অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২০
তোনিমা খান
বিগত দিনের অভিজ্ঞতায় বাবা আর ছেলে আজ আর কোনো ভুল করল না। তানশান মাথায় গেঁথে নিয়েছে, পরিবারের সাথে সদ্য যুক্ত হওয়া মানুষটা তার ও দায়িত্ব। যেই দায়িত্ব এখন পদে পদে প্রকাশ পায়। গাড়ির দরজা খুলতে না পারা রূপকথার প্রয়োজন পড়ে না দরজাটি খোলার। ছোট্ট ছেলেটি নিজেই দরজা খুলে দেয়। রূপকথা তখন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।
নারী অভিমানের স্বীকার তপোবন ও আজ আর ভুল করেনি। বরং স্ত্রী সন্তানের আগে সে তৈরি হয়ে বসেছে তাদের ড্রপ করার জন্য। কলেজের সামনে গাড়ি থামতেই তানশান বেরিয়ে যায়। পরপর রূপকথা ও গাড়ি থেকে নামলে, গাড়িতে থাকা তপোবন তার পানে তাকায়। জানালা থেকে মাথা বের করে আক্ষেপ জড়িত কণ্ঠে বলে,
–“গতকাল কত অভিমান দেখালে? আর আজ নিজে এসে ড্রপ করেছি একটা মিষ্টি করে ধন্যবাদ তো প্রাপ্য আমার। রূপকথার পরীরা এত নির্দয় কেন?”
রূপকথা প্রশ্নবিদ্ধ নয়নে তাকায় তার দিকে। তপোবন স্ত্রীর আপাদমস্তক দেখে। অন্তঃস্থল প্রহসনে মত্ত হয় কলেজ ড্রেস পড়া নিজের স্ত্রীকে দেখে। সাদা হিজাব, সাদা ইউনিফর্ম সাথে সাদা স্নিকার্স পড়া ছোট্ট একটি মেয়ে। ভাগ্য অদ্ভুত! আর সেই অদ্ভুত ভাগ্যের জোরেই মেয়েটি তার স্ত্রী। রূপকথা এগিয়ে এসে নম্র কণ্ঠে বলে,
–“ধন্যবাদ! নিজের খেয়াল রাখবেন।”
তপোবন স্মিত হেসে বলে,
–“যাও, দেরি হয়ে যাচ্ছে। কোনো সমস্যা হলে আমায় ফোন করবে। ফোন এনেছো না?”
রূপকথা হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ে। তপোবন বলল,
–“সাইলেন্ট করে রাখবে।”
রূপকথা মাথা নেড়ে পা বাড়ায়। অদূরে গেটের কাছে তানশান দাঁড়িয়ে। যেতে যেতেও রূপকথা আবার ছুটে আসে তপোবনের কাছে। উৎকণ্ঠা নিয়ে জিজ্ঞাসা করে,
–“আপনি কি নিতে আসবেন না?”
মেয়েটির চোখেমুখে স্পষ্ট গতদিনের বাজে ঘটনার ভয়ের রেশ। তপোবন তাকে আশ্বস্ত করে বলল।
–“আসব, আমিই নিতে আসব।”, রূপকথার মুখে হাসি ফুটে উঠলো তার কথায়।
–“আমরা অপেক্ষা করব।”
বলেই রূপকথা দ্রুত কদমে তানশানের কাছে যায়। সে যেতেই তানশান পা চালায়। রূপকথা কিছুটা কৌতূহলী হয় তানশানকে নিজের সাথে নিজের ক্লাসের ভবনের দিকে যেতে দেখে। সে কৌতূহলী গলায় শুধায়,
–“তোমার ক্লাস তো অন্য ভবনে, তুমি এখানে কোথায় যাচ্ছ?”
–“আপনাকে আপনার ক্লাসে পৌঁছে দিয়ে আমি আমার ক্লাসে যাব।”, তানশান হাঁটতে হাঁটতে জবাব দেয়।
–“প্রয়োজন নেই, আমি একাই যেতে পারব। তুমি চলে যেতে পারো।”, রূপকথা ইতস্তত করে বলল।
–“বেশি কথা না বলে তাড়াতাড়ি চলুন। ক্লাসের টাইম হয়ে গিয়েছে।”, তানশান গম্ভীর গলায় বলল। রূপকথা আর কিছু বলল না। তানশান রূপকথাকে পৌঁছে দিয়ে নিজের ক্লাসে যায়।
ভরা ক্লাসরুমে নিজেকে বড়োই একা মনে হয় রূপকথার। এত এত শহুরে চঞ্চল মেয়েদের মাঝে নিজেকে নিয়ে ভীষণ হীনমন্যতায় ভোগে। তবে তার হীনমন্যতায় আজ খানিক বিঘ্ন ঘটলো। সবার শেষ বেঞ্চে বসা রূপকথার দুইপাশে হুড়মুড়িয়ে দুইজন মেয়ে বসতেই রূপকথা হকচকায়। অচেনা ক্লাস ফিলো দেখে গম্ভীর মুখে বসে রইল সে। পাশের দু’জন ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলছে। দেরি হয়ে গিয়েছে তাদের।
নূর আর নৈমি ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলে একে অপরের দিকে তাকালে মধ্যমনি ব্যাঘাত ঘটালো। তারা রূপকথার আপাদমস্তক দেখে সমস্বরে শুধায়,
–“তুমি বিবাহিত?”
রূপকথা নিজের ডানে বামে তাকায়। উৎসুক বড় বড় দুটি নেত্র সে থমথমে মুখে বলল,
–“হ্যাঁ।”
মেয়ে দু’টো একপ্রকার হামলে পড়ে তার হাত আঁকড়ে ধরে উল্লাসে ফেটে পড়ে বলল,
–“তুমি তো আমাদের বেস্ট ফ্রেন্ড!”
–“অদ্ভুত! আমি তো তোমাদের চিনিই না।”, রূপকথা অবাক কণ্ঠে বলল। নূর আর নৈমি গাল ভরে হেসে বলল,
–“আরে তুমিও বিবাহিত আমরাও বিবাহিত—তাই আমরা বেস্ট ফ্রেন্ড।”
–“কি অদ্ভুত লজিক!”, রূপকথা থমথমে মুখে বলল। নৈমি চঞ্চল কণ্ঠে বলল,
–“আমিও নূরকে চিনতাম না জানো। যখন দেখলাম পুরো ক্লাসে আমি আর নূর-ই কেবল বিবাহিত তখন আমরা বন্ধু হয়ে গিয়েছি। আজ আমাদের দলে আরেকজন যোগ হয়েছে, ভেবেই আমার খুব ভালো লাগছে।”
নৈমি রূপকথার হাত আঁকড়ে ধরে বলল। রূপকথা কপাল কুঁচকে শুধায়,
–“তোমরা কি করে বুঝলে আমি বিবাহিত?”
