অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ১১
Maha Aarat
বর্ষার মৌসুম বিদায়ের প্রান্তে।পরিবেশে নতুন রঙ্গ।সূর্যের তেজ বেড়েছে।আকাশে রংধনুর ছড়াছড়ি আজ।তবে শীতল বাতাস ঘর ছাড়ছে না।মাঝে মাঝে শিউরে উঠা অনুভূতি দিয়ে যেনো বুঝিয়ে যায়,আমি এখনো ফিরিনি।আমার পুনরায় সাক্ষাত এখনো বাকি।
আজকে শুক্রবার।আরিফের সাথে হাফসার নিকাহ।আরিফ পেশায় একজন ডক্টর।মাহেরের ইনস্টিটিউশনের বিপরীত দিকে তাঁর কর্মস্থল।হাফসাকে নিয়ে যেদিন বাড়িতে এসেছিলেন সেদিন তাকে আরিফ সম্পর্কে সবকিছু বিস্তারিত বলার পর তার মত জানতে চাইলে হাফসা নিরুত্তর ছিলো।আরিফ স্বভাবত নরম স্বভাবের।হাফসার বাকহীনতা শুনে সে তেমন আপত্তি করেনি বরং মা বাবাকে উল্টো বুঝিয়েছিলো।নতুন দ্বীনে ফেরা একজন ব্যাক্তির জন্য একজন দ্বীনদার সঙ্গী খুব প্রয়োজন।আর আরিফ হাফসার ধার্মিকতায় মুগ্ধ।
বেলা এগারোটা ঘড়িতে।বাড়ির সামনে গাড়ি থামতেই আইরা চট করে নেমে পড়লো।ওর উড়ুউড়ু আচরণে আরহাম নীরব দৃষ্টিতে কেবল তাকালেন।এসব অস্বাভাবিক কিছু নয়।উনি দেখে দেখে অভ্যস্ত।
ভেতর ঘরে খাবারের আয়োজন চলছে।মাহের এগিয়ে এসে আন্টিকে সালাম দিয়ে আরহামের সাথে মুসাফাহা শেষে গেস্টরুমে নিয়ে তাদেরকে বিশেষ আপ্যায়নের আদেশ দিয়ে ব্যস্তভঙ্গিতে রুম ত্যাগ করতেই মাইমুনা চোখের নিকাব তুলে।স্ক্যাচ ছাড়িয়ে আইরা তাকে বসতে সাহায্য করলে মাইমুনা মলিন দৃষ্টিতে আরহামের দিকে চক্ষু স্থির রাখলো।উনি ব্যস্ত ফোনে।মাইমুনা জানে,এই সামনে বসা সুদর্শন সুপুরুষটা কেবল তাঁর।আর আরহামের প্রতিশ্রুতিও মিথ্যে হবে না।তবুও তাঁর কেমন ভয় লাগতে শুরু করে।নিকাবের আড়াল দিয়ে কপালে জমে উঠা বিন্দু বিন্দু ঘামফোঁটা মুছে ফেলে সে।
বেলকনির সোফায় চুপচাপ নতমুখী হয়ে বসা রমণীর চক্ষুগোলক পানিতে টইটম্বুর।সে আর কাঁদবে না।ভাই যখন বার বার এসে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘বোন তুমি রাজি তো?আপত্তি থাকলে এখনও জানাও।আমি ক্যানসেল করবো সব।’ তখনও সে চুপটি করে বসে ছিল।তাঁর কেন জানি মনে হয়,ভাইয়ের খুব দুঃশ্চিন্তা তাকে নিয়ে।এমনকি তাঁর জীবন গোছাতে গিয়ে নিজেকেও নিয়ে তিনি ভাবতে নারাজ।হাফসার মন তবুও প্রবল ঢেউয়ের বাঁধের মতো চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যায়।আপন নীড় সে ছাড়তে চায় না।কিন্তু তাকে অনেকগুলো অপশন নিয়ে ভাবতে হয়।
আইরা আসার পর থেকেই হাঁসফাঁস করছে।মাইমুনাকে বারবার ইশারায় বুঝাচ্ছে, ‘চলো আপুর ঘরে যাই?’
