অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬১
তোনিমা খান
একই রকমের দুইটা বই হাতে নিয়ে রূপকথা হতাশার নিঃশ্বাস ফেলল। প্রেগন্যান্সির সময়কালীন যাবতীয় সুরক্ষা, নিরাপত্তা, খাবার রুটিন এসব-ই বই দুটির মূল বিষয়বস্তু।
টেবিলের মাঝ বরাবর বসে থাকা তপোবন ভ্রু কুঁচকে বলল,
– একি! আরো একটা এই বই আসল কোত্থেকে তোমার কাছে?
রূপকথা শান্ত দৃষ্টিতে তাকালো নত শির ফিজিক্সের প্রবলেম সলভ করতে থাকা ছেলের পানে। নীরব ইশারা বুঝতেই তপোবন ছেলের পানে তাকালো। আশ্চর্য হলো। কিন্তু তা লুকিয়ে নিলো।
সে কিছু বলতে যাবে তার আগেই তানশান লিখতে লিখতে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বলল,
– লাইব্রেরীতে বই পড়তে গিয়েছিলাম আজ। তখন এটা পেলাম। মিমি নিজের প্রতি উদাসীন তাই ভেবেছি এটা তার কাজে লাগবে। তাই নিয়ে এসেছি।
তপোবনের ওষ্ঠকোনে প্রসন্নতার হাতছানি। জীবনের এই পর্যায়ে মনে হলো বিগত তিনদিন সে অযথা দুশ্চিন্তা করেছে। ছেলে এখন যথেষ্ট বড় হয়েছে, যতটুকু বড় হলে তার মিমিকে সে ঠিক তার পাপার মতোই দেখে রাখতে পারবে।
বাবার পরে কোম্পানি, বাড়ি সবটা তপোবনের উপর ন্যস্ত। বাবার বয়স হয়েছে। না চাইতেও তপোবন-ই এখন সবকিছুর তত্বাবধায়ক। উপরন্তু স্ত্রীর হাই রিস্ক প্রেগনেন্সি। সব মিলিয়ে সে খুব চিন্তিত ছিল। তবে এখন একটু হলেও নিশ্চিন্ত হলো। তানশান সব কিছুর উর্ধ্বে গিয়ে তার মিমি আর ভাই বোনকে দেখে রাখবে।
ছেলের কৈফিয়ত এর প্রেক্ষিতে তপোবন মিহি স্বরে বলল,
– গুড! এরপর থেকে আরো পেলে আরো নিয়ে আসবে। এখন পাপাকে বলো কাল তোমার স্কুল কয়টায়? ক্লাস কী হবে নাকি আমি টিচারকে ফোন করব?
তানশান চোখ তুলে তাকালো। ম্যাথ সলভ করা শেষ ততক্ষণে। সে খাতাটা এগিয়ে দিল বাবার কাছে। ছোট একটা ছুটির পর কাল প্রথম স্কুল খুলবে। সে বলল,
– আমি জানি না। তুমি জেনে নিও। মিমিও কী যাবে কলেজে?
তপোবন খাতা দেখতে দেখতে বলল,
– উঁহু, মিমি এখন আর কলেজে যাবে না।
তপোবনের কথায় চমকে উঠল রূপকথা আর তানশান।
তানশান পড়াশুনায় বিঘ্নতা একদম পছন্দ করে না। মাঝপথে কাউকে হাল ছাড়তে দেখতেও তার ভালো লাগে না।
সে প্রচন্ড উদ্বেগ নিয়ে বলল,
– মিমি আর পড়াশুনা করবে না?
রূপকথা তৎক্ষণাৎ বিরোধী কণ্ঠে বলল,
– কেন আমি কলেজে যাব না? আমি কোনোভাবেই পড়াশুনা বন্ধ করব না। জীবনে দুই বছর অলরেডি আমি পিছিয়ে গিয়েছি। আর পেছাতে চাই না। আমি পারব। এতটাও অসুস্থ নই আমি।
দু’জনের মুখের রঙ উড়ে যাওয়া দেখে তপোবন বিরক্তি মিশ্রিত নিঃশ্বাস ফেলল। মেয়েটির এই কথা বদলাতে বড়জোর আর তিনমাস লাগবে। কিন্তু সেই বিষয়ে কিছু বলল না।
– কথা সম্পূর্ণ করতে দাও।
– ওহ্ ওকে। স্যরি!
তানশান বলল।
– রূপকথা কলেজে যাবে না। কিন্ত বাড়িতে বসে পড়াশুনা করবে। আমি টিচারের সাথে কথা বলেছি। সব নোটস, সাজেশন রেগুলার পাঠিয়ে দেবে। শুধু পরীক্ষার সময় গিয়ে পরীক্ষা দিয়ে আসবে। আর তোমাদের দু’জনের পড়াশুনাই ডিপেন্ড করে আমার উপর। তাই আমি নিশ্চিত করব, তুমি পরীক্ষায় পাশ করবে কী করে! ওটা সম্পূর্ণ আমার চিন্তা শুধু তোমায় একটু পরিশ্রম করতে হবে।
রূপকথা কপাল কুঁচকে বলল,
– শুধু পাশ করব কেন? আমি জিপিএ ফাইভ ও পাব।
তপোবন ভ্রু উঁচিয়ে নিলো। বিদ্রুপ করে বলল,
– ওয়াও! হোয়াট আ কনফিডেন্স! আই লাইক ইট।
তানশান সরব প্রতিবাদ করে বলল,
– তুমি মজা উড়াচ্ছ কেন? চেষ্টা করলে সব পারা যায়। মিমি অবশ্যই জিপিএ ফাইভ পাবে। আমরা তাকে সাহায্য করব।
– ওকে সাহায্য করবে। কিন্তু বাই এনি চান্স যদি তোমাদের হার মানতে দেখি তবে তার শাস্তি আমি দেব।
তানশান আর রূপকথা হেসে উঠল তার কথায়। রূপকথা মাছি তাড়ানোর মতো করে বলল,
– শুনুন শিক্ষক মহাশয়, একজন নারী দূর্বল হতে পারে কিন্তু একজন মা নয়। একজন মা সব পারে তার সন্তানদের জন্য।
– হোয়াট আ মোটিভেশন! তো ছাত্রী মহাশয়া আপনাকে যে ফিজিক্সের এম সি কিউ সলভ করতে দিয়েছিলাম তা করেছেন?
তপোবন কৃত্রিম হেসে বলল। সরব রূপকথার মোটিভেশন উড়ে গেল। সে ক্লান্ত স্বরে বলল,
– ওহ তানশানের পাপা! আমি এখনো শেষ করতে পারিনি। অনেকগুলো তো। সবকটা একদম ম্যাথ করে করে সলভ করতে হচ্ছে।
– পুরো দুই ঘন্টা হয়ে গিয়েছে রূপকথা। আর তানশান? এখানে এটা কী লিখেছ? প্রশ্নে চেয়েছে কী আর তুমি করেছ কী? এই দশা নিয়ে তোমরা আমায় টিপিক্যাল মোটিভেশনাল স্পিচ শোনাচ্ছ?