–“সিম্পল! তোমার হাতে চুড়ি, নাকে নথ।”, নূর চমৎকার হেসে বলল। রূপকথা নীরব রইল। শাশুড়ি অলংকার ব্যতীত ঘরের বউদের দেখতেই পারেন না। এর জন্যই তপোবন তাকে সবসময় পড়ার জন্য ছোট ছোট কিছু অলংকার কিনে দিয়েছে। যেগুলো পড়লে অতিরঞ্জিত ও লাগবে না, আর নির্জনা বেগমের আদেশ ও মান্য করা হবে।
–“আমার বর ব্যাংকার আর নূরের বর টিচার। তোমার বর কি করে?”
রূপকথা ভাবুক হলো। সে ঠিক করে জানে না তপোবন কি করে। শুনেছে বিশাল কোম্পানি রয়েছে
সে বলল,
–“কিছু একটা করে।”
–“হ্যাঁ? তুমি জানো না?”
–“ঠিক করে জানি না।”,
–“বিয়ে হয়েছে কতদিন?”
–“পনেরো দিন।”
–“তো বরের সাথে কথা হয় না?”
–“হয় একটু একটু।”
–“একটু একটু কেন?”
–“আমি তো আমার বরের মাথা চিবিয়ে খাই।”, নূর পিটপিট করে চেয়ে বলল। নৈমি ভীষণ গম্ভীর গলায় বলল,
–“তারমানে তোমাদের মধ্যে কোনো গড়বড় আছে, তাই না?”
রূপকথা নাকোচ করে কিছু বলতে গেলেই ক্লাস টিচারের নজর পড়ে গেল। টিচার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলে ডেকে উঠল,
–“এই মেয়ে! দাঁড়াও।”
রূপকথা হকচকিয়ে উঠে দাঁড়ায়। টিচার রাগান্বিত স্বরে শুধায়,
–“কি হচ্ছে ওখানে? কি কথা বলছিলে?”
নূর আর নৈমি চুপসে গেল। রূপকথা মিনমিনে স্বরে বলল,
–“ও কিছু জিজ্ঞেস করেছি স্যার। দুঃখিত, আর হবে না।”
টিচার তার কথায় ভ্রুক্ষেপ করল না বরং হোয়াইট বোর্ডের দিকে নির্দেশ করে কঠোর গলায় বলল,
–“এখানে এসো আর এই ম্যাথটা সলভ করো। ক্লাসে এসে যখন কথা বলো তখন তো তোমরা সবজান্তা। এসো!”
রূপকথা অসহায় দৃষ্টিতে তাকায়। সে তো গতকাল ই প্রথম কলেজে এসেছে। এই ম্যাথ তো সে পায়নি। সে বিনম্র সুরে বলল,
–“স্যার, আমি গতকালকেই প্রথম এসেছি। এই ম্যাথগুলো আমি পাইনি।”
এহেন অযুহাতে টিচার দ্বিগুণ ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল,
–“লেইম এক্সকিউজ! এইসব অজূহাত এখানে দেবে না। এখানকার প্রত্যেককে শুধু আমি রুলস বলে দিয়েছি তারা এখন সব পারে। কিন্তু তোমরা তো পারবে না। ক্লাসে আসো শুধু গাল গল্প করতে।”
পরপরই চোয়াল শক্ত করে বলে,
—”তোমরা তিনজনই বিবাহিত, তাই না? ক্লাসে পড়তে আসো না, আসো সংসারের গল্প করতে। সংসার যখনই করবে, তখন ক্লাসে আসো কেন? তোমাদের জন্য আর পাঁচটা স্টুডেন্টদের ও মনোযোগ নষ্ট হয়। তোমাদের জন্য ঘরে বসে খুনতি নাড়াই বেশ মানায়! বইখাতা তোমাদের হাতে মানায় না—চুলোর পাশে দাঁড়িয়ে তরকারিতে লবণ কমবেশি হচ্ছে কি না, সেটাই দেখা দরকার!”
তার গলায় ঘৃণা, ব্যঙ্গ আর শ্রেণিবোধের ঠান্ডা বিদ্রূপ। নূর আর নৈমি চোখ নামিয়ে ফেলে, রূপকথা স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। চোখ তার টলটল করছে অপমান আর লাঞ্ছনায়। টিচার রাগ দমিয়ে ঠান্ডা গলায় বলে,
—”বিয়ে করেছো তো ভালো কথা, কিন্তু ছাত্রীর পরিচয়টা ভুলে যাও কেন? সংসার সামলাতে গিয়ে যদি পড়াশোনা ভুলে যাও, তাহলে এখানে আসার মানে কী?”
নিস্তব্ধ হয়ে যায় পুরো ক্লাসরুম। রূপকথা ধীরস্থির বসে পড়ে। চুড়ির ক্ষীণ ঝুনঝুনি যেন মুহুর্তটিকে আরো ব্যঙ্গাত্মক করে তুললো। নূর আর নৈমি টলটলে নেত্রের রূপকথাকে কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারল না। টিচার ক্লাস থেকে যেতেই তারা অনুতপ্ত হয়ে স্থবির রূপকথার হাত আঁকড়ে ধরে বলল,
–“তুমি আমাদের কষ্ট পেয়েছ? আমরা স্যরি, আমাদের তোমায় বকা খাওয়ানোর ইচ্ছা ছিল না। ক্ষমা করে দাও!”
রূপকথা টলটলে নেত্র তুলে তাকায়। মৃদু হেসে বলল,
–“তোমাদের কোনো দোষ নেই। আমার পরিস্থিতিটাই এমন—যে পারছে কথা শুনিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কেউ জানতে চায় না কেন আমি এই পরিস্থিতিতে রয়েছি।”
বলেই সে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে যায়। অন্য ক্লাসে এখন আইসিটি ক্লাস হবে।
আজও বারোটা নাগাদ তানশান আর রূপকথার ছুটি হয়ে গিয়েছে। রূপকথা বিমর্ষ মুখে ক্লাস থেকে বের হতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল মনোমুগ্ধকর এক অপেক্ষারত গম্ভীর মুখশ্রী। রূপকথার বিমর্ষতায় খানিক মুগ্ধতা ছুঁয়ে যায়। সে এগিয়ে আসতেই তানশান গম্ভীর মুখে নিরুত্তর চলতে শুরু করল।
সময়ের আগেই স্ত্রী সন্তানের প্রতিষ্ঠানের সামনে গাড়ি নিয়ে বসে থাকা তপোবনের গম্ভীর মুখশ্রীতে অদৃশ্য হাসির উজ্জ্বলতা বাড়াতে লাগলো ছেলে আর স্ত্রীকে একসাথে বের হতে দেখে। হয়তো তাদের বাস্তবতা খুবই জটিল, বেমানান কিন্তু তারা চাইলেই তা সহজ করতে পারে।
ঠিক যেমনটা সে সহজ করে তুলছে তানশান আর রূপকথার সম্পর্কটা। মা-ছেলে হওয়ার প্রয়োজন নেই তারা একে অপরের সহপাঠী হোক, একে অপরের বন্ধু হোক!
