Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২১

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২১

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২১
রুপান্জলি

রাত্রি ডাইরির পাতা উল্টাচ্ছে আর চোখ মুচছে, ক্ষনে ক্ষনে নাক ও টানছে,, ওর কান্না থামাতে ইরা ডাইরিটা কেরে নিতে চাইলে রাত্রি চোখ পাকিয়ে শাসালো। ইশারায় বুঝালো সে এই ডাইরি পড়েই ক্ষান্ত হবে,, যতো কষ্টই হোক, যতো কান্নাই পাক,, সে পারু আর দ্বীপকে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পড়বেই। ওর জেদ দেখে ইরা আর মাথা ঘামালো না। অর্পনা ফ্রন্ট মিররে তাকিয়ে একবার রাত্রি, ইরা আর পল্লবকে দেখে নিলো ওরা তিনজন গাড়ির বেক সিটে বসে আছে,, আর তার পাশের সিটে বসে আছে অরুন। পিছনের সিটে আপাতত রাত্রির কান্নার শব্দ ব্যাতিত কিছুই শুনা যাচ্ছেনা। এমন নয় যে শুধু রাত্রি একাই ডাইরিটা পড়ছে, না!! যাত্রাপথে অরুন, ইরা আর পল্লব তিনজনেই ডাইরিটা পড়েছে। ওরা শক্ত মনের অধীকারি হওয়ায় এতো কষ্টের মোমেন্ট গুলো পড়ার পরেও তাদের চোখে পানি আসেনি,, কিন্তু রাত্রির ব্যাপারটা আলাদা,, মেয়েটা যতই নিজেকে শক্ত প্রমান করতে চাকনা কেনো? একটু কষ্ট পেলেই মেয়েটা আবেগি হয়ে যায়, কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। অর্পনা গাড়ি ড্রাইভ করতে ইরার উদ্দেশ্যে বললো —

,,,থাক, নিসনা ডাইরিটা। পড়তে চাচ্ছে যখন পড়ুক, না পড়লে পরে আফসোস থেকে যাবে।
,, ইরা চোখের ইশারায় শায় জানিয়ে উড়না দিয়ে রাত্রির চোখ মুছে দিলো। রাত্রির অবস্থা দেখে পল্লব বিরক্তিসুচক শব্দ তুলে বললো — মানলাম কাহিনীটা খুব কষ্টের, তার জন্য এরকম ফ্যাচ ফ্যাচ করে কাদতে হবে কেনো? অযথা চোখের পানি খরচ করাটা বোধহয় একমাত্র মেয়ে মানুষের দ্বারাই সম্ভব।
,,, অরুন হাতের বইটা ক্ষনিকের জন্য বন্ধ করে মিররের মাধ্যমে রাত্রির দিকে তাকালো,, কেনো যেনো রাগ হলো অরুনের। সে কপালে তিনটে ভাজ ফেলে চোখ বাকিয়ে বললো– সব মেয়েরা এক না। ইরা আর অর্পন ও তো মেয়ে মানুষ। কই ওরা তো কাদছেনা? সবি ঢং, কিছু কিছু মেয়েদের ঢং দেখলে মেজাজ খারাপ হয়।
,,, অরুণের কথাটা কর্নকূহর হতেই ওর দিকে তাকালো রাত্রি,,পরপর নাক টেনে কান্না ভেজা কন্ঠে বললো— সবার সাথে আমার তুলনা দিতে হবে কেনো? আমি জানি আমি খারাপ,, তদের সমাজে চলার জন্য যোগ্য না। আমার ঢং যখন এতোটাই বিরক্ত লাগে তখন দেখিস না। কানে তুলো গুজে বসে থাক আর চোখে কালো চসমা লাগা। খবরদার!! আমার দিকে ভুলেও তাকাবিনা, আমার মতো মেয়েদের দেখলে তদের চোখে ছাইনি পরে যাবে।

