অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৩৯
Maha Aarat
চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন মাহের।আচমকা বেশ জোর গলায় আওয়াজ আসে নিচ থেকে।কিছুক্ষণের মধ্যে দেখলেন,বাইরে একজোট অশান্তি হয়ে বরের গাড়িসহ আগত মেহমান চলে যাচ্ছেন।মাহের দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।এত অশান্তির কারন,তিনি নিজেই।কিছু না করেই।মেয়েটার এমন পাগলামিও উনার হজম হচ্ছে না।এতটুকুন একটা মেয়ে!ভালোবাসা ও বুঝে?
‘আপনার গ্লাস ভেঙেছি বলে শোধ নিলেন?’
আচমকা কন্ঠে পিছন ফিরলেন মাহের।নিকাবে ঘেরা তাঁর চোখের দৃষ্টি।মাহের কিছুমুহুর্ত থমকালেও পরে নিজেকে সামলে নেন।
‘বলুন?'(আইরা)
‘নাহ।’
‘তাহলে না কেন করেছেন?ওই আপুটার জন্য? ‘
‘কোন আপু?’
‘এশা!’
‘না।’
‘আইরা হেঁচকি তুলে কাঁদছে।লোকটা এতো গম্ভীর কেন?অনুভূতি বলে কি কিছুই নেই?
চোখমুখ মুছে একরোখা কন্ঠে বলে, ‘শুনুন বিয়ে যদি করি, আপনাকে করবো।আর কাউকে নয়।আমাকে চিরকুমারী করে রাখবেন না।’
আইরা চলে যাচ্ছিলো।মাহের এতক্ষণে মুখ খুললেন।তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এই মেয়ে! বিয়ে মানে কি বুঝেন আপনি।এখনো খেলনা নিয়ে খেলে পুতুল নিয়ে খেলেন আর এমন সিরিয়াস বিষয় নিয়ে আমাকে দোষী বানালেন?আমি কি আপনাকে বলেছি কখনো , আমি আপনাকে পছন্দ করি?’
‘না ও তো করেন নি।’
‘মানেহ?’
‘মানে যা বললাম তাই।’
আইরা যাওয়ার কিছুক্ষণ পরে আরহাম আসলেন।মাহেরকে বললেন, ‘নিচে আসো।উমায়ের তোমার সাথে কথা বলতে চাচ্ছেন।’
‘ভাইয়া আইরাকে কেন মানছো না?ওর মতো মেয়ে হয় না।খুব ভালো মনের তিনি।একটু বাচ্চামি করেন,কিন্তু মন ভালো।আমি কখনো ভাবিনি,ও তোমার মতো গম্ভীর কাউকে পছন্দ করবে।বাবা-মা ছাড়া আমার একার লাইফে তুমি আমাকে সবসময় বেস্ট জিনিসটা দিতে চেয়েছো।কিন্তু তোমার জন্য কি করলে?দিনশেষে একটা মানুষকে পাশে রাখো যে তুমি অসুস্থ হলে অন্তত কেয়ার করবে।মন খারাপ ভালো দিতে সাহায্য করবে।তোমার কষ্টের মুহুর্ত পাশে থাকবে।সুখের সময় ও।আইরা যেমনই হোন,উনি চমৎকার একজন মানুষ।আমার আবদার টা রাখবে না?আমি তো তোমার ভালো চাই।
ভাইকে লেখাগুলো টেক্সট করে চুপচাপ পাশে পায়চারি করছিলো সে।মাহের পড়াশেষে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন , ‘বোন ,তুমি আমাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করছো?’
হাফসা ঠোঁট ফুলিয়ে না বোধক মাথা নাড়ায়।একটা সুন্দর সিদ্ধান্ত নিতে এত খামখেয়ালি কেন।আজকে যদি তাঁর ভাইকে বিয়ে করাতে না পারে,উনাকে আর কখনো বিয়ের পিড়িতে বসানো যাবেই না।আজকে রাজি করাতেই হবে।
মাহের ফোন পকেটে রেখে বললেন, ‘তুমি একটা বাচ্চা বুঝলে?আর আরেক বাচ্চাকে আমার গলায় ঝুলাতে চাইছো।আমি তাকে নিয়ে পুতুল খেলবো?বি ম্যাচিয়ুর হাফসা।’
হাফসা তাঁর সিদ্ধান্তে অবিচল।তাকে কোনোভাবে ঠলানো যাচ্ছে না। বোনের রাগ হচ্ছে বুঝে মাহের নরম স্বরে বললেন , ‘তোমার কি মনে হয় আমার কি করা উচিত?’
