Home ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি ৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৬ (৩)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৬ (৩)

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৬ (৩)
রুপান্জলি

বিছানায় কাঠ হয়ে বসে আছে অর্পনা,, মেজাজ আপাতত তুঙ্গে। সকাল সকাল সে কখনোই ভারি খাবার খায়না অথচ টি-টেবিলের উপর সযত্নে ভাত, মাছ, শাক সাজিয়ে রাখা হয়েছে। আর সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে দ্বীপ মির্জা,, তার হাতে গরম গরম কফি। পরনে কফি কালার টিশার্ট,, কফি কালার ট্রাওজার,, হাফ হাতা টিশার্ট পরার ফলে অতিরিক্ত ফর্সা হাত আর সেই হাতের সিড়া গুলো দৃশ্যমান। দেখতে পুরো কফিময় পাওডার মনে হচ্ছে। মানে বসার স্টাইল, কফি ধরার স্টাইল,, মাঝে মাঝে কফিতে চুমুক দেওয়া,, চুমুক দেওয়ার আগে তাতে ফু দেওয়া এগুলো বেশ আকর্ষণীয় ঠেকছে। ধুসর রঙা চোখ গুলো অর্পনার দিকেই তাক করা,, অর্পনা যতবার চোখ ঘুরিয়ে তাকাচ্ছে ততোবারই দ্বীপের গভীর দৃষ্টির সাথে দৃষ্টির মিলন ঘটছে। এরকম লুকে দ্বীপকে দেখার পর যেকোনো মেয়ের হৃদপিণ্ড থমকে যাবে নিশ্চিত ,, তবে অর্পনা ফিরেও তাকাচ্ছেনা। না দ্বীপকে দেখছে আর না তার আনা খাবার গুলোকে। এই দুটোর মধ্যে একটাতে ইন্টারেস্ট খুজে পাচ্ছেনা সে। অর্পনাকে এরকম শক্ত হয়ে বসে থাকতে দেখে দ্বীপ কফির মগটা টি টেবিলের উপর শব্দ করে রাখলো। অর্পনা বুঝলো শব্দের মাধ্যমে দ্বীপ তার মনোযোগ পেতে চাইছে কিন্তু অর্পনা সেসবে পাত্তা দিলোনা। মনযোগ না পেয়ে গলা খাকারি দিলো,, এবারেও লাপাত্তা অর্পনা। রাগ হলো দ্বীপের তবে সেটা প্রকাশ করতে চাইলো না। গম্ভীর কন্ঠে ডাকলো — ভেলোরা!! কাম,, বিছানায় খাবার খাওয়া আমি পছন্দ করিনা। এখানে আসো।

,,, অর্পনা বিরক্তিকর দৃষ্টি ফেলে দ্বীপের দিকে তাকালো। আমরা যখন কাউকে একটা জিনিস বুঝাতে চাই আর অপর পাশের মানুষ টা সেসব বুঝা তো দূর কানেও তুলতে চায়না। তখন রাগের চেয়ে বেশি বিরক্তি কাজ করে। অর্পনা বিরক্তিতে চোখ মুখ কুচকে বললো — এই দ্বীপ মির্জা!! আমার কথা আপনার কানে যায়না? আমি এখানে থাকবোনা,, আমাকে যেতে দেওয়া হোক।
,,, অর্পনা কথাটা শেষ করতে পারেনি,, একদম হাওয়ার গতিতে সামনে চলে এলো দ্বীপ, সেকেন্ডের গতিতে অর্পনাকে কোলে নিয়ে কাটকাট গলায় বললো — যেতে দিবোনা,, কি করবে তুমি? কি করার ক্ষমতা আছে তোমার? বাড়ি আমার, ঘর আমার, বউ আমার। সুতরাং আমি যা বলবো তাই হবে।

