Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৯

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৯

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৯
তোনিমা খান

বারংবার হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে হাত ধুয়েও যখন কলুষিত স্পর্শের ঘৃণাটুকু মুছল না, তখন এরোজ আরো জোরে জোরে ঘষতে লাগল। ডলতে ডলতে চামড়া রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে, যেন কিয়ৎকাল বাদেই তা দেহচ্যুত হবে।
সৈকত বিতৃষ্ণা ভরা চোখে তাকায় নিজের বাল্যকালের বন্ধুর পানে। চাপা আক্রোশে বলে,
–“যার সামান্য হাত ধরা সহ্য করতে পারিস না, তার সাথে সারাজীবন কাটাবি কি করে?”
–“এগুলো না বলে একটু স্যানিটাইজার তো আনতে পারিস?”, এরোজ অস্থির কণ্ঠে বলল। চোখমুখ তার বাজেভাবে বিকৃত হয়ে আছে ঘৃণায়। সৈকত ম্লান হেসে বলল,

–“তুই যেমন করছিস তাতে তোর এই ঘৃণা জমজম কূপের পানির ছোঁয়া ছাড়া যাবে না।”
–“ঠিক বলেছিস। চল বাসায় যাই, বাসায় জমজম কূপের পানি আছে।”
বাচ্চাদের ন্যায় অবুঝ কণ্ঠে বলল এরোজ। সৈকত গা দুলিয়ে হেসে উঠল তাতে। আক্ষেপভরা কণ্ঠে বলল,
–“এভাবে আর কতদিন এরোজ? মানুষ মারা গেলেও তো সেই শোক তিনদিনের বেশি থাকে না।”
এরোজ চোখ তুলে তাকায়। ভীষণ দুঃস্থ কণ্ঠে বলে ওঠে,
–“সেখানে তো মানুষটা বেঁচে আছে। আমার চোখে…”
এরোজের কণ্ঠরোধ হয়ে আসে। আর কিছু উচ্চারণ করতে পারে না, শুধু অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সৈকতের মুখপানে।
কিয়ৎকাল বাদ ধিমি কণ্ঠে বলে,

–“মৃত্যুর শোক তিনদিনে কেটে যায় কিন্তু নিজের একটু ভুলের জন্য নিজের সর্বসুখ হারিয়ে ফেলার শোক, মৃত্যুর শোকের থেকেও কঠিন। আমি তো আজও মানতেই পারিনা সে আমার নয়।”
–“অথচ সেই মানুষটা জানেই না তাকে কেউ ভালোবাসত।”, সৈকত ম্লান হেসে বলল। এরোজের ওষ্ঠকোণা আলতো বেঁকে যায় ‘ভালোবাসত’ শব্দটি শুনতেই।
তারা বেরিয়ে আসে ‘কাপ পিরিচ’ রেস্তোরাঁ থেকে। কিয়ৎকাল পূর্বে এখানেই সৃজার সাথে তার কথা হয়েছিল।
সৈকত চলতে চলতে শুধায়,
–“তোর কি মনে হয়, ঐ সৃজা বিয়েতে রাজি হবে?”
–“ও রাজি না হলেও ওর লোভ ওকে রাজি করাবে। সি ক্যান ডু এনিথিং ফর মানি। ও একটা স্লাট! ওর পুরো ফ্যামিলির এটাই মূল ধান্দা!”
–“কিন্তু ও তোকে ওর ছোট বোনের জন্য পছন্দ করেছে।”
–“আর আমি ওকে।”
–“কি অপছন্দ করেছিস?”, প্রহসনের সুরে বলেই হেসে ওঠে সৈকত।
পুনশ্চঃ শুধায়,
–“সেদিন যে আমি ছবি দেখালাম তখন বিশ্বাস করলি না। ওটা সৃজাই ছিল।”
–“হু।”
–“বিয়ের পর ওকে নিয়ে কি করবি?”
–“মাটিতে গেঁড়ে রাখব।”, এরোজের রুক্ষ কণ্ঠে সৈকত ফের হেসে উঠল। হাসতে হাসতেই ফের ম্লান হয়ে আসে তার বদন। ছেলেটি তার দেখা সবচেয়ে চঞ্চল, সুন্দর মনের মানুষ ছিল। যে কি-না অচিরেই এক উন্মাদ প্রেমিকে পরিণত হয়ে নিজেকে খুইয়ে বসেছে।
সৈকত বলহীন দেহে তাকায়। মিহি স্বরে বলে,

–“সে এইসব জানে?”
ছেলেটির চলন্ত কদম থেমে যায়। কর্ণকুহরে পুনরায় বিঁধছে কারোর কান্নার আওয়াজ। ক্ষীণ স্বরে বলে,
–“জানে হয়তো।”
–“তবে সে যেটা করছে সেটা ভুল।”
–“জানি। কিন্তু তার ভুলগুলোকে আমি না-হয় সঠিক করব। না থাকবে বাঁশি আর না বাজবে বাসুরি!”
–“কিন্তু তুই অন্যায় করছিস নিজের সাথে।”
–“আমার সাথে শত অন্যায়ের বিনিময়ে কেউ যদি ভালো থাকে… তবে দোষের কি? আমি তো এমনিতেই নিঃস্ব এক মানুষ!”
–“তুই ও কি তার মতো বোকামি করছিস? নিজের জীবনটাও নষ্ট করবি। কুকুরের লেজ কখনো সোজা হয় না। আজ একজন সৃজাকে বিয়ে করে তুই একটা সংসার বাঁচাবি। এমন সৃজা হাজারটা আসবে, তুই কি হাজারটা মেয়েকে বিয়ে করবি? বাড়ির সকলকে জানাচ্ছিস না কেন?”
এরোজ চোয়াল শক্ত করে ঘাড় কাত করে তাকায়। টলটলে নেত্রে বলে,

–“সে যখন কাউকে জানাচ্ছে না তখন তার নিশ্চয়ই কোনো বাধ্যবাধকতা আছে।”
–“কি এমন বাধ্যবাধকতা থাকবে? তপোবন ভাইকে জানা, সে সোজা বানিয়ে দেবে।”
এরোজ ম্লান হাসল। আফসোসে ভরা কণ্ঠে বলল,
–“ইমরোজের খুঁত তাদের নজরে আসে না, তাদের নজরে আসে শুধু আমার রাগ, জেদগুলো। অথচ আমার নিজের বলতে শুধু কারোর দেয়া স্মৃতিটুকুই আছে। সেটুকু আগলে বাঁচাও তাদের চোখে জেদ।”
–“তোরা এমন এক ব্যাধির বিরুদ্ধে নীরবে লড়ছিস— যা সমাজের সবচেয়ে নিকৃষ্ট শক্তিশালী একটা ব্যাধি। এই মানুষগুলোকে সমাজের সামনে মুখে কালি মেখে পেটাতে হয়।”
–“কিন্তু আফসোসবোধ হয় এখানটাতেই, কেউ জেনে-বুঝে ভুল করছে এটা ভেবে। কারণ ঐ মানুষটা নায়েলের বাবা, কারোর স্বামী। যাকে ভালোবেসে ঘর বেঁধেছে।”
–“স্বামী, বাচ্চার বাবা বলে সব অপরাধ মুখ বুজে মেনে নেবে?”
–“আমি জানি না, কিচ্ছু জানি না। শুধু এতটুকু জানি, নায়েলকে আরেক এরোজ হতে দেয়া যাবে না। বাবা-মা বিহীন জীবন কতটা কঠিন হয় তা আমি জানি। এই ব্যাধিকে কোনোভাবেই নায়েলের জীবন নষ্ট করতে দেব না, তাতে আমায় যা করতে হয় করব।”

সৈকত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাইকে উঠে বসে। সৈকতকে নামিয়ে দিয়ে এরোজ বাড়িতে ফিরল। গেট পেরোতেই তার দৃষ্টি আঁটকে যায় গেটের বাইরে অস্থির চিত্তে পায়চারী করা ওয়াহেদের পানে।
সে কপাল কুঁচকে এগিয়ে যায়। বিনম্র কণ্ঠে ডেকে ওঠে,
–“খালুজান… তুমি এখানে এত রাতে কি করছ?”
এরোজের কণ্ঠে চমকে উঠল ওয়াহেদ। কৃত্রিম হেসে এগিয়ে আসে। চোখেমুখে উদ্বিগ্নতা, অস্থিরতার ছড়াছড়ি। শুধায়,
–“কেমন আছো, এরোজ?”
এরোজ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
–“এজ অলওয়েজ। কিন্তু তুমি এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন?”
ওয়াহেদ বিচলিত দৃষ্টি ফেলে বলল,
–“আসলে তপোবনের সাথে দেখা করতে এসেছিলাম। ওকে আমি ফোনে পাচ্ছি না।”
–“তো এখানে কি করছ? বাড়িতে ঢোকোনি কেন?”
–“অনেক রাত হয়ে গিয়েছে, ভাবলাম বিষয়টা ভালো দেখায় না। তুমি একটু তপোবনকে ডেকে দিতে পারবে?”
এরোজ উদাসীন চিত্তে ভাইকে ফোন দেয়। তপোবন আধো আধো নয়ন মেলে ফোন কানে ঠেকায়। বক্ষমাঝে তখনো লেপ্টে আছে ছোট্ট দেহটি।
ক্ষীণ স্বরে বলে,

–“এরোজ! এখনো বাইরে?”
–“গেটের সামনে, ভাইজান। পিচ্চি ভাবিজানকে এনেছো? সে ঠিক আছে?”
তপোবন তপ্তশ্বাস ফেলে বলল,
–“এনেছি, কিন্তু জানি না ঠিক আছে কি-না!”
–“সময় দাও তাকে।”
–“হুঁ।” তপোবন ছোট্ট করে বলল। কেউ এখনো জানে না মেয়েটি কী বীভৎস দিন কাটিয়েছে!
–“তুই ওখানে দাঁড়িয়ে কি করছিস?”
–“ছোট খালুজান তোমায় ফোনে না পেয়ে দেখা করতে এসেছে। তুমি একটু নিচে আসতে পারবে?”
তপোবনের ঘুম হালকা হয়ে যায়। চোয়াল শক্ত করে বুক থেকে মেয়েটিকে অতি সাবধানে নামিয়ে ফোন হাতে ধীরস্থির বিছানা ছেড়ে নেমে আসে। বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থমথমে মুখে বলে,
–“ওনাকে ফোনটা দে।”
ওয়াহেদ ফোনটা নিয়েই ব্যতিব্যস্ত কণ্ঠে সাফাই দিয়ে বলল,
–“তপোবন আমার কথাটা একটু শোনো, আমার কাছে এক্সপ্লেনেশন আছে।”
তপোবন কঠিন স্বরে বলল,