,,,অরুন গাড়ো দৃষ্টিতে রাত্রির দিকেই তাকিয়ে ছিলো,, মেয়েটার চোখ মুখ জুড়ে অজানা অভিমান। ঐ অভিমানের কারন শতো খুজেও বের করতে পারলো না অরুন। কাল সারা রাত ভাবলো, গত দিনে সে কি করেছে? কার সাথে কি করেছে? খুজে পেলোনা। তার মধ্যে আবারও রাত্রির মুখে কালকের মতো খোচা মারা কথা শুনে রাগ হলো অরুনের। সে রাগে চোখ মুখ শক্ত করে বললো– তকে আমি একবার খারাপ বলেছি? কাল থেকে কি শুরু করে দিয়েছিস রাত? আমার সাথে ঢং করা বাদে তর কি আর কোনো কাজ নেই?

,,, অরুনের এহেন কথায় রাত্রি চোখ উচিয়ে আয়নায় তাকালো,, আয়নার মাধ্যমে দুজনের চোখাচোখি হতেই রাত্রির চোখ থেকে দু ফোটা পানি গড়ালো, সাথে সাথে চোখ মুছে ডাইরির দিকে নজর দিলো রাত্রি। অরুনের কেনো যেনো মনে হলো লাস্ট দু ফোটা পানি অরুনের নামেই ছিলো,, ওর সাথে অভিমান করেই ঐ দু ফোটা পানি ঝরিয়েছে রাত্রি। অরুনের বিরক্তি আরও বাড়লো, হাতে থাকা বইটা গাড়ির ডেসবোর্ডে ছুড়ে মারলো। পরপর কানে ব্লুতুথ চাপলো,, এই ফ্যাচ ফ্যাচ কান্না তার শুনতে মন চাচ্ছেনা। কোথাকার না কোথাকার প্রেমিক প্রেমিকা, পড়ছিস ভালো করে পড়,,এখানে এতো কাদার কি হলো? দ্বীপ আর পারুর জন্য মায়া তো তারো হচ্ছে,, তাই বলে কি অরুন কেদেছে নাকি? সে শুরুতেই এই মেয়েকে ফ্রেন্ড লিস্টে এড করতে চায়নি। নেহাতি অর্পনা জোর করে ওকে তাদের সাথে জড়িয়েছে নয়তো ওদের মতো মানুষের সাথে এই ফ্যাচফ্যাচানিকে মানায়না। বেয়াদব মেয়ে একটা,, কিছু হলেই খালি কাদবে, বিরক্তিকর!!

,,,রাত্রি ডাইরিতে নজর দিলেও বই ফেলার শব্দ হতেই আবারও অরুনের দিকে তাকালো,, অরুনকে কানে ব্লুতুথ চাপতে দেখে ভাবলো ওর কান্নার জন্য অরুনের পড়ায় অসুবিধা হচ্ছে। তাই চোখ মুছে ডাইরিটা অফ করে দিয়ে ঝানালায় মাথা হেলিয়ে দিয়ে ইরার উদ্দেশ্যে বললো — ইরা!! আমি ডাইরি অফ করে দিয়েছি, আর কান্নার শব্দ হবেনা। যার পড়ালেখা করার আছে তাকে পড়তে বল,, আমার জন্য বই ছুড়ে মারতে হবেনা।
,,, কানে ব্লুতুথ চাপলেও এখনো গান স্টার্ট করা হয়নি,, রাত্রির কথাটা কানে যেতেই দাতে দাত চেপে একটা হিট সং প্লে করলো অরুন। এই মেয়ের দিকে আর তাকাবে না সে ,, কান্না কাটি করুক,, অভিমান করুক,, মুখ ভার করে বসে থাকুক,, যা খুশি তাই করুক,, সে আর দেখতেও যাবেনা।

