অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২১
তোনিমা খান
ক্ষিপ্র বেগে ছুঁড়ে মারা ফুলদানিটা টাইলসের মেঝেতে বিকট শব্দে ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে না যেতেই দরজার পাশে থাকা কোমড়সমান আরেকটা ফুলদানি লাথি দিয়ে ফেলে দিলো এরোজ। নির্জনা বেগম ভয়ে দ্রুত পিছু সরে যায়। দানবের ন্যায় ছটফট করতে থাকা ছেলের লালচে মুখশ্রী পানে চেয়ে শুকনো ঢোক গিললো। আদুরে কণ্ঠে বলল,
–“এরোজ শান্ত হও, আব্বু। আর কেউ কখনো তোমার কোনো জিনিস ছোঁবে না আমি কথা দিচ্ছি। আমি খেয়াল রাখব যেন তোমার ঘরে কেউ না ঢোকে। ভাঙচুর করো না তানশান, নায়েল দেখছে। ওরা ভয় পাচ্ছে!”
রাগে দিকদিশা হারিয়ে এরোজ চেঁচিয়ে উঠল মায়ের উপর,
–“না, কেউ শোনে না আমার কথা। আমি আজ হারিয়ে ফেলতাম আমার ডায়রিটা। তুমি কাউকে চাবি দিয়েছ কেন? আমার ঘরে কেউ ঢুকেছে কোন সাহসে?”
নির্জনা বেগম অসহায় দৃষ্টিতে তাকায় ছেলের দিকে। চোখ থেকে বোধহয় এখনি রক্ত গড়িয়ে পড়বে এতটা ক্রুব্ধতা চোখে! হাতের এক একটা শিরা উপশিরা রাগের তোপে ক্রমশই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। সামান্য একটা ডায়রি ছুঁয়েছে বলে এত রাগ? এ যে স্বাভাবিক নয়! মাদকের প্রভাব যে ক্রমশই ছেলেটাকে শেষ করে দিচ্ছে। তার চোখ টলটল করে উঠল চোখের সামনে এক ছেলেকে তিলে তিলে মরতে দেখে। সে অনুনয় ভরা কণ্ঠে বলল,
–“এরোজ! নিজের দিকে একটু তাকিয়ে দেখো। নিজেকে শেষ করে দিয়েছ। এমন করছ কেন? একটা ডায়রির জন্য এত রাগ? আমরা তোমার পরিবারের সবাই। কেউ যদি ভুলক্রমে ছুঁয়ে ও থাকে তুমি পেয়ে যেতে। হারিয়ে যাবে কোথায় ঘর থেকে?”
রাগে টলটল করা কঠিন নেত্র তুলে তাকায় এরোজ। জীবন থেকে পাওয়া বিদঘুটে প্রাপ্তি স্মরণ করে চোয়াল শক্ত করে ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলে,
–“আমার সবকিছু এভাবেই কারণ বিহীন হারিয়ে যায় আমার থেকে। তোমরা বুঝবে না, জীবন আমার একটুও সুখ সহ্য করতে পারে না। সবসময় আমার থেকে সব ছিনিয়ে নেয়। তোমরা সরো এখান থেকে, আমার ঘরের চারপাশেও আসবে না কেউ নয়তো আমি চলে যাবো এখান থেকে।”
এরোজের কঠোর গলায় নির্জনা বেগম আর দ্বিরুক্তি করে না বরং দ্রুত সরে যেতে বলে সবাইকে। মৌনতা চোয়াল শক্ত করে এক পলক তাকায় মেঝেতে ভঙ্গুর পড়ে থাকা পছন্দের সব ফুলদানি গুলোর দিকে। এই সংসারের এক একটা জিনিস তার খুব যত্নের, অথচ সামান্য একটা ডায়রির জন্য কি-না এগুলো এভাবে ভেঙে ফেললো?
ভয়ে কাঠ হয়ে মায়ের গলা জড়িয়ে থাকা নায়েল আড়চোখে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকায় ফুঁসতে থাকা এরোজের পানে। ফের ভয়ে চোখ বন্ধ করে নিলো। মাকে ফিসফিসিয়ে বলে,
–“মাম্মা, চলো চলো ছোট পাপা মালবে আমাদেল।”
মৌনতা থমথমে মুখে নেমে আসে মেয়েকে নিয়ে। নির্জনা বেগম ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে তানশানের দিকে তাকায়। নাতির উতরে যাওয়া মুখ দেখে কৃত্রিম হেসে বলল,
–“চিন্তা করো না দাদুভাই। তোমার চাচু একটু রেগে গিয়েছে। ঘরে যাও, গোসল করে এসো তাড়াতাড়ি।”
তানশান কখনো বড়দের বিষয়ে নাক গলায় না। তাই সে নীরবে চলে গেল। নির্জনা বেগম ও চলে যায় নিচে।
বিছানার কোলঘেঁষে মেঝেতে বিশাল দূর্বল দেহটা তার ভর ছেড়ে দিলো। এরোজ কার্পেটে পা গুটিয়ে বসে বুকে জড়িয়ে রাখা ডায়রিটা চোখের সামনে আনে। সহসা চোখের কার্নিশ সিক্ত হয় শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণায়। আলতো হাতে ছুঁয়ে দিয়ে শক্ত করে ঠোঁট চেপে ধরে ডায়রির পাতায়। বারান্দা গলিয়ে অম্বরে ঝাঁপসা দৃষ্টি রেখে ফিসফিসিয়ে আওড়ায়,
–“এতটুকুও ছিনিয়ে নিতে চাইছ আমার থেকে? বিশ্বাস করো, আমার কাছে আর কিছু নেই হারানোর মতো। এতটুকু অন্তত ছেড়ে দাও, প্লিজ!”