,,,বলতে বলতে সোফার উপর বসিয়ে দিলো,, অর্পনা বিরক্ত,, চরম বিরক্ত। দাতে দাত চেপে দ্বীপের কলার ধরে শাসিয়ে বললো — আপনি বুঝতে পারছেন না? আমি মুক্তি চাচ্ছি? কাহিনি করছেন আমার সাথে ?
,,, দ্বীপ অর্পনার দিক থেকে চোখ সরিয়ে কলার ধরা হাত দুটোর দিকে তাকালো,, পরপর আবারও গভীর দৃষ্টিতে অর্পনার চোখে তাকালো। এভাবে তাকাতে দেখে হালকা থমকালো অর্পনা আর ওর থমকানোর সুযোগ নিয়ে ওকে একটানে কোলের উপর বসিয়ে দিলো দ্বীপ। পরপর কলার থেকে দুটো হাত টেনে পিছন নিয়ে একহাতে চেপে ধরে বললো — কাহিনি করবো নাকি অন্যকিছু, সেটা আমার ইচ্ছা। অতিরিক্ত লাফজাপ করবেনা। হয় আমার কথা মতো পাশে বসে খাবে নয়তো এভাবেই কোলে বসিয়ে খাওয়াবো। কোনটা চাও? দ্রুত বলো!!
,,,অর্পনা হাত ছাড়াতে চেয়ে বললো — ছাড়ুন!! আমি কোনো বাচ্চা নয় যে এভাবে খাওয়াতে হবে,, পাশে বসেই খাচ্ছি কিন্তু এগুলো না। আমি সকালে ভারি খাবার খাইনা।
,,,অর্পনাকে ছেড়ে দিলো দ্বীপ,, সাথে সাথে দূরে সরে বসলো অর্পনা। দ্বীপ প্লেটে ভাত বেড়ে তাতে শাক নিয়ে মাখাতে মাখতে বললো — কেনো ভারি খাবারে কি সমস্যা?

,,,আমি ডায়েট করি।
,,, এটুকু শরীরে? ( এক ভ্রু উচিয়ে)
,,, সরল চোখে তাকালো অর্পনা,, কিছুটা অবজ্ঞা, কিছুটা তাচ্ছিল্যতা নিয়ে বললো– হোয়াট ডু ইউ মিন বাই এটুকু শরীর? আপনি কি আমার বডি সেইম করছেন? ছেলে ছেলে মনে হয় আমাকে?
,,, অর্পনার কথায় চোখ তুলে তাকালো দ্বীপ,, ইলিশ মাছ থেকে এক টুকরো তুলে নিয়ে শাক দিয়ে মাখা ভাত দিয়ে লোকমা বানিয়ে অর্পনার মুখের সামনে ধরে বললো– আমাকে অন্যের সাথে গুলাবেনা অর্পন,, আমি দ্বীপ! তোমার হাসবেন্ড। আমার কাছে আমার ওয়াইফ সর্বো সুন্দরী। তার আগে কিংবা পরে কেউ নেই,, তাই বলে তোমার সব আবদার মেনে নেওয়া হবেনা। এখন থেকে এসব ডায়েট ফায়েট ক্লোজ। তিন বেলা ভারি খাবার খাবে তুমি। আর এটাই আমার ফাস্ট এবং লাস্ট ওয়ার্ন,, কথা না শুনলে খুব মারবো। হা করো,, ফাস্ট!!

,,,দ্বীপের কথা বার্তা আর শাসনে বড্ড অবাক হলো অর্পনা। এভাবে তো বাচ্চাদের সাথে কথা বলে মানুষ,, দ্বীপ কি তাকে বাচ্চা বানাতে চাচ্ছে নাকি? ঠিক বয়সে বিয়ে করলে এখন দুই বাচ্চার মা থাকতো,, আর তার সাথে বাচ্চাদের মতো বিহেব? মানা যাচ্ছেনা। অর্পনাকে এভাবে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে দ্বীপ হালকা ধমকের স্বরে বললো — ভাত খাবা নাকি মার খাবা? পাঁচ সেকেন্ডের মাঝে হা না করলে মাথায় চাটি পরবে। নাউ চয়েজ ইজ ইউর্স!!
,,, কি বলবে অর্পনা ভেবে পেলোনা, ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। পাপ্পার কথা খুব মনে পরছে,, পাপ্পা বরাবরই তাকে খাইয়ে দিতো। আজ পাপ্পার পর কেউ এতোটা তোরজোর করে খাওয়াতে চাচ্ছে। অর্পনার ভাবনার মাঝে গালে হাত রাখলো দ্বীপ,, আদুরে কন্ঠে বললো — হা করো ময়না! ”

