Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২
তোনিমা খান

বাবা হয় একটা মেয়ের জন্য দূর্ভেদ্য এক সুরক্ষা বলয়। যেটা টপকে কেউ ঐ মেয়েটিকে স্পর্শ করতে পারে না, অসম্মান করতে পারে না। সমাজে একটি মেয়ের মাথা উঁচু করে বাঁচার কারন হয় বাবা। যার বাবা আছে তার জন্য সমাজ, পৃথিবী হয় সুরক্ষিত। আর যার বাবা নেই তার জন্য সমাজ, পৃথিবী হয় অরক্ষিত। যে কেউ এসে তাকে নোংরা কথা বলতে কুন্ঠা বোধ করে না, বাজে স্পর্শ দিতে ভয় পায় না, নিচু করতে ভয় পায় না। আজ যদি রূপকথার জীবনে বাবা নামক শক্ত এই ঢাল থাকত— তবে কি কেউ কখনো সাহস পেতো সদ্য যৌবনে পা দেওয়া মেয়েটির জন্য এক বিপত্নীক সন্তান সমেত পাত্রের জন্য বিবাহের প্রস্তাব দিতে? পারতো না।

স্বামী নামক মানুষটির জন্য নিলীমা’র অন্তরালে জমে থাকা ঘৃণা গুলো দ্বিগুণ হারে বাড়তে লাগলো। মানুষটা তার কথা নাহয় না-ই ভাবলো কিন্তু একটাবার কেনো ভাবলো না তার দু’টো কন্যা সন্তান রয়েছে। তার অবর্তমানে যদি তার সন্তানদের কেউ ছিঁড়ে খায় তবে? অসম্মান করে? এই একটা ভয় কি বাবা নামক ঐ মানুষটির মনে কখনো উঁকি দেয়নি? শুনেছে মেয়েরা নাকি বাবার প্রাণ হয়, এগুলো তো সব মিথ্যা কথা। এগুলো শুধু বইয়ের পাতাতেই মানায়, বাস্তবে নয়। বাস্তবে তো বাবা’র কতোশত ঘৃণ্য রূপ দেখা যায়।
বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন ব্যস্ত সড়কের ফুটপাত থেকে এলোমেলো অলস পায়ে হাঁটছে নিলীমা এবং শুকতারা। মায়ের মলিন, নির্জীব মুখটি দেখে শুকতারা মাথা নিচু করে নেয়। চোখদুটো অশ্রুসিক্ত তার। মাঝেমধ্যে খুব ইচ্ছা হয় আল্লাহ যদি তাকে একটা জাদুর কাঠি দিতো তবে সে মায়ের সব দুঃখ দূর করে দিতো। নিজেদের জন্য একটা দৈত্যাকার দালান তৈরি করত, কারি কারি টাকা উৎপাদন করত, অনেক অনেক সুস্বাদু খাবার তৈরি করত, ঐ দুষ্টু লোকদের জাদুর কাঠি দিয়ে জাদুর দ্বারা পিটিয়ে পিটিয়ে পশ্চাৎদেশ লাল করে দিত। কত্তো মজা হতো তাহলে? মলিন হাসলো শুকতারা আল্লাহ কে অনেক বলেছে কিন্তু আল্লাহ কখনোই তাকে জাদুর কাঠি দেয়নি, আর না দূর করেছে মায়ের কষ্ট। আল্লাহ’র কাছে কি তার কথা পৌঁছায়নি? শত শত প্রশ্ন ছোট্ট মনটিতে। তবুও একটাই চাওয়া তার মায়ের সব দুঃখ দূর হয়ে যাক, তারা আর পাঁচটা মানুষের মতো আনন্দের সহিত বাঁচতে চায়।

হাঁটতে হাঁটতেই নির্জন গলিতে ঢুকলো নিলীমা। বাসস্ট্যান্ড থেকে বিশ মিনিটের দূরত্বে তাদের ঘর। এই রোডে অনেকক্ষণ পর পর একটা দুটো দোকান পাওয়া যায়।কিছুদূর হাঁটতেই নিলীমার পা দুটো কেমন শক্ত হয়ে আসে। অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা নিশাচরে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করা মাতালগুলোকে দেখে। বরাবরের মতো নিজেকে শক্ত করে যেমন চলাফেরা করতো আজো তেমনি চোয়াল শক্ত করে মাথা নিচু করে হাঁটা ধরলো। ভেসে আসলো বি’শ্রী ভাষায় কিছু গান। গা গোলায় নিলীমা’র। নিলীমা দ্রুত পা চালায়। তবে নিরব এই শুনশান রাস্তা যেন তাদের আরো বেপরোয়া ক্ষিপ্ত করে তুললো। কালো তেলতেলে কাটা ছিঁড়ে মুখশ্রী’র ছয় জনের মধ্যে একজন মাঝবয়সী লোক হেলেদুলে এসে পথ আঁটকে ধরল নিলীমার। শুকতারা লেপ্টে গেলো মায়ের সাথে। নিলীমা শক্ত করে জড়িয়ে নেয় মেয়েকে। সাথে থাকা কাপড়ের ব্যাগটি থেকে মরিচের গুঁড়া করা বোতলটি লোকটির অগোচরেই আঁকড়ে ধরল ছিপি খোলার প্রয়াসে। কঠোর গলায় লোকটির উদ্দেশ্যে বলল,

