৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২২
রুপান্জলি
পাপ্পার সাথে দির্ঘ বাক্য ব্যায়ের পর কল কাটলো অর্পনা। এই মুহুর্তে ঢাকা থেকে রওনা হলে গন্তব্য স্থলে পৌছাতে যদি ৪-৫ ঘন্টা লাগে তাহলে বাড়িতে ফিরতে ফিরতে ৮-১০ ঘন্টার ব্যাপার,, আর বাংলাদেশের রাস্তা ঘাটের যেই অবস্থা, কোনোভাবে যদি জ্যামে আটকে যায়, তাহলে বাড়ি ফিরতে ফিরতে অর্ধেক রাত কাবার হয়ে যাবে। তখন আবার পাপ্পা টেনশন করতে করতে পুরো থানার পুলিশদের রাস্তায় নামিয়ে দিবে শুধু মাত্র উনার প্রিন্সেসকে খুজে বের করার উদ্দেশ্যে। তাই আপাতত রিস্ক নিতে চাইলো না অর্পনা, দেশের একজন সতর্কবান নাগরিক হিসেবে দেশের রাস্তাঘাটের শান্তি বজায় রাখতে পাপ্পার থেকে অনুমতিটা নিয়েই নিলো। যদিও পাপ্পা হাজারটা প্রশ্ন করেছে,, সেটাও ইনিয়ে বিনিয়ে মিথ্যা বলে সামলে নিয়েছে অর্পনা। তার কেনো যেনো এই বিষয়টা নিয়ে পাপ্পার সাথে আলোচনায় যেতে অস্বস্তি হচ্ছে। কেনো হচ্ছে নিজেও জানেনা।
,,,অর্পনা কল কেটে পিছনে ঘুরতেই বিহানকে দেখতে পেলো, বিহান বুকে হাত ভাজ করে ওর দিকেই তাকিয়ে ছিলো। অর্পনা ভ্রু নাচিয়ে প্রশ্ন করলো — আমি কি ধরে নিবো আপনি ক্যারেক্টারল্যাস?
,,,বিহান শব্দ করে হেসে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বললো — এই না না!! একদমনা। আমি আমার বউয়ের প্রতি খুব লয়াল, ওসব তকমা দিবেন না প্লিজ!! আমি আপনাকেও পারুর মতো বোন মানি। আসলে আমার কেনো যেনো মানতে কষ্ট হচ্ছে আপনি অর্পনা, পারু নয়। একি মুখ, একি চোখ, একি ঠোঁট,, সরি সরি!! আপনার ঠোঁট টা ব্যাতিক্রম, ( ভালো করে পর্যবেক্ষণ করতে করতে) আর নাকের আগায় একটা ডিম্পল আছে, পারুর ছিলোনা। গালে তিল আছে, ঠোঁটের মাঝখানেও আছে বাট পারুর ছিলো কিনা আমার মনে নেই। বাকি চেহারাটাই এক,, একদম খাপেখাপ। আচ্ছা!! দুটো মানুষ কি এমনি এমনি এক চেহারার হতে পারে? আপনার সন্দেহ হচ্ছেনা?
