Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৬ (২)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৬ (২)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৬ (২)
রুপান্জলি

রাতের অধারের ন্যায় অন্ধকারে ছেয়ে আছে মির্জা বাড়ির এক কোনার বিশাল রুমটি, ক্ষনে ক্ষনে ফোপানোর স্বর শুনা যাচ্ছে। বিহান একবার অসহায় দৃষ্টিতে মেধার দিকে তাকালো। এই মুহুর্তে হাসবেন্ড হিসেবে মেধাকে কাছে টেনে নেওয়ার কথা থাকলেও বিহান পারছেনা,, তার সেই অনুমতি নেই। দুজন দুজনকে ভালোবাসার সত্ত্বেও তাদের মাঝে যোজন যোজন দূরত্ব । বিহান চাইলেই মেধাকে ছুতে পারেনা,, ছুতে গেলেই মেধা রেগে যায়,, ভুল বুঝে,, ভাবে বিহান ওকে কাছে পাওয়ার উদ্দেশ্যে ছুতে চায়। তাই প্রথম প্রথম হুটহাট মেধাকে জড়িয়ে ধরলেও এখন আর সেটা হয়ে উঠেনা। গত এক ঘন্টা যাবত বিছানার গা ঘেঁষে মেঝেতে হাটু মুড়ে বসে চোখের পানি ফেলছে মেধা। যখনি একটু সুখের আশা করে তখনি সেটা কোনো না কোনো ভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। কথা ছিলো বিহানের এক্সাম শেষ হলে দুজনের ধুম ধাম করে বিয়ে হবে,, একটা সুন্দর সংসার হবে,, বাচ্চা কাচ্চা হবে কিন্তু হলোনা। বিয়ে হলো ঠিকি তবে একটা সংসার হলোনা। আসলে তার ভাগ্যটাই খারাপ,, তার কপালে সুখ নেই। ভাবতে ভাবতে শব্দ করে ফুপিয়ে উঠলো মেধা। এবার আর নিজেকে আটকাতে পারলো না বিহান, দ্রুত পায়ে মেধার কাছে এসে মেঝেতে হাটু মুড়ে বসে পরলো। মেধার কাধে হাত রাখতে গিয়েও সরিয়ে নিলো। পরপর অত্যন্ত কাতর স্বরে বললো — বউ তোমাকে একটু ছুবো? রাগ করবে? আমি অসৎ উদ্দেশ্যে ছুবোনা জান। তুমি একটু আমার কাছে আসো, দেখবে মন খারাপ অনেকটা কমে এসেছে।

,,,বিহানের কাতর স্বর শুনে হাটু থেকে মাথা উচিয়ে বিহানের দিকে তাকালো মেধা, পরপরি ঝাপিয়ে পরলো বিহানের প্রসস্থ বুকে। পরনের শেরোয়ানি খামচে ধরে ফোপাঁতে ফোপাঁতে বললো — সরি, সরি বিহান। আমি তোমায় খুব কষ্ট দেই তাইনা? আমি একটু ও ভালো বউনা। বরাবরি তোমার হক নষ্ট করে এসেছি। আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হইয়োনা তুমি। আমাকে মাফ করে দাও, সরি সরি সরি! ”
,,, মেধাকে বার বার সরি বলতে দেখে মেধার মাথায় হাত ভুলালো বিহান। খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরার ইচ্ছা থাকলেও সাহস করে উঠতে পারছেনা। বিহানের সাহারা না পেয়ে মেধা নিজ উদ্দমে বিহানের হাত টেনে পিঠে রাখলো পরপর নাক টেনে ভাঙা কন্ঠে সুধালো — মাফ করবেনা?
,,, মেধাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো বিহান,, চুলের ভাজে চুমু দিতে দিতে বললো — আমি তোমার প্রতি একটুখানিও অসন্তুষ্ট নই বউ। আমি বরাবরই তোমার উপর সন্তুষ্ট। তুমি তো আমার ভালো বউ,, আমার রানি তুমি। এভাবে কান্না করোনা সোনা,, তোমার শরীর খারাপ করবে।

,,, মেধা মানলো না, সমানে ফুপাতে লাগলো। তাদের তো একটা সুন্দর সংসার হওয়ার কথা ছিলো কিন্তু হয়নি। এই সংসার না হওয়ার পিছনে বিহানের কোনো দোষ নেই, সব অন্যায় মেধার পক্ষ থেকে। সে বিহানকে কাছে ঘেষতে দেয়নি,, ভালোবাসেনি,, ভালোবাসা গ্রহন করেনি। কিন্তু এবার আর দূরে সরে থাকবেনা। বিহানকে ভালোবাসবে,, বিহানের ভালোবাসাও গ্রহণ করবে। ভাবতেই মাথা উচিয়ে বিহানের কণ্ঠনালিতে উষ্ঠ ছোয়ালো মেধা। স্পর্শটা স্বাভাবিক ছিলো না,, চমকে গেলো বিহান। মেধাকে জড়িয়ে রাখা হাতটা সহসা ঢিলে হয়ে এলো। বিষয়টা বুঝতে পেরে বিহানের বুকে নাক ঘষলো মেধা,, নাক টেনে অত্যন্ত আবদারের সহিত বললো — আদর দাও,, আমি আর আমাদের মাঝে দূরত্ব চাইনা,, ভালোবাসো আমায়।