–“তোমার কাছে যেই এক্সপ্লেনেশন-ই থাকুক না কেন খালুজান, তা রূপকথা আর তার পরিবারের কষ্টের কাছে ভীষণ তুচ্ছ আর হাস্যকর শোনাবে। তুমি আদতেও জানো না ঐ তিনটা মানুষের ওপর থেকে আজ দশ বছর যাবৎ কি কি গিয়েছে। এমনকি আমি নিজেও গতকাল পর্যন্ত ধারণা করতে পারিনি, নীলিমা নামক মানুষটা কোন নরক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে তার মেয়ে দুটোকে আগলে রেখেছেন। কিন্তু আজ আমি জানি, ঐ মানুষটা কত নিকৃষ্ট পরিস্থিতির মধ্যে জীবনযাপন করে আসছে। তোমার এই সকল কৈফিয়ত তাদের ক্ষত কমাবে না বরং তাতে মরিচ ঢেলে দেবে। আমি তোমায় অনুরোধ করছি, যদি মানুষ হয়ে থাকো আজকের পর থেকে আমার স্ত্রী আর তার পরিবার থেকে দূরে থাকো। তারা একা থাকতে শিখে গিয়েছে, ভালো থাকতে শিখছে। কিন্তু শুধু আফসোস হবে, আম্মা আর শুকতারা হয়তো এখনো তোমায় তাদের মোনাজাতে চাইবে, যার যোগ্য তুমি নও।”
আবছা আলোয় তপোবনের সুবিশাল অবয়বের পানে টলটলে নেত্রে তাকায় ওয়াহেদ। ধরা গলায় বলে,
–“আমি অপরাধী, তপোবন। কিন্তু অপরাধের পেছনের কারণটা তো অন্তত জানাতে দাও। আমারও কিছু বাধ্যবাধকতা ছিল।”
তপোবন ম্লান হেসে বলল,

–“সন্ধ্যা পর্যন্ত আমি অনেকবার ভেবেছি একবার তোমার কৈফিয়তগুলো শুনব। কিন্তু বিশ্বাস করো, গত এক ঘণ্টায় আমার সেই ইচ্ছেটুকুও মরে গিয়েছে। আমি রূপকথাকে জীবনের সবচেয়ে বীভৎস পর্যায়ে গিয়ে ভেঙে চুরমার হতে দেখেছি। ছোট্ট ওই শরীরে এত পাষণ্ডতা সহ্য করার শক্তি আদৌ আছে কি না, আমি জানি না। ছোট্ট একটা মেয়ে, খালুজান। দয়া করে ওকে আর দুঃখ দিও না।”
শেষের কথাগুলো তপোবন অনুনয়ের স্বরে বলল। ওয়াহেদ যেন নিজের শরীরের সব শক্তি হারিয়ে ফেলল। ক্ষীণ স্বরে শুধাল,
–“রূপকথার কি হয়েছে, তপোবন?”
তপোবন দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–“সেটা তোমার জানতে হবে না, খালুজান। এতদিন যেভাবে মুখোশ পড়ে ছিলে, এখনো তাই থাকো। নয়তো খালামনি কেমন তা তুমি ভালো করে জানো। এরপর থেকে আমার আর আমার পরিবারের চারপাশে তোমায় দেখতে চাই না।”
ওয়াহেদ যন্ত্রণাদায়ক এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ভারী কণ্ঠে শেষবারের মতো জানতে চাইল,
–“রূপকথা কি ভালো আছে তোমার কাছে?”
তপোবনের ভীষণ হাসি পেল ওয়াহেদের এই প্রশ্নে। গা দুলিয়ে হেসে উঠল সে। বলল,
–“তোমার মুখে এই প্রশ্ন শুনতে ভীষণ হাসি পাচ্ছে খালুজান। আমি জানি না রূপকথা আমার কাছে ভালো আছে কি-না! আমার মতো মানুষের সাথে ভালো থাকার কথাও নয়, কিন্তু আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব তাকে ভালো রাখার। রাখছি!”

বলেই তপোবন ফোন কেটে দেয়। বারান্দার রেলিংয়ে হাত রেখে ফোঁস করে এক নিঃশ্বাস ফেলল সে। সে জানে, সত্য কোনোদিন চাপা থাকে না। কিন্তু এই সত্য যতদিন আড়ালে থাকবে, শুকতারা আর নীলিমা অন্তত ততদিন শান্তিতে থাকবে। আর আজ থেকে তার আরেকটা দায়িত্ব হলো— ঐ ছোট্ট মেয়েটির মুখে হাসি ধরে রাখা। সকল ফারাক, জড়তা, অস্বস্তি ভুলে সে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে ঐ মেয়েটিকে আগলে রাখার। আর কোনোদিন কোনো দুঃখ ছুঁতে দেবে না।
ফোন হাতে এরোজ কপাল কুঁচকে তাকায় ওয়াহেদের দিকে, আরেকবার তাকায় ভাইয়ের দিকে। সন্দিগ্ধ কণ্ঠে শুধায়,
–“কি অপরাধ করেছো তুমি? কিসের এক্সপ্লেনেশন আছে তোমার কাছে? আর তুমি রূপকথাকে চেনো?””
অজস্র কৌতূহল! ওয়াহেদ বিষণ্ন মুখে সবটা এড়িয়ে গিয়ে বলল,
–“আমি আসছি, এরোজ। সময় করে তোমার খালামনির বাড়িতে যেও।”
বলেই সে চলে যায় সেখান থেকে। এরোজ আজস্র কৌতূহল নিয়ে কপাল কুঁচকে বাড়িতে ঢোকে।
তখন বারোটা বাজে। তপোবন বিছানার পানে এক পলক তাকিয়ে ঘর থেকে বের হয়‌। ঘুম ভাঙলে একবার ছেলেকে দেখে আসাটা অভ্যাস না-কি বদঅভ্যাস কে জানে!
সে বের হতেই দেখল মৌনতা আর রোজ করিডোরে দাঁড়িয়ে আছে। আর নায়েল পুরো করিডোর জুড়ে ছুটছে, দুষ্টুমি করছে। সে এগিয়ে গিয়ে শুধায়,

–“রোজ, মৌন তোমরা এখনো জেগে আছো? আমার মা-ও দেখি জেগে আছে!”
মৌনতা ম্লান হেসে বলল,
–“এখন সে একটার আগে ঘুমায় না, ভাইজান।”
–“এটা তো বাজে অভ্যাস।”
–“এটা আপনার দুই ভাই-বোন গড়েছে।”
–“ইমরোজ আর রোজ?”, তপোবনের কৌতূহলী কণ্ঠে মৌনতা নাকচ করে বলল,
–“নাহ, ছোট ভাইজান আর রোজ।”
তপোবন অবাক হলো।
–“এরোজ?”
–“হ্যাঁ বড় ভাইজান, নায়েল ছোট ভাইজানের কাছে বিগত এক সপ্তাহ ঘুমিয়েছে।”, রোজ চঞ্চল কণ্ঠে বলে উঠল।
–“ঘুমাতে পেরেছে?” তপোবনের অবাক কণ্ঠ থেমে যায় হঠাৎ এরোজ উপরে উঠতেই। সকলেই নীরব হয়ে গেল।
মৌনতা এগিয়ে যায় তপোবনের কাছে। চাপা স্বরে শুধায়,
–“রূপকথা ঠিক আছে তো, ভাইজান? ওকে এত বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল কেন?”
এরোজ ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে আসে ভাইয়ের কাছে। সন্দিগ্ধ কণ্ঠে শুধায়,
–“ছোট খালুজান কিসের কৈফিয়ত দিচ্ছিল? আর সে রূপকথাকে নিয়ে কেন কথা বলছিল?”
তপোবন শান্ত দৃষ্টি ফেলল সকলের উৎসুক দৃষ্টি পানে। অতঃপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে পুরো দিনের ঘটে যাওয়া বীভৎস ঘটনাগুলো জানায়। এরোজ, মৌনতা আর রোজ পাথরের মতো জমে গেল। মৌনতা রুদ্ধশ্বাসে শুধাল,
–“রূপকথার বাবা… ওয়াহেদ খালুজান?”
পরক্ষণেই সে ঘৃণা ভরা কণ্ঠে বলল,
–“এত কাছে থেকেও সে এমন নিকৃষ্ট কাজ করতে পারল? দশ বছর কোনো খোঁজ নেয়নি! সে কি আদৌ বাবা হওয়ার যোগ্য?”
‘চরিত্রহীন’ শব্দটি এরোজের মস্তিষ্কে জ্বলন্ত সিসার মতো বিঁধল। সে বিক্ষোভে ফেটে পড়ল,
–“ওই লোকটা একটা চরিত্রহীন! তাহলে তুমি তার সাথে এত শ্রদ্ধার সাথে কথা বললে কেন? কেন এখনো টলারেট করছ? একদফা পিটিয়ে সবার সামনে ওর আসল রূপটা বের করলে না কেন?”
তপোবন ক্লান্ত স্বরে বলল,
–“চাইলেই সকলের সামনে তার আসল রূপ দেখানো যায়, কিন্তু কতগুলো জীবন আরেকবার নিষ্ঠুরতার স্বীকার হবে ভাবতে পারছিস? ঐ মানুষগুলো কতটা বীভৎস ভাবে ভেঙে পড়বে… যারা দশ বছর যাবৎ এই মানুষটার অপেক্ষায় আছে? আমি তো এখনো বুঝতে পারছি না আজকের ঘটনার পর রূপকথাকে স্বাভাবিক কিভাবে করব!”

