অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৯
তোনিমা খান
দুঃখ আসে সুখের মাহাত্ম্য বোঝাতে। মৌনতা ও তার পরিবার তখন এক জরাগ্রস্ত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই কোনো এক অজ্ঞাত রাজকুমারের বেশে কেউ একজন তাদের জীবনে সুখের পরশ হয়ে এলো। মৌনতা সেই আগন্তুকের নাম, পরিচয় কিংবা অবয়ব—কিছুই জানত না; শুধু জানত, মানুষটা এক পশলা প্রশান্তির নাম।
মধ্যবিত্ত পরিবারের আত্মসম্মানবোধ এক অদ্ভুত অলঙ্কার। মৌনতার বাবা ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর আকস্মিক অসুস্থতায় তখন আর্থিক অবস্থা একদম শোচনীয়। চিকিৎসার খরচ চালিয়ে তিনবেলা খাবার জোটানোই দায় হয়ে পড়ল। কিন্তু তবুও তাদের হাসিমুখ আর চলন-বলন কাউকে সেই দৈন্যতা বুঝতে দেয়নি। এটাই বোধহয় মধ্যবিত্ত পরিবারের একটা চমৎকার দিক। তারা অনাহারে মরতে রাজি, কিন্তু সম্মানের সম্বলটুকু বিসর্জন দিতে নারাজ।
সেদিন ক্রিকেট বলের প্রকাণ্ড ক্ষিপ্র আঘাতে মৌনতার মাথা ফেটে রক্তারক্তি কাণ্ড হলো। পারিবারিক অস্থিতিশীলতার মাঝে সেটা আরেকটা ধাক্কা ছিল মৌনতার পরিবারের জন্য। তবে মৌনতার পরিবার হাসপাতালে আসার আগেই অজ্ঞাত অপরাধী চিকিৎসার সব খরচ মিটিয়ে উধাও। মৌনতার জ্ঞান ফিরলে রেগেমেগে গালি দিতে ভোলেনি অজ্ঞাত লোকটিকে।
তার যে সামনে ফাইনাল পরীক্ষা, উপরন্তু বাবা গুরুতর অসুস্থ। বাড়ি ফিরলে মাথার ব্যথা আরো যন্ত্রণাদ্বায়ক হয়ে উঠল। সারারাত ছটফট করল, ঘুমাতে পারল না। কিছু খেতে ইচ্ছে করলেও খেতে পারল না। ঘরে ভাত ছাড়া আর কিছুই নেই।
সেই রাতে দোতালার খোলা বারান্দায় বসে মৌনতা ভীষণ কেঁদেছিল। কাঁদতে কাঁদতে পণ করেছিল এরপর থেকে যদি পাশের মাঠে কাউকে খেলতে দিয়েছে তবে তার নাম ও মৌনতা নয়।
তবে সৃষ্টিকর্তা দুঃখ দিলে তা নিরসনের মাধ্যম ও দেয়। আঁধারে নিমজ্জিত বারান্দায় বিকট শব্দতুলে কিছু পড়তেই কাঁদতে থাকা মৌনতা ধড়ফড়িয়ে উঠল। ভয়ার্ত নয়নে চেয়ে দেখল বারান্দায় সাদা একটা প্লাস্টিক ব্যাগ ছুঁড়ে মেরেছে কেউ। সে তৎক্ষণাৎ রেলিং আঁকড়ে নুইয়ে যায়। জনমানবহীন নিস্তব্ধ রজনীতে চারিদিকে ভয়ার্ত দৃষ্টি ফেলে গলা উঁচিয়ে শুধাল,
– এই কে রে?
কোনো সাড়াশব্দ এলো না। সে হাঁটু গেড়ে বসে দুরুরুবুকে ফোনের লাইট জ্বালিয়ে প্যাকেটটা খুলল। খুলতেই অবাক হয়ে গেল। সেখানে চকলেট, কুকিজ, ড্রাই ফ্রুটস, চুলের বাহারি রকমের ব্যান্ড , ক্লিপ আর সাথে একটা কাগজ। সে কাগজটির ভাঁজ খুলতেই তার ললাটের ভাঁজ দৃঢ় হলো।
– রাজকুমারীকে দুঃখ দেয়ার অপরাধে রাজকুমারের আজন্ম কারাদণ্ড হোক। প্রেমময় কারাদণ্ড! তবুও রাজকুমারীর চোখে জল না আসুক।
মৌনতা অবাক হয়ে গেল পরের লাইনে থাকা ছোট্ট সম্বোধনে।
-হেই রূপাঞ্জেল! মাথায় খুব ব্যথা করছে বুঝি? আ’ম স্যরি। আর কখনো রাজকুমারীকে দুঃখ দেব না।
মৌনতার তড়িৎ গতিতে বারান্দা থেকে উঁকি দিল। কোথাও কেউ নেই। এটা সেই অসভ্য লোক! যে তার মাথা ফাটিয়েছে? নিশ্চিত কোনো নেশাখোর! যে কি-না এই রাতে এসে তার সাথে নাশকতা করছে।
সে আকাশ পাতাল চিন্তা বাদ দিয়ে খাবারগুলো নেড়েচেড়ে দেখল। প্যাকেট ইনটেক! তারমানে কোনো ক্ষতি নেই খাবারগুলো খেলে। মৌনতা চোখের পানি মুছে নেয়। পা গুটিয়ে মেঝেতে বসে গোগ্রাসে খেতে লাগল খাবারগুলো। যেন একটু খাবারের জন্য সে তৃষ্ণার্ত ছিল।
তমসা কেটে অম্বর ধূসর হতে শুরু করেছে। কিন্তু তখনো বারান্দায় বসা দুঃখি রাজকুমারীটি চেটেপুটে চকলেট খাচ্ছে।
লুকিয়ে থাকা পুরুষালী অবয়বটি ম্লান হলো তাকে এভাবে খেতে দেখে। মনে অজানা প্রশান্তি নামল নিজের এহেন ছ্যাঁচড়া কর্মে। জীবনে প্রথমবার কাউকে লুকিয়ে দেখা, রাতভর তার বাড়ির সামনে পায়চারি করা এসব নিতান্তই ছ্যাঁচড়ামো ছিল এরোজের কাছে। তবে প্রেমে পড়লে বোধহয় মানুষ নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে অন্য কারও প্রয়োজনে বিলীন হতেই বেশি আনন্দ পায়।
নিজের উপর আর রাগ হলো না এরোজের। বরং মনে হলো তার এই ছ্যাঁচড়ামোটুকু কারোর প্রয়োজন ছিল।
খেয়েদেয়ে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়েছে মৌনতা। পুরুষালী ওষ্ঠকোনা আলতো বেঁকে যায় আদুরে মেয়েটির কর্মকান্ডে।
মৌনতার ঘুম ভাঙলো মায়ের হাক ডাকে। মৌনতা ব্যথাতুর নিঃশ্বাস ফেলে সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মায়ের পানে তাকায়।
– কী হয়েছে আম্মা? এত সকালে ডাকছ কেন? সারারাত ঘুমাতে পারিনি।
মাসুমা বেগম তাড়া দিয়ে বললেন,
– ডাক্তার এসেছে তোর চেকআপ করতে তাড়াতাড়ি ওঠ।
– ডাক্তার এসেছে মানে? তুমি আবার ডাক্তার আনিয়েছ কেন? আমি একটু রেস্ট নিলেই ঠিক হয়ে যাব।
মৌনতা উঠতে উঠতে বলল। মাসুমা বেগম বললেন,
– আমি আনিনি ডাক্তার। যেই ছেলে তোর মাথা ফাটালো সেই নাকি গতকাল ডাক্তারকে অতিরিক্ত ফি দিয়ে রেখেছে যেন সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তোর চেকআপ করে যায়। কত ভালো ছেলেটা! মানুষ তো অপরাধ করেই পালিয়ে যায় এত চিন্তা কেউ করে?
