৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২৩
রুপান্জলি
,,, বাহির থেকে দরজার করাঘাত হতেই ঘুমন্ত চোখ জোড়া পিটপিট করে খুললো অর্পনা ,, মনে মনে কিযে বিরক্ত লাগলো, নিশ্চয়ই বিরক্তিকর প্রোফেসরটা দরজা ধাক্কাচ্ছে। নির্ঘাৎ মনে করেছে অর্পনা ঘরের ভিতর মরে পরে আছে। এখন তাকে এসে বাচাতে হবে। বিরক্তি নিয়েই চোখ মেলে তাকালো অর্পনা আবারও বুকের উপর দ্বীপের অগোছালো চেহারাটা দেখে তার টনক নড়লো। বুঝতে পারলো সে তার শ্বশুর বাড়িতে একরাত কাবার করে দিয়েছে। অর্পনা ঘুমন্ত দ্বীপকে সরিয়ে দিয়ে আবারও ওর গায়ে ভালো মতো ব্লাঙ্কেট জড়িয়ে দিয়ে উঠে বসলো। তার শরীরে উড়না নেই, হাসবেন্ডের জামা কাপর পরা, সেসবে থোরাই কেয়ার করলো অর্পনা, সে একদম চিল মুডে গিয়ে দরজা ওপেন করে দিলো। দরজা খুলে ঘুমন্ত ভাব কাটাতে হামি দিয়ে হাত টানা দিতেই অর্ধ ঘোমটা দেওয়া একটা মেয়েকে দাড়িয়ে থাকতে দেখলো। ঘোমটা দেওয়া দেখে সহসা বুঝে নিলো এটা মেধা,, মেয়েটাকে দেখার ইচ্ছা ছিলো তার,, আজ সামনাসামনি দাড়িয়ে আছে তবুও মুখটা দেখার সাধ্য হচ্ছেনা। অর্পনা ঠোঁটে হালকা হাসি ঝুলিয়ে কিছু বলতে নিবে তখনি মেধা ওর গালে হাত রাখলো,, অত্তন্ত নম্ন স্বরে বললো — তুমি ই বুঝি অর্পনা? বিহান ঠিকি বলেছিলো, তোমায় দেখতে একদম পারুর মতো। ভাইয়া কোথায়? ঠিক আছেন উনি? এখনো কি ঘুমে নাকি সজাগ? রাতে কোনোরুপ পাগলামি করছিলো?
,,,অর্পনা মুচকি হেসে বললো — নাহ!!পাগলামি করলে শুনতে পেতে। উনি এখনো ঘুমাচ্ছে, আসো ভিতরে আসো।
,,,কথাটা বলে মেধার হাত ধরতেই মেধা ইতস্তত করে বললো — নাহ থাক, ভাইয়া দেখলে আবার যদি ভয় পায়? উনি তো বেশি মানুষ থাকলে ভয় পায়।
,,, আরে আসো, আমি আছিনা?
,,, অর্পনার কথায় থমকে গেলো মেধা।এতো সুন্দর, স্নিগ্ধ একটা মেয়ে শুধু ডাইরি পরে তার ভাইয়ের দায়িত্ব নিয়েছে। এমন মেয়ে পৃথিবীতে খুব কম ই পাওয়া যায়। অর্পনাকে ভরসা করে ভিতরে ঢুকলো মেধা, এক ঝলক দেখলো দ্বীপকে পরপর ফিসফিস করে বললো — বাড়ির সবাই ভাইয়াকে দেখতে চায়, ওদেরকে ডাকবো? ভাইয়া পাগলামি করলে সামলাতে পারবে?
