৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৬
রুপান্জলি
মির্জা বাড়ির প্রতিটি কোনায় কোনায় উৎসবের ছোয়া,, হল রুম জুড়ে বিচরন করছে মেহমানদের আনাগোনা। সাথে প্রেস মিডিয়া,, সাংবাদিকদের ঝড় তুলেছে মির্জা বাড়ির আনাচে কানাচে। এই শহরে এমন কোনো মানুষ নেই যে জোহান-বিহানকে চিনেনা। ছয় বছর আগে যেই জোহান-বিহান রমনার অলিতে গলিতে আলোরন ছড়াতো আজ তাদের জীবনে আলোর রেখা ফুটতে চলেছে। দুই ভাই শেরওয়ানিতে পড়ে রেডি হয়ে আত্নীয় স্বজনদের সাথে কথা বলছে। কথা আত্মিয় স্বজনদের সাথে বললেও তাদের নজর সিরির দিকে। এইতো কিছু সময়ের মধ্যে তাদের বউরা বধু সেজে নিচে নেমে আসবে। যদিও দ্বীপের বউটা কথা শুনবে কিনা সন্দেহ । জোর করে পার্লারের মহিলাদের কাছে রেখে তো এলো,, এবার বাধ্য মেয়ের মতো সাজলেই আলহামদুলিল্লাহ!! দ্বীপের ভাবনার মাঝে একপাশের সিরি দিয়ে বধু সাজে নেমে এলো মেধা। দ্বীপের ভয়কে সঠিক প্রমান করে দিয়ে আগের পোষাকেই নিচে নেমে এলো অর্পনা,, একপাশের সিরি দিয়ে মেধা নামলেও সবার নজর দ্বীপ মির্জার বউয়ের উপর স্থির। অর্পনাকে নরমাল পোষাকে দেখে অনুষ্ঠানে থাকা প্রতিটি মানুষের মনে নানান প্রশ্নের উদয় হলো। নতুন বউ বিয়ের দিন নরমাল জামা কাপর পরে নিচে নামছে এটা কেমন কথা হলো? অর্পনাকে নিচে নামতে দেখে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলো দ্বীপ,, একদম সামনাসামনি দাড়িয়ে অর্পনার গালে হাত রেখে বললো — এনিথিং রং ভেলোরা? ড্রেস চেন্জ করোনি? তোমাকে না বউ সাজতে বললাম,, সাজলেনা কেনো? এখন অন্তত জেদ করিস না সোনা। বিয়েটা করে নেই তারপর নাহয় রাগ করে থাকিস,,
,,, ফুসে উঠলো অর্পনা,, শরীরের সকল শক্তি দিয়ে ধাক্কা মারলো দ্বীপের বুকে। শিরিতে দাড়িয়ে থাকার ফলে আকষ্মিক ধাক্কায় দ্বীপ কয়েক সিরি পিছিয়ে গেলো। অর্পনা আবারও ধাক্কাতে ধাক্কাতে বললো
— কি ভেবেছেন? জোর খাটিয়ে আমাকে দিয়ে সব করাতে পারবেন? কাঠের পুতুল আমি? যখন বলবেন, নাচ আমার ময়না তুই পয়সা পাবিরে,, তখনি দু হাত তুলে ধেই ধেই করে নাচতে শুরু করবো? নাহ!! নাচবো না। আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমাকে দিয়ে কিচ্ছু করানো যায়না। আর বিয়ে? তাও আপনার মতো সেইমলেস কাপুরুষকে? যে কিনা ভরা সভায় নিজের বউকে কাজের মেয়ে বলে পরিচয় দেয়,, তাকে বিয়ে করবো আমি? আমার জীবনে এতোটা অকাল পরেনি।বুঝেছেন আপনি?
,,,দ্বীপ অর্পনাকে টেনে নিজের কাছে নিয়ে এলো,, আবারও গাল আকরে ধরে বললো — সোনা!! তখনকার জন্য আমি সরি। দেখো, ঐ সময় কেউ শিউর ভাবে জানতো না আমি তোমার কথা বলেছি কিন্তু এখন এটা নিয়ে সিনক্রিয়েট করলে সবাই জেনে যাবে যে, আমি তোমার কথাই বলেছি। সোনা আমার শান্ত হও। চলো শান্ত মাথায় বিয়েটা করে নেই তারপর বাসর ঘরে যত রাগ দেখানোর দেখিও, আমি মাইন্ড করবো না।
,,, অর্পনা মানলো না,, কেনো মানবে সে? এসব লুতুপুতু অনেক দেখেছে সে। যখন অপমান করবে তখন পায়ের তলার পাপোশ বানিয়ে রাখবে আর যখন লুতুপুতু করবে তখন মাথায় তুলে রাখবে। দরকার নেই তার এসব ভালো ব্যাবহারের। অর্পনা আবারও চেচিয়ে বললো — জানুক,, সবাই জানুক আমি সেই কাজের মেয়ে,, যে দিন রাত আপনার সাথে ছিলো। আপনার সাথে থেকেছে,, ঘুমিয়েছে,, খেয়েছে,, সব সব করেছে। অথচ আমি মেইড,, জাস্ট মেইড। এতো আয়োজন করেছেন আমায় খুশি করতে? অথচ আমি দেখছি আপনি আমার আত্মসম্মানের দাফন কাফনের ব্যাবস্থা করেছেন। আমার আত্মসম্মানের দাফন না করে আমার দাফন করে দিন। আপনার এই দয়ার জীবনে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া ভালো। মরতে চাই আমি,, মুক্তি দিন।
,,,অর্পনার মুখে মরার কথা শুনে নিজেকে ঠিক রাখতে পারলোনা দ্বীপ। রাগের মাথায় ওর চোয়াল চেপে ধরে শাসিয়ে বললো — মরবি? কু*ত্তার বাচ্চা!! মরার এতো সখ তর? যেই বুঝলি দ্বীপ মির্জা তর প্রতি দূর্বল অমনি কষ্ট দেওয়ার পায়তারা, তাইনা? তাহলে মর, যাহ!! তর মতো মেয়ে আমার জীবনে না থাকলে কি হবে? মরে যাবো? মরলে মরবো। যাহ!! দরজা খোলা আছে,, (সবার দিকে ইশারা করে) এই সর,, এটাকে যেতে দে,, কেউ আটকাবিনা। যে আটকাবি, তার জান নিয়ে নিবো আমি। এই তুই এখনো দাড়িয়ে আছিস কেনো? যা, যাহ!!
