Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২২ (৩)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২২ (৩)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২২ (৩)
রুপান্জলি

অর্পনা তর মাথা ঠিক আছে? অবুঝের মতো আচরন করিস না প্লিজ, আদ্রিয়ান স্যার তকে পাগলের মতো ভালোবাসে। তাকে তুই এভাবে ঠকাতে পারিস না।
,,,, উনি বাসে কি বাসেনা আমি জানিনা। ওসব ভালোবাসা টাসা আমার চাইনা ইরা,, আমি আজীবন একা থাকতে চাই। আর উনার জন্য কখনোই আমার সেরকম ফিলিংস আসেনি,, যাকে মনে ধরে না তাকে জীবনে জড়াবো কোন যুক্তিতে?

,,, অর্পনার কথায় রেগে ফেটে পরলো ইরা, সে ঠিক ভুল না ভেবেই বলে বসলো — উনার জন্য তর ফিলিংস আসেনা তাহলে কি এই পাগলের জন্য আসে? এই পাগলকে মনে ধরে তর? বুঝলামনা অর্পনা, তর মতো একটা বুঝদার মেয়ে কিভাবে এরকম ন্যাকামি করতে পারে? বি প্রাক্টিক্যাল অর্পন, আবেগে জীবন চলেনা।
,,, দ্বীপকে সরাসরি পাগল বলাটা অর্পনার পছন্দ হলোনা,, কেমন যেনো বুকে গিয়ে লাগলো কথাটা। সে দাতে দাত চেপে বললো — লিমিট রেখে কথা বল ইরা, উনি পাগল নয়, উনি অসুস্থ। আর তিনদিনে কারোর প্রতি ফিলিংস জমে কিনা জানা নেই, আপাতত উনার জন্য আমার মায়া হচ্ছে। দেট্স ইট, কথা এখানেই ক্ষতম। আমার লাইফে আমি কি করবো না করবো ওটা আমি ডিসাইড করবো,, আশা করি ফ্রেন্ডশিপের রুল্স গুলো ভুলে যাসনি।

,,, এপর্যায়ে ইরা কথা বলার মতো ভাষা পেলোনা। সে জানে আদ্রিয়ান অর্পনাকে পাগলের মতো ভালোবাসে,, এতোটাই ভালোবাসে যে দুটো বছর শুধু অবহেলায় কাটিয়ে দিয়েছে তবুও কোনোদিন একটা অভিযোগ করেনি। এমন একজন লোককে ভালো না বেসে , এমন একটা ছেলেকে বিয়ে করছে যে কিনা প্রথম সাক্ষাতেই ওর চুল খামচে ধরেছে। আসলেই, মেয়ে জাত ই খারাপ। কথায় আছেনা? হাজার জন তোমার দিকে হাত বাড়ানোর পরেও তুমি তার দিকেই হাত এগিয়ে রাখবে, যে তোমার দিকে ফিরেও তাকায়নি। অর্পনার হয়েছে সেই দশা। যখন সুস্থ হয়ে ছুড়ে ফেলবে সেদিন বুঝবে জীবনে একা থাকার যন্ত্রণা কেমন, কত প্রকার ও কি কি? ইরার কেমন যেনো কান্না পাচ্ছে, তার যন্ত্রনাটা কোথায় সেটা কেউ বুঝবেনা। চাইলেও বুঝাতে পারবেনা কাউকে,, এ যে অন্যায়, এরকম অন্যায় স্বীকার করাও পাপ।
,,, আধা ঘন্টা পর মাওলানা সাহেবকে নিয়ে ফিরে এলো বিহান, অরুন আর পল্লব । এই বিয়েতে অরুনের তেমন মত না থাকলেও বন্ধুত্বের রুল্স এর কথা ভেবে আপত্তি করতে পারলো না। রুল্স অনুযায়ী অর্পনা ভালো মন্দ যাই করুক না কেনো ওর পাশে থাকতে হবে। ওর পারশোনাল বিষয়ে নাক গলানো যাবেনা, কি করবে না করবে তার কইফিয়ত চাওয়া যাবেনা, দেট্স ইট। আর সেসব রুল্স মেনেই এতোদিন একসাথে থেকেছে তারা,, আজ সেই রুল্স ব্রেক করে সম্পর্কটা নষ্ট করতে চায়না।