,,,অর্পনা বেডে পা ভাজ করে বসে বললো — আসতে বলো, দুজন দুজন আসুক, আপাতত দেখে চলে যাক। আর এমনিতেও তোমার ভাইকে একটু পর জাগিয়ে দিবো আমি। নিজের যা হাল করেছে, এর থেকে তো বন মানুষ ও ভালো পজিশনে থাকে।
,,,অর্পনার কথায় মৃধু হাসলো মেধা, হাত বাড়িয়ে আবারও গাল ছুয়ে বললো — বড্ড মিষ্টি আর লক্ষি মেয়ে তুমি,, একদম পারুর মতো।
,,, অর্পনা মেধার হাত ধরে বললো — ইউ আর রং সিস!! আমি নিতান্তই অভদ্র জাতির প্রানি। এখন তোমার ভাইয়ের দায়িত্ব কাধে নিয়েছি বলে যাই একটু সাক্রিফাইস করছি, একবার উনি সুস্থ হয়ে গেলে অর্পনা আবার নিজের স্বভাবে ফিরে যাবে।
,,মেধা হালকা হেসে চলে গেলো উদ্দেশ্য বাড়ির মানুষদের খবর দেওয়া। অর্পনা বসে বসে ভাবতে লাগলো এই বন মানুষকে কিভাবে মানুষে পরিনত করা যায়,, সেলুন থেকে লোক ডাকবে? যদি আবার ভয় পায়? পাগলামি করে? ওফ!! যন্ত্রণা। তাহলে কি করা যায়? মিষ্টার মির্জাকে বলবে? কিন্তু এই লোক তো বিহান মির্জাকেও ভয় পায় তাহলে কি অর্পনা নিজে করবে? কিন্তু সে তো জীবনেও এসব করেনি,, ছোট বেলায় মাঝেমধ্যে পাপ্পা যখন সেইভ করতো তখন কৌতুহল বসত পাপ্পার কোলে উঠে দু একটা টান দেওয়া হয়েছিলো কিন্তু কখনোই সেটা পারফ্যাক্ট হয়নি। হয় পাপ্পার গাল কেটে গিয়েছে নয়তো ওভার লাইন হয়ে গিয়েছে। আচ্ছা, ওভার লাইন নিয়ে যেহেতু ঝামেলা তাহলে ক্লিন সেভ করানো যাক তাহলেই তো কোনো প্রবলেম থাকলোনা। ভেবেই মনে মনে সস্থি পেলো অর্পনা,, একটু সাবধানে করলেই সব ঠিক ঠাক হয়ে যাবে। ওর ভাবনার মাঝেই দুজন লোক ঢুকলো ঘরে,, অর্পনার সামনে এসে দাড়াতেই ও এক প্রকার বেখেয়ালেই বলে ফেললো —
,,, আপনারা শাহিন মির্জা আর মাহিন মির্জা তাইনা? চিনি আপনাদের, আর্টিকেলে দেখেছিলাম।
,,,অর্পনার কথায় চোখ ছোট ছোট করে তাকালেন শাহিন মির্জা আর মাহিন মির্জা। ওনাদের এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে অর্পনাও ভ্রু কুচকে তাকালো। যখন বুঝলো সে মুরুব্বিদের সামনে তাদের নাম নিয়ে ফেলেছে তখনি চোরা মুখ করে ওনাদের দিকে তাকালো। ওর মুখ দেখে দুজনেই শব্দ করে হেসে ফেললেন। মাথায় হাত ভুলিয়ে অনেক কথা জিজ্ঞেস করলেন, যদিও নাস্তার টেবিলে বসেই উনাদের সবটা বলেছে বিহান। তবুও টুকটাক বাক্যালাপ করলেন,, পরপর দ্বীপকে এক ঝলক দেখে বেড়িয়ে গেলেন। উনারা যেতেই দুজন মহিলা এলো, বয়সের তফাৎ দেখে অর্পনা বুঝলো কোনটা রোমানা বেগম আর কোনটা সাথী বেগম। যদিও এবার নাম বলার মতো বেফাস কাজ করে বসেনি, ভদ্র হয়ে থাকতে মন না চাইলেও আপাতত চুপ রইলো, শ্বশুর বাড়ি বলে কথা। অর্পনার একটু ভদ্র সাজা উচিৎ।