তপোবন গুরুতর রেগে গেল। রূপকথা তড়িঘড়ি করে বইয়ে মুখ গুঁজল। তানশান ভয়ার্ত দৃষ্টি ফেলল নিজের খাতায়। মিনমিনে স্বরে বলল,
– ভুল করেছি? কীভাবে সম্ভব? হয়তো প্রশ্ন এলোমেলো করে ফেলেছি পাপা।
– তোমার চশমা কোথায়? বি নাম্বার প্রশ্নের অর্ধেক আর সি নাম্বার প্রশ্নের অর্ধেক মিলিয়ে তুমি নতুন একটা প্রশ্ন আবিষ্কার করেছ। আর আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি, তুমি নিজের সেই আবিষ্কৃত ভুল প্রশ্নের জবাব ও বের করেছ। কীভাবে?
রূপকথা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল ছেলের কান্ডে। বলল
– আপনি রাগ দেখাচ্ছেন কেন? আপনার তো খুশি হওয়ার কথা। একটা মানুষ কতটা মেধাবী হলে ভুলভাল প্রশ্নের সঠিক উত্তর নামায়!
বলেই সে আবার হেসে উঠল। তানশান লজ্জায় জড়সড় হয়ে গিয়ে সেন্টার টেবিল থেকে চশমা আনল। তার সবসময় চশমা পড়া লাগে না। শুধু বই পড়ার সময় পড়তে হয়। নয়তো লাইন উপর নিচ হয়ে যায় বুঝতে পারে না।
সে আবার সঠিক প্রশ্নের জবাব বের করল আর ছুটি পেল। রূপকথা পারমিতা আর তার স্বামীর সাথে দেখা করে এসে নিজেও ঘুমাতে গেল।
রাত তখন গভীর। রোজের ফোন অনবরত বেজে যাচ্ছে। সে ঘুম জড়ানো চোখে ফোন কানে ধরতেই ভেসে আসল পুরুষালী শ্রান্ত স্বর।
– দুইদিন যাবৎ আমার ফোন তুলছ না কেন? আমি কতটা অস্থির হয়ে আছি জানো? কলেজে যাচ্ছো না, ঘর থেকে বের হচ্ছো না, ফোন তুলছ না। কেন রোজ?
রোজ বিরক্তিতে ‘চ’ বর্গীয় শব্দ করল। ছোট্ট করে বলল,
– বাধ্য নই।
– আমাদের কী কথা হয়েছিল রোজ?
– যে কথা হয়েছিল তাতে আমার কোনো স্বার্থ ছিল না।
তৃশান ভ্রু কুঁচকে নিলো। সে তো একটা ভালোবাসাময়, ভরসাযোগ্য, সুন্দর জীবন চেয়েছিল মেয়েটির কাছে। কিন্তু মেয়েটি কী স্বার্থ খুঁজছে এই চাওয়ার মাঝে?
– কী স্বার্থ চাইছ তুমি?
রোজ চোখ খুলে তাকালো। দৃষ্টি বড্ড উদাসীন। বলল,
– প্রতিটা মেয়ে চায় কারোর জীবনের একমাত্র ভালোবাসা, একমাত্র প্রায়োরিটি হয়ে থাকতে। সে এমন কোনো জীবন চায় না যেই জীবনে ভালোবাসা নেই। আমিও ব্যতিক্রম নই। আমিও চাই কেউ আমায় ভালোবাসুক। এতটা ভালোবাসুক যেই ভালোবাসায় অন্য কারোর অস্তিত্ব থাকবে না। কারোর প্রথম ভালোবাসা নাহই কিন্তু শেষ ভালোবাসা তো হতেই পারি। আপনি নিজের কাছে প্রশ্ন করুন তো, আপনি কী আমায় ভালোবাসেন? যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তবে বাড়িতে প্রস্তাব পাঠাবেন আমি রাজী হয়ে যাব। কিন্তু আপনার জবাবে যদি একটুও কিন্তু থাকে, জড়তা থাকে তবে সারাজীবনের জন্য আমার জীবন থেকে চলে যাবেন। আল্লাহ হাফেজ! আশাকরি সঠিক জবাব খুঁজে বের করবেন।
বলেই সে ফোন কেটে দিল। ডিসকানেক্টেড ফোন রাখতে রাখতে তৃশান অবুঝপানে তাকিয়ে থাকলো। হঠাৎ করেই নিজেকে প্রশ্ন করল,
– ভালোবাসা আসলে কী?
প্রত্যাহিক প্রভাতটি তানশানের বড্ড একান্ত একটি মুহুর্ত হয়। যেখানে জীবনের সকল জটিলতা ছাপিয়ে সে মাম্মা আর পাপা একসাথে থাকে। এটা প্রতি দিনের সবচেয়ে সুন্দর সময় তানশানের জন্য। সে প্রভাতের এই প্রারম্ভটুকুর জন্য হলেও দীর্ঘদিন বাঁচতে চাইত। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা যে অপরাহ্নেও ছোট্ট ছোট্ট কিছু বাঁচার কারণ দিয়েছে।
ফজরের নামাজ শেষে বাবাকে পাঞ্জাবির আস্তিন আর পায়জামা গুটিয়ে কবরস্থানের ভেতর ঢুকতে দেখে এগিয়ে এলো তানশান। তপোবনের হাতে ঘাস কাটার কাঁচি আর ছুরি।
সে বলল,
– কী করবে পাপা?
তপোবন ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
– তোমার মাম্মার কবরস্থানে ঘাসগুলো বড় হয়ে গিয়েছে, আব্বু। এগুলো পরিস্কার করে দেব।
– আমিও আসি?