,,,বিহান যেনো বিষ্ময়ের চুড়ায় পৌঁছে গেলো। দ্রুততার সাথে মেধার মাথাটা বুক থেকে তুলে কপালে শক্ত চুম্বন করলো পরপর মেধার ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যাওয়া গালের প্রতিটি ক্ষততে উষ্ঠ ছোয়ালো। এমনটা সে বরাবরই করে। মেধা যখন বিহানকে সামান্য প্রশ্রয় দেয় তখন বিহান মেধার বাম গালে উষ্ঠ ছোয়ায়। নিজের প্রান প্রিয় স্ত্রীকে উপলব্ধি করাতে চায় তার সবচেয়ে দূর্বল জায়গাটাই বিহানের সবচেয়ে বেশি পছন্দ। আদরে আদরে দূর্বল জায়গাটাকে সবল করে দিতে চায়। গালে, মুখে, থুতনিতে অসংখ্য চুম্বন করে বিহান নরম স্বরে বললো — বউগো!! বিশ্বাস করো আমি তোমার প্রতি একটু খানিও অসন্তুষ্ট নই। আমার ওসব লাগবেনা সোনা,, তুমি শুধু এভাবেই সবসময় আমার কাছে থেকো,, আমায় ভুল বুঝোনা,, আমাকে সবসময় তোমার খারাপ সময়ে সঙ্গে নিও। আর কিছু লাগবেনা জান!! এতেই আমি পরিপূর্ণ।

,,, স্বামীর আদুরে কথায় বিগলিত হলো মেধা,, আল্লাহ তাকে কতো সুখ দিয়েছেন অথচ সে কিছুক্ষণ আগেও সুখের আশায় তরপাচ্ছিলো। বিহানের গলা জড়িয়ে ধরলো মেধা কোলের উপর বসে আবারও আবদার মাখা কন্ঠে বললো — ভালোবাসোনা,, অনেকটা ভালোবাসো। যতটা ভালোবাসলে আমাদের মাঝে নিক পরিমান দূরত্ব থাকবেনা ঠিক ততোটা ভালোবাসো।
,,, শক্ত পোক্ত ঢোক গিললো বিহান, তার চোখে মুখে অবিশ্বাস। নিজেকে ঠিক রেখে সংকোচিত কন্ঠে সুধালো — সত্যি ই ভালোবাসবো? রাগ করবেনা?
,,, মেধা ঠোঁট উল্টে মাথা ঝাকালো, মানে রাগ করবেনা। পরপর নাক টেনে ফিসফিস করে বললো — বাসোনা,, এমন করছো কেনো? একটু বাসো।
,,, কাপা কাপা হাতে মেধার গাল দুটো আকরে ধরলো বিহান,, দুজনের নজর দুজনের মাঝে স্থির। এই চোখে হাজারো ভাষা,, ভালোবাসার ভাষা। এই ভাষা তারাই বুঝবে,, যারা ভালোবেসেছে কিংবা ভালোবাসায় মজেছে। বিহান সন্তর্পণে মেধার উষ্ঠ যুগল নিজের আয়ত্তে নিয়ে নিলো। দুজনের প্রতিক্রিয়াই সমান ছিলো,, বিহান যত্ন সহকারে তার প্রান প্রিয় স্ত্রীকে ভালোবাসার সৌন্দর্যের মর্মার্থ বুঝিয়েছে আর মেধা তার স্বামিকে বুঝিয়েছে ,, স্বামীর প্রতি তার নিগুঢ় আনুগত্যতা। দুজন মিলে ডুব দিয়েছে ভালোবাসার অতল সাগরে,, যেখানে কোনো বাধ – বিচার,, ন্যায় -অন্যায়ের স্থান নেই, আছে শুধু ভালোবাসা আর ভালোবাসা।
( ইট্স বাসর 🤗)

,,কুয়াশার আবরনে চারপাশ ঢাকা। অবস্থান রত জায়গা হতে ১০ – ১২ হাত জায়গা স্পষ্ট,, তার পর থেকে কুয়াশার ঘনত্ব শুরু। এমন এক কুয়াশাময় ভোরে পায়ে হেটে পাহারের চুড়ায় উঠছে এক জোড়া কপত কপতি। দ্বীপ অর্পনাকে কোলে নিয়ে পাহারের কোল ঘেষে উঠে যাচ্ছে আর অর্পনা চুপটি করে দ্বীপের বুকের কাছের স্যাুট খামচে ধরে শুয়ে আছে। দুজনার দৃষ্টি দুজনার মাঝে স্থির। হাটতে হাটতে পাহাড়ের চুড়ায় এসে পৌছাতেই অর্পনা দ্বীপের বুক থেকে মাথা তুলে আকাশ পানে তাকালো। পরপর আবার দ্বীপের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টে অত্যন্ত বাচ্চাসুলভ ভঙ্গিতে বললো — আকাশ কোথায়? কিছুই তো দেখা যাচ্ছেনা।

,,, অর্পনার উল্টানো ঠোঁটে টুপ করে চুৃুমু খেলো দ্বীপ,, পরপর নরম কন্ঠে সুধালো — আকাশ পরে দেখো,, এখন আমার দিকে তাকাও। যতক্ষণ না সূর্য এসে উকি দিচ্ছে ততোক্ষণ তুমি আমাকে দেখবে আর আমি তোমাকে।
,,,,অর্পনা মিষ্টি করে হাসলো,, দ্বীপের গলা জড়িয়ে মাথাটা উচু করতেই দ্বীপ অর্পনার উদ্দেশ্য বুঝতে পারলো। সহসা মুখ নামিয়ে আনলো অর্পনার মুখের সামনে,, তাদের মধ্যেকার দূরত্ব কয়েক সেন্টিমিটারের মতো হবে। দূরত্ব গুচিয়ে দ্বীপ যেইনা অর্পনার উষ্ঠ ছুতে নিবে অমনি একটা বিকট শব্দে দুজনেই থমকে গেলো।পিঠে গুলি লাগতেই অর্পনাকে নিয়ে ধপ করে মাটিতে বসে পরলো দ্বীপ৷ অর্পণার আত্মাটা ছলাৎ করে উঠলো,, দ্বীপ!! দ্বীপকে কেউ গুলি করেছে? অর্পনার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে,, বড়ো বড়ো দম ফেলে দ্বীপের বুকে মাসাজ করতে লাগলো,, কিছুটা সময় যেতেই নজর স্থির করলো সামনে থাকা যুবকের পানে। যুবকটি নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। অর্পনা এদিক ওদিক তাকিয়ে জায়গাটা পর্যবেক্ষণ করতেই বুঝতে পারলো তারা নিজেদের রুমে,, নিজেদের বিছানায় শুয়ে আছে,, আর দ্বীপ তাকে আদরের সহিত বুকের মাঝে লুকিয়ে রেখেছে।

