৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২২ (২)
রুপান্জলি
দ্বীপ তেড়ে এসে অর্পনাকে ইরার থেকে টেনে নিয়ে গোছালো চুলগুলো খামচে ধরলো। চুলের ব্যাথায় ককিয়ে উঠলো অর্পনা। ওর ২২ বছরের জীবনে কেউ কখনো আঘাত করেনি,, তবে এমন নয় যে সে আঘাত পায়নি। যতটা আঘাত পেয়েছে সবটা নিজে থেকে করা। হঠাৎ অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে আঘাত পেয়ে চুলের ব্যাথায় মুখ চোখ লাল হয়ে উঠলো। অর্পনা ব্যাথায় ককিয়ে উঠে বললো — হোয়াট্স হেপেন্ড? লিভ মাই হেয়ার!! ওফ্ফ!! ছারেন দ্বীপ, ব্যাথা পাচ্ছি। আল্লাহ!!
,,, দ্বীপ পাত্তা দিলোনা সেসবে, আরেকটু শক্তি প্রয়োগ করে অর্পনার চুল টেনে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বললো– তেল কই? তর মাথার তেল কই? এসব কি পরেছিস তুই? পারু!! বেয়াদবের বাচ্চা!! এসব কি পরেছিস?
,,, দ্বীপকে এমন করতে দেখে দৌড়ে এলো বিহান, দ্বীপের হাত ধরে টেনে বললো — জোহান ছাড়, ও পারু না, ও অর্পনা। ছাড় ভাই!!
,,,দ্বীপ তিব্র রাগে কটমট করে বিহানের দিকে তাকালো,, সেই দৃষ্টিকে পরোয়া না করে দ্বীপের থেকে অর্পনাকে ছাড়াতে চাইলে দ্বীপ ওকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো। তৎক্ষনাৎ অরুন আর পল্লব এগিয়ে এলো, ওদেরকেও ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো দ্বীপ। এদিকে ব্যাথায় কাতরাচ্ছে অর্পনা। দুহাতে শক্তি প্রয়োগ করেও চুল থেকে দ্বীপের হাত সরাতে পারছেনা। বিহান আবার এগিয়ে আসতে নিলে অর্পনার কথায় থেমে গেলো। অর্পনা একদম পারুর মতো করেই বললো–
,,, সরি বেবি, সরি!! আর পরবোনা এসব, মাফ করে দাও, সরি সরি। চুলটা ছাড়ো প্লিজ, মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে।
,,, মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে, কথাটুকু কানে পৌঁছাতেই দ্বীপের মানস্পটে কিছু আবছা চিত্র ভেসে উঠলো। পারুর মাথায় ধরে চিৎকার করা, চুল খামচে ধরে চিৎকার করা, প্রতিটি চিৎকার যেনো দ্বীপের কানে বাজছে, সে দ্রুত অর্পনার চুল ছেড়ে দিলো। হাত দিয়ে মাথা ঘষতে ঘষতে বিচলিত কন্ঠে বললো — ব্যাথা? ব্যাথা করছে? আবার চলে যাবি? ছেড়ে যাবি? বেইমানি করবি? পারু!! মরে যাবি?
,,,, শক্ত পোক্ত অর্পনা নিজের স্বভাবের বাহিরে গিয়ে বোকা বোকা মুখ করে হালকা পলক ঝাপটে বললো — যাবোনা, শান্ত হও, আমি কোথাও যাবোনা। তোমার সাথেই থাকবো, রিলেক্স!!
