Home অপেক্ষা সিজন ২ অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৩৩

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৩৩

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৩৩
Maha Aarat

২ মাস পর……
মাহদিন শাহরিয়ার।সদ্য ইউকে থেকে এলএলবি কমপ্লিট করে আসা তরুণ।জেনারেল লাইনে যুক্ত থেকেও দ্বীন সম্পর্কে যার ধ্যান-ধারনা সমুন্নত।আর বিশেষত এ কারনেই আহনাফ তাজওয়ারের ভীষণ পছন্দ পাত্রকে।এছাড়া মারুফ শাহরিয়ার আহনাফ তাজওয়ারের এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার শুভাকাঙ্ক্ষী।অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে পরিচয় হওয়া মানুষগুলো একটু বিশেষই হয়।আর সেখানে যদি থাকে নি:স্বার্থপরতা।
ফিতনার যুগে যুবক-যুবিকাদের যতো তাড়াতাড়ি হালাল সম্পর্কে জুড়ে দেওয়া হবে ততো নফস,আর শয়তানকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে।আর সফলতার প্রথম থেকেই যদি হালাল সঙ্গীর ভালোবাসা আর ভরসা থাকে তবে সেই সফলতার দ্বারে পৌঁছানোও আরও একধাপ সহজ হয়।

আইরাকে দেখা হয়নি মাহদিনের।তবে তাঁর সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে উনার দ্বিমত নেই।নিকাহের ব্যাপারটা চূড়ান্ত হয়ে গেলে শুধু একবার দেখা করার অনুরোধ উনার।কারন
প্রিয় নবী (ﷺ) বলেন,
إِذَا خَطَبَ أَحَدُكُمْ امْرَأَةً فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِ أَنْ يَنْظُرَ إِلَيْهَا إِذَا كَانَ إِنَّمَا يَنْظُرُ إِلَيْهَا لِخِطْبَتِهِ وَإِنْ كَانَتْ لَا تَعْلَمُ.
‘‘যখন তোমাদের কেউ কোন রমণীকে বিবাহ প্রস্তাব দেয়, তখন যদি প্রস্তাবের জন্যই তাকে দেখে, তবে তা দূষণীয় নয়; যদিও ঐ রমণী তা জানতে না পারে।’’[4]
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন-“তোমাদের কেউ যদি কোন মেয়েকে বিবাহের প্রস্তাব দেয় এবং তার এমন কিছু দেখতে পারে-যা তাকে আগ্রহশীল করবে,তবে সে যেন তা করে নেয়”
হযরত জাবের (রাঃ) বলেন-“আমি বনী সালামা গোত্রের এক মেয়েকে বিবাহের প্রস্তাব দেই এবং তাকে এক দৃষ্টি দেখার জন্য খেজুর গাছ তলায় লুকিয়ে থাকি ।একদিন আমি তাকে দেখে ফেলি-যা আমাকে তার ব্যাপারে আগ্রহী করে তুলে ।ফলে আমি তাকে বিবাহ করে নিই।
{সুনানে বাইহাকী, ৭ম খন্ড, ৮৪ পৃষ্ঠা;হাদীস নং ১৩৪৮৭}
অন্য বর্ণনায় আছে-একদা মুগীরা ইবনে শু’বা (রাঃ) জনৈক মেয়েকে বিবাহ করার ইচ্ছা করেন ।
তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন-“যাও, তাকে দেখে এসো ।কারণ, এ দেখা তোমাদের মাঝে আগ্রহ সৃষ্টির ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করবে ।”
মুগীরা (রাঃ) বলেন-একথা শুনে আমি পাত্রী দেখে আসি। …