মৌনতা আশ্চর্য না হয়ে পারল না। গতরাতের করা অদ্ভুত কর্মকাণ্ড আর এখনকার করা এহেন কর্মে একটু হলেও মনে জমা ক্রোধ কমলো। ডাক্তারকে দেখে আরেকদফা ভ্রু কুঁচকালো মৌনতা। ডাক্তার রোগী দেখতে এসেছে দু’হাত ভরতি খাবার, ফলমূল নিয়ে। এসব কী হচ্ছে?
সময় গড়ায় আর এভাবেই একের পর এক প্রশ্ন, কৌতুহল এভাবেই জমতে থাকল মৌনতার মনে। টানা তিনশো পঁয়ষট্টি দিন! রোজ তার বারান্দায় এমনি খাবার আর চুল বাঁধার বাহারি রকমের জিনিসে ভরতি একটা প্যাকেট থাকে। সাথে থাকে ‘রূপাঞ্জেল’ সম্বোধনে একটা চিরকুট। চলার পথে অজানা অচেনা ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের ফুল দেয়া, উপহার দেয়া, মাঝেমধ্যে ভীড়ের মাঝে ভাবী বলে ডেকে ওঠা…এমনি নিত্যনতুন অদ্ভুত আচরণে মৌনতা প্রতিনিয়ত অনুভব করতে লাগল তাকে কেউ সর্বদা চোখে চোখে রাখছে। তার প্রতিটা পদক্ষেপ কেউ অনুসরণ করছে। আর সেটা যে তার মাথা ফাটানো ওই লোকটা তাও বুঝতে পারে। কিন্তু হাতের নাগালে কখনোই পেতো না।
বহুবার খোঁজ করেছে ক্রিকেট খেলতে আসা ছেলেদের কাছে গিয়ে। কিন্তু কেউ বলেনি মানুষটা কে!
মানুষটার দেয়া শেষ চিঠিটা ছিল অসহনীয় প্রতীক্ষার অবসানের ছোট্ট একটা বার্তা। যেই একটা বার্তা আঁকড়ে ধরে মৌনতা নিজের সকল কৌতুহল দমিয়ে রেখেছিল।
“যেদিন আপনার সামনে আসব সেদিন একদম বর সেজে আপনাকে নিতে আসব। খোঁজাখুঁজি বন্ধ করে দিন আর নিজেকে তেরি করুন। সবচেয়ে সুন্দর রাজকুমারীটিকে বধূসাজে দেখার জন্য আমি তৃষ্ণার্ত হয়ে আছি। বউ সাজবেন তো?”
স্মৃতির পাতা থেকে বর্তমানে ফিরতেই মৌনতার রুগ্ন অবয়ব কেঁপে উঠল। ডায়েরির পাতায় সেই ছয় বছর আগের চিরকুটের হুবহু প্রতিচ্ছবি। সে অস্ফুট স্বরে আওড়ালো,
– এটা হতে পারে না… নায়েলের চাচু সেই মানুষটা হতে পারে না!
মৌনতা অবিশ্বাস্য নয়নে এক একটা পাতা উল্টাতে লাগল। যেন সে ডায়রির ঠুনকো কোনো পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছে না বরং সে যেন ছয় বছর আগের নিজের জীবনে অবহেলায় ফেলে আসা এক বছরের প্রতিটা দিন উল্টাচ্ছে। উল্টাতে উল্টাতে শেষ পাতায় আসতেই মৌনতা শব্দ করে কেঁদে উঠল।
“আপনি আমার জন্য অপেক্ষা করেননি, রূপাঞ্জেল। আপনি বউ তো সেজেছেন কিন্তু আমার জন্য সাজেননি। আপনাকে বউ সাজে দেখা আমার জন্য এতটা যন্ত্রণাদায়ক হবে জানলে কখনো আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে এই আবদার করতাম না।”
মৌনতা হেঁচকি তুলতে তুলতে ডায়রিটা মুখে চেপে ধরল। নোনাজলের স্পর্শে ভিজে উঠল ডায়রির শেষ পান্নাদুটো। সে তো বউ সেজেছিল কিন্তু…বর যে তাকে নিতে আসেনি। সে তো বিয়ের আগের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিল, কিন্তু সেই অজ্ঞাত মানুষটি কোনোদিন কোনো ভিত্তি রেখে যায়নি—যে সম্পর্কের দাবি নিয়ে মৌনতা বিয়ে আটকানোর জন্য লড়াই করবে।
যন্ত্রণাদ্বায়ক স্মৃতিচারণের ঠিক সেই লগ্নে মৌনতার হাত থেকে কেউ ডায়রিটা ছিনিয়ে নিলো। মৌনতা পিছু ফিরে তাকায়। রণমূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষটি গর্জে উঠল,
– কারোর অনুমতি ব্যতীত তার ব্যক্তিগত জিনিসে হাত দেয়া চরম বেয়াদবি।
অতি আশ্চর্যে মৌনতা সর্বশান্ত হয়ে বসে আছে। সে দু দন্ড সময় নিলো। অনিমেষ চেয়ে রইল সম্মুখে দন্ডায়মান মানুষটার দিকে। একটুও বিশ্বাস হচ্ছে না, এই কঠিন অবয়ব আর উগ্র স্বভাবের মানুষটা এতটা উন্মাদের মতো কাউকে ভালোবাসতে জানে।
সে কিয়ৎকালবাদ ধিমি কণ্ঠে বলল,
– আর কারোর অনুমতি ব্যতীত তাকে নিজের ব্যক্তিগত বানিয়ে ফেলা কী ভদ্রতা?
