহসা টপ করে কিছু একটা গড়ালো। যেগুলো লুকাতে লুকাতে বদন আজ ভীষণ ক্লান্ত! অন্তঃস্থলে জমা ব্যথাগুলো বইতে বইতে আজ সে ভীষণ ক্লান্ত। কে জানে সৃষ্টিকর্তা কখন এই ক্লান্তির উপসংহার কবে টানবে!