তারমানে ওরা কোথাও ঘুড়তে টুরতে যায়নি? দ্বীপের গায়েও গুলি লাগেনি? বুঝতে পেরে স্বস্থির নিশ্বাস ফেললো অর্পনা। পরোক্ষনেই নিজের অবস্থান দেখে অসন্তুষ্ট হলো। সে দ্বীপের বুকে ঘাপটি মেরে শুয়ে আছে,, মুখ ঠেকেছে দ্বীপের উন্মুক্ত গলায়। অর্পনা খেয়াল করলো দ্বীপের গায়ে একটা সেন্ডো গেঞ্জি বাধে আর কিছুই নেই। ড্রিম লাইটের গোল্ডেন আলোয় দ্বীপের প্রসস্থ বুক চকচক করছে,, অর্পনা নজর ফিরিয়ে নিলো। এর আগে কখনোই দ্বীপের উন্মুক্ত বক্ষ তার নজরে আটকায়নি,, পুরো আট টা মাস নিজেকে যথেষ্ট সন্জোমে আবদ্ধ রেখেছে সে,, আজো তাই করলো। এসব মিছে মোহয় পরে নিজের আত্মসম্মান বিলীন করা উচিৎ নয়। অর্পনা দ্বীপের বুক থেকে সরে যেতে চাইলে খেয়াল করলো দ্বীপের বুকের বাম পাশে একটু উচুতে রক্ত জমাট বেধে ফুলে আছে। পরোক্ষনেই নজর পরলো গলার ক্ষতয়,, সেখানেও একই অবস্থা । অর্পনার চোখ দুটো জ্বালা করে উঠলো,, এই প্রতিটি ক্ষত তার দ্বারা হয়েছে,, সে কিভাবে পারলো দ্বীপের বুকে কাচ বিধাতে?

একটুখানি হাত কাপলো না? জ্বালা করা চোখ দুটোতে পানি জমলো,, অর্পনা নাকের উপরে মাসাজ করতেই আবার সেগুলো মিলিয়ে গেলো। নিজের উপর থেকে দ্বীপের হাত এবং পা ধীরে ধীরে সরিয়ে বিছানা থেকে উঠে বসলো। কয়েক কদম হেটে ড্রয়ার খুলে ফাস্ট এইড বক্স এনে আবারও বিছানায় হাটু মুড়ে বসলো। খুব সন্তর্পণে দ্বীপের ডান হাতটা টেনে কোলের উপর রাখলো। তাতে অনেকগুলো ছোট ছোট ক্ষত দৃশ্যমান। অর্পনা মুখ নামিয়ে সেই ক্ষততে ছোট ছোট চুমু একে দিলো পরপর ধীরতার সাথে ড্রেসিং করে ঔষধ লাগিয়ে দিলো। ক্ষত গুলো গভীর না হওয়ায় বেন্ডেজ করার প্রয়োজন পরলো না। তবে গলায় আর বুকের ক্ষতগুলো তরতাজা ছিলো তাই সেগুলো ড্রেসিং শেষে মলম লাগিয়ে ওয়ান্ট্যাম লাগিয়ে দিলো। কাজ শেষ করে দ্বীপের মুখের দিকে তাকালো অর্পনা। এই পুরুষটাকে সে ভালোবাসে,, খুব ভালোবাসে তবে পুরুষটা তাকে ভালোবাসেনা।

হয়তো আগলে রাখতে চায়,, কাছে থাকতে চায় তবে এই কাছে থাকা, আগলে রাখা সম্পর্কে অর্পনা থাকতে চায়না। সে তো কখনোই কারোর ভালোবাসা পায়নি অথচ পাওয়ার কথা ছিলো। কথা তো কতোকিছুই থাকে তবে সবার ভাগ্যে তা জুটেনা। কিশোরী বয়সে একজনকে ভালোবেসেছিলো,, তবে সে মুল্য দেয়নি। সেদিন আদ্রিয়ান রিজেক্ট করেছে বলে অর্পনার কোনো কষ্ট নেই,, কষ্ট তো তখনি হয়েছিলো যখন আদি আর তার পরিবার তাকে অসভ্য, অভদ্র, উগ্র আরও নানান কঠাক্য পূর্ন কথা বলেছিলো। অথচ তাকে সভ্য বানানোর জন্য কেউ ছিলোনা,, কেউ আসেনি সেদিন,, যেদিন তার খুব করে একটা মায়ের প্রয়োজন ছিলো। তাকে সভ্য বানানোর দায়িত্বটা তো কাইসার বাড়ির বড়ো মেয়ের হাতে ছিলো,, সে কেনো নিজের দায়িত্ব পালন করলো না? মারা এতো সার্থপর হয় নাকি কাইসার বাড়ির মানুষ গুলোই সার্থপর?