এরোজ নিরুত্তর, নির্বাক এক পলক কঠিন দৃষ্টি ফেলে বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছবিগুলো আর ডায়রি কুড়িয়ে নিতে লাগল। যেন কোনো অমূল্য সম্পদ!
জীবনের চরম দুঃসময়ে যেগুলো তার শান্তির কারণ ছিল সেগুলো সে কখনোই হারাতে চায় না। তাতে স্বয়ং সেই মানুষটা উপস্থিত থাকলেও সে এই স্মৃতিগুলো কখনো হারাতে চায় না।
মৌনতা চোখের পানি মুছে নেয়। পুনশ্চ শক্ত কণ্ঠে বলল,
– আমি কিছু জিজ্ঞেস করেছি।
– জবাব দিতে বাধ্য নই।
এরোজের ত্যাড়া কণ্ঠে মৌনতা উদগ্রীব হয়ে বলল,
– বিয়ের আগের এক বছর আপনি আমায় চিঠি দিতেন? উপহার দিতেন? খাবার রাখতেন বারান্দায়? আপনি আমার মাথা ফাটিয়েছিলেন?
বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সব স্মৃতিগুলো ততক্ষণে এরোজ বুকের মাঝে লুকিয়ে নিয়েছে। মৌনতা অবাকচোখে দেখে সামান্য ছবি আর ডায়রির জন্য কতটা উদগ্রীব যেখানে সে স্বয়ং দাঁড়িয়ে আছে।
– ওগুলো আমারই ছবি। আপনি আমার দিকে তাকান। আমার প্রশ্নের জবাব দিন।
মৌনতার কথায় এরোজ ম্লান হাসল। ঘার ঘুরিয়ে তাকায় শারীরিক আর মানসিকভাবে বিধ্বস্ত নারীটির দিকে। ধিমি কণ্ঠে বলে,
– আপনি ছেড়ে গেলেও আপনি জড়িত এই স্মৃতিগুলো কখনো আমায় ছেড়ে যায়নি। আমার দুঃসময়ে আমায় শান্তি দিয়েছিল। আপনি আমার জন্য অপেক্ষা না করলেও এগুলো ছয় বছর আমার সঙ্গী হিসেবে থেকে গিয়েছে। এগুলো আমার কাছে খুব মূল্যবান।
চাপা অভিযোগ আফসোসে জর্জরিত কণ্ঠে মৌনতার বুক ছলকে উঠল। যেন সে কোনো অপরাধী। অথচ সেই অপরাধের ব্যপারে সে কিচ্ছু জানে না। সে ক্ষীণ স্বরে বলল,
– কখনো জানিয়েছিলেন আমায়? আমি হন্য হয়ে খুঁজেছি আপনাকে কিন্তু আপনি কখনো সামনে আসেননি। আমায় কেন দোষী সাব্যস্ত করছেন?
ধূসর নেত্রদ্বয় চিকচিক করছে। বলল,
– আপনাকে তো কোনো দোষ দেইনি। দোষ সবটা আমার ভাগ্যের। আমার ভাগ্যে কখনো ভালোবাসা সয় না। প্রিয় মানুষগুলো আমার হয়ে থাকতে চায় না।
মৌনতা হাঁসফাঁস করে উঠল অস্বস্তিকর এই কথোপকথনে। তিনমাস আগেও যাকে দেবর বলে শ্রদ্ধা করে এসেছে, তার মুখে নিজেকে প্রিয় মানুষ বলতে শোনা ভীষণ অস্বস্তিকর। সে ওড়নায় গলা মুছতে মুছতে অস্ফুট স্বরে বলল,
– এগুলো কেন করছেন?
– কোনগুলো?
– আমার আর নায়েলের প্রতি এত যত্ন, দেখভাল, এত পরিশ্রম কেন করছেন?
– আমার সুখের যত্ন আর দেখভাল আমাকেই তো করতে হবে।
সোজাসাপ্টা সেই স্বীকারোক্তিতে মৌনতা হকচকিয়ে গেল। সহাস্যে নাকচ করে বলল,
– আমরা আপনার সুখ নই। দয়াকরে অতীত ভুলে যান। আপনি একটাসময় আমার শুভাকাঙ্ক্ষী হয়ে এসেছিলেন। আমার জীবনটা অনেক সহজ করেছিলেন তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু বর্তমান ভিন্ন। আমার জীবন অনেক জটিল। দয়াকরে আর জটিল করবেন না। আপনি আমার এক্স হাজবেন্ড এর ভাই। সংযত ভাষায় কথা বলুন।
এরোজ শ্রান্ত নয়নে তাকিয়ে রইল প্রিয় নারীর কঠিন মুখশ্রীর দিকে। চোখের সামনে ভাসল নিজের ছয় বছরের এক একটা দুঃসহনীয় লহমা। সে ছলছল নেত্রে চেয়ে ডেকে উঠল,
– মৌন? আপনি কী জানেন নিজের প্রিয়মানুষকে চোখের সামনে নিজের ভাইয়ের স্ত্রী হিসেবে দেখা কতটা যন্ত্রণাদায়ক? যাকে নিজের স্ত্রী রূপে অজস্র স্বপ্ন দেখেছি তাকে অন্যের ঘর করতে দেখার ব্যথা বোঝেন? বহুল কাঙ্ক্ষিত মানুষটাকে পেয়েও হারিয়ে ফেলার অনুভূতি বোঝেন? যাকে এক পলক দেখার জন্য আট ঘন্টা ট্রেনিং শেষ করে ঢাকা থেকে খুলনায় আসতাম, তার দিকে এক পলক তাকানোটাও আমার জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যায়—এই ব্যথাটা বোঝেন? যেই চুলগুলো ছোঁয়ার জন্য বিগত ছয় বছর আমি তরপেছি সেই চুলগুলোকে নিজের হাতে কাঁটার যন্ত্রণা বোঝেন? আমি এক একটা মুহুর্ত মৃত্যু যন্ত্রণা সহ্য করেছি। মৃত্যুর জন্য ছটফট করলেও মরতে পারিনি। আমার যন্ত্রণাটা এক মুহুর্তের জন্য ও বোঝার চেষ্টা করেছেন?