,,,, মাওলানা সাহেব আসতেই বিয়ের কার্যক্রম শুরু করা হলো,, এটা কোনো কাগজে কলমে বিয়ে নয়, জাস্ট ধর্মীয় আকারে বিয়েটা হবে। বিহান চেয়েছিলো কাজি ডেকে রেজিস্ট্রি করে নিতে কিন্তু অর্পনা নিষেধ জানালো। সে তাদের বিচ্ছেদে কোনো শর্ত রাখতে চায়না আর না কারোর দয়া নিতে চায়। সল্প টাকা দেনমোহর ধরে বিয়ে পড়ানো হবে,, যেনো ভবিষ্যতে দ্বীপ তার দিকে মোটা অঙ্কের টাকা ছুড়ে দিয়ে বলতে না পারে,, এই নেও টাকা এতে তোমার আজীবনের ভরন পোষণ হয়ে যাবে। সেই স্কোপ রাখতে চায়না অর্পনা। যেই সম্পর্কে ভালোবাসা কিংবা টান থাকবেনা সেখানে টাকার লেনদেন রাখাটা বোকামি। দ্বীপ যদি কখনো মনে করে সে অর্পনার সাথে থাকবেনা তখন যেনো বিচ্ছেদের জন্য তাদের উকিলের দুয়ারে করা নাড়তে না হয়,, এমনিতেও দ্বীপ সুস্থ হয়ে গেলে অর্পনা নিজের রাস্তা বেচে নিবে। ভালোবাসা কিংবা সহানুভূতি কোনোটাই অর্পনার কাম্য নয়,, এই পৃথিবীতে সবার জন্য ভালোবাসাটা ভালো হলেও অর্পনার কাছে বিষাক্ত।

,,, ১০০১ টাকা ধার্য করে দ্বীপ আর অর্পনার বিয়ের বাধন বাধা হলো,, অর্পনাকে কবুল বলার কথা উঠলে অর্পনা নির্দ্বিধায় ৩ বার কবুল বলে দিলো কিন্তু বিপত্তি বাধলো দ্বীপের বেলায়। দ্বীপ এখনো আগের মতো অর্পনার পেটে মুখ গুজে রেখেছে,, এতো এতো মানুষ,, এতো আলো সহ্য করতে পারছেনা ব্যাচারা। ভয়ে বার বার কুকরে যাচ্ছে আর অর্পনার পরনের সুয়েটার খামচে ধরছে। দ্বীপের কান্ডে না চাইতেও অর্পনার হাসি পেলো, কে বলবে এই লোক ৬ বছর আগেও খুন খারাপিতে মেতে থাকতো? অর্পনা দ্বীপের কানের কাছে মুখ নিয়ে কোমল স্বরে বললো — খারাপ পুরুষ কি আমায় বিয়ে করবেনা?
,,,দ্বীপ ওভাবেই মাথা ঝাকালো, মানে করবে,,যার ফলে দ্বীপের পুঢ় উষ্ঠ অর্পনার কোমল উদর স্পর্শ করলো, ভিতর থেকে কেপে উঠলো মেয়েটা তবে বাহিরে তার আভাস পাওয়া গেলোনা। শক্ত পোক্ত অর্পনা অবেলায় ই অসহায় হয়ে পরলো, তার মন তাকে বলছে এই লোকটাকে সামলাতে গিয়ে অর্পনাকে খুব পুড়তে হবে। এতোটাই পুড়তে হবে যে দহনকুন্ডে তার অস্তিত্বের ছিটা ফোটাও অবশিষ্ট থাকবেনা। অর্পনা দ্বীপের চুলের ভাজে হাত চালিয়ে ধীর কন্ঠে বললো — কবুল বলুন দ্বীপ, নয়তো আমি আপনার সাথে থাকতে পারবোনা। আবার দূরে চলে যাবো,, আপনি কি চান আমি চলে যাই?