,,,অর্পনা ঘোরের মধ্যেই হা করলো,, সাথে সাথে লোকমা তুলে দিলো দ্বীপ। ভাত গরম হওয়ায় অর্পনার খেতে অসুবিধা হচ্ছিলো, সহসাই হা করে শ্বাস টানতে লাগলো অর্পনা। দ্বীপ বিষয়টা বুঝতে পেরে হা করা মুখে ফু দিয়ে ভাত ঠান্ডা করতে চাইলো। দ্বীপের কান্ডগুলো খুব ডিস্টার্ব করছে অর্পনাকে। এসব তার পছন্দ হচ্ছেনা। কেউ কোনো তাকে এতোটা পেমপ্যার করবে? এসবে তো সে অভ্যস্ত নয়। দ্বীপ আরেক লোকমা নিয়ে সেটা আগে ভাগে ফু দিয়ে ঠান্ডা করতে করতে বললো — দ্রুত খাওয়া কম্প্লিট করো,, একটু পর একজন মেয়ে আসবে।
,,, বলতে বলতে আরেক লোকমা এগিয়ে দিলো, অর্পনা সেটা গ্রহণ করে চিবুতে চিবুতে বললো — কোন মেয়ে? আর কেনো আসবে?

,,, দ্বীপ আবারও লোকমা বানিয়ে ঠান্ডা করতে করতে বললো — তোমার চুল কাটাতে।
,,, ভ্রু কুচকালো অর্পনা,, মুখ বিকৃত করে বললো– মানে কি? আমি আমার এতো লম্বা চুল কেটে ছোট করে ফেলবো? মাথা খারাপ আপনার?
,,, কেনো ছোট করলে সমস্যা কোথায়? বছর ঘুরতেই আবার বড়ো হয়ে যাবে। এতো চিন্তা নেও কেনো?
,,,ধুর না,, আগে বড়ো চুল ঝামেলা লাগলেও এখন অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। কেটে ফেললে আমার নিজেরি আন-ইজি লাগবে। সো, আমি চুল ছোট করবো না।
,,, দ্বীপ ভাবুক হলো, জ্বীব দিয়ে গাল ঠেলে বললো– ছোট করবেনা তাইনা? ওকে!! বিষয়টা নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। আচ্ছা হা করো, বাকিটা আমি দেখে নিবো।
,,,অর্পনা চুপচাপ খেয়ে নিলো। আমরা যখন নিজেরা নিজেদের মতো বাচতে শিখে যাই,, নিজেই আত্ম নির্ভর হয়ে উঠি তখন হুট হাট কেউ দায়িত্ব নিতে চাইলে বড্ড অস্বস্তি ফিল হয়। সবকিছু কেমন বেশি বেশি মনে মনে হয়। অর্পনারো তাই হচ্ছে,, সে খেতে খেতে কিছুটা ধীরো কন্ঠে বললো — আমার সাথে এমন বিহেভ করছেন কোনো দ্বীপ?