তানশান গাড়ির কাছে এসেই পেছনের দরজা খুলে দাড়িয়ে রইল। ঐ ক্ষুদ্র খেয়ালটুকু রূপকথাকে আরেক দফা মুগ্ধ করে। তানশান দরজা আঁটকে নিজেও ফ্রন্ট সিটে বসে পড়ে। তপোবন মৃদু হেসে ঘর্মাক্ত স্ত্রী সন্তানের দিকে দু’টো জুসের বোতল এগিয়ে দিলো।
–“ঠান্ডা ঠান্ডা খেয়ে নাও এনার্জি পাবে।”
রূপকথা থমথমে জুসের বোতলটা হাতে নেয়। ভদ্রলোক তাকেও তানশানের মতো ট্রিট করে। অদ্ভুত! সে ছোট নাকি?
অফিসের চরম ব্যস্ততা রেখে তপোবন স্ত্রী সন্তানকে নিতে এসেছিল। তাই তাদের ড্রপ করেই সে আবার অফিসে ছুটলো।
রূপকথা বসার ঘরে ঢুকতেই জড়তা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলো শাশুড়ির তীক্ষ্ণ চাহনি দেখে।
নির্জনা বেগম ক্ষুব্ধ দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। কুশিকাটা চালাতে চালাতে বিলাপের সুরে বলল,
–” ঘরের মেজো বউ সংসারের জন্য নিজের অসুস্থতা, মেয়ে রেখে দিনরাত খাটে, আর ঘরের বড় বউ কলেজ ড্রেস পড়ে নাচতে নাচতে কলেজে যায়। বাহ্! আমার ঘরটাকে সার্কাস বানিয়ে রেখেছে!”
সকাল থেকে এমনিতেই রূপকথার মস্তিষ্ক থম মেরে ছিল টিচারের কটুক্তিতে। আবার শাশুড়ির এমন কটুক্তি শুনে তার অন্তঃস্থল ভেঙে পড়ে। বিরূপ এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য শক্তি খুঁজে পেলো না ছোট্ট মেয়েটি। দ্রুত কদমে উপরে গিয়ে নিজের ঘরে ঢুকতেই টলটলে নেত্র অশ্রু ছেড়ে দিলো।
বেশ খানিকক্ষণ অবুঝের ন্যায় কেঁদে রূপকথা নোনাজলগুলো মুছে নেয়। তাকে যে এখনো অনেক বড় হতে হবে, বুঝদ্বার হতে হবে। এত অল্পতেই যদি কেঁদে ভাসায় তবে—যে এই কঠিন পথে সে নিজকে দাঁড় করাতে পারবে না।
কলেজ ড্রেস ছেড়ে শাড়ি পড়ে ভারী ভারী গহনাগুলো পড়ে নেয় রূপকথা। থমথমে মুখে মেকি হাসি ফুটিয়ে নিচে চলে আসে। রান্নাঘরে ঢুকতেই মৌনতা ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
–“কথা, এসে পড়েছ? ক্লাস কেমন হলো?”
–“ভালো ছিল ভাবি। আপনি এখন বিশ্রাম নিন ভাবি, বাকি কাজ আমি করছি।”
রূপকথার কথায় মৌনতা মৃদু হেসে বলল,
–“কাজ সব শেষ, কথা। আমি জানতাম তুমি আসলেই আম্মা কাজে পাঠাবে তাই সব আগে আগে শেষ করে ফেলেছি। এখন শুধু রান্নাঘর গুছিয়ে তরকারি গুলো নামালেই হয়ে যাবে। তুমি ক্লান্ত নিশ্চয়ই? টেবিলে ফল কেটে রেখেছি নিজেও খাও আর তানশানকেও দাও।”
রূপকথা ছলছল নেত্রে তাকায় তার পানে। এসেছে থেকে এই মানুষটা তার মাথায় সংসারের ভার পড়তেই দেয় না। সে ধিমি কণ্ঠে বলল,
–“ধন্যবাদ ভাবি।”
মৌনতার ব্যস্ততা ম্লান হয় মেয়েটির মলিন মুখ দেখে। এগিয়ে এসে মাথায় হাত রেখে বলল,
–“নিজের জীবন থেকে শিখেছি কারোর জন্য কোনোকিছু ত্যাগ করতে নেই। তাই তোমায় কোনোকিছুর জন্য তোমার স্বপ্নগুলো ত্যাগ করতে দেবো না। ভাবি যতদিন বেঁচে আছি, ততদিন নিশ্চিন্তে থাকো। সংসারের ভার তোমার উপর এত সহজে পড়তে দেবো না।”
–“এমন কথা কেন বলছেন? আপনার কি শরীর বেশি খারাপ?”
–“শরীরের থেকে ভেতরটা বেশি অসুস্থ! এর ওষুধ কোথায় পাবো বলতো?”, মৌনতার মলিন কণ্ঠে রূপকথা অবুঝের ন্যায় চেয়ে রইল। মানুষটা কখনো ভেতরের চাপা কষ্ট বলে না কাউকে। অথচ চোখেমুখে রাজ্যের ক্লেশ!
বয়সের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দৈহিক কমজোরি। উর্ধ্বশ্বাস, পায়ের গিঁটে গিঁটে ব্যথা, একটু হাঁটলেই শরীর আর পেরে ওঠে না। এমনি দিনকাল চলছে নির্জনা বেগমের। হাঁটু চেপে ধরে ধীরপায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এক বুক দম ছাড়লেন তিনি। চারিদিক অবলোকন করতে করতে এগিয়ে চলে। সিলিংয়ের কোনায় কোনায় জমে থাকা মাকড়সার জাল দেখে তার মস্তিষ্ক চিড়বিড়িয়ে উঠলো রাগে। দাঁতে দাঁত চেপে করিডরে সাজিয়ে রাখা ফুলদানি, শো পিস ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখতে লাগলো। এক ইঞ্চি পরিমান ধুলো জমে আছে তাতে। সে আর চুপ থাকতে পারলো না। গলা উঁচিয়ে হাঁক ছাড়ল,
–”জবা? এই জবা? মাজেদা? এদিকে এসো তো? এগুলো কি পরিষ্কার করো? এত খচ্চর মানুষ হয়? এগুলো কি তোমাদের কারোর চোখে বাঁধে না?”