-না, তুমি দাদুভাইয়ের সাথে হেঁটে আসো। অনেক গরম পড়ছে। এগুলো করার কোনো প্রয়োজন নেই। তুমি এগুলো পারবেও না।
– কিন্তু আমার কোনো সমস্যা নেই পাপা। আমার গরম লাগছে না। প্লীজ আমি আসি। আমার শেখা উচিত সবকিছু।
তপোবন কথা বাড়ালো না।
-আসো।
তানশানের মুখে হাসি ফুটে উঠল। সেও পাঞ্জাবি পায়জামা গুটিয়ে কবরস্থানের ভেতর ঢুকলো। বাবার দেখাদেখি সেও একটা কাঁচি দিয়ে ঘাস কাটতে লাগল। এগুলো বাকি সবাই লোক দিয়ে করালেও সে ছোটবেলা থেকে দেখেছে এটা বাবা নিজেই করে। এই কবরস্থানে গাছ লাগানো থেকে শুরু করে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন সবটা নিজ দায়িত্বে করে।
বাবার অনুসরণ করতে করতে তানশান সফল হলো খুব সুন্দর করে ঘাস ছাটাই করতে। সম্পূর্ণ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন শেষ হতেই তারা কল থেকে হাত পা ধুয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
নিজের রুমে ঢুকেই তানশান চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল বিছানায়। তন্মধ্যেই দৃষ্টি আকর্ষণ করল বেড সাইড টেবিলের উপর রাখা ড্রাই ফ্রুটস আর কোল্ড কফি রাখা ট্রে টি। সাথে একটা চিরকুট “ইট মি”।
সে হেসে ডানে বামে মাথা নাড়লো। মিমির শারীরিক অবস্থা ভালো না জেনেই সে এখন নিজের অনেক কাজ নিজেই করতে চায়। কিন্তু তার সুযোগ মিমি কখনোই তাকে দেয় না। সে নিজের পছন্দের কোল্ড কফিটি হাতে নেয়। প্রত্যাহিক সকালে এই এক কাপ খেলে সারাদিন খুব সতেজ কাটে।
রুমে ঢুকতেই তপোবন দৃষ্টি ফেলল বিছানায়। কাত ফিরে গুটিয়ে শুয়ে আছে রূপকথা। মেয়েটির ঘুম বেড়েছে, আশ্চর্যজনক ভাবে বেড়েছে।
শব্দ পেয়ে চোখ মেলে তাকালো রূপকথা। তপোবন স্মিত হাসল তার ঘুমে বুজে আসা চোখ দেখে। জোরপূর্বক খোলার চেষ্টা করছে। জড়ানো কণ্ঠে বলল,
– এত দেরি হলো কেন?
তপোবন পাঞ্জাবি খুলতে খুলতে বলল,
– কবরস্থানে অনেক ঘাস জন্মেছিল ওগুলো পরিষ্কার করেছি।
-ওহ।
রূপকথা বদ্ধ নেত্রে বলল।
-কিছু খাবেন?
পুনরায় রূপকথা বদ্ধ নেত্রেই জিজ্ঞেস করল। তপোবন টিশার্ট পরে এগিয়ে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল মেয়েটির মাথার কাছে। মাথায় হাত রেখে ললাট বরাবর ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। বলল,
– এত চিন্তা বাদ দাও। ঘুমাও নিশ্চিন্তে। আমাদের যার যা লাগে সব নিয়ে নেব আমরা।
– নাস্তা মামনি বানাচ্ছে। আমার খুব ঘুম পেয়েছিল তাই ঘুমাচ্ছি।
– ঘুমাতে বারণ করেছি? কৈফিয়ত দিচ্ছ কেন? ঘুমাও। আমি আবার একটু বাইরে যাব।
-আচ্ছা।
বলেই রূপকথা গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। তপোবন ঘরের সব পর্দা লাগিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল। রান্নাঘরে গিয়ে বলল,
-মা, এসো। এখন মানুষ নেই তেমন।
পারমিতা জবার কাছে বাকি কাজ সপে দিয়ে হাত ধুয়ে বেরিয়ে আসে। চোখেমুখে ভীষণ প্রতীক্ষা ফুটে উঠল।
-চল চল। আমি তৈরি আছি।
তপোবন মৃদু হেসে তার হাত আঁকড়ে ধরল। বাড়ি থেকে বের হয়ে মেইন রাস্তায় নামে। বলল,
-হাঁটবে নাকি রিকশা নেব?
-এই টুকু রাস্তা রিকশা নিতে হবে না। একটু হাঁটি শরীর ঝরঝরে লাগবে।
তপোবন সায় জানালো। মসজিদে যাচ্ছে। পাঁচ মিনিটের দূরত্বেই মসজিদ। মসজিদের ঠিক বাম সাইডে বিশালাকৃতির একটা কবরস্থান। যেটা ওই এলাকার স্থানীয় সকলের শেষ আবাসস্থল। তপোবন পারমিতার হাত ধরে আরেকটু কাছে এগিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু পারমিতার পা নড়ছে না। তপোবন ফিরে তাকালো। বয়সের দোরগোড়ায় কুঁচকে থাকা চোখদুটো রক্তিম হয়ে উঠেছে। পারমিতা টলটলে নেত্রে বলল,
-এখানেই থাকি। দূর থেকে দেখি। নয়তো বেশি মায়া জন্মে গেলে কষ্টটাও বেশি হবে।
তপোবন উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলে নারীটি কে বুকে জড়িয়ে নিলো। আদুরে কণ্ঠে বলল,
-মা, সবসময় তো আসো না। কতদিন পর পর আসো। কাছে থেকে দেখে যাও নয়তো পরে নিজেই অস্থির হয়ে পড়বে।
পারমিতা এগিয়ে গেল। তপোবনের বুকে লেগে বসে দেখল একটা স্বার্থপর মেয়েকে। যে কি-না নিজের শারীরিক জটিলতা জেনেও শুধুমাত্র আরো একবার মা হওয়ার লোভ করেছিল। নিজের কোল ভরতে গিয়ে সে আরেকজনের কোল খালি করে দিয়েছে। এই আফসোস সে কখনো ভুলবে না।
একাধারে নিরব উষ্ণ জলের ছোঁয়ায় তপোবন আরো দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরল বয়স্ক নারীটিকে। আফসোসে জর্জরিত কণ্ঠে বলল,
-সে আমাদের ভালোবাসার কখনো মূল্য দেয়নি, মা।
-একদম ই দেয়নি।
পারমিতা একদৃষ্টিতে মাটির উঁচু জায়গাটিকে দেখতে দেখতেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। একটা নীরব অভিযোগে ভরপুর কথোপকথন বাতাবরণে মিলিয়ে গেল। ঠিক যেভাবে ধরণী থেকে মিলিয়ে গেল পূর্বা নামক নারীটির অস্তিত্ব। তবে কিছু অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেলেও তার স্নিগ্ধ কৃতিত্ব থেকে যায়। যেই কৃতিত্বের নাম ছিল ‘তানশান’ যে আজ ও পূর্বার আদর্শ হয়ে ধরণীতে বিচরণ করছে।
সৃজা খাওয়া থামিয়ে আশ্চর্য হয়ে তাকালো ইমরোজের দিকে।
-তুমি তোমার সব জায়গা বিক্রি করে দিচ্ছ?
ইমরোজ খেতে খেতে বলল,
-হুম।
-কিন্তু কেন? সব বিক্রি করে দিলে আমাদের ভবিষ্যৎ এর কী হবে?
-একটা সফল বিজনেস দাঁড় করাতে পারলে এমন জায়গার অভাব হবে না। আমায় যেকোনো মূল্যে বিজনেস দাঁড় করাতে হবে। আর সেটা অনেক ব্যয়বহুল।
-এতগুলো লস খেয়েও তোমার মন ভরেনি? আবার বিজনেস করতে চাচ্ছো?