,,, কেমন করছি?
,,, এইযে, এতো এফোর্ট দিচ্ছেন অথচ এগুলো আমি চাইছিনা। আপনাকে বুঝতে হবে, আমার এসব প্রয়োজন পরেনা। আমি ফেরারি,, ঘর বাধতে শিখিনি। দয়া করে ক্ষান্ত হোন আর আমাকে মুক্তি দিন। এই নিয়মের বেড়াজালে আমি আবদ্ধ হতে চাইনা।
,,, আমি আবদ্ধ করতে চাই!! আর এটা আমি করবোই। রোজ রোজ এমন করবো তোমার সাথে,, খুব কেয়ার করবো,,খুব আদর করবো আর এসব তুমি গ্রহন করতে বাধ্য।
,,,অর্পনা বিরক্তিতে চ সূচক বাক্য উচ্চারন করলো। তবে আর কিছুই বললো না। অর্পনার কাছে আগের অসুস্থ দ্বীপটাকেই বেশি ভালো লাগতো,, সারক্ষন চুপচাপ থাকতো,, মাঝেমধ্যে রাগ দেখাতো,, অর্পনার সব কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতো এবং মানতো আর এখন!! এখনকার দ্বীপ অর্পনাকে পাত্তা দেয়না,, নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেয়। অর্পনা কিছু বললে সেটা সিরিয়াসলি নেয়না। এইযে সকাল থেকে একটার পর একটা খারাপ ব্যাবহার, তিক্ত কথা বলে যাচ্ছে দ্বীপ কানেই তুলছেনা। বাড়ি ছেড়ে চলে যাবার কথা বললে সিরিয়াসলি নিচ্ছেনা। নিজের ফোনটাও কোথায় না কোথায় হাড়িয়ে এসেছে এখন যে পাপ্পাকে একটা কল করবে তারো জো নেই। আদ্রিয়ান কেমন আছে আল্লাহ জানেন!! আর তার বন্ধু বান্ধব গুলোর কি অবস্থা তাও জানা নেই। সে যে অস্ট্রেলিয়া যেতে পারেনি এটার বিষয়ে আদেও কি তারা কিছু জানে? নাকি সবাই ভাবছে সে অস্ট্রেলিয়া পৌছে ওদেরকে ভুলে গিয়েছে?
এতো এতো ভাবনা ভাবতে ভাবতে এক প্লেট খাবার সে অনায়াসেই খেয়ে নিলো। প্লেটের ভাত শেষ হতেই আবার ভাত নিলো দ্বীপ,, তাতে ছোট মাছের ঝোল নিয়ে মাখতে নিতেই সম্ভিত ফিরলো অর্পনার। দ্রুত বাধা দিয়ে বললো — এই না না,, আর খাবোনা। আল্লাহ!! কি করছে এই লোক,, দ্বীপ রাখুন। আমি আর খেতে পারবোনা ভাই,, মাফ করুন।

,,, অর্পনার মুখে ভাই ডাক শুনে রাগ হলো দ্বীপের, ভাতের লোকমা তুলে দিয়ে বললো — আ’ম নট ইউর ব্রাদার,, ওকে? ডাকার হলো হাসবেন্ড ডাকবে নয়তো শুধু নাম ধরে ডাকবে। এডব ভাই ডাকাডাকি আমি পছন্দ করিনা, আর সবচেয়ে বড়ো কথা হাসবেন্ডকে ভাই ডাকলে আল্লাহ নারাজ হোন।সুতরাং এটুকু সুধরে নাও। যাই হোক!! আগে কি খেতে না খেতে সেসব আমি দেখতে যাবোনা। আমি সেটাই দেখবো যেটা খেলে আমার বউ সুস্থ সবল থাকবে। নাও, হা করো।
,,,খেয়ে নিলে অর্পনা। জেতার আসঙ্কা না থাকলে অযথা লড়াই করে লাভ নেই। খাওয়ানো শেষ হলে হাত ধুয়ে অর্পনার মুখ মুছিয়ে দিলো দ্বীপ। পরপর একজন মেইডকে ডেকে জুঠার প্লেট গুলো নিয়ে যেতে বললো। মেইড এসে সেসব নিয়ে যেতেই অর্পনার কোলে মাথা রেখে সোফায় শুয়ে পরলো দ্বীপ। হকচকিয়ে গেল অর্পনা,, অবাক কন্ঠে জানতে চাইলো– এসব কি হচ্ছে? সরুনতো,, ভালো লাগছেনা। জাস্ট বিরক্তিকর।