–“তাই বলে ঐ কাপুরুষ, চরিত্রহীনকে তুমি এভাবে ছেড়ে দেবে?”
–“আমি শাস্তি দেয়ার কে বলতো? এই মানুষগুলোকে দেয়া কোনো শাস্তিই এখন আর কোনো মূল্য রাখে না। বরং আরো একবার দ্বিগুণ কষ্ট দেবে ঐ মানুষগুলোকে, যারা বাবা আর স্বামীর অপেক্ষায় দিন গুনছে। আমি শুধু আমার ছোট পরিবারটাকে আগলে রাখতে পারি, আর সেটাই করছি। তারা ভালো থাকতে শিখছে। কিন্তু এই সত্যি তাদের বেঁচে যাওয়া সুখটুকুও ছিনিয়ে নেবে।”
এরোজ কঠিন দৃষ্টিতে ভাইয়ের দিকে তাকাল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–“এই চরিত্রহীন মানুষগুলোকে সুযোগ দিতে দিতে দেখবে তোমরা নিজেরাই একদিন ধ্বংস হয়ে গিয়েছ।”
কথাটা তপোবনের উদ্দেশ্যে হলেও মৌনতার বুকে তীরের মতো বিঁধল। বুকটা খামচে উঠল। সত্যিই কি তাই? সেও কি একজনকে সঠিক পথে ফেরার সুযোগ দিয়ে নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে?
মৌনতা হাঁসফাঁস করে উঠল, এটা হতেই পারে না। নিজের সন্তান আর তার মায়ের সাথে এমন নৃশংসতা কেউ করতেই পারে না। ইমরোজ যদি এমন কিছু করত তবে দেড় বছর আগেই করত! এখনো তাদের সংসারটা টিকে থাকত না। বোকা মৌনতা আরেকটু শক্তি সঞ্চয় করে সংসারটা আগলে বাঁচার জন্য।
এরোজ ফুঁসছে চাপা আক্রোশে। অন্যায় সহ্য করা তার স্বভাবে নেই, কিন্তু মাঝেমধ্যে পরিস্থিতি আমাদের স্বভাব বহির্ভূত অনেক কাজ করাতে বাধ্য করে। সে ক্রুব্ধ কণ্ঠে ফের শুধায়,

–“আর ঐ বাস্টার্ডদের কি করেছো? ওদের ও কি দয়া দেখিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছো নাকি?”
তপোবন মৃদু হাসল। সেই হাসিতে এক অদ্ভুত কাঠিন্য ছিল। বলল,
–“প্রশ্নই ওঠে না। যেটুকু শাস্তি ওদের প্রাপ্য, তা নিজ হাতে বুঝিয়ে দিয়েই পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছি।”
ভাইয়ের কথায় এরোজ খানিকটা শান্ত হয়। পথ ঘুরিয়ে পা বাড়ায় নিজের ঘরের দিকে। অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা নায়েলের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল এরোজকে দেখে। সে চেঁচিয়ে উঠল,
–“হাই! ছোট পাপা।”
কারোর চিৎকারে এরোজ এক পলক ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। নায়েল ততক্ষণে ছুট লাগিয়েছে তার দিকে। এরোজ ফাঁকা ঢোক গিলল। প্রশ্রয় দেয়ার মতো ক্ষমতা না থাকায় দ্রুত কদমে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। ছুটন্ত নায়েলের গতি শ্লথ হয়ে গেল তার এহেন কাজে। সে আশাহত নয়নে তাকিয়ে রইল বদ্ধ দরজার দিকে। চোখ দু’টো টলটল করে উঠল,
– “তাকে দেখে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে?”
রাগে-দুঃখে সে গিয়ে মায়ের কোলে চড়ে বসল।
দুঃখগুলোর মতো অসুখগুলোও ইদানিং মৌনতার নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছে। শরীর যেন ক্রমেই ভেঙে পড়ছে। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখলে নিজেই চমকে ওঠে সে; একসময়ের সজীব মুখশ্রী এখন পাণ্ডুর, রক্তহীন এক ফ্যাকাশে অবয়বে পরিণত হয়েছে। কোনো কারণ ছাড়াই ওজন কমতে কমতে হাড়গুলো জীর্ণ হয়ে বেরিয়ে এসেছে।
তবে পায়ের অস্বাভাবিক ব্যথায় যত না কষ্ট হয়, তার থেকেও বেশি কষ্ট হয় সে ইদানিং বেশিক্ষণ কোলে রাখতে পারে না নায়েলকে। মেয়েটা খুব আক্ষেপ জানায়।
নায়েলকে এখনো বেশিক্ষণ কোলে রাখতে পারল না মৌনতা। অসহায়ত্ব ভরা দৃষ্টিতে তাকায় বিষণ্ন রোজের দিকে। বলে,

–“ওকে একটু কোলে নাও, রোজ।”
রোজ বিমর্ষ মুখে নায়েলকে কোলে তুলে নেয়। ক্ষোভে ফেটে পড়ে বলে,
–“বড় ভাবিজানের সাথে একদিনে কতকিছু হয়ে গেল, মৌন বউ। সে এগুলো সহ্য করেছে কি করে? আজ কি হতো যদি বড় ভাইজান সঠিক সময়ে না পৌঁছাতো! তোমার কি মনে হয়, এর জন্য তোমার শাশুড়ি দায়ী নয়?”
–“সে তো জানত না ওখানে পশু গুলো এমন ওত পেতে থাকবে।”
–“সবসময় আম্মার হয়ে কথা বলবে না, মৌন বউ। এই যা কিছু হয়েছে তা সব তোমার শাশুড়ির জন্য। অহংকারী, স্বার্থপর একজন মানুষ সে। স্বার্থে আঘাত লাগলে ঘৃণ্য আচরণ করতেও সে দ্বিধাবোধ করে না।”
মৌনতা শ্রান্ত চোখে তাকায়। বিতৃষ্ণা ভরা কণ্ঠে বলল,
–“আমি কিছু বলি না বলি তাতে কিছু যায় আসে না, রোজ। সে কি আজ পর্যন্ত আমার কোনো কথা শুনেছে? আমি আজ পর্যন্ত তার কথার অবাধ্য হইনি, এর জন্য হয়তো আমায় বেশি ভালোবাসে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে— আমি বুঝি না তার অপরাধগুলো। কিন্তু তাকে রোধ করার সাধ্য তো আমার নেই।”
রোজ জবাব দেয় না, রেগেমেগে চলে যায় নিজের ঘরে। সে ভাবতেই পারছে না রূপকথা এত বিদঘুটে পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে গিয়েছে, আর সেটাও তার মায়ের দোষে।

আঁধার কাটল। ধরণী ফের নতুন আলোয় আলোকিত হয় নতুন স্বপ্ন বুনতে। আর বাবা-ছেলে যেই মানুষটাকে সকল দুঃখ থেকে আগলে রাখবে বলে পণ করেছে, তার সুখ নিশ্চিত করণে মগ্ন হয় তারা।
আর রূপকথা নামক ছোট্ট মেয়েটি… সে দুঃখ ভুলতে আজ নিদ্রার আশ্রয় নিয়েছে। কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হতে হতে ভয়ার্ত মেয়েটি সকাল আটটা পেরোলেও ঘুম থেকে উঠল না।
তপোবন শান্ত দৃষ্টিতে মায়ের পানে তাকায়। গম্ভীর মুখে বলল,
–“আম্মা, আপনি সবাইকে নিজ মর্জিমাফিক জীবনযাপন করতে বাধ্য করতে পারেন না। সবার নিজস্ব সতন্ত্র জীবন রয়েছে, ইচ্ছা রয়েছে, চাহিদা রয়েছে। আপনার ইচ্ছা হয়েছে বলে আপনি অনুভূতিতে আঘাত করে বিয়ে করতে রাজি করাবেন, আবার ইচ্ছে হয়েছে আপনি বিয়ে ভাঙতে বলবেন— বৈবাহিক সম্পর্কটা কি এতটাই ঠুনকো আপনার কাছে?”
দম ফেলে ফের বলল,

–“আপনি নিজেও জানেন রূপকথার বয়স। সব জেনেও আমার মতো একজন অযোগ্য মানুষের সাথে তাকে জুড়ে দিয়েছেন। এখানে আমি তাদের কোনো দোষ দেখি না, কারণ তারা কি নরক যন্ত্রণায় ছিল তা বোধহয় আমি গতকাল বুঝতে পেরেছি। আপনিও তো একজন নারী। আরেকটা নারীর সাথে এত অবিচার, অন্যায় কি করে করতে পারেন? কিন্তু জানেন কি, এত অন্যায়ের পর ও আমি আজ পর্যন্ত রূপকথার চোখে আমার জন্য কোনো ঘৃণা দেখিনি। বরং প্রথম দিন থেকে ছোট্ট মেয়েটি এই সংসার, আমায় আর তানশানকে আগলে নেয়ার চেষ্টা করেছে। এর পরিবর্তে আপনি ওকে এত অসম্মান কোনোভাবেই করতে পারেন না। আপনার পরিবারের সবাই চরিত্রহীন বলে যে পথেঘাটে সবাই চরিত্রহীন হবে এমন কোনো কথা নেই।”
তকদির সিকদার চোখ তুলে তাকায় ছেলের কঠিন মুখপানে। ঘরভরতি মানুষের সামনে ছেলের এহেন কঠিন আচরণে নির্জনা বেগম তব্দা খেয়ে গেলেন। অবাক হলেন শেষের কথাটা শুনে। সে অবাক কণ্ঠে শুধায়,