তাহলে দ্বীপ এমন কেনো? সে ভালো না বাসুক তাতে কোনো অভিযোগ নেই অর্পনার। ভালোবাসার জন্য একটা টানের প্রয়োজন,, যেটা না চাইতেই হয়ে যায়। আর যদি না হয় সেখানে জোর খাটেনা। তাই ভালো না বাসায় অর্পনার কোনো কষ্ট নেই কিন্তু সেদিন সবার সামনে তাকে মেইড বলাটা সার্থপরতা নয়? সে তো কোনোকিছুর বিনিময়ে দ্বীপের পাশে থাকেনি,, প্রথমে মায়া হয়েছিলো এরপর ভালোবাসা। এই দুটো কারনেই দ্বীপের পাশে থেকেছে সে,, অথচ দ্বীপ তাকে বিনিময় প্রাপ্ত মেইড বললো। সমস্যা নেই!! অর্পনা তো পাথর,, পাথরকে চাইলেই আঘাত করা যায়। এইযে চলতি পথে মানুষ পাথরের সাথে কতো হোচট খায়,, হোচট খাওয়ার পর কতো আর্তনাদ করে,, কেউ কেউ তো রাগে পাথরটাকে ফের লাত্থি মেরে দূরে সরিয়ে দেয়। কই কেউ তো কখনো পাথরের খোজ নেয়নি,, তার আর্তনাদ শুনতে চায়নি। সেও তো আঘাত পেয়েছিলো কিন্তু তার কোনো মুল্য নেই। কারন সে পাথর,, পাথরদের সব সহ্য করার ক্ষমতা থাকে। অর্পনাও তাই,, তার মতো পাথরদের চাইলেই আঘাত করা যায়,, লাত্থি মেরে দূরে সরিয়ে দেওয়া যায়। তবে অর্পনাদের অভিযোগ থাকেনা, অভিযোগ করতে হয়না। ভাবনা রেখে সোফার দিকে এগিয়ে গেলো অর্পনা,, এতো রাতে ঝামেলা করতে ইচ্ছা করছেনা,, শরীরটাও খুব উইক লাগছে তাই সোফায় গিয়ে গুটিশুটি মেরে শুয়ে পরলো।

,,,অনেকটা সময় পর অর্পনা যখন ঘুমের দেশে তলিয়ে গেলো দ্বীপ তখন চোখ মেলে তাকালো। বউটা তাকে নিরবে ভালোবেসে নিশ্বব্দে পালিয়ে গেলো যেনো কেউ বুঝতে না পারে,, অথচ দ্বীপ বুঝে। বউয়ের মনের ভিতরে লুকায়িত ভালোবাসাটুকু উপলব্ধি করতে পারে। আর সেই ভালোবাসাকে সে মন থেকে সম্মান করে। দ্বীপ বিছানা ছেড়ে উঠে দাড়ালো,, কয়েকপা এগিয়ে অর্পনার কাছে গিয়ে তাকে কোলে তুলে নিলো। বিছানায় এনে শুইয়ে দিয়ে নিজেও পাশাপাশি শুয়ে পরলো। বিষয়টা পাশাপাশি পর্যন্ত থেকে থাকলো না,, সন্তর্পনে বউয়ের বুকে মুখ গুজে দিয়ে সাপের মতো আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরলো দ্বীপ। অর্পনাও স্বভাব সুলভ ঘুমের ঘোরে দ্বীপের চুলের ভাজে এক হাত ঢুকিয়ে অন্য হাত পিঠে রেখে মাসাজ করতে লাগলো। যেমনটা সে গত আট মাস ধরে করে এসেছে। দ্বীপ সন্তুষ্ট হাসলো,, এমন একটা বউ পাওয়া ভাগ্যই না বরং সৌভাগ্যের বিষয়। আর এমন ভাগ্যকে দ্বীপ কখনোই দূরে সরতে দিবেনা। প্রয়োজন বুকের বাম পাশে গর্ত খুরে তাতে বউকে লুকিয়ে রাখবে তবো হাড়িয়ে যেতে দিবেনা।

,,,ফোনের কর্কষ শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো পল্লবের। ঘুম ঘুম চেখে বালিশের তলা থেকে ফোন বের করতেই দেখতে পেলো ” ভুতের আড্ডা” গ্রুপ থেকে ভিডিও কল এসেছে,, বিরক্ত হলো পল্লব । এটা কল দেওয়ার সময়? রাত বাজে ২ টা ২৮। এতো রাতে গ্রুপে কল দেওয়ার কি মানে? বিরক্ত হয়ে কল ইগনর করে আবারও বালিশে মুখ গুজে শুয়ে পরলো। কিছুটা সময় ঝিম মেরে শুয়ে থাকার পর অর্পনার কথা মনে এলো। তার তো ৬ টায় ফ্লাইট ছিলো,, সময় অনুযায়ী যদিও এখোনো পৌছানোর সময় হয়নি। তবুও যদি কোনোভাবে অর্পনা কল করে থাকে? ভেবেই আবারও বালিশের তলা থেকে ফোন বের করলো। ঘুম ঘুচোখো হোয়াটসঅ্যাপ এ ঢুকে গ্রুপ কলে এড হতেই শুনা গেলো অরুনের অসহায় স্বর —