আড়ষ্ট বদনে রূপকথা মলিন মুখে দেখে কেমন অদ্ভুত আচরণ করা বলিষ্ঠ দেহের এক পুরুষকে। একটা ডায়রিকে এমনভাবে আগলে রাখছে যেন এটা তার জীবন। মানুষটা অদ্ভুত! সে দরজার সামনে থেকে সরে গিয়ে গুটিগুটি পায়ে নেমে যায় নিচে।
নির্জনা বেগম কঠোর দৃষ্টিতে তাকালেন মৌনতার দিকে।
–“তুমি ঐ ডায়রি এনেছ মেজো বউ মা?”
–“আমার কাজের কমতি নেই— যে আমি তার জিনিস ধরতে যাবো, আম্মা! আমি পারলে তার ছায়ার ধারেকাছেও যাই না। ওটা জবা এনেছে ঘর ঝাড়ু দিতে গিয়ে।”, মৌনতার রাগান্বিত কণ্ঠ। তার আজ ভীষণ রাগ হয়েছে। একে তো বিনা দোষে সবার থেকে কথা শুনেছে তার মধ্যে ঐ লোকের এমন উগ্রতা।
–“জবাআআ!”, নিজ ঘরে কাঁথা মুড়ি দিয়ে বসে থাকা জবা কেঁপে উঠল নির্জনা বেগমের চিৎকারে। আজ তওবা করেছে আর কোনো অকাজ করবে না। সে অসহায় দৃষ্টিতে তাকায় রোজের দিকে।
–“তওবা তো করছি আফা। এহন কিছু করেন, আইজকের মতো বাঁচাইয়া দেন।”
রোজ নখ খুঁটতে খুঁটতে বলল,
–“গোসলে ঢুকুন গিয়ে, আমি না বলা পর্যন্ত বের হবেন না।”
জবা ছুটে গিয়ে বাথরুমে ঢুকলো। রোজ মাকে জানালে সে একা একাই রাগ ঝেড়ে এক পর্যায়ে শান্ত হয়ে গেল।
নতুন প্রজেক্টের জন্য তপোবন বেশ ব্যস্ত সময় পার করছে। সে সন্ধ্যা নাগাদ বাড়ি ফিরলে নির্জনা বেগম তাকে সব খুলে বলল। তপোবন জবাকে পাশে বসিয়ে নরম স্বরে বুঝিয়ে বলেছে যেন এরোজের থেকে দূরে থাকে। জবা ঘন ঘন মাথা নেড়ে সায় জানিয়েছে। সে আর যাবে না ঐ ষাঁড় গরুর আশেপাশে।
তপোবন উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায়। যেতে যেতে শুধায়,
–“কি রান্না হয়েছে জবা?”
–“মেলা কিছু ভাইজান।”
–“এরোজের পছন্দের কিছু আছে?”
–“হের তো দুনিয়ার সবকিছুই অপছন্দের!”
–“বাড়তি কথা বলবি না।”
তপোবন গম্ভীর মুখে বলে রান্নাঘরে ঢুকলো। রূপকথা আর মাজেদা তাকে দেখে প্রশ্নবিদ্ধ নয়নে তাকায়। তপোবন রান্নাকরা খাবারগুলো উল্টে উল্টে দেখে রূপকথা কে বলল,
–“চিংড়ি মাছ আর ব্রকলি দিয়ে এক প্লেটে ভাত বেড়ে দাও।”
রূপকথা দ্রুত খাবার বেড়ে তার হাতে দিলো। তপোবন খাবার নিয়ে সোজা বেরিয়ে যেতে নিলে রূপকথা উৎকণ্ঠা ভরা চাহনি ফেললো। তপোবন যেতে গিয়েও অনুভব করল কারোর উৎকণ্ঠা। সে ফিরে তাকায়। মিহি স্বরে বলল,
–“দুপুরে তোমার মন খারাপ ছিল কেন? কলেজের সবকিছু ঠিকঠাক?”
রূপকথা আঁচল আঁকড়ে ধরে কেমন একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। অন্তঃস্থল জলধারার ন্যায় প্রশান্ত হয়ে যায় এই ভেবে, যে কেউ একজন আছে তার মন খারাপের খেয়াল রাখার। সে না বোধক মাথা নাড়লো। তপোবন অবুঝ কণ্ঠে বলল,
–“ঠিক নেই?”
–“নাহ।”
–“কি হয়েছে?”
–“কাল ম্যাথের একটা অধ্যায় দিয়ে পরীক্ষা কলেজে। কিন্তু আমি কিছু পারি না।”
–“এতটুকু বিষয়ে অমন মন খারাপ হওয়ার তো কথা নয়।”, তপোবনের সরু দৃষ্টিতে রূপকথা নীরব চাহনিতে তাকিয়ে রইল। তপোবন বুঝে যায় মন খারাপের কারণ এতটুকু নয়। সে বলল,
–“আমি একটু পরে ঘরে আসছি। তুমি কাজ শেষ করে ঘরে এসো।”
রূপকথা মাথা নেড়ে সায় জানায়। জবা আর মাজেদা মিটিমিটি হাসছে। রূপকথা ফ্রোজেন শিঙারা ভাঁজছিল। সে ফিরে তাকাতেই ভড়কে গেল তাদের মুখের লাজুক হাসি দেখে। সে অপ্রস্তুত শুধায়,
–“আপনারা হাসছেন কেন এমন করে?”
জবা মিটিমিটি হেসে শুধায়,
–“বড়ো ভাবিজান আফনার আর ভাইজানের প্রেম হইয়া গেছে তাই না?”