–“আমার পথ থেকে সরে দাঁড়ান।
লোকটি ফিচলে হেসে উঠলো খিকখিক করে। হাসতে হাসতেই সে খপ করে নিলীমার হাতটি আঁকড়ে ধরল। নিলীমা চমকে উঠল। বদনে কম্পন সৃষ্টি হলো পরপরুষের ছোঁয়ায়। এর আগে কখনোই লোকগুলো এমন সাহস দেখায়নি। সে গর্জে উঠে হাত মুচড়ে ছাড়িয়ে নিতে যায়,,
–“হাত ছাড়ুন নয়তো আমি চিৎকার করব।”
এহেন কথায় সকলে সমস্বরে হেসে উঠলো। লোকটি কন্ঠে আক্ষেপ নিয়ে বলল,,
–“সবসময় এইডি ই কও ক্যান? কহনো তো কইতে পারো হাতটা শক্ত কইরা জড়াইয়া ধরো আর সাথে আমারেও। তোমার মাইয়ার আইজ রেজাল্ট দেবে না? মিন্টু গেছে‌ তোমার মাইয়ারে ঠিকঠাক ভাবে ঘরে পৌঁছাইয়া দিতে। ” বলেই তারা পুনরায় হেসে উঠলো।
নিলীমা’র বুকটা ধক করে উঠলো আ’ত’ঙ্কে। এই মিন্টু এক উন্মাদ! যে কিনা কথাকে পাওয়ার জন্য ইদানিং বেপরোয়া হয়ে উঠছে। নিলীমা দ্রুত হাত ছাড়িয়ে নিতে চায়, কথার কাছে যেতে হবে‌। কিন্তু পারেনা দৈত্যের ন্যায় পুরুষালী ঐ শক্তির কাছে সে কিছুই না।

–“কথা’র মা, তোমার আর তোমার মাইয়ার রূপ তো দিনদিন বাড়তাছে তরতর কইরা এর কারণ কি কও তো? নাকি এই রূপ দেখাইয়া আমগো জ্বলন আরো বাড়াইয়া মজা নিতাছো। অনেক তো হইলো এইবার রাজী হইয়া যাও। একলা জীবনযাপন কতো কষ্টের আমারা বুঝি! তাই তো তোমার কষ্ট কমাইতে চাইতাছি। এতো জেদ করে না। আমরা তোমাগো মা মাইয়ার কষ্ট দূর করুম আর তোমরা আমাগো শরীরের জ্বলন দূর করবা। রাজী হইয়া যাও। দুইপক্ষের সম্মতি থাকলে তৃপ্তি বেশি পাওয়া যায়। আমরাও তৃপ্তি পাইতে চাই, তাই তো এতো অপেক্ষা। আইজকা রাইতে আসলে খুশি খুশি দরজা খুইলা দিও নয়তো কিন্তু আইজ দরজা ভাইঙা ঢুইকা যামু।”
লোকটির ঘৃণ্য সংলাপ শেষ হতে পারলো না, তার আগেই লালচে জ্বালাময়ী ছোট এক লহরী লোকটির নয়নদ্বয় ঝলসে দিল। চোখে অসহনীয় জ্বলন সইতে না পেরে, লোকটি গগনবিদারী চিৎকার করে উঠল। মাটিতে পড়ে চোখ চেপে ধরে যন্ত্রনায় ছটফট করছে সে। লোকটির সঙ্গী রুপি বাকি প”শু”রাও ততক্ষণে ক্ষিপ্র গতিতে এগিয়ে আসে। হুঙ্কার ছাড়ে,,

–“মা***মা** তগোরে আইজ খাইয়া ফালামু। আমগো সাথে লাগতে আছোস?”
পুরুষালী বিকট চিৎকারে ধীরে ধীরে কিছু লোক জমা হলো। কয়েকজন লোক এসে তড়িঘড়ি করে শুধায়,,
–“এই এইখানে হইছে কি?
নিলীমা চোয়াল শক্ত করে মেয়েকে নিজের সাথে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাত পা মৃদু কাঁপছে তার। সে চোখ তুলে তাকায় লোকগুলোর দিকে, সাথে কিছু মহিলাও রয়েছে। সে ঢোক গিলে বলল,
–“ওনারা আমায় বিরক্ত করছিল, আমায় বাজেভাবে ছোঁয়ার চেষ্টা করছিল। ”
–“মিথ্যা কথা ভাইজান। এই মহিলারে চেনেন না, আস্ত এক বা”রো”ভা”তা”রি। স্বামী নাই নিজেই এইসব কইরাই জীবন চালায়, আবার আমরা কিছু কইলে আমগো উফর দোষ চাপাইয়া দেয়।” তন্মধ্যে একটা ন”র”প”শু”র ক্ষিপ্ত কন্ঠে বললো।

–“সেইটাই তো‌, আমরাও তো এই রাস্তা দিয়া চলাফেরা করি সবসময়; কই মিন্টু গজা ওরা তো সবসময় আমগো দেখলেই সালাম দেয়। তাহলে তোমাগো দেখলে এমন করিবো ক্যান? নিশ্চয়ই তোমাগো কোন হাত আছে। ভালো মানুষের সাথে তো আর ওরা এমন করিবার সাহস পাইবো না। দেখো গিয়া এইসব ন*ষ্টা মহিলাগোই দোষ; যেই আমগো মত ভালো মানুষ দেখছে অমনি সহানুভূতি নিতে চাইতাছে। ” উৎসুক জনতার মাঝ থেকে একজন নারীর মুখ থেকে এই কথা শুনে নিলীমা নির্বাক অবাকপানে তাকিয়ে রইল ঐ নারীর দিকে। নারী হয়ে নারীর বিপদে পাশে দাঁড়ালো না, তাকে বোঝার চেষ্টা করল না, বরং সুযোগ পেতেই সেও তাকে অপমান করে দিল।
–“আমারো তেমনি মনে হইছিল, ভালো ঘরের মহিলাদের সাথে তো আর এমন করবে না ওরা। আর তেজ দেখছো? মরিচ গলানো পানি ছুঁড়ে মেরেছে। এই তেজ দেখিয়েই এরা এমন জীবনযাপন করে।”
গায়ের ভর ছেড়ে নিলীমা তখনো নিরুদ্বেগ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো সমাজে উচ্চ শ্রেণীর মানুষগুলোর নিচু চিন্তাভাবনা। সমাজের প্রত্যেকটা মানুষই কি এমন? তাহলে তো একদিন এই প”শু গুলো তাদের ছিঁড়ে খেলেও, তারা বলবে পশুগুলোকে তারাই নিমন্ত্রণ জানিয়েছিল! তাদের কিছু হয়ে গেলেও কারোর কিছু যায় আসবে না, কেউ হয়তো একটা দুটো সহানুভূতিশীল বাক্য ছুঁড়বে আর বেশিরভাগ লাঞ্ছনা ছুঁড়বে। আরক্তবদন, বিবশ হয়ে গেল নিলীমার মস্তিষ্ক।

