অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৪০
Maha Aarat
রাতের ছিমছাম পরিবেশ।ঘন কুয়াশায় ঢেকে আছে আঁধভাঙ্গা চাঁদ।কুয়াশায় চারপাশ ঝাপসা হয়ে আছে। জানালার থাই বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা শিশির ঝড়ে পড়ছে।পরিবেশে বইছে শীতল সমীরণ।ঘোর শীতের কবলে পাখপঙ্কি যেনো একটু উষ্ণতা খুঁজতে ব্যস্ত।শিশিরমাখা পাখির কুঠিরে চলছে বর্বর শীতোৎসব।কোথাও বা ডানা ঝাপটাচ্ছে ডাহুক।তাদের অপেক্ষা শীত বিদায়ের।আবার কোথাও ফুটপাতে কাঁপছে অসহায় পথশিশু।যে শীত আমাদের জন্য দারুণ উপভোগ্য সে শীত যেনো তাদের অভিশাপ।
‘আপনার সুলাসা প্রয়োজন আমাদের সাথে তো আলাপ করেননি,হুজুর সাহেব?’
আরহাম যেনো আকাশ থেকে পড়লেন।মাইমুনার থেকে চোখ সরিয়ে হাফসার দিকে তাকালেন তিনি।বিয়ের এই পুরো সময়টুকু যে তাঁর ভাইকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলো এবং আরহামকে পুরোদমে এড়িয়ে চলেছে।তার মানে তাঁরা দূজনের ইগনোর করার রিজন এক।
‘বলুন?উত্তর দিন।’
যে মুখ দিয়ে সবসময় মিষ্টি মিষ্টি ভালোবাসা আর অভিমান,আহ্লাদের কথা বের হয় সে মুখ দিয়ে এতো তেঁতো ঝাড়ি খেয়ে আরহাম বেশ ভয় পেয়ে গেলেন।উত্তর দিলেন,
‘ইম্পসিবল।কখনো না।কোনোদিন না।স্বপ্নেও না।বাস্তবেও না।জান্নাতেও না।আপনারা আছেন আমার আর কাউকে প্রয়োজন হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।’
‘তাহলে আপনার এতো শুভাকাঙ্ক্ষী আসে কোথুকে?’
‘কি বলছেন বুঝতে পারছি না।আমার শুভাকাঙ্ক্ষী আসবে কোথা থেকে?’
‘তাহলে যিনি আমার কাছে আপনার ওয়াইফদের দেখতে চাচ্ছিলেন আর হাফসার কাছে আপনাকে চাচ্ছিলেন সেই রমণী কে?’
আরহাম তাদের কথা কিছুই বুঝতে পারছেন না।’আশ্চর্য্য!আমি কি করে জানব?’
‘আপনি জানবেন না দেখে তাঁর ছবি তুলে রেখেছি’ বলতে বলতে আরহামকে ছবি দেখাতে চাইলেন।কিন্তু আরহাম ছবির দিকে তাকাতেও নারাজ।অবশেষে তাঁর বহু বর্ণনা দিয়ে আয়বীর সাহেবের মেয়ের পরিচয় দিয়ে ,মেয়ের নামও জানানো হলো।আরহাম পরিস্থিতি কিছুটা আন্দাজ করতে পেরে উনার সহকারী কে ফোন দিয়ে জানলেন যে মেয়েটা উনাকে জ্বালাতন করতো তাঁর নাম।মিল পেয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে বললেন , ‘ওহ।’
আরহামের নির্বিকার উত্তর।যেনো কত সহজ ব্যাপার।হাফসার চোখেমুখে অন্ধকার নেমে এলো।সত্যি কি তিনি সুলাসা করবেন?’
‘ওকে চিনেন আপনি।কি করে?’
আরহাম আর কিছু লুকোলেন না।সবকিছু বলে এটাও বললেন মেয়েটা উনাকে প্রতিদিন চিঠি দিতো।এখনো দেয়।
‘আপনি সে চিঠি গুলো পড়েছেন?’
