অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৪
তোনিমা খান
সময় বড্ডো অদ্ভুত এক বাস্তবতা! যেই বাস্তবতার পালাবদলে বদলে যায় কারোর গোটা এক জীবন।
যেই মেয়েটির বয়সটা ছিল নিজেকে গড়ার, আবেগ-অনুভূতিগুলোকে জানার, রঙিন দুনিয়া চেনার— সেই মেয়েটি এখন চব্বিশ ঘন্টা ফুলটাইম মায়ের দায়িত্ব পালন করছে হাসিমুখে।
তপোবন যাওয়ার পর থেকে তানশানের শান্ত জীবন ঝঞ্ঝাটময় বানিয়ে রেখেছে রূপকথা। মিনিটে মিনিটে মাতৃসুলভ সেই অত্যাচারে তানশান অজস্রবারের মতো বিরক্তি মিশ্রিত দৃষ্টি ফেললো রূপকথার মুখপানে।
–“আমার হাত আছে আমি খেয়ে নেবো, আপনি নিজের খাবার খান।”
রূপকথা ও পাল্টা গম্ভীর মুখে বলল,
–“তুমি নিজের হাতে খেলে তো মাছ দিয়ে খাবে না। তাই চুপচাপ মুখ খোলো, নয়তো তোমার পাপার কাছে ছবিগুলো পাঠাচ্ছি আমি। দেখুক তার ভোলাভালা শান্ত ছেলে কত সুন্দর মেয়ে পটাতে পারে।”
তানশান হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকায়।
–“মেয়ে পটানো? ছিঃ এইসব বাজেকথা আপনার মাথাতেই আসতে পারে। আমি সুনেহরাকে পটাইনি, আর না ওর সাথে আমার কোনো প্রকার কথা হয় কখনো। তো এইসব লেইম কথা বলবেন না।”
–“বাহ্, নাম তবে সুনেহরা? সুন্দর নাম!”
রূপকথা দাঁত কেলিয়ে বলল। তানশান ডানে বামে মাথা নাড়ে। গম্ভীর গলায় বলল,
–“আমি মাছ খাইনা। আপনি মাছ সরান।”
–“আমি মাছ খেতে বলিনি তো, মাছ ভর্তা খাবে। একদম তোমার পাপার মতো বানিয়েছি। সে যা যা দিয়ে যেভাবে বানায় সেভাবেই বানিয়েছি। খেয়ে দেখো”
–“সেটাই আমি পাপার হাতে বানানো মাছ ভর্তা ছাড়া আর কারোর হাতের খাইনা।”
–“তুমি খাবে তোমার বাপ ও খাবে, পাজি ছেলে। খাও নয়তো আমি তোমার পাপাকে পাঠাচ্ছি রোমান্টিক চুমুময় চিকুটগুলো।”
তানশান মাথা হেঁট করে টেবিলে বসে রইল। চোখেমুখে তার লজ্জা অস্বস্তি। কখনো ভাবেনি জীবনে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হবে। মিমি নিশ্চয়ই তাকে খারাপ ভাবছে। তার চেয়েও বড় কথা হলো এইগুলো যদি বাসার কেউ জানে তবে সে কখনো চোখেচোখ রাখতে পারবে না কারোর সাথে। নিজের ওপর রাগ হয় তানশানের। না চাইতেও সে উপভোগ করে সুনেহরাকে আর তার কার্যক্রমকে। যেটা তার গন্তব্য আর ব্যক্তিত্বের জন্য মানানসই নয়।
মৌনতা, নির্জনা বেগম আর রোজ চোখ পিটপিট করে দেখে ফুসুরফুসুর করতে থাকা দুই অদ্ভুত সম্পর্কধারীকে। দু’জনকে দেখলে বোঝার উপায় নেই দু’জন সৎ মা- ছেলে। মনে হয় যেন বন্ধু!
রোজ চঞ্চল কণ্ঠে শুধায়,
–“কি হয়েছে বড় ভাবি?”
পরপরই তানশানের উদ্দেশ্যে বলে,
–“এই রোবোটের বাচ্চা খাচ্ছিস না কেন?”
তানশান রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকায় ফুপির পানে। দাদুর কাছে বিচার দিয়ে বলে,
–“দেখো দাদুমনি কি বলছে তোমার মেয়ে।”
নির্জনা বেগম কঠোর চোখে তাকায় রোজের দিকে। ধমকে উঠে বলে,
–“ভাইয়ের ছেলেকে কেউ এভাবে বলে? দিন দিন বেয়াদব হয়ে যাচ্ছো রোজ।”
রোজ মুখ বাঁকিয়ে খেতে শুরু করলো। তানশান বেজায় বিরক্ত হয়ে হা করলো। সহসা রূপকথার ঠোঁট বেঁকে যায়। সে মাছের ভর্তা দিয়ে ভাত মেখে মুখে তুলে দিলো। তানশান চোখমুখ কুঁচকে কোনোরকম গলাধঃকরণ করতে নিলে মজাদার স্বাদ অনুভব হলো। একদম বাবার মতোই মাছের ভর্তার স্বাদ পেয়ে তানশান আড়চোখে তাকায় রূপকথার পানে। রূপকথা ভ্রু নাচিয়ে শুধায়,
–“কি কেমন? ভালো লাগছে?”