হাফসা ইশারায় বুঝালো ‘বিয়ে করে নেওয়া উচিত।’
‘এটা আবেগের বশে সিদ্ধান্ত না?’
‘মোটেই না।একদম সঠিক সিদ্ধান্ত।’
‘একদম ভুল সিদ্ধান্ত।’
বুকে হাত বেঁধে রাগ করে ঘুরে দাঁড়ায় হাফসা।সে ভাইয়ের দিকে তাকাচ্ছে না মানে খুব রেগে আছে।আর কথা বলবে না।বলবেই না।
মাহের ওর কান্ড দেখে বললেন , ‘এসব বিষয় নিয়ে রাগ করে থেকো না অন্তত।আর আমি অত্যন্ত দূ:খিত তোমার পরিবারের কাছে।ক্ষমা চাওয়া ছাড়া কিছু করার নেই।আর আমাকে নিয়ে উনার অনুভূতি সম্পূর্ণ একতরফা।আর উনিও বাচ্চা মানুষ।একটু বড় হলে ভালো দেখে ছেলে দেখে বিয়ে করিয়ে দিও।আসি।’
মাহের আর উত্তরের অপেক্ষা করলেন না।ড্রয়িংরুমে আহনাফ তাজওয়ার,আরহামের আম্মুসহ ঘরের মেহমান।পাশে কোনো রুম থেকে চাপা কান্নার আওয়াজ আসছে।সবাই নীরব।কারো মুখে কোনো রা নেই।মাহের যখন লিভিং রুম ক্রস করছিলেন উনার প্রচন্ড লজ্জ্বা হলো আহনাফ তাজওয়ার কে এড়িয়ে যেতে।মেয়ের বিয়ে ভাঙ্গার অভিযোগের দায় বোধহয় খুব কঠিন।ভদ্রলোকের মাথা হেট হয়ে আছে।মাহেরকে দেখে আরহাম এগিয়ে এলেন।মাহেরের কাঁধে হাত রেখে অনুতপ্ত সুরে বললেন , ‘আমাকে ক্ষমা করো মাহের।আমি আমার বোনের খুশির জন্য তোমার সাথে কিরকম ব্যবহার করেছি।এখন বুঝতে পারছি।ক্ষমা করে দিয়ো।এই বিষয়টা মাথায় রেখে আমাদের বন্ধুত্বে কখনো দূরত্ব বাড়িয়ো না।’
কোনো দোষ ছাড়াই আরহাম এত নত হয়ে ক্ষমা চাইছেন দেখে খুব লজ্জ্বা হলো মাহেরের।এর মধ্যে হঠাৎ আহনাফ তাজওয়ার উঠলেন।মাহেরকে একা ডেকে সামনে দাঁড় করিয়ে কিছুক্ষণ তাকালেন।অতপর একটা শুকনো মুচকি হাসি দিয়ে একেবারে নরম সুরে জিজ্ঞেস করলেন , ‘ইয়াং ম্যান!তোমার মধ্যে এমন কি দেখেছে আমার প্রিন্সেস যার কারনে মাহদিন কে এক সেকেন্ডের জন্যও তাঁর মনে বসাতে পারেনি?’