আরহাম কিছুটা ভয় নিয়ে উত্তর দিলেন, ‘একদিন পড়েছি।’
মাইমুনা চোখ বন্ধ করে নিলেন রাগে,ক্ষোভে।হাফসার দিকে তাকাতে খুব মায়া হলো মাইমুনার।যে ভয় তিনি পাচ্ছেন মেয়েটা সেই ভয়েই জড়োসড়ো হয়ে আছে।
‘হাফসা,শাহ তোমাকে এ নিয়ে কখনো কিছু বলেছেন?শেয়ার করেছেন?’
হাফসা না বোধক মাথা নাড়াতেই মাইমুনা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।বললেন , ‘আমরা এতোই তুচ্ছ আপনার জীবনে, যে এতো বড়ো বিষয়টা একবারও আমাদের জানানোর প্রয়োজন মনে করলেন না।তাও এত দিনের ঘটনা এটা।’
আরহাম তাদের এমন অবস্থা দেখে বুঝানোর সাপেক্ষে বললেন , ‘বিষয়টা ওরকম নয় যেমনটা ভাবছেন।আমি বলিনি আপনাদের কারন…
‘ব্যাস।আপনি এখন চলে যান শাহ।’
আরহাম তবুও দমলেন না।কিন্তু পুনরায় মাইমুনার একই কথা শুনে উমায়ের এর দিকে তাকালেন তিনি।জিজ্ঞেস করলেন , ‘আপনিও ভুল বুঝবেন?’
হাফসার পক্ষ থেকেও কোনো উত্তর আসলো না।মাইমুনা পুনরায় বললো, ‘আগামী তিনদিন আমাদের সাথে কথা বলবেন না।কোনো কথা না।’
আরহাম অস্থির হয়ে বললেন , ‘পারবো না।’
‘এতো বড় সত্যি যখন লুকাতে পেরেছেন তাহলে এটা কঠিন কিছু নয়।এবার আপনি আসুন।’
আরহামকে কিছু বলার সুযোগ দেওয়া হলো না।উনি বেরিয়ে যেতে মাইমুনা দরজা আটকালেন।দেখলেন মুখ নিচু করে চুপচাপ বসে আছে মেয়েটা।এই একটা বিষয় ওর আজকের পুরো আনন্দটুকু মুহুর্তেই গ্রাস করে নিলো।মাইমুনা এগিয়ে তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে জড়িয়ে ধরে বললেন , ‘মন খারাপ করো না বোনু।শাহ এমন কিছু কখনো করবেন না।এই শিক্ষাটা দেওয়া উচিত যাতে পরবর্তীতে এমন কোনো ভুল না করেন।ঠিক আছে?’
হাফসা মাথা নাড়ালো।দূজনে আরও গল্পসল্প করে একসাথে ঘুমাতে লাগলো।অথচ আরহাম রুমে এসে রাগে বালিশগুলো,শোপিসগুলো ছুঁড়ে ফেলে বিছানার পাশের বক্সটায় লাথি মারলেন।এ মেয়েটা আজ কেন এসেছিলো আর কেনো এসব অবাধ্য কাজকর্ম করলো এটা উনার মাথায় আসছে না।মেয়েটা সীমা ছাড়াতে ছাড়াতে ব্যক্তিগত জীবনেও হামলা দিয়ে বসেছে।তাঁর জন্য স্ত্রীরা উনাকে ভুল বুঝছে।এর একটা বিহিত করতে হবে তবে বোনের অনুষ্ঠান টা সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়ে যাক আগে।
মাইমুনা আর হাফসা ঘুমোনোর প্রস্ততি নিচ্ছে কেবল।আরহাম হঠাৎ দরজায় নক করতে করতে ওপাশ থেকে বললেন , ‘আমি আপনাদের সাথে ঘুমাতে পারি না?প্লিজ?’