–“আমার পরিবারের সবাই চরিত্রহীন মানে? তপোবন তুমি কি বলতে চাইছো? আমার পরিবার তোমার পরিবার নয়?”
–“হ্যাঁ আম্মা, আমার ও পরিবার। তাই তো আমি জানি, আমার নিজের পরিবার কতটা খুঁত যুক্ত হয়ে অন্যের মাঝে খুঁত খুঁজে বেড়ায়। এগুলো করবেন না, আম্মা। একটা সম্পর্ক, একটা পরিবার আর তার সুখশান্তি নষ্ট করার জন্য সন্দেহ যথেষ্ট হয়।”
–“তুমি নিশ্চিত তোমার স্ত্রী এত ভালো? অহংকার করো না তপোবন।”
–“আমি অহংকার করছি না, আম্মা। জীবন আমায় এতটুকু পরিপক্ক করেছে যে, আমি সামনের মানুষটাকে অন্তত বুঝতে পারি।”
নির্জনা বেগম রাগে অপমানে পাথরের ন্যায় শক্ত হয়ে বসলেন। বললেন,
–“আমি তোমার মা বলেই তোমার মঙ্গল চাই। তোমার যদি মনে হয় আমি ভুল, তবে ঠিক আছে। আশাকরি তোমার স্ত্রী আমায় শেষ পর্যন্ত ভুল প্রমাণিত করে যাবে। তোমরা ভালো থাকো, এর বেশি আমি কিছুই চাই না।”
বলেই সে গটগট করে নিজের ঘরে চলে গেলেন। তকদির সিকদার হাঁফ ছাড়লেন। ছেলের পানে চেয়ে বললেন,
–“তোমার মেজো চাচা আমায় বলেছে সবটা। ঠিক করেছো। কিন্তু তোমার মা তোমাদের খারাপ চায় না। ভুল বুঝো না তাকে। নিজের স্ত্রী সন্তান আগলে ভালো থাকো।”

ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন তকদির সিকদার। তপোবন নীরবে মাথা নাড়লো। রোজ আর তানশান ভীষণ খুশি হলো নির্জনা বেগমকে শায়েস্তা হতে দেখে।
বিগত দু’দিন যাবৎ ই এরোজ নায়েলের সাথে কোনোরূপ আহ্লাদ কিংবা ভালোবাসাময় আচরণ করছে না। এ নিয়ে নায়েলের রাগ ক্ষোভের শেষ নেই।
বড়দের বৈঠক শেষ হতেই খাবার ঘরে আগমন ঘটে এরোজের। হাঁটু সমান শর্টস পড়া সুবিশাল দেহী পুরুষটিকে দেখে নায়েল ঠোঁটে ঠোঁট চাপলো।
তার দিকে তাকাচ্ছেও না। একের পর এক উপেক্ষায় কান্না পাচ্ছে নায়েলের। কিন্তু কাঁদা তার স্বভাব নয় বরং জোরপূর্বক ভালোবাসা আদায় করা তার স্বভাব। তাই সে রোজের কোলে বসেই স্বভাবসুলভ তেজি কণ্ঠে শুধায়,
–“তুমি কি নায়েল বাবু?”
এরোজ ঘাড় ঘুরিয়ে শান্ত দৃষ্টি ফেলে ছোট্ট শুভ্র মুখপানে। একঘেয়ে রুক্ষ স্বরে পাল্টা শুধায়,
–“তোমার কোন দিক থেকে আমাকে ন্যাকাবতি নায়েল লাগছে?”
নায়েলের চোখেমুখে বিস্ময় খেলে গেল, সে ন্যাকাবতি? সে মুখ ঝামটা মেরে বলল,
–“আমি ন্যাকাবতি না, আমি ছুইট। তুমি যদি নায়েল বাবু না হও, তবে নায়েল বাবুল মতো এমন ছোট ছোট পোশাক পলেছো কেন?”
এরোজ চেয়ার টেনে বসতে বসতে কটাক্ষ করে বলল,

–“এগুলোকে ছোট পোশাক বলে না, শর্টস বলে— মূর্খ নায়েল।”
নায়েল অজানা ‘মূর্খ’ শব্দটি শুনে কপাল কুঁচকে নেয়। এরোজ যে কটুক্তি করেছে এটা ঢের বুঝেছে। কিন্তু ঠিক কি কটুক্তি করেছে তা বুঝল না। সে থমথমে মুখে রোজকে জিজ্ঞেস করে,
–“ফুপি, মূখো কি?”
রোজ হাসি চেপে বলল,
–“ওটা মূর্খ! মানে যে অশিক্ষিত, কিছু জানে না।”
নায়েল ভ্রু কুঁচকে নেয়। গাল ফুলিয়ে রাগান্বিত গলায় বলল,
–“আমি মূখো না! আমি অনেক কিছু জানি! গুগলও জানে না এমন জিনিস আমি জানি! আল তোমাল ওই শর্টসটসেল খবলও জানি— ওতে ঠান্ডা লাগে! বুঝছো?”
এরোজ উদাসীন দেহে হেসে উঠল বাচ্চা মেয়েটির কথায়। অবচেতনে খুব করে চায় মেয়েটির এমন পাকা পাকা কথা আজীবন ভর শুনতে। কিন্তু সেই সোনায় মোড়া কপাল কি তার আছে?
তার ঠোঁটে বিদ্রুপ মাখা হাসি দেখে নায়েল চোখ বড় বড় করে বলল,
–“হেসো না! আমি সিরিয়াল!”

এরোজ হাসি থামিয়ে থমথমে মুখে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় অত্যন্ত ঝগড়ুটে মেয়েটির পানে। খোঁচা মেরে বলে,
–“ওটা সিরিয়াল না মূর্খ নায়েল, সিরিয়াস হবে।”
–“ওইতো ওটাই বলেছি। তুমি বুঝে নিবে।”, নায়েল নিজের ভুল স্বীকার না করে পাল্টা রাগান্বিত স্বরে বলল। এরোজ ডানে বামে মাথা নাড়লো, টিপিক্যাল ঝগরুটে মেয়ে মানুষ!
এরোজ তাকে উপেক্ষা করে‌ হাঁক ছেড়ে বলল,
–“জবা, খাবার দে।”
রোজ বলল,
–“আমি দিচ্ছি, ভাইজান। জবা ছাদে গিয়েছে কাপড় শুকাতে দিতে।”
তার বলার মাঝেই মৌনতা খাবারের প্লেট হাতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে। চেয়ারে বসা অতি উগ্র মানবটির দিকে সতর্ক দৃষ্টি ফেলে প্লেটটা নীরবে তার সামনে রাখল।
রোজ খাবারের প্লেটটা দেখে বলল,
–“এ তো ঘি দিয়ে পরোটা ভাজা। ভাইজান তো রুটি খায়, মৌন বউ।”
তার কথা শেষ হতে না হতেই দেখল এরোজ প্লেট টেনে খেতে শুরু করেছে। মৌনতা কপাল কুঁচকে তাকায় ননদের দিকে। চোখেমুখে বিদ্রোহ, কে বলেছে খায় না? ঐ তো খাচ্ছে।
রোজ অবাক হলো, সেদিন ও যে তাকে ধমক দিল আনহেলদি খাবার বলে! অবশ্য যে সারাদিন নেশা দ্রব্যের সান্নিধ্যে থাকে, সে আবার কিসের হেলদি আনহেলদি খাবারের ভাষণ দেয়!
তন্মধ্যেই জবা খাবার ঘরে ঢুকলে তার চোখ বড় বড় হয়ে গেল এরোজের প্লেটে ঘি তে ভাজা পরোটা দেখে। সে খেকিয়ে উঠে বলল,

–“সেইদিন না আমারে কি ধমকান ধমকাইলেন যে— আমি এইগুলা খাইয়া হাতির মতো মোটা হইছি? তাইলে আফনে এহন খাইতেছেন ক্যান?”
নত শির খেতে ব্যস্ত এরোজ সরব খাওয়া থামিয়ে চোখ তুলে তাকায়। দৃষ্টি ভীষণ কঠিন। জবা আইঢাঁই করে উঠল। এরোজ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–“তোর মুখে আর একটা কথা শুনলে তোর ঐ হাতির মতো দেহ কেটে রোদে শুকাতে দেব।”
সে কি ভয়ঙ্কর হুমকি! জবা আড়চোখে চেয়ে নিজের পথ ধরে বিদ্রুপ করে বলল,
–“আফনার বিশ্বাস নাই, আফনে করতেও পারেন এমন।”
বলেই সে এক ছুট লাগায় রান্নাঘরে। এরোজ নির্বিকার খেতে শুরু করল। রোজ, মৌনতা আর নায়েল উপরে যায়। রূপকথার ঘরে গিয়ে বরাবরের মতো হতাশা নিয়ে ফিরে আসে। এখনো ঘুমাচ্ছে।
মৌনতা নিজের ঘরে ঢুকে বিছানার নিচ থেকে একটা ঝুড়ি বের করে রোজের সামনে রাখল। ত্যক্ত নিঃশ্বাস ফেলে বলল,

–“এই যে, তোমার ছোট ভাইয়ের উদ্ভট কর্মকান্ড। এক সপ্তাহে নায়েলকে এতগুলো হেয়ার এক্সেসরিজ দিয়েছে। এগুলো নিয়ে আমি এখন কি করব? দোকান দেব?”
রোজ হাঁটু গেঁড়ে বসে সব ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে।‌ অবাক হয়ে শুধায়,
–“এগুলো ছোট ভাইজান নায়েলকে দিয়েছে?”
নায়েল কোমরে হাত দিয়ে বলল,
–“হ্যাঁ, এত্তগুলো ছব আমায় দিয়েছে ছোট পাপা। তখন আমায় আদল কলতো। তখন গুড বয় ছিল, এখন ব্যাড বয় হয়ে গিয়েছে।”
রোজ হাসল। মৌনতার পানে চেয়ে শুধাল,
–“তো এখন কি করতে চাও?”
–“এগুলো সরাও কোনোভাবে। এতগুলো দিয়ে আমি কি করব? শুধু শুধু নষ্ট হবে।”
বলেই সে নিজ কর্মে মগ্ন হয়। ইমরোজের আধোয়া কাপড়চোপড় ওয়াশিং মেশিনে দেবে। রোজ ব্যান্ডগুলো দেখতে দেখতে বলল,