এটা কি অপমান?নাকি অন্য কিছু।সে যাই হোক।মাথা তুলে তাকাতে বড্ড অনুশোচনা হচ্ছিলো মাহেরের।
ভদ্রলোক বোধহয় মাহেরের অস্বস্তি বুঝতে পারলেন।তাই তাকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘বি কোল।আমি পজিটিভলি বুঝাতে চেয়েছি।তোমার মাঝে এমন দারুণ কিছু নিশ্চয়ই আছে যেটা আমার মেয়ে পছন্দ করেছেন।প্রেশার নিও না ডক্টর।আজকের বিষয়টা তোমার সিদ্ধান্তের উপরেই ক্লোজ হয়ে গিয়েছে।তুমি না চাইলে এটা আর কোনোদিন ওপেন হবে না।’
মাহের বেরিয়ে এসেছেন।পার্কিংটে গিয়ে লম্বা শ্বাস ফেলে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন মাহের।উনার হাঁসফাঁস লাগছে।অস্থির লাগছে।আশ্চর্য!কিন্তু কেন?হাফসার রাগ,অভিমান দেখেও ফেলে আসছেন সেজন্য?নাকি কারো চাপা কান্নায় লুকানো যন্ত্রণার জন্য?’
ড্রয়িংরুমে তখনো পিনপতন নীরবতা।হাফসা বেরিয়েছে রুম থেকে।সোফায় বসে থাকা আব্বুর ক্লান্ত চেহারা নজরে আসতেই বুকটা বাড়ি দিয়ে উঠলো তাঁর।এই মানুষটা নিজের বাবার মতো স্নেহ করেন তাকে।আর উনার এমন পরিণতি হাফসাকে পোড়াবে না তা কি হয়?
নীরব পরিবেশে ফিসফিস আওয়াজ ছাড়া কিছুই ঠাহর করা যাচ্ছে না।নীরবতা গা ছাড়লো যখন এই অসময়ে কলিং বেলে আওয়াজ উঠলো।আরহাম ভ্রু কুঁচকালেন তাকে পুনরায় প্রবেশ করতে দেখে।মাহের প্রথমেই দূর থেকে বোনকে দেখলেন।সাথে সাথে হাফসা মুখ ফিরিয়ে নিলো।অথচ মাহেরের হৃদয়ে যেনো এক সূঁচফোঁটা বিজলী বয়ে গেলো।
বোনের একটা জ্বলন্ত দৃষ্টিই ভাইয়ের অন্তর পুড়ে খাক করে দিতে যথেষ্ট।
মাহের ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন।আহনাফ তাজওয়ার এর নিরস দৃষ্টিতে মাহের আবদ্ধ।সবাইকে অবাক করে দিয়ে মাহের বললেন , ‘আপনাদের ঘরের বাচ্চাটার দায়িত্ব নিতে আমি রাজি।’
আরে! তাঁর কান কি ভুল কিছু শুনলো?মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যেই তাঁর ভাই জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন?হাফসা খুশিতে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো ভাইকে।
জড়িয়ে ধরে কয়েক সেকেন্ড পর নিজেই লজ্জ্বায় মরে যাচ্ছিলো সে।দ্রুত ভাইকে ছেড়ে দিয়ে দূরে সরে দাঁড়ালো।অথচ এরই মধ্যে যেনো ঘরে বিস্ফোরণ ফুটলো আব্বুর কন্ঠে,
‘তুমি দয়া করছো?না আবেগের সিদ্ধান্ত?’
‘ঠান্ডা মাথায় ভেবে আমার জীবনের সিদ্ধান্ত।
আংকেল আপনি যদি আবেগ নিয়ে মেয়ের চাওয়াকে প্রায়োরিটি দিয়ে থাকেন,আমি অবজেকশন দিবো।ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিন।আমাকে পছন্দ না হওয়ার অনেকগুলো অপশন আছে অথচ পছন্দ হওয়ার তেমন কোনো অপশন নেই বরং অবজেকশন আছে।’
আরহাম আর আহনাফ তাজওয়ার এর চোখাচোখি ইশারা কি হলো সেটা কেউই বুঝতে পারলো না।তবে বাপ-ছেলের আই কন্টাক্ট শেষ হলে আহনাফ তাজওয়ার চমৎকার হেসে উনার সিদ্ধান্ত জানিয়ে বললেন, ‘তোমাকে পছন্দ হয়েছে আমার।’
বিয়ে বাড়িতে এক অনাকাঙ্ক্ষিত দূর্ঘটনায় যতটুকু বিষাদ নেমে এসেছিলো মাত্র ঘন্টা দেড়েক এর ভিতরে পুনরায় প্রাণ ঢালা আনন্দ নেমে এলো।বিশেষ করে আব্বুর চোখমুখ চকচক করছে।অথচ ঘন্টাখানিক আগেই নিজের প্রিয়তম বন্ধু ও তাদের পরিবার থেকে অপমানে,লজ্জ্বায় উনার শরীরে যেনো ভারী ক্লান্তি নেমে এসেছিলো।বয়স যেনো বেড়ে গিয়েছিল দ্বিগুণ।এতকিছুর পরেও আহনাফ তাজওয়ার মেয়ের সামনেও লজ্জ্বিত।আদরের একমাত্র মেয়ে বুকে পাথর চেপে এমন অপছন্দের একটা সিদ্ধান্ত হজম করে নিয়েছিলো শুধুমাত্র আব্বুর খুশির দিকে তাকিয়ে।আর তিনি কি না প্রিয় কন্যার হৃদয়ে ছুরি চালাচ্ছিলেন?