,,, হাড়ানোর ভয়ে কুকরে গেলো দ্বীপ,, সন্তর্পণে অর্পনার পেট আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। এতোটাই শক্ত করে ধরেছে যে অর্পনার দম বেরিয়ে যাওয়ার অবস্থা। অর্পনা হাসফাস করতে করতে আবারও কবুল বলার জন্য তাড়া দিতেই দ্বীপ বাধ্যের ন্যায় ওভাবে থেকেই কয়েক বার কবুল বললো,, প্রতিটা কবুলের গরম নিশ্বাস অর্পনার অস্তিত্বকে জ্বালিয়ে দিচ্ছিলো। অর্পনার ভিতরে কেমন এক অজানা অনুভুতি নাড়া দিলো,, সে কি বউ? আজ কারোর বউ হয়েছে নাকি? অর্পনা আর বউ এই দুটো কথা বড্ড আশ্চর্য লাগলো তার কাছে। অর্পনারাও বউ হতে পারে? কই সে তো কোনোদিন নিজেকে নিয়ে সেসব ভাবেনি,, তাহলে আজ ভাবনার বিপরীতে গিয়ে এতোকিছু কেনো হলো? এটাই কি আল্লাহ এর ইচ্ছা ছিলো। এজন্যই কি অর্পনা কখনো আদ্রিয়ানকে নিয়ে ভাবতে পারেনি? কিংবা কোনো ফিলিংস জন্মায়নি? কিন্তু এই সম্পর্কের ভবিষ্যত কী? নাহ!!কোনো ভবিষ্যৎ নেই তো,, দ্বীপ যখন সুস্থ হয়ে যাবে তখন কোনোভাবেই অর্পনাকে মেনে নিবেনা। আর মেনে নেওয়া, মানিয়ে নেওয়া সম্পর্কে অর্পনা কখনোই থাকবেনা। ভালোবাসা বিহীন সম্পর্কে মানিয়ে নিয়ে থাকার চেয়ে একা থাকা ব্যাটার। সুতরাং তাদের বিচ্ছেদ অনিসিকার্য!!

,,,রাত তখন ১১ টা,
,,, জয়পুরহাট ছাড়িয়ে এখন টাঙ্গাইলের পথ ধরে ছুটে চলেছে বিহানের গাড়িটি, উদ্যশ্য ঢাকায় ফিরে যাওয়া। বর্তমানে ড্রাইভিং সিটে অর্পনা নেই, সে দ্বীপকে নিয়ে পিছনের সিটে বসেছে। জীবনে প্রথম অর্পনা নিজের তৈরি করা রুল্স ব্রেক করে সেচ্ছায় কারোর জন্য স্যাক্রিফাইস করলো। বিহান ড্রাইভ করছে আর তার পাশের সিটে বসে আছে পল্লব। যাবার পথে কেউ কারোর সাথে কোনোরুপ কথা না বললেও এই কয়েক ঘন্টায় অরুন, পল্লবের সাথে বিহানের একটা বন্ধুত্ব পূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। যার দরুন পল্লব আর বিহান সেই কখন থেকে কি নিয়ে যেনো কথা বলছে আর হাসাহাসি করছে। আজ বহুদিন পর বিহান এতোটা মন খুলে হাসলো, এতোগুলা বছর বুকের মাঝে কষ্ট চেপে রেখে মন খুলে হাসা হয়ে উঠেনি। আজ এক অনাকাঙ্ক্ষিত সুখের আশায় মন খুলে হাসছে বিহান। অর্পনার পাশের সিটে বসেছে ইরা, মেয়েটা কেমন উসখুস করছে, হয়তো অর্পনার সাথে কথা বলতে চাচ্ছে। অর্পনা একবার ঘুমন্ত দ্বীপকে দেখে নিলো,, ঢাকা নিয়ে যাওয়া হবে বিদায় ওকে ঘুমের ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে। আপাতত সে আরও ৯-১০ ঘন্টা ঘুমাবে। অর্পনা সন্তর্পনে তার পেট জড়িয়ে রাখা দ্বীপের হাতটা সরিয়ে দিলো,,লোকটা অসুস্থ হলেও তার স্পর্শে অর্পনার চরম অস্বস্তি হয়। দ্বীপের হাত সরিয়ে ইরার হাতের উপর হাত রাখলো অর্পনা। সহসা ইরা অর্পনার অন্য কাধে মাথা হেলিয়ে দিলো। ইরার মনটা ভার, এই মন ভারের মুল কারন খানা বড্ড জটিল এবং অসহায়।