,,, বিহানের কথা গুলো শুনে রাগ হলো অর্পনার, সে দাতে দাত চেপে বললো —আপনার কি মনে হয়? আমি পারমিতা নাকি পারমিতার ভুত? লিসেন ব্রো!! আমি আমার পাপ্পার এক মাত্র প্রিন্সেস, আমার আগে পরে তার কোনো বেবি হয়নি। সুতরাং, ইট্স অ্যা কো-ইন্সিডেন্ট, বাই দ্যা ওয়ে, পারুর একটা ছবি দেখান তো, দেখি ওর সাথে আমার ঠিক কতোটা মিলে।
,,, বিহান গাড়ির দিকে যেতে যেতে বললো — আপনার যা ব্যাবহার, আপনি পারমিতা কিংবা ওর ভুত কোনোটাই হতে পারবেন না। দুর্ভাগ্য বসত আপনার চেহারা আমার বোনের সাথে মিলে,, তাই ওকে দেখতে চাইলে মোবাইলের ক্যামেরায় নিজের ফেইস দেখে নিন। উত্তর পেয়ে যাবেন।
,,,,ফুসে উঠলো অর্পনা, কিছু বলতে নিবে তখনি দৌড়ে এলো রাত্রি, ওর মাম্মা ওকে এতো দূরের রাস্তায় যেতে দিচ্ছেনা, অর্পনা যেনো একটু মেনেজ করে ন্যায়। এটা বরাবারি হয়, রাত্রির মা রাত্রিকে নিয়ে সর্বক্ষণ কেমন ভয়ে ভয়ে থাকে,, দূরে যেতে দেয়না,, একমাত্র মেয়ে বলেই হয়তো এতোটা ভয়। অর্পনা রাত্রির মায়ের সাথে কথা বলে বিষয়টা মেনেজ করে নিজেদের গাড়ির দিকে এগুতে নিলে বিহান বললো — ওদিকে কোথায় যাচ্ছেন? ঐ ছোট গাড়িতে ছয়জন কিভাবে যাবো? যেতে হলে হাইয়েস্ট দিয়েই যেতে হবে, তাই এখানে এসে বসুন।
,,,দাড়িয়ে পরলো অর্পনা, মুখটা বিকৃতি করে হাইয়েস্ট টা এক ঝলক দেখে বললো — আপনার একার জন্য আমি আমার গাড়ি স্যাক্রিফাইস করবো? আর ইউ কিডিং উইথ মি? আপনি তো যথেষ্ট বড়োলোক, আপনার বাইক নেই? বাইক নিয়ে আমাদের পিছন পিছন চলুন।
,,,বাইকের কথা শুনে মন খারাপ হয়ে গেলো বিহানের, সে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বললো — সম্ভব না!! আমি এখন আর বাইক ইউজ করিনা,যেতে হলে হাইয়েস্ট দিয়েই যেতে হবে। সবচেয়ে বড়ো কথা, আমাকে ছাড়া আপনারা যেতেও পারবেন না, কারন আমি আপনাদের পথ প্রদর্শক। আমাকে ছাড়া কিভাবে পৌঁছাবেন সেখানে?
,,, বিহানের কথাটা একদম সত্যি,, ওরা যার সাথে যাচ্ছে, তাকেই যদি সাথে না নেয় তাহলে গন্তব্যে পৌছাবে কি করে? অগত্যা কোনো উপায় না পেরে বিহানের ইশারা করা গাড়ির ড্রাইভিং সিটে উঠে বসলো অর্পনা,, আর তার পাসের সিটে বসলো অরুন। তাদের পিছনের সিটে বসেছে ইরা, রাত্রি আর পল্লব । পাঁচ জনের এই সিট ভাগাভাগি দেখে ভ্রু কুচকালো বিহান, হালকা,দেমাগি স্বরে বললো — সরি, গাড়িটা আমার,, আমাকে ড্রাইভ করতে দেওয়া উচিৎ!!