,,, শান্ত হলোনা দ্বীপ, সে অর্পনার কপাল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখলো, ক্ষত স্থানে চোখ যেতেই সেখানে হাত ছোয়াল, ব্যাথায় ককিয়ে উঠলো অর্পনা। ওর ব্যাথাতুর শব্দ শুনে ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো দ্বীপ।অর্পনার এবার অস্বস্তি লাগছে, তখন ছাড়া পাবার জন্য পারুর মতো এক্টিং করলেও এখন লোকটার গা থেকে আসা সিগারেটের বিদঘুটে গন্ধে তার বমি পাচ্ছে। ছি ছি!! এই লোকের এই বিদঘুটে ঘ্রান পারু কিভাবে সহ্য করতো? বলতে হবে মেয়েটার দম আছে, তার আবার এতো দম নেই। সুতরাং তাকে এই বিদঘুটে লোকটার থেকে ছাড়া পেতে হবে, অগত্যা দ্বীপের বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে ছাড়াতে চাইলে তৎক্ষনাৎ দ্বীপ জ্ঞান হাড়িয়ে অর্পনার উপর ঢলে পরলো। সাথে সাথে দ্বীপকে আগলে নিলো সবাই,, বিহান, অরুণ, পল্লব একসাথে দ্বীপকে ধরে নিয়ে আলতো করে পাশে থাকা ছোট্ট তিনহাতের চৌকির উপর শুইয়ে দিলো। টানা চারদিন ধরে খাওয়া নেই তার উপর হঠাৎ পারুকে সামনাসামনি দেখা, ছুতে পেয়ে হয়তো অবাকতার রেশ কাটাতে পারেনি,যার ফলে সহসাই জ্ঞান হাড়িয়ে পরে যায় দ্বীপ। অর্পনা এগিয়ে গিয়ে দ্বীপের মাথার কাছে বসলো। পরপর বিহানের দিকে তাকিয়ে বললো — আপনার ভাইয়ের কথা-বার্তা, আচার-আচরনে উনাকে পুরোপুরি পাগল বলা যায়না। পারুর অনেক সৃতিই মনে আছে দেখছি, কথা বলার শক্তিও আছে, আগের মতো রাগ ও দেখায়। তাহলে এখানে রেখেছেন কেনো? আপনাদের উচিৎ উনাকে ভালো ডক্টর দেখানো। নয়তো এভাবে থাকতে থাকতে একদিন উনি সত্যি ই পুরোপুরি পাগল হয়ে যাবে।
,,সেই লোকটা দৌড়ে গিয়ে পাঁচ টা মোরা এনে দিতেই সবাই একে একে সেগুলো টেনে বসে পরলো। বিহান অর্পনার সামনাসামনি বসে একবার দ্বীপকে দেখে নিয়ে বললো — সুস্থ হতে তো ডক্টরের কাছে যেতে হবে, ঔষধ খেতে হবে, কিন্তু জোহানকে তো সেদিনের পর আর কোথাও নিয়ে যাওয়া যায়নি। শত চেষ্টার পরেও না।
,,,অরুন উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো — কোন দিনের পর?,,
,,, দিনটা শুক্রবার হওয়ায় ভার্সিটি আজ বন্ধ, বিশেষ ভাবে আদেশ করায় ক্যারানি এসে লাইব্রারির দরজা খুলে দিতেই পারুকে নিয়ে লাইব্রারিতে ঢুকলো দ্বীপ।
স্টাডি টেবিলে বসে আছে দ্বীপ, তার কোলে এক প্রকার মিশে আছে পারু। মেয়েটা থেমে থেমে বলছে আর দ্বীপ লিখছে। লিখতে লিখতে বার বার চোখ ভিজে যাচ্ছিলো দ্বীপের, পারু বলছে তো বলছেই,, বলতে বলতে একপর্যায়ে কাশি শুরু হলো, কাশির সাথে রক্ত বমি। নাক মুখ দিয়ে অজস্র রক্ত ঝড়ছিলো। পারুর অবস্থা দেখে দ্বীপ ওকে বুকের মাঝে চেপে ধরে কাদতে কাদতে বললো —
,,, জান!! জান!! কি হয়েছে তোমার? জান!! এমন করছিস কেনো পারু? আমাকে ছেড়ে যাবিনা, খবরদার!! ছেড়ে গেলে তর বাপ মাকে খুন করে ফেলবো আমি। পারু,, পারুরে, পারু,
,,, দ্বীপ পারুর অবস্থা দেখে সবাই বিচলিত হয়ে পরলো। বিহান তারাহুরো করে অক্সিজেন সিলিন্ডারটা হাতে নিয়ে দ্বীপকে বললো — জোহান!! কাদিস পরে, আগে ওকো নিয়ে হসপিটালে চল ভাই। আমাদের এখানে আসাটা উচিৎ হয়নি,, তারাতারি কর,, ফাস্ট!!