,,, বলতে বলতে মৃধু ধাক্কায় নিজের থেকে অর্পনাকে সরিয়ে দিলো,, সাথে সাথে সরে গেলো সবাই। দ্বীপ মির্জার আদেশ অমান্য করার মতো সাহস তাদের নেই। দ্বীপের কথায় প্রথমে অবাক হলো অর্পনা,, ভাবতে পারেনি এতো সহজে যেতে দিবে। তবে এটা ভালোই হলো,, এই বাড়িতে থাকার মিনিমাম ইচ্ছাটুকু ও তার নেই। অর্পনা রাগে জিদ্দে চলে যাওয়ার জন্য হাটা দিলো। হাটতে হাটতে অর্ধেকটা পথ পেরোতেই ওকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলো কেউ। পেট জড়িয়ে কাধে থুতনি রেখে কানের লতিতে উষ্ঠ ছোয়ালো। চুলের ভাজে চুমু দিতে দিতে অসহায় কন্ঠে বললো —
,,,যাসনা ভেলোরা,, যাসনা।
,,,অর্পনা কিছুটা থমকালো,, পিছনে দাড়ানো মানবটির আদুরে স্পর্শে চোখ বুঝে নিলো। বুকের ভিতরটা ঢিপ ঢিপ করছে,, এমনকি দ্বীপের বুকে চলা কম্পন,, শ্বাসের গতি ও টের পাচ্ছে অর্পনা। তবে টললো না বরং হালকা রাগি স্বরে জানতে চাইলো — কেনো থাকবো আমি? ভালো তো বাসেন না,, বেচে থাকার জন্য প্রয়োজন বলে রাখতে চাচ্ছেন?
,,, দ্বীপ অর্পনাকে আরও শক্ত করে আকরে ধরলো,, ঘাড়ে নাক ঘষে লম্বা শ্বাস টেনে খুব আছতে করে ফিসফিসানো স্বরে গাইলো — জানরে তুই জানরে,, বেচে থাকার তুই কারন। ওরে জানরে,, আমার জানরে,, ভুলে যা না সব বারন।
,,,দ্বীপের নরম স্পর্শ,, অসহায় ডাক,, আদুরে বারনে গলে গেলো অর্পনা। নিজের শক্ত আবরন খানা ধরে রাখতে পারলোনা। ছলছল নয়নে ফিরে তাকালো দ্বীপের দিকে,, অত্যন্ত আবেগি কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো — আর ভালোবাসা? ভালোবাসবেন?
,,, দ্বিপ চোখ সরিয়ে নিলো,, সে ভালোবাসতে পারবেনা। মেয়েটা তার অভ্যাসে পরিনত হয়েছে,, ছেড়ে থাকতে কষ্ট হয়। বেচে থাকার জন্য,, শান্তিতে বাচার জন্য তার অর্পনাকে প্রয়োজন কিন্তু ভালোবাসা অন্য বিষয়। সে চাইলেও মন খুলে ভালোবাসি কথাটা বলতে পারবেনা,, ভিতর থেকে শব্দটা আসতে চায়না। দ্বীপের চুপ থাকা,, নজর ফিরিয়ে নেওয়া,, পেটে রাখা হাতের বাধন ঢিলে হয়ে যাওয়া,, অর্পনাকে উত্তর দিয়ে দিলো। দ্বীপ তাকে ভালোবাসেনা,, আর না কখনো বাসবে। রাগে খোবে আবারও ধাক্কা দিলো দ্বীপকে, তবে দ্বীপ এক চুল ও নড়লো না। ওকে সরাতে না পেরে ছিটকে নিজেই দূরে সরে গেলো অর্পনা। পাশে সাজানো ফুল ধানি গুলো থেকে একটা ফুল ধানি ধাক্কা মেরে মেঝেতে ফেলে দিলো। অর্পনার এহেন কান্ডে হকচকিয়ে গেলো সবাই। দ্বীপ এগিয়ে আসতে নিলে অর্পনা নিচু হয়ে ফুলদানির ভাঙা অংশ নিজের গলায় চেপে ধরে বললো — শেষ করে দিবো নিজেকে,, একদম শেষ করে দিবো। আমার কাছে কেউ আসবিনা তরা। তরা সব সার্থপর ,, এই দুনিয়ায় আমার পাপ্পা ছাড়া কেউ নেই। আমি আমার পাপ্পার কাছে যাবো। কেউ আটকাতে এলে সব ধ্বংস করে দিবো। কসম!!