,,, রাত!! এই, কি হয়েছে তর? আমাকে এভাবে ইগনর করছিস কেনো? সরাসরি কল দিলে ধরছিস না, রাত, এই, রা,,,
,,,,, কল থেকে বেড়িয়ে এলো পল্লব ,, ঠোট নাড়িয়ে দুটো গালি ছুড়লো। প্রেম করার হলে পারশোনাললি কল দিয়ে প্রেম কর। ফ্রেন্ড সারক্যালের গ্রুপে কল দিয়ে প্রেম করা, এটা কেমন কথা হলো? বিরক্তিকর!! পল্লব বিছানা ছেড়ে উঠে বসলো,, এখন তার ঘুম হবেনা। একটা রিফ্রেশমেন্টের প্রয়োজন আছে। কয়েক পল এগিয়ে আলমারির সবচেয়ে গোপন জায়গা হতে একটা প্যাকেট বের করলো। মধ্যরাতে বারান্দায় দাড়িয়ে সি*গারেট খাওয়ার মাঝে একটা আমেজ আছে,, এটুকু সবসময় পাওয়া যায়না। পল্লব বারান্দায় দাড়িয়ে একটা সি*গারেট ধরলো,, দূর থেকে স্ট্রিট লাইটের আলো এসে বারান্দাটা হালকা আলোকিত করে তুলছে। এই আধো আলো- আধো ছায়ায় আকাশ পানে ধোয়া ছাড়লো পল্লব। সে একটা সুস্থ ফ্যামিলির সন্তান। পরিবারে তেমন একটা ঝুট জামেলা নেই। বাবা একটু রাগি হলেও মা খুব নরম । বাবা মায়ের সাথে পল্লবের বন্ডিং ও খুব ভালো। দুটো বোন আছে একটা বড়ো আরেকটা ছোট। বড়ো বোনের বিয়ে হয়েছে বছর চার হবে,, ছোট বোন ক্লাস টেইনের স্টুডেন্ট। ছোট বোনের সাথে পল্লবের সম্পর্কটা ঝগড়াঝাটির হলেও বড়ো বোনের সাথে সম্পর্কটা বর্তমানে খুব স্মুথ। বিয়ের আগে অবশ্য বড়ো আপুর সাথে ভালোই ঝগড়াঝাঁটি হতো তবে এখন আর হয়না। সেদিক থেকে দেখতে গেলে পল্লবের জীবনে কোনো কষ্ট, অভাব কিংবা শুন্যতা নেই তবুও বুকের একাংশ ফাকা ফাকা লাগে।শুষ্ক ঠোঁট জোড়া সি*গারেটের দাবানলে ঝলসে যাওয়ার পায়তারা করে। এই কাঙ্ক্ষিত জিনিসটাকে খুব সন্তর্পণে লুকি রাখতে হয়,, যখন তখন চাইলেই খাওয়া যায়না। বাড়িতে বাবা, বোনের থেকে লুকিয়ে রাখতে হয় আর ভার্সিটিতে অর্পনার থেকে। মেয়েটা স্মোকিং পছন্দ করেন। তাই ওকে কষ্ট দিবেনা বলে ভার্সিটি যাবার আগে খাওয়া হয়না। আর বাড়িতে ফিরার আগে বাবা বোনের ভয়ে খাওয়া হয়না। বাবা যদি কোনো ভাবে জানতে পারে তাহলে সোজা পায়ের নলি কেটে হাতে ধরিয়ে দিবে আর ছোট বোন জানলে টুপ করে বাবার কাছে নালিশ ঠুকে দিবে। ভেবেই ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো পল্লব,, আবারও টান বসালো অর্ধপোড়া সি*গারেটে।

,,, নামাজ পড়ে রুমে এলো দ্বীপ,, মাথা থেকে টুপিটা খুলে টি টেবিলে রাখতে রাখতে ঘাড় ঘুরিয়ে একবার অর্পনার দিকে তাকালো। দ্বীপের ঘাড় ত্যারা বউটা এক হাতে পেট চেপে কোমর বাকিয়ে শুয়ে আছে। সন্দেহ হলো দ্বীপের,, বউটার কি পেট ব্যাথা করছে নাকি? সন্দেহ বসত এগিয়ে গিয়ে বিছানার কাছ ঘেষে দাড়াতেই বিষয়টা মস্তিষ্ক ক্যাচ করে নিলো। দ্রুততার সাথে ওয়াশরুম পেড়িয়ে কাবার্ড রুমে গেলো। খুজে খুজে প্রয়োজনীয় জিনিস গুলো কালেক্ট করে অর্পনার এক সেট জামা নিয়ে ওয়াসরুমের হেঙ্গারে রাখলো। বাথটবে ঠান্ডা পানি ভর্তি করে তাতে গিজার সেট করা শাওয়ার থেকে কিছুটা পানি এড করলো যেনো পানিটা কুসুম গরম মনে হয়। ফিরতি রুমে এসে মেঝেতে হাটু ভাজ করে অর্পনার পাশাপাশি বসলো,, মুখের দিকে হালকা ঝুকে কোমল স্বরে ডাকলো–

,,,বউ, ও বউ!! ৪২ কেজি!! এই হাফ ফুট!! আমার ময়না পাখি উঠো। আর কতো ঘুমাবা? ভেলোরা!!
,,, আদুরে ডাকের সাথে কিছু খোচা মারা কথা কানে যেতেই ঘুম ঘুম চোখ মেলে তাকালো অর্পনা। দ্বীপকে নিজের উপর ঝুকে থাকতে দেখে মুখ ফিরিয়ে অন্য দিকে তাকালো যার ফলে অর্পনার গাল আর গলার এক পাশ দৃশ্যমান হয়েছে। সুযোগটা হাতছাড়া করলো না দ্বীপ,, দ্রুত মাথা নামিয়ে টুপ করে অর্পনার গালে চুমু খেলো। অর্পনা দাতে দাত চেপে দ্বীপের মুখ সরাতে চেয়ে প্রশ্ন করলো — কি সমস্যা? এতো সকালে ডাকাডাকি করছেন কেনো? আর আমি এখানে কেনো? গতকাল আমার কথা বুঝতে পারেননি? আমি আপনার এই পা*দের বাড়িতে এক মুহুর্ত ও থাকতে চাইনা। সরুনতো ,, মুক্তি দিন আমায়।