{(ঐ) হাদীস নং ১৩৪৮৮}
(আমি হাদীসগুলো উল্লেখ করলাম এমতে যে,বিবাহের পূর্বে একবার পাএী দেখা জায়েজ এবং সম্পূর্ণ পর্দা মেইন্টেইন করে।অথচ আমাদের দেশে তো মেয়ে দেখতে যাওয়ার সময় মেয়েরা এমনভাবে সাজগোছ করেন যেন আজই তাদের বিয়ে।আপনি পুরুষ।আগে আপনি শোধরান।তারপর একজন নারীর অভিভাবক হয়ে তাকে শোধরাবেন।এ বিষয়গুলো আপনার জন্য যতটা সহজ একজন মেয়ের জন্য ঠিক ততটাই কঠিন।)
বাকি ব্যাপারগুলো গার্ডিয়ানের সাথে সামলে নেওয়া যাবে।
মাহদিনের বায়োডাটা দেওয়া হয়েছে আইরাকে।যেখানে উনার সমস্ত ডিটেইলস সহ উইসগুলোও আছে।এখন প্রথম ধাপে আগানোর অপেক্ষা শুধু আইরার সম্মতির।

শুক্রবার সন্ধ্যা।ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে আছে তাজা গোলাপের পাপড়ি।রং বেরংয়ের মিনি লাইট সাথে তাজা ফুলের খুশবু পরিবেশটাকে আরো স্নিগ্ধময়ী করে তুলেছে ।পশ্চিমের গ্লাসটা খোলা।ধূ ধূ করে শীতল বাতাস ঢুকছে।মায়ের বুক জড়িয়ে বেনারসি শরীরে চুপচাপ বসে আছে এশা।আজকে তাঁর বিয়ে।খুব করে চাওয়া কাঙ্ক্ষিত সেই মানুষের সাথে হয়তো পরিণয় হচ্ছে না তবে যে মানুষটা তাঁর হচ্ছে সেই মানুষের খুব করে চাওয়া মানুষটা তো সে নিজেই।
একসময় কত পাগলামি,বা কোনো কৌশল বাকি না রেখে একজনকে চেয়েছিলো সে।অথচ তার তাকে প্রিয়জন বানানোর ইচ্ছে তো নেই,বরং প্রয়োজনও নেই।তবে নিজেকে নিজের কাছে ভীষণ ছোট লাগে তাকে।একদম বোধহীন,মেজাজি অধৈর্য একটা মেয়ে।তবুও এই পাগল মানুষটাকে পাবার জন্যই রায়ান লোকটার পাগলামির কমতি ছিলো না।এতো ধৈর্য,অপমান আর অপেক্ষাও লোকটাকে টলাতে পারেনি।
বাইরে গাড়ির এক দূইবার হর্ণ শুনতেই রুমের সবাই ছুটে গেলেন বর দেখতে।একসময় মাও চলে গেলেন ওদিক সামলাতে।এশা নামলো।ধীর পায়ে বিছানা থেকে নেমে গ্লাস পেরিয়ে নিচে তাকালো।এই তো তাঁর রাজকুমার।শেরওয়ানি আর পাগড়ি মাথায় তাকে তো সত্যিই দারুণ লাগছে।তাঁর মুখের লাজুক হাসি বুঝিয়ে দিচ্ছে,বরবেশে আজকের এই আগমন তাঁর সবচেয়ে খুশির মুহুর্ত।নিজের রাণীকে আপন করে নেওয়ার মাহেন্দ্রক্ষণ!