,,,ওদের মান অভিমানের পালা দেখে মুখ বাকালো পল্লব,, পাশে বসে থাকা ইরার কানের কাচে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো — এই বিধবা নারী, এদের মধ্যে কি চলেরে? আমার মনে হয় ডালমে কুচ কালা। নয়তো সারাদিন এমন জামাই বউয়ের মতো ঝগড়া করে কেনো?
,, বিধবা ডাক শুনে রাগ হলেও অরুন আর রাত্রির কথা ভেবে ঠোঁট টিপে হাসলো ইরা , পরপর সেও ফিসফিস করে বললো — আমারো মনে হয়, এদের দুজনের মধ্যে কিছু একটা চলছে। হয়তো ওরা বুঝতে পারছেনা নয়তো একে অপরের কাছে স্বীকার করতে চাচ্ছেনা। তবে দেখিস, বেশিদিন চেপে রাখতে পারবেনা,, একদিন না একদিন ঠিক মুখ ফসকে বলে দিবে।
,,, ইরার কথায় মাথা ঝাকালো পল্লব, তার মন ও একি কথা বলে। আর নিজে থেকে স্বীকার না করলেও সমস্যা নেই, ওসব সামলানোর জন্য পল্লব আছে তো!! দুটোকে এমন টাইট দিবে, একদম বাপ বাপ করে মনের কথা বাহিরে চলে আসবে।

,,,,,১৩ তলার একটা প্রস্বস্থ বিল্ডিং এর সামনে এসে গাড়ি থামালো অর্পনা, গেইটের দিকে চোখ পরতেই দেখলো সেখানে বড়ো বড়ো করে লেখা “” <– পার্কিং লট ওদিকে “” অর্পনা ঠোট কামরে কিছু একটা ভেবে বাকা হাসলো। ঘাড় ত্যারামি করে একদম গেইটের সামনে গাড়িটি রেখে ডোর খুলে বেড়িয়ে এলো। অর্পনাকে বেরুতে দেখে বাকি চারজন ও বেড়িয়ে এলো। অর্পনার মনোভাব বুঝতে পেরে সবাই গাড়ির বিষয়টাকে পাত্তা না দিয়ে ওর সাথে গেইটের দিকে এগিয়ে গেলো। গেইটের সামনে যেতেই সিকিউরিটি এজেন্ট আটকে দিলো ওদের। পরিচয় জানতে চাইলে অর্পনা আরশাদ জামানের সাইন করা একটা কাগজ দেখালো। আরশাদ জামানের সাইনের পাশাপাশি শাহিন মির্জার সাইন দেখে কাগজ খানা না পড়েই ওদের ঢুকতে দিলো। রিসেভশনে যাওয়ার পরেও সেইম কেইস। রিসেপশনিস্টকে কাগজটা দেখাতেই তিনি অফিসের ক্যারানিকে ডেকে ওদেরকে চেয়ারম্যানের রুমে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিলেন। অগত্যা ক্যারানির দেখানো পথে এগিয়ে গেলো পাঁচ জন, উদ্দেশ্য পারু আর দ্বীপের শেষটা জানা।

,,, আহাদ মাত্রই বিহানের ক্যাবিন থেকে বের হয়েছে,, উদ্দেশ্য ক্যান্টিনে গিয়ে কিছু একটা খাওয়া। সকালে একটা ইম্পর্ট্যান্ট মিটিং ছিলো,, বিহানের পি এ হওয়ার দরুন তাকেও সকাল সকাল চলে আসতে হয়েছে যার ফলে সকালের নাস্তা করা হয়নি। ক্যাবিন থেকে বেরিয়ে সামনে তাকাতেই পা যুগল থমকে গেলো। সে যেনো নিজের চোখকোই বিশ্বাস করতে পারছেনা,, এটা কিভাবে হতে পারে? আহাদ অবাক চোখে দূর থেকে আসা রমনি আর তার পিছনে থাকা চার যুবক যুবতীকে দেখতে লাগলো,,