,,,বলতে বলতে আরও একটা ফুলদানি ধাক্কা মেরে ফেলে দিলো,, মেধা ওকে থামানোর উদ্দশ্যে এগিয়ে আসতে চাইলে অর্পনা হিতাহিত জ্ঞান হাড়িয়ে ওর দিকে ফুলদানির অংশ ছুড়ে মারতেই দ্বীপ এসে মেধার সামনে দাড়িয়ে পরলো,, ভাঙা অংশটি ছিটকে এসে দ্বীপের বুকে লাগতেই সাথে সাথে মেধাকে আগলে নিলো বিহান। দ্বীপ এবার শান্ত, অবিচল ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে অর্পনার দিকে। মেধার চোখে পানি টইটম্বুর করছে,, তার খুব শখ ছিলো আজ থেকে নতুন জীবন শুরু করার কিন্তু তা বোধয় তার ভাগ্যে নেই।
পরশি আরিবকে জড়িয়ে ধরে এক পাশে দাড়িয়ে আছে। মাহিদ মির্জা গালে হাত দিয়ে হুইল চেয়ারে বসে আছেন,, শাহিন মির্জা, মাহিন মির্জা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে। রোমানা বেগম আতঙ্কে প্রায় কাদো কাদো অবস্থা,, সাথি বেগম মেঝো জাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। বাড়ির মেহমানরা দাড়িয়ে মজা দেখছে আর প্রেস মিডিয়ার লোকজন সেসব ভিডিও করছে। হয়তো গতকাল শহরে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর সংবাদ হতে যাচ্ছে মির্জা বাড়ি এবং দ্বীপের বৈবাহিক সম্পর্ক নিয়ে। দ্বীপ সেসব নিয়ে আপসেট নয়,, এমনকি এই বাড়ির কেউ ই সেসব ভেবে আতঙ্কিত হচ্ছেনা। তাদের মেইন ফোকাস অর্পনার উপর ,, ওর হাব ভাব দেখে বুঝা যাচ্ছে মেয়েটা নিজের মাঝে নেই। উপরের শক্ত আবরন আর ভিতরের কোমল হৃদয়ের গেড়াকলে পরে নিজেকেই নিজে হাড়িয়ে ফেলেছে। এই মুহুর্তে মেয়েটা যদি নিজের ভালো মন্দ কিছু করে বসে? তখন কি হবে? মাহিদ মির্জা চিন্তিত ভঙ্গিতে বললেন — অর্পন!! মা আমার,, এসব ছাড়ো,, তুমি আমার কাছে আসো মা। এই উজবুকের বাচ্চার কাছে তোমায় থাকতে হবেনা। আমিও তো তোমার বাবা,, আসো বাবার কাছে আসো।
,,,ভাঙচুর করা হাতটা থেমে গেলো,, ফুসতে ফুসতে মাহিদ মির্জার দিকে ফিরে তাকালো অর্পনা। শাহিন মির্জা ও সমান হাড়ে বললেন– শান্ত হও আম্মু, আমরা দ্বীপকে অনেক শাস্তি দিবো। একদম তোমার কাছে ভিরতে দিবো না। আসো আম্মু,, আসো।
,,মাহিন মির্জা পরশীর উদ্দেশ্যে বললেন — পরশী!! বড়ো ভাবির কাছে যাও,, দেখো হাত পায়ে লেগেছে কিনা।
,,,পরশি আরিবকে ছেড়ে অর্পনার কাছে যেতে নিলে রোমানা বেগম দ্রুত এগিয়ে গেলেন,, অর্পনাকে ছুতে নিলে দূরে সরে গেলো অর্পনা। আবারও ভাঙা টুকরো গলায় চেপে বললো — এসব মায়া আমার চাইনা। আমি পাপ্পার কাছে যাবো,, আমাকে যেতে দেওয়া হোক। আমি এই বাড়িতে থাকবো না,, কারোর বারন ও মানবো না। আমায় জোর জবরদস্তি করলে এটা একদম গলায় ঢুকিয়ে দিবো। সত্যি!!