ঘড়িতে নয়টার বেল বেজেছে সবে।শুধুমাত্র গার্ডিয়ান নিয়ে কনের কক্ষে ঢুকলেন বরপক্ষ।ওরনায় আবৃত নতমুখী নববধূ দেখে চমকৃত হলেন রায়ান।ঠিক সামনে বসা মানুষটাই উনার প্রিয়জন,ভালোবাসা,আবেগ সবকিছুই।
কবুল বলতে এশা যখন দেরি করছিলো রায়ান যেনো ছটফট করছিলেন।মনে হচ্ছিলো এই বুঝি হুট করে কোনো ইন্সিডেন্ট ঘটে গেলো।যে ইন্সিডেন্টে তিনি তাঁর প্রিয়তমাকে হারিয়ে ফেলবেন।
সবশেষে এশা কবুলসহ সম্মতি দিতেই বিবাহ সম্পন্ন হলো।আংটি বদলের পর তাদের যখন একসাথে বসতে দেওয়া হয়েছিলো সেই সাক্ষাতের প্রথম বার্তাতেই রায়ান বললেন , ‘মিস এশা,আপনি তো আমাকে চোখে চোখে একটা ইশারা করতে পারতেন যে আপনি একটু এক্টিং করে কবুল দেরিতে বলছেন।আমি কত ভয় পেয়েছি জানেন?’
পিত্রালয় বিয়োগের শোকে পাথর সে।রায়ানের বাবার ব্যবসায়িক প্রয়োজনে হুট করে বিদেশযাত্রার জন্যই বিয়েটা এতো পিছিয়েছে।এই দুটো মাস তাঁরা সম্পূর্ণ দূরত্ব মেইন্টেইন করেছে।তবে রায়ান আসতেন।ছুটির দিনে এসে মা-বাবার সাথে সময় কাটাতেন।এশা বুঝে,নিজের লজ্জ্বিত কৃতকর্মের জন্য পরিবারের সাথে যে এক দূরত্বের দেয়াল তৈরি হয়েছে তাঁর,সেই দেয়ালটা আস্তে আস্তে ভেঙে ফেলতেই রায়ানের এতো চেষ্টা।
জল টলমল চোখে কঠোরদৃষ্টিতে লোকটার দিকে তাকালো সে।কষ্টে তাঁর বুক ফেটে যাচ্ছিলো আর এই মোস্ট সিরিয়াস মোমেন্টকে উনার এক্টিং মনে হচ্ছে?

তাঁর চেহারায় রাগ আর চোখে নীরব অশ্রুর ঢেউ বুঝেও রায়ান হালকা হাসলেন।বসা থেকে উঠতে উঠতে গা ঝাড়া দিয়ে বললেন , ‘আচ্ছা কান্না করুন।বিয়ের সময় মেয়েরা না কাঁদলে বিষয়টা কেমন ফিকে দেখায়।বিয়ে বিয়ে ফিলিংসটাই আসে না।আপনার কাজিন বলছিলেন কেক আনা হয়েছে নাকি।আমার খোঁজ করা উচিত।’
বলতে বলতে তিনি উঠে গেলেন।এশার মুখ দিয়ে অস্ফুট এক আর্তনাদ বেরিয়ে আসলো।এ মুহুর্তে রায়ানকে তাঁর গিরগিটির চাইতেও ভয়ানক মনে হচ্ছে।একটু আগ পর্যন্ত এতো কেয়ারিং,এতো ইমোশন সব এক নিমিষেই শেষ?মানুষ চিনতে দ্বিতীয়বার ভুল করলাম না তো!বুকের ভারী যন্ত্রণা আরও দিগুণ হতেই মুখ চেপে কান্নার ঢেউ বেসামাল হয়ে আসলো।

শীতের উষ্ণ আগমন।হুট করেই যেনো উড়ে এসে জুড়ে বসা কোনো অতিথি পাখির মতো শীতের আগমন।শরীরে শীতলতার ঢেউ,শ্বাস ছাড়তেই যেনো ধোঁয়ায় ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে আশপাশ।ঘন কুয়াশা ভেদ করে রোদ্দুরের দেখা পেতে পেতে দিনের অর্ধেক হারিয়ে যাচ্ছে।তবুও ব্যস্ত জীবন থেমে নেই।সুয়েটারে নিজেকে প্যাকেট করে ঠিকই নিজেকে ব্যস্ত রাখার প্রয়াস।উষ্ণতা মাড়িয়ে কুয়াশা গিলতে গিলতে ছুটতে হয় জীবনকে নিয়ে।পেছনে পড়ে থাকে কত স্বপ্ন,হতাশা আর ভালোবাসা।তবুও ছুটতে হয়।যেটার শেষ কেবল মৃত্যুতেই।
ইশার সালাত আদায় করেই আরহাম নিজের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ সেরে নিচ্ছেন।কাজ শেষে উনাকে আবার বসতে হবে আহলিয়াদের নিয়ে।তাদের নিত্যকার রুটিন ছিলো বাদ ফজর আর মাগরিবের পর বাধ্যতামূলক কুরআন পড়া।অথচ শীত আসতেই সবার অলসতা তৈরি হয়েছে।তাই শাস্তিস্বরূপ এখন তিনবার কুরআন বাধ্যতামূলক।সাথে চলছে তালিম,তাফসীর,অনুবাদ।