,,, অর্পনা বিহানের থেকে দ্বীগুন দেমাগ নিয়ে বললো—- সরি!! আমি কোনো গাড়িতে থাকবো, আর সেই গাড়ি ড্রাইভ করবে অন্যজন, মানা যায়না। এসব আমার পারশোনালিটির সাথে যায়না। পিছনে বসুন।
,,, বিহান এবার দেমাগ টেমাগ সাইডে রেখে কাতর স্বরে বললো —তাহলে উনাকে পিছনে যেতে বলুন, আমার পিছনে বসতে অস্বস্তি হয়।
,,বিহানের কাতর স্বর শুনে নেমে এলো অরুন,,নয়তো জীবনেও নিজের সিট স্যাক্রিফাইস করতো না। অরুনকে পিছনে যেতে দেখে পল্লব ও পিছনে চলে গেলো,, দুজন এখন বসে বসে ফ্রি ফায়ার খেলবে। ইরা আর রাত্রি চাইলে ওদেরকেও সাথে এড করে নিবে,, এভাবে সিক্সথ পারশোনের সামনে আহাম্মক সেজে বসে থাকার মতো ভদ্র পাবলিক আবার তারা নয়।
,,,, বিহানের অনুসরণ করা পথে ছুটে চলছে একটা কালো হাইয়েস্ট, গাড়িতে পিনপতন নিরবতা থাকার পরিবর্তে প্রতিনিয়ত ঠাস ঠুস গুলি ছুড়ার শব্দ হচ্ছে,, সেসব শব্দে ভিষণ রকমের বিরক্ত বিহান। এতো বড়ো বড়ো ছেলে মেয়েরা নাকি ফ্রি ফায়ার খেলে তাও এরকম ঠাসঠাস শব্দ করে। বিহান বিরক্তি নিয়ে একবার সাইলেন্ট করতে বলায়,, তার বিপরীতে ছেলে মেয়ে গুলো ঘারত্যারামি করে বললো, ওদের নাকি মারামারির শব্দ না হলে খেলায় ফিল আসেনা। আর ফিল না আসলে খেলায় মজা পাওয়া যায়না। কি আর করার? অগত্যা চুপ রইলো সে ,, এদের খাতিরে নাহয় বিহানের জীবন থেকে একটা দিন অবাদে বিসর্জন গেলো, সমস্যা নেই। যেখানে বিহান তার ভাইয়ের ভালোর জন্য দুনিয়া এফোর ওফোড় করে দিতে রাজি,, সেখানে বসে বসে এই বিচ্ছুগুলোর আলগা ভাব দেখা তেমন কোনো ব্যাপার না।
,,, গাড়ি চলতে চলতে হুট করেই থেমে গেলো,, গাড়ি থামতেই প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে অর্পনার দিকে তাকালো বিহান,, অর্পনা সেসবে পাত্তা দিলোনা, সে জিন্সের পকেট থেকে ফোন বের করে স্ক্রিন চেক করলো। ইতিমধ্যে হেংলা প্রোফেসর নম্বর থেকে মোট ২৮ টা কল এসেছে যার একটাও অর্পনা ধরার প্রয়োজন মনে করেনি। তবে এবার সে বিরক্ত, এভাবে বার বার ফোন ভাইব্রেটর করলে কার না বিরক্ত লাগে? অগত্যা ২৯ বারের মতো কল আসতেই সেটা ধরলো অর্পনা, কলটা ভিডিও কল ছিলো তাই গাড়ির ডেস বোর্ডে রেখে আদ্রিয়ানের দিকে তাকালো। সাথে সাথে ওপাশ থেকে শুনা গেলো আদ্রিয়ানের অশান্ত স্বর– কি হয়েছে জানেম? কই তুমি? আঙ্কেল বললো, তুমি কোথাও একটা যাচ্ছো, ফিরতে নাকি অনেক রাত হবে? কোথায় যাচ্ছো একা একা?
,,, আমি যে অনেক দূরে যাচ্ছি এটা জানেন, আর আমার সাথে কে কে যাচ্ছে সেটা জানেন না?
,,, আদ্রিয়ান আবারো অশান্ত কন্ঠে বললো — জানি,আমি সবটা জানি। কিন্তু ওদের সাথে তোমাকে একা ছাড়তে আমার ভয় হচ্ছে জানেম। আমার মনটা কেমন যেনো করছে,, মনে হচ্ছে তোমায় হাড়িয়ে ফেলবো। আমায় একটু বুঝবে প্লিজ!! তুমি গাড়িটা একটু পার্ক করে আমাকে তোমার লোকেশন পাঠাও,, আমি এখোনি আসছি। বেশি ওয়েট করাবোনা, বিশ্বাস করো, আধা ঘন্টার মাঝেই পৌঁছে যাবো।
,,,বরাবরের ন্যায় বিরক্ত হলো অর্পনা,, তার কেনো যেনো অতিরিক্ত কেয়ার গুলো বিষাক্ত মনে হয়। তবুও অন্যের সামনে রুড বিহেব করবেনা বলে ভদ্রাতার সাথে বললো– দেখুন, আমি একটা কাজে যাচ্ছি,, কাজ শেষ হলেই ফিরে আসবো। আপাতত ড্রাউভিং সিটে বসে আছি আমি,, এভাবে বার বার কল আসলে এক্সিডেন্ট হতে পারে। আপনি নিশ্চই চান না, আমি এই বয়সেই পরোলোক ঘমন করি? সুতরাং, রাখছি।
,,,বলেই ফোন কেটে মোবাইলটা পকেটে ঢুকিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিলো অর্পনা। আবারও ব্যাস্ত রাস্তা ধরে নিজের গতিতে ছুটে চলছে গাড়িটি। বিহান কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থেকে কিসব যেনো ভাবলো। ভাবনা শেষ করে অর্পনার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো — লোকটা কে? সম্ভাবত আপনি আনমেরিড। আমি কি ধরে নিবো, উনি আপনার বয়ফ্রেন্ড?