,,, বলতে বলতে সদর দরজার দিকে এগিয়ে গেলো অর্পনা। ওর গলায় ফ্লাওয়ার বাসের ভাঙা অংশ দেখে গার্ড কিংবা সাংবাদিকরা আটকানোর সাহস করলো না।তবে দ্বীপ ধীরে ধীরে একপা একপা করে এগুতো লাগলো। খুব সন্তর্পণে একটু একটু করে এগিয়ে গিয়ে হাত বাড়িয়ে সেকেন্ডের গতিতে অর্পনার কোমর জড়িয়ে নিজের কাছে নিয়ে এলো। অর্পনা ধাম করে এসে দ্বীপের বুকের উপর আছড়ে পরলো। হাতে থাকা ভাঙা অংশটা অবলিলায় দ্বীপের বুকে এসে দেবে গেলো। যার ফলে চামড়া বেধ করে হালকা রক্ত বের হয়পছে। অর্পনা রক্ত দেখে স্থির হয়ে গেলো, দ্রুততার সাথে ভাঙা অংশটা টেনে তুলে ফেললো। দ্বীপ অবিচল ভাবে অর্পনার দিকে তাকিয়ে আছে,, অর্পনার খুব মায়া হলো দ্বীপের জন্য তবে টললো না। নিজেকে ছাড়াতে আবারও গলায় ভাঙা অংশ চেপে ধরতে নিলে দ্বীপ ওর হাত টেনে পিছনে নিয়ে বিহানের উদ্দেশ্য বললো — একটা হেন্ডকাফ দেতো,, ওর এই ডানা ঝাপ্টানো বন্ধ করে দিচ্ছি। বে*য়াদব একটা, কিছু হলেই হাত চালাবে।
,,, ফুসে উঠলো অর্পনা,, তরপাতে তরপাতে বললো — আই কিল ইউ দ্বীপ মির্জা,, রিয়্যাললি কিল ইউ।
,,, রাগে অর্পনার নাক, গাল লাল হয়ে গিয়েছে। দ্বীপ লোভ সামলাতে পারলো না,, সবার সামনেই টপাটপ চুমু খেলো অর্পনার লাল হয়ে যাওয়া নাকে পরপর গালেও কয়েকটা খেয়ে ফিসফিস করে বললো — ওমম!! আচ্ছা,, চলো রুমে যাই। খুন টা নাহয় ওখানেই করো,, আমার কোনো সমস্যা নেই বেইব।
,,৷ বিহানের ইশারায় সত্যি সত্যি ই একজন গার্ড হেন্ডকাফ নিয়ে এলো তবে সেটা পড়ানোর আগেই দ্বীপের বুকে ঢলে পরলো অর্পনা। থমকে গেলো দ্বীপ , দ্রুত অর্পনার মাথাটা বুক থেকে তুলে গালে চাপর মেরে কয়েকবার ডাকলো। ডাকতে গিয়ে খেয়াল করলো,, বউ তার হম্বিতম্বি করতে গিয়ে ঘেমে নেয়ে একশা। লম্বা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে এদিক ওদিক ছড়িয়ে আছে। দ্বীপ আবারও সন্তোর্পনে অর্পনার মাথাটা বুকে রেখে দুহাতে সবগুলো চুল একসাথে করে নিলো। তারপর অতি যত্ন সহকারে পেচিয়ে পেচিয়ে খোপা করার চেষ্টা করলো কিন্তু হচ্ছেনা,, বার বার ছুটে যাচ্ছে। বড়ো ভাইয়াকে এতো কষ্ট করতে দেখে এগিয়ে গেলো পরশী। নিজের মাথায় থাকা গার্ডারটা এগিয়ে দিয়ে বললো — ভাইয়া!! এটা দিয়ে আটকে দাও।
,,,দ্বীপ আবারও যত্ন সহকারে চুলগুলো পেচিয়ে খোপা করে গার্ডার দিয়ে আটকে দিলো। গার্ডার আটকাতেও বেশ হিমসিম ফেয়েছে বেচারা,, এর আগে কারোর চুলে গার্ডার বাধা হয়নি। তার উপর বউয়ের চুল গুলো খুব ঘন,, গার্ডারের ভিতর আটতেই চায়না। চুল বাধা শেষ হলে বউকে কোলে তুলে নিলো দ্বীপ। মেধার দিকে একবার তাকিয়ে আদুরে কন্ঠে বললো —
,,, বিয়েটা করে নে,, তর ভাবি এখন মরে গেলেও আমায় বিয়ে করবেনা। আগে মন জুগাই তারপর নাহয় মেডামের অনুমতি নিয়ে বিয়েটা করবো। সবাই আগের মতো ইনজয় করো,, আমি আমার বউকে সামলাতে গেলাম।
,,,সময়টা ২০ সালের মাঝামাঝি,, আদ্রিয়ান তখন অনার্স ফোর্থ ইয়ারের স্টুডেন্ট। সে ছোট থেকেই আমেরিকান কালচারে বড়ো হয়েছে। ভার্সিটি পড়ুয়া কালিন তার দুজন বাংলাদেশি ফ্রেন্ড ছিলো। যার ফলে বন্ধু মহলের সাথে আড্ডা দিতে গিয়ে বরাবরই একটা মেয়ের নাম শুনতো,, “” পৃথা জামান “” এই নামের মেয়েটার গানের গলা নাকি খুব সফ্ট, স্মুথ এবং মোহনীয়। একবার শুনলে শুধু শুনতেই ইচ্ছা করে,, একদম নেশা ধরে যাওয়ার মতো কন্ঠ স্বর। আদ্রিয়ান নিজেও গান গাওয়ায় বেশ পারদর্শী। ভার্সিটিতে বরাবরই গানের জন্য ট্রফি, ম্যাডেল জিতেছে। বহুবার গানকে প্রোফেসন হিসেবে বেছে নেওয়ার অফার ও পেয়েছে তবে আদ্রিয়ান এসবে আগ্রহ দেখায়নি।