নির্জনা বেগম চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বললেন। জবা আর মাজেদা ছুটতে ছুটতে আসে উপরে। সতর্ক দৃষ্টিতে তাকায় তারা। এই বড় চাচি প্রচুর খুঁতখুঁতে। খুঁত না থাকলেও কোত্থেকে যেন সে খুঁত বের করবেই। নির্জনা বেগম সব দেখিয়ে বলল,
–”এগুলো কি? এখানে কি মানুষ থাকে না-কি গরু ছাগল? কোনো ভদ্র মানুষের ঘর এমন থাকে? তোমরা চোখ কোথায় রেখে কাজ করো? এত গুলো মানুষ অথচ কারোর চোখে এগুলো পড়েনি?”
মাজেদা বিলম্বহীন তেজি কন্ঠে বলল,
–”বড় ভবিজান আমার তো মাজায় কি ব্যথা তা তো আফনে জানেন। আমি না পারলে উফরে উঠি না। তাই আমি জবারে পই পই কইরা বলছি এইসব কাজ যেন খেয়াল কইরা করে। যা কওয়ার ওরে কন।”
জবা দাঁত কিড়মিড় করে তাকায় মাজেদা চাচির দিকে। সে কি কম কাজ করে? ঘরে সব মানুষের কাজের কি অভাব আছে? সারাদিন এদিক ওদিক, উপর নিচ করতে করতে তার দিন পার হয়ে যায়। আর এদিকে খেয়াল দেয়া হয়নি। নির্জনা বেগম একদফা বকাঝকা করলো জবাকে। জবা চুপচাপ শুনলো সেসব। নির্জনা বেগম রাগ ঝেড়ে পা বাড়ায় আর বলে,
–”এখনি এইসব পরিষ্কার করবি।”
জবা সাথে সাথে ছুটলো ঝাড়ু মোছা আনতে। নির্জনা বেগম ধীরপায়ে হেঁটে এরোজের ঘরে ঢুকলেন। উটকো বিশ্রী গন্ধ এসে নাকে ঠেকলো না দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন সে। সে এগিয়ে গিয়ে একে একে সে বারান্দার পর্দা সরিয়ে দরজা খুলে দিয়ে, জানালা গুলোও খুলে দিলো। পুরো রুম আলোকিত হয়ে যায়।
সে ধীরস্থির গিয়ে বসলো একদম ঘুমন্ত এরোজের পাশে। মুখ ফুলিয়ে ঘুমাচ্ছে, ফর্সাভাব যেন আরো সুস্পষ্ট। সে ম্লান হেসে হাত গলিয়ে দেয় অযত্নে বৃদ্ধি পাওয়া রুক্ষ চুলগুলোতে। এই তিন ছেলের মা হয়ে ওঠার যাত্রাটি সহজ ছিলো না। এই যাত্রার সবচেয়ে বড় বাঁধা ছিল একটি সম্পর্ক, সেটা হলো সৎ মা। সে একজন সৎ মা। সমাজ এবং সমাজের মানুষগুলোর তিক্ত অভিজ্ঞতা, আর কটুক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সে ধীরে ধীরে সৎ মা থেকে মা হয়ে উঠেছে। কত দূর্ব্যবহারের স্বীকার হয়েছে এরোজের থেকে। সে তার মা নয়! তার মাকে এনে দাও। তুমি এইঘরে কেন থাকছো? বেরিয়ে যাও।
খাওয়াতে গেলেও তা ছুঁড়ে ফেলত। এভাবেই কতকিছু সহ্য করে সে এরোজের ও মা হয়ে উঠেছে সে। ঠিক পনেরো বছর বয়সে এরোজ তাকে মা বলে ডাকে। তারপর থেকে তাকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। এরোজের প্রিয় হয়ে ওঠে সে। ভেঙে যাওয়া সিকদার পরিবারটিকে সহ তিনজনের জীবনটা সে সফল ভাবে গুছিয়ে উঠেছিল। কিন্তু এই পরিবারটির উপর যেন কারোর কুনজর লেগে গিয়েছে। ভালোথাকা যেন এই পরিবারটির জন্য স্থায়ি হতে পারে না। পুনরায় এক ঝড় আঁছড়ে পড়লো আর তাতে কেড়ে নিলো তার বড় বউমাকে।
পুনরায় পরিবারটি বিক্ষিপ্ত হয়ে গেলো। পালাক্রমে কেড়ে নিলো তার আরো এক ছেলের ভালোথাকা। বহুকষ্টে পাওয়া এই সন্তানগুলো তার জন্য অমূল্য। এই সন্তানদের দুঃখ সে দেখতে পারে না। যাদের ভালো থাকার জন্য নিজের শখ, আহ্লাদ সব বিসর্জন দিয়েছে তাদের দুঃখ সে কিভাবে সহ্য করবে? সেই কতো বছর আগে ছেলেটির প্রাণখোলা হাসি, রসিকতাপূর্ণ আহ্লাদ মাখা কথা শুনেছিল। মনে পড়ে বছর ছয় আগের কথা।
আ্যরোনটিকাল ইঞ্জিনিয়ার হলেও এরোজের মন গেঁথে যায় সে পাইলট হবে। সেই ইচ্ছা থেকেই ঠিক দুই বছর ট্রেনিং এর পর সেদিন দ্বিতীয় বারের মতো ফ্লাই করছিল এরোজ। বাংলাদেশ টু দুবাই। ফ্লাইটে ওঠার আগে তাকে ফোন দেয়। আর ফোন দিয়েই উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে,
–”আম্মা, আর কিছুক্ষণ পরে আমি ফ্লাইটে উঠব। দোয়া করবে। এবার এসেই তোমার জন্য একটা বউমা আনব, আম্মা। তোমার বয়স হয়েছে না? তোমায় এত কাজ করতে হয়, সেটা দেখতে আমার খুব খারাপ লাগে বুঝেছো? এমনিতে কিন্তু আমার বিয়ে টিয়ে করার কোনো ইচ্ছা নেই। শুধু তোমার জন্যই আমি বিয়ে করব।”
নির্জনা বেগম রাগি দৃষ্টিতে তাকায় ছেলের দিকে। মেকি রাগন্বিত স্বরে বলল,
–”আমার জন্য তাই না? বড় ভাই এখনো অবিবাহিত, সেখানে আপনি বিয়ে করতে চান তাও আমার জন্য? ভারী ফাজলামো শিখেছেন, তাই না?”