ছোট্ট এই ঘটনাটি তাকে এতোটুকু শিক্ষা দিল, পৃথিবীতে কোন মানুষ কারোর জন্য নয়। এই সমাজ তাদের জন্য নিরাপদ নয়, তার কথা’র জন্য ও নিরাপদ নয়।
মনের জোর দিয়ে আর কতোদিন চলবে? সে যেভাবেই জীবনযাপন করুক না কেন, তার কাছে যখন সুযোগ রয়েছে কথা’কে এই অভিশপ্ত জীবন থেকে মুক্ত করার তবে সে কেন করবে না? কোন মা না চায় তার মেয়েটা ভালো থাকুক। মেয়েকে পড়ালেখা করিয়ে অনেক বড় একজন ডাক্তার বানাবে, নিজের মনের এই সুপ্ত বাসনা’র জন্য কি সে মেয়েটিকে বিপদে ঠেলে দেবে? প্রতিনিয়ত এমন ভয়ের সাথে জীবনযাপন করতে দেবে? না না, কখনোই না। কথাকে মুক্তি দিতে হবে এই অভিশপ্ত জীবন থেকে। ক্ষীণ সময়ের ব্যবধানেই নিলীমা সমাজের অক্ষরজ্ঞানহীন টিপিক্যাল সেই বিকৃত চিন্তাধারী মায়েদের মতো চিন্তা করতে লাগলো। যেই বিকৃত চিন্তা হলো মেয়েকে, বিয়ে দিয়ে দিলেই মেয়ে নিরাপদে থাকবে‌। মেয়ের জীবনের সকল সমস্যা দূর হয়ে যাবে। নিজের‌ ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়েই নিলীমা এক কঠিন; সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো।

জড়ো হওয়া লোকজন/ একজন আরেকজনের কথা শুনে তাদেরকেই দোষারোপ করছে। আর গজা তার দিকে হিংস্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে‌। যেই দৃষ্টি কোন ভালো সংকেত বহন করে না। তবে এই দৃষ্টি’র কোন বিরূপ প্রভাব সে তার কথার উপর পড়তে দেবে না। সে সকলের বাঁকা দৃষ্টি উপেক্ষা করে পা ঘুরায় উল্টোদিকে, যেই পথে এসেছিলো। দ্রুতপায়ে ফের উল্টোপথে ছুটলো নিলীমা। শুকতারা আশ্চর্য হলো মাকে পুনরায় ঐ পথে যেতে দেখে।
–“আম্মা আমরা আবার ঐ পথে যাচ্ছি কেনো? শুকতারা মায়ের হাতটি আঁকড়ে ধরে শুধায়।
নিলীমা দ্রুত কদম ফেলতেই থাকে। মেয়ের দিকে না তাকিয়েই চোখের পানি মুছে সে জবাব দেয় ,,
–“তোর বুবুকে এই অভিশপ্ত জীবন থেকে মুক্তি দিতে।”
শুকতারা বুঝলো না মায়ের কথার অর্থ। সে নিরবে মায়ের সাথে পা মেলাতে লাগলো।

–“আমি রাজি ভাবিজান।
নাতিকে ডাক্তারের কাছে রেখে সদ্যই বসার ঘরে বসেছিল মেজো গিন্নি এবং বড় গিন্নি। আচমকা নিলীমার আগমন এবং এহেন কথায় দু’জনে ই মৃদু থমকালো। মেজো গিন্নির চোখেমুখে খেলে গেল অপ্রকাশিত খুশির উজ্জ্বলতা।
নীলিমা হাতের মুঠো শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে। হ্যাঁ, এটাই তার ক্ষণকাল পূর্বের নেওয়া সেই কঠিন সিদ্ধান্ত। চোখের সামনে নিজের মেয়েকে সম্ভ্রম হারা হতে দেখার চেয়ে কারোর দ্বিতীয় স্ত্রী হয়ে বাঁচা, কারো সৎ মা হয়ে বাঁচা ও তার কাছে শ্রেয় মনে হলো। একাধিক পশুদের হাতে লাঞ্ছিত হয়ে মরার চেয়ে, অল্পবয়সে সংসারের টানাপোড়েনে মরা অধিক আরামের মনে হলো নিলীমার কাছে। সংসার, সমাজ, মানুষের তৈরি অদ্ভুত নিয়ম আর জীবনযুদ্ধের কাছে হেরে যাওয়া এক মা নিলীমা। সৃষ্টির সেরা জীব হয়েও পৃথিবীতে নিজের তুচ্ছ এই অবস্থান দেখে, পৃথিবীটা বড্ডো নিকৃষ্ট ঠেকলো নিলীমার কাছে।
বড় গিন্নি সরু চোখে তাকায় নিলীমার দিকে। গুরুগম্ভীর গলায় অনাদরে শুধায়,