সে বরাবরই খুবি অহংকারি,, তার মতে গান গায় নিম্ন বিত্তরা,,,টাকার অভাবে নিজের কন্ঠ বিক্রি করে জীবন পরিচালনা করে। এসব লেইম কাজকে সে কখনোই প্রোফেসন হিসেবে বেচে নিবেনা। সেই মনোভাব থেকে পৃথা জামানকেও তার নিম্ন বিত্ত মনে হতো,, আর নিম্নবিত্ত মানুষদের আদি খুব একটা পছন্দ করতো না। আদির মা বরাবরি অহংকার নিয়ে চলতেন,, বিদেশিনী বলে কথা। সেদিক থেকে বলতে গেলে আদি অনেকটা তার মায়ের মতোই হয়েছে। প্রথম দিকে আগ্রহ না দেখালেও একটা সময় একপ্রকার ঈর্ষান্মিত হয়েই পৃথা জামানের আইডি সার্চ করলো আদ্রিয়ান। দেখতে চাইলো কি এমন গলা মেয়েটার? যে তার বন্ধু মহল তার গান রেখে ঐ মেয়ের গানের প্রশংসা করে? সার্চ করতেই পেইজ টা পেয়ে গেলো,, ফলোয়ার্স সংখ্যা আনুমানিক ৬৭ k এর মতো। আদ্রিয়ান তাচ্ছিল্য হাসলো,, বাহ!! ভালোই,, টাকা কামানোর মতো জায়গায় পৌছে গিয়েছে,,, হত দরিদ্র হলে যা হয় আরকি। আদ্রিয়ান এক প্রকার অবজ্ঞা স্বরুপ পেইজে থাকা গানের ছোট ছোট ক্লিপ্স গুলোর মধ্য থেকে একটা গানে ক্লিক করলো। সাথে সাথে কানে বাজলো একটা সুমিষ্ট স্বর–
,,ভ্রোমর কইয়ো গিয়া,, শ্রী- কৃষ্ণ বিচ্ছেদের অনেলে,,
অঙ্গ যায় জ্বলিয়ারে,, ভ্রমণ!! কইয়ো গিয়া,,,,
,,,থমকে গেলো আদ্রিয়ান,, এতো মোহনীয় স্বর সে আগে কখনোই শুনেনি। একপ্রকার মাদকের ন্যায় একটার পর একটা ক্লিপ্সে ক্লিক করতে লাগলো। একটা সময় সব গান শেষ হয়ে গেলে আবার শুরু থেকে শুনতে লাগলো। মূহুর্তের মধ্যে পৃথা জামানের গাওয়া গানের প্রেমে পড়ে গেলো আদি। কমেন্ট বক্স চেক করতেই জানতে পারলো,, পৃথার নিদিষ্ট কোনো ফোন নেই, সে তার পাপ্পার ফোন দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে গান গেয়ে পোস্ট করে। তার পাপ্পা নাকি গান গাওয়া পছন্দ করেনা তাই। তবে খুব শিগ্রই পাপ্পার অনুমতি নিয়ে সে একটা ফোন কিনবে। পৃথার এই বাচ্চাসুলভ কথা গুলো পড়ে আদ্রিয়ানে আগ্রহ বাড়লো। সারাক্ষণ চাতক পাখির ন্যায় অপেক্ষা করতো কখন পৃথা জামান একটা গান গেয়ে পেইজে পোস্ট করবে। আদ্রিয়ান ফেইক আইডি দিয়ে পৃথাকে বহু বার মেসেজ করেছে তবে ওপাশে মেসেজ পৌছায়নি। কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করলে শুধু লাভ রিয়্যাক্ট কিংবা লাইক ব্যাতিত তেমন কোনো সারা পায়নি।
এই বিষয় গুলোতে বড্ড আশাহত হলো আদ্রিয়ান,, একপ্রকার উন্মাদের মতো খুজতে লাগলো,, কে এই পৃথা জামান? পৃথা জামানকে খোজার উদ্দেশ্য বার বার বাংলাদেশে আসতো, তবে খুজে পায়নি। এভাবেই কেটে যায় একটা বছর। এর মধ্যে অর্পনা আদ্রিয়ানকে প্রপোজ করে। এমনিতেই সে নিম্নবিত্ত মানুষদের পছন্দ করতো না তার উপর অর্পনার স্বভাব ছিলো ছেলেদের মতো। বারবিকাট হেয়ার,, টিশার্ট, ট্রাউজার, উগ্র চলাচল,, ছেলেদের মতো হাটা চলা সবকিছু মিলিয়ে অর্পনার আগা গোড়া পুরোটাই অপছন্দের ছিলো। তাই অর্পনার প্রপোজ পেয়ে তার মাথায় রাগ উঠে গিয়েছিলো। মনে জমে থাকা সকল অহংকার,, উগ্রতা ঢেলে দিয়েছিলো অর্পনার উপর। সেদিন অর্পনাকে বের করে দেবার পর অর্পনা মলেস্ট হয়েছিলো,, এটুকু জানতে পেরে প্রথমে আদ্রিয়ানের মনে অনুশোচনা কাজ করছিলো। এতো রাতে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া বোধহয় ঠিক হয়নি,, তবে সেই অনুশোচনা টুকু বেশিক্ষণ স্থায়ি হলো না। তার মতে,, ছেলেদের মতো চলাচল করা মেয়েদের ছেলেরা মলেস্ট করতে পারে নাকি? কি আছে ওর মাঝে? দেখতে তো ছেলেদের মতোই লাগে।