তানশান থমথমে মুখে বলল,
–“বাজে লাগছে।”
রূপকথা দুঃখি চেহারা নিয়ে বলল,
–“আহ্, খারাপ লাগলেও কিছু করার নেই। তোমাকে তো এই বাজে স্বাদের মাছ ভর্তা দিয়েই ভাত খেতে হবে। নয়তো জানোতো কি হবে?”
তানশান হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে। মৌনতা মিটিমিটি হেসে দেখে দু’জনকে। অবাক হয় রূপকথার মতো ছোট্ট মেয়েটিকে এত কম সময়ে এই জটিল গুরুভার বইতে দেখে।
নির্জনা বেগম ও অবাক হলেন, শুধু মাছের ভর্তা দিয়েই তানশানকে দুই প্লেট ভাত খেতে দেখে। রূপকথা চোখ পিটপিট করে তাকায় অতি ধুরন্ধর ছেলেটির পানে। মাত্র বলল বাজে লাগছে অথচ খাচ্ছে তো খাচ্ছেই; থামাথামির নাম নেই।
ঠিক দুই প্লেট ভাত শেষ হতেই রূপকথা সতর্ক কণ্ঠে শুধায়,
–“আর খাবে?”
তানশান আড়চোখে চেয়ে মিনমিনে স্বরে বলল,
–“আর অল্প একটু ভাত নিন।”
রূপকথার চোখেমুখে চাপা উচ্ছ্বাস। ধুরন্ধর ছেলেটি কি জানে মায়েরা সব বোঝে? সে আরো এক প্লেট ভাত নিলো আর তানশান ও নীরবে তিন প্লেট ভাত খেয়ে উঠল। রূপকথা হাসিমুখে প্লেট হাতে রান্নাঘরে যায় হাত ধুতে।
তানশান খেয়েদেয়ে উঠতে গেলে অনুভব করলো, সে আর নড়তে পারছে না। সে অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো মৌনতার দিকে। মৌনতা মিটিমিটি হেসে শুধায়,
–“কি হলো আব্বু, খাওয়া বেশি হয়ে গিয়েছে? নড়তে পারছো না?”
তানশান পান্তুর মুখে না বোধক মাথা নাড়লো। সহসা রোজ আর মৌনতা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল,
–“আজ তানশান বেশ জব্দ হয়েছে তার মিমির কাছে।”
–“হেসো না তোমরা।”, তানশান রেগে বলল। রোজ আর মৌনতা সহসা মুখে আঙুল চাপলো। কিন্তু উপচে পড়া হাসি আটকাতে তারা দু’জন ই ব্যর্থ হয়। মুখে আঙুল চেপেই তারা আবার খিক খিক করে হেসে উঠল তানশানের ফোলানো মুখ দেখে। তানশান অতিষ্ঠ হয়ে বলল,
–“তোমরা সবাই পাজি। অসহ্য!”
বলেই সে ধুপধাপ পা ফেলে দোতালায় চলে গেল। নির্জনা বেগমের আনত মুখেও মৃদু হাসি ফুটে উঠল চঞ্চল তানশানকে দেখে। তপোবন ব্যতীত তানশানকে এতটা চঞ্চল, যত্নে দেখা যায় না। বুকের ভার কমলেও রূপকথার প্রতি বিরূপ মনোভাব দূর হয় না।
রূপকথার প্রতি এই শোধ তানশান রাতে ঠিক-ই নিলো। সন্ধ্যার নামাজ শেষে তখন রূপকথা চার হাত পা ছড়িয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে। কিন্তু তার শান্তিতে নিদারুণ বিরক্তি ঘটিয়ে কেউ নক করে দরজায়।
রূপকথা সোজা হয়ে বসে বলল,
–“ভেতরে আসুন।”
তানশান দরজা খুলে উঁকি দেয়। বলে,
–“আপনার পড়াশুনা নেই?”
রূপকথা ভদ্র মেয়ের মতো বলল,
–“আর আধা ঘন্টা পর বসবো।”
–“এখুনি বসবেন। বই খাতা নিয়ে আমার ঘরে আসবেন এখনি।”, তানশান থমথমে মুখে বলল। রূপকথা কপাল কুঁচকে বিরোধ করে বলল,
–“এখন ইচ্ছা করছে না আধা ঘন্টা পর আসি।”
–“আপনি আসবেন না-কি আমি পাপাকে ফোন দেবো?”