-কাম অন সৃজা। সাহস না জোগাতে পারো অন্তত খোঁচা দিও না। একটা বিজনেস একবারের চেষ্টায় দাঁড়িয়ে যায় না।
সৃজা খাওয়া থামিয়ে চোখে চোখ রাখল। বলল,
-তারপর যদি এই টাকাগুলোও লস খাও তখন?
-কেন লস খাবো? আমার প্রথমবার ই বেশি টাকা ইনভেস্ট করা প্রয়োজন ছিল। যেটা করিনি বলেই আমি সফল হইনি। কিন্তু এবার আমি সফল হবো।
-আর ততদিন আমরা এভাবে আলু ভর্তা আর ভাত খেয়ে থাকব?
-হ্যাঁ, যতদিন না দাঁড়াতে পারি ততদিন একটু হিসাব করে চলব। আর আলু ভর্তা ভাত আমি তোমায় খাওয়াইনি, তুমি খাইয়েছ। বাড়িতে বসে আছো কিন্তু তুমি শুধু আলু ভর্তা আর ভাত রান্না করতে পারো।
সৃজা বিরক্তি মিশ্রিত নিঃশ্বাস ফেলে দ্রুত খেয়ে উপরে চলে গেল। ইমরোজ ঘরে গিয়ে দেখল সে ঘুমিয়ে পড়েছে। সেও নীরবে ঘুমিয়ে পড়ল। গভীররাতে কারোর ফোনের শব্দে সৃজার ঘুম ভেঙে গেল। দেখল তার ফোন বাজছে। স্ক্রিনে ভাসছে সানাফের নাম। সে কপাল কুঁচকে ইমরোজের দিকে এক পলক তাকিয়ে বারান্দায় চলে গেল।
-হ্যা সানাফ বলুন। কোনো সমস্যা?
-সমস্যা ছাড়া কী ফোন দেয়া যাবে না?
-রাত একটার সময় সমস্যা ছাড়া কেউ ফোন দেয় বলে মনে হয় না আমার।
-ঠিক বলেছেন। একটু সমস্যা হচ্ছে।
-কী হয়েছে?
-আমি ঘুমাতে পারছি না।
-মানে? কেন?
-চোখ বুজলেই চোখের সামনে এক সুন্দরী মেয়ে ভেসে উঠছে। আর সেটা আপনি।
-ওহ সানাফ। নট এগেইন প্লীজ।
-দশ মিনিট কথা বলা যাবে মিস বিউটিফুল?
-মিসেস।
-ওপস স্যরি মিসেস।
-এই রাতে আপনার সাথে আমি কী কথা বলব সানাফ?
-এই যে আমার ঘুম কেড়ে নেয়ার কারণ বলবেন।
সৃজা বিরক্ত হতে গিয়েও হেসে ফেলল,
-এটা একদমই ঠিক হচ্ছে না সানাফ।
-আমি জানি এটা একদমই ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু আমি অসহায়ত্ব অনুভব করছি সৃজা। আমি নিজেকে আটকাতে পারিনি। মনে হচ্ছে আপনার সাথে একটু কথা বললেই আমার অস্থিরতা কমবে।
-আচ্ছা ঠিক আছে, বলুন।
এরপর…একটা দীর্ঘ কথোপকথনে কখন দুই ঘন্টা কেটে গেল টের পেল না সৃজা। রুম থেকে হঠাৎ শব্দ আসতেই সৃজা হকচকিয়ে গেল। পিছু ফিরতেই দেখল ইমরোজ ঘুম জড়ানো চোখে দাঁড়িয়ে আছে।
-তুমি এত রাতে এখানে বসে কার সাথে কথা বলছ?
সৃজা থতমত খেয়ে বলল,
-সানাফ। ওই সুপ্তির শরীর একটু খারাপ ছিল তাই বলার জন্য ফোন দিয়েছে।
-সে কী কথা! এখন কেমন আছে? কী হয়েছিল?
-এখন ঠিক আছে।
-আচ্ছা, ঘুমাতে এসো।
-হ্যা, তুমি যাও।
বলেই সৃজা ফোনের দিকে তাকালো। দুই ঘন্টা? ওহ্ শিট! সে তড়িঘড়ি করে বাই বলে ফোন রাখল। তবে ওষ্ঠকোনে অযথাই লেগে থাকা হাসির রেশ তখনো স্পষ্ট!
মৌনতা জানত এরোজ রেগেছিল তার সাথে। তবুও ভ্রুক্ষেপ করেনি। কিন্তু এখন যেন সেই রাগ ইউটার্ন নিয়ে তার উপরেই উপনীত হচ্ছে। আর বিরক্তির বিষয় হলো, এরোজ ও তার রাগের ভ্রুক্ষেপ করছে না।
টেবিলে সাজিয়ে রাখা কানাডিয়ান খাবারগুলো ভীষণ বিরক্তির সাথে উপেক্ষা করল এরোজ। হাত বসাল টেবিলের আরেকপাশে রাখা বাঙালি খাবারগুলোতে। এক পিস গরুর গোশত মুখে নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
– তুমি রান্না করেছ খালামনি?
নিশাত ব্যস্ত দৃষ্টি ফেলল। সে ছোট মেয়েকে স্কুলের জন্য তৈরি করছে। পনিটেল করতে করতে বলল,
– কেন ভালো লেগেছে? এগুলো তোর জন্য ভাবি রান্না করে পাঠিয়েছে।
– আনির আম্মু? ওহ্ আনি, থ্যাংক ইউ সো মাচ। আন্টিকে আমার ভালোবাসা দিও।
– ইয়াহ, শিওর।
আনি গাল ভরে হেসে বলল।
তিনদিনের জ্বরে এরোজের চোখমুখ কেমন ভেঙে গিয়েছে। চুলগুলো রুক্ষ শুষ্ক হয়ে উড়ছে।
কাঁখে থাকা নায়েল এরোজকে খুব মজা করে খেতে দেখে নিজেও খাওয়ার আগ্রহ পেল। সে কাঁধ থেকে মাথা তুলে হা করে বলল,
– গিভ মি।
এরোজ তার মুখেও দিল। সেও মজা পেল। দু’জনে এবার বাটি কোলে নিয়ে সোফায় এসে বসল। এবং দীর্ঘদিন অভুক্ত মানুষের মতো চাচা ভাতিজি গরুর গোশত খেতে লাগল।
নিজের রান্না করা অবেহিলত কানাডিয়ান খাবারগুলো থেকে দৃষ্টি সরায় মৌনতা। দাঁতে দাঁত চেপে দু’জন অভুক্তকে দেখল। বাড়িতেও গরুর গোশত রান্না করা হয় তখন তো এই দু’জনের মুখে এত রুচি থাকে না? তবে কী এমন বিশেষত্ব আছে যে এই গরুর গোশত তারা অভুক্তের মতো খাচ্ছে?