মৌনতার বুকটা কেঁপে উঠল এরোজের আর্তনাদ ভরা কণ্ঠে। সে অস্থির দৃষ্টি ফেলে এক পা পিছিয়ে গেল। আঁকড়ে ধরল বুক শেলফের একটা তাক।
ওই আর্তনাদভরা চোখে তাকানোর সাহস হয় না, আর না হয় ওই আর্তনাদগুলো শোনার সাহস। সে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলতে ফেলতে অস্ফুট স্বরে বলল,
– এটা চিন্তা করাও অস্বস্তিকর। আমি কখনো চাইনা এগুলো বুঝতে। ভালো হবে আপনিও মাথা থেকে এগুলো মুছে ফেলুন। আমি আসছি…
বলেই মৌনতা হন্তদন্ত হয়ে পালাতে চাইল। ঘর থেকে ছুটে বের হতে নিলেই তার হাতটি আঁটকে গেল উষ্ণ হাতের শক্ত মুঠোয়। মৌনতা অশ্রুসিক্ত নয়নে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। তেজি কণ্ঠে বলল,
– ছাড়ুন আমায়।
এরোজ আঁকড়ে ধরা হাতটি আরো শক্ত করে আঁকড়ে ধরে দুই কদম এগিয়ে আসে। ঠিক নারীটির মুখোমুখি। চোখে চোখ স্থির হয়। এরোজ অশ্রুসিক্ত নয়নে স্মিত হেসে মৃদু ঝুঁকে গেল। কানের কাছে মুখ নিয়ে ক্ষীণ তবে দৃঢ় স্বরে বলল,
– একবার ভুলের কারণে বড্ড বিদঘুটে মাশুল গুনতে হয়েছে, মৌন। আমার রুহ কেঁপে ওঠে কাটিয়ে আসা দুঃসহনীয় লহমাগুলো মনে পড়লেই। আমার মধ্যে আর একটুও শক্তি নেই আপনাকে হারানোর। এবার দরকার পড়লে ভাগ্যের সাথে লড়ে যাব, সমাজের সাথে লড়ে যাব , আপনার সাথেও লড়ে যাব—তবুও আপনি আমার থেকে দূরে যেতে পারবেন না।
শ্রান্ত নয়নে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকা মৌনতা স্মিত হাসল সেই দৃঢ় কণ্ঠে। এখন আর দ্বন্দ্ব করার ইচ্ছে হয় না। ভালোবাসার বিনিময়ে এমন এক উপহার পেয়েছে যে এখন ভালোবাসার কথা শুনলেও হাসি পায়।
সে হাসিমুখে বলল,
– আমার দূরে যেতে হবে না, সৃষ্টিকর্তা নিজ দায়িত্বে আমায় রক্ষা করে নেবে ভালোবাসা নামক বিদঘুটে অনুভূতি থেকে।”
এরোজ থমকে যায়। হাতের বাঁধন ঢিলে হতে লাগল বলহীনতায়। মৌনতা মৃদু হেসে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয়। নিতে নিতে বলল,
– কাউকে ভালোবেসে আজ মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে, আপনি নিশ্চয়ই সেই দুয়ার খুলতে এসেছেন? একই গর্ভের পুরুষ আপনারা। আপনাদের মুখে ভালোবাসার কথা শুনলে আমার রুহ কেঁপে ওঠে বিশ্বাস করুন।
বলেই মৌনতা তটস্থ পায়ে বেরিয়ে যায় কামরা থেকে। এরোজ বলহীন দেহে শুধু চেয়ে থাকে সেই গমনের পানে। ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে,
– ভালোবাসার এক নতুন রূপ দেখার জন্য হলেও আপনাকে আমার হতে হবে, মৌন।
নিজের ঘরে আসতেই মৌনতা ডুকরে কেঁদে উঠল। বিগত ছয় বছর আগের কাটানো সেই অদ্ভুত সুন্দর একটা বছর যেন আজ চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে। কত কৌতুহল, কত উচ্ছ্বাস আজ সবটা এক অস্বস্তিকর স্মৃতিচারণ।
ইমরোজ বাবার কোম্পানিতে থাখা নিজের অংশটুকু আজ অফিশিয়ালি হ্যান্ডওভার করে দিয়েছে। কিন্তু যখন ক্রেতাকে দেখল সে স্তব্ধ হয়ে গেল।
ক্রেতা হিসেবে বড় ভাইকে দেখে ইমরোজ ক্রোধে ফেটে পড়ল,
– তুমি আমার সাথে ছলচাতুরি করেছ ভাইজান। হাউ কুড ইউ ডু দিজ টু মি?
তপোবন সটান হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ভরা মজলিশে। গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলল,
– ছলচাতুরি কী করে করলাম? তুই অফিসে থাকা তোর অংশটুকু বিক্রি করে দিচ্ছিস আমি কিনে নিচ্ছি। যত টাকায় বিক্রি করতে চেয়েছিস আমি ঠিক তত টাকাই তোকে দিয়েছি, এখানে ছলচাতুরির কী হলো?
– তুমি আর দালাল মিলে আমার কাছে পরিচয় লুকিয়েছ। আমার অংশটা তুমি কিনছ জানলে আমি কখনো বিক্রি করতাম না।
তপোবন উদাসীন চোখে দেখল ভাইকে। এই সেই ভাই যে কি-না তার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ছোটবেলা থেকে কাজ করেছে? আজ এই অফিসের ক্ষতি করতেও ও দু’বার ভাবছে না।
– অফিসে বাইরের লোক ঢুকলে আমরা তিলে তিলে ধ্বংস হয়ে যাব এটা জেনেও তুই এই কথা বলছিস?
– তোমরা আমার ভালোমন্দ চিন্তা করেছ? তবে আমি কেন তোমাদের ভালোর কথা চিন্তা করব?
তপোবনের বুকটা দুমড়ে মুচড়ে গেল। মায়ের পর এই ভাইয়েরা ছিল তার পৃথিবী। তাদের এই আচরণ সে মানতেই পারে না। সে অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,
– ভাইজান, তোকে ছোট থেকে বড় করেও চিনতে পারিনি ইমরোজ।
– চিনতে পারবেও না। কারণ তোমাদের চোখে মৌনতা পর্দা টেনে দিয়েছে আমার বিরুদ্ধে। এতদিন ভাবতাম মৌনতা সাদাসিধে। এখন মনে হচ্ছে ওর থেকে চালাক আর কেউ নেই। ঘরের মানুষদের ঠিক নিজের সরলতাম কাবু করে নিয়েছে।
– খবরদার ইমরোজ। মৌনতার সাথে তোর আর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ওর নাম মুখেও নিবি না। তুই যদি সৃজার সাথে ভালো থাকতে পারিস তবে থাক। কিন্তু ওকে নিয়ে একটাও বাজে কথা বলবি না।
– কেন বলব না? ওর জন্যেই তোমরা আমায় আমার ঘর থেকে বের করে দিয়েছ। একটা বাহিরের মেয়ের জন্য।
– কারণ এতটুকু সম্মান আর ন্যায় ওর প্রাপ্য ছিল। আমরা বুদ্ধিহীন নই ইমরোজ। ভালো খারাপ চিনতে শিখেছি।
– পছন্দের মানুষ বেছে নেয়া খারাপ বুঝি?