সে কি ভয়ঙ্কর হুমকি! রূপকথা মুখ বাঁকিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। অলস কণ্ঠে বলে,
–“আসছি।”
–“ফিজিক্স আর কেমিস্ট্রি নিয়ে আসবেন।”, তানশান বলেই বের হতে গেলে চোখে বাঁধে দরজার পাশে অবস্থারত বাবার ডেস্কের উপর থাকা একটি মেডিক্যাল রিপোর্ট। এটা তার মাম্মার। সে কৌতুহলী দৃষ্টি ফেলে এগিয়ে গিয়ে রিপোর্টটি হাতে নেয়।
সৃষ্টিকর্তা মায়ের যতটুকু স্মৃতি তার কাছে অবশিষ্ট রেখেছে তা এত বছর যাবৎ তারা বাবা ছেলে ভীষণ যত্নে আগলে রেখেছে। তাই মায়ের সবকিছু তানশানের আদ্যোপান্ত মুখস্থ! এমনকি মায়ের মেডিক্যাল রিপোর্টগুলোও। কত রাত পড়ে পড়ে দেখেছে মায়ের রোগের নামগুলো! যেগুলো একদিন তার মাথার উপর থেকে মায়ের ছায়া কেড়ে নিয়েছে।
রিপোর্টটি খুলতেই পরিচিত রোগের লক্ষণ দেখে শুধায়,
–“মাম্মার রিপোর্ট এখানে কি করে আসলো? এটা তো আমার কাছে ছিল।”
তানশানের প্রশ্নে বই গোছাতে ব্যস্ত রূপকথা ফিরে তাকায়। ম্লান হেসে বলল,
–“ওটা আমার রিপোর্ট।”
–“আপনার? এটা কি করে হতে পারে?”, তানশান অবাক হয়। রূপকথা ভ্রু নাচিয়ে শুধায়,
–“কেন কি হয়েছে?”
তানশান অপ্রস্তুত অভিব্যক্তি লুকিয়ে নিলো। ধাতস্থ কণ্ঠে শুধায়,
–“আপনি কি অসুস্থ?”
–“একটু, তেমন কিছু না।”, রূপকথা মিহি স্বরে বলল। কিন্তু তানশান তখনো আশ্চর্যের রেশ কাটাতে পারছে না। এই রিপোর্ট অবিকল মায়ের একটা রিপোর্টের সাথে মিলে যায়।
–“কি হয়েছে? কি ভাবছো?”, রূপকথা এগিয়ে এসে শুধায়। তানশান না বোধক মাথা নাড়লো। ধিমি কণ্ঠে বলল,
–“পড়তে আসুন।”
বলেই সে দ্রুত বের হয়ে যায়। রূপকথা কাঁধ ঝাঁকিয়ে নিজেও পাছে পাছে তার ঘরে যায়।
পৃথিবীতে সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ হলো চরিত্রহীন ব্যক্তি! জীবনের তীক্ত অভিজ্ঞতা গুলো এটাই এরোজকে মনেপ্রাণে মানতে বাধ্য করেছে। মূলত ঠিক এই কারনেই এরোজ খুব একটা পছন্দ করে না ইমরোজকে। যুবক বয়সে পদার্পণ করতেই ইমরোজের মাঝে এই প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। নারী সঙ্গ ব্যতীত ইমরোজের চলত না। তাকে এই পথ থেকে ফিরিয়ে আনতেই তপোবন আর নির্জনা বেগম সংসারী, স্বামীভক্ত সুন্দর একটি মেয়েকে ইমরোজের বউ করে আনে। যেন সে ঘরমুখো হয়। আর সেই অভিশপ্ত জীবনে পদার্পণ ঘটে মৌনতার। জীবনে একজন চরিত্রহীন ব্যাক্তি স্বামী হিসেবে পাওয়া আর জাহান্নামের মাঝে খুব একটা পার্থক্য নেই। বিয়ের পরপর ইমরোজের মাঝে অনেক পরিবর্তন আসে। সংসার স্ত্রী এর মাঝে মনোযোগী হয় সে। সন্তানের প্রতি আগ্রহ বাড়ে তার। তবে ইমরোজের মাঝে বাহিরমুখো হওয়ার প্রবনতা কমে গেলেও একদম পিছু ছাড়েনি।
রাত হলে এরোজের আড্ডার জায়গা হয় নিউমার্কেটের আশেপাশে অন্ধকার অলিগলিতে বা রোডসাইড টং এর দোকানে। সাথে থাকে স্কুল জীবন থেকে কলেজ জীবন পর্যন্ত বন্ধুরা। তবে আজ তারা একটু খোলামেলা জায়গায় রয়েছে তারা। নিউমার্কেটের বাইরে একটা রোড সাইড জনমানবপূর্ন জায়গায়। নিউমার্কেট এড়িয়া বরাবরই জমজমাট থাকে।
চেয়ারে গা এলিয়ে বসা এরোজ বাঁকা চোখে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নিজের সামনের চেয়ারে বসা এক ছোটভাইয়ের ঠোঁটে চেপে রাখা সিগারেটের দিকে। চোখেমুখে রাগ, অস্থিরতা!
সে আশা রাখে আজও নায়েল তারকাছে ঘুমাতে আসবে। তাই আজও কোনোপ্রকার ক্ষতিকর জিনিসে হাত দেয়নি। এমনকি নিজেকে কন্ট্রোল করার জন্য সঙ্গীসাথীদের ও ধরতে দেয়নি।
এরোজ নিজের ওপর জোর খাটিয়ে উত্তেজনা দমিয়ে রাখলেও তার সঙ্গীরা পারেনি। কয়েকজন না পেরে বদ অভ্যাসের জোরেই সিগারেট ধরিয়েছে।
নিজেকে দমাতে দমাতে বারংবার চোখা দৃষ্টিতে দেখলো এরোজ। একটাসময় তার উত্তজনারা মাত্রা ছাড়িয়ে গেল। সে রেগে দিলো ছেলেটির মাথায় একটা চাপড়। ক্ষুব্ধ হয়ে বলল,
–“একটু কন্ট্রোল হয় না, তাই না? শা*লা*র চেইন স্মোকার!”