রূপকথা সরব লাল হয়ে গেল জবার এমন কথায়। সে অবুঝ কণ্ঠে বলে,
–“কি বলছেন?”
জবা লাজুক হেসে বলে,
–“আরে আমি বুঝি বুঝি ভাবিজান, শরম পাওয়া লাগবে না। নতুন নতুন বিয়া হইলে এমন একটু হয়! এহনি তো ঘুরবেন আফনেরা, ভাইজানের তো বয়স হইছে! পরে আর শখ আহ্লাদ থাকবে নাকি! এহনি যতো পারেন শখ আহ্লাদ মিটাইয়া নেন।”
পরপরই বলে,
–কি সুন্দর দু’জন ফুসুরফুসুর করেন আবার ঘুরতে নিয়া গেছিল সেদিন। আর চাচি জানেন? ভাইজান সেদিন ভাবিজানের জন্য বিশাল এক ফুলের তোড়া আনছিল। আমি দেখছি!”
বলেই সে ফের লাজুক হাসলো।
কথার আগাগোড়া বুঝতে পেরে রূপকথা কপাল কুঁচকে তাকায় তার দিকে। নম্র কণ্ঠে বলে,
–“সেদিন তানশানকে সহ মেলায় গিয়েছিলাম, আপা। প্রেম করতে না।”
জবার অনুভূতিতে ভাটা পড়তেই সে অবাক কণ্ঠে শুধায়,
–“হ্যাঁ, সত্যি কতা? তানশান তো কোচিং এ গেছিল না?”
–“কোচিং থেকেই নিয়ে গিয়েছিলাম।”, রূপকথা কাজ করতে করতে জবাব দেয়।
জবা অসন্তোষের সাথে বলল,
–“আমার মনডাই খারাপ হইয়া গেল ভাবিজান। এই তপোবন ভাইজানের দ্বারা এইসব আর কিছু হইব না। কেমন ছন্নছাড়া ভাবে চলে। আগে নাহয় বউ ছিল না, নিজের যত্ন নেয় নাই। কিন্তু এহন তো একটু বদলানো উচিৎ। যুবতি বউ, তার কত কিছু ইচ্ছা করে। কোথায় মানুষ তারে নিয়া ঘুরতে যাইব, একটু প্রেম ভালোবাসা বাড়াইবো, তা না। ঘরে আইলেই বই নিয়া পড়তে বসায়, আশ্চর্য রকমের বেরসিক—বয়স্ক মানুষ!”, জবা বিতৃষ্ণা ভরা কণ্ঠে বলল।
তাদের কথার মাঝেই হনহন করে তপোবন রান্নাঘরে ঢোকে। তপোবনকে দেখতেই জবা হতচকিত নড়েচড়ে দাঁড়ায়। তপোবন এদিক ওদিক না তাকিয়ে শুধায়,
–“খাওয়ার মতো কি আছে? কিছু বানিয়েছিস? সাতটা বেজে গিয়েছে, তানশানের খিদে পেয়েছে।”
–“ক্যান! বাইর থিকা কিছু আনতে পারলেন না ভাইজান। এই ছোডো বয়সে একটু এটা সেটা খাইতে ইচ্ছা করে।”, জবা ফটফট করে বলল। তপোবন গম্ভীর গলায় বলে,
–“আমি ওকে না পরতে বাইরের খাবার খাওয়াই না, সেটা তুই আজ জানিস?”
–“সেইটাই তো কইছি! সবসময় তো খাওয়ান না। আইজ খাওয়াইতেন। আপনি নয় বুড়া হ ষইছেন কিন্তু ভাবিজান তানশান ওরা তো ছোডো তাদের তো অনেক কিছু মনে চায়। মানে খাইতে!”, জবা উৎকণ্ঠা নিয়ে খোঁচা দিয়ে বলল। তপোবন গুরুগম্ভীর গলায় কিছু বলার জন্য উদ্বত হলে রূপকথা ট্রে হাতে তার দিকে ফিরে তাকায়। ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
–“দুঃখিত দেরি হয়ে গিয়েছে। এই যে তানশানের স্যান্ডউইচ আর আপনার কফি।”
তপোবন এক পলক তাকায় রূপকথার হাতের দিকে। বিরতিহীন তাকায় ব্যস্ততা এবং দায়িত্বের প্রলেপনে স্নিগ্ধ মুখটির দিকে। হালকা শীতেও নাকের ডগায় জমে আছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। বয়সের থেকে অধিক পরিপক্কতা, দায়িত্বজ্ঞানবোধ চোখেমুখে স্পষ্ট। নেই কোন বিরক্তিভাব। সে নিলো না ট্রে’টি। লহু স্বরে বলে,
–“ও ওর ঘরে আছে। তুমি স্যান্ডউইচ’ টা দিয়ে আসো। আমার হাতে একটু কাজ আছে।।”
বলেই তপোবন নিজের কফিটা হাতে নেয়। মৃদু হেসে কফিটা দেখিয়ে বলে,
–“কফির জন্য ধন্যবাদ।”
সে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেলে রূপকথা কিছুটা জড়তা নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল ট্রে হাতে। অতঃপর সাহস জুগিয়ে পা বাড়ায়। তানশান পড়তে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। রূপকথা তার ঘরে নক করতেই তানশান নিজ কর্মে মগ্ন থেকেই বলে,
–“দরজা খোলা।”
অর্ধ দরজা খুলে রূপকথা উঁকি দিয়ে বলে,
–“তোমার স্যান্ডউইচ এনেছি।”
তানশান তড়াক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে রূপকথার দিকে। সে হাতের কাজ থামিয়ে হেঁটে আসে তার কাছে। রূপকথা সোজা হয়ে দাঁড়ায়। ছেলেটার সর্বদা গম্ভীর মুখ তার মধ্যে জড়তা বাড়ায়। আজও তেমনি জড়তা অনুভব হচ্ছে। তানশান নিরবে ট্রেটির দিকে হাত বাড়ায়। রূপকথা ট্রেটি তার হাতে দিতেই তানশান বলে,
–“কেচাপ নেই?”