ভিতর থেকে উত্তর আসল, ‘জ্বি না।’
আরহাম আরও দূর্বলসুরে বললেন , ‘প্লিজ।ডিস্টার্ব করবো না।একটুখানি জায়গা হলে হবে আমার।’
‘নিজের ঘরে যান।’
‘তাহলে ফ্লোরে ঘুমাব।তাও আপনাদের সাথে থাকতে দিন প্লিজ।’
‘প্লিজ শাহ।যান ঘুমাবো।’
রাগে দরজায় জোরে একটা আঘাত করতে চেয়েও সামলে নিলেন নিজেকে।বুকের ভেতর এতো যন্ত্রণা হচ্ছে কেন?
সকাল~
ব্রাউন কালার শার্ট আর কালো প্যান্ট,চোখে চশমা আর হাতেঘড়ি এটুকু সাজে বিয়ে তো হয়ে গেলো।তবে বউ নিয়ে কি এ বেশে যাওয়া যায় যেখানে বউয়ের পরনে থাকবে টুকটুকে কমলা শাড়ি।আইরার আবদার,বরকে সাজতে হবে বরের মতোন।বিয়ে কি সে আর করতে পারবে?একবারই তো।
কাকামণি আসছিলেন বিয়ে পরানোর কিছুক্ষণ আগে।তিনি দায়িত্ব নিলেন বাসা গোছগাছ করার।এদিকে হাফসা আর নাওমি কাকামণির সাথে বাসায় চলে গেছেন।যাওয়ার পারমিশন সে নিয়েছিলো আব্বুর থেকে।আরহাম পাশে দাঁড়িয়ে শুধু তাকে দেখছিলেন।নীরব মানুষের পরিবর্তন কতোটা দৃঢ় হতে পারে এই মাপজোখে করছিলেন তিনি।
‘আরহাম তাঁরা দূজন আর বেয়াইকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসো।’
আব্বুর কথার ওপরে একটা কথাও বলেননি আরহাম।তিনিই তাদেরকে পৌঁছে দিয়েছিলেন বাসায়।অথচ ফিরে আসার সময়ও উমায়ের চুপচাপ ছিলেন।বিদায় টাও সুখকর ছিলো না আরহামের জন্য।
ফিরে এসে আরহাম আর মাহের বেরিয়ে গেছেন সপিং করতে।এদিকে হাতে হাত লেগে সব কাজে সাহায্য করছে আইরা নিজেই।বিয়ে তো হয়ে গেছে।এখন আর কাজ করতে তাঁর তেমন লজ্জ্বা হচ্ছে না।মাইমুনার সাথে কাজ শেয়ার করতে করতে সে গত রাতে বরের সাথে একতরফা ঝগড়ার কথাও বাকি রাখলো না।মাইমুনা মুচকি হেসে বললেন , ‘উহু ভারী অন্যায় হয়েছে।তিনি কোথায় তোমার সাথে মিষ্টি আলাপ জমাবেন আর তা না করে তাড়িয়ে দিলেন?’
আইরা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, ‘ভাবি কি করে এর প্রতিশোধ নেওয়া যায় বলুন তো?’
মাইমুনাও মন লাগিয়ে চিন্তা করছেন এরই মধ্যে ব্যাঘাত ঘটালো ফোনের এসএমএস টিউন।
‘আমি আর কখনো এমন করবো না।আপনাদের অজানা রাখবো না কিছু।ক্ষমা করে দিন।আপনাদের ইগনোরেন্স আমি নিতে পারছি না,হানি।’
মাইমুনা উত্তর দিলেন না।মনটা কেন জানি খচখচ করছে তাও নিজের মনকে শক্ত করে নিলেন।
শপিং থেকে বেরোতে বেরোতে বারোটার ওপরে বেজে গেছে।পুরো সময়টুকু আরহাম শুধু হ্যাঁ না উত্তর দিয়েছেন।আরহাম আজকে এতো চুপচাপ কেন মাহের বুঝতে পারছেন না।একবার ভেবে নিলেন, বোনের বিদায়ে হয়তো।আবার অন্যমন বলল,নাহ কিছু একটা হয়েছে।
মাহেরের বাসার দিকে ড্রাইভ করছেন আরহাম।মাহেরের ধ্যান-ধ্যান-দৃষ্টি আপাতত আরহামের দিকেই।ওতো ভাবাভাবি না করে জিজ্ঞেস করেই বসলেন , ‘কি হয়েছে আরহাম?তোমার মন ভালো নেই কেন?’