,,, অর্পনার কথায় ঠোঁট টিপে হেসে দিলো দ্বীপ, বাধা দেওয়া হাতটা হাতের ভাজে নিয়ে গলায় মুখ গুজে দিলো। লম্বা শ্বাস টেনে নরম স্বরে জিজ্ঞেস করলো — কি বললে? কিসের বাড়ি?
,,, গলায় দ্বীপের নরম স্পর্শ পেয়ে না চাইতেও চোখ বুঝে নিলো অর্পনা সেই সাথে দ্বীপের সামনে এরকম একটা ভাষা বলে ফেলায় লজ্জাও পেলো। দ্বীপ সেটা বুঝতে পেরে অর্পনার গলায় শক্ত চুম্বন করে বললো — লজ্জা পেতে হবেনা,, আমরা আমরাই তো। স্বামির কাছে বউকে লজ্জা পেতে নেই আর পেলেও স্বামীর দায়িত্ব হলো খুব যত্নের সাথে আদর করে সেই লজ্জা ভেঙে দেওয়া। আমি খুব শিগ্রই তোমার সকল ভনিতা দূর করে দিবো সোনা, আর কটাদিন।

,,, কথাগুলো স্বাভাবিক ভাবে বললেও এগুলোর অর্থ বুঝতে অসুবিধা হলোনা অর্পনার। মনে মনে ব্যাথিত হলো,, পুরুষ মানুষ এরকম হয়? ভালোবাসা ছাড়া কাউকে ছোয়া যায় বুঝি? হয়তো যায়,, তাইতো এমন কথা বলতো পারে। তবে অর্পনা এসব মানবেনা,, সে কোনো পন্য নয় যে চাইলেই ইউজ করা যাবে। অর্পনা বিরক্তিকর শব্দ করে দ্বীপকে সরাতে চাইলে দ্বীপ নিজে থেকেই সরে গেলো। পরপর অর্পনাকে পাজাকোলা করে ওয়াসরুমের দিকে পা বাড়িয়ে বললো — সিক বলে ছেড়ে দিলাম নয়তো আমার থেকে ছাড়া পাওয়া এত্তো ইজি না।
,,দ্বীপের কথায় সম্ভিত ফিরলো অর্পনার,, নিজের অসুস্থতার বিষয়টা দ্বীপের কাছে ধরা পরেছে বুঝতে পেরে আরও আরষ্ঠ হলো মেয়েটা। এমনি পেটে ব্যাথা,, এজন্যই বোধহয় গতকাল এতো উইকন্যাস কাজ করছিলো যার ফলে জ্ঞান হাড়িয়ে পরে গিয়েছিলো। তবে রাতের মধ্য ভাগ পর্যন্ত ও অল ওকে ছিলো,, এরপর এমনটা হবে অর্পনা বুঝতে পারেনি। বুঝলে নিজের সেফ্টি নিশ্চিৎ করেই ঘুমাতো। ওয়াসরুমে গিয়ে অর্পনাকে সন্তর্পণে বাথটবে নামিয়ে দিলো দ্বীপ। লম্বা চুল গুলোতে হাত চালাতে নিলে অর্পনা শক্ত কন্ঠে বললো– এতো পেমপ্যার করার প্রয়োজন নেই,, আমি নিজেকে সামলাতে জানি। যখন পারতাম না তখন যেহেতু কাউকে পাইনি আজো কাউকে লাগবেনা।

,,,দ্বীপ শাওয়ার টেনে অর্পনার চুলে পানি দিতে দিতে বললো — আগে কি হয়েছে না হয়েছে জানিনা,, এখন থেকে তাই হবে যা আমি চাইবো। তুমি চুপচাপ লক্ষি বউয়ের মতো বসে থাকো।
,,অর্পনা তাচ্ছিল্য হেসে বললো — দয়া দেখাচ্ছেন নাকি যত্নের বিনিময়ে যত্ন ফিরিয়ে দিচ্ছেন? আপনি তো আবার দেনা পাওনায় বেশ পারদর্শী!! নিশ্চয়ই আপনাকে কেয়ার করেছিলাম বলে আপনিও আমায় কেয়ার করতে চাচ্ছেন। কিন্তু আমার সেসব লাগবেনা বিশ্বাস করুন। আমি এক ফেরারি মানবী,, কখনোই কোনো কূলে বাসা বাধিনি,, তাই এসবে রুচি নেই। ফেরারি অর্পনা,, ফেরারি জীবনেই ভালো।
,,, অর্পনার কঠিন কথার বেরাজালে ব্যাথিত হলো দ্বীপ। খুব করে চাচ্ছে নিজেকে সামলাতে,, মেয়েটার মন ভালো রাখতে কিন্তু মেয়েটা তা গ্রহণ করতে চায়না। সে চাইলেই ওকে ভালোবাসি বলতে পারছেনা। মন যদি ভালোবাসায় সাহারা না দেয় মুখ ফুটে তা বেরোবে কি করে? দ্বীপ মনের দগ্দতা লুকিয়ে হালকা শাসানোর স্বরে বললো– বেশি কথা বলছো মেয়ে,, মুখটা বন্ধ রাখো নয়তো মুখ বন্ধ করার বিশেষ ব্যাবস্থা আমার জানা আছে। দেখাবো?
,,,দ্বীপের ইশারায় অন্য কিছু ছিলো,, অর্পনা ঠোট কুচকে হাসলো,, দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বললো — ইন্টারেস্ট জাগেনা,, আসলে আপনাকে আমার রুচিতেই ধরেনা।