রোমানা বেগম ছেলেকে দেখে আচলে মুখ গুজে কাদলেন কিছুক্ষণ ্ পরপর অর্পনার মাথায় হাত ভুলিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরতেই অর্পনার কেমন যেনো লাগলো। সে কখনোই মহিলা সম্প্রদায় হতে আদর সোহাগ কিংবা সহানুভূতি পায়নি। যখন পেয়েছিলো তখন তার বুঝের বয়স ছিলোনা,, কবেই ভুলে গিয়েছে সেসব আদুরে স্পর্শ গুলো। বর্তমানে সেসবে আদুরে স্পর্শ গুল তার কাছে বিষ মনে হয়, তাই দ্বীপের মায়ের আদর পেয়ে হাসফাস লাগলো ভিতরটা। অর্পনা এসব স্পর্শ চায়না,, কথায় আছে,, এই পৃথিবীতে মারাত্মক লোভ জাতীয় যদি কিছু থেকে থাকে, সেটা হচ্ছে মায়ের আদর। এই আদর আজীবন পেলেও মন ভরেনা,, আক্ষেপ কমেনা। তাই অর্পনা এসব পেয়ে জীবনে আক্ষেপ জমাতে চায়না,, কোনো মায়ায় জড়াতে চায়না। কিছুক্ষণের মাঝেই ঘর ত্যাগ করলেন তারা। সকালের নাস্তা বানাতে হবে,, আজ বাড়িটা পরিপূর্ণ হলো বলে কথা। বাড়ির ছেলে বাড়িতে ফিরেছে সাথে রয়েছে বাড়ির বউ।
,,, উনারা চলে যেতেই অর্পনা একবার তার বন মানুষকে দেখে নিয়ে ওয়াসরুমে চলে গেলো। সেখানে সাওয়ার জেল থেকে শুরু করে সেইভ ক্রিম, ফেইস ওয়াস, স্যাম্পু আরও নানান ধরনের প্রোডাক্ট ছিলো। অর্পনা জানেনা এগুলো কবের তাই ডেইট চেক করতেই দেখলো ২০২৫ এ উৎপাদিত। দ্বীপের ফ্যামিলির কেয়ার দেখে বিগলিত হলো অর্পনা, কপালে তাহলে একটা ভালোই শ্বশুর বাড়ি জুটলো? হুম!! শ্বশুর বাড়ি কথাটা ভেবেই শব্দ করে হেসে দিলো অর্পনা। সে কেনো যেনো বিষয়টা সিরিয়াসলি নিতে পারছেনা। মানে অর্পনা আর বাড়ির বউ? কথাটা কেমন হাস্যকর না। থাক হাসাহাসি বহুত হলো এবার কাজের কাজ করা যাক। ঐ লোকের শরীরের গন্ধে অর্পনার নাকটা রাতের বেলায় ই আত্মহত্যা করে মারা গিয়েছে। ঘ্রান সিস্টেমে আপাতত সিগারেটের ঘ্রান ব্যাতিত অন্য কিছু আদান প্রদান হচ্ছেনা। এই ঘ্রান থেকে মুক্তি পাওয়া উচিত। অর্পনা খুজে খুজে গিজার সেট করা শাওয়ারটা বের করলো পরপর ওটা নামিয়ে বাথটবে ছেড়ে দিলো। সেইভ করা শেষ হলে ঐ বন মানুষকে সে এটার ভিতর চুবিয়ে মানুষে পরিনত করবে। অর্পনা জেল নিতে গিয়ে ওয়াশরুমের আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখতেই অনুভব করলো, তার হাসবেন্ডের ড্রেস দিয়ে তাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে। গেন্জিটাও একদম খাপেখাপ,, সে তো এরকম ওভার সাইজ টিশার্ট ই পরে। ভালোই হলো যখন লাগবে দ্বীপেরটা নিয়ে পরে ফেলবে,, এতে হাসবেন্ডের অনেক অনেক টাকা বেচে যাবে।
,,,অর্পনা রুমে এসে দ্বীপের মাথার পাশে বসলো, শরীর থেকে ব্লাঙ্কট টা সরিয়ে বার কয়েক ডাকতেই দ্বীপ চোখ মেলে তাকালো৷ অর্পনাকে দেখতেই ওকে জড়িয়ে ধরলো দ্বীপ,আবারও সেই ঘ্রানে অর্পনা নাক চেপে ধরে বললো — এই আপনার কি আমাকে কোল বালিশ মনে হয়? কিছু হলেই খালি জড়িয়ে ধরবে। ছাড়েন দ্বীপ, আল্লাহ কি বাজে গন্ধ!!