আরহাম শুকনো হাসি দিয়ে বললেন , ‘উহু কিছু না।’
‘বলার মতো হলে বলো।’
‘তোমার বোন বড্ড জেদী।উনি রাগ হলে কীভাবে উনার রাগ ভাঙ্গাও?’
‘ও একদমই রাগে না।কিন্তু যখন রাগ করে,ও যে জিনিসের জন্য রাগ করেছে তার কথামতো সেটা হতে দিতে হয়,ব্যসস।কিন্তু হাফসা কি করেছে?তোমাকে কষ্ট দিয়েছে?’
‘না না।এমনি জিজ্ঞেস করলাম।’
‘সেটা না বলতে পারো তবে ও কিছু একটা করেছে নিশ্চয়ই।আর সেটা ভালো কিছু নয়।’
‘তুমি বেশি ভাবছো।’
‘আচ্ছা আমি ওকে শাসন করে দিবো।’
আরহাম হালকা হেসে বললেন , ‘না না।আমার বউকে আমি শাসন করবো,আবার আমিই ভালোবাসবো।আমার উইক পয়েন্ট আমার স্ত্রী’রা।তাদের ওপর অন্য কারোর হস্তক্ষেপ আমি পছন্দ করছি না,জামাই সাহেব।’
‘বেশ!আমি ভুলে গিয়েছিলাম আমার বোন পর হয়ে গিয়েছে।’
আরহাম হেসে বললেন , ‘তুমি নেগেটিভলি কেন নিচ্ছো।জানো,তোমার বোন আমাকে ওতোটাও আপন ভাবেন না।কখনো যদি জিজ্ঞেস করি আমার আর তোমার মধ্যে যেকোনো একজনকে বেছে নিতে ,উনি চোখ বন্ধ করে তোমাকে বেছে নিবেন।’
মাহের বেশ প্রাউডফিল করে বললেন , ‘তাহলে তো তুমি লোজার।আমার বোনের মন জয় করতে পারোনি।হা হা।’
মাহের কথাটা মজা করে বললেও বাকি পথটুকু আরহামের মাথায় মাহেরের বলা শেষ কথাগুলোই ছোটাছুটি করছিলো।
এমনকি মাহেরকে নামিয়ে দিতে গিয়েও যখন এক নজরও হাফসার দেখা মিললো না এরপর থেকে আরহাম নিশ্চিত হলেন মাহেরের কথার সত্যতা নিয়ে।
যোহরের নামাজ আদায় শেষেই বরের গাড়ী এসে তাজওয়ার ভিলার উঠোনে থামলো।সকালেই এই বাড়ি থেকে শার্ট-প্যান্ট পরিহিত অবস্থায় বেরিয়েছেন আবার এখন শেরওয়ানি পরে আসছেন ভাবতেই অস্বস্তি হচ্ছে মাহেরের।এই বোকা মেয়েটা এভাবেই পদে পদে উনার হাল বেহাল করে ছাড়বে বোধহয়।মনে মনে স্থির করলেন,একবার শুধু বাগে পান,সব কিছু সুদ-আসল-লাভসহ উসুল করবেন।
আরহামের পরনে নীল রঙ্গের পান্জাবি।আব্বুর পরনে সবুজ।আরহাম এগিয়ে আসছিলেন আর হাফসাও গাড়ি থেকে বেরোচ্ছিলো দেখে আরহাম থমকে গেলেন।দ্রুত পিছু ফিরে দেখলেন আরহামের মামা-চাচারা আশেপাশেই।মাহেরের পরনে শেরওয়ানির সাথে চাদর।যেটা এক কাঁধ আর এক হাতে ফেলে রেখেছেন।আরহাম আচমকা কোনো বার্তাব্যতীত চাদর টা খুলে নিয়ে হাফসার মাথায় জড়িয়ে দিলেন।হাফসার চোখের দৃষ্টি সাথে সাথে অন্ধকার হয়ে এলো।আরহামের তাকে এমন ঢেকে নেওয়ার কারণ বুঝতে পারলো না সে।মাহের পরিস্থিতি বুঝতে পেরে ধীরসুরে বললেন , ‘এই কাহিনী!আমি ভাবলাম তুমি আমাকে রিসিভ করতে এসছো।’