অপরপাশে এরোজ খিকখিক করে হেসে উঠল। উপহাস রেখে দৃঢ় কন্ঠে বলল,
–”আম্মা, তোমার মেজো ছেলে বিয়ে করুক বা না করুক। আমি তো এবার আসলেই বিয়ে করবো। আমি ইনকাম করি, বউ খাওয়াতে পারব। বিয়ে আমার জন্য ফরজ হয়ে গিয়েছে, আম্মা। বড় ভাই, ছোট ভাই কোনো বিষয় না।”
–”হয়েছে হয়েছে বুঝেছি। আমার ছেলে আর আমার নেই। সে অন্য কারোর হয়ে গিয়েছে। তা, কে সে? আমায় দেখাবে না?”, নির্জনা বেগম হাসিমুখে বললেন। এরোজ নাকোচ করে বললেন,
–”না আর কোন দেখাদেখি নেই। যার দেখার সে দেখে নিয়েছে তাতেই হবে। তুমি শুধু গিয়ে তাকে আমার বউ করে আনবে।”
–”আচ্ছা, তাকে কিন্তু সংসারি হতে হবে এরোজ। এই বিষয়ে কিন্তু কোনো ছাড় দেয়া হবে না।”, নির্জনা বেগম গম্ভীর গলায় বললেন। এরোজ আরো প্রবল উচ্ছ্বাসে বলল,
–”সংসারি মানে! সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা, আম্মা। যেমন দেখতে তেমন ব্যবহার। একদম ওয়াইফ ম্যটারিয়াল।”
–”আচ্ছা, আচ্ছা তাহলে তো হলো। তুমি আগে সহিসালামত ভাবে এসো তারপরে দেখাযাবে। এদিকে তোমার ভাইয়ের জন্য ও একটা সুন্দরী, সংসারী কর্মঠ মেয়ে খুঁজে পেয়েছি এরোজ। আগামীকাল দেখতে যাব। ইমরোজের পছন্দ হলে পাকা কথা বলে আসব। তারপর তোমার বিয়েটাও বিনা বাঁধায় দিতে পারব।”
–”তাহলে তো আরো দারুন, আম্মা। তোমার মেজো ছেলের বিয়ে হয়ে গেলে আর কোনো ঝামেলা থাকবে না আমার বিয়ে নিয়ে। দিয়ে দাও ওটাকে বিয়ে। তাহলে একটু ঘরমুখে হবে। নয়তো বাহিরে মুখ দিতে দিতে দেখাযাবে কোনো ফোর টুয়েন্টি মেয়েকে ঘরে তুলেছে।”, এরোজ খোঁচা মেরে বলল। নির্জনা বেগম থমথমে কঠিন দৃষ্টিতে তাকায়। শাসিয়ে বললেন,
–”এরোজ! সবসময় এমন করে কথা বলবে না। বড় ভাই তোমার। সম্মান করে কথা বলবে।”
–”আমার বড় ভাইয়ের আমার মতো চরিত্র হলে মানতাম, আম্মা। সে আমার বড় ভাই নয় বরং তার মায়ের আদর্শ সন্তান।”
এরোজ থমথমে মুখে বলল। দৃষ্টি ইতিমধ্যেই তার সূচালো ধারণ করেছে। নির্জনা বেগম হতাশ হলেন। ছোটবেলা থেকেই এরোজ আর ইমরোজের ভ্রাতৃত্বমূলক সম্পর্কটা নড়বড়ে। এরোজ সর্বদা এড়িয়ে চলে ইমরোজকে। এর কারণ হলো ইমরোজ দেখতে, চাল চলন বাচনভঙ্গিতে একদম তার মায়ের অনুরূপ!
এমনকি যেখানে তাদের তিন ভাই বোনের চোখের রং ধূসর বর্ণের, সেখানে একমাত্র ইমরোজের চোখের রং তার মায়ের অবিকল কালো বর্ণের।
তবে সেটাই বোধহয় এরোজের শেষ ভালোথাকা ছিল। এরপর থেকে আর কখনো এরোজকে ভালো থাকতে দেখেনি কেউ। ইমরোজের বিয়ে হয় তার এক সপ্তাহের মধ্যেই। এরোজ ও ফিরে আসে কিন্তু আর বিয়ের কথা উচ্চারণ করেনি, আর না উচ্চারণ করেছে পছন্দের মানুষটির নাম। জিজ্ঞাসা করলে শুধু বলত,” দুষ্টুমি করেছিলাম, আম্মা। কাউকে পছন্দ করতাম না।”
তবে ছেলে যে মিথ্যা বলত, তা বুঝতে তাদের মাস কয়েক সময় লেগে যায়। যখন ধীরে ধীরে এরোজ উচ্ছৃঙ্খল, ভঙ্গুর হয়ে যেতে লাগলো। জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে লাগলো। আর সেই থেকে আজ পর্যন্ত এভাবেই চলছে। শুরুতে এমন মাদকাসক্ত ছিল না। বছর দুই হলো মাদকাসক্ত হয়। এক দিন কাজ করলে এক সপ্তাহ নেশাগ্রস্ত হয়ে বিদেশের ঘরে পড়ে থাকে।
কানাডায় খালা বাড়ি রয়েছে সেখানেও কখনো যায় না।
এরোজের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়ার মানুষের বড্ডো অভাব! কেউ কখনো জিজ্ঞেস করে না কোথায় কষ্ট হচ্ছে? কেউ জিজ্ঞেস করে না খেয়েছ কি-না, খাইয়ে দেই? সৃষ্টিকর্তার কি দ্বন্দ্ব এরোজের সাথে কে জানে? সেই ছোট্ট বেলা থেকে কেন তার প্রিয় মানুষগুলোকে কেড়ে নেয়? প্রথমে প্রিয় আর পড়ে? তার নাম ও উচ্চারণ করতে পারে না এরোজ!
চুলগুলোতে স্নেহের স্পর্শ অনুভব করতেই এরোজ নিভু নিভু চোখদুটো মেলে তাকায় । মাকে দেখে সে ম্লান হেসে তার হাত টেনে বুকের সাথে আগলে ধরলো। জড়ানো কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে আওড়ায়,
–”আম্মা, তুমি এখানে?”