–“ভাইজান অনেক বছর যাবৎ এমন হেয়ার এক্সেসরিজ কেনে, মৌন বউ। কেন জানি না! কিন্তু যখনি কিছু কেনে তার সাথে সবসময় এগুলো কিছু না কিছু থাকে।”
মৌনতা কপাল কুঁচকে অনাগ্রহে বলল,
–“টাকা নষ্ট করার জায়গা পায় না বোধহয়। এখন এগুলো কাউকে দিয়ে দাও, আর আমার ঘর খালি করো তাড়াতাড়ি।”
মায়ের কথায় নায়েল সহসা বিরোধী কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল,
–“নাহ, এগুলো ছোট পাপা আমায় দিয়েছে। বলেছে, এগুলো পড়লে আমায় লূপাঞ্জেলের মতো লাগবে। আমি কাউকে দেব না এগুলো।”
রোজ খিলখিলিয়ে হেসে উঠল নায়েলের কথায়। কিন্তু মৌনতার হাতটা থেমে যায় রুপাঞ্জেল শব্দটি শুনতেই। সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় নায়েলের পানে। কৌতূহলী গলায় শুধায়,
–“মা, তোমার না স্নো-হোয়াইট পছন্দ? তবে তুমি এখন সারাদিন শুধু রুপাঞ্জেল রুপাঞ্জেল করো কেন?”
নায়েল হাসিমুখে বলল,

–“আই লাইক ইট! ছোট পাপা অলসো লাইক ইট।”
–“ওহ্!”, মৌনতা ধিমি কণ্ঠে বলল। রোজ ও নায়েলের সাথে সায় জানিয়ে বলল,
–“হ্যাঁ মৌন বউ। ভাইজান রুপাঞ্জেলের বিশাল বড় ভক্ত।”
–“ছেলে মানুষ আবার এইসব পছন্দ কর?”
–“করে করে, ভাইজানের রুপাঞ্জেলের চুল খুব পছন্দ।”
নিজ কর্মে মগ্ন মৌনতার ললাটে ভাঁজ পড়ে। চুল, রুপাঞ্জেল, ক্ল ক্লিপ— এই জিনিসগুলো কেন এত পরিচিত লাগছে? সে কিয়ৎকাল ভাবুক হলেও আবার মাথা ঝেড়ে নিজ কর্মে মগ্ন হয়। কাজ করতে করতে বলল,
–“তবে ওগুলো ফুপির ঘরে রেখে আসো, নায়েল। আমার ঘরে জায়গা নেই এমনিতেই। ঝঞ্জাট ভালো লাগে না।”
রোজ ঝুড়িটি নিয়ে বলল,
–“আচ্ছা এগুলো আমার ঘরে নিয়ে যাচ্ছি। এই বুড়ি আয়।”
নায়েল চলল রোজের পাছে পাছে। আর মৌনতা ডুবে যায় নিজের জীবনের গতিবিধি মাপতে। কিন্তু দুঃস্বপ্নেও মনে আসে না— যেই শব্দগুলো তার জন্য নিছকই কোনো আবছা স্মৃতি, সেই শব্দগুলো জুড়ে কারোর প্রাণ বাঁচে।

সোফায় বসা বাবা-ছেলে আরো একবার হতাশার নিঃশ্বাস ফেলল সম্মুখে বেঘোরে ঘুমাতে থাকা নারীটির পানে চেয়ে। তপোবন সোফা ছেড়ে উঠে মানিব্যাগ আর ঘড়ি হাতে নিলো। ঘড়ি পড়তে পড়তে ছেলের উদ্দেশ্যে বলল,
–“আব্বু, আর অপেক্ষা করতে হবে না। এখন স্কুলে চলো। মিমি অসুস্থ, ঘুমালে তার ভালো লাগবে। এসে কথা বলবে।”
রূপকথার নিস্তেজ মুখ থেকে দৃষ্টি সরায় তানশান। ভীষণ বিষণ্ন কণ্ঠে বলে,
–“পাপা, মিমি অনেক কষ্ট পাচ্ছে তাই না?”
তপোবন ফিরে তাকায় ছেলের মলিন মুখপানে। ম্লান হেসে বলল,
–“তুমি কি তোমার মাম্মাকে হারানোর কষ্ট এখনো ভুলতে পেরেছো?”
তানশান বাবার চোখে চোখ রেখে ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“এখন কেন, কোনোদিন ও ভুলে পারব না।”
তপোবন হাঁটু গেঁড়ে বসে ছেলের সামনে। বলল,
–“তবে ভাবো তো তোমার মিমির কথা.. সেও তার বাবাকে ভালোবাসত, তার বাবার কোলে চড়ে বেরিয়েছে, কিন্তু একদিন হঠাৎ সে ইচ্ছাকৃত হারিয়ে গেল। তখন ঠিক কতটা আঘাত লাগে, আর সেই আঘাত কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয়।”
–“অনেক!”, তানশান বিমর্ষ কণ্ঠে বলল। তপোবন ছেলের মাথায় হাত রাখে,
–“তাকে সময় দাও। আর আমরা তো আছি, তাকে মন খারাপ করতেই দেব না।”
তানশান মাথা নেড়ে সায় জানালো। তপোবন ছেলের গুছিয়ে রাখা ব্যাগ নিয়ে বলল,

–“এখন চলো, নয়তো তোমার দেরি হয়ে যাবে। তোমায় দিয়ে আমি একটু কাজ শেষ করে আবার বাড়ি ফিরব।”
–“আজ না গেলে হতো না?”
–“উহু, পড়াশুনা কোনোভাবেই বন্ধ করা যাবে না।”
–“মিমির ও তো পড়াশোনা বন্ধ যাচ্ছে।”
তপোবন ফিরে তাকায় ছেলের দিকে। শ্রান্ত স্বরে বলে,
–“একটু সময় দাও, পাপা সব ঠিক করে দেব। আবার পড়াশুনা করবে মিমি।”
–“ওকে।”, তানশান পাণ্ডুর মুখে বলে বেরিয়ে যায় কামড়া থেকে। তপোবন ব্যস্ত কদমে বিছানার কাছে এগিয়ে গিয়ে হাঁটু গেঁড়ে বসে ঘুমন্ত মেয়েটির সামনে। দূর্বলতায় কাতর মুখের উপর থেকে চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে ললাটে আলতো ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। অতঃপর দ্রুত বেরিয়ে যায়, চোখেমুখে কাঠিন্যতা। তৃশানের সাথে কথা বলবে।
ঘরময় ছড়িয়ে থাকা আতরের গন্ধ মিলিয়ে যেতেই রূপকথা চোখ খুলে তাকায়। সহসা চোখের কার্নিশ বেয়ে দুই ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তিরতির করে কেঁপে ওঠে ওষ্ঠদ্বয়! ভেতরটা গুমড়ে গুমড়ে মরছে অসহনীয় যন্ত্রণায়, অথচ ব্যক্ত করতে পারছে না। চারিপাশে থাকা মানুষগুলোকে আর কৈফিয়ত দিতে ইচ্ছে করছে না। ইচ্ছে করছে না জোরপূর্বক এই মানুষগুলোর জীবনে মানিয়ে নেয়া এক মানুষ হতে। ইচ্ছে করছে হারিয়ে যেতে কঠিন বাস্তবতায় মোড়া ধরণী থেকে।
ছেলেকে ক্লাসে দিয়ে তপোবন তামজিদ মাহমুদের সাথে দেখা করল। তৃশানের খোঁজ করলে সে জানায়, তার পরীক্ষা চলছে। আর তাছাড়াও ঐ বেয়াড়া ছেলের খোঁজ-খবর তার কাছে খুব কমই থাকে।
তপোবন বেরিয়ে এসে ফোন দেয় তাকে। রিসিভ হলো। সে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে শুধাল,

–“তৃশান, তুমি কোথায়?”
তৃশানের ভ্রু কুঁচকে গেল তপোবনের ফোনে। খানিক শঙ্কিত কণ্ঠে জানাল,
–“পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি, ভাইজান।”
–“তোমার সাথে আমার জরুরি কিছু কথা ছিল, দেখা করা যাবে?”
তৃশান বাইকে উঠতে উঠতে বলল,
–“আমার ও আপনার সাথে কথা আছে, ভাইজান। কিন্তু এই সপ্তাহে দেখা করা সম্ভব হবে না। আগামী সপ্তাহে দেখা করি!”
তপোবন অসন্তোষের নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
–“আচ্ছা।”
তপোবন গাড়িতে ওঠে। চোখেমুখে ভরপুর দৃঢ়তা! সম্পর্কে আর কোনো জড়তা কেন, তৃতীয় ব্যক্তির ছায়াও থাকতে দেয়া যাবে না।

বাস্তবতার মারপ্যাঁচে রূপকথা নামক ছোট্ট মেয়েটি দমবন্ধকর বিশ্রী অনুভূতিতে অস্বাভাবিক থমকে গেলেও, লহমাগুলো অবিরত! লহমাগুলো বয়ে যাচ্ছে নিজ নিয়মে। সকাল গড়িয়ে বিকেল হলো। এর মাঝে রূপকথা কেবল একবারই জেগেছিল, যখন তপোবন কিংবা তানশান ধারেকাছে কেউ ছিল না। সেই সুযোগে মৌনতা তাকে জোরপূর্বক কিছু খাইয়ে দিয়েছিল।
এরপর ওষুধের ঘোরে সে যে আবার ঘুমালো, আর ওঠার নাম নেই। তার এই বিষণ্ন লুকোচুরিতে ইন্ধন জুগিয়েছে ডাক্তারের দেওয়া ঘুমের ওষুধগুলো।
তপোবন মৌনতাকে বারণ করেছিল ঘুমের ওষুধ দিতে, কিন্তু রূপকথা জোরপূর্বক খেয়েছে।
তপোবন ঘরময় পায়চারি করতে করতে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আজান দিয়েছে, নামাজে যেতে হবে; এরপর একবার অফিসেও যাওয়া জরুরি। অন্যদিকে ছেলেটার মুখের দিকে তাকানো দায়। কোচিং থেকে ফেরার পথে মিমির জন্য কত শখ করে ফুচকা নিয়ে এসেছে সে! অথচ তার মিমি আজ একাকী নিজের মাঝে লড়ছে। যেই লড়াইয়ে সে বাবা-ছেলে কাউকেই পাশে ঘেঁষতে দিচ্ছে না।
আজান পড়লে তপোবনকে বেরিয়ে যেতে হয়। নামাজ শেষে তানশান বাবাকে অনুযোগ ভরা কণ্ঠে বলল,
–“মিমি কেন সারাদিন ঘুমাচ্ছে? উঠছে না কেন? উঠতে বলো।”
তপোবন ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
–“অসুস্থ থাকলে ঘুম পায় বেশি। বাসায় যাও, পাপা যেগুলো করতে দিয়েছি সেগুলো করো। পাপা এক ঘণ্টার মধ্যে বাসায় আসছি।”
তানশান বাসায় ফিরলে মৌনতা খাবার নিয়ে তার ঘরে আসে। কিন্তু ছেলেটা খাবার খাবে না বলে জেদ ধরে বসল। মৌনতা অতিষ্ঠ হয়ে শুধায়,