–“কি চাপ?”, রূপকথা সাগ্রহে শুধায়। চোখেমুখে তার কৌতুহল।
–“কেচাপ।”, তানশানের শান্ত স্বর।
–“সেটা কি? দুঃখিত, আমি এটা চিনি না।”, রূপকথা ইতস্তত কণ্ঠে বলল।
তানশান বেশ অবাক হলো রূপকথার জবাবে। তার কাছে এটা অবিশ্বাস্য মনে হলো। সে আবার বলে,
–“সস চেনেন?”
–“সস? টমেটো সস তাই না? আমি শুনেছিলাম। আমি এখনি আনছি।”, রূপকথা হঠাৎ চঞ্চল কণ্ঠে বলল। তানশান হাঁফ ছাড়লো। নয়তো এই যুগে এসে কেউ সস চেনে না এটা তার মানতে কষ্ট হচ্ছিল। রূপকথা সস আনার জন্য পা বাড়ালে, তানশান পিছু ডাকে তাকে। বলল,
–“জবা ফুপিকে বললেই দিয়ে যাবে। আপনার যাওয়ার দরকার নেই। আপনি পড়তে বসুন। আপনার অনেক পড়াশুনা করতে হবে নয়তো আপনি খারাপ রেজাল্ট করবেন।”
বয়স এবং সম্পর্ক দু’টো দিক বিবেচনা করলে এক বিকৃত সমীকরন প্রকাশ পায় তানশান আর রূপকথার মাঝে। কিন্তু এই বিকৃত সম্পর্কটাও যে এতটা মসৃন হতে পারে তা রূপকথার ধারণা ছিল না। সে অভিভূত নয়নে তাকিয়ে রইল তানশানের দিকে। ভেবেছিল ছেলেটা হয়তো তাকে ঘৃনা করবে কিংবা তাদের মধ্যে সম্পর্কটা অনেক খারাপ হবে। কিন্তু যতোটা সময় গড়ালো তার চিন্তাধারা ভুল প্রমাণিত হয়। কিয়ৎকাল তাকিয়ে থেকে মৃদু হেসে বলল,
–“ধন্যবাদ! তুমি আর তোমার পাপা আছো না, খারাপ রেজাল্ট করব না।”
ভরসায় ভরপুর সেই কণ্ঠে তানশান নত শির পড়তে বসে। নিজের উপর বিরক্ত হয় সে! পড়াশুনা নিয়ে ভীষণ সিরিয়াস হওয়ায় ঐ মানুষটার পড়াশুনা নিয়েও তার চিন্তা হয়। যেখানে সে সারাদিন পড়েও হিমশিম খায় নিজের পজিশন ধরে রাখতে, সেখানে সংসারের পেছনে সারাদিন খেটে ঐ মানুষটা কি করে ডাক্তার হবে? এই চিন্তার আধিপত্য মস্তিষ্ক জুড়ে!
দরজার পাশের কেবিনেটে খাবারের ট্রেটা রেখে তপোবন এরোজের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে টোকা দিলো। একবার দু’বার নয় বরং তাকে বহুবার উচ্চস্বরে ডাকতে হলো।
–“এরোজ, ভাইজান এসেছি। দরজা খোল!”
কোনো প্রকার মাদকের সান্নিধ্যে না থাকায় বেঘোরে ঘুমাতে থাকা এরোজ ঠিক দশ মিনিট পর নড়েচড়ে উঠল। সে ঝাঁপসা নেত্রে চারিদিকে চোখ বুলায়। সেই যে দুপুরে ঘুমিয়েছে আর দিনদুনিয়ার খেয়াল ছিল না। সে ভারী দেহ টেনে উঠে দরজা খুলল। ভাইজানের মুখশ্রী দেখতেই চোখমুখের ক্রুরতা কমে আসল।
তপোবন তপ্ত নিঃশ্বাস ফেললো বিধ্বস্ত ভাইয়ের আগাগোড়া দেখে। তাদের মাঝেই যদি এভাবে থাকে তবে ঐ দূরদেশে একা একা কিভাবে থাকে? তপোবন ভাবতে পারল না আর। যাদের ছোট থেকে কোলেপিঠে বড় করেছে, কখনো দুঃখ ছুঁতে দেয়নি; তাদের কষ্ট কি করে সহ্য করবে? ভাবলো মায়ের কথামতো এরোজকে আর কানাডায় যেতে দেবে না।
–“কিছু বলবে?”, ব্যথায় ফেটে যাওয়া মাথা ঘষতে ঘষতে জিজ্ঞাসা করে এরোজ। তপোবন ট্রে হাতে ভাইকে পাশ কাটিয়ে ঢুকতে ঢুকতে আদেশের সুরে বলল,
–“দরজা আঁটকে হাত মুখ ধুয়ে আয়, ভাত খাবি।”
–“আমার খিদে নেই ভাইজান। তুমি যাও।”
–“আমিও ভাত খাইনি এরোজ। একসাথে খাবো, বাড়তি কথা বলা যেন না লাগে।”
বড় ভাইয়ের কঠোর গলায় এরোজ রাগ গিলে ধুপধাপ পা ফেলে ওয়াশ রুমে ঢুকে যায়। ফিরে এসে বিছানায় পা গুটিয়ে বসে পড়ল। ভাইয়ের সামনে বসে তপোবন ভাত মেখে মুখে তুলে দেয় নিজেও খায়। নির্বাক এরোজ খাবার মুখে তুলে নেয়। এই দৃশ্য মোটেই বিরল নয় বরং ছোটবেলা থেকে এভাবে কত খাইয়েছে যখন মা নামক স্বার্থপর মহিলাটি তাদের একা ফেলে চলে যায়। তপোবন খেতে খেতে শান্ত স্বরে শুধায়,
–“তুই কি চাইছিস এরোজ?”