,,, সময়টা শীতের শুরুতে হওয়ায় অর্পনা লুস জিন্সের সাথে সফ্ট সুয়েটার আর তার উপরে হাটু সমান লং শার্ট পরেছে। শার্টের বোতাম গুলো খোলা থাকায় হাটার তালে তালে সেটা একটু একটু করে উড়ছে। অর্ধেকটা চুল উপর থেকে ঝুটি করা আর বাকিটা ছেড়ে রাখা, তার পাশাপাশি হাটছে অরুন সেও সফ্ট সুয়েটারের উপর বোতাম খোলা শার্ট পরেছে,, পল্লবের ও সেইম ড্রেস। ইরা সেই চিরোচারিত সাদা রঙের সালোয়ার স্যুট আর সফ্ট সুয়েটার ,,রাত্রির পরনে টপ্স আর ব্লাক ডেনিম। এখানে মুখ্য বিষয়টা তাদের পোশাক আশাক নয়,,মুখ্য হচ্ছে তাদের এটিটিউড,, পাঁচজন এমন ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে যেনো তারা একেক দেশের একেকজন প্রধান মন্ত্রী। আশেপাশে কে আছে না আছে সেটা দেখার প্রয়োজন ই মনে করছেনা,, সেই সাথে পাঁচ জনকে দেখতেও অসম্ভব সুন্দর লাগছে। যার ফলে অফিসের ম্যাক্সিমাম এমপ্লয় ওদের দিকেই তাকিয়ে আছে। আহাদ আর দাড়িয়ে থাকতে পারলোনা। যেই তরে বিহানের ক্যাবিন থেকে বেড়িয়েছিলো তার অধীক তরে দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলো। তার চোখে মুখে উচ্ছাসের সাথে ক্ষিনো ভয়ের ও আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আহাদের এরুপ অবস্থা দেখে চোখ তুলে তাকালো বিহান,, পরপর ভ্রু গুটিয়ে জিজ্ঞেস করলো — কি হয়েছে আহাদ? খেতে না গিয়ে ফিরে এলি কেনো? আর এরকম হাসফাস করার কারন কি?

,,, আহাদ উচ্ছাস আর ভয়ের সংমিশ্রণে কিছুটা ভাঙা কন্ঠেই আওড়ালো — ভ,ভাবি এসেছে।
,,,আহাদের কথায় হালকা হাসলো বিহান,,পরপর আবারও কাজে মনোযোগ দিয়ে বললো — এতে এমন করার কি হলো? মেধা তো প্রায়সই আসে,, তুই ও না আহাদ। যাহ! গিয়ে খেয়ে আয়, আর তর ভাবিকে বল খাবার নিয়ে যেনো সোজা চেম্বারে চলে আসে,, এখানেই খেয়ে নিবো।
,,বিহানের কথাটা আহাদের মনপুত হলো না। সে দ্রুত মাথা ঝাকিয়ে নাকোচ করে বললো — মেধা ভাবি না, পারু ভাবি এসেছে।
,,, আহাদের কথায় যেনো বর্ষার আকাশের তিব্র বাজ খানা বিহানের কানের পাশেই পরলো। বিহান তিব্র উত্তেজনায় উঠে দাড়িয়ে অবাক কন্ঠে বললো — হোয়াট? হাউ ইজ দিস পসিবল ইয়ার? পারু এখানে আসবে কি করে? মাথা খারাপ তর? কি আবল তাবল বকছিস?