,,,অর্পনার নাক ছিটকানো দেখে দ্বীপ ওকে ছেড়ে দিয়ে অন্য দিকে ফিরে গেলো। অর্পনা ভ্রু কুচকালো, বনমানুষ আবার রাগ ও করতে পারে নাকি? বাপরে, নিজে গন্ধ নিয়ে ঘুরতে পারবে আর অর্পনা বললেই দোষ। অর্পনা ওর রাগকে পাত্তা না দিয়ে হাত টেনে উঠাতে চাইলে পারলোনা, শক্তি হাড়িয়ে বেডে বসে পরলো। এই লোককে তোলার জন্য অর্পনা এবার একটা ক্যারেনের ব্যাবস্থা করবে নয়তো যেই উজন, তার পক্ষে বারবার এই দানবকে উঠানো সম্ভব না। অর্পনা এবার বিছানায় উঠে দ্বীপের গলা জড়িয়ে টেনে তুললো। তুলতে গিয়ে আবারও শক্তি হাড়িয়ে দ্বীপের বুকে হেলান দিয়ে বার কয়েক দম নিলো। নিজের মাঝে আরও শক্তি জুগিয়ে দ্বীপকে টেনে টি-টেবিলে নিয়ে বসালো। দ্বীপ এখনো মুখ গুমরা করে রেখেছে,, অর্পনা সেসবে পাত্তা দিলোনা। এখন রাগ ভাঙালে যদি আবার জড়িয়ে ধরে? তাহলে অর্পনা মরেই যাবে। অর্পনা দ্বীপের মুখটা সোজা করে দাড়ি গোফটা ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলো,, দাড়িটা বেশ বড়ো হয়েছে। একদম দরবেশ বাবা দরবেশ বাবা লাগছে। অর্পনা ঠোট টিপে হেসে কাচি এগিয়ে নিতেই ভয়ে কুকরে গেলো দ্বীপ। দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না না করতে করতে মাথা চেপে ধরলো। অর্পনা দ্বীপের মাথা থেকে হাত সরিয়ে গালে দু হাত রেখে নরম স্বরে বললো
,,, দ্বীপ!! আমার দিকে তাকান,,আপনাকে এভাবে একটু ও সুন্দর লাগেনা। কিন্তু আমার তো সুন্দর হাসবেন্ড চাই,, পরিপাটি দ্বীপ মির্জাকে চাই। আপনি আমাকে ভরসা করেন না? আমি কি আপনার ক্ষতি করবো? তাকান, সোজা হয়ে বসুন। আচ্ছা!! আমাকে জড়িয়ে ধরে বসুন।
,,, বলতে বলতে দ্বীপের হাত টেনে নিজের কোমরে রাখলো,, নিজের কাজে নিজেই ভরকে গেলো অর্পনা। সে একটা অচেনা লোকের সাথে কতোটা ফ্রেন্ডলি বিহেব করছে। পরোক্ষনেই মনে হলো লোকটা পর নয়, তার বিয়ে করা হাসবেন্ড। ভাবনা রেখে কাজে মন দিলো অর্পনা। দ্বীপ কিছুটা অশান্ত, ভয় পাচ্ছে তবুও বসে রইলো,, সে বোধয় অর্পনাকে খুব ভরসা করছে। না না, অর্পনাকে নয় পারুকে ভরসা করছে। সেসব ভেবে তপ্ত শ্বাস ফেললো অর্পনা। সে তো ভুলেই গিয়েছিলো সে নিজের নয়, পারুর হাসবেন্ডকে পারু সেজে সেবা করছে।
অর্পনা সন্তর্পনে দাড়ি গোফ কেটে তাতে সেইভ জেল ছোয়াতেই দ্বীপ অর্পনাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। যার ফলে অর্পনার পোশাকেও জেলের ফ্যানা লেগে গিয়েছে। অর্পনা বিরক্ত হতে গিয়েও দ্বীপের মুখটা দেখে হেসে ফেললো,, কেচি দিয়ে সামান্য আকারে চুল গুলো কেটে দিলো। দাড়ি গোফ ক্লিন সেইব করলেও চুলটা সে রাখবে,, যতটুকু পারে মানসম্মত একটা কাট দিয়ে দিবে চুলে। হয়তো পারফেক্ট হবেনা কাকে খাওড়া চুলের মতো দেখা যাবে। কিন্তু চুল ছাড়া টাকলু দ্বীপ মির্জার থেকে কাকে খাওরা চুলেই বেশি মানাবে। অন্তত দ্বীপ মির্জার মান সম্মান তো থাকবে? এই অনেক। দীর্ঘ ৩০ মিনিটের ও বেশি সময় লাগিয়ে ধীরে ধীরে সেইভ করিয়ে দিলো অর্পনা। কোথাও কেটেছে কিনা, সে শিউর বলতে পারবেনা তবে দ্বীপ একবারও ব্যাথাতুর শব্দ করেনি। সেইভ করা শেষ হলে দ্বীপকে নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো,,বাথটবের কাছে যেতেই দ্বীপ আবারও অর্পনাকে জড়িয়ে ধরে ছোট্ট করে বললো — শীত!!