গায়ে চাদর জড়িয়ে সোফায় পা তুলে ল্যাপটপে নিজের কাজ সেরে নিচ্ছেন।কাপ রাখার টুংটাং শব্দ হয় আচমকা।হাফসা গরম কফি দিয়ে গিয়েছে।আরহাম একবার চোখ তুলে পুনরায় নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।পুরোদমে কাজে মনোযোগী হতেই তাতে ব্যঘাত ঘটে দরজার করাঘাতে।
আব্বু আসার অনুমতি চাইতেই আরহাম উঠে দাঁড়ালেন।বাবাকে বসতে দিয়ে বললেন,আপনি কেন আসলেন আব্বু।আমাকে ডাকতেন।আমিই আসতাম।’
ভদ্রলোক মুচকি হেসে বললেন , ‘কেন?তোমার রুমে আসতে মানা?’
আরহাম কেবল মুচকি হাসলেন।লাস্ট মান্থেই আব্বু দেশে আসছেন।
‘তুমি কি বিজি?’
‘ওতো বেশী না।’
‘মাহদিনের বায়োডাটা টা দেখেছো?’
আরহাম ফুস করে লম্বা শ্বাস নিয়ে বললেন, ‘জ্বি।’
‘কেমন লাগছে তোমার কাছে?’

‘মাশা আল্লাহ ভালো।কিন্তু আব্বু বোনটা তো ছোট…
আরহাম আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন।বাবা তাতে বাঁধ সেধে বললেন, ‘তোমার বোনকে তো এখনি চলে যেতে দিচ্ছি না।শুধু আক্বদ হলো।সে তো আমাদের সাথেই থাকবে।’
‘তবুও।বিয়ের বয়স হয়নি ওর।এখনো বাচ্চামি যায়নি আর…
আব্বু কোমল সুরে বললেন , ‘ভয়টা তো এখানেই আমার,আরহাম।ওর বাচ্চা বাচ্চা বিহ্যাভ গুলো যে কেউ নিতে পারবে না।এটাকে নেগেটিভলি নিবে।কিন্তু মাহদিন ব্যতিক্রম।তার সাথে আমি কথা বলেছি।ও যথেষ্ট কোমল আর ধৈর্যশীল একটা ছেলে।সে পারবে তাকে সামলাতে।’
আরহাম আর কথা বাড়ালেন না।তিনি নিজেও মাহদিন সম্পর্কে জেনেছেন।ফিরিয়ে দেওয়ার মতো ছেলে সে নয়।
‘তাহলে!তাহলে আগামী শুক্রবার আমরা যাচ্ছি তবে?’
‘আইরার মত নিয়েছেন?’
‘জিজ্ঞেস করতেই চোখ মুখ লাল করে চলে গেলো।সেটা তোমার আম্মু জেনে নিবেন।’
‘ও আগে ভালোভাবে বলুক।তারপর!’
‘আচ্ছা।তুমি প্রিপেয়ার থেকো।’

হাঁড় কাপানো শীতে জুবুথুবু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আদওয়া।কুয়াশায় চারপাশ ঘোলাটে।সকাল হলেও এ রোডে লোকসমাগম বেশ ভালোই।ছোট ছোট বাচ্চা থেকে বড় বড় শিক্ষার্থী আর গার্ডিয়ানের আনাগোনায় বেশ ব্যস্ত পরিবেশ।
আদওয়া বারবার হাতঘড়িতে তাকাচ্ছে।ঠিক আটটায় লোকটার আসার কথা।আর তো মিনিট পাঁচেক বাকি।আজকে কি আসবেন না?
ভাবতে ভাবতে কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা মিললো কাঙ্খিত ব্যক্তির।আরহাম গেইট দিয়ে ঢুকার মুহুর্তেই সে দ্রতপায়ে সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।কিছু বলার চেষ্টা সাথে চিরকুটটা এগিয়ে দিতেই তিনি পুরোদমে অগ্রাহ্য করে চলে গেলেও আদওয়া হাল ছাড়লো না।উত্তর তো উনাকে দিতে হবেই।