হাফসা আরহামকে অনুসরণ করে করে হাঁটছে।একেবারে ভেতর ঘরে এসে মাথার ওপর থেকে চাদর সরালেন আরহাম।গলডেন কালার গাউনের সাথে সোনালি পুঁথির কাজে তার পোশাকটা চমৎকার লাগছিলো।তাঁর চেহারা ঢেকে থাকলেও পোশাকের সৌন্দর্যে যে কেউ তার দিকে তাকাতে বাধ্য হবে।যেটা আরহাম মোটেও পছন্দ করবেন না।
দূপুরের খাবারের সময় একই টেবিলে বসলেন আরহাম ,মাইমুনা হাফসা,আইরা মাহের সহ পিচ্চিপাচ্চা কাজিনরা।মাইমুনা ,হাফসা দূজনের খুশির যেনো সীমা নেই।মাইমুনা পর্দা ঠিক রেখেই একপাশে বসে পুরো মুহুর্তটুকু ইনজয় করছেন।মাহেরের এসবে কোনো ফিলিংস নেই।হাফসার জন্য তিনি পারছেন না এখান থেকে উঠে যেতে।বিরক্তি লাগছে উনার।এতো হাসি আড্ডা তামাশার মাঝেও আরহামের চেহারায় কোনো হাসি নেই।এককোনায় বুকে হাত বেঁধে নীরবে দেখে যাচ্ছেন তাদের খুশি-আনন্দ।বোনকে বিদায় দেওয়ার যন্ত্রণা টা বহু কষ্টে সামলাচ্ছেন আরহাম।আর এদিকে উনাকে রীতিমতো এড়িয়ে যেতে সফল হওয়ায় উনার দূই প্রিয়তমা হয়তো দারুণ সন্তুষ্ট!
খাবার শেষে দূ পরিবারের সবাই একত্রিত হলো।আংটি বদলের সময় তো মানুষ একটু ধীরেসুস্থে আংটি পরায়।অথচ তার ডাক্তারের যেনো বড্ড তাড়া।বউকে একপাশে রেখে তিনি মুরব্বিদের মাঝখানে বসে তাদের আলাপ আলোচনা খুবই মনোযোগ সহকারে শুনছেন।
আশ্চর্য! সে কি মরা মুরগী? তার কোনো দাম’ই নেই?কি চমৎকার অত্যাচার!
বিকেল এসে দাঁড়িয়েছে।দিন ছোট তাই সন্ধ্যের বেশি বাকি নেই।পুরো সময়টুকু আইরা খুশি ছিলো অথচ বিদায়ের মুহূর্তে আব্বুকে যখন জড়িয়ে ধরছিলো তাঁর সব কষ্ট তখন উন্মুক্ত হলো।সে নিজেই বুঝতে পারলো না তাঁর বুকে বুঝি এতো কান্না জমানো ছিলো।আব্বু নিজেকে অনেকক্ষণ স্ট্রং রাখলেও শেষ মুহুর্ত মোমের মতো নিভে গেলেন।যে মেয়েটা সারাক্ষণ চোখের সামনে ঘুরঘুর করতো,বাসাটা মাতিয়ে রাখতো তাঁর সাথের দূরত্ব নাকি এখন দূই মাইল।আম্মুকে জড়িয়ে ধরে সে প্রচন্ড কেঁদেছে।আম্মু হাউমাউ কাঁদতে কাঁদতে বারবার আওড়াচ্ছেন, ‘আমার বাচ্চা পাগলিটা দূরে চলে যাচ্ছে,আমার বাচ্চা…’
মাইমুনার থেকে যখন বিদায় নিচ্ছিলো মনে হচ্ছিলো সে তাঁর হৃদয়ের এক অংশকে ফেলে আসছে।মাইমুনা তাঁর ভাবি নয়,মাইমুনা হচ্ছে তাঁর বেস্ট ফ্রেন্ড,বেস্ট সিস্টার,বেস্ট লাভার।অন্যসব আপনদের থেকে বিদায় নিয়ে যখন ভাইয়ের সামনে আসলো আরহাম চুপচাপ বোনকে জড়িয়ে নিলেন।উনার বুকে বাজতে থাকা ধড়ফড়ানি আইরা নিশ্চয়ই স্পষ্ট শুনতে পারছে।বুকের ভেতর আতশবাজির ন্যায় গো’লা ফুটছে।কি নিষ্ঠুর সে যন্ত্রণা!