বিয়ে বাড়িতে নিভে যাওয়া আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে ফিরে এলো।বিকেলের একেবারে শেষ প্রান্ত।সন্ধ্যার পরপরই বিবাহ সম্পন্ন হবে।মাগরিবের আর খুব বেশী বাকি নেই।এতকিছু হয়ে গেলো, এত খুশির সিদ্ধান্তটুকু এখনো কনে জানলো না?বিষয়টা খুবই মর্মান্তিক।নাওমি এসে জানালেন কাঁদতে কাঁদতে হয়তো মাত্র কিছুক্ষণ আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে আইরা।অথচ গায়ে তাঁর তখনো সুন্দর পোশাক।আরহাম ফিরতি যাওয়া বরপক্ষের কোনো ঋণ রাখেননি।এই পুরো রিলিজিয়াস ব্রাইডাল পোশাক এর দাম তিনি দ্বিগুণ দিয়ে শোধ করে দিয়েছেন।
পুরুষরা মসজিদে যাওয়ার পর আম্মু এসে তাকে ডেকে গেলেন সালাত আদায়ের জন্য।ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে উঠে বসে খানিকক্ষণ ঝিমোচ্ছিলো সে।অথচ সামনে বসে থাকা আম্মুকে এত ফূর্তিতে দেখে মলিন গলায় বলল, ‘মেয়ের বিয়ে ভাঙ্গলে মায়েরা বুঝি এত খুশি হয়?’
‘খুশি হয় যদি পূর্বের পাত্র থেকে উত্তম কেউ মেয়েকে লাইফ পার্টনার হিসেবে চায়।’
আইরা মুখ নত করে নিলো।আম্মুর আবোলতাবোল কথাবার্তার কোনো কিনার পাচ্ছে না সে।তবুও মস্তিষ্কে একটা কথা ঘুরতে থাকলো, ওই লোকটাই তাঁর জন্য বেটার ছিলো।ওই লোকটাই।
পরক্ষণেই রবের কাছে দ্রুত ক্ষমা চেয়ে নিলো সে।সে তো রব্বের কাছে সবচেয়ে বড় উপহার হিসেবে তাঁর জীবনসঙ্গীকে চেয়েছে।রবের ওপর তাওয়াক্কুলে ঘাটতি না পড়ুক।একটু নয় অনেকখানি ভরসা রাখা যাক!
ফ্ল্যাশব্যাক….
নিকা’হের অন্তিম মুহুর্ত।নিকাহনামায় সবকিছু রেডি।এরই মধ্যে আরহাম কোথায় চলে গেলেন।মাহেরের সাথে কথা বলে যখন নিচে নামলেন দেখলেন প্রস্ততি একেবারে পাকা।আরহাম অনুরোধ করে সময় চেয়ে নিলেন।অতপর আব্বু আম্মু আইরাকে আলাদা ঢেকে নিয়ে বললেন , ‘আইরার মত নেই আব্বু এই বিয়েতে।ও সুখী হবে না।’
উপস্থিত তিনজনই ভারীরকম চমকালেন।একটু পর বিবাহ আর এখন এ কি কথা?