ছেলেরা আবার ছেলেদের মলেস্ট করে নাকি? যে ওকে মলেস্ট করতে যাবে । এসব শুধু শুধুই নাটক,, যেনো আদ্রিয়ানকে দোষারোপ করে তার ঘাড়ে অসভ্য মেয়েটাকে গছিয়ে দিতে পারে। আকষ্মিক ভাবে সেই ঘটনার পর টানা এক বছর পৃথা জামান আইডি থেকে কোনো গানের ক্লিপ্স পোস্ট করা হয়নি। আদ্রিয়ান তখন পাগল প্রায়,, কেনো পৃথা গান পোস্ট করছেনা? কি হয়েছে ওর? একটার পর একটা কমেন্ট করতে লাগলো,, মেসেজ ডেলিভার্ড না হওয়া সত্তেও বার বার মেসেজ পাঠাতে লাগলো কিন্তু ওপাশ থেকে নো রেসপন্স। তারো একমাস পর হঠাৎই পৃথা জামান আইডি থেকে নটিফিকেশন আসে,, “‘ পৃথা জামান ইন লাইভ”” মেসেজটি পাওয়ার সাথে এক প্রকার উন্মাদের ন্যায় লাইভে এড হলো আদ্রিয়ান। তবে আশানুরূপ কিছুই পেলো না,, সে ভেবেছিলো পৃথা জামানকে দেখতে পাবে কিন্তু অন্ধকারে একটা ছায়া ব্যাতিত কিছুই দেখতে পেলোনা।
এক রমনি অন্ধকার রুমে বসে গিটারে টুংটাং শব্দ তুলে গান গাইছে। অবয়ব অনুযায়ী শুধু গিটারের কিছু অংশ,, মেয়েটির লম্বা কেশ,, আর ছিমছাম দেহের গড়ন ব্যাতিত কিছুই বুঝা যাচ্ছিলো না। আদ্রিয়ান এই অভয়ব দেখে আরও উন্মাদ হলো,, এতোদিনে গান শুনতে শুনতে মেয়েটার প্রতি আসক্তি ধরে গিয়েছে,, এখন যেনো সেই আসক্তি ভালোবাসার রুপ নিলো। সে আবারও বাংলাদেশে বেক করলো,, শত শত লোক লাগালো শুধু এই পৃথা জামানকে খুজে বের করার জন্য। বরাবরই অশাহত হলো,, কোনো উপায় না পেয়ে পৃথার আইডিতে একের পর এক মেসেজ দিতে দিতে ইনবক্স ফুল করে ফেললো। পৃথা সবসময় লাইভে আসতো না, কখনো এক সপ্তাহ,, কখনো এক মাস,, আবার কখনো দুমাস – চারমাস ছাড়িয়ে যেতো। আদ্রিয়ান চেয়ে চেয়ে দেখতো,, একটা ক্লু পাওয়ার আশায় ডিটেকটিভের মতো পর্যবেক্ষণ করতো। এই পর্যবেক্ষণ স্বরুপ একটু ক্লু পেয়েছিলো আদ্রিয়ান,, সেটা হলো পৃথার গিটারে সবসময় একটা রুমাল বাধা থাকতো। মৃধু আলোয় রুমালের কালার না দেখলেও সাইজ, প্যাচের ধরন মাথায় সেইভ করে রেখেছিলো। খুজতে খুজতে টানা নয় মাস সতেরো দিন পর পৃথার দেখা পেলো আদ্রিয়ান। এবার বাংলাদেশে আসার সময় সেই বাংলাদেশি বন্ধুরাও এসেছিলো। তাদের সাথেই মিট করার উদ্দেশ্যে ঢাকা ভার্সিটিতে গিয়েছিলো,, ঘুড়তে ঘুড়তে একটা ফ্রেন্ড সারক্যালের উপর নজর পরলো।
একটা শ্যাম বর্নের ছেলে একটা সুন্দরী মেয়ের চুল ধরে টেনে দিলো,, তারপর সেই মেয়েটি উল্টো শ্যাম বর্নের ছেলেটির চুল টেনে ধরে মাথা ঝাকাতে লাগলো। আরেকটা সুন্দর ছেলে মেয়েটার পক্ষ নিয়ে সেই শ্যাম বর্নের ছেলেটির পিঠে ধুপ ধাপ কিল বসালো। আরেকটা ইনোসেন্ট মেয়ে টেনে টুনে তিনজনকে দূরে সরিয়ে ঝগড়া মিটমাট করার চেষ্টা করছে। আদ্রিয়ান কৌতুহল বসত এগিয়ে গেলো সেদিকে,, এতো সুন্দর ফ্রেন্ড সারক্যাল খুব কম ই দেখা যায়। এগিয়ে যেতে যেতে হঠাৎই খেয়াল করলো একটা মেয়ে বড়ো বরো কদম ফেলে তাকে ক্রস করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে,, মেয়েটার কাধে একটা গিটার,, গিটারের মাথায় রুমাল পেচানো,, চুলগুলো কোমর ছাড়িয়ে হাটুর উপরিভাগ পর্যন্ত। ঘন কালো, রেশমের ন্যায় চুলে একটা ফ্লাওয়ার গার্ডার আটকানো,,
পরনে লুজ টিশার্ট আর জিন্স,, পায়ে ছেলেদের মতো চটি। আদ্রিয়ান সেসবে খেয়াল করলো না, তার নজর মেয়েটার চুল আর ঐ গিটারে যা তাকে বার বার পৃথার কথা মনে করে দিচ্ছে। তখনি আকষ্মিক ঐ চারজনের মাঝে সুন্দর ছেলেটা ধমকে উঠলো “”পৃথার বাচ্চা!! এতো দেরি করলি কেন?”” নাম শুনে থমকে গেলো আদ্রিয়ান । এটাই তবে পৃথা,, সেই পৃথা জামান। এক মুহুর্ত ও অপেক্ষা করলো না সে,, আগ পিছ না ভেবেই দৌড়ে গিয়ে পৃথা নামক মেয়েটাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল। সাথে সাথে পেটে শক্তিশালী হাতের ঘুষি পরতেই ছিটকে দূরে সরে গেলো আদ্রিয়ান। কিছু বুঝে উঠার আগে চাপা, কাধ, বুক, পা সবখানে একটার পর একটা আঘাত এসে লাগলো,, মার খেয়ে যতটা অবাক হয়েছে তার থেকেও হাজার গুন অবাক হয়েছে অর্পনাকে দেখে। অর্পনা এতোক্ষণ অন্য কাউকে ভেবে মারলেও যখন দুজনার চোখাচোখি হলো তখনি মার থামিয়ে ভ্রু কুচকে আদ্রিয়ানের দিকে তাকালো। আদ্রিয়ান বুক, কাধ ঘষতে ঘষতে অবাক কন্ঠে সুধালো — অর্পন!! তোমার নাম পৃথা? পৃথা জামান?