–“কিসের জন্য রাজি?
–“তপোবন সিকদারের সাথে আমার মেয়ের বিয়ের জন্য রাজি।” নিলীমা দৃঢ় কন্ঠে বললেও কন্ঠনালী তার কেঁপে উঠল। সে মেয়ের সামনা কীভাবে করবে অন্তস্থলে তার ই প্রস্তুতি চলছে।
বড় গিন্নির ভেতরে চাপা উদ্বেগ দেখা গেল। মেজো জা এর আন্দাজে ছোঁড়া ঢিল যে এভাবে লেগে যাবে তা সে ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি। সে অপ্রস্তুত হয়েই শুধালেন,
–“আপনি কি বলছেন ভেবে বলছেন তো? পরে আবার বলবেন না এটা আপনার জেঁকের বশে নেওয়া সিদ্ধান্ত।
–“অবশ্যই ভেবেচিন্তে ই নিয়েছে ভাবিজান। বিয়ে তো কোন ছেলেখেলা নয় যে হুটহাট সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।” মেজো গিন্নি ব্যগ্র কন্ঠে বললেন।

–“আমাকে কথা বলতে দে মেজো।”
বড় গিন্নি গম্ভীর গলায় বললেন। মেজো গিন্নি আলাভোলা হেসে চুপ করে গেলো। বড় গিন্নি পুনরায় শুধালেন,
–“শুনেছি আপনার মেয়ের বয়স কম, তা আপনার মেয়ে এই বিয়েতে রাজি হবে? আমার বিরাট সংসার। তপোবন আমার বড় ছেলে। হিসেব মত সে আমার বাড়ির বড়ো বউ হবে সে। চাট্টিখানি কথা নয়! বিশাল দায়িত্ব! তা কি আপনার মেয়ে নিতে পারবে? আমার তপোবনের জন্য একজন বুঝ ব্যবস্থা সম্পন্ন মেয়ে প্রয়োজন। যে কি-না তার এবং আমার সংসারের হাল ধরতে পারবে শক্ত হাতে। নেহাৎ-ই আমার মেজো জা আমার বিনা অনুমতিতে আপনাকে প্রস্তাবটা দিয়ে ফেলেছে, নয়তো আমি কখনো এমন মেয়েকে আমার ঘরের বড় পুত্রবধূ হিসেবে মানতাম না। তার একটা সম্মান রয়েছে সেটি রক্ষার্থেই আমি আপনার সাথে কথা বলছি। আপনি বুঝে দেখুন আপনার মেয়ে আমার ছেলে আর তার সংসার শক্ত হাতে গড়তে পারবে কি-না। আমি কোন ঝামেলা চাই না। উঠতি বয়সী মেয়েদের মন থাকে উরু উরু। কিন্তু আমি এমন একজন মেয়ে চাই যে স্বামীর আনুগত্য থাকবে, স্বামীকে সংসারমুখী করার যোগ্যতা রাখে।”

কথার মাঝেই সূক্ষ্ম এক নিচু জাতের খোঁচা নিলীমা সন্তপর্নে হজম করে নিলো। তপোবন সিকদারের মহত্ত্ব, নম্রতা সম্পর্কে সে অবগত তাই-ই তার এই পদক্ষেপ। সে এতটুকু অন্তত নিশ্চিত তপোবন সিকদার মাঝপথে তার মেয়ের হাত ছেড়ে দেবে না। আর সংসার জীবনে যুদ্ধ? এটা কোন মেয়ের না থাকে? মেয়ে হয়ে জন্মালে সংসার জীবনের যুদ্ধ লড়তেই হবে তাতে উঁচু জাত আর নিম্ন জাত নেই। সকলকেই লড়তে হবে, তার রূপকথাও ব্যাতীক্রম নয়। তাকেও লড়তে হবে শুধু সময়টা একটু আগে পড়ে। সে দৃঢ় কন্ঠে মাথা নেড়ে বলল,,
–“ও ছোট, সংসার জীবন সম্পর্কে অজ্ঞ। আপনি যদি হাতে কলমে বুঝিয়ে নেন— তবে অবশ্যই পারবে।”
পরিপ্রেক্ষিতে বড় গিন্নিকে আরো গম্ভীর দেখাল। সে ভাবনায় বিভোর, ঘোর ভাবনা। তপোবনকে কি করে রাজি করবে? এদিকে তো সব ঠিকঠাক হয়ে গেল। সে চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে বললেন,,

–“আমি শিঘ্রই আপনাকে জানাব, নিজের মেয়েকে প্রস্তুত রাখবেন। আমার বাড়ির বউদের কাছে স্বামী সংসার সকল কিছুর উর্ধ্বে, সকল কিছু। এই বিষয়টা মেয়ের মাথায় ঢুকিয়ে দেবেন। এখন আসতে পারেন। ”
নিলীমা সালাম জানিয়ে বেরিয়ে যায় সেখান থেকে। নিলীমা যেতেই মেজো গিন্নি হেসে উঠে উৎসুক কণ্ঠে বললেন,,
–“ভাবিজান দেখিছেন, আমি বলেছিলাম না আমার চাল বৃথা যাবে না। মাইয়া অনেক সুন্দর, তেমনি নম্র ভদ্র একদম মায়ের মতোন গুনী।
বড় গিন্নি চিন্তায় বিভোর হয়েই ধিমি কন্ঠে বললেন,,
–“কিন্তু বয়স কম মেজো। এইসব মেয়েদের চাহিদা অন্যরকম থাকে। সংসারে যদি মন না দেয়?
–“আরে ভাবিজান আপনি বয়স নিয়া চিন্তা কইরেন না। এই কম বয়সী মেয়েদের আপনি হাতে গড়ে নিতে পারিবেন। মাটির মতোন, যেমন রূপ দেবেন তেমন আকার ধারন করিবে। আর তপোবন মিষ্টভাষী, নম্র ভদ্র একটা কম বয়সী মেয়ে জীবনে আসলে ও সংসারে আগ্রহী হবে। একবার বিয়ে হলে ভালোবাসা এমনিতেই হয়ে যাবে। আমরা কি চেনা জানা ছাড়া বিয়া করিনাই? মিল মহব্বত হয়নাই? বাচ্চা কাচ্চা হয়নাই? ওদের ও হবে দেখিবেন।
–“কিন্তু সমস্যা টাই তো সেখানে, তপোবনকে রাজি করাবো কিভাবে? আজ পর্যন্ত কি কম চেষ্টা করলাম? তবে এখন কেন রাজি হবে?