,,,বিহানের কথায় টনক নরলো দ্বীপের, সে পারুকে ঐ অবস্থাতেই কোলে নিয়ে ছুট্টে গেলো বাহিরে,, সবাই ছুটলো ওদের পিছু পিছু। এর মধ্যে ডাইরি কোথায় গেলো? কই পরলো? কে পেলো? সে খবর নেওয়ার মতো মন মানসিকতা কারোর ছিলোনা। ওরা যেহেতু দুটো গাড়ি করে এসেছে সেহেতু প্রথম গাড়িতে পারুকে নিয়ে উঠে বসলো দ্বীপ। বিহান তারাহুরো করে ড্রাইভিং সিটে বসতেই মেধা তার পাশের সিটে বসলো। আর বাকি ছেলেপুলে সব পিছনের গাড়িতে। পারুর অসুস্থতা ধীরে ধীরে বারছে,, সাথে বারছে রক্ত বমি। বিহান হিতাহিত জ্ঞান হাড়িয়ে গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে ছুটে চলছে। দ্বীপ রুমাল দিয়ে বারবার পারুর মুখ মুচছে আর পাগলের মতো বলছে —
,,,যাবিনা, যাবিনা পারু,, কোথাও যাবিনা। মরে যাবো বলে দিলাম,, তর ওসব সো কল্ড কথা আমি রাখতে পারবোনা। পারু, পারুরে,, আমি তুই হীনা একা বাচতে পারবোনা। সোনা, পারু জান আমার!!
,,,দ্বীপের পাগলাম দেখে পারু নিজের শরীরের কষ্ট ভুলে দ্বীপের গালে হাত রাখলো, অত্যন্ত কাতর স্বরে কিছু বলতে নিবে ঠিক তখনি একটা চলন্ত মালবাহী ট্রাক ওদের গাড়ির দিকে ধেয়ে এলো। গাড়ির স্পিড এতোটাই বেশি ছিলো যে বিহান ব্রেক কষতে পারেনি আর অপর প্রান্ত থেকে ট্রাকটি ব্রেক কষার চেষ্টাও করেনি বরং ইচ্ছাকৃত গাড়ির এক পাশ এফোড় ওফোড় করে চলে গিয়েছে। ট্রাকটি যে পাশ দিয়ে গিয়েছে সেই পাশে ছিলো মেধা, দ্বীপ পারু ছিলো মধ্যেবর্তী জায়গায়।
বিহান হিতাহিত জ্ঞান হাড়িয়ে গাড়ির স্টিয়ারিং ছেড়ে দিয়ে মেধাকে নিজের কাছে টেনে নিলেও গাড়ির বেশিভাগ কাচ মেধার মুখ, শীরের বিভিন্ন জায়গায় গেথে গিয়েছিলো,, মেধাকে বুকে নেওয়ার সাথে সাথে বিহানের মাথা গাড়ির জানালায় বাড়ি খায়,, তারপর গাড়িটিতে যতবার আঘাত লেগেছে ততোবার দুজন আঘাত প্রাপ্ত হয়েছে। পারু যেহেতু দ্বীপের বুকের সাথে মিশে ছিলো তাই পারুর শরীরে কোনো আঘাত লাগেনি তবে দ্বীপের পিঠে বাহুতে কাচ ঢুকে গিয়েছে,, মাথার একপাশে বড়ো সরো রকমের দুটো কাচ বিধেছে সাথে আঘাত পাওয়া গুলো যেনো বিনামূল্যে ছিলো। তাদের গাড়িটি ঝটকা খেতে খেতে যখন খাদে পরে যাবে তখনি একটা গাছের সাথে আটকে গেলো। গাড়িটি যখন স্থির হলো ততোক্ষণে বিহান মেধার জ্ঞান নেই তবে দ্বীপ পারু তখনো সজ্ঞানে। দ্বীপ তার শরীরের ব্যাথাকে দূরে সরিয়ে পারুকে সেভাবেই বুকের মাঝে আকরে রাখলো। তার ঠোঁটে খুশির ঝিলিক, সে পারুর ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ফিসফিস করে বললো —
,,, পালালবি? দেখ আমিও আসছি, তর পিছু পিছু আসছি। তুই যতদূর যাবি, আমিও ততোদূর যাবো। পালাবি কোথায় পারু? দ্বীপ মির্জার থেকে পালানো এতো ইজি না।
,,, পারু কিছু বলার শক্তি পাচ্ছেনা, তার চোখ দুটো বুজে আসছে,, সে চোখ বুঝার আগে শুধু ঠোট নাড়িয়ে বললো — আমার ভাগের সব সুখ তোমার হোক, তোমার সব দুঃখ আমার হোক। আলবিদা!!