–”কেন, আমি আমার ছেলের ঘরে আসতে পারব না?”, নির্জনা বেগম মৃদু হেসে শুধায়।
এরোজ মাথা নেড়ে বলল,
–”পারবে, অবশ্যই পারবে।”
নির্জনা বেগম একহাত মাথায় রেখে নম্র কন্ঠে শুধায়,
–”এরকম আর কতদিন এরোজ? এভাবে কে জীবনযাপন করে? নিজের জন্য কোনো চিন্তা নেই মানলাম। কিন্তু বুড়ো এই মা বাবার দিকে তো একটু খেয়াল করবে? বয়স হয়েছে আমাদের। তোমায় এভাবে দেখা আমাদের জন্য শাস্তিস্বরূপ। নায়েল, তানশান বড় হচ্ছে। ঘরের পরিবেশ যদি এমন থাকে তবে ওদের সুষ্ঠবিকাশ হবে কি করে?”
এরোজ সিলিংয়ের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে। মিহি স্বরে বলল,
–“তানশান আর নায়েলের কোনো সমস্যা হবে না আম্মা। আমি তিন মাসের মধ্যেই চলে যাব।”
–“আমি তোমায় এবার আর যেতে দিচ্ছি না, এরোজ। এই অবস্থায় তো একদমই নয়। এই শরীরের অবস্থা! না খেয়ে দেয়ে ওভাবে দূর দেশে একাকী পড়ে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই।”, নির্জনা বেগমের দৃঢ় কণ্ঠে এরোজ নির্নিমেষ চেয়ে বলল,
–“আমার ভেতরটা যন্ত্রণায় তিল তিল করে মরছে, আম্মা। দূরদেশে বসে মরলে যন্ত্রনা একটু কম হবে। কিন্তু এখানে থাকলে আমার মৃত্যুটা ভীষণ কঠিন হয়ে যাবে। জীবন কি কম দুঃখ দেয়? অন্তত মৃত্যুটা সহজ হোক!”
–”এসব কেমন কথা, এরোজ?”, নির্জনা বেগম ধমকে উঠলো। এরোজ ম্লান হাসে মায়ের ধমকে।
–“জানো আম্মা, মাঝেমধ্যে মনে হয় আমার জন্মের কোন মানে নেই আর না আছে জীবনের। সৃষ্টিকর্তা আমার সাথে সবসময় এমন কেন করে বলতো? যাকেই ভালোবাসি তাকেই বিশ্রী ভাবে কেড়ে নেয়। ইদানিং তো আমার প্রিয় মদটাও আমার সঙ্গ ছেড়ে দিচ্ছে। এত খাই নেশাই চড়ে না। এভাবে বেঁচে থেকে কি লাভ বলতো?”
এরোজ বিলাপের সুরে আওড়ায়। নির্জনা বেগম হতবুদ্ধি হয়ে গেলেন। ছেলে যে নিজের মধ্যেই থাকে না। সে আজ ও থমকে আছে জীবনের কোনো এক বিদঘুটে অধ্যায়ে। সে থমথমে মুখে বলল,
–”কোনো মেয়ের জন্য তুমি নিজেকে শেষ করে দেবে? এমন মেয়ের জন্য যে তোমায় ছেড়ে চলে গিয়েছে? পরিবার পরিজনের কোনো মূল্য নেই তোমার কাছে?”
এরোজ স্মিত হাসে। হাসতে হাসতে বলে,
–“সেই কোনো একটা মেয়েকে নিয়ে আমি জীবন মৃত্যুর এক দীর্ঘ যাত্রার স্বপ্ন বুনেছিলাম। রূপকথার গল্পের মতো ছোট্ট একটা ক্যাসকেডে নিজেদের ছোট্ট একটা সংসার গড়ার স্বপ্ন বুনেছিলাম। অথচ দেখো আজ আমি সর্বশূন্য!”
হাসতে হাসতে বলা কথাটিতে কখন যে সুঠামদেহী পুরুষটির নেত্রদ্বয় বাচ্চাদের মতো অশ্রু ছেড়ে দেয় টেরই পেল না। এরোজ সন্তপর্ণে লুকিয়ে ফেলে দুর্বলতাগুলো।
নেশা বোধহয় এখনো চড়ে আছে নয়তো এত কথা কি করে বলে ফেললো। নির্জনা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। সাহস জুগিয়ে সতর্ক কণ্ঠে বললেন,
–”আমি মেয়ে দেখব এরোজ? সংসারী, সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা,ওয়াইফ ম্যটারিয়াল ঠিক যেমনটা তুমি পছন্দ করো?”
এরোজ এতেও হাসলো, জবাব দেয় না। চোখের কোনা রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। ভেতরের এক একটা স্নায়ু ক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে, বিভ্রাট লাগিয়ে দেয়। অশ্রুমাখা নেত্রে চেয়ে হাসিমুখে বলল,
–“বিয়ে, সংসার, ভালোবাসা এগুলো তো বহু আগেই কেউ নিজের নামে করে নিয়েছে, আম্মা। সে আমার না হলেও আমি তার হয়ে থেকে যাব আজীবন। তাকে না পাওয়ার অতৃপ্ততা নিয়ে জীবন কাটাতেও ভীষণ সুখ, আম্মা। আমি ভালো আছি, এভাবেই খুব ভালো আছি।”
দীর্ঘ বাকবিতন্ডা হয় তাদের। ছেলের সাথে না পেরে নির্জনা বেগম চাপা নিঃশ্বাস ফেলে তাড়া দিয়ে বললেন,
–”উঠে পড়ো, এরোজ। দুপুর হয়ে গিয়েছে। আজ সকলে একসাথে দুপুরের খাবার খাবো।”
–”তুমি যাও, আমি আসছি।”, এরোজের নিরুদ্বেগ কণ্ঠ। নির্জনা বেগম বেরিয়ে যায়।
এরোজ বিছানা ছেড়ে আড়মোড়া ভেঙে দাঁড়ায়। ধীরপায়ে হেঁটে যায় স্টাডি টেবিলের দিকে। চেয়ারে বসে একটা ডায়রি বের করে তাতে কলম চালায়। মুহুর্তেই খালি পৃষ্ঠাটি বর্ণে সুসজ্জিত হয়ে উঠল। জমে থাকা কথাগুলো বর্ণ আর পৃষ্ঠার কাছেও বোধহয় হার মানে। এরোজ কলম থামায়। তাকায় বারান্দা ভেদ করে দূরপানে। কেমন দিক দিশাহারা দৃষ্টির গন্তব্য! বিরবির করে আওড়ায়,
–“পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ রয়েছে যাদের সাথে থাকা ক্ষণকালের অনুভূতি আমাদের সারাজীবন তাড়া করে বেড়ায়। আর কিছু মানুষ থাকে যাদের উপস্থিতি আমাদের নিত্যসঙ্গী হলেও তাদের কখনো মনে পড়েনা। কিন্তু আমি বারংবার এমন অনন্য মানুষের সান্নিধ্যেই কেন যাই?”