মাইমুনা অসহায় দৃষ্টিতে কেবল তাকালেন।উনার ভেতর অন্য ঝড়।তাদের সাথে আছে তোহফা।আইরা তাকে চুপিচুপি বলল, ‘আপুর ঘরটা কোনদিকে?’
‘করিডোর পেরিয়ে বামদিকে।’
আইরা আর পিছু ফিরলো না।আশেপাশে মেহমান আছে।চোখের নিকাব ফেলে সে ছুট লাগালো হাফসার ঘরের উদ্দেশ্যে।
অথচ রুমে এসে চমকালো সে।আপু কোথাও নেই।ওয়াশরুম থেকে পানির ঝনঝনানি আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।আইরার মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়লো।আপু এখনও শাওয়ারে?ইসস…তার চিন্তার শেষ নেই।গেস্ট রা এসে গেলো বলে।ওয়াশরুমের দরজায় বিরামহীন নক করতে করতে বলল, ‘আপু তাড়াতাড়ি বের হোন।গেস্ট রা চলে আসছে তো।আপনি এখনো শাওয়ারে?’
ওপাশ থেকে ঠিকই পানির আওয়াজ বহমান।আইরার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙ্গছে।আপুটার একটুও তাড়া নেই?
আইরা আবারও জোর শব্দে আওয়াজ তুললো।তবুও ওপাশ থেকে কোনো উত্তর নেই দেখে এবার বেশ জোরালো স্বরে বলল, ‘আপু তাড়াতাড়ি বের হোন।আপনি বুঝতে পারছেন না গেস্টরা তো….
কথা শেষ করতে পারে না সে।ওয়াশরুম থেকে উঁকি দিয়ে তিনি চোখ কুঁচকে তাকালেন।আইরা যেনো বড়োসড়ো শক খেলো এমন অদ্ভুত মুখ দেখে।মাহের হাত দিয়ে চোখমুখের ফেনা সরিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ‘এটা কোন দিক দিয়ে মেয়েদের রুম মনে হচ্ছে আপনার?’
আইরার অবস্থাটা এমন যে সে শকড হয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছে।কেবল হতবিহ্বল হয়ে চারিপাশে তাকালো।রুমে শুধু একটা কেবিনেট, বেড,ফ্রিজ আর একটা স্টাডি টেবিল।
ফেনার জন্য ঠিকমত তাকাতে পারছেন না মাহের।আবারও চোখমুখে পানির ছিটা দিয়ে বললেন, ‘হাফসার রুম বামদিকের থার্ড রুম।’
আইরা আর এক সেকেন্ড অপেক্ষা করলো না।ছুট লাগালো সেই উদ্দেশ্যে।অথচ মাহের ওয়াশরুমের ডোর লক করতে করতে ঠাস করে শব্দ শুনলেন।মাহের যতক্ষনে তাকালেন ততক্ষণে রুম ফাঁকা।
মাহেরের অবচেতন মন বুঝতে পারলো না শব্দটার উৎপত্তি।তিনি আবার ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
একজন বিউটিশিয়ান হাফসাকে রেডি করতে ব্যস্ত।সে নিঁখুত দৃষ্টিতে হাফসার সাজ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে কোনো কমতি হচ্ছে না তো।কিছুক্ষণ পর রুমে আসলেন মিসেস আফসানা।তিনি যতক্ষণে এসেছেন হাফসাকে গোছানো প্রায় শেষ।চমৎকার হেসে কেবল বললেন, ‘মাশা আল্লাহ মাশা আল্লাহ।নজর না লাগুক।’