বলেই সে ক্ষিপ্ত হাতে ছেলেটির হাত থেকে সিগারেটটা ছিনিয়ে নিলো। আর ঠোঁটে চেপে উন্মাদের মতো ফুঁকতে লাগলো। ছেলেটি তখনো তব্দা খেয়ে তাকিয়ে রইল। বাকি সবার ওষ্ঠকোনে চাপা হাসি। তারা কেউ কেউ এরোজের সমবয়সী আবার কেউ কেউ জুনিয়র আবার কেউ সিনিয়র। তবে তাদের প্রত্যেকের সুসম্পর্ক রয়েছে।
এরমধ্যে সকলের চাকরি রয়েছে পরিবার রয়েছে।
তাদের আড্ডার মাঝেই কেউ একজন ক্ষিপ্ত গতিতে হামলে পড়লো এরোজের উপর। এরোজ চোখমুখ কুঁচকে বিরক্তি নিয়ে তাকায় হামলাকারী রূপী বন্ধুর দিকে। খেকিয়ে উঠে বলল,
–“আমাকে তোর বউ পেয়েছিস? এসেই এমন গায়ে পড়ছিস কেনো?”
সৈকত এরোজের বাহু চাপড়ে বলল,
–“রাগ করিস কেন? এত দিন পর দেখা হলো কোথায় বুকে জড়িয়ে নিবি তা না করে বিরক্ত হচ্ছিস।”
এরোজ পাত্তা না দিয়ে সিগারেটে সুখটান দিতে দিতে শুধায়,
–“ঢাকা থেকে আসলি কবে?”
–“এসেছি অনেকদিন! আম্মা আর বাবু অসুস্থ ছিল তাই বের হতে পারিনি। আজ সময় পেলাম আর তোর কাছে চলে আসলাম।”
–“ওহ্।”, এরোজ অনাগ্রহে ছোট্ট করে জবাব দেয়। সৈকত তার বাহু জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করে,
“এমন করছিস কেন? কোথায় সুন্দর করে হাসিখুশি মনে কথা বলবি। তা না এমন গম্ভীর মুখে কথা বলছিস।”
–“মুড নেই!”, এরোজের গা ছাড়া কণ্ঠে সৈকত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই রূপ কি আজকের? বিগত ছয় বছর যাবৎ এমনি মনমরা, উগ্র রূপ দেখে আসছে। পুরোনো সেই দুষ্টু, চঞ্চল এরোজটা হারিয়ে গিয়েছে। তারা গল্পে মগ্ন হয়। কথোপকথনের এক পর্যায়ে সৈকত বিকৃত কণ্ঠে বলে,
–“তোর ভাইয়ের কি খবর? তার নাটবল্টু কি এখনো ঠিক হয়নি?”
দ্বিতীয় নাম্বার সিগারেটটা ধারতে ধরাতে এরোজ শুধায়,
–“কিসের নাটবল্টু? কোন ভাইয়ের কথা বলছিস?”
–“আরে ইমরোজ ভাই। তোর ভাইদের মধ্যে একজনই আছে যার নাটবল্টু ঢিলা।”
–“তার খবর আমায় কেন জিজ্ঞাসা করছিস?”
–“তোর ভাই, তোকে জিজ্ঞাসা করব না? তার বউ বাচ্চার কি খবর?”
এরোজ উদাসীন হয়। ম্লান হেসে বলে,
–“ওর কথা জিজ্ঞেস করিস না, ওর সুখ দেখে তোরাও বিস্মিত হয়ে যাবি। সৃষ্টিকর্তার ভান্ডারে যত সুখ ছিল সব ওকেই দিয়ে রেখেছে।”
–“তবে এত সুখ রেখে বাইরে মুখ দেয় কেন? নাকি সুখ সহ্য হচ্ছে না?”
এরোজের হাত থামে। নাসারন্ধ্র থেকে বিষাক্ত ধোঁয়া বের করতে করতে শুধায়,
–“কী?”
সৈকত তীর্যক মন্তব্য করে বলল,
–“সে কি ঘরে পদ্মার ইলিশ রেখে পদ্মা নদীতে জাল ফেলতে গিয়েছিল?”
এরোজ চোখ মুখ কুঁচকে নেয় ফের ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কথা বলায়। বিরক্ত হয়ে শুধায়,
–“কি সব উল্টাপাল্টা কথা বলছিস?
সৈকত সয়তানি হাসি দিয়ে বলল,
–“ইমরোজ ভাই মনে হয় পদ্মার পাড়ে ইলিশ মাছ খুঁজতে গিয়েছিল।”
এরোজ এবার ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। ক্রুব্ধ কণ্ঠে বলে,
–“কথা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে না বলে ঠিক করে বল। আর তুই সবসময় ওকে নিয়ে পড়িস কেনো? এসেছিস, অন্য বিষয়ে দু’টো কথা বলবি।”
–“আমি কি করলাম? সে প্রতিবার আমার সামনেই পড়ে। আর আমি বলবো না?”