,,,টানা তিন মাস পর জ্ঞান ফিরে দ্বীপের। এই পুরোটা সময় সে চিকিৎসার আওতায় ছিলো। মাথায় বড়ো বড়ো কাচ বিধার সেগুলো বের করতে সার্জারী করতে হয়েছিলো,, সেসবের প্রভাব কাটিয়ে সুস্থ হতে হতে টানা তিন মাস কেটে যায়। বিহান তখন অনেকটা সুস্থ তবে মেধার অবস্থা খুব করুন। মুখে কাচ লাগার ফলে মুখের একটা পাশ কেটে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে থেতলে গিয়েছে,, ভাগ্য ভালো ছিলো এক্সিডেন্টর সময় মেয়েটা চোখ বন্ধ করে রেখেছিলো নয়তো চোখটাও বাচানো সম্ভব হতো না। সেই ছিন্ন ভিন্ন মুখ নিয়ে কারোর সামনে আসতে চায়না মেয়েটা,, বিহানের সামনে তো একদমি না। সারাক্ষণ নিজেকে ঘর বন্দি করে রাখে,, কখনো হাওমাও করে কাদে আবার কখনো নিরব হয়ে বিছানায় পরে থাকে। এই কদিনে মির্জা বাড়ির সকল সুখ সাচ্ছন্দ্য হাড়িয়ে ধুধু মরুভূমিতে পরিনত হয়েছে। এটুকু সময়ে মাহিদ মির্জা ছেলের শোকে দুবার হার্ট এটাক করেছেন,, লাস্টবার অ্যাটাকের পর উনি আজীবনের জন্য প্যারালাইসিস্ট এ আক্রান্ত হোন। মাহিদ মির্জা না থাকায় বিজনেস তখন ডাউনের পথে,, শাহিন মির্জা, মাহিন মির্জা নিজেদের কাজ সামলে যতটুকু সময় পারেন অফিসে যান। এদিকে ছেলে মেয়েদের অবস্থা করুন,, বাড়ির মেইন কর্তা সকলের বট বৃক্ষের এমন দশা,, সব মিলিয়ে শাহিন মির্জা, মাহিন মির্জা নিজেদের সামলে, কোনোকিছুই সামলে উঠতে পারছেন না। পরিবারের এই করুন অবস্থায় বাড়ির মহিলাদের রান্না বান্না, কাজ বাজ সব বন্ধের পথে,,বাড়িতে সার্জেন্ট না থাকলে বোধয় বাড়ির প্রতিটা মানুষকে খাদ্যাভাবে প্রান হাড়াতে হতো।
,,,এদিকে দ্বীপের জ্ঞান ফিরতেই সে পারুর জন্য পাগলামি শুরু করে দেয়,, তাকে কেনো বাচানো হলো তার কইফিয়ত জানতে চায়,, ভাঙচুর করতে থাকে। ভাঙচুর শেষ হলে বার বার পারুর কাছে যাওয়ার জন্য জেদ করতে থাকে। শেষে না পেরে বিহান ওকে নিয়ে রাতারাতি জয়পুরহাট পৌছায়। কবরস্থানে গিয়ে যেনো দ্বীপের পাগলামি আরও বাড়লো,, সে কোনো পারুকে শেষবার দেখতে পেলোনা? সে তো পারুর বিয়ে করা স্বামি,, পারুর শেষ সাজ তো তার হাতে সাজার কথা ছিলো,, তাহলে কেনো সেই সুযোগ পেলোনা দ্বীপ? কেনো? দ্বীপ একপর্যায়ে পাগলামির বসে পারুর কবরের মাটি সরাতে শুরু করে,, সেদিন বহু কষ্টে ওকে সামলে রেখেছিলো বিহান। তারপর টানা সাতদিন বিহান আর দ্বীপ পারুদের বাড়িতেই থাকে। যত দিন যাচ্ছিলো দ্বীপের পাগলামি বাড়ছিলো, সে রাত দিন পারুর কবরেই পরে থাকতো,, ধীরে ধীরে পারুকে,, দ্বীপের মা রাহিতা মির্জাকে হেলুসুলেট করতে থাকে। বিহান শতবার চেষ্টা করেছে দ্বীপকে জয়পুরহাট থেকে ঢাকা ফিরিয়ে আনার। বহুবার ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে ঘুমন্ত অবস্থায় ঢাকা এনেছে, হসপিটালে এডমিট করিয়েছে,, এমনো সময় গিয়েছে ওকে বাড়িতে বন্দী করে রাখা হয়েছে তবুও দ্বীপের পাগলামি কমেনি।