,,, অর্পনা ঠোট বাকিয়ে বিরবির করে বললো– এটা বলতেও জড়িয়ে ধরা লাগে? শিক্ষা হয়েছে আমার। আর জীবনে যদি বিয়ে করেছি তাহলে আমার নাম প্রিথা জামান অর্পনা না। শব্দ করে বললো — শীত লাগবেনা,, এখানে গরম পানি আছে,, আপনি বসুন।
,,,দ্বীপ বসতে চায়না বরং আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে অর্পনাকে। অর্পনার নিজেকে বড্ড অসহায় লাগছে,,লোকটা কিছু হলেই এভাবে জড়িয়ে ধরে কেনো? অর্পনা আরও কিছুক্ষণ বুঝালো দ্বীপকে,, তারপরেও বসতে না চাইলে অর্পনা মৃধু ধাক্কা দিয়ে দ্বীপকে বাথটবে বসিয়ে দিলো যার ফলে বাথটব থেকে পানি ছিটকে এসে অর্পনাকে অনেকটাই ভিজিয়ে দিয়েছে। সেটা দেখে বোধহয় বেস মজা পেয়েছে দ্বীপ,, এবার সে সেচ্ছায় পানি নিয়ে অর্পনার দিকে ছুড়ে দিলো। অর্পনা শুধু দাতে দাত চেপে সহ্য করে যাচ্ছে,, এই লোকটা একবার সুস্থ হোক তারপর ইচ্ছামতো কথা শুনিয়ে তারপর মির্জা বাড়ি ত্যাগ করবে সে।
,,, দীর্ঘ সময় ব্যায় করে দ্বীপের মাথাটা ওয়াস করে দিলো,, পরপর শরীর ওয়াশ করতে নিতেই বিপত্তি বাধলো। এই লোককে ওয়াশ করতে হলে গেঞ্জি খুলতে হবে সেটা আপাতত করতে পারবেনা সে। ব্যাক্তিত্বের দিক দিয়ে সে যতই শক্ত হোক না কেনো,, এসব বিষয়ে সে বড্ড নাজুক। তাই পকেট থেকে ফোন বের করে বিহানের মোবাইলে কল দিলো। গতকাল মির্জা বাড়িতে আসার পর বিহান ওকে ফোন নম্বর দিয়েছিলো যেনো দ্বীপ কোনো রকম পাগলামি করলে কিংবা কিছুর প্রয়োজন পরলে জানাতে পারে। অগত্যা কোনো উপায় না পেয়ে বিহানকে উপরে আসতে বললো। মিনিট তিনের মাথায় রুমে এলো বিহান,, ওয়াসরুমে ঢুকতেই অর্পনা দ্বীপকে নিজের থেকে ছাড়াতে চাইলো কিন্তু সে কোনো মতেই অর্পনাকে ছাড়াবেনা। বিহান দ্বীপের দিকে এগিয়ে আসতে নিলে দ্বীপ আরও শক্ত করে অর্পনাকে জড়িয়ে ধরে। এপর্যায়ে অর্পনার মন চাইলো ওয়াশরুমের টায়েল্স করা দেয়ালে নিজের মাথাটা বারি দিয়ে সব সৃতি ভুলে দ্বীপের মতো নাদান বাচ্চা সেজে বসে থাকতে। তাহলে এই লোক আর তাকে জ্বালাতে পারবেনা।
কিন্তু তাতো হওয়ার নয়, যা হওয়ার নয় তা নিয়ে আশা করাও ঠিক না। অগত্যা কোনো উপায় না পেয়ে অর্পনা চোখ বুঝে সেভাবেই দাড়িয়ে রইলো। অর্পনা সাথে থাকায় বিহানকে ভয় পেলেও কোনো চেচামেচি করেনি দ্বীপ,, তবে পুরোপুরি শান্ত থেকেছে এমন ও নয়। দ্বীপকে ফ্রেশ করিয়ে ড্রেস চেন্জ করিয়ে দিয়ে বিহান চলে যেতেই অর্পনা চোখ মেলে তাকালো। চোখ মেলতেই দূর্বল বনে গেলো অর্পনা, তার সামনে দাড়িয়ে আছে একজন পরিপাটি যুবক,,যার পরনে হোয়াইট টিশার্ট আর ব্লাক ট্রাউজার। ভেজা চুলগুলো কপালের উপরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। বয়সটা হিসেব মতো ৩১ এর ঘরে হলেও ক্লিন সেইভে লোকটাকে ২৫,২৬ বছরের যুবক মনে হচ্ছে। দ্বীপ একভাবে অর্পনার দিকে তাকিয়ে আছে,, দ্বীপের ক্ষেত্রে প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে অর্পনা কাছে থাকলে ও একদম চুপ থাকে। অর্পনা যা বলে মন দিয়ে শুনে তবে জবাব দেয়না শুধু ফেলফেল করে তাকিয়ে থাকে। এখনো সেভাবেই তাকিয়ে আছে,, অর্পনা না চাইতেও বারবার দ্বীপকে দেখছে। দ্বীপ হুট করেই হাত বাড়িয়ে অর্পনার কপালের ক্ষতটা ছুয়ে দিলো,, ব্যাথায় দ্বীপের গেন্জি খাপচে ধরে চোখ বন্ধ করে নিলো অর্পনা। দ্বীপ কপালের ক্ষতে হাত ভুলিয়ে বললো — ব্যাথা?