গাড়ির হর্ণের শব্দ ভেসে আসতেই আরহাম উঠে দাঁড়ালেন।তখনো মাইমুনার নিঁখুত দৃষ্টি আরহামের দিকেই নিবদ্ধ।মাইমুনার এমন আচরণে আরহাম অস্বস্তিতে পড়ছেন।তবুও বাইরে বেরোনোর আগে স্বাভাবিক কন্ঠে বললেন, ‘রুম থেকে বেরোবেন না।বিশেষ প্রয়োজন ব্যতীত কারো সাথে কোনো কথা বলারও প্রয়োজন নেই।আমি মাহেরের কাছে যাচ্ছি।নয়তো ভুল বুঝবে আমাকে।’
মেজবান মহিলাদের জন্য আলাদা রুম নির্ধারিত।আর সে রুমেই বসে আছে মাইমুনাও।পুরুষরা ড্রয়িং রুমে আলোচনায় ব্যস্ত।হাফসার চাচা তাদের সাথে গুরুত্বপূর্ণ আলাপ সেরে নিচ্ছেন।মাহের আরিফের সাথে আরহামের পরিচয় করিয়ে দিতেই সে মুচকি হেসে আরহামের দিকে মুসাফহার উদ্দেশ্যে হাত বাড়িয়ে বলল, ‘আপনাকে দেখেছি এর আগেও।এখন পরিচিত হয়ে গেলাম।দারুন তিলাওয়াতের সুর আপনার।যোহরের সালাতটা আপনার নেতৃত্বে পড়তে চাই।’
আরহাম কেবল সৌজন্যমূলক হাসলেন।
যোহরের আজান পড়তেই নামাজে গেলেন পুরুষরা।মহিলাদের খানাপিনা তখনই সম্পন্ন হলো।খাবার শেষে তাদের আবদার হাফসাকে দেখবেন।হাফসাকে আরিফের পরিবার কখনো দেখেনি।সেটার প্রয়োজন বোধও করেনি আরিফ।কারন সে হাফসার পর্দার কাঠিন্যতা সম্পর্কে অবগত আর যেখানে চাচা আহমাদ বাবার বিশ্বস্ত বন্ধু,সেখানে আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন ছিলো না।
বোরকা পরিহিত অবস্থায় তাকে রুমে আনা হলে আরিফের এক আন্টি বললেন, ‘আমরা তো মহিলা৷ মানুষ।পুরুষের সামনে যখন যাবে তখন না হয় বোরকা পড়বে।এখন খুলে নাও।শাড়ি তো এমনিই ভারী।’
আইরার কেন জানি এই প্রস্তাব ভালো লাগলো না।মাইমুনার দিকে তাকাতে দেখলো ভাবির চেহারাতেও একই চাহনী।কিন্তু আইরা অবাক হলো তখন যখন তাকে মুখফ্রেশ করতে বলা হলো।রাগ সামলে সে উত্তর দিলো, ‘আপুর মুখে তো কোনো মেকাপ ইউজ হয়নি।কেবল একটু লিপস্টিক।’
আইরার মন্তব্য তাদের ভালো লাগলো বলে মনে হলো না।একজন বলে উঠলেন, ‘আমাদের বাড়ির বউ সে।আমরা তাকে এইটুকু আবদার করতে পারি না?’
আইরার রাগ তখন তুঙ্গে।সে কিছু বলার আগেই মাইমুনা ওর হাত চেপে ইশারা করলো চুপ থাকতে।আইরা চুপচাপ অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো হাফসার দিকে।যার চোখের বর্ষন থামছে না আজ।
‘এত কাঁদার কি হলো মেয়ে।তোমার কি মত নেই বিয়েতে?’
আচানক প্রশ্নে চোখ তুলে তাকালো সে।সহজ একটা কথা অথচ হাফসার বুকফেঁড়ে যেনো সূঁচ ডুকে গেলো।
আইরার মুঠো করা হাতটা কাঁপছে সেটা মাইমুনা ভালোই টের পাচ্ছেন।মাইমুনা ভালো জানেন,আইরা হাফসাকে কতোটা পছন্দ করে।মুখভরে আপু ডাকে!