আরহাম নিজের সিটে এসে বসেছেন কেবল কিছুক্ষণ হলো।হাতের চিরকুট কে দুমড়েমুচড়ে ছিঁড়ে ফেলে নিজের কাজে মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করলেন।গত একমাস থেকে এই নাছোড়বান্দা মেয়েটা উনার পিছ ছাড়ছেন না।রোজ রোজ চিরকুট লিখে পাঠাচ্ছেন।আর সেগুলো পাঠানোর উপায় হচ্ছে বাচ্চা ছেলেগুলো।
প্রথমদিন যখন আরহামের হাতে এমন কিছু আসছিলো সেটা দেখেছিলেন আরহাম।তাঁর অবাধ্য চাওয়া শুনে মেজাজ খারাপ হয়েছিলো ভীষণ।একজন বিবাহিত পুরুষকে এত তীব্রভাবে চাওয়ার কারন কি।আরহাম ধরেই নিয়েছেন তাঁর মাথায় সমস্যা।কিন্তু প্রতিদিনের এসব পাগলামি মোটেই সহ্য করার নয়।খোঁজ নিয়ে যখন জানলেন সে হালিমা মিসেস এর তালিমের স্টুডেন্ট তখনই তাকে দিয়েই বেশ কড়াভাবে নিষেধ দিয়েছিলেন।হালিমা তাকে বুঝিয়ে বলার সময় বলেছিলেন, ‘তিনি একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও বিবাহিত।উনি কেন তোমাকে নিয়ে ভাববেন?’
তার উত্তর ছিলো, ‘উনার বিবাহিত জীবন নিয়ে তাঁর কোনো অবজেকশন নেই।সে শরীয়াহ অনুযায়ীই উনার হালালসঙ্গী হতে চায়।’

কুয়াশায় ঢাকা ক্যাম্পাস।রং-বেরঙ্গের হুডি ঝুলে আছে সবার শরীরে।হলগুলোতে নীরব হইচই।ইয়ারচেন্জ এক্সাম চলছে।
দূ্র্ভাগ্যবশত তাঁর সিট পড়েছে ফার্স্ট ব্রেন্চে।পেপার হাতে ঠান্ডায় গুটিসুটি মেরে বসে আছে আইরা।হাইয়ার ম্যাথ এক্সাম আজকে।ম্যাথে সে ভীষণ কাঁচা।কঠিন সব হিসাব নিকেশগুলো মাথার ওপর দিয়ে চলে যায়।সূত্রগুলা মনে রাখতে গিয়ে পুরনো পড়াগুলো ছুটে যায়।তবুও বেশ কনফিডেন্স নিয়ে সে প্রস্তুত।স্নেহার সাথে তাঁর ভীষণ ভাব হয়েছে।পেছনের সিটে সে তো আছেই।
মনের মাঝে যতটা আত্নবিশ্বাস আর ভরসা নিয়ে পরিক্ষার জন্য প্রস্তত হচ্ছিলো সেগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে গেলো যখন দেখলো রুমে ডুকেছেন মাহের মুসতাকিম।স্নেহার দিকে তাকাতেই চোখাচোখি হলো দূজনের।তাদের ভয়ে আচ্ছাদিত গোল গোল চোখগুলো যেনো বলছে, আজকে শেষ!
প্রশ্নপত্র হাতে পেতেই একটা নীরব গর্জন শোনা গেলো, ‘ক্লাসে কোনো শব্দ যেনো না হয়।আর দেখে দেখে লিখার মতো দূ:সাহস কেউ করবেন না আশা করি।কারন আমি একবার রেড পেন ইউজ করলে সেকেন্ড ইয়ারে প্রমোটেড হওয়ার প্রয়োজন হবে না।’