,,,দ্বীপের কথায় চোখ মেলে তাকালো অর্পনা, দ্বীপের চোখে ব্যাথার ছাপ স্পস্ট। যেনো অর্পনার কপালে নয় দ্বীপের কপালেই ব্যাথা হচ্ছে,, দ্বীপের চাহনিতে আবারও দ্রবীভূত হয়ে যাচ্ছে অর্পনা। সে দ্বীপের
চোখে চোখ রেখে গালে হাত ছুয়িয়ে বললো — আপনি একটা মায়া দ্বীপ,, আগা গোড়া পুরোটাই মোহমায়া।
বেলা ১২ টা বেজে ৪৮,,
,,, এক বালিশে মাথা রেখে অন্য বালিসটা জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে রাত্রি, তার দৃষ্টি দেয়াল টিবিতে নিবদ্ধ। গতকাল মাঝরাতে বাড়ি ফিরায় আজ আর ভার্সিটিতে যাওয়া হয়নি। বাড়িতে আপাতত সে একা,, মাম্মা অফিসে গিয়েছে,, কাজের মেয়েটা দুপুরের রান্না করে দিয়ে বাড়ি চলে গিয়েছে। রাত্রি টিবির দিকে তাকিয়ে থাকলেও তার মন টিবিতে নেই,,কিছুই ভালো লাগছেনা,, জীবনটাকে মাঝেমধ্যে খুব বিশাক্ত মনে হয়। তার জীবটা এতো বিষাদময় না হলে কি খুব ক্ষতি হতো ? এই বিষাধের তারনায় সে শান্তিতে বাচতে পারছেনা, মাঝে মধ্যে দম আটকে আসে,, মন চায় সেই দম বন্ধ অবস্থায় ই মরে যাক। মানবজীবনে জন্মের পর ৪ টা বছর খুব সুন্দর যায় কারন তখন তারা অবুঝ থাকে,,, কটুক্তি, বাজে কথার মানে বুঝতে পারেনা। কিন্তু যখনি মানুষ বছর পাঁচে পদার্পণ করে তখন থেকেই শুরু হয় বিষাদ, কষ্ট, অপূর্ণতা। ছোট থেকে একই কথা শুনতে শুনতে রাত্রি ক্লান্ত হয়ে পরেছে অথচ লোকে বলে বলেও ক্লান্ত হয়না। একটু আগে পাশের ইউনিটে থাকা মহিলার কথাগুলো মনে হতেই রাত্রির চোখ থেকে দু ফোটা পানি গড়ালো। সেই পানি মুছলোনা মেয়েটা, মুছে কি হবে? সেইতো ঝরবেই। রাত্রি যখন বিষাদের ব্যাদনায় দগ্দ, তখনি ওর মোবাইলটা আবারো ভাইব্রেট করে উঠলো,, গত আধা ঘন্টা যাবত এটা বেজে চলেছে,, কথা বলতে ইচ্ছা করছেনা তাই ফোনের দিকে এবারেও তাকালোনা। রাত্রির কথা বলার তাড়া না থাকলেও ওপাশের ব্যাক্তিটির বোধয় কথা বলার খুব তাড়া। কল দিচ্ছে তো দিচ্ছেই, একটার পর একটা কল বেজেই যাচ্ছে। বিরক্ত হলো রাত্রি, হাত বাড়িয়ে বালিশের তলা থেকে ফোনটা বের করতেই দেখলো পল্লব কল করেছে। রাত্রি কল ধরতেই ওপাশ থেকে অরুনের ব্যাস্ত কন্ঠ শুনা গেলো — রাত!!!
,,,অরুনের কন্ঠে কিছু একটা ছিলো,, এই ছেলেটা সবসময় রাত্রির সাথে ঝগড়া করলে যখন নাম ধরে ডাকে তখন কেমন করে যেনো ডাকে। সেই ডাকে বার বার রাত্রির অন্তরটা কেপে উঠে,, বরাবরের ন্যায় এবারেও রাত্রির অন্তরপুট কেপে উঠলো,, সে ভাঙা কন্ঠে বললো — হ,হুম!! কিছু বলবি?