–“শান্তি।”, এরোজের নির্লিপ্ত কণ্ঠে তপোবন থমথমে মুখে বলল,
–“কিভাবে? মদ খেয়ে আর দূরদেশে মুখ লুকিয়ে?”
হেডবোর্ডে পিঠ ঠেকিয়ে বসা এরোজ ম্লান হাসল। আফসোসের সুরে বলে,
–“ইদানিং কোনোকিছুতে নেশা চড়ে না ভাইজান। কত কত শক্তিশালী জিনিস খেলাম কাজ হয় না।”
তপোবনের হাত থেমে যায়। তাকায় বাঁচার বিন্দুমাত্র ইচ্ছাশক্তি না থাকা ছেলেটির পানে। মায়ের যাওয়ার পর পনেরো বছর বয়সের দিকে এরোজ স্বাভাবিক হতে শুরু করে, আর পাঁচটা মানুষের মতো হাসতে খেলতে শিখেছিল। অথচ তাদের জীবন কতটা বিদঘুটে ভাবে মোড় নেয়! সে বলল,
–“এরোজ, জীবনকে এত পাত্তা দিতে নেই। জীবনের কাজ মোড় নেয়া আর আমাদের কাজ হলো দৃঢ়তার সাথে সেই মোড় ঘুরিয়ে সোজা পথ খোঁজা।”
–“আমি তো প্রতিটা পথে মুখ থুবড়ে পড়ি পিছুটানের কারণে।”
–“এটা অপরাধ, এরোজ।”, তপোবনের দৃষ্টি কঠিন হয়ে আসে। এরোজ অসহায় চোখে তাকায়।
–“তাই তো সবসময় পালিয়ে বেড়াই। কিন্তু তাতেও তোমাদের সমস্যা!”
–“কারণ আমরা তোকে ভালোবাসি। তোর কোনো ক্ষতি হতে দেখতে পারব না আমরা।”
–“তোমাদের ভালোবাসা, ভালোবাসা হয়ে থেকে গেল। আরা আমার ভালোবাসা পাপ হয়ে থেকে গেল। আমার অপরাধটা কোথায় ছিল, বলোতো?”
–“তোর কোনো অপরাধ নেই, অপরাধ আমার। কিন্তু তার শাস্তি আমাদের এভাবে দিস না। আমি তোর পায়ে পড়ছি, এরোজ।”
–“আমি কাউকে কোনো শাস্তি দিচ্ছি না শুধু নিজের মতো থাকছি। তোমাদের সমস্যা হলে আমি আগামী সপ্তাহে টিকিট কাটব।”, এরোজ অস্থির কণ্ঠে বলল। মানুষ সহ্যই হয় না ইদানিং। ছোট্ট হুমকিতে তপোবন আর কথা বাড়ায় না। দুই ভাই নীরবে ভাত খেয়ে নিলো। ভাত খাওয়া হতেই এরোজ আবার ঘুমিয়ে পড়ে। তপোবন দীর্ঘশ্বাস ফেলে লাইট নিভিয়ে দরজা আঁটকে বেরিয়ে আসে।
–“ফাদার মানে কি, নায়েল সোনা?”
চাচির বুকে লেপ্টে থাকা নায়েল গলা জড়িয়ে ধরে চেঁচিয়ে বলল,
–“পাপা!”
–“আমি ভালো আছি?”
–“আই এম ফাইন।”
–“আমার নাম নায়েল সিকদার?”
–“মাই নেইম ইজ নায়েল ছিকদাল।”
নায়েলের চটপটে জবাবে রূপকথা মৃদু হেসে তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলল,
–“এই তো গুড! নায়েল সোনা তো সব পারে।”
–“ইয়েয়েয়ে!”, নায়েল আনন্দিত কণ্ঠে বলল। তপোবন নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে এহেন দৃশ্যে মৃদু হাসল। টিচার স্টুডেন্ট একে অপরকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে শুয়ে পড়ছে। সে গায়ের চাদর রেখে বলল,
–“এমন গলা জড়িয়ে ধরে শুয়ে শুয়ে কোন টিচার স্টুডেন্ট পড়াশুনা করে?”
রূপকথা আড়ষ্ট বদনে দ্রুত উঠে বসে। বড় পাপার কথায় নায়েল চমৎকার হেসে বলল,
–“বলো মাম্মা, গুড গার্ল বলো পাপা। আমায় আদল কলে পড়ালেখা কলায়।”
তপোবন হাসিমুখে বলল,
–“আমার বুড়ি মা! তোমার এই ল আর র এর দ্বন্দ্ব কবে ঠিক হবে?”
–“দন্দ নেই বলো পাপা”, নায়েল পিটপিট করে চেয়ে অবুঝ কণ্ঠে বলল। তপোবন হেসে এগিয়ে যায় তার কাছে।
–“দ্বন্দ্ব নেই? আচ্ছা এসো বড় পাপার কাছে এসো। বড় পাপা এখন তোমায় পড়াব।”
–“ওয়াওওও সত্যি?”, নায়েলের উল্লাসিত কণ্ঠ। তপোবন হাত বাড়িয়ে তাকে কোলে তুলে নিয়ে বলল,
–“ইয়েস।”
রূপকথা ততক্ষণে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। তপোবন শুধায়,
–“এখন বলোতো কি হয়েছে?”