রুলস রেগুলেশন, খিদে সব চাহিদার উর্ধ্বে গিয়ে এরোজের উদাসীন জীবন ই বেশি প্রাধান্য পায়। আজও ব্যতিক্রম হলো না।
ভরদুপুরে না খেয়েই গোসল করে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছে সে।
এই দৃশ্যে চকচে দৃষ্টি ফেলে জবা ছুটে যায় নির্জনা বেগমের ঘরে। চঞ্চল কণ্ঠে বলল,
–“চাচি, এরোজ ভাইজানের ঘর মেলা আউলা ঝাউলা আর অপরিষ্কার। গুছাইয়া দেই?”
–“তা আবার আমায় জিজ্ঞেস করতে হবে?”, নির্জনা বেগমের রুক্ষ কণ্ঠে জবা বলল,
–“ভাইজান তো তালা দিয়া ঘর থিকা বাইর হয় চাচি। চাবি তো আমার কাছে নাই।”
–“ওর ঘরের আরেকটা চাবি আমার কাছে আছে। নিয়ে তাড়াতাড়ি পরিষ্কার কর। কোনা কোনা পরিষ্কার করবি যেন কোনো দুর্গন্ধ না আসে।”
–“একদম! আফনে চাবি দেন।”
জবা চাবি নিয়ে বিশ্বজয়ের হাসি নিয়ে ছুটলো। কোনোরকম ঘরটা গুছিয়ূ ঝাড়ু দিয়ে মূল উদ্দেশ্য হাসিল করে বেরিয়ে আসে।
রান্নাঘরের দেয়ালে সেঁটে হাঁফাচ্ছে জবা। মৌনতা, রূপকথা, রোজ আর মাজেদা কোমড়ে হাত দিয়ে তাকিয়ে আছে তার পানে। মৌনতা গমগমে স্বরে শুধায়,
“কি করেছিস জবা সত্যি করে বলবি।”
জবার কাঁচুমাচু ভাব উবে যায়। সে প্রফুল্ল চিত্তে হেসে অতিরঞ্জিত কণ্ঠে বলল,
–”আইজ কিন্তু রিস্ক হুদাহুদি নেইনাই, ভাবিজান। আইজকা নিজের পরান বাজি রাইখা আমি এমন জিনিস উদ্ধার করছি, যা দিয়া আমরা ছোডো ভাইজানের এই সন্ন্যাসী রূপের রহস্য ভেদ করতে পারুম।”
সহসা সকলের মুখ থেকে রাগি রাগি ভাব সরে যায়। ভর করে আগ্রহ। রোজ আর মাজেদা চাচি ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করে,
–”এই কি উদ্বার করেছো? সেদিনকার মতো হেয়ার ক্লিপ নিয়ে আসছ নাকি? দেখো আজ যদি কোনো ফালতু জিনিস নিয়ে ভাব দেখিয়েছো না? তবে খবর আছে!”
–”আরে না না। আইজ ঝাঁকানাকা জিনিস উদ্বার করছি। আইজ তো জাইনাই ছাড়ুম কেডা ছোডো ভাইজানের ভালোবাসার মানুষ!”, বলেই জবা লাজুক হাসল। এইসব ভালোবাসা নিয়ে কথা বলতে তার লজ্জা করে।
সকলে উৎসুক জনতার ন্যায় তাকিয়ে আছে জবার দিকে। জবা কামিজের নিচ থেকে একটা কিছু বের করতেই রোজ মুখ বিকৃত করে নেয়। জবা একটি নোটবুক বের করে সেটি মুখের সামনে তুলে ধরে।
–”এই দেখছেন? এইহানেই আছে ভাইজানের ভালোবাসার মানুষের নাম। সেইদিন এইডা পড়তে যাইয়াই এরোজ ভাইজান আমার জান নেওয়ার জন্য ক্ষেপছিল। তারমানে এইডা গুরুত্বপূর্ণ!”
রোজ একপ্রকার ছিনিয়ে নেয় নোটবুকটি। মৌনতা, রূপকথা, মাজেদা আর জবা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে উঁকি দিয়ে তাকায় নোটবুকটির দিকে। প্রথম পৃষ্ঠা খুলে রোজ জোরে জোরে পড়তে শুরু করলো কিছু গোটা গোটা অক্ষরের বুনন।
❝ক্ষণপরিচিত আমারা! এই ক্ষণকালের পরিচয়ে কখনো আমাদের কথা হয় নি, অনুভূতির লেনাদেনা হয় নি, প্রেম হয় নি তবুও এই ক্ষণপরিচিত আপনিটা আমি হয়ে রয়ে গেলে কেন? এই আমিটাতে আমি নিজেকে খুঁজে পাই না। আমি আপনাকে ভালোবাসি! কতটা ভালোবাসি এটা তখন অনুভব করতে পারলাম যখন আপনি আমার জন্য নিষিদ্ধ হয়ে গেলেন। দেখুন আজ কত বর্ষ কাটিয়ে ফেললাম আপনাকে ছাড়া। অথচ নিজেকে হারিয়ে ফেললাম তবুও আপনাকে ভুলতে পারলাম না। আপনি কেন এতো শক্তিশালী, ক্ষণিকা?❞
একনাগারে এতোটুকু পড়ে রোজ থামলো। উপস্থিত সকলে একে অপরের দিকে গোল গোল চাহনিতে তাকায়। অতঃপর সকলের নাসারন্ধ্র থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। মৌনতা হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে চুলোর তরকারি দেখতে লাগলো। রূপকথাও মিটিমিটি হাসছে। রোজ ক্ষেপে গিয়ে বললো,
–”জবা আপা? কোথায় তোমার ভাইজানের ভালোবাসার মানুষের নাম? ক্ষণিকা? এটা তো কোনো নাম-ই না।”
জবা ডাগর ডাগর চাহনি ফেলে হড়বড়িয়ে বললো,
–”আফনের কি চোখে সমস্যা আফা? আরো যে পৃষ্ঠা আছে সেইগুলি পড়বেন না?”