–“কি হচ্ছে তানশান? খাবে না কেন? সেই দুপুরে ভাত খেয়েছো আর কিছু খাওনি।”
তানশান গাল ফুলিয়ে বলল,
–“কেন খাব? তুমি খাবার এনেছো কেন? এই খাবার তো মিমি আনতো। তাকে দিতে বলো।”
মৌনতা অসন্তোষের সাথে বলল,
–“তুমি না মাত্র দেখে এসেছো মিমি ঘুমাচ্ছে? তবে?”
–“সেটাই, কেন ঘুমাচ্ছে? আমাদের সাথে কথা বলছে না কেন?”, তানশানের চোখ অচিরেই ছলছল করছে। মৌনতা হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে জবার পানে তাকায়। বলে,
–“গিয়ে দেখ না রূপকথা উঠেছে কি-না? এই ছেলে তো মাকে ছাড়া সবাইকে ভুলে গিয়েছে।”
জবা রূপকথার ঘরে গিয়ে দেখল সে তখনো ঘুমাচ্ছে। তানশান সেই জেদ ধরে সন্ধ্যা থেকে আর খেলোই না।
রাত দশটা নাগাদ দুশ্চিন্তাগ্রস্থ মৌনতা আবারও জবাকে পাঠালো উপরে। এবার অবশ্য জবা গিয়ে দেখল রূপকথা জেগেছে। সে শূন্য দৃষ্টিতে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আছে। জবা উৎফুল্ল হয়ে বলে উঠল,
–“ভাবিজান শরীর ভালো লাগতাছে এখন? ওঠেন কিছু খাইয়া নেন, আর আফনের ছেলেরেও কিছু খাওয়ান। সে জেদ ধইরা বইসা আছে মিমির হাতে ছাড়া কিছু খাবে না। সন্ধ্যা থেকে এই পর্যন্ত কিছু খায়নি।”
রূপকথার স্থির দৃষ্টি নড়েচড়ে উঠল। শান্ত দৃষ্টি ফেলল জবার পানে। ক্ষীণ স্বরে শুধায়,
–“তানশান খায়নি কিছু?”
–“সেই দুপুরে খাইছে আর এখন পর্যন্ত কিছু খায় নাই।”
মেয়েটির মস্তিষ্ক ভীষণ ক্লান্ত হলেও, মাতৃত্ব উদ্দীপ্ত অন্তঃস্থল স্থির থাকতে পারল না। বিচলিত মন নিয়ে রূপকথা ধীরস্থির উঠে দাঁড়ায়। দেয়াল ঘড়ির দিকে এক পলক তাকিয়ে ধীর কদমে সোজা তানশানের ঘরে গেল।
টেবিলে বসা থমথমে মুখের ছেলেটির পানে চেয়ে শুধায়,
–“খাওয়া দাওয়া করছো না কেন?”
বহুল আকাঙ্ক্ষিত কণ্ঠে তানশান চোখ তুলে তাকায়। অন্তঃস্থল খুশিতে আত্মহারা হলেও মেকি রাগ ধরে থমথমে মুখে বলল,

–“কেন খাব?”
পাল্টা প্রত্যুত্তর আসল ভীষণ অনাদরে।
–“কেন খাবে না?”
তানশান অভিমানী দৃষ্টিতে চেয়ে বলল,
–“কেন খাব? আমার জন্য তো সবসময় আপনি খাবার আনেন। কিন্তু আজ তো আনেন নি।”
–“আমি খাবার না আনলে খাবে না?”
তানশান জেদি কণ্ঠে বলল,
–“নাহ।”
রূপকথা এক পলক শান্ত দৃষ্টি ফেলে গটগট করে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। তানশান ছলছল নেত্রে সেই গমনের পানে তাকায়। অযথাই চোখমুখ উপচে বেরিয়ে আসছে কান্না। সে বোধহয় কাউকে বেশিই আপন করে নিয়েছে, নয়তো কেন তার উপেক্ষায় এত কষ্ট হচ্ছে? মানুষটা বোধহয় তার কারণে বিরক্ত হচ্ছে!
অন্তর্মুখী ছেলেটা একরাশ লজ্জা, হতাশায় ডুবে গেল। সে কি স্বভাব বহির্ভূত আচরণ করে ভুল করে ফেলছে?
নিমিষেই অজস্র কু ভাবনায় ডুবে গেল তানশান। কিন্তু তার সকল কু ভাবনা গুলোকে দূরছাই করে দিয়ে রূপকথা এক প্লেট ভাত নিয়ে তার সামনে বসে।
তানশান আড়চোখে তাকায়। রূপকথা থমথমে মুখে এক লোকমা মুখের সামনে তুলে ধরল। এই মুহূর্তে ভাত খাওয়ার অভ্যাস না থাকলেও, ছেলেটি একটুও দ্বিমত করল না বরং চুপচাপ মুখে তুলে নিলো। নীরবে মায়ের হাতে এক প্লেট ভাত খেয়ে তানশান তখন নড়তে চড়তে পারল না। কিন্তু পুরোটা সময় রূপকথা একটুও কথা বলল না দেখে তানশানের মুখ ভার হয়ে এলো।
সে ধরা গলায় শুধাল,

–“এমন করছেন কেন? আমরা কি করেছি?”
কাষ্ঠল প্রলেপের আড়ালে লুকায়িত অসহনীয় যন্ত্রণাগুলো লুকিয়ে রূপকথা চেয়ার ছেড়ে উঠে যায়। ঘর থেকে বের হতে হতে বলে,
–“ঘুমানোর আগে কিছু খেয়ে ঘুমাবে। রাত বড়, ক্ষুধা লাগবে।”
রূপকথা চলে যায়। আর বুকভরা বিষণ্নতা নিয়ে ছোট্ট ছেলেটি মায়ের পথে চেয়ে থাকে। তপোবন কাজ শেষ করে ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে এসে ছেলের ঘরেই আগে ঢুকল। ঢুকতেই ছেলের ফোলা ফোলা লালচে মুখ দেখে উদ্বিগ্ন বদনে তাকে বুকে চেপে ধরল। শুধায়,
–“কি হলো, মুখের এমন দশা কেন?”
তানশান অভিযোগ করে বলে,
–“মিমি আমার সাথে কথা বলছে না, পাপা। আগের মতো জেদ দেখাচ্ছে না, জোর করে খাইয়ে দিচ্ছে না, ধমক ও দিচ্ছে না—কেন দিচ্ছে না? তাকে বলো, আমরা কি করেছি? আমাদের সাথে এমন করছে কেন?”
তপোবন মৃদু হেসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
–“আচ্ছা, পাপা দেখছি। পাপা জিজ্ঞেস করছি, কেন মিমি তার তানশানের সাথে জেদ দেখাচ্ছে না, জোর করে খাইয়ে দিচ্ছে না, ধমক দিচ্ছে না— ঠিক আছে?”
তানশান ছোট্ট বাচ্চার মতো চোখ মুছে বলল,

–“আচ্ছা।”
শত দুশ্চিন্তার মাঝেও তপোবন সুখময় এক নিঃশ্বাস ফেলল। ছোট্ট মেয়েটি কি জানে, সে কত কঠিন এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে জিতে গিয়েছে?
চেঞ্জিং রুমের এক কোণায় মাথার চুল খামচে ধরে গুমড়ে কাঁদতে থাকা মেয়েটিকে দেখে তপোবন ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। বাঁ হাতে রুমের সাটারটা টেনে দিয়ে সে মেয়েটির ঠিক পাশটিতে পা গুটিয়ে বসল। আতরের তীব্র ও আভিজাত্যময় সুবাসে রূপকথার কান্নার বেগ যেন থমকালো। তপোবন দুই হাঁটু আঁকড়ে ধরে দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে শূন্যতায় চোখ রাখল। মিহি স্বরে শুধায়,
–“আমাদের থেকে লুকাচ্ছো কেন?”
এলোমেলো কেশে দু’হাতে মুখ চেপে ধরে থাকা রূপকথা ফুঁপিয়ে উঠল সেই প্রশ্নে। ক্ষীণ ভাঙা স্বরে বলল,
–“আমি তো পুরো পৃথিবী থেকে লুকাতে চাচ্ছি, কিন্তু পারছি না। আমায় একটু লুকিয়ে দেবেন? আমি এত নৃশংসতা নিতে পারছি না। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।”
কারোর বুকফাটা আর্তনাদ অথচ তপোবনের ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা। সে ঘাড় ঘুরিয়ে উন্মাদের মতো কাঁদতে থাকা মেয়েটির রক্তিম চোখের দিকে তাকাল। ধীরস্থির কণ্ঠে বলল,
–“লুকিয়ে দিতে পারি, কিন্তু একটা শর্তে।”
রূপকথা নুইয়ে পড়া ঘাড় তুলে স্থির হয়ে রইল। কিছুক্ষণ নীরব থেকে ক্ষিণ স্বরে বিড়বিড় করল,
–“একটু সুখ দেওয়ার জন্য সবাই শর্ত জুড়ে দেয়। অথচ সেই শর্তগুলোই হয় দুঃখে ভরপুর। আপনিও সবার মতোই সুখের পরিবর্তে নিশ্চিত কোনো দুঃখে জর্জরিত শর্ত রাখবেন, তাই না?”
তপোবন অবিচলিত। মৃদু স্বরে বলল,