সারাক্ষণ ভাঙচুর করতো,, হাত পা কেটে কুটে আহত হয়ে পরে থাকতো। ঘর থেকে সব আসবাব পত্র, ভাঙচুর করার মতো জিনিস সরিয়ে ফেলার পরেও দ্বীপ দেয়ালে হাত দিয়ে আঘাত করে নিজেকে রক্তাক্ত করে জ্ঞান হাড়িয়ে পরে থাকতো। কাউকে কাছে ঘেষতে দিতোনা, খাবার খেতোনা ঔষধ খাওয়া তো দূর। মেধা আর দ্বীপের করুন অবস্থায় মির্জা বাড়িতে তখন হাহাকার আর বিষাধের যন্ত্রণা। দ্বীপের সিগারেট খাওয়ার হাড় আগের থেকে তিনগুন বেড়েছে,, সিগারেট না পেলেও পাগলামি করে। এট লাস্ট না পেরে এই জয়পুরহাট কবরস্থানেই ঘর তুলে তাতে দ্বীপকে রাখা হয়। এখানে আসার পর দ্বীপের পাগলামি কমে,, সে সারাক্ষণ চুপ থাকে,, বিরবির করে কার সাথে যেনো কথা বলে,, একপ্রকার অস্বাভাবিক আচরন করতে থাকে। দ্বীপকে আর কখনোই ঢাকা নিয়ে যেতে পারেনি কেউ,, তবে বহু ডাক্তারকে জয়পুর আনা হয়েছে দ্বীপের চিকিৎসা করার জন্য। দ্বীপ সেসব গ্রহণ করা তো দূর কাউকে কাছেই ঘেষতে দেয়নি।
কেউ কাছে গেলেই মারধর করতো নিজেকে রক্তাক্ত করতো,, পারুর কথা বলে মাঝে সাজে খাওয়ানো গেলেও বেশিভাগ দিন দ্বীপ না খেয়েই কাটিয়ে দিতো,, মার খাওয়ার ভয়ে কেউ কাছে ঘেষতে চাইতোনা। এভাবেই পেরিয়ে যায় মাস, বছর, তারপর বছরের পর বছর। দ্বীপের আর ফিরা হয়না, প্রথম প্রথম বিহান জয়পুরে সপ্তাহে দু, তিনবার এলেও এখন প্রতি শুক্রবার ব্যাতিত আসা হয়ে উঠেনা। একা হাতে বিজন্যাস রাজনীতি সব সামলাতে গিয়ে পরিবারকে তেমন একটা সময় ও দেওয়া হয়না। এর মাঝে বছর চারেক আগে মেধার জড়তা কাটাতে এক প্রকার জোর করেই বিয়ে করে বিহান। কিন্তু মেয়েটা এখনো জড়তায় কুকরে থাকে, এতো বছরেও বিহান ব্যাতিত কারোর সামনে মুখ খুলে হাজির হয়নি। বাহিরের পৃথিবীর সাথে মেয়েটার আকাশ পাতাল সমান দূরত্ব। সেদিন মেধা ঠিকি বলেছিলো,, পারুর জীবনের সাথে সাথে মেধার জীবনটাও থমকে গিয়েছিলো। মেধা আর কোনোদিন সেই ভার্সিটির প্রাঙ্গনে পা বাড়ায়নি, বই ছুয়ে দেখেনি, পড়ালেখা করেনি। একটা মানুষের জীবনের খাতিরে মির্জা বাড়ি এখন দুঃখ শালায় পরিনত হয়েছে,, চারদিকে শুধু অপূর্ণতা আর অপূর্ণতা।
,,,, দীর্ঘ বাক্য ব্যায়ের পর থামলো বিহান,, তার চোখ জোড়া লাল হয়ে গিয়েছে, হাত দিয়ে বার বার চোখ মুচছে। সে তো সবাইকে শর্টকাটে কথাগুলো বলে দিলো, এটুকু কথা বলতে মিনিট ১০ মিনিট ও লাগেনি,, অথচ গত ৬-৭ বছর ধরে সে এসব দেখে এসেছে,, আরও কতো ঘটনা রয়েছে যা ব্যাক্ত করা সম্ভব হয়ে উঠেনি। এদিকে বিহানের কথাগুলো শুনে রাত্রি কান্না করতে করতে ঘর ভাসিয়ে দেওয়ার জোগাড়। তার ফোপানো আর নাক টানার শব্দে বিরক্ত হলো পল্লব , অরুন তো আগা গোড়া পুরো রাত্রিতেই বিরক্ত,, এই মেয়েকে নিয়ে সে কিছুই বলতে চায়না। তাই সে রাত্রিকে পাত্তা না দিয়ে বিহানকে বললো — সেদিন যদি ট্রাকটা ইচ্ছাকৃত আপনাদের ধাক্কা দিয়ে থাকে, তাহলে আই গেইজ কেউ আপনাদের মার্ডার করার প্লান করছিলো। কে করেছিলো, সেই বিষয়ে কিছু জানেন?