,,, দ্বীপ শান্ত দৃষ্টিতে অর্পনার দিকে তাকালো, পরপর তার থেকেও অধীক শান্ত এবং গম্ভীর কন্ঠে বললো — ভালো লাগছেনা তাই না? আমার উপস্থিতি তোমায় বিরক্ত করছে? আচ্ছা!! আর বিরক্ত করবোনা,, যাও।
,,, বলতে বলতে উঠে বারান্দার দিকে চলে গেলো,, দ্বীপের কান্ডে থতমত খেলো অর্পনা। এই লোক তার সাথে রাগ করছে? মানে অসুস্থতার সময় যেমন কাছে না গেলে গাল ফুলিয়ে রাখতো তেমন করে এখোনো গাল ফুলালো? এখন অর্পনার কি করনীয়? আগের মতো কাছে গিয়ে আদর করে রাগ ভাঙানো? নাহ!! কখনোই এসব করবেনা সে। আগে আর এখনের মাঝে বড্ড তফাৎ। আগে তো ওসব পারু করতো এখন তো আর সে পারু নয়,, তাই এসব করার তাড়া নেই। রাগ হয়েছে মিটে যাবে,, না মিটলে হয়তো ছেড়ে দিবে। ছেড়েই দিক, থাকার ইচ্ছা নেই অর্পনার।ভাবতে ভাবতে কুষন জড়িয়ে সোফায় গা হেলিয়ে দিলো অর্পনা। ঠিক আধা ঘন্টার মাথায় রুমের দরজায় নক করলো কেউ,, অর্পনা সেদিক পানে তাকাতেই পরশি উকি দিয়ে বললো — ভাবি!! সানায়া আপু এসেছে,, ভিতরে আসবো?

,,,অর্পনা জানেনা সানায়া কে? তবে দ্বীপ তখন বলেছিলো একটা মেয়ে আসবে তাই মাথা ঝাকিয়ে শায় দিলো। তরিহরি করে রুমে এলো পরশি এসেই ধপ করে অর্পনা পাশে বসে পরলো,, সাথে সাথে মাথাও হেলিয়ে দিলো অর্পনার কাধে। না চাইতেও হেসে ফেললো অর্পনা,, এই মেয়েটা চঞ্চল,, একদম ছোট্ট অর্পনার মতো,, যখন সে তার মাম্মা পাপ্পার সাথে খুব সুখে ছিলো তখনকার মতো। সানায়া নামক মেয়েটি ধীরে ধীরে রুমে আসলে অর্পনা তাকে বসতে বললো। রুমে কেউ এসেছে বুঝতে পেরে বারান্দা থেকে রুমে এলো দ্বীপ। পরশিকে অর্পনার কাধে মাথা হেলিয়ে থাকতে দেখে ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে অর্পনার তাকালো। সে একটু কোলে মাথা রেখেছিলো বলে কতো কথা শুনালো আর এখন যে পরশী ওর কাধে মাথা রাখলো তাতে কিছু না। সবসময় বউটা ওর সাথেই এমন করে যেনো দ্বীপ তার সৎ জামাই। দ্বীপকে এভাবে তাকাতে দেখে অন্যদিকে মুখ ঘুরালো অর্পনা। হিংসুটে মির্জা, আগে মেধাকে হিংসা করতো আর এখন পরশিকে হিংসা করছে। এতো হিংসা আসে কতথেকে ভাই? ভালো তো বাসেনা, আবার হিংসা করে। করলে করুক তাতে অর্পনার কি? বউয়ের মুখ ফিরানো দেখে আরও গাল ফুলালো দ্বীপ।বউটা তাকে বেহিসাবি ইগনর করছে,, এতোটা ইগনর সে কখনোই প্রাপ্পো নয়। দ্বীপের ভাবনার মাঝেই সানায়া নামক মেয়েটি অর্পনার উদ্দেশ্যে বললো– চুলে কি কাট দিবেন ভাবি?