,,,অরুনের পাশে বসে কেমন হাসফাস করছে রাত্রি,, তাদের একসাথে যতোই জার্নি হোক, যেখানেই যাকনা কেনো,, অরুন কখনোই রাত্রির সাথে বসেনি। আজ একসাথে, এতোটা কাছাকাছি থাকায় রাত্রির ভিতরটা অস্বস্তিতে ছেয়ে যাচ্ছে। সেই অস্থিরতা কাটাতে রাত্রি কানে হেডফোন গুজলো,, মোবাইলে কান্টিনিউয়াসলি অনুপম রায়ের গান চলছে। রাত্রি মন প্রান দিয়ে নিজের মনকে ডাইভার্ড করে গানে মনোনিবেশ করতে চাচ্ছে। রাত্রি যখন মন দিয়ে নিজেকে ব্যাস্ত করতে ব্যাস্ত, তখনি প্রবল শিহরণে মনটা তলিয়ে গেলো।পায়ের উপর কোনো এক শক্ত পোক্ত ঠান্ডা পায়ের অস্তিত্ব টের পেয়ে চোখ বন্ধ করে নিলো রাত্রি। পা টা ধীরে ধীরে তার একটা পা কব্জা করে নিচ্ছে। প্রবল শিহরনে রাত্রি চোখ বন্ধ রেখেই অস্ফুট স্বরে বললো — ক,কি করছিস? পা ছাড়।

,,,অরুন কথা শুনলোনা, বরং অনর ভঙ্গিতে রাত্রির পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলে নিজের বৃদ্ধাঙ্গুল গলিয়ে দিলো। পরপর কন্ঠ নিচু করে বললো — ছাড়বোনা কি করবি? তুই না কাল থেকে বলে যাচ্ছিস, আমার বিয়ের সখ জেগেছে? কিন্তু আমি তো এমন কিছুই করিনি, যা দ্বারা এমন কিছু প্রমানিত হয়। তবে এখন করছি,, তর অপবাদটা সত্যি করে দেওয়ার চেষ্টা করছি। এবার যত খুশি বল, আমার আপত্তি নেই।
,,, অরুনের কথাগুলোতে রাগ ছিলো তবে কন্ঠ ছিলো অত্তন্ত গম্ভীর, শান্ত। সেই কন্ঠের মোহজালে মিয়িয়ে যাচ্ছিলো রাত্রি, সে আবারো অস্ফুট স্বরে বললো —
–ছাড় অরুন, আমার অস্বস্তি হচ্ছে।
,,, অরুন রাত্রির দিকে আরেকটু এগিয়ে গেলো, সিটের মাঝামাঝি কোনো বাধা না থাকায় সহসাই দুজনের কাধ একত্র হলো,, কেপে উঠলো রাত্রি,, অরুন আবারও অনর ভাঙ্গিতে বললো— ছাড়বোনা,, আগে বল কি দেখেছিস তুই? কি করেছি আমি? কথায় কথায় এতো খোচা দিচ্ছিস কেনো?

,,, রাত্রি অরুনের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করলো– তুই জানিস না তুই কি করেছিস?
,,, অরুন হালকা জেদি কন্ঠে বললো — জানলে তকে জিজ্ঞেস করতাম?
,,, রাত্রি অরুনের পা থেকে নিজের পা ছাড়াতে চেয়ে বললো — আগে পা ছাড়, তারপর বলছি।
,,, আগে বলবি তারপর ছাড়বো,, নয়তো
,,,নয়তো কি?
,,, অরুন একটা হাত সামনের সিটে রেখে রাত্রির দিকে হালকা ঝুকে বললো– আমার যে বিয়ের সাধ জেগেছে, তার একটা কঠিন প্রমান দিবো।
,,, অরুনের কথা বার্তা আর চাহনিতে ভয়ার্ত ঢোক গিললো রাত্রি, সে তারাহুরো করে বললো– বলছি, বলছি,, গতকাল সকালে লাইব্রেরিতে ঐ মেয়েটার সাথে তুই কি করছিলি?
,,,কোন মেয়ে?
,,, এখন ভুলে যাওয়ার ভান করছিস? দ্বিতীয় সারির বুক সেল্ফে মেয়েটা বইয়ের দিকে ফিরে ছিলো আর তুই মেয়েটার ঠিক পিছনে দাড়িয়ে ছিলি। সম্ভাবত মেয়েটার ঘাড়ে,, ( শেষের দিকে রাত্রির কন্ঠ কিছুটা ভেঙে এলো)
,,, কি?
,,, রাত্রির চোখ জোড়া ছল ছল করে উঠলো, সে এদিক ওদিক চোখ ঘুরিয়ে কান্না আটকাতে চেয়ে বললো — আমি বলতে চাইনা, এসব কুকর্মের কথা আমি কেনো বলবো?
,,, অরুন রাত্রির দিকে আরেকটু ঝুকে ফিসফিস করে বললো— কুকর্ম রাইট? ওকে!! ঐ মেয়েটাকে তো আমি চিনিনা, জানিনা, তাই ওর কাছে কেমন লেগেছে তা জানা হয়নি। কিন্তু তুই তো আমার পরিচিত শত্রু,, তর সাথেও একই কাজ করি? নিজের সাথে হলে ভালো করে বলতে পারবি আমার বিয়ের শখ জেগেছে নাকি জাগেনি। ভালো একটা রিভিউ আসবে।