,,,, অর্পনা সামনের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে বললো– না!! উনি আমার কেউ হয়না।
,,, বিহান ঠোট কামরে দির্দ্বান্বিত কন্ঠে বললো — কথা বার্তা শুনে মনে হলো লোকটা আপনার প্রতি খুব কেয়ারিং। অথচ আপনি বলছেন উনি আপনার কেউ হয়না। স্ট্রেন্জ!!
,,,অর্পনা একবার বিহানের দিকে তাকালো, বিহানের চোখে প্রশ্ন,, কি মনে করে যেনো অর্পনা ছোট করে বললো — উনার সাথে আমার একটা অসম্পর্ক আছে,, যেটা আমি মানিনা আবার উনাকে চাইলেও ছুড়ে ফেলা যাচ্ছেনা। এক কথায় ঝুলে থাকা যাকে বলে, আরকি।
,,,অর্পনার কথার আগা মাথা বুঝলোনা বিহান, সে অবুজের মতো করেই বললো— অসম্পর্ক? এটা আবার কেমন সম্পর্ক?
,,, অর্পনা বিরক্ত হলো, একটা মানুষ এতো প্রশ্ন কিভাবে করতে পারে? তাও একটা অপরিচিত মেয়েকে? বিরক্তিতে চোখ মুখ কুচকে কাঠ কাঠ গলায় বললো — আমি আমার পাপ্পাকেও কোনোদিন এতোটা এক্সপ্লাইনেশন দেইনি, যতটা আপনাকে দিলাম। যতটা বলেছি ততোটা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকুন,,, পারসোনাল বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করা আমার পছন্দ না।
,,, বিহান নিজেই নিজের প্রতি বিরক্ত,, সে যা আশা করছে তা কি আদেও সম্ভব? কিন্তু চেষ্টা তো করতে হবে,, যদি সম্ভব হয়,, যদি কোনো ভাবে,, ভেবেই তপ্ত শ্বাস ফেলে বাহিরের দিকে নজর তাক করলো বিহান। বিকাল হয়ে এসেছে,, এই সময়টাতে সামনের রাস্তায় খুব জ্যাম থাকে, আজ না থাকলেই হলো।
,,,দির্ঘ ছয় ঘন্টা জার্নি করার পর এমন একটা জায়গায় এসে গাড়ি থামলো, যেটা দেখার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিলোনা। চোখের সামনে “”জয়পুর হাট কেন্দ্রীয় কবরস্থান”” লেখাটি দেখে স্থির নেত্রে তাকিয়ে রইলো অর্পনা। এর আগে সে কখনো জয়পুরহাট আসেনি তাই পথ ঘাট কিছুই চিনেনা। এতোক্ষন চলতি পথে কিছু না চিনলেও বর্তমানে সামনে দন্ডায়মান হয়ে দাড়িয়ে থাকা কবরস্থানটি দেখে হুট করেই মনটা ভার হয়ে এলো ,, গতকাল রাতের সেই অস্থিরতা,, পারু দ্বীপকে পড়ার পর তৈরি হওয়া মন খারাপ গুলো একসাথে জমা হয়ে তার মন পুটে আধার নামলো। অর্পনার ভাবনার মাঝেই একটা লোক এগিয়ে এলো,, একদম বিহানের সামনে এসে দাড়াতেই বিহান প্রশ্ন করলো–
,,,সব ঠিক আছে?