এরোজ থমথমে মুখে বলল,
–“যা বলার সোজাসাপ্টা বল।”
সৈকত বলল না কিছু। পকেট থেকে ফোন বের করে একটা ছবি বের করে সেটা এরোজের দিকে বাড়িয়ে দেয়। এরোজের দৃষ্টি সংকুচিত হয়ে আসে পদ্মা ব্রীজের উপর কিনারায় পাশাপাশি এক যুগলকে দেখে।
–“এটা কে?”
–“এটা তোর ভাই না? চিনতে পারছিস না?”
দু’জনের মুখ দেখাযাচ্ছে না কিন্তু ভীষণ অন্তরঙ্গতার সাথেই একে অপরকে আগলে দাঁড়িয়ে আছে।
সে সৈকতরের দিকে তাকায়।
–“এটা যে ইমরোজ তা বুঝলি কি করে?”
–“আমি চলন্ত বাসে বসে দেখেছি কিন্তু আমি শিওর এটা ইমরোজ ভাই। জুম করে দেখ।”
এরোজ ছবিটি জুম করে এবং মুহুর্তেই তার দৃষ্টি থেকে উদাসীনতা সরে যায়, দেহের আদলে সাময়িক মনে হলো এটা ইমরোজ। একটা মেয়ের কোমড়ে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এরোজ হাঁসফাঁস অরে উঠল পুরোনো সেই যন্ত্রনাদ্বায়ক স্মৃতি আবারো উজ্জীবিত হতেই। দিনের পর দিন মায়ের জন্য তরপাতে থাকা ছোট্ট এরোজের যন্ত্রনাময় দিনগুলোতে ভেসে উঠলো ছোট্ট নায়েলের মুখটি। কেমন ছটফট করে উঠলো এরোজ। মুখশ্রী ঘেমে উঠলো। একটা পরিবার ভাঙা কতটা কষ্টকর সেটা তারা জানে। আর এই পরিবার ভাঙতে দেখার সাহস তার মধ্যে নেই।
সে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে বলল,
–“এমন তো নাও হতে পারে।”
–“কাকে স্বান্তনা দিচ্ছিস, নিজেকে?”, সৈকত ম্লান হেসে বলল।
এরোজ অস্থির চিত্তে সিগারেটে সুখটান দেয়। গমগমে স্বরে বলে,
–“মুখ দেখা যাচ্ছে না। না জেনে কাউকে নিয়ে এত বিদঘুটে মন্তব্য করা ঠিক না। তুই জানিস না ও কত সুখী! ওকে কেউ একটু আঘাত করতে চইলেও ওকে আগলে রাখার মতো দু’টো শক্তিশালী সত্ত্বা রয়েছে। তাদের চোখেমুখে ওর জন্য অজস্র ভালোবাসা। পৃথিবীর কারোর সাধ্য নেই ঐ ভালোবাসাকে উপেক্ষা করার। তোর ভুল হচ্ছে কোথাও।”
–“ভুল হলেই ভালো। আমি তোর পরিবারের ভালো চাই। আর তার জন্যই তো এগুলো বলছি।”,”, সৈকত কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল। এরোজ নির্বাক নিজ কর্মে মগ্ন হয়। ধারণা করতে পারে না, যেই ভালোবাসাকে পৃথিবীর কারোর উপেক্ষা করার ক্ষমতা নেই, সেই ভালোবাসাকে তার ভাই নিদারুণভাবে উপেক্ষা করছে। এবং নিজের হাতে তিলে তিলে গলা টিপে মারছে সেই স্নিগ্ধ ভালোবাসাগুলোকে।
রাত বাড়ে। সেই সাথেই এরোজ অনুভব করলো সে দূর্ভাগা! ঐ উপর ওয়ালাও তার সাথে প্রহসনে মত্ত। নয়তো বারংবার এমন অদ্ভুত সুখের সাথে কেন পরিচিত করায়?
আজ আর নায়েল আসলো না এরোজের কাছে ঘুমাতে। ইমরোজ আসতে দেয়নি। এরোজের সাথে তার মেয়েকে রাখতে তার ভয় করে। আজ নায়েল বাবা মায়ের সাথেই ঘুমিয়েছে। নায়েলের জন্য অপেক্ষারত এরোজ আবারও উদাসীনতা আঁকড়ে একাকীত্বতাকে বরন করে নেয়। ওষ্ঠকোনে ম্লান হাসি ফুটে উঠল এরোজের। তার জীবনে অপেক্ষারা কেন ফুরায় না?
বহুক্ষণের অপেক্ষা ভেঙে উদাসীন চিত্তে উঠে হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে কাবার্ড থেকে নিষিদ্ধ দ্রব্যগুলো বের করে। গ্লাসে ঢেলে বারান্দায় চলে যায়।
রাত তখন প্রায় একটা। রূপকথা শ্রান্ত দৃষ্টি ফেললো সম্মুখের গুরুগম্ভীর ছেলেটির দিকে। অনুনয় করে বলল,
–“এখন ছেড়ে দাও। আর পড়তে ইচ্ছে করছে না, নিজেও ঘুমাতে যাও।”
তানশান অনঢ় গম্ভীর গলায় বলল,
–“আর দুইটা প্রশ্ন আছে সেটা সলভ করেই ঘুমাতে যাবেন।”
রূপকথা অতিষ্ট হয়ে গেল। রেগে বলল,
–“তুমি আমায় শায়েস্তা করছো তাই না?”