–“উহু, একবার বিশ্বাস করেই দেখো।”
রূপকথা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। রক্তাভ চাহনিতে এঁটে যায় লোকটির সুদৃঢ় মুখাবয়ব। তাকে সুখ এনে দিতে পারার ক্ষমতায় অদ্ভুত অহমিকা ঐ চোখেমুখে। রূপকথা আরেকবার বিশ্বাস করল। ক্ষীণ স্বরে শুধায়,
–“কি শর্ত?”
দৃষ্টিতে দৃষ্টি এঁটে থাকা পুরুষটি স্মিত হাসল। হাসিটা ভীষণ স্নিগ্ধ! কিন্তু তার থেকেও অধিক স্নিগ্ধ ছিল তার বলা শর্তটি,
–“বউ সাজতে হবে।”
রূপকথার ক্লেশে জর্জরিত চাহনি কৌতূহলী হলো। অস্ফুটে শুধাল,
–“কেন?”
–“এই পৃথিবী থেকে লুকাতে চাও?”
–“হুঁ।”
–“তবে বিনা প্রশ্নে শর্ত মানতে হবে।”
রূপকথা নির্বাক, নিস্তরঙ্গ! তপোবন ফের বলল,
–“যত তাড়াতাড়ি বউ সাজবে, তত তাড়াতাড়ি এই নৃশংসতা থেকে লুকাতে পারবে।”
রূপকথা ফিরে তাকায়। রূপকথার মাঝে কোনো উদ্বেগ না দেখে তপোবন এবার সাগ্রহে বলল,
–“আমি সাজিয়ে দেব?”
রূপকথা তবুও নিরুত্তর। তপোবন এবার আর অনুমতির অপেক্ষা করল না, বরং উঠে গিয়ে কাবার্ড থেকে বেনারসি সহ বিয়ের সবকিছু বের করল। যেগুলো একদা তার চোখের সবচেয়ে অনাগ্রহী তৈজসপত্র ছিল, আজ সেই তৈজসপত্রগুলো ঐ দুঃখী মেয়েটির বদনে দেখার জন্য সে উদগ্রীব।
তপোবন ব্লাউজ, পেটিকোট নিয়ে জোরপূর্বক মেয়েটির হাতে ধরিয়ে দিল। তাড়া দিয়ে বলল,

–“দুই মিনিটে পরে বের হবে।”
রূপকথা কান্না ভুলে ফ্যালফ্যাল করে অবলোকন করে লোকটির কার্যক্রম।
তপোবন নিশ্চল মেয়েটিকে দেখে বলল,
–“কি হলো, আমি পরিয়ে দেব? দাও।”
তপোবন ফের ব্লাউজ পেটিকোট নিতে গেলে মেয়েটি শক্ত করে তা আঁকড়ে ধরল। নীরব সম্মতি বুঝে নিলো তপোবন।
–“তাড়াতাড়ি পরে বের হও।”
তপোবন চেঞ্জিং রুমের শাটার লাগিয়ে বের হতে গিয়েও আবার শাটার খুলে দিল। কপাল কুঁচকে বলল,
–“এটা অপ্রয়োজনীয়! খোলাই থাক।”
ভীষণ অদ্ভুত কথা! রূপকথা ভ্রু কুঁচকে নেয়, স্থবিরতা ভেঙে উঠে গিয়ে ঠাস করে শাটার বন্ধ করে দিল। তপোবন নিঃশব্দে হাসল। মেয়েটির পরিবর্তনের মাঝে নিজেও ঝট করে একটা কালো হাফ হাতার টি-শার্ট আর কালো ট্রাউজার পরে নেয়।
মুহূর্তেই গতরে আঁছড়ে পড়ে একটু নবযৌবনের উদ্দামতা।
আরশিতে নিজেকে এক পলক দেখে তপোবন স্মিত হাসল। চুলে হাত গলাতে গলাতে নিজেকে আরেকটু পরিপাটি করে।
খানিক বাদে অতি সতর্কতায় শাটার খুলে গেল। তপোবন ফিরে তাকালো। শাটারের ওপাশ থেকে শুধু দুটি অশ্রুসিক্ত মায়াবী চোখ দৃশ্যমান। সে তাড়া দিল,

–“তাড়াতাড়ি বাইরে এসো।”
রূপকথা মাথা নাড়ল। সে এতটুকু বুঝতে পারছে লোকটা আজ বউ না সাজিয়ে তাকে ছাড়বে না। তাই নাকোচ করে বলল,
–“আমায় শাড়ি দিন।”
–“উহু, এই অফার অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছে। এখন আমি শাড়ি পড়াব, ফাস্ট!”
রূপকথা গায়ে শাড়ি পেঁচিয়ে বেরিয়ে আসে। এবং ধীরস্থির মনে হলো তার দুনিয়াটা সত্যিই একটু একটু করে আবেশিত হয়ে আসছে কারোর মোহে। বদন আড়াল করে রাখা শাড়িটা দেহচ্যুত হতেই রূপকথা ঝট করে চোখ বন্ধ করে নিলো। কৃত্রিম আলোয় জ্বলজ্বল করা ঘরের ঠিক মাঝখানে যেন ছোট্ট একটা হাতেগড়া মাটির পুতুল দাঁড়িয়ে আছে। তপোবন স্মিত হেসে আলগোছে বেনারসির আঁচলটা গায়ে তুলে দিল।
রূপকথা অনুভব করল, কেউ অত্যন্ত নিপুণভাবে তার কোমরে শাড়ির কুঁচি গুঁজে।
কর্ণকুহরে আন্দোলিত হয় সহজ সাবলীল কণ্ঠ।
–“তুমি জানো আমি অনেক সুন্দর শাড়ি পড়াতে পারি?”
–“জানি।”
তপোবন অবাক হলো। অবাক কণ্ঠে শুধায়,
–“কি করে‌ জানো?”
রূপকথা আঁখিদ্বয় মেলে তাকায়‌। ক্ষীণ স্বরে বলতে নিলো,
–“তানশানের…
তার কথা অপূর্ণ রয়ে গেল তপোবনের ব্যগ্র কণ্ঠে,

–“তানশানের ফুপিকে ছোটবেলায় শাড়ি পড়িয়ে দিতাম, বউ সাজাতাম।”
রূপকথা শান্ত দৃষ্টি ফেলল অতি সন্তর্পণে তার কথার বান ঘুরিয়ে দেয়া চৌকস লোকটির দিকে।
তপোবন শাড়ি পড়াতে পড়াতে বলে রোজের ছোটবেলার কথা।
–“রোজ ছোটবেলায় বউ সাজতে খুব পছন্দ করত। আর আমি সবসময় তাকে বউ সাজিয়ে দিতাম।”
কুঁচি গোঁজার ঠিক পরমুহূর্তে তপোবনের কথারা খানিক গতি হারালো। ফর্সা উদরে তখনো জ্বলজ্বল করছে লালচে ক্ষিপ্র খামচির দাগ। তপোবন আলতো হাতে ছুঁয়ে দিল নিখুঁত বদনে লেপ্টে থাকা খুঁত টিকে।
অনতিবিলম্বে বীভৎস অনুভূতি আঁছড়ে পড়ে দু’জনের মাঝে। বিগত রাতের পাশবিক স্মৃতিগুলো আবার যেন জীবন্ত হয়ে উঠতে চাইল। কিন্তু সেই অন্ধকারকে নিমিষেই ধুয়ে দিল তপোবনের এক অভাবনীয় স্পর্শ।
ঘৃণ্য সেই স্মৃতির ওপর প্রলেপ লাগিয়ে দিল স্বামীর এক গভীর ও পবিত্র ছোঁয়া। তপোবনের তপ্ত অধর অতি সাবধানে ছুঁয়ে গেল রূপকথার উদরের সেই ক্ষতবিক্ষত স্থানটি। শিউরে উঠল রূপকথা। পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির সারা শরীরে যেন এক বিদ্যুৎ তরঙ্গ খেলে গেল।
তপোবন উঠে দাঁড়ায়। লাজে রাঙা মেয়েটির মুখশ্রীপানে মুগ্ধ দৃষ্টি ফেলে হাতে কানে গলায় ছোট্ট ছোট্ট কিছু গহনা পড়িয়ে দিল। অতঃপর ঘোমটা টেনে দিলে রূপকথা আড়ষ্টতা ভেঙে আয়নার পানে চোখ মেলে তাকালো।
আরশিতে ভেসে ওঠা ভীষণ সাদামাটা একটা ছোট্ট বউ দেখে বলল,

–“এটা বউ?”
মেয়েটির পাশে বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকা তপোবন মাথা নেড়ে বলল,
–“হু, আমার বউ।”
কর্ণকুহরে ‘আমার বউ’ কথাটি বারংবার আন্দোলিত হলো। রূপকথা আড়ষ্ট কণ্ঠে বলল,
–“বউরা অনেক সাজে।”
–“আমার বউকে অনেক সাজে নয় বরং লাজে বউ বউ লাগে। এতটুকুই যথেষ্ট তার অপার্থিব সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলার জন্য। এই স্নিগ্ধতাই যথেষ্ট। আর আমার মুরুব্বি তো এখন লজ্জায় লাল হয়েই আছেন।”
আরেকদফা আঁছড়ে পড়া লাজ সামলে রূপকথা নত শির কোণা চোখে তাকালো। সে জানে এই পুরুষটি ক্ষমতাধর; কিন্তু ঠিক কতটা আধিপত্য বিস্তার করলে মানুষের মস্তিষ্ক এভাবে অসাড় হয়ে যায়? অন্তঃস্থলের দহন, বিশ্বাসঘাতকতার যন্ত্রণা সেগুলো কেন মস্তিষ্ক গ্রাস করছে না? কেন সর্বদা লোকটির দেয়া প্রেমময় অনুভূতির আধিপত্য?
লাজে রাঙা মেয়েটি ঘোর লাগা দৃষ্টি থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। চঞ্চল দৃষ্টি ফেলে শুধাল,