,, লোকটা দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বললো — ৪ দিন ধরে কিছুই খাচ্ছেনা,, কাছে গেলেই মারধর করছে, আগে বুঝুম বাঝুম দিয়ে খাওয়ানো গেলেও এখন পারুকে ছাড়া তিনি কিছুই খেতে রাজি নয়। সারাক্ষণ পারু পারু করেন, আমরা নিরুপায় স্যার।
,,,লোকটার কথা শুনে বিহানের চোখ জোড়া ছলছল করে উঠলো, মুহুর্তেই চোখে পানি জমা হলো। পারুকে দেওয়া কথা সে রাখতে পারছেনা,, কিছুতেই কিছু হচ্ছেনা। বিহান বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে চোখে জমা পানি টুকু মুছে নিলো। এদিকে সবাই অবাক হয়ে বিহান আর ঐ লোকটাকে দেখছে। তারমানে ওরা যা ভাবছে তাই সঠিক? পারুকে হাড়িয়ে দ্বীপ মানসিক ভারসম্য হাড়িয়ে এখানে পরে আছে? কিন্তু দ্বীপদের তো টাকার অভাব নেই, তাহলে এমন একটা জায়গায় কেনো ফেলে রেখেছে? তারা চাইলে তো ভালো কোনো হসপিটালেও রাখতে পারতো। মনে জমা প্রশ্ন টুকু পল্লব করেই বসলো — আপনাদের তো টাকার অভাব নেই, তাহলে নিজের ভাইকে এমন একটা জায়গায় রাখার কারন কি মিষ্টার মির্জা? আপনারা চাইলে উনাকে বিদেশে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করাতে পারতেন।
,,, বিহান ঠোঁট বাকিয়ে সুক্ষ হাসতে চাইলো পরক্ষনেই আবার চোখ ভিজে উঠলো, সে হালকা ভাঙা কন্ঠেই বললো– বহু চেষ্টা করেছি, সম্ভব হয়নি। সেসব বিরাট কাহিনি, আগে ভিতরে চলুন তারপর বলছি সবটা।
,,,চার দেয়ালের একটা শ্যাতশ্যাতে রুমের মেঝেতে হাটু ভাজ করে আছে একটা লোক, তার চুল গুলো বেশ লম্বা আর প্রচন্ড ঝট পাকানো,, দূর থেকেই বুঝা যাচ্ছিলো বহুদিন এই চুল কেউ ছুয়েও দেখেনি। পরনে একটা ছাই রঙা ময়লা টিশার্ট, পিছনের অনেক গুলো যায়গা টুকরো টুকরো হয়ে ছিড়ে আছে,, নিচে বোধয় ট্রাউজার পরা দেয়ালের দিকে ফিরে থাকার দরুন পোসাকটা পুরোপুরি বুঝা যাচ্ছেনা। লোকটা দেয়ালে কি যেনো আকিবুকি করছে,, অর্পনা গাড়ো দৃষ্টিতে পুরো ঘরটা স্কেন করলো, একটা রুমের তো চারটা দেয়াল থাকে,, সেই চারো দেওয়ালে কিসব যেনো লেখা, সন্ধার নরম আলোয় তেমন কিছুই বুঝা যাচ্ছেনা। বিহান এগিয়ে গিয়ে টিমটিমে লাল আলোর বাতিটা জ্বালিয়ে দিলো। পুরো রুমে আলো জ্বলে উঠতেই চমকে উঠলো অর্পনা, লোকটা যেখানে বসে আছে তার ঠিক সামনেই খুব বড়ো করে তার ছবি আকা। ছবিটা কোনো শিল্পের রং তুলি দিয়ে আকা শিল্প কর্ম নয়,, এটা এক প্রেমিক পুরুষের ভালোবাসার পরশ দিয়ে আকা প্রেম চিত্র। অর্পনার সাথে সাথে ইরা, পল্লব, রাত্রি, অরুন ও অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো।
এটা তো অর্পনার ছবি, তারমানে বিহান ঠিকি বলেছিলো? অর্পনা আর পারুর মাঝে তেমন কোনো তফাৎ নেই? সবাই একবার অর্পনাকে দেখছে আরেকবার ঐ ছবিটা। এটা কিভাবে সম্ভব? এমন মিল শুধু জমজ বোনদের মাঝে পাওয়া যায় কিন্তু অর্পনা আর পারুর বয়সের তো চার বছরের ডিফারেন্স। সেইম এইজ ও যদি হতো, তাতে কি? পারু হচ্ছে হামিদ হোসেনের মেয়ে আর অর্পনা হচ্ছে আরশাদ জামানের মেয়ে। দুজন দু মেরুর মানুষ,, এতোটা মিল আল্লাহ কেনোই বা দিলেন? আর ঐ ডাইরিটা? ঐ ডাইরিটা অর্পনা কেনো পেলো? অন্য কেউ ও তো পেতে পারতো। এতো বছরেও কেউ কেনো পেলোনা?