বোনের দিকে এগিয়ে আরহাম ওকে একহাতে আগলে নিয়ে বললেন , ‘আমার ছোট্ট বাচ্চা বোনটা কারো খুশির জন্য এতোবড় স্যাক্রিফাইস করতে পারবে আমি কখনো ভাবি নি।আব্বু শুধুমাত্র আপনার খুশির জন্য ও রাজি হয়েছে।মন থেকে নয়।’
একটার পর একটা ধাক্কা আহনাফ তাজওয়ারকে দূর্বল করে দিচ্ছিলো ভীষণ।আম্মুরও হাত পা কাঁপছে এমন পরিস্থিতিতে।আইরার কান্নামাখা অশ্রু টলটলে চোখের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকালেন আহনাফ তাজওয়ার।নাহ,এই চোখ মিথ্যে বলছে না।আরহামের কথার সাথে তাঁর দৃষ্টির মিল যেনো স্পষ্ট।
বুকের ভেতর থেকে উগড়ে আসা ভারী নি:নি:শ্বাসের সাথে আহনাফ তাজওয়ার বন্ধুকে দেয়া কথা আর মাহদিনের মতো সুপাত্র ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ করে জিজ্ঞেস করলেন , ‘কিন্তু কেন মামনি?’
‘বোন মাহেরকে পছন্দ করে।’
আব্বু যেনো ভীষণভাবে চমকালেন।উনার মেয়ে কাউকে ব্যক্তিগত পছন্দ করবে এটা তিনি কল্পনায়ও আনেননি।আর ছেলে যদি হয় পরিচিত মুখ সেখানে সত্যিটা আরো জোরালো হয়।
আব্বু সবকিছু ভুলে গেলেন মেয়ের চাওয়ার দিকে তাকিয়ে।জিজ্ঞেস করলেন , ‘মাহের ও?’
আরহাম কিছুটা ইতস্তত করে বললেন , জ্বি না।ও একদম অন্যরকম।বিয়ের মতো সিদ্ধান্ত নিতে সে মোটেও প্রস্তুত নয়।’
আইরার ভেতর যেনো তড়িৎ এক ভয়াবহ বিজলী খেলে গেলো।বিষয়টা পারিবারিক ভাবে এগোনোর পরও উনি নাকোচ করে দিতে পারলেন?
মাত্র মিনিট বিশেকের মধ্যে সব আয়োজন ভেঙে গেলো।বরপক্ষ থেকে যত রকম অপমান লাঞ্চনা তীরের মতো বুকে এসে বাঁধলো ,আরহাম আর আহনাফ তাজওয়ার সবকিছু নীরবে হজম করে নিলেন।সর্বোচ্চ নীচু হয়ে ক্ষমা চাইতেও কুন্ঠাবোধ করেননি।
বর্তমান
মাগরিবের নামাজ শেষ হতেই আব্বু এসে মেয়ের সাথে দেখা করলেন।অশ্রুতে অনগল এক আলিঙ্গন শেষে তিনি খুব করে মেয়ের কাছে ক্ষমা চাইলেন মেয়েকে নিয়ে উনার এমন ভুল সিদ্ধান্তের জন্য।অতপর মাহের রাজি হওয়ার বিষয় অবগত করতেই আইরা চমকিত হলো।তাৎক্ষণিক কিছু না বললেও যখন আব্বু বেরিয়ে রুমে বাকিরা প্রবেশ করলেন তখন সে এককথায় জানিয়ে দিলো সে আপাতত বিয়ে টা করতে পারছে না।এ নিয়ে তাঁর সাথে পরে আলোচনা করতে।কি অবাক করা কান্ড?যার জন্য এতোদিন সে অঝোরে কাঁদলো এতো কষ্ট হজম করলো তাকে পাওয়ার সুযোগ পেতেই তাঁর সিদ্ধান্ত এমন বদলালো কেন?
উপস্থিত সবাই তাঁর হঠাৎ এমন আচরণের কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না।হ্যাঁ সে সব বিষয় নিয়ে হুটহাট এমন করে তবে বিয়ের মতো এমন গুরুত্বপূর্ণ একটা সিদ্ধান্তে এমন করবে এটা সবারই চিন্তাভাবনার বাইরে।আরহামও তাকে বুঝাতে গিয়ে নারাজ।একে একে যখন তাঁর এমন আচরণের কথা মাহেরের কানে পৌঁছলো তখন তিনিও যেনো শক খেলেন।বাচ্চা একটা মেয়ে কীভাবে নাকে দঁড়ি দিয়ে ঘুরাচ্ছে!