,,, আহাদ দ্রুত মাথা ঝাকিয়ে সিরিয়াস কন্ঠে বললো — ট্রাস্ট মি ভাই, বাহিরে গিয়ে দেখ,, সাথে চারজন ছেলে মেয়ে নিয়ে সত্যি ই পা,,
,,,আহাদের কথা শেষ হওয়ার আগেই দরজার ওপাশ থেকে একটা সুমিষ্ট কন্ঠ ধেয়ে এলো। — মে আই কাম ইন? মি. বিহান!!
,,,কন্ঠটা চিকন, সুস্রি, মধুময় হলেও কথার ধাচে কিছু একটা ছিলো। উৎসুক বিহান, আহাদের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে চকিতে দরজার পানে তাকালো। তখন আহাদ হন্তদন্ত হয়ে ঢুকার ফলে দরজাটা আদ খোলাই পরেছিলো,, সেই আদ খোলা দরজায় অনাকাঙ্ক্ষিত ভঙ্গিমায় অনাকাঙ্ক্ষিত মানবীর চেহারা দেখে বড্ড অবাক হলো বিহান। এটা কিভাবে সম্ভব? একটা মেয়ে হুবহু পারুর মতো দেখতে? এটা কি কোনো মেজিক? কিভাবে হতে পারে এটা? বিহান অস্ফুট স্বরেই আওড়ালো — প,পারু!!
,, অর্পনা শুনলোনা সেই ডাক,, দুজন লোককে এভাবে আহাম্মকের মতো তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে অর্পনা বিরক্তিতে কপাল কুচকালো পরপর আরেকটু কঠোর কন্ঠে বললো– পারমিশন দিবেন নাকি নিজে নিজে ঢুকে পরবো? আমার হাতে কিন্তু আগে থেকেই পারমিশন পেপার রয়েছে,, তাই আপাতত রং ঢং করতে পারছিনা।

,,,মেয়েটার ব্যাবহার দেখে ভ্রু কুচকালো বিহান,, এটা যে পারু নয় সেটা এই মেয়ের আচরনেই বুঝা যায়। পারু কোনোদিনি এরকম বেয়ারার মতো কথা বলতো না। এই মেয়েটা সম্পূর্ন পারুর বীপরিত মুখি, বাট একটা মেয়ে হুবহু পারুর মতো দেখতে, বিষয়টা বড্ড ভাবনার। তাহলে কি সত্যি ই দুনিয়াতে সাতজন মানুষের চেহারা একই রকম হয়? কি জানি? আল্লাহ মালুম। বিহান নিজের অবাকতা কাটিয়ে সহজ হলো, পরপর কিছুটা গম্ভীর কন্ঠে বললো — আপনি কে? আমার কাছে আসার কারন?
,,, অর্পনা পারমিশন না নিয়েই ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে বললো — আমার পাপ্পা ডিটেকটিভ আরশাদ জামান, গতকাল আপনার পাপ্পার সাথে আমার পাপ্পার কথা হয়েছিলো। হোয়াট এভার, আপনার পাপ্পা আপনাকে কিছু বলেনি?
,,,আরশাদ জামান নামটা শুনে বিহান ঠোঁট প্রশারিত করে সামান্য হাসলো,, পরপর সহজ কন্ঠে বললো — আপনি মিস.অর্পনা, রাইট? আব্বু বলেছিলেন আপনাদের কথা। তো, আপনার ফ্রেন্ডরা কোথায়? তাদের দেখতে পাচ্ছি না যে?

,,, ফ্রেন্ডদের খোজ করতেই পল্লব ভিতর ঢুকে অর্পনার পিছন থেকে উকি দিয়ে বললো — আমরা এখানে।
,,,পল্লবের গদগদ ভাব দেখে অর্পনা কনুই দিয়ে পল্লবের পেটে গুতো মেরে শক্ত কন্ঠে বললো– হেংলা।
,,,পল্লব নাক কুচকালো,, পরপর বিহানের পারমিশনের পরোয়া না করেই সবাইকে ইশারায় ভিতরে আসতে বললো। অগত্যা তিনজনেই ভিতরে ঢুকে এলো। বিহান ওদের সৌজন্যতার সাথে বসতে বলে আহাদের দিকে তাকিয়ে বললো — আহাদ!! তুই বরং কিছু খেয়ে আয়, আর ওদের জন্য কফি পাঠাতে বলিস।
,,, আহাদ আহাম্মকের মতো একবার অর্পনাকে দেখছে তো আরেকবার বিহানকে। পারুর মতো হুবহু দেখতে একটা মেয়েকে দেখার পরেও বিহান এতোটা সহজ আছে কি করে? বিহানের মনে কি কোনো প্রশ্ন জাগছেনা? আহাদের মাথা কাজ করছেনা। আপাতত সে এখান থেকে গিয়ে এক কাপ গাড়ো কফি পান করবে। কফি খেলে যদি মাথাটা একটু হালকা হয়। অগত্যা বাহিরের দিকে পা বাড়ালো আহাদ। ওকে যেতে দেখো নিজের সিটে বসে পরলো বিহান,, অর্পনা একদম বিহানের মুখোমুখি বসেছে, তার ডানপাশে ইরা আর অরুন,,, বাপ পাশে পল্লব আর রাত্রি । বিহান নিরব চোখে পাঁচ মানব মানবিকে দেখলো পরপর অর্পনার চোখের দিকে তাকিয়ে সোজা সাপ্টা প্রশ্ন করলো — মিস.অর্পনা!! আপনার ফেইসটা আমি একটু মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে পারি? আপনার অনুমতি পেলে করবো নয়তো না।