হাফসা লক্ষ্য করলো আইরার সাথে আলিঙ্গনে আরহামের চোখ থেকে বিরামহীন অশ্রু ঝড়ছে।হৃদয়ে তীব্র দাবানল,অথচ মুখে টু শব্দ নেই।তাহলে এই যন্ত্রণা কি করে পরিমাপ করা যায়?
মাহেরের সাথে আলিঙ্গন শেষে আরহাম বললেন , ‘এমন একটা দিন,ঠিক তুমি যেমন কাঁদতে কাঁদতে তোমার বোনকে আমার হাতে আমানত দিচ্ছিলে আজকে ঠিক এমনভাবে আমি দিলাম।মাহের,আমার বোন তোমাকে পছন্দ করে একথা জানার পর আমি তোমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে দ্বিতীয়বার ভাবিনি কেন জানো,কারন আমি তোমাকে বিশ্বাস করি,ভরসা করি।তুমি যেমন চাও তোমার বোনের হৃদয়ে একটুও আঁচড় না লাগুক আমিও তেমন চাই।আমার জেরি’কে ভালো রেখো।সবার জন্য তুমি কঠিন হও,কিন্তু আমার বোনের কাছে যখন আসবে সে যেনো তোমাকে তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত প্রিয় বন্ধু মনে করে ,এ দায়িত্ব তোমার।তোমার থেকে কষ্ট পাওয়া কোনো কান্না যেনো আমার বোনের চোখে কোনোদিন না আসে।’
মাহের তাকে আশ্বস্ত করলেন।বন্ধুর হৃদয়ের তীব্র যন্ত্রণা তিনি অনুভব করতে পারছেন কারণ এমন একটা দিনের সাক্ষী উনি নিজেই।
আব্বু তার কাঁধে হাত রেখে বললেন , ‘ইয়াং ম্যান।আমি শুধু চাই আমার মেয়েটা ঠিক এরকম বাচ্চা থাকুক।সে আমাদের ছোট্ট বাচ্চা।কখনো যদি আমার মেয়ের মধ্যে এই বাচ্চা বাচ্চা বিহ্যাভিওর মিসিং পাই,আমি মনে করবো তার হৃদয় তুমি আহত করেছো।তুমি সেই সুযোগ দিও না যাতে আমি কোনোদিন জিজ্ঞেস করতে পারি যে, ‘আমার প্রিন্সেসের বদলে যাওয়ার কারণ কী!’
এক হৃদয়ভাঙ্গা আলিঙ্গননিয়ে আব্বু উনার বার্তা সম্পূর্ণ করলেন।সবার চোখ অশ্রু টলমল।আব্বু গাড়িতে তুলে দিলেন আইরাকে।হাফসা শেষ মুহুর্ত আরহামের সামনে এসে দাঁড়ালো।আরহাম চোখ না তুলে অনুমতি দিয়ে বললেন , ‘সাবধানে যাবেন।’
অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৩৯
গাড়িতে উঠা থেকে বাসায় পৌঁছা অব্দি আইরা তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিল আর অন্যদিকে হাফসার দমবন্ধকর এক বিদঘুটে অনুভূতি হচ্ছিল।শুধুমাত্র আপুর কমিটমেন্টে সে আটকানো,নাহলে এতো কষ্ট পেতে দিতো না লোকটাকে।উনার চোখের বর্ষা আজ,আর তাঁর হৃদয়ে কি করে বসন্ত বইবে?