তানশান চোখে হাসে। সে আসলেই শায়েস্তা করছে। নিজের ঘুম বাদ দিয়েও আজ পাহাড়া দিচ্ছে। তবুও অভিব্যক্তি লুকিয়ে বলল,
–“আপনি পড়া শেষ না করলে আমি পাপাকে ফোন দেবো। পাপা আমায় দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছে আপনার এই টাস্কগুলো নিজ দায়িত্বে শেষ করানোর জন্য।”
অগত্যা রূপকথাকে আরো দুইটা সৃজনশীল প্রশ্ন লিখতে হলো।
পড়া শেষ হতেই সে তানশানের বিছানা গুছিয়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়ে। দরজা পর্যন্ত বের হতেই শুনতে পেলো তানশানের হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠ।
–“পাপা, আমি তোমায় মিস করছিলাম। এতক্ষণ ফোন দাওনি কেন?”
রূপকথা আনন্দিত হয় তপোবনের ফোন দেখে। এই তিনদিনে একবার ও ফোন দেয়নি। এখন নিশ্চয়ই তাকেও ফোন দেবে। সে নিজের ঘরে ছুটে গিয়ে ফোনটা আঁকড়ে ধরে অপেক্ষা করতে লাগল। তবে তার অপেক্ষারা ফুরালো না। রাত আড়াইটা পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরেও তপোবনের ফোন আসল না। রূপকথার উচ্ছ্বাস মিলিয়ে গেল। জীবনে তৈরি হওয়া ছোট্ট ছোট্ট মনোমুগ্ধকর মুহূর্তগুলো আর আনন্দিত করে না। মানুষটা বোধহয় দায়িত্বের জায়গা থেকেই জোরপূর্বক তাকে মেনে নিচ্ছে তাই তো সুযোগ পেতেই কেমন উপেক্ষা করছে।
কনকনে শীতের রাতে মৌনতার ঘুম ভেঙে গেল অস্বাভাবিক ভাবে শরীর ঘেমে ওঠায়। হাঁসফাঁস করে উঠল মৌনতা। লেপ সরিয়ে উঠে বসে নিজের শরীর হাতায়। শ্বেদ জলে ভিজে উঠেছে ব্লাউজ। শরীরের অস্বাভাবিক যন্ত্রনায় আর আরামের ঘুম আসলো না। বরং সেভাবেই ছটফট করতে করতে সে বিছানা ছেড়ে নামে। পাশ ফিরে তাকালে মুখে মলিন হাসি ফুটে উঠল।
ইমরোজের হাতের উপর বেঘোরে ঘুমাচ্ছে নায়েল। বড্ডো কামনীয় দৃশ্য এটি মৌনতার জন্য। সবসময় প্রার্থনা করে বাবা মেয়ে যেন সবসময় এমন থাকে। নায়েল যেনো বাবার চোখের মনি হয়ে বাঁচে।
সে ধীরপায়ে হেঁটে বারান্দায় চলে যায়। তবে সেখানে দুই মিনিট দাঁড়াতেই তার শরীর ভেঙে আসলো। চোখের সামনে হঠাৎ সব ধোঁয়াশা হয়ে আসতেই মৌনতা রেলিং আঁকড়ে ধরে নুইয়ে পড়লো। ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেললো সে।
কিছুক্ষণ সেভাবেই নিজেকে ধাতস্থ করার চেষ্টা করলে হঠাৎ করেই নাক থেকে তরল কিছু গড়িয়ে পড়ার অনুভূতি হয়।
সে আনমনে হাতের উল্টোপিঠে নাক ঘষা দেয়। হাতটি চোখের সামনে ধরতেই স্ট্রিট লাইটের আবছা আলোয় স্পষ্ট হয় লাল লাল অজস্র রক্তকণিকা। মৌনতা সেদিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিললো।
এই চামড়া আর কঙ্কালের আড়ালে থাকা তার ভেতরটা কি খুব অসুস্থ? তাকে যে এখনো অনেকটা পথ ধৈর্য্য সহকারে লড়তে হবে সন্তানের সুখের জন্য।
রক্তকণিকা গুলো দেখতে দেখতেই অনুভব হলো তাকে কেউ দেখছে। সে এদিক সেদিক নয় সোজা দৃষ্টি তাক করে নিজের বাম পাশের বারান্দাতে। আবছা আলোয় দৃশ্যমান এক উদাসীন পুরুষালী অবয়ব। এই অবয়ব সে চেনে। বিগত এক যাবৎ এমনি হুটহাট রাত বিরাতে তো কখনো কাক ডাকা ভোরে দেখা যায় এখানে। হয়তো কখনো মাতাল অবস্থায় কিংবা মাতাল না হয়েও কেমন অন্য এক জগতে বিরাজ করে।
সে সময় ব্যয় করে না দ্রুত রুমে ঢুকে যায়।
বাতাবরণ থেকে ল্যাভেন্ডার এর সুবাস ধীরস্থির মিলিয়ে গেল। এরোজ ভীষণ অলসতার সাথে বদ্ধ নেত্র খুলে তাকায় সম্মুখের খালি বারান্দার দিকে। ভালোবাসা কেমন হয়? ভালোবাসলেই কি পেতে হবে? থাক না কিছু অমূল্য অনুভূতি হৃদয়ের মাঝে লেখা। ভালোবাসার মানুষটির ভালোথাকা নিশ্চিত করাও তো ভালোবাসা তাই না?