জড়তায় ভরপুর এই সম্পর্কে আর জড়তা বাড়াতে চায় না রূপকথা। তাই বলল,
–“তেমন কিছু না। এই পরীক্ষা নিয়েই একটু সমস্যা হয়েছে।”
তপোবন স্থির দৃষ্টিতে তাকায় নিভন্ত মুখপানে। অভিজ্ঞ কণ্ঠে বলে,
–“তুমি মিথ্যা বলছো আমি কিন্তু তা বুঝতে পারছি।”
–“আপনি সবই বুঝতে পারেন। এটা আপনার এক অদ্ভুত অভ্যাস।”
রূপকথার কণ্ঠে অভিযোগ ছিল না, রাগ ছিল না, উপহাস ও ছিল না। তপোবন মৃদু হেসে বলল,
–“আমার মতো বয়সে আসলে দেখবে তুমিও সব বুঝে যাচ্ছো। এটা অদ্ভুত না বরং বয়সের একটা অভিজ্ঞতা। এখন তাড়াতাড়ি বলে ফেলো কি হয়েছে কলেজে?”
রূপকথা খুলে বলল সব। সব শুনে তপোবন বলল,
–“ভুল কিছু তো বলেনি।”
রূপকথা থমথমে মুখে বলল,
–“আমি ইচ্ছাকৃত তো এই পরিস্থিতিতে দাঁড়াইনি।”
–“ইচ্ছাকৃত দাঁড়াওনি কিন্তু ভাগ্য তোমায় দাঁড় করিয়েছে। এখন তুমি কি চাও, ভাগ্যের কাছে হেরে যাবে আর মানুষের কটু কথা শুনবে? নাকি এই কটুক্তি গুলোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে?”
রূপকথা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল গম্ভীর মুখপানে। অতঃপর মৃদু স্বরে বলল,
–“রুখে দাঁড়াব।”
তপোবন মৃদু হাসল। বলল,
–“তবে বই খাতা নিয়ে তাড়াতাড়ি টেবিলে বসে পড়ো। আমি পোশাক পাল্টে আসছি।”
রূপকথার মুখে হাসি ফুটে উঠল কঠিন পথটাতে অপ্রতিরোধ্য ভাবে চলার জন্য একজন দৃঢ় সাহায্যকারী পেয়ে।
নায়েলকে ডেস্কে দাঁড় করিয়ে তপোবন পাঞ্জাবি খুলতে প্রয়াস করতে গিয়েও থেমে যায়। ডেকে ওঠো,
–“শোনো।”
রূপকথা চঞ্চল কদমে এগিয়ে আসে। তপোবন পাঞ্জাবি খুলতে খুলতে মাথা নুইয়ে দিলো।
–“টান দাও।”
রূপকথা আজ আর জড়তা অনুভব করে না। পাঞ্জাবী খুলতে সাহায্য করে।
বাবা আসার আগে তানশান নিজের হোম ওয়ার্ক শেষ করে। বাবা আসলে সে নতুন পড়া পড়ে। ট্রাউজারের সাথে সাদামাটা রঙের ফতুয়া পড়ে তপোবন নায়েলকে নিয়ে ছেলের ঘরে ঢোকে।
তানশান হোম ওয়ার্ক করতে করতে বলল,
–“পাপা তুমি আগে এসেছ। আমার হোম ওয়ার্ক শেষ হয়নি।”
তপোবন চেয়ারে বসে নায়েলকে টেবিলে বসিয়ে দিলো। বলল,
–“তুমি হোম ওয়ার্ক শেষ করো আমি ততক্ষণে রূপকথাকে পড়াব। তার কাল ম্যাথ এক্সাম কিন্তু সে ঐ অধ্যায় সম্পর্কে কিছু জানে না।”
তানশান চোখ তুলে তাকায়। আতঙ্ক মিশ্রিত কণ্ঠে বলল,
–“তবে তো সে নিশ্চিত ফেইল করবে।”
রূপকথা বই খাতা নিয়ে ঢুকতেই এহেন কথায় মুখটা ছোট করে নিলো। তপোবন হেসে বলল,
–“পাপা, আছি না। ফেইল করতে দেবো না।”
তানশান মাথা নত করে নেয়। মিনমিন করে বলে,
–“তার পড়াশুনার গতি দেখলে আমার ভয় করে। এমন পড়াশুনা যদি আমি করতাম তবে আমি ক্লাসেই জায়গা পেতাম না।”
তপোবন হেসে ফেললো তানশানের সহজ আচরণ দেখে। বলল,
–“রূপকথার টিচার ও আজ তাকে অপমান করেছে এমনকিছু বলে।”
–“আশ্চর্য! কেন? সে তো নতুন এসেছে। পারবে না এটাই স্বাভাবিক!”, তানশানের আশ্চর্য কণ্ঠ। তপোবন ঠোঁট উল্টে বলল,
–“এটাই তো চ্যালেঞ্জ! টিচাররা যদি মনে এতটুকু ক্ষোভ না জাগাতে পারে তবে তোমরা পড়াশুনায় মনোযোগী হবে কি করে?”
–“তাই বলে অপমান করা উচিৎ নয়।”
–“হ্যাঁ, তা তো ঠিক। কিন্তু এখন আমাদের কাজ হচ্ছে টিচারের অপমানের উচিৎ জবাব দেয়া আগামীকালকের পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে।”
–“আই হোপ ইউ উইন দ্যা চ্যালেঞ্জ।”, তানশান লিখতে লিখতে ধিমি কণ্ঠে বলল। তার কণ্ঠে শংকা!