,,, অরুনের মতো একজন ভদ্র সভ্য ছেলের মুখে এমন কথা শুনে রাত্রি ঘৃনায় মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বললো — আমাকে কি তর রাস্তার মেয়ে মনে হয়? যে তুই বলবি আর আমি সহ্য করে নিবো?
,,, রাত্রির কথা শেষ হতে দেরি অরুন রাগের তোপে রাত্রির পা শক্ত করে চেপে ধরতে দেরি হলোনা। এমন ভাবে চেপে ধরেছে যেনো পা দ্বারা এখোনি রাত্রির পা গাড়ির সাথে পিষে ফেলবে। পায়ের ব্যাথায় ককিয়ে উঠলো রাত্রি,, অরুণ এতোটাই শক্ত করে ধরেছে যে ফর্সা মুখশ্রী সেকেন্ডের গতিতে ব্যাথায় লাল হয়ে উঠেছে। শত চেষ্টা করেও পা সরাতে পারছেনা মেয়েটা। ওকে পা নাড়াতে দেখে অরুন ওর পাটা আরেকটু পিষে দিয়ে বললো — তুই রাস্তার মেয়ে নয়, তাহলে কি আমি রাস্তার ছেলে? কয়দিন আমাকে মেয়েদের পিছন পিছন ঘুরতে দেখেছিস যে এরকম একটা অপবাদ দিলি? এতোদিন একসাথে থেকে এই বিশ্বাস অর্জন করেছিস তুই? এসব ভাবিস আমাকে নিয়ে? আসলে কি বলতো?

যার মন যেমন সে অন্যকে তেমনি ভাবে,, তুই নিজেই আগা গোড়া একটা খারাপ মন মানসিকতার মেয়ে। নয়তো আমাকে লাইব্রারিতে ওভাবে দেখে এসব না ভেবে, কি হয়েছে? কেনো হয়েছে? সেটা জানতে চাইতি, এভাবে অপবাদ দিতিনা। ইউ নো রাত? আমি সেখানে প্রেম করতে যাইনি বরং বই আনতে গিয়েছিলাম। বই নিতে গিয়ে দেখি একটা মেয়ে বই নিচ্ছে,, অগত্যা আমি সেদিক থেকে চলে আসতে নিতেই চোখ যায় বুক সেল্ফের উপরে। কোনো এক কারন বসত উপরের কয়েকটি বই নিচে পরে যেতে নেয়। বই গুলো এতোটাই ভারি ছিলো যে, যদি ঐ মেয়ের মাথায় পরতো নির্ঘাত মেয়েটার মাথা ফেটে যেতো। সেই এক্সিডেন্ট ঠেকাতেই ঐ বইগুলো হাত দিয়ে আটকে দিয়েছিলাম। মেয়েটা যেহেতু আমার সামনে ছিলো সেহেতু পরিস্থিতিটা অন্য রকম দেখা গিয়েছিলো। কিন্তু তুই তো সেসব বুঝবিনা, তর কথা অনুযায়ী আমার চরিত্র খারাপ। ওকে, মেনে নিলাম, আজকের পর থেকে আমার খারাপ রুপ দেখবি। এর পর থেকে আমার নামে যা যা অপবাদ দিবি সবটা তর সাথে হবে,, বরাবর তর অপবাদ গুলো সত্যি করে দিবো আমি। দেখে নিস।

,,,কথাটা বলেই দূরে সরে গেলো অরুন, পা সরাতে নিলে রাত্রি ওর পা চেপে ধরে কান্না ভেজা কন্ঠে বললো — সরাবিনা, খবরদার!! পা পিষে দিতে চেয়েছিলি না? পিষে দে, সরালে ভালো হবেনা বলে দিলাম।
,,,অরুন ঝটকা মেরে পা সরিয়ে নিলো,, পল্লব ঠিকি বলে। মেয়ে মানুষের ন্যাকামি গুলো জাস্ট সহ্য করার মতো না। নিজে ভুল বুঝে হাজারটা কথা শুনাবে, তাতে কোনো দোষ নেই। অরুন যেইনা দুটো কথা শুনালো, এটা নিয়ে আবার রাগ করে বসে থাকবে। থাকুক বসে, কিছু আসে যায়না।