আম্মুর অনুরোধে মাহের একবার তাঁর সাথে কথা বলতে রাজি হলেন।অথচ রুমে ঢুকতেই পর্দার ওপাশ থেকে সে আড়ষ্টতা নিয়ে বলল,
‘আমার এখন বিয়ের মুড নেই আপনি চলে যান।’
ওকে। মাহের এর ইচ্ছে হলো বেরিয়ে যেতে।তবে চাইলেই পারা যাচ্ছে না সেটা।তিনি খানিক সময় নিয়ে জবাব দিলেন,
‘বিয়ের মুড নেই?’
‘নাহ।’
‘কোথায় গেছে মুড?কতক্ষণে ফিরতে পারে?’
‘মুড আজকে আর আসবে না।’
‘আজকে আসবেই না?’
‘নাহ।’
‘আমি অপেক্ষা করি।মুড আসলে নাহয় বিয়ে হবে।’
‘নাহ।’
‘তাহলে কোনোমতেই আপনি রাজি হচ্ছেন না বিয়েতে?’
‘নাহ।’
‘আচ্ছা বেশ।কিন্তু একবার যখন মত দিয়েছি আমি আর দেরি করতে চাচ্ছি না।’
‘আ্ আমি রাজি হলেই না আপনি বিয়ে করবেন?’
‘সমস্যা নেই।অন্য কাউকে করে নিব।আসি।’
আইরার পেটের ভিতর মিচকে বুদ্ধি দৌড়াদৌড়ি করছে।একটু আগেই না মুখের ওপর তাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন এই শোধ সে নিবে না?কিন্তু লোকটা তো বেঁকে গেছেন।উনি নিশ্চয়ই ফাজলামো করার লোক না।সত্যি যদি বিয়ে করে নেন তাহলে?
মাহের রুম থেকে বেরোতে যাচ্ছিলেন অমনি সে বলতে লাগে, ‘ঠিক আছে ঠিক আছে আমি রাজি।’
মাহের দাঁড়ালেন।উত্তর দিলেন , ‘কিন্তু আমি রাজি না।’
‘কেন?আপনার আবার কি হলো?’
একটুতেই এ মেয়েটা হেনস্তা করে রাখছে না।এর জন্য তার একটা পানিশমেন্ট পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।মাহের বললেন ,
‘আমি বিয়ে করতে পারি তবে আপনাকে আজকেই আমার সাথে আমার বাসায় যেতে হবে ।’
এ্যাঁহহহহ!আইরা ভেটু ভেঙে কেঁদে দেওয়ার জোগাড়।কিন্তু মাহের দেরি না করে বেরিয়ে গেলেন।
রাত দশটায় পবিত্র নিকাহ সম্পন্ন হলো।কান্নাকাটির পর্ব শেষ হলেও সবার মনে যেনো অদ্ভুত এক আনন্দ।দেনমোহর হিসেবে মাহের একটা মোটা অঙ্কের চেক আইরার হাতে তুলে দিয়েছেন।আপাতত উপহার হিসেবে দিয়েছেন একটা ব্রেইসলেট।কারন খুব অল্প সময়ের তোড়জোড়।যদিও আইরার পরিবার কিছুই চাচ্ছিলেন না তবুও হাফসার কথা সে নতুন মেহমান কে খালি হাতে একসেপ্ট করবে না।
মাহের এর শর্ত হলো আইরা উনার সাথেই যাবে।কিন্তু এ অবস্থায় বাসায় তাদের একা দিতে নারাজ সবাই।তাই আজকের রাতটুকু আইরার বাসায়ই থাকতে হবে।মাহেরও আর দ্বিমত করার সুযোগ পেলেন না একমাত্র বোনের খুশিতে বাকবাকুম অবস্থা দেখে।রাতের খাবারের সময়টুকু ছিল সবচেয়ে আনন্দের।হাফসা আজ ভাইয়ের সাথেই খেয়েছে।আরহাম খেয়েছেন মাইমুনার সাথে।
খাবার শেষে সবাই’ই ঘুমোতে ব্যস্ত।এর মধ্যে মাইমুনা আরহামকে জরুরী প্রয়োজনে ঢেকে নিলেন।আরহামও দেরি না করে রুমে এসে দেখলেন মাইমুনা চুপচাপ বসে আছেন।আরহাম তাঁর পাশে গিয়ে বসতে চাইলে মাইমুনা চোখ বড় করে সামনের চেয়ার দেখিয়ে ইশারা করলেন দূরে বসতে।আরহাম আশ্চর্য হলেন খুব।তাদের খাওয়ার সময়ও মাইমুনার মুখে কোনো কথা ছিলো না।ভুল কিছু করে বসলেন না তো?