দেড় ঘন্টার বেল পড়েছে।আইরা পিছন ঘুরে খুব সতর্কের সহিত স্নেহার খাতা দেখে লিখছে।অথচ এতটুক সময় সে কেঁদেছিলো।বারবার চশমার ভেতরে টিস্যু দিয়ে চোখ মুছছিলো।এখন স্যার আশেপাশে নেই।এই সুযোগে একটু না লিখলে তাঁর প্রমোশন মিস যাবে।
একটু সময়ের জন্য লিখা থামিয়ে ভালো করে চোখমুখ মুছে নিচ্ছিলো।পুনরায় পিছু ঘুরে লিখার ফাঁকে ভালো করে কর্ণারে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিলো।স্যারের কোনো নড়চড় নেই কেন।কোথায় আটসাট হয়ে বসে আছেন ভাবতেই চার ব্রেন্চ পেছনেই চোখ পড়লো তাঁর।চোখাচোখি হতেই ভয়ের চোটে হালকা ঢুক গিললো।স্যার তার দিকেই তাকাচ্ছিলেন তাহলে নিশ্চয়ই এইসব পাপ কাজ দেখে ফেলেছেন।আইরার ভয় আরও গাঢ় হলো যখন দেখলো তিনি এদিকেই আসছেন।
চটপট সামনের দিকে ঘুরে দরুদ জপতে থাকলো।আজকে পরিক্ষাও ডিশমিশ তাঁর অপমানিত হওয়াও কনফার্ম।সাপও মরলো না লাঠিও ভাঙ্গলো না বিষয়টার মতো।কি ভয়ানক সেই চাহনী।একটা মানুষ একটা মানুষকে এত ভয় পায় কীভাবে?

দূ পকেটে হাত গুজে মাহের ধীরে ধীরে সামনে এসে দাঁড়াতেই আইরা দাঁড়িয়ে যায়।চোখমুখ খিঁচে আকুতিস্বরে বলতে আরম্ভ করে, ‘এক্সট্রিমলি সরি স্ স্যার….বলতে বলতে কান্না গিলতে থাকে।
মাহের কোনো বাক্যবিনিময় ছাড়াই পেপারের দিকে ইশারা করলেন।শেষ!যে ভয়টা সে পাচ্ছিলো।এবার নিশ্চয়ই এক হুংকার দিয়ে গেট আউট বলে পেপার টা টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলবেন।কিন্তু এবারেও রেজাল্ট খারাপ করলে আব্বুকে কি জবাব দিবে সে।প্রচন্ড অনুশোচনা থেকে অনুরোধিত সুরে বলল, ‘প্ প্লিজ পেপার নিবেন না এমন….
‘সিগনেচার দিব।’মাহেরের গম্ভীর কন্ঠস্বর।
আইরা তখনো ভয়ে নির্বাক।মাহের আর অপেক্ষা না করে নিজেই পেপার টা হাতে তুলে সাইন দিয়ে চলে গেলে আইরা একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকালো।উনার দৃষ্টিতে এখন কোনো কাঠিন্যতা ছিলো না তবে সেটা কি!
বিছানার বেডশীটে মাথাটা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে।সে এতোটাও অবুঝ না যে,সত্যিকার অর্থেই ভালো লাগা আর সাময়িক পছন্দের পার্থক্য বুঝবে না।সেদিন তো তিনি দেখছিলেন আইরা দেখে দেখে লিখছে।তবুও কেন চুপচাপ ছিলেন।অথচ বাকি কারো ক্ষেত্রে কাঠিন্যতা করতে তো ছাড় দেননি বা তাঁর জীবনের সেরা ভয়ংকর মুহুর্তে প্রটেক্ট করা তো নিছক নয়।