,,,দ্বীপ এগিয়ে এসে সানায়ার উদ্দেশ্যে বললো — ওর সাথে নয় আমার সাথে কথা বলুন,, ও ওসব বুঝেনা।
,,,সানায়া শায় জানিয়ে বললো — জ্বী ভাইয়া বলুন।
,,,দ্বীপ হাতে থাকা ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে একটু ভাবুক হয়ে বললো– ওইযো একটা কাট থাকেনা? মাথার উপর থেকে চুল একটু একটু করে কাটতে কাটতে একদম নিচ পর্যন্ত কাটে। চুল লম্বা থাকে তবে পাতলা হয়ে যায়, সেই কাট টা দিয়ে দিন।
,,,দ্বীপের বলা কাট টা সহজেই ক্যাচ করে নিলো পরশি, অর্পনার চুলে হাত বুলাতে বুলাতে উৎফুল্ল কন্ঠে বললো — ওহ!! বাটারফ্লাই কাট? হুম, ভাবি তোমার চুলে এই কাট দিলে খুব সুন্দর হবে। তোমাকে একদম প্রিটি গার্ল লাগবে।
,,,অর্পনা বিনিময়ে মিষ্টি করে হাসলো কিন্তু মনে মনে হালকা সন্দেহ হলো। এই লোক এই কাট কই থেকে শিখলো? পারুপু তো জীবনেও চুলে কাট দিতো না। আর সে তো কোনোরকম চুলের আগা কেটে দিতো যেনো অতিরিক্ত বড়ো না হয়। তাহলে উনি এই কাট কার থেকো শিখলেন? নিশ্চিত এই কদিনে ভালোই মেয়েদের দিকে তাকানো হয়েছে। নয়তো দেখার তো কথা না। ভেবেই রাগ হলো অর্পনার। সে পরশীর উদ্দেশ্য বললো — পরশী!! অন্য কোনো কাট সিলেক্ট করো,, আমি এভাবে চুল কাটবো না।

,,, অর্পনার নাকোচে আরও ক্ষিপ্ত হলো দ্বীপ, রাগি কন্ঠে বললো — আমি একটু অফিসে যাবো,, ফিরতে ফিরতে রাত হবে। এসে যেনো আমার পছন্দ সই চুল দেখতে পাই। আর পরশী!! ভাবির খেয়াল রাখবে,, দুপুরের ওকে খাওয়ানোর দায়িত্ব তোমার। একটু পর পর ঠান্ডা শরবত পাঠাতে বলবে,, না থাক!! আমি ই আম্মুকে বলে যাবো। তোমরা তোমাদের কাজ করো।
,,, বলতে বলতে হেটে ওয়াসরুমে ঢুকে গেলো দ্বীপ । অন্যদিকে তাকিয়ে থাকলেও দ্বীপের পুরোটা কথা মনোযোগ দিয়েই শুনেছে অর্পনা। এমনিতে বাটারফ্লাই কাট কোনটা সেটা অর্পনা জানেনা, কখনোতো নিজেকে তেমন করে সাজানো হয়নি। বর জীবনে এমন কেউ ছিলো ও না যার জন্য সাজবে। ওর ভাবনার মাঝেই পরশি অর্পনার গলা জড়িয়ে বললো — ও ভাবি!! ভাবিগো। চলোনা আমি তুমি আর মেধাপু মিলে বাটারফ্লাই কাট দেই। তুমি অনুমতি দিলে আমি মেধাপুকে ডেকে আনবো। চলোনা,, চলোনা,, একটু রাজি হও। আমরা তিনজন একই কাট দিয়ে চুলের ছবি তুলে এফবিতে স্টুরি দিবো। প্লিজ প্লিজ!!

,,,চঞ্চল পারশীর অনুরোধ ফেলতে পারলোনা অর্পনা। মাথা ঝাকিয়ে শায় জানাতেই পরশী দৌড়ে গেলো মেধাকে ডেকে আনার উদ্দেশ্যে। পরশি যেতেই সানায়া সাথে করে আনা প্রোডাক্ট গুলো বেগ থেকে নামাতে লাগলো। সানায়া এর আগেও মির্জা বাড়িতে বহুবার এসেছে। এই বাড়ির মেয়ে বউদের চুল কাটা কিংবা অন্যান্য পার্লার ট্রিটমেন্টের জন্য বরাবর সানায়াদের পার্লার থেকেই লোক আনা হয় তাই অর্পনা ব্যাতিত পরিবারের সকলের সাথেই তার ভালো সক্ষতা আছে। এইতো ঘন্টাখানেক আগেই দ্বীপ সানায়ার আম্মুকে কল করে চুল কাটার জন্য বুকিং দিলো। সানায়া সবকিছু রেডি করতে করতে মেধাকে টেনে রুমে নিয়ে এলো পরশি। মেধা কিছুটা নার্বাস, সেই সাথে অর্পনার সাথে হালকা রেগে আছে,,তাই সহজ হতে পারছেনা। অর্পনা জানে মেধা তার উপর রেগে আছে তাই উঠে গিয়ে জেচে পরে মেধাকে টেনে এনে নিজের পাশে বসিয়ে দিলো। পরপর মেধাকে পর্যবেক্ষণ করে মুচকি হেসে বললো — বিয়ে না করলেও বাসর তো ঠিকি করেছো।
লজ্জা পেলো মেধা,, দুহাতে মুখ ঢেকে বললো — ইস্স!! লজ্জা দিওনাতো।