,,,, টানা ৫ ঘন্টা জার্নির পর রাত ১ টায় মির্জা বাড়ির গেইটের সামনে এসে বিহানের গাড়িটা থামলো। আসার পথে সবাইকেই বাড়ি পৌছে দিয়েছে বিহান,, শুধু ছাড়া হয়নি অর্পনাকে। অর্পনাতো এখন বিহানের ভাইয়ের বউ, দ্বীপের পারু। দ্বীপের পারুকে দ্বীপ থেকে আলাদা করা যায় বুঝি? নাহ, একদমি যায়না। দ্বীপ এখোনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তাই বিহান গাড়ি থেকে নেমে একজন গার্ডকে ডেকে দ্বীপকে আগলে নিলো। দ্বীপের হঠাৎ আগমনে বেশ অবাক হয়েছে গার্ডটি সাথে ভয় ও পেয়েছে। এর আগে যতবার দ্বীপকে বাড়িতে আনা হয়েছে ততোবার মির্জা বাড়িতে তান্ডব চলেছে। আবারও কি সেই তান্ডব চলবে? ভেবে আরো কুন্ঠিতো হচ্ছে লোকটি। গভীর রাত হওয়ায় পুরো বাড়ি নিস্তব্দ, সবাই ঘুমিয়ে আছে হয়তো তাই আর কলিং বেল চাপলোনা বিহান। ডুবলিকেট চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতেই খাবার টেবিলে ঘুমন্ত অবস্থায় মেধাকে দেখতে পেলো। ইসস!! মেয়েটা ওর জন্য অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে গিয়েছে। তারাতারি দ্বীপ আর অর্পনাকে রুমে দিয়ে এসে মেধার কাছে আসতে হবে,, নিশ্চয়ই রাতে কিছু খায়নি। এই মেয়েটাকে নিয়ে পারেনা বিহান,, এতোবার নিষেধ করা সত্তেও ওর জন্য অপেক্ষা করবেই।

,,,বিহান আর দাড়োয়ানটি দ্বীপকে বিছানায় শুইয়ে দিলো। দ্বীপের ঘরে অপরিচিত একটা মেয়েকে ঢুকতে দেখে অবাক হলো গার্ডটি, তবে কিছুই বলেনি। মালিক পক্ষের কাউকে প্রশ্ন করার মতো অধিকার তাদের নেই। বিহান আর গার্ডটি চলে যেতেই হাফ চেরে বাচলো অর্পনা। দরজাটা বন্ধ করে খুজে খুজে ড্রিম লাইট জ্বালিয়ে বিছানায় পা ভাজ করে বসলো। তার হাত পা নিশপিশ করছে, এই মুহুর্তে ফ্রেস হওয়াটা খুব দরকার। ড্রিম লাইটের আলোয় অর্পনা তার তথাকথিত স্বামির ঘরটা এক ঝলক দেখে নিলো। রুমটা বিশাল বড়ো,, রুম অনুযায়ী আসভাব পত্র নেই বললেই চলে,, একটা গোল সেইপের বেড,, একটা বুক সেল্ফ,, একটা কিং সাইজ সোফা, একটা স্টাডি টেবিল তার পাশে ফাইল সেল্ফ,, আর রুমের দেয়ালের চারোশে এন্টিক, হেন্ড মেইড জিনিস পত্রে ভর্তি। ঘরের এক কোনায় একটা গিটার ও দেখা যাচ্ছে। অর্পনা পুরো রুম জুড়ে একটা আলমারির খোজ চালালো, উদ্দেশ্য পড়ার মতো কিছু একটা নিয়ে ফ্রেস হওয়া। কিন্তু রুম জুড়ে আলমারি আ ও খুজে পেলোনা।