–“কেন শাড়ি পড়িয়েছেন?”
–“দেখতে?”
–“কেন? আগে কখনো শাড়ি পড়া দেখেননি?”
–“শাড়ি পরা দেখেছি, কিন্তু ‘বউ’ সাজে দেখিনি। সেবার তোমাকে বধূবেশে দেখার মতো মানসিক পরিস্থিতি বা ইচ্ছা কোনোটাই আমার ছিল না। কিন্তু এখন…”
–“কিন্তু এখন কি তবে জোরপূর্বক সেই ইচ্ছা পূরণ করছেন?”
তপোবনের সুপ্ত অভিমানী ঠোঁটে স্মিত হাসি ফুটে উঠল। সে ধীর স্বরে বলল,
–“উহু, আমার জীবনের রঙ ফিকে হয়ে গেলেও তোমার জীবনকে রঙিন রাখার দায়িত্ব এখন আমার। তাই প্রিয় মানুষকে সাথে নিয়ে আজ থেকে পথচলা শুরু হবে নতুনভাবে—যেখানে থাকবে না কোনো পিছুটান, কলুষতা কিংবা অন্ধকারের ছায়া।”
রূপকথা অস্থির নয়নে তাকাল। অস্ফুটে বলল,
–“দেখা তো শেষ, এখন কি শাড়িটা খুলে ফেলব?”
–“তুমি খুলবে নাকি আমি?”
গম্ভীর স্বরে করা তপোবনের এই নিঃসংকোচ স্বীকারোক্তিতে রূপকথা স্তম্ভিত হয়ে গেল। সে তোতলাতে তোতলাতে বলল,

–“মজা করছেন কেন? আমি… আমি পোশাক বদলে আসছি।”
রূপকথা পালাতে চাচ্ছিল অদ্ভুত মোহগ্রস্ত মুহূর্তটি থেকে। কিন্তু এক ঝটকায় তাকে বাহুডোরে আগলে নিলো তপোবন। কাঁধে রুক্ষ একটা থুতনি ঠেকলো অতি সন্তর্পণে। তপোবন ফিসফিসিয়ে বলল,
–“আমি মোটেও মজা করছি না, মুরুব্বি। আপনাকে কষ্ট করে খুলতে হবে না। আপনার কষ্টগুলো আমায় সঁপে দিন। দেবেন কি? যাবেন আমার সাথে একটা অন্য দুনিয়ায়? যেখানে দুনিয়াবি কোনো নৃশঃসতা আমাদের পিছু নিতে পারবে না! কারণ ওখানে সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত সবচেয়ে শক্তিশালী অনুভূতি দ্বারা বেরিবাঁধ টেনে রাখা। যেই অনুভূতি বলয়ে শুধু আপনি আর আমি থাকব।”
রূপকথা বোধহয় এই অমোঘ বাক্যগুলো থেকেই পালাতে চেয়েছিল। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। তার অবাধ্য মনটি বহু আগেই এই চৌকস পুরুষটির আয়ত্তে চলে গিয়েছে। দেহ যেন আপন সত্তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে স্বামীর বাহুডোরে নিজেকে সঁপে দিল। যে দুর্বৃত্তকারীর কাছ থেকে সে দূরে থাকতে চেয়েছিল, এখন তার বুকেই সে মুখ লুকিয়ে শান্তির খোঁজ করছে।
ঘরটিতে অন্ধকার নামলো। তবে এ যেন কোনো কৃষ্ণপক্ষ নয়, বরং এক নতুন আলোর প্রারম্ভ।
নরম শয্যায় রূপকথার দেহ লেপ্টে রইল। সমীরণ ভারী হয়ে উঠল দুজনের তপ্ত নিঃশ্বাসের টানাপোড়েনে।
আঁখিদ্বয়ে খরখরে দু’টো অধর ছুঁয়ে গেল, একে একে ছুঁয়ে গেল পুরো মুখশ্রী। প্রতিটি স্পর্শ যেন মেয়েটির হৃদয়ে জমে থাকা ক্লেশ শুষে নিয়ে আশ্বাস দিল— ‘কিছু হয়নি, সব ঠিক হয়ে যাবে।’
সেই মোহাচ্ছন্ন মুহূর্তের প্রখরতায় রূপকথার চোখের কোণ অজান্তেই ভিজে উঠল। তপোবনের প্রতি গভীর অনুরাগের মাঝেও তার কানে বিষের মতো বিঁধছে ‘চরিত্রহীন’ নামক সেই ঘৃণ্য অপবাদটি। সে অশ্রুভেজা নয়নে তাকিয়ে ক্ষীণ স্বরে বলল,

–“আমি চরিত্রহীন নই।”
অনুভূতির কঠিন টানাপোড়েনে থাকা সেই মুহূর্তে তপোবন এই ঘৃণ্য শব্দটি মানতে পারল না‌।
–“শশশ! একদম এই শব্দটাকে উচ্চারণ করবে না। এই চোখদুটো দেখে লুকিয়ে থাকা ঐ মন পড়তে জানি আমি। বিয়ের প্রথম দিন থেকে যার চোখে আমার জন্য কোনোদিন ঘৃণা ছিল না, সেই চোখ কখনো আমায় ফাঁকি দেবে না। আমায় কৈফিয়ত দিতে হবে না।”
রূপকথা জানত এই মানুষটা কখনো তাকে অবিশ্বাস করবে না। সে অশ্রুভেজা নয়নে আলতো হেসে বলল,
–“কখনো ছেড়ে যাবেন না আমায়।”
তপোবন স্মিত হেসে তার নাকের ডগায় ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলল,
–“এই বুড়ো তার মুরুব্বিকে ছেড়ে কোথায় যাবে?”
তপোবন হঠাৎ করেই শুধাল,
–“ভালোবাসো?”
গুরুগম্ভীর কণ্ঠে রূপকথা চোখ মেলে তাকায়। কপাল কুঁচকে বলল,
–“না, বুড়ো লোককে কেন ভালোবাসব?”
চপল কণ্ঠে মেয়েটির রাগের বশে করা সম্বোধনে তপোবনের মুখশ্রীর গাম্ভীর্যতা ভেদ করে ঠোঁট ঠিকরে হাসি বেরিয়ে আসে। তবুও গাম্ভীর্যতা আঁকড়ে ধরে শুধায়,

–“কখনো যদি মনে হয় আমি তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় পিছুটান?”
–“আমি সেই পিছুটান নিয়েই থাকতে পছন্দ করব।”, রূপকথার দ্বিধাহীন কণ্ঠ তপোবন মৃদু হেসে বলল,
–“আমায় ছেড়ে কখনো যাওয়া চলবে না।”
–“আপনি ব্যতীত আমার আর যাওয়ার জায়গা নেই। আর না আমি যেতে চাই। যাওয়ার হলে বিয়েই করতাম না। আর বিয়ে যখন করেছি, তখন স্বামী ছাড়া দ্বিতীয় কোনো কিছু আমি চিন্তাও করতে পারি না। আমি এই বুড়োর সাথেই আজীবন থাকতে চাই, তার পাকা চুলগুলোতে মেহেদি লাগাতে চাই, সে যখন বার্ধক্যে পরিণত হবে— তখন তার ঢাল হতে চাই।”
ব্যস, তপোবনের জন্য অতটুকুই যথেষ্ট ছিল। প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার সুযোগ পেল না মেয়েটি। শাড়ির আঁচল তখন পুরুষালী হাতের মুঠোয়…।
বস্ত্রহীনতার আবেশে রূপকথা বিবশ হয়ে এলো। লাজে জর্জরিত মেয়েটি তাকায় সম্মুখের আলোয় সুদৃশ্যমান মুখটির পানে। পুরুষালী দৃষ্টি তার চোখ থেকে সরতেই রূপকথা সরব বা হাতে চেপে ধরে তপোবনের আঁখিদ্বয়।
তপোবনের ওষ্ঠকোণা বেঁকে গেল। জোরপূর্বক নিজের চোখের উপরে থাকা ছোট্ট হাতটি হাতের মুঠোয় নিয়ে নেয়। ড্রিম লাইটের মৃদু আলোয় স্পষ্ট রূপকথার লাজুক মুখটি তখন এক জীবন্ত চিত্রকর্ম। মেয়েটির নাকে নাক ঘঁষে তপোবন সম্মোহিত কণ্ঠে বলল,

–“আপনার সব আবদার শিরোধার্য, মুরুব্বি!”
রূপকথার ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটে উঠল। অতঃপর রূপকথা সত্যিই জাগতিক পাশবিকতা ভুলে বসল।
অসম বয়স, খুঁত, জড়তা উপেক্ষা করে দু’জন মরিয়া হয়ে ওঠে এক ভালোবাসাময় উপসংহার গড়তে। যেই উপসংহারে থাকবে না কোনো কলুষতা আর দুঃখের ছায়া। থাকবে শুধু নতুন করে পাওয়া কিছু ভালোবাসাময় প্রাপ্তি। হয়তো পিছু ফিরে তাকাতে হবে ফেলে আসা একফালি দুঃখের দিকে, কিন্তু তবুও সামনে তাকালে মুখে ফুটবে এক টুকরো স্নিগ্ধ হাসি।

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৮

কিন্তু সব থাকতেও কেন জানি আমারা জীবনে কোথাও না কোথাও অতৃপ্ত থেকেই যাই। এত সুখময় সময়েও রূপকথার লাজুক মুখ দেখে তপোবন নিজের অতৃপ্ততা গুলোকে তীব্রভাবে অনুভব করতে পারছে।
তপোবন ছলছল নেত্রে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল রূপকথার পানে। মেয়েটির সারা অবয়ব জুড়ে তখন এক পবিত্র লাজুকতার আল্পনা। রূপকথার এই লাজুকতার বিপরীতে পূর্বা ছিল দুরন্ত চঞ্চল, দুষ্টুর শিরোমণি।
অথচ আশ্চর্যের বিষয়, রূপকথার এই শান্ত আড়ষ্টতাকেও তপোবন ঠিক ততখানি গভীরভাবে অনুভব করতে পারছে।
এই দুইজন মানুষ দুই রকম অনুভুতি লালন করে তার মনে। ভালোবাসার পরিমান পরিমাপ করতে গেলে কেউ কারোর প্রতি এক রত্তি পার্থক্য খুঁজে পাবে না। দু’জন ই তার কাছে মূল্যবান এবং অবর্ণনীয় সুন্দর।
সে ছলছল নেত্রে আলতো হেসে নিজমনে আওড়ায়,
–“সে ছিল আমার জীবনের প্রাতঃকালের মিষ্টি প্রারাম্ভ এবং অপরাহ্নে সৃষ্টিকর্তার দেয়া সবচেয়ে সুন্দর উপসংহার হয়ে তুমি এসেছ। আর এই দু’জন দ্বারাই আমি পরিপূর্ণ।”

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৪০