,,,বিহান তপ্ত শ্বাস ফেলে বললো — এক্সেক্ট বলতে পারছিনা কারন আমাদের শত্রুর অভাব নেই। তবে আমার সন্দেহ বর্তমান এমপি সমীরণ মন্ডল এবং তার ছেলে অজয় মন্ডলের উপর। লাস্টবার দ্বীপের উপর হামলাটা অজয় মন্ডল ই করিয়েছিলো। আবার সাবেক এমপি তাহরিফ খান ও করতে পারে, বিষয়টাতে আমি শিউর না।
,,,, বিহানের কথাটা সহ্য হলোনা অর্পনার, সে বিরক্তিতে চোখ মুখ কুচকে বললো — শিউর না? এতোদিনেও আপনি এই কথাটা কিভাবে বলতে পারেন? একটা এক্সিডেন্টে আপনাদের পুরো পরিবারটা শেষ হয়ে গিয়েছে। আর আপনি সেই এক্সিডেন্টের উৎস খুজে বের করলেন না? স্ট্রেন্জ!!
,,, আমি ট্রাই করেছি, তবে এখনো তেমন কোনো প্রুভ পাইনি। সেই সাথে পুরো একটা পরিবার, অফিস, রাজনীতি একা একা সামলানোর পর দুদন্ড শান্তিতে ঘুমানোর সময় টুকু ও পাওয়া হয়না। আর সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট, যেই আমি জোহানকে ছাড়া এক পাও এগুতে পারতাম না, সেই আমি বর্তমানে একা একা এতোটা সামলাচ্ছি নিজেরি বিশ্বাস হয়না।
,,, অর্পনা বিরক্তিতে “চ” যুক্ত শব্দ উচ্চারণ করলো। কি এক ঝামেলা যুক্ত কাহিনীতে ফেসে গেলো সে? অচেনা লোক গুলোর জন্য মায়া মায়া ফিল হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি কষ্ট লাগছে মেধার জন্য, মেয়েটার সখের বয়সে নিজের সৌন্দর্য হাড়ালো শুধু এই রাজনীতির ক্যাচালে পরে। এজন্যই রাজনীতি শব্দটা অর্পনার অপছন্দের একটি টপিক । দ্বীপের গোঙ্গানির শব্দে ধ্যান ভাঙলো সবার। দ্বীপ চোখ বন্ধ রেখেই পারু পারু কারছে,, অর্পনার কি হলো কে জানে? ও এক প্রকার মোহচ্ছন্নের ন্যায় দ্বীপের হাত ধরে বলতে লাগলো –.