না না, এটা তেমন আহামরি কোনো বিষয় নয়,, কারন গত ১৫ বছর ধরে লাইব্রারির বই এক্সচেঞ্জ করা হয়না। ওরা যেহেতু বইয়ের লিস্ট করতে গিয়েছে তাহলে তো ওরাই পাবে,, অন্য কেউ লিস্ট করলে নিশ্চয়ই অন্য কেউ ই পেতো? অর্পনা নিজের আলোকে গড়া পারুর ছবিটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো,, তার কেমন যেনো অনুভুত হচ্ছে,, নিজেকে দায়ি মনে হচ্ছে,, কেনো হচ্ছে এমন, সে নিজেও জানেনা। ওর মনটা হুট করেই ঐ ছবির মেয়েটাকে নিজের সাথে গুলিয়ে ফেলছে,, পারুর জায়গায় নিজেকে রাখতে চাচ্ছে,, অর্পনা কি তবে নিজেকে দ্বীপের প্রেমিকা রুপে ভাবতে চাচ্ছে? শেষ ভাবনাটা মনে আসতেই সম্ভিত ফিরলো অর্পনার। সে এসব কি ভাবছে? এসব অবান্তর ভাবনা গুলোকে অবান্তর হিসেবে ঘোষণা করে পুরো ঘরটা স্কেন করলো। ঘরের প্রতিটি কোনায় কোনায়,, পারু, পারু আর পারু। নামের ফাকে ফাকে কিছু বড়ো লেখাও আছে,, যেমন,,,
“” নিষ্ঠুর মায়াবতী, তর মায়ার চেয়ে অধীক যন্ত্রণা সৃতিতে লুকিয়ে “”
“” আমার অবাধ্য প্রেমিকা, আমার হলোনা,, আমাদের সংসার হলোনা,, ভালোবাসা হলো তবে ভালো থাকা হলোনা। “”
“‘ তুই বেইমান পারু, আমার সাথে বেইমানি করে পালিয়েছিস””
“‘তুই হীনা একটা জীবন, জাহান্নামের সমান””
“” সে ভালোবাসেনি,,কথা রাখেনি,, অথচ তার কথা রাখতে গিয়ে আমি বিবাগী “””
“”খারাপ পুরুষ ভালো নেই “”
“”অবাধ্য তুই, বড্ড অবাধ্য””
“” আমাদের সংসার হলে খুব মন্দ হতো?””