,,, বিহানের এহেন কথায় ভ্রু কুচকালো অরুন, হালকা রাগি কন্ঠে সুধালো — কেনো? ওর ফেইস পর্যবেক্ষণ করবেন কেনো? আজব!!
,,,অরুনের রিয়্যাক্ট দেখে বিহান ঠোট বাকিয়ে হেসে বললো— সরি, আমাকে ক্যারেক্টারল্যাস এর লিস্টে ফেলে দিবেন না প্লিজ!! আমার ওয়াইফ আছে। আর আমি আমার ওয়াইফকে খুব ভালোবাসি। আসলে, মিস.অর্পনার ফেইসটা আমার খুব কাছের একজন মানুষের সাথে মিলে যায়। তাই উনার চেহারা পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে চাচ্ছিলাম, আদেও কি দুজনার মাঝে কোনো তফাৎ আছে? নাকি তারা একে অপরের কপি প্যাস্ট।
,,, বিহানের কথা শুনে রাত্রির চোখ জোড়া চকচক করে উঠলো, সে হাসি হাসি মুখ করে উচ্ছাস ভরা কন্ঠে বললো– সিরিয়াসলি? কে উনি? আপনার ওয়াইফ নাকি?
,,, বিহান মাথা ঝাকিয়ে নিষেধ করে বললো — না না!! ও আমার বোন, মানে আমার ভইয়ের ওয়াইফ।
,,, কথাটা বলতে গিয়ে বিহানের কন্ঠটা হালকা কাপলো, সেই কাপন টুকুই অর্পনার ব্রেইনকে সচল করে দিলো। সে সহসাই প্রশ্ন করে বসলো — মেয়েটা কি পারু?
,,, অর্পনার মুখে পারুর নাম শুনে অবাক হলো বিহান,, অর্পনা কি তবে পারুকে চিনে? আচ্ছা!! কোনো ভাবে ওরা আত্মীয় নয়তো? হতেও পারে,, চেহারা যেহেতু এক, কিছু না কিছু কানেকশন থাকতেই পারে। সেসব ভেবেই বিহান উচ্ছাস নিয়ে প্রশ্ন করলো — পারুকে আপনি চিনেন? আপনারা কি পরিচিত? মানে কোনো সম্পর্ক আছে দুজনার?