,,, রাগ হলো দ্বীপের,, এই মেয়েকে কোনোকিছুতেই কাবু করা যায়না,, দাতে দাত চেপে বললো — তোমার মুখ বরাবর দুটো স্যুট করে দিতে পারলে মনের খায়েস মিটতো। তিক্ত কথা ছাড়া ভালো কিছু বের হয়না? মাঝে মাঝে একটু মিষ্টি করে কথা বললেও তো পারো? হাসবেন্ডের খুশি -অখুশির ও তো একটা ব্যাপার থাকে।
,,,মুখ ফিরালো অর্পনা, তিক্ত কন্ঠে বললো — আপনাকে খুশি করার দায় নিয়ে রেখেছি আমি? সেইমল্যাস কা,,
,,,অর্পনার ঠোটে আঙুল চেপে ধরলো দ্বীপ, অত্যন্ত শান্ত কন্ঠে বললো– হুসস!! দ্বীপ মির্জার ব্যাক্তিত্ব নিয়ে বার বার এমন কমেন্ট করবেনা। আমি সেইমল্যাস হলে যেদিন তোমার আসল পরিচয় জানার পরেও নিজের খোরাক মিটাতাম। এতো বাধ বিচার মানতাম না,, মেয়ে পেলেই হতো এবার এটা তুমি হও কিংবা পারমিতা। আমি পারুকে সম্মান করার পাশাপাশি তোমারো সম্মান রেখেছি। হয়তো তুমি বুঝবেনা,, আমি বুঝাতেও চাইনা। আমি চাইনা আমাদের সম্পর্কটা বুঝা পড়ায় এসে ঠেকুক। আমরা দুজন দুজনকে পর্যাপ্ত পরিমান সময় দিবো নিজেদের অনুভূতি বুঝার জন্য। তুমি হয়তো তোমার অনুভতিতে শিউর কিন্তু আমার একটু সময় লাগবে।
,,, দ্বীপের কথা শেষ হওয়ার আগেই অর্পনা ঠোঁট থেকে আঙুল সরিয়ে কাট কাট গলায় বললো — আপনার প্রতি আমার কোনো অনুভূতি নেই,, আর না আপনাকে সময় দেওয়ার ইচ্ছা আছে। থাকুন না ভাই নিজের মতো,, আমার পিছনে পরে আছেন কেনো? আম,,

,,, আবারও ঠোটে আঙুল রাখলো দ্বীপ, ধমকে বললো– এই মেয়ে!! এতো কথা বলা লাগবে কেনো? তোমার মতামত চেয়েছি আমি? তোমাকে সময় দিতে হবেনা,, তুমি শুধু মুখটা বন্ধ রেখে চুপচাপ বসে থাকো আর আমাকে আমার কাজ করতে দাও।
,,,বলতে বলতে অর্পনার চুলে সাম্পু লাগাতে লাগলো দ্বীপ। অর্পনা কিছু বললো না,, এই সময়টাতে সে বড্ড উইক থাকে,, সেই সাথে দ্বীপের স্পর্শ কিংবা দৃষ্টিতে কোমলতা ব্যাতিত অন্য কিছু নেই তাই শান্ত রইলো। দ্বীপ চুলে মাসাজ করতে করতে বললো — চুল এতো ঘন কেনো? তোমার অস্বস্তি হয়না? ইদানীং তো বেশ গরম পরেছে,, চুলগুলো ছোট করে কেটে দিবোনে।

,,,দ্বীপের কথায় অবাক হলো অর্পনা,, না চাইতেও প্রশ্ন করে বসলো — আপনার লম্বা চুল পছন্দ না?
,,, দ্বীপ মুচকি হেসে বললো — খুব!! লম্বা চুল আমার খুব পছন্দ। তোমার পারুপুর চুল গুলো ও তোমার চুলের মতো লম্বা ছিলো তবে এতোটা ঘন নয়। তোমার গুলো খুব ঘন এবং সফ্ট। আমার খুব ভালো লাগে।
,,বিনিময়ে অর্পনাও মুচকি হেসে বললো — আই নো!! আমাদের মাঝে বড্ড মিল,, পারুপুকে দেখলে মনে হয় আয়না দেখছি। তবে পারুপু খুব সুইট ছিলো,, দেখলেই কেমন মায়া মায়া লাগে।
,,, পারুর কথা শুনেও অর্পনাকে স্বাভাবিক দেখে মনে মনে সস্থি পেলো দ্বীপ,, যদিও সে আগেই বুঝেছিলো অর্পনা পারুকে নিয়ে ডিস্টার্ব নয় বরং মনে মনে পারুকে বেশ সম্মান করে,, এখন শিউর হলো। দ্বীপ অর্পনার চুলে আরেকটু পানি দিয়ে মাসাজ করতে করতে বললো — সৌন্দর্য আর কম্ফোর্টের মাঝে একটা তফাৎ আছে আর আমি কম্ফোর্ট টাই প্রেফার করি বেশি। এইযে এটুকু শুটকি মাছ হয়ে এতগুলো চুল মাথায় রেখেছো কখন না জানি চুলের ভারে মাথা ঘুরে পরে যাও। তখন তো আরও বিপদ,, আমার তো একটাই তুমি। বিপদ আপদ হলে তখন আমার কি হবে? তাই চুল গুলো কেটে বিপদ থেকে রক্ষা করতে চাচ্ছি।

,,, কথায় কথায় এই চিকন হওয়া নিয়ে খোচা দেওয়াটা দ্বীপে স্বভাব হয়ে গিয়েছে,, অর্পনা ফুসে উঠলো। নাকমুখ কুচকে বললো — কথায় কথায় খোটা না দিয়ে বাহিরে যান, দয়া করে। আমি একাই পারবো।
,,,দ্বীপ শুনলো না,, অর্পনার মাথা ওয়াস করা শেষ করেই ওয়াসরুম থেকে বের হলো।বের হয়ে সোজা নিচে চলে গেলো। বউটাকে দেখে খুব উইক মনে হচ্ছিলো এই মুহুর্তে ভারি খাবার খাওয়া উচিত কিন্তু সকালে তো ভারি খাবার বানানো হয়না। শুধু পরটা, রুটি, আলুভাজি, সবজি আর ডিম ভাজা হয়,, এরপর যার যেটা প্রয়োজন সেটা খেয়ে নেয়। দ্বীপ রান্নাঘরে যেতেই দেখলো রোমানা বেগম আর সাথী বেগম রান্নার তোরজোর করছেন। দ্বীপকে রান্নাঘরে দেখে এগিয়ে এলেন রোমানা বেগম, বিচলিত কন্ঠে জানতে চাইলেন — কি হয়েছে আব্বু,, তুমি রান্না ঘরে কেনো? কফি লাগবে? লাগলে আমায় উপর থেকেই বলতে পারতে মেইড দিয়ে পাঠিয়ে দিতাম।
,,, মাকে বিচলিত হতে দেখে দুদিকে মাথা নাড়ালো দ্বীপ, মানে তার কফি লাগবেনা। পরপর ধীরো কন্ঠে বললো — ফ্রিজে ইলিশ আর ছোট মাছ রয়েছে না?