রোজ আড়চোখে তাকায়। সে পৃষ্ঠা উল্টিয়ে দ্বিতীয় পৃষ্ঠা বের করে। সকলের কান পুনরায় সচকিত হয়।
❝নিজের জন্য বধূসাজে আপনাকে দেখার আকাঙ্ক্ষায় ব্যাকুল আমার, সকল ব্যাকুলতা ম্লান হয়ে যায় আপনাকে অন্য কারোর বধূসাজে দেখে। কি নিদারুণ যন্ত্রনা! আমি আপনার সেই মোহনীয় রূপ আজও ভুলতে পারি না। চোখ বুঝলেই হাহাকার জুড়ে দেয় অন্তরাল—আপনি আমার নষ। অথচ আমি আপনাকে নিয়ে শেষ নিঃশ্বাস অব্দি ভেবে নিয়েছি।❞
সকলের উৎসুক মুখশ্রী ম্লান হয়ে যায় এতটুকু পড়ে। ভালোবাসার মানুষটিকে না পাওয়ার বেদনায় বিমর্ষ হয়ে গেল রূপকথা, মৌনতা, জবা আর মাজেদার মুখ। মাজেদা বিলাপের সুরে বলে উঠল,
–“দেখলা কি ভালোডাই না বাসতো!”
বিমর্ষ রূপ নিয়েই রোজ পরের পৃষ্ঠা উল্টায়,
❝আমি শূন্য বক্ষে আপনি কারোর বক্ষতলে। ভালোবাসা নামক পাপের শাস্তি ঠিক এতটাই যন্ত্রণাদ্বায়ক ছিল আমার জন্য।❞
রোজ পরবর্তী পৃষ্ঠা উল্টায়। এবং পুনরায় নিভন্ত কণ্ঠে পড়তে শুরু করে,
❝…….কাক ডাকা ভোরে অপেক্ষা করতাম কখন আপনি এক গোছা চুল খুলে রেখে বারান্দায় আসবেন। আর আমি মুগ্ধ হয়ে দেখবো। আপনি কি জানেন, আমি যেখানেই যাই না কেন সবসময় সেখান থেকে চুলের ব্যান্ড আর চিরুনি কিনতাম। আমার কাবার্ডের দু’টো ড্রয়ার ভরে গিয়েছে এগুলো কিনতে কিনতে। কত সুন্দর সুন্দর বো ক্লিপ কিনেছি! আমি প্রহর গুনছিলাম কখন ঐ চুলগুলো ছোঁয়ার, যত্ন করে নিজের কেনা বো ক্লিপগুলো আপনাকে পড়িয়ে দেয়ার অধিকার পাবো। কিন্তু দেখুন আমার অপেক্ষারা ফুরায় না। কেননা এগুলোকে আপনার চুলে দেখতে পাওয়া আমার জন্য এখন দুঃস্বপ্ন! এমনি এক কাকডাকা ভোরে তোমায় যেদিন ভেজা চুলে দেখলাম, আমার চোখ ঝলসে গেল। মনে হয় যেনো প্রানটা এখুনি বের হয়ে যাবে কিন্তু সেখানেও সৃষ্টিকর্তার নারাজি। সে আমায় মরতে দেবে না এতো সহজে, তোমায় ভুলতে দেবে না এতো সহজে। শক্তিশালী নেশা দ্রব্যও আমায় আপনার ভাবনা থেকে মুক্তি দিতে পারে না। আপনি শক্তিশালী! আপনার দেয়া ক্ষণকালের সেই অনুভূতি আরো শক্তিশালী। যা লালন করে আমি আজন্ম কাটিয়ে দিতে পারব। তবে পথচলাটা একটু কষ্টকর! ত
আপনি এভাবেই থেকে যান আমার রূপা..❞
বাক্যটি সম্পূর্ণ করার আগেই এক বিকট হুঙ্কারে রোজ সহ স্তম্ভিত মৌনতা হকচকিয়ে উঠল।
“জবাআআআ! জবাআআআ? আমার নোটবুক কোথায়? বিশ্বাস কর, ওটা যদি না পাই, আর যদি কোনক্রমে ওটা তোর কাছে পাই—তবে আমি তোর হাত দু’টো আজ কেটে ফেলব।”, এরোজের হুমকিস্বরূপ কথায় সকলে বড় বড় চোখ করে তাকায় একে অপরের দিকে।
জবা বুকে হাত চেপে ভয়ার্ত কণ্ঠে আওড়ায়,
–“ভাইজান কোত্থেকে আইলো ভাবিজান? আমি শেষ! আমার চল্লিশা খাওয়ার জন্য তৈরি হইয়া যান।”
–“আরে ঐ পাগল মহিলা! বিলাপ না করে শিগগিরি পালান।”
রোজ, জবা আর মাজেদা আচমকাই চেঁচিয়ে উঠে নোটবুক ছেঁড়ে ছুঁড়ে এক দৌড় লাগায় উল্টোদিকে। রান্নাঘরের অপর দরজা দিয়ে পালিয়ে যাওয়া সকলের গমনের পথের দিকে মৌনতা আর রূপকথা বোকার মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।
মৌনতা তখনো শংকিত মনে থমকে আছে। অন্তঃস্থল কেমন অস্থির হয়ে পড়েছে অসংলগ্ন এক কথা মাথায় আসতেই। সাথেই মস্তিষ্কে আবছা কিছু স্মৃতিরা উজ্জ্বীবিত হতে লাগলো। রোজের অসম্পূর্ণ বাক্যের শেষের নামটি কি ছিল? এমনি এক পরিচিত ডাক যে জিহ্বায় জেঁকে বসেছে। রোজ কি রূপাঞ্জেল বলতে চেয়েছিল? এই কি সেই রূপাঞ্জেল? না না সে বেশি ভাবছে। সে হাঁটু গেড়ে বসে নোটবুকটা তুলতে গেলেই কেউ ক্ষিপ্র গতিতে এসে সেটি ছিনিয়ে নিলো। মৌনতা চকিতে তাকায় এরোজের জ্বলন্ত আঁখিদ্বয়ের দিকে। এরোজ চোখে চোখ রেখে চোয়াল শক্ত করে বলল,
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১৯
–”অন্যের জিনিস না বলে স্পর্শ করা বেয়াদবি। এরপর থেকে আমি যেন কাউকে আমার ঘরে না দেখি!”
বলেই সে গটগট করে বেরিয়ে গেল রান্নাঘর থেকে। মৌনতা তখনো হতবাক হয়ে বসে রইল। বলার সুযোগই পেল না এমন বেয়াদবি করতে তার বয়েই গিয়েছে!