,,, অর্পনা কিছু বললো না,, বিহানের দিক থেকে চোখ সরিয়ে রাত্রির দিকে তাকিয়ে ইশারা করতেই রাত্রি ডাইরিটা অর্পনার দিকে এগিয়ে দিলো। অর্পনা ডাইরিটা নিয়ে বিহানের সামনে টেবিলের উপর রাখতেই বিহানের চোখ জোড়া ছলছল করে উঠলো। খপ করে ডাইরিটা নিজের কাছে নিয়ে তাতে হাত ভুলিয়ে বললো — এটা? এটা কতো খুজলাম,, পেলামনা। আপনারা কোথায় পেলেন? কোথায় ছিলো এটা? ইসস!! কতো পুরোনো হয়ে গিয়েছে ডাইরিটা, অতচ এটা আমার আগলে রাখার কথা ছিলো।
,,, ইরা অতিবো শান্ত কন্ঠে বললো — আমরা এটা লাইব্রারির শেষ প্রান্ত থেকে পেয়েছি। পাওয়ার পর দ্বীপ পারুর অনুমতি না নিয়েই পুরোটা পড়ে ফেলেছি,, পড়ার পর শেষ পাতায় গিয়ে দেখি সেখানে তাদের শেষটা লেখা নেই। আমরা দ্বীপ পারুর শেষটা জানতে এসেছি, সেদিন কি দ্বীপ পারু লাইব্রারিতে গিয়েছিলো? যাওয়ার পর কি হয়েছে? পারু কি মারা গিয়েছে? মারা গেলেও, কতোদিন পর মারা গিয়েছে? দ্বীপ এখন কেমন আছে? সে কি পারুকে দেওয়া কথা রাখতে এখোনো বুকে কষ্ট চেপে বেচে আছে? দ্বীপ পারুর প্রেমের সৃতি কি দ্বীপ এখনো একা একা বয়ে যাচ্ছে? নাকি তারো মুক্তি মিলেছে?

,,,এটুকু বলে ইরা উৎসুক দৃষ্টিতে বিহানের দিকে তাকালো,, বিহানের মুখটা মলিন,,অর্পনা সেটা খেয়াল করে তপ্ত শ্বাস ফেলে বললো — আর এই সকল প্রশ্নের উত্তর একমাত্র আপনার কাছেই আছে,, হয়তো আপনার বাবা চাচার কাছেও এর উত্তর পাওয়া যাবে। কিন্তু তাদের সাথে এ বিষয়ে আলোচনায় বসাটা মানানসই হবে বলে মনে হয়না। সেজন্যই আপনার নিকটবর্তী হওয়া।
,,,, এপর্যায়ে বিহান একটু বাকা হাসলো, সোজা অর্পনার দিকে নজর তাক করে বললো– এর বিনিময়ে আমি কি পাবো? আমাকে কি দিবেন?
,,,,অর্পনা এবার শব্দ করে হাসলো,, টেবিলের উপরে থাকা ছোট পাথরটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বললো — বিনিময়? দেনাপাওনা? এই কথাটা আপনার ভাইয়ের থেকে শিখেছেন বুঝি? আপনার ভাই মাঝেমধ্যেই পারুর কাছে এমন বিনিময় চাইতো,, লেনদেন স্বরুপ হাজারটা বাহানা জুরে দিতো। পারু সেসব পুরন করতে না চাইলে গ্লাস ভেঙে খুন করার হুমকি দিয়ে সেটা হাসিল করে নিতো। আপনার ভাইয়ের চরিত্রটা বেশ ইন্টারেস্টিং, আই লাইক ইট!!
,,,,বিহান মুচকি হেসে বললো– আমার জীবনের বেশিভাগ শিক্ষাই আমি জোহানের থেকে পেয়েছি,, তার মধ্যে এই দেনা পাওনাটাও ওর থেকেই শিখা। এবার বলুন, আমি ওদের শেষটা বললে আপনারা আমাকে কি দিবেন?
,,,, কি চাই আপনার? ( অরুন)
,,, যা চাই তাই পাবো?