আনির চোখেমুখে প্রসন্নতা। সে রুটির ঝুড়িটা নিয়ে তাদের পাশে বসল। বলল,
– তোমরা রুটি দিয়ে গোশত খাও। মাম্মি বলে বাঙালিরা নাকি রুটি দিয়ে গোশত খেতে ভালোবাসে।
– রুটিও আছে?
বলেই এরোজ বড়ই সানন্দে রুটি নিয়ে খেতে লাগল। নায়েল ও খেলো। খেতে খেতে গালে মুখে মেখে ফেলল। থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মৌনতা এবার হেঁটে গিয়ে টিস্যুর বক্সে হাত দিল। কিন্তু তোলার আগেই তা কেউ ছিনিয়ে নিয়ে গেল। মৌনতা অবাকপানে তাকালো টিস্যু ছিনিয়ে নেয়া আনির দিকে। আনি সৌজন্য হেসে বলল,
– আমি দিচ্ছি। তুমি রেস্ট নাও।
সে পানি আর টিস্যু নিয়ে এরোজ আর নায়েলের পাশে গিয়ে বসল। জ্বরমুখে এরোজ ভীষণ মজা করে খেল মশলাদার গোশত। দু’জন খেয়েদেয়ে ঢেঁকুর তুলে আনির থেকে টিস্যু আর পানি নিয়ে বলল,
– থ্যাংক ইউ, আনি।
আনি গদগদ হয়ে বলল,
– ইউ ওয়েলকাম, হানি। তোমার খুশিই আমার খুশি।
মৌনতার চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম। কেমন নির্লজ্জ মেয়ে! খালামনির সামনে এই ধরণের কথা বলছে! আর তার থেকেও বড় নির্লজ্জ ওই লোকটা—যে কি-না হাসিমুখে তা শুনছে!
নায়েল ভ্রুকুটি করে নিলো আনির কথায়। হঠাৎ করেই সে গম্ভীর মুখে বলল,
– আনি! ডোন্ট সে হানি টু মাই পাপা। আই ডোন্ট লাইক দিস।
এরোজ সহ উপস্থিত সকলে চমকালো নায়েলের কথায়। চাইল্ড কেয়ারের বদৌলতে নায়েল এখন ইংলিশে কথোপকথনে যথেষ্ট পটু হয়েছে। কানাডার অনেকেই ঘনিষ্ঠতা প্রকাশে সচরাচর একে অপরকে হানি বলে সম্বোধন করে। এটা শেখা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার সেটি ছিল না। বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল তার বলা ‘পাপা’ শব্দটিতে। আজ প্রথমবার নায়েল সজ্ঞানে তাকে পাপা বলেছে।
আনি থতমত খেয়ে তৎক্ষণাৎ বলল,
– এরোজ তোমার পাপা নয়। সে তোমার ছোট পাপা।
সে কী ভয়াবহ কথা! নায়েলের চোখেমুখে রাগ ফুটে উঠল। সে তড়িঘড়ি করে প্রচন্ড অধিকারবোধের সাথে এরোজের গলা জড়িয়ে ধরল। আনির দিকে ক্রুব্ধ দৃষ্টি ফেলে ফেলে জেদি কণ্ঠে বলল,
– নো। আমাল পাপা, ছোট পাপা…সব আমাল। তুমি হানি বলবে না।
– না, এরোজ তোমার পাপা নয়।
আনি আবারও জোর দিয়ে বলল। এরোজ ভীষণভাবে উপভোগ করছিল নায়েলের অধিকারবোধ আর ঝগড়া। কিন্তু ততক্ষণ যতক্ষণ না আনি নিজের অধিকার বোধ দেখাতে শুরু করল।
এরোজ তীক্ষ্ণ নজর ফেলে শুধু সতর্কতা জারি করল,
– আনি!
আনি সতর্ক হলো। সে জানে এরোজের কতটা অবসেশন নায়েলের প্রতি। রঙচটা মুখে বসে রইল সে। এরোজ ছোট্ট দেহটিকে নিজের সাথে জড়িয়ে নিয়ে বলল,
– আমার মা রেগে যাচ্ছে কেন? আমি তো সবটা তোমার
আমিই তোমার পাপা, আমিই তোমার ছোট পাপা। আনি মজা করেছে তোমার সাথে।
নায়েল ঘাড় থেকে মাথা তুলে তাকালো আনির দিকে। ঘাড় নেড়ে জিজ্ঞাসা করল,
– মজা কলেছ?
আনি কৃত্রিম হেসে হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ল। নায়েল গাল ফুলিয়ে বলল,
– আল মজা কলবে না। আমি মজা কলা পছন্দ কলি না।
আনির মুখটা আবার বিবর্ণ হয়ে গেল অপমানে। নিশাত সতর্ক দৃষ্টিতে তাকালো মৌনতার দিকে। আশ্চর্য ভাবে তার চোখে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া নেই। বরং মনে হচ্ছে সে ভীষণ প্রসন্ন।
মৌনতার মনে যেটুকু রাগ ছিল তা যেন মিলিয়ে গেল নায়েলের অবুঝ প্রতিবাদে। এরোজ নায়েলকে নিয়ে আবার ঘরের দিকে পা বাড়ালো। মৌনতাকে নিরুদ্বেগ পাশ কাটিয়ে চলে যেতে দেখে সে উঁচু স্বরে বলল,
– নায়েলকে আমার কাছে দিন।
– আফটার শাওয়ার।
গুরুগম্ভীর কণ্ঠে ছোট্ট একটু জবাব দিয়েই এরোজ তাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। মৌনতা দাঁত কিড়মিড় করল। আনির সাথে বিয়ে করার কথা বলার পর থেকে তার সাথে রাগ দেখাচ্ছে—অথচ আনির থেকেই হেসে হেসে সেবা নিচ্ছে!
সে তাদের অনুসরণ করল। চলতে চলতে বলল,
– সারারাত একটা মানুষের সেবা নিলেন। আপনার অভ্যাস অনুযায়ী টেবিলে কানাডিয়ান খাবার থাকতেও আপনি আনির আনা গরুর গোশত এমনভাবে খেলেন যেন কোনোদিন খাননি। এটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে আনিকে বিয়ে করলে আপনি ঠিক কতটা সুখী হবেন। অথচ সেটা আমি বললেই দোষ, তাই না? আপনার কী মনে হয় না আপনি অহেতুক রাগ দেখাচ্ছেন আমার উপর?
মৌনতার কণ্ঠে কিছু একটা ছিল যা ভিন্ন ছিল। সেই ভিন্নতাটুকু উপলব্ধি করতে পেরেও এরোজের কোনো উদ্বেগ দেখাগেল না। সে গেস্ট রুমে গিয়ে ঠাস করে মৌনতার মুখের উপর দরজা আঁটকে দিল। মৌনতা ক্রোধে লাল হয়ে গেল।
সে হনহনিয়ে গিয়ে নিশাতের পাশে বসল। নিশাত তার ক্রোধ লক্ষ্য করল। অন্তঃস্থল পুলকিত হয় এরোজের জন্য মৌনতার মাঝে উদ্বেগ দেখে। অবশেষে যদি ছেলেটা একটু সুখ পায়!