,,,অর্পনা কিছু বললো না,, আদ্রিয়ানকে না দেখার ভান করে বন্ধুদের নিকট এগিয়ে গেলো। কনফিউস্ড আদ্রিয়ান নিজের মনের দোলাচল মিটাতে সোজা ফোন করলো সুস্মিতা কাইসারের মোবাইলে। কোনো ভনিতা ছাড়াই জানতে চাইলো অর্পনার নাম পৃথা কিনা? সুষ্মিতা কাইসার জানালেন,, ওর পুরো নাম পৃথা জামান অর্পনা। এই চরম সত্যিটা শুনে বড্ড অবাক হয়েছিলো আদি,, তবে অর্পনা আগে থেকেই তাকে ভালোবাসতো সেটা ভেবে মনে মনে খুশি হলো। কষ্ট করে আর পটাতে হবেনা, তার ভালোবাসার মানুষ তাকে আগে ৎেকেই ভালোবাসে। আবারও দৌড়ে গেলো অর্পনার সামনে অথচ মেয়েটা তাকে চিনলো না। না চিনার ভান করে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে লাগলো। তার পরের সময় গুলো আদি অনেক চেষ্টা করেছে অর্পনার মন পেতে তবে মেয়েটা তার দিকে ফিরেও তাকায়নি।
সেবারের পর আর আমেরিকায় ফিরেনি আদ্রিয়ান,, সে সর্বক্ষণ অর্পনার পিছন পিছন ঘুরতো। বিনা বেতনে ভার্সিটি জয়েন্ট করলো,, আরশাদ জামানের মন গলিয়ে দিনের পর দিন অর্পনাদের বাড়িতে পরে রইলো,, মায়ের সাথে সম্পর্ক খারাপ করলো,, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হলো তাও অর্পনার মন পেলো না। একটু খানি গললো না ঐ পাষান মানবীর মন। বলতে বলতে আদ্রিয়ানের চোখের কোনা দিয়ে জল গড়ালো। তার সামনে বসে থাকা ইরা মনোযোগ দিয়ে শুনলো পুরো কাহিনি । তার এসব শুনে খুব দম বন্ধ লাগছে,, ইস্স অর্পনাকে কতোটা তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা হলো। মেয়েটা কত কি সহ্য করলো। আর সে কিনা আগে অর্পনাকে ভুল বুঝতো, অর্পনাকে পাষান ভাবতো, আদ্রিয়ানের জন্য মায়া করতে করতে ভালোবেসো ফেললো। এতোটাই ভালোবাসলো, যতটা ভালোবাসলে ধর্ম বর্ন ত্যাগ করার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।
ইরা মনে মনে ঠিক করলো সে এই অহংকারি মানবের জন্য মুসলিম হবে,, একটু সাহারা পেলে ভালোবেসে সকল কষ্ট ভুলিয়ে দিবে। অর্পনা যেমন দ্বীপ নামক লোকটাকে ভালোবেসে পাগল থেকে সুস্থ মানবে পরিনত করতে পেরেছে,, তেমন করে সেও আদ্রিয়ানের মনে অসুখ সারিয়ে তুলবে। নতুন একটা জীবন শুরু করবে দুজনে মিলে। ইরার ভাবনার মাঝে হসপিটালের বেডে শুয়ে থাকা আদ্রিয়ান নরম স্বরে বললো — তোমায় ছোট বোন মানি বলে পুরো অতিতটা তুলে ধরলাম। আমায় খুব খারাপ চরিত্রের অধীকারি বলে মনে হচ্ছে তাইনা? আমারও মনে হয়,, আসলেই আমি খারাপ। আমার মন মানসিকতা খারাপ ছিলো,, আমি মানুষকে তার স্টেটাস দিয়ে নির্বাচন করতাম। কি করবো বলো? ছোট থেকে এসবি দেখে এসেছি,, আমার বাড়ির মানুষ গুলোর কাছে ভালোবাসা, মানবিকতার কোনো স্থান নেই। তারা শুধু টাকা বুঝে আর স্টেটাস।
,,, সবগুলো কথা মানলেও ছোট বোন কথাটা আঘাত করলো ইরাকে,,, এমনি সে নাজুক,, কারোর উপর জোর করতে পারেনা। ভালোবাসা নিয়ে জোর করার মতো কাজ সে করতেই পারবেনা, তাই নরম স্বরে জানতে চাইলো — এরপর? কি করতে চান? অর্পনাকে ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করবেন নাকি নতুন করে জীবন শুরু করবেন?