,,, রোমানা বেগম মাথা ঝাকিয়ে শায় জানালে দ্বীপ বললো — ইলিশ মাছ ভেজো,, সাথে এক-দুই পদের শাক রান্না করো,, ছোট মাছ দিয়ে জোল রান্না করো, বেশি ঝাল দিয়োনা। জানোই তো, তোমার বউমা ঝাল খেতে পারেনা।
,,,রোমানা বেগম মাথা ঝাকিয়ে শায় জানিয়ে দ্বিধান্মিত কন্ঠে বললো — কিন্তু অর্পনা তো সকালে ভারি খাবার খায়না,,ডায়েট করে। খেতে রাজি হবে?
,,,দ্বীপ বিরক্ত হলো,, দাতে দাত চেপে কিছুটা রাগান্বিত স্বরেই বললো– পিটিয়ে ওর ডায়েট বন্ধ করবো আমি। এইটুকু শরীর তার উপর নাকি ডায়েট করে। তুমি রান্না করে দাও, খাওয়ানোর দায়িত্ব আমার। এখন থেকে তিন বেলা ভারি খাবার খাবে ও,, মানা করলে সত্যি সত্যি মার খাবে আমার হাতে।
,,, রোমানা মুচকি হেসে শায় জানালেন। আল্লাহ এবার উনার সংসারটা পরিপূর্ণ করেছেন। এবার ছেলে- বউ, ভবিষ্যতে নাতি নাতনি নিয়ে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারলেই হলো। বড়ো জায়ের সাথে সাথে সাথী বেগম ও এগিয়ে গিয়ে কাজে হাত লাগালেন। বাড়ির বাকিসব কাজ বাজ মেইডরা করলেও রান্নাটা উনারাই করেন। নয়তো কেউ ই মন মাফিক খাবার খেতে পারেনা।

,,,দ্বীপ সিরি বেয়ে উপরে উঠতে নিতেই বিহানের মুখোমুখি হলো। এই পাপি আজ ফজরের নামাজ পরতে যায়নি সাথে সদ্য গোসল নেওয়ায় চুল গুলো ভিজে আছে। দ্বীপ ভ্রু কুচকে গাড়ো দৃষ্টিতে বিহানের দিকে নজর স্থাপন করলো,, গায়ে ফুল হাতা গেন্জি,, এই গরমে ফুল হাতা গেন্জি পরার বিষয়টা বুঝলো না কিন্তু যখনি কলার বেধ করে গলায় লাল লাল দাগ দেখতে পেলো তখনি বিরক্তিতে চোখ মুখ কুচকে নিলো দ্বীপ। বিহানের কাধে চাপর মেরে ক্রুদ্ধ কন্ঠে বললো — এতো বড়ো বেইমানিটা কিভাবে করলি বিহান? আমাকে রেখে নিজে নিজে বাসর সেরে নিলি? ছেহ!! একবার জানাতে পারতি।
,,, বিহান ক্রুর হাসলো,,এক ভ্রু উচিয়ে সন্দেহি কন্ঠে সুধালো — কেনো আমার কি তর সাথে বাসর করার কথা ছিলো? মানে আমরা দুজনেই তো ছেলে,, কিভাবে কি ভাই?
,,, ধুপ করে বিহানের পেটে ঘুষি বসালো দ্বীপ,, বিহান পেটে হাত চেপে বাকা হয়ে গেলো। পরপর বাহুতে কিল বসিয়ে বললো — লে*সবিয়ান একটা। কিছু হলেই উল্টাপাল্টা চিন্তা। বাই দ্যা ওয়ে,, কঙ্গ্রাচুলেশন!! নতুন জীবনে এগিয়ে যা।

,,, বিহান পেট আর বাহু ঘষতে ঘষতে বললো — বেড লাক!! আমার বোন তকে জীবনেও পাত্তা দিবেনা। এসব ইলিশ মাছ, ছোট মাছ খাইয়ে আমার বোনকে বশ করা ইম্পসিবল ।
,,, দ্বীপ ক্রুর হেসে বললো — ইলিশ মাছ, ছোট মাছের সাথে সাথে নাহয় স্পেশাল কিছু এড করে দিবো তাহলেই বশ মেনে যাবে।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৬

,,, বিহান চোখ ছোট ছোট করে বললো — কি স্পেশাল?
,, দ্বীপ পাশ কাটিয়ে উপরে যেতে যেতে বললো — পারশোনাল।
,,,পাশ কাটিয়ে যাবার সময় কিছু একটা ইশারা করেছে দ্বীপ,, বুঝতে পেরেই দুগালে হাত ছোয়ালো বিহান। মৃধু চাপর মারতে মারতে বললো — তওবা!! তওবা,, আসতাগফিরুল্লাহ!! একটা ছেলে কি করে এতোটা,, ছিহ ছিহ!!ভাবতেও অবাক লাগে,, সে নাকি আমার তিন ঘন্টার বড়ো ভাই। আল্লাহ!! মাফ করুন।

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৬ (৩)