,,, এতোক্ষনকার অশান্ত কন্ঠটা কেমন রাগের রুপ নিলো,, অরুন এক প্রকার ধমকেই বললো — কখন থেকে কল দিচ্ছি? ধরছিস না কেনো? এতো নাটক কিভাবে করিস ভাই? কাল নাহয় দুটো কথা শুমিয়েছি, তাই বলে কল ধরবিনা? মানুষ মরে টরে গেলেও তদের খোজ নিবি বলে মনে হয়না।
,,, রাত্রি চোখ এখনো ভিজা, নাক টেনে কান্না আটকে বললো — কি হয়েছে বল, শুনছি?
,,,রাত্রির কান্না ভেজা কন্ঠে বিচলিত হলো অরুন, তবে সেটা প্রকাশ করলোনা। কিছুটা তাচ্ছিল্য ভরা কন্ঠে বললো — তর কি হয়েছে? কন্ঠ এমন শুনাচ্ছে কেনো? আবার কোনো ড্রামা দেখে কেদেছিস নাকি?
,,, রাত্রি মলিন হাসলো,, নিজেকে শক্ত করতে চাইলো তবে পারলোনা, হুট করেই শব্দ তুলে কেদে দিলো। রাত্রিকে এভাবে কাদতে দেখে নিজেকে ঠিক রাখতে পারলোনা অরুন, সে এবার প্রকাশ্যেই বিচলিত কন্ঠে বললো — রাত!! কি হয়েছে তর? শরীর খারাপ? কাল পায়ে ব্যাথা দিয়েছি বলে রাগ করেছিস? পা ব্যাথা করছে? কালকের কথায় কষ্ট পেয়েছিস? রাত!! এই, এভাবে কাদছিস কেনো? রাত!!
,,,রাত্রি ফোপাতে ফোপাতে ভাঙা কন্ঠে ডাকলো — অ,অরুন!!
,,, রাত্রির এই কন্ঠটা, এই ডাকটা নতুন। এভাবে কখনোই অরুনকে ডাকেনি মেয়েটা। অরুন দিগুন বিচলিত কন্ঠে বললো — কি হয়েছে রাত? কাদছিস কেনো? বল আমায়?
,,, আমার মরে যেতে মন চাচ্ছে অরুন, নয়তো সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে পালিয়ে যেতে। আমার একটু ও শান্তি লাগছেনা,, কি করবো? মানুষ এমন কেন? কথা বলার সময় কেনো ভাবেনা অপর পাশের মানুষটা ঠিক কতোটা কষ্ট পাবে? দূর্বল জায়গা গুলোতে আঘাত করা এতোটাই সহজ? এতোটাই আনন্দ হয় তাদের? মানুষ এমন কেন অরুন? বলনা, এমন কেন সবাই?
,,,রাত্রির কথার মানে বুঝলোনা অরুন,, ওর কথা শুনে মনে হচ্ছে কোনো কারনে খুব আঘাত পেয়েছে। কেউ আঘাত দিয়ে কথা বলেছে। কিন্তু কিসের দূর্বলতার কথা বলছে ও? রাত্রির কোনো দূর্বল জায়গা আছে? কি সেটা? অরুনের মনে হাজারটা প্রশ্নের ছড়াছড়ি,, বুকের বাম পাশে শুক্ষ ব্যাথা অনুভুত হচ্ছে। গতকাল রাতে ওরম ব্যাবহার করার পর সারা রাত ঘুম হয়নি অরুনের। ভোর রাতের দিকে চোখ লাগায় ঘুম ভাঙতে ভাঙতে বেলা ১২ টা বেজে গিয়েছে। ঘুম থেকে উঠার পর থেকে কল দিয়ে যাচ্ছে রাত্রিকে, টানা ৩০ মিনিট যাবত কল দেওয়ার পরেও এপাশ থেকে কল না তোলায় বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পল্লবদের বাড়িতে এসেছে। ও ভেবেছিলো রাত্রি ওর সাথে রাগ করে কল ধরছেনা,,কিন্তু এখন মনে হচ্ছে,, রাত্রি কোনো কারনে খুব কষ্ট আছে। যদিও তাদের ফ্রেন্ডশিপ রুল্সে পারসোনাল বিষয়ে প্রশ্ন করা নিষেধ, আজ নিষেধ মানতে পারলোনা অরুন, সে বুক ভরা সাহস নিয়ে প্রশ্ন করলো — কিসের দূর্বলতা রাত? কে তকে কি বলেছে?
বল আমাকে, কি হয়েছে তর? কোন দূর্বল জায়গার কথা বলছিস?