সে বলল,
– কী হয়েছে?
মৌনতা আড়চোখে আনিকে দেখল যে কি-না তাকে অসন্তোষের চোখে দেখছে। বলল,
– কিছু না খালামনি।
– কোথাও ঘুরতে যাবি?
হসপিটালে যাওয়ার আর চারদিন বাকি থাকায় নিশাত বলল। কিন্তু মৌনতার কাছে হঠাৎ করেই সব বিষাদ লাগতে শুরু করল। সে অনীহা নিয়ে বলল,
-নাহ, ইচ্ছে করে না।
– আচ্ছা, তবে কিছু খাবি? রেস্তোরাঁয় যাবি? ড্যানফোর্থে বাঙালি সব ধরণের খাবার পাওয়া যায়। ওখানে চল। চারদিন পর থেকে তো আর তেমনকিছু খেতেই পারবি না।
মৌনতার ইচ্ছে হচ্ছিল মশলাদার বাঙালি খাবার খাওয়ার কিন্তু এরোজের আচরণ তার মন বিষিয়ে তুলছে। কিছু ভালোলাগছে না। সে বলল,
– তোমার ভাগ্নেকে বলো ঠিক করে ব্যবহার করতে।
– কেন আমার ভাগ্নে কী করেছে?
– দেখছ না আমার সাথে রাগ দেখাচ্ছে? আমি কী করেছি?
-রাগের কারণ খুঁজে বের কর আর স্যরি বল। তাহলেই তো হয়ে গেল।
– কিন্তু আমার কোনো দোষ নেই। সেই শতভাগ দোষী!
মৌনতা তীব্র উদ্বেগ নিয়ে বলল। সে বিয়ের কথা বললে দোষ কিন্তু আনির সেবা নিলে কোনো দোষ নেই?
নিশাত মৃদু হেসে বলল,
– একটা সম্পর্কে কার দোষ বেশি এটা খোঁজা অনুচিত। বরং দোষগুলো উপেক্ষা করে একে অপরকে ক্ষমা করে দেয়া মানে সম্পর্ককে আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
মৌনতা চমকে উঠল নিশাতের কথায়। খালামনি এমন কথা বলল কেন? সে তড়িঘড়ি করে বলল,
– এমন কোনো বিষয় নয় খালামনি। সে রাগ করলেও বা কী! আমার কিছু যায় আসে না।
– সত্যিই যায় আসে না?
নিশাত হেসে জিজ্ঞেস করল। মৌনতা ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
– নাহ। কিন্তু একজন চঞ্চল, হাসিখুশি মানুষ হঠাৎ চুপ হয়ে গেলে অস্থিরতা অনুভব হয়।
– আর এই অস্থিরতার নাম অন্যকিছু। যা তুই স্বীকার করতে চাইছিস না।
বলেই নিশাত উঠে দাঁড়ালো। ছোট মেয়ে ততক্ষণে বাবার সাথে বেরিয়ে গিয়েছে। মৌনতা তাকিয়ে রইল নিশাতের গমনের পানে। খালামনি কী বোঝাতে চাইছে? এই অস্থিরতার অন্য নাম কী?
এরোজের অভিমান দীর্ঘ হলো। মৌনতার অস্থিরতাও ঠিক ততটাই তীব্র হলো। চারদিন নিমিষেই ফুরিয়ে গেল। হসপিটালে ঢোকার আগে মৌনতা দীর্ঘ বিচ্ছেদের একটা ক্লান্তিভরা নিঃশ্বাস ফেলে নায়েলকে বুকে জড়িয়ে নিলো। চোখেমুখে অজস্র চুমু দিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে বলল,
– মাম্মা, খুব তাড়াতাড়ি চলে আসব ওকে? তুমি গুড গার্ল হয়ে থাকবে। সবসময় নানু আর ছোট পাপার কাছে থাকবে।
নায়েল ঠোঁট উল্টালো। ঘন পল্লব বারংবার নেড়ে কান্নাচেপে বলল,
– কেন বালবাল ছেলে চলে যাও?
ল আর র এর দ্বন্দ্ব আজ ও গেল না নায়েলের। মৌনতা অশ্রুভেজা নয়নে চেয়ে ম্লান হেসে বলল,
– এটাই যে মাম্মার ভাগ্য! তুমি আল্লাহর কাছে প্রে করবে—যে আল্লাহ প্লীজ আমার মাম্মাকে সুস্থ করে দাও। তাহলে দেখবে, মাম্মা আর কখনো ছেড়ে যাব না তোমায়?
নিশাত আর নিশান্ত তাড়া দিল।
– ভাবি, রাত নয়টার মধ্যে তোমায় কেবিনে থাকতে হবে। অলরেডি আটটা আটান্ন বাজে।
মৌনতা মেয়ের ললাটে আরেকটু চুম্বন এঁকে দিয়ে বুকভরে মেয়ের সুঘ্রাণ শুষে নিলো। নিঃসন্দেহে পৃথিবীর সবচেয়ে স্নিগ্ধ মায়াভরা সুঘ্রাণ।
– মাম্মা, আসছি। তোমার সাথে ফোনে কথা বলব ওকে? যাও, নানুর কোলে যাও।
নায়েলকে মাসুমা কোলে তুলে নিলো। মৌনতা ভেতরে ঢুকে গেল। নায়েল সেদিকে চেয়ে রইল অভিমানী ভেজা চোখে। পরপরই ঘাড় উঁচিয়ে তাকালো তমসাবৃত আকাশপানে। শিশুসুলভ অবোধ কণ্ঠে ডাকল,
– এই আল্লাহ, শুনছ? আমাল মাম্মা কেন আমায় ছেলে চলে যায় বালবাল? মাম্মাকে সুস্থ কলে দাও প্লীজ। নায়েল মাম্মাকে মিস কলে। তুমি তো বেবিদেল খুব ভালোবাসো তাই না? আমাল প্রে শুনবে না?
মাসুমার চোখ ভিজে উঠল নাতনির আকুতিতে। তিনি তার গালে অজস্র চুমু দিয়ে বললেন,
– শুনবে নানুমনি, অবশ্যই শুনবে। আল্লাহ কখনো বেবিদের কথা ফিরিয়ে দেয় না।
নায়েলের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
-তাই?
-হুম।
-কবে শুনবে?