,,,অর্পনা মেধার মুখ থেকে হাত সরিয়ে বললো — কই দেখি, কতোটা লজ্জা পাচ্ছে আমাদের মেধা রানী।
,,, আরও লজ্জা পেলো মেধা, অর্পনার কাধে মুখ লুকিয়ে বললো — এই না না,প্লিজ!!
,,, মেধার কান্ডে হালকা শব্দ করে হাসলো অর্পনা। মেধার মাথাটা টেনে বার বার মুখ দেখতে চাচ্ছে কিন্তু মেধা দেখাতে নারাজ।ওদের খুনশুটির মাঝেই দ্বীপ ওয়াসরুম থেকে বেড়িয়ে ফাইল সেল্ফ থেকে কয়েকটা ফাইল নিয়ে বেড়িয়ে গেলো। যাবার আগে খুব সন্তর্পনে বউটাকে একবার দেখে নিলো। নাহ!! বউ তাকে মনোযোগের কাতারে রাখেনি। ভিতরটা হাসফাস লাগলো দ্বীপের,,সে এতো সুন্দর পরিপাটি হয়ে বের হলো বউটা একবার তার দিকে মনোযোগ দিতে পারতো। বউয়ের মনোযোগ না পেয়ে চলে গেলো দ্বীপ। বড়ো ভাইয়া চলে যেতেই পরশি মোবাইল বের করে গান ছাড়লো —
,,,তুই যতই বল আমায় বোকা ভোলা,,
,,হায় হায় বোকা ভোলা,,
,,কাল হবি তুই আমার কোকা কোলা,,
,,,গানের তালে সালো কোমর ধুলিয়ে, চুল এদিক ওদিক করে,, লাফিয়ে ঝাপিয়ে নাচতে লাগলো পরশি। ওর নাচ দেখে সানায়া হাসতে হাসতে শেষ,, মেধা আর অর্পনার অবস্থা ও তাই। হাসতে হাসতে অর্পনা ভুলেই গেলো তার একাকিত্ব, যন্ত্রণা, অপূর্নতা!!

,,,গাড়ির ফ্রট মিররে তাকিয়ে মুখ ঘুড়িয়ে ঘুড়িয়ে নিজেকে পর্যবেক্ষন করছে দ্বীপ,, কখনো চুল বেক ব্রাস করছে তো কখনো খোচা খোচা দাড়িতে হাত ভুলাচ্ছে,, আবার কখনো কখনো শার্টের কলার ঠিকঠাক করছে। সবসময় শার্টের তিনটে বোতাম খোলা রাখলেও আজকে সুন্দর করে বুকের দুটো বোতাম বাধে বাকি সবগুলোই লাগিয়ে নিয়েছে। তবুও তার কেমন যেনো কমতি কমতি মনে হচ্ছে। বিহান ড্রাইভ করতে করতে একবার দ্বীপের দিকে তাকালো,, ওকে এরকম উসখুস করতে দেখে ভ্রু বাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো — জোহান!! কি হয়েছে তর? এরকম উসখুস করছিস কেনো ভাই?