– ভুল সময়ে ভুল মানুষকে বেছে নেয়া খারাপ। একজন বিবাহিত পুরুষের জন্য তার সবকিছু তার স্ত্রী হয়। কিন্তু তুই সেই মানটুকুই নষ্ট করে ফেলেছিস। আমি তোর সাথে বাড়তি কথা বলব না। পেপারে সাইন কর আর চলে যা। তুই যেভাবে ভালো থাকতে চাস, থাক। আমাদের কোনো সমস্যা নেই।
– আমি অনেক ভালো আছি। নিজের বাড়ি গাড়ি সব করেছি। কিন্তু তোমার ছোট ভাই আমার পিছে লেগে আছে। ওকে বারণ করে দিও। আমি মাঠে নামলে কিন্তু ওকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। ও আমার ছোট ভাই। একটু হলেও আমার ওর প্রতি সফট কর্নার আছে।
বলেই ইমরোজ পেপারে সাইন করে দিল। তপোবন সকল ফর্মালিটিজ পূরণ করে বাড়ির পথ ধরল। নাসারন্ধ্র থেকে শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস বেরোনোর শব্দ হলো।
ঘড়িতে তখন দেড়টা বাজে। পকেটে থাকা ফোনটা বাজতেই তপোবন ড্রাইভ করতে করতে রিসিভ করল।
– আব্বু, স্কুল ছুটি হয়ে গিয়েছে? তোমরা দশ মিনিট অপেক্ষা করো পাপা আসছি।
আড়ং এ অলস কদমে হাঁটতে থাকা তানশান অলস কণ্ঠে বলল,
– পাপা আড়ং এ আসো। আমরা আড়ং এ।
– আশ্চর্য! তোমরা আড়ং এ কী করছ? একা একা চলে গিয়েছ?
তানশান হতাশার সুরে বলল,
– গতকাল মিমিকে চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলাম দুই চ্যাপ্টারের সৃজনশীল প্রশ্ন এক রাতের মধ্যে সলভ করতে পারলে একটা শাড়ি কিনে দেব। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সে এক রাতের মধ্যে সব করেছে পাপা। চ্যালেঞ্জ জিতে গিয়েছে এখন উপহার না দিলে তো সে আমার মাথা খেয়ে নেবে। তাই শাড়ি কিনে দিতে এসেছি।
ছেলের কথায় তপোবন হতাশার নিঃশ্বাস ফেলল। গতকাল রাতভর ম্যাথ করার পেছনে চমৎকার মোটিভেশন তবে এটা।
গতকাল রাতে জিজ্ঞেস করেছিল,
– সারারাত ভর পড়াশুনা করার মোটিভেশন পেলে কোথায়?
প্রেক্ষিতে রূপকথা চমৎকার হেসে বলেছিল,
– তার কাছে একটা চমৎকার শক্তিশালী মোটিভেশন আছে। যেটা দিলে সে সব পড়া খুব সহজেই শেষ করে ফেলতে পারে।
স্ত্রীর চমৎকার সেই মোটিভেশন জানতে পেরে তপোবন অবাক হলো না। ছেলেকে বলল,
– এত টাকা আছে তোমার কাছে? বিল দেয়ার দরকার নেই, পাপা এসে বিল দিয়ে দেব।
– আ’ম আ বিগ বয় নাউ, পাপা। মিমিকে একটা শাড়ি কিনে দেয়ার মতো সামর্থ্য আমার আছে।
– অথচ তোমার এই টাকাটাও পাপার পকেট থেকেই এসেছে।
– মোটেই না। এটা আমার হাত খরচের টাকা। যেটা আমি জমিয়ে অনেক টাকা বানিয়েছি।
– সেটাই তো বললাম, ওটাও আমার টাকাই।
– উঁহু, এটা আমার ইনকাম। আমি ছোট মানুষ। আমি তো এভাবেই ইনকাম করব।
ছেলের কথায় তপোবন হো হো করে হেসে উঠল। বলল,
– তুমি তো দেখি তোমার মিমির সাথে থাকতে থাকতে আরেকজন ধান্দাবাজ হচ্ছো।
– তুমি এটা বলতে পারো না পাপা।
ছেলের গুরুগম্ভীর কণ্ঠে তপোবন সতর্ক কণ্ঠে বলল,
– ওকে স্যরি, পাপা। আপনারা বসুন, আমি আসছি।
তপোবন দশ মিনিটের মাথায় নিউ মার্কেট এড়িয়ার পাশে আড়ং এ পৌঁছাল। যেতেই রূপকথা হাতের শাড়িটি গায়ে মেলে ধরে বলল,
– দেখুন এটা আমায় তানশান কিনে দিয়েছে। কেমন দেখাচ্ছে আমায়?
তপোবন প্রাণবন্ত মেয়েটিকে মুগ্ধ চোখে দেখে বলল,
– তানশানের মিমির মতোই স্নিগ্ধ লাগছে।
রূপকথা ঠোঁট উল্টাল।
– এ কেমন প্রশংসা?
তপোবন চাপা স্বরে বলল,
– এই যেমন আমার সাথে থাকলে তোমায় ঠিক তপোবনের ছোট্ট বউয়ের মতো লাগে, তেমনি তানশানের সাথে থাকলে ঠিক তার ছোট্ট মায়ের মতো লাগে, বুঝলেন মুরুব্বি?
রূপকথার পছন্দ হলো প্রশংসাটুকু। মাথা নেড়ে বলল,
– বুঝেছি।
তপোবন হেসে তার নাক চেপে দিল। অদূরে ছেলে পাঞ্জাবির জায়গায় ঘোরাফেরা করছে। সে ছেলের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। বলল,
– সবসময় মিমিকেই দাও, পাপাকেও কিছু কিনে দাও।
বাবার কথায় তানশান হ্যাঙ্গার থেকে একটা পাঞ্জাবি বের করে বাবার গায়ে ধরলো। ভীষণ বিচক্ষণ চাহনিতে চেয়ে বলল,
– দেখো তো এটা তোমার গায়ে কেমন লাগছে।
ছেলের এহেন গুরুগম্ভীর আচরণে তপোবন যারপরনাই অবাক হয়ে পাঞ্জাবিটা গায়ে ধরে দেখল।
– এটা কী তুমি আমার জন্য চুজ করেছ? আমি মজা করে বললাম তো।
– আমি আগে থেকেই তোমার জন্য একটা পাঞ্জাবি খুঁজছিলাম।
– কেন?
– আমি ম্যাথ অলেম্পিয়ারে যেই টাকাগুলো পেয়েছিলাম তা দিয়ে সবার জন্য উপহার কিনছি।
– তবে তখন মিথ্যা বললে কেন?
– সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম সবাইকে।
তপোবন হেসে ছেলের বিরক্তি মাখা মুখটি দেখে। বদ অভ্যাস অনুযায়ী ছেলের সরুর নাকটাও চেপে দিয়ে বলল,
– আমার ছেলে বড় হয়ে গিয়েছে। পাপাকে সারপ্রাইজ দিতে চায়। ভাবা যায়, কী সাংঘাতিক ব্যাপার?
তানশান লাজুক হাসল বাবার কথায়। বাসার সবার জন্য উপহার কিনল তানশান। তপোবন একদমই বারণ করল না। এভাবেই তো পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধ জন্মায়।
নিজের দমে বিজনেস গড়ার পরিকল্পনায় ইমরোজ বহুদূর এগিয়েছে। কিন্তু ভাইকে যে জোরগলায় বলে আসল, সে ভালো আছে। সত্যিই কী ভালো আছে? নাকি জীবন তাকে বোঝাচ্ছে প্রকৃত জীবনসঙ্গী আর শয্যাসঙ্গিনীর মধ্যে পার্থক্য?
ঘরে ঢুকতেই কাজের বুয়া ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
– ভাইজান, ওই টেবিলে খাবার সব রান্না কইরা সাজাইয়া রাখছি। ভাবি কইছে, আপনি আপনার মতো খাইয়া নিয়েন। আমি গেলাম, এহনো এক বাড়িতে কাজ কইরা নিজের বাড়ি ফিরতে হইবে। সেইখানে আবার রাজ্যের কাজ।
– সৃজা কোথায় গিয়েছে এই দুপুর বেলায়?
ইমরোজ শ্রান্ত কণ্ঠে বলল।
– ভাবি তো সকাল থিকাই ঘরে নাই। সাইজা পুইড়া কোথায় জানি গেল!
– ওহ্।
কাজের বুয়া চলে গেল। ইমরোজ গোসল করে এসে বিশাল বাড়ির ডাইনিং টেবিলে এসে বসল। যেখানে আগে মৌনতা পারলে মুখের উপর খাবার উঠিয়ে দিতো সেখানে আজ নিজেই ভাত বেড়ে নিচ্ছে। মাংস মুখে দিতেই ইমরোজ উটকো গন্ধে চোখমুখ কুঁচকে নিলো। আভিজাত্যের মাঝে বেড়ে ওঠায় কাজের লোকের হাতের রান্না খেতে অভ্যস্ত না।
ইমরোজ মাংস তুলে রেখে ডাল নিলো। তা যেন হলুদ দেয়া পানি শুধু। সবজি আর খেতে ইচ্ছে হলো না। হাত ধুয়ে উঠে গেল।
বিশাল এক আলিশান বাড়ি, খাবারের অভাব নেই তবুও রিজিকে খাবার জুটলো না। শান্তি নেই, চারিদিকে শুধু শূন্যতা। সে সৃজাকে ফোন লাগালো। ব্যস্ত দেখালো ফোনটা। বিক্ষিপ্ত মেজাজ নিয়ে সে বিছানায় গিয়ে ধপ করে শুয়ে পড়ল। এখন আর ঘুমালে কেউ পিঠের উপর উঠে লাফালাফি করে না, কানের কাছে পাপা পাপা বলে রব তোলে না, কোনো নারী কণ্ঠ তার পাছে পাছে ঘুরে ঘুরে এটা জিজ্ঞাসা করে না যে—ইমরোজ পেট ভরেছে? খাবার কেমন হয়েছে?
ইমরোজ ঘুমাতে পারল না। এদিক ওদিক করছে শুধু। ফের ফোন দিল সৃজাকে। এবার রিসিভ হলো। সৃজা বিরক্তি নিয়ে বলল,
– এতবার ফোন করছ কেন ইমরোজ? সুপ্তির শশুর বাড়ির মানুষের সাথে দেখা করতে এসেছি। বিরক্ত করো না।
ইমরোজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
– কই আমায় তো কিছু বললে না? আমি যাব না তাদের সাথে দেখা করতে?
– তুমি এখন দেখা করে কী করবে? তোমার আকদের দিন দেখা করলেই হবে।
সুপ্তির বিয়ে ঠিক হয়েছে। ছেলে বিদেশে থাকে। সুপ্তিকেও সাথেই রাখবে। বিত্তশালী পরিবার। বিয়েতে খরচ ও তেমনি হবে। সবটা তাকেই করতে হবে অথচ প্রথমবার পারিবারিক মিটিং এই তাকে রাখার প্রয়োজন বোধ করেনি।
সে অভিব্যক্তি প্রকাশ করল না বরং হঠাৎ করেই বলল,
– আমার বাচ্চা চাই, সৃজা। আমরা এখন থেকেই ট্রাই করব। নায়েলের কাস্টিডি পেতে আমার অনেক বেগ পোহাতে হব। আমার একা একা ভালো লাগছে না।
সৃজা শুকনো ঢোক গিলল। চাপা স্বরে বলল,
– এই মুহুর্তে এই কথা বলা কী খুব প্রয়োজন ইমরোজ? বাসায় আসি তখন কথা হবে।
সে ফোনটা কেটে দিল। ইমরোজ তবুও অস্থিরতা দমাতে পারছে না। চারিদিকে এই শূন্যতা। সব থেকেও নেই এটা তাকে বড্ড পীড়া দিচ্ছে। সে এবার উকিলকে ফোন দিল। মামলার প্রস্তুতি কতদূর জানল। সে জানালো, এই সপ্তাহের মাঝেই মৌনতার কাছে আইনি নোটিশ চলে যাবে। উকিল আরো জানালো, সে আজ পর্যন্ত কোনো কেস হারেনি। এটাও হারবে না। নায়েল শিঘ্রই তার কাছে থাকবে। এই পর্যায়ে গিয়ে তার অস্থিরতা একটু দমলো।
তৃশান শুয়ে শুয়ে অলস বদনে ফোন দেখছিল। মৈতি ছেলের কাপড় গোছাতে গোছাতে অতিষ্ট হয়ে বলল,
– বাবু, কিছু তো বল। পড়াশুনা শেষ এখন কী করবি?
তৃশান বিরক্ত হয়ে বলল,
– কী করতে বলছ, বলো। সকলের সামনে গিয়ে এখন নাচব?
– বাবু, থাপড়ে তোর কান ফাটিয়ে দেব। আমার সাথে ফাজলামি করবি না। বয়স হয়েছে তোর। চাকরি খোঁজ, আর আমি এদিকে একটা ভালো মেয়ে খুঁজি। আল্লাহর রহমতে থাকলে দেখবি দুদিকেই ভাগ্য একসাথে খুলে যাবে।
– ভাগ্য না খুললেও তুমি খুলিয়ে ছাড়বে, মামনি। পরীক্ষা শেষ হয়েছে থেকে তুমি কী শুরু করেছ?