আসরের ক্ষণ।বেলা পড়তে শুরু করেছে।খাওয়াদাওয়া শেষ।নিকাহনামা রেডি করা হচ্ছে তখন আচমকা ডাক পড়ে আরিফের।আরিফের মা আয়িশা তাকে আড়ালে নিয়ে বললেন, ‘তুমার একটা বার দেখা উচিত ছিল মেয়েটাকে।মেয়েটাকে আমার কাছে একটু বেঁটে মনে হচ্ছে।কথাবার্তা ও বলে না।কিছু বুঝেও না মনে হয়।আমরা এত কথা বললাম কোনো আ, উ করলো না।’
আরিফ মাকে আশ্বস্ত করে বলল, ‘ওহো মামনি।আমি, আমরা সবাই জানি উনার সমস্যার কথা।এটা কোনো ইস্যু নয়।’
আয়িশা চৌধুরী শক্ত কন্ঠে বললেন, ‘এত বড়ো ভুল সিদ্ধান্ত তো একাই নিলে।মা হয়ে আমি তোমার জীবন নষ্ট হতে দিতে পারি না
তুমি হ্যান্ডসাম,ড্যাশিং ছেলে।এসব মেয়েরা তোমার পিছু পিছু ঝুলবে।তাও…
‘ইনাফ মামনি।এখন এসব বলার সময় নয়।সংসার আমি করবো।যেহেতু আমার কোনো সমস্যা নেই মানে আমার কোনো ওবজেকশনও নেই।আপনি বাড়াবাড়ি করবেন না।’
ভদ্রমহিলার চেহারা নীরব।অথচ অন্তরে কালো ছাঁই উড়ছে।চৌধুরী বাড়ির রক্ত তাঁর।সহজে হার মানা তাদের বংশে নেই।আর না আছে কোনো বোবা বউ।
আরহাম সালাত থেকে ফিরেই আইরাকে মেসেজ করলেন, ‘কোন রুমে আছো?’
আইরা কিছুক্ষণের মধ্যে বারান্দায় উঁকি দিলো।আশেপাশে কাউকে দেখতে না পেয়ে ভাইয়ের কাছে এসে বলল, ‘কোনো দরকার?’
আরহাম টুপি খুলতে খুলতে চুলে আঙ্গুল চালিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘উনি কোথায়?’
‘ভেতরে।’
‘গেস্টের সিকনেস কমেছে?’
আইরার চোখমুখ শক্ত হয়ে গেল মুহুর্তেই।কঠিন ভাবসাব নিয়ে বলল, ‘আর সিকনেস।মহিলার যত ঢং।’
আরহাম কয়েক পলক তাকিয়ে শাসনের সুরে বলেন, ‘আইরা এভাবে বলতে নেই।’
আইরার স্বর যেনো গলে আসলো।মলিন দৃষ্টি রেখে নিচুস্বরে বলল, ‘ভাইয়া আপুর সাথে অনেক কিছু হয়ে যাচ্ছে।কিন্তু উনার কাছের কেউ পাশে নেই।আজকে উনার মা থাকলে এমন পরিস্থিতি তৈরী হওয়ার পরও হয়তো তাদের ফিরিয়ে দিতেন।’
আরহামের কৌতূহল বশত ইচ্ছে হলো কিছু জিজ্ঞেস করতে।কিন্তু মাইমুনাকে দেওয়া প্রতিশ্রতি মনে পড়তেই অন্য প্রসঙ্গ টেনে বললেন, ‘মাইমুনার রাতের মেডিসিনের কথা কাইন্ডলি মনে করে দিয়ো।বেরোতে দেরি হবে মনে হচ্ছে।’
আরহামের চলার পথে সামনাসামনি পড়ে গেলেন বরপক্ষের কোনো মেয়ে।তৎক্ষনাৎ ঘুরে পেছন ফিরতেই দেখেন আইরা তখনো ঠাঁয় আগের মতে দাঁড়িয়ে।
ভাইকে আড়ালে নিয়ে গিয়ে সে বলল, ‘ভাইয়া আমার মনে হচ্ছে আপু সুখী হবে না।তুমি তো জানো আমি যেটা অনুমান করি সেটা বেশীরভাগ সময় সত্যি হয়ে যায়।আমি যেনো স্পষ্ট আপুর ফিউচার দেখতে পারছি।’
আরহামের সকল মনোযোগ হাতের ঘড়িতে।আইরা সেটা বুঝেও কথা চলতি রেখে বলল,
‘আপুকে ওই মহিলা আঘাত দিয়ে অনেক কথা বলেছে।কথাগুলো হজম করার মতো নয়।আপু কথা বলতে পারে না এটা জানতো তাঁরা।তবুও এটাই তাদের সমস্যা এখন।আপু আমার থেকেও লম্বা তবুও তাদের বাহানা আপু বেঁটে।আমার মনে হচ্ছে তাঁরা ইচ্ছে করে এমন করছে।শেষে না কোনো ইন্সিডেন্ট ঘটায়।’
‘আম্মু কোথায়?’