“” ছোট সংসার””
“” সংসার “”
“” পারু, পারু, পারু, পারু,,,,,,,,,,,,,,,,,
,,প্রতিটি লেখার রং কেমন কালচে খয়েরি হয়ে আছে, অর্পনা ধরতে পারলোনা এটা কি দিয়ে লেখা এমনকি পারুর ছবিটার রং ও এমন কালচে খয়েরি রঙের। এমন রং তো তখনি হয় যখন রক্ত শুকিয়ে যায়।তারমানে কি, দ্বীপ? আর ভাবতে চাইলোনা অর্পনা। ভাবতে গেলেও তার কষ্ট হচ্ছে,, এতোটা কষ্ট তার কখনো অনুভুত হয়নি,, কারোর জন্য না,, শুধু একবার হয়েছিলো তাও ঐ বেইমান মহিলার জন্য। তারপর আর কারোর জন্য এমন হয়নি, তাহলে দ্বীপের জন্য এতো কষ্ট হওয়ার কারন কি? শুধু মাত্র ওর চেহারাটা পারুর মতো দেখতে বলে? জানা নেই তার,, অর্পনা যখন গভির ভাবনায় নিমোজ্জিত তখনি একটা স্টিলের গ্লাস ছুটে এসে অর্পনার কপাল বরাবর লাগলো,, ব্যাথাতুর শব্দ করে কপাল চেপে ধরলো মেয়েটা,, ইরা তারাহুরো করে অর্পনাকে আগলে নিলো। গ্লাস লাগার ফলে কপালের কিছুটা অংশ কেটে গিয়েছে,, সেখান থেকে হালকা রক্ত ও বেড়িয়েছে বোধয়। কিন্তু সেসবে মন নেই অর্পনার, সে তাকিয়ে আছে সেই লোকের পানে। অগোছালো চুল দাড়ির ফাকে স্নিগ্ধ মুখ খানায় কেমন ময়লার আস্তরন পরে আছে, দেখে মনে হচ্ছল কতোদিন ঐ মুখে পানির ঝাপটা পরেনা। বিড়াল চোখা নয়ন দুটোতে যেনো মোহমায়া কাজ করে,, পারু ঠিকি বলেছিলো, ঐ চোখে যে একবার চোখ রাখবে সে সাথে সাথে হিবনোটাইস্ট হয়ে যাবে,, অর্পনা কপালের ব্যাথা যন্ত্রণাকে ভুলে এক দৃষ্টিতে দ্বীপের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো,,
,,,শ্যাতশ্যাতে অন্ধকার ঘরে আকষ্মিক আলো জ্বলে উঠায় বিরক্ত হলো দ্বীপ, সে কল্পনায় মায়ের সাথে কথা বলছিলো,, হাজারটা অভিযোগ করছিলো অবাধ্য প্রেমিকার নামে,, মা শুধু চুপচাপ শুনে, তাকে কিছুই বলেন। সে মাত্রই মায়ের কাছে জানতে চাচ্ছিলো,, পারু আবার কখন আসবে? কতোদিন হয়ে গেলো আসছেনা কেনো? মা মাত্রই জবাব দিচ্ছিলো তখনি লাইট জ্বলে উঠায় ,, সহ্য করতে না পেরে আলো জ্বালানো অধীকারির দিকে গ্লাসটা ছুড়ে মেরেছে,, পিছন থেকে অনেক গুলো মানুষের আনাগোনা টের পেয়ে ভয়ে ভয়ে ফিরে তাকালো দ্বীপ। তাহলে কি তাকে আবারও এখান থেকে নিয়ে যেতে এসেছে? কিন্তু সে তো যাবেনা, পারু আছে এখানে,, সে পারুর কাছে থাকবে। ভয়ে, রাগে, জিদ্দে পাশে থাকা স্টিলের প্লেট টা সবার উদ্দেশ্য ছুড়ে মারতে নিতেই চোখের সামনে পারুকে দেখে বোকার মতো তাকিয়ে রইলো। পরপরি কিছু একটা মনে হতেই রেগে গেলো, তেড়ে গেলো পারুর দিকে,,
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২১
,,,দ্বীপ তেড়ে এসে অর্পনাকে ইরার থেকে টেনে নিয়ে গোছালো চুলগুলো খামচে ধরলো। চুলের ব্যাথায় ককিয়ে উঠলো অর্পনা। ওর ২২ বছরের জীবনে কেউ কখনো আঘাত করেনি,, তবে এমন নয় যে সে আঘাত পায়নি। যতটা আঘাত পেয়েছে সবটা নিজে থেকে করা। হঠাৎ অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে আঘাত পেয়ে চুলের ব্যাথায় মুখ চোখ লাল হয়ে উঠলো। অর্পনা ব্যাথায় ককিয়ে উঠে বললো — হোয়াট্স হেপেন্ড? লিভ মাই হেয়ার!! ওফ্ফ!! ছারেন দ্বীপ, ব্যাথা পাচ্ছি। আল্লাহ!!