–“ওরে‌ রাজি করাইতে হইবো ভাবিজান, যেভাবেই হোক। অল্পবয়সী মাইয়া তপোবনের বেরঙ দুনিয়াটা রঙিন কইরা তুলবো, আমার কথা মাথায় রাইখেন। এই মাইয়া হাতছাড়া করা যাইবো না ,খাটি সোনা! ”
মেজো গিন্নি রসিয়ে রসিয়ে বললেন। বড় গিন্নি মাথা নেড়ে সায় জানায়। মেজো গিন্নি প্রাণখোলা হাসলেন।
অসহায়ত্বের সুযোগ নেওয়া কয়েকজন পশুর ভয়ে, আরেকজনের কাছে সমাধান নিতে এসেছিলো একজন অসহায় মা। অথচ সমাধানের নামে এখানেও যে তার অসহায়ত্ব’র সুযোগ নেয়া হয়েছে তা‌ কি বুঝলো নিলীমা? হয়তো বুঝেছে, আবার বোঝেনি! কেননা বুঝে তো লাভ নেই, দুটোই যে নিরূপায়! দুদিকেই মরন! একদিকে সম্ভ্রম আর‌ প্রাণের মরন। আরেকদিকে সদ্য যৌবনে পা দেওয়া একটা মেয়ের মনে প্রেমময় এক সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা এবং পড়াশুনা করে প্রতিষ্ঠিত হয়ে মায়ের দুঃখ নিরসনের বাসনার মরন। অর্থ, সামাজিক অবস্থান, উঁচু জাত, পুরুষ মানুষের শক্ত, দূর্ভেদ্য আশ্রয় যে কতোটা গুরুত্বপূর্ণ জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার জন্য— তা বেশ অনুধাবন করতে পারছে নিলীমা, রূপকথা আর শুকতারা। ধিক্কার সমাজ আর সমাজে বসবাসরত মানুষের তৈরি নিকৃষ্ট সব নিয়মনীতিগুলোকে!

তকদির সিকদার পরপর দু’বার এমপি হিসেবে নির্বাচিত হন। নাম ডাক অর্থবিত্তের কমতি নেই। তবে তার যতোই নাম ডাক থাকুক না কেন, তার ছেলেমেয়ারা ঠিক তার উল্টো। বাবা রাজনীতিবীদ হলেও তারা রাজনীতি বিমুখ। তকদির সিকদার তিন ছেলে এবং এক মেয়ের জনক। বড়ো ছেলে তপোবন সিকদার, মেজো ছেলে ইমরোজ সিকদার, সেজো ছেলে এরোজ সিকদার এবং সর্বশেষ ছোট মেয়ে রোজ সিকদার। পরিবার সমেত খুলনা শহরে থাকে। সেখানে বাড়ি ব্যাবসা রয়েছে। বড় দুই ছেলে বাবার কোম্পানি পরিচালনায় নিয়োজিত থাকলেও, তপোবনকে বাধ্যতামূলক ভাবেই একটু আধটু রাজনীতিতে জড়াতেই হয়। বাবার বড়ো ছেলে এবং বাবার বয়স হওয়ায় এই গুরুভার আপনাআপনি তার উপর এসে পড়েছে। অনীহা সত্ত্বেও তাকে এই গুরুভার বইতে হয়। জীবনের প্রথম বয়সেই পড়াশোনা চলাকালীন দীর্ঘদিনের প্রেমের আকস্মিক এক পরিনতি হিসেবেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল তপোবন সিকদার। তবে সৃষ্টিকর্তার মর্জি অন্য কিছু থাকায় সেই পথচলা দীর্ঘায়িত হয়নি। বিয়ের চার বছরের মাথায় তিন বছরের ছেলে সন্তান রেখে পরোপার গমন করে তপোবনের স্ত্রী।

দ্বিতীয়বারের মতো প্রেগন্যান্ট ছিল, তবে সেই প্রেগনেন্সি ছিলো জটিল। এতোটাই জটিল যে জীবন তাকে দ্বিতীয়বার সুযোগ দেয়নি। সেখানেই সমাপ্তি ঘটে তপোবনের বৈবাহিক জীবনের। সেখান থেকেই তপোবনের সিঙ্গেল ফাদারের দায়িত্ব পালনের শুরু। দেখতে দেখতে আজ এগারোটি বছর পার হয়ে গেলো। তিন বছরের সেই সন্তানটি এখন অনেক বড় হয়ে গিয়েছে। এবং বরাবরের মত এবার ও ক্লাসে ফার্স্ট হয়ে নিউ টেনে উঠেছে তপোবন সিকদারের একমাত্র ছেলে তানশান সিকদার। নবম শ্রেণীর পরীক্ষা শেষে দেশের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল, পনেরো দিন হলো। আগামীকাল চলে যাবে।
দ্রুতকদমে পথ পেরিয়ে সদ্যই নির্দিষ্ট কামরার সামনে নিজের গতি শ্লথ করে ব্যক্তিটির দৃষ্টি গিয়ে সোজা আটকায় বিছানার উপর বসে থাকা ছেলের ব্যাথাতুর মুখটির দিকে। দৃষ্টি ম্লান হয়, আলতো ক্রোধ, ক্ষোভ ছুঁয়ে যায় দৃষ্টিদ্বয়। ছিলে যাওয়া হাঁটুতে ডাক্তারের দিয়ে যাওয়া মলমটি লাগাচ্ছিলো তপোবনের মেজো ভাইয়ের স্ত্রী মৌনতা। মলম লাগতেই তার জ্বলনে চোখমুখ কুঁচকে নেয় তানশান। তপোবন এগিয়ে যায় কামড়ার ভেতরে। মৌনতা মুখ তুলে তাকায় ভাসুরের গম্ভীর থমথমে মুখটির দিকে। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ছেলের ব্যান্ডিজরত দুই হাতের দিকে। সে ইতস্তত করে বলল,