দীর্ঘ পাঁচ মিনিট যাবৎ বমি করতে করতে বেসিন আঁকড়ে ধরে নুইয়ে পড়লো মৌনতা। বমি করতে করতে শরীর ভেঙে এসেছে।
ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলালো। তবে সেকেন্ড সময় অতিবাহিত হওয়ার আগেই পুনরায় গলগল করে বমি করে দিলো সে। একটাসময় শারীরিক যন্ত্রণা আর সহ্য করতে না পেরে চোখের পানির ছেড়ে দেয়।
সে দূর্বল হাতে মুখ ধুয়ে ধীর পায়ে গিয়ে একটা টুলে বসে পড়ে। সেখানেই কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে একটু সুস্থতা বোধ করার জন্য। প্রায় অনেকক্ষণ বাদ যখন একটু ভালো লাগলো, তখন বেরিয়ে আসে ওয়াশরুম থেকে।
ইমরোজ নায়েল বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। সে দূর্বল দেহ টেনে ঘর থেকে বেরিয়ে নিচে নামে। বমি ভাব এখনো কাটেনি। একটা কমলা খেলে হয়তো ভালো লাগবে।
রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালেই দেখতে পায় আলো জ্বলছে সেখানে। এত রাতে এখানে কে থাকবে?
সে কৌতুহলী দৃষ্টি ফেলে রান্নাঘরে ঢুকতেই কৌতুহলী নয়নদ্বয়ে বিরক্তিকর এক দৃশ্য এঁটে যায়। ঠোঁটের ভাঁজে সিগারেট চেপে এক ধ্যানে পেঁয়াজ কাটছে এরোজ। বিষাক্ত ধোঁয়ার দুর্গন্ধে মৌনতা তৎক্ষণাৎ নাকে কাপড় চাপলো।
কারোর উপস্থিতির আভাসে এরোজ পাশ ফিরে তাকায়। সহসা মৌনতা মুখের ওপর থেকে কাপড় সরিয়ে ফেলল। অপ্রস্তুত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করে বসে,
–“ছোট ভাইজান আপনি এখানে? খিদে পেয়েছে?”
এরোজ নির্বিকার নিজের দৃষ্টি সরিয়ে চপিং বোর্ডে রাখে। ঠোঁটে চেপে রাখা সিগারেট নিয়েই উচ্চারণ করে,
–“হুঁ।”
মৌনতা কি বলবে ভেবে পেল না। সিগারেটের গন্ধে শরীর গুলিয়ে আসছে। চলেও যেতে পারছে না। দেবর রান্না করছে আর সে বড় ভাবি হয়ে দেখছে! বহুকষ্টে গন্ধটিকে উপেক্ষা করে বলল,
–“কি খাবেন? আমায় বলুন, আমি বানিয়ে দিচ্ছি ভাইজান।”
এরোজের হাত থামিয়ে মুখ থেকে সিগারেটটা নামায়। দৃষ্টি চপিং বোর্ডে স্থির রেখেই শান্ত স্বরে বলল,
–“দরকার নেই। আমি পারব।”
–“সমস্যা নেই আমি বানিয়ে দিচ্ছি, ভাইজান।”, মৌনতা আরেকটু জোর দিয়ে বলল।
এরোজ গুরুগম্ভীর আওয়াজে কিছু বলতে যাবে তার আগেই ভেসে আসলো গলগল করে বমি করার আওয়াজ। এরোজের নির্লিপ্ততা ভেঙে যায়। কিছুটা চমকে তাকায় মৌনতার দিকে।
দৃষ্টি হকচকায় হাঁটু গেড়ে বসে পড়া দূর্বল মৌনতাকে দেখে। রান্নাঘরের মেঝেতেই বমি করে দিয়েছে সে। হাতের কাজ থামিয়ে সিগারেট সহই এগিয়ে আসে এরোজ। চাপা উদ্বেগ লুকিয়ে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করে,
–“ঠিক আছেন? পানি দেবো?”