,,, দ্বীপ!! রিল্যাক্স, আমি এখানেই আছি। হাইপার হবেন না।
,,, অর্পনার কথায় চোখ মেলে তাকালো দ্বীপ, কয়েকবার পলক ঝাপটে অর্পনার কোলে মাথা রেখে ওর পেট জড়িয়ে ধরে বার বার পারুর পারু জপছে। যার ফলে দ্বীপের গরম নিশ্বাস অর্পনার পেট ছুয়ে যাচ্ছে বার বার। এরুপ কান্ডে চরম অস্বস্তিতে পরে গেলো অর্পনা,, যতই পাগলামি করুক, বুঝুক আর না বুঝুক লোকটা তো একজন প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ,, অস্বস্তি হওয়াটা স্বাভাবিক। অর্পনা হাত বাড়িয়ে দ্বীপের মাথাটা কোল থেকে সরাতে চাইলে দ্বীপ আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো ওকে। পেটে মুখ ঘষে মাথা দুদিকে বারবার ঝাকাতে ঝাকাতে বললো — না, না, ছাড়বোনা। তুই চলে যাবি, আবার চলে যাবি,, তুই ছাড়া আমার কষ্ট হয় পারু,, যাসনা,, যাসনা।
,,,এতে আরও হাসফাস করে উঠলো অর্পনা,, এই পাগল লোককে কিভাবে সরাবে সে? ছাড়তেই তো চাচ্ছেনা। বিহান বুঝলো অর্পনার অবস্থাটা তাই এগিয়ে গিয়ে দ্বীপের কাধে হাত রাখতেই ভয়ে কুকরে গেলো দ্বীপ। সর্বশক্তি দিয়ে অর্পনাকে জড়িয়ে ধরলো যেনো ওখানেই সে নিরাপদ আশ্রয় খুজতে ব্যাস্ত। দ্বীপকে ভয় পেতে দেখে অর্পনা বিহানকে সরে যেতে ইশারা করলো পরপর দ্বীপের ঝটালো চুলে হাত ডুবিয়ে নরম স্বরে ডাকলো — দ্বীপ!! একটু সরুন,কষ্ট হচ্ছে আমার। আমি কোথাও যাচ্ছিনা, আপনাকে রেখে কোথাও যাবোনা। একটু শান্ত হোন, আমি পেটে ব্যাথা পাচ্ছি।
,,,দ্বীপ সরলোনা, বরং আরও শক্ত করে চেপে ধরে বারবার ছাড়বেনা বলে বায়না করতে লাগলো। দ্বীপের অবস্থা দেখে মাটিতে হাটু মুরে বসে পরলো বিহান,, অর্পনার দিকে তাকিয়ে বড্ড অনুনয়ের স্বরে বললো —
,,, আমার ভাইটাকে সুস্থ করার জন্য হেল্প করবেন প্লিজ? ও একবার সুস্থ হয়ে গেলে আমাদের বাড়ির সুখ সাচ্ছন্দ্য ফিরে আসবে। আমার মেধার সাথে হওয়া অন্যায়ের বিচার পাবো। আমি তো কিছুই খুজে বের করতে পারিনি,, আমার জায়গায় জোহান থাকলে এতোদিনে ঐ কুত্তার বাচ্চাদের মাংস কেটে কুত্তা দিয়ে খাওয়াতো। আমার ভাইয়ের জন্য আপনার মায়া হচ্ছেনা অর্পনা? আমার ভাই বাদ, আমার ফ্যামিলির জন্য মায়া হচ্ছেনা? বড়ো আব্বু এখোনো প্যারালাইসিস্ট হয়ে বিছানায় পরে আছে,, আমার আম্মু জোহানকে হাড়িয়ে পাগল প্রায় অবস্থা,, ছোট আব্বু লাস্ট ইলেকশনে চরম অপমানের সম্মুখীন হয়,, যার ফলে এখন তিনি বাড়ি থেকেই বের হোন না। ছয় বছর আগেও যেই মির্জা বাড়িতে দাপট আর ক্ষমতার বসবাস ছিলো সেখানে এখন হতাশা আর হাহাকার ছাড়া কিছুই নেই। দয়া করে আমাকে ফিরিয়ে দিবেন না অর্পনা, আমরা সত্যি ই অসহায়।
,,, বিহানের কথায় থম মেরে বসে রইলো অর্পনা,, তার পলক পরছেনা,, কি বলবে, কি করবে, কিছুই বুঝতে পারছেনা। এদিকে সবাই অর্পনার মুখের দিকেই তাকিয়ে আছে। সবাই ভেবেছিলো অর্পনা সাথে সাথে রিয়্যাক্ট করে বসবে। কিন্তু দু মিনিট পেরিয়ে যাওয়ার পরেও যখন অর্পনা কোনো রেসপন্স করছেনা তখন ইরা অধৈর্য হয়ে বললো —