–“ভাইজান আসলে ওর কোন দোষ নেই। বাচ্চারা সকলে কমলা খেতে চাইছিল….
–“বাকিটা আমি লাগিয়ে দিচ্ছি মৌন, তুমি যাও নায়েলকে দেখো ও বাইরে একা।”
ব্যাগ্র কণ্ঠে কথাটি বলেই তপোবন মৌনতাকে থামিয়ে দিয়ে তার হাত থেকে মলমটা নিয়ে নিলো। বাবাকে দেখতেই তানশান গুটিয়ে গেলো নত মস্তকে।
মৌনতা আঁচল তুলে ধীরপায়ে বেরিয়ে যায় ইশারায় তানশানকে আশ্বাস দিতে ভুললো না। পৃথিবীতে এই একজন মানুষের কোনপ্রকার আঘাত ভাইজান সহ্য করতে পারে না। তাতে যদি তানশান নিজের দোষেও আঘাতপ্রাপ্ত হয় তবুও তাকে বাবার রোষের তোপে পড়তে হয়।
মৌনতা বেরিয়ে যেতেই তপোবন সোজা এসে হাঁটু গেড়ে বসে তানশানের সামনে। পড়নের শর্টসটিকে অতি সাবধানে আরো গুটিয়ে দেয়। ডান হাঁটু ছিলে রক্তাক্ত মাংস দৃশ্যমান হয়ে আছে। সেদিকেই কিয়ৎকাল তাকিয়ে থাকে তপোবন। অতঃপর সে মলমটা হাতে নিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর গলায় অনাদরে শুধায়,

–“কমলা গাছে কি করছিলে?”
বাবার এই কন্ঠটি গা ছমছমে লাগে তানশানের কাছে। বাবা যখনি ভয়ঙ্কর রেগে থাকে তার গলার স্বর এমন ভারী শোনায়। তানশান নত মস্তকে অস্ফুট স্বরে বললো,
–“কমলা পারছিলাম।
–“মালি ছিল না?” বিরতিহীন বাবার প্রশ্নে ক্রোধের আভাস তীব্র।
–“ছিল, কিন্তু আমি ইচ্ছে করেই গাছে উঠতে গিয়েছিলাম।
–“তুমি গাছে উঠতে পারো?”
হাতের মলমটির ছিপি লাগিয়ে তপোবন চোখ রাখে ছেলের চোখে।
তানশান সন্তপর্নে চোখ সরিয়ে নেয় জ্বলন্ত সেই চোখদুটোর থেকে। নির্বাক না বোধক মাথা নাড়লো সে।
–“তাহলে কোন সাহসে গাছে চড়তে গিয়েছো তুমি?” সরব তপোবনের হুঙ্কারে চকিতে আড়ষ্টতা ভাঙলো তানশানের। দৃষ্টি সচকিত হয়। তবুও চুপ করে অপরাধীর ন্যায় বসে রইল। তপোবনের ক্রুব্ধ দৃষ্টি ঝলসে দিচ্ছে ছেলের নত মস্তক। তানশান আড়চোখে একবার তাকিয়েছিল পরবর্তীতে আর তাকায় নি। কিয়ৎকাল বাদ সে মিনমিন করে বললো,,

–“গাছ থেকে ফল পেরে খাওয়ার আনন্দ-ই আলাদা হয়। আর তাছাড়া আমাদের সবকিছু শেখা উচিৎ ভবিষ্যতে কাজে দেবে।”
–“তুমি কি ভবিষ্যৎ এ মানুষের গাছে চড়বে? ফের বাবার ক্রুব্ধ কন্ঠে ছোঁড়া প্রশ্নে তানশান তড়িঘড়ি করে না বোধক মাথা নাড়লো। তপোবন থমথমে মুখে বলল,,
–“তাহলে নিজের ভবিষ্যত পরিকল্পনার দিকে মনোযোগ দাও, পড়াশুনায় মনোযোগী হও। গাছে চড়া শেখার প্রয়োজন নেই।
–“ওকে পাপা।”
তানশান মলিন মুখে বলে বাধ্যগত ছেলের মতো মাথা নাড়লো। তপোবন উঠে দাঁড়ায়। পাঞ্জাবির পকেট থেকে ফোনটি বের করে‌ অন করতেই মৌনতার পাঠানো আঘাতপ্রাপ্ত দু’টো হাতের রক্তাক্ত ছবি ভেসে উঠল। এটা দেখেই ছুটতে ছুটতে এসেছে। কমলা গাছের কাঁটা’য় দু’টো হাতের চামড়া লম্বাকৃতি ভাবে ছিঁড়ে গিয়েছে। বুকের ভেতরে অসহনীয় ব্যাথার অনুভব হলো। সেই তিনবছরের মা হীনা ছেলেটিকে ঠিক মাটির পুতুলের মতো আলতো হাতে গড়ে তুলেছে সে। মা-বাবা উভয়ের দায়িত্ব পালন করেছে।
কখনো কোন আঘাত ছুঁতে পারেনি। মা না থাকার কমতিটাকেও যতোটুকু পেরেছে পূরণ করেছে। তবুও অদেখা এক অপূর্ণতা তো থেকেই যায়। তাই দিনশেষে এতো কষ্টের ফলস্বরূপ সে নিজের এই অংশটিকে সুস্থসবল হাসিখুশি দেখতে চায়, না-কি এমন আঘাতপ্রাপ্ত ব্যান্ডেজরত অবস্থায়।
সে ছবিটি সরিয়ে রেজাল্ট কার্ডের ছবিটি বের করে এগিয়ে দেয় ছেলের দিকে। থমথমে মুখে বলে,