‘হানি?কিছু কি হয়েছে? আপনার মন খারাপ?আমি কিছু করেছি?আমার কি ভুল হয়েছে বলুন?আমি ঠিকমতো কেয়ার নিতে পারছি না তাই রাগ?…
আরহামের এসব প্রশ্ন মাইমুনা একটুও আমলে নিচ্ছেন দেখে আরহাম চিন্তায় পড়ে গেলেন।মাইমুনা চুপচাপ বসে আছেন যেনো তিনি কারো অপেক্ষায়।আরহামের ধারনা সত্যি হলো যখন হাফসা রুমে প্রবেশ করায় মাইমুনা প্রস্তুত হয়ে নড়েচড়ে বসলেন।
হাফসা নিজে বসতে হলো না বরং মাইমুনা তাকে নিজের পাশে বসালেন যেখানে আরহাম বসতে চাইছিলেন।দূজনের এমন গদগদ ভাব দেখে আরহাম নিশ্চিত হলেন নিশ্চয়ই তাদের কোনো আবদার আছে।
অথচ আরহামের ভাবনাকে মিথ্যে প্রমান করে দিয়ে মাইমুনা বোম ফাটালেন।বললেন, ‘আপনার সুলাসা প্রয়োজন আমাদের সাথে তো আলাপ করেননি,হুজুর সাহেব?’
বেশী মেহমানের জন্য জায়গার অভাব কিংবা নতুন দম্পতি ,যেকোনো একটা রিজনে তাদের দুজনকে একসাথে ঘুমোতে দেওয়া হলো।আইরা আগে আগেই শুয়ে ছিলো।মাহেরকে ঢুকতে দেখে ঝটপট উঠে বসলো সে।
‘আশ্চর্য্য!আপনি এখানে কেন?’
‘ঘুমাব তাই।’
‘আর কি জায়গা নেই?এখানেই কেন?’
‘আমাকে বলা হয়েছে এখানে ঘুমাতে।’
‘তাহলে আমি কোথায় ঘুমাব?’
মাহের বিছানার কাছাকাছি আসতেই আইরা নেমে গেলো।মাহের তার হাতে তুলতুলে হাওয়াই মিঠাই এর মতো বালিশ তুলে দিয়ে বললেন , ‘যান আপনি আপনার মায়ের কাছে ঘুমান।আমি এখানে ঘুমাবো।’
আশ্চর্য্য!তার রুম থেকে তাকে এভাবে তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।অনেকক্ষণ তর্কবিতর্ক করেও লাভ হলো না আইরার।বালিশ হাতে চলে যাচ্ছিলো সে।
অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৩৮
অমনি মাহের পিছু ডেকে বললেন , ‘এত নরম বালিশে ঘুমাবেন না। নরম বালিশে মাথা দেওয়ার পর মাথার ভার নির্দিষ্ট একটা জায়গায় পড়ে থাকে।এই অভ্যাসে মুখের ত্বকে টান পড়ে।যা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে ত্বকে বলিরেখারও জন্ম দিতে পারে।’
তাহলে সে ঘুমাবে কিসে নরম বালিশ ছাড়া?ডাক্তার জামাই বিয়ে করার জ্বালা বোধহয় এখন থেকে শুরু হলো!