‘ঘরে।আচ্ছা ভাইয়া আপুকে কি বলবো না করে দিতে?’
‘কখনোই নয়।এমন দূ:সাহস দ্বিতীয়বার দেখাবে না।’
‘তাহলে আপু এমন ঘরে যাবে যেখানে তাকে উঠতে বসতে খোঁটা শুনতে হবে?’
‘শান্ত হোও আইরা।উনার জন্য যেটা বেস্ট হবে,আল্লাহ সেটাই করবেন।’
আইরার দূ:শ্চিন্তা কিছুটা কমে।দম নিয়ে সে বলে, ‘ইন শা আল্লাহ।’
ইশারের সালাত আদায় করে হাফসা রুমে এলো।এখন তাঁর পরনে লং আবায়া।ভদ্রমহিলা এখনো শুয়ে আছেন।আসরের পরক্ষণে যখন আক্বদের সবকিছু রেডি তখনই উনার অসুস্থতা অনুভব হয়।মাথা ঘুরে পড়ে যাবার আগেই তাকে ধরে কোনোমতে সামলে বিশ্রাম নিতে বলা হয়েছিলো।উনার সুস্থ অনুভব হওয়ার আগ পর্যন্ত শেষ অনুষ্ঠান হচ্ছে না।
হাফসা পানি এগিয়ে দিলে তিনি গোমড়ামুখে সেটা খেয়েই অভিযোগের সুরে বললেন, ‘গরমে হাঁসফাঁস লাগছে।তাও কুসুম গরম পানি দিয়েছো?’
মাইমুনার চক্ষু চড়কগাছ।এখানে হাফসার কি দোষ।তিনি পানি চাইতেই উনার পাশের মহিলাই তে বলে দিয়েছিলেন ঠান্ডা পানি না দিতে।
হাফসার অশ্রুতে টলমলে দৃষ্টি আড়াল হলো না মাইমুনার।মেয়েটাকে এখানে বসেই যাচ্ছে তাই আঘাত দিয়েই চলেছেন।আড়ালে কী করবেন কে জানি।এত ধৈর্য কীভাবে হাফসার?
ফ্ল্যাশব্যাক_____
মাইমুনা অদ্ভুত হাসি হাসলো।যে হাসিতে লুকিয়ে আছে যন্ত্রনার সূঁচ।আরহামের মস্তক অবনমিত হয়ে যায়।ইতিমধ্যে ভেতরে চেপে থাকা কথাটা তিনি উগড়ে ফেলেছেন।এবার মাইমুনাকে কীভাবে বুঝাবেন!
‘দেখলেন তো!সরি মিথ্যে বলেছি।আমি তাকে আপনার বিষয়ে কিছু বলি নি।’
আরহাম দীর্ঘসময় চুপ থেকে বললেন, ‘এটা একসেপ্ট করিনি।’
‘সত্যি কথা বের করতে চাইছিলাম।ক্ষমা করুন।নয়তো জানতাম না।’
‘আ’ম সরী।ওগুলো অতীত হানি।এখন কিছু নেই।বিশ্বাস করুন।’
সেদিনের রাতটা পুরোদমে অস্থিরতায় কাটলো আরহামের।এদিকে কাল বাদ পরশু তাঁর নিকাহ।আরহামসহ উনার পরিবার না গেলে মাহের রাগ করবে।আর আরহাম না গেলে তো সে বাড়ি এসে বসে থাকবে।এদিকে মাইমুনা ভেতরে ভেতর কত দগ্ধ হচ্ছেন এটা আরহামের অজানা নয়।
দীর্ঘ রাতটা অমানষিক যন্ত্রণা নিয়ে কাটালেও সকালবেলা সালাত আদায় করেই মাইমুনার রুমে গিয়েছেন।তিলাওয়াত শেষে মাইমুনা তখন শোবার প্রস্ততি নিচ্ছিলেন মাএ।
আরহামের হঠাৎ উপস্থিতিতে সে না চমকালেও লাল লাল চক্ষুগোলক দেখে ঠিকই চমকালো। জিজ্ঞেস করলো, ‘শাহ!আপনি ঠিক আছেন?’