ছেলে যে কোনো মেয়ের পাল্লায় পড়ে এমন হয়ে গিয়েছে তা বেশ জানে মৈতি। পরিস্থিতি হাতের নাগালে যাওয়ার আগে তার ছেলেকে সঠিক পথে আনতে হবে। সে অনুনয় করে বলল,
– মায়ের কথা শোন বাবু, জীবনে ঝড় আসবে যাবে। কিন্তু আমাদের পথিমধ্যে থমকে দাঁড়ালে হবে না। জীবনটা ছোট্ট! এক জীবন যদি মনমরা আর উদাসীন থেকেই কাটিয়ে দিস তবে জীবন উপভোগ করবি কী করে? নতুন উদ্যমে নতুন কাউকে নিয়ে জীবন শুরু কর।
তৃশান ফোন রেখে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় মায়ের পানে। ইনিয়ে বিনিয়ে ভদ্রমহিলা বারংবার কেন কোনো মেয়ের প্রসঙ্গ টানে? সে বলল,
– মামনি, চিল। আমি এতটাও অবুঝ নই যে ভুল আঁকড়ে ধরে গোটা জীবন নষ্ট করে দেব। আমায় একটু সময় দাও। চাকরি, বিয়ে, সংসার, জীবন উপভোগ সব করব। শুধু প্লীজ মাথা খেও না।
ছেলের কথায় মৈতির বুকের উপর থেকে বিশাল বড় পাথর নেমে গেল।
– সত্যি বলছিস আব্বা? আমি জানতাম তুই বুদ্ধিমান ছেলে। মা আর তোকে বিরক্ত করব না। শুধু আশাকরব, তুই সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিবি।
– হু।
মা চলে যেতেই তৃশান বালিশে মুখ ডুবিয়ে একটা বুকভরা নিঃশ্বাস ফেলল। তার কষ্ট হয়। নিজের উপর ভীষণ রাগ হয়। নিজের করা ভুলটা শুধরাতে ইচ্ছে হয়। মনে হয় যেন, সে কারোর কাছে ভীষণ অপ্রীতিকর এক বিরক্তির কারণ।
সে মাথা ঝেড়ে পুনরায় মনোযোগ হয় ফেসবুকের মেসেজ রিকোয়েস্টে পরিচিত এক ছোট ভাইয়ের আইডির খোঁজে। ছেলেটাকে এখন দরকার। মেসেজ করেছিল একটা চাকরির বিষয় নিয়ে কিন্তু তখন উপেক্ষা করেছিল।
সে কাঙ্ক্ষিত আইডি খুঁজতে গিয়ে পেল অনাকাঙ্ক্ষিত এক আইডির সন্ধান। নিজের মেসেজ রিকোয়েস্টে রোজ সিকদার এর নাম দেখে তৃশানের চোখেমুখে উপচেপড়া আগ্রহ ভীড় জমালো। প্রায় চার বছর আগের মেসেজ রিকোয়েস্ট দেখে সে অবাক হলো। ওই বেয়াদব, উগ্র মেজাজের মেয়ে চার বছর আগে তাকে মেসেজ কেন পাঠিয়েছিল? সে ইনবক্স ওপেন করতেই কয়েকদফা অবাক হলো অজস্র মেসেজ দেখে। যার প্রতিটা বার্তায় ছিল বাচ্চামোতে ভরা প্রেমময় অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। কথা বলার, দৃষ্টি আকর্ষণ করার কতশত ব্যর্থ প্রয়াস।
তৃশান এবার আর উপেক্ষা করতে পারল না। অবহেলায় পড়ে থাকা বাচ্চামো মেসেজগুলো সব একে একে পড়ল। দীর্ঘ বিশ মিনিট সময় নিয়ে সব মেসেজগুলো পড়ে তৃশান আচমকা হো হো করে হেসে উঠল।
সে হাসতে হাসতে বিছানার হেড বোর্ডে পিঠ ঠেকালো। সর্বশেষ মেসেজটার একটা স্ক্রিনশট নিয়ে ফিরতি বার্তা পাঠালো ওই আইডিতে। লিখল,
– চার বছর আগের এই রোজ যতটা সুইট আর প্রাণবন্ত মেয়ে ছিল, চার বছর পরের রোজ ঠিক ততটাই তেতো আর গোমড়ামুখো উগ্র মেয়ে হয়েছে। বাট আই লাইক দ্যাট রোজ ফ্রম ফোর ইয়ার্স অ্যাগো।
অপরপ্রান্তে মেসেজটা সিন হলো। সে হাসতে হাসতে ফোন রেখে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। এই উগ্র মেয়েকে এখন বেশ জব্দ করা যাবে।
শুয়ে শুয়ে ভিডিও দেখতে থাকা রোজ হতভম্ব হয়ে গেল তৃশানের পাঠানো ছবিটা দেখে।
যেখানে সে লিখেছে,
– আমায় কী একটু ভালোবাসা যায় না? আমি কী খুব খারাপ মেয়ে? আপনি কেন কখনো আমার মেসেজ দেখেন না? আচ্ছা, আর কখনো আপনাকে বিরক্ত করব না। আল্লাহ হাফেজ।
এরপর সত্যিই আর সে কোনো মেসেজ করেনি বরং চ্যাট ডিলিট করে দিয়েছিল আর রিকোয়েস্ট ও। রোজের কান দিয়ে ধোঁয়া বেরিয়ে গেল নিজের লজ্জাজনক কাজকর্মে। চোখ টলটল করে উঠল লজ্জায়। তৃশান এগুলো দেখেছে? ছিঃ ছিঃ ওই লোক নিশ্চয়ই এখন তাকে হেনস্থা করবে।
সে কী করবে ভেবে না পেয়ে তড়িঘড়ি করে একটা মিথ্যা গল্প সাজালো। মেসেজ করল,
– দেখুন আপনি যা ভাবছেন তেমনটা একদম নয়। ওটা আমার এক ফ্রেন্ডের সাথে বাজি ধরে আপনাকে মেসেজ করেছিলাম। যেটা নিতান্তই একটা খেলা ছিল। বাজি জিতে গেলেও মেসেজ আর ডিলিট করা হয়নি। এসব আপনি সিরিয়াসলি নেবেন না। আমার দিন এত খারাপ আসেনি যে আমি আপনাকে পছন্দ করব। আর আ’ম স্যরি আপনাকে মেসেজ করার জন্য। আপনি এগুলো ডিলিট করে দিন প্লীজ।
তৃশান মৃদু হেসে মেসেজটা দেখল। ছোট্ট একটা লেখায় ছয়টা বানান ভুল, টাইপিং মিস্টেক। মেয়েটার হাত নিশ্চয়ই কাঁপছে মিথ্যা বলতে গিয়ে। সে লিখল,