,,,অরুনের কথায় সম্ভিত ফিরলো রাত্রির,, সে কি ভুল করে বসেছে সেটা বুঝতেই তারাহুরো করে বললো– কিছুনা কিছুনা, কিছু হয়নি অরুন। পরে কথা বলছি কেমন? ভালো থাক, টাটা!!
,,, অরুনকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই কল কেটে দিলো। পরপর ফোনটা বন্ধ করে দূরে ছুড়ে মেরে বালিশে মুখ গুজে ফুপিয়ে উঠলো। রাত্রির মনে হাজারটা প্রশ্ন, কিন্তু সেই প্রশ্নগুলো করার মতে সাহস তার নেই। কাকে প্রশ্ন করবে সে? যে তাকে সকল প্রতিকুলতা থেকে রক্ষা করে এই পর্যায়ে এনেছে তাকে? এরকম প্রশ্ন করা যায় বুঝি? নাহ!! যায়না। রাত্রি কষ্ট পেতে পেতে মরে যাবে তবো মুখ ফুরে এই প্রশ্ন বের করবেনা।
,,,ঘুমন্ত দ্বীপের মায়াবী মুখখানা বড্ড স্নিগ্ধ,, লোকটাকে বড্ড আদুরে লাগছে যেনো ৪, ৫ বছরের একটা কিউট বাচ্চা। অর্পনা হাত বাড়িয়ে দ্বীপের চুলের ভাজে হাত ভুলিয়ে দিলো,, পরপর দ্বীপের গালের নিচে থাকা হাতটা সরিয়ে নিলো। তাকে একটু নিজের বাড়ি যেতে হবে,, কাল রাত থেকে একটার পর একটা কল আসছেই,, একবার বাড়িতে গিয়ে পাপ্পাকে সবটা জানানো উচিৎ। আর আদ্রিয়ান? তাকে জানানোর কিছুই নেই,, সে এবার মুক্ত। আদ্রিয়ানকে নিয়ে ভাবতে চাইলোনা অর্পনা , সবাইকে নিয়ে ভাবতে হয়না। কিছু কিছু ভাবনা, ভাবনায় আসাও অন্যায়।
,,, দুটোর দিকে এভার কেয়ার হসপিটাল থেকে ডক্টর মাহিরা সুলতানাকে আনা হয়েছিলো,, উনি একজন নামকরা সাইক্রেটিস্ট। দ্বীপের মানসিক অবস্থা,, আচার আচরণ আর অতিতে ঘটা সকল ঘটনার প্রেক্ষিতে পেস্কিব্ট দিয়ে গিয়েছেন। দ্বীপের অসুস্থতা অনুযায়ী আনুমানিক ১ বছর ট্রিটমেন্ট চলবে। ২ মাস টানা ঔষধ চলার পর যখন কিছুটা ইম্প্রুভ করবে তখন সপ্তাহে ১ বার করে কাউন্সিলিং করতে হবে। আশা করা যায় ২০-২৪ টা কাউন্সিলিং করলেই দ্বীপ অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠবে। তারপর থেকে বাকি ছয় মাস ঔষধ কান্টিনিউ করলেই সবটা ঠিক হয়ে যাবে, ইনশা আল্লাহ!!
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২২ (৩)
পুরোপুরি সুস্থ স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। তখন হয়তো অর্পনাকে ছুড়ে ফেলে দিবে ,, হয়তো কি? হয়তো এর প্রশ্ন আসে কতথেকে? ফেলে দিবেই। কারন, দ্বীপ কখনোই অর্পনাকে মেনে নিবেনা, নেওয়ার কথাও না। অর্পনা দ্বীপের গায়ে ভালো মতো ব্লাঙ্কেট জড়িয়ে উঠে বসলো। দ্বীপ এখন গভীর ঘুমে,, ডক্টরের দেওয়া কর্ড়া ডোজের ঔষধের প্রভাবে আরও ২, ৩ ঘন্টা ঘুমাবে ও। এই সময় টুকুতেই বাড়ি গিয়ে ফিরে আসবে অর্পনা। পাপ্পাকে সবটা বুঝিয়ে,, কিছু ড্রেস, বই আর গিটারটা নিয়ে চলে আসবে। অর্পনা গতকালের পোষাক গুলো নিয়ে ওয়াসরুমে চলে গেলো। গতকাল থেকে দ্বীপের জামা কাপর পরে আছে সে,, বাড়িতে তো আর এসব পরে যাওয়া যাবেনা। অগত্যা নিজের ইউজ করা ড্রেস গুলোই পরে নিলো,,,