,,, বলুন দেখি কি চান ? টাকা পয়সা তো চাবেন বলে মনে হয়না। আল্লাহ আপনাদের ভালোই দিয়েছেন, যদিও লাস্ট ফাইভ ইয়ার্সে টুকটাক ডাওন খেয়েছেন,, আশা করি সেসব ব্যাপার না। ( পল্লব)
,,,বিহান মাথা ঝাকিয়ে শায় জানালো, সত্যি ই সেসব ব্যাপার না। তারা এখন সব ছেড়ে ছুড়ে শুধু একটা একাউন্ট থেকে টাকা নিয়ে জীবন পরিচালনা করতে শুরু করলেও আরো ১৭- ১৮ গুষ্টি পায়ের উপর পা তুলে খেতে পারবে। আরো তো কতো কতো একাউন্ট এমনি পরে রয়েছে,, সেসব হিসাব করতে গেলেও লাখ খানিক লোককে কাজে লাগাতে হবে, জাস্ট এমাউন্ট হিসেব করার জন্য। ( সব চাপা, লেখতে তো আর টাকা লাগেনা, তাই লিখে দিলাম) বিহানকে শায় জানাতে দেখে অর্পনা বললো — তাহলে বলুন, কি চাই আপনার?
,,,, এখন আপাতত কিছুই চাইনা, তবে চাওয়াটা পেন্ডিং এ থাক। আমার কেনো যেনো মনে হচ্ছে, আমাদের আবারও দেখা হবে, হয়তো বারবার দেখা হবে তখন নাহয় সময় সুযোগ বুঝে চেয়ে নিবো।
,,, অর্পনা ঠোট চেপে মাথা ঝাকালো,, থাক তবে পেন্ডিং এ, সময় সুযোগ বুঝে সেও দিয়ে দিবে। এমনিতে দেনা পাওনায় বেশ পরিপক্ক অর্পনা। কারোর থেকে কিছু নিলে অবস্যই তাকে কিছু বিতে হয়। চাইলেও দিতে হয় আর না চাইলে জোর করে দিতে হয়। সেসব ভেবে অর্পনা গভীর শ্বাস ফেলে বললো — ওকে!! এবার বলুন, পারু কোথায়? দ্বীপ কোথায়? কি হয়েছিলো শেষ পর্যায়ে?

,,,, বিহান চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ালো, কিছুটা হেটে ফ্লোর পর্যন্ত টানা ঝানালার পাশে গিয়ে দাড়িয়ে উদাস কন্ঠে বললো– এমনি এমনি বলা অসম্ভব ,, সবটা জানতে হলে আপনাদেরকে একটা জায়গায় যেতে হবে। সেখানে গেলেই সবটা খোলাসা হয়ে যাবে, যাবেন? রাজি থাকলে বলুন, আমরা এখোনি বের হবো।
,,, বিহানের কথার তালে প্রশ্ন করলো পল্লব– কোথায় এটা? যেতে কতোটা সময় লাগবে? কাছেই নাকি দূরে?
,,ইট্স অ্যা লং জার্নি, কম করে ৭ – ৮ ঘন্টার ব্যাপার।
,,, অরুন কিছুটা সন্দেহি কন্ঠে বললো– জানতে হলে ওখানেই যেতে হবে কেনো? আপনি আছেন, আমরাও আছি, তাহলে এখানে বলতে প্রবলেম কোথায়?

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২০

,,, বিহান ওদের দিকে তাকিয়ে শক্ত কন্ঠে বললো— জানতে হলে ওখানেই যেতে হবে, এবার আপনারা জাবেন নাকি জাবেন না সেটা আপনাদের ব্যাপার। অতিরিক্ত কথা কিন্তু আমিও অপছন্দ করি।
,,, বিহানের শক্ত কন্ঠ শুনে অর্পনার রাগ হলো, তবুও আপাতত এটাকে এভোয়েট করবে সে। এই মুহুর্তে দ্বীপ, পারুর বিষয়টা জানা খুব ইম্পর্ট্যান্ট। সে জানেনা, তার কাছে কেনো এটা এতো ইম্পর্ট্যান্ট হয়ে দাড়ালো। ওর মন হুট করেই ওদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে গেলো,, আর আকৃষ্ট দমিয়ে রাখার মতো মেয়ে অর্পনা নয়, সে জানবে, সবটা জানবে,, জেনেই ছাড়বে।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ২২