অর্পনা হতাশ হয়ে ওয়াশরুমে ঢুকলো,, সেখানে ঢুকে একটু আশ্চর্যই হলো,, ওয়াশরুমটা বিশাল বড়ো তাতে নানান রকম শাওয়ার সিস্টেম সেট করা। অর্পনা এদিক ওদিক নজর ঘুড়াতেই ওয়াশরুমের এক প্রান্তে আরও একটা দরজা দেখতে পেলো। অর্পনা কৌতুহল বসত দরজা খুলতেই অটোমেটিক আলো জ্বলে উঠলো। আলো জ্বলে উঠার পর চরম বিশ্ময়ে মুখটা হা হয়ে গেলো অর্পনার। তার মনে হচ্ছে সে কোনো জ্যান্স শপে ঢুকে পরেছে। ঘরের এক পাশে কাচের আলমারিতে হাজার খানিক জুতার কালেকশন,, অন্যপাশে ৬ টি সারিতে ছয় রকমের ড্রেস,, ওয়েল ক্যাবিনেট, তাতে ছেলেদের ইউসেবল নানান রকম প্রডাক্ট। এগুলো নিশ্চয়ই দ্বীপের? এতো সাচ্ছন্দতা রেখেও লোকটা কিনা ঐ কবরস্থানে পরেছিলো? অর্পনার এই পর্যায়ে মনে হলো, সে যা করেছে ঠিকি করেছে। এমন একজন লোকের জীবনটা নষ্ট হয়ে যেতে পারেনা। পরিবারের জন্য , নিজের জন্য হলেও সুস্থ হওয়া উচিৎ।

অর্পনা আর কিছু দেখলোনা, সে এগিয়ে গিয়ে দ্বীপের গেঞ্জির কালেকশন থেকে একটা গেন্জি নিলো, ট্রাওজার কালেকশন থেকে ট্রাওজার নিতেই বিরক্ত হলো অর্পনা। লোকটাকে এতো লম্বা হওয়ার পারমিশন কে দিয়েছে? এখন যে অর্পনার এটা বড়ো হবে, তার দায় কে নিবে? অর্পনা ট্রাউজারটা রেখে একটা থ্রি কোয়াটার নিলো,, এটা হয়তো পারফেক্ট হতে পারে। অর্পনা নিজের মতো ফ্রেস হয়ে রুমে এলো। দ্বীপ সোজা হয়ে শুয়ে আছে, শরীরে এখনো সেই ময়লা টিশার্ট, মায়া হলেও সেটা চেন্জ করার মতো সাহস হলোনা। এগিয়ে গিয়ে কম্ফোর্টার টেনে দিলো, যেনো শীত না লাগে। পরপর কিং সাইজের সোফায় গা হেলিয়ে দিলো। গতকাল একবার পাপ্পার কাছে যেতে হবে। অর্পনার বিশ্বাস, পাপ্পা শুনলে বেশ খুশি হবে,, অর্পনাকে নিয়ে অনেক গর্ভ করবে। সারাজীবন তো এটাই হয়ে এসেছে,, পাপ্পা অর্পনার সব সিদ্ধান্তে পাশে থেকেছে। ভেবেই চোখ বুজে নিলো,, অর্পনা কখনোই ক্রাইসিস নিয়ে চিন্তিত হয়না। কান্নাকাটি, ন্যাকামি গুলো ও তার দ্বারা হয়ে উঠেনা। যা হবে তা হবেই। এই যে ও একটা সম্পূর্ণ অপরিচিত বাড়িতে এলো তার মাঝে কোনো জড়তা নেই। জড়তা কাজ করে লাভ কি? এখানে সে কারোর দায়িত্ব নয় বরং অন্যের দায়িত্ব নিতে এসেছে। তাই ন্যাকামি না করাই ব্যাটার।

,,,ঘুমের ঘোরে নিজের বুকের উপর ভারি কিছু অনুভব করতেই ঘুমু ঘুমু চোখ মেলে তাকালো অর্পনা। ড্রিম লাইটের আলোয় অগোছালো দ্বীপকে দেখে প্রথমে অবাক হলো। সেকেন্ডের গতিতে কিছু মনে হতেই দ্বীপকে ভালোমতো পর্যবেক্ষণ করলো,,এই লোক মাটিতে বসে তার বুকের উপর মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে।
কোনো যেনো বিরক্ত হলোনা অর্পনা, সে আলগোছে দ্বীপের জট পাকানো ময়লা চুলে হাত ভুলালো। খয়েরী আলোয় দ্বীপের মুখটা ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে বললো — আপনি আমায় খুব জালাচ্ছেন স্মোকার,, এসব কিন্তু ঠিক না। অর্পন কখনোই এতোটা ধৈর্য শীল নয়,, অথচ আপনার বেলায় অর্পন তার জীবনের সবচেয়ে বড়ো ধৈর্যের পরিক্ষা দিচ্ছে। নিজেকে ভাগ্যবান মনে করুন,, এমন ভাগ্য সবার হয়না।