-তুমি রোজ আল্লাহর কাছে বলবে দেখবে একদিন তোমার প্রে শুনে নিয়েছে আল্লাহ।
– ওহ্,ওকে। থ্যাংক ইউ আল্লাহ। আমি লোজ তোমাল কাছে মাম্মাকে চাইব।
নায়েলের মন খারাপ ভালো হয়ে গেল। কারণ তার কাছে এমন এক বিস্ময়কর সৃষ্টিকর্তা আছেন যার কাছে জগতের সকল অসম্ভব কিছু নির্দ্বিধায় চাওয়া যায়। আর এটা বোধহয় মানুষের অর্ধেক মানসিক শান্তি নিশ্চিত করণের জন্য যথেষ্ট। আমাদের চাওয়ার জন্য এমন এক বিস্ময়কর সৃষ্টিকর্তা রয়েছেন যার কাছে আমরা যখন, যা ইচ্ছা তাই চাইতে পারি।
রাত এগারোটা বেজে গেল মৌনতার কেমোর প্রস্তুতি নিতে নিতে। নিশান্ত, তার স্বামী আর নিশাত ততক্ষণ সেখানে উপস্থিত ছিল যতক্ষণ পর্যন্ত না মৌনতা ঘুমিয়ে যায়।
সকল টেস্টের আশানুরূপ ফলাফল পেয়ে রাত বারোটা নাগাদ মৌনতার কেমো শুরু হলো।
হাসপাতালের সেই যান্ত্রিক কক্ষ, কেমোর অসহনীয় গন্ধ আর নিজের ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া অস্তিত্বের মাঝেও ছিল এক অদ্ভুত অস্থিরতা। ভালোবাসি, ভালোবাসি বলে রব তোলা মানুষটা একবার ও তো আসল না। অভিমান জমলো, অপেক্ষা নামক অদ্ভুত অনুভূতি জেঁকে বসল।
এমনটা তো হওয়ার কথা নয়। এটা কী শুধুই হঠাৎ বদলে যাওয়া অভ্যাসের রেশ নাকি অন্যকিছু? অপেক্ষা করতে করতে আঁখিদের তেজ হারালো কিন্তু অপেক্ষা ফুরালো না।
ভালোবাসা মানে কী? যে অন্য কারোর মায়ায় নিজেকে খুঁইয়ে বসে। ভীষণ বাজেভাবে খুঁইয়ে বসে। মৌনতা আদোতেই জানে না ভালোবাসা কী। জানলে হয়তো সে এরোজের ভালোবাসাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারত না। সে শুধু জানে, সময়ের সাথে কীভাবে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। যেটা এরোজকে ভীষণ দুঃখ দেয়।
বরাবরের মতোই মৌনতা এরোজকে তখন কাছে পেয়েছে যখন সে ভীষণ অসহায়। হোক সেটা আর্থিক ভাবে কিংবা শারীরিক ভাবে। সময় গড়ায়।
আর সময়ের সাথে সাথেই কেমোর অসহনীয় প্রতিক্রিয়ায় মৌনতা একটু একটু করে বাঁচার আশা ভুলতে শুরু করল।
নিজের সাথে লড়াই করে তিনটা কেমো মৌনতা খুব দুঃসাহসীকতার সাথে লড়লেও, তার মাঝে আর শক্তি ছিল না কেমোর বিরুদ্ধে লড়ার। জিহ্বায় পানির ছোঁয়া পেলেও গলগল করে বমি করে দিচ্ছে। বমি করতে করতে দৈহিক যন্ত্রণায় তখন মেঝেতে পড়ে ছটফট করছিল মৌনতা। ঠিক তখুনি বরাবরের মতোই কেউ সবেগে তাকে আগলে নিলো বক্ষমাঝে। বক্ষমাঝে আগলে নেয়া দেহটিকে আরাম দিতে দিতে এরোজ ধিমি কণ্ঠে বলল,
– কিচ্ছু হবে না, কিচ্ছু হবে না। আর একটু ধৈর্য ধরুন। আর মাত্র তিনদিন তারপরই এগুলো কমে যাবে।
নেহাৎ ই স্বান্তনা ছিল। মৌনতা তো জানে এই যন্ত্রণার সময়সীমা আগামী বারো দিন কিংবা তার বেশি। প্রচন্ড যন্ত্রনার মাঝে মাথায় কেউ ভরসার হাত রাখলে বোধহয় অর্ধেক যন্ত্রণা কমে যায়। কী অদ্ভুত শক্তি! এমনি শক্তির বলে মৌনতা দীর্ঘ সাড়ে তিনমাস লড়েছে।
মাথায় অনবরত হাত বুলানোর আরামদায়ক আবেশে মৌনতা ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করে নিলো।
কিন্তু মিনিটের মাঝেই আবারতার আরামটুকু মিলিয়ে গেল। ফের পেট উগড়ে বের হয়ে আসল। পুনরায় লাগাতার পাঁচ মিনিট যাবৎ বমি করে মৌনতার বলহীন দেহটি ভর ছেঁড়ে দিলো পুরুষালী বাহুডোরে। বদ্ধ নেত্রের কার্নিশ বেয়ে টপটপিয়ে কয়েক ফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পড়ল। অনুনয় করে ফিসফিসিয়ে বলল,
– ডক্ট…ডক্টরকে একটু বলুন না.. আমায় যেন একটু ঘুমের ওষুধ দেয়। আমি আর সহ্য করতে পারছি না।
ধূসর নেত্রদ্বয়ে রক্তিম আভা নেমে এলো সেই ছটফটানি ভরা আকুতিতে। অনবরত মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে ক্ষীণ স্বরে বলল,
– ঘুমের ওষুধ দেয়া যাবে না। আপনি ঘুমানোর চেষ্টা করুন আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।
রুগ্ন দেহটি তখন দৈহিক যন্ত্রণায় অস্বাভাবিক উষ্ণ হয়ে উঠেছে। এরোজ নার্সের দিকে তাকিয়ে বলল,
– একটা ভেজা টাওয়েল দিন।
নার্স বলল,
– ওনাকে বেডে শুইয়ে দিন প্লীজ। সেন্ট্রাল লাইনে টান লাগলে সমস্যা হয়ে যাবে।
এরোজ অশ্রুভেজা নয়নে বলল,
-দেখছেন না সে কষ্টে ছটফট করছে? বিছানায় স্থির হয়ে শুয়ে থাকবে কী করে? সেন্ট্রাল লাইনে টান লাগবে না, আমি দেখে রাখব। আপনাকে যেটা বলেছি সেটা করুন।
নার্স টাওয়েল ভিজিয়ে এনে দিল। এরোজ খুব সাবধানে মাথা, মুখ, ঘাড় মুছিয়ে দিতে শুরু করল। একটু আরাম, একটু ভরসাস্থল আর মাথার উপর একটা হাত পেতেই মৌনতার যন্ত্রণারা ফিকে হয়ে আসল। ক্ষীণ সুখ যে অসহনীয় দুঃখকে হার মানাতে পারে সেই উপলব্ধিটুকু হওয়ার আগেই মৌনতার হাত পা ছেড়ে দিল।
নিমিষেই গভীর ঘুমে তলিয়ে যাওয়া মুখটির দিকে অনিমেষ চেয়ে রইল এরোজ। নার্স আবারো বলল,
– এখন ওনাকে বিছানায় শুইয়ে দিন।
– উঁহু, এখানেই থাকুক।
এরোজ আরো দৃঢ়ভাবে আগলে নিয়ে বলল। একটি হাত অনবরত তখনো মাথায় হাত বুলিয়ে যাচ্ছে।
জগতে সবার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়ার মতো একজন মানুষ থাকা প্রয়োজন। তবে হয়তো কেমোর মতো অসহনীয় প্রতিক্রিয়াও হার মেনে যেতো। ঠিক যেমনটা মৌনতার দুঃখরা হার মানলো।
প্রিয় মানুষটি কাছে আছে, বুকে আছে তবুও যেন তার নয়। এই এক ব্যথা এরোজকে আরো বাজেভাবে ভেঙে দিচ্ছিল। সব থেকেও কিছুই নেই এই অনুভূতি এতটা বিদঘুটে কেন?