আরহাম অস্থিরতা নিয়ে তাকে পাশে বসিয়ে বললেন, ‘হানি আমি কিছু কথা বলতে চাই।আপনি শুনুন প্লিজ।’
‘বলুন।’
‘গতকাল আপনি হার্ট হয়েছেন তাই না?রাতের মাথায় সত্যিটা বলেই দিয়েছি তো।মাইমুনা আমি উনাকে পছন্দ করতাম তবে আমাদের বিয়ের আগে।সেটা একদমই একতরফা।আমি উনার চেহারাও কখনো দেখিনি বড় হওয়ার পর।এটা সৌন্দর্যের ভালোলগা ছিলো না।বলতে পারেন, এতো ছোট বয়সে দ্বীনদারিতায় মুগ্ধ হয়েছিলাম।ব্যসস এতটুকুই।এটা অতীত।আপনি আমার জীবনে আসার আগের অতীত।যেটা আমার কাছে মূল্যহীন।আমি উনাকে এখন পছন্দ করি না।আপনিই আমার বর্তমান,আপনিই ভবিষ্যত।আর কারো জায়গা নেই আমার জীবনে।প্লিজ আমাকে ভরসা করুন।’
মাইমুনা মনে মনে স্বস্তির শ্বাস ফেললেও দীর্ঘশ্বাসগুলো এসে আটকে যাচ্ছে গলায়।
আরহাম কাতর স্বরে ক্ষমা চেয়ে বললেন, ‘আমাকে ক্ষমা করে দিন।আমি কোনো পরনারীর দিকে চোখ তুলেও তাকাবো না কোনোদিন।কাউকে নিয়ে ভাববোও না প্রমিস।শুধু আপনাকে নিয়ে ভাববো।আমার দ্বারা আপনাকে আর কষ্ট পেতে দিব না।শুধু আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন।’
মাইমুনা গলায় আটকে থাকা ব্যথার সূঁচগুলো গিলে আরহামের হাতে হাত রেখে আশ্বস্ত করে বলল, ‘শাহ।আমি ক্ষমা করেই দিয়েছি।আমার জন্য আল্লাহর কাছে আপনাকে জবাবদিহি করতে হবে,এমন কিছু করবো না আমি।আপনার হাত ধরে যে জান্নাতে যেতে চাই।সেখানে আপনাকে নিয়ে অভিযোগ করি কীভাবে?’
আরহামের বুকের বোঝা হালকা হয়ে এলো মুহুর্তেই।নিজের মনের সব রকম বাড়াবাড়ির জন্য তাওবা করে ক্ষমা চেয়ে নিলেন রবের কাছে।এমন গুনাহ আর না হোক কখনো।
বর্তমান~
গতদিনের কথাগুলো মনে উঁকি দিচ্ছিলো আরহামের।এমুহূর্তে মাইমুনাকে একটু বেশিই মিস করেছেন।টেক্সট এরও কোনো উত্তর আসছে না ভেবে একটু মন খারাপ হলো উনার।
মেজবান’দের আপ্যায়ন শেষে রুমে ফিরতেই মাইমুনা জিজ্ঞেস করলেন, ‘হাফসা তুমি ইস্তেখারা করেছিলে?’
হাফসা ভেজা চোখজোড়া তুলে একবার তাকালো।সে উত্তর দিতে চাচ্ছে না তবুও মাইমুনা জিজ্ঞেস করলেন আবার।আইরাও সেখানে উপস্থিত হলো হঠাৎ।হাফসা একবার আশেপাশে তাকালো।অতপর হ্যাঁ বোধক মাতা নাড়তেই মাইমুনা যখন জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি উত্তর পেলে?’
অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ১০
সে ইশারায় বুঝালো, ‘সে ঘোলাটে কিছু স্বপ্ন দেখেছে।ইস্তেখারার এমন বিভ্রম উত্তর পাওয়া এমন ঘটনা তাঁর সাথে এর আগে ঘটেনি।তাঁর একমন বলছে, ভাইয়ের দায়িত্ব অনেক।অন্যমন বলছে, তাঁর জীবনে সঠিক মানুষ আসাটা এখনো বাকি।….