– ডোন্ট প্যানিক! এত তাড়াহুড়া করে মিথ্যা বললে ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। মিথ্যা বলতে হয় খুবই গুরুগম্ভীর কণ্ঠে আর সময় নিয়ে। বুঝলে? সময় নাও, তারপর গুছিয়ে মিথ্যা গল্প বলো। আমি ধৈর্য নিয়ে শুনব চিন্তা নেই।
রোজের মাথায় বাজ পড়ল তৃশানের এহেন মেসেজে। চোখমুখ লাল হয়ে গেল লজ্জায় অপমানবোধে। অতি লজ্জায় এবার সে ফোন বন্ধ করে দিয়ে কেঁদেই ফেলল।
উঠতি বয়সের আবেগগুলো কি এমনই হয়? অদ্ভুত এক মরীচিকার পিছু ধাওয়া করতে করতে মানুষ নিজের অস্তিত্বকে বিলিয়ে দেয়। আর যখন সেই ঘোর কাটে, তখন প্রাপ্তবয়স্ক মনের কঠিন যুক্তির কাছে সেই পুরোনো স্মৃতিগুলো বড় বেশি অবান্তর আর হাস্যকর ঠেকে।
তবে রোজের মনে হচ্ছে এই লজ্জার কারণে তার গলায় দড়ি দিয়ে মরা উচিৎ। এখন কী হবে? যদি সে কখনো তৃশানের সামনাসামনি পড়ে যায়? তবে সে নিজের কৃতকর্মের জন্য চোখে চোখ মেলাতে পারবে না।
মৌনতা এখন আর অনিয়ম করে না। নিজের খেয়াল নিজে রাখে। নায়েলের খেয়াল ও সেই রাখে। নায়েলের ‘ছোট পাপাময়’ বদ অভ্যাস ছাড়াতে প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু যত দূরে সরতে চাইছে সম্পর্কের বাঁধন যেন ঠিক ততটাই দৃঢ় হচ্ছে।
আজ প্রায় তিন মাস সাত দিন। নায়েল বাবার কথা প্রায় ভুলে বসেছে। কালেভদ্রে কখনো যদি কেউ উল্লেখ করে তখন তার মনে পড়ে তার পাপা যে দেশে। তাদের নিতে আসে না। কি এর ব্যতীত কখনোই এখন আর তেমন ইমরোজের নাম তোলে না। এর পেছনে যে কারোর কারসাজি রয়েছে তা বেশ জানে মৌনতা।
মেয়ের নরম অবয়বের বদলে বাহুডোরে কোলবালিশ অনুভব হতেই মৌনতা ধড়ফড়িয়ে চোখ মেলে তাকাল। নিশ্চল মস্তিষ্কে ডেকে উঠল,
– নায়েল?
জবাব এলো তৎক্ষণাৎ।
– ইয়েস মাম্মা!
বিছানায় শায়িত মৌনতা চকিতে বাম দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালে মৃদু আর্তনাদ করে উঠল মুখের উপর ঝুঁকে থাকা দুটি মুখ দেখে। এরোজ আর নায়েল টুকটুক করে তাকিয়ে আছে। মৌনতা হতভম্ব হয়ে বলল,
– আপনি এখানে? আপনারা কী করছিলেন?
এরোজ স্মিত হেসে নায়েলের পানে চেয়ে বলল,
– আমরা আমাদের প্রিয় মানুষটিকে দেখছিলাম।
মৌনতা চোয়াল শক্ত করে বলল,
– আপনাকে আমি আগেও বলেছি এভাবে কথা বলবেন না আমার সাথে।
– সংযম আপনি ভেঙেছেন। আমার কিছু করার নেই। আমি লুকিয়েই রেখেছিলাম।
এরোজের নির্লিপ্ত কণ্ঠে মৌনতা ক্ষীণ স্বরে বলল,
– আমি আপনাকে কখনো ভালোবাসব না।
এরোজ স্মিত হাসল। ধিমি কণ্ঠে বলল,
– ভালোবাসতে হবে না। আমার একার ভালোবাসাই যথেষ্ট। সুখ ফুরিয়ে যায় দ্রুত। কিন্তু দুঃখ ফুরায় না। তাই আপনি বরং আমার দুঃখ হয়ে থেকে যান আমার সাথে। তবুও সবসময় আমার সাথে থাকুন। আমি তাতেই খুশি।
– আপনি একটা পাগল।
মৌনতা অবাক হয়ে বলল।
– আপনার জন্য। উঠে আসুন। ডক্টর বলেছেন, ভোর ছয়টার পর আপনি আর ঘুমাতে পারবেন না। সকালে দুই ঘন্টা প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে হবে, শরীরচর্চা করতে হবে। কাম অন, গেট আপ।
এরোজ হাত বাড়িয়ে দিল। ছোট পাপার দেখাদেখি নায়েল ও হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
– কাম অন গেট আপ, মাম্মা। আমলা বেলু কলতে যাব।
মৌনতা কারোর হাত ধরলো না। বরং দু’জনের দিকে ক্রুব্ধ দৃষ্টি ফেলে বলল,
– নায়েল তুমি মাম্মার কাছে শুয়ে ছিলে না?
নায়েল না বোধক মাথা নেড়ে শিশুসুলভ অবোধ কণ্ঠে বলল,
– নাতো। আমি ছোট পাপাল কাছে ঘুমিয়েছি। ছোট পাপা স্টোলি বলেছে, আমি ঘুমি ঘুমি কলেছি।
– কিন্তু তুমি মাঝরাতেও আমার কাছে ছিলে।
মৌনতা তীব্র দ্বিরুক্তি নিয়ে বলল।
এরোজ মিটিমিটি হেসে বলল,
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৮ (৩)
– মাঝরাতেই ও আমার কাছে গিয়েছে। আমরা দু’জন জড়াজড়ি করে ঘুমিয়েছি।
মৌনতা এবার রাগে গজগজ করতে করতে বলল,
– নিজেকে নায়েলের অভ্যাস বানিয়ে আপনি ঠিক করেননি। ছোট্ট একটা বাচ্চাকে ব্যবহার করছেন নিজের মনকামনা পূরণ করার জন্য।
– আপনিও আমার অভ্যাস করে নিন। ইট উইল বি বেটার ফর ইউ। আ’ম নট লেটিং ইউ গো দিজ টাইম, এট এনি কস্ট। ইফ ইউ লিভ, আই উইল লিভ। ইফ ইয়োর ডেস্টিনেশন ইজ ডেথ, আই উইল বি ইয়োর ডেথ পার্টনার।
এরোজের দৃঢ় কণ্ঠে মৌনতা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।