মৌনতা ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলছে। এমনিতেই বমি বমি ভাব ছিল আবার সিগারেটের তীব্র গন্ধ সব মিলিয়ে হঠাৎ করেই তার গা গুলিয়ে বমি আসে।
এরোজ দ্রুত গ্লাস নিয়ে ফিল্টার থেকে পানি এনে তার সামনে ধরে। মৌনতা টলমলে আঁখি তুলে তাকায় গ্লাসটির দিকে। আচমকাই লজ্জা আঁকড়ে ধরলো। সে লজ্জিত বোধ করে, রান্নাঘরে বমি করে দেয়ার জন্য।
লজ্জা আঁকড়ে হড়বড়িয়ে উঠে দাঁড়ায়।
সিগারেটের গন্ধ আরো সন্নিকটে তখন। সে দ্রুত নাকে কাপড় চাপলো। অনুতপ্ত হয়ে বলল,
–“দুঃখিত! ছোট ভাইজান, আমি আসলে বুঝতে পারিনি। আমার শরীরটা খারাপ আর আমি সিগারেটের গন্ধ একদমই সহ্য করতে পারি না, তাই আঁটকে রাখতে পারিনি। আমি এখনি পরিষ্কার করে দিচ্ছি।”
এরোজ একপলক লজ্জিত মুখটির দিকে তাকিয়ে বাড়িয়ে দেয়া গ্লাসটির দিকে তাকায়। কোনো প্রত্যত্তুর না করে সে নির্বিকার গ্লাসটি কিচেন কেবিনেটের উপর রেখে দেয়।
চলতে চলতেই হাতের সিগারেটটি নিচে ফেলে দিয়ে পায়ে পিষে ফেললো। নিরুদ্বেগ ফলের ঝুড়ি থেকে একটা কমলা এনে ঠিক গ্লাসটির পাশে রাখে। অতঃপর জোরে এক হাঁক ছেড়ে জবাকে ডাকলো। মৌনতা হকচকায় আচমকা চিৎকারে। কিছুটা অবাকপানে তাকায় একবার এরোজের দিকে, আরেকবার কমলার দিকে।
মানুষটাকে আজ পর্যন্ত তার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাতে দেখেনি। কেমন যেন অন্তর্মুখী স্বভাবের। ঘর সংসার, পরিবার পরিজেনের প্রতি কখনোই এতটা দায়িত্বশীল বা সক্রিয় দেখা যায় না, নায়েল আর তানশান ব্যতীত। সে শরীরের সাথে না পেরে গ্লাসের পানি ঢকঢক করে পান করে। কমলার খোসা ছাড়িয়ে তা নাকের কাছে ধরলো।
রান্নাঘর সংলগ্ন একটি ঘর, যেখানে জবা আর মাজেদা চাচি থাকে। আচমকা রাতের এমন নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে এরোজের চিৎকারে, জবা এক চিৎকার দিয়ে লাফিয়ে উঠে বসলো। আ’ত’ঙ্কে বক্ষস্থল হাঁপাচ্ছে তার। সে বিরক্ত নিয়ে মাজেদা চাচির দিকে তাকায়। বিরক্ত হয়ে বলল,
–“সারাদিন ষাঁড় গরুর মতোন চেঁচায়, এহন তো স্বপ্নের মাঝেও আইসা চেঁচায়। কি এক যন্ত্রনা! এ কি সইহ্য হয় কন চাচি!”
–“এই জবাআআ? মরার মতো ঘুমাচ্ছিস? কানে কথা যায় না?”, পুনরায় এরোজের চিৎকারে জবার ঘুম ছুটে গেল। তারমানে এটা স্বপ্ন নয়।
সে হুড়মুড়িয়ে বিছানা থেকে নেমে কোনমতে চাদর জড়িয়ে এক ছুট লাগায়। এরোজ জ্বলন্ত চোখে তাকায় তার দিকে। সে আলাভোলা হেসে বলল,
–“ঘুমাইতেছিলাম ভাইজান। কেডায় জানতো, আফনে রাইতে না ঘুমাইয়া ঘর পাহারা দেন।”
বলেই জবা জিভ কাটলো। বোকাসোকা হেসে বলল,
–“না মানে, কিছু লাগবে ভাইজান?”
এরোজ শানিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
–“ওগুলো পরিষ্কার কর।”
জবা এরোজের হাতের নির্দেশনা অনুসরণ করে তাকাতেই বমির সামনে মৌনতাকে দন্ডায়মান দেখলো। সে কপাল কুঁচকে শুধায়,
–“আফনে এইহানে কেয়া ভাবিজান? এই বমি করছে কেডায়, আফনে?”
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৩
মৌনতা মাথা নেড়ে সায় জানায়। জবা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ল। সে এগিয়ে আসে মৌনতার কাছে।
এরোজ নিজের কাজে মগ্ন হয়। খিদে পেয়েছিল। রাত জাগলে খিদে পায় তার। পাস্তা বানাচ্ছে।
জবা সব পরিষ্কার করে। মৌনতা ফলের ঝুড়ি থেকে আরো একটা কমলা নিয়ে ঘরের চলে যায়। জবাকে বলে যায় এরোজকে সাহায্য করতে। জবা এরোজের পাশে দাঁড়াতেই এরোজ খ্যাক করে উঠল। তার কোনো সাহায্যের প্রয়োজন নেই। যার সঙ্গী একাকীত্ব তার কিসের আবার সাহায্যের প্রয়োজন?
আজ এরোজের হাসি পায় নিজের ওপর। কারোর অনুমতি বিহীন সে তাকে নিয়ে গোটা এক জীবন ভেবে বসেছিল। অথচ আজ সেই বাঁচার স্বপ্নই তাকে তিলে তিলে মারছে।