,,, আদ্রিয়ান মলিন হাসলো, নাকের এক পাশে আর কপালের মাঝখানটায় এখোনো ব্যাথা করছে। বসর্তমান সময়টা রাত ১ টার কাছাকাছি । অর্পনাকে দ্বীপ নিয়ে গিয়েছে ছয়টার দিকে আর আদ্রিয়ানকে ছাড়া হয়েছিলো সাতটার দিকে। সে নিজেকে নিজের রুমে আবিষ্কার করতেই অবাক হয়ে গিয়েছিলো। সে তো অর্পনার সাথে গাড়িতে ছিলো তাহলে নিজের ফ্লাটে আসলো কি করে? পরোক্ষনেই মনে পরলো দ্বীপের আগমন,, অর্পনাকে নিয়ে যাওয়া,, সব মনে পরতেই আদ্রিয়ানের মাথাটা কেমন চক্কর কাটলো। কপালের মধ্য ভাগটা তিব্র যন্ত্রণায় নীল হয়ে নাক গলিয়ে রক্ত পরছিলো। ইট্স অ্যা পেনিক অ্যাটাক,, দ্বীপ যখন বুঝলো সে প্যানিক অ্যাটাক করেছে তখনি ইমার্জেন্সি নম্বরে কল দিলো,, তবে খুব একটা সুবিধা হলো না। ওপাশ থেকে কল ধরলেও সে কিছুই বলতে পারলো না,, অজ্ঞান হয়ে আবারও পড়ে রইলো বিছানায়। এরপর চোখ মেলতেই নিজেকে হসপিটালে আর চোখের সামনে ইরাকে দেখতে পেলো। সেসব ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেললো আদ্রিয়ান,, দম টেনে ভাঙা স্বরে বললো —
,, আমার ছায়ায় সে একটু বিশ্রাম নিয়েছিলো মাত্র, গন্তব্য তো ছিলো অন্য কারোর কাছে। সে আমার তাকদির শুন্য করে তার তাকদিরে থাকা মানুষ টার কাছে চলে গিয়েছে। আমার শত যন্ত্রণা, আফসোসের দাম দেওয়ার মতো সামান্য পরিমান আগ্রহ তার মাঝে নেই। সে আমার জীবনটা অন্ধকারে ডুবিয়ে অন্যের জীবনে আলো হয়ে উঠেছে,, সাহারা পেলে হয়তো দুজন মিলে নতুন এক পৃথিবী গড়ে তুলবে। যেই পৃথিবীর নিজ চোখে দেখার মতো সামর্থ্য আমার নেই,, তাই আপাতত আমার ছুটি।
,, আদ্রিয়ানের কথায় চমকালো ইরা,, ছলছল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে সুধালো — মরে যাবেন নাকি ছেড়ে যাবেন?
,,,আদ্রিয়ান মলিন হেসে বললো — মরে তো কবেই গিয়েছি,, দেহটা দাফন করা বাকি। করতে সাহায্য করবে? মেরে দাও আমায় ইরা,, এই মুহুর্তে যে আমায় মুক্তি দিতে পারবে তার থেকে আপনজন এই পৃথিবীতে আর কেউ রবেনা। আমি তোমার কাছে আখিরাতেও কৃতজ্ঞ থাকবো ইরা, আমায় মুক্তি দিবে?
,,ইরার চোখে পানি জমলো,, ভাঙা স্বরে বললো — দিবো, তবে মেরে নয় বাচিয়ে দিয়ে আপনাকে মুক্তি দিবো স্যার। একটু অপেক্ষা করুন।
৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৫
,,, কথার বিপরীতে কোনো উত্তর এলোনা। অনেকটা সময় ধরে ইরা আদির দিকে তাকিয়ে রইলো। আদির চোখ বন্ধ ,, বুঝলো উনি আর কথা বাড়াতে চায়না। ইরা কফি আনার উদ্দেশ্যে ক্যাবিনের বাহিরের দিকে পা বাড়াতেই কানে এলো —
,,, সপ্তাহ খানিকের মাঝে আজীবনের জন্য আমেরিকায় বেক করছি। বাংলাদেশে আর নয়।