—- কি বলতে চাচ্ছেন আপনি? অর্পন কিভাবে হেল্প করবে? আজব!! এখন আবার এটা বলবেন না যে, অর্পন যেনো পারুর ভুমিকায় অভিনয় করে। পসিবল না, অর্পন এসব করবেনা,, কোনো মতেই না।
,,, বিহান এখনো সেভাবেই বসে আছে, তার চোখে মুখে চরম অসহায়ত্ব। বিহানের মুখটা দেখে মায়া হলো রাত্রির। সে তো শুরু থেকেই দ্বীপের কষ্টে দ্রবীভূত হয়ে আছে। অগত্যা সে ইরার বিপরীতে গিয়ে বললো — করলে সমস্যা কি ইরা? এতে যদি একটা লোক স্বাভাবিক জীবন পায়,, একটা পরিবার থেকে কষ্ট হাহাকার কেটে যায়,, একটা নিষ্পাপ মেয়ে তার সাথে হওয়া অন্যায়ের বিচার পায় তাহলে এর থেকে ভালো আর কি হতে পারে? অর্পন তুই বিহান ভাইয়ার কথায় রাজি হয়ে যা।
,,, রাত্রির সাথে সাথে পল্লব শায় জানালেও অরুন রাজি হতে পারলোনা। সে কোনো ভনিতা ছাড়াই সোজা সাপ্টা বললো — কি আবোল তাবোল বকছিস তরা? উনি একটা মানসিক রুগি,, উনার সাথে কিভাবে কি ভাই? আর অভিনয় করলেই হলো? আজ নয় কাল উনি সুস্থ হবেন না? তখন যদি জানতে পারে ও পারু নয়, অর্পনা। তখন যদি ওকে মানতে না চায়? তখন অর্পনার কি হবে? আমি ওর জীবনটা এভাবে নষ্ট হতে দিতে পারিনা।
,,, অরুনের কথায় লজিক আছে, ওর কথা শুনে পল্লব ও বেকে বসলো,, সে বিহানের দিকে তাকিয়ে বললো — অরুন ঠিকি বলেছে,, আর আঙ্কেল শুনলে জীবনেও এসব মানবেনা। বরং অর্পনা আর আঙ্কেলের মাঝে ঝামেলা হবে,, আঙ্কেল আরও ভুল বুঝবে ওকে। আমরা কখনোই এমনটা হতে দিতে পারিনা।
,,,বিহানের চোখ জোড়া ছলছল করে উঠলো, সে এখনো অর্পনার দিকেই তাকিয়ে আছে,, বিহান আগের চেয়েও করুন স্বরে বললো– প্লিজ অর্পনা, আমার ভাই আপনাকে পারু মনে করছে,,এটা আমার ফ্যামিলির জন্য একটা প্লাস পয়েন্ট। আপনি চাইলেই ওকে এখন ঢাকা নিয়ে যেতে পারবেন, ডক্টর দেখাতে পারবেন,,ঔষধ খাওয়াতে পারবেন,, আপনার সব কথা শুনবে ও। আপনারা আমার ভাইকে যেমন ভাবছেন ও কিন্তু এমন নয়। ও রাগী হতে পারে কিন্তু অমানুষ নয়,, দেখবেন একবার সুস্থ হলে অর্পনাকে ফিরাবেনা। ভালোবেসে আগলে রাখবে,, প্লিজ অর্পনা, আমার ভাইকে মেনে নিন, আপনি একবার হ্যা বললে আমি এখোনি মাওলানা সাহেবকে ডেকে আনবো। প্লিজ, অর্পনা,, প্লিজ!!
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২২
,,, বিহানের কথায় তেতে উঠলো ইরা—– হোয়াট দ্যা হেল মিস্টার মির্জা!! আপনার জীবনটাকে ফ্যান মনে হচ্ছে? অর্পন তুই উনার কথা শুনবিনা। কানেও তুলবিনা, অর্পন ভুলে যাসনা,,
,,,ইরা কথা সম্পন্ন করতে পারলোনা তার আগেই অর্পনা বললো — তরা এতো হাইপার হচ্ছিস কেনো? আমাকে তদের অবোলা নারী মনে হয়? যে উনি আমাকে মেনে না নিলেই জীবন শেষ হয়ে যাবে? এমনিতেও আমার এক জীবন আমি একাই কাটিয়ে দিতাম,, এর ফাকে যদি উনি সুস্থ হয় তাহলে ইট্স ওকে। মিস্টার মির্জা আপনি মাওলানা সাহেবকে ডাকুন। আমার কোনো আপত্তি নেই।