রাতের অর্ধপ্রহরটুকু সেভাবেই মেঝেতে, প্রশস্ত বুকে কেটে গেল মৌনতার। দীর্ঘক্ষণ আরামের ঘুম সেদিন হারাম হয়ে গিয়েছিল যেদিন সে বিয়ে নামক বিদঘুটে বন্ধনে জড়িয়েছিল। আজ ও মৌনতা দীর্ঘক্ষণ ঘুমাতে পারল না।
টিমটিমে আলোয় চোখ মেলে তাকাতেই দৃষ্টিসীমায় ভেসে উঠল দুটি ধূসর রাতজাগা লালচে নেত্র। এই চোখটি ইদানিং তার একটিমাত্র আরামদায়ক দৃশ্য হয়ে উঠেছে, তার বদঅভ্যাস হয়ে উঠেছে। সুখে দুঃখে, যন্ত্রণায় সবসময় এই চোখদুটো তার উপরেই নিবদ্ধ থাকে।
আগে লজ্জা পেত কিন্তু এখন আর লজ্জা হয় না। করুণা হয়। ভুল মানুষকে ভালোবাসার নীল ব্যথায় জর্জরিত পুরুষটির জন্য তার ভীষণ কষ্ট হয়!
মৌনতা একদৃষ্টিতে চেয়ে রইল অশ্রুভেজা নয়নপানে। যখন তার সবছিল তখন কেউ একটু তাকে ভালোবাসা তো দূর মাথায় হাত ও রাখেনি। কিন্তু এখন তার কিছু নেই অথচ এই মানুষটা তার জন্য কাঁদছে।
সে অতি ক্ষীণ স্বরে বলে উঠল,
-এক ভাই ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেয় আর এক ভাই সেই টুকরো গুলো জোড়া লাগাতে চায়। জীবন কী জটিল, তাই না?
এরোজ ম্লান হেসে বলল,
-আর আপনি তখন ও বোকা ছিলেন আজ ও বোকাই আছেন। তখন ভুল মানুষকে ভালোবেসে বোকামি করেছেন, এখন সঠিক মানুষকে ভালো না বেসে বোকামি করছেন।
-অথচ ভালোবাসা নামটা শুনলেও আমার ভয় হয়।
মৌনতার চোখের কোল ঘেঁষে নোনাজল গড়িয়ে পড়ল। এরোজ অশ্রুসিক্ত নয়নে চেয়ে আবদারের সুরে বলল,
-জীবনের শেষ লহমাটুকু আমার নামে করে দিন না, মৌন। চলুন বিয়ে করি।
মৌনতা স্মিত হেসে বলল,
– আমি ডিভোর্সি।
– যেদিন আল্লাহকে সাক্ষী রেখে কবুল বলব সেদিন এর তকমা চিরতরে মুছে যাবে।
– আমার একটা সন্তান রয়েছে।
– আমি তার বেস্ট পাপা হবো।
– আমার দৈহিক সৌন্দর্য নেই, মাতৃত্বের দাগ স্পষ্ট।
এরোজ ম্লান হেসে বলল,
– মাতৃত্বের কষ্ট, দাগ বহন করার এই ত্যাগ ও ধৈর্য্যের কারনে সৃষ্টিকর্তা যখন আপনাকে সম্মানিত করবে আমি তখন চোখ ভরে দেখব। আমি তো ভালোবেসেছিলাম দৈহিক সৌন্দর্য থাকাকালীন, না থাকাকালীন। তবে কী যায় আসে দৈহিক সৌন্দর্য থাকুক বা না থাকুক। আমি নাহয় আমার সৌন্দর্যে আপনাকে রাঙিয়ে তুলব।,
মৌনতা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল পুরুষালী দৃঢ় মুখপানে। সর্বশান্ত সেই মৃতপ্রায় চাহনিতে পুরুষটির বুকে কাঁপন ধরে। ভয়ে কুঁকড়ে যায় অন্তঃস্থল। চোখের কোনা ছলছল করে ওঠে তবুও ওষ্ঠদ্বয় থেকে হাসি সরে না। মৌনতা ক্ষীণ স্বরে বলল,
– আমি মৃত্যু পথযাত্রী।
এরোজ গড়িয়ে পড়া অশ্রু গুলো মুছতে মুছতে বলল,
– আমি সেই পথের সঙ্গী হবো।
যত অশ্রু মোছা হয় ততই যেন আরো অশ্রু গড়ায়। চোখের কোনে জমা অশ্রুগুলো তখন অঝোরে ঝরছে। মৌনতা পুনশ্চ বলল,
– আমি একটা লাল শাড়ি পড়ে বউ সাজব।
– আমি লাল শাড়ি কিনে আনব।
– হাত ভরতি চুড়ি পড়ব আর আপনি তা ফূরসৎ নিয়ে চোখ ভরে দেখবেন।
– আমি অক্লান্ত অফুরন্ত সময় নিয়ে চুড়িপড়া সেই হাত মুগ্ধ হয়ে দেখব।
– আমি অনেকগুলো গোলাপ ফুল দিয়ে মাথায় খোঁপা বাঁধবো।
সেই লগ্নে এরোজ থমকালো। কেননা নারীটির মাথায় তখন একটা চুলের উপস্থিতি নেই। সে অসহায়ত্ব নিয়েই বলল,
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৬০ (২)
– খোঁপার থেকে লাল ঘোমটা বেশি সুন্দর। আপনি লাল ঘোমটা দিয়ে একটা লাল টুকটুকে বউ সাজবেন।
সহসা মৌনতা হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠল। এরোজ ও কাঁদে! মৌনতা ক্রন্দনরত গলায় বলল,
– আমায় খোঁপাতে খুব সুন্দর লাগে।
প্রেক্ষিতে এরোজ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
– আপনাকে সবকিছুতে, সবভাবে সুন্দর লাগে।