,,, দ্বীপ মিরর থেকে চোখ ঘুড়িয়ে বিহানের দিকে তাকিয়ে সন্দেহি কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো — তথাকথিত আছে, দ্বীপ মির্জার চোখ নাকি হিপনোটাইস্ড করার ক্ষমতা রাখে। ইদানিং সেই কথাটাকে মিথ্যে মনে হচ্ছে।
,,,বিহান চোখ ছোট ছোট করে জানতে চাইলো — হঠাৎ এমন কথা?
,,, দ্বীপ আবারও আয়না দেখতে দেখতে বললো– আমার কিছু প্রশ্নের উত্তর দেতো বিহান।
,,, কি প্রশ্ন?
,,, আমার চোখের সৌন্দর্য কমে গিয়েছে?
,,, একদমি না,, এখন আরও আকর্ষণীয় লাগে। সম্ভাবত তর অসুস্থতার ফলে ধূসর রংটা আরো গাড়ো হয়েছে।
,,,তাহলে কি হেয়ার কাট টা চেন্জ করতে হবে?
,,, নাহ!! একদম পারফ্যাক্ট লাগছে।
,,,, দাড়ির সেইপটা?
,,, পারফ্যাক্ট!!
,,, বডি, মাসাল?
,,, ১০০\১০০০!!
,,, দ্বীপ হতাশ হলো,, হতাশা ভরা কন্ঠে বললো– তাহলে অর্পনা আকর্ষিত হয়না কেনো

,,, দ্বীপের কথা শুনে ক্রুর হাসলো বিহান,, যা ভাবিয়াছিলো তাহাই সম্পাদন হইয়াছে। দ্বীপ তাহলে বউয়ের সামনে নিজেকে সুন্দর প্রমান করতে চাচ্ছে? ভাবতেই আরও হাসি পাচ্ছে বিহানর,, তবে সেই হাসিখানা চেপে রাখলো পরের দ্বীপের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়লো– কি হয়েছে? পুরোটা খুলে বল।
,,, দ্বীপ হতাশ কন্ঠে বললো– ভালোবাসা আর আকর্ষণ দুটো আলাদা জিনিস। আমি চাই অর্পনা আমার প্রতি আকর্ষিত হোক। আমার মাঝেই আবদ্ধ থাকুক কিন্তু সেটা হচ্ছে না। অর্পনা কোনো মতেই আমাকে মানতে পারছেনা।।
,,, দ্বীপের হতাসের বিপরীতে বিহান শব্দ করে হাসলো,, এই ছেলে বউয়ের পাত্তা না পেয়ে নিজের ব্যাক্তিত্ব হাড়াতে বসেছে। হাসতে হাসতে গান ধরলো বিহান,,, ( গানটা স্কিপ করবেনা, পুরোটা পড়ো)

,,, বউ পাত্তা দিচ্ছেনা,,
,, বউ সম্মান করছেনা,,
,, আমার কাম বেক হচ্ছেনা,,
,,,তত্তুর তু তুত্তুর তুওওও
,, আমার বাসর হচ্ছেনা,,
,,ফিউচার প্লানিং হচ্ছেনা,,
,,,কি করবো জানিনা,,
,, তুত্তুর তু তুত্তুর তুওও
,, মা বলছে বিহানের পা ধোয়া পানি খা,,
,,,বাবা বলছে তুই কোনো কাজের না,,
,,বউ বলছে তুই আমার লাইফ থেকে সরে যা,,
,, আমি কোথায় যাবো,, বুঝতে পারিনা আআআ,,
,, আমি এতো সুন্দর হয়েএএ ওওওও
,,,বউয়ের পাত্তা তো পাচ্ছিনা,,,
,, বিহানের ফালতু গান শুনে কলার চেপে আরও চার পাচটা ঘুষি বসালো দ্বীপ । বিহান মার খেতে খেতে আরও জোড়ে জোরে গাইতে লাগলো,

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৬ (২)

,, বউ পাত্তা দিচ্ছে না,,
বউ সম্মান,,আল্লাহ গো!! মেরে ফেললো!!
ছাড় জোহান,,এক্সিডেন্ট হবে। ছাড় শালা,, ওরে আল্লাহ!! ওফফ মাফ কর,, আর বলবোনা। জোহানের বাচ্চা ছাড়, নয়তো বাড়ি গিয়ে বড়ো আব্বুর কাছে নালিশ করবো। আল্লাহ বাচাও,, ওমাাাআআ!

৩৭ পৃষ্ঠার ডায়েরি পর্ব ৩৭