তপোবন রূপকথাকে পড়াতে শুরু করল। পুরো বইয়ের বেসিক রেখে, ঐ অধ্যায়ের বেসিক পড়িয়ে পুরো অধ্যায় করিয়ে দিলো। এমনকি সাপ্লিমেন্টের ম্যাথ ও সলভ করালো। দু’জনেই দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তাদের আগামীকালকের ছোট্ট লড়াইটাতে বিজয়ী হতে হবে। তবেই না আগামীর দীর্ঘ পথ চলায় সাহস পাবে।
গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হতেই সৃজা শান্ত দৃষ্টি ফেললো ইমরোজের পানে। শুধায়,
–“তারমানে তোমরা যা ইনকাম করো তা প্রতিমাসে চার ভাইবোনের মাঝে ভাগ হয়ে যায়?”
ইমরোজ মাথা নেড়ে সায় জানায়।
–“হুম, রোজ আর এরোজের ভাগটা প্রতি মাসে তাদের একাউন্টে জমা হয়ে যায়। এটা আব্বুর করা নিয়ম। যেন সবাই বাবার সমান হক পায়।”
–“কিন্তু এটা তো অন্যায় হয়ে যাচ্ছে তোমার সাথে।”
ইমরোজ কপাল কুঁচকে নিলো। মাথা ব্যথায় ফেটে যাচ্ছে।
–“মানে?”
–“মানে দেখা যায় এই কোম্পানির জন্য সবচেয়ে হার্ড ওয়ার্ক তুমি করো অথচ রোজ আর এরোজ কিছু না করেই সমান ভাগ পায়।”
–“এটা আব্বুর কোম্পানি। স্বাভাবিক ভাবেই আমরা চার ভাই বোন এর হকদার। কি বলছো সৃজা! বাদ দাও এগুলো মাথাটা টিপে দাও তো?”
ইমরোজ সিটবেল্ট খুলে সৃজার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। সৃজা অসহায় দৃষ্টিতে তাকায়। নিজের লম্বা লম্বা নখ গুলো দেখিয়ে অসহায়ত্ব ভরা কণ্ঠে বলল,
–“জান, আ’ম এক্সট্রিমলি স্যরি। আমি আজকেই নেইল এক্সটেনশন করিয়েছি। এই দেখো, এতে মাথা টেপা সম্ভব নয়।”
ইমরোজের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। মাথা ব্যথায় সে স্থির বসতে পারছে না। সে তৎক্ষণাৎ উঠে গিয়ে বলল,
–“ওকে, বাসায় যাও। আমি বাড়িতে যাব।”
সৃজার দৃষ্টি শানিত হয়ে গেল।
–“এত তাড়া কেন?”
–“শরীর খারাপ লাগছে।”
–“তবে আমার বাসায় চলো। আজ আমারা একসাথে থাকি।”
–“নাহ! আমার শরীর খারাপ লাগছে সৃজা। বাসায় গিয়ে রেস্ট নিতে হবে।”
–“আমার বাসায় গেলে কি তুমি রেস্ট নিতে পারবে না?”
–“সবসময় বাড়তি কথা কেন বলো? তোমার হাতে তো এত বড় বড় নখ তুমি আমার মাথা টিপতে পারবে? যখন পারবে না তখন কেন এমন কথা বলছ?”
–“ওহ, তারমানে তুমি মৌনতার কাছে ছুটছো তাই তো?”
ইমরোজ আর নিতেই পারল না এহেন কথাবার্তা। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–“কাম অন সৃজা বের হও। আমি তোমার সাথে এখন বাড়তি কথা বলতে চাইছি না।”
এহেন আচরণে সৃজা টলটলে নেত্রে তাকায়।
–“তুমি আমায় উপেক্ষা করছ, ইমরোজ? আচ্ছা ঠিক আছে এরপর থেকে আমার আর কোনো প্রয়োজন নেই তোমার। আমি আসছি!”
বলেই সে রেগে গাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। ইমরোজ বিতৃষ্ণা ভরা নিঃশ্বাস ফেললো।
প্রতিরাতের মৌনতা আজও ক্লান্ত ভঙ্গুর দেহে অপেক্ষা করছিল ইমরোজের জন্য। দৃষ্টি ভীষণ মলিন। একা থাকলে কতকিছু মাথায় ঘোরে। তার জীবনটা কখনোই এমন মলিন ছিল না। জীবনটা উল্টেপাল্টে গিয়েছে এই কিছু মাস! আর কিছুদিন হলো সে ভেতরে ভেতরে গুমড়ে মরছে যখন জানলো নিজের জীবনের একমাত্র ভিত্তি প্রতিনিয়ত চমৎকার অভিনয়ে মগ্ন। তবে সে শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে যাবে তবুও তার নায়েলের শৈশবে কোনো প্রকার ঝড় আসতে না দেবে না।
কলিং বেল বাজতেই তার অপেক্ষারা ফুরালো। শরীর যে এই সময়ে এসে আর চলে না। জবা দরজা খুলতেই ইমরোজ লম্বা লম্বা কদমে উপরে উঠতে উঠতে দড় আওয়াজে বলল,
–“উপরে এসো মৌনতা।”
জবা মুখ ভ্যাটকালো। মেজো ভাইজানের সিগনেচার ডায়লগ এটা ‘মৌনতা উপরে আইসো।’
মৌনতা উঠতে উঠতে শুধায়,
–“খাবার উপরে নিয়ে আসব?”