–“ফার্স্ট হয়েছ। কোন বিষয়ে কত নাম্বার পেয়েছ দেখে নাও। কোনটাতে কম পেয়েছ সেটাও দেখে নাও। এরপর থেকে ঐ বিষয়ে সময় বেশি দেবে। আর দশ মিনিট পরে নিচে বাগানে আসবে।
বলেই তপোবন লম্বা লম্বা পা ফেলে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। তানশান নিরুদ্বেগ রেজাল্ট কার্ড দেখতে লাগল। ফার্স্ট হয়েছে এই নিয়ে বিন্দুমাত্র খুশি দেখাগেল না তার মাঝে। পড়াশুনা শুরু করেছে থেকেই প্রতিটা ক্লাসে ফার্স্ট হয়ে আসছে। এর জন্যই এই বিষয়টি এতোটা মূল্যহীন তার কাছে। সবাই বলে সে নাকি বাবার প্রতিরূপ। দেখতেও বাবার মত, কাজে- কর্মে, আচার আচরণে, অভ্যাসে সবকিছুতে বাবার মত। এমনকি পড়াশুনায় ও বাবার অবিকল! আর এই পড়াশুনাই তার জীবনের একমাত্র মানে। সে এই বিষয়টিতে দারুণ আগ্রহ খুঁজে পায়।
–“তানশান বাবা, তপোবন ভাইজান তোমারে ডাকতিছে বাগানে।
দরজায় দাঁড়ানো কাজের মহিলা উচ্চ স্বরে বলল। তানশান কপাল কুঁচকে তার দিকে তাকায়। বিরক্তি নিয়ে তাকে বলল,

–“আপনি কি একটু আস্তে কথা বলতে পারেন না, ফুপি? এতোটুকু দূরত্বে আমি স্পষ্ট শুনতে পাবো আপনার স্বাভাবিক কণ্ঠ।
মহিলা লজ্জিত ভঙ্গিতে হাসলো। এক গাল হেসে বলল,,
–“এইডাই আমার স্বাভাবিক কন্ঠ বাবা। কাম করতে আইলে এমন হাঁক ছাইড়া কথা কইতে হয় দেইখা এমন হইয়া গেছে কন্ঠ।
তানশান ডানে বামে মাথা নেড়ে বাবার ফোনটা রেখে ধীরপায়ে উঠে দাঁড়াল। হাঁটতে গেলে পায়ে মৃদু ব্যাথা অনুভব হচ্ছে। সে ধীরস্থির পা চালিয়ে বলল,
–“আচ্ছা চলুন।
তানশান ধীরপায়ে বাগানে এসে দাঁড়ালে চোখেমুখের মলিনতা উবে গিয়ে মুগ্ধতা ভর করলো। এই মুগ্ধতা আজকের নয় বহু বছরের। সেই ছোটবেলা থেকে সে বারংবার মুগ্ধ হয়ে আসছে বাবার কাজে, কথায়, ভাবনায় সবকিছুতে। বাবা নামক মানুষটাই আস্ত এক মুগ্ধতা তার জন্য। কমলায় পরিপূর্ন ডালটিকে দড়ি বেঁধে নিচে নামিয়ে ধরে রেখেছে দুইজন মালি। আর তপোবন প্লাস্টিকের একটা ঝুড়ি হাতে দাঁড়িয়ে আছে কমলা গাছের নিচে। তানশান বাবার কাছে এগিয়ে যেতেই তপোবন থমথমে মুখে হাতের ঝুড়িটা এগিয়ে দেয় ছেলের দিকে। থমথমে গলাতেই বলল,,
–“গাছ থেকে ফল পাড়ার যতো আনন্দ অনুভব করে নাও।
তানশানের মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে প্রফুল্ল চিত্তে বাবার হাত থেকে ঝুড়িটা নিয়ে দালানের দিকে তাকিয়ে হাঁক ছাড়ল,

–“নায়েলললল, এসো গাছ থেকে কমলা পারব।
সাথে সাথেই দালানের ভেতর থেকে চার বছরের একটি বাচ্চা মেয়ে দৌড়ে বের হয়ে আসল। ফর্সা আদল হাস্যোজ্জ্বল মুখ পড়নে একটা জাম্প স্যুট। তপোবনের মেজো ভাই ইমরোজের একমাত্র মেয়ে নায়েল। সে ছুটতে ছুটতে এসে থামলো ভাইয়ের সামনে। হাঁফাতে হাঁফাতে শুধায়,
–“ভাইজান, কমলা পালতে পালবে তুমি?
তানশান হাসিমুখে মাথা নাড়লো।
–“হু পারব দেখো গাছ আমাদের কত কাছে।
মূলত নায়েল-ই জেদ করছিল গাছ থেকে কমলা খেতে চাওয়ার। বোনের ইচ্ছা পূরন করতেই সে গাছে চড়তে গিয়েছিল কিন্তু একটাও পারতে পারেনি তার আগেই পড়ে গিয়েছে। বাগেরহাট শস্য ,ফল ফলাদি উৎপাদনে সমৃদ্ধ। এখানে সকলে মাছের ঘের, ফার্ম, কৃষিকাজে বেশি আগ্রহী। তপোবনদের ও তিনটা মাছের ঘের আছে ,ফার্ম আছে, কৃষিক্ষেতে নিজস্ব ফসল, সবজি হয়।
–“এসো আমি তোমায় কোলে তুলি আর তুমি কমলা পারো, ঠিক আছে?
নায়েল একগাল হেসে প্রবল উৎসাহে ঘাড় দুলিয়ে বললো,