একমাস আগের ফেলে আসা সময়গুলো অটোমেটিক চোখে ভাসছে আইরার।এই গম্ভীর,একরোখা, রষকষহীন, রাগী মানুষটাকেই সে পছন্দ করে।এতোদিনে না বুঝলে লাস্ট এক মাসে সে বুঝেছে।তবে তাকে নিয়ে কল্পনা করা বা ভালোবাসাময়ী কোনো ইঙ্গিত সে দিতে চায়না বা দেয়নি।যদি সম্ভব হয় হালাল সম্পর্ক হোক,হারামের মতো ভয়াবহ গুনাহ’য় সে জড়াতে চায়না।
ইয়ার ফাইনাল এক্সামের পর কলেজ অফ।ইচ্ছেমতো ঘুমানোর সুযোগ থাকলেও ঠিক ন’টায় রুটিন মতো তাঁর ঘুম ভেঙে যায়।সন্ধ্যে হলে যেনো মন থেকেই একটা তাড়া আসে পড়তে বসার।এই অবসরের একমাসের মধ্যে উনার সাথে দেখা হয়েছে মাত্র একবার।
হলদে ফর্সা,সুঠামদেহী শরীরের সাথে লেপ্টে আছে শার্ট।হাতা ফোল্ড করে রাখা ঠিক কনুইয়ের নিচ অব্দি।মুখের গম্ভীরতা আরও গাঢ় করেছে ব্ল্যাক ফ্রেমের চশমা টা।

কোনো একদিন ভাবিপুর থেকেই শুনেছিলো,লোকটার মনে অনেক দূ:খ।বিশেষ করে মাকে নিয়েই।আর পরিবারের প্রতি বিদ্বেষ মুখোশপরা আপনজনের থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে ফেলেছে।এই একা অগোছালো মানুষটার একজন সঙ্গী হলে তো সবার আগে নিশ্চিন্ত থাকতো হাফসাই।আইরা নোটিশ করছিলো ভাবি’পু যখন উনার ভাইকে নিয়ে কথা বলেন তখন উনার চোখেমুখে কেমন যেনো আঁধার নেমে যায়।আসলেই এই মানুষটা এক নিকষ কালো আঁধারের বাসিন্দা।সেই আঁধারে আলোর ফুল ফুটাতে পারে কেবল একজন সঠিক মানুষ।যে স্ত্রী হওয়ার আগে একজন ভালো বন্ধু হবে।দূ:খ ভাগ করতে শিখবে।তাঁর সব আনন্দ হবে এই মানুষটাকে ঘিরেই।

এমন অনুভূতির কোনো পরিণতি তাঁর জানা নেই।একদিকে লোকটাকে বললে তিনি নির্ঘাত রিজেক্ট করে দিবেন।কারন আইরা জানে,তিনি বিয়ে করবেন না।বিয়ের কোনো কথাবার্তাই সহ্য করতে পারেন না বা ব্যক্তিগত কোনো পছন্দ নেই।এতো স্মার্ট মানুষের পাশে তার থেকে বেটার মেয়েদের তো অভাব হবেই না আর আব্বু?এই মানুষটার ওপর ভীষণ দূর্বল সে।আব্বুর এতো এতো পছন্দ সেই ছেলেকে?আব্বুর মন ভাঙ্গলে উনার মলিন চেহারা তাঁর সহ্য হবে না।কিন্তু মন থেকে অন্য কাউকে মানতেও নারাজ।এমন দোটানা পরিস্থিতির কোনো সমাধান কি নেই?যাতে আব্বুকেও খুশি রাখা যাবে আর এই গম্ভীর মানুষটাকেও পাওয়া যায়?

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৩২

আইরার চিন্তায় ব্যঘাত ঘটে দরজার করাঘাতে।আম্মু এসেই জিজ্ঞেস করলেন , ‘সব তো বলা হয়েছে।তুমি রাজি তো আম্মু আমার?’
মায়ের বুকে মাথা লাগাতেই বুকভেসে কান্না চলে আসে তাঁর।অথচ আম্মু ভেবে নিলেন এই অশ্রু আপনজন বিয়োগের অশ্রু।তাঁর নীরবতাকে সম্মতি ভেবে সম্বন্ধ আরেকধাপ এগোলো।

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৩৪