–“খিদে নেই। তুমি উপরে আসো তাড়াতাড়ি।”
মৌনতা জবাকে বলল,
–“খাবারগুলো তুলে রাখ। আর সকালে উঠে রুটি আর পরোটা বনাস। আমি উঠে বাকিসব করব।”
–“আইচ্ছা আইচ্ছা চিন্তা কইরেন না।”
মৌনতা উপরে যেতেই ইমরোজ রোজকার ন্যায় বিছানায় যাও বলে আদেশ ছুঁড়ে দিলো না বরং আজ ব্যতিক্রম হলো।
আজ রাতটা অসহনীয় হয়ে ধরা দিলো না মৌনতার কাছে। বক্ষমাঝে নির্জীব পড়ে থাকা দেহটি দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল,
–“আপনার গা গরম ইমরোজ। শরীর খারাপ করছে?”
–“হু। মাথা টিপে দাও।”
মৌনতা নিরুত্তর মাথা টিপতে লাগলো। কিয়ৎকাল বাদ ইমরোজ বদ্ধ নেত্রে অদ্ভুত প্রশ্ন করল,
–“তুমি নেইল এক্সটেনশন করাও না কেন?”
–“সারাদিন কাজ করি, বাচ্চা আছে নেইল এক্সটেনশন কি আমার জন্য?”
–“নিজের যত্ন নিতে জানো না এর জন্যই দিন দিন বুড়ি মহিলাদের মতো হয়ে যাচ্ছো।”
–“নেইল এক্সটেনশন করানো নিজের যত্ন নেয়া নাকি ফ্যাশন দেয়া? রাতে একটু আরাম করে ঘুমানোও নিজের যত্ন নেয়া।”, মৌনতা ম্লান হেসে বলল।
–“তো তোমায় ঘুমাতে কে বারণ করেছে? সারাদিন এত সময় থাকে ঘুমাতে পারো না?”
–“যখন আমি ফ্রি হই তখন আপনার মেয়ে জেগে থাকে। তাকে এক মিনিট একা রাখা যায় না।”
–“যতসব অযুহাত! ইচ্ছে থাকলে সব হয়।”
ইমরোজের বিতৃষ্ণা ভরা কণ্ঠে মৌনতা ম্লান হাসলো। ইচ্ছে থাকলে সব হয়—আসলেই। ইমরোজের ইচ্ছে থাকলে আজ তার সংসারটা এমন ছন্নছাড়া হতো না। আর না একটা সম্পর্ক শুধু জৈবিক সুখের ওপর টিকে থাকত।
রাত তখন তিনটা দশ মিনিট। সর্বশেষ সমাধানের উত্তর লিখে রূপকথা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে কলম ছাড়লো। কোলের মাঝে ঘুমন্ত নায়েলকে দোল দিতে দিতে তপোবন চাপা স্বরে শুধায়,
–“এখনো কোনো কনফিউশন আছে? কনফিডেন্স পাচ্ছো একটুও?”
রূপকথা মৃদু হেসে বলল,
–“ম্যাথগুলো আমার কাছে অনেক সহজ লাগছে। এখন যেভাবে দিক আমি পারব।”
তপোবন হাঁফ ছেড়ে বলল,
–“এখন তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ো।”
বলেই তারা উঠে দাঁড়ায় টেবিল ছেড়ে। তপোবন রূপকথার কোলে নায়েলকে দিয়ে বলল,
–“ও আজ আমাদের সাথেই থাকুক। তুমি যাও আমি আসছি।”
রূপকথা চলে গেলে তপোবন ধীরস্থির ঘুমন্ত ছেলের মুখের উপর থেকে কম্ফোটার সরায়। সরাতেই সে ডানে বামে মাথা নাড়লো খোলা ডায়রি আর মোবাইলের ফ্লাশলাইট অন দেখে। সে লাইট অফ করে ফোন আর ডায়রিটা বন্ধ করে ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রাখল। ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বেরিয়ে আসে। ছেলের বিবেক বুদ্ধি হয়েছে থেকে আজ পর্যন্ত এমন কোনো দিন যায়নি—যে সে এই ডায়রি পড়েনি ঘুমানোর আগে। একই লেখা এতবার পড়েও কি মায়ের তৃষ্ণা মেটানো যায়? যায় না!
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২০
আজ তপোবনের ঘরের দৃশ্যটা খানিক অন্যরকম। নায়েল আজ চাচা চাচির আদর পেয়ে এখানেই খেয়ে দেয়ে ঘুম দিয়েছে। রূপকথা আর তপোবনের মাঝে ছোট্ট দেহটি একটু জায়গা করে নিয়েছে। রূপকথা আর নায়েল একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়েছে। তপোবন লাইট নিভিয়ে এসে নিজেও পিঠ এলিয়ে দেয় বিছানায়। তবে দীর্ঘ আধা ঘন্টা পার হয়ে গেলেও তার ঘুম আসল না। সে ঘাড় কাত করে তাকায় জড়াজড়ি করে ঘুমানো দু’টো ছোটখাটো সত্ত্বার পানে। কথায় আছে বদ অভ্যাস গড়তে এক পল যথেষ্ট। তবে সেই বদ অভ্যাসের জোর এতটাই বাজে যে—সে এখন আশা রাখে প্রতি রাতে কেউ জোরপূর্বক তার বক্ষস্থলে জায়গা করে নেবে।
সে নিঃশব্দে নায়েলকে নিজের বুকে তুলে নিলো। এবং তার ঠিক দশ মিনিটের মাথায় তার বদ অভ্যাসকে আরো দৃঢ় করে দিয়ে কেউ আরামসে তার বাহুতে মাথা এলিয়ে দিলো। তপোবনের ওষ্ঠকোনা আলতো বেঁকে যায়।