–“ঠিক আছে।
তানশান হাসিমুখে বোনকে কোলে তুলতে গেলে তপোবন বাঁধ সাধে। গম্ভীর গলায় ছেলেকে বলল,
–“আমি নিচ্ছি ওকে, তুমি পারো।
তপোবন কোলে তুলে নেয় নায়েলকে। নায়েল লাফিয়ে পড়ে একটা কমলা খপ করে ধরল। তপোবন সাবধানী কন্ঠে বলল,
–”মা, কাঁটা আছে। শুধু ফলটা ধরো ডাল’টা ধরো না।
–“আচ্ছা বলো পাপা।”
নায়েল হাসিমুখে বললো। তার “ল” উচ্চারণ করতে মহা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। দুই ভাইবোন হাস্যোজ্জ্বল মুখে গাছ থেকে কমলা পারতে লাগলো। ছেলের মুখের মলিনতা দূর হয়ে হাসি ফিরতেই তপোবনের মুখে স্মিত হাসি ফুটে উঠল। দিনশেষে ছেলের এই হাসিটুকুই তার একমাত্র অর্জন! তার বেঁচে থাকার কারণ! যেদিন এই হাসিমুখটা চলে যাবে সেদিন সে কারোর কাছে অপরাধী হয়ে যাবে। যেটা সে কখনো হতে দেবে না।

রূপকথা কলেজ থেকে বাড়ি ফিরেই আনন্দিত কণ্ঠে মাকে ডাকলো। তবে মায়ের সাড়া পাওয়া গেল না। শুকতারা দরজা খুলে দিতেই রূপকথা বোনকে উৎফুল্লতা নিয়ে বলল,
–“তারা জানিস আজ কি এনেছি?”
শুকতারা মলিন মুখে শুধায়,
–কী?
রূপকথা দরজা আঁটকে ঘরে ঢোকে। হাতে অজশ্র সেলাই যুক্ত কলেজ ব্যাগটির কোনমতে আঁটকে রাখা চেইনটি খুলে দুই প্যাকেট দশ টাকা দামের নুডুলস বের করলো। সেটি দেখতেই শুকতারার মলিন মুখটিতে আনন্দের দেখা মিলল। সে অবাক কন্ঠে শুধাল,
–“বুবু, নুডুলস? এতো টাকা পেলি কোথায়?
দশ টাকার এক প্যাকেট নুডুলস। আর পাঁচটা ছেলে মেয়ের জন্য জাতীয় খাবার হলেও তাদের জন্য বিরল এক বিলাসীতা। আম্মা যখন অনেক অর্ডার পায় তখনি দু এক প্যাকেট খাওয়া হয়। রূপকথা প্রগাঢ় হেসে নুডুলস দু’টো বোনের হাতে দিয়ে বলল,

–“আম্মা কলেজে যাওয়ার সময় দুই তিন টাকা দিতো না! সেগুলো জমিয়ে এনেছি। ঘরে ডিম আছে? আম্মা কোথায়? তাকে রান্না করতে বল।”
–“ডিম তো নেই, বুবু। গত সপ্তাহে চারটা ডিম এনেছিল আম্মা তা তো অনেক আগেই শেষ।” শুকতারা ছোট মুখে বলল। নুডুলসের মজা ডিমের সাথে রূপকথার মুখটিও ছোট হয়ে গেল। তবুও জোরপূর্বক হেসে বলল,
–”কোনো সমস্যা নেই এগুলো পানি দিয়ে রান্না করে খেলেও ভালো লাগে। টিভিতে দেখায় না স্যুপি নুডুলস? ওগুলোর মতো লাগে। আজকে আমরা স্যুপি নুডুলস রান্না করে খাবো।”
–“কিহ! ঐ টিভির বাচ্চাগুলোর মতো স্যুপি নুডুলস? শুকতারার কণ্ঠে বিস্ময়।
–“হু হু।
–“ওহ্ বুবু, মজা হবে। আমরাও স্যুপি নুডুলস খাবো।”
–“আম্মা কোথায় তারা? আম্মাকে তো দেখছিনা।”
বলেই রূপকথা রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যেতে চায় কিন্তু শুকতারা তার হাত টেনে ধরল। এতক্ষণের চেপে রাখা সেই আ’ত’ঙ্ক জর্জরিত কথাটি মনে পড়তেই সে তড়িঘড়ি করে ফিসফিসিয়ে বলল,,

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১

–“বুবু, তোর সাথে কথা আছে শোন।”
–“হু, কী বল?
–“আম্মা তোর বিয়ে ঠিক করেছে বুবু।” আচমকা প্রবল অনাকাঙ্ক্ষিত এই কথাটিতে রূপকথার চঞ্চলতা উবে গেল। সে থমকে তাকায় তারার দিকে। অপ্রস্তুত কন্ঠে শুধায়,,
–“এসব কী বলছিস, আমার বিয়ে? কার সাথে? যতসব উল্টাপাল্টা কথা।”
–“না না সত্যি বুবু! ঐ সিকদার বাড়ির বড়ো ছেলে আছে না, অনেক বড়লোক তারা। তার সাথে বিয়ে ঠিক করছে।”
রূপকথা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল বোনের দিকে। মস্তিষ্কে সদ্যই ভর করল সিকদার বাড়ির বড় ছেলে, মানে তপোবন সিকদার নামের এক বয়স্ক লোকের প্রতিচ্ছবি; যাকে প্রায়শই বিলবোর্ডে দেখে বাবা’র পাশে হাস্যোজ্জ্বল মুখে বসে থাকতে।

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