,,,কথাটা বলেই দ্বীপের মাথাটা তোলার চেষ্টা করলো,,এভাবে কারোরি ঘুম হবেনা। যার থেকে দূরে থাকবে বলে সোফায় শুয়েছিলো সেই যদি শ্বাস বন্ধ করে মেরে ফেলার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে তাহলে এতো কষ্ট করে সোফায় শুয়ার মানে কি? দ্বীপকে উঠাতে চাইলে দ্বীপ আবারও আগের মতো মাথা দুদিকে ঝাকিয়ে ওমম ওমম শব্দ করে নিষেধ জানালো। অর্পনা সেসব নিশেধ মানলোনা। জোর করে দ্বীপের মাথাটা তুলে বহু কষ্ট সোজা করলো। তারপর নিজে মেঝেতে বসে দ্বীপের মাথাটা কাধে রাখলো পরপর এক হাতে দ্বীপের কাধ পেচিয়ে অন্য হাতে পেট জড়িয়ে উঠানোর চেষ্টা করলো। বাপরে, কে বলবে উনি ছয় বছর ধরে নিয়মিত খাবার খেতোনা? যেই ওজন, আল্লাহ!! রহমত দান করুন। অর্পনা মনে মনে আল্লাহ আল্লাহ জপতে জপতে বহু কষ্টে দ্বীপকে তুলে বিছানার কাছে যেতেই কার্পেটের সাথে পা বেজে ধপ করে বিছানায় পরলো দুজন। নাকে বিদঘুটে ঘ্রাণ পৌছাতেই পেট গুলিয়ে এলো মেয়েটার,, নাক চেপে দ্বীপের বুক থেকে উঠতে নিলে দ্বীপ ওর কোমর জড়িয়ে ধরে আবারও মিশিয়ে নিলো। এবার বিরক্ত হলো অর্পনা, সে নিজেকে ছাড়াতে চেয়ে কিছুটা রাগি স্বরেই বললো

— ছাড়েন দ্বীপ, আপনার এই বিদঘুটে ঘ্রানে যখন তখন মারা যাবো আমি। তখন শত খুজলেও পারু সাজার জন্য আরেকটা অর্পনা পাবেন না।
,,,অর্পনার কথা কানে গিয়েছে কিনা জানা নেই তবে ওর বলা শেষ হতেই পিট পিট করে চোখ মেলে তাকালো দ্বীপ। দ্বীপের চোখে চোখ পরতেই অর্পনার সব বিরক্তি উধাও হয়ে গেলো, যেনো কোনো বশিকরন মন্ত্রবলে আবদ্ধ করে রেখেছে ওকে। দ্বীপ ঘুম ঘুম কন্ঠে অস্ফুট স্বরে ডাকলো — পারু!!
,, অর্পনা মোহাচ্ছন্নের ন্যায় উত্তর করলো — হু!!
,,,দ্বীপ বাচ্চাদের মতো করে বললো — যাসনা,, আমার ভয় হয়,, কোথাও যাসনা।
,,,দ্বীপের কথা বলার ধরন দেখে ঠোঁট বাকিয়ে হেসে ফেললো অর্পনা,, পরপর দ্বীপের চুলের ভাজে হাত ভুলিয়ে বললো — যাবোনা কোথাও, ঘুমান,, আমি এখানেই আছি।
,,,,দ্বীপ চোখ বুঝলো না, অনর হয়ে অর্পনার দিকেই তাকিয়ে রইলো। অর্পনাও তাকিয়ে রইলো দ্বীপের চোখে,, এই চোখটা এতো সুন্দর কেনো? এতো মায়া মায়া লাগে কেনো? অর্পনা সেই চোখে তাকিয়ে মোহাচ্ছন্নের ন্যায় ঠোঁট নাড়িয়ে মৃধু স্বরে গাইলো —

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২২ (২)

,,,tere naajroke saadke,, Yeh,
, Jaan vaar doonga
,,tuju kehde tu apna
Jahan vaar donga,,
,,maine maula se teri meri,,
Doniya he maangii
Tujo likhde tu
uski,, haq mar longa,,,,!!

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২৩